সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ক্যালাইডোস্কোপ বার এন্ড ক্যাফে

 ক্যালাইডোস্কোপ  বার   এন্ড   ক্যাফে

--------------------------------------   

কক্ষনো কক্ষনো অনেক সময় নিয়ে জিনিসগুলো বদলায় ।

আপনি  ধরতে পারবেন না।

আর দশটা পরিবর্তনের মত  সাধারণ  মনে হবে  । কিন্তু তলে তলে সব দখল করে নিচ্ছে ।

 আপনি কিচ্ছু টের পাবেন না ।  

ব্যাপারটা এত বিচ্ছিরি ।

 কিন্তু খুব সহজ ভাবে শুরু হয়েছিল । কে জানে ওটা একটা ফাঁদ  ?

 আর ওরা যে আমাকে টার্গেট করেছে তাও না। পতঙ্গ ভুক উদ্ভিদের মত । যে কেউ ধরা পতে পারে ।

যখন তখন ।

আমি হাল্কা মদ্যপান করি । হালকা । মাতাল হই না, হতে ইচ্ছা করে । কিন্তু হই না।  কারন ,  আমার গিন্নি   আরমিন পছন্দ করে না।  অনেকে বলে  আধুনিক মেয়েরা নাকি বরের অমন খুচরা দোষ মেনে নেয় । কিছু মনে করে না। আরমিন সেই রকম না  ।

বাড়িতে বোতল গ্লাস নিয়ে বসলে বাপের বাড়ি চলে যাবে ।

সেটা বেশ ঝক্কির । ও বাপের বাড়ি গেলে সকালের চায়ের পাতা আর চিনিও খুঁজে পাই না আমি । জামার বোতাম তখনই ছিঁড়ে যায় ।

আরও  অনেক বিচ্ছিরি ব্যাপার হয় । সব বলতে হবে ?

আপিস শেষ হয় সন্ধ্যা ছয়টায় । তারপর বাজার করে বাসায় ফিরি ।

 মাঝে মাঝে সুলতানের মেসে যাই । কলিগ ।  ব্রিজ খেলি । পয়সা দিয়ে না। মজা করার জন্য । তখন কেউ বোতল আনে । দুই এক পেগ মেরে কচি পেয়ারা পাতা চিবিয়ে লেবুর খোসা মুখে রেখে বাড়ি  ফিরি ।

একদম সহজ সরল জীবন ।

ভালই যাচ্ছিল ।

তারপর হল সেই ঘটনা ।

প্রতিদিনের মত আপিস  শেষ করে  ফিরছিলাম । ঘুর পথে । সন্ধ্যা হয়ে গেছে ।

 আজ বাজার করতে হবে না । কিন্তু সুলতানের মেসেও যাওয়া যাবে না । মেসের   কার  মা অথবা বাবা   মারা গেছে   যেন  । হারাম জিনিস আনা যাবে না। চক্ষুলজ্জা ।

নিতাইগঞ্জের ঐদিকটায় আগে আসিনি । প্রথম । নারায়ণগঞ্জের এই একটা অংশে এখনও দালানবাড়ি সব পুরানো । সব ভেঙ্গে নতুন আধুনিক  ফ্ল্যাট হয়নি । কেমন পুরানো পুরানো লাগে সব । আমার চোখে আরাম দেয় । ভাল লাগে ।

লাল ইটের একটা পোস্ট আপিস   । বাইরে  বড় বড় ছাতিম গাছ  দাঁড়িয়ে  আছে   কয়েকটা ।  কেমন মিষ্টি সৌরভ । বাগানবিলাসের ঝাড় পেঁচিয়ে রেখেছে পুরো বাড়িটা । পাকা জামের ভেতরের রঙের মত ফুল । মনে হয় কাগজ কেটে বানিয়েছে ।

পথের শেষ মাথায়  একতলা একটা  বাড়ি । ভেতরে নরম আলো জ্বলছে ।  হালকা গানের শব্দ ।   

দরজার পাল্লা সবুজ । খোলা । জানালার সব কাচ আলাদা আলাদা রঙের ।  ভেতরের নরম আলো জানালার কাচে  গলে বাইরে আসায়    অপূর্ব দেখাচ্ছে । খোলা দরজায় কাচের পুঁতির পর্দা । কেউ ঢুকতে গেলেই ঝন ঝন করে উঠে ।

বাইরে সাইনবোর্ড -

 ক্যালাইডোস্কোপ  বার   এন্ড   ক্যাফে  ।

এতো জল না চাইতেই লস্যি ।

সুরুত করে ঢুকে পড়লাম ।

আর দশটা বারের মতই । দেখে ভুল হবার কোন উপায় নেই । মাঝারি কামরা ।  সবুজ নীল নরম আলো জ্বলছে নানান শেড থেকে ।   এক  দিকের  দেয়াল জোড়া বার । চেনা অচেনা  বোতল দিয়ে সাজানো । রেগুলার বার যেমন হয় । পানপাত্র কিছু চেনা- , হাইবল , ককটেল , কলিন , সূটার , টাম্বলার , মারটিনি   ,  মার্গারিটা  ।   

একটা বারে নাকি  মোট সাতাশ পদের গ্লাস থাকে । কয়টা চিনব ?

 ভেতরটা  তেমন ব্যাস্ত নয় ।

জানালার ধারে,  এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে কয়েক জোড়া নারী পুরুষ ।  সংখ্যায় কম ।

হালকা মিউজিক । অচেনা । পরিচিত কোন সুর না ।

বারের সামনে কাউনটারে দুই হাত রেখে দাড়িয়ে  বুড়ো মত এক বারটেনডার ।

একমাথা কাচাপাকা চুল । মুখভর্তি দাড়ি । ব্রাশ করে রেখেছে । পেল্লাই গোঁফ । সব  সাগরের ফেনার মত শাদা । বুড়ো চোখ দুটো নতুন পয়সার মত চকচক করছে অল্প  আলোতে । রেশমি কাপড়ের  শাদা  শার্ট , উপরে বেগুনী রঙের  ভেসট । ওটার গায়ে আবার একই রঙের সূতার   কাজ করা  লতাপাতা । সব মিলিয়ে ক্লাসিক বারটেনডার । জামার হাতা গুটিয়ে রেখেছে ।  দুই হাতেই নীল রঙের উল্কি ।

একটা মৎস্যকুমারী । আরেকটা উল্কি অচেনা ভাষায় কি সব লেখা ।

উল্কি জিনিসটা ইয়াং ছেলে পিলে আজকাল বেশ করাচ্ছে । অমন বুড়ো হাবড়া করায়,  প্রথম দেখলাম ।

বিহারি আর পাহাড়ি দুচার জনকে অবশ্য দেখেছি।

যাকগে , আমার কী   

আমাকে দেখে হাসল বুড়ো । যেন অনেক দিন পর দেখা হল , আগে থেকেই চিনতাম একে অপরকে ।

' গুড ইভিনিং । বসুন স্যার । বলুন কি দেব ?' এক নাগাড়ে বলে গেল বুড়ো ।

 

গলার স্বর ওর চোস্ত পোশাক  আশাকের সাথে যায় না। নরম । কেমন ভরাট আর ঘুমঘুমে গলা ।

কাউনটারের সামনের একটা বার  টুল টেনে বসতে বসতে বললাম , ' এখানে যে বার আছে আগে জানতাম না। অদ্ভুত ব্যাপার । নতুন নাকি ?'

' না স্যার ।'  ধপধপে শাদা পিচ্চি তোয়ালে দিয়ে কাচের একটা পানপাত্র মুছতে মুছতে বলল বুড়ো । ' অনেক পুরানো স্যার ।  সেই ইংরেজ আমলের   রয়্যাল  জিনিস  ।   নারায়ণগঞ্জের   কয়েকটা জিনিস একদম পুরানো । এক , হংস থিয়েটার ।  দুই , লক্ষ্মী নারায়ন আখড়া ।  আর তিন আমাদের  এই  ক্যালাইডোস্কোপ বার এন্ড ক্যাফে  ।   আগে  অবশ্য নারায়ণগঞ্জের নাম ছিল খিজিরপুর । আর খানিকদূরের   সোনার গাঁ ছিল বাংলার রাজধানী । পরে ইংরেজরা যখন এই শহরে আসে উইলিয়াম ক্যারেল সাহেবের আমলের বার এটা ।'

লোকটার জ্ঞানের বাহার দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না।

' আসলে আমিই নতুন এই শহরে ।' ব্যাখ্যা করলাম ।

'  সে রকমই মনে হয়েছে ।' আবারও হাসল বুড়ো  বারটটেণ্ডার । ভেতরের  নরম  আলোতে বেশ বুজুম ফ্রেন্ড টাইপের মনে হচ্ছে ।

' সবচেয়ে সস্তা ড্রিঙ্ক কোনটা ?'

'আমার একটা স্পেশাল বানিয়ে দেই  ?  কম দামের মধ্যে ? দুনিয়ার অন্য কোন বারে পাবেন না ।' প্রস্তাব দিল বারটেণ্ডার ।

হ্যাঁ বোধক মাথা ঝাঁকালাম ।

বুড়ো ব্যস্ত হয়ে পড়লো ।

সামনের জিনিসগুলো থেকে সিলভারের গ্লাস তুলে নিল । ককটেল শেকার বলে । তাকের উপর থেকে বেছে নিল    দুটো বোতল । একটার  রঙ বাদামি আরেকটা  নীল ।  বোতলের  গায়ে  হলুদ হয়ে যাওয়া লেবেল । কিসের বোতল কে জানে  ?   আগে দেখিনি অমন । দেখলেও চিনব না ।

 ষ্টীলের পিচ্চি একটা কাপ নিল । জিগার বলে  এই  কাপকে ।  তেল মাপার মত ঐটা দিয়ে  মদ  মেপে  ককটেল বানায় ।  মুভিতে দেখেছি ।

তাই করলো ।

দুই বোতল থেকে মেপে  এক জিগার করে তরল ঢেলে  দিল ককটেল শেকারে । আরও অচেনা দুই সিরাপের মত জিনিস  ঢেলে উপরে তুলে মনের খুশি মত ঝাঁকিয়ে নিল শেকারটা  । বয়ামের মত বেঁটে একটা গ্লাস বেছে নিল । গ্লাসের গায়ে কোন রকম খাঁজ কাঁটা নেই । ঝকঝকে ।  

আইস বাকেট থেকে  বড় একটা চামচ  বরফ   তুলে  রাখল গ্লাসের ভেতরে । বরফ না তো সদ্য কাঁটা হীরক ।

 মমতা দিয়ে শেকারের সব তরল ঢেলে দিল গ্লাসে ।

 ককটেল   র্যাকের  এক পাশ থেকে তুলে নিল শুকনো একটা গুল্ম । গুল্মটা দেখতে অনেকটা  পর্তুলিকা ফুলের ডাটার মত । চিনলেন না ? অনেকে টাইম ফুল বলে । পাকা জামের  ভেতরের মত ফুল ধরে । মেক্সিকান গোলাপ বলে অনেকে ।  গুলদেহপরি  বলতো পুরানো দিনের মানুষেরা । মানে দুই প্রহরের ফুল । দুই প্রহর মানে দুপুর ।

 সত্যি তাই , দুপুরের পরেই  এই ফুলগুলো ফুটে ।    আমরা  ছোটবেলায় দূর্বাফুল বলতাম ।

দেশলাই হাতে নিয়ে ফস করে গুল্মটার গায়ে আগুন ধরিয়ে  ফেলল  প্রবীণ বারটেণ্ডার । ভালমত ধরতে না ধরতেই ফু দিয়ে নিভিয়ে  ফেলে সেটা গুঁজে দিল গ্লাসের ভেতরে ।

সবশেষে ভাল মানুষের মত হাসি হেসে পাত্রটা ঠেলে আমার সামনে বাড়িয়ে দিল ।

জাদুকরদের   মত এক হাত নিয়ে গেল  শরীরের পিছনে অন্য হাতের তালু ছড়িয়ে দিল সামনে ।

রিমঝিমে আলোতে মনে হল  ভানুমতির    খেলা দেখাল শতবর্ষের পুরানো কোন বাজিকর ।

এখন আমার সামনে কাচের পানপাত্র ।  শয়তানের গায়ের রঙের মত সবুজ কোমল পানীয়  সেটায় ।

লকনেস  দানবের লেজের মত পাকিয়ে পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে নীল রঙের ।

'কী   এটা ?' জানতে চাইলাম ।

'কোন নাম নেই । আপনি একটা নাম দিয়ে দেবেন । আমার নিজের  রেসিপি । একদিন বিখ্যাত হতেও পারে ।' বিনয়ের সাথে বলল বুড়ো ।

 

 গলায় স্বর একঘেয়ে । ঘুমঘুম ।

আর  কোন কথা না  বলে   হাত বাড়িয়ে  তুলে নিলাম কাচের পানপাত্রটা । সবুজ তরল । আধপোড়া গুল্ম । নীল ধোঁয়া ।

নাকের সামনে নিলাম ।

যে কোন পানীয় পান করার আগে ওটার এরমা নিতে হয় , অমনটাই নাকি নিয়ম । বিদেশী কোন একটা ফিচারে পড়েছিলাম ।  

অচেনা মিষ্টি  সৌরভ । কিছুটা চেনা । খানিক অচেনা । বৈশাখের তপ্ত মাটিতে প্রথম  বৃষ্টির ফোঁটা পড়লে মনে হয় অমন একটা ঘ্রান পাওয়া যায় । আবার কাঁঠাল বেশি পেকে গেলে অমন সৌরভ পাওয়া যায় । কড়া   একটা ঝাঁঝ পেলাম ।  ক্লাব সোডা বা  স্পার্কলিং ওয়াটারের বোতল খুললে অমন ঝাঁঝ পাওয়া যায় ।  

ধীরে ধীরে চুমুক দিলাম ।

ভয় ছিল  শক্ত  ঝাঁঝ লাগবে , লিকারের কড়া ঘ্রানে  বিম্বিসা জাগবে ।

 অমন কিছু হল না।  

মিষ্টি কেমন একটা তরল   চলে গেল গলা দিয়ে ।  হালকা পুদিনার স্বাদ পেলাম আলজিভে ।

'কী   কী  দিয়েছেন ?' জানতে চাইলাম ।  দেখি আগ্রহের সাথে আমার দিকেই চেয়ে আছে বুড়ো ।

' ডিমের কুসুম , শিমের দানা , এটা সেটা অনেক কিছু ।' আগের মতই ঘুম ঘুম গলায়  জবাব দিল ।  লোকটার কণ্ঠস্বর বেশ কিন্তু । অনেকগুলো বছর আগে   আমেরিকান রেডিও-তে  ' লাইট আউট' নামে একটা শো হত ।  কয়েকটা এপিসোড শুনেছি নেটে । বক্তার  কণ্ঠস্বর এই ব্যাটার মত ।

অনেকক্ষণ কথা বললে  শ্রোতা ঘুমিয়ে যাবে ।

আবার চুমুক দিলাম । স্বাদ ভাল ।

'নাম কি আপনার ?'

'ওয়াসিম অনন্ত ।'

'অদ্ভুত নাম।'

'তা তো বটেই ।'

'কত বছর কাজ করছেন ?'

'অনেক বছর ।'

'মালিক কে এটার , মানে বারের ।'

'অনেকেই ।'

'মানে ?'

'বেশ কয়েকজন মিলে  চালাচ্ছেন ।'

' থাকে   কোথায় উনারা ?'

'এই শহরে না।'

'সেটা তো বুঝলাম । কিন্তু দেশি লোক না  বাইরের ?

'বাইরের ।'

'বিদেশী ?'

'বলতে পারেন ।'

বুঝলাম ব্যাটা সঠিক তথ্য দিতে চাইছে না। সেটাই স্বাভাবিক ।  হয়তো ট্যাক্সের ঝামেলা আছে । স্থানীয় কোন সংসদ সদস্যকে মোটা টাকার চাঁদা দিয়ে ব্যবসা চালায় । কত কিছু হয় একটা ক্যাফে আর বারে । আমরা জানব কেমন করে ?

গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে আবার চারিদিকে তাকালাম ।  আগের মতই । নতুন কেউ ঢোকেনি বা বের হয়নি ।

জানালার পাশে, দূরের কোণায় স্বল্প আলোতে বসে বসে পান করছে এক গুচ্ছ  নরনারী ।

'ককটেল স্ন্যাক্স বিক্রি করেন না আপনারা ? যেমন পিঁয়াজের রিং , আলুর চাট ,  নিমকি বা  নোনতা কাজু  বাদাম ?'

' না স্যার । চাহিদা নেই ।'

' সে কি কথা ? খদ্দের  খালি পেটে গিলে ঐসব ? '

জবাব না দিয়ে মুচকি হাসল ওয়াসিম ।

'ছাপানো মেনু আছে আপনাদের ?'

' নেই স্যার ।'

' খদ্দের অর্ডার দেয় কী   ভাবে ?'

' যা চায় বানিয়ে দিতে পারি ।'

'সে কি ?'

আবারও হাসল ওয়াসিম বুড়ো ।

'বারমুডা ট্রায়াঙ্গল ককটেলে কী   যায় ?' মুখ শক্ত করে প্রশ্ন করলাম ।

' পরীক্ষা নিচ্ছেন ।'

'ধরা যাক সেটাই ।'

' হাফ সর্ট ব্ল্যাক রাম , তাজা পাইন অ্যাপেল জুস , আড়াই সর্ট জিঞ্জার বিয়ার , দুই ফোঁটা কমলার বিটার। ওল্ড ফ্যাশন গ্লাসে আসবে । সাথে কাগজি লেবুর একটা ফালি ।'

চুপ মেরে গেলাম ।

বুড়ো শক্ত পাল্লা ।

বলার মত কিছু খুঁজে না পেয়ে বললাম , ' এত ভাল কাজ  জেনে  এই রকম অখ্যাত বারে কাজ করছেন কেন  ?'

খানিক চুপ করে আমার চেহারায় কি যেন খুঁজলো ওয়াসিম । হয়তো ভাবছে ব্যাঙ্গ করছি না তো ?  শেষে নিশ্চিত হল ওটা প্রশংসা ।

শান্ত গলায় জবাব দিল , ' জায়গা বদলাতে ভাল লাগে না ।'

সংক্ষিপ্ত জবাব । বুঝলাম না কি বলতে চাইছে ।

আমি গ্লাস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম ।  বাইরে গরম হলেও বারের ভেতরে শীততাপ  নিয়ন্ত্রনের ব্যবস্থা আছে । গরম লাগছে না। কামরার চারিদিকে কয়েকটা পোষ্টার । ফ্রেমে বাঁধিয়ে রেখেছে । সব শাদা কালো ছবি ।  কারা কিসের ছবি সেটা এত দূর থেকে বুঝা যাচ্ছে না।

এক কোণে বাথরুম । উপরে  লাল রঙ্গে লেখা  ƚɘlioT

অবাক হতেই ওয়াসিম বুড়ো ব্যাখ্যা করলো , ' সস্তা মিস্ত্রি দিয়ে কাজ  করালে  ওমনি হয় ।'

হালকা হবার জন্য ভেতরে গেলাম ।

ছোট কিন্তু বেশ সুন্দর । ভেতরে প্রচুর আয়না । ফলে নিজেকে অনেকগুলো করে দেখতে পাচ্ছি । ছোটবেলায় মহল্লার নাপিতের দোকানে অমনটা হত । মানুষ নিজেকে দেখতে পছন্দ করে ।   

এক সাথে নিজেকে অনেকগুলো করে দেখার আনন্দ অন্যরকম ।

 ফিরে এলাম কাউনটারে । বুড়ো ওয়াসিম আগের মতই পিচ্চি তোয়ালে দিয়ে গ্লাস পরিষ্কার করছে ।

বাজনা শুনে শুনে গ্লাস খালি করতে  লাগলাম ।  মালমশলা কী   দিয়েছে কে বলবে কোন রকম  মোহ , মত্ততা কাজ করছে না ।

আশাহত হলাম ।

আরেকটা নেব কি না ভাবছি তখনই ঘড়ির দিকে চোখ পড়তে চমকে গেলাম । হায় হায় । সাড়ে সাতটা ? এত জলদি সময় গেল ?

' দাম কত ?'  প্যান্টের  পকেটে হাত বাড়ালাম ।  

'সত্তর টাকা ।' স্মিত হাসি হেসে সামনে এগিয়ে এলো  ওয়াসিম বারটেণ্ডার ।

'কত ?' প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম ।

একই উত্তর পেলাম ।

কি ভাবে সম্ভব ? উত্তরায় ক্লাবে সামান্য একটা ড্রিঙ্ক সাড়ে ছয়শো টাকা করে রাখে  । সত্তর টাকা তো ফাস্টফুডের দোকানে  সরু টেস্টটিউবের মত গ্লাসে   এক পোয়া বরফ , সামান্য  স্প্রাইট  আর এক ফালি লেবু দিয়েই রাখে ।  

' আপনি নতুন এসেছেন । তার উপর  একা । সেইজন্য আমাদের তরফ থেকে ডিসকাউনট ।'  হাসি মুখে বলল বারটেণ্ডার ।  ' বিজ্ঞাপন বলতে পারেন ।'

'  পরের বার পাবো ? ' বেহায়ার মত জিজ্ঞেস করলাম ।

' যদি একা আসেন তবেই । সঙ্গী সহ আসলে পাবেন না।' একই রকম ভঙ্গিতে উত্তর দিল ।

দারুন ব্যাপার ।

টাকা রাখল সে । কোন রকম রিসিট দিল না ।

আমার মনের ভাব দেখে জবাব দিল , ' কোন রিসিট দেই না আমরা । দরকার হয় না সেইসবের ।'

আসল ব্যাপারটা বুঝলাম । টাকাটা হাপিস করে ফেলবে করিৎকর্মা বুড়ো ।

'কোন ফোন নাম্বার বা ভিজিটিং কার্ড আছে ?'  জানতে চাইলাম ।

'ওসব লাগে না আমাদের ।'  জবাব এলো ।

কথা শেষ ।

বাইরে চলে এলাম ।

বাইরে বের হতেই বিচিত্র  অনুভূতি হল ।

গরমের একটা হলকা ধাক্কা  দিল মুখে । বারের ভেতরে শীতল পরিবেশে ভুলেই গিয়েছিলাম বাইরের তন্দুরির মত গরমের কথা । চারিদিকে বেহুদা শব্দ ।  রিক্সার  ঘণ্টার টুংটাং ।  প্রাইভেট কারের  হর্ন । রাস্তার এক হালিমওয়ালা চেঁচিয়ে খদ্দের ডাকছে । চিনাবাদেম - বাদাম বিক্রেতার বিচ্ছিরি সুর ।

এত কোলাহল কেন এই শহরে ?

আবিস্কার করলাম শরীর ঘামছে । চোখে  কেমন যেন ঘোর ।  দিয়েছিল কী   আমাকে বুড়ো বারটেণ্ডার ? টকিলার মত পানীয় ? পান করার সময় কোন বোধ হয় না আচমকা নেশা চেপে বসে ।

কানের পাশে  রিক্সা ঘণ্টা দিয়ে মিহি গলায় বলল , ' মামা জাইবেন ?'

লাফ দিয়ে উঠে বসলাম । হেঁটে এত পথ আজ ফিরতে পারব না ।

'চলো ।' হুকুম দিলাম ।

'কই জাইবেন ?' ভাগ্নের প্রশ্ন ।

' নগর খানপুর ।'

প্যাডেলে চাপ দিল সফর সঙ্গী ।

রিক্সা চলতেই কেমন শির শিরে হাওয়া গায়ে লাগল । আরাম করে বসলাম । কেমন তন্দ্রা তন্দ্রা ভাব হচ্ছে ।  বুঝলাম মাল কাজ করছে ।  চারিদিকে কেমন নীল অন্ধকার । সবাই পাগলের মত হাঁটছে । কত মানুষ এই শহরে ? সবাই ব্যস্তসমস্ত ভঙ্গিতে বাড়ি ফিরছে ।

চারিদিকের পরিবেশ অমন কেন ? চমকে গেলাম । মনে হচ্ছে ত্রিসিরা কাচের ভেতর দিয়ে সবাইকে দেখছি ।  সবাই শরীর ঢেউ ভাঙ্গা । ঘোলা । বর্ণালি কেমন রঙ ছড়াচ্ছে দিগন্ত থেকে ।

এক লহমায় রাজপথ ফাঁকা হয়ে গেল যেন । যেন অচিন কোন পথে হেঁটে যাচ্ছি ।

নারায়ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারটা নেই । ওখানে আদ্যিকালের দোতলা লাল বাড়ি । চামড়ার ব্যাগে জল ভর্তি  করে  কাধে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বুড়ো এক ভিস্তিওয়ালা । মাথায় আধ  ময়লা কাপড়ের টুপি । মুখ ভর্তি দাড়ি ।

আবিস্কার করলাম একদম অচেনা পথে যাচ্ছে আমাদের রিক্সা । সরু পথ । দুই ধারে বড় বড় ফণীমনসার গাছ । গাছের পাতাগুলো নানরুটির মত দেখতে । কাঁটা ভর্তি ।

বড় একটা দালান । কয়তলা হবে বলতে পারব না । ধাপে ধাপে    সিঁড়ি  উঠে গেছে একদম উপর তলার ছাদ পর্যন্ত । ওটার উপরে দাড়িয়ে বলি দেয়া হচ্ছে একদল মানুষদের ।  মায়ান মন্দির ।

বিচ্ছিরি সব দৃশ্য দেখছি চোখের সামনে ।

জ্যান্ত একটা মানুষকে চ্যাঙদোলা করে বেঁধে রেখেছে । লোকটা জীবন্ত । বেঁচে আছে । চারজন মানুষ ধারালো ক্ষুর দিয়ে লোকটার গায়ের চামড়া তুলে ফেলছে যত্নের সাথে ।

কালো  কোট আর মাথায় লম্বা টুপি  পরে  হেঁটে যাচ্ছে এক লোক । হাতে ধারালো চাকু । ত্রিভুজ ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যবয়স্কা মোটামত এক মহিলা । তার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে লোকটা । গলা কাটবে । চিনে ফেললাম । লন্ডনের শয়তান -জ্যাক দ্যা রিপার ।

পরমুহূর্তে আবিস্কার করলাম কুরুক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছি আমি । কৌরব পাণ্ডবদের ভীষণ লড়াই । হলুদ ধুতি মাথায় ময়ূরের পালক গুঁজে রথ চালাচ্ছে কৃষ্ণ । পিছনে তীর ধনুক নিয়ে শ্যামলা মত যুবক অর্জুন । হাসি মুখে তীর ছুরছে গাণ্ডীব থেকে ।

প্রাণের ভয়ে পালাচ্ছি ।

'মামা , উঠেন ।'  শরীরে ঝাঁকুনি দিল রিক্সাওয়ালা । ' কই নাম্বেন ?

পোলস্টার ক্লাবের সামনে রিক্সা । বাড়ির কাছেই ।

' সামনের  কাঁচি গেইটওয়ালা   বাড়িটার সামনে নিয়ে রাখ ।' বললাম ।

সেইরকম করলো রিক্সাওয়ালা ।

ভাড়া মিটিয়ে বাসায় চলে এলাম । চারতলার উপরে থাকি । লিফটের কথা কল্পনা করা  বাজে ধরণের রসিকতা ।

 কয়েকবার  কলিং বেল চাপার পরও আরমিন দরজা খুলল না ।  বাড়তি চাবি আছে । অনেক কষ্টে দরজা খুলে ভেতরে গেলাম ।

মনে হচ্ছে মেঘের উপর দিয়ে হাঁটছি ।

আরমিন নেই । ফ্রিজের উপরে কাগজে নোট লিখে ম্যাগনেট দিয়ে চাপা দিয়ে গেছে ।

হলুদ কাগজ । নীল কালিতে লেখা - ' রাত  নয়টার মধ্যে ফিরব । বিকেলের জলখাবার টেবিলে আছে ।'

বাপের বাড়ি  যাবে  দুপুরে বলেছিল । ভুলে গিয়েছিলাম ।

টেবিলের  উপর চিনামাটির তশতরীতে  দুটো   চিকেন  স্যান্ডউইচ  প্ল্যাস্টিকের জালি দিয়ে ঢাকা ।

খাওয়ার রুচি নেই । কেমন যেন  তন্দ্রালু ভাব সারা শরীরে ।

ও আসার আগে খানিকটা ঘুম দিয়ে উঠলে ফ্রেশ লাগবে ।

কোনমতে জুতাজোড়া খুলে বেডরুমে চলে গেলাম ।

বিছানায়   গা এলিয়ে দেয়ার সাথে সাথেই তলিয়ে গেলাম ঘুমে ।

এমনিতেও ঘুমালে হুশ থাকে না ।

তারপরও কিচেনের শব্দ , প্রেশার কুকারের সিটি , আরমিনের চুড়ির টুংটাং  অমন হাবিজাবি  শব্দ কানে আসে । বেড সাইড টেবিলের  সতর্ক ঘণ্টা জাগায় রোজ ।

আজও তেমন ।

পিলে চমকে জেগে ঘড়ির দিয়ে চেয়ে দেখি সকাল সাতটা ।

বাইরে  দিনের আলো  । কাচের শার্শি চুইয়ে সোনালী রোদ আসছে ।

 

মানে কী   ? কাল রাতে আর উঠিনি ঘুম থেকে ?

উঠে   কিচেনে গেলাম ।

ডাইনিং টেবিলের সামনে আরমিন বসা।  সামনে চিনামটির  বাউলে  তাজা লেটুস , গোলাপি  পেঁয়াজের রিং , আর পনিরের কুচি ।

' সালাদ খাচ্ছি ।' হেসে বলল মেয়েটা । ' ওজন কমানোর দরকার ।'

স্বপ্ন  যে দেখছি    সন্দেহ নেই । সালাদ ফালাদ পছন্দ করে না ও । আর ওজন কমানোর কথা কবে বললাম  ?

সবচেয়ে বড় কথা এই যে কাল রাতে অমন ঘুমিয়ে কাটিয়েছি সেইজন্য ধাতানি দিচ্ছে না কেন ? নাকি পরে ধরবে ? মেয়েরা ঐসব ব্যাপারে পাকা ।

'জল খাবারের কি খবর ?' পেট ভর্তি  খিদে । সোজা কাজের কথায় চলে গেলাম ।

'আটার  রুটি  আর  বেগুনের ছক্কা ।'

 আরে সর্বনাশ ।

আরমিন পাউরুটির টোষ্ট আর ডিমের অমলেট পছন্দ করে । বরাবর ওটাই করে । কখনও কখনও চিকেন স্যান্ডউইচ বা ভেজিটেবল রোল । কিন্তু বেগুনের ছক্কা আর শাদা আটার  রুটি আমার পছন্দ হলেও  তেমন করে না।

কপাল খুলে গেল আমার ? নাকি মার্কেটিং করতে যাবে খানিক পর । টাকা চাইবে ।

'কাল কখন ফিরেছ ?' সতর্ক ভাবে  কথার চাল দিলাম ।

' মানে কি ?' খাওয়া বন্ধ করে  চোখ বড় বড় করে  ফিরে চাইলো আমার দিকে । ' রাত আটটায় ফিরে না রান্না করলাম ?  আজব মানুষ তো ।'

বাথরুমে ঢুকে গেলাম কথা না বাড়িয়ে ।

বেশি কথা বললে ধরা খেয়ে যাব ।

আমি কখন ফিরেছি সেটাই মনে নেই । আরমিনের কথা হিসাবে রাতের খাবার এক সাথে খেয়েছি । কিন্তু বেমালুম ভুলে গেছি । এটা কোন কথা ?

এখন আর পুরানো মোরব্বা ঘেঁটে লাভ  কী  ?

কিন্তু মন বলছে মস্ত কোন ভজঘট ঘটেছে ।

সেটা আবার টের পেলাম বাথরুমে । বেসিন নীল রঙ্গের । আজ দেখি গোলাপি । আয়না উল্টা দিকের দেয়ালে ।

কাল সকালে দাড়ি কামিয়েছিলাম ।  শাওয়ারের ডান দিকে ছিল  আয়না । আজ জায়গা  পালটিয়ে ফেলল ?

বেসিনের তাকে শেভিং ব্রাশ আর ফিটকারী দেখে দম আঁটকে মরার দশা হল । ব্রাশ ব্যবহার করি না। টিউব থেকে  ফোম বের করে গালে ঘষি । আর ফিটকারী দশ বছর ধরে চোখে দেখি না। আফটার শেভ লোশন মাখি ।

কথা না বলে চুপচাপ  সকাল বেলার বাথরুমের কাজ  শেষ করে বের হয়ে গেলাম ।

অন্যমনস্কতার ভান করে জামা পড়তে পড়তে আরমিনকে প্রশ্ন করলাম , ' আয়নাটা বদলিয়েছিলাম  কবে যেন ?'

' বদল করেছ মানে ?' দাঁত মুখ খিচিয়ে উঠলো আরমিন । ' ওটা ভাঙলো  কবে ? কাল গিলেছ টিলেছ নাকি ?'

' আরে নাহ ।' হাসলাম । ' মাথায় আসলে অফিসের বাথরুমের আয়নাটার কথা ঘুরঘুর করছিল । মুখ ফস্কে বলে ফেলেছি। পিয়নটা বলেছিল , ওখানের আয়নাটা বদলাতে হবে ।  একেই বলে  রামের পিণ্ডি শ্যামের ঘাড়ে । হে হে ।'

লাভ হল না । কেমন সন্দিহান চোখে আরমিন চেয়ে আছে ।

জলখাবারের টেবিলে লাল চা দেখে চুপচাপ খেয়ে নিলাম প্রশ্ন না করে ।

বুঝতে পারছি অনেক কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটবে । অথবা সত্যি সত্যি ভুল হচ্ছে কিছু আমার ।

সেই সকাল থেকেই ঘটনা শুরু হল ।

আসলে ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারব না কি হচ্ছে । হতে পারে স্মৃতি প্রতারণা করছে আমার সাথে ।

কোন কোন ড্রাগ নিলে  ওমনটা হয় ।  অবাস্তব  কিছু ধারনা জন্মে মনের ভেতরে । মিথ্যা স্মৃতির ব্যাপারে বিজ্ঞান  অনেক আগেই গবেষণার হিসাব দিয়েছে আমাদের ।  অতীতের তিক্ত স্মৃতি আছে যাদের তাদের মধ্যে মিথ্যা স্মৃতির প্রবণতা বেশি ।   ডিপ্রেশন আর  অতিরিক্ত চাপ  মিথ্যা স্মৃতির জন্ম দেয় ।  

ফলস মেমরি সিনড্রোম তো একটা অসুখই আছে । অমন রোগের রোগী হয়ে গেলাম না তো ?

আমার স্থির বিশ্বাস অতিরিক্ত কাজের চাপের জন্য সামান্য ফলস মেমরির বা ভুলে যাবার রোগ হয়েছে ।

আপাতত এই হচ্ছে কাহিনি ।

তো আমার মনে হয় সেইদিনের পর আর যদি  ক্যালাইডোস্কোপ     বারে না যেতাম তবে বোধ হয় বেঁচে যেতাম ।

 

কিন্তু ঘটনা যদি কেউ নিয়ন্ত্রন করে তবে পালানো যায় না। তাছাড়া সস্তায় মদ এই ব্যাপারটা  বড্ড কড়া লোভ । আমি শুনেছি ঢাকা  শহরে আশির দশকে আণ্ডারগ্রাউনডের  সবচেয়ে বড় ডনকে মদ খাওয়ানোর কথা বলে ডেকে নিয়ে খুন করেছিল তারই কাছের মানুষ ও প্রিয় বন্ধু ।

এসব আসলে আবোল তাবোল যুক্তি । হাজার বছরের জ্ঞান যাদের আছে তাদের সাথে পারা মুশকিল ।

পতঙ্গভুক গাছ অমন মাংস  পচা বাজে ঘ্রান ছড়ায় , লোভে পোকা হাজির হয় ।

সেইদিনের আপিস শেষ করে নিজের  অজান্তেই হাঁটা  ধরলাম ।

আজ গরম কম । বিকেল থেকেই ঠাণ্ডা বাতাস বইছে ।

 ক্যালাইডোস্কোপ     বারটার কাছে গেছি তখনই আগাম নোটিশ না দিয়ে বৃষ্টি নেমে গেল।

দৌড়ে ভেতরে গেলাম ।

চোখা  চোখি হতেই  বারটেণ্ডার  অয়াসিম বুড়ো হেসে ফেলল ।   সেই হাসি আন্তরিক  ।

গতদিনের মতই পরিবেশ ভেতরের ।

কয়েক জোড়া নরনারী বসে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে । সামনে কাচের পানপাত্র । কথা বলছে । লুকানো স্পিকার থেকে কেমন অচেনা সুর ভেসে আসছে । কোন শিল্পীর কোন  অ্যালবাম কে জানে ।  বেশ লাগে , বুড়োর কাছ থেকে এ্যালবামের নাম জেনে নেব আজ ।

কাউন্টারের সামনে বেশ কয়েকটা কাঠের চেয়ার থাকলেও কেউ নেই ।

একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লাম ।

'মনে হচ্ছিল আপনি আসবেন ।' মুচকি হাসল ওয়াসিম ।

' এই পথ দিয়েই  যাচ্ছিলাম ।' মিথ্যা বললাম । যাতে আমাকে পাঁড় মাতাল না ভাবে ।

'আজকেও আমার স্পেশাল খাবেন ? অন্য একটা ?' পেশাদারী আচরণ স্পষ্ট ।

'কালকের দামে ?' মনে আছে কি না কে জানে , ঝুঁকি না নিয়ে জিজ্ঞেস করে নিলাম ।

'একা আসলে সব সময়  একই দামে পাবেন ।'

কথা শেষ করে কাজে লেগে গেল বারটেণ্ডার ।

 কাচের  ত্রিভুজ একটা  বিকার  তুলে  নিল । ভেতরে বর্ণহীন তরল ।

আগের দিনের মত কাচের খাঁজকাটা   গ্লাসে বরফ রেখে অর্ধেক বর্ণহীন তরল ঢেলে দিল ।  হোমিওপ্যাথির শিশির মত একটা ক্ষুদে শিশি নিল । মুখটা কর্ক দিয়ে ছিপি আঁটা । যত্নের সাথে দুই ফোঁটা তরল ঢালল গ্লাসে । ঘন ঘন বুদ্বুদ উঠতে লাগল গ্লাস থেকে । রঙ বদলাতে লাগল । একটা বড় দারুচিনির ফালি রাখল গ্লাসে । লেবুর গোল রিং কেটে ভেতরে গেঁথে দিল কয়েকটা লবঙ্গ । সেটাও দিল গ্লাসে ।

 

পানীয়ের রঙ অনেকবার বদলে বেগুনী হয়ে গেল ।

টিস্যুর রুমালের উপর গ্লাসটা রেখে সামনে এগিয়ে দিল । এই লোক এখানে কী   করছে কে বলবে ? এর থাকার কথা ছিল লাস ভেগাসের কোন ক্যাসিনোতে । ড্রিঙ্ক বানানোর কায়দা দেখতেই   লোকে ভিড়  করতো ।

'এটারও নাম নেই ?' জানতে চাইলাম ।

' সব কিছুর নাম দেয়া সম্ভব না স্যার । ধরুন আমরা যদি সৈকতের সব বালির নাম দিতে চাই পারব ? পারব না । অথচ প্রত্যেকটা বালির গঠন আলাদা ।  কোনটার সাথে কোনটার মিল নেই । আর  সৈকতের বালির চেয়ে বেশি  মহাশূন্যের নক্ষত্র । ওদের নাম দেয়া ও  সম্ভব না ।'

' আপনি তো ভাই হাফ কবি আর হাফ বিজ্ঞানী।' কিছু বলা দরকার । বললাম ।

পানীয়ের গ্লাস নিলাম নাকের সামনে । মিষ্টি ঘ্রান ।  একদম অচেনা ।  চুমুক দিলাম ।

 গলা জুড়িয়ে গেল ।

আহা ।

এতদিন কী সব   ছাই ছক্কড় খেয়েছি ।

'অফিসিয়ার ফ্যাংন  বা গেট  টুগেদার করা যাবে আপনাদের এখানে ?'

'না স্যার ।' দুঃখিত ভঙ্গীতে মাথা নাড়ল বুড়ো । ' আমাদের লোকবল কম । স্টাফ  নেই । বড় ধরণের ঝক্কি নিতে পারব না আমরা । তাছাড়া লোক গেদারিং হলে রেগুলার খদ্দের আসতে চাইবে না ।  অনেকেই চায় না লোকজন দেখুক সে ড্রিঙ্ক করে । ব্ল্যাকমেইল হবার ভয় করে অনেকে ।'

' বুঝলাম ।' যুক্তি আছে বুড়োর কথায় । ' আপনাকে হায়ার করা যাবে কোন পার্টির জন্য ?'

'না স্যার বাইরে কাজ করা  অ্যালাউ না ।' আবারও দুঃখিত ভঙ্গীতে মাথা নাড়ল সে ।

'মালিক জানবে কেমন করে ?' বিরক্ত না অবাক হলাম ।

'উনারা একজন হলে চলত । উনারা অনেক । ধরা পড়ে যাব । শেষ বয়সে চাকরি চলে গেলে বিপদে পড়ব ।'

'আপনার চাকরি অভাব হবে বলে তো মনে হয় না ?' আরও বেশি অবাক হলাম ।

' সবারই সেফ জোন আছে ।   নিজের এলাকা  , গণ্ডী থেকে বের হলে সমস্যায় পড়ে যায় । '

বুঝলাম লাভ  নেই । বুড়ো ভজবে না ।

'রেসিপি লিখে দেবেন ?' বেহায়ার মত হাসলাম ।

'না । আমার আবিস্কার । আর লিখে দিলেও পারবেন না । মাপের উনিশ কুড়ি হলে স্বাদ নষ্ট হয়ে যাবে । ভাঁওতা না সত্যি । দেখুন না রাস্তার মোড়ে ছয়টা বিরিয়ানির দোকান আছে । লালবাগ বিরিয়ানি সারাদিন মাছি মারে ।  সাহেব  বিরিয়ানি মোটামুটি চলে । আর নূর বিরিয়ানি দোকানে আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে সিট পাবেন । টেবিল ময়লা । পাশে হাড় পড়ে আছে । তারপরও লোকের ভিড় কম হয় না। চৈত্র মাসের ভরা গরমেও ওদের দোকানের একটা সিট খালি যায়  না । এটাই হাত যশ । কাল্লু বাবুর্চির সাগরেদ কয়েক ডজন আছে । কেউ ওস্তাদের মত নাম করতে পারেনি ।'

বুড়োর যুক্তি মেনে নিলাম ।

সত্য ।

উকিল পাড়ার মোড়ে রুপাই ঘোষের সিঙ্গারা মারাত্নক ফেমাস । বুড়ো মরার পর  বুড়োর ছেলে সেই সিঙ্গারা বিক্রি করে বকাঝকা শুনেছে খদ্দেরের ।

যাই হোক গ্লাসে মন দিলাম ।

কী   দিয়ে বানিয়েছে ? অপূর্ব জিনিস ।  স্নায়ুর সব ক্লান্তি গলে গলে যাচ্ছে। ঘাম হয়ে বেড়িয়ে যাবে ।

বাইরে  বৃষ্টি ।

কামরার ভেতরে শীততাপ নিয়ন্ত্রন করা ।  সম্ভবত শব্দও ।   বৃষ্টির মাতাল করা  রিমিঝিমি  শব্দ শুনতে পাচ্ছি না।  জানালায় সেঁটে গেছে বৃষ্টির ফোঁটা । কাচ হয়ে গেছে ঘোলা । গাড়ির টেল লাইটের আলো কেমন মোম রঙা হয়ে দেখা যাচ্ছে । মনে হয় ক্রেয়ন পেন্সিলে আঁকা বিমূর্ত কোন ছবি ।

ভাবতে অবাক লাগে এই শহরের এক কোণে অমন একটা বার আছে কিন্তু  তত বেশি লোক   জানে না। কোন প্রচার নেই । তেমন ভিড় দেখিনি ।

অথচ শহরে সুরা প্রিয় ধনী মানুষের অভাব নেই ।

কেন অমন ?

আমি পান করতে থাকি গ্লাস থেকে । লোকটা জাদুকর । জিনিস বানিয়েছে । ইস ।

চারিদিকে চেয়ে অন্য খদ্দের দেখলাম চুপি চুপি ।

বারে আলো কম রাখা হয় ।

কারও চেহারাই পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না। তারপরও মনে হল গতবার এদের কয়েকজনকে দেখেছি ।

'কিছু  কাস্টমার বোধ হয় রেগুলার আসে ?'   জানতে চাইলাম ।

'বেশির ভাগই নিয়মিত । একবার কেউ আসলে  সে রেগুলার হয়ে যায় ।'

তখনও কিন্তু বেখাপ্পা কিছু চোখে পড়েনি আমার । চোখ কান খোলা রাখলে  আভাস পেতাম । যেমন - যতবার আমি গেছি আমার ভেতরে থাকা  অবস্থায় কোন নতুন খদ্দের ভেতরে প্রবেশ করেনি বা বাইরে চলে যায়নি । একটা খদ্দেরও টয়লেট  ব্যবহার  করেনি একবারের জন্য ।

আমি চালাক না।

বৃষ্টি কমছে না দেখে আরেকটা পানীয়ের অর্ডার দিলাম । বিল আসলো । একশো চল্লিশ টাকা !

কী   ভাবে সম্ভব  !

গত বারের মত বাইরে বের হতেই মাথাটা কেমন শূন্য শূন্য লাগলো । কণকণে কেমন একটা শীতল বাতাস  বয়ে গেল ।

বাদলার দিন , তাই । হালকা শীত শীত লাগল ।

একটাও রিক্সা নেই ।

কী   মনে করে হাঁটতে লাগলাম ।  পকেটের মোবাইল আর টাকার কী   দশা হবে সেটা ভাবছি না।

এটাই অ্যালকোহলের মাজেজা ।

 সাঁই সাঁই  বাতাস । বিচিত্র সব অনুভূতি হচ্ছে ।

মনে হচ্ছে এই পথে এই শহরের রাস্তায় যেন হাজার হাজার বছর ধরে হেঁটে গেছি ।  তখন অবশ্য এমন ছিল না। রাস্তার উল্টা দিকের হোমিওপ্যাথিকের দোকানটা ওখানে অনেক বছর আগে এমন বৃষ্টির দিনে একটা  গয়াল  দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে  ভিজছিল ।

অনেক বছর আগে । সেইদিন ছিল এমন ভেজা হাওয়া ।

আর ফুটপাথের পাশে ছিল একটা শাখা নদী ।  শীতলক্ষ্যার শাখা । ওখানে নৌকায় ডাকাতি হয়েছিল ।  স্বামী স্ত্রী ফিরছিল  নৌকায় ।  ডাকাতেরা  গয়না টাকা  লুটে  ওদের দুইজনকে মেরে ফেলে দিয়েছিল এই খানে । বৃষ্টির ফোঁটায় রক্ত বলকে বলকে উঠছে । শিরশির করে উঠলো ।

মাদক ।

 ব্যাটা কোন রকম মাদক দিয়েছে নাকি ?  বাথসল্ট যে মাদকতা নতুন এসেছে ? ব্যবহার করলে নাকি অমন আকাশ কুসুম কল্পনা চোখের সামনেই বাস্তব দেখে ।

রাস্তায় বৃষ্টির ফোঁটা পরে সেটা ভেঙ্গে ভেঙ্গে যাচ্ছে । ফোঁটার মধ্যে ছায়া ছায়া কিসের যেন ছবি দেখা যাচ্ছে ।  অনেক বছর আগে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার ভিডিও হয়ে আছে যেন ঐসব বৃষ্টির ফোঁটায় । সম্পূর্ণ দেখতে পাচ্ছি না। কারণ ফোঁটাগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে ।  

রিক্সা দরকার ।

হাত তুললাম ।

বাড়ি ফিরতে হবে ।

ঘুম ভাঙ্গল সকালে ।

আরমিন বসে  টিভি দেখছে । হাতে সালাদের বাউল ।

আমি জানি আরমিন সালাদ পছন্দ করে না।

গায়ে আমার রাতের ঘুমের পোশাক । গত কালের  'কিস্যু' মনে নেই ।

আমার জায়গায় অন্য যে কেউ হলে সাবধান হয়ে যেত ।

কাল রাত এমন  নিটোল বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি ফিরলাম কিন্তু মোবাইল বা টাকা কিছু হয়নি ।

  সম্ভব ?

আজ সকালে খটখটে রোদ । কাল রাতের বৃষ্টির কোন চিহ্ন নেই । আর  সব যে অল্প অল্প করে বদলে গেছে সেটা কেন ধরতে পারছি না ?

এতক্ষণ যে কথা বললাম সেটার মধ্যে কি বেখাপ্পা কিছু  পাননি আপনি ?

ওকে,  যেমন আমাদের দুইজনের   একটা  যুগল ছবিতে একটা কুকুর  দেখা যাচ্ছে । ভাল কথা । কুকুরটার নাম - ইয়েতি । আরমিন বলল ।

আমার কুকুর  পোষার বাতিক নেই । ছিল না কখনও ।  কিন্তু  আরমিন বলতো , আমরা ইয়েতিকে পালতাম ।

বছর খানেক আগে মারা গেছে ।

যে বাড়ির ছবি সেটা কোথায় ? কেমন পুরানো ধাঁচের বাড়ি । বাইরে কামরাঙা গাছ । লাল রঙ করা মেঝে ।

মগজে কোন স্মৃতি নেই আমার । কি ভাবে ?

ফুলকপির আচার । সেটা কবে থেকে আমাদের বাসায় ? ফুলকপির ঘ্রাণ তেমন পছন্দ হয় না আমার ।

কিন্তু এখন খাওয়া হচ্ছে ।

ঐসব ব্যাপার নিয়ে আরমিনকে কিছু জিজ্ঞেস করলে কেমন করে তাকায় আমার দিকে ।

আমার মনে হচ্ছে  ক্যালাইডোস্কোপ    বারের সেই পানীয় কোন রকম সমস্যা করছে । হয়তো নিয়মিত পান করলে আমার মাথার কোন গড় বড় হবে ।

বিকেলে কাজ শেষ করে সোজা যাই ওখানে । খালি পেটে অ্যালকোহল বাজে এফেক্ট করে । কে না জানে ?

ঠিক করলাম বন্ধ করে দেব ওখানে যাওয়া ।

কিন্তু সারাক্ষণ মুখে সেই পানীয়ের স্বাদ  মিশে থাকে । আর বাড়ি ফেরাটা কেমন যেন লাগে ।

আর এর মধ্যেই সব হিসাব নিকাশ শেষ হয়ে গেল ।

সুলতানের সাথে দেখা হল । অফিসেই এসেছিল । পাশ দিয়েই যাচ্ছিল । দেখা করে গেল ।

' কি রে দোস্ত এক সপ্তাহ ধরে মেসে যাচ্ছিস না যে ।' এসির তলায় আরাম করে বসে বলল সুলতান । ' গত পরশু ফোন দিয়েছিলাম তোকে । বিকেলের দিকে ফোন বন্ধ রাখিস না কি ?'

মনে পড়লো ।  ক্যালাইডোস্কোপ     বারে ফোন নিয়ে দেখেছিলাম । নেটওয়ার্ক   কাজ করে না ওখানে ।

বারটার কথা খুলে বললাম ।

' বলিস  কি রে ?' আকাশ থেকে পড়লো সুলতান । ' নিতাইগঞ্জে বার ? আমি চিনি না ? কবে খুলল ?'

'অনেক পুরানো নাকি ? ইংরেজদের আমলের ।'

'হতেই পারে না । নারায়ণগঞ্জ ক্লাব ছাড়া লিগ্যাল ভাবে ঐসব গেলা যায় না কোথাও । মেথরপট্টিতে  পাওয়া যায় । সেটা তো দেশি । বাজে জিনিস ।   বন্দর আর চৌধুরীগঞ্জে বিদেশী বোতল পাওয়া যায় । কিন্তু লিঙ্ক ছাড়া কেনা যায় না । পুলিশই এই ব্যবসাটা চালায় । আর তুই বারে বসে গিলে এসেছিস ? চাপা মারছিস না তো ?'

' চল তোকে আজ নিয়েই যাই ।' জানতাম সুলতান অমন করবে ।  অবাক হলাম না।

'খরচ কিন্তু দোস্ত তোর ?' হাসল সুলতান ।

'কুছ পরোয়া নাই ।' হাসলাম ।   ' ফিস শেষে ফোন দেব । বাইরের চায়ের দোকানে বসিস।'

বিকেলে  দুই বন্ধু মিলে হাঁটতে লাগলাম ।

নিতাইগঞ্জের সেই জায়গায় আসতেই সুলতান অবাক হয়ে  জানতে চাইলো , ' কী   রে কোথায় তোর  বার ?'

বেকুব হয়ে গেলাম ।

পথের শেষ মাথা ।

  অন্নপূর্ণা  চালের আড়ত  ,  হোটেল  আবু বককর দুটোই আছে ।

নেই শুধু একতলা বাড়িটা । যেটার বাইরে  নিয়ন সাইন জ্বলতো গোলাপি রঙ্গের ।

নেই।

 ক্যালাইডোস্কোপ    বারের বাইরে খানিক দূরে ছাতিম গাছের তলায় একটা মুচি বসে । নিবিষ্ট মনে জুতা সেলাই করে । সেই লোকটা আছে আজও । বাদামী চামড়া কেটে জুতার মাপ দিচ্ছে ।  খানিক দূরের অন্ধ ভিখিরি আজও বসা। সব আগের মত ।

 

 নেই শুধু  ক্যালাইডোস্কোপ   বার ।

 

 খানিক বিরক্ত  সুলতান ।

আবিস্কার করলাম গলার ভেতরটা শুকিয়ে গেছে । হাতের তালু ঘামছে বিনবিন করে।

'এখানেই ছিল ।' কোন মতে বললাম ।

'কী   ?'

' বারটা ।'

'জীবনেও না।' হিসহিস করে উঠলো ওর গলা । 'গত  সপ্তাহে নিতাইগঞ্জের ডালপট্টি থেকে ফেরার সময় এই জায়গা দিয়ে গেছি । এই জায়গায় কোন বার তো দূরের কথা  চায়ের টঙও ছিল না। ফাজলামোটা না করলেও পারতি ।'  

সন্ধ্যা হতে অনেক দেরি ।  সূর্য পশ্চিম আকাশে ।

সব কিছুর ছায়া লম্বা লম্বা । দিনের আলো অ্যাম্বার রঙ্গের । বিভ্রম জাগায় মনে। চোখে ।

মুচিওওয়ালার দিকে হেঁটে গেলাম । বারে ঢোকার আগে ওর কাছ থেকে জুতা পালিশ করিয়েছিলাম একবার স্পষ্ট মনে আছে ।  ভাঙটি টাকা ছিল না বলে  পাঁচ টাকা ফেরত দিতে পারেনি । বদলে বেশি করে ক্রিম মাখিয়ে আরও বেশীক্ষণ পালিশ করে দিয়েছিল ।

আমাকে দেখে ফিরে তাকাল । চেহারা চোখ দেখেই বুঝলাম চিনেছে আমাকে।

' চিনতে পেরেছেন ?' জিজ্ঞেস করলাম ।

' হ স্যার ।'

' কতদিন ধরে এখানে বস ?'

'কুড়ি বচ্ছর । কোন সমস্যা স্যার ?'

বেচারার চোখে ভয় ।

আজকাল মানুষ চেনা যায় না। কে কোন বিপদে ফেলে ।

'ঐ দিকে খালি জায়গা । শুধু ঘাস হয়ে আছে । ওখানে কোন দোকান বা দালান ছিল ?'

'না স্যার । আমি যখন থেইক্কা বই তখন থেইক্কা অমনই দেখতাছি । হের আগে কী   আছিল কইতে পারি না ।'

'গত পরশু তোমার কাছ থেকে জুতা পালিশ করিয়ে আমি কী   করেছিলাম ?'

' হাইট্যাঁ   গেলেন না ।'

'যে দিন বৃষ্টি হল সেইদিন ?'

'বৃষ্টি কবে অইল ?'

শরীর খারাপ লাগছে । মাথার ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলা । শরীর টলে উঠলো যেন । টের পেলাম সুলতান ধরে ফেলেছে আমাকে।

সামনে খানিক দূরে চায়ের দোকান । বড় একটা পাকুড় গাছের তলায় । গিয়ে বসলাম ।

'তুই ঠিক আছিস ?' গলায় কোন রাগ ক্ষোভ নেই সুলতানের । নরম । চিন্তিত ।

প্রচুর চিনি দেয়া এক  পেয়ালা করে চায়েস নিলাম । এটা চা না ।  চিনি, দুধ , তেজপাতা এলাচি দিয়ে এত ঘন জ্বাল দিয়েছে যে  চা এবং পায়েসের মিক্স একটা জিনিস হয়ে গেছে ।

কথা না বলে চুপচাপ চা খেলাম দুই বন্ধু।

ব্লু বেরি ফলের মত নীল সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এলাম ।

অনেক সময় নিয়ে একা বসে রইলাম । পাশে বকবক করলো আরমিন ।  ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমাতে গেলাম সেই রাতে ।

পরের দুইদিন অফিস থেকে সিক লিভ নিয়ে বাসায় রইলাম ।

দুইদিন পর আপিসে  গেলাম ।

শুরু করলাম আগের মত জীবন ।

আগের মত জীবন ?

তা হয় কি করে ?

কত রকম   ভাঁজে  ভাঁজে  জীবনের জ্যামিতি পাল্টে গেছে সেটা কি আর আমি জানি না ?

গোপন কোন মাদকের কারনে অমন  হয়েছে । প্রথমে ভেবেছিলাম ।  অফিস শেষ করে আবার গেলাম নিতাইগঞ্জের সেই জায়গায় । সব আছে । মুচি , ভাতের দোকান ।  মাইক  সাউনড বক্স ভাড়া দেয়ার দোকান । সব।

 ক্যালাইডোস্কোপ    বারটা নেই ।

অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম একা একা ।  

আরেকদিন গেলাম ।

সেই মুচি কেমন ভয়ার্ত চোখে  তাকায় আমার দিকে ।

ভয়   পায়   ।

নিশ্চয়ই পাগল  টাগল হবে - ভাবে হয়তো । তাছাড়া আর কি ?

মাত্র দুইদিনের অমন বিচ্ছিরি অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছে সব কিছুর প্যাটার্ন । এই যে জীবনটা আমি কাটাচ্ছি একদম অচেনা মানুষ । অর্ধেক চিনি । বাকি অর্ধেক অচেনা । এই আরমিনকে ভালবেসে বিয়ে করেছিলাম ?

এত অচেনা ?

বারান্দায় রাখা নীল গোলাপের টব দেখে ভাবি আমার আবার ফুলের শখ ছিল কবে থেকে ?

হিপহপ  গানের অ্যালবাম আমি কিনেছি ? কবে ?

একদিন সিটি কাউন্সিলে গেলাম । মেয়রের অফিস ।  চ্যাংরা এক ছোকরা কাজ করছে । দুইশত টাকা ঘুষ দেয়ার পর আধা ঘণ্টা কাগজ পত্র ঘেঁটে বলল , ' না ভাই । ঐ জায়গায় আগে কোন বাড়িঘর ছিল না । এক হিন্দু বাবুর পতিত জায়গা । উনারা  কিনেছিল ।  দেশ ভাগের পর উনারা চলে গেছেন । পরে অনেক বার হাত বদল হয়েছে ।   হারমোনিয়ামের দোকান ছিল একটা ।  বিয়ের   বাড়িতে  ঢোল সানাই বাজায় অমন একটা দলের অফিস ছিল ।  চালা ঘর তুলে ভিখিরি থেকেছে ।  ট্রাক  ড্রাইভাররা হোগলা বিছিয়ে আড্ডা দিত । কিন্তু বাড়ি ঘর  পাকা হয়নি । দোকানও না । খালি পরে আছে আজ দশ বছরের উপর ।'

' শীতলক্ষ্যার শাখা নদী...?'

'হ্যাঁ,  ওটা বাবুরাইল পর্যন্ত গিয়েছিল । মজে গেছে । তবে মেয়র আবার সেটা খোঁদাই করে চালু করবেন । বন্যা কম হবে । আপনারা যদি সুরভী আপাকে ভোট দিতেন তবে...'

কায়দা করে ছোকরা রাজনীতির আলাপ শুরু করলো । সম্ভবত মেয়র সুরভী আপাই ওকে চাকরি দিয়েছে ।

কেমন যেন অনুভূতি হয় আজকাল ।

কাজে  যাইনা তেমন ।

ভুল করে ফেলেছি । সুলতানকে যদি না নিয়ে যেতাম সেই বারে তবে আজও সেটা খোলা থাকতো । আমিও গ্লাসের পর গ্লাস সেই অচেনা পানীয় গিলতে পারতাম । মাতাল হয়ে অপার্থিব জিনিস দেখতে দেখতে বাড়ি ফিরতাম । মনে আছে না , ওয়াসিম অনন্ত বলেছিল - 'একা আসলে ডিসকাউনট পাবেন । একবার যে আসে সে রেগুলার হয়ে যায় ।'

কি সব ইঙ্গিত দিয়েছিল সে আমাকে ।

ওর নাম কি ? ওয়াসিম অনন্ত ?

নাহ । ওটা হবে অসীম অনন্ত ।  ওদের আসলেও কোন সীমা নেই । সীমাহীন জগত থেকে এসেছে ওরা ।  আকার নেই । ছক নেই ।   সব পারে ।

কী   একটা মনে পড়লো ।

যেই সব খদ্দের বসে থাকতো । সবাই এক । পিলে চমকে গেল । মাত্র এক জোড়া নরনারী । মোট পাঁচ ছয় জায়গায় বসে ছিল । কিন্তু এক জোড়া । যেন ফটোকপি করে বসিয়ে রেখেছে ।

 টয়লেটের উপরে কি লেখা ছিল ?    ƚɘlioT

উল্টা ।

কোথায় যেন পড়েছিলাম প্যারালা জগতের জিনিস সব উল্টা দেখা যাবে । মিরর ইমেজ ।  সেইজন্য ওদের কাছে কোন ছাপা মেনু নেই । রিসিট দেয় না কাউকে ?

নাকি ভিন্ন মাত্রার মানুষ ওরা । শিখে গেছে কি ভাবে মাত্রা ভাংতে হয় । আমার মত দুইচারজন ঢুকে পড়ে ওদের জগতে । ভুলে । বেশি লোক নিতে চায় না ওরা ওদের জগতে ।

মনে আছে বাথরুমে গিয়ে আয়না ভর্তি দেখেছিলাম । সব ছায়া কি আমার ? আবার নড়াচড়া হুবহু আমার মত ছিল না । বাজি ধরে বলতে পারি ।  

সবার  একই ব্যাপার ঘটে লিফটে উঠলে । তখন প্রায় ভিন্ন জগতে চলে যাই আমরা । বুঝতে পারি না ।

আমরা তিন মাত্রার জগতে বসে সেইসব জগত নিয়ে  সারজীবন ধরে  কল্পনা করে বের করতে পারব না কিছুই । ক্যালাইডোস্কোপের মত ।

 প্রতিবিম্বের ওপারে প্রতিবিম্ব। দিগন্তহীন। সীমানাহীন অথচ সংক্ষিপ্ত এক জগৎ। একই বস্ত'র প্যাটার্ন ঘুরে ফিরে গঠন করবে আকর্ষণীয় জ্যামিতিক ত্রিমাত্রিক ফ্র্যাক্টাল চিত্র।

সেইজন্যই অসীম অনন্ত আমাকে বালি কণা আর বৃষ্টির ফোঁটার কথা বলেছিল কায়দা করে ?

আমি সারাদিন বসে বসে ভাবি ।

ওটা করতেই ভাল লাগে ।

তাছাড়া কাজ করে টাকা কামিয়ে হবেটা কী   । আমি জানি এইসব ক্ষণস্থায়ী । কোটি কোটি বছর আগে মহাজগৎ তৈরি হয়েছে , এবং আরও লক্ষ বছর পরে ধ্বংস হবে ডাহা মিথ্যা কথা ।

এই সব হয়তো হয়েছে মাত্র কয়েক পল  আগে । এবং যে কোন সময় বুদ্বুদের মত মিলিয়ে যাবে ।

প্রতি মুহূর্তেই এমন হচ্ছে ।

যে কোন সময় দেখব চোখের সামনে দিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে সব কিছু । আকাশ থেকে চুমকির মত তারা খসে যাবে । ডাস্টার দিয়ে বোর্ড মোছার মত সব মুছে যাবে ।

অথবা সময় থমকে যাবে । কিছুই আর হবে না। ঘটবে না।

মিছামিছি কেন  দৌড় দেব ।

আমি বা আমরা ধ্বংস হয়ে গেলেও অন্য মাত্রার আমরা ঠিকই থাকব । ওখানে সব চলতে থাকবে । আরও অনেক আমি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়  জীবন যাপন করে যাবে ।

আরমিন চলে গেছে ।

আমি সারাদিন  বাসায় থাকি ।

আমার চিকিৎসা করা হচ্ছে ।  মানসিক  সেনেটেরিয়ামে যাই  । চলে আসি ।    

সারদিন বসে বসে ভাবি ।  হোটেল থেকে  তিনবেলা খাবার দেয় । খাই । ঘুমাই ।

আরও কয়েকজন আছে আমার মত ।

 যে কোন শহরেই পাবেন অমন একটা ক্যাফে বা বার । দেখলে চিনতে পারবেন না ।  একা যাবেন  না  । কাউকে  সাথে নিয়ে যাবেন । একা গেলেই  শেষ ।

আমি মাথা ঘামাই না।

 

জ্যাক ফিনের 'অফ মিসিং পারসনস'-এর ছায়া অবলম্বনে

(শেষ)


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...