সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ফুল বাগান

 তেমন ভাল এক টুকরো জমি ছিল না যে বাগান করতে পারব

 

পাহাড়ের ওখানে খানিক রুক্ষ পাথুরে জমিতে আগারে বাগাড়ে কিছু সাদা হলুদ ডেইজি ফুটে থাকতোকোন রকম যত্ন ছাড়াই

তারপরও গরমের দিন গুলোতে পাহাড়ের দিকে তাকালেই মনটা ভাল হয়ে যেত

 

সবচেয়ে বেশি ভাল লাগতো ভরা জোসনার রাতেজোসনা রাতে ফুলের  হাসি দেখার মত হয়

 

গত কয়েক বছর ধরে আমি মউসুরিতে এক পুরানো ভাঙ্গা বাড়িতে আছি

দুই কামরার এক বাসাদোতলা

বাগানের কোন নাম গন্ধ ছিল নাতবে বাগান না থাকলেও বাড়ির দেয়ালের নানান জায়গায় হাজারে বিজারে ফাটল ছিলআর ওখানেই ধুতরা , বিছুটি আর ডেনডলায়ন নামে কট কটে হলুদ রঙের পিচ্চি পিচ্চি এক ধরনের বুনো ফুল হয়ে থাকতোওরা সংখ্যায় প্রচুর

এবং বেশ দাপটের সাথেই বেঁচে বর্তে আছে

মোট কথা জিনিসটা যেন একটা পুরোপুরি বুনো দেয়াল বাগান হয়ে গিয়েছিল

 

ফুলের অভাব টের পাচ্ছিলাম নাকারন হাঁটতে গেলেই পাহাড়ের কাছে বহু বুনো ফুল পাচ্ছিলাম

 

তারপরও নিজের একটা বাগানের অভাব থেকেই যাচ্ছিল

 

একদম পেল্লাই ধরনের কিছু নাসুইমিং পুল সহ রাশি রাশি দুর্লভ গাছের বাগান না মোটেও

আমি চাইছিলাম পিচ্চি একটা বাগানকিছুটা হাবিজাবি টাইপের বাগান হলেও চলবে

 

দেহারে আমার  দিদিমা'র নিজের একটা বাগান আছেসে একটু জায়গাও নষ্ট করতে চাইতো না

বাড়ির সামনের বাগানে দিদি মা ফুল গাছ বুনতো  আর বাড়ির পিছনে কড়াইশুটি   আর ফলের গাছ

 

হরেক পদের ঝুমকা ফুলের চারা ছিলযেগুলোকে  বাটার কাপ  বলে অনেকে

লাল আর বেগুনি রঙের বাগান বিলাসের ঝাড় বারান্দা ছেঁকে থাকতো

শৈশবের বাগান এটাইআর  আমার মনে বেশ ছায়া ফেলেছিল

 

পরিচিত এক পিসী ছিলেনউনি বাগানে জল দেয়া পছন্দ করতেনসময় পেলেই বাগানের গাছে জল দিতেন

যখনই তাকে দেখতাম তার দুর্বল হাতে একটা মরচে পড়া জলের কৌটা থাকতো, যার ভারে এক দিকে সামান্য ঝুঁকে থাকতেন

সকাল থেকে সন্ধ্যা পযন্ত সময় পেলেই জল দিতেন

এমন কি বৃষ্টির দিনেও ! 

 

আপনি বৃষ্টির সময় ও গাছে জল দেন কেন পিসী ? এক দিন প্রশ্ন করলাম

 

আরে গাছেরা আমার দেয়া জলের জন্য অপেক্ষা করে জবাব দিয়েছিলেন পিসীবৃষ্টির জল তো ফ্রিওতে গাছের মন ভরে না

 

ঠাকুরমা যখন মারা গেলেন তখন আমি একবারে পিচ্চি

তার শখের বাগানটা অন্যের হাতে চলে গেলসেটা ভেবে আর দুঃখ পাবার কিছু নেইচোখ বুজলেই ঠাকুরমায়ের বাগানটা মনের ভেতরে পষ্ট দেখতে পাই

 

ইচ্ছা আছে, অমন একটা বাগান আমিও করব।  বড় জায়গার উপর

পছন্দের গাছে আর ফুলের ঘ্রানে ঠাসাযদি না ও করতে পারি চিন্তা কি ?

স্বপ্নটা তো আছে !

 পরে বাসা বদল করে যেখানে গেলাম ওখানেও বাগান ছিল না

 

তবে পাহাড়ের কাছে খানিক খোলা বাগিচা মার্কা কিছু একটা ছিলমন মেজাজ খিচড়ে গেলে ওখানেই বসতাম

 

আচমকা থেকে যাওয়া গল্প, অমীমাংসিত কবিতা আর বার বার খিচড়ে যাওয়া প্রবন্ধ লেখা শেষ করার জন্য বাগান আমার জন্য দরকারি

নাহ, আমি বলছি না যারা গল্প আর কবিতা ফবিতা লেখে তাদের জন্যই  বাগানের দরকার আছে

এমনকি দিল্লিতে বড় বড় আড়তে যারা কাজ করে বা বড় বড় কারবার সামলায় তারাও আমাকে বলেছে- সকালে কাজে যাবার আগে নাকি আধা ঘণ্টা বাগানে সময় কাটায় উনারা

একজন এও বলেছে বাগানে সময় কাটিয়ে আপিসে গেলে বড় বড় মিটিং সে মাখনের মত সহজ করে ফেলে

 

বোঝ এবার ?

 

আচ্ছা আমি বরং সিরিলের কথা বলিআমার পুরানো বন্ধু প্রথম যখন পরিচয় হল সিরিল তখন দোতলা একটা  বাড়িতে থাকেএকদম ফালতু জায়গাউঁচু নিচু রুক্ষ পাথুরে মাটি

ভাবলাম, বেচারা সিরিল জীবনেও বাগান বানাতে পারবে নাকোন উপাই নেই ওর

নাহ, ভুল ভেবেছিলাম আমি

সিরিলের বাড়ির সামনে লম্বা বারান্দা ছিলপ্রচুর রোদ আর বাতাস আসতো ওখানে

 

প্রথমে দেখি একটা আইভি লতা বারান্দায় চেয়ার প্যাচিয়ে বেড়ে উঠছেএবং কফি টেবিল তক ওটা চলে গেল

 

 পরে দেখি আরও দুই একটা লতানো গাছ হয়েছে

সিরিলের উৎসাহ দেখে কে ?

হ্যাঁ, মাঝে মাঝে দুই চারটে শুয়ো পোকা বারান্দায় অলস ভাবে হাঁটতো

তাতে কী   ?

সিরিল ওর বাগান নিয়ে বেশ সুখেই ছিল যতদিন না বাড়িওয়ালা চিল্লা ফাল্লা শুরু করলবাড়িওয়ালার মতে, বারান্দায় প্রচুর জল পড়ে পড়ে  উনার ছাদ নষ্ট হচ্ছে

 

ভাই আপনার ছাদ আপনি ঠিক করে নেনবিরক্ত হয়ে বলল সিরিল

আর আগের মতই বারান্দার বাগানে জল দিতে লাগলআর এই ভাবেই বাড়িওয়ালা বনাম ভাড়াটের দারুন  সম্পর্কটা  নষ্ট হল

 

 

  প্রতিবেশী ধোপানীর কথা বলিখানিক দুরেই থাকতো ওদের যা অবস্থা, দুপুরে মোটামুটি খাবার খেত পরিবারের সবাইসেখান থেকেই বাকি খাবার রেখে দিত সন্ধ্যার পর খাবে বলে

 

কিন্তু ওরাও মাটির বড় পাত্রে আর বড় বড় টিনের ক্য্যানেস্তেরায়  ফুলের চারা বুনত

 

আমি বহু চেষ্টা করেছি অমন, হয়নিকে জানে কেন ?

 বাগান নিয়ে অনেকের বাতিক থাকে যে অমুক ফুল না থাকলে বাগানই করবে না

যেমন আমার বন্ধু অধ্যাপক সেলির কথাই বলি

 

উইলিয়াম ওয়ার্ডসঅয়াডের কবিতা পড়ে কেমন একটা বিকার চাপলো , বাড়ির সামনের উঠানে ড্যাফোডিল ফুলের বাগান করবেই করবে

কাজে লেগে গেল

সেই বসন্তে অনেক অপেক্ষার পর বাগানে একটা মাত্র ড্যাফোডিল ফুল ফুটল

মনে হচ্ছে কোন যাত্রী ট্রেনে করে ভুল ইশটিশনে নেমে দাঁড়িয়ে রয়েছে

 

পাহাড়ি এই শহরে সবার বাড়ির সামনে কিন্তু বাগান থাকে নাবিশাল কোন প্রাসাদ মার্কা বাড়ি আর পেল্লাই সব হোটেলের সামনে বাগান থাকেবাগান মানে- ফালতু ঝোপ ঝাড়, বিছুটি গাছের দঙ্গলআর মরা বা প্রায় মর মর

গোলাপের ঝোপ

 

 

বাগানের মালিকদের ও সমস্যা আছেনিজেদের কোন সমস্যা হলেই বাগানের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেকিছু হলেই বাগানের অনাদর

 

আমার দাদু ফল পাকুড় ধরে অমন গাছ বুনতে চাইতোআর দিদিমা ফুলের বাগান করতে চাইতো

 

সারা জীবন এক সাথে থাকার পর ও কিছু কিছু হালকা ব্যাপার নিয়ে মানুষের মধ্যে

মত ভেদ হতেই পারে

দাদুর মুখ প্যাচার মত হয়ে যেত যখন দিদিমা কাঁঠাল গাছের পাশে ফুলের বাগানের জন্য বেড়া দিত

মাঝের জায়গাটায় নরম মাটি পেলেই আমরা ফুলকপি বুনে দিতামদাদু দিদিমার ঝগড়া বন্ধ হত

 

বাড়িতে ফলানো সবজীর মত দারুন জিনিস আর নেইদুই জন মানুষকে একদম কাছে এনে ফেলে

ভালবাসা শুরুর জন্য লাল গোলাপ আর দীর্ঘ মেয়াদি বন্ধুত্বের জন্য বরবটি উপহার দেয়া অনেক পুরানো একটা প্রথা

 

 

(রাস্কিন বন্ড এর   The Good Earth- এর  ছায়া অবলম্বনে)


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...