সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

প্রবেশ নিষেধ

 এক

 

 

কামরার ভেতরের আরামদায়ক পরিবেশটা  উপভোগ করছিল রতন

 

আবিস্কার করল ,হোম সুইট হোম কথাটা  মোটেও বানানো কোন ডায়ালগ না।  নিজের বাড়ির মত জায়গা দুনিয়ার কোথাও নেই।

   ।

বেতের ঝোলানো  খাঁচার ভেতরে টিয়া পাখিটা ডেকে উঠলো

কচি বাকসা ঘাসের ত ওর গায়ের রঙঅনেকটা আবার কলাপাতার মত।  

' আবার খিদে পেয়েছে ?' জানতে চাইল রতন' সমস্যা নেই লাঞ্চ রেডিকত আর খাবি ? নে । খা। '

 

ছোলার দানা ভিজিয়ে রেখেছিল রতনটিনের ছোট্ট একটা   বোউলে করে এগিয়ে   দিল পাখিটার সামনে খাডায়েট করার দরকার নেই'

 

জীব জন্তু ভালবাসে রতনআগে একটা বিড়াল ছিলমাছ চুরি করলেও কিছু বলতো নাবিড়ালটাকে আয়না নিয়ে গেছেহারামজাদি  মুখে পোকা পড়ুক।

 

বাইরে কাঞ্চন রঙা রোদ ।

 গরমের  দুপুর

 

বিছানায় খানিক গড়াগড়ি দিয়ে বিকেলে ক্লাব থ্রি সিক্স  সিক্স -এ    যাবেমদ গিলতে নাজরুরি কাজ আছে এই গরমে মদ খাওয়া জমে না।

পাখিটাকে কয়েকটা লাল মরিচ দেবে নাকি -  ভাবছে ,  তখনই দরজায় কলিং বেল চাপল কেউ

 

অসম!

 

কারো তো আসার কথা না

তনের বাড়ি বছরে চার মাস-  ছয় মাস খালি থাকেমাত্র গতকাল এসেছে ওএর মধ্যে কে জানলো ও নারায়ণগঞ্জে ?

নাকি ফকির ?

আজকাল ফকির মিসকিনরা পাঁচ তলা দালানে সিঁড়ি বা লিফট  বেয়ে উঠে কলিং বেল বাজিয়ে আল্লার ওয়াস্তে ভিক্ষা চায়আবার নতুন কোন গুড়া সাবান কোম্পানির লোক হতে পারে ওরাও বড্ড ঘ্যান ঘ্যান করে। কেনার জন্য মাথা খেয়ে ফেলে।

 

একবার ভাবল জবাব দেবে নাচুপচাপ গুমটি মেরে থাকবেঅপর পক্ষ কয়েক বার বেল বাজিয়ে ভেগে যাবে

তেমনটা হল না

ও ব্যাটা বাজিয়েই যাচ্ছে 

কোন হালায় রে , বলতে গিয়েও সামলে নিয়ে বিরক্ত মুখে গিয়ে দরজা খুলল

 

বাইরে ছিপ ছিপে এক তরুণ দাঁড়িয়ে আছেচোখা চেহারাসাদা-নীল স্টেের  জামাকালো ঢোলা প্যান্টমাথার চুল পরিপাটিশান্ত চতুর চোখমুখে ফিচেল মার্কা হাসি হাসিটা পছন্দ হল  না রতনের ।

 

কেমন আছেন রতন বাবু ?' মিহি গলায় বলল আগন্তুক

 

পুলিশের লোক মনে হচ্ছে ?'ব্যাজার মুখে     জানতে চাইল  রতন

 

ঠিকই ধরেছেনদারুণ চোখ আপনার একেই বোধ হয়  বলে ,  রতনে রতন চেনে,  ভোমরা চেনে মধু '

 

মুচকি হেসে ওকে ঠেলা  দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো লোকটাঢোকার আগে রতনের  ভুঁড়িতে তর্জনীর গাঁট দিয়ে দুটো টোকা দিল মজা করলো আর কি যেন বাচপান কা ইয়ার।

 

ভেতর ঢুকে অনেকটা  সময় নিয়ে কামরাটা পরীক্ষা করলো লোকটা দেয়ালের রঙ হতে খাঁচার ঝোলানো পাখিমায় মেঝের কার্পেটজানালার ফুল তোলা পর্দা

 সব

বাড়ির দালালের মত মুখের ভাব করে বলল , দারুণ পরিবেশএকদম খাসা জায়গা বেশ  সুখেই আছেন'

 

ব্যক্তিগত কাজে এসেছেন বা ব্যবসায়িক কাজে ?' জানতে চাইল রতনমোটেও নার্ভাস হয়নি ওর কাছে এইসব ডাল ভাত  নাকি খেজুরে আলাপ রতে এসেছেন ?'

 

খেজুরে আলাপই বলতে পারেন রতন বাবুএকদম খেজুরে গুড় মার্কা আলাপ করব আমরাআপনি একাই থাকেই নাকি  এই বাড়িতে ? ' শান্ত মুখে জবাব দিল লোকটা

 

আরে নাসাথে আমার প্রেমিকা থাকতো'সত্যি কথাই বলল। জানে,  মিথ্যা বলে লাভ নেই। ভালমত খোঁজ খবর নিয়েই এসেছে এই লোক ।

 

 এবং সে চলে গেছে আপনাকে ফেলে তাই তো ?'

 

তাই সব জেনে শুনে ও প্রশ্ন করছেন ?  আপনি তো সাহেব  অদ্ভুত লোক ।   '

 

জিভ দিয়ে চুক চুক বিচিত্র শব্দ করে দুঃখ প্রকাশ করলো লোকটা ধপাস করে বসে পড়লো সোফায়  আসলে জীবনটাই এমন রতন বাবু  টাকা আর মেয়ে মানুষ সব সময় হাতে থাকে নাছোট বেলায় একটা চটি টাইপের রোমান্টিক উপন্যাসে পড়েছিলাম - নারীর মন আর পুরুষের ধন চিরস্থায়ী নয়'

 

চা নেবেন আপনি ?'

হলে ভাল হয়আমি সেই রকম চা- খোর রাত দুটোর সময় চা দিলেও মানা করি না। দিনে এক বালতি চা লাগে আমার।  কিন্তু বানাবেন কিভাবে ?চা বানাতে পারেন ?  এটা কিন্তু একটা মস্ত বড় গুণ। গ্রেট স্কিল।  '

 

জবাব না দিয়ে পাশের কাউনটার  থেকে ফ্ল্যাক্সটা নামাল রতন চিনামাটির,    সুন্দর দুটো   পেয়ালায় চা ঢেলে  একটা পেয়ালা  বাড়িয়ে দিল আগন্তুকের দিকে

 

 সকালেই বানিয়ে ফেলেছে  । ইচ্ছে হলেই ঢেলে নেবে। বারবার কিচেনে গিয়ে চায়ের পাতা -চিনি এইসব হাবিজাবি খুঁজতে ইচ্ছা করে না।

 

আগন্তুক পেয়ালা নিয়ে বিচ্ছিরি ফুররর শব্দে চুমুক দিলঅমন শব্দ শুনলে খামাখাই রাগ উঠে যায়।

 

বাহ বেশ জিনিসখাঁটি গরুর দুধ না,  ভুল বললাম  গরুর খাঁটি দুধের চা পাওয়া মুশকিল ' তারিফ করলো লোকটা

 

এখানে কি বাংলা ব্যাকরণ মারাতে এসেছেন অধ্যাপক  সাহেব ?' টিটকারিটা না মেরে পারলো না রতন

 নাউপদেশ দিতে এসেছি তাও মাগনা। বিনামূল্যে । একদম  ফ্রি ।    আমি চাই আপনি এই শহর ছেড়ে চলে যাবেনএবং আজই'

 

চলে যাব ?   আরে  আমি তো ফিরলামই মাত্র গতকাল রাত্রে ' বিশাল শরীরটা নিয়ে সোফায় বসতে বসতে বলল রতন

 

 

সেটা জানি' জবাব দিল লোকটা ' আমার নাম   বিহারীলাল রায় ক্রাইম ব্রাঞ্চের লোক  আপনি শহরে পা দেয়া মাত্র খবর চলে এসেছে আমার কানে তাই সোজা চলে এলাম কথা বলতে আসলে সাবধান করতে আপনার সব খবরই রাখি মানে রাখতে হয় ।   গতকাল এসেছেন নারায়ণগঞ্জে ছিলেন  সুলতানগঞ্জে মাত্র তিন  মাস কিন্তু সেখানে এক মাসে তিনটে মানুষ গোরস্তানে গেছে  বিচ্ছিরি  দুর্ঘটনা  আর হাস্যকর রকমের  মৃত্যু তিন জনই  টাকাপয়সাওয়ালা   ব্যবসায়ী ছিলেন রাজনীতি  করতেন কেউ কেউ   '

 

 

হু, আজকাল দুর্ঘটনা আর মৃত্যুর হার অনেক বেড়ে গেছে খবরের কাগজে ঘটনাগুলো পড়েছি জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই এই দেশে। ' দুঃখ মাখা গলায় বলল রতন 

 

চেহারায় কোন ভাব নেই

 

সুলতানগঞ্জে যা করেছেন এখানে সেই সব করতে যাবেন না   আমি আপনাকে চিনি পেশাদার খুনি কিন্তু এমন ভাবে কাজ করেন যেন দুর্ঘটনা বলে মনে করে লোকজন  নারায়ণগঞ্জ শহরে অতীতেও অমন করেছেন এখন  অন্য শহরে গিয়ে কাজ করেন ফিরে এসেছেন ভাল কথা কিন্তু ভুলেও এখানে কিছু করতে যাবেন না'

 

খামাখাই সময় নষ্ট করছেন সাহেব' বিরস সুরে বলল রতন 

 

জাস্ট সতর্ক করে দিলাম তবে আপনার উপর আমার কড়া নজর থাকবে এই শহরে কিছু করতে গেলে নিজের পায়েই কুড়াল মারবেন একদম চাইনিজ কুড়াল কিন্তু আমার মাথায়  একটা জিনিস কিছুতেই ঢুকছে না   প্রশ্ন হচ্ছে  কেন ফিরে এসেছেন ? '

 

উঠে দাঁড়ালো বিহারীলাল

 

 কাঠের আলমারির সামনে গিয়ে   তুলে নিল বাঁধাই করা একটা ছবি সুন্দর নকশা করা  অ্যালুমিনিয়ামের  ফ্রেমের ভেতরে  রঙ্গিন ছবিটা একটা যুবতীর জরি আর চুমকির কাজ করা  অসম্ভব ধরনের জমকালো  পোশাক গায়ে চেহারায় অপূর্ব এক মাদকতা রয়েছে মেয়েটার মোহনীয় ভঙ্গী  বিবশ করা চোখের তারাযে কোন পুরুষ ধরা খেয়ে যাবে।

 

মেয়েটা কিন্তু বেশ খাসা চেহারা কোন ক্লাবে নাচে বোধ হয় ফিগারটা কড়া রে ভাই' জ্যাল জ্যালে একটা হাসি  হেসে  বলল বিহারীলাল

 

সোফা থেকে উঠে এসে ছবির ফ্রেমটা ছিনিয়ে নিল রতন  ওটা আমাকে দিন

 

 উফ, দরদ এখনও কমেনি বোধ হয়' হেসে ফেলল বিহারী ' একেবারে স্পর্শকাতর ব্যাপার রে ভাই খাঁটি প্রেম শুধু কাছেই ডাকে না দূরেও ভাগিয়ে দেয় ।  আমার তো মনে হয় এই সুন্দরীর একটা ব্যবস্থা করার জন্য আপনি ফিরে এসেছেন দেখেন না ছবিতে হাত দিতেই কেমন  তেতে গেলেন 

 

' সোজা সুজি কথা বললে ভাল হয় চরকা  প্যাঁচানোর  মানে দেখি না'

 

'আপনি প্রায় মাস তিনেকের মত শহরের বাইরে ছিলেন তখন আপনার তথাকথিত প্রেমিকা  নর্তকী আয়না  উঠতি এক গুণ্ডার প্রেমে  পড়ে  ছোকরার নাম সম্ভবত  সিধু    এবং আপনাকে ছেড়ে চলে যায় তো বাজারে গুজব আয়নার একটা ব্যবস্থা করতে মানে ,  প্রতিশোধ নিতে ফিরে এসেছেন আপনি'

 

' অতটা বলদ আমাকে ভাবেন ?' রাগি চিড়বিড়ে গলায় বলল রতন ' সস্তা একটা মেয়ে মানুষের জন্য...  কি ভাবেন আমাকে ? অ্যাঁ ? যে চলে যায় তাকে যেতে দেয়াই মঙ্গল ভালর জন্যই চলে গেছে  '

 

' বাহ,  একদম চৈনিক দার্শনিকদের দর্শন  ।  শুনে তো ভালই মনে হচ্ছে' নিরীহ গলায় বলল বিহারীলাল ' নিজের দিকে খেয়াল রাখবেন'

 

উঠে চলে গেল দরজার সামনে দরজার নব ধরে নাটকীয় ভঙ্গীতে ফিরে চাইল রাঘবের দিকে , ' আপনার সাথে  তো পিস্তল থাকে তাই না ?'

' থাকতেই পারে'

'ব্যবহারের আগে দুই বার চিন্তা করে নেবেন'

' সব সময় তাই করি গুলি লোড করার সময় একবার ভাবি নিশানার দিকে চালানোর আগে  দ্বিতীয়  বার '

 

সবজান্তার মত মাথা ঝাঁকিয়ে কামরার বাইরে চলে গেল বিহারীলাল

 

কেমন একটা  দিশেহারা   ক্রোধে  ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা দরজার দিকে ছুড়ে মারল রতন

 

জিনিসটা ভেঙ্গে টুকরো টাকরা হয়ে ছড়িয়ে পড়লো নানান জায়গায়

 

আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলো খাঁচার ভেতরে বসা টিয়া

'আহা ভয় পায় না' নরম গলায় বলল রতন ' দাঁড়া তোকে ছোলা দিচ্ছি খেয়ে নে'

 

 

 

 

দুই

 

 

মাত্র সন্ধ্যা

 গরম একটু কমেছে। তারপরও  পীচ ঢালা পথ    থেকে যেন   উনুনের মত  ভাপ  উঠছে । তন্দুরি বন্ধ করে দিলে যেমন কয়েক ঘণ্টা পরও যেমন তাপ ছড়ায়, তেমনই।   

 

ক্লাব থ্রি- সিক্স-   সিক্স

সবাই সদস্য হতে পারে না সবাই ভেতরে ঢুকতে  পারে না

বাইরে পুরানো দিনের ভিক্টোরিয়ান আমলের কাচের ত্রিভুজ শেডে কমলা আলো জ্বলছে 

ক্লাবের বিশাল দরজা বন্ধদরজার উপরে  গোলাপি  নিয়ন সাইনে  CLUB 366 লেখা।  

দরজার ঠুক ঠুক করে  নক করলো রতন   ঠিক মাঝখানে চারকোণা কাচের   একটা টুকরো ফাঁকা হয়ে গেল

' কাকে চাই ?' জানতে চাইল ভেতর থেকে

' আকবর শেঠের সাথে দেখা করব' জবাব দিল রতন

নিয়ম হিসাবে একজন সদস্যের নাম বলতে হয়

কিন্তু আকবর শেঠ  খোদ ক্লাবের মালিক

 

ভেতরে ঢুকে পড়লো রতন

ক্লাব থ্রি সিক্স  সিক্স শুধুমাত্র  অভিজাত  লোকজনদের   জন্য  

 সেই রকম করেই সাজানো হয়েছে ভেতরের পরিবেশ  যেন ভেতরে পা ফেললেই নিজেকে মস্ত বড় রুই কাতলা মনে হয়। বেঁচে থাকার জন্য এই   অনুভূতিটাই আসল।

 

 

ক্লাবের ভেতরটা কিন্তু     বেশ বড়  

 

 প্রথমেই নজর কাড়ে  পেল্লাই সাইজের একটা বার মুভি বা সিনেমায় যেমন বার থাকে,  তেমনই রাজ্যের সব বোতল আর গ্লাস দিয়ে ভর্তি  মাত্র তিনজন বারটেন্ডার কিন্তু   সুন্দর ভাবে সামাল দিচ্ছে

 

দেয়ালে বেশ কিছু তেল রঙা পেইন্টিং ঝুলছে ছবির বিষয় বস্তু বা  মাথা মুণ্ডু বুঝা মুশকিল  মর্ডান  আর্ট না কি যেন বলে না ?- সেটাই সিলিঙের  এখানে ওখানে ঝাড়বাতি কমলা রঙের মায়াবী আলোঝাড়বাতির ডায়মন্ড কাট কাচে আলো ঠিকরে আরও  বেশি মায়াবী  জোসনার  বিভ্রম জাগায়।

 

কামরার নানান জায়গায়    ছড়িয়ে আছে কালো সোফা কাউচ টেবিল নরনারী বসে নিচু গলায় খোশ গল্প করছে হাতে কাচের পান পাত্র রকগ্লাস। গবলেট।  পণী টাম্বলার। হাইবল ।    

 

বারে বসে যারা পান করছে বেশির ভাগই নিঃসঙ্গ  বা কারো অপেক্ষায় আছে ওখানেই দরজার দিকে পিঠ দিয়ে বসে আছে  বিহারীলাল  কি একটা নরম  পানীয় পান করছে সময় নিয়ে রতন সেটা খেয়াল করলো নাকরার কথাও না।  

 

কাউনটারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো রতন  

 

কালো কুচকুচে একটা লোক ওর দিকে পিছন ফিরে ,   কাচের  টাম্বলার পরিষ্কার করছিল,  সাদা কাপড় ঘষে ঘষে

' কেমন আছ মুস্তাফা ?' নরম গলায় জানতে চাইল 

 

চমকে ফিরে চাইল  বারটেনডার মুস্তাফা ' আরে রতন দাদা যে কবে ফিরলেন ? কি  অবাক কাণ্ড  শুনেছিলাম  সুলতানগঞ্জ না বাদশাগঞ্জ কোথায় যেন গেছেন  '

 

'এই যাওয়া আসার মধ্যেই আছি আমি ফিরেছি  গতকালই  ' হাসি মুখে নরম গলায় বলল রতন ' আকবর শেঠ আছেন ?'

 

'আছেন তো

 

 উনার প্রাইভেট রুমে ?’

 

 আর যাবেন  কোথায় ?  আমি গিয়ে এখনই খবর দিচ্ছি' উৎসাহের সাথে বলল মুস্তাফা রতন দাদা ভাল সব সময় বখশিস দেয়

 

' উনি কি একা ? না মীটিং ফিটিং ?'

 

' নাহ, একাই আছেন'

 

'তাহলে তোমাকে যেতে হবে না আমি গিয়ে উনাকে সারপ্রাইজ দেই দেখি কেমন চমকে যায় শয়তানটা'

 

' নিশ্চয়ই না করলো কে ? আপনি তো উনার খাস লোক পেয়ারা বান্দা'

 

হাসি মুখে উঠে দাঁড়ালো রতন

কামরার এক পাশে গোলাপি রঙের  পর্দা ঘেরা একটা জায়গা 

নাম-  ভিআইপি লাউঞ্জ 

মাত্র দশ জনের মত বসতে পারবে  যারা অতিরিক্ত  গোপনীয়তা পছন্দ করে বা এক সাথে বসে কারো মাথায় কাঁঠাল ভাঙ্গার জন্য নিরাপদ জায়গা চায় তারা এই অংশটা বুকিং করে অতিরিক্ত পয়সা দিয়ে ঘণ্টা হিসাবে 

 

সেইসব আবার গোপনে  রেকর্ড করে আকবর শেঠ  ওখান থেকেও আবার কিছু পয়সা কামায় নানান জায়গায় তথ্য বিক্রি করাও ভাল  একটা উপার্জন।

 

ভিআইপি লাউঞ্জের দেয়ালে সাথে  মিশে আছে একটা দরজা উপরে লাল নিয়ন  আলোতে জ্বলছে - প্রবেশ নিষেধ

আলতো করে ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলল রতন

দরজার ওপাশে অসম্ভব বিলাসি মার্কা একটা কামরা রুচিশীল টাকার কুমিরদের যেমন হতে হয়  

দেয়ালে দামি  ওয়ালপেপার বাহারি কাচের শেডে জ্বলছে আলো নানান জায়গায় নানান কোণে এখানেও কিছু তেল রঙের  পেইনটিং  লটকে আছে আকবর শেঠ  লোকটা  শিল্প রসিক ? নাকি বাহবা পাওয়ায় আশায় অমন করেছে ? -  ঠিক জানা নেই রাঘবেরতবে মাথা না খাটিয়েও  ধারনা করতে পারে ,   পেইন্টিং গুলো  দিয়েও কোন রকম দাও  মারার উদ্দেশ্য আছে। পেইন্টিং কেনা বেচাও তো আজকাল   প্রায় আন্ডারগ্রাউনডের হাতে ।     হয়তো চোরাই পেইন্টিং।      সদ্য ধনী হওয়া   কালো টাকার মালিকদের কাছে  বিক্রি করবে।  ধানাই ফানাই বোঝাবে, এইসব ছবি কিনে রাখ।   পরে বিক্রি  করলে কালো টাকা সাদা হয়ে যাবে। কত কিছুই তো হতে পারে। পারে না ?

 

 তেঁতুলের দানার রঙের  গোল একটা টেবিল  টেবিল ঘিরে আছে মাত্র চারটা চেয়ার মানে বেশি লোককে এক সাথে ভেতরে ঢুকতে দিতে চান না আকবর শেঠ 

ওখানেই একটা চেয়ারে বসে পিস্তল পরিষ্কার করছেন আকবর শেঠ 

দরজার দিকে পিছন ফিরেই বসেছেন

 

এত হালকা শব্দ  কানে গেল সজাগ হয়ে শান্ত গলায়  বললেন, '  আস্তে করে দরজা বন্ধ করে ভেতরে চলে এসো চান্দু যদি ভাব আমাকে খুন করে সিন্দুক লুট করবে সে  চিনিতে বালি এই কামরা থেকে আমার মর্জি ছাড়া একটা পিঁপড়াও  বেরুতে পারেনি আজও

 

' নাহ,বাহবা দিতেই  হয় নার্ভ আছে আপনার' শব্দ করে  হেসে ফেলল রতন নির্জলা প্রশংসা ।

 

পরিচিত গলার স্বর শুনে  ঝট করে   ফিরে চাইলেন আকবর শেঠ   গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠলেন , ' আরে আমাদের রতন বাবু যে ! কি ভাগ্য আমার  '

 

উঠে গিয়ে থাবা মেরে তনের  হাত ধরলেন তারপর ঝালমুড়িওয়ালাদের  মত    ইচ্ছা মত ঝাঁকিয়ে দিলেন , ' আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিল মালটা তুমি তাছাড়া কার অত সাহস,  আমার কামরায় নক না করে ঢুকে ? ফিরলে কবে ?'

 

 'গতকাল'

 

'দেখেই ভাল লাগছে এসো  বসো মনটা ভাল হয়ে গেল তোমাকে দেখে'

 

'ব্যবসা কেমন চলছে?'

 

' ভাল  না চলার কোন কারণ নেইগত দশ বছর ধরে ধীরে ধীরে  ক্লাবটার দারুণ একটা রেপুটেশন বানিয়ে ফেলেছি  লোকজন একবার হলেও  আসতে চায়মনে মনে  ভাবে,  সহজে সদস্য হওয়া যায় না যখন , ভেতরে না জানি কি কি হয়  এই দিকে আবার অনেক খুঁজে ফিরে  ভাল কয়েকজন বাবুর্চি এনেছি রান্না   ভাল মদের স্টক ভাল  শিক্ষিত ওয়েটার রেখেছি ইচ্ছে করেই   সব সময় হাই ক্লাস একটা ভাব মেইনটেন করি    ব্যবসা ভাল হবে না কেন ?'

আত্নতৃপ্তি ভরা গলায় জবাব দিলেন আকবর শেঠ

উনার বয়স পঞ্চাশ ছিপছিপে গড়নের জন্য অনেক কম মনে হয় রোগা মাথার চুল উল্টে লেপটে আঁচড়ানো নাকের ডগায় সরু গোঁফ যেন পেন্সিলে আঁকা আগের দিনের রাজকুমার- কিশোর কুমার মার্কা নায়ক গায়কেরা অমন গোঁফ রাখত চোখের নীচে পিচ্চি পুঁটলি  অতিরিক্ত মদ গেলার কুফল

তারপরও চেহারায় অভিজাত একটা ভাব আছে

ক্রিম রঙা সুটে দারুণ মানিয়েছে গলায় বেশ বাহারি সিল্কের টাই সব মিলিয়ে কেমন  মার মার কাট কাট একটা  ভাব

 

আকবর শেঠ শহরের ধনী এবং সম্মানী মানুষ সব পথেই অর্থ উপার্জন করেন টাকা উপার্জন করা একটা শিল্প।সেই শিল্পের মস্ত এক কারিগর তিনি।    জিনিসটা দোষের কিছু বলে মনে করেন না পুলিশের খাতায় নাম উঠবে অমন কোন কাজে আজও  ফাঁসানো যায়নি তাকে অথচ শহরের সব  অপরাধীর ওস্তাদ তিনি অদৃশ্য গায়েবী

কেউ জানে না

        

  

সাধারণ ভাবে জীবন শুরু করেছিলেন আকবর শেঠ।

 কিশোর  বয়সে   নাম্বার গেইম’  নামে একটা খেলা চালু করেছিলেন শহরের মহল্লায় মহল্লায়।  সাধারণ খেলা। একটা বড় কাগজে এক থেকে ছয় পর্যন্ত  সংখ্যা লেখা থাকতো।  খেলোয়াড়রা এক একটা সংখ্যায় টাকা রাখতো মর্জি মত। বাজির টাকা। আকবর শেঠ পেল্লাই একটা প্ল্যাস্টিকের মগের ভেতরে লুডু খেলার ছক্কা ইচ্ছা মত পাকা জাম ঝাঁকানোর মত  ঝাঁকিয়ে  কাগজের উপর ছক্কাটা উপুর করে ঢেলে দিতেন।

যেই নাম্বার উঠত সেই নাম্বারে  টাকা রাখা খেলোয়াড় পেত ডাবল টাকা। বাকি সংখ্যার টাকা সবই আকবর শেঠের। কয়েক ঘণ্টায় আক্ষরিক অর্থেই বস্তা ভর্তি টাকা কামিয়ে ফেলতেন।

 

  কোমরে গোঁজা থাকতো পিতলের মৎস্যকুমারীর বাটওয়ালা   চাকু।

হেরে যাওয়া খদ্দের কখনও ঝামেলা করতো না।  পুলিশ আর রাজনৈতিক মিত্রদের লাভের অংশ দিয়ে কাজ করতেন তিনি ।   যৌবনে   একের পর   এক -      মাদক কেনাবেচা, চাঁদা, ছিনতাই , চুরি, নদী আর রাজপথের অবৈধ টোল আদায় থেকে ভাগ নিতেন ।  

 

পুলিশ তাকে এড়িয়ে চলে। কারণ সারা জীবন চেষ্টা করলেও আকবর শেঠকে ফাঁসানো যাবে না। ঘাঘু অপরাধীরা পর্যন্ত দূর থেকে সালাম  দেয়। নতুন  অপরাধীদের,  ওস্তাদদের কারও না কারও  ওস্তাদ এই আকবর  শেঠ।

সবাইকে সাহায়্য   করেন।সবারই বন্ধু তিনি। এই শহরে এখনও  যেখানে যাই হোক প্রতি মাসে তার কমিশন এসে যায় ।  

 

 

'তারমানে ভালই নোট গুনছেন' সরু চোখে চাইল রতন

 

' ডাল ভাত খেতে পারি আরকি কিন্তু পোলাও আনতে সালাদ ফুরায়' শুকনো আমসি মার্কা মুখ করলেন আকবর শেঠ

 

' সামান্য সালাদ আর  বোরহানি হলে কেমন হয় ?' মতলব বাজ মার্কা একটা ভঙ্গী করে বলল রতন ওর কুৎসিত মুখটা সামান্য এগিয়ে আনল নাটকীয় একটা ভাব আনতে

 

' কি বলতে চাইছ শুনি' নরম তুলট কাপড়ের  টুকরো দিয়ে পিস্তলের চেম্বার পরিষ্কার করছিলেন আকবর শেঠ সামান্য থামলেন

 

' কে না জানে এলিবাই  তৈরি করার জন্য আপনি সেরা' ব্যবসায়ীদের মত ইঙ্গিত পূর্ণ ভাষায়  বলা শুরু করলো রতন ' গত মাসে  আপনার  প্ল্যান অনুয়ায়ি একজন ঘাঘু অপরাধী  জেলে থেকে পালিয়েছিল পাশের দেশে নিরাপদেই আছে'

 

'  এইসব আমি করি মাঠে নামি না কিন্তু মাথা থেকে নিখুঁত ছক নামাতে পারি হ্যাঁ, সামান্য ফি অবশ্য চার্জ করি' পিস্তলের কলকব্জা পরিষ্কার করতেই লাগলেন আকবর শেঠ  সতর্ক ভাবে চেয়ে আছেন তনের  দিকে  ' তো , তোমারও কি কোন রকম ঝোপ ঝাড় লাগবে নাকি ?'

 

' হলে তো ভালই হয়' হাসল রতন লাইন মত যাচ্ছে কথার কুমড়া

 

' তাহলে ঝেড়ে সর্দি ফেলআমাকে একটা দাম বলশোনাও টাকার অংক'

 

 'পঞ্চাশ হাজার'

 

'কি ?' কৃত্রিম  রাগে ভুরু কুঁচকে ফেললেন আকবর শেঠ তারপর হেসে ফেললেন বাচ্চাদের দুষ্টুমি  দেখলে বুড়ো হাবড়ারা যেমন করে

 

' ষাট হাজার'

 

' আরে ধ্যাত, অন্য লোকের কাছে যাও সংসদ সদস্য হেকমত আলী  অমন কাজ করেন যাও '

 

' সত্তর হাজার'

 

'নাহ'

 

'এক লক্ষ' মুখ গম্ভীর হয়ে গেছে রাঘবের

 

' আরও নোট ফেলতে হবে'

 

লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো রতন, ' আপনি আসলেও ডাকাত এইজন্য অবসর সময়ে বসে বসে পিস্তল বন্দুক পরিষ্কার করেন'

 

' অপরাধ করতে পিস্তলের দরকার হয় না আমার' মুচকি হাসলেন কবর শেঠ   ' যৌবনের শুরুতে ব্যবহার করেছি আজকাল লাগে না আমার নাম আর মগজ যথেষ্ট  তারপরও  হাফ ডজনের বেশি দেশি বিদেশি অস্ত্র রয়ে গেছে আমার কাছে অবসর সময়ে সেইসব মেরামত করি তেল দেই পরিষ্কার করে রাখি এটাও একটা শখ বিদেশে খুব জনপ্রিয়প্রচুর গান ক্লাব আছে। পিস্তল বন্দুক নিয়ে প্রচুর পত্রিকাও বের হয়।    আসলে সবার একটা গোপন শখ থাকা দরকার গোপন শখের চর্চা  মানুষের   বয়স অনেক  কমিয়ে ফেলে ...'

 

' বুঝেছি' বাঁধা দিল রতন  এখানে শখের ক্লাস নিতে আসিনি'

 

'প্রস্তাব তুমি দিয়েছ দামও তুমি বাড়াও গতবার এক লাখ নিয়েছি সেটা ঈদের মৌসুম বলে ডিসকাউনটে ছিল এবার বেশি লাগবে'

 

 

ঝপ করে চেয়ারে বসে অসহায় গলায় রতন বলল , ' কত চান আপনি ?'

 

' নির্ভর করছে কি ধরনের অপকর্ম করবে তার উপর'  শান্ত  পেশাদারী গলা আকবর শেঠের  যেন রাস্তা থেকে এক ডজন আমলকী কেনার জন্য দরদাম করছেন ' কিছু একটা করার জন্যই তো নারায়ণগঞ্জে ফিরেছ তাই না ?আর তোমার ভাল করেই জানার কথা আমার চেয়ে ভাল ছক কেউ বানাতে পারবে না কেউ না তুমি ধামাকা মেরে আসবে কিন্তু সবাই জানবে ঘটনার জায়গায় তুমি ছিলেই না হাজার লোক সাক্ষী দেবে একদম নির্দোষ প্রমাণ হবে জানো তো এইসব  নাকি ?   '

 

'জানি বলেই তো সব সময় আপনার কাছে আসি'  ব্যাজার মুখে বলতে বাধ্য হল রতন

 

' এইবার আমি দুই লাখ নেব'

 

কিইইইই ?' লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো রতন

 

'শান্ত হও রতন বসো '

 

বসে পড়লো রতন কিছুক্ষণ তোম্বা হয়ে রইল চেহারা দেখে মনে হল রুহ আফজার কথা বলে কেউ ওকে চিরতার রস খাইয়ে দিয়েছে ' ব্যাপারটা খুব বিরক্তকর  আপনি আসলে টাকার পয়দা দশ বছর ধরে আমাকে ছক দিচ্ছেন মাত্র  কুড়ি    হাজার টাকা করে নিতেন আগে ,  শুরুর দিকে'

 

' আরে ভাই জিনিস পত্রের দাম যা বেড়েছে আর পারছি শীত এসে যাচ্ছে নতুন একটা স্যুট কিনব সেই উপায় নেই  তাছাড়া কিলার হিসাবে তুমিও বেশ ভাল চার্জ কর আন্ডারগ্রাউন্ড সবার কমিশন আর চার্জ বেড়েছে এক আমি হতভাগা শুধু অল্প দামে কাজ করছি তাছাড়া...'

 

'হ্যাঁ বুঝেছি আপনি পঞ্চ পাণ্ডবদের এক  ভাই অনেক সৎ এখন এই পিস্তল আর ন্যাকড়া দূরে রাখুন কাজের কথায় আসুন  '

রতন বিরক্ত

 

'ঠিক কথা'

 

কাঠের খাঁজ কাটা একটা  ্যাক ছিল সামনে সাতটা বিদেশি বিভিন্ন ক্যালিবারের সাত রকমের পিস্তল আর রিভলবার   রাখা ্যাকের ভেতরে  পাশে তেলের শিশি সব জিনিস সহ  কাঠের ্যাকটা দুই হাতে বুকের সাথে ধরে তুলে নিলেন আকবর শেঠ দেয়ালের আলমারিতে রাখলেন  আলমারি বন্ধ করে যত্নের সাথে তালা দিয়ে চাবিটা প্যান্টের পকেটে রাখতে রাখতে বললেন , ' তো কেকটা কবে বানাতে চাইছ ?'

 

 'আজ রাতেই'

 

'সমস্যা নেই টাকা যখন নিচ্ছি দারুণ একটা ছক আর এলীবাই পেয়ে যাবে আমার মগজ থেকে সময়টা কখন হবে ?'

 

'রাত দশটার পর মেয়েটা কাজ থেকে ফেরেই তখন'

 

'মেয়েটা ?' অবাক হয়ে ফিরে চাইলেন আকবর শেঠহতাশ গলায় বললেন ,  ' রতন ! টাকার জন্য মেয়ে মানুষ খুন করছ আজকাল ?'

 

'খাঁচার ভেতরের অচিন পাখি নিয়ে আপনাকে   চিন্তা করতে হবে না আপনি প্ল্যান বানান' বিরক্ত হল রতন

ভাব দেখলে গা জ্বলে ব্যাটা একেবারে সত্য যুগের মানুষ যেন

 

' তাও সত্য' খানিক চুপ থেকে নরম গলায়  স্বীকার করলেন আকবর শেঠ ' প্রয়োজন আইন মানে না তারপরও মেয়ে মানুষ আর শিশু  খুন কেমন যেন লাগে যাক , সেটা তোমার ব্যাপার সারা জীবন বেপথে ছিলাম। আছি।  এবং থাকব । কিন্তু শিশু আর মেয়েমানুষের সাথে   অপরাধ  মিক্স করিনি।     খুব সুন্দরী নাকি মেয়েটা ?'

 

' এতই সুন্দরী যে দুই লাখ টাকা পেয়ে যাচ্ছেন আপনি'

হা হা করে প্রাণবন্ত হাসি ফিরিয়ে দিলেন আকবর শেঠ সামনে এসে রাঘবের পিঠ চাপড়ে বললেন , ' চল তোমাকে দারুণ একটা জিনিস দেখাই'  

আকবর শেঠ উনার প্রাইভেট রুমের দরজা খুলে রতনকে নিয়ে বাইরে চলে এলেন 

বাইরে সেই ভিআইপি লাউঞ্জ  পর্দা ঘেরা

 

নিচু গলায় বলতে লাগলেন তিনি , ' ভাল করে খেয়াল কর আমার প্রাইভেট রুমে যাবার অন্য কোন রাস্তা নেই বের হবারও কোন রাস্তা নেই না কোন দরজা না আছে কোন জানালা  সোজা ক্লাবের মেইন গেইট দিয়ে  ভেতরে ঢুকে সবার চোখের সামনে দিয়েই আমার রুমে যেতে হবে আর সেটা সবাই দেখবে  ক্লাবের বাইরের সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়বে ভেতরে কে কে ঢুকেছে বা বের হয়েছে'

 

 ' তো ?' বোকা বোকা গলায় বলল রতন 

 

'আজ রাতে সাড়ে নয়টায় তুমি আমার কামরায় ঢুকবে সবার চোখের সামনে দিয়ে আমরা দুইজন গেইম সেট আপ করব শুধু তুমি আর আমি থাকব আমার কামরায় তুমি বের হয়ে যাবে  কেক  বানানোর কাজ শেষে ফেরত আসবে কেউ টেরও পাবে না কারণ সবাই জানবে তুমি আমার সাথেই আমার কামরায় ছিলে'

ফিসফিস করে বললেন আকবর শেঠ

 

' আপনি বলছেন সবার সামনে দিয়ে বের হয়ে যাব কেউ সেটা দেখতেই পাবে না ?' রতন অবাক

 

' সবার সামনে দিয়ে যাবে কে বলল ?'

'কিন্তু আপনিই তো বললেন এখান দিয়ে বের হবার কোন রাস্তা নেই দরজা বা জানালা নেই'আরও অবাক রতন

 

'আছে' মুচকি হাসলেন আকবর শেঠ' কিন্তু সেই গোপন পথ শুধু আমি জানিযেহেতু তুমি আমাকে দুই লাখ টাকা দিচ্ছ  কাজেই তুমি এখন সেই পথটা জানবে'

 

ভিআইপি লাউঞ্জেরশেষ মাথায়  এক কোণে একটা টেলিফোন বুথ ভেতরে পুরানো আমলের বাতিল কালো কুচকুচে একটা ফোন ঝুলছে দেয়ালের সাথে বড় কাগজের প্ল্যাকার্ডে লেখা- আউট অভ অর্ডার

অনেক আগে যখন মোবাইল এত চালু হয়নি তখন এই জায়গা থেকে লোকজন গোপনে ফোন দিতে পারতো আকবর শেঠ ওখান  থেকেও পয়সা কামাতেন 

 

' আপনি কাউকে ফোন  করবেন ?' অবাক রতন লোকটা গভীর জলের ক্রাকেন  আজও রহস্য

 

'আমি না তুমি দেবে' হাসি হাসি মুখ আকবর শেঠের ' যাও ফোনের সামনে গিয়ে ওটার দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়াও'

বোকা বোকা ভাবে তাই করলো রতন মাথায় কিছু ঢুকছে না

' শরীরের ওজন মেঝেতে দাও তারপর টেলিফোনের ডায়ালের ৪৬৯৩ নাম্বার ধরে ডায়াল কর'

 

ধূর্ত রতন বেশ উজবুক হয়ে গেছে

কিন্তু তাই করলো পুরানো দিনের ফোন রোটারি ডায়াল  পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ওই নাম্বার ডায়াল করতে হয়

ডায়াল শেষ হতে ফিরে চাইল আকবর শেঠের দিকে কই কিছুই তো হচ্ছে না

তখনই ঘড় ঘড় শব্দ করে দেয়ালের এক পাশে  সরু এক চিলতে জায়গা ফাঁক হয়ে গেল একজন মানুষ হেসে খেলে বেরুতে পারবে বাইরে সরু  করিডোর নরম আলো জ্বলছে 

বোকার মত হেসে ফেলল রতন

 

' দেখলে ?' হাসি মুখে বললেন আকবর শেঠ ' এই রাস্তা চলে গেছে  ক্লাবের পিছন দিকে  বাইরে দেয়াল  ওটা  টপকে বাইরে গেলেই  সরু গলি গলি থেকে রাজপথ   কেউ জানবে না কাজ শেষ করে আবার দেয়াল টপকে চলে আসবে সোজা এই টেলিফোন রুমে  আবার  ৪৬৯৩ ডায়াল করলেই গোপন দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। তারপর   এখান থেকে সোজা  আমার রুমে কেমন লাগল ?'

অপূর্ব'

 

'এখন জলদি চলে এসো কেউ যেন না দেখে

 

দ্রুত পায়ে দুই ধড়িবাজ ফিরে এলো প্রবেশ নিষেধ কামরাতে।

 

আর শোন এই ৪৬৯৩  পিন নাম্বার  দিয়ে গোপন দরজা একবারই খোলা যাবে। সব কিছু নিখুঁত আর নিরাপদ রাখার জন্য প্রত্যেকবার ব্যবহার করার পর পিন নাম্বার বদলাই আমি। ভাল কথা পিস্তল ফিস্তল আছে তোমার কাছে ? না আমার কাছ থেকে ভাড়া নেবে ? ’ চেয়ারে বসতে বসতে জানতে চাইলেন আকবর শেঠ।

 

আছে আকবর ভাই। নিজের কাছে কখনই রাখি না। লোকনাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার চেনেন তো ?’

 

না চেনার কোন কারণই নেই। সব সময় ওদের মিষ্টিতে মাছি পাই। সব কিছুই এক সপ্তাহের বাসী মাল।

 

দোকানের মালিক লোকনাথ বাবুর কাছেই আমার জিনিসপত্র রাখি। সামান্য ভাড়া দিতে হয়। কিন্তু নিরাপদে থাকে।

      

খুবই ভাল কথা। এ যেন মিষ্টির নীচে বৃষ্টি ।’     

 

 

 

 

তিন

 

ক্লাব থ্রি সিক্স সিক্স

বার কাউনটারে বসে আছে রতনরাত নয়টা ক্লাব জমে উঠেছে । এক কোণে পেল্লাই একটা পিয়ানো । তরুণ এক বাদক চলতি হিন্দি গান বাজিয়ে  শ্রোতাদের   বাহবা

 নিচ্ছে অকাতরে।

বুক পকেট থেকে সিগারেট বের করে মুখে ঝুলানো মাত্রই পাশে কে যেন গ্যাসলাইটার জ্বেলে দিল ফস করে

বিরক্ত হয়ে ফিরে চাইল রতন

 

সিগারেটটা  জ্বেলে ফেলুন ' আন্তরিক মাখা গলায় বলল বিহারীলালযেন কত কালের বন্ধু

 

ফু দিয়ে গ্যাস লাইটার নিভিয়ে দিল রতন, আমার কাছে দেশলাই আছে'

 

দেখুন দেখি আপনার আচরণে বন্ধুত্বের কোন ছাপ নেই'  বিহারীলালের গলায় হতাশা অথচ আমি বন্ধু-বান্ধব পছন্দ করিবন্ধু ছাড়া জীবন অচল। বন্ধু  মানেই সোনার খনি । '

 

 

' অন্য কোন ক্লাবে  যেতে পারেন না ?  যেখানে ডবকা মেয়ে মানুষ আপনার সামনে ধেই ধেই করে নাচবেদেখে মজা পাবেন। '

 

তেমনটা হতেই  পারেতবে নাহ, ওই সব নর্তকীদের ভাতারগুলো আবার দেখা যায় অপরাধ জগতের মানুষ জনকোন নর্তকী প্রেম ভরা চোখে দেখলে ভাতার এসে ঝামেলা করবে।   ঝামেলা ভাল লাগে না'

 

আহা,  কী সুন্দর কৌতুক শুনলাম' টিটকারি না মেরে পারলো না রতন

 

বারটেনডার মুস্তাফা সামনে এগিয়ে এলো আপনার কিছু চাই স্যার ?'

বিহারীলালকে উদ্দেশ্য করে বলেছে সেনিজের পেশায় পাকা। বুঝতে পেরেছে কোন রকম নাট বল্টু চলছে এখানে ।

 

না কিছু চাই নাশুধু নাটক দেখতে এসেছি 'রসহীন গলায় বলল বিহারীলাল। যেন গলা শুকিয়ে গেছে।  

 

নাটক ? এখানে তো কোন রকম নাটক হয় না স্যার' অবাক মুস্তাফা

 

আরে কি যে বল নাযেখানে রতন হাজির সেখানে কোন না কোন নাটক নিশ্চয়ই হয়'

 

 দেখুন আপনি কিন্তু একটু বেশি রকম  বাড়াবাড়ি করছেনআপনার আচরণ আমার পছন্দ হচ্ছে না' গর্জে উঠল রতন

 

হতেই পারে।সবার আচরণ সবার পছন্দ হবে অমন কোন কথা নেই।তেমন কোন আইন ও তো নেই।   '

 

এখানে আমি কোন রকম ঝামেলা করতে   আসিনি'

 

সেটা তো আমাদের জন্য  আনন্দের সংবাদতবে আপনাকে আমি কোন ঝামেলায় জড়াতে দেব  না'

 

আমি এখানে এসেছি শুধু  আমার বন্ধু আকবর শেঠের সাথে তাস খেলতে'

 

না করলো কেখেলুন নাআমি বসে বসে দেখবতারপর না হয়  আপনার সাথেই হেঁটে আপনার বাড়ি পর্যন্ত যাব'

 

আবার খেজুরে আলাপ মারাতে ?'

না, আপনাকে চোখে চোখে রাখতেআগে বন্ধু হিসাবে গিয়েছিলাম, এখন ডিউটিতে আছিচব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখব আপনার উপরকোন রকম বন্ধু না আমরাএখন কোন হেল্প পাবেন না'

 

আহ কি দারুণএকেবারে বইয়ে পড়া থ্রিলার গল্পের নায়কঢঙ দেখে আর বাঁচি না'

আরও কি কি বলতো রতন কে জানে ! আচমকা কোত্থেকে পাশে হাজির হলেন আকবর শেঠ দরাজ গলায় বললেন , ' গুড ইভিনিং জেনটল ম্যানসব ঠিক আছে তো  ?'

 

তারপর বিহারীলালের দিকে ফিরে অমায়িক একটা স্মিত হাসি দিয়ে বললেন , আঃ, ইউনিফর্ম ছাড়া বিহারীলাল বাবুকে চেনা একদম মুশকিল'

 

চলুন আকবর ভাই' উঠে পড়লো রতন' আজ বড় বাজিতে তাস খেলব আপনার সাথেবিহারী বাবু নিশ্চয়ই কিছু মনে করবেন না'

 

না,  মোটেই নাখেলুনতাস পাশা দাবা যা খুশি খেলুন।আমিও আপনাদের সাথে খেলতাম।   আমার আবার  ভাল লাগে নাশাস্ত্রে ওই সব বারণ আমি ক্লাবের ভেতরে বসেই পিয়ানো শুনি বা টিভি দেখি '

বলেই উঠে কামরার অন্য দিকে চলে গেল বিহারীলাল

মাছের মত চোখে,   অনেক সময় ধরে লোকটার চলে যাওয়া দেখলেন আকবর শেঠ খানিক চিন্তিত সুরে বললেন ,  পরিস্থিতিটা  আমার পছন্দ হচ্ছে না রতন'

 

'গাধাটাকে নিয়ে মোটেও ভাববেন না আকবর ভাই' গলার পর্দা কয়েক ধাপ নিচু করে বলল রতন ' ব্যাটা জানতেই পারবে না কি করছি আমরা চলুন ভেতরে'

 

কথা বলা শেষ করে ভেতরের রুমের দিকে পা বাড়াল রতন

বারটেন্ডার মুস্তাফাকে ডেকে  আকবর শেঠ বললেন , ' নতুন এক প্যাকেট তাস দাও তো আমাকে আর শোন একজন ওয়েটারকে দিয়ে ভাল এক   বোতল   ওজো    (মৌরির স্বাদগন্ধযুক্ত এক ধরনের  গ্রীক মদ)    আর কয়েকটা গ্লাস পাঠিয়ে দিও আমার প্রাইভেট রুমে'

 

' নিশ্চয়ই স্যার। এখনই ব্যবস্থা করছি।  '  সায় দিল মুস্তাফা 

 

 

নতুন তাসের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে চারিদিকটা সতর্ক ভাবে দেখে পা বাড়ালেন আকবর শেঠ

 

খানিক দূরে  মিক্স জুসের ককটেল হাতে বসে পিয়ানো শুনছিল বা শোনার ভান করছিল বিহারীলাল আকবর শেঠের সাথে চোখা চোখি হতেই  বেহায়ার মত হাসল অফিসার চোস্ত আর অভিজাত ভঙ্গিতে হাসিটা ফেরত দিলেন ক্লাবের মালিক।

 

 

প্রাইভেট লাউঞ্জ  তারপর প্রবেশ নিষেধ সাইন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লো দুইজন

 

'বস'  বললেন আকবর শেঠ ' কয়েক দান খেলে নিই আগে'

 

'  বেশি সময় নেই হাতে '  ধৈর্যহীন গলায় বলল রতন

 

'জানি  কিন্তু সেট আপ বানাতে হবে  মঞ্চ যাকে বলে বস'

 

 

দুইজনেই বসে পড়লো

 

 

প্যাকেট খুলে নতুন কড়কড়ে তাস বের করলেন আকবর শেঠ  দ্রুত আর দক্ষ হাতে সাফল করলেন সব তাস মিশিয়ে নিলেন ইচ্ছামত  

 

 

' শোন, ওয়েটার এখনই আসবে  এক বোতল অজো আর গ্লাস নিয়ে ওর আসাটা দরকার একজন রাজ সাক্ষী বলতে পারো পরবর্তীতে সবাইকে বলবে - দেখছিল তোমাকে আমার সাথে জুয়া খেলছ'

 

' ব্যাপারটা পছন্দ হয়েছে' তারিফ করলো রতন

 

 

'এখন পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে টেবিলের উপর রাখ জুয়া খেলছি ব্যাপারটা জাতে জেনুইন মনে হয়'

 

পকেট থেকে একশো টাকার একটা বাণ্ডিল বের করে টেবিলের উপর রাখল রতন টাকা আনার কথা আগেই বলে রেখেছিলেন ক্লাবের ধূর্ত মালিক।  

 

তাস বাঁটা শুরু করেছেন আকবর শেঠ দ্রুত হাতে

 

 

 বিরক্ত মুখে হাত ঘড়ির দিকে চেয়ে রতন বলল , ' পৌনে দশটা বেজে গেছে'

 

'রিলাক্সমেয়েটা তো দশটার পর বাসায় ফিরবে  নাকি ?'

 

' হ্যাঁ,   কিন্তু আমাকে আগে ভাগে ওর রুমে গিয়ে ঘাপটি মেরে থাকতে হবে তো '

 

' সময় মতই পৌঁছে যাবে ভাল কথা,  প্ল্যানটা ভাল মত করেছ ? নিখুঁত ভাবে লাশটা পড়বে ?'

 

' দারুণ একটা প্ল্যান আছে আমার মাথায় সিম্পল আর বিউটিফুল প্ল্যান     আনন্দে কুৎসিত হয়ে গেছে রাঘবের চেহারা   আমি পিছনের গোপন দরজা দিয়ে মেয়েটার বাসায় চলে যাব আপনি উঁচু গলায়  একা একাই কথা বলতে থাকবেন।   তর্ক আর ঝগড়া   করার মত     বাইরে থেকে সবাই ভাববে আমরা দুইজনে   ঝগড়া করছি  মেয়েটা সাড়ে দশটায় বাসায় ফিরে ক্লাব থেকে ঠাস করে মেরে আবার চলে আসব আপনার কাছে পিছনের দরজা দিয়েই'

 

' ক্লাব থেকে মেয়েটা ফিরবে ?' অবাক হলেন আকবর শেঠ

 

' হ্যাঁ, ব্লু ফক্স ক্লাবে  সপ্তাহে তিনদিন  নাচে মেয়েটা আজ ওর শো আছে'

 

' বাহ, মেয়েটার সব কিছু ভালই তো জরিপ করেছ '

' করতে হয় পেশা। '

 

 দরজায় ঠক ঠক  শব্দ 

 

হাত দিয়ে ইশারা করলেন আকবর শেঠ দ্রুত টেবিলের উপর থেকে তাস তুলে নিল রতন 

 

'ভেতরে এসো' নিজের ভাগের তাস থাবা মেরে তুলে গম্ভীর সুরে হাঁক দিলেন আকবর শেঠ সেই সাথে  কোটের পকেট থেকে কিছু টাকা ছড়িয়ে রাখলেন টেবিলের উপর

 

দরজা খুলে গেল

ভেতরে ঢুকল রোগা মত এক যুবক গায়ে ওয়েটারের পোশাক মাথায় হালকা টাক হাতে ট্রে কাচের  সাদা বোতল চারটে গ্লাস

 

গলা উঁচু করে তর্কের সুরে বলতে লাগল রতন , ' আপনি অতিরিক্ত কথা  বলেন আকবর ভাই নিন তাই সই দশ হাজার টাকা দিয়েই শুরু  দরকার হলে বাকিতে খেলব'

 

'প্যান প্যান করছ কেন ? এই তো রেখেছি টাকার দলা' সমান তেজে বললেন আকবর শেঠ তারপর ফিরে চাইলেন ওয়েটারের দিকে , '  প্রাণকৃষ্ণ ?  বোতল এখানে রাখ আর খেয়াল রাখবে আগামী দুই ঘণ্টার মধ্যে কেউ যেন আমার প্রাইভেট রুমে না আসে আজকে মুডে আছি  রতন বাবুকে এক দান দেখিয়ে দিতে হচ্ছে ক   টাকা নিয়েও ওকে বাড়ি ফিরতে দেব না'

 

' গতবার আমি দশ লাখ টাকা হেরেছি আপনার চোট্টামির জন্য' অম্লান বদনে মিথ্যা বলল রতন  

 

'চোট্টামি করিনি তাসের ভাগ্য তোমার সব সময়ই  খারাপ বাজে অপবাদ দেবে না ' হাত তুলে সাবধান করে দিলেন আকবর শেঠ

' রাখেন আপনার ভাগ্য  দেখি আজকে কেমন তাস উঠে'  গজ গজ করে উঠলো রতন 

' মুখটা বেশি চলে তোমার'  সমান তেজে জবাব দিলেন আকবর শেঠ

 

ওয়েটার প্রাণকৃষ্ণ দুই অসম বয়সী জুয়াড়ি বন্ধুর দিকে ঘন ঘন কয়েক বার চেয়ে  দেখল।  পরিস্থিতি সুবিধার না,  বুঝে আস্তে করে ভেগে গেল টেনে দরজা বন্ধ করে দিল বাইরে থেকে

প্রাণকৃষ্ণ চলে যেতেইএক সাথে  থেমে গেল দুইজনের তর্জন গর্জন

মিহি একটা হাসি হেসে রতন বলল ,' দারুণ হয়েছে আকবর ভাই এইবার আমি বেড়িয়ে পড়ি  মোক্ষম সময়'

উঠে দাঁড়ালো রতন  

 

'হ্যাঁ যাও, জলদি জলদি কাজ সেরে ফেল শুভ কামনা রইল  '  হাত বাড়িয়ে রাঘবের মুঠোটা ধরে ইচ্ছামত ঝাঁকিয়ে দিলেন আন্তরিক ভাবে ' চিন্তা করবে না আমি বক বক করতেই থাকব  যতক্ষণ তুমি ফিরে না আসছ আর শোন, মোবাইল ফোন টেবিলের উপরে রেখে যাও। পুলিশ আবার  নাম্বার ট্র্যাক করে তোমার লোকেশন বের করতে পারবে । আরেকটা ব্যাপার , আমার ক্লাবের বাম  পাশে,   মনিহারি দোকান আছে কয়েকটা । এড়িয়ে যাবে।  সিসি ক্যামেরা  আছে ওখানে ।  '

 

দরজা খুলে বেড়িয়ে গেল  রতন 

সতর্ক আর আত্নবিশ্বাসী   পায়ে 

ভিআইপি লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে সাবধানে পর্দার আড়াল থেকে বাইরের  দৃশ্য জরিপ করলো বাজছে  পিয়ানো   পানাহার করছে নরনারী  ঠুং ঠ্যাঙ কাচের পানপাত্রের শব্দ। হাসি।

 

ওই দিকে আকবর শেঠের কামরা থেকে শব্দ ভেসে আসছে উঁচু গলায়, ' ঠিক আছে ঠিক আছে বেহুদা প্যাচাল না পেরে খেলা শুরু কর   সামান্য দশ পাঁচ হাজারে আকবর মরে না বের কর কত আছে'

 

মুচকি হাসল রতন এই গলা বাইরের বার পর্যন্ত শোনা যাবে

ওই দিকে ভেতরের রুমে দুটো গ্লাসে সমান করে পানীয় ঢাললেন আকবর শেঠ  অর্ধেক মদ ফেলে দিলেন পাশের  একটা  পিচ্চি বেসিনে 

উঠে গিয়ে আলমারির লকার থেকে বের করে আনলেন উনার পিস্তলের সংগ্রহ তেলের শিশি পরিষ্কার সাদা  ন্যাকড়া

সময়টাতে বকবক করবেন আর শখের কাজটা সেরে ফেলবেন

 

আউট অভ অর্ডার-  লেখা বাতিল ফোনটার দিকে এগিয়ে গেল রতন

যেমনটা আকবর শেঠ দেখিয়েছিলেন তেমন করতেই আগের বারের মত খুলে গেল দরজা

এক গাল হেসে বের হয়ে গেল রতন

পিছন থেকে ভেসে আসছে আকবর শেঠের গজগজানি

 

 

বারে বসে অলস ভাবে সময় পার করছিল বিহারীলাল

কান খাড়া করে শুনছে আকবর শেঠের হাউ কাউ

'মনে হচ্ছে তোমার বস জুয়ায় হারছে' নরম গলায় মন্তব্য করল গোয়েন্দা

' বস কক্ষনই জুয়ায় হারে না'    সামনে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার ন্যাকড়া দিয়ে রকগ্লাস পরিষ্কার করছিল  মুস্তাফা  জবাব দিল 

মাথা ঝাঁকাল বিহারীলাল 

 

চার

 

 

 

ক্রিং ক্রিং করে টেলিফোনটা চেঁচিয়ে যাচ্ছে রিসিভার কোলে তুলে  কেউ  থামাচ্ছে না ওর কান্না 

বাসায়  লোকজন  থাকলে তো !

জানালার পাল্লা খুলে প্রায় ভূতের মত কামরার ভেতরে ঢুকে পড়লো রতনজানালার পাশে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে জরিপ করেছে ।

আধো ছায়া ছায়া অন্ধকার ভেতরে বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলো অনুমতি ছাড়া ভেতরে ঢুকে পড়েছে  ঘুঁট ঘুটটি আঁধার নেই ভেতরে

 

 

আরামদায়ক শৌখিন কামরা 

একটা বিছানা চাদর বালিশের কভার সব গোলাপি কামরার এক কোণে কালো চতুর্ভুজ  টেবিল উপরে চীনা মাটির পেল্লাই এক  সাদা  ফুলদানি ভেতরে  ঠাসা রাজ্যের সব তাজা গোলাপ

 

ওখানে মেয়েলী কিছু অলংকার সবুজ   পাথরের একটা ব্রেসলেট দেখে তুলে নিল চিনতে পারলো  নিজেই কিনে দিয়েছিল আয়নাকে  রাগে ছুড়ে মারল কামরার অন্য মাথায়

একা একা ফোনটা বেজে এখন থেমে গেছে

সুইচ চেপে  টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে দিল

একটা খাম খোলা চিঠি  কি মনে করে চিঠিটা পড়া শুরু করেছে,  তখনই খস মস করে  বাইরের দরজার কী হোলে  শব্দ হল

দ্রুত আলো নিভিয়ে অন্ধকারে দেয়ালের সাথে  সেঁটে রইল সে

দরজা খুলে হাইহিলের শব্দ করে ভেতরে ঢুকল কেউ শব্দ করে  দরজা বন্ধ হল  

 আলো জ্বলল বাইরের কামরার  খুট খাট শব্দ করে বেডরুমে ঢুকে পড়লো   মেয়েটা পরিচিত পারফিউমের সৌরভে রতন বুঝল - আয়নাসেই মিষ্টি সৌরভ। এক জনমে কি ভোলা যায় কাউকে ?

 

ভেতরের কামরার দেয়ালের কোথা সুইচে চাপ দিতেই হলুদ আলোতে ভেসে গেল সবকিছু  আয়না মেয়েটা কাচের মত সুন্দরী যত না  রূপ  ,  তারচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় মেয়েটার শারীরিক গঠন দামি পোশাক গায়ে হাতে চুমকির কাজ করা মেয়েলী ব্যাগ 

কানে ইয়া বড় বড় দুল বিজলির আলোতে দামি পাথর ঝিকিমিকি করে উঠলো   

  

'তারপর কেমন আছ আয়না ?' মেয়েটাকে চমকে দিয়ে আচমকা কথা বলে উঠল রতন।

আর, চমকটা ভালই খেল আয়না

ভয়ে  ফ্যাঁকাসে হয়ে গেল চেহারা একবার শুধু বলল , ' রতন তুমি ?'

তারপরই দৌড়ে পালিয়ে যেতে চাইল কামরার ভেতর থেকে

 

অত সহজ না  দরজার ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিল রতন খপ করে ধরে ফেলল আয়নার হাত জোরে ঝাঁকুনি দিতেই ছিটকে গিয়ে আয়না পড়লো বিছানার উপর

' বিশ্বাসঘাতিনী' হিসিয়ে উঠলো রতন 'অত সহজে পালাতে পারবে না কেমন আছে তোমার সিধু নাগর?'

 

'সিধু ?' ফ্যাল ফ্যাল করে বলল আয়না  আতঙ্কে কুরূপা হয়ে গেছে  মুহূর্তেই

 

' সেই দিনের এক সস্তা গুণ্ডার হাত ধরে পালালে ? অথচ কি দেইনি আমি আমি তোমাকে ? হীরার গহনা, নতুন  ফ্ল্যাট ,  বস্তা বস্তা  টাকা বেহিসাবি খরচ কি দেইনি ?'

 

 

 

চুপ করে রইল আয়না ওর দুই চোখে আতংক

' ব্যাপারটা মোটেও পছন্দ হচ্ছে  না মার ,আর  সেই জন্য ফিরে এসেছি হিসাব বুঝানোর জন্য' কাটা কাটা গলায় বলল রতন

 

ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর' কান্না ভেজা গলায় বলল আয়না ' ব্যাপারটা আসলে হয়ে গেছে একটা দুর্ঘটনা'

'হারামজাদা  সিধু এখন কোথায় ?' খেঁকিয়ে উঠল রতন

' গেছে ঢাকার এক ক্লাবের ম্যানেজারের সাথে কথা বলতে নতুন একটা কন্টাক্ট  করতে'

'তোমার জীবনের কন্টাক্ট এখনই শেষ করছি' প্যান্টের পকেট থেকে পিস্তলটা বের করে আনল রতন

সই করল আয়নার মাথা বরাবর

একদম  শান্ত হয়ে গেল মেয়েটা যেন বাস্তবতা বুঝে গেছে চুপ করে রইল শেষে জবাব দিল, 'ঠিক আছে রতন  তাই সই '

তাই সই ?' অবাক না হয়ে পারলো না রতন বাঁধা বা কাকুতি মিনতি  আশা করেছিল।

 

'হ্যাঁ, তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হোক তবে মরার আগে আমার একটা ইচ্ছা পূর্ণ কর, আমার স্বামীকে ফোন দিয়ে বিদায় নিতে চাই'

শান্ত মুখে বলল আয়না উঠে দাঁড়িয়েছে বিছানা ছেড়ে

' স্বামী ?' বোকা বোকা গলায় বলল রতন  ' তুমি বিবাহিত ?' 

 

'হ্যাঁ, গ্রামের বাড়িতে আছে সে আমি এসেছিলাম শহরে পেটের দায়ে এই রুপ যৌবন পুঁজি করে'

 

' যাও ফোন কর মরার আগে বিদায় নাও আমি  দেখে চোখের তৃপ্তি পাই'

আয়নাকে ঠেলে টেবিলের উপরে রাখা টেলিফোনটার সামনে নিয়ে গেল সে

পিস্তলটা এখনও ধরে রেখেছে আয়নার কপাল বরাবর

' নাও ফোন করে বল কি করুণ মৃত্যু মেনে নিতে যাচ্ছ তুমি' হাসল রতন

' লোকটা খুব ভাল মানুষ' মায়াবী গলায় বলল আয়না ' এই যুগেও আমাকে চিঠি লেখে এই যে দেখ ...'

' দেখিছি তোমার সেই লাভ লেটার'

 ' শেষের অংশটা পড়েছ ?'

'এই সব পিতলা খাতির মার্কা চিঠি আমি পড়ি না'

 

' এই তো, শেষে লেখা আছ... সব কিছু ঠিক ঠাক আছে এই খানে আমাদের বাচ্চার খেয়াল রাখছি ঠিক মত' কেমন একটা ধূর্ত ভাবে বলল আয়না চোখের কোণে কেমন যেন ষড়যন্ত্র 

' বাচ্চা ?' লাফ দিয়ে সামনে চলে এলো রতন ' কই আমি তো কোন বাচ্চার অংশ পড়িনি '

থাবা মেরে চিঠিটা নিল ' আরে তাইতো শেষে লেখা- আমাদের বাচ্চার খেয়াল ঠিক মত রাখছি তুমি তো জীবনেও বলনি তোমার বাচ্চা আছে'

' সেই সুযোগ আসেনি তাই নইলে ঠিকই বলতাম'

টেবিলের উপরে রাখা ফোনের ডায়াল করতে লাগল আয়না

ওপাশে রিঙ হতে লাগল মাত্র দুইবার রিঙ হওয়া মাত্র কেউ তুলে নিল রিসিভার 

'হ্যালো আমি আয়না' বলল মেয়েটা ' আমাদের  খোকন  কেমন আছে ? আশা করছি সব ঠিক আছে ? ওর দিকে খেয়াল রেখেছ ?'

 

 

 

 

 

 

অনেক দূরে কেউ একজন ফোন তুলেছে লোকটার চেহারা ঘাগু অপরাধীদের মত মুখে কাটা দাগ    বন্ধ একটা কামরায়  একা  বসা সামনে মদের বোতল গ্লাস    সস্তা সিগারেটের ধোঁয়ায় কামরা প্রায় অন্ধকার 

আয়নার গলা শুনে সব বুঝে গেল লোকটা ওর নাম সিধু শান্ত গলায় বলল , ' আমাদের খোকন ঠিক আছে একদম সুস্থ'

কথা শেষ করেই পকেট থেকে লেদ মেশিনে বানানো দেশি রিভলবার বের করে আনল  ওর প্রিয় খোকন 

 

' শুনে ভাল লাগল' সতর্ক ভাবে কথা বলছে আয়না ' আমাদের খোকন রতনকে আদর করে দাও'

 

রতন? চমকে গেল রতন ' তোমার বাচ্চার নাম রতন রেখেছ ?'

 

মাথা ঝাঁকাল আয়না  ' শোন আমার হাতে সময় নেই খুব বেশি কিছু বলতে পারব না খোকা তনের কপালে একটা চুমু দাও আমার তরফ থেকে বল, মা ওকে খুব ভালবাসত    আমার  যদি কিছু হয়ে যায় ...তবে তুমি...'

 

দ্রুত বাঁধা দিল রতন ' বাদ দাও এইসব।  সব বাদ দাও বল পরে ফোন করবে  '

 

তনের কথা মত আয়না ফোনে বলল , ' আমি ফোন রাখছি পরে ফোন দেব'

রেখে দিল রিসিভার

 

'তুমি খোকার নাম রেখেছ রতন ?' নরম ভেজা গলায় বলল খুনি লোকটা চোখ ভিজে আসছে ওর

 

আয়না কিছু বলল না সরু লম্বা আঙুল দিয়ে  রতনের  মুখটা শুধু  ছুয়ে দিল 

'বাচ্চাটা খুব সুন্দর রতন একদিন সময় করে দেখবে ওকে অনেক সুন্দর'

মায়াবী গলা আয়নার

' পিচ্চি এখন কত বড় হয়েছে ?'

' বেশ বড় স্বাস্থ্য ভাল'

তুমি জানো কেমন করে ?'

 

'এই তো গত সপ্তাহেই দেখা করে এসেছি ভয়ে জানতাম তুমি ঠিকই আমাকে খুঁজে মেরে ফেলবে তাই... ওটাই শেষ দেখা...'

' মোটেও শেষ দেখা না' রেগে গেল রতন ' প্রতি মাসে গিয়েই দেখে আসবে পিচ্চিকে '

' কিন্তু তুমি তো বললে...'

'সব ভুলে যাও কাউকে এতিম করতে পারব না আমি নিজেই এতিম ভাল করেই  জানি,  বাপ মা ছাড়া দুনিয়া কেমন জায়গা সাধে কি আর অপরাধী হয়েছি ?  সব ভুলে যাও তোমার কাছে যথেষ্ট টাকা পয়সা আছে ? বাচ্চা লালন পালন করতে নাকি অনেক টাকা লাগে যা খরচ আমি কি কিনে দিতে পারি ? কি লাগবে তোমার ? একটা সাইকেল ? বক্সিং গ্লাভস? রিমোটে চলে অমন মোটর গাড়ি দেখেছিলাম কবার...নাকি ভিডিও গেইম ?  '

 

'উহু, খোকা রতন অনেক ছোট ওর সব আছে যা যা দরকার সব কিনে দিয়েছি আমিতোমার টাকা দিয়েই। হাত খরচের টাকা দিতে না আমাকে ? অর্ধেক ওর কাছে পাঠাতাম। তোমার খরচেই বড় হয়েছে ও।   ' মায়াবী হাসি হেসে জবাব দিল মেয়েটা চোখের তারায় ভালবাসা ঝিকিমিকি করছে।     

 

তারপরও' মুখ কুঁচকে ভাবছে রতন কিছু তো দিতেই হবে শোন কাল সকালে আসব আমি তোমাকে নিয়ে মার্কেটে যাব তোমার যা ইচ্ছা হয় কিনবে টাকার জন্য ভাববে না ঠিক আছে ?'

 

'ঠিক আছে রতন' হাসল আয়না

 

'আর খানিক আগে যে ব্যবহার করেছি ভুলে যাও কোন রাগ নেই তোমার উপর   ' হাসল রতন কুৎসিত মুখে হাসিটা কিন্তু বেশ  সুন্দর

আয়নার রেশমের মত চুল আদর করে এলো মেলো করে দিল রতন 

বের হয়ে এলো দরজা খুলে 

 

 

বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলোতে দেখা গেল হাসছে সে বিড়বিড় করে বলল , ' পিচ্চির নামও রতন ভাবা যায় ? অ্যাঁ ?'

চৈতালি হাওয়ায় বিবাগী হয়ে গেল ওর মন।

 

হাসছে।  

 

রতন বের হয়ে গেছে মিনিট খানেক হবে

ঝন ঝন করে আয়নার টেলিফোন আবার বেজে উঠল

'কে সিধু নাকি  ?' জানতে চাইল  নর্তকী  মেয়েটা

'হ্যাঁ সব ঠিক আছে ? তুমি বারবার খোকন খোকন বলছিলে কেন ? খোকন তো আমার রিভলবারের নাম  তুমি ঠিক আছ তো ?    '

'হ্যাঁ,  আমার চালাকি কাজে লেগেছে  পরে তোমাকে সব গুছিয়ে বলব   এখন জলদি মাল পত্র গুছিয়ে ফেল কাল আমরা শহর ছেড়ে চলে যাব কয়েকটা  দিন একদম গুম হয়ে থাকবএমন জায়গায় যেতে হবে যেখানে কেউ আমাদের চিনবে না পরে সময় সুযোগ মত তোমার খোকনের ব্যবহার করে রাঘবের ব্যবস্থা করতে হবে তখনই বিয়ে করতে পারবে আমাকে কাল দেখা হচ্ছে ?'

 

 

পাঁচ

 

 

ক্লাবের ভেতরে বসে  খরগোশের মত  কান পেতে আছে বিহারী লাল

আকবর শেঠের কামরা থেকে এখনও হাউ কাউ শোনা যাচ্ছে লাগাতার তর্ক করছে লোকটা  অদ্ভুত বিকারগ্রস্থ নাকি ?  

একবার উঠে গিয়ে পর্দা ঘেরা অংশটায় দাঁড়ালো হ্যাঁ নিঃসন্দেহে ভেতরে ঝগড়া চলছে বাজির দান,  বেশি  টাকা, বাকি পয়সা ,  জোচ্চুরি , হরতন ,   রুইতন, টেক্কা ।     হেন তেন 

ওই দিকে কামরার ভেতরে বসে এখনও নিজের প্রিয় পিস্তল আর রিভলবারগুলো একটার পর একটা পরিষ্কার করেছেন আর একা একাই কথা বলে যাচ্ছেন আকবর শেঠ

 

বারে ফিরে এসে লম্বা টুলে বসে পড়লো বিহারীলাল ' এত লম্বা সময় ধরে মানুষ ঝগড়া করে ?'

 

'আপনার মাথা  ধরে গেছে ?' গ্লাস পরিষ্কার করতে করতে জানতে চাইল মুস্তাফা

 

'শুধু  মাথা না,    মুথা পর্যন্ত ধরে গেছে' ম্বা মুখে বলল  গোয়েন্দা

 

সেই সময় পিছনের গোপন দরজা খুলে ভিআইপি রুমে ঢুকে পড়লো রতন নিঃশব্দে

আকবর শেঠের গলা কানে ঢুকতেই মুচকি হাসলো

আকবর শেঠ বলে যাচ্ছেন , ' খেলতে না পারলে আসো কেন বার বার কার্ডই তো চেন না ভাল মত রঙ আর টেক্কা না চিনলে অমনই হয় কুইন তো...'

 

আকবর শেঠকে চমকে দেয়ার জন্য দরজায় শব্দ না করে ভেতরে ঢুকে পড়লো রতন 

 

তখনই কাণ্ডটা হল 

 

 

পিছন ফিরে দেখতে যাচ্ছিলেন আকবর শেঠ কিভাবে যেন হাতে ধরা পিস্তলের ট্রিগারে চাপ লেগে ধুরুম করে গুলি বের হয়ে গেল

একেবারে  নিজের বুকেই লাগল 

 

 

'আকবর ভাই' চেঁচিয়ে দৌড়ে সামনে গেল রতন 

গল গল করে রক্ত বেরোচ্ছে আকবর শেঠের বুক থেকে ভিজে গেছে দামি পোশাক

 

'এখনই হাসপাতালে নিতে হবে আপনাকে' চেঁচিয়ে বলল রতন  ওস্তাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিল রিভলবারটা   

 

' নাহ দেরি হয়ে যাবেততক্ষণ বাঁচব না।  তোমার কাজটা হয়েছে ?'

 

এটাই ছিল আকবর শেঠের  শেষ কথা  

 

নিজের নিরাপদ অফিস রুমে,  নিজের  পিস্তলের গুলিতে মারা গেলেন শহরের সবচেয়ে ধূর্ত অপরাধীটা

 

তখনই খোলা দরজার সামনে  হুঙ্কার দিয়ে উঠল বিহারীলাল ' একদম নড়বে না রতন'

ঘাড় ফিরিয়ে দেখল বিহারিলাল পিস্তল ধরে রেখেছে ওর দিকেপিস্তলের নল একদম ওর কপাল বরাবর।বিহারী লালের পিছনে  বারটেনডার  মুস্তাফা তার  পিছনে হাফ ডজন কৌতূহলী নরনারী ক্লাবের সদস্য

  হুড় মুড় করে ভেতরে  ঢুকে পড়লো বিহারীলাল  

বুক  পকেট থেকে রুমাল বের করে,   সাবধানে রাঘবের হাতে ধরা রিভলবারটা আলতো করে  প্যাচিয়ে  নিজের প্যান্টের পকেটে  ভরে  ফেলল বিহারীলাল , ' জিনিসটা আমার জিম্মায় রইল রতন কোন চালাকি করবে না খেলা শেষ'

অন্য হাতে দ্রুত সার্চ করে রাঘবের প্যান্টের পকেট থেকে বের করে নিল ওর  পিস্তলটাও।

 

 

' আপনি ভুল বুঝছেন ?' চেঁচিয়ে উঠল রতন

 

' ওই সব কোর্টে গিয়ে  বলবে' খিঁচিয়ে উঠল বিহারীলাল ' সেই রাত নয়টা থেকে জুয়া খেলা শুরু করেছ তোমাদের ঝগড়া আর চিল্লাচিল্লি  বাইরে থেকে আমরা সবাই শুনেছি জুয়ায় হেরে রাগের মাথায় ক্লাবের মালিক আকবর শেঠকে খুন করেছ এই রুমে তুমি ছাড়া আর কেউ আসেনি আর এই যে পিস্তলও পেয়েছি তোমার হাতে  আঙুলের ছাপ পাওয়া আর এমন কি মুশকিল ?আমার  সাক্ষী আছে কম পক্ষে এক ডজন।  '

 

নাহ বিশ্বাস করুন আকবর শেঠ একা একাই জুয়া খেলছিলেন  আর একা একাই ঝগড়া করছিলেন আমি রুমে ছিলাম না'

' শুনলেন সবাই' হেসে জনতার উদ্দেশ্যে বলল বিহারীলাল ' মিথ্যা, তাও কত কাঁচা  যাও কোর্টে এইসব বলবে রতন রায় খেলা শেষ তোমার'

 

দুইজন উর্দি পরা পুলিশ কোত্থেকে যেন হাজির

 

হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে উত্তেজিত জনতার সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হল রতনকে

 

মুস্তাফা এগিয়ে গিয়ে ক্লাব মালিক  আকব শেঠের  দুই চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলল,   ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন

 

 

শেষ

 

 

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...