সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বোলপুরের রেল

 ট্রেনে চাপলেই আমার মেজাজ অন্যরকম হয়ে যায়। অবিশ্যি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমার রেলের দৌড়ও কমতে কমতে এখন কলকাতা থেকে বোলপুর আর বোলপুর থেকে কলকাতায় এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাই বলে রেলযাত্রার রোমাঞ্চ একটুও কমেনি। হাওড়া থেকে বোলপুরের দূরত্ব ৯৫ মাইল হলেও, মনে হয় এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে গেলাম। কালো এঁটেল মাটির বদলে দেখা যায়, লাল ঝরা মাটি। লতাগুল্মের ঝাড়ের বদলে ভাঙা ডাঙার ওপর দেখা যায় বেঁটে বেঁটে খেজুর গাছ। রেলগাড়িও বাঁধের ওপর না চলে, কাটিং-এর মধ্যে নামে। সহযাত্রীদের ধরনটাও দেখি অন্যরকম। কালো, লম্বা, কোঁকড়া চুল, সাজের ঘটা কম, কিন্তু চালাক-চালাক মুখ, বন্ধুসুলভ হাবভাব।

এই দুই সীমানার মধ্যিখানে ৮০-৯০ মাইল পথের বিচিত্র ব্যাপার। একবার বর্ধমানে গাড়ি ছাড়ব-ছাড়ব করছে, এমন সময় একসঙ্গে অনেকগুলি যাত্রী উঠলেন। একজন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা আধা-বয়সি ভদ্রলোক, দুঃখী-দুঃখী মুখের একজন ৪০-৫০ বছরের মহিলা, তাঁর সঙ্গে একটি বছর তিনেকের খুকি আর কটকটে হলুদ হাওয়াই শার্ট গায়ে এক লম্বা-চুলো ছোকরা। জায়গা-টায়গা খুব বেশি ছিল না। আর আমাদের পাশেই দাঁড়াল। ভদ্রমহিলাকে একটু বসবার জায়গা করে দেওয়া হল। খুকিও বসল।
দুঃখী-দুঃখী মুখের ভদ্রমহিলা হলদে-শার্ট ছোকরার সামনে একটা বড় সাইজের হ্যান্ডব্যাগ খুলে ধরলেন। হ্যান্ডব্যাগে পাঁচ টাকা দশ টাকার নোট যেমন তেমন করে ঠাসা। ব্যাগের পেট ফুলো হয়ে আছে। ছোকরা তার ভেতর থেকে গোটা তিনেক দশ টাকার আর গোটাতিনেক পাঁচ টাকার নোট তুলে নিয়ে বলল, ‘তা হলে এগুলোও নেব?’ এই বলেই পিছোতে পিছোতে শেষটা কামরা থেকে নেমেই গেল!
সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রমহিলা খোলা অবস্থাতেই হ্যান্ডব্যাগটাকে টাকাকড়িসুদ্ধ আমাদের সামনের বেঞ্চিতে ফেলে, ‘কোথায় গেল? কোথায় গেল?’ বলে আর্তনাদ করতে করতে উঠি-পড়ি দরজার দিকে ছুটলেন। খুকিও এই বড় হাঁ করে তারস্বরে কান্না জুড়ে দিল।
আমরা শশব্যস্ত হয়ে উঠলাম। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ও কে? আপনার ছেলে নাকি?’ বাধা পেয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘না না, আমার ছেলে হতে যাবে কেন? এর আগে কখনও চোখেও দেখিনি। প্ল্যাটফর্মে দেখা হল, বলল আমার ভাইকে চেনে। আমেদপুরে দুজনেই এক আপিসে চাকরি করে। সেখানে নাকি নোট ভাঙানো যায় না। তাই আমার নোটগুলো ভাঙিয়ে দেবে বলে কিনা নোট নিয়ে গাড়ি থেকেই নেমে গেল!’
ভদ্রলোক বললেন, ‘নিয়ে গেল আবার কী! আপনিই তো একরকম গুছিয়ে দিলেন। বসুন। দেখি কী করতে পারি।’ বলে তিনিও নেমে গেলেন।
আমরা ভদ্রমহিলাকে টেনে বসিয়ে দিয়ে বললাম, ‘ও টাকার আশা ছাড়ুন। আপনার বাকি টাকাগুলোও আমেদপুর অবধি পৌঁছবে কি না সন্দেহ। এতক্ষণ যে ভাবে ব্যাগটা খুলে ফেলে রেখে দিয়েছেন, আমরা যে-কেউ একগোছা তুলে নিতে পারতাম!’
তিনি আঁতকে উঠে ব্যাগ বন্ধ করলেন। খুকি ‘খিদে পেছে’ বলে চ্যাঁচাতে লাগল। গাড়ি ছেড়ে দিল।
এমন সময় চলন্ত গাড়িতে খচমচ করে সেই ভদ্রলোক উঠে পড়ে, ভদ্রমহিলাকে তিনটে দশ টাকার তিনটে পাঁচ টাকার নোট দিয়ে বললেন, ‘নিন, ধরুন। কখনও কোথাও কোনও অচেনা লোককে বিশ্বাস করবেন না। এমনকী আমাকেও না।’
ভদ্রমহিলা তো অবাক, ‘ওমা! অচেনা কোথায়? বলল যে ভাইকে চেনে! নিজের থেকে আলাপ করল। পান কিনে দিল।’
আমরা আর থাকতে না পেরে ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কিন্তু তাকে ধরলেন কী করে?’
তিনি হাসলেন, ‘তাও পারব না? ওই তো আমার কাজ। ২৫ বছর ওয়াচ অ্যান্ড ওয়ার্ডে আছি না! বেরুবার ফটকে ক্যাঁক করে ধরেছি বাছাধনকে! অমনি নোটগুলো ছুড়ে ফেলে দিয়ে পগার পার! রেলওয়ে পুলিশকে জিম্মা করে দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হলে এত কষ্টে পাওয়া ছুটিটা মাঠে মারা যেত। আর দেখলেন তো কী ইনকম্পিটেন্ট! ছিনতাই করবি তো হলুদ শার্ট কেন? ভিড়ের সঙ্গে মিশে থাকতে হয় তাও জানিস না আবার চুরি করতে আসিস!’
আরেকবার যেই না জনাই রোডে গাড়ি থেমেছে, একজন যাত্রী বললেন, ‘আবার রোড কেন? জনাই নামই তো বেশ ছিল।’ আরেকজন বললেন, ‘তিন মাইল দূরে জনাই গ্রাম আছে কিনা, তার সঙ্গে তফাত করবার জন্য স্টেশনের নাম জনাই রোড।’
তৃতীয় যাত্রী বললেন, ‘মোটেই তিন মাইল নয়। বড় জোর দেড় মাইল।’ আগের বক্তা বিরক্ত হলেন, ‘বলছি মশাই পাক্কা তিন মাইল।’ পরের বক্তাও তেরিয়া হয়ে উঠলেন, ‘আজ্ঞে না মশাই, যা-তা বললে তো আর হবে না। দেড় মাইলের এক পা-ও বেশি নয়।’
কামরায় বেশ একটা গরম হাওয়া জমে উঠল। কোনও পক্ষেরই পৃষ্ঠপোষকের অভাব হল না। শেষ পর্যন্ত প্রথম ভদ্রলোক বললেন, ‘কী মুশকিল, এতে এত তপ্ত হবার কী আছে? আচ্ছা দেখাই যাক না, কার কথা ঠিক। আপনিই আগে বলুন অত নিশ্চয়তার সঙ্গে কী করে বলছেন দেড় মাইল?’
সে বলল, ‘আমি জানব না তো কে জানবে বলুন? একরকম বলতে গেলে আমি এখানকার একজন ইনহ্যাবিট্যান্ট। আজকাল কলকাতায় থাকলেও এইখানেই আমার বাড়ি। ওই পথের প্রত্যেকটা ইট-পাটকেল ঝোপ-ঝাড় নেড়িকুত্তো আমার চেনা।’
তখন অন্য লোকটিকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘তা হলে আপনিই বা তিন মাইল বলছেন কেন?’ ভদ্রলোক কাষ্ঠ হাসলেন, ‘বলছি কী সাধে! ওই তিন মাইলের প্রত্যেকটা ইঞ্চি ট্যাঙস্ ট্যাঙস্ করে হেঁটেছি বলে বলছি। দু’বছর আগে আমরা ফুটবল ম্যাচ খেলতে এলাম। ওঁরা স্টেশন থেকে গলায় ফুলের মালা পরিয়ে ট্রাকে চড়িয়ে খেলার মাঠে নিয়ে গেলেন। কী আর বলব মশাই, হেরে ভূত হয়ে গেলাম! আর এনারা করলেন কী, আমাদের খেলার মাঠে ফেলে, ট্রাকটি নিয়ে বিকট জয়ধ্বনি দিতে দিতে শোভাযাত্রায় বেরুলেন। অগত্যা হেঁটে স্টেশনে আসা ছাড়া গত্যন্তর রইল না। হুঁঃ!’
মধ্যস্থ তখন বললেন, ‘তা হলে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে দূরত্বটা দুই মাইল।’


লীলা মজুমদার



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...