স্বপ্নের খামার ১
শীত চলে গেছে।
তারপরও পথের দুই ধারে বরফের সরু আইল। যত্ন করে যেন কেউ ফেলে রেখেছে ময়দার স্তূপ। পথের দুই পাশে বড় বড় পাইন গাছ। শীতের শেষে ওরা আড়মোড়া ভেঙ্গে চারিদিকের চেয়ে দেখছে। রোদ কেমন ? সামনের দিনগুলো কেমন যাবে !
টুকটুক শব্দ করে দুই ঘোড়ার ওয়াগনটা চলছে। কোচম্যান বিজাতি। সুইটযারল্যান্ডের। বুড়ো। এই শেষ বয়সে ভাগ্য বদলানোর জন্য এসেছে পশ্চিমে। আগে নাকি প্রসপ্যাক্টর ছিল। দিনরাত ঝর্ণার পাশে তাবু খাটিয়ে থাকতো। ঝর্ণার কাঁদা জল আর নুড়ি কুড়িয়ে চালুনি দিয়ে ছেঁকে সপ্তাহে মটর দানার সমান একটা সোনার টুকরা পেত। কখন পেত না।
খাটুনি বেশি। পোষাতে না পেরে ছেড়ে দিয়ে ওয়াগন চালান শুরু করেছে।
চলতি পথে সারাক্ষণ কথা বলেছে লোকটা। তবে বাচাল নয়। নিজের দায়িত্বে সবাইকে পরামর্শ দিচ্ছে। পশ্চিমে টিকে থাকতে হলে এই সব গুণ থাকা নাকি দরকার।
আকাশের রঙ নতুন কেনা জিনসের প্যান্টের মত ঘন নীল। ঝকঝক করছে ।
মেঘ নেই।
শীতের করাল আক্রমণে তেপান্তরের বিজন ঘাস সব মরে গেছে। হলুদ শেকড় রয়ে গেছে খড়ের মত।
তবে বেশি সময় লাগবে না। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে তরতর করে বেড়ে উঠবে। মায়াবী এক ঘাসের বন হয়ে যাবে এই রুক্ষ প্রান্তর।
মুগ্ধ হয়ে আগামী দিনের কথা ভাবছিলাম।
কেমন হবে সামনের দিনগুলো ?
যেই শান্তি আর নির্জনতার খোঁজে এসেছি সেটা পাব ? কেমন হবে আমার স্বপ্নের খামার ?
খোঁজ নিয়ে জেনেছি এই এলাকায় অ্যাপাচি বা রেড ইনডিয়ানদের ভয় নেই।
আগের স্টেশনে একজন একজন করে সব যাত্রী নেমে গেছে। আমিই শেষ যাত্রী। সেইজন্য কোচম্যান তাড়া দিচ্ছে ঘোড়াদুটোকে । মুখ দিয়ে বিচিত্র হুশ হাস শব্দ করে উৎসাহ দিচ্ছে লম্বা পথ দৌড়ে আসা স্প্যানিশ কালো দুই ঘোড়াকে।
ওরা মনে হয় মালিকের অনুগত। কথা শুনছে বেশ। খুঁড়ের ঘায়ে লালচে ধূলা উড়ছে।
'আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি।' ফ্যাস ফ্যাসে গলায় জানালো বুড়ো কোচম্যান । ' খানিক নিচেই আপনার সেই শহর। অমন মড়া ধরা শহর বেছে নিলেন কেন ? সিনরের বয়স কম। একটা টাটকা শহর বেছে নইলে ভাল হত না ? জমজমাট একটা জীবন শুরু করতে পারতেন ? পরিচিত কেউ আছে নাকি এখানে ?'
'না।' জবাব দিলাম। জানতাম প্রসঙ্গ আসবেই। ' ম্যাপে অলস নজর বুলিয়ে শহরটার খোঁজ পেয়েছি। মনে হল খুব নির্জন আর শুনসান জায়গা হবে। আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ। তাই বেছে নিলাম।'
'হ্যাঁ। আপনি যদি নিরিবিলি জায়গা চান তবে ঠিকই আছে।' মাথা ঝাঁকিয়ে উৎসাহ দিল বুড়ো।
রাশ টেনে ধরেই ঘোড়া দুটো চলার গতি কমিয়ে দিয়ে একদম থেমে গেল এক সময়।
'এসে গেছি সিনর। এখান থেকে নেমে মিনিট খানিক হাঁটতে হবে আপনাকে।'
'অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।' লাফ দিয়ে নামলাম ওয়াগন থেকে। পিছনে শুয়ে আছে বাদামী ক্যানভাসের পেল্লাই একটা ব্যাগ। তুলে নিয়ে নিলাম। ওটার মধ্যেই আমার দরকারি সব কিছু।
ব্যাগ হাতড়ে বের করে আনলাম সিক্সসুটারটা। ভয় পেয়ে গেল বুড়ো।
ওর চোখে আতংক। হয়তো ভাবছে নির্জনে খুন করে ওর ওয়াগনটা হাপিস করে ফেলব।
'অনেক বছর জিনিসটা আমার কাছেই ছিল।' আতঙ্কিত বুড়োর দিকে চেয়ে বললাম । ' মনে হয় না আর কাজে দেবে। তুমি উপহার হিসাবে এটা নিলে খুশিই হব।'
'দামি আর দুর্লভ জিনিস।' ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল বুড়ো।
' আমার কাছে না। চার বছর এটা সাথে ছিল। কিন্তু আমার ভাগ্য খারাপ। পিস্তল হাতে থাকলেই ঝামেলায় জড়িয়ে যাই। ঝামেলা আমার নিয়তি। আর চাই না। মনে হয় পিস্তল বা বন্দুক না থাকলেই ঝামেলা দূরে থাকবে।'
' অস্ত্র ছাড়া , এই পশ্চিমে ?' পাকা দাড়ি দিয়ে গিজগিজ করা গাল চুলকে হতভম্ব গলায় বলল বুড়ো।
'আমার মনে হয় বন্দুকবাজ হিসাবে জীবন পাড় করার জন্য জন্ম হইনি আমি। ভুল জিনিস বেছে নিয়েছি। অন্য কোন বন্দুকবাজের হাতে মরতে চাই না। '
বুড়োর পাশের বসার গদিতে যত্ন করে রাখলাম সিক্সসুটারটা।
'মাই ফ্রেন্ড ।' হাসি মুখে পিঠ চাপড়ে দিল বুড়ো । ' ওটা না থাকলেই তুমি আরও জলদি মারা যাবে। পরের বার এই শহরে এসে তোমাকে না পেলে খারাপই লাগবে। ভাবা যায়, মন্টানা শহরে তুমি এক মাত্র লোক যার কাছে কি না পিস্তল নেই ? নিজেকে রক্ষা করবে কিভাবে ? '
'সমস্যা সমাধানের উপায় থাকে সব সময়।' হাসি মুখে সিক্সশুটারটা ওর সামনে ঠেলে দিলাম। ' জিনিসটা নাও। খুশি হব। প্রাথনা কর, যেন ঝামেলা না আসে আমার জীবনে।'
'ঠিক আছে।' দোন মনো করে খানিক ভেবে জবাব দিল বুড়ো। ' কিন্তু শর্ত আছে। আমার কাছ থেকেও একটা জিনিস নিতে হবে উপহার হিসাবে।'
পকেট হাততে কি একটা বের করে আনলো , ' জিনিসটা আমি নিজেই বানিয়েছি। কামারের কাজ জানতাম। আমার বাপও চাকু বানাত সুইটযারল্যান্ডে। খনিতে কাজ করার সময় নিজের সুবিধের জন্য এটা বানিয়েছি। বাজারে পাবে না। তবে ইচ্ছা আছে, জিনিসটা বাজারে ছাড়ব। দেখ জিনিসটা। ক্যাম্প নাইফ বলতে পারো। দুটো ফলা আছে। দুই সাইজের। কর্ক খোলার স্ক্রু ফিট করেছি। সুন্দরী মেয়েদের সামনে
ওয়াইনের কর্ক খুলে দিলে খুশি হবে। আবার দেখ খাবারের টিন খোলার জন্য একটা চ্যাপ্টা কাটার আছে। ওটার ডগা দিয়ে আবার স্ক্রু খুলতে পারবে। খুব কাজের জিনিস। আফসোস আমার প্রতিভা কেউ বুঝল না।জিনিসটা নিলে আসলেই খুশি হব।'
খানিক চিন্তা করে হাত বাড়িয়ে নিলাম।
ওক কাঠের তৈরি শরীর। গায়ে আবার পিতলের নকশা করা ক্রুশ আঁকা।
' দারুণ জিনিস।' অকৃত্রিম প্রশংসা বেড়িয়ে এলো ভেতর থেকে ।
খুশিতে ছল ছল করে উঠলো বুড়োর চোখ। প্রশংসা কাতর লোক। কেউ হয়তো সারা জীবনে ওকে পাত্তা দেয়নি। যত টুকু পাবার দরকার ছিল জীবন ওকে দেয়নি।
আমার উদ্দেশ্যে মাথা ঝাঁকাল ।
শিস দিয়ে লাগাম ঝাঁকুনি দিতেই আবার টগবগ করে চলতে লাগলো ঘোড়াদুটো ।
সদ্য পাওয়া বিচিত্র ক্যাম্পিং নাইফটা ওভার কোটের পকেটে পুরে পা বাড়ালাম শহরের দিকে।
উপহার পেয়ে ভালই লাগছে।
শহরটা ছোট।
ওয়াগন চলার পথ থেকে উঠে আসার পরই শহরটা শুরু। ছোট ছোট দুই একটা নিঃসঙ্গ বাড়ি ঘর দিয়ে। মনে হচ্ছে কখনই জমজমাট ছিল না শহরটা । খনি বা অমন কিছুর লোভে মানুষ আসেনি এখানে। যারা এসেছে তারা হয়তো আমার মতই ঝামেলা এড়াতে বসতি গেড়েছে। শান্তি প্রিয় মানুষ জন।
শহরের শুরুতেই গোরস্থান।
অল্প কিছু কাঠের ক্রুশ দেখে মনে হল খুব বেশি মানুষ গুলি হজম করেনি। এটাও লক্ষণ ভাল।
এখানে ওখানে খাবলা খাবলা বরফ। মচ মচ শব্দ হচ্ছে আমার বুটের তলায় ।
মলিন লাল মাটির পথ। পাইনের জঙ্গল ঘন হয়েছে দুই পাশে। কাপড়ের ব্যাগটা পিঠে ফেলে হাঁটছি। বড় বড় চোখে দেখছি শহরটা।
কারো বাড়ির পোষা কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক।
বড় কাঠের একটা তক্তায় লোহা পুড়িয়ে শহরের নাম লেখা- নির্জনবাস।
অমন কাব্যিক নামের শহর আবার পশ্চিমে হয় নাকি ? মনে হল শহরটা যারা শুরু করেছিল তাদের কেউ হয়তো ইংল্যান্ড থেকে এসেছে । কেউ হয়তো শেক্সপীয়র পড়েছিল। শিক্ষিত লোকের এই একটা জিনিস ভাল। যেখানে যায় রুচির ছাপ রাখে। ঠিক করলাম, সময় পেলেই লেখাপড়া ধরব।
খামারটা যদি করতে পারি কিছু বই আনাব নিউ ইয়র্ক থেকে।
কোন পত্রিকার গ্রাহক হব।
দুই পাশের বাড়ি ঘরগুলো কাঠের। ছোট। সুন্দর। দুটো গ্যাসের ল্যাম্পপোস্ট। টমটম চালিয়ে চলে গেল একজন। কৌতূহলী চোখে জরিপ করলো না। ভাল লক্ষণ ।
একটা মায়াবী ধরনের পোস্ট আপিস। বাইরে গ্যাসের আলোর নিঃসঙ্গ ল্যাম্পপোস্ট । একদিন আমার চিঠি আসবে হয়তো এখানে ।
পোস্ট আপিসের মাত্র কয়েক ফুট দূরেই সেলুন। বাইরে সাইন বোর্ড-
' দুপুরের খাবার ফ্রি।'
নীচে আবার লেখা - শর্ত , ড্রিঙ্কের অর্ডার দিতে হবে।
সামনে পা বাড়িয়েছি তখনই দুইজন লোক চ্যাং দোলা করে রোগা একজনকে তুলে বাইরে ফেলে দিল ময়লা বালিশের মত ।
বাইরে মুখ থুবড়ে পড়লো লোকটা।
বাকি দুইজন খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে ফেলল।
একজন অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল , ' সামান্য ক্লাস দিলাম। পরের বার কফিনের বাক্সে ভরে গোরস্তানে রেখে আসব।'
নিজের রসিকতায় নিজেই আবার হেসে ফেলল গলা ছেড়ে। সঙ্গীও তাল দিল। হাসতে হাসতে বাদুর দরজা ঠেলে সেলুনের ভেতরে চলে গেল মারকুটে চেহারার দুই লোক।
হাত ধরে ভূমি শয্যায় থাকা কাহিল লোকটাকে তুলে দাঁড়া করালাম।
মাটিতে পরে থাকা টুপিটাও কুড়িয়ে নিলাম ওর জন্য । এখনও তেজ কমেনি বেচারার। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে থাবা মেরে টুপি কেড়ে হাঁটা ধরল উল্টা পথে।
ধন্যবাদ দেবে , আশা করিনি। পেলামও না।
সেলুনের বাইরের নোটিশ দেখে মন ভাল হয়ে গেল। খাবার দরকার। আরও একটা সাইনবোর্ডে লেখা - বিয়ার অ্যান্ড এল । ইস্ট আর মল্ট দিয়ে এল বানায়।
তবে নিউ ইয়র্কের মত এরা ঠাণ্ডা পরিবেশন করতে পারবে কি না সন্দেহ আছে।
বড় টিনের টুকরার মধ্যে লেখা - রেড ডগ সেলুন। রেড ডগ কথাটা লিখেছে লাল কালিতে। সেলুন শব্দটা লিখেছে সাদায়। সাইন বোর্ড শিল্পী তার প্রতিভা দেখানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় নি। ইয়া বড় একটা লাল রঙের কুকুর এঁকে দিয়েছে সাথে। লাল কুকুরটা জিভ বের করে আছে।
সব মিলিয়ে এক বিরাট আয়োজন।
বাদুর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।
যাত্রা পথে অমন সেলুন আগেও পেয়েছি। নতুন কিছু না। ছক বাঁধা। আহামরি নতুন কিছু নেই। তবে এটা সম্ভবত ভদ্রলোকদের জায়গা। ভেতরে লাল চুলের এক মেয়ে বসে পিয়ানো বাজাচ্ছে। হাতা কাটা চুমকির পোশাক গায়ে। বাজছে কিন্তু সুর তাল নেই। পিয়ানোর উপর সাজানোর মত কিছু না পেয়ে দানব সাইজের এক জোড়া বাইসনের শিং সাজিয়ে রেখেছে।
বাইরে বিকেলের আলো থাকলেও সেলুনের ভেতরে আধো অন্ধকার। দেয়ালে ত্রিভুজ কাচের শেডের ভেতরে প্যারাফিনের আলো জ্বলছে। ঝাড়বাতি আছে বেশ কিছু। ওখান থেকে শুকনো ঘাসের রঙের আলো নেমে এসেছে নরম হয়ে।
অভাবি কোন শিল্পীর কাছ থেকে সস্তায় কয়েকটা তেল রঙে আঁকা ছবি কিনে দেয়ালে বিচ্ছিন্ন ভাবে ঝুলিয়ে রেখেছে। জানালায় রঙ্গ জ্বলা ভারি পর্দা। বেশ কিছু খদ্দের আছে এখানে ওখানে ছড়িয়ে। এক টেবিলে মহানন্দে পোকার খেলছে মতলববাজ চেহারার কয়েকজন ।
টুপি খুলে মাথা নিচু করে পিয়ানোওয়ালা মেয়েটাকে বাউ করলাম। বদলে হাসি উপহার দিল সে।
বার কাউনটারের দিকে গেলাম।
'রেড ডগে স্বাগতম ।' এগিয়ে এলো বারম্যান। গায়ে হাতির দাঁতের রঙের সাদা জামা। ময়লা হয়ে গেছে সামান্য । রেশমি কাপড়ের ভেসট । উপরে এপ্রন। মাথার চুল পরিপাটি। গোঁফ পর্যন্ত চিরুনি দিয়ে আঁচরে রেখেছে। একদম ফুলবাবু।
'খাবার দরকার। খিদে পেয়েছে।' বললাম। ছোকড়াকে বেশ পেশাদার মনে হল।
' যে কোন ড্রিংক অর্ডার করলেই ফ্রি খাবার।' দুই হাত ছড়িয়ে বলল ছোকরা বারম্যান। ' পেট চুক্তি। যত ইচ্ছা খেতে পারবেন।'
কাউটারের এক পাশে সাজিয়ে রেখেছে বাদামী রঙের একটা আস্ত পাউরুটি, টিনের বাউল ভর্তি হলুদ মাখন। কাচের টোপা ভর্তি বাদামী চিনি। শূয়রের চামড়ার মত শক্ত বিস্কুট । আর এক পাত্র গরুর মাংস আর আলু দিয়ে রান্না করা পাতলা ঝোল ।
' সমস্যা ওখানেই।' হাসলাম । ' ড্রিঙ্ক করা ছেড়ে দিয়েছি। নতুন জীবন নতুন যাপন। আচ্ছা আমি বরং খাবারের দাম পরিশোধ করি। পানীয় হিসাবে আমাকে কড়া এক পেয়ালা কফি দিতে পারেন ? বেশি দুধ দিয়ে।'
কামরার সবাই ফিরে চাইলো আমার দিকে। যারা জুয়া খেলছিল তারাও খেলা বন্ধ করে চেয়ে আছে। যে মেয়েটা পিয়ানো বাজাচ্ছিল সে তার কাজে ইস্তফা দিয়ে ফিরে চেয়ে আমাকে দেখছে। মুখের কব্জা খুলে হা হয়ে গেছে।
'দুধের কফি ?' চেঁচিয়ে উঠলো রোগা পটকা একজন। পরে জেনেছি ওর নাম , মেলট বোজার । নাকটা টিয়া পাখির ঠোঁটের মত । মুখটা সরু । চেহারায় রাজ্যের বিতৃষ্ণা । যেন জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে। মেরুন রঙের নতুন জামা গায়ে। চিনতে পারলাম, এই লোক খানিক আগে তার সঙ্গীকে নিয়ে একজনকে বাইরে ফেলে দিয়েছিল।
' বাচ্চা কাচ্চাদের কেন যে বারের ভেতরে ঢুকতে দেয় কে জানে !' খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে ফেলল অন্য জন। এটার চেহারাও প্রায় আগের জনের মত। একই গোয়ালের গরু। আসলে দুই ভাই। পরে জেনেছি ওর নাম অয়েলট বোজার।
কথা শেষ করে অয়েলট জোরে চাপড় মেরে বসলো ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়েট্রেস মেয়েটার পিঠে । যেন আনন্দের সীমা নেই। মেয়েটা
তাল সামলাতে না পেরে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। হাত দিয়ে ধরে ফেললাম।
' ফের অমন করলে নাক ফাটিয়ে ফেলব।' ফুঁসে উঠলো মেয়েটা।
সবাই হেসে উঠলো। বোজার দুই ভাইয়ের গলা সবচেয়ে উঁচু ।
মেয়েটা ফিরল আমার দিকে। বেশ মিষ্টি। ওর নাম নাকি পেনি পার্কার। এ তো পেনি না পুরো ডলার।
মা বলতো মেয়েদের সম্মান দিবি। মাথার টুপি খুলে বাউ করলাম।
কি যে খুশি হল পেনি। ডালিম দানার মত দাঁত বের করে হাসল। ' ধন্যবাদ।'
ততক্ষণে হিসাব কষে বার ম্যান বলল, ' বিয়ার বা আরল না নিলে খাবার সহ কফির দাম পড়বে পনের সেন্ট। তবে শুধু কালো কফি । দুধের কৌটা চালান আসেনি গত সপ্তাহে। নগদ। কোন পাথর বা চামড়ার বেল্ট বা অমন জিনিস দিলে চলবে না।'
নতুন লোক পেলেই গলা কাটো নাকি ?' কে যেন বলে উঠলো।
ফিরে দেখি অভিজাত চেহারার একজন লোক নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এই দিকেই আসছে। সেলুনের মধ্যে সবচেয়ে দামি আর ভাল পোশাক গায়ে। সুন্দর কোট চাপিয়েছে। মাথায় হ্যাট নেই। সুন্দর চুল। চোখ দুটো বড় বড় । বুদ্ধি, চতুরতা, সংবেদন সব মিশে আছে। হাতের আঙুলে মোটা সিগার।
বারের সামনে এসে দাঁড়ালো সে , ' ড্রিঙ্ক নিলেও তো একই দাম রাখ। এই লোক তো বিয়ারের বদলে কফি নিচ্ছে। দাম সমান হয় কি করে। তাহলে ওকে কফিও বেশি করে দাও। অনেক দূরের পথ ধরে এসেছে। অমন ব্যবহার করলে আমাদের শহর নিয়ে প্রথমেই বাজে ধারনা তৈরি হবে ওর মনে।'
ঠিক আছে।' সায় দিল বারম্যান। কফিও পাবেন ইচ্ছা মত।'
' আমি জ্যাক ডালটন।' সামনে এসে হাত বাড়িয়ে দিল ভদ্রলোক। ' হরেক রকম ব্যবসায়ী।'
হাত মেলালাম । নতুন জায়গা। বন্ধু দরকার আমার।
' আমি পেনি।' বলল মেয়েটা। ' আপনার সাথে বসব টেবিলে ?'
' ওকে মারতে গেলে কেন ?' রাগে চিড়বিড় করে উঠল থরটন।
ঘোলা পারদ উঠে যাওয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের নিষ্ঠুর চেহারাটা মনোযোগ দিয়ে পরখ করছিল মাইকেল। সদ্য দাড়ি গোঁপ কামিয়েছে। চেহারাটা আরও বেশি পাণ্ডুর দেখাচ্ছে।
মুখ না ঘুরিয়ে আয়নার ভেতর থেকেই থরটনের দিকে চেয়ে বলল , ' দরকার ছিল। ওটা একটা নমুনা দেখালাম । আশা করছি এশিয়ান হারামজাদাটা ভেগে যাবে। কোন ট্যাঁ ফো করবে না।'
বড় করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলল থরটন । হতাশ সুরে বলল , ' আগেই বলেছি খুন খারাবি চাই না আমি।'
' তাহলে আমাকে ডেকেছেন কেন ? নাচ দেখানর জন্য ?' ঘুরে লঘু চালে থরটনের সামনে চলে এলো মাইকেল।
পকেট হাতড়ে এক গাদা নোট আর তামার পয়সা ভর্তি চামড়ার একটা বটুয়া বের করে আনল থরটন , ' এই নাও তোমার মজুরি। যা বলেছিলাম তা তো আছেই। উল্টা বেশি টাকা দিয়েছি। যাও চলে যাও। আর কিছু করতে হবে না।'
'কিন্তু আমি তো আমার কাজ শেষ করিনি।' কেমন একটা মতলবি হাসি দেখা গেল মাইকেলের মুখে।
' তুমি আমার সাথে লেন দেন শেষ করেছ।' চাঁপা সুরে হিস হিস করলো থরটন । ' এই নাও তোমার মজুরি।'
কথা শেষ করেই মাইকেলের দিকে ছুড়ে মারল বটুয়াটা । শূন্যেই খপ করে সেটা ধরে ফেলল ভাড়াটে খুনি।
পকেটে পুরে জবাব দিল , ' আসলে জিনিসটা অত সহজ না। পশ্চিমে আমার একটা নাম আছে। সেটা প্রায় কিংবদন্তীর পর্যায়ে চলে গেছে। টাকা নিয়েছি কিন্তু কাজ শেষ করিনি অমনটা হতেই পারে না। লোকে শুনলে হাসবে। হয়তো অনেকে আর ভাড়া করতে চাইবে না। ভাববে টাকা নিয়ে কাজ করব না। আমার সুনামটাই একটা সম্পদ । সেটা নষ্ট করব কেন আমি ? '
'নিকুচি করি তোমার সুনাম। এই দিকে লাশ ফেলে আমার সুনাম নষ্ট করেছ তুমি।' হিমেল গলা থরটনের ।
নিঃশব্দে হোলস্টারের দিকে হাত বাড়াল মাইকেল। আধো অন্ধকারে মটকু টের ও পাবে না।
মাইকেলের সারা জীবনের বিস্ময় হয়ে থাকবে ব্যাপারটা। যদি হাজার বছর বাঁচে, মনে থাকবে।
সাদা চাদরের তলা থেকে র্যাটেল স্নেকের মত বের হয়ে এলো থরটনের হাত। বাঁটে হাতির দাঁতের কাজ করা দামি একটা পিস্তল মোটকুর হাতে। নলটা ওর বুকের দিকে চেয়ে আছে এক চোখা শয়তানের মত।
' ভুলেও অমন কিছু চিন্তা কর না।'
রেগে আছে , কিন্তু বুড়োর হাত কাঁপছে না। ব্যাপারটা দেখে গলা শুকিয়ে গেল মাইকেলের। জীবনের প্রথম ভয় পেল।
কিন্তু বাহাদুরি দেখানোর ভুলটা করলো না। দুই হাত সরিয়ে নিল হোলস্টারের কাছ থেকে। বেহায়ার মত হাসল , ' আরে না, না। তেমন কিছু করতে চাইছিলাম না।'
গায়ের চাদরটা ফেলে ঝট করে উঠে দাঁড়ালো থরটন ।
পিস্তলের নল সোজা মাইকেলের বুকের দিকে।
ওকে কাভার দিয়েই ঘুরে দাঁড়ালো । পিছন দিকে ফিরল না। মাইকেলের চোখে চোখ রেখে এক পা এক পা করে দরজার সামনে গেল। তারপর পিস্তল হোলস্টারে রেখে দরজা খুলে বেড়িয়ে এলো বাইরে।
গায়ের জোরে সেলুনের পাল্লা বন্ধ করে দিল।
দুই বোজার ভাই বাইরে বসে ছিল। মালিককে দেখে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
'সব শুনেছ নিশ্চয়ই।' প্রথমেই কাজের কথায় চলে গেল পিটার থরটন।
'হ্যাঁ, আপনি মন বদলেছেন।'
ঠিকই শুনেছ।' জ্যাকেটটা গায়ে চাপাতে চাপাতে বলল ধনী খামার মালিক।
'কিন্তু কেন বস ?' অবাক মেলট বোজার। ' ওই এশিয়ান আগন্তুককে পাঁচ মিনিটেই ফেলে দিতে পারবে আমাদের মাইকেল।'
'না।' খেঁকিয়ে উঠল থরটন । ' আমি এই নিয়মে খেলি না। ভয় দেখাই। কিন্তু রক্তপাত না। আমার মনে হয় আমি সারাআ জীবন বাড়াবাড়ি করে গেছি নিজের লাভের কথা ভেবে। '
'লজ্জা হওয়া উচিৎ আপনার বস।' যথা সম্ভব চিবিয়ে চিবিয়ে বলল বোজার। মালিককে উত্তেজিত করতে চাইছে সে।
' ইতিমধ্যে একটা লাশ পড়ে গেছে ওই খামারে। ওটা আমার জন্য লজ্জাকর।' সমান তেজে জবাব দিল থরটন ।
লাফ দিয়ে ঘোড়ায় উঠে বসলো পিটার থরটন। দুই বোজার ভাইয়ের দিকে একবার কারণ ছাড়াই কটমট করে চেয়ে ঘোড়া হাঁকিয়ে চলতে লাগল।
খানিক অবাক হয়ে লোকটার চলে যাওয়া দেখল দুই ভাই।
' লোকটা নরম হয়ে গেছে।' হতাশ সুর উইলট বোজারের গলায়।
'আমার একটা পানীয় লাগবে। শক্ত কিছু।' জবাব দিল মেলট বোজার।
থুক করে মুখের তামাকের দলা ফেলল।
বিরক্ত হল বড় ভাই উইলট। ওর বুটের মধ্যে পড়েছে ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন