সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নক্ষত্রেরা মরে গেলে চুমকি হয়ে যায় ১২

 ১২

 

 

 

বিপিনের সাথে দেখা হয় কয়েক দিন পর পর।

 

ওর কি আর মড়ার সময় আছে?

 

রঙ জ্বলা কালো ঢোলা ট্রেটনের প্যান্ট আর বিবর্ণ পাঞ্জাবী গায়ে  চাপিয়ে  কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায় কে জানে  ?

 

কাঁধে ব্যাগ। হাতে কবিতার খাতা। চেহারায় গভীর চিন্তার ছাপ। নাকি ওর চেহারাই অমন কে জানে!

 

সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায় জিজ্ঞেস করতেই একদম খ্যাক করে উঠলো।

 

 

আমি কী তর মত শুয়ে বসে কাটাই নাকি?' বিরক্ত হয়ে গজ গজ করতে করতে বলল বিপিন।

 

'কেন কি করিস?' জানতে চাইলাম ।

 

'কি করি মানে?' আরও বিরক্ত হল বিপিন। ' টিউশনি করি ।'

 

মোটামুটি আকাশ থেকে পড়লাম । বিপিন করে টিউশনি? ওর মত মুখ চোরা মানুষকে কেউ টিউশনি দেয়? ছাত্রদের কী পড়ায়? ওর নিজের মাথাই তো গোবর ভর্তি। যে পরিমাণ গোবর আছে সেটা দিয়ে বায়োগ্যাস বানিয়ে একটা পরিবার দিনের পর দিন জ্বালানি সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারে।

 

কথা বার্তা শুনে বুঝতে পারলাম ঘটনা আসলেও সত্যি।

  

মোটামুটি বস্তি আর গরিবঘরগুলোতে ওর সুনাম আছে ভাল মাষ্টার হিসাবে।

 'বাকি সময়টা দুই একটা সংগঠনে বিনামূল্যে শ্রম দেয়। রাতের আধারে দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার সাঁটায় আর লাল রঙের চিকা মারে। একটা রাজনৈতিক দলের বড় দাদারা এসে বিপিনের বাড়িতে মার্কস আর লেলিনের বই দিয়ে যেত।

 

বিপিনের বাড়ির পরিবেশ একদম রাবণের পরিবারের মত।

শান্তি নেই।

সকাল দশটা থেকে রাত দশটা ওদের বাড়ির সদর দরজা খোলা থাকে। লোকজন যাওয়া আসা করছে । ক্লাবের মত।

একদল যাচ্ছে আরেকদল আসছে।

হয়তো বিপিনের মেজদা এলেন।  সাথে চার পাঁচ জন বন্ধু।

 

ব্যস, শুরু হয়ে গেল ম্যারাথন আড্ডা ।

 

ওদের বাড়িতে চা নাস্তার ব্যবস্থা । নেই মেহমানের আপ্যায়নের কোন কিছু।  তারপরও আড্ডা চলতো ।  রাস্তা  দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পেতাম, এক দল তরুণ উত্তেজিত ভঙ্গিতে বকবক করছে। কি নিয়ে কে জানে।

 

এই দল যেতে না যেতেই সেজদা তার এক গণ্ডা বন্ধু নিয়ে হাজির। আবার আড্ডা।

এই দল বের হলে প্রতিবেশী দু-চারজন বিধবা মহিলা হাজির ।এই দলের নেতৃত্ব দেয়  বিপিনের মা ।

 কারণ তিনিও বিধবা।

 

 পুরো দলের সবাই আতপ চালের ভাত আর কলা সিদ্ধ খেতে খেতে ঝিমসি মেরে গেছে।

 এই দলের কর্মকাণ্ড বিচিত্রমুখী।

 

 ঘন্টার পর ঘন্টা এরা , পান দোক্তা এইসব হাবিজাবি মুখে দিয়ে গল্প করছেন সবাই।  কী  নিয়ে গল্প করছে সেটা পরিস্কার না । কারণ সবার মুখ ভর্তি পান।

 

এদের অনেকে পানের সাথে চুন খেত না। কারণ শামুক , ঝিনুক পুড়িয়ে চুন  বানায়, খাওয়া বারণ।

 

সপ্তাহে একদিন নামকীর্তনের ব্যবস্থা করতো।

 হরিবোল হরিবোল বলে চিল্লাপাল্লা করে ঘণ্টা কয়েক পাড় করে , কলা , মিছরি , বাতাসা বিতরণ করত প্রসাদ হিসাবে।

 

 মোদ্দা কথা বিদঘুঁটে  একটা হইচই মুখর পরিবেশে বিপিন থাকে।

 

সপ্তাহের ছুটির দিনে বিপিনের বড়দা বাসায় থাকেন ।

সেদিন সবাই চুপচাপ ।কোন শব্দ হয় না ।

কারণ ভদ্রলোকের মেজাজ খুব খারাপ ।

উনি সারাদিন মনে পড়ে পড়ে ঘুমান। সন্ধ্যা বেলা  উঠে এক বাটি মুড়ি আর চা নিয়ে বাড়ির সবার সাথে ঝগড়া করেন।

 

 মাসে একবার কার কাছ থেকে যেন একটা ভিসিআর  ধার নিয়ে আসেন। সাথে চার-পাঁচটা ভিডিও ক্যাসেট । বেশির ভাগই কলকাতার বাংলা ছবি । দুই একটা হিন্দি সিনেমা । যাতে প্রচুর মারামারি থাকে। চলে ম্যারাথন মুভি দেখা।

 

 একটা শেষ হতে না হতেই আরেকটা চলতেই থাকে । যতক্ষণ না সবার চোখে ঝি ঝি দেখা শুরু করে , বা মাথাব্যথা শুরু হয়।  অথবা ভিডিওতে ফিতা  আটকে না থাকে । কখনো কখনো ভিসিআরের হেড ময়লা  হয়ে যায়।

আরেক ঝামেলা।

 

সম্ভবত সেই কারনে বাড়িতে শান্তি পায় না বিপিন।হুট হাট করে বেড়িয়ে যায় বাইরে।বিশেষ করে দুপুর বেলা

 

 

অমন নিরাক পড়া দুপুরের প্রতি লোভ ছিল আমারও।

 

সে একটা সময় ছিল । অরন্যের গাছদের    মত বা চিলের মত রোদে ভিজতে ভাল লাগত।প্রখর রোদে চারিদিকটা জ্বলত রুদ্রপ্রয়াগের চিতার চোখের মত।

 

রাস্তাঘাট শুনশান।

 

নিউ মেট্রো সিনেমা হলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই ।

 

শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে কালির মন্দিরের ওখানে একগাদা দোতলা বাড়ি ছিল। টানা। সারি- সারি। প্রত্যেকটা বাড়ির সামনে রোয়াক । ওখানে বসে এক দঙ্গল বুড়ো লোক ষোলগুটি বা দাবা খেলত।

 দোতলার বারান্দার রেলিঙ ছিল লোহা আর কাঠের। বিচিত্র নকশা করা।

 

সব কয়টা জানালায় কাঠের ঝিলিমিলি। টান দিলে খোপ খোপ ফাঁকা হয়ে যায়। দোতলার বারান্দা থেকে দেখা যায় নদীর বুকের গয়না নৌকা আর দূরের পাটকল ।

 

 সন্দেহ নেই, অসম্ভব রকমের সুখী মানুষজন,  ওই স্বপ্নিল বাড়িগুলোতে থাকতো। সব ঋতুতে প্রকৃতির আয়োজন উপভোগ করতে পারতো বাড়ির বাসিন্দারা।

বাড়ির ভেতরে আর পিছনে অনেক খানি ফাঁকা জায়গা।

মাঝখানে বড় চারবাহুর উঠান। চারিদিকে চতুর্ভুজ হয়ে বাড়িটা ঘিরে থাকে। নিচতলার প্রথম কামরাটাই হয় বাড়ির বৈঠক খানা। যেখানে বাড়ির কর্তা অবসরে বা ছুটি ছাঁটার দিনে ইয়ার দোস্তদের নিয়ে আড্ডা দিত।

 

প্রায় সবগুলো বাড়ির এক কোনে একটা কুয়া ছিল। অনেকেই কুয়ার ভেতরে কচ্ছপ ছেড়ে দিত। শুনতে অবাক মনে হলেও ঘটনা কিন্তু সত্যি।

 

আর এর ব্যাখ্যাও আছে।

 

কুয়ার ভেতরে কচ্ছপ থাকলে কুয়ার জলে পোকা মাকড় জন্মাতে পারে না। কোন বিষাক্ত পোকাও আসতে পারে  না।

প্রায় সব বাড়ির কুয়া নিয়ে কোন না কোন ভৌতিক গল্প প্রচলিত থাকতো। কুয়ার ভেতরে ভুত আছে।

বহু আগে কেউ না কেউ ডুবে মরেছিল বা আত্নহত্যা করে ছিল কুয়ার ডুবে। আজও গভীর রাতে কুয়ার দেয়াল বেয়ে সেই মড়া মানুষটা উপরে উঠে আসে।

 

আসলে ব্যাপারটা অন্যরকম।

 

এইসব গাল গল্প ইচ্ছা করে ছড়ানো হয়েছে । বাড়ির ছোট খাট বাচ্চারা খেলাধুলা করতে করতে যেন কুয়ার আশে পাশে চলে না আসে সেইজন্য।

খেলতে খেলতে কুয়ার ভেতরে বাড়ির খোকা পড়ে গেছে অমন ঘটনা একেবারে কম না কিন্তু।

 

এই বাড়িঘরগুলোর সামনে দাঁড়ালে আমার মনের গহীনে আগাছার মত  কেমন দুঃখ বোধ জন্মে 

বাড়ির বাসিন্দারা সবাই চলে গেছে ।

 

কেউ দেশ ভাগের সময়।

 

কেউ দুর্ভিক্ষের সময়।

 

কেউ একাত্তরের সময়।

 

 সীমান্তের ওপারে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। বাড়িঘর জমিজমা সব পড়ে ছিল। পরে ধীরে ধীরে লোভী আর অসৎ মানুষের হাতে চলে গেছে এইসব স্বপ্নপুরী।

 

 যারা এইসব ছেড়ে গেছিল তাদের কষ্ট হয়েছিল না? মনে পড়তো না?

কখনই কি মনে পড়তো না?

 

বাদলার দিনে যখন কেউ ইলিশ মাছ ভাঁজে । সেই লোভ জাগানিয়া খিদে জাগানিয়া সৌরভে  মনে পড়ে না ওপাড়ের বসতভিটার কথা?

 

  কখনও বা কাঁঠালের তীব্র মাতাল করা ঘ্রানে?

 

শীতের বিকেলে কমলালেবুর খোসা ছিলতে গিয়ে?

কোন অলস মুহূর্তে । ভিড়ে বা একা ।

জোনাক জ্বলা লেবুপাতার গন্ধভরা সন্ধ্যায় বা নক্ষত্র ভরা ময়ূরকণ্ঠী রাতে হয়তো তাদের মনে পড়ে।

 কষ্ট হয়?

না ,ততদিনে স্মৃতির গায়ে কালের ধূলা পড়ে গেছে?

 

স্মৃতি নাকি মগজ থেকে সোজা চলে যায় DNA -তে।ওখানেই জমা থাকে। মানুষ চাইলেও কিছু ভুলতে পাড়ে না।

সে ভুলে থাকার ভান করে মাত্র !

 

সেইসব সোনালী দিনের হারিয়ে যাওয়া মানুষজনদের জন্য মন আমার কেমন কেমন করে। যারা এক সময় ছিল এখানে। ছায়া ছায়া হয়ে হারিয়ে গেছে এখন।

 

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...