রেল ইষ্টিশন থেকে বেশ দূরে। নদীর পাড়ের কাঠের একটা দোকানে আমরা প্রত্যেক সন্ধ্যায় আড্ডা দেই ।
এই ব্যাপারটা আপনাদের কক্ষনও বলেছি ?
বলিনি ?
তবে বলি- এটা রামধনিয়ার দোকান।
কোন সাইন বোর্ড নেই অবশ্য। তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। এক ডাকে সবাই চেনে।
রামধনিয়ার দোকান বিখ্যাত চা আর বেগুনির জন্য।
এই দুর্মূল্যের বাজারেও রামধনিয়ার দোকানের বেগুনিগুলো হত সাত নাম্বার চটি জুতার মত বড় বড়। চায়ের মধ্যে তেজপাতা, লবঙ্গ, এলাচি, দারুচিনি , মোষের দুধ হাবিজাবি এত কিছু দেয় , ইচ্ছা করলে ওটা গিরিশ ঘোষ না গিনেজ বুক কি যেন আছে না ? - ওখানে নাম লেখাতে পারে।
যাক সে সব।
আমি, আবদুল হাকিম আর বজলু এই তিন বন্ধুই আড্ডা দিতাম। তিনজনেই একবারে ছোট্ট বেলার বন্ধু। আমাদের আড্ডার বিষয় বস্তুুতে বৈচিত্রের অভাব ছিল না। উত্তর মেরুর তলায় রহস্যময় সেই পিরামিড হতে শুরু করে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসার আসল কপিটা এখন কোথায় আছে ? - কি না আসতো আমাদের এই আড্ডায় ? মোদ্দা কথা দেশের ফালতু রাজনীতির বিষয় ছাড়া সব বিষয় নিয়েই কথা বলতাম আমরা।
রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে পারতাম না আরেকটা কারনে, দোকানে বড় করে লেখা ছিল -
এখানে রাজনৈতিক আলোচনা নিষেধ।
আপনি নিজেও রামধনিয়ার দোকানে গেলে লেখাটা দেখতে পাবেন। ওই যে- ‘প্লেটে হাত ধুইবেন না’ এবং ‘ভদ্রতা বজায় রাখুন’ লেখাটার বামে।
তো এক সন্ধ্যায় বসে আমরা আড্ডা মারছিলাম।
বাইরে কাত্তিক মাসের তিরতিরে হাওয়া। এ রকম হাওয়াতে মনটা উদাস হয়ে যায়। ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। তুচ্ছ কারনে জীবনটাকে মহামুল্যবান বলে মনে হয়।
মাত্র প্রথম দফার চা আর বেগুনি শেষ করেছি আমরা। দোকানে তেমন খদ্দের নেই। ঢাউস কতগুলো ঘন বেগুনি রঙের বেগুন ফালি করে কাটছে পিচ্চি এক ছোকরা।
দূরের ইষ্টিশনে একটা রেলগাড়ি এসে থামল মাত্র।
বজলু বলছিল , ‘জানিস এই যে সায়েন্স ফিকশন ছবিগুলোতে ভয়াল সব লেসার গান নিয়ে লড়াই করতে দেখি আমরা, তাতে কিন্তু একটু ভুল আছে।’
‘তাই নাকি ? কী রকম ?’ - প্রায় এক সাথে জিজ্ঞেস করলাম আমি আর আবদুল হাকিম।
‘তোরা দেখবি সায়েন্স ফিকশন সিনেমাগুলোতে লেসারগানের আলোগুলো রঙ্গিন দেখায়। মানে গুলি করলেই চুই- চুই শব্দ করে হলুদ, বেগুনি, কমলা, লাল এই রকম আলোর টুকরো ছুটে যায়। আর তাতেই শত্রুপক্ষ ঝলসে শেষ। কিন্তু যে সব আলো আমরা চোখে দেখতে পাই সেগুলো কিন্তু একটু ও বিপদজনক না। কোনও ক্ষতিই করতে পারবে না এই সব আলোগুলো ।তারমানে সায়েন্স ফিকশন সিনেমাগুলোতে একটা ভুল জিনিস দেখাচ্ছে দিনের পর দিন।’
ব্যাপারটা আমাদের ব্যাখ্যা করে বলল বজলু। এইসব ব্যাপারে ও ভালই জানে। প্রচুর বইপত্র ঘাঁটে।
‘কথাটা সত্যি।’ সায় দিল আবদুল হাকিম। ‘এ রকম একটা কথা আমিও বিজ্ঞান-বার্তা মার্কা পত্রিকাতে পড়েছিলাম। তবে এই সাধারণ আলো মানে দেখা যায় এমন আলো ব্যবহার করে মানুষ খুন করা হয়েছিল এ রকম একটা ঘটনা আমি জানি।’
আলো ব্যবহার করে মানুষ খুন ! আমরা একটু নড়েচড়ে বসলাম।
বুঝতে পারছি ফাটাফাটি কোনও গল্প শুনতে পারব এখন আবদুলের কাছ থেকে। পিচ্চি ছোকরাটাকে ডেকে এনে আরেক রাউনড চা আর হাফ ডজন বেগুনির অর্ডার দিলাম।
বেগুনি আর চা এলো।
আবদুল হাকিম ওর কাহিনি শুরু করল ।
সুনীল বাবুর পুরো নাম সম্ভবত সুনীল হাওলাদার, আমরা সবাই উনাকে সুনীল বাবু বলেই ডাকতাম। এক কথায় ভদ্রলোক। বয়স হবে পঞ্চাশ। বেশ মোটা সোটা মানুষ। রাশভারি চেহারা।
উনার স্ত্রীর নাম ছিল হিমানী । একেবারে উল্টা স্বভাবের। দুজনের মধ্যের বয়সের তফাৎ ছিল প্রায় বিশ বছরের। ব্যাপারটা সবাইকে খুব ধন্ধে ফেলে দিত। তারা যে খুব সুখী দম্পতি ছিল, এ রকম মনে করার ও কোনও কারণ ছিল না।
আসলে ঘটনা ছিল এই রকম, সুনীল বাবু ছিলেন অনেক টাকা পয়সার মালিক। বাপদাদাদের কাছ থেকে প্রচুর সহায় সম্পত্তি পেয়েছিলেন । নিজেও শেয়ারের ব্যবসা করে, এখানে ওখানে পুঁজি খাটিয়ে প্রচুর পয়সা করেছিলেন।
হিমানীর সাথে কোন ও একটা ক্লাবের পার্টিতে বা সেই রকম কিছুতে পরিচয় হয়। সেটা গড়ায় বিয়ে পর্যন্ত।
বিয়ের পর শহরতলিতে বিশাল রাজপ্রাসাদের মত একটা বাড়িতে বসবাস করা শুরু করেন তাঁরা। বাড়িটা সুনীল বাবুর ঠাকুরদার বাড়ি। ভেতরে প্রচুর গাছপালায় ঠাসা। এই ধরনের বাড়িগুলোকেই শান্তিনীড় বা শান্তিকুটির বলে হয়তো।
সুনীল বাবুর একটা শখ ছিল, রাত জেগে বাড়ির ছাদের উপর বসে, দামি টেলিস্কোপের সাহায়্যে রাতের আকাশের গ্রহ নক্ষত্র দেখা।
বিদেশি কিছু বিজ্ঞান ক্লাবের সদস্য ও ছিলেন। প্রতি মাসেই হরেক রকম জ্যোতিষ বিজ্ঞানের বই আর পত্র পত্রিকা আসতো তাঁর বাড়িতে। বুক পোস্টের মাধ্যমে। বিজ্ঞান ক্লাবগুলোতে চাঁদা দিতেন মুক্ত হস্তে।
বৃহস্পতির উপগ্রহ আর শনির বলয় নিয়ে বেশ কয়েকটা ফিচারও লিখেছিলেন তিনি।
তো রাতের পর রাত ছাদে বসে আকাশের তারা দেখে খুব ভোরে এসে ঘুমাতেন ভদ্রলোক। সারাদিন ঘুমিয়ে আবার সন্ধ্যা বেলা উঠে যেতেন ছাদে।
এইভাবেই চলছিল। ফলে তাঁর স্ত্রী হিমানীর সাথে ধীরে ধীরে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে।
হিমানী বেচারি পড়ে গেল বিপদে। ধীরে ধীরে একঘেয়ে হয়ে যেতে থাকে ওর জীবন।
প্রথমে গাছপালা আর বাগান নিয়ে মেতে উঠে সে।
সময়ই কাটতে চায় না। লাইব্রেরির সদস্য হয়ে আবোল তাবোল সব ধরনের বই পড়ে। মহিলা ক্লাবে গিয়ে সারা সন্ধে আড্ডা মারে। থিয়েটারে গিয়ে দুর্বল সংলাপের যাত্রা মার্কা নাটক দেখে সময় পার করে করে। তারপরও মনে প্রাণে অতৃপ্ত থেকে যায় বেচারি।
একদিন রাজা নামে এক চৌকষ যুবকের সাথে পরিচয় হয় হিমানীর । কোনও একটা ক্লাবে, রাতের অনুষ্ঠানে।
এবং তার পর খুব দ্রুত ঘটনা ঘটে যেতে থাকে৷
ঝুপ করে একে অপরের প্রেমে পড়ে যায় ওরা।
যথেষ্ট কারণও ছিল ।
রাজা ছিল শহরের আরেক অভিজাত পরিবারের একমাত্র সন্তান। আলালের ঘরে দুলাল না কি বলে না ?- সেটাই। দেখতে শুনতেও ছিল বেশ। চকোলেট হিরো মার্কা চেহারা। অনেক মেয়েই গাঁথতে চাইতে ওকে। কিন্তু রাজার বাবা তাঁকে অত্যন্ত ধনী এক ব্যবসায়ীর একমাত্র মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে চাইত । যে মেয়েটা ছিল তারকা রাক্ষসীর মতো কুৎসিত। মোটা । আর শিঙ মাছের মতো কালো।
মেয়েটাকে পছন্দ করতে পারছিল না রাজা।
হিমানীর সাথে পরিচয়ের পর মনে হল এই রকম একজনকেই খুঁজছিল সে।
আর হিমানীর পানসে জীবনে রাজা এলো মরুভূমির অকস্মাৎ বৃষ্টির মতই।
কে না জানে, এই ধরনের ঘটনাগুলোর অনুভূতি এই রকমই হয়ে থাকে।
দুইজনের মধ্যে নাটক যমে উঠল। যেটাকে আজকাল রসায়ন না কি যেন বলে। সেটাই।
সুনীল হাওলাদার অবশ্য ঐসবের কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি।
তাঁর শুধু মনে হচ্ছিল, তাঁর স্ত্রী আগের চেয়ে বাইরে বেশি সময় কাটাচ্ছে। আর একটু বেশি হাসি খুশি হয়ে উঠছিল। তিনিও ভাবলেন, যাক বেচারির বিষণ্ণতা কেটে গিয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। ভালই তো ।
সময় কাটানোর উপায় বের করে ফেলেছে বোধ হয়।
ব্যাপারটা হয়তো এ ভাবেই চলতো । কিন্তু একদিন সন্ধ্যাবেলা কী একটা কাজে বাইরে গিয়েছিলেন সুনীল বাবু। তখনই হিমানিকে কাচপোকা টাইপের সুদর্শন এক যুবকের সাথে একটা সিনেমা হলের টিকিট কাউন্টারের সামনে দেখতে পান। তাতে ও তেমন কিছু মনে করেন না৷
কিন্তু রাতের বেলা খাবার টেবিলে বসে তিনি হিমানীকে জিজ্ঞেস করেন, সারা দিন কী ভাবে কাটল তার ?
উত্তরে হিমানী যখন বলে, এক বান্ধবীর সাথে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল, তখনই তাঁর মনে হল, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।
তিনি তক্কে তক্কে রইলেন।
একদিন শহরের অভিজাত এক ক্লাবে গিয়ে গায়ে পড়ে রাজার সাথে আলাপ করলেন। জানতেন- রাজা সন্ধ্যা বেলায় এই ক্লাবেই আড্ডা আর তাস খেলতে যায়।
কথা বার্তায় রাজাকে তার বেশ ভালই লাগল।
বড় লোকদের অকর্মার ঢেঁকি ছেলেপিলেদের মত না রাজা। বেশ ভদ্র। সুদর্শন। বিনয়ী ছেলে। এত কিছুর মধ্যেও হিমানীর রুচির প্রশংসা না করে পারলেন না।
তাছাড়া দুজনকে মানায় ও বেশ । নামে ও কেমন ছন্দ আছে। রাজা। হিমানী। সোনায় সোহাগা না কি হাগা বলে না ? সেটাই।
রাজা ছেলেটার বিরুদ্ধে কোনও রকম ব্যক্তিগত ভাবে রাগ - ক্ষোভ-ঘৃণা কিছু অনুভব করলেন না তিনি।
ফিরে এলেন নিজের বাড়িতে। তারপর ব্যস্ত হয়ে পড়লেন জার্মানি থেকে আনা নতুন টেলিস্কোপটা নিয়ে।
রাতের পর রাত কাটাতে লাগলেন তিনি, আগের মতো নক্ষত্র আর গ্রহ দেখে ।
আর হিমানি ব্যস্ত হয়ে পড়ল তাঁর ‘বান্ধবীদের’ সাথে সময় কাটাতে। রোজ বিকেলে বের হয়ে যেতো হিমানী। প্রায় মাঝরাতে একা একা গাড়ি ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরত সে।
সে সময় টেলিস্কোপে চোখ রেখে ছাদে বসে থাকতেন সুনীল হাওলাদার।
রোজ রাতে হিমানী যখন গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরত তখন গাড়ির হেড লাইটের আলো দূর থেকেই চোখে পড়ত।
বাড়ির অদূরেই ছিল একটা পাহাড়। সেটাতে বাঁক ঘুরে গাড়িটা যখন নামত তখন হেড লাইটের জোড়া আলো সোজা এসে পড়ত টেলিস্কোপের উপর।
আর তাতে চোখ ঝলসে যেত সুনীল হাওলাদারের। বেশ কয়েক মুহূর্তের জন্য অন্ধ হয়ে যেতেন তিনি। অনেক সময় লাগত দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক হতে।
ব্যাপারটা বিরক্তকর।
এবং রোজই সেটা ঘটতে লাগল।
তারপর একদিন বুদ্ধিটা এলো সুনীল হাওলাদারের মাথায়।
হঠাৎ করেই তার ভেতরে ঈর্ষাকাতর এক স্বামী জেগে উঠলো। মনে হলো ইচ্ছে করলে, অতি সহজেই তিনি হিমানীকে শায়েস্তা করতে পারেন । কেউ ধরতে পারবে না যে খুনটা তিনি করেছেন । কারণ তখন সেটা দেখাবে একটা দুর্ঘটনার মতো।
তা ছাড়া হিমানীকে শায়েস্তা করার দরকার আছে। প্রতিশোধটা ও নেয়া হয়ে যাবে সেই সুযোগে। কারণ হিমানী তাঁকে ঠকিয়েছে ।
খুনের পরিকল্পনাটা অতি সহজ।
পাহাড়ে রয়েছে বড় একটা খাদ। বাম দিকেই।
হিমানীর গাড়িটা যখন বাঁক ঘুরে সোজা নীচের দিকে নামতে থাকবে তখন যদি শক্তিশালী লেন্সের সাহায্যে সার্চলাইটের কড়া আলো গাড়ির উপর ফেলা যায় ?
সঙ্গে সঙ্গে চোখ জোড়া ঝলসে যাবে হিমানীর । এবং তাল হারাবেই বেচারি । আর মনে রাখা দরকার বাম দিকে রয়েছে সেই খাদটা । কাজেই কয়েক কোটি টাকা বাজি ধরা যায় , গাড়িটা খাদে পড়বেই ।
ব্যস। খেল খতম।
এখন শক্তিশালী এক জোড়া লেন্স আর কড়া একটা আলোর ব্যবস্থা যোগার করা সুনীল হাওলাদারের জন্য নাক টিপে সর্দি বের করার মতই সহজ ।ছাদের উপর জিনিস দুটো সুন্দরভাবে ফিট করলেন তিনি। তারপর অপেক্ষা করতে লাগলেন।উদ্দেশ্য সৎ থাকলে দ্রুত সফল হওয়া যায়।
সে রাতটা ছিল চমৎকার এক রাত ।
পরিষ্কার আকাশ। মুঠো মুঠো তারা আর ভাগ্য গ্রহে ঝিলিমিলি করছে আকাশ। পাঁচমিশালি ফুলের ঘ্রাণ ভেসে আসছে বাগান থেকে।
হিমানী চলে গেছে বিকাল বেলাতে । তার ‘বান্ধবীদের’ সাথে দেখা করতে।
সুনীল বাবু অপেক্ষা করছেন ।
তারপর ঠিক মাঝরাতের একটু আগে দেখা গেল হিমানীর গাড়িটা। পাহাড়ের বাক ঘুরে ঢাল বেয়ে নেমে আসছে দ্রুত। পরিকল্পনা মতো সার্চ লাইটের সুইচ টিপে জ্বেলে দিলেন তিনি। শক্তিশালী লেন্সের ভিতর দিয়ে হাজারগুণ জোরালো হয়ে আলোটা গিয়ে পড়ল গাড়ির উপর৷।
দূর থেকেও পরিষ্কার দেখতে পেলেন তিনি। টলমল করছে গাড়িটা। মনে হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে । তারপর সরল হিসেব মতো খাদের পুরনো কাঠের রেলিং ভেঙে সোজা নিচে গিয়ে পড়ল হিমানীর গাড়িটা । ধাতব কর্কশ শব্দ গুলো চরম তৃপ্তি দিল সুনীল বাবুর মনে।
গ্রহ নক্ষত্র দেখা বাদ দিয়ে সোজা নীচে নেমে এলেন তিনি। তিন আউন্স সিভ্যাস রিগ্যালের সাথে তিন টুকরো বরফ মিশিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ঠান্ডা করে টুক করে গিলে ফেললেন তরলটুকু। তারপর বিছানায় শুয়ে তৃপ্তির সাথে ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি।
সত্যি কথা বলতে কি কোনওরকম অনুশোচনা বা পাপ বোধ অনুভব করছিলেন না তখন। মনে হচ্ছিল, আপদ বিদায় হয়েছে।
হয়তো এক ঘুমে রাত শেষ করে ফেলতে পারতেন তিনি। কিন্তু বেরসিকের মতো রাত প্রায় পৌনে দুটোয় বিচ্ছিরি শব্দ করে ফোনটা বেজে উঠল।
ফোনটা ছিল পাশের ছোট্ট টেবিলের উপর। ঘুম ঘুম চোখে ফোনটা তুলে নিতেই ভয় পেয়ে গেলেন তিনি ।
সর্বনাশ!
এ সব কি ?
ভেবেছিলেন থানা থেকে পুলিশ ফোন করেছে। কিন্তু না।
ফোন করেছে হিমানি।
মরা মানুষ ফোন করে কী করে ?বেশ থত মত খেয়ে গেলেন।
রাজা কোথায় ? চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল হিমানী । কী করছো তুমি ওকে ?
টলে উঠলেন সুনীল হাওলাদার। বুঝতে পারলেন কোথাও মারাত্নক ভজকট হয়ে গেছে।
তুমি কোথায় ? কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলেন তিনি।
রাজার বাড়িতে। ওর জন্য অপেক্ষা করছি আমি। ওকে পাঠিয়েছিলাম তোমার কাছে। এখনও ফেরেনি।
এক নাগাড়ে বলে গেল হিমানী।
সুনীল হাওলাদার বুঝে গেলেন।
আসলে ব্যাপারটা হয়েছিল এ রকম- সে রাতে রাজা আর হিমানী সিধান্ত নেয় , সুনীল বাবুকে সব জানাবে তারা। জানাবে- একে অপরকে ভালবাসে দুজনে।
রাজার বাড়িতে অপেক্ষা করতে থাকে হিমানী। রাজা হিমানীর গাড়ি নিয়ে চলে আসে সুনীল বাবুর সাথে দেখা করার জন্য।
তারপর নিয়তির অমোঘ নিয়ন্ত্রনে খাদ থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায়।
কেউ জানতে পারে না কী হয়েছিল সে রাতে।
ওভার স্পিডে গাড়ি চালালে এরকম ঘটনা হতেই পারে। সবাই স্বীকার করলো সে কথা। তা ছাড়া অনেকে ধারনা, রাজা সেই রাতে মাতাল ছিল ।
যাক সে সব ।
সমস্যা হল সুনীলবাবুকে নিয়ে।
পুরো ব্যাপারটার জন্য নিজেকে দায়ী ভেবে মনোকষ্টে ভুগতে লাগলেন তিনি।
শেষে এক দিন থানায় গিয়ে নিজের দোষ স্বীকার করবেন। খুব বেশি দিন কেস চললো না। অল্প দিনের মধ্যে রায় হয়ে গেল। সবার ধারণা সুনীল সাহেব কোন কারনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। মেন্টাল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভদ্রলোককে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর একগাদা বইপত্র নিয়ে হাসপাতালে চলে গেলেন তিনি। বছরখানেক পর নিউমোনিয়া হয়ে ওখানেই মারা যান।
হিমানী তাঁর বাড়ি ঘর সয় সম্পত্তি সবই পেয়েছিল। আইনগতভাবেই। না আর কাউকে বিয়ে করেনি বেচারি।
আমি এত কথা জানলেন কী করে?
কারণ, সুনীল সাহেব তাঁর শখের টেলিস্কোপটা আমার বড় কাকার কাছে বিক্রি করে দেন , হাসপাতালে যাবার আগে। আমার কাকা আর তিনি একই বিজ্ঞান ক্লাবের সদস্য ছিলেন। কাকাকে সবকিছু বলেছিলেন তিনি। আমার কথা হলো দৃশ্যমান সাধারণ আলো কায়দা করে ব্যবহার করেও মানুষ খুন করা যায়। সায়েন্স ফিকশন সিনেমাগুলোতে একটু আধটু ভয় দেখালে তেমন আর ক্ষতি কী?
আবদুল হাকিম গল্প বলা বন্ধ করার পর আমরা চুপ করে রইলাম। শুধু পিচ্চিটা এসে জানতে চাইল- আরেক দফা চা আর কিছু বেগুনি দেবে কি না?
বিদেশী কাহিনীর ছায়া অবলম্বনে ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন