এক
ক্রিসমাসের রাত ।
বাইরে শীত।
ঝুরঝুর করে বরফ পড়ে একদম সাদা হয়ে গেছে চারিদিক ।
শহর ছেড়ে অনেক, অনেক খানি দূরে ফাঁকা বিচ্ছিন্ন একটা জায়গা। এখানের বাড়িঘরগুলো সব বিচ্ছিন্ন ।একটা থেকে আরেকটা বেশ দূরে দূরে ।
কাছাকাছি প্রতিবেশী নেই । কোন বসতি নেই।
চারদিকে শুধু বরফের স্তূপ ।
এলাকায় ছোট খাট কিছু ঝোপ ঝাড় আছে। সেগুলো এখন বরফের নীচে চাপা পরে গেছে। টানা এক সপ্তাহ ধরে তুষার ঝরছে। তারপরও বিরাম নেই। বরফ পড়ছেই।
দোতলা বাড়ির ছাদটা টালির। লাল টুকটুকে। এখন বরফের নীচে । ওখান থেকে মাঝে মাঝেই হুড় মুড় করে বরফের স্তূপ খসে পড়ছে নীচে। আকসার অমন হয়। যখন বরফগুলো আর নিজেদের ওজন ধরে রাখতে পারে না তখনই অমন কাণ্ড করে।
বাড়ির চারিদিকটা ঘিরে রেখেছে এক মানুষ সমান উঁচু দেয়াল। ইটের।
সেগুলোর উপর বরফ জমে অমন অবস্থা হয়েছে দেখে মনে হয় চারটে লম্বা পেল্লাই সাইজের আইসক্রিম দিয়ে বাড়ির চারিদিকটা ঘিরে রেখেছে কোন এক অচিন জাদুকর ।সবচেয়ে সুন্দর দেখাচ্ছে উঠানটা। লণ্ড্রী থেকে বের করা সাদা ধপধপে চাদর যেন একটা ।
অনেক দূর থেকেও দেখা যাবে- বাড়ির ভেতরের সবচেয়ে বড় কামরাটা । কমলা লেবুর খোসার রঙের মত মায়াবী আলো জ্বলছে । নরম । আদুরে ।
সাথে দেখা যাচ্ছে , আরও হরেক রঙের আলোর জোনাকি। এটা আসলে ড্রয়িং রুম ।
এক কোনে মস্ত বড় একটা ক্রিসমাস ট্রি । ক্রিসমাস ট্রি-তে জড়ানো হয়েছে লাল, হলুদ, নীল , সবুজ , বেগুনী কাচের ক্ষুদে ক্ষুদে বাল্ব। জ্বলছে নিভছে । হরেক ছন্দে।
দানব সাইজের সোফা সেট সাজানো। গম্ভীর চেহারার একজন মোটা মত মানুষ বসে আছে সোফায় । হাতে ব্রানডির বেলুন গ্লাস। ভেতরে লিচুর দানার রঙের তরল । আগুনের মত ব্রাণ্ডি ।
অনেক সময় নিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে ব্র্যান্ডিটুকু পান করছে লোকটা।
চেহারায় আবেশ আর আলস্য ।
সামনে একটা টেবিল।
টেবিলে, চীনামাটির একটা তশতরীতে আপেল পাইয়ের বড় একটা চিলতে । কয়েকটা ঘন লাল ত্রিভুজ আকৃতি স্ট্রবেরি । আরও আছে প্রচুর চকোলেটের কুঁচি দেয়া কুকি পাই। সন্দেহ নেই , ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে বানানো হয়েছে ।
বুঝাই যাচ্ছে, লোভনীয় একটা ক্রিসমাস ডিনার শেষে সামান্য মিষ্টি মুখ করে বড়দিনটা উপভোগ করছে লোকটা ।
সন্দেহ নেই, লোকজনের মনে ঈর্ষা জাগায় অমন জীবন যাপন করছে লোকটা ।
পাশে একটা ঠাকুর মায়ের আমলের টেবিল। কী কাঠের কে বলবে ? কালো কুচকুচে রং। ওখানে একটা রেডিও বসে আছে। রেডিও থেকে ভেসে আসছে একটার পর একটা ক্রিসমাসের জনপ্রিয় গানগুলো। তারমধ্যে জিঙ্গেল বেল জিঙ্গেল বেল... গানটা প্রতি পাঁচটা গানের পর আবার রিপিট করছে রেডিয়োর লোকজন ।
কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।
এই গানটা ছাড়া আবার ক্রিসমাস হয় না কি ?
সামনে একটা ফায়ারপ্লেস ।
বেশ খরচ করে বানানো হয়েছে ।
চারকোণা ছোট ছোট পাথরের এবড়ো থেবড়ো ব্লক দিয়ে সুন্দর করে বানানো ফায়ারপ্লেসটা । ভেতরে কমলা- হলুদ- লাল - গোলাপি রঙের আগুনের শিখা নাচানাচি করছে রাসায়নিক ছন্দে। ড্রাগনের জিভ । হলুদ কাঠের গুড়ি পুড়ছে। মাঝে মাঝে কাঠ ফুটছে পট পট হালকা শব্দ করে ।
জলদস্যুদের লাল চোখের মত জলন্ত কয়লা থেকে উত্তাপ বের হয়ে কামরার পরিবেশটা আরামদায়ক করে তুলেছে ।
সুন্দর উপভোগ্য একটা পরিবেশ।
উষ্ণ আরামদায়ক কামরা।
সাজানো ক্রিসমাস ট্রি ।
লোভনীয় খাবার ।
আর কী চাই এই ক্রিসমাসে ?
তারপরও লোকটা খুঁতখুঁতে। মনে হল , ফায়ারপ্লেসের উত্তাপটা কম। ঠিক জমছে না। আরেকটু চনমনে হলে ভাল হত ।
'জুলি , ফায়ারপ্লেসের কয়লাগুলো একটু নেড়ে চেড়ে দাও তো ।'
হঠাৎ করেই বলে উঠলো লোকটা । গলার সুরেই বোঝা যায় আমুদে মেজাজের মানুষ। জীবনকে ভালবাসে । উপভোগ করতে চায় জীবনের প্রতি পল । প্রতি ক্ষণ । মুহূর্ত ।
ফ্রিজের ডালা খুলে কী যেন বের করছিল জুলি। থেমে ওখান থেকে সোজা চলে এলো ফায়ারপ্লেসের সামনে।
জুলিয়ানের বয়স ত্রিশের মত। এক মাথা সোনালী চুলে বেশ সুন্দরীই লাগে। চোখ দুটো নীল। ঘন নীল । ঠোঁট পাতলা । চেহারার মধ্যে অচেনা এক মায়া আছে। যে কেউ দেখলেই পছন্দ করে ফেলবে ওকে। বয়সের তুলনায় চলাফেরার গতি দ্রুত। চপলা কিশোরীর মত ।
উলের বানানো টাইট একটা পুলওভার গায়ে চাপিয়েছে ক্রিসমাস উপলক্ষে। টকটকে লাল রঙের পুলওভারে, ফায়ারপ্লেসের ভেতরের একটা জ্বলন্ত কয়লার মত লাগছিল জুলিকে ।
'দিচ্ছি ।' হাসি মুখে বলল জুলি ।
ফায়ারপ্লেসের এক পাশেই লোহার একটা আলনা । ছোট্ট । ওখানে ঠেস দিয়ে রাখা নানান সাইজের লোহা আর পিতলের কতগুলো ডাণ্ডা। ক্ষুদে একটা ঝাড়ু , যেটা দিয়ে ফায়ারপ্লেসের ছাই কাচানো হয়। কুড়ানো , কাঁচানো ছাই সংগ্রহের জন্য একটা ট্রে । আরও আছে একটা চিমটে।যেটা দিয়ে জ্বলন্ত কাঠ বা কয়লার টুকরো ধরা হয় নড়াচড়ার উদ্দেশ্যে ।
এত কিছুর মধ্যে আরও আছে লম্বা সাইজের লোহার একটা শিক। পোকার (poker) বলে। ওটা দিয়ে ফায়ারপ্লেসের ভেতরের আগুন উস্কে দেয়া হয়। পোকারটা লম্বা আর সূচালো । আগায় হাঙরের পিঠের ফিনের মত লোহার বাড়তি সামান্য অংশ আছে।
জিনিসটা তুলে নিল জুলি।
আগুনটা উস্কে তুলে না দিয়ে, খামখাই জিনিসটা নিয়ে চলে এলো লোকটার পিছনে।
'আরে পোকার নিয়ে কোথায় যাচ্ছ ?' অভিযোগের সুরে বলল লোকটা। ' বললাম না কয়লাগুলো খানিক নেড়ে চেড়ে দাও ।'
'আরেহ , তাইতো ।' লজ্জিত গলায় বলল জুলি ।
তারপর কি মনে করে দুই হাত উঁচু করে শক্ত করে তুলে ধরল পোকারটা।
শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে লোহার শক্ত জিনিসটা নামিয়ে আনল লোকটার মাথার চাঁদি বরাবর ।
অনেক আগে গলফ টলফ খেলত জুলি । কাজেই, আঘাতটা বেশ জুত মতই হল । বিশেষ করে হাঙরের ফিনের মত ধারালো অংশটা বেশ চমৎকার ভাবে গেঁথে গেল লোকটার চাঁদিতে। রক্ত বের হয়ে এলো গলগল করে ।
ভাল মানুষটা মরলও বেশ ভাল ভাবেই।
কোন রকম ট্যাঁ ফো করলো না। ভণ্ড সাধুদের সামনে প্রণাম করার মত ভঙ্গিতে মাথাটা নিচের দিকে নেমে এলো । ঠকাস করে ঠুকে গেল টেবিলের উপর।
ভাগ্যিস আপেল পাইয়ের তশতরীটা দূরে ছিল। নইলে সুন্দর জিনিসটা বরবাদ হয়ে যেত। আজকাল অমন জিনিস পাওয়া যায় না।
' মেরি ক্রিসমাস মার্টিন ।' হাসি হাসি মুখে বলল জুলি। ' অ্যান্ড হ্যাপি নিউ ইয়ার।'
সঙ্গত কারনেই মার্টিন নামের লোকটা , খানিক আগেও খাওয়াদাওয়া করছিল , জবাব দিল না।
উপায় নেই।
পোকারের হাতল ধরে টান দিতেই টেবিলের উপর থেকে খানিক মাথা তুলল মার্টিন নামের লোকটা । সোফায় হেলান দিয়ে বসে রইল। চোখের দৃষ্টি শূন্য । মুখটা খানিক হাঁ হয়ে আছে। মারা গেছে কবে।
টান দিয়ে পোকারটা বের করে আনতে চাইলো জুলি। খুলির হাড় কেটে ভেতরে ঢুকে গেছে ওটার শক্ত ধারালো অংশ। যেটা কি না দেখতে হাঙরের ফিনের মত। গায়ের জোরে টান দিতেই আচমকা খুলে চলে এলো এবার। এতই হঠাৎ , তাল সামলাতে না পেরে চিৎ হয়ে পরে যেতে যেতে সামলে নিল জুলি।
হাতের পোকারটা গিয়ে ঠং করে আঘাত করলো শোকেসের উপর সাজিয়ে রাখা ধাতব একটা প্লেটের উপর। জিনিসটা সুভেনিয়র।
দোতলার সিঁড়ি বেয়ে ধুপধাপ করে নেমে এলো ফুটফুটে একটা পিচ্চি মেয়ে। বয়স ছয় হবে। ঘুমানোর ঢোলা পোশাক গায়ে। মাথা ভর্তি সোনালী চুল। হাতে একটা মেয়ে পুতুল ।ওটার হাত ধরে রেখেছে পুঁচকে মেয়েটা। পুতুলের বাকি শরীরটা ঝুলছে নীচে ।
' মা, সান্তাক্লজ এসেছে ? উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে মেয়েটার চোখ মুখ ।
চট করে পোকারটা নিজের শরীরে পিছনে নিয়ে গেল জুলি।
' না তো মা।' মাথা নাড়লো সে । ‘ সান্তাক্লজ তো আসেনি।'
' আমি যেন কেমন একটা শব্দ শুনলাম ।' হতাশ গলায় বলল পিচ্চি মেয়েটা । ' মনে হল সান্তাক্লজ হয়তো চলে এসেছে।'
' না সোনা , সান্তা আসেনি ।' দ্রুত মেয়ের সামনে চলে গেল জুলি। ' তুমি উপরে চলো । নিচে এসেছ কেন ? এখানে অনেক ঠান্ডা তো ! ঘুমোওনি এখনও ?'
' না, মা । জেগে ছিলাম , তুমি না বললে মাঝরাতে সান্তাক্লজ আসবে । উনার হাতে কাপড়ে বড় এক ব্যাগ ভর্তি গিফট থাকে। যেসব বাচ্চারা ভালো তাদের সবাইকে গিফট দেয় সান্তা। তাইতো আমি জেগে আছি । '
' তোমার জেগে থাকতে হবে না। ' তাড়াতাড়ি মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল জুলি । ' চলো, ঘুমাতে চলো । সান্তা এলে আমিই তোমাকে ডেকে দেবো।'
' সত্যি ?' মায়ের উপর পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছে না পিচ্চি।
পাছে ভুল করে মা যদি ডেকে না দেয়, তাহলে উপহারগুলো পাওয়ার আর কোন সম্ভাবনা থাকছে না । অনেক বড় রকমের ঝুঁকি হয়ে যায় সেটা ।
' সত্যি! সত্যি ! সত্যি!' হেসে ফেললো জুলি ।
' ঠিক আছে , গুড নাইট ড্যাডি । মা , ড্যাডি আমার গুড নাইটের জবাব দিল না কেন ?'
' তোমার ড্যাডি রেডিওতে গান শুনছে। পুরনো দিনের গান।'
সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে আবারো বাচ্চা মেয়েটা, বাবাকে দেখার চেষ্টা করল । সোফায় বসে থাকা মাথাটা অল্প অল্প নড়ছে । আসলে ভারসাম্য হারাচ্ছে ধীরে ধীরে ।
' মা , ড্যাডি কী মাতাল ?' চাপা সুরে জানতে চাইল পিচ্চি। মার্বেলের মতো নীল চোখ দুটো দুষ্টুমিতে ঝিকিমিকি করছে।
হাসল জুলি ।
এতক্ষণে ওরা চলে এসেছে দোতলায় । পোকারটা পিচ্চির অলক্ষ্যে বাইরে ঠেস দিয়ে রেখে দিলো জুলি।
ওদের একমাত্র মেয়ে এই পিচ্চিটা।
টাকার অভাব নেই । কাজেই সুন্দর করে সাজানো হয়েছে ওর কামরাটা। টাকা খরচ করতে কোন রকম কার্পণ্য করেনি। বিছানাটা এত বড় , পূর্ণবয়স্ক ছয় জন মানুষ ঘুমাতে পারবে। উপরে গোলাপি দামি বেড কভার । আরামদায়ক সুন্দর কম্বল।
পুরো কামরা ভর্তি হরেক পদের খেলনা ,পুতুল, রেলগাড়ি, অ্যাবাকাস , রুবিজ কিউব।
যত্ন করি মেয়েকে বিছানায় তুলে দিলো জুলি।
কম্বলটা জড়িয়ে দিয়ে আদর মাখা গলায় বলল , ‘ লুনা মা , তুমি ঘুমাও। নিচে আসবে না কিন্তু । কোনরকম শব্দ পেলেও নিচে আসবে না। কারণ সান্তাক্লজ তো সিঁড়ি দিয়ে আসবে না। সান্তা আসবে বাড়ির ছাদের চিমনি দিয়ে। ছাদের উপরের হরিণের স্লেজ গাড়িটা থেমে থাকে তো , তাই। ঠিক আছে মা ?'
মাথা ঝাঁকাল পিচ্চি লুনা।
আশায় মন ভরে গেল। যাক, সান্তাক্লজ আসলে সে আগে ভাগেই টের পাবে ।
‘ আমি নিচে নেমে যাচ্ছি মা।' টুক করে লুনার কপালে চুমু খেয়ে উঠে দাঁড়ালো জুলি । ' জেগে থাকতে হবে না। ঠিক আছে? গুডনাইট মামনি।’
' গুড নাইট,মা । ' বালিশ কম্বল ইত্যাদি ভিড়ে হারিয়ে গেছে লুনা । ছোট্ট মুখটা বের হয়ে আছে শুধু । দরজা ভেজিয়ে দিয়ে চলে এলো জুলি ।
লুনার কামরা পুরোপুরি অন্ধকার করল না ।
বেড সাইট ল্যাম্পটা রইল ।
দুই
মার্টিনের লাশটা সোজা করে বসালো জুলি।
ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে টেবিলের উপর জমে থাকা রক্ত পরিষ্কার করল। ছোট্ট একটা পলিথিনের ব্যাগে এনে মার্টিনের মাথাটা মুড়ে দিল টুপি পড়ানোর মতো করে। গলার কাছে গিঁট দিতেই স্বস্তি বোধ করলো।
নাহ, রক্ত গড়িয়ে পড়বে না টুপটাপ করে।
লাশটার পাশেই আরাম করে বসলো জুলি। হাতে ব্রাণ্ডির বেলুন গ্লাস। ভেতরে লিচুর দানার রঙের তরল। এক ঢোক গিলে ফিসফিস করে আপন মনেই বলল , ' আমি, ক্রিসমাসের উপহার পেয়ে গেছি।'
গ্লাসের ব্যান্ডি সব টুকু শেষ করে টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো ।
টেলিফোন তুলে ডায়াল করলো মুখস্ত একটা নাম্বারে।
মাত্র দুইবার রিঙ হবার পর ওপাশ থেকে ভেসে এলো যান্ত্রিক রেকর্ড করা কণ্ঠস্বর ,' হ্যালো , আমি পিটার বলছি । এই মুহূর্তে বাড়ি নেই। ক্রিসমাসের ছুটিতে একটু, শহরের বাইরে গেছি। দয়া করে আপনার নাম, ফোন নাম্বার আর মেসেজ বলে যান । আমি ফিরে আসা মাত্রই যোগাযোগ করব। ধন্যবাদ। মেরি ক্রিসমাস ।'
রেকর্ড করা মেসেজ শেষ হওয়া মাত্র টুক টুক করে শব্দ হল।
দুই বার।
'হ্যালো পিটার ।' আদর মাখা গলায় বলল জুলি । ' যত জলদি পার যোগাযোগ করবে। কেক বানানো শেষ করেছি সুন্দর ভাবে। আবারও বলছি কেক বানানো শেষ করেছি সুন্দর ভাবে। বেকিঙ্গে কোন রকম সমস্যা হয়নি। ক্যারামেল আর বাদামী চিনি মাপ মত দিয়েছি।'
ফোন রেখে দিল জুলি।
পিটার মাত্রারিক্ত বুদ্ধিমান ছেলে। বেশি কথা বলার দরকার নেই।বুঝে নেবে সব কিছু।
পিটারের কথা মনে হতেই অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল জুলির সারা শরীরে।
অহ পিটার ! এই ক্রিসমাসের রাতে খুবই মিস করছি তোমাকে। কোথায় তুমি এখন ? সামনের ক্রিসমাসে দুইজন এক সাথে থাকব। লুনা নতুন বাবা পাবে।
বইয়ের দোকানে পরিচয় হয়েছিল পিটারের সাথে। প্রথম দেখাতেই ছেলেটাকে বেশ পছন্দ হয়ে গিয়েছিল ওর। এক হারা লম্বা শরীর। এক মাথা এলো মেলো চুল। স্বপ্নিল দুই চোখ। বগল ভর্তি বই। পিটার যেন সাক্ষাৎ পিটারপ্যান হয়ে এসেছিল জুলির জীবনে।
আরও কয়েকবার দেখা হয়েছিল দুজনের। ঘন ঘন।
ঘটনাটা যে রোমান্সে গড়াচ্ছে , দুইজনেই সেটা বুঝতে পেরেছিল। আপত্তি নেই কারও। নিজের বিবাহিত জীবনটা জেলখানার মত মনে হত জুলির। মারটিনের সাথে কখনই সুখী ছিল না সে। টাকার জন্য বিয়ে করেছে মারটিনকে। একেবারে নিরামিষ মানুষ। কোন বৈচিত্র্য নেই। হাঁপিয়ে উঠছিল জুলি।
পিটারের সাথে পরিচয়ের সাথে সাথেই মনে হল, এই- ই সে। যাকে খুঁজছিল জন্ম জন্মান্তর ধরে।হাজার কোটি বছর পর ভাগ্যগুণে দেখা হয়ে গেছে।
সমস্যা হল, ভালবাসার মানুষটাকে পাবার জন্য ঝুঁকি নিতে রাজি না পিটার। মোটেই না। অত্যন্ত ভীরু আর দুর্বল চরিত্রের ছেলে । অথচ গল্প উপন্যাসে পড়েছে জুলি, এই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রেমিক পুরুষটা সব ধরনের ঝুঁকি নিতে রাজি থাকে।
বাধ্য হয়ে জুলি নিজেই প্ল্যান বানিয়ে ফেলে।
এবং আজকের রাতের খানিক আগের ঘটনা যা দেখলেন , সেই প্ল্যানের ফলাফল।
ব্রাণ্ডির শূন্য বেলুন গ্লাসটা সিঙ্কের মধ্যে রেখে মারটিনের লাশের সামনে এসে দাঁড়ালো জুলি।
রেডিওটা তখনও বেজেই যাচ্ছে।
আই উইশ ইউ মেরি ক্রিসমাস অ্যান্ড হ্যাপি নিউ ইয়ার, গানটা বাজছে এখন।
ধাক্কা দিয়ে লাশটা সোফা থেকে মেঝেতে ফেলল জুলি। এই আন্দিজ পর্বত কাঁধে করে বাইরে নেয়া যাবে না। পা ধরে টেনে হিঁচড়ে নিতে হবে।
সময় লাগবে। তাতে কী ?
সময়ের কোন অভাব নেই।
মারটিনের দুই পায়ের গোড়ালি ধরে টানতে শুরু করলো জুলি। সদর দরজা পর্যন্ত নিয়ে থামল । দরজার পাশে হুকে ঝুলানো ফারের জ্যাকেটটা তুলে গায়ে চাপাল ।
নব মোচড় দিয়ে দরজা খুলতেই শোঁ - শোঁ শব্দ করে বরফের মত ঠাণ্ডা হিমেল হাওয়া ঢুকে পড়লো এক ঝলক । সাথে মিহি তুষার কণা।
ঠাণ্ডায় কেঁপে উঠলো জুলি।
উঠানটা পুরো সাদা হয়ে ফুলস্কেপ একটা হোয়াইট প্রিন্ট কাগজের টুকরোর মত লাগছে।
উঠানের শেষ মাথায় একটা কুয়া। পাথরের টুকরো সুন্দর করে সাজিয়ে কুয়ার দেয়ালটা বানানো হয়েছিল । উপরে টিনের ছাদ । বরফ জমে সব সাদা ধপধপে।
সদর দরজায় পাল্লায় এক টুকরো কাঠ গুঁজে দিল জুলি। যাতে জোর হাওয়ায় বন্ধ হয়ে না যায়। তারপর আবার মারটিনের পা দুটো ধরে টানতে লাগল।
'কতবার? অ্যাঁ ? কতবার বলেছি একটু ওজন কমাও। একটু ডায়েট কর।' দাঁতে মুখ চেপে খিস্তি দিতে লাগল জুলি। ' বলতে বলতে আমি ক্লান্ত। কুঁড়ের বাদশা কোথাকার । এখন শেষ পর্যন্ত আমাকে এই পাহাড় টানতে হচ্ছে।'
মারটিনের লাশ সিঁড়িতে ঠোক্কর খেতে খেতে উঠানে নামলো ।
দরজা খোলা। কামরার ভেতরে হিম বাতাস ঢুকছে।
তুষার কণা , পাউডারের মত নেমে আসছে কার্পেটের উপর। ফায়ারপ্লসের শিখার কাঁপুনি বেড়ে গেছে খোলা হাওয়া পেয়ে। রেডিওটা বেজে যাচ্ছে আগের মতই। কী একটা একঘেয়ে আধুনিক গান বাজছিল। হঠাৎ থেমে গেল।
তারপরই ভরাট গলায় ঘোষক বলতে লাগল , ' একটি জরুরি ঘোষণা । লাসকো মানসিক হাসপাতালের কড়া পাহারা থেকে একজন অসুস্থ রোগী পালিয়ে গেছে। সে একজন সিরিয়াল কিলার। ছোট বাচ্চা আর মহিলা খুন করতে ভালবাসে। অতীতে এগারো থেকে পনেরটা খুনের অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। আদালতে প্রমাণ হয়েছিল সে মানসিক ভারসাম্যহীন । চিকিৎসার জন্য লাসকো মানসিক হাসপাতালে রাখা হয়েছিল তাকে। আজ সন্ধ্যায় ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে হাসপাতালে পার্টি চলছিল । আর সেই ফাঁকে কিভাবে যেন প্রহরীদের ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছে এই বিকারগ্রস্থ খুনিটা।
‘ লোকটা বিশাল দেহের অধিকারী। লম্বায় ছয় ফুট। বাদামী চামড়া। পালিয়ে যাবার সময় তার পরনের ছিল সান্তাক্লজের পোশাক । আমরা সবাইকে অনুরোধ করব , দয়া করে কেউ বাড়ির বাইরে বের হবেন না। দরজা জানালা ভাল করে বন্ধ করে ভেতরেই থাকবেন। কোন রকম নিরাপত্তার অভাব বোধ করলেই ইমারজেন্সিতে ফোন দিয়ে পুলিশের সাহায়্য নেবেন। আমাদের পুলিশের বেশ কয়েকটা দল অনুসন্ধানে নেমে গেছে। দয়া করে উত্তেজিত হবেন না। ঘোষণাটি শেষ হল। ধন্যবাদ।'
জুলি এই ঘোষণার এক বিন্দুও শুনতে পেল না।
তিন
ততক্ষণে উঠানের প্রায় শেষ প্রান্তে চলে গেছে বেচারি। হাঁপাচ্ছে জোরে জোরে। মুখ আর নাক দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে গলগল করে।
কী ঠাণ্ডা !
কুয়ার সামনে এসে থামল জুলি ।
লোহার ঢাকনা তুলে কুয়ার তলার দিকে চাইলো। অন্ধকার।
ভেতরের জল জমে আছে । উপরের স্তর কাচের গ্লাসের মত । মারটিনের লাশটা ফেলে দিলে ভারি শরীরটা উপরের পাতলা কাচের মত স্তরটা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে যাবে। মাত্র কয়েক মিনিট পরেই আবার উপরের স্তরে বরফ জমে সমান হয়ে যাবে।
আর তলায় অবিকৃত অবস্থায় জমে থাকবে মারটিন। মেরুর মাছের মত। তারপর যখন শীত শেষে বসন্ত আসবে তখন কুয়ার অতল তলায় হারিয়ে যাবে মারটিনের লাশ।
সারা দুনিয়ায় মারটিনকে খোঁজা হবে কিন্তু কেউ জানবে না, বেচারা শুয়ে আছে নিজের বাড়ির কুয়ার তলায় ।
‘ দেখলে মারটিন ।' হাসি মুখে বলল জুলি। ' তোমার জন্য ফ্রোজেন ব্যবস্থা করে রেখেছি। এখানে শুয়ে আমাদের সঙ্গ উপভোগ করবে কমপক্ষে আরও দুইমাস ।'
এবার লাশটা তুলে ফেলে দিতে হবে।
বাড়ির বসার কামরা থেকে এই পর্যন্ত এক ফোঁটা রক্তও পড়েনি । বুদ্ধি করে মারটিনের মাথাটা পলিথিনের ব্যাগ দিয়ে মুড়ে দিয়েছিল বলেই। মনে মনে নিজের বুদ্ধির তারিফ না কর পারল না জুলি।
উঠানের বরফের উপর টানা লম্বা একটা দাগ পড়েছে বটে। তবে আর কিছুক্ষণ বরফ ঝড়লেই সব ঠিক হয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে সব নিশানা ।
একদম ফুল প্রুফ প্ল্যান।
এখন খামখাই এই শীতের মধ্যে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানে হয় না।
ঝটপট কাজ শেষ করে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেই ভাল হয়। আরও খানিকটা ব্রাণ্ডি গিলে পেল্লাই সাইজের এক টুকরো আপেল পাই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে হবে।
কষ্ট করে মারটিনের লাশটা কাঁধে তুলে, কুয়ার ভেতরে ফেলে দিলেই কাজ শেষ ।
হাত বাড়াল জুলি।
সাথে সাথেই, ওকে চমকে দিয়ে আতঙ্কের শেষ মাথায় নিয়ে গেল পরের ঘটনা।
খপ করে জুলির হাতটা ধরে ফেলল মারটিন । শক্ত মুঠোতে চাপ দিয়ে যেন পিষে ফেলবে ওর হাতের কবজি । স্বচ্ছ পলিথিনের ভেতরে ওর রক্ত মাখা মুখটা দেখা যাচ্ছে । দুই চোখ খোলা । নগ্ন আক্রোশ নিয়ে চেয়ে আছে জুলির দিকে।
সর্বনাশ।
এখনও বেঁচে আছে বেজন্মাটা!
সব ভণ্ডুল হয়ে যাবে তো ।
ভয়ের জায়গায় রাগ , ক্ষোভ চলে এলো জুলির মনে। মরিয়া হয়ে উঠলো ।
অস্ত্রের খোঁজে চারিদিকে তাকাল । নেই। মুহূর্তেই বুদ্ধিটা চলে এলো মাথায় । পা দিয়ে চেপে ধরল মারটিনের গলা। নিজের পুরো শরীরের ভার ছেড়ে দিল গলার উপর।
মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত জুলির হাতের কবজি চেপে ধরে রাখল মারটিন । বাসি লেটুস পাতার মত নিস্তেজ হয়ে ছেড়ে দিল জুলির হাতটা।
আরও মিনিট তিনেক মারটিনের গলায় পা চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল জুলি।
ব্যাটা বিরাট শয়তান।
উহ, কী ভয়টাই না পেয়েছিল ।
ভাগ্যিস ওকে কাবু করতে পারেনি।
ওভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে ঘন ঘন দম নিল । যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।
আর ঠিক তখনই শব্দটা শুনতে পেল।
শব্দের দিকে ফিরে থমকে দাঁড়ালো।
প্রবল বাতাসে দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। কাঠের গোঁজ কোন কাজ করেনি। মানে ভাল মত গুঁজে দেয়নি ওটা। বাতাসের বেগ আচমকা বেড়ে গিয়েছিল। সামাল দিতে পারেনি গোঁজ। কিন্তু শব্দটা ঠিক সেইজন্য হয়েছে ?
কেমন অন্য রকম শোনালো না ?
কুয়ার সামনে দাঁড়িয়ে পুরো বাড়িটা দেখতে পাচ্ছে জুলি। ক্রিসমাস সজ্জার রঙ্গিন আলোতে সব ঝিকিমিকি করছে।
বাইরে বহু দূর দূরান্ত পর্যন্ত ঘন নীল অন্ধকার। নিঝুম পরিবেশ, সেটা বলা যাবে না। বাতাসের শো শো গর্জন হচ্ছে । আর কিছু না। তারপরও...অদ্ভুত রকম অনুভূতি হচ্ছে জুলির। মনে হচ্ছে ও একা নেই। আড়াল থেকে কেউ দেখছে ওকে । নজর রাখছে ওর উপর ।
'হ্যালো । কে ওখানে ?' কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তারপরও চিৎকার করে উঠলো জুলি। একবার মনে হল, ওকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য পিটার চলে আসেনি তো ?
পর মুহূর্তেই চিন্তাটা বাতিল করে দিল ।
না। এটা একেবারে অসম্ভব। এত সাহস নেই পিটারের। তাছাড়া সত্যি সত্যি শহরের বাইরে গেছে ও।
ধীরে ধীর খানিক সামনে চলে এলো জুলি।
উঠানের শেষ মাথায় লোহার প্রমাণ সাইজের দরজা। এই দরজা দিয়ে বাইরে গেলেই রাস্তা। দরজাটা খোলা। বাতাসে পাল্লা দুটো একটা আরেকটার সাথে লুকোচুরি খেলছে।
মারটিন কী বাড়ির বাইরে যাবার মূল গেইটটা বন্ধ করেনি ? কিন্তু কখনই তো অমন ভুল করে না।
নিজের হাতে লোহার গেইট বন্ধ করে, উঁকি দিয়ে দেখে নিশ্চিন্ত হল।
বাইরে কেউ নেই।
ঘুরে দাঁড়াতে যাবে তখনই কোন কিছুতে ধাক্কা খেল।
এতই আচমকা, গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠলো সে।ধাক্কা খেয়ে পিছিয়ে গেছে খানিকটা।
সামনে ইয়া লম্বা একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। গায়ের রঙ বাদামী। সান্তাক্লজের পোশাক পরনে। মাথায় পশমি কাপড়ের লাল টুপি। মুখে সাদা তুলার তৈরি কৃত্রিম দাঁড়ি গোঁপ। চোখ দুটো কেমন যেন। একটা হাত শরীরের পিছনে রেখে কী যেন আড়াল করে রেখেছে।
চোখে চোখ পড়া মাত্র হাসল বিশালদেহী সান্তাক্লজ । নোংরা কুৎসিত কালো দাঁত। ঘিনঘিন করে উঠলো জুলির শরীরটা।
' মেরি ক্রিসমাস।' ফিসফিস করে বলল সান্তাক্লজ। তারপরই পিছনের হাতটা সামনে নিয়ে এলো । হাতে একটা কুড়াল। দুই হাতে কুড়ালের হাতলটা ধরে ঝেড়ে কোপ বসাল কুৎসিত সান্তা ।
মুহূর্ত আগে টের পেয়ে সরে গেল জুলি।
নইলে সঙ্গে সঙ্গে দুই টুকরা হয়ে যেত।
কোপটা পড়লো বরফের মধ্যে।
ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল সান্তা।
সেই সুযোগে বাউলি কেটে দৌড় দিল জুলি। দৌড়াতে গিয়ে বুঝল উল্টা দিকে মানে কুয়ার দিকে দৌড় দিয়েছে সে। বাড়ির দিকের পথ জুড়ে সান্তা দাঁড়িয়ে আছে।
খুনিটাও নিজেকে সামলে নিয়েছে ততক্ষণে।
কুড়াল হাতে জুলিকে ধাওয়া করলো । প্রাণের দায়ে ছুটছে জুলি। কুয়ার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো। পালাবার আর কোন পথ নেই। শুধু পারবে কুয়ার মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে। অন্য কোন উপায় নেই আর।
ঘুরে দাঁড়াতেই খুনিটার সাথে মুখোমুখি হল আবার। কুড়াল তুলে আবার কোপ বসাল ভয়াল সান্তা। আবারও সামান্যের জন্য মিস করলো। কুয়ার পাথরের দেয়ালে কুড়ালের লোহার ফলার ঘা লেগে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হল দেশলাইয়ের মত।
ভারসাম্য হারিয়ে এবার জুলির গায়ের উপর পড়লো বিশাল দেহী শয়তানটা।
গায়ের জোরে ধস্তাধস্তি করতে লাগল জুলি। ততক্ষণে বুঝে গেছে , ভয়ংকর এক খুনির পাল্লায় পড়েছে। বেঁচে থাকাটা বিরাট একটা ভাগ্যের ব্যাপার হবে এখন ।
কী এক ঝামেলায় পড়ে গেছে মারটিনকে খুন করে। নইলে কি আর এই শীতের রাতে বাইরে থাকতে হত ? মারটিন বেঁচে থাকলে চিৎকার শুনে সাহায়্য করতে আসতো !
হুটোপুঁটি করার সময় জুলির হাত গিয়ে ঠেকল কুয়ার উপরের টিনের চালে।
বরফ জমে জমে শক্ত হয়ে ঝুলে আছে। এক একটা বরফের টুকরো পেরেকের সমান লম্বা। আর সূচালো ।
মুঠো করে ধরতেই কচি ,মূলার সাইজের একটা বরফের টুকরা ভেঙ্গে জুলির হাতের মুঠোয় চলে এলো ।
মুঠো করা হাতটা তুলে আঘাত করলো সান্তার মুখে ।
বরফের জিনিস । কিন্তু অস্ত্রের বাপ। সূচালো মাথাটা গিয়ে বিঁধল সান্তার চোখের কোনে।
টান দিতেই চোখের কোন থেকে ঠোঁটের এক কোন পর্যন্ত লম্বা লম্বি ভাবে কেটে গেল। এক মুহূর্ত পরই , গলগল করে ঘন তরল রক্ত বের হয়ে এলো সান্তার মুখের কাটা জায়গা থেকে।
ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠলো সান্তা । জুলির চুলের মুঠো ছেড়ে নিজের মুখের ক্ষতস্থানে হাত দিল।
শরীরের সব টুকু শক্তি ব্যবহার করে লোকটার দুই উরুর সংযোগ স্থলে আঘাত করলো জুলি।
ব্যাথায় গুঙিয়ে উঠল সান্তা। কুঠারটা খসে গেছে হাত থেকে।
সুযোগটা কাজে লাগাল জুলি।
নিচু হয়ে কুঠারটা মুঠো করে তুলেই ঝেড়ে দৌড় দিল।
পিছন পিছন বিশাল ভাল্লুকের মত শরীর নিয়ে তাড়া করলো খুনিটা।
কয়েক লাফে বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে দরজার নব ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল জুলি।
ভাগ্যিস কাঠের গোঁজটা সরে গিয়েছিল। নইলে কিছুতেই দরজা বন্ধ করতে পারতো না।
ভেতরে ঢুকে শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে ঠেলে দরজার পাল্লা বন্ধ করতে গিয়ে আবিস্কার করলো, পারছে না।
পাল্লার বাইরেই খুনি সান্তাক্লজ দাঁড়িয়ে একটা হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে ভেতরে। গায়ের জোরে দরজার পাল্লা খুলে ফেলতে চাইছে।
নিজেও জানে না , কখন যেন চিৎকার শুরু করছে জুলি। গায়ের জোরে ঠেলে বন্ধ করতে চাইছে ওক কাঠের ভারি দরজা।
পেরে উঠছে না কিছুতেই।
লোকটার গায়ে বুনো মোষের জোর। একটু একটু করে ফাঁক হয়ে যাচ্ছে দরজার পাল্লা। এখন ভেতরে একটা পা ঠেলে দিলেই জুলি আর পারবে না দরজা বন্ধ করতে।
নিজের বোকামিটা হঠাৎ করেই বুঝতে পারল জুলি।
ঈশ ।
আতঙ্কে মানুষ সত্যি সত্যি বোকা হয়ে যায় ।
ঠাণ্ডা মাথায় বা -হাত দিয়ে ঠেসে ধরল দরজার পাল্লা। ডান হাতে কুড়ালটা ছিল ভুলেই গেছে । খুনিটার হাত অর্ধেক পর্যন্ত ভেতরে ঢুকে গেছে। কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত । কুড়ালের হাতলের গোঁড়াটা ধরে কোপ মারল জুলি। খুব কাছ থেকে কোপটা মারা হয়েছে। তাড়াহুড়ায় নিশানা ততবেশি স্থির করে উঠতে পারেনি।
তারপরও কবজির মধ্যে পড়লো কোপটা।
ব্যাথায় ঘেউ ঘেউ করে উঠলো বাইরে দাঁড়ানো সান্তাক্লজ ।
আউ আউ করতে করতে নিজের হাতটা টেনে বাইরের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেল।
আর সেই সুযোগে টেনে ঝপাৎ করে দরজাটা বন্ধ করে দিল জুলি।
বড় পিতলের ছিটকিনি আর সেফটি লক পর্যন্ত আটকে দিল ।
এখন এই দরজা ভাংতে হলে সার্কাসের হাতি আনতে হবে।
দৌড়ে গিয়ে প্রথমে রেডিওটা বন্ধ করলো জুলি।
বাইরের শব্দ শোনা দরকার। কী করছে খুনিটা ?
দ্রুত হেঁটে গিয়ে কালো কুচকুচে টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলো।
‘ হ্যালো পুলিশ স্টেশন ।' ওপাশ থেকে পেশাদারী ভাব গাম্ভীর্য নিয়ে বলল কেউ।
'আমাকে সাহায়্য করুন।' খিচিয়ে চিৎকার করে উঠলো জুলি। ' প্লিজ আমাকে সাহায়্য করুন ।'
'আপনি শান্ত হন।' ওপাশ থেকে আগের মতই শান্ত গলা। ' বলুন কী হয়েছে আসলে।'
'একটা লোক।' হাঁপাতে হাঁপাতে বলল জুলি। ' বিচ্ছিরি চেহারার একটা লোক আমাকে আক্রমণ করতে এসেছে । আমাকে হেল্প করুন ।'
'ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনার ঠিকানা বলুন দয়া করে।'
'লিখুন , ঠিকানা হচ্ছে...।' এই টুকু বলেই থেমে গেল জুলি।
জানালা দিয়ে উঠান দেখা যাচ্ছে। উঠানের শেষ মাথায় কুয়ার সামনে চিৎ হয়ে পড়ে আছে মারটিনের লাশটা । হালকা মিহি তুষার জমেছে মারটিনের উপর। পুলিশ আসবে ওকে বাঁচানোর জন্য । তখন ওরা লাশটা দেখবে।
কী ব্যাখ্যা দেবে ?
লাশটা দেখে পুলিশ বুঝে যাবে পোকারের আঘাতে মারা গেছে মারটিন । এই মুহূর্তে পোকারটা রয়েছে দোতলায়, পিচ্চির কামরার বাইরে। চালাক চতুর পুলিশ অফিসারদের বুঝতে অসুবিধে হবে না খুনি বাইরের কেউ না। জুলিই করেছে কাজটা। পোকারের হাতলে জুলির আঙুলের ছাপ ও পাবে।
আরও কথা আছে।
বাইরে খুনিটা আছে কি না কে জানে ? নইলে দৌড়ে গিয়ে লাশটা ফেলে দিতে পারতো কুয়ার মধ্যে। কেউ বুঝতেও পারতো না ওখানে মারটিনের লাশ। কিন্তু খুনিটার উপস্থিতি জানা নেই ওর। পুলিশের গাড়ি আসতে দেখলে পালিয়ে যাবে শয়তানটা ।
তখন উল্টা ফেঁসে যাবে ও।
কট করে ফোনটা কেটে দিল জুলি।
ভাবছে। দ্রুত চিন্তা চলছে ওর মাথায় ।
বাইরে খুনিটা আছে ? থাকলে কোথায় আছে ঘাপটি মেরে ? আবার শয়তানটা এই ভেবে পালিয়ে যেতে পারে, ভেতরে ঢুকেই নিশ্চয়ই জুলি পুলিশ ষ্টেশনে ফোন করেছে নিশ্চয়ই ।
একটা সুযোগ দরকার ওর। কোনভাবে মারটিনের লাশটা কুয়ার ভেতরে ফেলতে পারলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
আবার খুনিটা কিন্তু বাড়ির ভেতরে ঢোকার একটা চেষ্টা করতেও পারে । মনে হয় না এত সহজে হাল ছেড়ে দেবে । সেক্ষেত্রে বাড়ির সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটা বের করে সেখান দিয়ে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করবে ।
আর বাড়ির সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হচ্ছে রান্নাঘরের জানালা। পুরো জানালাটা কাচের তৈরি। লোহার কোন গরাদ নেই। কাঠের ফ্রেম আর কাচ। শখ করে বসানো হয়েছিল । যাতে রান্না করার সময় ওই দিকের বাগানের সুন্দর দৃশ্য চোখে পড়ে ওর। এই মুহূর্তে আবিস্কার করলো ফালতু শখও মানুষের বিপদ ডেকে আনতে পারে কোন একটা সময়ে।
দ্রুত গিয়ে দাঁড়ালো রান্নাঘরের জানালার পাশে।
বাঁশের কঞ্চির পাতলা ফালি দিয়ে বানানো ভেনিশিয়ান ব্লাইন্ড ঝুলছে জানালার কাচের উপর। যাতে ভেতরে থেকে বাইরের সব কিছু দেখা যায়। কিন্তু বাইরে থেকে ভেতরের কোন কিছু দেখতে পাবে না কেউ।
বিড়ালের মত সতর্ক ভাবে ওখানে দাঁড়ালো জুলি।
ভেনিশিয়ান ব্লাইন্ডের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল জুলি। কেউ নেই। কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
চলে গেছে ? কোথায় থাকতে পারে খুনিটা ?
ঝন ঝন করে টেলিফোনটা বেজে উঠলো এই রকম দম বন্ধ করা মুহূর্তে। এতই আচমকা , পিলেটা পর্যন্ত চমকে গেল ওর।
ফোনটা তুলবে কি না ভাবছে । কে ফোন করতে পারে ? নিশ্চয়ই পুলিশ স্টেশন থেকেই করেছে। আচমকা জুলি ফোন কেটে দেয়ায় ওরাই নিশ্চয়ই আবার কল করেছে ওকে ?
নাকি অন্য কেউ ?
যদি পুলিশ স্টেশন থেকে ফোন করে তবে তো আরও মুসিবত । জুলি ফোন রিসিভ না করলে হয়তো সরাসরি ওর বাড়িতেই চলে আসবে ওরা !
আরও কি কি ভাবতো কে জানে ?
জুলিকে ততবেশি ভাবার সুযোগ না দিয়ে ঝন ঝন করে ভেঙ্গে গেল জানালার কাচ । আর সেই ভাঙ্গা কাচের বাইরে থেকে একজোড়া হাত এসে প্যাচিয়ে ধরল ওর গলা।
ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গিয়েছিল জুলি। ততক্ষণে ব্জ্রমুঠিতে আটকা পড়ে গেছে ।
বাইরে গাছের ডালে ট্রাকের একটা টায়ার শক্ত দড়িতে বাঁধা ছিল। গরমের বিকেলেগুলোতে লুনা ওটায় বসে বসে দুলত । খুনিটা গাছের ডাল ভেঙ্গে টায়ার খুলে এনে জানালায় ছুড়ে কাচ ভেঙ্গেছে। বাইরে থেকেই জুলির উপস্থিতি টের পেয়েছে শয়তানটা।
দম আটকে ছটফট করছে জুলি।
আর কিছুক্ষণ এইভাবে থাকলে দম আটকে মারা যাবে। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে সব কিছু।
কানে পাশে খ্যাক খ্যাক করে হাসছে বিকারগ্রস্থ খুনিটা।
মাত্র এক হাত সামনে কিচেনের সিঙ্ক। ওখানেই কুড়ালটা রেখেছিল জুলি। হাত বাড়াল জুলি। মনে হয় জিনিসটা হাজার মাইল দূরে। ইঞ্চি ইঞ্চি করে জুলির আঙুলগুলো সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত। জয় পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যাবে এখনই।
কুড়ালের হাতলটা হাতের মুঠোয় আসতেই জুলির গায়ে একশো হাতির জোর এসে গেল ।
হাতলটা তুলে নিয়ে আন্দাজে নিজের পিছন দিকে কোপ মারল।
ভাগ্য খারাপ। ফলাটা ছিল ওর দিকে। উল্টা দিকের শক্ত লোহা গিয়ে আঘাত করলো সান্তাক্লজের মাথায়।
নারকেল ফাটার মত শব্দ হল। সাথে সাথেই জুলির গলার ফাঁস ঢিলে হয়ে গেল। বিচ্ছিরি একটা আর্তনাদ করে কাটা কলাগাছের মত বরফের উপর চিত হয়ে পড়ে গেল হারামিটা।
ওজনের দরুন ঝুর ঝুরে নরম বরফের মধ্যে খানিক ঢেবে রইল লোকটার বিশাল শরীর।
ভাঙ্গা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখে মনে মনে তৃপ্ত হল জুলি।
মারা গেছে ব্যাটা ।
সেই মুহূর্তেই আবার ওকে চমকে দিয়ে বেজে উঠলো বসার কামরার টেলিফোনটা ।
ক্রিং ! ক্রিং! ক্রিং!
বেজেই যাচ্ছে। এক টানা। একঘেয়ে সুরে।
এবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। নাহ। তুলতেই হবে ফোনটা। দেখা যাক কে আছে ওপাশে। বড় বড় করে কয়েকটা দম নিয়ে শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো ।
'হ্যালো।' রিসিভার তুলে শান্ত ভাবে কথা বলার চেষ্টা করলো জুলি।
'এটা মারটিন প্যাঁটারসনের বাড়ি না ?' ওপাশ থেকে অমায়িক ভাবে জানতে চাইল কে যেন।
‘ হ্যাঁ। কিন্তু কে বলছেন ?'
'ম্যাডাম আমি পুলিশ স্টেশন থেকে ফোন করেছি। অফিসার গ্যানডমণ্ড আমার নাম। আপনার নাম্বার থেকে থানায় একটা ফোন এসেছিল ।'
'হ্যাঁ , সরি। আমার ছোট মেয়ে লুনা মজা করে ফোনটা করেছিল ।' হাসল জুলি।
'আচ্ছা আমাদেরও সেইরকম মনে হয়েছিল। তারপরও ম্যাডাম, সতর্ক থাকবেন।'
'কেন ?'
'রেডিয়োর স্পেশাল নিউজ শোনেননি ?' লোকটা অবাক।
'না তো। রেডিও বন্ধ আসলে ।'
'অহ। একটা ভয়ানক খুনি পালিয়ে গেছে মানসিক হাসপাতাল থেকে। ওর গায়ে সান্তাক্লজের পোশাক । কাজেই সাবধানে থাকবেন।'
খুনির গায়ে সান্তাক্লজের পোশাক ?' চট করে বাইরে চেয়ে মড়া সান্তাক্লজকে এক বার দেখে নিল জুলি।
'হ্যাঁ ম্যাডাম। কুড়াল থাকতে পারে ওর হাতে। আগের খুনগুলো ইয়ে মানে... কুড়াল দিয়েই করেছিল। বাচ্চা মেয়ে খুন করতে পছন্দ করে শয়তানটা । তবে ভয় পাবেন না। আমাদের পুলিশের একটা দল আপনার বাড়ির দিকেই আসছে।'
'কেন ?' আবিস্কার করলো বুকের ধুকপুক আবার বেড়ে গেছে । চট করে বাইরে তাকাল । কুয়ার পাশে আগের মত বিনা আপত্তিতে পড়ে আছে মারটিনের লাশটা ।
'কারণ আপনাদের বাড়িটা একদম নির্জন জায়গায়। আবার বিচ্ছিন্ন। ' ব্যাখ্যা করলো অফিসার। ' আর আমাদের ধারনা অনুয়ায়ি ওই দিকেই কোথাও আছে বদমায়েশটা ।'
'তাই নাকি ?' কি বলবে বুঝতে না পেরে শুধু এই টুকু বলল জুলি। ' কতক্ষণ লাগবে আপনাদের আসতে ?'
'এই ধরুন বিশ মিনিট।'
বিশ মিনিট !
ঘড়ির দিকে চাইল জুলি। রাত একটা বেজে চল্লিশ ।
'ঠিক আছে অফিসার।' ঢোক গিলে বলল জুলি। ' আমি অপেক্ষায় রইলাম ।'
ফোন কেটে দিল।
ভাবছে জুলি। মারটিনের লাশটার কী হবে ? ঘটনাটা কি ভাবে সাজানো যায় ?
পরমুহূর্তেই হাসি ফুটল। আরে, এ তো বিরাট সহজ কাজ। সব দোষ তো ওই সান্তাক্লজ খুনির উপর সহজেই চাপিয়ে দেয়া যায়। ওই ব্যাটাই খুন করেছে মারটিনকে। মেইন গেইট তালা দেয়া হয়েছিল কি না সেটা দেখতে বেচারা মারটিন বাইরে বের হয়েছিল। খুনিটা বাইরে ঘাপটি মেরে ছিল।
আচমকা আক্রমণ করে মেরে ফেলে মারটিনকে। ভেতর থেকে দৃশ্যটা দেখে প্রাণের ভয়ে দরজা বন্ধ করে ফেলে জুলি। তখন কিচেনের জানালা ভেঙ্গে জুলিকে আক্রমণ করতে যায় সান্তা । প্রাণ বাঁচাতে ফায়ারপ্লেসের কয়লা উস্কে দেয়ার পোকার দিয়ে খুনিকে আঘাত করে জুলি। পরে কি হয়েছে সেটা আর জানে না ও।
বাহ! দারুণ আইডিয়া।
পুরো ব্যাপারটা আরও কয়েকবার দ্রুত ভেবে নিল মনে মনে । নাহ , কোন খুঁত নেই।
আবার দরজা খুলল।
হিম হিম হাওয়া দৌড়ে এসে কামরার ভেতরে ঢুকে পড়লো ।
চিনির দানার মত সফেদ তুষার কণা এসে লুটিয়ে পড়লো দামি কার্পেটের উপর। ফায়ারপ্লেসের ভেতরে আগুনের শিখা নড়ে চড়ে উঠলো কেমন একটা ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে।
বাইরে সাঁই সাঁই হাওয়ার কেমন যেন কান্নার সুর ।
পুরো বাড়িটা ঝিকিমিকি করছে ক্রিসমাসের আলোতে। শক্ত করে কুড়ালটা বাগিয়ে ধরে বাইরে বের হল জুলি।
দরজার বাইরে ছিল ময়লা ফেলার টিনের বিন। সেটা কায়দা করে দরজার সাথে ঠেস দিয়ে রাখল। দমকা বাতাসে যাতে দরজা বন্ধ হতে গেলে বিনটা বাঁধা দেয় ।
ওর কাছে চাবি নেই। চাবির গোছা ছিল মারটিনের প্যান্টের পকেটে। এখনও আছে।
দ্রুত এসে দাঁড়ালো কুয়ার সামনে।
মারটিনের লাশটা অসহায় ভঙ্গিতে চিত হয়ে পড়ে আছে আগের মত। খোলা দুই চোখ বিস্ফোরিত। বরফের হালকা কুঁচি জমেছে মুখের প্ল্যাস্টিকের উপর।
কুড়ালটা শক্ত মুঠোয় ধরে দাঁড়ালো জুলি। গায়ের জোরে নামিয়ে আনল মারটিনের মাথায়। মড়া ভেড়ার মাথায় কোপ দিলে যেমন হয় তেমন একটা অনুভূতি হল জুলির।
মারটিনের শরীরটা নড়ে উঠলো শুধু । অন্য কোন বিকার নেই। ব্যাথা বেদনা সব কিছুর উপরে চলে গেছে বেচারা কত আগে।
আবার কুড়ালের ফলা নামিয়ে আনল জুলি।
আবার।
এবার সন্তুষ্ট হল। ফলাটা সুন্দর করে গেঁথে আছে মারটিনের খুলিতে।
নিচু হয়ে মারটিনের প্যান্টের পকেটে হাত দিল। চাবির গোছাটা পাওয়া গেল খুব সহজেই।
ভাল হয়েছে।
নইলে তদন্তকারী অফিসার প্রশ্ন করতে পারবে, খুনি সান্তাক্লজ মারটিনকে যদি খুন করে থাকে তবে পকেট থেকে চাবি বের করে নিয়ে আনন্দের সাথে দরজা খুলে বাড়ির ভেতরে ঢুকল না কেন ?
চার
লুনার ঘুমটা হঠাৎ করেই ভেঙ্গে গেল।
কিসের যেন একটা শব্দ শুনতে পেল না ? সান্তাক্লজ এসে গেছে ?
ঘুমঘুম চোখে জানালার দিকে ছুটে গেল।
' সান্তা এসে গেছ না কি ?' চেঁচিয়ে উঠলো সে।
তাকাল বাইরে। না, কেউ নেই।
তবে জানালার নীচে, উঠানের মধ্যে বরফ খানিকটা যেন নিচু হয়ে আছে। ঠিক যেন হুবহু একটা মানুষের ছাপের মত।
‘ অহ, সান্তা তুমি আসো নি। ' জনম দুখিনীর মত বিড়বিড় করে বলল লুনা। পুতুলটা এখনও জড়িয়ে ধরে রেখেছে।
ঝুপ করে শব্দ হতেই চমকে গেল জুলি।
আজকের রাতটা ওর জন্য দুঃস্বপ্নের রাত। কখনই যেন শেষ হবে না এই দুঃস্বপ্ন। চোখ ফিরিয়ে দেখতে পেল বাতাসের তোড়ে গারবেজ বিনটা সরে গিয়ে দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।
কুছ পরোয়া নেই। চাবি আছে ওর কাছে।
এখন ভালোয় ভালোয় ভেতরে ঢুকে পুলিশকে ফোন দিতে হবে।
সুন্দর করে একটা নাটক বানাতে হবে।
উঠান পার হয়ে বারান্দায় আসতেই আবার আগের বারের মত অনুভূতি হল।
সেই অনুভূতি।
মনে হচ্ছে আড়াল থেকে আবারও কেউ দেখছে ওকে।
থমকে দাঁড়ালো।
তখনই ছাদের লাল রঙা টালি থেকে ঝুপ্পুস করে এক খাবলা বরফ পড়লো ওর মাথার উপর।
ভয়ে আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলো জুলি।
পরমুহূর্তেই বুঝতে পারল , অতটা আতঙ্কিত হবার দরকার ছিল না। এটা এমনিতেই হয়েছে, ভার সহ্য করতে না পেরে নিজে থেকেই নেমে গেছে নীচে। মানুষের চরিত্রের মত।
ভেতরে ঢুকে ভাল করে দরজা বন্ধ করে দিল জুলি।
ফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলো।
রিঙ বাজতেই এক মহিলা ফোন ধরল , ‘ হ্যালো পুলিশ স্টেশন , কি সাহায়্য...।'
'জলদি করুন, আমাকে বাঁচান।' চেঁচিয়ে উঠলো জুলি। ওর অভিনয় দক্ষতা প্রশংসা করার মত।
'একটা বিচ্ছিরি চেহারার লোক। সান্তাক্লজের পোশাক পরনের ...।আক্রমণ করে বসেছে আমার স্বামীকে । ও বাইরে গিয়েছিল ময়লার বিন খালি করতে...।'
‘ শান্ত হন...।' শশব্যস্ত হয়ে জবাব দিল মহিলা। 'আমরা এখনই আসছি। আপনার কাছে কোন অস্ত্র আছে ?'
'আছে, বেডরুমে একটা বাক্সে আমার স্বামীর পিস্তল আছে।'
'ওটা নিয়ে অপেক্ষা করুন। দরকার মনে করলে গুলি চালাবেন। আমরা আসছি। বেশিক্ষণ লাগবে না। আপনার ঠিকানা বলুন জলদি।'
হাসি ফুটল জুলির ঠোঁটে।
ঠিকানা বলার আগে কী মনে করে জানালা দিয়ে বাইরে চাইল ।
জমে পাথর হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।
মারটিনের লাশটা দেখা যাচ্ছে। খানিক আগেই চিত হয়ে ছিল। এখন কিভাবে যেন কাত হয়ে আছে। খুলিতে গেঁথে থাকা কুড়ালটা নেই।
তারমানে খুনিটা মরেনি , জ্ঞান হারিয়ে পড়ে ছিল শুধু !
হায় হায় ।
' জলদি করুন ম্যাডাম ।' চেঁচিয়ে উঠলো জুলি। ' শয়তানটা এখনও বাড়ির আশেপাশে আছে। আমার ঠিকানা হল...।
হব হব করে নিজের ঠিকানা বলে গেল জুলি।
ওপাশের মহিলা সান্তনা দিয়ে বলল, ইতিমধ্যে নাকি একদল অফিসার ওর বাড়ির দিকে রওনা হয়ে গেছে। এই মিনিট দশেক আগে হবে।
ফোন রেখে ছুটল জুলি।
বেডরুমের কোণায় ছোট্ট মত আরও একটা কামরা আছে। ক্লজিট টাইপের । ভেতরে জামাকাপড় হতে লণ্ড্রী মেশিন , এসব রাখা। ওখানেই একটা তাকের উপর কাঠের পিচ্চি এক বাক্সের মধ্যে পিস্তল আছে একটা।
জুলি জানে।
দৌড়ে ক্ষুদে কামরাটার ভেতরে ঢুকে পড়লো ।
ওর ধাক্কায় রুমের দরজাটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে লকড হয়ে গেল।
জানলো না সেটা।
মাথা তুলতেই নজরে পড়লো। উপরের তাকে বাক্সটা ঠিকই রাখা আছে। হাত বাড়িয়ে বুঝল , নাগাল পাওয়া যাবে না। অনেক উঁচুতে ।
দ্রুত এদিক ওদিক চাইল।
কিছুই নেই যার উপর দাঁড়িয়ে বাক্সটা হাতের মুঠোয় পেতে পারে।
তবে লণ্ড্রী মেশিনটা ঠেলে আনা যেতে পারে !
একমাত্র সমাধান ।
তখনই জানালার বাইরে চোখ পড়তেই শিউরে উঠলো জুলি ।
সান্তাক্লজের পোশাক পরা বিশালদেহী কুৎসিত খুনিটাকে দেখা যাচ্ছে । বাইরের দেয়ালের সাথে একটা মই ঠেস দিয়ে সেটা বেয়ে দোতলায় উঠে যাচ্ছে।
এখান দিয়ে উঠলেই, দোতলায় লুনার কামরা।
কী সাংঘাতিক।
মই পেল কোথায় ?
অহ , এটাও তো বাগানের এক কোনে পড়ে ছিল। গতকাল সন্ধ্যায় না মারটিন এই মই বেয়ে উঠেই ক্রিসমাসের লাইটগুলো সাজিয়েছিল ।
জুলির সাথে চোখাচোখি হওয়া মাত্র খুনিটা হাসল।
কি ভয়াল আর কুৎসিত সে হাসি ।
নোংরা দাঁতগুলো দেখলে যে কেউ বমি করে ফেলবে।
হাত উঁচু করে কুড়ালটা দেখাল শয়তান সান্তাক্লজ । আতঙ্কে যেন পাগল হয়ে যাবে জুলি। আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত পরেই দোতলায় উঠে যাবে খুনিটা। ছোট্ট লুনা ঘুমিয়ে আছে।
পুলিশ অফিসার বলেছিল, বাচ্চাদের খুন করতে পছন্দ করে খুনিটা ।
কি করবে এখন জুলি ?
চেষ্টা করবে কোনভাবে পিস্তলটা সংগ্রহ করার জন্য ? নাকি সোজা দৌড়ে যাবে দোতলায় ?
লুনাকে জাপটে ধরে দৌড়ে বের হয়ে যাবে বাড়ির বাইরে। দৌড়ে উঠে যাবে সদর রাস্তায় ।
ওভাবে দৌড়াতেই থাকবে। দৌড়াতেই থাকবে।
হয়তো ইতিমধ্যে পথের অর্ধেক পর্যন্ত চলে এসেছে পুলিশের পেট্রোল কার। অন্য কোন পথ চলতি গাড়ি কি চলে আসতে পারে না ?
গায়ের জোরে ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলতে গিয়ে আবিস্কার করলো কোন ভাবে দরজা বন্ধ হয়ে এঁটে গেছে ।
লকড হয়ে গেছে নিজে থেকেই। কিভাবে যেন !
পাঁচ
‘ সান্তাক্লজ তুমি খুব খারাপ।' মন খারাপ করা গলায় বলল লুনা। ' কী এমন হত আমার জন্য উপহার নিয়ে এলে ? মা বলেছে ভাল বাচ্চাদের উপহার দাও তুমি।'
কথা শেষ করে বিছানার দিকে পা বাড়াল লুনা।
হয়তো আর আসবে না সান্তাক্লজ।
এমন সময় ঠক ঠক শব্দটা শুনতে পেল। বাইরে থেকে আসছে না ? আরে তাইত !
দৌড়ে চলে গেল জানালার কাছে।
হায় হায়, এ কি ?
স্বপ্ন দেখছে না তো ?
দুই চোখ কচলে আবার চাইলো লুনা।
'আমি জানতাম ।' চেঁচিয়ে উঠলো পিচ্চি লুনা। ‘ আমি জানতাম সান্তা তুমি আসবে।‘
ওর চিৎকার শুনে সান্তা মুখ তুলে উপরের দিকে তাকাল ।
বেচারা মই বেয়ে উঠছে।
‘ জলদি এসো ।' হাত বাড়িয়ে দিল লুনা। ' মা মিথ্যা বলেছে । মা বলেছে তুমি চিমনি বেয়ে আসবে। সাথে হরিণের স্লেজ থাকবে। সব মিথ্যা। এসো, এসো আমার হাত ধর সান্তাক্লজ।'
আরও আরও কাছে চলে এসেছে বিশালদেহী সান্তাক্লজ । আরও কাছে। হাত বাড়িয়ে দিল লুনার দিকে। দুই হাতের দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চি।
ছয়
পাগল হয়ে যাবে যেন জুলি।
গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে দরজায়। একটার পর একটা । ওটা এমন ভাবে এঁটে গেছে, মনে হয় না ইহ জিন্দেগিতে খুলবে।
চেঁচাচ্ছে জুলি , ' ওহ ঈশ্বর কিছু কর। প্লিজ কিছু কর।‘
দরজায় ধাক্কা দিয়েই যাচ্ছে। কাঁধের হাড় ভেঙ্গে যাবে যেন।
ওদিকে সান্তাক্লজের শরীর আর দেখা যাচ্ছে না। উপরে উঠে গেল না কি ? ওহ ঈশ্বর লুনার যেন ঘুম ভেঙ্গে যায়। অচেনা বিদঘুটে চেহারার লোকটাকে দেখে লুনা যেন ভয় পেয়ে কামরা থেকে দৌড়ে বের হয়ে আসে।
ওহ ঈশ্বর আজকের রাতেই সব কিছু অমন হচ্ছে কেন ?
কেন ?
কেন?
কেন ?
আচমকা কোন রকম নোটিশ না দিয়ে কড়াৎ শব্দ করে দরজার নব ভেঙ্গে গেল।
ছিটকে বাইরে চলে এলো জুলি। আছাড় খেয়ে পড়লো মেঝেতে। গড়ান দিয়েই উঠে ছুটল উপরের দিকে। নিজের অজান্তেই প্রাণপণে চেঁচাচ্ছে , ‘ লুনা , লুনা, লুনা মা আমার ।'
পাহাড় সমান সিঁড়ির ধাপগুলো একটার পর একটা পার হয়ে অনেকগুলো বছর পর, ঠিক যেন হাজার বছর পর দোতলায় পৌঁছল জুলি।
লুনার কামরার দরজা খোলা।
কেউ নেই।
খালি।
লুনা নেই কোথাও।
জানালা খোলা। বাইরের দমকা বাতাসে সাদা নীল ফুলের ছাপাওয়ালা পর্দাটা উড়ছে। তুষার কণা এসে পড়ছে ভেতরে বিষণ্ণ ভঙ্গিতে। কিন্তু লুনা নেই।
কী মনে হতেই সিঁড়ি বেয়ে আবার নামতে লাগল।
নিচ তলায় ড্রয়িং রুমে কিসের শব্দ !
সিঁড়ির গোঁড়ায় এসে থমকে দাঁড়ালো জুলি।
নীচে বসার রুমের মাঝখানে লুনা একা দাঁড়িয়ে আছে। দুই চোখে দুষ্টুমির হাসি চিকচিক করছে ।
‘মা তুমি ঠিক আছ তো ?' চেঁচিয়ে উঠল জুলি। বুক কাঁপছে ওর।
‘ তোমার জন্য সারপ্রাইজ মা।' হাসল লুনা। 'এই দেখ ।'
কাঠের আলমারিটা ছিল পাশেই । ওটার আড়াল থেকে বের হয়ে এলো বিশাল দেহী বাদামী লোকটা । সান্তাক্লজের পোশাক গায়ে। মুখে তুলার নকল দাঁড়িগোঁপ । হাতে রক্তাক্ত কুড়াল।
'তুমি মিথ্যা বলেছ মা।' অভিযোগের সুরে বলল লুনা। ' সান্তাক্লজ চিমনি বেয়ে আসে না তো । আমাদের সান্তাক্লজ মই বেয়ে এসেছে। আর সাথে কোন উপহার আনেনি। '
শেষের দিকে ওর গলায় অভিমান ।
‘নাহ, ওহ ঈশ্বর, প্লিজ না।' ফোঁপাচ্ছে জুলি। উন্মাদিনীর মত মাথা নাড়ছে। ' না, প্লিজ , না, না , না...।'
কুৎসিত লোকটা লুনার পাশে এসে দাঁড়ালো শান্তভাবে। আলতো ভাবে হাত রাখল লুনার সোনালী চুল ভর্তি মাথার উপর।
শেষ রাতের দমকা বাতাসে কামরার দরজাটা খুলে গেল কিভাবে যেন।
ক্রিসমাস ট্রিতে ঝুলানো পিতলের ক্ষুদে ক্ষুদে ঘণ্টাগুলো বেজে উঠলো টুং টাং শব্দ করে।
নাটকের শেষ পরিণতি দেখার জন্য কেঁপে কেঁপে উঠলো ফায়ারপ্লেসের শিখাগুলো ।
উত্তেজনার খোরাক পেয়েছে ওরা সবাই। ঘরময় উড়ে বেড়াতে লাগল অচিন নক্ষত্রের মত তুষার কণা।
সবগুলো দাঁত বের করে কুৎসিত একটা হাসি হাসল লোকটা। কুড়ালটা মুঠো করে তুলে অনুমতি নেয়ার ভঙ্গিতে বলল , ' বাচ্চাটাকে দিয়েই শুরু করি ?'
বিদেশি গল্পের কাঠামো অবলম্বনে
অন্য নাম ও হতে পারে
অপয়া ক্রিসমাস, দুঃস্বপ্নের বড়দিন, রক্তাক্ত ক্রিসমাস ,বড়দিনের দুঃস্বপ্ন

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন