দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ।
ব্রিটিশ সেনা বাহিনী থেকে অবসর নেয়ার পর, হিউ অ্যালেন-এবং তাঁর বিধবা বোন ব্যাবস- ঠিক করলেন শান্ত নিরিবিলি ভাবে বাকি জীবনটা পাড় করবেন ।
সেই আশায় মধ্য ভারতের একটি অখ্যাত গ্রাম , মান্দিখেরাতে ছোট খাট একটা জমিদারি কিনে বসতি স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেন।
সৈনিক থেকে অবসর নিয়ে শুরু করেন কৃষকের জীবন।
কিন্তু ফসল ফলানোর সাথে সাথে, আবিস্কার করেন , আশেপাশের বনের ক্ষুধার্ত ধূর্ত বাসিন্দারা নেমে আসে সমতল ভূমিতে ।
যখন তখন।
ফসল আর মান্দিখেড়ার গ্রামবাসীদের রক্ষার জন্য অ্যালেন তখন অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হন।
নিখুঁত , টানটান এবং রোমাঞ্চকর গদ্যে ‘দ্য লোনলি টাইগার’ বইতে বুনো প্রাণীদের সাথে মুখোমুখি হওয়ার কথা বর্ণনা করেছেন হিউ অ্যালেন। যা পাঠককে জঙ্গল-এবং শিকারকে একদম চোখের কাছে নিয়ে আসে।
দ্য লোনলি টাইগার এখন পর্যন্ত লেখা সেরা শিকার বইগুলির মধ্যে একটি,।
ভারতের দ্রুত বিলুপ্ত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য প্রথম দিকের দলিলগুলির মধ্যে একটি এই বই ।
অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় বিরতির পরেও বইটা আজও জনপ্রিয় ।
১৯৫৫ সালের ঘটনা । প্রায় শেষ হয়ে আসছে গরমের মউসুম ।
বলা দরকার , এই বছর গরম পড়েছিল সাংঘাতিক রকমের। জুন মাস, গরম শেষের দিকে।
অ্যালেন আর ব্যাবস নিয়ম করে রোজই একবার আকাশের দিকে নজর বুলিয়ে দেখছিলেন। আশা, মেঘের কোন চিহ্ন দেখা যায় কি না ।
ভাই বোন দুইজনে গরমটা ভালই টের পাচ্ছিল ।
এস্টেটের চারপাশে সবকিছুই শুকনো টনটনে । জমি লোহার পিণ্ডের মতো শক্ত।
এই শক্ত মাটিতে ফসলের বীজ বোনা এক কথায় অসম্ভব ।
এই বছর বাদলার মউসুম যে দেরি করে আসছে , সেই ব্যাপারে কারও কোন সন্দেহ নেই। খবরের কাগজে ছেপেছে, দক্ষিণ ভারতে মৌসুম চলে এসেছে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে এখানেও চলে আসবে তাতেও কোন সন্দেহ নেই ।
বৃষ্টির মউসুম যখন কাছাকাছি চলে আসে তখনই নালা আর গিরিখাদগুলো একটু পরীক্ষা করা দরকার। এই নালা আর গিরিখাদগুলো দিয়েই জমির সব জল গড়িয়ে দেনওয়া নদী পর্যন্ত যায় । বৃষ্টির শুরুতেই কি ভাবে যেন বড় বড় গাছের গুঁড়ি নালার জলে পড়ে আটকে যায় । সেই সাথে জমা হয় রাজ্যের সব ময়লা । শুকনো পাতা। মরা ঘাস।
আপাতত সামান্য ছোট কিছু মনে হলেও, সময় মত পরিষ্কার না করলে, পরে সব ময়লা জমে জলে পাথরের মত শক্ত হয়ে যায়। তখন এই ময়লা পরিষ্কার করা বেশ কঠিন হয়ে যায় । নালার চঞ্চলা জল বের হয়ে দৌড়ে নদীতে পালিয়ে যেতে পারে না।
আর তখনই নামে ঝুম বৃষ্টি । বৃষ্টির জল নালা আর গিরিখাদ উপচে খেতে জমে সব ফসল ডুবে যায় ।
মারা যায় সারা বছরের শ্রম।
সব সময় যে গাছের মড়া ডাল আর পাতা জমে কৃষকদের এই বিপদ আনে, তেমনটাও না।
চোরা মাছ শিকারিরা কায়দা করে, এই সব নালায় মাছ ধরার ফাঁদ পাতে। আর সেটাও করে বাদলা শুরুর আগে।
আলগা ছোট ছোট পাথর দিয়ে প্রায় গোলাকার দেয়ালের মত বানায় নালার মধ্যে। এক দিক রাখে খোলা। খলবলে জলের মাছ সাঁতরে ঢুকে পড়ে ফাঁদের ভেতরে। ঢুকে বন্দি হয়ে যায় । বের হতে পারে না।
আপাতত পিচ্চি পিচ্চি এই মাছের ফাঁদ দেখতে সামান্য মনে হলেও , সংখ্যায় প্রচুর । তুমুল বৃষ্টি শুরুর আগে ঐগুলো খুঁজে নষ্ট না করলে, জলের তলায় ডুবে যায়। তখন আর কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যায় না।
ফলাফল ? ফসল ডুবে যায় ।
সবচেয়ে বড় নালাটার ওখানে প্রথমে খোঁজ নিতে গেলেন অ্যালেন ।
জায়গাটায় অনেকগুলো প্রাকৃতিক বাঁধ গড়ে উঠায় চোরা মাছ শিকারিদের খুবই প্রিয় জায়গা ।
বড় নালাটার কাছা কাছি আসতেই শুনতে পেলেন কারা যেন কথা বার্তা বলছে। সাথে শব্দ। নালার তলা থেকে পাথরের টুকরো তুলে মাছের ফাঁদ বানাচ্ছে ।
নালার পাড়ে বড় একটা গাছের পিছনে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন তিনি । হাতে নাতে ওদের ধরে লজ্জা দিতে চান না।চোরা এই দুই মাছ শিকারিকে ভাল করেই চেনেন । অ্যালানকে দেখে , বেশ লাজুক আর অপরাধী মার্কা আচরণ ওদের মধ্যে। যেমনটা হওয়া উচিৎ।
বছরের পর বছর এই কাজ করে ওরা। বছরের পর বছর ওদের ধরছেন তিনি ।
একঘেয়ে ব্যাপার ।
পাথর দিয়ে বানানো গোলাকার ফাঁদটা দ্রুত ভেঙ্গে ফেলতে লাগল ওরা।
অ্যালান ওদের বোঝালেন , ' নালা পরিষ্কারের পর ওরা ইচ্ছা করলে আবার ফাঁদ বানাতে পারে। সমস্যা হবে না তখন।
ওরাও সেটা ভাল করেই জানে। কিন্তু শুকনো নালার মধ্যে বালি পাথর জমিয়ে অমন ফাঁদ বানানো অনেক সহজ। সেইজন্য বার বার ইচ্ছা করে অমন করে।
ধরা পড়লে ভেঙ্গে ফেলবে। ধরা না পড়লে তো ফাঁদ রইলোই।
পাথরের শেষ টুকরাটা জলের মধ্যে ফেলে ওদের মধ্যে বয়স্ক লোক যার নাম মাচু বলল , ' সাহেব বাঘের মড়ি দেখবেন ?'
অবাক না হয়ে পারলেন না অ্যালান ।
বাঘের মড়ি কথাটার অন্য অর্থ আছে। মানে কোন প্রাণীকে বাঘে মেরে সেই প্রাণীর কিছু অংশ খেয়ে বাকি অবশিষ্টাংশ ফেলে গেছে। সেটাই মড়ি।
লোকদুটো ব্যাখ্যা করলো , খানিক আগেই নালার এখানে মড়ি দেখেছে ওরা !
বিশ্বাস করার প্রশ্নই আসে না।
আল্যান ধারনা করলেন , আসলে মাছের ফাঁদ পাততে এসে এই ভাবে হাতে নাতে ধরা পড়ে যাওয়ায় গল্প ফাঁদছে ওরা। যাতে সাহেবের মনোযোগ অন্যদিকে চলে যায়।ফাঁদ বানানোর দোষটা বেশ খানিকটা হালকা হয়ে যাবে তাতে।
বাঘের মড়ি দেখার পরও এরা নিশ্চিন্তে মাছের ফাঁদ বানাচ্ছিল , বিশ্বাস যোগ্য না।
মড়ি কোথায় দেখেছ ? অ্যালান আগ্রহী হয়ে উঠলেন।
উনার বিশ্বাস গল্পের মধ্যে সত্য কিছু থাকতে পারে। মাছের ফাঁদ নষ্ট হওয়ায় লাভের আর কিছু নেই ওদের। এখন মিথ্যা গল্প বলে ভোলানোর চেষ্টা করবে বলে মনে হয় না।
আবার হয়তো বিদায় করে দিতে চাইছে এই কায়দা করে।
মাচু নালার দিকে ইশারা করে বলল , ' খানিক হাঁটতে হবে। খুব বেশি দূরে না। নালার বাম তীরে। আবার হয়তো ‘মোগরাওয়াল্লাহ’ কাজ ।
ব্যাপারটা সত্যিই আকর্ষণীয় । মোগরাওয়াল্লা একজন সুপরিচিত গরু চোর । যাকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এলাকায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে । গ্রামে ঢুকতে পারবে না ।
অ্যালান দুই মাছ চোরকে এগিয়ে যেতে ইশারা করে নিজেও ওদের পিছু পিছু আসতে লাগলেন ।
তিনশো গজ হেঁটে যাবার পর নালার তীরে উঠলেন। জায়গাটা শুকনো ঝোপ আর ছোট ছোট গাছে ভর্তি ।
আরও সামান্য হাঁটতেই ক্ষুদে একটা জঙ্গলের সামনে চলে এলো তিনজনের দলটা ।
মাচু ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে চুপ থাকার ইশারা দিল।
ওখান থেকে আবার চুপচাপ নিঃশব্দে কুড়ি গজের মত হাঁটতেই পাওয়া গেল অর্ধেক খাওয়া মড়া গরুটা। খাওয়া শেষে টেনে ল্যান্টানা ঝোপের নিচে ফেলে রাখা হয়েছে।
এত কিছুর মধ্যেও অ্যালান খুশি, গরুটা তাদের না।
দুই মাছ চোরকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারলেন না। বললেন নালার নরম মাটিতে খুঁজে দেখতে। বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়া যায় কি না।
খুঁজতে হল না তেমন। জলের চারিদিকেই পাওয়া গেল। কয়েকটা তো বেশ টাটটা।হিসাবে বাঘটা এই জলাভূমির চারিদিকে দুই সপ্তাহ ধরে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে ! পায়ের ছাপ দেখে কিন্তু ততটা ভয়াল কোন প্রাণী মনে হল না।
মনে হচ্ছে বাঘটা বেশ ভদ্রলোকই হবে !
জলাভূমির এখানে বেশ কয়েকটা দিন আসেননি অ্যালান । সেইজন্য বাঘের পায়ের ছাপের ব্যাপারটা জানতে পারেননি ।
অথচ বাঘটা দুই সপ্তাহ ধরে এই জায়গায় হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। তারপরেও ওর কথা কানে আসেনি কেন সেটা এক রহস্যময় কাণ্ড !
আধ ঘণ্টা খোঁজা খুঁজি করতেই জঙ্গলের এই জায়গাটার মধ্যেই আরও দুটো মড়ি পাওয়া গেল।
এই দুটো প্রথমটার চেয়ে পুরানো । খাওয়া শেষ হবার পর হায়েনারা এসে ভাগ বসিয়েছিল । হাড়ের শেষ মাংস কণা খেয়ে এখানে ওখানে ফেলে রেখেছে।
দেখে বোঝা গেল , আরও অনেক বাঘের মত এই বাঘটাও একবার মাত্র খেয়ে আর কখনই মড়ির কাছে ফেরত আসেনি ।
আরও একটা ব্যাপার মাথায় এলো, বৃষ্টি শুরু না হলে বাঘটা এই এলাকা ছেড়ে যাবে না। না চাইতেই প্রচুর খাবার পাচ্ছে সে ।
চারিদিকে বিঘে বিঘে জমিতে শয়ে শয়ে গরু চড়ে বেড়াচ্ছে , চিন্তার কি আছে ?
গরমকালটা গরুর মালিকদের জন্য একটা বিরক্তিকর সময়। মাঠে ঘাস যায় কমে। ফসল সে তো কবেই কাটা হয়ে গেছে, আবহাওয়া হয়ে গেছে গরম । মাঠে এত বার গরু চরানো হয়েছে, খাওয়ার মত আর ঘাস পাওয়া যায় না।
তখন গরুর মালিকেরা ওদের ছেড়ে দেয়। যাতে ওরা ঘুরে ফিরে ঘাস- লতা- পাতা যোগাড় করে নিজেরাই ইচ্ছা মত খেতে পারে । এদের দিকে নজর রাখার কোন লোকও থাকে না। ওরা ইচ্ছা মত ঘুরে খাওয়া দাওয়া করে। বাসায় ফিরলে ফিরল । না ফিরলে মাঠেই রাত পার করে পরের দিনের জলখাবার খাওয়া শুরু করে।
দিন রাত খেতেই থাকে। কারণ ঘাস কম ।
বাসায় ফিরে না। ফিরে কী করবে ? খাবার কই ?
এই নাটক চলতেই থাকে বৃষ্টির আগ পর্যন্ত। বৃষ্টি শুরু হলেই লকলক করে ঘাস বাড়তে থাকে । তখন পেট ভরা হলে বাড়ির পথ ধরে।
মুক্ত গরুর জীবন ! ঈর্ষা করার মতই ।
নদীর তীরের চারণভূমিগুলো এক কথায় সেরা। সেটা যদি আবার নিয়ন্ত্রণ করা যায় আরও ভাল। ধরা যাক দিনে চল্লিশটা গরু এখানে ঘুরে বেড়ালে খুবই ভাল, কিন্তু একশোটা করে চলে এলে তখন বিকট সমস্যা ।
কিন্তু গরুর মালিকেরা তখন সবাই যার যার গরু নিয়ে চলে আসে। উনাদের মধ্যে দুই এক কথা চালাচালি থেকে সেটা মারামারি পর্যন্ত গড়ায়। সেটা যায় পুলিশ থেকে কোট কাচারি পর্যন্ত। বাধ্য হয়ে সরকারকে মাঠে নামতে হয় । এই গরু নিয়ে ভারতের সমস্যা চিরকালীন ।
এখন সব মিলিয়ে গরুখেকো একটা বাঘের জন্য এই এলাকাটা একটা স্বর্গ। শুয়ে বসে থাকো , খিদে পেলে টপ করে একটা গরু মুখে তুলে নাও। মালিকবিহীন গরু খেয়ে ফেললে অতটা মাথা ঘামতেন না অ্যালান । কিন্তু নিজেরদের তালুকের গরু আছে। বেশির ভাগ সময় রাখাল হিসাবে কাজ করে পিচ্চি বাচ্চা কাচ্চা।
যে কোন সময় একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যেতে পারে ।
বাঘটা আবার শিকার করলো।দুইদিন পর।
এইবারও মালিকবিহীন গরু । গরুটা সম্ভবত জলাভূমি থেকে জল টল খেয়ে ফেরার পথে বাঘের পাল্লায় পড়ে। আগের বারের মতই শিকারকে মেরে টেনে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে গেছে বাঘটা। খাওয়া শেষে ওখানেই ফেলে চলে গেছে।
সকালে অ্যালান যখন আধ খাওয়া গরুটা খুঁজে পেলেন সেইদিনই বর্ষার প্রথম বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
মাটি ভিজে নরম । শুকনো পাতা ভিজে প্যাচ প্যাচ করছে ।
খানিক আগেই বাঘটা পেট ভরে খেয়েছে। অ্যালানের মনে হল খুঁজলে কাছেই পাওয়া যাবে ওকে। ভাগ্য ভাল হলে ঘুমন্ত অবস্থায় পাবেন !
ব্যাপারটা যে একেবারে অমন হবে তা কিন্তু না।
হতে পারে বাঘটার সাথে যখন দেখা হবে সে লড়াই করার জন্য তৈরি ।
অ্যালানের পায়ের শব্দে জেগে উঠবে। আবার হয়তো জেগেই থাকবে , লম্বা ঝোপের আড়াল থেকে সতর্ক ভাবে লক্ষ্য রাখবে অ্যালানের উপর।
দুপুরের খাবার খেতে বাসায় ফিরে গেলেন অ্যালান ।
খেয়াল করলেন , আবার ঘন কালিগোলা মেঘ জমা হচ্ছে আকাশে ।
দুপুর দুইটার দিকে বৃষ্টি শুরু হলো। প্রবল বর্ষা যে শেষ পর্যন্ত এসে গেছে তাতে সন্দেহ নেই। এই প্রবল বৃষ্টির মধ্যে বাঘের জন্য বসে থাকা বুদ্ধিমান বা সুখকর নয় । কর্মচারী ভুতুকে মাচান তৈরি করতে বলেছিলেন, সেটা বাতিল করে দিলেন ।
বৃষ্টির মধ্যে বাঘ বের হবে কি না সন্দেহ। ইচ্ছামত ঘুরে বেড়ানো গবাদিপশু যার যার খামারে ফিরে যাচ্ছে ।
সারারাত বৃষ্টি চলল । পরের দিন ভোরবেলা পর্যন্ত থামার কোন লক্ষণ দেখা গেল না।
সকাল হবার এক ঘণ্টা পরও ঘন মেঘ তেমন পাতলা হল না। হলুদ কুৎসিত রঙের মেঘের স্তূপ ধেয়ে জমা হল। তারপর আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেগে নামলো বৃষ্টি। সাথে বিজলির চমক। বজ্রপাত হতে লাগল ঘন ঘন।
বারান্দায় ঝুলিয়ে রাখা ব্যারোমিটারটা সকালে দেখেছিলেন । বাতাসের মতিগতি খারাপ।
আবহাওয়াটা এখন আসলেই কুৎসিত লাগছিল । আকাশের দিকে তাকাতেই ভয় পাচ্ছিলেন তিনি । মেঘগুলো যেন টব বগ করে ফুটছে ।
প্রচণ্ড আক্ষেপে নেমে আসছে বৃষ্টির জল ।
বাড়ি থেকে নদী চারশো গজ দূরে, কিন্তু এখান থেকে নদীর ভয়াল গর্জন শোনা যাচ্ছে। সেই
শব্দ শুনে রেইন কোট আর গামবুট বগলে নিয়ে বাইরে বেড়িয়ে গেলেন তিনি ।
এমন বৃষ্টি হলে নদীর জল ফসলের খেতে উঠে যায় । বেশি সময় লাগে না ।
নদীর তীরে গিয়ে অ্যালান আবিস্কার করলেন, জল উপচে উঠে গেছে,
গ্যাঁজলা ওয়ালা সাদাটে কাঁদাজল জমা হয়েছে নদীর দুই তীরে ।
অল্প এইটুকু সময়ের মধ্যে এতটা বন্যার কারণ কী ভেবেই পেলেন না তিনি।
অনুমান করলেন, পাচমাড়ি পাহাড়ের আশেপাশে কোথাও ডেনওয়া
নদীর আরেকটা উত্স রয়েছে, সেখানে এই এলাকার চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
দৌড়ে বড় নালার কাছে গিয়ে দেখেন ইতিমধ্যেই দুই পাড়ের জমি প্লাবিত হয়ে গেছে।
জলের স্রোত ভয়ানক ।
অনেক করে খুঁজলেন। না , অমন কোন বাঁধা নেই যে জল জমিয়ে রেখেছে। আসলে নালাটা এত ছোট । আকাশ থেকে নেমে আসা টন টন জল বয়ে নদীতে ফেলতে পারবে না।
দুপুর তিনটের সময় আকাশ অন্ধকার হয়ে গেল। বাতাসের গর্জন ধীরে ধীরে আরও বাড়তে লাগল।
দুপুরের মধ্যে অ্যালানের কর্মচারীরা সব গরু মাঠ থেকে খুঁজে খুঁজে, সবগুলোকেই নিরাপদে খামারে নিয়ে এসেছিল।
কর্মচারীদের সবাইকে ছুটি দিয়ে কোয়াটারে চলে যেতে বললেন তিনি।
এই বাদলার মধ্যে আর কাজ কই ?
এমন খারাপ আকাশ আগে কখনই দেখেননি ।
বৃষ্টির গতিবেগ বাড়তে লাগল। পাল্লা দিয়ে বাতাসের চিৎকার । ছয়টার পরপরই টাইফুন আঘাত হানে।
কয়েকটা বিচ্ছিন্ন বজ্রপাত সামান্য আগাম সতর্কবানী হিসাবে দিয়েছিল প্রকৃতি ।
কয়েকটা মুহূর্ত পর সব কিছু যেন উম্মাদ হয়ে যায়। ঘন ঘন বেগুনী আলোর হিংস্র ঝলকানি চারিদিকে । বাতাসের প্রকোপ বড্ড ভয়ংকর। গাছের ডালে ডালে বাতাস বারি খেয়ে কেমন হাউ মাউ করে ভয়াল শব্দ করছে। পুরো বাড়িটা কাঁপছে।
কোন বদরাগী দৈত্য যেন বনের ভেতরের সবগুলো গাছের পাতা ডালা ভাংছে। এক একটা পেল্লাই গাছ ধপাস করে মাটিতে আছড়ে পড়ছে কিছুক্ষণ পর পর।
ঝড়ের পনের মিনিটের মধ্যেই গোয়াল ঘরের চাল উড়ে গেল।
উড়ে কোথায় গিয়ে পড়লো কে বলবে ?
ইটগুলো খসে পড়লো ঝুমঝুমির মত শব্দ করে।
আতঙ্কিত গবাদি পশুর উন্মত্ত আর্তনাদ আর কংক্রিটের উপর ছত্রভঙ্গ খুরের শব্দ বাড়ির ভেতরে বসে এত গোলমালের মধ্যে শুনতে পেলেন ।
টর্চ ছাড়াই অন্ধকারে গোয়াল ঘরের ক্ষয় ক্ষতি দেখতে পেলেন অ্যালান ।
অন্ধকারের মধ্যে খাঁ খাঁ করছে ছাদ বিহীন ভাঙ্গা গোয়াল ঘরটা। এলো মেলো হয়ে গেছে গরুর পাল।
এই ঝড়ের মধ্যে চারজন লোক আর অ্যালান নিজে লণ্ঠন হাতে বের হয়ে পড়লেন ।
বাতাসে বৃষ্টির গতিবেগ এতই বেড়েছে মুখে আর খোলা হাতে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে ব্যাথাই লাগছিল বেশ।
বাড়ি থেকে মাত্র দুশো গজের পর চারিদিকের সব কিছু যেন জলের চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে। মাঠ নেই। ডানে বামে যেখানেই চোখ ফেলা যাক , জলে থই থই করছে। নালা থেকে জল উঠে সব কিছু ডুবিয়ে ফেলেছে।
বাম দিকে খানিক খোলা জায়গা পেয়ে সেখানে গেল পাঁচ জনের দলটা। বেশ কয়েকটা বড় বড় গাছের তলায় দাঁড়িয়ে গরুগুলো ভিজছে। এতক্ষণে ওদের ভয় বোধ হয় কিছুটা কমেছিল । লণ্ঠন হাতে মালিকপক্ষকে এগিয়ে আসতে দেখে আরও শান্ত হয়ে গেল।
ঝামেলা ছাড়াই সবগুলোকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হল।
বিকেলে যেটা ছিল সামান্য নালা এখন সেটাই ফুঁসে পেল্লাই একটা নদী হয়ে গেছে যেন ।
অ্যালান ভাবছেন, নদীর অবস্থা না জানি কেমন হয়েছে ।
বাড়ির নিরাপত্তার কথা ভেবে শঙ্কিত হয়ে গেলেন তিনি।
কোন ভাবে নদীর জল আরও বেড়ে যদি ধেয়ে আসে ? খুবই নাজুক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে তাদের বাড়িটা ।
দমকা বাতাসে মাথা নিচু করে নদীর দিকে হাঁটতে লাগলেন। সেই রাতের কথা সারা জীবন মনে থাকবে। প্রতিটা পদক্ষেপের কথা মনে ছিল তাঁর অনেক অনেক দিন পর্যন্ত ।
বাতাসের প্রবল ধাক্কায় একদম জম্বির মত হাঁটছিলেন।
বাতাসের গর্জন বড্ড অপার্থিব আর ভূতুরে ।
নদীর কাছে যাবার অনেক আগেই নদী এসে দেখা করল অ্যালানের সাথে।
বৃষ্টির জল খেয়ে খেয়ে নদীর পেট ফুলে ঢোল হয়ে ভয়াল আকারের হয়ে গেছে।
সেই কত দূরে নদী, কিন্তু নদীর তীরের গাছপালার সাথে বাতাস বারি খেয়ে যে শব্দ বানাচ্ছে, সেটা এই পর্যন্ত এসেও পিলে চমকে দিচ্ছে ।
হাতের টর্চ জ্বেলে দিলেন কী মনে করে।
বৃত্তাকার আলোর মধ্যে বৃষ্টির কণাগুলো রূপার কুঁচির মত ছিটকে ছিটকে পড়ছে।
দূরে এক দঙ্গল বুনো কুকুর সাঁতরে শুকনা জায়গায় উঠার চেষ্টা করছে। অ্যালানকে দেখে ওরা দাঁতমুখ খিচিয়ে ঘেউ ঘেউ করে উঠলো । ভয় দেখাতে চাচ্ছে না। মনে হয় কাঁদছে ।
এত ঘন ঘন বিজলি চমকে উঠছিল, চারিদিক একদম স্পষ্ট দেখা যায়, দিনের আলোর মত । টর্চ নিভিয়ে ফেললেন।
খানিক দূরে কয়েকটা গাছপালার আড়ালে এক দল ফুটি ফুটি দাগওয়ালা চিতল হরিণ বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে শিকারিকে দেখছে। চেহারায় কোন ভয় নেই। প্রকৃতির রুদ্ররোষের চেয়ে অন্য কোন ভয় এখন বড় হতে পারে না ওদের কাছে।
আরও পঞ্চাশ গজ এগিয়ে আবার জলের সাথে দেখা হল।
এখানে কোন রকম জল থাকার কথা না।
বৃষ্টির জন্য নালা, শাখা নদী আর মূল নদী মিলে জলের একটা বিশাল চাদর হয়ে গেছে।
কয়েক মুহূর্ত সেখানেই পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি।
মস্ত বড় বিপদ বাড়ির খুব কাছেই চলে এসেছে !
দুই পাশ দিয়ে ছম ছমে গতিতে জলের ধারা চলে যাচ্ছে সামনে কোথাও !
ঘুরে উল্টা পথে ফিরে আসতে যাবেন তখনই বিজলির আলোতে দেখতে পেলেন। পথের ঠিক মাঝখানে অনড় ভাবে দাঁড়িয়ে আছে অন্য রকমের এক দুঃস্বপ্ন ! বিশাল আকারের একটা বুনো শূয়র ।
বরাহ সাহেবের সামনে দিয়েই যেতে হবে। উপায় নেই । দুর্দান্ত গলা-কাটা চিৎকার করেও সাহেবকে নাড়াতে পারলেন না এক চুল।
বাধ্য হয়ে ওর পাশ দিয়েই গেলেন ।
এইবার আবিস্কার করলেন আশেপাশেই হরেক পদের জীব জন্তু দাঁড়িয়ে আছে । কেউ কেউ আবার ঘুমের ঘোরের মধ্যে যেন হেঁটে যাচ্ছে ।
ওদের কোন দোষ নেই ।
চারিদিকে জল উঠে আসায় কেমন একটা দ্বীপের মত হয়ে গেছে। ওখানেই বন্দি ওরা।
বাড়ি ফিরে গেলেন অ্যালান ।
বড়দিদি ব্যাবস চুলার উপর কেটলি বসিয়ে রেখেছিলেন । চটপট কফির পেয়ালা ভরে দিলেন ছোট ভাইকে ।
কফি গিলে খানিক বিশ্রাম নিয়ে আধা ঘণ্টা পর আবার বাইরে চক্কর দিতে চলে গেলেন অ্যালান।
মোটেও স্বস্তি পাচ্ছেন না।
সরু শাখা নদীটা এখন বাড়ির একশো গজের মধ্যে চলে এসেছে । আর উল্টা দিকের নদীটা হাসতে হাসতে চলে গেছে তার সামনে অপেক্ষায় থাকা নালাটার দিকে।
নদী নালা মিলে চারিদিকে ত্রিভুজ বানিয়ে ফেলেছে। ত্রিভুজের ঠিক মাঝে অ্যালানের বাড়ি আর গোয়াল ঘর। যেন একটা দ্বীপের মত। বন্দি।
জায়গার পরিমাণ মাত্র তিন একর। এই তিন একর জায়গার বাইরে উথাল পাথাল জল ।
তখনও বৃষ্টির মধ্যে থামার কোন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। পড়ছেই ঝুপ ঝুপ করে ।
বাড়ি ফেরার পথে গোয়াল ঘরে উঁকি দিলেন তিনি। আগের চেয়ে নিরাপদ অবস্থায় আছে গরুগুলো । এখনও অস্থির ।
মনে মনে ঠিক করলেন , এই নাগাড়ে যদি আরও এক ঘণ্টা বৃষ্টি হতেই থাকে তবে ওদের খোলা ছেড়ে দেবেন।
তারপর যা হবার হবে।
কুড়ি মিনিট পরে।
বাড়ির পিছনের কামরাতে বসে আছেন অ্যালান। মনে হল বৃষ্টিটা যেন আগের চেয়ে নরম শিথিল হয়ে গেছে।
কী মনে করে উঠে সামনের বারান্দার দিকে গেলেন।
ওখানে বড় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থামলেন একটু । বাইরে কোন আলো নেই। কামরার ভেতরেও নেই। কালো কফির মত অন্ধকার।
একদম খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন।
আচমকা বৃষ্টি থেমে গেল কোন রকম ইশারা না দিয়ে। তখনই বিকট শব্দ করে বাজ পড়লো কোথাও ।
চোখের কোনে বারান্দায় বাম দিকে কিসের যেন নড়াচড়া নজরে পড়লো ।
বিজলির চমক এত নিখুঁত ছিল, চোখে ভুল দেখার প্রশ্নই উঠে না। বারান্দার শেষ মাথায় একটা বাঘ দাঁড়িয়ে আছে।
আবারও বিজলি চমকে উঠলো ।
একই ভাবে আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে বাঘটা !
মুহূর্তখানিক সময় নিলেন তিনি। লাফ দিয়ে কামরার ভেতরে চলে গেলেন। যেখানে রাইফেল আছে।
রাইফেলের ম্যাগাজিন ভর্তিই ছিল । অমন ঘন রাতের জন্যই ব্যারেলের উপর ফিট করা ছিল টর্চ ।
বারান্দার দরজার ওখানে দাঁড়িয়ে কট মট করে চাইলেন যেখানে বাঘটা ছিল।
কী অদ্ভুত , বাঘটা তখনও একই জায়গায় ।
ওর শরীরে টর্চের আলোর বৃত্ত পড়তেই আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না। লাফ দিয়ে বারান্দার বাইরে চলে গেল।
অন্ধকারেই গুলি ছুঁড়লেন। দিশা হারিয়ে বাগানের কোথাও হারিয়ে গেল বুলেটটা ।
সম্ভবত গোয়াল ঘরের পাশ দিয়েই বাঘটা দৌড়ে গিয়েছিল। বাঘের গায়ের গন্ধ গরুগুলোর নাকে যেতেই আতঙ্কে এত রাতের মধ্যেও ওরা আবার হল্লা মল্লা শুরু করলো।
বন্দুকের শব্দ দূরে গিয়ে আবার প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো।
সব শব্দ মিলে কেমন মন খারাপ করা পরিবেশ।
আতঙ্কিত গবাদিপশুদের চেঁচামেচি থেমে যেতেই আচমকা যেন সুন সান হয়ে গেল চারিদিকটা ।
তিনি আবিস্কার করলেন বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ হল ।
মেঘের চলাচল নেই। দূর থেকে নদীর গর্জন ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।
আর সেই নদীর গর্জন ততটা বিপদজনক না। বন্যা হয়ে ফসল তলিয়ে যাবে না। কল কল শব্দ করে বয়ে যাচ্ছে নদীটা । সেই শব্দ বলছে, জল কমছে । সেই সব জল ওদের আসল বাড়ি, সমুদ্রে চলে যাচ্ছে।
বাড়ির চারিদিকে ছোট্ট এই জায়গাটার মধ্যে একটা বাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু সেটা নিয়ে একদম চিন্তিত না তিনি ।
বেচারা বাঘটার নিজেরই প্রচুর সমস্যা ।
জীবনে এত ভয় পাওয়া কোন বাঘ আগে পরে দেখেনি অ্যালান । এই ঝড়ো ঝড়ো বাদলার রাতে বারান্দাটা ছিল বাঘটার জন্য নিরাপদ একটা বন্দর । কতখানি বিপদে পড়লে মানুষের বারান্দায় এসে আশ্রয় নিতে পারে !
সকালের জলখাবার খাওয়ার সময় নদীর জল নেমে নেমে একদম প্রায় আগের মত সমতল হয়ে গেল। চকচকে নীল আকাশে সূর্য উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছিল ।
সকাল বেলা যখন গরুর পাল নিয়ে রাখালের দল মাঠের দিকে যাচ্ছিল , অ্যালান সবাইকে সাবধান করে দিলেন, বাড়ি থেকে বেশি দূর যেন না যায়।
এমন রোমাঞ্চকর রাতের পর , বাঘটার খিদে পেয়েছে , সন্দেহ নেই . .।
শেষ
TIGER IN A TYPHOON অবলম্বনে
দেনওয়া হল ভারতের মধ্য প্রদেশ রাজ্যের ধুপগড়ের চারপাশে উৎপন্ন একটি নদী।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন