১৫
মুদি দোকানের সামনে বসে আছেন মিল্লাত ভাই।
চারিদিকে অন্ধকার তারপরও চোখে কালো রঙ্গের চশমা। এই চশমা জন্য দুই দুইবার রাতের বেলা ড্রেনে পড়ে গিয়েছিলেন।
সবাই জানে, উনি জানেন না ।
কটকটি ভাঁজা টাইপের কিছু খাচ্ছিলেন । আমাকে দেখেই তুড়ি দিয়ে ডাকলেন, ' এই কাউয়ার বাচ্চা । এদিক আয়। কী ব্যাপার রাতকানা রোগ হয়েছে নাকি? চোখে দেখিস না? মলা ঢেলা মাছ খাসনি বাচ্চাকালে? অ্যাঁ?'
সংলাপের পর সংলাপ দিয়ে যাচ্ছেন। বুঝাই যাচ্ছে খুব মুডে আছেন।
সবুজ রঙের ক্যারাবিয়ান কচ্ছপেরা যেমন গুটিগুটি পায়ে হাটে, তেমন করে এগিয়ে গেলাম মিল্লাত ভাইয়ের দিকে।
ফিচেল মার্কা একটা হাসি দিলেন তিনি।
চেহারাতে বেশ খুশি খুশি ভাব। নিশ্চয়ই কাজ হয়েছে।
' আসলে আপনাকে দেখতে পাইনি ।' মিনমিন করে বললাম। বলতে ইচ্ছে করছিল, এমন কাইল্লা মানুষ আপনি, অন্ধকারে বসে থাকলে চোখের সাদা ডিম ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না।
সেটা বলা সম্ভব না। হাড্ডি গুড্ডি শেষ হয়ে যাবে।
তোর রেণু বউদিকে চিঠি দিলাম রে।'
জামার কলার দুটো মেরামত করতে করতে বললেন । অন্ধকারে দাঁতের ঝিলিক। 'মনটা বেশ উরাধুরা লাগছে।'
নিজের হাতে দিয়েছেন?' অবাক হলাম। ব্যাটার সাহস কত । একটা চিঠি দিয়েই রেণুকে আমার বৌদি বানিয়ে ফেলছে।
'নারে নিজের হাতে দিতে পারিনি।' খানিক লজ্জিত গলায় বললেন মিল্লাত ভাই। ' রেণুর এক বান্ধবীর হাতে তুলে দিয়েছিলাম। বান্ধবী দিয়েছে তোর বৌদির হাতে। চিঠি পেয়ে খুব খুশি হয়েছে রে তোর রেণু বৌদি।'
কেমন যেন একটা অনুভূতি হল আমার। আরও অনেক...অনেক পরে বুঝেছি, ওটার নাম- ঈর্ষা ।
কেন এমন হয়েছিল কখনো জানতে পারিনি।
শুধু মনে হল রেণুর পাশে মিল্লাত ভাইকে মানাবে না। রাজকন্যা আর দানব। বিদেশি একটা রূপকথা গল্পে পড়েছি অমনটা।
'কী রে তোর চেহারা অমন হরতকির মত শুকিয়ে গেল কেন?' খেঁকিয়ে উঠলেন মিল্লাত ভাই। ' সময় মত কবিতা সহ চিঠি লিখে রাখবি কিন্তু।'
'কবিতা বাদ দেন ভাই।'
'ক্যান , আমি তো শুনেছি মেয়েরা কবিতা পছন্দ করে।'
'তা করে। কিন্তু আমাকে দিয়ে কবিতা হবে না।'
'আসলে তোর মাথায় প্রোটিনের অভাব।' বিরক্ত হলেন মিল্লাত ভাই।
'তুই এক কাজ কর। নাম করা কবির কবিতার লাইনগুলো সুন্দর করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখে দে।'
'আপনি লিখতে পারেন না?' ভয়ে ভয়ে বললাম ।
'নারে ।' হতাশ ভাবে মাথা নাড়লেন প্রেমিক মিল্লাত ভাই। 'জীবনে বই খাতা ছুয়ে দেখলাম না ভাল করে। আর আউট বই তো দিল্লি বহু দূরে । সারা জীবনে দুইটা আউট বই পড়েছি । রিক্তের বেদন আর রিক্সা ড্রাইভারের প্রেম । এর মধ্যে রিক্সা ড্রাইভারের প্রেম ,একেবারে ফাটাফাটি।
ঘটনার হিস্টোরিটা বলি তোকে। একটা বাইংটা ধরনের ছেলে রিক্সা চালাত। গরিব হলেও ভদ্রঘরের। কপাল দোষে রিক্সা চালায়। চেহারাটা দারুণ।আমার মত। একদিন...।'
তিন সপ্তাহ হয়ে গেছে এরমধ্যে।
আমি কবিতার বই ঘেঁটে ঘেঁটে চিঠি লিখে দেই।
তেমন আহামরি কিছু না । নতুনত্ব ও নেই ।
লাইনগুলো খুব প্রাচীন। যেমন -
হায় রেণু বেলাশেষে একদিন হাজার জোনাকি নিয়ে এসে দেখি তুমি হারিয়ে গেছো বিবাগী জোছনায়।
অথবা
আমার চিঠি কে পড়বে তুমি ছাড়া?
ঘুমাতে গেলে ও তন্দ্রা ফিসফিস করে।
জাগিয়ে রাখে আমায় । রৌদ্র হাওয়া পিয়ানো বাজায় কার্নিশে ।
বাইরে মৌরি গাছটা একা একা রোদ খায় । বারান্দায় দড়িতে রেখে দেয়া শাড়িগুলো ডাকাতিয়া হাওয়ায় ফুলে উঠে, প্রাচীন তিন মাস্তুলওয়ালা জাহাজের পালের মত ।
কারা যেন উৎসব করে আজও । সমুদ্রস্নানে যায় । ভালবাসে ।
ভাঙ্গা টিনের তলোয়ার নিয়ে হাঁটে পরাজিত রাজা । গায়ে সার্কাসের ক্লাউনের পোশাক । নীল ঘোড়া বেঁধে রেখে এসেছে , বিষাদের বিস্ময়ের বনে ।
পকেটে রক্তচন্দনের বীজ । রানীর সাথে দেখা হলেই রাজার করতলে জন্ম নেবে চন্দনের বন।
শালপাতার ঠোঙা ভর্তি করে দুঃখ কিনেছি । ফেলে দেয়া যায় না । অনেক দামে কেনা । ওরা বলেনি, বিফলে মুল্য ফেরত । ওদের দোকান উঠে গেছে সব দুঃখ আমার কাছে বিক্রি করে ।
মরীচিকার মত দালানবাড়ি , মিলিয়ে যেতে পারে যে কোন সময় । ফুউস মন্তরের মত। আমাদের শহর, হতেও পারে কোন এক নতুন মহেঞ্জোদারো ।
আমার চিঠি কে পড়বে তুমি ছাড়া?
কে জানবে আমার সব অভিমানী গোপন কথা?
আমি তো বটতলায় তেল সিঁদুর মাখা ঋত্বিক না। হাওয়াকে
বশ মানাতে পারি না। জমাতে পারি না কাচের গ্লাস ভর্তি চৈতালি মেঘ । মদিরার নীল ভাঙ্গা বোতল আর ক্রিট দ্বীপের নষ্ট কেপার দানার মত বাতিল সব অনুভূতি আমার ।
আমার চিঠি কে পড়বে তুমি ছাড়া?
মোট কথা আগারে বাগাড়ে লিখে দেই যা মনে আসে।
আর সেগুলো হাতে নিয়ে হাঙরের মত পৈশাচিক হাসি হাসতে হাসতে চলে যান মিল্লাত ভাই।
আমি জিম্মি হয়ে গেছি।
কিছু বলতে পারি না। প্যান্টের পিছন পকেটে মাছ মার্কা চাকু আছে মিল্লাতের। বাটটা পিতলের। মাছের লেজের মত। ফলাটা ভয়ংকর।
শহরের নামকরা রংবাজদের প্রিয় জিনিস। নাকে হিঙ্গাইল মনটু, কুত্তা কায়েস, পিচ্চি হান্নান এদের কাছে ও অমন জিনিস থাকে। শুধু মাত্র সরকারী দল করলে পিস্তল পাওয়া যায়। এমপি সাহেব আদর করে উপহার দেন।
তবে আজকাল বাজারে পাইপ গান চলে এসেছে।
কী ভাবে বানায় বলছি।
নাহ থাক ।
ঘন ঘন রাস্তার শিডিউল বদল করলাম।
রেণুর সাথে দেখা যাতে না হয়।
কিন্তু হায় !
ঈশ্বর লোকটা মহা ফুর্তিবাজ লোক ।
উল্টা দিকে ঘুরে একদিন ভিন্ন পথে বাসায় আসছিলাম। এই মহল্লাটাও দুপুরের সময় ভীষণ নিঝুম থাকে।
বেশ কয়েকটা নিম গাছ। ওদের চিরকি মিরকি পাতায় রোদের আঁকিবুঁকি।
বাতাসটা পর্যন্ত তেতো মনে হয় ।
বগলে বই নিয়ে ফিরছিলাম।
তখনই রেণুকে দেখলাম।
বরাবরের মত পণী টেইল চুল আর মেকাপ ছাড়া রেণু হেঁটে আসছে , মাথা
নিচু করে।সাথে দুই বান্ধবী।
আবিস্কার করলাম অসম্ভব রকমের নার্ভাস লাগছে। পা দুটো যেন বরবটি। কেমন যেন ল্যাগ ব্যাগ করছে।
জুলফি বেয়ে ঘাম আসছে আমার। বুকের ভেতরে ঢাক বাজছে। অমন অচেনা ঢাক আফ্রিকার মাসাইমারা গ্রামে বাজে।
পথটা এত সরু যে পালানোর উপায় নেই। নেই কোন উপগলি।
নেই কোন আড়াল।
অবাক হলাম এই ভেবে , এত নার্ভাস লাগছে কেন?
জীবনের প্রথম বারের মত পথ চলতে চলতে মুখ তুলে চাইল রেণু।
সোজা আমার দিকে !
একদম সোজা।। অমন চোখ আগে পরে কখনই দেখিনি।
উত্তর দিকের মহল্লায় একটা পুকুর আছে।
আমরা আহ্লাদ করে পদ্ম পুকুর বলি। ওটার জল কালো কুচকুচে।
একদম খরালি কালেও জল বরফের মত ঠাণ্ডা।
রেণুর দুই চোখ আমাকে পদ্ম দীঘির জলের কথা মনে করিয়ে দিল।
মনে হল, মেয়েটা এক লহমার মধ্যে জেনে গেল , আমার অতীত , ভবিষ্যৎ , বর্তমান।
ও আমার সব জানে।
এমন কি চিঠিগুলো যে আমি লিখে দিয়েছি তাও বোধহয় জেনে গেছে।
'এই মিলন শোন।' ডাক দিল সে আমাকে।
আগেও রেণুর গলার স্বর শুনেছি। বান্ধবীদের সাথে যখন কথা বলতে বলতে যেত, তখন শুনেছি।
কিন্তু সেই গলার স্বর আজকের সাথে অনেক তফাৎ ।
তারচেয়ে বড় কথা আজ আমার নাম ধরে ডেকেছে।
সিদ্ধান্ত নিতে কখনই আমার দেরি হয় না। আজও হল না।
আর্মি অফিসাররা যেমন আব্যাউট টার্ন করে তেমন করেই ঝেড়ে দৌড় দিলাম।
আতঙ্কে দিশা হারিয়ে ফেলেছিলাম খানিকটা। বুদ্ধি সুদ্ধি লোপ পেয়ে গিয়েছিল।
কোমর সমান ড্রেনের ভেতরে আবিস্কার করলাম নিজেকে।
মনেই ছিল না ওখানে একটা লম্বা সরু ড্রেন আছে। হররপ্পা আর মহেনজো দারো নগরীতে যেমন সুন্দর পাথরের ড্রেন থাকতো ঠিক সেই রকমই ।
ড্রেনের গন্ধটা বড্ড বিটকেলে লাগল।
মাথার চুলে কচুরি পানা। বুক পকেটে পচা ঘাস। বইটা দূরে পড়েছে। ভাগ্য ভাল।
দূরে রেণু আর ওর বান্ধবীরা হাসছে । খিল খিল করে।
ওরা হেঁটে চলে যাবার পর ড্রেন থেকে আস্তে ধীরে উঠলাম ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন