সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

এখানে ঝলসানো মাংস পাওয়া যায়

 এক

 

'এত মোটা একটা বই কিন্তু রেসিপিগুলো সবই ফাউল'

বিড়বিড় করে বলল অমিত    

দ্রুত উল্টে যাচ্ছে  বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো  

ইয়া মোটা ঢাউস আকৃতির বই দশ ইঞ্চি একটা ইট যেন নাম , স্কুইড , স্কুইড এবং আরও স্কুইড 

খুব নাম করা কোন বাবুর্চির লেখা না তারপরও বইটা বিক্রি হচ্ছে ভালবইয়ের  দোকানদার পর্যন্ত স্বীকার করছে, গত দশ বছরে স্কুইড নিয়ে লেখা এমন ভাল বই আর বের হয়নি আর এমন গরম পাউরুটির মত বিক্রি ও  হয়নি 

আরও একটা কারনে বইটা পছন্দ করেছে অমিত   প্রচুর ছবি দেয়া হয়েছে, রেসিপিগুলো বর্ণনা করা হয়েছে গল্পের ছলে 

বেশির ভাগ রান্নার বইগুলোতে অমনটা থাকে না

কোন মতে কাঠ খোটটা ভাবে রেসিপিগুলো দিয়েই খালাসঅমুক অত গ্রাম , তমুক তত গ্রাম হেন তেন এক সাথে মাখাওজল দাওকড়াইতে ঢেকে দাও ব্যস আর বইয়ের ভেতরে যে সব ছবি দেয়া থাকে সবই ফালতু বকোয়াজ অকাজের জিনিস 

দ্রুত পৃষ্ঠা উল্টে যাচ্ছে  অমিত

শেষ পর্যন্ত পেয়ে গেল

স্টেক উইথ স্কুইড ' বিড়বিড় করে আবার পড়লো 'এই তো পাওয়া গেছে হিট একটা আইটেম হবে'

' স্টেক উইথ স্কুইড !' মন্তব্য না করে পারল না  তন্দ্রা       অমিতের  বউ  পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল  

'কেন ? ' রেসেপির বই থেকে চোখ তুলে ফিরে চাইল তন্দ্রার  দিকে  অত অবাক হচ্ছ কেন ?

তন্দ্রার  বয়স কম

টেনে টুনে আটাশ হবে কি না সন্দেহ মেঘের মত কালো   চুলগুলো টেনে পিছন দিকে বাঁধা পণী টেইল না কি যেন বলে না ? অনিন্দ্য সুন্দর মুখটা আপেল রাঙ্গা  চোখের মণি একটু বেশি কালো   অ্যাটল্যান্টিকের গহন গভীরতা সেখানে  

অমিত  ভাগ্যবান

'স্টেকের সাথে স্কুইড খাপ খায় না' মন্তব্য করলো  তন্দ্রা  ' একদমই না'

 

'কিন্তু উপায় কি বল ?'  দুই হাত উল্টে  হতাশ একটা ভঙ্গী করলো অমিত   ' দাম কিছুতেই কমাতে পারছি না আট আউন্সের একটা স্টেকের সাথে যদি গ্রিল করা সামান্য স্কুইড দিতে পারি,  তবে হয়তো আরও কিছু খদ্দের টানতে পারব  দোকানের যে অবস্থা তিন মাস হতে চলল এখনও দোকান ভাড়াই ঠিক মত উঠে না একদম বেকার খাটছি যে করেই হোক , খদ্দের আরও বাড়াতে হবে যে ভাবেই হোক  মাগনা কফি দিয়ে লাভ নেই অন্য উপায় ধরতে হবে‘  

দিনকাল ভাল যাচ্ছে না  অমিত তন্দ্রা  দম্পতির 

অনেকটা ঠিক ঝোঁকের মাথায় দোকানটা কিনে ফেলেছে ওরা নাইস অ্যান্ড জুসি স্টেক হাউজ  নীচে ছোট করে লেখা- গ্রিল আর বারবিকিউ-  এর জন্য বিখ্যাত দোকানের বাইরে,  এই কথাগুলো লাল আর গোলাপি নিয়ন সাইনে জ্বলে   সন্ধ্যার পর থেকে রাত দুটো পর্যন্ত নিয়ন সাইনের লেখাগুলো জ্বলজ্বল করে , খদ্দেরের চোখে হাতছানি দিয়ে ডাকে  

আগে এই দোকানটা চালাত এক  পেশোয়ারী   দম্পতি 

তেমন আহামরি চলতো না

খুব  ধীরে সার্ভিস দিত উনারা 

এক ফালি গ্রিল করা মাংস , সাথে আভেন বেকড করা আস্ত একটা গোল আলু দিতে যদি  চল্লিশ  থেকে ত্রিশ মিনিট সময় নেয়, তবে সেটা বড্ড বেশি বিরক্তকর হয়ে যায় আর খিদের সময় অপেক্ষা করাটা আরও বেশি কঠিন একটা কাজ দিনদিন খারাপ হচ্ছিল ব্যবসা  তেমন ভাল কর্মচারীও ছিল না অসুস্থ শরীরে যুত মত সার্ভিস দিতে ব্যর্থ হচ্ছিল  শেষে বুড়ো বুড়ি মনস্থির করে ফেলে, বিক্রি করে ফেলবে দোকানটা

আকারে তেমন বড় না কিন্তু তিন রাস্তার মোড়ে লোকেশনটা খুবই সুন্দর  

এবং রেস্টুরেন্টের ভেতরটা বেশ ছিমছাম করে সাজানো  

অল্প কিছু চেয়ার টেবিল সুন্দর একটা স্টোর রুম যেটা আসলে পুরোটাই একটা ফ্রিজ, কুল রুম- কাঁচা মাছ , মাংস রাখার জন্যতেলে ভাজার জন্য একটা ডিপ ফায়ার আর বড় গ্রিল তো আছেই কন্ডিশন খুবই ভাল 

রান্নাঘরের বাইরে কাঠের তাক ভর্তি হরকে পদের বোতল তেষ্টায় কাতর মানুষ জানে ওই সব কিসের বোতল 

রেস্টুরেন্টের মেঝেটা  দারুণ ঝকমকে  

ছোট একটা কফি মেশিনও আছে সাথেই পিচ্চি একটা ফ্রিজ নরম পানীয়ের টিন আর বোতল  দিয়ে ভর্তি 

মোট কথা দোকানটা কিনে মোটেও ঠকেনি  অমিত  দম্পতি  জলের দামেই কিনতে পেরেছে 

খুশি 

 তন্দ্রা  আর  অমিত   দুইজনেই টুক টাক কাজ জানত  দুইজনেই নাম করা কিছু ক্যাফে বা চেইন হোটেলে কাজ করেছিল,  ব্যবসা শুরুর আগে   ভেবেছিল,   সেই অভিজ্ঞতা পুঁজি করেই ছোট খাট একটা স্টেক হাউজ চালান তেমন একটা কঠিন হবে না 

ফুড বিজনেস আসলে ততটা সহজ না

  মানুষ  যেমনটা  ভাবে আরকি  !  

টাকা আছে, কিন্তু শ্রম মেধা দিতে হয় ভুতের মত আরও দরকার হয় নিত্য নতুন চমক লোভনীয় জিভে জল আসা সব রেসিপি সার্ভিস যতই ভাল হোক খাবার ভাল না হলে খদ্দের আসবে না 

আর সেই কারনেই বার বার মার খেয়ে যাচ্ছে  তন্দ্রা  আর  অমিত  

 

দুই    

 

নাইস অ্যান্ড জুসি স্টেক হাউজের মূল আকর্ষণ , নরম রসালো মাংসের ফালিমাংসের পরতে পরতে  রয়েছে  রসুন আর গুল্মের চনমন করা সৌরভ সাথে যে আভেনে বেকড করা বিশাল একটা আলু দেয়া হয় ,  সেটার কথা তো আগেই বলেছি সেই আলুর ভেতরে সামান্য আধ গলা  হলুদ রঙা ঘন  মাখন আর পেঁয়াজ পাতার কুঁচি দেয়া হয় ,  সেটা ও  কিন্তু আপনার জানার কথা  

নিশ্চয়ই কোন না কোন স্টেক হাউজে গিয়ে একবার হলেও এক ফালি মাংস খেয়েছেন ?

অমিত  চাচ্ছিল খদ্দের ধরার জন্য আরও অতিরিক্ত কিছু করতে 

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিটা স্টেক  অর্ডারের   সাথে সাথে বিনা মূল্যে অতিরিক্ত তিনটে করে অনিয়ন রিঙ দিচ্ছিল  অনিয়ন রিঙ জিনিসটা আর কিছু না বড় বড় পেঁয়াজ।   গোল রিঙ করে কেটে ,  বিস্কুটের গুঁড়ার সাথে মাখিয়ে ডুবো তেলে সোনালী করে ভেঁজে দিলেই সেটা অনিয়ন রিঙ 

তার আগের সপ্তাহে প্রতিটা স্টেক অর্ডারের  সাথে সাথে মুফতে এক মুঠো করে   সেদ্দ    কড়াইশুটি দিয়েছিল 

যে করেই হোক খদ্দের বাড়াতে হবেই 

দুঃখের ব্যাপার হল , এত কায়দা কানুন করেও খদ্দের বাড়ছিল না মোটেও সবাই যেন পণ করেছে,  এই দোকানে আর  খেতে   আসবে না 

কেন , কে বলবে ? সম্ভবত আগের বুড়ো বুড়ি বাজে সার্ভিস দিয়ে অমন বেহাল অবস্থা করেছে

আজ সাত সকালে এই নিয়েই কথা হচ্ছিল 

কাঁটায় কাঁটায় সকাল নয়টায় রেস্টুরেন্টের দরজা খোলে ওরা চলে রাত দুটো পর্যন্ত অমানুষিক শ্রম দেয় ওরা 

এই মুহূর্তে কাঠের বড় একটা চপিং বোর্ডে এক গাদা স্কুইড রেখে পেল্লাই একটা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে কাটছিল অমিত   প্রায় এক মুঠোর মত স্কুইড কুঁচি করে কেটে তন্দ্রার   দিকে ফিরে বলল ,' দেখি না এই সপ্তাহটা প্রত্যেকটা অর্ডারে এক মুঠো,  এই ধর এই পরিমাণ স্কুইড গ্রিল করে দিয়ে দেখি কাস্টোমার কী বলে 

'স্যার, আমার মনে হয় রেসিপি বদলানো দরকার ' মাঝ খানে নাক গলাল  হীরালাল    , দোকানের ক্লিনার 

হীরালালের  বয়স কম অমিতের যদি পয়ত্রিশ হয় তবে হীরালালের হবে তেইশ বা চব্বিশ বেঁটে, রোগামত শরীর মাথার চুলগুলো জেল দিয়ে ঝাড়ুর শলার মত খাড়া করে রেখেছে চোখ দুটো সরল পুরো চেহারাতে এমন একটা ভাব যেন ভাঁজা মাছ উল্টে খেতে জানে না 

কথা বার্তা খুব কম বলে বখে যাওয়া ছেলে বাপ মায়ের সাথে ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে 

 একটা লোক দরকার ছিল অমিতের   আবেদন করতেই পেয়ে গেছে কাজটা সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত কাজ করে হীরা   তারপর ওদের রেখেই চলে যায় ওর কাজ হচ্ছে - মেঝে পরিষ্কার করা, থালা বাটি মাজা, খদ্দের খেয়ে গেলে টেবিল পরিষ্কার করা তেন তেন অনেক কিছু

এবং ভালই কাজ করছে  হীরালাল  

'রেসিপি বদলানো দরকার মানে ?' বিরক্ত হয়ে জানতে চাইল  অমিত   গায়ে পড়ে উপদেশ দিতে চাইলে কারই বা ভাল লাগে ?

'আমি ঠিকই বলেছি স্যার' ন্যাকড়া ফিট করা কাঠের লম্বা লাঠি দিয়ে মেঝে পরিষ্কার করছিল হীরা    সেটার উপর ভর দিয়ে দাঁড়ালো তারপর হাত পা নেড়ে সিরিয়াস একটা ভঙ্গী করে  লেকচার  মারা   শুরু করলো , ' মূলত প্রত্যেকটা ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টের নিজস্ব একটা রেসিপি থাকা দরকার  আর সেটাই হবে সেই দোকানের সাফল্যের মূল চাবি কাঠি  আমাদের এই স্টেক হাউজটা স্টেকের জন্যই জনপ্রিয় এখন খামাখা সী ফুড বা এলিয়েন খাবার পরিবেশন করতে যাওয়া বোকামি হয়ে যাবে আমাদের উচিৎ মাংসের কোয়ালিটি পরিবর্তন করা বা রান্নায় নতুন কোন কৌশল প্রযোগ করা যাতে খদ্দেরের মুখে এর স্বাদ লেগে যায় আর খদ্দের বারবার ফেরত আসতেই থাকে আসতেই থাকে আসতেই থাকে...'

থামো' ঘেউ ঘেউ করে উঠলো অমিত   ' তুমি নিশ্চয়ই বাবুর্চি না ? তাই না ?’

জী না স্যার' সহমত প্রকাশ করলো হীরা   বড্ড নিরীহ ছেলে 

'আর হোটেল ম্যানেজমেনটের উপর তোমার নিশ্চয়ই বড় সড় কোন ডিগ্রি নেই ?'

জী না স্যার নেই' মাথা ঝাঁকিয়ে একমত হল হীরা  

'আর তোমাকে চাকরি দেয়া হয়েছে ক্লিনার প্লাস কিচেন হেল্পার হিসাবে , ঠিক না কি ?'

জী স্যার' আবারও সহমত প্রকাশ করলো হীরা

'তো আমার তো মনে হয় তোমার নিজের চরকায় তার্পিন তেল দেয়া উচিৎ, নাকি ? খামাখা গায়ে পড়ে উপদেশ না দিয়ে জলদি মেঝেটা পরিষ্কার কর তারপর কিচেনে গিয়ে আলু বেকড করা শুরু কর '

শেষের দিকে অমিতের গলার স্বর অনেক খানি চড়ে গেল

'দুঃখিত স্যার' গরিব মানুষের মত দুঃখী একটা চেহারা করে ব্যস্ত হয়ে পড়লো হীরালাল  

' গুড মর্নিং লেডিস অ্যান্ড জেনটেলম্যান ' দরজা ঠেলে রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকে পড়লো ইয়া লম্বা এক লোক 

টুংটাং করে ঘণ্টা বেজে উঠলো

আসলে দরজার সাথে এত চমৎকার করে পিতলের ঘণ্টাটা বেঁধে রাখা হয়েছে , বলার মত না সামান্য ঠেলা লাগলেই ঘণ্টা বেজে উঠে টুংটাং শব্দ হয় কিচেনের ভেতরে যে যতই ব্যস্ত থাকুক, বুঝতে পারে , খদ্দের এসেছে বা কেউ বের হয়ে যাচ্ছে 

আহামরি কিছু না আমেরিকার প্রায় সব দোকান পাটেই এই ব্যবস্থা থাকে  ওরা কায়দাটা কপি করেছে ।  

মোটা লোকটার নাম     সোহরাব তালুকদার          গায়ে পুলিশের ইউনিফর্ম  ঝাড়া ছয় ফুট লম্বা প্রায় দানব বিশেষ বয়স হয়ে গেছে বেশ যে কোন মুহূর্তে অবসর গ্রহণ করবে গাল দুটো পেঁপের মত ফোলা অসম্ভব ভাল মানুষ

 সেন  দম্পতি যে দিন থেকে ওদের রেস্টুরেন্টটা চালু করেছে, সেইদিন থেকেই তালুকদার      ওদের নিয়মিত খদ্দের ডিউটিতে সকালের শিফট হলে সকালের জলখাবার আর রাতের শিফট হলে ডিনার এখান থেকেই খেয়ে যায় খিদে না পেলে ও  এক পেয়ালা কফির জন্য   হাজির হয়

বসে খাওয়ার সময় না থাকলে কাগজের কাপে করে নিয়ে ভেগে যায় নতুন ব্যবসায় নামা এই দম্পতিকে দারুণ রকমের পছন্দ করে  সে

'গুড মর্নিং !'

প্রায় একই সাথে জবাব দিল ভেতরে থাকা তিনজন

 হীরা  ব্যস্ত হয়ে পড়লো মেঝে পরিষ্কার করার কাজে পছন্দ মত একটা চেয়ারে বসে সোহরাব তালুকদার           কফির অর্ডার দিল  তন্দ্রাই সেটা পরিবেশন করতে লাগল

' ব্যবসার কী খবর ?' জানতে চাইলো    তালুকদার     রোজই একবার করে জিজ্ঞেস করে

 

'উম্মম ভাল না' মাথা নাড়ল তন্দ্রা  ' তবে হতাশ নই  অমিত  চেষ্টা করছে নতুন ভাবে ঘষে মেজে মেনু চালু করতেদেখা যাক কি হয় ।  '

 

'সাত সকালেই নেগেটিভ কথা বলবে না' কফি দেয়া হতেই পেয়ালাটা সামনে টেনে নিল সোহরাব তালুকদার               '  অবশ্যই ভাল করবে তোমরা  আর নতুন করে মেনু বানিয়ে লাভ কী ? এই দোকানটা সবাই স্টেক হাউজ হিসাবেই চেনে এখন কেক বিক্রি করতে চাইলে তো মুসিবতে পড়ে যাবে  তোমাদের উচিৎ স্টেকগুলোই আরও ভাল করে গ্রিল করা বা স্পেশাল কিছু কর কিন্তু স্টেকই  অন্য কিছু অ্যাড করতে যাবে না 

' যেমন ধর, একটা আইরিশ স্টেক হাউজে গিয়েছিলাম ওরা কি করে ? রোজমারির একটা আস্ত ডাটা মাংসের সাথে দিয়ে গ্রিল করে তাতে   দারুণ একটা ফ্লেভার  এসে যায়  মাংসের মধ্যে সাথে দিত প্রচুর গোল মরিচের গুড়া দেখ না তোমরা অমন কিছু করতে পার কী না '

বক বক করতেই লাগল  সোহরাব তালুকদার           

 

তিন  

 

দিন শুরু হল

সারাদিন কাজ করে যেতে লাগল ওরা তিনজন খুব বেশি খদ্দের আসে না যথা সম্ভব সেরা সার্ভিস দেয়   তন্দ্রা   আর  অমিত  কফির পেয়ালাটা পর্যন্ত দুই তিন বার বিনা পয়সায় ভর্তি করে দেয় 

রাত নয়টায় ছেড়ে দেয়া হয় হীরাকে  

রোজই

এর পর অবশ্য ততবেশী খদ্দের থাকে না আসেও না যে কয়েকজন আসে অমিত  আর তন্দ্রা   দুইজনেই সামাল দিতে পারে অযথা অন্য কাউকে ওভার টাইম পে করার দরকার পরে না 

রাত এগারোটার দিকে তন্দ্রা  বের হয়ে এলো রেস্টুরেন্ট থেকে সোজা বাড়ি যাবে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে গেলেই ওদের বাড়ি একটা মোটামুটি মানের ফ্ল্যাটে থাকে নির্জন জায়গায় দশ মিনিট হাঁটার পথ 

আর অমিত   ফিরবে ঘণ্টা খানেক পর পরের দিন সকালের বাজারের লিস্ট বানাবে আরও টুকিটাকি কিছু কাজ শেষে অমিতের বাড়ি ফিরতে বেশ খানিকটা  দেরি হয়ে যায় সব সময়ইতারপরও তেমন একটা অসুবিধে কারো  হয় না গত কয়েক মাস ধরে রেস্টুরেন্ট কেনার পর থেকে অমনই চলছে বাকি দিনগুলো কেমন করে যেত....ওরা ভাবতেই পারেনি...কিন্তু...

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে বড় রাস্তাটা পাড় হল তন্দ্রা  

একদম  ওদের দোকানটার উল্টা দিকে 

হন হন করে হেঁটে যাচ্ছে  তন্দ্রা  উল্টা দিকের রাস্তার ফুটপাথের উপর আধো অন্ধকারে একটা পিলারের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হীরা

রোজই দাঁড়িয়ে থাকে ছেলেটা

তন্দ্রার হাতে বাদামী রঙের কাগজের একটা ব্যাগ ভেতরে ভাঁজা  মাংসের  কিছু টুকরা  বাড়তি বিক্রি করা যাবে না ছাঁটা ছুটা অংশঅথচ একদম ভালহাড় আর চর্বির অংশ বেশি ফেলে না দিয়ে নিজেরাই গ্রিলে ভেঁজে খায়সবাই

তন্দ্রাকে দেখে আড়াল থেকে বের হয়ে এলো হীরা শান্ত, লোভী চোখে দেখছে তন্দ্রাকে

'এই নাও তোমার খাবার' কাগজের ব্যাগটা সামনে এগিয়ে দিল মেয়েটা

হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা নিল হীরা খুলে দেখল নাজানে ভেতরে কী আছে লোভনীয় ঘ্রাণ ছড়াচ্ছেএখনও গরম

' সকালের ঘটনার জন্য দুঃখিত' মিষ্টি হেসে বলল  তন্দ্রা   ' বুঝতেই পারছ  অমিত  খুব মানসিক চাপের মধ্যে থাকে আজকালনইলে ও কিন্তু অমন না'

'না , না' বিনীত ভাবে বলল হীরা ' আমি কিছুই মনে করিনি ম্যাডাম স্যার যাই করুক না কেন, আপনি তো আমাকে পছন্দ করেন '

চুপ করে রইল তন্দ্রা  এটা কোন রকম ইঙ্গিত নয় তো !

'শত হলেও আপনি খুবই নরম মনের মানুষ' ফিসফিস করে নিচু গলায় বলে যাচ্ছে হীরা ' আপনি শুধু সুন্দরীই না, মনটাও সুন্দরস্যার ভাগ্যবান , আপনার মত সঙ্গিনীকে স্ত্রী হিসাবে পেয়েছেন'

তন্দ্রা   শুধু হাসল

এ ধরনের পরিস্থিতিতে সামান্য হাসি অনেক কথা বলে দেয়

তাছাড়া রোজই শুনে আসছে এই কথাগুলো নতুন কিছু নাসবই বুঝতে পারে তন্দ্রা পুরুষের চোখের ভাষা পড়া কত সহজ !

ঈশ, আপনার মত যদি একটা বান্ধবী থাকতো আমার' প্রায় শোনা যায় না অমন একটা স্বরে বলল হীরা

'আমাকে এ বার যেতে হবে হীরা  ' হেসে জবাব দিল তন্দ্রা   ' বাড়ি ফিরেও অনেক কাজ করতে হয়'

আমি কী আপনাকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেব ?'

' না,  লাগবে না '

'পথটা কিন্তু অনেক নির্জন , ম্যাডাম '

'চিন্তা কর না' বলেই কাঁধে ঝোলানো লেডিস ব্যাগটার জিপার খুলে দেখাল ভেতরে কালো কুচকুচে রিভলবারের বাট ঝিকিয়ে উঠলো ল্যাম্পপোস্টের আলোতে ' আমি সব সময়ই সতর্ক থাকিসারাদিনের বিক্রির টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরিবুঝতেই পারছ '

কিছু বলল না হীরা  অতটা আশা করেনি

'ওকে,  গুড নাইট হীরা কাল সকালে আবার দেখা হবেতুমি বাড়ি চলে যাও'

জী ম্যাডাম '

হাই হিলের শব্দ তুলে এগিয়ে গেল তন্দ্রা   কয়েক মুহূর্ত পরেই হারিয়ে গেল দূরের ল্যাম্পপোস্টগুলোর আড়ালে

তখনও দাঁড়িয়ে আছে হীরা

কাগজের ব্যাগের ভেতর থেকে গ্রিল করা মাংসের ফালি একটা , একটা করে বের করে এনে মুখে পুরে চিবুতে লাগল

বরফের মত ঠাণ্ডা চোখে চেয়ে আছে রাস্তার উল্টা দিকে' নাইস অ্যান্ড জুসি স্টেক হাউজ ' লেখা নিয়ন সাইনগুলো জ্বল জ্বল করছে নরকের বর্ণমালার মতরেস্টুরেন্টের বেশির ভাগ আলো নিভিয়ে ফেলা হয়েছেতারপরও অমিতকে  পরিষ্কার দেখা যাচ্ছেছায়ার মত মেনুর পাতা উল্টে যাচ্ছে গাধাটা

গভীর ভাবে কী যেন ভাবছে হীরা  

ওর চোখের মণিতে কোন ভাব নেইশান্তনির্লিপ্তশুধু ঠোঁটের কোণা নড়ছে শব্দ করে বললে বুঝা যেত ও বলছে , ' মিস্টার অমিত বাবু  , একটা সময় আসবে তুমি আমার কথা মত সব পা ফেলবেনিজের বলতে কিছুই থাকবে না তোমারকিছুই নাবিশ্বাস কর'

 

চার

 

 

ঘটনার শুরু হল পরের দিন

আসলে মাঝে মধ্যে অমোঘ নিয়তির টানে ঘটে সব কিছুআমাদের কোন হাত থাকে না

কিন্তু এখানে হীরার মত ধূর্ত এক তরুণ রয়ে গেছে , সেটা আমাদের ভুললে চলবে না

পরদিন রেস্টুরেন্ট চললসাধারণ গতিতেস্পেশাল কিছুই হল নাহাতে গোনা কিছু খদ্দের পায় ওরাতাই পেলরাতের বেলা ক্যাশ ক্লোজ করার সময় তন্দ্রা  দেখল , সারাদিনের বিক্রি মাত্র তিন  হাজার টাকা  

হতাশ বোধ করলো

আর কতদিন এইভাবে চলবে ? দিন যাচ্ছে দিনের মতআর কতদিন লাগবে রেস্টুরেন্টটা তুলে দাঁড়া করাতে ? এই দিকে মাংসের বিল, দোকান ভাড়া, বিজলি খরচ সবই বকেয়া পরে আছে

'আমি বাসায় যাচ্ছি' নিজের গোলাপি রঙের লেডিস ব্যাগে টাকাগুলো ঢুকিয়ে বলল তন্দ্রা  ' তুমি কখন ফিরবে ?'

 

দেখি‘  নিস্তেজ গলায় জবাব দিল অমিত ' বড় পেটি থেকে কতগুলো মাংসের ফালি কেটে টুকরা করে আলাদা করে রাখিপরদিন সকালের জন্য কাজটা খানিক এগিয়ে থাকবেখদ্দের এলে চট জলদি দিতে পারব'

'ঠিক আছেকাল সকালে হীরা  এসে রেস্টুরেন্ট খুলবেএক্সটা চাবি দিয়ে যাব ওকে'

সম্মতি সূচক মাথা ঝাঁকাল অমিত হাতে বিশাল সাইজের মাংসের পিণ্ডকায়দা করে সময় নিয়ে কাটতে হবেটুকরোগুলো সব যেন সমান হয়চর্বির পরিমাণ যত কম হয় ততই ভাল

তন্দ্রা   চলে গেল

অমিত  ব্যস্ত হয়ে পড়লো মাংস নিয়েফালি করতে হবে

এখন মনে হয় না আর খদ্দের আসবে

পা দুটো খানিক বিশ্রাম দেয়ার জন্য লম্বা টুলের উপর বসে মাংসের ফালি করতে লাগলকালকের দিনের পরিকল্পনা করছে মনে মনে

হালকা টুং টাং শব্দ হতেই কান খাড়া হয়ে গেল

খদ্দের ঢুকল না কি ?

পড়ি মড়ি করে উঠে দাঁড়াতে যাবে তখনই লোকটাকে দেখতে পেল অমিত

বুকটা শুকিয়ে গেল মুহূর্তেই

লোকটা মধ্যবয়স্ক বেশ মোটা সোটা আর নাদুস নুদুসধপ ধপে ফর্সা শরীরটা যেন মাংস আর চর্বির ডিপো মুখটা টম্যাটোর মত লালফোলা ফোলালিলেনের তৈরি দামি স্যুট প্যান্ট পরে আছেসব সাদা ধপধপে এমন কি গলায় ঝুলানো টাইটাও সাদা ধপ ধপেকাঁচা দুধের মতপায়ে আইভরি রঙা জুতামাথায় নরম কাপড়ের টুপিসেটাও সাদাসব মিলিয়ে সাদা কুমার।  দেখেই বুঝা যায় লোকটা টাকার কুমির

শুভ সন্ধ্যা অমিত  ' ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল সাদা আগন্তুক হাসি হাসি একটা ভাব করে রেখেছে চেহারায়, কিন্তু হাসছে নাবরং অদ্ভুত রকমের পৈশাচিক একটা ভাব  ঠিকরে বেরোচ্ছে মুখ চোখ দিয়ে

' আরে    তোফাজ্জল   ভাই  আপনি ?  ' দ্রুত উঠে দাঁড়াতে গেল অমিত লোকটাকে দেখে বসে পড়েছিল

'আরে বস বস, ব্যস্ত হবার কিছু নেই' আসর জমানোর মত একটা ভঙ্গিতে বলল  তোফাজ্জল  যেন মোটেও তাড়া নেইঅঢেল সময় নিয়ে খোশ গল্প করার জন্য এখানে এসেছে

'আপনি, এই সময়ে ?' কী  বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না অমিত  বরাবর কথা গুছিয়ে বলতে পারলেও এই মুহূর্তে কোন  থই পাচ্ছে না

 

'কেন ?' দারুণ রকমের অবাক হয়েছে অমন একটা মুখের ভাব করলো তোফাজ্জল আনাড়ি আর কৃত্রিম মুখের ভাবপরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে , ব্যাঙ্গ করছে অমিতকে ভেতরে পুষে রেখেছে তীব্র ঘৃণা রাগক্ষোভ ।  'ঘড়ি ধরে কি তোমার সাথে সাথে করতে আসব ? নাকি ক্যালেন্ডার ধরে ?'

কী যে বলেন না' ফ্যাকাসে হাসি হাসল অমিত  

'দেখ,  আমার কিন্তু কালকে , মানে গতকাল আসার কথা ছিল'

তা ছিল'

'কিন্তু গতকাল এলাম নাএলাম আজকেকারণ আজকে গতকাল নাগতকাল যদি আজ হত তবে আমার আসার কোন দরকার ছিল না'

ইয়ে মানে... তা ও সত্য '

'ইয়ার্কি কর আমার সাথে ?' খেঁকিয়ে উঠল তোফাজ্জল ' রাগে মুখটা ইটালিয়ান টম্যাটোর মত লাল হয়ে গেছে'পনের দিন ধরে আমাকে ঘোরাচ্ছ ব্যাপার কী ? অ্যা ? মাংসের টাকা কে দেবে ? এক মাসের বিল আটকে রেখেছকাল থেকে এক টুকরা মাংস ও পাবে না তুমিএখন টাকা কবে দিচ্ছ সেটা আগে  বল ?'

হতাশায় কাঁধ দুটো ঝুলে পড়লো  অমিতের  

বিশ্বাস করুন  তোফাজ্জল ভাই  ' করুন সুরে বলতে লাগল অমিত  লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে ওর' আজ মাত্র তিন মাস হল রেস্টুরেন্টটা কিনেছিআমাদের জমানো সব টাকা চলে গেছে বুড়ো বুড়ির কাছ থেকে জায়গাটা নিতেহাতে একদম টাকা পয়সা নেইআর ব্যবসাটা খুব একটা চলছেও নাসত্যি, খুবই সাফার করছিকারেন্ট বিল, গ্যাস বিল, জলের বিল আর সহ হাবিজাবি বিল দিতে দিতেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছেএকটু সময় দিন ভাই '

 

আর কত সময় দেব ? অ্যা ?' ঘেউ ঘেউ করে উঠলো মাংস ব্যবসায়ী'জীবন পাড় হয়ে গেল ব্যবসা করতে করতেমানুষ চেন না ভেবেছ ? তোমাকে বাকিতে মাল মোটেও দিতাম নাআগের সেই বুড়ো বুড়ি আমার কাছ থেকেই মাল নিতসেইজন্য রাজি হয়ে তোমাকে দিয়েছিএখন তো দেখছি মহাভুল করে ফেলেছি'

দয়া করুন  তোফাজ্জেল ভাই  ' দ্রুত বলতে লাগল অমিত  ' যে সময়টা এখন আমি পার করছি , সবারই জীবনে এমন একটা সময় আসেআপনার মত সফল আর দয়াবান ব্যক্তি যদি আমার পাশে থাকে, তবে ঠিকই উঠে দাঁড়াতে পারব আমিআপনি বসুন নাভাল দেখে এক ফালি মাংস গ্রিল করে দেই আপনার জন্য ? এখনও গ্রিল জ্বালানো আছে  ভাই সাথে মাশরুম,  টম্যাটো আর খানিকটা পেঁয়াজ গ্রিল করে দেই ? আপনার ভাল লাগবে '

'খাওয়া ?' মুখ বেঁকিয়ে বলল তোফাজ্জল   ' তোমার এখানে হিসু ও করব না আমিকাল সকালেই কোটে গিয়ে কেস করব তোমার নামেঠ্যালা বুঝবে তখন দোকান বিক্রি করে আমার পয়সা দিতে হবেকাক দেখেছ কাকের ডিম দেখনি ।  '

বলতে বলতে দরজার দিকে পা বাড়াল মাংস ব্যবসায়ী  তোফাজ্জল হোসেন   

 তখনও কি সব বলে বলে শাসাচ্ছে ।  কী কী নাকি করবে ।  হেন তেন।  

লাফ দিয়ে সামনে এগোল অমিত উত্তেজনায় খেয়াল করেনি,  তখনও হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছে চাকুটা যেটা দিয়ে মাংসের ফালিগুলো আরও নিখুঁত করছিল

দৌড়ে গিয়ে তোফাজ্জলকে থামাতে চাইল

' তোফাজ্জল ভাই  , প্লিজ আমার কথা শুনুন' হাঁপাচ্ছে অমিত  ' প্লিজ আমাকে এইভাবে বিপদে ফেলে যাবেন না'

বিচ্ছিরি রকম দুর্ঘটনাটা তখনই ঘটে গেল

দোষ কারও ই না

চাকুটার ধার একটু বেশিমাংস ফালি   করার চাকু যেমন হয় আর কি চাকুর ফলাটা কীভাবে যেন মাংস ব্যবসায়ীর বুড়ো আঙুলের সাথে ছোঁয়া লেগে গেলঘ্যাস করে কেটে গেল বেশ খানিকটা জায়গাচোখের পলকে ফিনকি দিয়ে বের হয়ে এলো তরল রক্ত

পরিমাণ সামান্যইতবে রক্ত , রক্তই

ব্যাথা পেয়ে হাতটা চোখের সামনে তুলে ধরল  তোফাজ্জল হোসেন   

রক্ত দেখে ভড়কে গেল বেচারা

চোখ তুলতেই আরও ভড়কে গেল।  দেখল চাকু হাতে ওকে ধাওয়া করতে এসেছে অমিত

'কি কি ...কি ব্যাপার' সাংঘাতিক ভয় পেয়ে গেছে মাংসওয়ালা

' আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না ভাই  ' হব হব করে বলতে লাগল অমিত এটা একটা দুর্ঘটনা, বিশ্বাস করুন ভাই '

দুর্ঘটনা ?' দ্রুত রেস্টুরেন্ট থেকে বের হবার জন্য আথালি পাথালি ভাবে দরজা খুঁজছে  তোফাজ্জল হোসেন    ।   আতঙ্কিত চোখে চেয়ে আছে অমিতের দিকে।  এক মুহূর্তের জন্য ও  বিশ্বাস করতে পারছে নাপিছন ফিরলেই যদি চাকু বসিয়ে দেয় ওর পিঠে ?

হায় হায়

'আমার কথা শুনুন  তোফাজ্জল ভাই  ' বলেই যাচ্ছে অমিত  মাথার ঠিক নেই ওরআতঙ্কের চোটে সাধারণ জ্ঞান হারিয়ে সব কিছুর তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে

ততক্ষণে দরজা খুলে বাইরে চলে এসেছে  তোফাজ্জল হোসেন    রাস্তায় পা দিয়ে ওর সাহস বেড়ে গেল স্বাভাবিক

'তোমার সাহস দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম' গলা উঁচু করে বলছে মাংসওয়ালা আশা, লোকজন যদি শুনতে পায়' তুমি আমাকে চাকু মারতে চেয়েছসাংঘাতিক লোক হে তুমি দেনার হাত থেকে বাঁচার জন্য তুমি  সবই করতে পার ...'

'ভাই ,  এটা একটা দুর্ঘটনা'  ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছে  অমিত  বোকার মত তখনও হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছে চাকুটাঘটনার আকস্মিকতায় মাথা কাজ করছে না বেচারারদূর থেকে  যে কেউ দৃশ্যটা দেখলে এখন অন্য রকম একটা  মানে বুঝবে

দুর্ঘটনা ?' অমিতের সংলাপটাই কপি করলো মাংসওয়ালাগলার জোর অনেক গুণ বেড়ে গেছেযদিও রাস্তা ফাকাতারপরও জানে , এখন আর কিছু করতে পারবে না অমিত  বহু দূর থেকে এই রেস্টুরেন্টটা দেখা যায়

'তুমি আমাকে চাকু হাতে ধাওয়া করেছ' ঘেউ ঘেউ করে বলেই যাচ্ছে  তোফাজ্জেল হোসেন   নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে অবশ্য ' কোপ মেরে আমার হাত কেটে রক্ত বের করে বলছ , এটা একটা দুর্ঘটনা দাঁড়াও, আমি এখনই পুলিশ ষ্টেশনে গিয়ে তোমার নামে নালিশ করে পেল্লাই এক রিপোর্ট করে তবেই বাড়ি ফিরবআমার নাম  তোফাজ্জেল  হোসেন   তোমার দোকানে  ঘু ঘু চড়াব ।   তোমার মত বহু লোককে টিট করেছিআর আমাকে কি না চাকু দেখাওকী ডাকাত লোকরে বাবা...'

গজগজ করতে করতে ভেগে গেল মাংসওয়ালা

চাকু হাতে বোকার মত দাঁড়িয়ে রইল অমিত  

 পৌষের  শীতের রাততারপর কপাল ঘেমে গেছে

দূর থেকে বিনা পয়সায়  পুরো নাটকটাই দেখল হিরালাল মোটেও উত্তেজিত হল নাদুই পক্ষের বেশির ভাগ সংলাপ কানে গেছে ওর ।  যা বুঝার বুঝে গেছে।  মাথা বরাবর  পরিষ্কার ।  সিদ্ধান্ত নিতে  দেরি হল না মোটেও  কাগজের ভেতরের ভেতর থেকে ভাঁজা মাংসের শেষ টুকরাটা চট করে মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল শূন্য কাগজের ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে দিল অনাদরে

 ছায়ার মত সেঁটে রইল অন্ধকারে   অপেক্ষা করছেদারুণ একটা প্ল্যান এসেছে ওর মাথায়

ওই দিকে চাকু হাতে বোকার মত কিছুক্ষণ দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে রইল অমিত  শেষে হতাশ হয়ে ঢুকে পড়লো ভেতরে

অমিত  ভেতরে চলে যেতেই সামনে পা বাড়াল হীরালাল ।  

এখনও দূরে মাংস ব্যবসায়ী তোফাজ্জল হোসেনকে দেখা যাচ্ছেহাঁটতে হাঁটতে ছোট হয়ে যাচ্ছে লোকটা  দ্রুত পা চালাল হীরা মাংস ব্যবসায়ীকে ধরতে হবে

হীরালালের মাথায় কি চিন্তা ভাবনা চলছে কে বলবে ?

ঠোঁটের কোনে হাসি দেখা যাচ্ছে

সচরাচর হাসে না ও

 

 

বাসার ভেতরে ঢুকতেই  মিষ্টি একটা সৌরভ পেল অমিত

গায়ে গোলাপি নাইটি ,  তন্দ্রাকে       অদ্ভুত রকমের  মোহিনী কামিনী    লাগছে  

'দারুণ না পারফিউমটা ? চোখ মটকে জানতে চাইল  তন্দ্রা  চোখের তারায় আদিম আমন্ত্রণপ্রাচীন আহ্বান ।  ' যাও জলদি শাওয়ার সেরে এসো'

তম্বা মুখে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল অমিত   চেহারা থমথমে

দরজা লাগানর শব্দেই   তন্দ্রা   বুঝে  গেল ,   মস্ত কিছু ভজকট হয়েছেঅনেকগুলো বছর তো হয়ে গেলদুইজন দুইজনকে ভাল করেই চেনেমতিগতিইশারা

কী হয়েছে বল তোকোন সমস্যা ?' শেষের দিকের খদ্দেরগুলো সব সময় কেমন যেন  বকোয়াজ আর খুঁত ধরা হয়।  তন্দ্রা  জানে

'উমম, ঝামেলা ঠিক না'

' তবে ?'

কিভাবে বলবে বুঝতে পারছে না অমিত   খানিক ইতস্তত করে শেষে গড়গড় করে বলে গেল, খানিক আগে কী হয়েছে  মাংসের পাইকার তোফাজ্জেলের সাথে

'আরে ধ্যাত' শান্তনা দিল  তন্দ্রা   ' তোফাজ্জেল সাহেব   মোটেও পুলিশের কাছে রিপোর্ট করবেন নাদিলে এতক্ষণেই দিয়ে ফেলতআর পুলিসও পো পো করে গাড়ি নিয়ে চলে আসতোআসেনি , মানে থানায় যায়নিকিছু হয়নিউনি বুঝে গেছেন এটা একটা দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু নাদেখে নিও , কাল সকালে ঠিকই চলে আসবেননা আসলে আমরাই ফোন করবথানার   অফিসার সোহরাব তালুকদার         সাহেব   তো আমাদের পছন্দ করেন বেশউনি না হয় মাঝখান থেকে ঘটনাটার মীমাংসা করে দেবেন ? কী বল ?'

ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে গিয়েই খানিকটা   কূল কিনারা খুঁজে পেল অমিত  

আরে তাইতোসব সমস্যার সমাধান আছে

যতটা ভাবছে ,  ঠিক ততটা ভয়ংকর কিছু হয়নিস্বস্তির নিশ্বাস ফেলল বড় করে

পিছন থেকে  তন্দ্রা   জড়িয়ে ধরল ওকেমিষ্টি সৌরভটা পাগল বানিয়ে ফেলবে নাকি ?

' যাও শাওয়ার শেষ করে এসো' খসখসে গলায় বলল  তন্দ্রা  ' আমি অপেক্ষা করছি বেড রুমে'

 

 

 

সকালটা দারুণ

রেস্টুরেন্টে পৌঁছে অবাক হল ওরা

হিরালাল   আগেই পৌঁছে গেছেসপ্তাহে বেশ কয়েকটা  দিন হীরালাল    আগে ভাগে গিয়ে ওপেনিং শিফট চালু করেআজও তেমন একটা

চেয়ার টেবিলগুলো ততক্ষণে সুন্দর করে সাজানো হয়ে গেছেসংখ্যায় খুবই কম

প্রত্যেকটা টেবিলে যত্ন করে রাখা লবণ আর কালো মরিচের গুড়া ভর্তি শিশি সাথে এক বোতল  স্টেক সসমেনুগুলো ও এক পাশে  সুন্দর  করে রাখাগ্রিল জ্বালানো হয়েছে আগেইএই কাজটা  রেস্টুরেন্ট  খুলেপ্রথমেই করতে হয়গ্রিল গরম হতে বেশ খানিক সময় লাগেআচমকা খদ্দের ঢুকে পড়লে, তখন ?

ক্যাশ রেজিস্টার খুলে  ভাংতি  পয়সা রাখল তন্দ্রা  

ফ্রিজ খুলে নতুন পানীয় ঠেসতে লাগল অমিত

টুংটাং শব্দে দরজা খুলে গেল

ভেতরে ঢুকল দানব সাইজের সোহরাব তালুকদার            ' গুড মর্নিংহ্যালো সবাই'

বরাবরের মত সম্ভাষণ জানালো  সোহরাব তালুকদার          লোকটা অমায়িক


কফি ?' জানে,  তারপরও প্রশ্ন করলো  তন্দ্রা  

'নিশ্চয়ই, আর দুটো ডিম ভেজে  দাও তো'কাউন্টারের চেয়ার টেনে বসলো সোহরাব তালুকদার   ।         

গ্রিলের পাশেই পিচ্চি একটা ফ্রিজমাংসের ফালি, ডিম, দুধের বোতল, পনীর , মাশরুম, মাখন এইসব হাবিজাবি রাখা হয়যাতে প্রত্যেকবার অর্ডার খদ্দের অর্ডার দেয়া মাত্র দৌড়ে পিছনের স্টোর রুমে যেতে না হয়

সহজ নিয়ম

যাতে আট দশটার মত অর্ডারের ষ্টক এখানেই থাকে

ফ্রিজ খুলে অবাক হয়ে গেল তন্দ্রা  


ডিম , মাখন, দুধ এই সব ছাড়া অন্য কিছু থাকার কথা নাকাল রাতে মাংসের ফালি কেটে স্টেক সাইজ করে রাখতে পারেনি   অমিত  ।   তোফাজ্জলের   সাথে ঝগড়ার পর বাদবাকি মাংস সব স্টোর রুমে রেখে বাড়ি ফিরেছিল ওঅমনটাই তো বলল

কিন্তু এখন তো একবাক্স ডিমের পাশে  লাল, কাঁচা টাটকা হাফ ডজন  মাংসের ফালি দেখা যাচ্ছে !  

অবাক হয়ে ফিরে তাকাতেই চোখাচোখি হল হীরালালের সাথেওর দিকেই নজর রাখছিল ছোকরাকিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ছোকরা ব্যাখ্যা করলো, ' ম্যাডাম , আজ সকালে চায়না টাউন গিয়েছিলাম ওখানে মাংসের দাম বেশ কম নাম করা সাপ্লাইয়ারদের চেয়েও অনেক কমে মাংস দিতে পারে ওরাসেইজন্য স্যাম্পল হিসাবে কিছু কিনে এনেছি'

মনে মনে খুব খুশি হল তন্দ্রা   

এমন বুদ্ধিমান করিৎকর্মা ছেলে কর্মচারী হিসাবে পাওয়া বেশ মুশকিল এক কথায় অসম্ভব

' স্টেক আছে নাকি ?' জিরাফের মত গলা বাড়িয়ে জানতে চাইল   সোহরাব তালুকদার          ' তাহলে স্টেকই দাওবেশি করে গোল মরিচের গুড়া মাখিয়ে দিওসাথে পারসলের কুঁচিসাথে দুটো ডিম অবশ্যইখাই আজকে একটু বেশিই খাই কি আছে জীবনে ? আজ মরলে কাল দুই দিন ।   হ্যাহ হ্যাহ হ্যাহ'

যেন দারুণ রকম একটা কৌতুক বলে ফেলেছে অমন ভাবে হাসল পুলিশ অফিসার

ব্যস্ত হয়ে পড়লো তন্দ্রা   গরম গ্রিলে মাংসের ফালি রাখা মাত্র  কিম্ভুত   স্যাত স্যাত  শব্দ করে ঝলসাতে লাগল

মাংসের ফালির উপর লবণ আর গোল মরিচ দেয়া মাত্র দারুণ চনমন করা লোভনীয় ঘ্রানে ভরে গেল চারিদিকটা

'আহ' বুক ভরে শ্বাস টানল সোহরাব তালুকদার          ' অদ্ভুত রকমের   ঘ্রাণ তো !   খিদে বেড়ে যাচ্ছে'

টুংটাং শব্দ হতেই আবার  ফিরে তাকাল তন্দ্রা  

দুই বুড়ি এসে ঢুকেছেরোজ আসে আলু ভাঁজা আর কফি খায় ওরাআজ ভেতরে ঢুকেই স্টেকের অর্ডার দিল

দরজা খুলে ভেতরে ঢোকা মাত্রই নাকি ঝলসানো মাংসের ঘ্রান পেয়েছে , অমনটাই বলল

একপাশে খাম্বার মত দাঁড়িয়ে ছিল হীরা  পকেট থেকে রুমাল বের করে নাক মুখ মুছে রুমালটা আবার রাখতে যাবে তখনই অমিত   ওকে আঙুলের ইশারায় ডাকল  

'হাজারবার বলেছি 'চাপা স্বরে গর্জন করে উঠলো অমিত  ' কাসটোমারের সামনে নাক পরিষ্কার করবে নাফাজিলের বাচ্চা কোথাকারমাথার ঘিলু কি ফ্রিজে রেখে দাও নাকি ? অপদার্থ ডেপো ছোকরা কোথাকার'

'আমাকে অপদার্থ বলছেন স্যার?' যেন ভীষণ কষ্ট পেয়েছে অমন একটা ভাব ভঙ্গী চেহারায় ফুটিয়ে তুলল হীরা  চেহারা দেখে মনে হচ্ছে হেমলকের রস গিলিয়ে দিয়েছে ওকে, কেউ

'কেন , কোন সন্দেহ আছে ?' টিটকারির সুরে বলল অমিত  কেন জানে না,  ছোকরার এই অতি ভালমানুষী আচরণটা কোন দিনই ভাল লাগেনি ওর কাছেভাল একটা কর্মচারী পেলেই পাছায় লাত্থি মেরে বের করে দেবে এই মিচকে শয়তানটাকে

'স্যার আপনি এইভাবে বললেন ' এখনও দুঃখ ভরা বেদনা বিধুর রোলে অভিনয় করে যাচ্ছে মিচকে শয়তান হীরালাল  ' আমি আপনাকে সাহায়্য করার চেষ্টা করছি এমন কি আজ সকালে রেস্টুরেন্টে আসার আগে খানিক মাংস পর্যন্ত নিয়ে এসেছিতাও আবার সাইজ মত কাটা'

এক মুহুতের জন্য থতমত খেয়ে গেল অমিত

তাই তো !

এমন সময় কিচেন থেকে তন্দ্রার  গলা ভেসে এলো , ' এই কোথায় তোমরা? আরও মাংসের ফালি লাগবেনতুন তিনজন খদ্দের ঢুকছে ভেতরেওরাও স্টেক চাইছে

এ কী কথা ?

সাত সকালে এত স্টেকের অর্ডার !

ওরা দুইজন এতক্ষণ কিচেন আর স্টোররুমের মাঝখানের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলএই দোকানের কিচেন খোলাখদ্দের সামনে বসেই দেখতে পায় কিভাবে তার খাবার রান্না হচ্ছেখুবই জনপ্রিয় একটা কিচেন ডিজাইনএতে ভোজনের আগ্রহ বেড়ে যায় অনেকগুন

'কী ব্যাপার কথা বলছ না কেন ? আরও মাংসের ফালি আছে হীরা  ? ' গ্রিলের উপর মাংসের ফালিগুলো উল্টে পাল্টে দিতে দিতে বলল  তন্দ্রা  

'ইয়েস ম্যাডাম' জবাব দিল হীরালাল  ' আরও খানিকটা  মাংস আছে'

' জলদি দাও, কাসটোমার অপেক্ষা করছে '

বাউলি কেটে অমিতের বগলের পাশ দিয়ে চলে গেল হীরা  স্টোররুমের দিকে যাচ্ছে

পিছন পিছন অমিত  ও অনুসরণ করলো ওকে

স্টোররুমে গিয়ে জিনিস পত্রের স্টকটা দেখা দরকারকাল রাতে মন মেজাজ খারাপ থাকায় কাজটা করা হয়নিআলু আর পনীর কতটুকু আছে কে জানে !

প্রত্যেকটা স্টেকের সাথে বেকড করা আস্ত একটা আলু দিতে হয়খোসা সহ ।  আলুতে লাভ বেশি

স্টোররুমের দরজাটা ভারি স্টিলের পুরুভেতরে সারাক্ষণ হিমেল হাওয়া বয়মাংসগুলো টাটকাই থাকেবড় বড় বড়শি আকৃতির লোহার হুকে ঝুলে থাকে পেল্লাই সাইজের গরুর ঠ্যাংগুলো

ধাক্কা দিয়ে স্টোররুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লো হীরা

অলসভাবে স্টোররুমের বাইরে দাঁড়ালো অমিত আরও এক পেয়ালা কফি গেলার দরকার ছিল ওরভেতরে চোখ পড়তেই পিলেটা চমকে গেল অমিতেরকয়েক মুহূর্ত বন্ধ রইল হৃৎপিণ্ডটা যেটা কি না বছরের পর বছর দারুণ রকম সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছিল তারপর আবার লাব ডুব লাব ডুব করে চালু হল বুকের ভেতরে

কয়েক মুহূর্ত মনে হল , নিশ্চয়ই বাজে ধরনের কোন দুঃস্বপ্ন দেখছেবিচ্ছিরি কোন দুঃস্বপ্ন !

এ রকম কোন দৃশ্য বাস্তবে হতেই পারে না

অসম্ভব !

স্টোর রুমের মাঝ খানে লোহার একটা হুকের মধ্যে ঝুলে আছে একটা মড়া লাশনগ্নগায়ে কোন কাপড় চোপড় নেইঅসম্ভব রকমের মোটা দেহচর্বি আর মাংসের ডিপো বলা যায়অনেকটা সময় বরফ শীতল স্টোর রুমের ভেতরে থাকায় মোমের মত সাদা হয়ে গেছে দেহটা

এবং এক উরুর খানিকটা মাংস নেই

ঢোক গিলে কিছু বলতে যাবে অমিত  অনুভব করলো গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না

হাত পা থর থর করে কাঁপছে

ওই দিকে  হীরার  মধ্যে কোন রকম বিকার দেখা যাচ্ছে নাএকদম শান্ত ভঙ্গিতে গিয়ে দাঁড়ালো ঝুলন্ত লাশটার সামনেপাশের   একটা লোহার র্যাকের   উপর বড়সড় একটা চাপাতি আর চিনামাটির চ্যাপ্টা তশতরী রাখা ছিল

চাপাতি তুলে নিয়ে মাপা হাতে কোপ দিল হীরা  যে উরুর মাংস নেই সেই উরুর মধ্যেই কোপটা দিলনিখুঁত ভাবে ছোট এক ফালি মাংস কেটে বের হয়ে এলোতারপর, একের পর এক কোপ দিয়ে কেটে আনল আরও চার পাঁচটা মাংসের বড় ফালিযত্ন করে রাখল চীনা মাটির সাদা তশতরীতে

এতক্ষণে চিনতে পারল অমিত  

 মাংস ব্যবসায়ী তোফাজ্জেলের   লাশ

'তু্মি ...তুমি উনাকে খুন করেছ ?' অনেক সময় পর বোকার মত প্রশ্ন করলো অমিত  ফিস ফিস করেগলা শুকিয়ে গেছে

'করেছি' শান্ত গলায় জবাব দিল হীরা  চেহারা বা হাবভাবে কোন রকম বিকার নেইএমন কি চোখের পাতাও কাঁপছে না 'এখন মাংসগুলো ম্যাডামকে দিয়ে আসুন'

চীনামাটির তশতরীটা সামনে বাড়িয়ে দিল হীরা  ভয়ে এক পা পিছনে চলে গেল অমিত   

রক্তাক্ত ফিকে মেরুন রঙের মাংসের ফালিগুলোর উপর চোখ পড়তেই শরীরটা কেমন শিরশির করে উঠছে

' এর স্বাদই আলাদা' লেকচার দেয়ার ভঙ্গিতে বলে যাচ্ছে হীরা  ' নরম আর রসালো লবণটা পর্যন্ত পরিমাণ মত দেয়া আছেপ্রকৃতিই এমন করে বানিয়ে রেখেছে আর শরীরের এক একটা অংশের স্বাদ এক এক রকম হবেপাঁজরের মাংসের এক স্বাদ, উরুর মাংসের এক স্বাদ, পিঠের মাংসের আরেক স্বাদবৈচিত্র আর কাকে বলেআর স্বাদও অদ্ভুত রকমেরমাছ আর মাংসের মিক্স'

কী বলবে বুঝতে পারছে না অমিত

জবান আটকে গেছে

'কী ? হল তোমাদের ? ' কিচেন থেকে চেঁচিয়ে উঠলো তন্দ্রা  ' আরে কাস্টমার অপেক্ষা করছে তো '

সসারে স্টেক আর ডিম ভাঁজা তুলে সোহরাব তালুকদারের           সামনে নিয়ে রাখল  তন্দ্রা আরও এক বুড়ো এসে টুক করে বসে পড়েছে সোহরাব তালুকদার           পাশে নাক দিয়ে যোগ ব্যায়াম করার ভঙ্গিতে শ্বাস টেনে লোভী গলায় বলল , ' আমাকেও ঠিক একই জিনিস দিন নাঘ্রানেই তো মেরে ফেলছে আমাকে'

হাসল তন্দ্রা  

প্লেটটা সামনে টেনে নিল   সোহরাব তালুকদার          কাটা চামচ দিয়ে গ্রিল করা মাংসের টুকরাটা গেঁথে স্টেক নাইফ দিয়ে কেটে নিল এক ফালি মাংসমুখে পুরে চিবুতেই স্বাদের চোটে দুই চোখ বন্ধ হয়ে গেল পুলিশ অফিসারের

'দারুণ' খুশি মনে মন্তব্য করলো সোহরাব তালুকদার           ' খামাখাই দিনের পর দিন সকাল বেলা টুনা আর  মুরগির  মাংসের স্যান্ডউইচ খেয়েছি'

'স্বাদটা কেমন অফিসার ?' চীনামাটির তশতরী ভর্তি মাংসের ফালি নিয়ে কিচেনে ঢুকল হীরা

'বলার মত না' মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে আউ আউ করে জবাব দিল অফিসার সোহরাব তালুকদার          ' সারাজীবনে কত পদের স্টেক খেয়েছিঅমনটা আগে কোথাও পাইনি'

'কারণ এটা হচ্ছে একটা ফ্যামিলির গোপন রেসিপি' ব্যাখ্যা করার ভঙ্গিতে বলল হীরা  ' আমি আমার দাদীর কাছ থেকে শিখেছিআমার দাদী শিখেছিল তার দাদীর কাছ থেকেআসলে তেমন কিছু নামাংসের ফালিতে জলপাই তেল, খনিজ লবণ , অমন হাবিজাবি এক গণ্ডা জিনিস মাখিয়ে সারারাত রেখে দিলেই অমন স্বাদ হয়ে যাবে'

 

মুখ ভর্তি করে খাবার নিয়ে আউ আউ করে কী যেন বলল সোহরাব তালুকদার           কিছুই বোঝা গেল নাসম্ভবত প্রশংসাসূচক কিছু বলেছে হীরা   গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো কাস্টোমারদের খোঁজ খবর নিতে

মোট আটজন ঢুকে পড়েছেকেউ চাইছে কফিকেউ বা নরম পানীয় সাথে ডিম , আলু ভাঁজা

' বুঝলে  তন্দ্রা  , কাল একটা সাংঘাতিক কাণ্ড হয়েছে' খাওয়ার গতি একটু কমে আসতেই বলল সোহরাব তালুকদার          

'আবার কি হল ?' গ্রিলের উপর মাংসের ফালিগুলো ভাঁজতে ভাঁজতে জানতে চাইল মেয়েটাদোকানটা ভর্তি দেখে ভাল লাগছে

 ইশ, রোজ যদি অমন হত !

ততক্ষণে ভেতর থেকে বের হয়ে এসেছে অমিত  চেহারা ফ্যাকাসেহাত পা কাঁপছে ।  বাইরে এসে যা দেখল,  তাতে ওর মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো

প্রায় সবগুলো টেবিল ভর্তি আজপ্রায় সবাই স্টেকের অর্ডার দিয়েছে।   যে  কিপটে বুড়োটা রোজ এক বাউল আলু ভাঁজা ছাড়া কিছু খায় না সেও পশুর মত স্টেক চিবুচ্ছে আজবারবার  বোতল থেকে ঝাঁকি দিয়ে ঝোলা গুড়ের মত স্টেক সস ছিটিয়ে দিচ্ছে মাংসের ফালির উপর

ব্যস্ত হাতে টেবিলে টেবিলে গিয়ে খাবার সহবরাহ করছে হীরা

সবাই খাচ্ছে

সবার চোখে মুখে তৃপ্তি আর প্রশংসার আমেজ

বিশেষ করে পুলিশ অফিসারের প্লেট তো অর্ধেকের বেশি খালিমুখ ভর্তি খাবার নিয়ে চম চম শব্দ করে খাচ্ছে আর কী সব বলছে তন্দ্রাকে

'সাংঘাতিক ব্যাপারটা হচ্ছে ওই যে মাংস ব্যবসায়ী  তোফাজ্জল   আছে না ? নাম শুনেছ নিশ্চয়ই ? হয়তো তোমাদের মাংস সাপ্লাই দিত' বলে যাচ্ছে সোহরাব তালুকদার         

'হ্যাঁ , চিনি তোভাল করেই চিনি' সায় দিল তন্দ্রা

'আজ সকালে এই গলির শেষ মাথায় তোফাজ্জলের গাড়িটা পাওয়া গেলসম্ভবত কাল রাতে কোন কাজে একা বের হয়েছিলেন ভদ্রলোক কোথায় গেছে কেন গেছে কে বলবেউনার স্ত্রী পুলিশ ষ্টেশনে গিয়ে আমাদের কাছে রিপোর্ট দিয়েছেন , কাল রাতে উনার স্বামী বাসায় ফেরেনি'

'এই না বললেন গাড়ি পেয়েছেন '

'গাড়ি পেয়েছি, শুধু তাই না বোনাস হিসাবে ভেতরে রক্তও পেয়েছি'

'মানে মারা গেছেন উনি ?'

'সেটা কে বলবে ? লাশটা তো পাইনিএকদম উধাও হয়ে গেছে শরীরটাযেন মড়ার পর হেঁটে চলে গেছে'

হায় হায়সাংঘাতিক তো'

'আরে আমার জন্য দারুণ আনন্দের ব্যাপারআমার এলাকায় হয়েছে ঘটনাটাএই দিকে আমার রিটায়ার করার মাত্র ছয় মাস বাকি আছেএর মধ্যে যদি একটু খেলা দেখাতে পারি নিশ্চিন্তে অবসর নিতে পারববুড়ো বয়সে আর হ্যাপা সহ্য হয় নাখুনি যেই হোক ঠিকই ধরে ফেলতে পারব ব্যাটাকেকী ব্যাপার অমিত  ? শরীর খারাপ না কি ?'

দরদর করে ঘামছে অমিত

সোহরাব তালুকদারকে          সব বলে দেবে এখন ?

কী লাভ হতে পারে ?

দোকান ভর্তি কাস্টমারএমন কি সোহরাব তালুকদার         ও নিজের প্লেটের সব খাবার খেয়ে ফেলেছে, প্রায়

এখন কি হবে ?

কী করে বলবে , স্যার আমার স্টোর রুমে মাংস ব্যবসায়ী  তোফাজ্জেলের লাশটা ঝুলে আছেআর আপনারা যে মাংস খাচ্ছেন সেটা...

জেল হাজত ছাড়াও জীবনে ও কী এই দোকান উঠে দাঁড়াবে ?

বাকি জীবন কিছু করতে পারবে ওরা ? হয়তো এলাকার মানুষের গণপিটুনিতেই মারা যাবে ওরা   

জোর করে হাসল অমিত

মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবেসব কাস্টমার চলে যাবার পর ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি ঠিক করতে হবেআর সব কিছু হীরাকে দিয়েই করতে হবেওই  শূয়রের বাচ্চা শুরু করছে ওই শেষ করবে

'নাহ স্যারশরীরের আর দোষ কী ?' ফ্যাকাসে হেসে বলল অমিত  যেন সাফাই গাইছেসপ্তাহে সাতদিন কাজ করিছুটি ছাঁটা নিতে পারি নাটানা বারো ঘণ্টার বেশি শিফটতাই মাঝে মাঝে ক্লান্তি লাগে একটু'

'না, এত সহজে তো ক্লান্ত হয়ে পড়লে চলবে না বাবারেস্টুরেন্টটা তুলতে হবে না এর চেয়ে ভাল ব্যবসা আর আছে নাকি ? কত লোককে চিনি মাত্র একটা পিচ্চি দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিল মড়ার আগে আট থেকে দশটা হোটেল ক্যাফে বানিয়ে ফেলেছেআর বংশধরদের জন্য রেখে গেছে বস্তা ভর্তি টাকা  তোমাদের বয়স কত কমযত পার খেটে ভবিষ্যৎ গুছিয়ে নাওআমার অবস্থা তো দেখলেইজীবনের শেষ প্রান্তে এসে গেছিঅথচ ...যাকগে দারুণ হয়েছে আজকের স্টেকটাএই রেসিপি ফলো করলে ভাল হয়'

সারাটা দিন ব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেল

গ্রিলের কাজটা তন্দ্রাই করে সব সময়আজও করলো অমিত  খদ্দেরের দিকে খেয়াল রাখলটাকা পয়সা নিল।   টেবিল পরিষ্কার করা থেকে থালা বাটি মেজে বেশ কয়েকবার স্টোর রুম গিয়ে সেই 'মাংসের ফালি ' নিয়ে এলো হীরা   বার বার নিজে থেকেই এই কাজটা করলোদুইজনে মিলেই খেয়াল রাখল ,  তন্দ্রা  যাতে ভুলেও স্টোর রুমের ভেতরে না যায়কাজটা অবশ্য সহজ

এমনিতেও তন্দ্রার  ঠাণ্ডার ধাঁচ আছে

কয়েক বার স্টোর রুমে গেলেই হাঁচি চলে আসে

রাত নয়টার সময় ক্যাশ রেজিস্টারের হিসাব চেক করলো অমিত

'কত বললে ?' প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো এমা

' পনের  হাজার টাকা  আজকের বিক্রি' টাকাগুলো হাতের মুঠোয় নিয়ে বিড়বিড় করে বলল অমিত

এই মুহূর্তে ওর চেহারাটা কেমন বোকা বোকা দেখচ্ছে

'আমাদের প্রায় তিনদিনের বিক্রি' হাসতে হাসতে বলল তন্দ্রা   ' এরই নাম রেস্টুরেন্ট ব্যবসাকখন যে কী হবে মোটেও বলা যাবে নাকাল রাতেই ভাবছিলে কী ভাবে মাংসের দাম আর দোকান ভাড়া শোধ করবে'

'হ্যাঁ , তাইতো ' অমিত  এখনও বোকার মত হাতের মুঠোয় টাকাগুলো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেযেন কেউ টাকাগুলো   নিয়ে দৌড় দেবেরেস্টুরেন্ট খোলার পর এই প্রথম এত টাকা বিক্রি করলো সারাদিনে

' তাহলে আমরা হীরার  রেসিপিই অনুসরণ করব সব সময়' বলল তন্দ্রা  খুশি

'ইয়ে মানে...'

' স্যার আপনি কী ধনী হতে চান না ?' পাশে এসে দাঁড়ালো হীরা  ' চোখ দুটো সতর্ক আর শীতল' আপনার সমস্যা কোথায় ? মাংসের সাপ্লাই তো সস্তা'

' হ্যাঁ ' সায় দিল  তন্দ্রা  ' আমি নিজে ও দুপুরে এক ফালি স্টেক খেয়ে দেখেছিঅপূর্ব স্বাদ'

'তুমি... তুমি এই মাংস খেয়ে দেখেছ ?' দুই চোখ কপালে উঠে গেল অমিতের

'অবশ্যই কেন কেন ?' হাসছে  তন্দ্রা  বেচারি বুঝেই উঠতে পারছে না , অমিত  এতটা অবাক হচ্ছে কেন ?

হঠাৎ করেই স্টোর রুমে ঝুলে থাকা তোফাজ্জলের    শীতল লাশটার কথা মনে পড়লো অমিতেরকী অবস্থা ওটার ? এখনও ঝুলে আছে ? সারাদিনে একবারও ভেতরে যায়নি সেইচ্ছা করেই

 

 

দ্রুত কিচেন ছেড়ে স্টোর রুমের দিকে চলে গেল অমিত

' দাঁড়াও ষ্টক চেক করছি'  তন্দ্রার   উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলল সে

ধীর পায়ে এগিয়ে গেল হাতে এখনও টাকার বাণ্ডিল সিদ্ধান্ত নিতে পারছে নাটাকার বাণ্ডিলগুলোর দিকে তাকাচ্ছে বার বারদুই হাতে স্পর্শ  নিচ্ছে  কাগজের নোটগুলোর

দরজা খুলে স্টোররুমের ভেতরে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো অমিত  ।  তোফাজ্জলের  লাশটা এখনও ঝুলে আছে হুকের সাথেদুই পায়ের মাংস বলতে কিছু নেইশুধু হাড় ঝুলছে ল্যাগ ব্যাগ করে পাঁজরের হাড় দেখা যাচ্ছেশরীরের উপরের অংশটা শুধু আগের মত আছে

 পিঠে ভারি হাতটা পড়তেই ভীষণ রকম চমকে গেল অমিত

ঘুরে  মুখোমুখি হল হীরার  ছোকরার  চেহারায় কোন ভাব নেই ওর হাঁটা চলাতে সতর্ক বিড়ালের মত আচরণ

'আমাদের কথা বলা দরকার' ফিসফিস করে বলল হীরা

'নিশ্চয়ই কথা বলা দরকার' খেঁকিয়ে উঠল অমিত  ' পুলিশ ষ্টেশনে ফোন করে আমিই সব বলছি'

'ফোন করে কী বলবেন ?'

চুপ করে গেল অমিত  

'বলুন ফোন করে কী বলবেন ?' শান্ত এক ঘেয়ে সুরে বলে যাচ্ছে হীরা  '  তোফাজ্জলকে  আমি খুন করেছি ? কে বিশ্বাস করবে ? কাল রাতে  তোফাজ্জলের   সাথে আপনার ঝগড়া হয়েছিলরাস্তার উল্টা দিকে দাঁড়িয়ে আমি নিজের চোখে দেখেছিখোঁজ নিলে আরও দু চারজন পথচারী পাওয়া যাবে যারা ওই দৃশ্য দেখেছে তোফাজ্জলকে খুন করার জন্য যে মোটিভ দরকার সেটা আপনার মধ্যে সবচেয়ে বেশিকারণ , পাওনাদার বনাম দেনাদারসারাদিন রেস্টুরেন্ট চালিয়েছেন তখন ফোন দেননি কেন ? আর রান্না ও তো আমি করিনিকরেছে আপনার গিন্নিসারাদিনপ্রত্যেকটা অর্ডার তো ?'

চুপ করে রইল অমিত

নিজের বোকামিতে হায় হায় করছে

ইস সকালে লাশটা দেখা মাত্র পুলিশ অফিসার সোহরাব তালুকদারকে            জানায়নি কেন ?

তারপরও বিরাট ঝামেলায় ফেঁসে   যেতততক্ষণে সোহরাব তালুকদারের প্লেটে স্টেক দেয়া হয়ে গিয়েছিলখেয়েও ফেলেছিলদুই চার কামড় না অর্ধেকের বেশি ।   বিচ্ছিরি ভাবে ফেঁসে যেত তখনইসোহরাব তালুকদার           ওকে অমনিতেই ছেড়ে দিত ?

কিভাবে প্রমাণ করতো, তোফাজ্জেলকে ও মারেনি ?

কথা তো সত্য পাওনাদার...

'দেখুন না, তোফাজ্জলের গলায় আপনার চাকুটা এখনও গেঁথে আছে'

কৌতুক করছে অমন একটা ভঙ্গিতে বলল হীরা

ঝট করে ফিরে চাইল অমিত

শিউরে উঠল শরীরটাতোফাজ্জলের গলায় অমিতের চাকুর বাটটা দেখা যাচ্ছেকাঠের বাটস্টেক ফিলে করার চাকু যেমন হয়

দৌড়ে গিয়ে বের করল চাকুটানিজের এপ্রনে ভাল করে মুছে নিল ধারালো ফলাটা

'আমার মনে হয় আপনার নিজের মুখটা ভাল মত বন্ধ রাখলেই সেটা ভাল হবে পার্টনার' চিবিয়ে চিবিয়ে বলল হীরাবের হয়ে গেল স্টোর রুম থেকে

কয়েক মুহূর্ত লাগল কথাগুলো বুঝতে পরক্ষণে ঘেউ করে উঠল অমিত  , 'পার্টনার ?'

দৌড়ে সে নিজেও বের হয়ে এলো স্টোর রুমের বাইরে

' অর্ধেক অর্ধেক ' শান্ত ভাল মানুষের মত বলল হীরা 'আজ থেকে আপনি আর আপনার বউ এই রেস্টুরেন্টের অর্ধেক মালিকবাকি অর্ধেক আমারআপনার কোন ঝামেলা নেইলাশ যোগাড় করে আনব আমিসপ্তাহে যে কয়টা লাগে

রান্না করবেন আপনি বা আপনার গিন্নিক্যাশ দেখা শোনার কাজও আপনাদের মধ্য থেকে কেউ এক জন করলে আমি খুশি হবভেবে দেখুনটাকা বানাতে বেশি সময় লাগবে নাশহরের ধনী হয়ে যাবেনঅথবা এই মুহূর্তে ফোন করে দিন থানায়চুলোয় যাক সব কিছুআমাকে কিছুতেই ফাঁসাতে পারবেন নাআমার রুম মেট সাক্ষী দেবে সারা রাত ওর সাথে বসে তাস খেলেছিলাম আগের রাতে'

কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই আনন্দে ভাসতে ভাসতে হাজির হল তন্দ্রা  

হাতে শ্যাম্পেনের সবুজ রঙের ধাউস একটা বোতল

'  শ্যাম্পেনের বোতলটা ভেতরে রেখে দেইআজকের দিনটা স্পেশাল' হাসতে হাসতে বলল তন্দ্রা   ' ডিপ ফ্রিজে পনের মিনিট বোতলটা রাখলেই ঠাণ্ডা হয়ে যাবেসবাই এক গ্লাস করে পান করে আজকের দিনটা স্মরণ করে রাখি'

'না , না' দৌড়ে গিয়ে স্টোর রুমের দরজাটা আড়াল করে দাঁড়ালো অমিত বুকটা ঢিপ ঢিপ করছে'কি দরকার ? আজ আর ঝামেলার দরকার নেইতোমাকে  বরং কাল বা পরশু কোথাও থেকে ডিনার করিয়ে নিয়ে আসব'

হাসল তন্দ্রা

কেমন অস্বাভাবিক লাগছে না অমিতের আচরণ ?

'তাহলে বোতলটা রেখে দেই?'

'আরে চল তোসামনের ফ্রিজেই রাখ বোতলটা এখনই তো আর লাগছে না জিনিসটা ?'

প্রায় ঠেলতে ঠেলতে ওখান থেকে তন্দ্রাকে নিয়ে চলে এলো অমিত

'স্যার , তাহলে ওই কথাই রইল ' পিছন থেকে বলল হীরা

নিশ্চয়ই ' হাসল অমিত

 

পাঁচ

 

তিন মাস পর

 

হঠাৎ করেই যে কেউ থতমত খেয়ে যাবেভাবতেই পারবে না , এটাই সেই নাইস অ্যান্ড জুসি স্টেক হাউজ

নাতেমন বড় সড় কিছুই পরিবর্তন করা হয়নিআগের সেই নিয়ন সাইনটাই রয়েছে দালানের রঙও পরিবর্তন করা হয়নিতবে রেস্টুরেন্টের বাইরে অসম্ভব লম্বা একটা লাইন।   লোকজন দাঁড়িয়ে  আছে

অপেক্ষা করছে সবাই

ভেতরে কোন ভাবে একটা টেবিল খালি হলেও ঢুকতে পারবেতবেই খেতে পারবে এই দোকানের বিখ্যাত সেই স্টেক, যে না খেয়েছে সে নাকি সারা জীবন হায় আফসোস করবে

দোকানের মূল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ম্যানেজার হিরালাল ওর গায়ে খুবই দামি আর অভিজাত একটা পোশাকচেহারাতে একটা চেকনাই এসে গেছেতবে চোখ দুটোতে কোন পরিবর্তন নেই

আগের মতই ঠাণ্ডাসতর্ক

কেন যেন বিড়ালের কথা মনে হয়  ওকে দেখলে খামখাই

অত্যন্ত মার্জিত বাচনভঙ্গি দিয়ে অপেক্ষমাণ ভিড়টাকে সামাল দিচ্ছে সে

সুন্দর করে কথা বলছে সবার সাথেসবাইকেই আশ্বাস দিচ্ছে, আর খানিক পরই একটা টেবিল খালি হবেহেন তেন

এবার ভেতরে ঢুকুন

বাপরে

খদ্দের গিজগিজ করছে

মোট দশটা টেবিল পাতাএকটা টেবিলে দুইজন করে বসতে পারেসব ভর্তিকাউনটারে ছয় জন বসতে পারেবসে আছে ওই ছয় জনই

নতুন তিনজন কর্মচারি রাখা হয়েছেওরা দম ফেলার ফুরসৎ পায় নাটেবিলে টেবিলে ঘুরে ওরা স্টেক পৌঁছে দেয়পানীয় দেয়আবার খাওয়া শেষ হলে এঁটো প্লেট গ্লাস ভেতরে নিয়ে যায়

ওখানে আবার একজন সব কিছু ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে

খদ্দেররা খাচ্ছেসবার সামনে স্টেকসাথে আভেন বেকড আলুআলুর ভেতরে পেঁয়াজ পাতা আর বেকনের কুঁচিসাথে এক খাবলা মাখন তো আছেই

সবাই খুশি

অমন স্বাদু , তৃপ্তিদায়ক খাবার খুবই কম খেয়েছে মানুষ ! সারা জীবন স্টেক হাউজে পার করেছে অমন খদ্দেরও নিজের মুখেই স্বীকার করেছে , না, জীবনেও অমন নরম আর সুস্বাদু স্টেক খায়নি ওরা

লোকজন যদি সতর্ক থাকতো, তবে দুটো জিনিস খেয়াল করতে পারতো

এক, স্টোর রুমে শুধু  অমিত  আর হীরা  যায়অন্য কোন কর্মচারী কখনই স্টোর রুমে ঢোকার অনুমতি পায় না

আর দুই, এই দোকানের খাবার কখনই বাইরে নেয়া যায় নাটেক ওয়ে অর্ডার ওরা নেয় নাএখানেই বসে খেতে হয়

ঘটনা  দুটো সামান্য

তবে অনেক সময় অর্থহীন ঘটনাগুলো ও ভয়াল কিছুর ইঙ্গিত দেয়

মানুষ বুঝতে পারে না

' খুব ভাল লাগছে  অমিত   'ক্যাশ রেজিস্টার  চেক করে বলল তন্দ্রা

ওর চেহারা উজ্জ্বলসফলতার ছাপ পড়তে শুরু করেছে চোখে মুখেদামি জামা কাপড় পরে আছেশুধু উপরে রেস্টুরেন্টের লগো সহ একটা ভেসট চাপিয়েছেনইলে সবাই ওকে খদ্দেরই মনে করতো

'হুম ' এক কথায় জবাব দিল অমিত গম্ভীর

 সেই ঘটনার পর থেকে অসম্ভব রকম চুপচাপ হয়ে গেছেএই মুহূর্তে গ্রিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে অমিত  রান্নার কাজ নিজে করেতন্দ্রা   ক্যাশ দেখেনতুন কোন বাবুর্চি রাখা হয়নি হবেও না সঙ্গত কারনেই

ঘাড় ফিরিয়ে ভোজনে ব্যস্ত লোকগুলোর দিকে তাকাল এক ঝলক

সবাই গাপুস গুপুস করে খাচ্ছেবুড়ো হাবড়া ব্যবসায়ী খাচ্ছেকালো কুচকুচে   বিশালদেহী এক ব্যবসায়ী   কানে হেড ফোন গুঁজে খাচ্ছেসূর্যমুখী ফুলের মত সুন্দরী উঠতি মডেল খাচ্ছেনানান পেশার , নানান বয়সের অসংখ্য মানুষ বসে বসে স্টেক খাচ্ছে

তবে একটা মিল রয়েছে সবার মধ্যেসবার চেহারায় তৃপ্তির ছাপ

চোখ মুখ কুঁচকে কী যেন ভাবছে অমিত

মানুষের মনের কথা যদি জানা যেত তবে তো হয়েই ছিল

কি মনে করে গ্রিল থেকে ছোট এক টুকরো মাংস তুলে নিল অমিত চেহারায় অস্বস্তিমনের ভেতরে রাজ্যের ঘৃণাভয় আর কাঁপা কাঁপা হাতে নিয়ে গেল মুখের সামনেচোখ বন্ধ করে মুখে পুরে ফেলল

মাত্র কয়েক মুহূর্ত

নিজের অজান্তেই জিভ নড়তে লাগল

অপূর্ব , অদ্ভুত একটা স্বাদসত্যি বলতে কী এ রকম বিচিত্র স্বাদ আর কখন কোথাও পায়নি সে এই জন্যই বোধ হয় যে সব পশু একবার মানুষের মাংস খাওয়া শুরু করে , কিছুতেই আর রুচি বদলাতে পারে না

'অয়াও' নিজের অজান্তেই বলে ফেলল অমিত  ' ইয়েসদারুণহ্যাঁ আমরা ধনী হয়ে যাবোকোন সন্দেহ নেইইয়েস...'

স্টেক গ্রিল করার ফাঁকে ফাঁকে আনন্দে প্রায় নাচছে অমিত  ইস আরও আগে কেন চেখে দেখল না মাংসের স্বাদ।  তন্দ্রা   তো প্রথম দিন থেকেই খাওয়া শুরু করেছেআজ তক চলছেএখন অন্য মাংস খায় না সে

'জী স্যার' পিছন থেকে শান্ত গলায় বলল হীরা  ' টাকা পয়সাই আসলকিভাবে আসছেকোত্থেকে আসছে , সেটা বড় কথা না আসলেই হল আপনার কাছে টাকা আছে সেটাই আসল সত্য'

'ঠিক' সায় দিল সে মনের সব জড়তা কেটে গেছে অমিতের

'হ্যালোকী খবর সবার ?' ভিড় ঠেলে সামনে চলে এলো সোহরাব তালুকদার          

কাউনটারে একটা সীট খালি হয়েছে মাত্রকারও অনুমতির তোয়াক্কা না করে ওখানেই বসে পড়লো সে

কেউ অবশ্য দোষ ধরতে পারবে নাখদ্দের উঠে যাবার সাথে সাথেই রিজার্ভ লেখা ছোট্ট একটা কাঠের টুকরা রাখা হয়েছিল সেখানে

স্টেক?' জানতে চাইল অমিত

নাহ কফি দাওব্যস্ত আছি আজ' হাঁপাতে হাঁপাতে বলল সোহরাব তালুকদার          ঘামছেইউনিফর্মের দুই বগল ভিজে আছে

'কী নিয়ে এত ব্যস্ততা ?' অমিতের প্রশ্নওই দিকে কফি বানাচ্ছে  তন্দ্রা  

 

আরে ওই যে মাংস ব্যবসায়ী নিখোঁজ ' চিন্তিত গলায় বলল সোহরাব তালুকদার          ' তাছাড়া গড়ে প্রত্যেক পাঁচ বা ছয় দিন পর পর হোমলেস বা ফুটপাথের লোকজন গায়েব হয়ে যাচ্ছেবিরাট রহস্য'

পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অমিত   কথা কানে যাচ্ছে না

চিন্তিত ভঙ্গিতে কফির পেয়ালাটা তুলে নিয়ে বলতে লাগল সোহরাব তালুকদার   , ' সব ঘটনাগুলোর মধ্যে অবশ্য বেশ খানিকটা মিল মানে প্যাটার্ন পেয়েছি আমিএমন মানুষগুলো হারিয়ে যাচ্ছে যারা হারিয়ে গেলেও খোঁজ পড়বে নাসবই হোমলেস , ভিক্ষুক বা মাতালশুধু মাত্র তোমার মাংসওয়ালা বাদেআর সবগুলো ঘটনা ঘটেছে এই এলাকাতে , মানে তোমার রেস্টুরেন্ট থেকে তিন বা সাত  মাইল  দূরত্ব কেন্দ্র করে'

গলা শুকিয়ে গেছে অমিতেরসোহরাব তালুকদারের দিকে ভুলেও তাকাচ্ছে না

কাজগুলো আসলে করছে হীরা

রাতের বেলা দোকান বন্ধ করার খানিক আগে রাস্তায় গিয়ে কোন মাতাল বা ভবঘুরেকে ডেকে নিয়ে আসেলোভ দেখায়, খাবার দেবেবা সামান্য কাজ করিয়ে নগদ পয়সা দেবে

সোজা স্টোর রুমের পাশে ডিশওয়াশেরের এলাকায় নিয়ে মাথায় হাতুড়ির বারি বসিয়ে দেয়ঠিক একই ভাবে মাথা আর মেরুদণ্ডের হাড়গোড় ছোট ছোট পলিথিনের ব্যাগে করে ফেলে দিয়ে আসে দূরের ময়লার বিনগুলোতে

ভোর রাতে ময়লা  তোলার সরকারী গাড়িগুলো এসে নিয়ে যায় সে সবকেউ কিছু জানতেও পারে না

'এখন যাই' ঠকাস করে পেয়ালাটা কাঠের কাউনটারের উপর শব্দ করে রেখে উঠে দাঁড়ালো সোহরাব তালুকদার  'ছকটা খুঁজে পেয়েছিআজ বা কাল অপরাধীকে ঠিকই খুঁজে পেয়ে ফেলব  চিন্তা করবে না অমিত  আর হ্যাঁ, আজকে রাতের বেলা আসব স্টেক খেতেই হবেঅন্য কিছু খেতে ভাল লাগে না আজকালতুমিও বিরাট ফাজিলডিসকাউনট ফিসকাউনট দাও না '

খ্যাক খ্যাক করে হাসতে হাসতে চলে গেল মাইকেল

যেন মস্ত একটা কৌতুক বলে ফেলেছে

ছয়

রাত দশটায় হিসাব করলো তন্দ্রা

ত্রিশ  হাজার টাকা মাই গড

'ওহসত্যি সত্যি আমরা আমাদের স্বপ্ন পূর্ণ করতে পারছি' আনন্দিত সুরে বলল  তন্দ্রা টাকাগুলো দ্রুত ভরে নিল লেডিস ব্যাগটাতে' ধন্যবাদ হীরা তোমার সেই অদ্ভুত রেসিপির জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ'

'নিশ্চয়ই ম্যাডাম' অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জবাব দিল হীরা  ' আমিও তো আপনাদেরই   একজন '

' অবশ্যই ' হাসল তন্দ্রা  ' যাই আমি আজকে স্টোর রুমটা দেখে যাই কতদিন ওটা চেক করি না'

স্টোররুমের দিকে পা বাড়াল তন্দ্রা

গ্রিল ক্লিনার ঢেলে স্টিলউল দিয়ে ঘষে ঘষে গ্রিল পরিষ্কার করছিল অমিত  দোকানের বাদবাকি কর্মচারীদের ছুটি দেয়া হয়ে গেছে বহু আগেইরেস্টুরেন্ট বন্ধ করার শিফট আগের মতই রেখেছে ওরাকারণটা তো আপনি জানেন ?

 তন্দ্রাকে  স্টোর রুমের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে পাগলের মত দৌড় দিল অমিত যে করেই হোক থামাতে হবে

চারিদিকটা এক ঝলক দেখে নিল হীরা

কেউ থাকার কথা নাতারপরও সব সময় ডাবল সতর্ক সে

হাত বাড়াল তন্দ্রার গোলাপি ব্যাগটার দিকেজিপার টেনে খুলতেই দেখা গেল ভেতরে টাকার ব্যান্ডিল আর রিভলবারের বাটটা

দ্রুত রিভলবারটা তুলে এনে গুঁজে রাখল ওর কোমরের কাছেআয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাল করে দেখল, না, বাইরে থেকে বোঝার কোন উপায় নেই

হ্যান্ডব্যাগের সোনালী রঙের জিপারটা টেনে বন্ধ করে নিজেও ঝেড়ে দৌড় দিল স্টোর রুমের দিকে

ভাবখানা ,  অমিতকে  যেন সাহায়্য করতে চায়মাথার ভেতরে চিন্তা চলছে ঝড়ের বেগে

নিজের মগজের ধার দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেল

ততক্ষণে তন্দ্রর হাত ধরে থামিয়ে ফেলেছে অমিত  

'আরে বাড়ি যাও তো' ফ্যাকাসে হেসে বলল সে' আমি আর একটু দেরি করে সব গুছিয়েই বাড়ি ফিরব'

অমিত  আর  হীরার  দিকে অবাক হয়ে ঘন ঘন চাইল তন্দ্রা  যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না

হীরা ,  তুমি ম্যাডামকে   দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দাও' খানিক রুক্ষ গলায় বলল অমিত

চুপচাপ চলে এলো তন্দ্রা  দরজা পর্যন্ত মানে রেস্টুরেন্টের দরজা পর্যন্ত

' ও আমার সাথে অমন করলো কেন ?' দুঃখী মানুষের মত বলল তন্দ্রা  

মনটা খারাপ হয়ে গেছে

'উনি আসলে অনুশোচনায় ভুগছেন' গলার স্বর নিচু করে শান্তনা দেয়ার সুরে বলল হীরা

'মানে ?'অবাক হল  তন্দ্রা

'পরে বলব ম্যাড্যাম , আপনি যান এখন'

 চলে গেল তন্দ্রা

হীরা  ফেরত গেল কিচেনের ভেতরে

 

সাত  

 

ঠকঠক করে দরজায় নক করলো কেউ

অবাক হল তন্দ্রা  এই সময় আবার কে এলো ? অমিতের কাছে তো চাবি আছে

তাছাড়া অমিত  আসবে আরও খানিকটা দেরি করে

সেফটি লক আছেঅর্ধেক দরজা খুলতেই দেখা গেল হীরার সুদর্শন মুখটাচিন্তিত

ম্যাডাম আমি কী একটু ভেতরে আসতে পারি ?' বিনয়ী আর মার্জিত গলায় বলল হীরা

'এই সময়ে ? কিন্তু কী ব্যাপার ?'

'খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারপ্লিজ না করবেন নাএর সাথে আমি , আপনি , স্যার আমরা সবাই জড়িতএমন কী আমাদের ব্যবসা , সব '

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতে দিল হীরাকে

ছোকরা কোন বদ মতলবে আসেনি তো ? ভয়ের কিছু নেইবেশি টেণ্ডাই মেনডাই করলে রিভলবার তো আছেই

'কী হয়েছে  বলতো' উদ্বিগ্ন গলায় বলল তন্দ্রা  

নিশ্চয়ই মস্ত কোন রকম ভজকট হয়েছেনইলে হীরার চেহারা অমন দেখাচ্ছে কেন ? তাছাড়া আগে কখনই রাতের বেলা এইভাবে চলে আসেনি বাড়িতে 

কিছুক্ষণ চুপ করে রইল হীরা  যেন দুঃখে ওর বুকটা ফেটে যাচ্ছেতারপর করুন সুরে বলতে লাগল , ' ম্যাডাম আমি আপনাকে বলেছিলাম না , স্যার অনুশোচনায় ভুগছে ? সত্যি কিন্তু তাইআপনি ভাবতেও পারবেন না কত বড় জঘন্য পাপ উনি করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন'

'আরে বলবে তো তুমি...' তাড়া দিল তন্দ্রা চেহারা দেখেই বুঝা যায় নার্ভাস হয়ে গেছে  

'মাংস ব্যবসায়ী  তোফাজ্জেল হোসেন   সাহেবের কথা মনে আছে আপনার ?' সতর্ক ভাবে কথা মেপে মেপে বলছে হীরা

'আছে , থাকবে না কেন ? উনাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সেটা তো অফিসার  সোহরাব তালুকদার           বলে গেছে'

'পাবে কী করে ? স্যার উনাকে খুন করেছেন '

'মাই গড'

আমি নিজের চোখে দেখেছিরাস্তার উল্টা দিকে দাঁড়িয়ে আপনার দেয়া খাবার খাচ্ছিলাম  তখনআর ঘটনাটা এখানেই শেষ হলে ভাল হত ম্যাডাম সেই মৃতদেহটা কেটে কেটে উনি স্টেক হিসাবে বিক্রি করেছেন'

'কী বলছ এই সব' চেঁচিয়ে উঠল  তন্দ্রা  চোখ দুটো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেছে

'একের পর এক হত্যাকাণ্ড করে গেছেন উনি' করুন মুখে বলে যাচ্ছে হীরা চেহারা থমথমেচোখে গ্লানি' এই জন্য আপনাকে কখনই স্টোর রুমে ঢুকতে দেয়নিভেতরে লাশ থাকতো'  

ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আতঙ্কে যেন  পাথর হয়ে গেল তন্দ্রা

' এইবার সব মিলে যাচ্ছে' ফিসফিস করে বলল সে' ছি, কী বোকা আমি'

'আজ দুপুরবেলা সোহরাব তালুকদার            এসেছিল মনে আছেসম্ভবত  সোহরাব তালুকদার            বুঝে গেছে আসল ব্যাপারটাতাই স্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন , উনি আত্নহত্যা করবেনআত্নহত্যা করে সব ঝামেলার বাইরে চলে যাবেন'

'আত্নহত্যা করবে অমিত  ?'

'হ্যাঁ , ম্যাডাম আমি নিজে দেখেছি, কালো রঙের একটা রিভলবার নিয়ে কিচেনে বসে বসে কাঁদছেন   রিভলবারটা দেখতে অনেকটা আপনার সেই রিভলবারের মত'

বুক ভরা বেদনা নিয়ে বলে যাচ্ছে হীরা

ঝট করে উঠে দাঁড়ালো  তন্দ্রা

 রিডিং টেবিলের উপর গোলাপি রঙের ওর ব্যাগটা এখন ও পরে আছেটান দিয়ে জিপার খুলে দেখল

নেই জিনিসটা

সর্বনাশ

আরও আগে বুঝার দরকার ছিলব্যাগটা নিয়ে হেঁটে বাসায় এসেছেওজনের তারতম্য বুঝার মত ঘিলু ও হারিয়ে ফেলেছে ?

'তুমি নিশ্চিত , ওর হাতে রিভলবার ছিল ?' উম্মাদিনীর মত দেখাচ্ছে তন্দ্রাকে

' ম্যাডাম নিজের চোখে দেখেছিশুধু তাই নাস্যার আমাকে বলেছেন পাপের বোঝা তিনি আর বইতে পারছেন না'

'সর্বনাশ এই কথা তুমি এতক্ষণে বললে ?' দুই হাতের মুঠো পাকিয়ে চিৎকার করে উঠলো তন্দ্রা ' আমাকে এখনই রেস্টুরেন্টে যেতে হবে'

'আমি আগে যাচ্ছি' বাঁধা দিল হীরা  ' আপনাকে দেখে গুলি করে বসতে পারেস্যারের মাথার কি আর ঠিক আছে ?আপনি বরং অফিসার সোহরাব তালুকদারকে ফোন দিনউনি যেন জলদি রেস্টুরেন্টে চলে আসেন '

 

'ঠিক আছে'মাথা ঝাঁকিয়ে  তন্দ্রা  দৌড়ে গেল টেলিফোনের দিকে

দরজা খুলে ঝড়ের বেগে বাইরে নামলো হীরা  ঠোঁটের কোনে বাঁকা চাঁদের মত এক ফালি নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠেছে

সব কিছুই হচ্ছে ওর পরিকল্পনা মত

আজকেই নাটক শেষ করবে

আট  

 

রেস্টুরেন্টের ভেতরে যতটা সম্ভব নিঃশব্দে ঢুকে পড়লো হীরা   পেতলের ঘণ্টার জন্য হালকা টুং টাং শব্দ হল অবশ্যকি আর করা ?

কোমর থেকে রিভলবারটা বের করে নিল সেপুরোপুরি তৈরি

রেস্টুরেন্টের ভেতরে অন্ধকারশুধু কিচেনের আলোটা জ্বলছেকিন্তু অমিতকে  দেখা যাচ্ছে না কোথাও

হ্যালো স্যারভেতরে আছেন না কি ? ' সতর্ক পায়ে সামনে এগুতে এগুতে গলা উঁচু করে বলল হীরা  

কেউ জবাব দিল না

বিপদের গন্ধ পেয়ে  আরও বেশি সতর্ক হয়ে গেল হীরা    সন্দেহ নেই, গড়বড় হয়েছে কিছু

অন্ধকারে নড়ে উঠল অমিত  হাতে পেল্লাই সাইজের লোহার ফ্রাই প্যানভীষণ ভারি , শক্ত

জায়গা মত লাগলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলত হীরা ভাগ্য ভাল ওর, আঘাতটা লাগল না

সতর্ক ছিলদ্রুত বাউলি কেটে সরে গেল

ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে এলো অমিত যেন রেস্টুরেন্টের মেঝে চুম্বন করবে

বাম হাতে রিভলবারটা ধরে ডান হাতের মুঠো পাকিয়ে ঘুষি মারল হীরা

অমিতের চোয়ালে যেন হাতুড়ির ঘা দিল কোন  কামারব্যাথায় ককিয়ে উঠলো  টল মল করে নিজেকে সামলে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো হীরার উপর

মাথা দিয়ে মোষের মত আঘাত করে বসলো হীরার রাবারের মত শক্ত পেটে ছিটকে গিয়ে মেঝেতে পড়লো হীরা   চোখে মুখে অন্ধকার দেখছে দুর্দান্ত এই ছোকরাটা বড় করে একটা দম নিয়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো হীরা এত কিছুর মধ্যেও রিভলবার ছাড়েনি হাত থেকে

মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে ওরাকিচেনের ভেতরেমাত্র কয়েক হাত দূরত্ব দুইজনের মধ্যে

তীব্র ঘৃণা ভরা চোখে একে অপরকে দেখছে

বুনো শূয়রের মত দম ফেলছে দুজনেই রিভলবারটা সোজা অমিতের কপাল বরাবর ধরে রেখেছে হীরা

'বাহাদুরি দেখানোর দরকার দেখি না' চিবিয়ে চিবিয়ে বলল হীরা ' তুমি শেষগুলি করে মেরে হাতে রিভলবার ধরিয়ে দেবসবাই জানবে আত্নহত্যা করেছ তুমিব্যস , সব রাস্তা ক্লিয়ার আমার জন্য অফিসার  সোহরাব তালুকদার           এসে দেখবে স্টোর রুম ভর্তি মানুষের মাংসদুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে সবাই বুঝে নেবে আত্নহত্যার মোটিভ কি '

চুপ করে রইল অমিত  কি বলবে ?  বলার মত কিছু নেই আসলে

টুংটাং শব্দ হল, ঘণ্টার

হুড় মুড় করে রেস্টুরেন্টের মধ্যে ঢুকে পড়লো তন্দ্রা

শালি আরও একটু দেরিতে এলে ভাল হতমনে মনে খিস্তি আউরে গেল হীরা

'আসুন ম্যাডাম , আসুন' বিদ্রুপ ঝরে পড়লো হীরার গলা দিয়ে

ঠাণ্ডা চোখে পুরো পরিবেশটা জরিপ করলো  তন্দ্রা

সোজা ঢুকে পড়লো কিচেনের ভেতরেহাত বাড়িয়ে তুলে নিল মাংস কাটার সবচেয়ে বড় চাপাতিটাপা বাড়াল হীরার দিকে

'আচ্ছা তাহলে এই ঘটনা ?' শয়তানের মত হাসল হীরা

রিভলবারটা অমিতের উপর থেকে সরিয়ে তাক করলো তন্দ্রার মাথার দিকেট্রিগার চেপে দিলখারাপ লাগছেমাগিটাকে খুন করতে চায়নিওকে দরকার ছিলকিন্তু কি আর করানিয়তি

খটাশ করে রিভবারের হ্যামার পড়লো শূন্য চেম্বারে

অবাক না হয়ে পারল না হীরা

আবার দ্রুত ট্রিগার চেপে দিল এবারও খটাশ করে শূন্য চেম্বারে আঘাত করলো হ্যামার

ততক্ষণে  পিছন থেকে ওকে জাপটে ধরে ফেলেছে অমিত  

হাত থেকে রিভলবারটা খসে নাচতে নাচতে চলে গেল ফ্রিজের তলায়

 

বজ্র আঁটুনি বলতে একটা শব্দ আছেঠিক সেইভাবেই হীরাকে ধরেছে অমিত এক চুলও নড়তে চড়তে পারছে না  ফচকে শয়তানটা

ধারালো চাপাতি হাতে সামনে চলে এলো তন্দ্রা

'তুমি বলেছিলে অমিত  আত্নহত্যা করতে যাচ্ছে তাই না ?' শান্ত গলায় প্রশ্ন করলো  তন্দ্রা

'ইয়েস ম্যাডাম' চেঁচিয়ে জবাব দিল  হীরা  ' স্যার নিজের মুখে আমাকে বলেছেন'

'তাই নাকি ?' হাসল তন্দ্রা ' আমার রিভলবারে কখনই গুলি ভরা থাকে না '

কখনই না?' বোকার মত বলল হীরা  ঘামছে দরদর করেআফসোস করছে , কেন ভুলে একবারও চেক করেনি বিভলবারটা ।   

'আজ্ঞে হ্যাঁ' এই প্রথম কথা বলল অমিত ' আমিই ওকে বারণ করেছিজিনিসটা জাস্ট একটা খেলনার মত বহন করে তন্দ্রা  জাস্ট ফর শো '

ঢোক গিলল হীরা

এখন এই বিচ্ছুটাকে কি করা যায় ?' বউয়ের দিকে ফিরে জানতে চাইল অমিত

'ব্যবস্থা তো একটা করতেই হবে' হিস হিস করে বলল তন্দ্রা  ' বেজন্মাটা বড্ড বেশি কথা বলে, একেবারে বাচাল'

'হ্যাঁ তাই করমাংসের দরকার তো আমাদেরতাই না ?'

চাপাতিটা উঁচু করে ধরল তন্দ্রা কোপ বসাবে হীরার  গলায়

টুংটাং শব্দ হল

আবার ?

পেতলের সেই ঘণ্টাদরজা খুলে গেলভারি বুটের শব্দ খট খট  

ভেতরে ঢুকল পুলিশ অফিসার   সোহরাব তালুকদার          

'স্যারবাঁচান আমাকে' হাউ মাউ করে উঠলো হীরা

ধরে প্রাণ ফিরে এসেছে ওর

পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইল সোহরাব তালুকদার       কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না যেন

'স্যার , এরা আমাকে মেরে ফেলবে' হাপুস নয়নে  কেঁদেই যাচ্ছে হীরা ' আপনি জানেন না এরা কত খারাপ তোফাজ্জেল   মাংসওয়ালাকে খুন করেছে এরাআর ...আর দোকানের যে স্টেক প্রত্যেকদিন খান সব মানুষের মাংস স্যারআমি চাকরি হারানোর ভয়ে চুপ ছিলাম এত দিনআজ ওরা আমাকে খুন করে পথের কাটা দূর করে ফেলবেকারণ আমি ওদের সব অপকর্মের নীরব সাক্ষী স্যারস্টোর রুমে এখনও খানিক মাংস পাবেনময়লার বিনে কিছু হাড্ডি গুড্ডি থাকলেও  থাকতেও পারে স্যারবাঁচান আমাকে'

শেষের দিকে হীরার গলা ধরে গেল

কট মট চোখে স্বামী স্ত্রী কে দেখল   সোহরাব তালুকদার           যেন গিলে ফেলবে

এগিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়লো কাউনটারেরোজ এই জায়গায় বসেই খাওয়া দাওয়া করে সোহরাব তালুকদার          

'হুম' চিন্তিত সুরে বলল সোহরাব তালুকদার       'দারুণ একটা সময়ে এসে পড়ছিকী করব এখন ? হুম ,আগেই সন্দেহ হয়েছিল আমার'

'কী করবেন মানে ?' খেঁকিয়ে উঠল হীরা  ' এরেস্ট করুন দুই খুনিকে এরা নরকের কীট  '

'করব , করব ' আশ্বাস দিলেন অফিসার।  চেহারায় চিন্তার ছাপ

' কিন্তু...' চিন্তিত সুরে বলল সোহরাব তালুকদার            ' সামনের মাসে আমি অবসর নিচ্ছিতাও একদম খালি হাতেএই সময় যদি এই রেস্টুরেন্টের অর্ধেক মালিকানা পাই তাহলে কেমন হয় ? বুড়ো বয়সে বয়সটা একটু ঘিয়ে মাখনে  আরাম আয়েশ করে পার করতে পারতাম তাহলে  আর বেশ কিছু টাকা পয়সা আসতো মাসে মাসেকী বল তোমরা ?'

'আমার কোন আপত্তি নেই' হাসল অমিত

'নিশ্চয়ই , খুব খুশি হব আমরা  তালুকদার     সাহেব   ' সায় দিল এমা

আর ও  একটা সমস্যা আছে' লজ্জিত ভাবে বলল সোহরাব তালুকদার          লজ্জায় যেন মারা যাবে এমন একটা ভাব চেহারায় ' আমার স্বাদ রুচি বদলে গেছেআজকাল অন্য কোন খাবারে কোন স্বাদই পাই নামনে হয়ে শেয়ালের গু খাচ্ছিশুধু ইয়ে... এই স্পেশাল মাংসটাই ভাল লাগে'

এই প্রথম হাসল   সোহরাব তালুকদার           

ওদের দিকে ফিরে বলল , ' ইয়ে মানে গ্রিল গরম আছে তো ?'

'হ্যাঁ , এখনও গরম ' জবাব দিল অমিত 'বন্ধ করা হয়নি আজ'

'তো এই বাচালের গালের মাংসটা খানিক ঝলসে দাওবেশ নরম হবে মনে হয়বেশি করে গোল মরিচ


আর পাপরিকা সস দিও'

'ওকে  তালুকদার     সাহেব    '

ওরা দুজনে মিলে হীরার  গাল চেপে ধরল গরম গ্রিলের উপর

চট চট শব্দ করে গালের চর্বি পুড়তে লাগলসেই সাথে মাংস পোড়ার চনমনে একটা ঘ্রান ছড়িয়ে পড়লো বন্ধ দোকানের ভেতরে  

ব্যাথা আর যন্ত্রণায় পাগলের মত চেঁচাতে লাগল হীরা

সোহরাব তালুকদার            উঠে গিয়ে রেস্টুরেন্টের দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিলফেলে দিল জানলার সব পর্দা বাইরে জ্বলে থাকা দোকানের নাইস অ্যান্ড জুসি স্টেক হাউজ’  নিয়ন সাইনটা অফ করে দিল পরম মমতায়

 

William M. Gaines এর  গল্প  অবলম্বনে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...