পৃথিবীর প্রথম ভয়ের গল্প কী ভাবে শুরু হয়েছিল ?
গুহাযুগে , শিকার শেষে যখন সবাই আগুনের পাশে গোল হয়ে বসেছিল তখন , কেউ একজন বলেছিল কোন গল্প ?
কেমন ভয়ের গল্প ছিল সেটা ?
দাঁতাল বাঘের আক্রমণের গল্প ? নাকি অন্য কিছু ?
কেউ জানে না।
ভয়ের মাত্রা সংজ্ঞা বদলায়। একদম পিচ্চিবেলায় মায়ের মুখ থেকে শুনতাম ভয়াল সব গল্প। সব গুলোই গা ছমছমে।একটা গল্প অমন-
এক নিরালা শহরের শেষ মাথায় এক মহিলা তার ছোট দুই বাচ্চা নিয়ে একা থাকত। স্বামী চাকরির জন্য শহরে থাকে । এক সন্ধ্যায় অচেনা বুড়ো এক লোক এসে বলে , দয়া করে আমাকে রাতের বেলার জন্য থাকার জায়গা দেবেন ? আমি পথিক। যাব বহুদূর। কাল সকালে উঠেই চলে যাব।
মহিলার দয়া হল। থাকতে দিল বুড়োকে। রাতের বেলা ঘুমের ঘোরে মহিলা কেমন একটা শব্দ পেল যেন । বিড়াল দুধ খেলে অমন চক চক শব্দ হয়। ভাবল , হয়তো বিড়াল ! ঘুমিয়ে পড়ল। বাইরে শীতের ঠাণ্ডা রাত।
পরদিন সকালে উঠে দেখে বুড়ো মানুষটা নেই। অত সকালে উঠে কাউকে কিছু না বলে একাই চলে গেছে। জলখাবার বানিয়ে দেখে বাচ্চারা ঘুম থেকে উঠছে না।
কেন ?
ভাল করে দেখে, বাচ্চা দুটোর শরীরের খোসা শুধু পড়ে আছে। এক বিন্দু রক্ত নেই ওদের শরীরে। বুড়োটা আসলে রক্তচোষা ! ওরা সন্ধ্যার দিকে ঘুরে ঘুরে মানুষ খোঁজে। রক্ত খাওয়ার জন্য !
১৯৮১ সালের আমার মহল্লাটা ছিল একদম নিঝুম। দূরে- দূরে এক একটা বাড়ি ঘর। ফাঁকা বড় বড় প্লট। বাড়িঘর উঠেনি। ইয়া বড় বড় সব রহস্যময় পুকুর। কারণ ছাড়াই বুদবুদ উঠে যখন তখন। পুরো মহল্লা মাত্র দুটো ল্যাম্প পোস্ট। কেমন মড়া আলো ঝুপসি সব গাছপালা। শীতের রাতে তুলট কম্বলের নীচে শুয়ে মায়ের মুখে গল্পটা শুনে কেমন যেন লাগছিল। তখনই বাইরের দরজা খট খট করে উঠল। ফ্যাস ফ্যাসে গলায় কে যেন বলল- দরজাটা একটু খুলেন তো !
আতঙ্কে যেন মারাই যাব আমি।
পরে দেখি প্রতিবেশী বাপ্পির মা উনার ছোট ভাইকে পাঠিয়েছেন। এক ছটাক তেল দেয়া যাবে কি না! আলু ভর্তা বানিয়ে খাবেন নাকি ?
ভাইটার নাম নাড়ু। আমার দশা দেখে মিহি ভাবে হাসছিল।
রক্তচোষার গল্প তখন বেশ শুনতাম । খেলার মাঠ ছেড়ে সন্ধ্যা হবার অনেক আগেই বাড়ি ফিরতে হত।
ভূত- পেত্নী নামে একটা বটতলার বই পাই ক্লাস ফোরে পড়ার সময়।
নিউজ প্রিন্টে ছাপা । বাঁধাই ও একই রকম সস্তা কাগজে। প্রচ্ছদে হাস্যকর চেহারার ভূত। কিন্তু প্রাচীন ভিক্টোরিয়ান আমলের একটা দুর্গ আর গোলগাল ডাবের মত পূর্ণিমার চাঁদ বইটা দারুন আকর্ষণীয় করে ফেলেছে।
প্রকাশক সাহেব কোন গল্পের প্রকৃত লেখকের নাম দেননি। কেন কে জানে !
বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত সব গল্প ছিল সেটায়। গঙ্গাধরের বিপদ। ডাক্তারের রক্ষা নেই। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের- অকৃতজ্ঞ , মৃত ভাগ্নে এসে ডাকাতদের হাত থেকে মামা- মামিকে রক্ষা করে। । শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের- পিনটু । ভয়াল দিঘির পারে বিপদ থেকে কুকুরটা তার প্রভুকে রক্ষা করে।
অনেক বার পড়েছিলাম বইটা। প্রত্যেকবার নতুন মনে হত ।
আরও খানিক পর পাই ড্রাকুলা। বিখ্যাত এক পেপারব্যাক প্রকাশনী দুই খণ্ডে বইটার অনুবাদ বের করেছিল।
তখন বইটার এতই প্রচার হয়েছিল , না পড়েছে তাকে সবাই ধরে নিত- বেচারা ভীতুর ডিম।গোরস্তানের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় বা আচমকা বাদুর উড়ে গেলে শরীরটা রোমাঞ্চিত হত।
আমার শহরটা তখন যেন বেশ রহস্যময় ছিল।
খেলার মাঠ থেকে বাড়ি ফেরার সময় দেখতাম, কোত্থেকে যেন নীলচে কুয়াশা নেমে আসছে ধীরে ধীরে। শহরের শেষ মাথায় থাকত নিঃসঙ্গ একটা বাড়ি। যেটার বাসিন্দাদের সবার পরিচয় জানা যেত না। ফিকে বেগুনি আর গোলাপি কেমন একটা আলো জ্বলত বারান্দায়।
মাঝ রাতে কখনও কখনও কুকুর কেঁদে উঠত বীভৎস সুরে। গভীর রাতে বুট পরা ভারি পায়ে কে যেন হেঁটে যেত।
সব কিছুই রোমাঞ্চ জাগাত মনের গহীনে।
একদম শৈশবে একটা ভয়াল অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার। যেটার কথা আজও ভাবি। আজও সেই বাড়ির সামনে দাঁড়ালে অবাক হই। অলস অবসরে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করি ঘটনাটার।
দ্বীপান্তরে থাকার সময় প্রাচীন এক কবরস্থানের পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরতে হত প্রায়ই। ওখানে ছিল , অগুনতি মৃত সৈনিকদের কবর। লাল টকটকে মোম জ্বলত । ঝড়ের রাতে অশান্ত হয়ে যেত সাগরের জল। ডাকাতিয়া হাওয়ায় কেমন অপার্থিব দেখাত গোরস্তানটা । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যেখানে জাপানী সৈন্যরা আত্নহত্যা করেছিল সেই সুইসাইড ক্লিফে রাত কাটিয়েছিলাম। সবাই বলত মড়া সৈনিকেরা রাতের বেলা কাঁদে!
কোন বাজে অভিজ্ঞতা হয়নি। গভীর রাতে কান্নার শব্দ ছিল । সেটা পাহাড়ি পাখির ডাক।
লেখার শুরুর দিকে আমি আড্ডাবাজ ছিলাম। অনেকের মুখে সত্য হরর গল্প শুনে শুনে লেখার আইডিয়া মাথায় এসেছিল।
ভয়ের জ্যামিতি -আমাদের বাড়িতে শয়তান থাকে , লেখা হয়েছিল সেই সব আসরের গপ্পোবাজদের সাথে থেকে।
আর গুচ্ছ হরর গল্পগুলো লেখা হয়েছিল নানা সময়ে । নানান পরিবেশে।
ওরা আসে নিঝুম রাতে বইটার পরের পর্ব বের হল এবার মায়াকাননের সৌজন্যে। প্রায় এক যুগ ধরে বইটা আউট অভ প্রিন্ট।
প্রথম প্রকাশের পর অনেকের কাছ থেকেই উৎসাহ আর ভালবাসা পেয়েছিলাম।
এক যুগ আগে যারা বইটার জন্য ভালবাসা দেখিয়েছিলেন আজ তারা পছন্দ করবে এই সংকলন ? সময়ের সাথে ভয়ের মাত্রা ফিকে হয়ে যায়। শৈশবে যে স্যারকে দেখলে আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে যেত কয়েক বছর আগে দেখি সেই লোকটা একদম ছোট খাট। দুর্বল। হাতে বেতের বদলে কচুশাক। একদম কাহিল হয়ে গেছে।
তবে ওরা আসে নিঝুম রাতে দিয়েই আমার লেখালেখি শুরু।
আবার ফিরে এলো আপনাদের সামনে। এই গল্পগুলো নতুন পাঠকের কাছে ভাল লাগলে আনন্দিত হব।
শেষ বিচারের ভার পাঠকের হাতেই।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন