ষোল
বারান্দায় চলে এলো মানিক । বেতের চেয়ারটা টেনে নিয়ে এমন একটা জায়গায় বসল যেখান থেকে চাকরদের কোয়াটারের দিকে নজর রাখতে পারবে - যেখানে পোকা মানিক আছে । আবার বাড়ির ভেতরটায় লক্ষ্য রাখতে পারবে। সেই সাথে বাইরের মূল ফটকের দিকে খেয়াল রাখতে পারবে।
বসে বসে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে মানিক ।
বরাবর চিন্তা শক্তিতে দুর্বল সে। তারপর ও জীবনে কিছু সময় নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে হয়। কী করবে এখন ?
বাড়ির ল্যান্ড ফোন থেকে কল দেবে ওস্তাদের নাম্বারে ? ফোন করে এখানের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করবে ? কিন্তু ফোন করাটা বিপজ্জনক হয়ে যাবে । সন্দেহ নেই পুলিশ বহু আগে থেকেই ওদের ফোন ট্যাপ করে বসে আছে। আর এখন ফোন করলে লোকেশনও জেনে যাবে। ওর নাম্বার চোরাই, কিন্তু ওস্তাদ নতুন নাম্বার ব্যবহার নেয় নি ।ওস্তাদ বার বার ফোন করতে বারন করে দিয়েছে।
পোকা গ্রুপের উপর চোখ রাখতে হবে। ওরা সাপের মতো। যে কোনও মুহূর্তে ছোবল মারতে পারে। ওকে মেরে ফেললে আর কোনও বাধা থাকবে না । আরও দুটো দিন সতর্কভাবে ওদের উপর নজর রাখা এক কথায় অসম্ভব।
আমি বরং অপেক্ষা করি। দীর্ঘক্ষণ চিন্তাভাবনার পর সিদ্ধান্ত নিল মানিক । ওস্তাদ পাবলিক ফোন দিয়ে এই বাড়ির ল্যান্ডলাইনে ফোন করতে পারে যখন তখন। পুরো পরিস্থিতি তখন বুঝিয়ে বলতে পারব। হয়তো ওস্তাদ নিজেই চলে আসবে । বা অন্য কোনও বিশ্বস্ত লোক পাঠাবে ।
অতীতে যেমন করত।
চাকরদের কোয়াটারের দিকে তাকাল একবার। গোটা জায়গাটা ঘুঁট ঘুঁটে অন্ধকারে ঢাকা । জানলা দরজা সব বন্ধ । ওরা ভাই বোন কোন রকম ফন্দি আঁটছে না তো?
দুঃখীরাম যে টয়লেট ব্যবহার করত, এখন সেটা পোকা ব্যবহার করছে। ঠান্ডা জল ঢালছে নিজের কানের লতিতে। মাঝে মাঝে অভিশাপ দিচ্ছে মানিককে ।
খানিক দূরে রুইতন বসে আছে। রেগে বোম হয়ে আছে পোকার উপর।
‘ওখানে চুপচাপ বসে আছিস কেন ?’ খেঁকিয়ে উঠল পোকা। ‘খুঁজে দেখ ,
কোন মলম টলম পাস কি না।’
জবাব দিল না রুইতন।
জীবন প্রথম বার ভাইয়ের বিপদে পাশে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না।
সাবিহা। এই কুত্তীটা এসে ওদের দুই ভাই বোনের মধ্যে বিভেদ তৈরি করেছে। পোকা থাকুক সাবিহাকে নিয়ে।
কল্পনা সাগরে ভাসছে পোকা। ওর কোনও ধারণা নেই , সাবিহার মতো মেয়েরা কতটা পল্টিবাজ হতে পারে। এই মুহুর্তে পোকা শুধু নিজের আয়েশি জীবনের কথা ভাবছে । আর কিছু না। অথচ বেকুবটা জানে না আরেকটা সুদর্শন বড়লোকের ছেলে পেলেই পোকাকে লাথি মারবে সাবিহা ।
বিছানার চাদর ছিঁড়ে ফালি করে কানের ক্ষত ব্যান্ডেজ করল পোকা । গজগজ করে তখনও মানিককে অভিশাপ দিচ্ছে। রাজ্যের সব নোংরা ভাষায়।
‘খাওয়ার ব্যবস্থা কী হবে রাতে?’ বোনের দিকে ফিরে বলল পোকা। ‘আর মানিক মালাউনের বাচ্চাটা যখন গুলি করল তুই কিছু করলি না কেন?’
তখনও চুপ করে রুইতন।
পোকা বুঝতে পারল বোন রেগে আছে। তবে এর আগে এমন মুখে কুলুপ এঁটে থাকেনি।
জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল পোকা। মটকু মানিক শালা বসে আছে বারান্দায়। পিস্তল হাতে।
নিজের পিস্তলটা কথা আবার মনে পড়ল।
গেল কোথায় ওটা ? অদ্ভুত তো !
‘আমার পিস্তলটা দেখেছিলি ? নিয়েছিলি তুই ?’ বোনের দিকে ফিরে সরাসরি প্রশ্ন করল পোকা।
‘পিস্তল ? তোর পিস্তল আমি নিতে যাব কেন?’ চোখ বড় বড় করে পাল্টা প্রশ্ন করল রুইতন।
‘আমার মনে হয় তুই নিয়েছিস।’
‘দাঁত ফেলে দিবো আর একবার বললে।’
থতমত খেয়ে চুপ হয়ে গেল পোকা। ভাবতে লাগলো । কে নিল ওর পিস্তলটা?
রাত একটা।
ক্রিসেন্ট হোটেলের রিসেপশনে সামনে এসে দাঁড়ালেন গাউস চৌধুরী।
পকেট থেকে শিশিরের ছবি বের করে রিসিপশনের ছোকরার সামনে ছবিটা ঝুলিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘মুরগিটা এখানে আছে ?’
বিশালদেহী গাউস চৌধুরীর সাথে দুজন পুলিশ দেখে যা বোঝার বুঝে গেছে ছোকরা। নতুন চাকরি নিয়েছে। ঝামেলায় যেতে চান না।
ঢোক গিলে বলল, ‘জ্বি স্যার। মামুন হাসান নামে উঠেছে।’
‘চাবি দাও রুমের। লোকটার সাথে কথা বলব।’
তর্ক না করে চাবি দিয়ে দিল ছোকরা। নতুন চাকরি নিয়ে কী বিপদে যে পড়লাম- মনে মনে ভাবছে ছোকরা।
অন্ধকার কামরায় শুয়ে আছে শিশির। চিন্তায় ঘুম আসছে না। মেঘা আর পিচ্চির মুখ সারাক্ষণ চোখের সামনে ভাসছে। কত কিছুই না হতে পারে ওই বাড়িতে।
মনে হল দরজা কেউ খোলার চেষ্টা করছে। শব্দ শুনতে পেল শিশির।
ধড়মড় করে উঠে বেড সাইডের আলো জ্বেলে দিল।
পাহাড়ের মতো শরীর নিয়ে নিঃশব্দে ভিতরে ঢুকে পড়েছে লোকটা। হাতের সামনে ফোটো আইডি ধরে রেখেছে।
দুজন দুজনের দিকে কিছু ক্ষণ চেয়ে রইল ।
‘আমি গাউস চৌধুরী। গাচৌ বলে সবাই। ক্রাইম ব্রাঞ্জে আছি। আপনি নিশ্চয়ই শিশির রায় ?’
শান্ত গলায় বলল পাহাড়ের মতো লোকটা ।
শিশিরের মনে হল অনেক বছর পর মন প্রশান্ত করা কোনও কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। কোটি বছর বধির থেকে কানে শুনতে পাচ্ছে সে।
লোকটা চেহারা বেশ দয়ালু। আইনের কাঠখোট্টা অফিসারদের মতো চিত্রি বিত্রি মার্কা চেহারা না।
‘আমিই শিশির। কী হচ্ছে একটু বলবেন ?’ খানিক ইতস্তত করে বলল সে।
‘ভয় পাবেন না। আমি আপনাকে সাহায্য করতে এসেছি। দুজনেই জানি কারা কি বিরিয়ানি রান্না করছে।’
বিছানার পাশে বসতে বসতে বললেন গাউস চৌধুরী।
বাইরে অন্য দুই পুলিশ দাঁড়িয়ে রইল। সতর্ক।
‘আমি জানি আপনার গিন্নি আর খোকা জিম্মি। এবং আপনি যদি আমাকে সাহায়্য করেন , ওদের আমি মুক্ত করতে পারব। কথা দিচ্ছি মুক্তিপণ তুলে দেওয়ার পর যখন আপনার গিন্নি আর বাচ্চা নিরাপদ থাকবে তখন আমি মাঠে নামব। একটা ভালো খবর দিতে পারি। এই মুহূর্তে আমার তিন জন যোগ্য অফিসার নির্জনবাস বাড়ির উপর নজর রাখছে। খারাপ কিছু হতে দেখলে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়বে।’
শিশিরের মনে হল শরীর ভিতর থেকে জ্বর উঠে আসছে প্রবল বেগে।
‘আপনি ওদের এ সবের বাইরে রাখতে পারলেন না।’ রাগি গলায় বলল শিশির। ‘কিডন্যাপাররা যদি টের পায়, কেউ ওদের উপর নজর রাখছে তবে সাথে সাথেই খুন খারাবি শুরু করবে। এর মধ্যে আমার কাজের লোকটা খুন...।’
’আপনি বলছেন একজন ইতোমধ্যে মারা গেছে ।’ লম্বা দম নিয়ে বললেন গাউস চৌধুরী।
‘লাশ দেখিনি। কিন্তু ওর কামরার সামনে রক্ত দেখেছি আর... ওকে আর খুঁজেও পাইনি।’
’
‘আরে না, কাউকে খুন করেনি ওরা। মারধর করেছে। আর নিশ্চয়ই বন্দি করে রেখেছে । শুনুন আমি আপনার অবস্থা বুঝতে পারছি। শুধু একটু ভেবে বলুন তো আমাকে সাহায্য করবে কি না। কথা দিচ্ছি একদম নিরাপদে আপনার বউ বাচ্চাকে উদ্ধার করব আমরা।
চুপ করে রইল শিশির।
’আচ্ছা আপনি শুধু বলু্ন দলের নেতার বয়স কি প্রায় ষাট বছর? আর বেশ মোটা গাঁট্টাগোট্টা শরীর । ঠিক না ?’
হা -সূচক মাথা নাড়ল শিশির।
’আর ,লোকটার একটা সাগরেদ আছে । বেঁটে মোটা কালো কুচকুচে।’
অবাক হয়ে মাথা নাড়ল শিশির।
সাফল্যের হাসি হাসলেন চৌধুরী। ‘ সাথে যমজ ভাই বোন আছে। ভাইটা সাইকেল চেইন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ওদের একটু নিখুঁত বর্ণনা দিন তো।’
শিশিরের বলা শেষ হতেই উঠে দাঁড়ালেন চৌধুরী । পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে হাতে দিয়ে বললেন, এটা আমার ফোন নাম্বার। মুখস্ত করে ফেলুন নাম্বারটা। তারপর পুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলুন৷ আসলে কিডন্যাপাররা তৈমুর আলম খন্দকারকে চেনে না। সারা জীবনের অর্জন করা ক্ষমতা নিয়ে ওদের পিছনে লাগবে খন্দকার। আপনার বউ বাচ্চা নিরাপদ হওয়ার পরেই মাঠে নামব আমি। দরকার হলে ফোন দেবেন আমাকে। আপনার পাশের রুমে আমার তিনজন অফিসারকে ফিট করে যাচ্ছি আমি। ওরা নজর রাখবে আপনার উপর। অবশ্যই ছন্মবেশে। একটুও ভয় পাবেন না। টাকা নিয়ে নবীগঞ্জে ফিরে যান। দেখা হবে। আর এইভাবে বিচ্ছিরি স্টাইলে আপনার রুমের ভিতর ঢুকে পড়ায় দুঃখিত।
চৌধুরী চলে গেলেন।
বিছানায় অসহায় ভাবে শুয়ে রইল শিশির। চেয়ে আছে সামনের দেওয়াল।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন