সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

একটা কালো জলপাই

 ‘ শুধু মাত্র একটা কালো জলপাই ?’ অফিসার অবাক হয়ে চেয়ে রইল।

‘ ভুল শোনেননি।’ জবাব দিলাম। ‘ তবে ভেতরে দানা থাকতে হবে।’

লোকটা কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল। একবার মনে হল হার্টফেল করবে না তো। তেমন কিছু হল না । ব্যারাকুডা মাছের মত মুখটা কয়েকবার ফাঁক হয়ে গেল। কিছু বলবে বলবে করে নিজেকে সামলে নিল।
কেন বলল না কে জানে ?


‘ দেখুন এটা আপনার শেষ খাবার।’ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল অফিসার। ‘ ইচ্ছা করলেই আপনি যা খুশি বেছে নিতে পারেন। মাখন আর ক্রিম দেয়া গলদা চিংড়ির লেজ । ঝলসানো নরম বাছুরের মাংস সাথে রোসমারির সৌরভওয়ালা আভেন বেকড সবজী আর বাদামী আলু। আপেল পাই। যা খুশি।’


‘ কিচ্ছু চাই না।শুধু একটা একটা জলপাই। ’


‘ ভেতরে দানা থাকতে হবে তাই তো ?’ তম্বা মুখে বলল লোকটা।

‘ সেটাই তো বললাম নাকি ?’ হাসি মুখে জবাব দিলাম ।
সহজে রাগ করি না । সবাই জানে।


অফিসার দাঁড়িয়ে আছে। ধাক্কা সামলে নিতে পারেনি এখনও। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি অনেক অদ্ভুত আর বেখাপ্পা আচরণ করে। কেউ কেউ হাউ মাউ করে কান্না কাটি করে। কেউ একদম পাথর হয়ে যায়।
শেষ খাবার খেতে চায় না এমন মানুষ পাওয়া গেছে হরদম। কিন্তু দানাসহ মাত্র একটা জলপাই খেতে চায় এমন মানুষ ইতিহাসে আমিই প্রথম। খবরের কাগজে ব্যাপারটা আসবে আশা করছি।



মার্চ ১৪। ১৯৬৩।
আমার নাম, ভিক্টর হ্যারি ফিগার।
কাল ফাঁসি হবে আমার।
নাহ । কোন রকম বিকার নেই। মরতে এমনিতেই হবে। অপরাধ প্রমাণ হয়ে গেছে। সেলের বাইরে প্রহরীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে । খাবার চলে আসবে খানিক পর। সাফাই গেয়ে নিজের দোষ পাতলা করার কোন মানে দেখি না।


মিশিগানে জন্ম আমার, ১৯৩৫ সালে। জীবন ভালই কাটছিল । মা মারা যাবার পর বাপ হারামি মদ ধরল। আসলে মদে ওকে ধরল। কি সব দিন গেছে। চুরি শেখা শুরু করলাম। ১৬ বছর বয়সেই গাড়ি চুরি করে জেলে গেলাম। সেই শুরু। চুরির দায়ে আরও কয়েক বার জেলে গেছি। খারাপ লাগে না । রুটি আর মাখনের মত সহজ ব্যাপার।


‘ ব্যাক্তিগত জীবনে ছন্নছাড়া টাইপের মানুষ ছিলেন।’ মন্তব্য করলো অফিসার। ‘ নিদিষ্ট কোন জায়গায় থাকতেন না, বা পেশা ছিল না।’
জবাব দিলাম না। সব জানে ব্যাটা।
খামাখাই কথা ফেনাচ্ছে। পরে আড্ডা দিতে গিয়ে সবাইকে বলবে।
‘ গত জুলাই ১১ এই শহরে এসে একটা সস্তা ধরনের বোডিঙ হাউজ ভাড়া করে উঠেন । সেই দিনই শহরের নামকরা ডাক্তার এডওয়ার্ড বাটলিকে ফোন দেন। দিয়ে বলেন আপনার সাথে এক মহিলা আছে। সেই মহিলা হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে।ডাক্তার দরকার। তো বেচারা ডাক্তার আপনার কামরায় ঢোকার সাথে সাথে উনাকে আক্রমণ করে জিম্মি করে ফেলেন।’


‘ বলে যান।’ শান্ত গলায় বললাম।
‘ ডাক্তারের গাড়িতে করেই তাকে নিয়ে যান। পথের মাঝে ইলিনয় শহরটা আসতেই এক নলা শটগান দিয়ে ডাক্তারের মাথায় গুলি করে মেরে ফেলেন। লাশটা পাওয়া যায়নি।’
‘ মিসসিসিপিতে ফেলে দিয়েছি।


‘ শিকার হিসাবে ডাক্তারকে বেছে নিয়েছিলেন কেন ? বেচারার দুটো বাচ্চা ছিল। কোন পূর্ব পরিকল্পনা ?’
‘ নাহ। ইয়েলো পেইজ ঘাঁটতে ঘাঁটতে চিকিৎসকের নাম পেয়েছিলাম।’
‘ খুন করলেন কেন ?’
‘ড্রাগ নিয়েছিলাম। নইলে হয়তো করতাম না । জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করতাম ।’
‘পরে ডাক্তারের গাড়ি বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়লেন।’
‘ কপাল খারাপ।’
‘ শেষ খাবার হিসাবে জলপাই বেছে নিলেন যে ।’


‘মরার পর কবর দেবেন না ? জলপাইয়ের দানা থেকে নতুন একটা জলপাই গাছ জন্ম নেবে। গাছটা শিকড় দিয়ে আমার লাশের ভেতর থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে বেড়ে উঠবে। বড় হবে। আরও হাজার হাজার লাখ লাখ জলপাই ধরবে সেই গাছে।

' সব আমার জন্য। গাছের প্রাণ থাকে। গাছের চিন্তা চেতনা থাকে। এই জলপাই গাছটা আমার চিন্তা চেতনা নিয়েই বেড়ে উঠবে। গাছটা আসলে আমিই। মরার পরও দুনিয়ায় বেঁচে থাকব। দুই হাজার বছরও নাকি জলপাই গাছ বাঁচে। আমি ও অমন লম্বা আয়ু নিয়ে বেঁচে থাকব দুনিয়ায়। কত লম্বা সময়। মাঠে দাঁড়িয়ে সব দেখব। সব। সেই গাছের জলপাইয়ের দানা থেকে আরও গাছ হবে। সব জায়গায় আমি ছড়িয়ে যাব। হা হা হা।’
হাসতে লাগলাম ।


তৃপ্তির হাসি। সুখী একজন মানুষ আমি।
সুখী কারন ডাক্তারের লাশ এখনও পায়নি কেউ। কাউকে বলব না কি করেছি ওটা। কাউকেই না।


( সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...