সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

শেখ আবদুল হাকিমের ‘অপরিণত পাপ’

 প্রায় ছ’বছর আগে চতুর্থ শ্রেণির রুচিহীন প্রচ্ছদে শোভিত হয়ে আড়াইশ পৃষ্ঠার একটি পেপারব্যাক বই বাজারে বেরিয়েছিল। ‘অপরিণত পাপ’ নামের সেই গ্রন্থটির রচয়িতা ছিলেন শেখ আবদুল হাকিম। বইটি সম্পর্কে কোনো আলোচনা কোথাও হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। আমাদের প্রশংসাকৃপণ সমালোচকরা হয়তো সে বই পড়েননি, কিংবা পড়লেও আলোচনার যোগ্য মনে করেননি। এ দেশে অনেক সম্ভাবনাময় লেখকের ভাগ্যে যা ঘটে, শেখ আবদুল হাকিমের ভাগ্যেও তাই ঘটেছে। নিরাভরণ সরল গদ্য লেখার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি উপেক্ষিত হয়েছেন। 


অথচ আমাদের এখানে গদ্যলেখক নেই বললেই হয়। যারা ভালো গদ্য লিখতে পারেন তারা নানা নিরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। কেউ কেউ কবিতায় সমর্পিত। জলের মতো বেগবতী সহজ ও সরল গদ্য আর লেখকদের আকৃষ্ট করছে না। এ সময়ে যদি কেউ সত্যিকার অর্থেই নিরাভরণ গদ্য লেখার ক্ষমতা নিয়ে জন্মান তাহলে তাকে স্বাগতম জানানোর দায়িত্ব আমাদের মতো সাধারণ পাঠকদের। যারা জটিল বাক্যবিন্যাস, ততোধিক জটিল ভাববস্তু থেকে পছন্দ করেন ‘গল্প’; যা অনায়াসে বর্ণিত। যার সঙ্গে পাঠকদের যোগ আছে। যে গল্প পড়তে গিয়ে আমাদের হাই ওঠে না, শেষ পর্যন্ত তরতর করে পড়ে যেতে পারি। শেখ আবদুল হাকিমের ‘অপরিণত পাপ’ সেই জাতীয় রচনা। 


প্রথমেই বলে রাখি ‘অপরিণত পাপ’ কোনো মহৎ সাহিত্যকর্ম নয়। লেখক সাদামাটা একটি গল্পই বলতে চেয়েছেন। একটি উচ্ছৃঙ্খল অধঃপতিত তরুণের পাপ ও ভালোবাসার গল্প। পুরোনো থিম, গল্পাংশও তেমন জোরালোও নয় কিন্তু লেখা হয়েছে পাকা হাতে। চরিত্রগুলি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। লেখক যখন বলেন–‘রিফ্রেশমেন্ট রুমে মামুন ছিল। আমরা দুজনে ঢুকতেই ও লাফিয়ে উঠল প্রথমে তারপর হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল আচমকা। বুঝলুম অনেকক্ষণ থেকেই টানছে।’ তখন তাঁর সংযত বর্ণনাভঙ্গির প্রশংসা করতেই হয়। এখানেই কাঁচা ও পাকা হাতের লেখা আলাদা হয়ে যায়। একজন পাকা লেখক চিহ্নিত হন; যিনি কথাশিল্পীর জন্য অত্যাবশ্যকীয় সংযম নামক গুণটি কবজা করেছেন। 


চরিত্র সৃষ্টির কঠিন ব্যাপারটিও শেখ আবদুল হাকিম অত্যন্ত সহজভাবেই করে গেছেন। অতিনাটকীয় চরিত্রগুলিও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। পাঠক একসময় (নিজের অনিচ্ছাতেই) চরিত্রগুলির জন্য ‘ফিল’ করতে শুরু করেছেন। ইতু নামের হতভাগ্য মেয়েটির জন্য ‘অপরিণত পাপ’-এর প্রধান এবং সম্ভবত একমাত্র চরিত্র শেখ যে দুঃখ পেয়েছে তা সঞ্চারিত হয়েছে পাঠকদের মধ্যেও। গল্পকার সাফল্য লাভ করেছেন।


আগেই বলেছি সমস্ত গল্পটিতে চমৎকার গতি আছে। তরতর করে পড়ে যাওয়া যায়। তার প্রধান কারণও অতিনাটকীয় চরিত্রসমূহ; যা শেষ পর্যন্ত তাদের প্রতি আমাদের কৌতূহল জিইয়ে রাখে। দুর্বল গল্পাংশ সত্ত্বেও আমরা বই এক বৈঠকেই শেষ করে ফেলি সেই কারণেই। লেখককে অবশ্যি তাঁর দুর্বল কাহিনি সম্বন্ধে সচেতন বলেই মনে হলো। সচেতন বলেই তিনি সমগ্র উপন্যাসটিতে বহু ছোটখাটো চমকের ব্যবস্থা রেখেছেন। উদাহরণ দিচ্ছি–
‘ইতুর মা খুব রোগা ও পরিচ্ছন্ন মহিলা। দেখলেই মনে হয় পবিত্র মানুষ। প্রথমে গিয়ে বললুম– আমি আপনাকে মাসিমা বলে ডাকব, তাতে আপনার আপত্তি আছে?
ইতুর মা বললেন– ও মা তুমি কি পাগলা ছেলে বাবা। আমি কি হিন্দু?’ 
অন্য জায়গায়–
‘একজন বলল– কী সাহেব, আপনি এখানে কি জন্য দাঁড়িয়ে আছেন? সকাল থেকে দেখছি যেন?
–খালেদকে খুঁজছি।
–ওনার বাড়ি তো তালাবন্ধ অনেকদিন থেকে। এখানে আর থাকেন না। মাঝে মাঝে বেড়াতে আসেন।
–কোথায় পাব ওকে বলতে পার? ওকে আমি খুন করব।’
আবার অন্য এক জায়গায়–
‘একটা টিকটিকি দেখে জামসেদ একবার উঠে গেল। বলল– ফ্রাই করে খাব ওটাকে। ধরে আনল অনেক কষ্টে। ধরতে গিয়ে ওটার লেজ খসে পড়ল। জামসেদ কাটা লেজটা কুড়িয়ে এনে টেবিলে রাখল। লাফাচ্ছিল আধকাটা লেজটা। মজা পেতে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল আমাদের মধ্যে। কেউ কিছু বলার আগে জামসেদ লেজটাকে তুলে নিয়ে সকলের গ্লাসে একবার করে ডুবিয়ে দিল। বলল–আজকে টিকটিকির লেজ ছোঁয়া অমৃত খাব।’

ছোটখাটো চমৎকার সব চমক যা আমাদের আগ্রহকে সজীব করে রাখে। লেখক এই সঙ্গে অশ্লীলতাও এনেছেন এবং এটি আমার মতে তাঁর সবচে বড় দুর্বলতা। আধুনিক উচ্ছৃঙ্খল তরুণের জীবন বর্ণনায় যৌনতা থাকবেই, কিন্তু তার প্রয়োগ যখন অশৈল্পিক হয় তখন তার আবেদন হয়ে ওঠে ভিন্ন। বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে লেখকের অশ্লীলতা দোষে দুষ্ট অংশগুলি তুলে দিলে ভালো হতো, কিন্তু সে লোভ সংবরণ করছি। 


‘অপরিণত পাপ’ প্রসঙ্গে আর একটি কথা বলা প্রয়োজন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আত্মপ্রকাশ’ নামের বিখ্যাত উপন্যাসটি শারদীয় দেশ পত্রিকায় ১৩৭৩ সনে প্রকাশিত হয়েছিল। ঔপন্যাসিক শেখ আবদুল হাকিম সম্ভব ‘অপরিণত পাপ’ রচনার প্রেরণা সেখান থেকেই পেয়েছেন। কারণ দুটি উপন্যাসে কিছু কিছু বিষয়ে এ রকম মিল চোখে পড়ে, যা কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মনে হয় ‘আত্মপ্রকাশ’-এর সুনীল ‘অপরিণত পাপ’-এর শেখ। ‘আত্মপ্রকাশ’-এর যমুনাই ‘অপরিণত পাপ’-এ ইতু। 


সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গদ্য একজন সচেতন তরুণ গল্পকারকে প্রভাবিত করবার সাংঘাতিক ক্ষমতা রাখে। এর প্রভাব এড়ানো শক্ত। শেখ আবদুল হাকিমও পারেননি। কিন্তু তবুও আমি শুরুতে যা বলেছি তার জের টানছি। বলছি শেখ আবদুল হাকিম নিঃসন্দেহে নিরাভরণ সরল গদ্য লেখার ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছেন। সেই সঙ্গে তাঁর রয়েছে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তি। 

একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে তাই আমি আশা করব তিনি তাঁর ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ করবেন। তাঁর কাছ থেকে ‘অপরিণত পাপ’-এর চেয়ে অনেক ভালো লেখা আশা করি। কারণ তিনি পরিণত লেখক। 

—হুমায়ূন আহমেদ

২৪ নভেম্বর ১৯৭৪, ‘পূর্বদেশ সাহিত্য’, দৈনিক পূর্বদেশ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...