ঘড়ি ধরে সাড়ে নয়টায় রাতের খাবার শেষ করে চৌধুরী পরিবার ।
সবসময় ।
নিয়ম ।
কার্ত্তিক -অগ্রহায়ণ মাসে শহরে শীতটা ঠিক টের পাওয়া যায় না । এখানে বেশ পাওয়া যায়।
টনকপুরকে শহর বললে ভুল হবে। মফস্বল এখনও ।
যদিও ডাকঘর- ব্যাংক সব আছে ।
মোড়ের ' লালু ভুলু বিপণী বিতান' -এর সামনে থেকে বাসে করে এক ঘণ্টায় জেলা শহরে পৌঁছে যাওয়া যায় ।
বাড়ির কর্তা মাহবুব চৌধুরী সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন । বিকেলে ফেরার সময় খবরের কাগজ নিয়ে বাসায় ফেরেন । পড়া শেষ করে ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেলে দেন ময়লার বিনে ।
নিয়ম করে কাজটা করেন । ভুল হবার জো নেই ।
পাশে একটা টেবিলে রেডিও বাজছে হালকা শব্দে । কোন একটা স্টেশনে পুরানো দিনের গান বাজে এই সময় । মাহবুব চৌধুরী শোনেন । স্মৃতিকাতর হতে ভাল লাগে, তাই ।
রান্নাঘরে খুট খাট শব্দ । বেসিনে জল গড়াচ্ছে । চীনামাটির বাউল আর তশতরীর শব্দ । রাতের খাওয়ার আয়োজন করছে গিন্নি সিতারা বেগম ।
ঘরের মেঝের কার্পেটের উপর বসে একগাদা খেলনা নিয়ে খেলছে চৌদ্দ পনের বছরের একটা ছেলে । অত বড় ছেলে , এই রকম কাঠের
ঘোড়া , মাটির পুতুল , টিনের পিস্তল নিয়ে খেলে না ।
এ খেলছে ।
যদিও সাথে রুবিজ কিউব আর অ্যাবাকাস আছে । তারপরও যে কেউ প্রথম দর্শনেই বুঝবে ছেলেটার খেলনাগুলো বড্ড বেশি শিশুতোষ ।
তবে ওর চেহারা দেখেই যা বুঝার বুঝে যাবে সন্দেহকারী ।
ছেলেটার মাথা ভর্তি এলোমেলো চুল । দুই চোখ বড় বড় স্বপ্নিল । বাস্তব দুনিয়ার কোন কিছুর ছাপ পড়েনি । সারাক্ষণ বোকার মত হাসছে । সুতার মত সরু লালা ঝরছে মুখ দিয়ে ।
মাহবুব চৌধুরী আর সিতারা বেগমের একমাত্র ছেলে ভানটু , বুদ্ধি প্রতিবন্ধী।
অনেক দুঃখ উনাদের ।
' ভানটু এত চুপচাপ কেন । ঠিক আছে তো ?' রান্নাঘর থেকে জানতে চাইল সিতারা বেগম ।
'ঠিক আছে । খেলছে আর কি ।' ফোঁস করে ড্রাগনের মত বড় একটা শ্বাস ফেলে বললেন মাহবুব চৌধুরী ।
' ও খুব বেশি চুপচাপ থাকলে আমার ভয় করে ।' কাজের ফাঁকেই কথা বলছে সিতারা বেগম । মায়ের মন ।
'জানি ।' ছেলের দিকে এক পলক দেখে নির্জীব গলায় উত্তর দিলেন পিতা ।
ততক্ষণে টেবিলে সব খাবারের থালা বাউল সাজিয়ে ফেলেছে সিতারা বেগম । এক কালে বুকে চাক্কু মারা সুন্দরী ছিলেন ।
বয়সের তুলনায় একটু বুড়ি বুড়ি হয়ে গেছে চেহারা । চোখে গোল ফ্রেমের চশমায় কেমন ইস্কুলের দিদিমণি মার্কা ভাব ।
কার্পেটের তলায় একটা ছবিওয়ালা বই লুকিয়ে রেখেছিল ভানটু । এ- তে আপেল । বি -তে বল মার্কা বই । সাথে প্রচুর ছবি । ওখানেই যে -তে জেব্রা ছবিটা দেখে দুই হাত শূন্যে তুলে কেমন ঘড় ঘড় গলায় বলল , ' চলে আসো ...চলে আসো ...।'
আরেকবার বলার আগেই রান্নাঘর থেকে এসে ছেলের পিছনে দাঁড়ালো সিতারা বেগম । জানতে চাইল , ' তোমার খিদে পেয়েছে ভানটু ?'
' বাবা , বাবা জিলিপি খাব আমি ।' আচমকা শিশুতোষ আধো আধো বোলে আবদার করে উঠলো ভানটু ।
ছেলের দিকে চেয়ে পিতা সুলভ স্নেহের হাসি হাসলেন মাহবুব চৌধুরী ।
আহারে বাপ আমার । বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো , বাপটা যদি সুস্থ হত !
'দুপুরে না জিলিপি খেয়েছ ভানটু ? এই বেলা আবার কেন ?' সস্নেহে বললেন ।
'আমি জিলিপি চাই ।' ভানটুর গলা কাঁদো কাঁদো ।
'ঠিক আছে । আগে রাতের খাওয়া শেষ কর । জিলিপি হবে ।'
সোফা থেকে উঠে এসে ছেলের হাত ধরলেন মাহবুব চৌধুরী । ' চলো খেতে চল ।'
খাওয়ার কথা শুনে খুশি হয়ে বাবার হাত ধরল ভানটু ।
উচ্চবিত্তের খাওয়ার টেবিল যেমন হয় । তিন জন মানুষের তুলনায় অনেক বেশি খাবার । প্রচুর রসুন দিয়ে পুঁইশাকের সৌরভ কেমন খিদে বাড়িয়ে ফেলে ।
তবে যত পদ হোক , খাওয়ায় তেমন রুচি নেই এই দম্পতির ।
খিদে লাগে । খেতে হয় । ব্যস - আর কিছু না।
ভানটুর জন্য এক গ্লাস চকোলেট দুধ রাখা আছে । পছন্দ করে যে । মুরগীর তরকারি আর চিকন চালের ভাত । হাত দিয়ে ভাত মেখে গোল্লা বানিয়ে খেলার চেষ্টা করছে ভানটু ।
'ভানটু , অমন করে না বাবা । খাবার নিয়ে খেলে না ।' হাত দিয়ে বাচ্চাকে সামাল দিলেন মাহবুব সাহেব ।
'জিলিপি চাই ।' মুখটা কাঁদো কাঁদো করে বলল ভানটু ।
'দেব, আগে ভাত খাওয়া শেষ কর ।' হালকা শাসনের সুর মাহবুব চৌধুরীর গলায় ।
' খাওয়া শেষে জিলিপি । লাল জিলিপি আর শাদা জিলিপি দুটোই হবে।' সায় দিল মা ।
চপ চপ করে বিচ্ছিরি শব্দ করে খাবার গিলতে লাগল ভানটু ।
'চিবিয়ে খাও ভানটু । অমন করে খেতে নেই । হজম হবে না ।' সিতারা বেগমের তিরস্কার ।
পিরানহার মত খেতে লাগল ভানটু ।
রাতের খাওয়া শেষ অতিরিক্ত ক্রিম দিয়ে এক পেয়ালা কফি পান করেন মাহবুব চৌধুরী ।
পেয়ালা নিয়ে চুমুক দেয়া মাত্র ভানটু খাওয়া শেষ করে চেঁচাল , ' আমার জিলিপি কই ?'
'ঠিক আছে ।' মাথা ঝাঁকালেন চৌধুরী । ' ভানটুকে কথা যখন দিয়েছি । দিতেই হবে । আমাদের এখন দরকার ছবি ।'
পেয়ালা রেখে উঠে গেলেন তিনি । ঢোলা প্যান্টের পকেট থেকে বের করলেন চাবির গোছা । ঝন ঝন করে উঠলো । চাবির সংখ্যা মনে হয় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি । ইস্কুল বা আপিসের দারোয়ানরা অমন চাবির গোছা নিয়ে চলাফেরা করে ।
কামরায় বা এই বাড়িতে অন্য কেউ থাকলে অবাক হত এই ভেবে , প্রায় সব জায়গায় তালা মারা কেন ?
বইয়ের আলমারি হতে কিচেনের ড্রয়ারেও !
একটা চাবি বেছে নিয়ে কিচেনের দেরাজের ড্রয়ার খুলে এক গাদা রেস্টুরেন্টের মেনু আর খাবারের ছবি বের করলেন মাহবুব চৌধুরী । বেছে বেছে যেটার মধ্যে জিলিপির ছবি আছে সেটা নিয়ে আবার সব ভেতরে রেখে তালা বন্ধ করে দিলেন ।
পিছন থেকে ভানটু চেঁচাচ্ছে , ' জিলিপি চলে এসো । জিলিপি চলো এসো ...।'
ফিরে তাকাতেই অবাক হয়ে গেলেন মাহবুব চৌধুরী ।
মুঠো ভর্তি কয়েকটা জিলিপি নিয়ে বসে আছে ভানটু । খাচ্ছে মনের সুখে । মিষ্টি সিরা গড়িয়ে নামছে ।
থতমত খেয়ে গেলেন চৌধুরী ।
কি ভাবে সম্ভব ?'
' জিলিপি পেল কোথায় ভানটু ?' অবাক গলায় উচ্চারন করলেন মাহবুব চৌধুরী । ' মানে, ছবি লাগছে না ওর ?'
সিতারা বেগম চুপচাপ বাসন গুছাচ্ছে ।
' সিতারা , ছবি ছাড়াই এই প্রথম জিনিস আনল ভানটু ।' আগের মতই পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন চৌধুরী । ' কি ভাবে সম্ভব ?'
' শুধু মনে হয় জিলাপি আনতে পারে ।' হাসি মুখে বলল সিতারা বেগম । ' জানোই তো খোকা জিলিপি কত পছন্দ করে । আর তো কিছু আনতে দেখলাম না ।'
'মা তুমি খাও । জিলিপি খাও ।' মায়ের দিকে আধ খাওয়া জিলিপি থেকে বেছে আস্ত একটা এগিয়ে দিল ভানটু ।
' তুমি খাও বাবা ।, ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল সিতারা বেগম । ' ভাল করে চিবিয়ে খাবে ...।'
আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলেন মাহবুব চৌধুরী ।
ভাবছেন ।
চেহারায় চিন্তার ছাপ ।
সেই রাতে পেট ব্যাথায় চেঁচাতে লাগল ভানটু ।
রাত তখন এগারোটা । টনকপুরে বলতে গেলে গভীর রাত ।
' পেট ব্যাথা করছে মা । অনেক ...।' তলপেট চেপে ধরে হাউ মাউ করে কাঁদছে ভানটু । দুই চোখ ভর্তি জল । চেহারা দেখেই বুঝা যায় - কষ্ট পাচ্ছে ।
ছেলের কপালে হাত দিয়ে পাশে বসে আছে সিতারা বেগম । হাতে থার্মোমিটার । দরজায় বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন মাহবুব চৌধুরী ।
চিন্তিত ।
'কিচ্ছু হবে না আমার বাবার । দেখ সব ঠিক করে ফেলছি ।' ছেলেকে বলছে সিতারা বেগম । ' হাঁ কর দেখি । মনে হয় জ্বর হয়েছে । '
ভানটুর মুখে থার্মোমিটার পুরে দিতেই থু করে ফেলে দিল সেটা ।
'পেট ব্যাথা হচ্ছে মা ...।' চেঁচাচ্ছে ভানটু ।
'জিলিপি নয়তো ?' কামরার ভেতরে ঢুকে ভারি গলায় বললেন চৌধুরী ।
'আগে কি জিলিপি খায়নি ? আগে হয়েছে অমন ? ' যুক্তি দেখাল সিতারা বেগম ।
'হ্যাঁ, কিন্তু খেয়াল করেছ ? ছবি লাগছে না ভানটুর ।' উত্তেজিত গলায় পাল্টা যুক্তি দেখাচ্ছেন বাবা । ' মানে কি ? ইচ্ছা মত যখন খুশি তখন জিলিপি এনে খাচ্ছে । শুধু জিলিপি আনছে সেটা কে বলল তোমাকে ? হয়তো ওর ক্ষমতা বেড়ে গেছে । যা মর্জি তাই আনছে । খেয়ে ফেলছে । হতে পারে না তেমন ?'
ব্যাথায় দরদর করে ঘমাছে ভানটু । মুখটা লাল হয়ে গেছে ।
' তুমি ডাক্তার হরি নারায়ণ বাবুকে ফোন দাও না ।' স্বামীর দিকে চেয়ে অনুরোধ জানালেন । ' দরকার হলে গাড়ি নিয়ে তুমি যাও উনাকে আনতে ।'
' উনি আজকাল নাইট কলে আসেন না । চোখের সমস্যা উনার । সন্ধ্যার পর একদম চোখে দেখেন না। বিকেল বেলাই চেম্বার বন্ধ করে বাসায় চলে যান ।'
'তারপরও ফোন দাও ।'
'বললাম তো , রাতে উনি বাড়ি থেকে বের হবেন না । একদম অর্থহীন হবে উনাকে আনতে গাড়ি নিয়ে যদি আমিও যাই ।'
'তাহলে অন্য কোন ডাক্তার ?'
' আর কোন ডাক্তার আছে টনকপুরে ?'
তখনই আবার চেঁচিয়ে উঠলো ভানটু ।
দৌড়ে বসার রুমে চলে গেলেন মাহবুব চৌধুরী । কালো রঙের পুরানো দিনের ফোনের রিসিভার তুলে তর্জনী দিয়ে ডায়াল করতে লাগলেন ।
'কাকে ফোন দিচ্ছ ?'
পিছন পিছন সিতারা বেগম দৌড়ে এসেছে ।
'হাসপাতালে ।'
'অসম্ভব ।' চেঁচিয়ে উঠল সিতারা বেগম । ' ভানটুকে হাসপাতাল নিয়ে গেলে বিপদ আরও বাড়বে ।'
'অন্য কোন উপায় আছে তোমার কাছে ?' থমথমে গলায় কৈফিয়ত তলব করলেন চৌধুরী ।
টনকপুরের মত জায়গায় হাসপাতাল থেকে এ্যাম্বুলেন্স পাওয়া আর মুরগীর দুধ পাওয়া সমান কঠিন ।
টাকার যাদু শব্দটা যারা জানে না তারা আসলেও সরল ।
মাহবুব চৌধুরীর মত ধনী লোককে সবাই খুশি করতে চায় ।
এ্যাম্বুলেন্স এলো ।
তখনও চেঁচাচ্ছে ভানটু ।
খানিক পর দেখা গেল হাসপাতালের লবিতে বসে আছেন চৌধুরী দম্পতি । অপেক্ষা করছেন ।
অনেক লম্বা সময় অপেক্ষা করার পর হাসিখুশি তরুণ এক ডাক্তার এগিয়ে এলো ।
'আমার ছেলে ? ও ঠিক আছে তো ?' চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো সিতারা বেগম ।
'একদম চিন্তা করবেন না। ' চেহারাটা সিরিয়াস বানিয়ে পেশাদারি একটা ভাব ভঙ্গি করে বলল তরুণ চিকিৎসক । ' ফুড পয়জনিক হয়েছিল । পেট ওয়াশ করতে হয়েছে । কি আর করা ? এখন একদম নিরাপদ । আউট অভ ডেঞ্জার । কিন্তু তারপরও সারারাত আমাদের অবজারভেশনে রাখব । কাল সকালে বা দুপুরে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন খোকাকে ।'
মুহূর্তেই থমকে গেল শোকাকুল দম্পতি ।
'সারারাত রাখবেন ?' থমথমে গলায় বললেন মাহবুব চৌধুরী । ' এর কোন দরকার আছে কি ? আমাদের ছেলে বাড়িতেই বেশি সবছন্দ বোধ করে । বাড়ির বাইরে ও থাকতে পারে না । আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যায় । '
' একটুও চিন্তা করবেন না।' হাসিটা আবার ফিরে এলো তরুণের মুখে । ' আমাদের এখানে শিশু বিভাগ আছে । একদম যত্নে রাখব । টিভি আছে । কার্টুন নেটঅয়ারক চ্যানেল আছে । ভিডিও গেইম দেয়া যাবে । আরও আছে প্রচুর বই । টিনটিন আর অরন্যদেবের কমিকস , চাচা চৌধুরী ...।'
আরও কি কি বলতো তরুণ কে জানে । শক্ত মুখে থামিয়ে দিলেন মাহবুব চৌধুরী । ' না । মোটেই না ।'
থমমত খেয়ে গেল চিকিৎসক ।
'মানে আমাদের ছেলে যদি থাকে আলাদা প্রাইভেট রুমের ব্যবস্থা করতে হবে ।' তাড়াতাড়ি যোগ করলেন মাহবুব চৌধুরী । ' সাথে আমি আর আমার মিসেস ও থাকবে । কিন্তু টিভি বা ছবিওয়ালা বই দেয়া যাবে না ।'
আক্ষরিক অর্থেই ব্যাক্কলের মত চেয়ে আছে ডাক্তার ।
হয়তো ভাবছে -এরা আবার কেমন পদের বাপ মা ?
' ঠিক আছে ।' ক্লান্তিকর রকম সুদীর্ঘ বিরতির পর জবাব দিল তরুণ চিকিৎসক । অহং বোধে লাগায় চেহারা থমথমে হয়ে গেছে । ' তাই সই । আমি আপনাদের জন্য রুম বুকিং করার জন্য ব্যবস্থা করছি ।'
চলে গেল সে ।
পরদিন সকাল ।
উজ্জ্বল একটা কামরা পেয়েছে ওরা । দেয়ালের রঙ দুধের চেয়ে শাদা । তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রনের ব্যবস্থা আছে । ভানটুর বিছানা, হাসপাতালের আর সব বিছানার মত লোহার তৈরি না ।
আরামদায়ক তোষক । নীল শাদা চেক চাদর । তাতে হাসপাতালের ছাপ নেই । মনেই হয় না কোন কেবিন ।
বিছানায় খেলনা নিয়ে বসে আছে ভানটু । খেলছে । মুখে হাসি । পাশে সিতারা বেগম । খানিক দূরে খটখটে একটা কাঠের চেয়ারে মাহবুব সাহেব বসে খবরের কাগজ পড়ছেন । সেই তরুণ চিকিৎসকের কাছ থেকে ধার চেয়ে নিয়েছেন । পড়া হলেই ফেরত দেবেন ।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো শাড়ি পড়া সুন্দর মত একটা মেয়ে । গায়ে শাদা আপ্রন দেখে বুঝা যায় ডাক্তারনী ।
' শুভ সকাল ।' হাসি মুখে বলল সে । ' আমি ডাক্তার কুমকুম । কেমন আছেন সবাই । আর ...এই নিশ্চয়ই আমাদের ভানটু বাবু ।'
কুমকুমের মুখে হাসি । উজ্জ্বল দাঁত । চোখে মায়া ।
'হ্যাঁ... হ্যাঁ । আমি... মাই নেইম ভানটু ।' খামখাই খুশি খুশি গলায় জবাব দিল ভানটু ।
মেহমান পছন্দ করে সে ।
'ধন্যবাদ ডাক্তার কুমকুম ।' খবরের কাগজটা ভাঁজ করে পাশে রেখে উঠে দাঁড়ালেন মাহবুব চৌধুরী । প্যান্টের পকেটে দুই হাত রেখে সোজা চলে গেলেন কাজের কথায় । ' সকাল বেলায় দেখলাম ভানটুর শরীর একদম ভাল হয়ে গেছে । আমরা ওকে বাড়ি নিয়ে যেতে চাইছি ।'
'কোন সমস্যা নেই ।' হাসি মুখে বলল কুমকুম । ' ডাক্তার আমজাদ আমার বস । উনি খানিক পর জানাবেন কখন আপনার ছেলেকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন । কিন্ত এই সময়টাতে যদি আপনার সাথে খানিক কথা বলতে পারতাম ভাল হত । ভানটুর ব্যাপারেই আর কি ।'
অযথাই যেন চমকে গেল সিতারা বেগম ।
'আমার মনে হয় যত দ্রুত সম্ভব আমাদের ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরাটাই উচিৎ ।' হব হব করে বললেন মাহবুব চৌধুরী ।
'নিশ্চয়ই ... নিশ্চয়ই ।' মাথা ঝাঁকিয়ে তাল দিল কুমকুম । ' তারপরও কিছু প্রশ্ন করতেই হচ্ছে আমাকে । আমি শিশু বিভাগের ডাক্তার সেই সাথে ' নারী ও শিশু'দের নিয়ে কাজ করে অমন একটা সংস্থার সাথে জড়িত । তো খোঁজ নিয়ে দেখলাম আপনার ছেলেকে ইস্কুলে পাঠাননি । কখনই । ক্লাস ওয়ানেও ভর্তি করাননি কখনও । মনে হয় না ইস্কুল জিনিসটাই ভানটু চেনে ।'
' দরকার মনে করিনি ।' খানিকটা চাঁছাছোলা গলায় বললেন মাহবুব চৌধুরী ।
'আসলে ইস্কুল জায়গাটা ভানটুর জন্য ঠিক মানান সই না। ' তাড়াতাড়ি সংশোধন করলো সিতারা বেগম । ' জানেন বোধ হয় । ও খানিক আলাদা । অন্য বাচ্চাদের সাথে মিশতে পারবে না । আর বয়সের সাথে ওর ব্রেইন মানে ঠিক ... অন্য রকম ছেলে।'
'তা জানি তো । ' জান প্রান দিয়ে যুক্তি দেখাচ্ছে কুমকুম । ' একদম প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের জন্যও অন্য রকম আলাদা ইস্কুল আছে । সেখানে বাচ্চারা শেখে । পড়াশুনা করে । অমন প্রতিবন্ধী বাচ্চা আজও পাইনি যেখানে কাউকে কিছু শেখাতে পারিনি আমরা ।'
ইস্কুল শব্দটা কানে যেতেই ভানটুর চেহারা কেমন আলো ঝলমলে হয়ে উঠলো ।
'আপনার গায়ে পড়ে সাহায়্য করতে চাওয়ার মনোভাব খুবই ভাল কুমকুম ম্যাডাম । কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের বাচ্চা নিজেরাই সামাল দিতে পারব ।' শান্ত ভাবেই কথাগুলো বললেন মাহবুব চৌধুরী । তবে চেহারায় কৃত্রিম ভদ্রতা নেই আগের মত ।
'আমার ছেলে অনেক ভাল ।' কেন যেন খানিক আবেগি গলায় বলল সিতারা বেগম । ভাবাবেগে গলা কাঁপছে মায়ের । ' খুব ভাল । অন্য রকম । অনেক স্পেশাল । সবার চেয়ে আলাদা । থাকুক আমাদের সাথে।'
'না করলো কে।' হাসি মুখে বলছে কুমকুম । 'তারপরও ওকে প্রতিবন্ধী ইস্কুলে পাঠান । বেড়ে উঠুক অন্যদের সাথে । অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলুক । দেখবেন একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে । সুস্থ যুবক হিসাবে বেড়ে উঠবে । কথা দিচ্ছি ।'
তখন একটা কাণ্ড হল ।
কুমকুমের হাতে একটা মেডিক্যাল জার্নাল ছিল । কথা বলতে বলতে ভানটুর বিছানার পাশের টেবিলের উপর রেখেছে । চিলের মত থাবা দিয়ে সেটা তুলে নিল ভানটু । ' ছবি ...ছবিওয়ালা বই ।'
সে রকম একই গতিতে ছেলের হাত থেকে জিনিসটা ছিনিয়ে নিলেন মাহবুব চৌধুরী । ' না ভানটু ...না।'
'বাবা ছবিওয়ালা বই চাই আমার ।' কেঁদে ফেলল ভানটু ।
' না , বলেছি । না।' বাজখাই গলায় চিৎকার করে উঠলেন মাহবুব চৌধুরী ।
বন্ধ কামরার ভেতরে গমগম করে উঠলো উনার কণ্ঠ । এতই কর্কশ , কুমকুম আর সিতারা বেগম দুইজনেই চমকে গেল ।
ভানটু কাঁদছে ।
'আপনি অযথাই অমন করছেন ।' দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করলো কুমকুম । ' সামান্য একটা জিনিস । দিন ওকে। আমার লাগবে না । দরকারি কিছু না।'
'আপনাকে নাক গলাতে হবে না।' খেঁকিয়ে উঠলেন মাহবুব চৌধুরী ।
'আমার ছবিওয়ালা বই চাই ।' হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল ভানটু ।
ছেলেকে বুকে চাপড়ে ধরে মাথায় হাত বোলাতে লাগল সিতারা বেগম ।
অবাক হয়ে এই ফ্যামিলি ড্রামা দেখছিল কুমকুম ।
কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না ।
'কাঁদে না বাবা কাঁদে না।' পাগলের মত ছেলেকে সান্তনা দিচ্ছে সিতারা বেগম । ' আমরা বাসায় যাব । ওখানে তোমার সব খেলনা আছে । আবার খেলতে পারবে বাবা ।'
পুরা পরিবার অসুস্থ । সব গুলোর চিকিৎসা দরকার । মনে মনে ভাবল কুমকুম ।
'আমরা ওকে ছবিওয়ালা বই দেই না।' মনে হল চোখের জল আড়াল করার চেষ্টা করছেন চৌধুরী ।
'এটা একটা সাধারণ ম্যাগাজিন । দামি কিছু না।' এই প্রথম তেড়ে মেরে জবাব দিল কুমকুম । ' লক্ষ টাকা দাম না । নিয়ে গেলে আমি কাঁদতাম না । বাচ্চার হাতে ছবিওয়ালা বই দিলে বাচ্চার ক্ষতি হয় জিন্দেগীতে প্রথম শুনলাম । শিখলাম আপনাদের কাছ থেকে ।'
'আপনাকে শেখানোর জন্য কোন আগ্রহ নেই আমাদের ।' গলার পর্দা তুলে ফেললেন পিতা । ' আমরা ঠিক করব আমাদের ছেলের জন্য কোনটা ভাল আর কোনটা খারাপ । কথায় বলে না মায়ের চেয়ে দরদ যে বেশি দেখায় সে ডাইনি । হাসপাতালের বিল শোধ করা আছে । আমরা চলে যাচ্ছি । '
'এইভাবে চলে যেতে পারেন না।' ফুঁসে উঠলো কুমকুম ।
'পারি।' পিশাচের মত হাসলেন চৌধুরী । ' পারলে বাঁধা দেবেন । আমন্ত্রণ রইল ।'
খানিক পর।
আলোকিত লবি দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে পরিবারটা । হাসি হাসি মুখে চারিদিকটা দেখছে ভানটু ।
জীবনের প্রথম এক সাথে এত মানুষ দেখল ।
এত আলো !
বিচিত্র সব জিনিসপত্র । লিফট । অসুধের বোতল । অক্সিজেন সিলিন্ডার । ইনজেকশন । মুখ ভর্তি সবজি নিয়ে চিবিয়ে লাল পিক ফেলছে দারোয়ান । পিক লাল হল কিভাবে ?
একটা ল্যাংড়া লোক হুইল চেয়ারে বসে যাচ্ছে । অমন চেয়ার সবাই ব্যবহার করে না কেন ? চলাফেরার সুবিধা হত না তাহলে ?
চোখে পট্টি বেধে বসে আছেন আরেক জন । কেন ?
রোগা সিরিঙ্গে চেহারার একজন লোক মহিলা ডাক্তারকে বলছে - আফা তিন দিন দইরা পাইখানা হয় না ।
মজাই মজা । ইস ।
' বাচ্চাটার জন্য আসলেই খারাপ লাগছে ।' আড়ালে দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখে বলল তরুণ ডাক্তার । ' কিছু করা যায় না ?
'যায় তো ।' থমথমে গলায় বলল কুমকুম । ' আচমকা একদিন ওদের বাড়িতে যাব আমি । দেখে আসব বাড়ির ভেতরের পরিবেশ । তুমি খোঁজ নাও চৌধুরী পরিবারের অতীত নিয়ে । সব পরিবারের একটা অন্ধকার ইতিহাস থাকে । এদের ও আছে । এদের কুণ্ডলী খুলে ফেল । তাহলেই জানা যাবে কেন অমন করছে এরা । '
কুমকুমের চোখ বরফের মত ।
হাসপাতালের বাইরে গিয়ে কি মনে করে ফিরে চাইলেন মাহবুব চৌধুরী ।
একদম সোজা কুমকুমের চোখের উপর চোখ পড়লো । লোকটার তীব্র চাহনি দেখে আরও একবার নতুন করে বিস্ময়ের ঢেউ ধাক্কা দিল কুমকুমের মগজে ।
বাড়ি ফিরে পরিচিত পরিবেশ পেয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচল ভানটু ।
'যাও নিজের রুমে গিয়ে খেল ।' তুলার একটা বেঢপ পুতুল ভানটুর হাতে দিয়ে বলল সিতারা বেগম ।
খুশি হয়ে সেটা নিয়ে চলে গেল ভানটু ।
'যাক ঠিক মত বাড়ি ফিরতে পেরেছি ।' স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল সিতারা বেগম ।
' তুমি গিয়ে বিশ্রাম নাও । অনেক ধকল গেছে তোমার । আমি নিজেই কফি বানিয়ে নেব । তুমি নেবে নাকি ? ' স্বামীর প্রস্তাব ।
' আমিই বানাচ্ছি । আছা সেই মহিলা কুমকুম না চুমচুম । কি মনে হয় তোমার ? কোন রকম ...?'
'কিছু করবে বলে মনে হয় না। নতুন চাকরি পেয়েছে হয়তো । কাজ আর ক্ষমতা দেখানোর মওকা পাচ্ছে না । কয়েকদিন পরই উৎসাহ থিতিয়ে যাবে ।'
'কিন্তু তোমার কি মনে হয় ? ' সোফায় গা এলিয়ে বসে বলল সিতারা বেগম । ' আমার তো মনে হয় উনার কথা একটু ভেবে দেখা উচিৎ । হয়তো...উনি সত্যি বলছেন । কোন স্পেশাল ক্লাস বদলে দিতে পারে না ভানটুর জীবন । অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলাধুলা করলে হয়তো...।'
কেমন হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন চৌধুরী ।
মায়ের মন । ওই দিকে বলেই যাচ্ছে সিতারা বেগম । ' কয়েকদিনের জন্য দিই না হয় ? দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা করে রইল সেখানে । আমরা রইলাম পাশে । চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি !'
চুপ করে রইলেন চৌধুরী ।
'আমরা দুইজনে না হয় একবেলা বাইরে গিয়ে খেয়ে আসি কোন রেস্টুরেন্ট থেকে ।' কেমন স্বপ্নিল গলায় বলল সিতারা বেগম । ' সিনেমা হলে গিয়ে একটা মুভি দেখি না হয় ? কত বছর ধরে মুভি দেখি না। টিভিও দেখা হয় না কতকাল !'
'আমি জানি তুমি ক্লান্ত ।' ভারি গলা মাহবুব চৌধুরীর । ' আসলে কাউকে পেলে ভাল হত যার কাছে এইসব বোঝা শেয়ার করতে পারতাম আমরা ।
সেটা সম্ভব না, তুমি ও জানো । ভানটু আমাদের বাচ্চা । দায়িত্ব আমাদের । অন্য কারোও না । ওকে বাসায় রেখে যে ঘণ্টা খানেকের জন্য আমরা বাইরে যাব সেটাও বিপদজনক । ওই সময়ের মধ্যে না জানি ও কি কি দেখে ফেলবে । অথবা কি সব এনে ফেলবে ?'
যুক্তিগ্রাহ্য জবাব খুঁজে পেলেন না সিতারা বেগম ।
ভেতরের কামরায় বসে আছে ভানটু । গভীর ভাবে মনোযোগ দিয়ে স্মৃতি ঘাঁটছে । দম নিচ্ছে বড় বড় করে । আচমকা দুই হাত সামনে বাড়িয়ে চোখ বন্ধ করে মনের সব শক্তি জড়ো করে বলল , ' চলে এসো ... চলে এসো ।'
সাথে সাথে ভানটুর হাতে ভোজবাজির মত চলে এলো হাসপাতালে দেখা সেই রঙিন মেডিক্যাল ম্যাগাজিনটা ।
খুশি হয়ে গেল সে। পাতা উল্টে অবাক হয়ে গেল ।
ছবি আছে !
ট্রে-তে করে চিনা মাটির পট ভর্তি কফি , দুটো পেয়ালা , চিনির টোফা এইসব নিয়ে এসে মাহবুব চৌধুরী দেখেন সোফায় বসে থেকেই ঘুমিয়ে পড়েছে উনার গিন্নি ।
বেচারি ।
আগের মত ধকল নিয়ে পারে না। কাল সারারাত থেকে বাসায় ফেরা পর্যন্ত চোখের পাতা এক পলের জন্য ও এক করেনি ।
আলতো করে হাত রাখলেন মাথায় । নরম গলায় ডাকলেন প্রথম যৌবনের মত , ' সিতারা , কফি নেবে ? অনেক বছর পর বানালাম ।'
চোখ মেলেই বিনিময়ে সুন্দর হাসি উপহার দিল , ' আরেহ কেমন যেন তন্দ্রা লেগে গিয়েছিল । কেন ঝামেলায় গেলে ?'
ধড়মড় করে উঠে বলল , ' ভানটু গেল কোথায় ?'
' ও ঘুমিয়ে আছে । চিন্তা বাদ দিয়ে কফি নাও । রিলাক্স কর ।' পেয়ালায় কফি ঢালতে ঢালতে বললেন মাহবুব চৌধুরী ।
'একটু উঁকি মেরে দেখে আসি ।'
উঠে গেল সিতারা বেগম ।
ভানটুর কামরা পাশেই । দরজা ভেজানো । হালকা ধাক্কা দিতেই খুলে গেল । এই দুপুর বেলায় ও কামরার ভেতরে বড় বড় ল্যাম্পশেডে আলো জ্বলছে । জানালা নেই এই কামরায় ।
মেঝেতে বসে কি যেন চপ চপ করে শব্দ করে খাচ্ছে ভানটু । পিছন দিকে ফিরে বসে থাকায় চেহারা দেখা যাচ্ছে না । কিন্তু ওর হাত বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় লাল তরল গড়িয়ে পড়ছে ।
কারন ছাড়াই বুকটা কেমন ধরাস করে উঠলো ।
অবচেতন মন বলছে বিচ্ছিরি কিছু হয়েছে ।
'ভানটু ...বাবা কি খাবার ?' ঢোক গিয়ে বলল সিতারা বেগম ।
তখনই পায়ের সামনে পেল মেডিক্যাল ম্যাগাজিনটা । খোলা পাতার ছবিটা দেখে চমকে গেল বুকটা ।
সর্বনাশ !
তখনই ফিরে চাইলো ভানটু । ওর মুখ ভর্তি খাবার । চিবুচ্ছে । ঠোঁটের দুই কষা বেয়ে দরদর করে নামছে তাজা রক্ত ! হাতে কাঁচা মাংস কিসিমের কি যেন !
চোখা চোখি হতেই হাসল ভানটু । আধো ছায়া ছায়া আলোতে পিশাচের মত লাগছে ওকে ।
তখনই বুকের মধ্যে তীব্র ব্যাথার ঝলক টের পেল সিতারা বেগম । যেন লক্ষ কোটি সূচ ফুটিয়ে দিয়েছে কেউ ।
মাথার ভেতরে আলোর বর্ণালী ।
বুকটা চেপে ধরে মেঝেতে পড়ে গেল সে ।
মারা যাবার আগে বুঝল , মেডিক্যাল ম্যাগাজিনে মানুষের শরীরের লিভারের ছবি দেখেছে ভানটু । সেটাই এনে খাচ্ছে এখন । মরার আগে ছেলের জন্য বুক ভরা কষ্ট নিয়ে গেল ।
নরখাদক ছেলে তার । মানুষের লিভার খাওয়া শুরু করছে । এখন হয়তো শুধু এটাই খাবে । কে জানে ? কঠিন পৃথিবীতে কে দেখবে ওকে ?
পতনের শব্দ শুনে যখন মাহবুব চৌধুরী দৌড়ে এসে দেখতে পেলেন, গিন্নি মরে পড়ে আছে কার্পেটের উপর । পাশে ভানটু বসে বসে মানুষের কাঁচা লিভাব খাচ্ছে মনযোগ দিয়ে।
মায়ের ব্যাপারে উদাসীন ।
কেমন একটা শব্দ হতেই ঘুম ভেঙ্গে গেল মাহবুব চৌধুরীর ।
সোফায় বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন । হাতে ফ্রেমে বাঁধাই করা সিতারা বেগমর ছবি । বিয়ের আগের ছবি ।
কেমন গাল ফোলা কিশোরী ছিল না ?
তন্দ্রা মাখা আঠালু চোখে দেয়াল ঘড়ি দেখলেন । বিকেল চারটে ।
শীত পড়ে গেছে । শন শন হাওয়া । ঘাসের গন্ধ ।
কার্পেটের উপর বসে একগাদা খেলনা নিয়ে খেলছে ভানটু ।
কিন্তু কিসের শব্দে ঘুম ভাংল তার ?
আবিস্কার করলেন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে কেউ ।
কে ? কে হতে পারে ?
ক্লান্ত পায়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখতে পেলেন বাইরে দাঁড়িয়ে আছে কুমকুম ।
'মাফ করবেন। আশা করছি অসময়ে এসে বিরক্ত করলাম না আপনাকে ? আপনার স্ত্রীর ব্যাপারে দুঃখিত । ' সহানুভূতি মাখা গলা কুমকুমের । চোখের ভাষা নরম ।
'ধন্যবাদ ।' আবেগে গলা কেঁপে গেল চৌধুরীর । ' হ্যাঁ , আমাদের ফেলে রেখে চলে গেছে । অনেক শক্ত টাইপের মহিলা ছিল । কিন্তু মানসিক চাপ দুর্বল করে ফেলেছে । আয়ু চলে গেছে সেই চাপে।'
চুপ করে ভাবাবেগ সামলানোর চেষ্টা করলেন । দরজার পাল্লা সামান্য ফাঁক করতেই নরম পায়ে ভেতরে ঢুকে গেল কুমকুম ।
ভেতরের পরিবেশ খুব একটা ভাল না ।
সব কিছুই লণ্ডভণ্ড । গুছিয়ে রাখার মানুষ নেই । এক মাস হয়ে গেছে সিতারা বেগমের মৃত্যুর পর। বাপ ব্যাটা কিভাবে দিন কাটাচ্ছে সেটা ভেবেই দিশেহারা হয়ে গেল কুমকুম ।
ভানটু বসে খেলছিল কার্পেটের উপর ।
কুমকুমকে দেখে খুশি হল ।
'কেমন আছ ভানটু ?' জানতে চাইল মেয়েটা ।
'খুব ভাল । অনেক অনেক ভাল ।' হাসি হাসি উত্তর ।
'আপনি কি ভানটুর জন্য এসেছেন ?' সতর্ক ভাবে কথা চালু করলেন চৌধুরী ।
'দেখুন স্যার আপনার শোক , দুঃখ আমি বুঝতে পারছি ।' শান্ত ভাবে কথার চাল দিল কুমকুম । ' মনে হয় এখন সত্যি সত্যি আমার সাহায়্য দরকার হবে আপনার । বিশেষ করে আপনার স্ত্রী মারা গেছেন । বাচ্চাকে একা সামলাতে পারবেন না। একটা সংস্থায় আপনার বাচ্চাকে রেখে আমরা বড় করব ওকে। এই যে কাগজ পত্র পড়ে দেখুন ।'
কথা শেষ করে কাঁধে ঝুলানো বাদামি ক্যাম্বিসের ব্যাগ খুলে হলুদ রঙের পুস্তিকা বের করে চৌধুরীর হাতে ধরিয়ে দিল ।
ছবিওয়ালা কোন বই মনে করে হাততালি দিয়ে খুশি হয়ে উঠল ভানটু । ' ছবি...ইইইইয়ে ছবি ।'
হাসি মুখে পুস্তকাটা হাতে নিয়ে ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেললেন মাহবুব চৌধুরী । ' আমার ছেলে এতিম না। বাপ বেঁচে আছে । আপনার দরদ দেখে ভাল লাগল । আপনার কাজ শেষ চলে চলে যেতে পারেন । আমি সত্যি ক্লান্ত ।'
'আমার কাজ শেষ হয়নি স্যার ।' শক্ত মুখে জবাব দিল কুমকুম । নাক দিয়ে বড় করে একটা লম্বা দম নিয়ে বলতে লাগল , ' আপনার সাথে শেষ
বার কথা বলার পর অনেক দিন ধরে তদন্ত চালিয়েছি আমি । সবার সাথে কথা বলেছি । আপনার প্রতিবেশী , এই শহরের আগের সব বাসিন্দা । আপনার পুরানো সব কর্মচারী, যাদের কারন ছাড়াই বাতিল করে দিয়েছেন আপনি । আপনার আগের সব বন্ধু- বান্ধব যাদের সাথে ইচ্ছা করেই সম্পর্ক নষ্ট করেছেন আপনি । এমন কি আপনার স্ত্রীর পরিবারের সাথেও আপনি সম্পর্ক নষ্ট করেছেন । সবার সাথে কথা বলেছি আমি । আমার বিশ্বাস ভানটুকে আপনার হেফাজত থেকে নেয়ার মত অধিকার আমার বা আমাদের সংস্থার আছে । আইন আমাদের পক্ষে ।'
'তাই নাকি ?' খুব অবাক হয়েছেন অমন একটা মুখের ভাব করে বললেন চৌধুরী ।
'হ্যাঁ , তাই ।আপনার প্রতিবেশীরা পর্যন্ত স্বীকার করছে আপনার ছেলে এক রকম বন্দি জীবন যাপন করছে এখানে । ভানটুকে আপনি বারান্দায় পর্যন্ত যেতে দেন না। ওর কামরার সব জানালা বন্ধ করে দিয়েছেন অনেক বছর আগেই । শেষ কবে আপনার বাচ্চাকে বাইরে নিয়ে গেছেন সেটাও কেউ ঠিক মত বলতে পারছে না । অন্য বাচ্চাদের সাথে জীবনেও খেলাধুলা করেনি আপনার বাচ্চা । জীবনে ওকে খেলার মাঠে বা কোন দোকানে নিয়ে যাননি । ইস্কুলে ভর্তির কথা তো আগেই বলেছি। বাসায় ওর জন্মদিন করেননি । শিশু পার্ক বা চিড়িয়াখানার তো প্রশ্নই উঠে না । আপনার গিন্নির বোন আমাদের এ কথাও জানিয়েছে ভানটু হবার পর বাড়িতে টিভি ও রাখেননি ।'
কুমকুমের গলার স্বর এত উঁচু পর্দায় চড়ে গেল যে ভানটু হাউ মাউ করে কেঁদে দৌড়ে চলে এলো বাবার সামনে ।
'হ্যাঁ আমরা টেলিভিশন রাখিনি।' এতক্ষণে মাত্র একটা কথা বললেন মাহবুব চৌধুরী । ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন , ' কাঁদে না বাবা । কাঁদে না । সব ঠিক আছে ।'
' আপনি আসলে বাপ না। আপনি মানসিক ভাবে অসুস্থ ...।' কথা বলার মুড এসে গেছে কুমকুমের ।
'আর একটা কথাও বলবেন না আপনি ।' তর্জনী তুলে শাসালেন চৌধুরী । ' বসুন , আপনি । বসুন । ভানটুকে আপনি নিয়ে যেতে চান তাই না ? তাহলে এখন সময় হয়েছে ওর ব্যাপারে কিছু জানার । বসুন ।'
ভয়ে ভয়ে বসে পড়ল কুমকুম ।
ভদ্রলোকের চেহারা আর গলার টোনে অমন কিছু আছে যা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা হল না।
হেঁটে কাঠের আলমারির সামনে চলে গেলেন চৌধুরী । তালা খুলে বের করে আনলেন মোটা সোটা একটা বই ।
'আমাকে দাও । আমার চাই ।' বইটা দেখে খুশি হয়ে গেল ভানটু ।
' আমার বাবাটা বই পছন্দ করে ।' ছলছল গলায় বললেন পিতা । ' ছবিওয়ালা বই , ম্যাগাজিন , কমিকস , খবরের কাগজ । আসলে সব ধরনের বই কিন্তু ছবিওয়ালা ।'
মনোযোগ দিয়ে শুনছে কুমকুম । রাগ কমে গেছে ।
'বাবা ভানটু এখানে এস ।' নরম গলায় বললেন উনি । ছেলের সামনে বইটা খুলে একটা ছবি বের করে রাখলেন । চ্যাপ্তা তলোয়ার । মধ্যযুগের নাইটেরা ব্যবহার করতো । ' ওটা আনো তো বাবা । আমার জন্য আনো ।
বাবার দরকার । আনো ।'
অবাক হয়ে এইসব নাটক দেখছে কুমকুম ।
উত্তেজিত হয়ে গেল ভানটু । দুই হাত সামনে রেখে বড় বড় করে শ্বাস নিতে লাগল । বিড়বিড় করে বলল , ' চলে এসো । চলে এসো ।'
চমকে গেল কুমকুম।
বইটার ছবির পাশেই ভোজবাজির মত কোত্থেকে কি ভাবে যেন চলে এসেছে একটা তলোয়ার । হুবহু ছবির তলোয়ারটার মত । কামরার অল্প আলোতে ওটার ফলা ঝিকিমিকি করে উঠলো ।
খুশি হয়ে হাততালি দিয়ে উঠলো ভানটু । থাবা মেরে ধরতে চাইলো জিনিসটা ।
'না বাবা না । ধার অনেক । কেটে যাবে ।' চেঁচিয়ে উঠলেন মাহবুব চৌধুরী । তলোয়ারটা মুঠো করে কুমকুমের দিকে চাইল , ' আপনি জানেন সারা দুনিয়ায় অমন কত ধারালো আর বিপদজনক জিনিস আছে ? জানেন ? অ্যাঁ ?'
ভয়ে সোফা থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে প্রায় দরজা পর্যন্ত চলে গেল মেয়েটা ,' স্যার আমি আপনার ছেলের ভালর জন্যই এসেছি । আর আপনি আমাকে হাত সাফাইয়ের জাদু দেখিয়ে ভয় পাওয়াতে চেষ্টা করছেন ।'
নিষ্ঠুর হাসি দেখা গেল ভদ্রলোকের মুখে । বাড়িয়ে দিলেন ছবিওয়ালা বইটা । ' নিজেই পরীক্ষা করে দেখুন ।'
ফিরে এসে কাঁপা কাঁপা হাতে বইটা নিল কুমকুম ।
থতমত ভাবে উল্টে গেল কয়েক পাতা । এক পাতায় লোহার ডামি পেল একটা । ডামির মাথায় লোহার শিরস্ত্রাণ । হাতে ঢাল আর পেল্লাই তলোয়ার । সব মিলিয়ে ভারি আর বিশাল জিনিস । হাত সাফাই করা যাবে না ।
' ভানটু এনে দেখাত তো এটা আমাকে ।' বলল কুমকুম।
ভানটু ফিরে চাইলো বাবার দিকে । যেন বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে ।
'স্যার এইসব চালাকি ...।' বলা শুরু করেছিল কুমকুম । হাত তুলে সাধু দরবেশের মত থামিয়ে দিলেন চৌধুরী । ভানটুর দিকে ফিরে সামান্য মাথা ঝাঁকালেন । অনুমতি দিলেন যেন ।
খুশি হল ভানটু ।
আগের মতই দুই হাত শূন্যে তুলে বড় বড় করে দম নিয়ে বলল , ' চাই আমার । চলে এসো ।'
সাথে সাথে কামরার এক কোনে হুড়মুড় করে আস্ত জিনিসটা ধাতব শব্দ করে পড়ে গেল ।
এত আচমকা আর তীব্র শব্দ হল চমকে উঠে এক কদম পিছিয়ে গেল কুমকুম।
'এইসব কি স্যার ?' হাঁপাতে হাঁপাতে বলল কুমকুম । ' কোন ধরনের জাদু ? অলৌকিক কিছু ?'
' কোন জাদু না।' মাথা নেড়ে বিষাদ মাখা গলায় বললেন মাহবুব চৌধুরী । ' হয়তো অভিশাপ । কোন জন্মের পাপের প্রায়শ্চিত্ত ।'
'অমন করে বলবেন না ।' উচ্ছ্বাস নিয়ে সামনে চলে এলো মেয়েটা । বসে পড়লো ভানটুঁর সামনে । ' অদ্ভুত রকমের ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে আপনার ছেলে। দুনিয়াতে একদম আলাদা । কি ভাবে শুরু হল ? কিভাবে জানলেন ভানটু অমন অসীম ক্ষমতার অধিকারী ? '
'আমি একটু বেশি বয়সে বিয়ে করেছিলাম । টনকপুরের ধনী ব্যবসায়ী আমার বাবা আর দাদা । টাকার অভাব নেই । সিতারার সাথে পরিচয় হয়ে ছিল শীতের এক বিকেলে শহরের একটা গানের অনুষ্ঠানে গিয়ে । পরিচয় থেকে প্রণয় । বিয়ে... কি সব দিন !
' বিয়ের পর বেড়াতে গিয়েছিলাম দূরে কোথাও । পিকনিক টাইপের ভ্রমণ । সাথে চায়ের ফ্ল্যাক্স আর পিঠা । যেমন হত সেই সময় । ফিরছিলাম । ফেরার সময় আচমকা ঝড় বৃষ্টি শুরু হল । যেমন শুরু হয়েছিল তেমনই থেমে গেল আচমকা ।
' ফেরার সময় দ্গিন্তজোড়া ফসলের মাঠ পেলাম । তখন মাত্র বিকেল । কিন্তু আচমকা বৃষ্টি হওয়ায় মনে হচ্ছে রাত । ভেজা হাওয়া । অবাক হয়ে দেখলাম ফসলের মাঠে কেমন যেন নীল কুয়াশা পড়েছে ঘন হয়ে । অমন হতেই পারে । গরমে তেতে ছিল মাঠ । বৃষ্টির জল পড়ে ভাপ উঠে কুয়াশা কুয়াশা লাগছে ।
' তারপরও কেমন যেন অদ্ভুত । কি মনে করে গাড়ি থেকে নেমে গেল সিতারা । হাতে ক্যামেরা । ছবি তুলবে । বাঁধা দেয়া উচিৎ ছিল । দেইনি । কে জানতো ? ছবি তুলল । আমাকে ওর ছবি তুলে দিতে বলল । ও গিয়ে দাঁড়ালো কুয়াশার মধ্যে । তখন আমার মনে হল কেমন যেন দেখাচ্ছে ওকে । ঠিক গুছিয়ে বলতে পারব না। টিভির চ্যানেলে সমস্যা হলে ছবি যেমন ঘোলা আর লম্বাটে দেখায় তেমন লাগছিল সিতারাকে ।
অথবা প্রিজম কাচে কাউকে দেখলে অমন লাগে । চোখের ভুল মনে করে পাত্তা দেইনি ।
ফিরে এলাম ।
সেই রাতে ভীষণ রকম মাথা ধরেছিল সিতারার । বমি বমি ভাব । দাঁতের গোঁড়ায় সিরসিরে ব্যাথা । পরদিন ঠিক হয়ে গেল । পরের বছর আমাদের ভানটু জন্ম নিল আমাদের ভালবাসায় ।
ভানটুঁর বয়স তখন দুই বছর । টিভি দেখছিল । একটা কুকুরের বাচ্চা দেখে চিৎকার শুরু করলো । বাচ্চাটা ওর চাই । ঠিক এইভাবে কুকুরের বাচ্চাটা নিয়ে আসলো ভানটু । আমরা জানলাম ওর অসীম অদ্ভুতুড়ে ক্ষমতার কথা । কিন্তু কুকুরের বাচ্চাটা আনল মড়া। জ্যান্ত কিছু আনতে পারে না ভানটু । কিন্তু বাপটা আমার জানে না । রোজ হাজার পদের
কুকুর আনতে লাগল । সবই মড়া । স্তুুপ হয়ে গেল মড়া ককুর দিয়ে । বাড়ির পিছনে বাগানে সবগুলোকে কবর দিলাম ।
আপনার কি মনে হয় এমন বাচ্চাকে আমরা ইস্কুলে পাঠাতে পারি ? অন্য বাচ্চাদের সাথে মাঠে খেলাধুলা করতে দিতে পারি ? না কি চিড়িয়াখানায় নিয়ে যেতে পারি ? কি মনে হয় আপনার ? আগে ছবি ব্যবহার করে জিনিস আনত । আজকাল মনের স্মৃতি ব্যবহার করে আনতে পারে । জিনিসটা আরও ভয়ংকর । আমার বাবা একটা অচিন জাদুকর । অতীতের যেই সব মহাশক্তিশালী জাদুকরের গল্প আমরা শুনেছি ওরা আসলে সত্যি সত্যি ছিল । '
' আমি দুঃখিত স্যার । না জেনে অনেক খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি আপনার সাথে ।' আন্তরিক গলায় বলল কুমকুম ।
' ভানটুকে কখনই বন্দি করে রাখিনি আমরা ।' ধরা গলায় বলে যাচ্ছেন মাহবুব চৌধুরী । ' আমার বাপটাকে আমরা রাজপুত্রের মতই লালন পালন করেছি ।'
'তারপরও বলব স্যার ভানটুর সাহায়্য দরকার । কাউন্সেলিং করা দরকার । ' উঠে দাঁড়ালো কুমকুম ।
'সাহায়্য ?' তড়াৎ করে লাফ দিলেন ভানটুর বাবা । ' কিসের সাহায়্য ? কি করবে আমার ছেলের সাথে ওরা আপনি জানেন না ? সার দুনিয়ার বিজ্ঞানীরা ঝাঁপিয়ে পড়বে ওর উপর । বছরের পর বছর ওকে বন্দি করে রাখবে গবেষণাগারে । ওর শরীর আর মগজ নিয়ে চলবে হাজারো রকম পরীক্ষা । সামাজ্যবাদি কোন দেশ ওকে প্রাইভেট সম্পত্তি বানিয়ে দুনিয়া দখলের স্বপ্ন দেখতে পারে । অসম্ভব কি কুমকুম ম্যাডাম ?
ভানটু না করতে পারে না কখনই । আমার ছেলেকে অমন গবেষণায় দিতে পারি না। কোথাও দিতে পারি না আমার ছেলেকে । আমার সাথেই থাকবে আমার বাপটা । আমার বাড়িতে আমার সাথে । চলে যান আপনি । গেট আউট । গেট আউট ...।'
রাগের মাথায় চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি ।
' আমি এইভাবে চলে যেতে পারি না।' সমান তালে চেঁচাচ্ছে কুমকুম । 'এর একটা বিহিত করবই আমি ।'
দুইজনের চ্যাঁচামেচিতে হাউ কাউ করে কেঁদে ফেলল ভানটু । তখনই নজর পড়লো সিতারা বেগমের সাদাকালো ছবিটার উপর । সোফার উপরে ওটা ।
দৌড়ে গিয়ে তুলে নিল । কাঁদতে কাঁদতে বলল , ' মা চলে এসো ... চলে এসো মা ...।'
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে চেঁচিয়ে উঠলেন মাহবুব চৌধুরী । ' না ভানটু ...। না ...।'
তখনই পাশের ইজিচেয়ারে শূন্য থেকে এসে পড়লো সিতারা বেগমের মৃতদেহটা ।
গলিত । পচা । পোকা কিলবিল করছে ।
তীব্র মাংস পচা গন্ধ কামরার মধ্যে লেপটে গেল যেন।
দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল ভানটু ।
শিউরে উঠলো কুমকুম । বমি করে ফেলল গলগল করে ।
ধাক্কা দিয়ে কুমকুমকে বাইরে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে ছেলের কাছে ফিরে এলেন মাহবুব চৌধুরী । ' না ভানটু । ওই দিকে তাকাবে না । আমি সরিয়ে নিচ্ছি ওটা ...।আমি এখনই সরিয়ে নিচ্ছি।'
বাড়ির পিছনে গোলাপ ঝাড়টার তলায় নতুন করে কবর দিলেন সিতারা বেগমকে । শেষ বেলচা মাটি দিয়ে বললেন , ' সরি , ছবিটা ভুলে সোফার উপরে রাখায় কষ্ট হল তোমার । কি করবে বল ? বাপটা কিছু বোঝে না তো ...। ছেলে মানুষ । আমারই ভুল ।'
আচমকা কানে এলো দূর থেকে মোটর গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন ভেসে আসছে । দূরের পথের দিকে তাকালেন । পাহাড়ি পথ । বাড়িটা উঁচুতে থাকায় স্পষ্ট দেখতে পেলেন ।
পুলিশের গাড়ি ।
'সময় হয়ে গেছে ।' ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন । 'এখনই সময় । '
কাঁদছেন উনি ।
ভেতরে ভানটু খেলছিল । বাপকে আলমারির চাবি হাতে আসতে দেখে খুশি হল ।
আবার ছবিওয়ালা বই ? আজ দেখি বারবার হচ্ছে । বাবা তো রোজ অমন করে না ।
কি একটা বই বের করে মাহবুব চৌধুরী সোফায় এসে বসলেন । ভানটু গিয়ে পায়ের কাছে বসলো । ওর মাথার চুল এলোমেলো করে দিলেন চৌধুরী সাহেব ।
' ভানটু অনেক ভাল ছেলে । তুমি আমার অনেক লক্ষ্মী একটা বাবা ।' কথা বলছেন নরম সুরে ।
বুকের ভেতরে হাহাকার । রেডিওতে পুরানো দিনের গান বাজছে । কারা বাজায় এইসব ? কেন স্মৃতিকাতর করে ফেলে মানুষকে ?
কি দরকার ?
বই খুলে ভেতরের ছবিটা ভানটুঁর সামনে ধরলেন । গাড়ির শব্দ আরও কাছে চলে এসেছে । অনেক কাছে ।
'ছবিটা সুন্দর না বাবা ?' বইয়ের ভেতরের ছবিটা দেখিয়ে বললেন চৌধুরী । ' যেন সূর্য ডুবছে । লাল হলুদ কমলা তিনটে রঙ , তাই না বাবা ? সুন্দর না বাবা ?'
চোখ বড় বড় করে ছবিটা দেখছে ভানটু ।
ছেলের মাথায় গলা ঠেকালেন তিনি । কাঁদছেন । কষ্ট ।
' তোমাকে অনেক ভালবাসি বাপ আমার ।'
ভানটু চেয়ে আছে ছবির দিকে । আধো গলায় বলল , ' চলে এসো । আমার চাই ।'
ছবিটা ছিল বোমা বিস্ফোরণের দৃশ্য ।
কমলা লাল হলুদ ।
পুলিশের গাড়িটা যখন পৌঁছল তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে চৌধুরী ভিলা । জ্বলন্ত নরক । আগুনের জিভ নাচছে এখানে ওখানে ।
অবাক হয়ে চেয়ে আছে দুই অফিসার আর এক কনস্টেবল । পিছন সীট থেকে নামলো কুমকুম ।
কাঁদছে ।
কারণ বলতে পারবে না ।
জর্জ রেমন্ড রিচার্ড মার্টিন - এর ছোট গল্প অবলম্বনে

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন