প্রথমবার গিয়েছিলাম, হুমায়ূনের মেয়ের বিয়েতে। খুবই বর্ণাঢ্য বিবাহ-উৎসব হয়েছিল ঢাকাতে, তারপর একটি দাওয়াত নুহাশ পল্লিতে। হুমায়ূন আমন্ত্রণ করার সময় জানিয়েছিল তার মেয়ে নাকি বলেছে, তার দু'চারখানি গয়নার বদলে সে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নামের এক লেখককে বিয়ের উৎসবে অতিথি হিসেবে পেতে চায়। সম্ভবত কথাটি সত্যি নয়। হুমায়ূন রসিকতার ছলে এমন অনেক গল্প বানায়, আমি জানি। কিন্তু সত্যি না হলেও এরকম গল্প শুনলে যে-কোনও লেখকের বক্ষ উত্তাল হয়।
এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্যে আমরা ঢুকেছিলাম নুহাশ পল্লিতে। কয়েকশো মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল দুপাশে।...
দ্বিতীয়বার গেলাম আরও এক আশ্চর্য কারণে।
হুমায়ুনের একটা ফিল্মের শুটিং-এর শেষ দিন, সব ফিল্ম ইউনিটেই এই দিনটিতে একটা উৎসবের মতো হয়। ক্যাম্প ফায়ার, নাচ-গান-হই-হুল্লা, উদ্দামতা হয়। এটা শুধুই ইউনিটের নিজস্ব ব্যাপার। আমি সম্পূর্ণ বাইরের লোক, সে ফিল্মটি সম্পর্কেও কিছু জানি না। তবু সেই উৎসব-উদযাপনের দিনে সস্ত্রীক আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কলকাতা থেকে।...
ঢাকা শহরে আমার পরিচিতের সংখ্যা নেহাত কম নয়। একাত্তর সালের পর থেকে যাতায়াত করছি নিয়মিত, আড্ডা জমেছে অনেক বাড়িতে। বীথি ও গাজী শাহাবুদ্দীনের বাড়ি প্রায় আমাদের নিজের বাড়ির মতো। বেলাল চৌধুরী আমার সহোদরের মতো এবং নিত্য সহচর।
নুহাশ পল্লিতে যেমন আছে গ্রাম্য পুকুর, তেমনি আছে অত্যাধুনিক সুইমিং পুল। সেই সুইমিং পুলে সারা শরীর পানিতে ডুবিয়ে, হুমায়ূনসমেত আরও দশ বারোজন আমরা আড্ডা দিয়েছিলাম প্রায় চার ঘণ্টা। সেরকম জলজ আড্ডা আমার জীবনে অবিস্মরণীয়।
আমাদের বাড়ি ছিল মাদারিপুর জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানকার বাড়ি-ঘর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। ঐতিহাসিক কারণে। তার জন্য বুকে এখনও একটু-একটু চিনে ব্যখা হয়, তা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে।
তবু, এ কথাও ঠিক, ঢাকায়, পূর্ব পাকিস্তান পরবর্তী বাংলাদেশে এসে অনেকের কাছে যেমন আন্তরিক, আত্মীয়ের মতো নিবিড় ব্যবহার পেয়েছি, সেই তুলনায় যা হারিয়েছি, সেইসব বাড়ি-ঘর অতি তুচ্ছ। ভালোবাসা ছাড়া আর কোনওকিছুরই কোনও মূল্য নেই।
— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন