সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নক্ষত্রেরা মরে গেলে চুমকি হয়ে যায় ২৩ শেষ পর্ব

 ২৩

 

 

অনেক খুঁজে বিপিনের বাসা পেলাম।

একটু ঘিঞ্জি আর কোলাহল ।

আমার পিচ্চিবেলায় ও এখানে বাড়ি ভাড়া সস্তা ছিল। আজও হয়তো তাই।

 

বিপিনদের সেই পেল্লাই যৌথ পরিবার ভেঙ্গে আলাদা হয়ে গেছে দশ বছর আগে।

ওর বড় দাদা পুরো পরিবারের ভার বইতে বইতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তবে বোনদের বিয়ে দিয়েছেন। ভাইরা সবাই চাকরি করে।

সবাই আলাদা।

 

বিপিন ওর বুড়ি মাকে নিয়ে একা থাকে। বুড়ি মাকে কেউ নিতে চায়নি।

 

কিছুদিন আগেও বিপিন দিন রাত টিউশনি করতো। এখন তো ফুল টাইম বাসায় থাকে।

 

সব ভাইয়েরা চাঁদা তুলে ওদের খরচ চালায়।

 

আজও বিপিনের বাড়ির দরজা খোলা !

 

 

 জানালার পাশে বসে আছে বিপিন। পুরানো আমলের একটা চেয়ার। বিচ্ছিরি। ডেকোরেশনের দোকানগুলো অমন চেয়ার ভাড়া দিত একটা সময়। সেই ছোট বেলায় ওদের বাড়িতে দেখেছিলাম । আজও আছে!

 

ক্লান্ত চোখে বাইরে চেয়ে আছে বিপিন। চেহারায় কোন ভাব নেই।

 

একগাদা পাটকিলে রঙের চড়ুই কি সব দানা খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। অখণ্ড  মনোযোগ দিয়ে  সেই দৃশ্য দেখছে।

চড়ুইগুলো বেশ ঝগড়া করছে নিজেদের মধ্যে। যদিও খাবারের তুলনায় ওদের সংখ্যা কম।

ঝগড়া না করে খেলেই হয়। কে বুঝাবে ওদের?'

  

আমার দিকে ফিরে চাইল বিপিন।

 

আর্ট ফিল্মে অমন দৃশ্য দেখা যায়।

 

খোলা জানালার আলো এসে পড়ছে ওর মুখের এক পাশে। কেমন যেন বুড়োটে  দেখাচ্ছে। চোখে দেখি মোটা কাচের চশমাও নিয়েছে।

 

বয়স কত হল আমাদের?

 

কতটা সময় পাড় করেছি জীবনের রঙ্গ মঞ্চে?

 

ক্লাস ফোরে পড়ার সময় বিপিনের সাথে পরিচয়।

নিঝুম দুপুরে ভিন্ন মহল্লা দিয়ে হেঁটে আসার সময় দেখি , এক গাদা বখাটে ছেলে মেরে তক্তি ভাংছে ওর।

 

দৌড়ে দাঁড়িয়েছিলাম পাশে।

 

সারা জীবন বন্ধুদের পাশে ছিলাম। তারপরও আমি একা।

 

মুচকি হাসল বিপিন, ' কি রে সামাজ্যবাদীর দালাল । দেখ কাণ্ড। মাত্র নিমন্ত্রণ শুরু হয়েছে। ডাল লুচি দিয়েছে। আরও আসার কথা পাঁঠার মাংস, আকবরি পোলাও, শাহী রেজালা। রসগোল্লা আর দই। কিন্তু বলে কি না আমাকে হাত ধুয়ে উঠে যেতে হবে। ভাল কথা কিছু টাকা ধার দিতে পারছি। ফেরত পাবি না কিন্তু ।'

 

 বিপিন কাঁদছে।

 

বাইরে বাটারকাপ ফুলের মত রোদ।

 মাখনপেয়ালা রোদ ।

 চড়ুইগুলো ঝগড়া করছে। যদিও খাবারের অভাব নেই।

 

 

 

 

২৪

 

 

আগামী কাল রাতে ফ্লাইট ।

চলে যাচ্ছি।

ব্যাগ প্যাঁটরা সব গুছানো হয়ে গেছে। তেমন কিছু না। একটা ব্যাগ প্যাক আর ক্ষুদে হাত ব্যাগ।

 

অসুস্থ মাকে পাশের কামরায় রেখে বসে আছি বারান্দায়।

জীবনের সাথে লড়াই করে মা ক্লান্ত। ঘুমিয়ে পড়ে আচমকা আচমকা ।

 

 চীনা মাটির পেয়ালা ভর্তি কফি। লোভনীয় সৌরভ।

 

বিকেল প্রায় শেষ। ঘন কমলা রঙের শেষ আলো বাগানের ঘাস লতা পাতার সাথে খেলা করছে। বড্ড মায়াবী পরিবেশ । এই রকম মুহূর্তে মনটা কারণ ছাড়াই ভাল হয়ে যায়।

অনেক দিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করে।

 

 

নীচ তলায় একটা গাড়ি এসে থামল।

 

খানিক পর দারোয়ান এসে বলল ,' ভাই এক আপুনি দেখা করতে চায়।'

 

' কী   নাম?'

 

' নাম বলতে চায় না। আপনাকে সুপারিপেয়াজ দিতে চান।'

 

' সুপারি পিয়াজ? না সারপ্রাইজ?'

 

'হ ওটাই ।'

 

খানিক পর অচেনা এক যুবতী এসে দাঁড়ালো দরজার সামনে। চেনা চেনা লাগছে।

 

যখন চিনতে পারলাম বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।

 

 রেণু ।

 

আমাদের শহরের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে। আরও বেশি কিছু বলার দরকার আছে?

 

 

এতগুলো বছর পরেও রেণু একদম আগের মতই আছে।

সময় তার রুক্ষ হাত একটুও বুলিয়ে যায়নি ওর মুখে।

সামান্য পৃথুলা হয়েছে।

ঘন চুল রেখেছে খোলা।

 এ ছাড়া অন্য কোন পরিবর্তন চোখে পড়লো না আমার প্রতারক চোখে।

 

কপালে সিঁদুর। হাতে নারকেল ফালির মত শাখা দেখে বুঝা যায় কেউ তাকে নিয়ে গেছে সাত জনমের মত। ফিরিয়ে দেবে না তাকে আর ।

 

বোকার মত চেয়ে আছি।

 

আবার হাজার বছর পর দেখা হবে ।

 

হয়তো আমি জরাজীর্ণ হয়ে যাব প্রাচীন জাহাজের মাস্তুলের মত। জরা এসে গ্রাস করবে আমাকে। কুৎসিত হয়ে যাব কচ্চছপের মত। রেণু অমন থাকবে হাজার হাজার বছর পরেও।

 

দীঘির মত কালো থাকবে ওই অতল চোখ।

 

দারোয়ান ফিরে চাইল আমার দিকে। মাথা নাড়তেই ভেতরে এলো রেণু।

মুখমুখি দাঁড়িয়ে আমরা।

 মাঝখানে অনন্ত সময়।

 

 কতগুলো বছর পর আমাদের দেখা?

 

' কোথায় ছিলে এত দিন?' বলল রেণু। ' গায়ের রঙ এত ময়লা হল কেমন করে?'

কত হাজার বছর পর সেই কণ্ঠস্বর। 'বসতে বলবে না?'

 

নিশ্চয়ই।' বোকার মত হাসলাম।

 

বারান্দায় চেয়ার ছিল।

বসলাম মুখমুখি।

 

 অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বললাম না। নীরবে কত কথা বলা যায় ।

 

' তুমি কেমন আছ?' আবারও প্রশ্ন করলো সে।

 

'ভাল ।' সহজ হবার চেষ্টা করছি। ঘামছি কেন যেন।

 

হাসল রেণু। সুন্দর গজদন্ত দেখা গেল। আমার দেবীর গজদন্ত আছে জানতাম।

প্রকৃতির ভুল কত সুন্দর হয়।

 

কথা বলতে পারছি না।

 

ঘামছি।

 

শুনেছি বিপিনের মুখে - আমি দ্বীপান্তরে চলে যাবার পরের বছরই বিয়ে হয়ে গেছে ওর। জামাইটা খুবই অমায়িক।  কিসের যেন ব্যবসা করেন।

 

' আমাকে অড়হরের খাওয়াত তোমার যে দিদিমা, কেমন আছেন? '

 

'উনি স্বর্গে চলে গেছেন প্রায় বছর দশেক আগে।'

 

' ওহ, সরি।'

 

'দিদিমা কিন্তু তোমার কথা অনেক বলতো ।'

 

'কী বলতেন?'

 

' কেন বলব সে কথা?'

 

' তোমার ক্ষুদে শয়তান কয়টা হয়েছে?'

 

'দুটো। ওদের কাছে তোমার সেই গল্পটা বলেছি।'

 

' কোনটা?'

 

' ওই যে তুমি ড্রেনে পড়ে গিয়েছিলে ।'

 

কান লাল হয়ে গেল আমার।

 

নতুন করে কফি এলো দুজনের জন্য।

চুপচাপ পেয়ালা হাতে বসে রইলাম।

পয়সা ফুলের মত তারা উঠলো আকাশে। একটা । দুটো। তারপর আরেকটা।

 

কৃপণ সন্ধ্যা ওর সমস্ত তারা জমিয়ে রাখছে রাতের জলসার জন্য। একটা দুটো করে ছেড়ে দেখছে আকাশ কত ঘন হল। রাতের নিমন্ত্রণের লোভ দেখাচ্ছে সে ।

 

' আমি যাই। ' বলল রেণু। ' শোন, তুমি কিন্তু অনেক বোকা ।'

 

'কেন? কেন?' শশব্যস্ত হয়ে উঠলাম ।

 

' মিল্লাত ভাইয়ের চিঠিগুলো যে তুমি লিখে দিতে, সেটা আমি তখনই জানতাম।'

 

'সে কি?' বিব্রত হলাম।

 

' আমার বান্ধবী লিমা তোমার কাছ থেকে নোট চেয়ে নিয়েছিল। সেটা আবার আমি ধার নিয়েছিলাম। তখনই তোমার হাতের লেখা চিনি। চিঠি দেখেই ধরে ফেলেছি। তাছাড়া সেই নীল অন্ধকার, হলুদ রোদ এইসব তোমার সিগনেচার স্টাইল। লাইব্রেরী থেকে তখন  নির্বাচিত প্রেমের কবিতা মার্কা বই ইস্যু করাতে।'

 

হাসল রেণু।

 

অমর দেবতারা অমৃত পান করার সময় বেখেয়ালে কাচের পানপাত্র হাত থেকে পড়ে গেলে অমন শব্দ করে ভাঙ্গে।

 

'তুমি আসলেও খুব বোকা।' আবারও পানপাত্র ভাঙ্গল রেণু।

 

আমাকে একটা কথা বলার সুযোগ না দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে স্যান্ডেলের শব্দ তুলে  হেঁটে চলে গেল বাইরে।

 

গাড়ির শব্দ । হুশ করে চলে গেল যান্ত্রিক শকট।

 

বাইরে নীল অন্ধকার। হু হু করে বইছে সোহাগী বাতাস ।

দূরে, কোন এক হিন্দু বাড়ির সন্ধ্যাপূজার কাঁসর বাজানোর শব্দ ভেসে আসছে।

 

বাতাসে তখনও রেণুর চুলের সৌরভ।

 

 অদ্ভুত এক নির্বাসনে ডুবে গেলাম আমি ।

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...