তিন
বৃহস্পতিবার।
সকাল।
টেবিলে বসে জলখাবার সারছিল কেশু আর হেলেন।
টোস্ট করা পাঁউরুটি- মাখন আর ডিম ভাজা শেষ করে দ্বিতীয় দফা কফি নিয়ে কেশু সহজ গলায় ঘরোয়া আলাপের ভঙ্গিতে বলল , ‘মানিক আসছে আজ। দুপুরে এখানেই খাবে।’
‘কে? কার নাম বললে ? ’ পেয়ালাতে কফি ঢালতে গিয়ে থমকে গেল হেলেন।
‘আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাগরেদ ।’ মাখনে কোটা নাড়তে নাড়তে বলল কেশু।
‘সেই জালিয়াতটা? মাত্র না জেল থেকে বের হল ?’
‘ দু-বছর আগে। মাত্র না।দুই বছর তো অনেক সময়।’ নরম গলায় বলল কেশু । ‘ছেলেটা ভাল। তুমিও তো ওকে বেশ পছন্দ করতে একটা সময়।’
হেলেনের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
‘কিন্তু কী চায় তোমার কাছে ?’
‘ কিছু না। কিছু চাইলেই যে একজন আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করবে এটা কোন কথা না।’ পেয়ালা ঘুরিয়ে কফি নাড়তে নাড়তে বলল কেশু । ‘ কাল ফোন করেছিল আমাকে। এখানে একটা হোটেল খুলতে চায়। নিজের ব্যবসা চালাচ্ছে। দেখা করতে চাইল। না করলাম না। ছেলেটা ভালো ।’
‘ লোকটা পেশাদার ক্রিমিনাল। থানায় ওর ফাইলগুলো বেশ ভারি।’ থমথমে গলায় বলল হেলেন। ‘ তুমি আমাকে কথা দিয়েছিলে, এসব ঝামেলা থেকে দূরে থাকবে। আমাদের মান সম্মান দিকে খেয়াল রাখবে।এই শহরের কেউ যদি দেখে, তুমি একজন পুরানো চাল ঘাগু অপরাধীর সাথে কথা বলছ , তখন কী হবে?’
অনেক কষ্টে রাগ সামলাল কেশু।
‘আহ, হেলেন। থাম তো। ছেলেটা আমাদের পুরনো লোক ৷ জেলে গেছে মানে না আমরা ওকে এড়িয়ে চলব । ছোকরা একদম সিধে হয়ে গেছে । বললাম না, ব্যবসা করে।’
‘ কীসের ব্যবসা ?’
‘জানি না। দেখা হলে তুমি নিজেই জিজ্ঞেস করে নিও।’
‘ আমি ওর সাথে দেখা করতে চাই না। বাসায়ও আনতে চাই না। তুমি এ সবের বাইরে থাকবে।’
অনেক সময় নিয়ে জলখাবার আর কফি শেষ করে সিগারেট ধরাল কেশু । কাটা কাটা গলায় বলল, ‘ কারও উপদেশ কানে ঢুকিয়ে আমি চলি না। তুমিও জানো সেটা। মানিক আমাদের বাড়িতে দুপুরের খাবার খাবে। ও আসছে। কারন আমার পুরোনো বন্ধু। ব্যস আর কিছু না৷ কাজেই শান্ত হও।’
ভেতর ভেতর বেশ ভয় পেয়ে গেল হেলেন।
চেহারা দেখে বুঝতে পেরেছে, রেগে গেছে ওর স্বামী।
লোকটাকে যমের মতো ভয় পায় । এটাও জানে, দিন দিন ওর বয়স বেড়ে যাচ্ছে। শরীরে মেদ জমেছে। প্রত্যেক সকালে আয়নায় তাকিয়ে আবিষ্কার করে চেহারা দিন দিন ঘষা পয়সার মত জৌলুসহীন হয়ে যাচ্ছে। কেশুর বয়স যদিও ষাট। এখনও সবল আর তেজি। যদিও ও অন্য মেয়ের দিকে নজর দেয় না । তারপরও রাশ টেনে না ধরলে নজর দিতে কতক্ষণ ? বিগড়ে যাওয়া পুরুষের ধর্ম।
‘ঠিক আছে ।’ জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল হেলেন। ‘ আমি ভালো কিছু রান্না করে রাখব। আসলে আমি ভেবেছিলাম...।’
উঠে দাঁড়াল কেশু। ‘ স্টেশনে যাচ্ছি। ওকে আনতে। সাড়ে বারোটার মধ্যে চলে আসব৷।’
হেলেনের ঘাড়ে আলতো করে আদর করে বের হয়ে গেলো কেশু ।
ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়ল হেলেন। পা কাঁপছে।
মানিক আসছে ?
তার মানে সাংঘাতিক কিছু হতে যাচ্ছে।
চায়ের পেয়ালাতে আয়েশ করে চুমুক দিলেন ক্রাইম ব্রাঞ্চের ঘাঘু অফিসার গাউস চৌধুরী। এই দোকানের চায়ের সুনাম আছে। কিন্তু আজ চায়ের মধ্যে দুধের সর ভাসছে। তাই বিরক্ত। কিন্তু কোন শূয়রের বাচ্চা যেন মালাই চা নাম দিয়েচ্ছে এটার। মুখে দিলেই বমি আসে।মানুষের রুচি বলে কথা !
গাউস চৌধুরীর বয়স আটচল্লিশ । বিশাল শরীর। নাকের নীচে পেল্লায় একজোড়া গোঁফ। অপরাধীরা তাঁর চোখের দিকে তাকাতেই ভয় পায়। বাঘের মতো চেহারা ।
পাশে বসে আছে তরুণ অফিসার আবদুল হাই । চৌধুরীর ডান হাত। আবদুল হাইয়ের হাতেও চায়ের পেয়ালা।
‘লোকটাকে দেখেছ।’ আচমকা ফিসফিস করে বলে উঠলেন গাউস চৌধুরী। ‘ঐ যে। দুই নম্বর গেট দিয়ে মাত্র নামল। হাতে নতুন স্যুটকেস। গলায় টাই। পার্কিং এরিয়ার দিকে হেঁটে যাচ্ছে মোটা মতো লোকটা।’
‘না স্যার, চিনি না।’ জবাব দিল আবদুল হাই।
‘ তা অবশ্য চেনার কথাও না।’ চিন্তিত স্বরে বললেন গাউস চৌধুরী । ‘ লোকটার নাম মানিক । জেল খাটা দাগি আসামি।একদম পুরানো চাল। কিন্তু এই ব্যাটা এখানে কেন?’
‘এবার বোধহয় চিনেছি স্যার।’ জবাব দিল আবদুল হাই । ‘বেশ কয়েকটা ফাইলে ওর ছবি দেখেছি। পুরনো ডন কেশু হালদারের ডানহাত ছিল লোকটা। তাই না ?’
‘ওহ খোদা। সর্বনাশ। ’ চিড়বিড় করে উঠলেন গাউস চৌধুরী। ‘ঐ দেখ, বাইরে পার্কিং এরিয়ায় ওই লোকটাই কেশু ।’
দুই অফিসার দেখতে পেল কেশু আর মানিক হাতে হাত মেলাচ্ছে। তারপর সামনে এগিয়ে গেল। যেখানে একগাদা গাড়ি পার্ক করা।
‘কেশু আর মানিক ।’ চিন্তিত স্বরে বললেন গাউস চৌধুরী। ‘ সেই মানিকজোড় । তার মানে ঝামেলা হতে যাচ্ছে। আন্ডারগ্রাউন্ডে একটা কথা চালু আছে, কেশু আর মানিক যেখানে, সেখানে কিছু না কিছু হবেই।’
‘কিন্তু কেশু তো অপরাধ জগৎ থেকে অবসর নিয়েছে স্যার। অনেক বছর ধরে কোন মুভমেন্ট নেই।’ মন্তব্য করল আবদুল হাই।
‘ এই ধরনের লোকেরা অবসর কখনো নেয় না। অপরাধ এদের মজ্জার অংশ। এদের বিশ্বাস করা ঠিক না। উপযুক্ত আবহাওয়া পেলেই এরা ডানা মেলে।’ চিন্তিত সুরে বললেন গাউস চৌধুরী । ‘ চট্টগ্রামের বিখ্যাত উকিল চাকলাদার আত্মহত্যা করেছে, এটা জানি। আর এ- ও জানি চাকলাদার ছিল কেশুর পরামর্শদাতা । কেশুর টাকাপয়সা রক্ষণাবেক্ষণ করত। আইনি দিক দেখভাল করত। দেখো আমার বিশ্বাস কিছু একটা হতে যাচ্ছে। চোখ কান খোলা রাখতে হবে। কেশুকে গত ত্রিশ বছরে কেউ ফাঁসাতে পারেনি। কেন যেন মনে হচ্ছে প্রমাণসহ এই বার ব্যাটাকে ধরতে পারব আমরা।’
সম্ভবত এটাই ওদের নিয়তি।
অপরাধী দুজনের কারও খেয়াল আসেনি, স্টেশনের উল্টা দিকের সস্তা চায়ের দোকানে ঠিক এই সময়ে বসে থাকবে ক্রাইম ব্রাঞ্চের সেরা এবং ভয়াল দুই অফিসার।
কল্পনারও বাইরে।
হাসিমুখে মুখোমুখি হল ওস্তাদ -সাগরেদ। খুঁটিয়ে একে অপরকে দেখতে লাগল। শেষবার দেখার পর কার চেহারার কতটুকু পরিবর্তন এসেছে?
মানিকের মনে হল , ওস্তাদের চেহারা খানিক বাদামি হয়ে গেছে। আরেকটু মোটা হয়েছে। হাঁটাচলাও মনে হয় একটু ধীরে করে। অবশ্য এটাও মনে রাখতে হবে, ওস্তাদ বয়স এখন ষাট। এই বয়সে আর কতটুকু চটপটে হাঁটা যায়? তারপরও কালো রঙের গলফ টিশার্ট আর মেরুন গাবাডিনে দারুণ লাগছে ওস্তাদকে।
কেশু লক্ষ্য করল, মানিক অনেক মোটা হয়ে গেছে। চেহারা ফ্যাকাশে। শারীরিক ভাবে যেন খানিকটা আনফিট। কিছুটা যেন কাবু হয়ে গেছে সময়ের আক্রমণে।তারপরও কালো রঙের স্যুটে বেশ চৌকস লাগছে মানিককে।
‘তোমাকে দেখে খুব ভাল লাগছে মানিক ।’ হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল কেশু । ‘ আছো কেমন ?’
কেশুর লোহার মত শক্ত হাতে নিজের তুলতুলে হাত তুলে দিয়ে মানিক জানাল, সে ভালো আছে।
তারপর দূরে পার্ক করে রাখা কালো রঙের গাড়িটার দিকে এগুলো দুজনে।এত কিছুর মধ্যেও ওস্তাদের গাড়ি দেখে মুগ্ধ হল মানিক।
‘আপনার গাড়ি ওস্তাদ ?’বোকার মত বলে বসল মানিক।
‘হু।বাড়ি চল আগে। তোমার হেলেন বৌদি দুপুরে তোমার জন্য রান্না করেছে।’
কথা শেষ করে কেমন একটা হাসি হাসল কেশু।
মানিক নার্ভাস হয়ে গেল। হেলেনকে একসময় মনে মনে পছন্দ করত।
গাড়িতে বসেই ডলি পিসির কথা জানতে চাইল কেশু । সব শুনে দুঃখ প্রকাশ করলো।
চলতে লাগল গাড়ি ।
পরবর্তী ত্রিশ মিনিট লাগাতার অতীত দিনের কথা বলে গেল পোড়খাওয়া
এই দুই মানুষ। দুই শক্তপাল্লা। এক সময়ের অপরাধ জগতের দুই রত্ন। সেই সব লোকদের কথা বলল, যাদের তারা চিনত। একসাথে কাজ করেছে, ওঠাবসা করছে৷ কিছু জায়গার কথা বলল যেখানে দুজন একসাথে গেছে। কিন্তু মানিককে কেন ডেকে এনেছে সে প্রসঙ্গ কেউ তুলল না৷
দুপুরের খাওয়াটা মোটামুটি ভালই হল ।
খাওয়া দাওয়ার আয়োজন ভালোই করেছিল হেলেন। গলা পর্যন্ত খেলো মানিক । অনেক অনেক দিন পর অমন ভাল খাওয়া ওর পাতে পড়েছে। যদিও বাড়িতে ঢোকার কয়েক মিনিটের মধ্যে বুঝে গেছে হেলেন ওকে সহ্য করতে পারছে না।বেশ বিরক্ত। খাওয়ার মাঝখানেই দুম করে প্রশ্ন করে বসল, ‘আজকাল কি করছ তুমি ?’
মানিক আগের মিথ্যাটাই বলল , একটা হোটেল চালাচ্ছে।ভালই চলছে সেটা।
‘তাহলে কী ব্যাপারে এখানে এসেছ ?’
এতই আচমকা বেশ থতমত খেয়ে গেল মানিক । কী জবাব দেবেন বুঝে উঠতে পারল না।
কেশু চট করে বলল, ‘ নতুন একটা হোটেল খুলতে চায় মানিক । আমি ওকে জায়গা বেছে নিতে সাহায্য করব। নিতাইগঞ্জের ওখানে হোটেল খুব ভাল চলে।নাকি মানিক?’
খাওয়া শেষে হেলেন জানাল ও বাইরে যাচ্ছে । শপিং শেষ করে প্যারাডাইস ক্লাবের যাবে। জিমে ভর্তি হয়েছে নাকি !
দুই পুরুষ একা হয়ার পর সোজা স্টাডি রুমে চলে এলো।
মানিক কিন্তু ওস্তাদের বাড়ি দেখে মুগ্ধ। বাগান, ফার্নিচার, গাড়ি, সবকিছু চোখ বড় করে দেখছে । স্টাডি রুমে বসে যখন বাইরে গোলাপ বাগানটা দেখল তখন ওর দম বন্ধ হয়ে গেল প্রায়।এই না হলে ওস্তাদ ?
সিগারেট নিয়ে মানিক অফার করল কেশু ।
‘ শিবশঙ্কর চাকলাদারের কথা মনে আছে ?’ সিগারেট ধরিয়ে সোজা কাজের কথা চলে গেল কেশু ।
‘ মনে থাকবে না কেন ? কী করে আজকাল ? আপনার সাথেই আছে না ?’
‘নিজের মাথায় গুলি করেছে কয়েক সপ্তাহ আগে।’ মুখটা সামান্য কঠিন হয়ে গেল কেশুর । ‘আমিই করতাম।আমার খাটুনি আর বুলেট বাঁচিয়ে দিয়েছে।’
পাথরের মত চেয়ে রইল মানিক ।
বরাবর মাথা কম কাজ করে ওর।
‘ আমার সব টাকা হাপিস করে দিয়েছে হারামজাদা ।’ বলে চলল কেশু । ‘ কথাগুলো যেন শুধু আমাদের মধ্যেই থাকে। এইসব ঘটনা হেলেন পর্যন্ত জানে না। এই মুহূর্তে ধরতে গেলে পথের ফকির আমি। আমার চেয়ে বেশি টাকাপয়সা বোধহয় তোমার কাছে আছে।’
মনে মনে হতাশ হল মানিক । কিন্তু ওস্তাদ ওকে ডেকেছে ? টাকা ধার চাইবে ? হায় হায়।
‘আরেকটা কিস্তি খেলতে হবে।’ ওর মনের ভাব বুঝতে পেরে শান্ত গলায় বলল কেশু । ‘ টাকার বড় একটা পোঁটলা বানাতে হবে। আমি পারব। কিন্তু সাহায্য লাগবে ।আর তোমার কথাই প্রথমে মনে হল।’
চুপ করে রইল মানিক ।
‘আমার মাথায় দারুণ একটা প্ল্যান আছে।’ দম নিয়ে বলতে লাগল কেশু । ‘ নিরাপদ । সহজ। আবারও বলছি মানিক , ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। কোনও রকম ঝুঁকি নেই কাজটায় । তোমাকে বিপদে ফেলব না মানিক । জানি অনেক লম্বা একটা সময় ধরে জেল হাজতে কাটিয়েছ তুমি। বিশ্বাস করো, আমার বয়সটা যদি কম হত তাহলে তোমাকে এই ঝামেলা জড়াতাম না।’
বুকের ভেতর থেকে হঠাৎ করে সব ভয় চলে গেল মানিক ।
পঞ্চাশ লাখ টাকা !
এবং ওস্তাদ বলছে, কোনও ঝুঁকি নেই।
এ কথা তো সত্য, টানা পনের বছর কাজ করছে কেশুর সাথে। একটুও ঝামেলা হয়নি। ওস্তাদের উপর ষোল আনা বিশ্বাস আছে । এক লহমায় যৌবনের কোষগুলো শরীরে ফিরে পেল সে।
‘কাজটা কী?’ আগ্রহ প্রকাশ পেল মানিক কণ্ঠে।
‘তৈমুর আলম খন্দকারের নাম শুনেছ ?’ সিগারেটের ধোঁয়ার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল কেশু ।
মাথা ঝাঁকাল কিছু মানিক ।
মানে, শুনেছে।
‘ টপ লেভেলের তেল ব্যবসায়ী।’ বলতে লাগল কেশু । ‘ এবং দেশের সেরা ধনীদের একজন। খন্দকারের বাপ সামান্য ছোট- খাট একটা তেলের পাম্প দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিল। বুড়ো অবস্থায় অবিশ্বাস্য রকমের পাত্তি রেখে পটল তুলেছে৷ ঢাকা শহরে কমপক্ষে দশটা বাড়ি করেছে।সাভারে বিঘার পর বিঘা জমি। তেলের ট্যাঙ্কার, ওয়েল শিপ , হাবিজাবি কিনে বিচ্ছিরি অবস্থায় চলে গিয়েছিল । বুড়ো মরার পর ব্যবসার হাত ধরে আমাদের এই খন্দকার । বাবার এক টাকা ছেলে একশো টাকা বানায়, নিজের ব্যবসা বুদ্ধি দিয়ে। এই মুহূর্তে খন্দকার নিজেও জানে না ঠিক কত টাকা আছে ওর কাছে।’
‘নাম শুনেছিলাম । তবে এতকিছু জানতাম না।’ জবাব দিল মানিক ।
‘ এক বছর ধরে লোকটা ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছি। বেশ আকর্ষণীয় চরিত্র। লোকটা আমাকে মুগ্ধ করেছে। ’ ড্রয়ার থেকে ফাইলটা বের করে তুলে দিল মানিক হাতে । ওটা ভর্তি একগাদা খবরের কাগজের কাটিং।প্রত্যেকটা কাটিং খন্দকার সাহেবের নামে যত সব খবর ছাপা হয়েছে সেই ব্যাপারে ।
‘ উনার সব খবর আমার কাছে আছে। খন্দকারের ব্যাপারে আমি একজন বিশেষজ্ঞ বলতে পার। তার সম্পর্কে আমি যা জানি সে নিজেও ততটুকু জানে না। খন্দকার সাহেবের বউ মারা গেছে ...ক্যানসারে। তাদের মেয়ে আছে একটা। নাম সাবিহা। এই মেয়ে খন্দকার সাহেবের সবকিছু। আবারও বলছি... সব কিছু।’
কয়েকটা মুহূর্ত দুই পুরানো পয়সা দুইজনের দিকে চেয়ে রইল।
‘ খন্দকার সাহেবের টাকার অভাব নেই। প্রচুর টাকা আছে ।দরকারের চেয়েও বেশি আছে। ’ বলল কেশু। ‘তো… মেয়ে কিন্তু একটাই আছে।’
মানিক কিছু বলল না। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। ধুকপুক করে।
‘তো আমরা সাবিহাকে তুলে নিয়ে নিরাপদ কোনও জায়গায় রাখতে পারি। তারপর সাহেবকে ফোন করে ভদ্রভাবে দশ কোটি টাকা চাইতে পারি। নাকি ?’ ঝিকমিক করে উঠল কেশুর দুই চোখ।
মানিক হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
তারপর আবার দ্বিগুণ গতিতে চলতে লাগল।
‘কিন্তু ওস্তাদ এটা তো অপহরণের কেস। ধরা পড়লে কী হবে, জানেন ?কিডন্যাপের কেস আগের মত সহজ না। আইন কানুন বেশ পোক্ত হয়ে গেছে গত কয়েক বছর ধরে।’ মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলল মানিক।
‘ তোমার কি মনে হয় এই সব হাবিজাবি ব্যাপারগুলো চিন্তা করিনি ? আবারও বলছি একদম নিরাপদ প্ল্যান বানিয়েছি। খন্দকার ওর মেয়ে সাবিহাকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসে । দশ কোটি টাকা ওনার কাছে বাদামের খোসার মতো । ধরা যাক তোমার মেয়েকে দুই গুন্ডা তুলে নিয়ে গেল । বললো বিশ টাকা দিলেই ছেড়ে দেবে। তুমি কি কুড়ি টাকা দিয়ে মেয়েকে বাড়ি ফিরিয়ে আনবে? নাকি পুলিশকে ফোন করে ঝামেলায় যাবে ? খন্দকারের ব্যাপারটা হুবহু এইরকম। তোমার কাছে কুড়ি টাকা যা খন্দকার কাছে দশ কোটি টাকা তাই।’
এত বড় লেকচারটা কোনও কাজেই এল না । মানিকের চোখে সামনে জেলখানার গরাদ ছাড়া আর কিছুই ভেসে উঠলো না। জেলখানার পিটুনির কথা মনে হতেই আতঙ্কে বুক কেঁপে গেল ওর।
‘ কিন্তু ওস্তাদ টাকা পেয়ে মেয়েকে ছেড়ে দিলাম আমরা। তারপর ? খন্দকার সাহেব ওনার সমস্ত ক্ষমতা নিয়ে আমাদের পিছনে লাগবেন না ?’ ঢোঁক গিলে বলল মানিক ।
‘ভুল।’ মুচকি হাসল কেশু । ‘ ভদ্রলোকের মনে সুন্দর করে ভয় ঢুকিয়ে দেবো আমি । ভাল করে বুঝিয়ে বলব, আপনি যদি ওরকম কোন কাজ করতে চান, বিপদে পড়বেন৷ সারা জীবন আপনার মেয়েকে বাড়ির ভিতর রাখতে পারবেন না। হাজারটা বডিগার্ড দিয়েও আড়ালে রাখতে পারবেন না। হয়তো কয়েক মাস একটু সতর্ক থাকবেন। হয়তো এক বছর বা দুই বছর । আর একটু ঢিলে পেলেই আমাদের ভাড়াটে বন্ধুকবাজ লোক দূর থেকে স্নাইপার রাইফেল দিয়ে আপনার মেয়ের মাথায় গুলি করে দেবে।’
লম্বা সময় নিয়ে চিন্তা করল মানিক ।
বরাবর মাথাটা কাজ কম করে ওর।
শেষে হাসি মুখে বলল, ‘ওস্তাদ সারা জীবন আপনার উপর নির্ভর করে পথ চলেছি। শেষকালে আরেকটা খেলা হোক। এখন বলুন তো আমাকে ঠিক কি করতে হবে?’
‘তোমার কাজটা জলের মত সোজা ।’ বলল কেশু । ‘ একটু খবরদারি কাজ। জিম্মিকে পাহারা দেবে। সব কাজ তদারক করবে। তবে একা না। আরও দুজন লোক লাগবে। সেই দুজন লোক ও তুমি জোগাড় করবে। আমি ফোন দিলে মানুষের অভাব হবে না। কিন্তু কতগুলো বছর সব থেকে দূরে ছিলাম। সবার কনটাক্ট হারিয়ে ফেলেছি । তাছাড়া চাই না লোকজন জানুক, আমি আবার মাঠে নেমেছি। একদম টাটকা লোক নিয়ে কাজ করতে হবে। বয়স কম হলে ভালো হয়৷ ভালো কথা খুব বেশি টাকা কথা বলবে না। দেখো , পাঁচ লাখ করে দিয়ে রাজি করাতে পার কিনা এক একজনকে।’
মনস্থির করতে সময় নিল না মানিক । ভাল করে ওস্তাদকে চেনে। একটু ইতস্তত করতে দেখলেই ওকে ফেলে অন্য লোকের খোঁজ করবে কেশু। যত পুরনো সাগরেদই হোক, কোনওরকম সহানুভূতি দেখাবে না। এই মুহূর্তে যদি বলে কাউকে সে চেনে না, তবে সব শেষ।
‘ আমার হাতে তেমন লোক আছে। পাকা লোক।’ নরম গলায় বলল মানিক । ‘লোকে ওঁদের পোকা গ্রুপ বলে।’
‘পোকা গ্রুপ ?’
‘ হ্যাঁ, আমার অ্যাপার্টমেন্টে পাশে থাকে ওরা। বেশ মারকুটে দল।মাত্র দুজন মিলে দলটা বানিয়েছে। যমজ ভাই বোন। ভাইটার নাম পোকা, বোনের নাম রুইতন। সাংঘাতিক হিংস্র। অনেকেই, অনেক ছোটখাটো আর বড় গ্রুপ ওদের দলে টানতে চেয়েছে। লাভ হয়নি।’
হাসল কেশু । সারা জীবন কত ঘাঘু মাল আর চিড়িয়া সামাল দিয়েছে সে। পোকা গ্রুপ নামটা শুনেই হাসি আসছে।
‘আমি ওদের সামাল দেব।’ ছাইদানিতে সিগারেট গুঁজে বলল কেশু। ‘পোকা গ্রুপের ব্যাপারে আরও খানিক খোশ খবর দাও, শুনি।’
‘ তেমন কিছু বলার নেই। কিছুই করে না ওরা। আবার সবই করে । যেমনটা আমি বললাম, মারকুটে দুই চরিত্র । ওদের বাপ ছিনতাই করত। সুযোগ বুঝে নির্জন মুদির দোকানে বা সুনসান রাস্তায় চাকু বা দেশি পিস্তল দেখিয়ে ডাকাতি করত। এক রাতে পেট্রল পাম্পে ডাকাতি করে খুশি মনে মদ খেয়ে বাড়ি ফিরে দেখে প্রতিবেশী ফুচকাওয়ালার সাথে বিছানায় শুয়ে আছে ওর বউ । মাতাল বাপ দুটোকেই খুন করে ফেলে। জেলে যায় পনের বছরের লম্বা সফরের জন্য।
তিন মাস পর জেলখানার বাথরুমে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করে।
‘ বস্তির এক বুড়ি দাদি পোকা আর রুইতনকে নিয়ে যায় নিজের কাছে ৷ এই বুড়ি দাদি ছিল একটা রত্ন। বড় মাপের চোর । পকেট মারতো। কাজের বুয়া সেজে মানুষের বাসায় চুরি করত। বাড়ির ভেতরের তথ্য ডাকাত দলের কাছে বখরার বিনিময়ে বিক্রি করতো।
দাদি বেশ ভাল করেই পালাতে থাকে ওদের। পোকা রুইতনের যখন দশ বছর তখনই মারা যায় বুড়ি। নিষ্ঠুর পৃথিবীতে একদম একা হয়ে যায় ওরা। শুরু হয় ওদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। খাবারটা পর্যন্ত চুরি করে জোগাড় করত দুই ভাই বোন।তবে বাচ্চাদুটো ছিল শেয়ালের মত চালাক। কারও হাতে কখনও ধরা পড়েনি। পুলিশের কাছে কোনও তথ্য নেই। রেকর্ড নেই।
‘দল খুলেছে নিজেরাই। ওই যে বললাম পোকা গ্রুপ। দুজনেই সদস্য । না কোনওরকম মাদক ব্যবসা বা ভায়োলেন্স করে না। ব্ল্যাকমেইল করে। আমাদের এই রুইতন অপূর্ব সুন্দরী । সেই ফাঁদ পাতে । সুন্দরী একা মেয়ে দেখে অনেক বেকুব সেই ফাঁদে পা দেয়। তখন ভাইবোন মিলে বেকুবটাকে ছোট খাট একটা কোর্স দিয়ে ডিপ্লোমা করিয়ে ছেড়ে দেয়। পোকা খুবই নিষ্ঠুর মানুষ । এতদিনে ভাইবোন ভালই পেকে গেছে। ভয়ডর বলতে কিছুই নেই ওঁদের মধ্যে। চোখ বন্ধ করে কাজে লাগাতে পারি ওদের।’
কিছুক্ষণ ভাবল কেশু। ‘হ্যাঁ। লাগাও। আমি কথা বলব ?’
‘আপনাকে দেখলে পয়সা বেশি চাইব ওঁরা।’
‘ঠিক আছে। তবে পুরো প্ল্যান ওদের জানাবে না। শুধু এটুকু জানাবে পুরানো চাল কেশুর সাথে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে ওরা। ভবিষ্যৎ ফকফকা।’

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন