এক
সস্তাদরের হাত সাফাই দিয়েই অনুষ্ঠান শুরু করে সব জাদুকরেরা । জটিল আর রোমাঞ্চকর খেলাগুলো দেখানো শুরু করে শেষে ।
আস্তে আস্তে ।
ধীরে সুস্থে ।
একদম শেষে দেখায় তুরুপের তাস । যেই খেলার জন্য বিখ্যাত সে ।
কিন্তু রাঘবের দুর্ভাগ্য, জটিল বা রোমাঞ্চকর খেলা কোনটাই ওর স্টকে নেই । সামান্য ভুং ভাং জানে । সেইগুলোই বারবার রিপিট করে ।
লম্বা টুপি থেকে খরগোশ বের করা । জামার আস্তিন থেকে সাদা পায়রা বের করে উড়িয়ে দেয়া । চোখে রুমাল বেঁধে কার হাতে ইসকাপন , কার হাতে রুইতন পড়েছে সেইসব বলে দেয়া পর্যন্ত ওর দৌড় ।
মানুষকে মোহিত করে রাখার জন্য বৈচিত্রতার দরকার আছে । নইলে বেশি দিন মোহ টিকে থাকে না । বৈচিত্রতার অভাবে দেবতারাও বেশি দিন স্বর্গে থাকতে পারে না । একঘেয়েমিতে ভুগে চলে আসে ধূলা মাটির পৃথিবীতে ।
অনুষ্ঠানের প্রথম জাদু - টুপির ভেতর থেকে লাফ দিয়ে উঠবে গনগনে আগুন । তারপর সেই আগুন নিভে রঙ্গিন একঝাঁক কাগজের ফুল হয়ে যাবে ।
একদম সহজ সরল একটা খেলা ।
কিন্তু দর্শক বেশ পছন্দ করে ।আগুন আর ফুল পরপর দুটো আজব আর উদ্ভটি জিনিস , কার না ভাল লাগে ?
মঞ্চে উঠেই রাঘব হতাশ ।
পাঁচ জন দর্শক ।
মাত্র !
একদম সামনের সিটে মাঝ বয়স্ক একজোড়া দম্পতি বসে আছে । মহিলা ইয়া মোটা । প্রায় বাঁধাকপির মত । শীতের জন্য গায়ে চাদর জড়িয়ে আছে। চাদর না বলে কম্বল বলা ভাল । কম্বলের লোম উঠে ঘেয়ো কুকুরের চামড়া । চেহারা দেখে বনেদী ঘরের মনে হল না। পান খেয়ে পিচকি ফেলছে ঘন ঘন ।
পাশে ফতুয়া পরা , টাক মাথার কেমন মিহি চেহারায় এক লোক । রোগা । খ্যাঙরা কাঠির মাথায় আলুর দম । এই লোক ঘুমাচ্ছে নাক ডেকে ।
খানিক দূরে এক দর্শক । বিরতিহীন কেশে যাচ্ছে । কাশির বেগ খানিক কমলে দম নিচ্ছে । আবার কেশে যাচ্ছে । শেষে আবার দম নিচ্ছে । যে কোন সময়ে মারা যেতে পারে এই লোক ।
পিছনের সিটে আরও এক জোড়া দম্পতি । এরা বিরক্ত । কেন কে জানে ? হয়তো যাবার কোন জায়গা নেই তাই বসে আছে । কে বলবে ?
দর্শকের সংখ্যা দেখে বুক শুকিয়ে গেল রাঘবের ।
সর্বনাশ ।
থিয়েটারের ভাড়া উঠবে কি করে ? কর্মচারির বেতন ? আর সব খরচ ? দিন দিন দর্শক কমছে ।
পাপের ফল ?
অমায়িক দেঁতো হাসি হেসে টেবিলের উপর টুপি রাখল রাঘব । হাতে কালো ছোট্ট একটা ছড়ি । মাথাটা পেতলের । সেটা টুপির উপর ঘুরিয়ে উচ্চস্বরে ভুং ভাং মন্ত্র পড়তে লাগল , ' হে মহান অগ্নি , আপনি আমার বশ । আপনাকে হুকুম দিচ্ছি , জেগে উঠুন । জ্বলে উঠুন আমার মায়াবী কালো টুপির ভেতর থেকে । আপনি বন্দি । মুক্ত করুন নিজেকে ।'
সেই সাথে হাতের তালুতে লুকিয়ে রাখা রাসায়নিকের গুড়ো কায়দা করে ঢেলে দিল টুপির ভেতরে ।
ওস্তাদ গণপতি সরকার শিখিয়েছিল যত্ন করে । কিন্তু কাজ করছে না । আগুনের ফুলকি দেখা যাচ্ছে । চকমকি পাথর ঠুকলে যেমন দেখা যায়। কিন্তু ড্রাগনের জিভের মত দাউদাউ করে জ্বলে উঠছে না ।
দর্শকের দিকে চেয়ে বেহায়ার মত হাসতে লাগল রাঘব ।
ওর পরনের জরির পোশাক ।ওস্তাদ যেমন পরতো । মঞ্চের আলোতে ঝলমল করছে সেই পোশাক । দেশি জাদুকরেরা জরি আর চুমকির কাজ করা পাঞ্জাবী , পায়জামা, হাতা কাটা ফতুয়া আর মাথায় মহারাজাদের মত কাপড়ের টুপি বা পাগড়ি পরে । পাগড়ির মাথায় কপালের কাছাকাছি রঙ্গিন কাচের টুকরো ফিট করে রাখে । ঢং করে বলে - দামি পাথর, মূল্যবান রত্ন । অমুক রাজা বা তমুক মহারানী জাদু দেখে খুশি হয়ে দিয়েছে ।
ফাজলামো আর কাকে বলে !
রাঘবের ওস্তাদ গণপতি সরকার বিলেত ফেরত । সেইজন্য উনি কালো লম্বা কোট পরতেন । কোটের বুকের দিকটা দুই দিকে চ্যাপ্টা । ডাবল বেস্ট। পিছনের ঝুল অনেকখানি নামানো । কাঁধের পিছন থেকে আবার টকটকে লাল রঙের একটা রেশমের কাপড় ঝুলে থাকতো সুপার হিরোদের মত । কোটের দুই হাতায় হাফ ডজন করে এক ডজন পেতলের বোতাম । চকচকে পালিশ করা । হাত সাফাইয়ের সময় মঞ্চের উজ্জ্বল আলো লেগে ঝিকিমিকি করে দর্শকদের চোখে কেমন মায়া আর কুহক তৈরি করতো ।
রাঘবকে সুদর্শন বলা যায়, কোন রকম তর্ক না করেই । যে কেউ বলবে । গায়ের রঙ কাঁঠালের কোষের মত । ফর্সা । দাড়ি রোজ কামায় । পেল্লাই গোঁফ চেহারায় একটা অভিজ্যাতের ভাব জমা করে রেখেছে ।
যদিও বাস্তবে রাঘব তেমন নয় ।
কয়েক হাত দূরে চুমকির কাজ করা যে অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে ওর নাম কামিনী । আগে ওস্তাদের সহকারিণী ছিল ।
এখন ওর ।
' আগুনের দেবতা আপনি জেগে উঠুন । আপনি আমার আদেশ শুনতে বাধ্য , কারন আপনি আমার বশ । জেগে উঠুন ।'
আগুন জ্বলে উঠলো ।
শিখা তেমন প্রানবন্ত নয়।
' আরও আরো আগুন চাই ।' বলেই লাঠি দিয়ে টুপির উপর হালকা আঘাত করলো সে ।
এবার আগুনের দেবতা দপ করে লাফ দিয়ে জ্বলে উঠলো । একটু বেশিই জ্বলে উঠলো । রাঘবের চেহারায় বিব্রত ভাব ফুটে উঠল ।
এমন হবার কথা নয় । আগুন কথা শুনছে না কেন ? আরও মকশো করার দরকার ছিল ?
' ফিরে যাও, আগুন। ফিরে যাও ...।' লাঠি দিয়ে আঘাত করতে করতে বলল রাঘব ।
কামিনীর কোন কাজ নেই । ফুল বের হলে রাঘব হাসি মুখে ওর হাতে তুলে দেবে । দাঁড়িয়ে আছে সে । হাসিমুখে ।
'ফিরে যাও আগুন ।' টুপিতে আঘাত করতেই লাঠির মাথায় কি ভাবে যেন আগুন জ্বলে উঠলো ।
পর পর কয়েক বার ফু দিয়ে লাঠির মাথার আগুন নিভিয়ে সেটা ছুড়ে দিল কামিনীর দিকে । রুটিন অনুয়ায়ি সেটা খপ করে ধরে মোহিনী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকবে মেয়েটা ।
উড়ন্ত লাঠি ধরতে গিয়ে ছ্যাকা খেয়ে হাত থেকে ফেলে দিল কামিনী ।
এক দর্শক হেসে ফেলল ।
' দর্শক মণ্ডলী আমার সহকারিণী আসলেই একটা অপদার্থ । ওর ভুলের জন্যই চমৎকার খেলাগুলো মাঠে মারা যায় ।' অমায়িক একটা হাসি হেসে বলল রাঘব ।
বরাবর তাই করে । দোষ চাপিয়ে দেয় মেয়েটার উপর ।
আজ মেজাজ ভাল ছিল না কামিনীর । মুহূর্তের মধ্যে চেহারাটা আবিরের মত রাঙ্গা হয়ে গেল । তারপর সস্তা একটা খিস্তি দিয়ে দুপদাপ করে চলে গেল পর্দার আড়ালে । মঞ্চের বাইরে ।
'এবার আমি আগুনের ভেতর থেকে বের করে আনছি ফাগুনের ফুল । এই দেখুন , কামাখ্যা থেকে শিখে আসা আমার গুপ্তবিদ্যা ।'
টুপির ভেতরে আগুন নেই । ওখানে হাত গলিয়ে দিল রাঘব । গোপন জায়গায় কায়দা করে লুকানো আছে এক গুচ্ছ কাগজের ফুল । টান দিলেই ছাতা মেলার মত ঝপ করে খুলে বের হয়ে আসবে ফুলগুলো ।
তাই হল । টান দিতেই বের হয়ে এলো ফুলের গুচ্ছ । সগর্বে উপরে তুলে ধরল রাঘব ।
'এই সেই ফুল । আগুনের ফাগুণ ফুল । অবিশ্বাস্য কিন্তু সত্য ...।' বলে চলল সে । আরও কি কি বলতো কে জানে ? আচমকা আবিস্কার করলো কাগজের ফুলে আগুন ধরে গেছে ।
কি ভাবে হল ?
অমন তো হবার কথা না ।
নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বের হয়ে এলো চাপা চিৎকার । ফেলে দিল জ্বলন্ত ফুল । হাত দিয়ে ইঙ্গিত করতেই মঞ্চের পর্দা ধিরে ধিরে নেমে এলো ।
আড়ালে বসে থাকা পিয়ানো বাদক টুংটাং করে সুর তুলল তার বাদ্যযন্ত্রে ।
দুই
মঞ্চের পিছনে দাঁড়িয়ে আঙ্গুলে ফু দিচ্ছিল কামিনী ।লাঠির মাথায় গরম অংশ হাতে লেগে পুড়ে গেছে ।
' কি রকম কাণ্ড । একেবারে অবিশ্বাস্য ।' গজগজ করতে করতে বলল রাঘব । ' ভাবতেই পারছি না এত কাছ থেকে ওটা তোমার হাত থেকে পরে গেল কি ভাবে ? না খেয়ে ছিলে নাকি সারাদিন ?'
গট গট করে হেঁটে যেতে লাগল গ্রিন রুমের দিকে ।
' নিজের দিকে নজর দাও ।' সমান তালে খেঁকিয়ে উঠলো কামিনী । ' একটা কাজও তোমাকে দিয়ে হচ্ছে ? একটাও না । দেখেছ দর্শকের অবস্থা ? কয়েকদিন পর চামচিকা আর কাঁচপোকা শো দেখতে আসবে ।'
জবাব দিল না রাঘব ।
ঢুকে পড়েছে গ্রিন রুমে।
পিছন পিছন কামিনী ।
রুমের এক কোনে কালাই করা টিনের তৈরি একটা বেসিন । পাশে কল্কে ফুলের মত নীলরঙা কাচের ল্যাম্প শেড । নরম তুত রঙা আলো জ্বলছে ।
বেসিনের সামনে দাঁড়ালো রাঘব ।
আগাম কোন নোটিশ না দিয়ে উপুর হয়ে হড়হড় করে বমি করে ফেলল ।
সামলে উঠে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে লাগল ।
'তোমাকে দিয়ে কিছু হবে ।' ঘ্যান ঘ্যান করে বলেই যাচ্ছে কামিনী । ' ওস্তাদের প্রিয় শিষ্য হয়েছিলেন কি ভাবে ভগবানই জানেন । ওস্তাদ নিখোঁজ হবার পর সব কিছুর ভার নিজেই নিজের কাঁধে তুলে নিলে । তারপর থেকেই শুরু হল শনির দশা । দিন দিন খারাপ হচ্ছে আমাদের মান । নিজেই দেখ।'
'ঘ্যান ঘ্যান না করে চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যাও ।' খেঁকিয়ে উঠলো রাঘব । ' নইলে আজই কাজ থেকে ছাঁটাই করে দেব ।'
খানিক থমকে গেল কামিনী ।
কোমরে হাত রেখে কয়েক কদম সামনে এসে চোখ বড় বড় করে বলল , ' কি বললে ? আমাকে ছাঁটাই করবে ?'
'তাই তো বললাম । শুনতে পাও নি ?'
'আজ্ঞে না মহাশয়, আমিই তোমার চাকরি ছেড়ে দিলাম । এখনই ।'
'উহু , ছাড়ার আগেই তোমাকে ছাঁটাই করে ফেলেছি ।'
উঁচু গলায় শব্দে বিচ্ছিরি একটা গালি দিল কামিনী ।
ধুপধাপ করে চলে গেল কামরার বাইরে ।
গায়ের কোটটা খুলে ছুড়ে মারল রাঘব । এক কোনে গিয়ে পড়লো ।
ধপাস করে বসে পড়লো চেয়ারের উপর ।হতাশ। গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে । একজন একজন করে সবাই ওকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে ।
ঝপাং করে দরজা খুলে ভেতরে এলো কামিনী । রাঘব ভেবেছিল মাফ চাইতে ফিরে এসেছে । যদিও কামিনী সেই নমুনার মেয়ে না । তারপরও , মানুষ কত রকমই না আশা করে ।
কামিনী এসেছিল ওর চটের ব্যাগটা ফেরত নিতে । রাগের চোটে বা ভুলে ফেলে গেছে ওটা । ব্যাগটা তুলে ফিরে যাবার আগে থমকে দাঁড়ালো । কি একটা নজরে পড়েছে ওর । চোখ বড় বড় হয়ে গেছে কামিনীর ।
হেঁটে সামনে চলে এলো খানিকটা ।
' ওটা পেয়েছ কোথায় শুনি ?' চিবিয়ে চিবিয়ে জানতে চাইল মেয়েটা ।
চেয়ারে ঝুঁকে বসেছিল রাঘব । বুক খোলা সাদা রেশমের জামার ভেতরে ঝুলে আছে জিনিসটা । সোনার চেইনের মধ্যে ডালিম দানার রঙের একটা পাথর ।পাথরটা প্রায় হাতের তালুর সমান ।
' ওস্তাদ আমাকে দিয়েছে ।' তাড়াহুড়া করে জামার ভেতরে ওটা ঠেসে ভরতে ভরতে জবাব দিল রাঘব ।
' অসম্ভব ।' খেঁকিয়ে উঠলো কামিনী । ' গণপতি বাবুকে আমি চিনি পাঁচ বছর ধরে । উনার ওস্তাদ দিয়েছিল এটা । জীবনের চেয়ে বেশি ভালবাসতেন এই নেকলেস । এত বড় রুবি সারা দুনিয়া খুজলেও পাবে না কেউ । সবচেয়ে বড় কথা উনি বিশ্বাস করতেন ওটার মধ্যে ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা আছে । সেই জিনিস তোমাকে দিয়ে গেছে , আর আমরা কেউ জানলামও না ? সত্যি করে বল পেয়েছ কোথায় ?'
' হাওয়া থেকে পেয়েছি ।' দুই হাত শূন্যে তুলে বিদঘুটে মুদ্রা দেখিয়ে বলল রাঘব । ' যাও এইবার ভেগে যাও ।'
'সত্যি করে বল , ওস্তাদ কোথায় ?' যেন মস্ত কোন ষড়যন্ত্র ধরে ফেলেছে অমন ভাবে বলল কামিনী ।
'উনি সব কিছু আমার হাতে ছেড়ে দিয়ে তীর্থে গেছে । পার্থিব জগতের প্রতি উনার আর কোন মোহ মায়া নেই। তাই সবই আমাকে দিয়ে গেছে ।' অম্লান বদনে বলে গেল রাঘব ।
' তুমি উনার কোন ক্ষতি করেছ , উনাকে খুন করেছ !’ চাপা গলা কামিনীর ।
প্রশ্ন করছে না । নিজের ধারনা , বিশ্বাসের কথা বলল ।
গলা কাঁপছে ওর ।
' হ্যাঁ, আমি গণপতি বাবুকে খুন করেছি ।' দুই হাত শূন্যে তুলে খিঁচিয়ে উঠলো রাঘব । ' আমি উনাকে গুলি করে মেরেছি । না , ভুল বললাম । রাতে ঘুমাতে যাবার আগে উনি এক পাত্র মদ গিলত না ? উনার মদের মধ্যে বিষ মিশিয়ে দিয়েছি । উহু ওটাও মানান সই না। উনি সকালে শীতলক্ষ্যায় স্নান করতে যেতেন না ? ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছি । কুমির এসে খেয়ে গেছে উনাকে । খুশি ? হল তো এবার ?'
' আমি পুলিশের কাছে যাচ্ছি ।' শান্ত গলায় বলল কামিনী । ' কোলকাতা থেকে নতুন এক ইংরেজ অফিসার এসেছে , উইলিয়াম ব্লেক । ভদ্রলোক ভীষণ কড়া ।'
'যাও যাও । না করলো কে ?' বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বলল রাঘব । ' প্রমাণ আছে তোমার কাছে ? লাশ কোথায় গণপতি বাবুর ? অ্যাঁ ?'
' আমি তোমার দিকে নজর রাখব । বলে দিলাম ।' হুমকিটা দিয়ে গায়ের জোরে দরজা টেনে বাইরে চলে গেল কামিনী ।
মাথা নিচু করে কয়েক পল বসে রইল রাঘব ।
হতাশ , ক্লান্ত ।
হাতের তালু দিয়ে মুঠো করে ধরল নেকলেসের পাথরটা । চোখ ভিজে গেছে কেন যেন ।
উঠে চলে গেল কামরার এক কোনে । বড় বড় হাফ ডজন আইভরি রঙা মোমবাতি জ্বলছে । দেয়ালে পিতলের ফ্রেমে বাধাই করা পেল্লাই সাইজের একটা তৈলচিত্র । দুই হাত বিচিত্র ভঙ্গিতে সামনের দিকে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে গণপতি সরকার ।
' মায়াজাল কাজ করছে না কেন ওস্তাদ ?' ফিসফিস করে বলল রাঘব । ' কোথায় ইন্দ্রজাল ? ভেল্কিবাজি ? কুহক আর ভোজবাজি ? কোথায় সব ওরা ? আমাকে ধরা দেয় না কেন ? '
রাঘব জানতে পারল না ওর কামরার এক মাত্র জানালার বাইরের দাঁড়িয়ে আছে মোটা দোঁহারা গড়নের এক লোক । এই রাতের বেলাও চোখে লাল কাচের বেঢপ চশমা । কাচের আড়ালে মায়াবী দুটো চোখ । সেই চোখের রয়েছে অপরিসীম ক্ষমতা ।
তিন
বেশ তাড়াহুড়া করেই চলে যাচ্ছিল কামিনী ।
বাইরে ধূসর শীত ।
শীতলক্ষ্যা নদীর পেটের ভেতর থেকে ঠাণ্ডা হিমহিম হাওয়া ভেসে আসছে । মিনাবাজারের ওখানে ' হংস থিয়েটার' বেশ দমে চালু হয়েছে । কোলকাতা থেকে দারুন সব অভিনেতা অভিনেত্রীরা ওখানে এসে কাজ করে । সদর ঘাঁট থেকে ষ্টীমার ভর্তি করে দর্শক আসে রোজ । চেষ্টা করলে কি হংস থিয়েটারে একটা কাজ পাওয়া যাবে না ?
'কি খবর সুন্দরী ?' আচমকা বলে উঠল কেউ ।
চমকে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো কামিনী ।
রাস্তার উপর ল্যাম্পপোস্টের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক ভদ্রলোক । চোখে লাল কাচের চশমা । থুতুনিতে মিয়া ভাই মার্কা দাড়ি ।
এক কদম সামনে এসে দাঁড়ালো লোকটা । মুখে বিচিত্র হাসি । মাথাটা নিচু করতেই ল্যাম্প পোস্টের কিপটে মাপা আলোর সামান্য গিয়ে পড়লো তার চোখে । সম্মোহনী সেই চোখ । যে ওই চোখে চোখ রাখবে তার ইচ্ছা অনিচ্ছা বলে কিছু থাকবে না । ইচ্ছে করলে এই চোখ দিয়েই দুনিয়া নিয়ন্ত্রন করতে পারে এই লোকটা ।
বিড়বিড় করে তিন চারটে শব্দ উচ্চারণ করলো চশমাওয়ালা আগন্তুক ।
মুহূর্তেই সব কিছুর বিস্মরণ হয়ে গেল কামিনীর কাছে ।
সব কিছু।
সময় যেন বন্দি হয়ে গেল। ল্যাম্পপোস্টের আলো পনিরের মত।
চার
রাঘবের গুনের অভাব নেই ।
পরদিন দুপুরের মধ্যে এক জোড়া মেয়ে জোগাড় করে ফেলল । যাদের চেহারা কামিনীর চেয়ে হাজার গুণ বেশি কামিনী । বয়সটাও কম । বুকে চাক্কু মারা ফিগার ।
ওরা আবার যমজ বোন ।
ইস কেমন একটা মাখামাখি অবস্থা !
মেয়ে দুটো দেখতে হলেও দর্শক আসবে !
সন্ধ্যায় শো দেখাচ্ছে রাঘব ।
' হে আগুনের দেবতা আপনি আমার বশ । আমার হুকুমের ...।' বলে যাচ্ছে মুখস্ত করা সেই সংলাপ । পাশেই চুমকির কাজ করা আঁটসাঁট পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে মেয়ে দুটো । আপাতত ওদের নাম - সীতা আর গীতা । মুখে রেডিমেড হাসি ।
টান দিয়ে টুপির গোপন জায়গা থেকে বের করে আনল কাগজের ফুল ।
হাতে তুলে উপরে ধরা মাত্র ফুলে আগুন জ্বলে উঠলো ।আগের দিনের মতই।
রাগে দুঃখে মেঝেতে ফেলে পা দিয়ে চেপে ধরল ফুলের গোছা । নাহ কাজ করছে না। একা একা চর্চা করার সময় তো কাজ করে ! তবে ?
মেয়ে দুটোর দিকে কটমট করে ফিরে তাকাল রাঘব । যেন সব দোষ ওদের ।
'পর্দা ফেলে দাও ।' হতাশ গলা রাঘবের ।
আজ দর্শক মাত্র তিনজন । এক জোড়া মলিন চেহারার দম্পতি । গ্রাম থেকে হয়তো শহরে এসেছে বেড়াতে । সস্তায় বিনোদন হিসাবে ঢুকে পড়েছে ওরা রাঘবের জাদু দেখতে ।
কিন্তু আরও একজন লোক বেশ পিছনে বসে আছে। গভীর মনোযোগের সাথে মঞ্চের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা রাঘবের কারসাজি দেখছে । হাতে জিওল গাছের লাঠি । লাঠির হাতলে পিতলের মোষের মাথা খোঁদাই করা । চোখে লাল কাচের চশমা ।
' আর হবে না আমাকে দিয়ে।' গ্রিনরুমে চেয়ারে বসতে বসতে বলল রাঘব। পিছনে দাঁড়িয়ে আছে সীতা-গীতা।
'চিন্তা করবেন না।।আগামী কাল রাতে নিশ্চয়ই ভাল করবেন ।' উৎসাহ দেয়ার সুরে বলল ওদের একজন ।
' আগামী কাল রাতে ?' চিড়বিড় করে উঠলো রাঘব । ' বের হয়ে যাও তোমরা । যাও বলছি ।'
মেয়েরা বুঝতেই পারল না ওদের দোষ কি ।
ঠেলাঠেলি করে বের হতে যাবে তখনই আগাম কোন নোটিশ না দিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লো লোকটা ।
মেয়েদুটোর দিকে চেয়ে মোহন মার্কা হাসি বিলিয়ে দিল লোকটা । ' কি খবর সুন্দরীরা ? দিনকাল কেমন যাচ্ছে ?'
সুন্দরীরা জবাব না দিয়ে ভেগে গেল । দিনকাল ভাল যাচ্ছে না ওদের ।
লোকটা ফিরে চাইল রাঘবের দিকে । গুটি গুটি করে কয়েক পা সামনে এসে দাঁড়ালো । কেমন মসৃণ তরল গলায় বলল , ' রাঘব বাবু কেমন আছেন ? আশা করি আপনাকে বিরক্ত করছি না। আমার নাম মদনলাল সেরাওগি ।'
লোকটার ভাব চক্কর দেখে মনে হচ্ছিল যেন নাম শুনেই রাঘব হায় হায় করে উঠবে , কমপক্ষে মাথায় তুলে নাচবে । সেইসব না হলেও বলবে , ' কি সৌভাগ্য আমার । কেমন করে গরিবের বাড়িতে ?‘
হেন তেন।
সেইরকম কিছুই হল না।
হবে কেমন করে ? জীবনেও লোকটাকে দেখেনি রাঘব ।
মাঝ বয়েসী একজন মানুষ । মাথায় সমানুপাতিক হারে কাঁচাপাকা চুল । ঢং করে আবার লেপটে উল্টা দিকে আঁচড়ে রেখেছে । থুতুনিতে মিয়া ভাই কিসিমের সামান্য দাড়ি । চোখে সমস্যা আছে ? নইলে কোন পাগলেও রাতের বেলা লাল কাচের চশমা চোখে দেয় না ।
হাস্যকর ।খুবই হাস্যকর।
তবে লোকটার কণ্ঠস্বর মারাত্নক । কেমন যেন ঘুম পাড়ানী গানের মত । কিছুক্ষণ এর সাথে কথা বললে যে কেউ হাই তুলবে ।
ঘুমিয়েও পড়তে পারে ।
চশমা খানিক নামিয়ে রাঘবের মুখের দিকে চাইল লোকটা । ডাকাতের মত চোখ । নাহ, চোখ দুটো পছন্দ হল না রাঘবের ।
'কি চাই ?' ভাবলেশহীন গলায় বলল রাঘব।
জুই ফুলের মত সাদা আধ হাত লম্বা তোয়ালে বের করে মুখের ঘাম মুছতে লাগল । গোলাপ জল মেশানো আছে তোয়ালেতে । মনটা ফুরফুরে হয়ে যাবে ।
'আজ রাতে আপনার শো দেখলাম রাঘব বাবু ।' আরও সামনে চলে এলো বাঁটুল সাইজের লোকটা । ' দারুন খেলা দেখিয়েছেন ।'
'ধন্যবাদ ।' অনেক অনেক ধন্যবাদ ।' সৌজন্যমূলক হাসি হেসে বলল রাঘব ।
তবে মনটা ভাল হয়ে গেছে ।
মিথ্যা হলেও প্রশংসা কার না ভাল লাগে ।
'কিন্তু আপনি বসেছিলেন কোথায় ? দর্শকদের আসনে আপনাকে দেখলাম না যে ।'
'আরে ছিলাম , একটু পিছে আর কি । সব সময় কি আর সব কিছু দেখা যায় ? তো আমি চাই কাল রাতে আপনি আমার জাদু দেখবেন । বিনীত নিবেদন ।'
'তাই নাকি ?' অবাক হয়ে বলল রাঘব । 'আপনি জাদু দেখান ? নাম শুনিনি কখনও ।'
'কারন আমি বিখ্যাত কেউ না। আর বড় বড় শহরে খেলা দেখাই না । এই গ্রামে গঞ্জে খোলা বাজারে সস্তা কাপড়ের প্যান্ডেল খাঁটিয়ে খেলা দেখাই । এই প্রথম এসেছি বড় শহরে । আপনি গেলে খুশি হব। আমরা জাদুকরেরা আসলে মায়াজীব । আর সব মানুষের চেয়ে আলাদা । আর সব জীবের চেয়েও আলাদা । কোন জানোয়ার কি পারবে হাত সাফাইয়ের এমন ধাপ্পা দেখাতে ? পারবে ? পারবে না। যা বাস্তব না কিন্তু সবাই দেখে ভাবতে বাধ্য হবে যা দেখছি সেটাই সত্য । এক মহাবিদ্যা । '
লোকটা দেখতে যেমন হোক কথাবার্তায় বেশ অমায়িক । ভাল লাগল রাঘবের । কিন্তু নিজের দাম কমাতে চাইল না, ' আসলে আমি বেশ ব্যস্ত মানুষ , মনে হয় না আপনার শো ...।'
'জানি, জানি ।' বাধা দিয়ে বলল মদনলাল সেরাওগি । ' আমি বিশ্বাস করি আপনার মহা মূল্যবান সময় এক বিন্দু ও নষ্ট হবে না । তাছাড়া আমি আপনার জন্য একটা টিকিট সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছি । আমার তরফ থেকে সামান্য উপহার আর কি । এই নিন ।গ্রহণ করুন। '
বলেই প্রায় জোর করে রাঘবের হাতে বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্রের মত একটা কার্ড ধরিয়ে দিল সেরাওগি ।
' অপেক্ষায় থাকব , আপনি সময় পেলে আসবেন ।' বলতে লাগল সে । ' না এলে কষ্ট পাব কিন্তু...।'
কথা শেষ না করে নাটকীয় ভাবে থেমে গেল ।
চলে গেল দরজার সামনে । চলে যাচ্ছে সে ।
থমকে দাঁড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে বলল , 'আসুন , দেখে যান সত্যিকারের তেলেসমাতি আর ভেল্কিবাজি কাকে বলে ।'
বলেই ঢোলা ফতুয়ার পকেটে হাত পুরে দিল সেরাওগি । কোত্থেকে যেন বের করে আনলো কালো লম্বাটে একটা টুপি ।পকেটে এত বড় টুপি থাকা এক কথায় অসম্ভব।
টুপিটা মাথায় দিয়ে ডান হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুল শূন্যে তুলে কেমন একটা চুটকি বাজানোর মত ভঙ্গি করতেই দপ করে আগুন জ্বলে উঠলো আঙুলের ডগায় । সেই আগুন পকেটে ভরে ফিসফিস করে বলল , ' মায়াবিদ্যা দেখে যান রাঘব বাবু ।'
বলেই হেসে উঠলো হো হো করে ।
দরজা খুলে গেল একা একাই । হাসতে হাসতে বের হয়ে গেল মদনলাল সেরাওগি । দরজা বন্ধ হয়ে গেল নিজে থেকেই ।
বেশ তম্বা হয়ে গেল রাঘব ।
একি ভূতুরে কাণ্ড ?
কি এইসব ?
থতমত খেয়ে হাতের কার্ডটা খুলে চোখের সামনে ধরল । কাগজিটোলা থেকে কেনা মোটা সস্তা ধরনের কাগজে ছাপা । ছাপাও হয়েছে বুড়িগঙ্গার ওখানে সদরঘাটের কোন আনাড়ি ছাপাখানা থেকে। অল্প কয়েকটা কথা ছাপা ।
প্রদর্শিত হচ্ছে
স্থান - হংস থিয়েটার ।
নতুন মায়াজীব জাদুর বরপুত্র - মদনলাল সেরাওগি ।
বিশেষ আকর্ষণ - মড়া মানুষের সিন্দুক ।
এই ই। আর কিছু লেখা নেই।
পাঁচ
দর্শকদের করতালিতে যেন আকাশ ভেঙ্গে নক্ষত্রগুলো সব খসে পড়বে মাথার উপর ।
মঞ্চের উজ্জ্বল আলোতে দাঁড়িয়ে আছে মদনলাল সেরাওগি । নীল সাদা রঙের মিশেল দেয়া বিচিত্র পোশাক গায়ে ।
সিল্কের নীল কোট । তলায় সাদা সিল্কের মিহি জামা । জামার উপরে রুপালি ভেস্ট । ভেস্টের গায়ে রুপালি সুতা দিয়ে সুন্দর নকশার কাজ করা । লম্বা রুপালি পর্দা পিঠে ঝুলে আছে । শেক্সপিয়ররের নাটকের রাজকুমারদের যেমন থাকে । নীল রঙের টাইট প্যান্ট । পায়ে জরির কাজ করা কেমন ধরনের নরম কাপড়ের বুট ।
নির্লিপ্ত চেহারায় একটার পর একটা জাদু দেখিয়ে যাচ্ছে বুড়ো মানুষটা ।
ক্লান্তি নেই ।
জড়তা নেই ।
যেন হাজার হাজার বছর ধরে এই একটা কাজই করে যাচ্ছে । দর্শকদের মাথা চিন্তাভবনা জমাট করে দিচ্ছে তার ভোজবিদ্যা ।
শেষ জাদু দেখাচ্ছে মদনলাল সেরাওগি ।
সেই কালো টুপি । তুরি দিতেই ওটার ভেতর থেকে বের হয়ে এলো আগুনের স্ফুলিঙ্গ । ঝরে ঝরে পড়ছে মেঝেতে । স্ফুলিঙ্গ নিচে পরেই ছোট ছোট কিসের দানা হয়ে গেল । হলুদ কমলা রঙের। অনেকটা কাউনের দানার মত। খানিক বাদে দানা থেকে মঞ্চের উপরে গজিয়ে উঠলো নরম সবুজ ঘাস। অনেক এলাকায় মহিষ ঘাস বলে এই রকম ঘাসকে ।
কোত্থেকে উড়ে এলো কয়েক ডজন নীল রঙের পাখি। পাখি তো না যেন রামধনুর টুকরো দিয়ে বানানো স্বর্গের বাগানের নাম না জানা কোন অচিন পাখি।
ঘাসের বাগানে লুটপুঁটি খেতে লাগল সেইসব পাখিরা।
আবার তুড়ি দিতেই মিলিয়ে গেল সব । ফিরে এলো কাঠের মঞ্চ ।
বাতাসে ভাসতে লাগল শুধু একটা পাখির পালক। সেটা খপ করে ধরে কায়দা করে টুপির মধ্যে গুঁজে রাখল জাদুকর।
আবার তালি ।
দর্শকের আসনে বসে থাকা সবাই পাগল হয়ে গেছে যেন।
'ধন্যবাদ সবাইকে ।' টুপিটা মাথায় রাখতে রাখতে বলল মদনলাল । ' কষ্ট করে সামান্য মায়াবিদ্যা দেখলেন । সবই চোখের ধান্ধা । মায়া । এবার আমার শেষ খেলা মড়া মানুষের সিন্দুক দেখবেন । বাস্তব অবাস্তব সব আপনার মাথার মগজে । এই পৃথিবীতে আসলে বাস্তবতা বলতে কিছু নেই । সব মায়া ।বিভ্রম । মানুষের মৃত্যুও একটা বিভ্রম ছাড়া আর কিছু না । '
হাত তুলে মঞ্চের পিছনটা দেখালো সে ।
সুন্দরী মেয়ে সহকারিণী একটা পাকানো দড়ি ধরে টান দিতেই রুপালি পর্দা সর সর করে উঠে যাচ্ছে জাহাজের পালের মত ।
দর্শকদের হাত তালির শব্দে কানের পোকা নড়ে গেছে রাঘবের । গোঁফের উপর তর্জনী রেখে শান্ত স্কুল বালকের মত গভীর মনোযোগ দিয়ে তামাশা দেখছে ।
পর্দা উঠে যেতেই দেখা গেল আসলে সিন্দুক না, মানুষের সাইজের একটা কফিন বা বাক্স বলা যায় তেমন কিছু রয়েছে ওখানে । সেই কফিন বা বাক্সের উপরে ঝুলে আছে কমপক্ষে আটটা তলোয়ার । উজ্জ্বল আলো লেগে ভয়ংকর দেখাচ্ছে ।
'আজ রাতে আমি এই ভয়ংকর বাক্সে প্রবেশ করব। শুধু মাত্র আপনাদের আনন্দ দেয়ার জন্য । উপরের তলোয়ার সব আসল । টিনের বানানো বাচ্চাদের খেলার জিনিস না যেটা কিনা বৈশাখ মাসের মেলায় লক্ষ্মী-নারায়ণ মন্দিরের বাইরে চার আনা করে বিক্রি হয় । '
বলেই হাতের লাঠি দিয়ে ঠং ঠং করে আঘাত করলো নিচের দিকে মুখ করে ঝুলে থাকা তরোয়ালগুলোতে । মেকি জিনিস না । মিথ্যে বলছে না মদনলাল ।
'তো এইসব তলোয়ার ঝুলিয়ে রাখার মানে কি ?' নিজের কথার খেই ধরল মদনলাল সেরাওগি । ' সব তলোয়ার ঝুলে আছে একটা সেফটি হুকের সাথে । কোন ভাবে হুকটা সরে গেলে কি হবে ?'
দর্শকদের দিকে ফিরে চাইল বুড়ো যাদুকর । ' নিজের চোখেই দেখুন । এক , দুই, তিন ।'
বলা শেষ করতেই সেরাওগির সুন্দরী সহকারিণী হাতে ধরা একটা দড়ি আলগা করে দিল । বিকট শব্দ করে উপর থেকে লোহার দুটো ফ্রেম খসে পড়লো নিচের বাক্সের উপর । সেই ফ্রেমে ঝুলে আছে আটটা তীক্ষ্ণ তলোয়ার ।
নিজের অজান্তেই সব দর্শক চেঁচিয়ে উঠলো ।
মুখ শুকিয়ে গেছে অনেকের । বুক ধড়ফড় করছে সবার ।
আট তলোয়ার এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে কাঠের বাক্সটা । পাল্লা দুটো খুলে দেখাল সেওয়াগি । বুক ধড়ফড় রত অবস্থায় সবাই দেখল , যদি কেউ বাক্সের ভেতরে থাকতো তার অবস্থা হত পিনকুশনের মত । কেঁচে মোরব্বা হয়ে যেত বেচারা বা বেচারি ।
'এখানেই শেষ নয় ।' সাদামাটা ভাবে বলেই যাচ্ছে মদনলাল সেরাওগি । কোন উত্তেজনা স্পর্শ করেনি তার হাবভাবে । ' সেই সুদূর চায়না থেকে আমি নিয়ে এসেছি তরল মৃত্যু । নাম বললে অনেকে চিনবেন । কারন আপনারা সবাই শিক্ষিত এবং সুধী সমাজের লোকজন । এই তরল মৃত্যুর নাম - সালফিউরিক অ্যাসিড । একদম অসুরদের গুপ্তঅস্ত্র । নিজের চোখে দেখে চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করুন ।
কাচের একটা গোল পাত্র নিয়ে এলো মদনলালের সুন্দরী ।
পাত্রটা স্বচ্ছ ।
ভেতরের তরল জলের মত ।
বর্ণহীন ।
পকেটে হাত দিতেই সাদা রঙের কি একটা ফুল চলে এলো । সবুজ ডাঁটসহ । ফুলটার ঘ্রান শুঁকে আলতো করে পাত্রের তরলে ডুবিয়ে দিল যাদুকর ।
ঘন সাদা ধোঁয়া উঠতে লাগল । কয়েক পলে সেটা বাস্প হয়ে উবে গেল । জাদুকরের হাতে রইল শুধু ফুলের ডাঁটাটা ।
উউউউউউউউ……!
দর্শকদের মুখ দিয়ে বিস্ময় মেশানো কেমন একটা ধ্বনি বের হয়ে এলো ।
' সাংঘাতিক জিনিস তাই না ?' ফুলের ডাটা মঞ্চের এক কোনে ছুড়ে ফেলতে ফেলতে বলল মদনলাল ।
তখনও উপস্থিত ' শিক্ষিত ' লোকজন বুঝে উঠতে পারেনি , এই তরল মৃত্যু দিয়ে বুড়ো যাদুকর করবেটা কি ?
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কেমন মিহি একটা হাসি উপহার দিয়ে বলল যাদুকর , ' বুঝিয়ে দিচ্ছি ।'
কাঠের তিন ধাপওয়ালা একটা সিঁড়ি বাক্সের পাশেই ছিল । সেটা বেয়ে উপরে উঠে কাচের পাত্রটা রেখে দিল বাক্সের উপরে লোহার একটা পায়ার উপর । অমন পায়া বা গাছায় গ্রামের লোকজন প্রদীপ বা কেরসিনের কুপি রাখে ।
তারপর সামান্য খোঁড়াতে খোঁড়াতে নিচে নেমে ফ্যাসফ্যাসে গলায় মদনলাল বলল , ' তো , তরোয়ালের আঘাতে আমার মৃত্যু না হলেও উপর থেকে কাচের পাত্র থেকে নেমে আসা তরল মৃত্যুর জন্য আমার মাথা, চুল , চেহারা সব জ্বলে যাবে । অনেক যন্ত্রনা নিয়ে কষ্ট পেয়ে মরব আমি । এটাই হবে জাদুকরের মহান মৃত্যু , আর এইজন্য এই বাক্সের নাম , মৃত্যুর বাক্স বা মড়া মানুষের সিন্দুক ।’
সোজা চেয়ে রইল দর্শকদের দিকে ।
বেশির ভাগ দর্শক পাথর হয়ে বসে আছে। সাহসী দুই চারজন ফিসফিস করে পাশের জনের সাথে মতামত বিনিময় করে রায় দিচ্ছিল –
কাজটা অসম্ভব ।
বা বিপদজনক ।
বা আমি হলে জীবনেও করতাম না ।
ডান হাতের তর্জনী তুলে মঞ্চের দিকে একটা জায়গা দেখাল মদনলাল । একদম নতুন হলুদ রঙের একটা মোটা মোমবাতি ছিল সেখানে । স্ফুলিঙ্গ দিয়ে সলতেয় আগুন জ্বলে উঠলো । আচমকা।
মোমবাতির শিখার উপর পাকানো মোটা পাটের বাদামি রঙের দড়ি । সেই দড়ি ধরে রেখেছে আট তরোয়ালের সেফটি হুক । মানে , দড়িটা পুড়ে গেলেই উপর থেকে ধরাম করে নেমে আসবে আটটা তরোয়াল ।
এবং পাত্র ভরা তরল মৃত্যু । শিক্ষিত সমাজ যাকে সালফিউরিক অ্যাসিড না কি বলে !
জাদুকরের চেহারায় কোন বিকার নেই ।
গায়ের কোট খুলে সুন্দরীর হাতে তুলে দিল । ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে গায়ে তিলের তেল মেখে শীতলক্ষ্যায় স্নান করতে যাচ্ছে । স্নান করা শেষ হলে বাড়ি ফিরে চাপিলা মাছের তরকারী , কুমড়ার ছক্কা , আর মৌ-সিম ভাঁজা দিয়ে লাল ফ্যানসা ভাত খেয়ে দাওয়ায় পরে ঘুম দেবে ।
জুতা খুলে বাক্সের ভেতরে চলে গেল মদনলাল ।
ওইদিকে দড়িতে আগুন ধরে গেছে ।
হায় হায় ।
'ব্যাপারটা আরও একটু রোমাঞ্চকর করা দরকার ।' বাক্সের ভেতরে ঢুকে বলল মদনলাল । ' আপনারা বেশ পয়সা খরচ করেছেন টিকিট ক্রয় করে । হাতে হাতকড়া মানে শিক্ষিত জনসাধারণ যাকে হ্যান্ড কাফ বলে সেটা লাগিয়ে নিলে কেমন হয় ?'
বলার অপেক্ষায় ছিল সুন্দরী ।
কোত্থেকে যেন একেবারে ঝাঁ চকচকে নতুন একজোড়া হাতকড়া এনে সুন্দর করে লাগিয়ে দিল জাদুকরের হাতে ।
দুই হাত উপরে তুলে বিপ্লবী নেতাদের মত সেই হাত সবাইকে দেখাল মদনলাল ।
লোকটা নাটক জানে । মনে মনে স্বীকার করলো রাঘব ।
নাটক তখনও শেষ হয়নি ।
বাক্সের ভেতরে ছিল চটের ব্যাগ । অনেকে ছালার ব্যাগ না কি যেন বলে । সেটার খোলা মুখের উপরে দাঁড়ালো বুড়ো । বাচ্চাদের পায়জামা পড়ানোর মত করে ব্যাগটা বুড়োর মুণ্ডু পর্যন্ত তুলে বুড়োকে বস্তাবন্দি করে ফেলল সুন্দরী । তারপর মোটা লোহার শিকল দিয়ে বস্তার মুখ বেঁধে ফেলল ।
শেষে হাতের তালুর মত বড় একটা তালা শিকলে আঁটকে দর্শকদের দিকে ফিরে মদির একটা হাসি মাগনা বিলিয়ে দিল ।
ওই দিকে মোমের আগুনে দড়ি পুড়ছেই । সুন্দরীর কোন বিকার নেই ।
বাক্সের ডালা বন্ধ করে উপরে ঢাউস সাইজের একটা লোহার হুড়কো নামিয়ে দিল সুন্দরী। কারও বাপের সাধ্য নেই এখন, বাক্সের ভেতর থেকে বের হবে।
তারপর আরও একটা মদির হাসি দিয়ে সুন্দরী মঞ্চের আড়ালে চলে গেল ।
সুন্দরীর সেই হাসি দেখার মত কারও মুড নেই । কারন দড়ি অর্ধেক পুড়ে গেছে !
প্রস্রাব আঁটকে রেখে পুরো অনুষ্ঠান দেখছে দর্শক ।
সবার অবস্থা কাহিল ।
আচমকা বাক্সের ভেতরে চেঁচিয়ে উঠলো , ' আরে কেউ আছে নাকি ? আরে আমি তো আঁটকে গেছি, হ্যান্ডকাফ খুলতে পারছি না। কেউ আছ ? অ্যাঁয়, বের কর আমাকে । কেউ শুনতে পারছ ?'
খাবি খেয়ে মরার দশা হল দর্শকদের ।
কি করবে কেউ বুঝে উঠতে পারছে না। আর সুন্দরী কোন চুলায় মরতে গেছে ? বাকি লোকজন কোথায় ?
বুড়ো যাদুকর তখনও চেঁচিয়ে যাচ্ছে । সাহায়্যের আকুল আবেদন করে গলা ফাটিয়ে ফেলছে ।
দড়ি পুড়ে টাং করে ছিঁড়ে উপর থেকে ধপাস করে নেমে এলো আট আটটা ভয়ংকর তলোয়াল । ঢুকে গেল বাক্সের ভেতর । মরণ চিৎকার করে উঠলো মাদনলাল সেরাওগি ।
সেই চিৎকারে দর্শকদের শরীরের রোম দাঁড়িয়ে গেল ।
দর্শকদের মধ্যে কয়েকজন মহিলা আর দুর্বলচিত্তের মানুষ চেঁচিয়ে উঠলো ।
বড় করে ঢোক গিলল রাঘব।
এতক্ষণে কোত্থেকে ফিরে এলো সুন্দরী হারামজাদী । দৌড়ে গিয়ে হুড়কো তুলে খুলে দিল বাক্সের দুই পাল্লা ।
পাল্লা দুটো খুলে যেতেই আরেক দফা চিৎকার করে উঠলো দর্শকমণ্ডলী ।
ভেতরে বাঁকাচোরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বুড়ো মদনলাল । শরীরে নানান জায়গায় ঢুকে গেছে আটটা তরোয়ালের ডগা । ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে । এসিডে পুড়ে গেছে কপাল । মনে হচ্ছে মরিচ বাটা মাখিয়ে দিয়েছে কেউ ।
টলতে টলতে বের হয়ে এলো সে। চেঁচাচ্ছে । দর্শকরাও চেঁচাচ্ছে ।
আক্ষরিক অর্থেই বোকা বনে গেছে রাঘব ।
কি করবে বুঝতে পারছে না ।
হাঁটু গড়ে বসে পড়লো যাদুকর । ষাঁড়ের মত গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে । দোষারোপ করছে তার এই বেহাল দশার জন্য উপস্থিত দর্শকেরাই দায়ী । ঠিক তখনই থিয়েটারের সমস্ত আলো নিভে মায়ের গর্ভের মত অন্ধকার হয়ে গেল জায়গাটা ।
ঠিক তেমন নয় ।
মঞ্চে সেই সর্বনাশা মোমবাতিটা জ্বলছে তখনও ।
একা ।
পাণ্ডুর আলো নিয়ে ।
' চেয়ার ছেড়ে কেউ নড়বেন না।' ছমছম করা অন্ধকারে স্বাভাবিক গলায় বলে উঠল মদনলাল । ' আশা করছি শো - উপভোগ করেছেন সবাই ।'
কোত্থেকে ফেরেস্তার মত আলো এসে পড়লো মঞ্চের উপর । এক ফালি সাদা স্পটলাইটের আলোতে সবাই দেখল আলোর বৃত্তের নিচে দাঁড়িয়ে আছে মদনলাল । একদম ঝকমকে কাপড় গায়ে ।
রক্তের কোন চিহ্ন নেই।
চেহারায় কোন দাগ নেই ।
'ভদ্রমহিলা আর মহোদয়গন এটাই সেই বিভ্রমের খেলা । চোখের মায়া । ইন্দ্রজাল । কেমন লাগল আপনাদের ? '
হাসি মুখে বলল বুড়ো যাদুকর ।
ঝপ ঝপ করে সব আলো জ্বলে উঠলো থিয়েটারের ।
হাপ ছেড়ে বাচল সবাই ।
পাগলের মত তালি দিতে লাগল লোকজন ।
সুন্দরী আর বুড়ো মাথা নিচু করে দর্শকদের আভিবাদন জানাল ।
আর সবার চেয়ে একটু বেশি সময় ধরে ধানের বস্তার মত বসে ছিল রাঘব । যখন হুশ হল, আবিস্কার করলো সবচেয়ে বেশি জোরে তালি বাজাচ্ছে ও নিজেই।
কি দেখল এটা ?
অবিশ্বাস্য !
ছয়
' আপনি আমার শো দেখে আনন্দ পেয়েছেন জেনে আমিও অত্যন্ত খুশি এবং নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি রাঘব বাবু ।'
বার্মিজ চাকু দিয়ে ক্রিকেট বলের সমান একটা কাশ্মীরি আপেলের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল মদনলাল সেরাওগি ।
'আমার জীবনে অমন খেলা আগে কখনই দেখিনি ।' আনন্দের চোটে হব হব করে বলতে লাগল রাঘব । ' আপনি সাধারণ কোন যাদুকর না। আপনি আসলেও ইন্দ্রজালের রাজা । চোখের ধা ধা একটা মানুষ অমন ভাবে দেখাতে পারে নিজে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না ।'
হংস থিয়েটারের লাগোয়া ছোট্ট একটা রুম ।
এটাই মদনলালের গ্রিন রুম ।
দেয়াল ভর্তি দেশ বিদেশের নাম করা সব জাদুকরদের ছবি । সে সব ছবি আবার দামি পিতলের ফ্রেমে বাধাই করা ।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে আরামদায়ক চেয়ারে বসে আছে মদনলাল । ড্রেসিং টেবিল ভর্তি হরেক পদের - নানান আকৃতির সৌরভের শিশি । শৌখিন মানুষ সে । সম্ভবত ভক্তরা উপহার দিয়েছে ।
পাশে দাঁড়িয়ে আছে রাঘব । বিগলিত । কাউকে তুচ্ছ করা ঠিক না , এই শিক্ষা পেয়ে গেছে আজ ।
' আরে ধ্যাত, আপনি বাড়িয়ে বলছেন ।' কৃতজ্ঞ চিত্তে বলল মদনলাল ।
' মোটেই না। দর্শক হচ্ছে বড় প্রমাণ । আপনি দেখেননি কতটুকু আনন্দিত চেহারা নিয়ে সবাই বের হয়ে গেছে থিয়েটার থেকে ? সত্যি… আমার অনেক অনেক কিছু শেখার আছে ।'
'শেখার কোন শেষ নেই রাঘব বাবু ।' মাথা ঝাঁকাল মদনলাল ।
'তবে আমার মনে হয় কোন একটা ব্যাপার আছে।' পাশের চেয়ারটায় বসতে বসতে বলল রাঘব । ' পুরো ব্যাপারটাই চোখের ভ্রম ? মনে হয় না। হয়তো বাক্সের মধ্যেই কোন কায়দা ফায়দা আছে । '
খ্যাক খ্যাক করে ছেলেমানুষি ভঙ্গিতে হেসে ফেলল বুড়ো লোকটা । ' আছে তো , নিশ্চয়ই আছে । বাক্সের পিছনের তক্তাটা আলগা । যখন আমার সঙ্গিনী বাক্সের পাল্লা দুটো বন্ধ করে দেয় তখনই আমি চাপ দিয়ে পিছনের তক্তা সরিয়ে নিরাপদ দূরে চলে যাই ।'
'মানে যখন তলোয়ারগুলো নেমে আসে তখন ?' কৌতূহলী গলায় জানতে চাইল রাঘব ।
আসলে খবর বের করছে ।
'তার আগেই । একদম নিরাপদে চলে যাই আমি । পিছনের তক্তাটা স্প্রিঙের সাহায়্যে জোড়া দেয়া থাকে । একদম কাছ থেকে দেখলেও কেউ বুঝতে পারবে না ।' খোসা ছাড়ানো আপেলের একটা ফালি মুখে দিতে দিতে বলল মদনলাল ।
'তাহলে রক্ত ?' অগাকান্তের মত চেয়ে আছে রাঘব ।
'রঙ । শরীরের নানান জায়গায় বেল্টের সাথে লাল রঙের পোঁটলা বেঁধে রাখি । নিজেই ফাটিয়ে দেই । লোকজন বেশ ভড়কে যায় ।'
'অহ কি দুর্দান্ত ।' হেসে ফেলল রাঘব ।
' আর নাকে মুখে যে অ্যাসিডের ক্ষত সেটা মেকাপ ছাড়া কিছু না।' মুখ ভর্তি আপেল নিয়ে আউ আউ করে বলল মদনলাল । ' পকেটে রাখি । নাকে মুখে লেপটে মাখিয়ে দেই । লোকজন বেশ আতঙ্কিত হয়ে ভড়কে যায় । আলগা একটা চুল লাগাই মাথায় । যেটা দেখলে মনে হয় চাদি ফাদি জ্বলে গেছে । '
টেবিলের এক কোনে আলগা চুল ছিল সেটা তুলে নিয়ে দেখাল ।
' অ্যাসিড কি সত্যি নাকি কাচের সেই পাত্র ভর্তি জল মল রেখে দেন ?' মনে মনে আনন্দে বগল বাজাচ্ছে রাঘব ।
'নাহ খোকাবাবু । ওটা আসল । সামান্য ঝুঁকি না থাকলে জীবন নিরামিষ হয়ে যায় । ' মদনলাল আরেক ফালি আপেল চালান করলো মুখে ।
' দুঃখিত । আসলে...।' আমতা আমতা করতে লাগল রাঘব ।' আমি ভেবেছিলাম হয়তো ... কিন্তু ...' বেহায়ার মত হেসে বলল , ' পুরো কায়দাটা শেখাবেন আমাকে ?'
ডানে বামে হাত পাখার মত নিজের মাথাটা দুলিয়ে আপত্তি জানাল বুড়ো যাদুকর , ' অসম্ভব । হতেই পারে না । আমার গুপ্তবিদ্যা এটা ।'
'দয়া করুন । বলুন না ।'
'জীবনেও না।'
' আপনার শিষ্য হিসাবে শেখান না আমাকে । কৃতজ্ঞ থাকব ।'
' কস্মিনকালেও না ।'
'আপনি না বললেন আমরা মায়াজীব । আর সবার চেয়ে আলাদা । আমরা সবাই এক । তাহলে এমন করছেন কেন ? বলুন না ।'
থমথমে চেহারা করে রাঘবের দিকে চেয়ে রইল মদনলাল । বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ । তারপর নাক দিয় ফোঁৎ শব্দ করে বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসল । কেমন রহস্যময় সেই হাসি ।
পেতলের বাঁটওয়ালা বার্মিজ চাকুটা টেবিলের উপর শব্দ করে রাখতে রাখতে বলল , ' ঠিক আছে খোকা বাবু । আমি আপনাকে বলছি কি ভাবে কি করতে হয় । কিন্তু মাত্র একবার দেখাব। আর আপনাকে কথা দিতে হবে এই জাদু জীবনেও কাউকে দেখাবেন না । ঠিক আছে ?'
কথা শেষ করে আধ খাওয়া আপেলটা ছুড়ে দিল রাঘবের দিকে । শূন্যে থাকতেই খপ করে ধরে ফেলল রাঘব ।
উৎসাহের চোটে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো মদনলাল সেরাওগি ।
গায়ের কোট খুলে দেয়ালে গেঁথে থাকা পেরেকে ঝুলিয়ে বলল, ' চটের বস্তা কোথায় ? এই তো পেয়েছি ।'
মেঝেতেই ছিল একটা বস্তা । সেটার উপর দাঁড়িয়ে বস্তা টেনে তুলতে তুলতে বলে যেতে লাগল, ' আমাদের হাতে সময় একদম মাপা। বস্তার উপরের শিকল আর তালা একদম বকোয়াজ জিনিস । ভেতর থেকে ঠেলা দিলেই খসে পড়বে । হাতকড়া ? ওটার দুই স্ক্রু আলগা । বুড়ো আঙ্গুল আর তর্জনী দিয়ে মোচড় দিলেই খুলে যাবে। অতিরিক্ত সতর্কতা হিসাবে পকেটেই চাবি রাখি আমি । কয়েক মুহূর্ত লাগে হাত মুক্ত করে বস্তার মুখ খুলে নিজেকে বের করে আনতে ।'
বাধ্য ছাত্রের মত শুনছে রাঘব ।
আগ্রহের চোটে উঠে দাঁড়ালো সে । আধ খাওয়া আপেলটা টেবিলের উপর রেখে নিতম্বে ড্রেসিং টেবিল ঠেকিয়ে দাঁড়ালো । চোখ বড় বড় করে শুনছে মদনলালের কথা । মুখে মিহি একটা তেলতেলে হাসি ।
বলে যাচ্ছে মদনলাল , ' বস্তার বাইরে যখন গলা চলে আসবে ততক্ষণে দড়ি অর্ধেক পুড়ে গেছে । সামান্য ভিজিয়ে রাখি দড়িটা। ফলে পুড়তে একটু সময় নেয় । হাত বের করে পকেটের কৌটা থেকে মলমের মত মেকাপ মুখে মাখিয়ে ফেলি । মাথার পোড়া আলগা চুল থাকে বাক্সের বাইরে । আগেই বলেছি বাক্সের পিছনের ডালা আলগা । স্প্রিঙের সাথে সাঁটানো । ঠেলা দিলেই আধ হাত পিছিয়ে যাবে । আমি থাকব নিরাপদ দূরত্বে । ওইদিকে তরোয়াল নেমে আসবে বাক্সের ভেতরে । তরোয়াল কিন্তু আসল । বাক্স থেকে থেকে বের হয়ে না পারলে ...।'
আচমকা থেমে গেল মদনলাল ।
ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় চোখ পড়তেই শরীর হিম হয়ে গেছে বুড়োর ।
রাঘব চেয়ে আছে সামনে । কিন্তু ওর একটা হাত পিছনে । সেই হাতের মুঠোয় ধরা বার্মিজ চাকু।
বোকা বোকা ভাবে চেয়ে আছে মদনলাল ।' কি করছেন রাঘব বাবু ?'
'কিছুই করছি না তো ।' মুখ ভর্তি দাঁত বের করে বেহায়ার মত হাসি হেসে জবাব দিল রাঘব ।
'চাকু রেখে দিন জায়গা মত খোকা বাবু ।' ঢোক গিলে ভয়ার্ত গলায় বলল বুড়ো যাদুকর ।
রাঘব এবার সামনে নিয়ে এলো চাকুটা ।
খোঁদাই করা পিতলের বাঁট । উপরে বাঁকানো ইস্পাতের ফলা । কামরার অল্প পার্সিমন ফলের মত হলদে রঙা আলোতে ঝকমক করে উঠলো ফলাটা ।
'তারপর ?' হিস হিস করে উঠলো রাঘব । ' পরের অংশটুকু বলে ফেল ।'
' তাহলে এই ব্যাপার ?' রাগি গলায় বলল মদনলাল । ' আপনি আমার ম্যাজিক ট্রিক চুরি করতে চান ?'
' বলে ফেল বুড়ো হারামজাদা । তারপর কি ?' চাকু ধরে সামনে চলে এলো রাঘব।
' জীবনেও বলব না।' হাউ মাউ করে উঠলো বুড়ো । ' এই মড়া মানুষের সিন্দুক জাদুটা আমাদের পারিবারিক বিদ্যা । বাবা শিখিয়েছিল আমাকে । ঠাকুরদা শিখিয়েছিল বাবাকে । এটাই আমাদের রুজি রুটির উপায় ।'
' অনেক বছর রুজি রুটি করেছিস বুড়ো শূয়র । এইবার বল আমাকে ।' বুড়োর জামার কলার ধরে চাকুটা উপরে তুলে ধরল রাঘব।
দুই হাতে রাঘবের কবজি ধরে আর্তনাদ করে উঠলো মদনলাল, ' দয়া করে আমাকে মারবেন না , ভগবানের দোহাই ।'
গায়ের জোরে বুড়ো পারবে কেন রাগবের সাথে ?
তাছাড়া অবলার বাঁচার আকুতির চেয়ে স্বার্থপর লোভী মানুষের জোর সব সময় বেশি হয় । ধিরে ধিরে চাকুর ফলা নেমে এলো মদনলালের বুক বরাবর । তখনও চেঁচিয়ে যাচ্ছে মদনলাল ।
দুর্ভাগ্য ।
ছিল শীতের রাত ।
হংস থিয়েটারের এই অংশটা দিনের বেলাতেই নিঝুম থাকে । গরমের সন্ধ্যায় গোরস্থানের নীরবতা । শীতের মউসুমে সেটা ছয়গুণ বেশি শুনশান ।
রাত আটটায় শো শেষ হবার পর আরও ভুতুড়ে হয়ে যায় চারিদিক । কেউ জানেও না হলের পিছনে গ্রিনরুমে মদন বাবু আজ রাতে রাঘবকে নিয়ে আপেল খাচ্ছে ।
চাকুর ফলা যথেষ্ট বড় । বুকের ভেতরে পুরোটা ঢুকে যেতেই ডাঙ্গায় তোলা মাছের মত খাবি খেতে লাগল প্রাচীন এই যাদুকর । মেরুন রঙা রক্ত বের হয়ে এলো ফিনকি দিয়ে।
ধপাস করে চালের বস্তার মত শক্ত মেঝেতে পরে গেল লোকটা ।
রক্ত মাখা ফলাটার দিকে চেয়ে রাঘব মুখ দিয়ে ‘ ঝাঁন ঝাঁন’ বিচিত্র শব্দ করল। জাদু দেখানোর সময় পিয়ানো বাদক বা অন্য কোন যন্ত্র সঙ্গীত বাদকেরা দর্শকদের উৎকণ্ঠা বাড়ানোর জন্য অমন শব্দ তৈরি করে ।
অর্ধেক শরীর বস্তার ভেতরেই ছিল । বাকিটুকু ঠেসে ভরতে বেগ পেতে হল না রাঘবের । চাকুটাও বস্তার ভেতরে ভরে মুখটা গিঁট দিয়ে ফেলল ।
' বুড়ো ভাম , তুমি এখন শীতলক্ষ্যার ঠাণ্ডা জলে সাঁতার কাটতে যাবে । সাঁতার শরীরের জন্য উপকারি ।' চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলে বস্তাটা কাঁধে তুলে নিল রাঘব ।
সাত
দুই সপ্তাহ পরের কথা ।
আরাম কেদারায় বসে নখে রুপালি রঙের নেইল পালিশ দিয়ে বাতাসে আঙ্গুল ঝেড়ে শুকাচ্ছিল রাঘব । মনটা বেশ ফুরফুরে । গায়ে সাদা সিল্কের শার্ট । উপরে চুমকির কাজ করা নীল রঙের হাতাকাটা ফতুয়া ।
দরজা খুলে গেল শব্দ করে । ভেতরে ঠেলাঠেলি করে ঢুকল সীতা আর গীতা ।
ওদের একজন খুশি খুশি তৃপ্ত গলায় বলল , ' বিশ্বাস করবেন না আজও হাউজফুল ।'
'কি একটা অবস্থা ।' সায় দিল অন্য বোন । ' এক সপ্তাহ ধরে আমাদের রোজই হাউজফুল যাচ্ছে । কখনও ভাবিনি অমন দিন আসবে ।'
'অবিশ্বাস্য তাই না ।' হাসি মুখে গোঁফের ডগা মুচড়ে একটা কায়দা করতে করতে বলল রাঘব । ' আমি সব সময় বিশ্বাস করতাম, আন্তরিকতার সাথে কাজ করলে ভাগ্যের আকাশে রবি শশী দুটোই দেখা দেয় । পরিশ্রম সৌভাগ্যের আপন মা । পিরামিড একদিনে বানানো হয়নি ...।'
আরও কি কি বলতো কে জানে ।
ঝপাং করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লো মোটাসোটা এক লোক ।
মোটা লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল , ' জনাব আমার নাম উল্লাসকর দত্ত ।আশা করি আপনাদের বিরক্ত করছি না ।'
মোটা লোকটা দেখতে আলুর মত । গায়ের রঙ্গ ও আলুর মত ।মাথা ভর্তি চুল , মুখ ভর্তি দাড়ি গোঁফের জঙ্গল । বেশির ভাগ পেকে গিয়ে কেমন আমের আঁটির মত একটা জিনিস বানিয়ে ফেলেছে চেহারাটা । কাঁধের উপর কাঠের বাক্স টাইপের জিনিস । বাক্সের আবার তিনটে পা আছে ।
'আপনার দেখা পেয়ে খুব খুশি হলাম বাবু ।' বিনয়ে গলে যাওয়া মাখন হয়ে বলল উল্লাসকর । ' আপনার সাথে দুই মিনিট কথা বলতে পারলে আমি বর্তে যাব ।'
'সে তো ভাল কথা , কিন্তু আমার হাতে কোন সময় নেই ।' আঙুলের নখ পরীক্ষা করতে করতে বলল রাঘব ।
'আপনার উপকারের জন্যই আমি এসেছি ।' কাঁধের উপর থেকে তিন পায়া বাক্সটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল উল্লাসকর । ' আমি আপনাকে আরও ধনী ব্যক্তি বানিয়ে দেব ।'
'আপনি হয়তো বুঝতে পারছেন না। আমার শো আছে। মাত্র কয়েক মিনিট বাকি ।'
'আপনি জানেন এই যন্ত্রটার নাম কি ? এটা একটা ক্যামেরা । চলন্ত ছবি তোলা যায় ।'
'এইসব বকোয়াজ খেলনা কিনে টাকার শ্রাদ্ধ করতে চাই না ।'
'খেলনা !' হেসে ফেলল আলু । ' এটা খেলনা না স্যার । আগামী দিনের বিনোদনের জিনিস হবে এই চলন্ত ছবি ।'
'অন্য সময় কথা হবে ।' সত্যি রেগে গেল রাঘব ।
'আমার কথা বুঝার চেষ্টা করুন । আপনি কখনই একই সময়ে দুই জায়গায় থাকতে পারবেন না। যত ভাল যাদুকর হন না কেন আপনি, কখনই সেটা সম্ভব না । কিন্তু আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন তবে আজ আপনার একটা শো আমি চলন্ত ছবি তুলে সেটার হাজার হাজার কপি করে দুনিয়ার সব মঞ্চে দেখানোর ব্যবস্থা করতে পারি। লোকজন টিকিট কেটেই দেখবে । আপনাকে উপস্থিত থাকতে হবে না। টাকা আর টাকা । এখন আর কত কামাচ্ছেন । একশো, পাঁচশো হাজার গুণ বেশি কামাবেন । '
'এই বাক্স দিয়ে ?' সোজা হয়ে উঠে বসলো রাঘব ।
টাকার কথা শুনলে কার না ভাল লাগে ।
'স্যার , দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে আধুনিক যন্ত্র পাতি ব্যবহার করেই টিকে থাকতে হয় । নইলে খেলা শেষ । চালাক মানুষ তাই করে । আমার প্রশ্ন আপনি কি বুদ্ধিমান ? টিকে থাকতে চান ?'
সীতা গীতা চোখ বড় বড় করে আলুর কথা শুনছিল । এইবার দুজনেই ফিরে চাইল রাঘবের দিকে ।
'আমাকে কি করতে হবে ?' কৌতূহল পেয়ে বসেছে রাঘবের ।
'কিচ্ছু না। শুধু রোজকার মত আজও আপনার শো চালিয়ে যাবেন । আমি চলন্ত ছবি তুলব । তারপর আপনি আরাম করে চেয়ারে বসে থাকবেন । মাসে মাসে বস্তা ভর্তি টাকা চলে আসবে আপনার পায়ের সামনে ।'
সীতা গীতা দুই যমজ চোখ মটকে একে অপরকে দেখে নিল । উল্লাস দত্তের কথায় ওরাও উল্লাসিত ।
খানিক চিন্তা করার ভান করলো রাঘব , তারপর মুখের ভাব এমন করলো যেন উল্লাস বাবুকে দয়া করছে , ' আচ্ছা তাহলে করা যায় ।'
'জানতাম রাঘব বাবু ।' হাফ ছেড়ে বাঁচল যেন মাঝবয়েসী লোকটা, যে কিনা বিচ্ছিরি বাক্স দিয়ে চলন্ত ছবি তুলবে ।
' মুনাফার বখরা নিশ্চয় অর্ধেক অর্ধেক ?' করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল রাঘব ।
'আর বলতে ।' মোটা থলথলে হাত বাড়িয়ে দিল উল্লাস দত্ত ।
' সত্তর আমার আর ত্রিশ আপনার হলে কাজটা মোলায়েম হয় ।' বেহায়ার মত বলল রাঘব।
ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল উল্লাস দত্ত , ' একদম খাঁটি ব্যবসায়ী আপনি ।'
আট
মঞ্চের কোণায় দাঁড়িয়ে যার যার নিজের মেকাপ শেষ বারের মত চেক করে নিচ্ছিল সীতা-গীতা ।
তিনজন লোক নিচে বসে যন্ত্রসঙ্গীত বাজাচ্ছে । এদের কাজ অনেক । প্রতি দৃশ্য অনুয়ায়ি শব্দ নির্বাচন করে বাজায় । বেতন ভালই পায় ।
গটগট করে হেঁটে এলো রাঘব। আগের পোশাক । উপরে দামি একটা কোট আর টুপি ।
'কেমন দেখাচ্ছে ।' জানতে চাইল ।
' দারুন দেখাচ্ছে জাদু সম্রাট ।' এক সাথে বলে উঠল যমজ বোন ।
মনটা ভাল হয়ে গেল রাঘবের । বাইরে দর্শকের হাততালিতে কান ঝালাপালা হবার দশা ।
'শুনেছ ।' হাসি মুখে বলল রাঘব । ' থিয়েটারের শব্দ অমন হয়া উচিত আসলে । মেকাপ কোথায় আমার ?'
'চটের বস্তার ভেতরে , যেমন থাকে ।' বলল সীতা অথবা গীতা ।
'বাক্সের পিছনের প্যানেল আবার চেক করেছ নিশ্চয়ই ? স্প্রিং ঠিক মত কাজ করছে ?'
'একদম নিখুঁত ভাবে ।' বলল গীতা অথবা সীতা ।
আরও খানিক সময় নিল ওরা । দর্শকদের খানিক উত্তেজিত করার জন্য ।
'এবার মঞ্চে যাই । ' বলল রাঘব । ' দর্শকের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করানো ব্যবসার জন্য খারাপ।'
শেষ বারের মত দুই বোনের একজন হাত দিয়ে রাঘবের গলার নেক টাই ঠিক করে দিল । গট গট করে মঞ্চে চলে এলো রাঘব । একজন বিজয়ী রাজার মত তার চাল চলন । পিছনে যমজ দুইজন ।
কেউ জানে না , হংস থিয়েটারের পিছনের এক গলি দিয়ে তখন গোপনে হেঁটে যাচ্ছে সুন্দর মত একটা মেয়ে । শীতের জন্য মনিপুরী চাদর দিয়ে সারা শরীর ঢাকা । মাথা মুখ সব । খুব কাছ থেকে দেখলে চেনা যাবে , মেয়েটা কামিনী ।
রাঘব যাকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করেছিল ।
গলির শেষ মাথায় গিয়ে দাঁড়ালো কামিনী । চারিদিকটা সতর্ক ভাবে দেখল ।
কেউ নেই ।
সামনে পান্না রঙের একটা দরজা । উপরে বড় করে লেখা -
প্রবেশ নিষেধ ।
কামিনী প্রবেশ করলো ।
এই পথ চলে গেছে মঞ্চের পিছে । মঞ্চ সজ্জার লোকজন ভারী ভারী জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে যায় এই পথ দিয়েই । সে জানে ।
মঞ্চে প্রবেশ করতেই উপর থেকে উজ্জল আলোর বৃত্ত এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো ওদের উপর । ঝনঝন করে বেজে উঠলো বাজনা ।
নাটুকে গলায় কথা চালাতে শুরু করলো রাঘব , ' শুভ সন্ধ্যা , ভদ্রমহিলা এবং মহোদয়গণ । আমার শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন । আমি জাদু সম্রাট রাঘব ( গত কয়েকদিন ধরে নিজেকে তাই বলছে) আমার সাথে আছে দুই সহযোগী সীতা এবং গীতা । আজ আমি প্রমাণ করব মৃত্যু জিনিসটা আসলে চোখের বিভ্রম ছাড়া আর কিছু না । মড়া মানুষের সিন্দুক এক বিস্ময়কর মায়া । যা দেখিয়ে আমি বিপুল খ্যাতি পেয়েছি ।'
ওই দিকে মঞ্চের পিছন দিক দিয়ে ' মড়া মানুষের সিন্দুকের’ একদম পিছনে চলে এসেছে কামিনী । সব জানে সে । কায়দা করে টান দিতেই বাক্সের পিছনের একটা খোপ খুলে গেল । ভেতরে স্প্রিং, আর সেখানে কাঠের বড় বড় দুটো টুকরো রেখে দিল । টুকরো দুটো ইটের সাইজের সমান । এখন বাক্সের ভেতর থেকে ঠেলা দিলেও স্প্রিং নড়বে চড়বে না ।
ঘাড় ঘুরিয়ে চারিদিকটা দেখে পর্দার আড়ালে চলে গেল কামিনী ।
প্যাঁচাল পেরেই যাচ্ছে রাঘব , ' ভদ্রমহিলা আর মহোদয়গন আপনাদের জন্য আজ রাতে আমি প্রবেশ করব ভয়ংকর মড়া মানুষের সিন্দুকে ।'
বাজনা ।
হাততালি ।
সুন্দরীদের দড়ির টান খেয়ে পর্দা উঠে গেল । পিছনে সেই বাক্স । হুবহু মদনলাল সেরাওগির বাচন ভঙ্গি আর হাবভাব অনুকরণ করে বলে যাচ্ছে রাঘব , ' এই দেখুন উপরে রয়েছে ক্ষুরধার তলোয়ার । আসল জিনিস । লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরের বাইরে বিক্রি করা টিনের খেলার জিনিস না...।'
দর্শক দম আঁটকে রেখে দেখছে ।
এক কোনে মোটা উল্লাস দত্ত দাঁড়িয়ে তার বাক্স ক্যামেরার একটা হাতল ঘুরিয়ে যাচ্ছে । ক্যামেরার গায়ে কাচের গোল লেন্সে চোখ রেখে সব দৃশ্য দেখছে সে। ভেতরে নাকি সেলুলয়েডের ফিল্ম আছে। সব ছবি নাকি উঠছে !
'...আর বাক্সের উপর আছে তরল মৃত্যু অর্থাৎ সালফিউরিক অ্যাসিড । যখন দড়ি পুড়ে যাবে...।' বলছে রাঘব ।
দুই জমজের একজন দৌড়ে গিয়ে দেশলাই ঘষে মোমবাতি জ্বেলে দিল ।
বেশ একটা ভাব নিয়ে গায়ের কোট আর নীল ভেস্ট খুলে মেঝেতে ফেলে দিল ‘জাদু সম্রাট’ । ঢুকে পড়লো বাক্সের ভেতরে । মুখে চলছে বাচালের মত , ' দড়ি পুড়ে গেলেই উপর থেকে নেমে আসবে তলোয়ারের ফলা সেই সাথে তরল মৃত্যু । পালানোর কোন পথ নেই । হাতে হ্যান্ডকাফ আর বস্তার গায়ে শিকল সেটা আবার তালা মারা ...। '
মনোযোগ দিয়ে সব কিছু রেকর্ড করছে উল্লাস দত্ত । তার চেহারায় কিসের যেন আলোছায়ায় খেলা । যেন কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে সে । জানে আজ রাতে কিছু ঘটবে ।
বস্তার ভেতরে রাঘবকে পুরে শিকলে তালা এঁটে দিল দুই যমজ । দরজার পাল্লা বন্ধ করে হুড়কা এঁটে দুই সুন্দরী চলে গেল মঞ্চের এক কোনে । হাসি মুখে মোহনীয় একটা ভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে রইল ।
দরজার পাল্লা বন্ধ হতেই পকেট থেকে চাবি বের করে আনল রাঘব । বস্তার ফাঁক দিয়ে হাত বের করে তালা খুলতে লাগল মাত্র পাঁচ সেকেন্ড ।
প্রতি মুহূর্ত এখন দামি । এই খেলার মূল উপাদান – সময় ।
বস্তা খসে পড়লো পায়ের কাছে ।
পকেট থেকে টিনের একটা কৌটা বের করে আনল । মেকাপের মলম । রঙ, মুলতানি মাটি, করঞ্চা তেল , এ রকম কয়েক পদের জিনিস মিশিয়ে বানানো । আচ্ছা করে দুই গালে, কপালে মেখে নিল ।
হাতের তালু দিয়ে চাপ দিল বাক্সের পিছনের কাঠের তক্তায় । প্রতিবার সামান্য ধাক্কায় স্প্রিং ডেবে যায় । শরীর পিছিয়ে নিরাপদ জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে রাঘব। দড়ি পুড়ে যখন খুশি উপর থেকে তলোয়ার পড়ুক সমস্যা নেই ।
রাঘব নিরাপদ।
পরে পকেট থেকে রঙ ভরা বেলুন বুকের কাছে ফাটায় । ভেতরে গিয়ে ত্রিভঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে হাউ মাউ করে । সহকারিণী দুইজন দরজা খুলে ওকে বের করে । সবাই দেখে তলোয়ারের ঘায়ে মোরব্বা হয়ে গেছে ।
গৎ বাঁধা হিসাব ।
আজ স্প্রিং এঁটে গেল কেন ?
উলটা দুই হাত দিয়ে পাগলের মত পিছনের তক্তায় ধাক্কা দিতে লাগল । কোন পরিবর্তন নেই । তক্তা অটল ।
ঘেমে গেল রাঘবের সারা শরীর । সর্বনাশ ! স্প্রিং নষ্ট হয়ে গেছে ?
শো শুরুর আগে নিজে পরীক্ষা করেছে । তখন তো ভালই ছিল ।
' বাঁচাও।' চেঁচিয়ে উঠলো রাঘব । ' বের কর আমাকে ভেতর থেকে । জলদি কর । সমস্যা হয়েছে ।'
ক্যামেরা রোল করেই যাচ্ছে উল্লাস দত্ত । লেন্সের দিকে চেয়ে নেই আর । সোজা তাকিয়ে আছে মঞ্চের দিকে । মুখে কেমন যেন হাসি । চোখে জিঘাংসা ছাপ যেন । কিসের এত ক্ষোভ এই লোকের ?
তখনও চেঁচাচ্ছে রাঘব । ‘বাঁচাও আমাকে। বের করে আনো ।'
দড়ি পুড়ছেই।
কাঠ হয়ে বসে দর্শক দেখছে সব । যারা আগেও খেলা দেখেছে বা সীতা গীতার কোন বিকার নেই । এই সব চিল্লা ফাল্লা শো - এর একটা অংশ । উত্তেজনার পারদ তুলে ধরার কায়দা ।
কে না জানে !
পটাং করে ছিঁড়ে গেল দড়ি । পুড়ে গেছে । উপর থেকে নেমে এলো ইস্পাতের তীক্ষ্ণ তরোয়ালগুলো । অ্যাসিডের বাউল উল্টে পড়লো নিচে ।
মরণ চিৎকার দিয়ে উঠলো রাঘব।
দৌড়ে গিয়ে বাক্সের দরজা খুলে দিল দুই সুন্দরী ।
দরজার দুইপাশে হাত ছড়িয়ে হাসি মুখে আবেদনময়ী একটা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল ।
দর্শক দেখল আট তলোয়ারের ফলায় গেঁথে দাঁড়িয়ে আছে রাঘব । চিৎকার করছে কুরুক্ষেত্রে আহত কৌরব সেনার মত ।
'হুক টেনে লিভার উপরে তোল ...।' যন্ত্রণা কাতর গলায় বলল রাঘব ।
দৌড়ে গেল দুই কন্যা । পাশেই ছিল লিভারে বাঁধা দড়ি । টেনে ধরতেই আগের জায়গায় চলে গেল সব তলোয়ার ।
টেঁটা বিদ্ধ মাছ মুক্ত করলে যেমন করে ঠিক সেই রকম করে বাক্সের ভেতর থেকে বের হয়ে মঞ্চে উপর হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়লো ।
চেঁচাচ্ছে পাগলের মত । মাথার চুল উঠে গেছে ।দুই হাতের তালু দিয়ে চোখ কচলাচ্ছে । ' আমাকে বাচাও । কেউ ডাক্তারের খোঁজ নাও । জলদি ডাক্তারকে খবর দাও কেউ ।'
মঞ্চের উপর গড়াগড়ি খেতে লাগল রাঘব ।
যারা রাঘবের শো আগে দেখেছে তাদের সবার কাছে মনে হল আজ বেশি নাটক করছে বেচারা ।
সীতা গীতার একজন ব্যাপারটা প্রথম বুঝতে পারল । চিৎকার করে উঠলো মেয়েটা । ওর দেখাদেখি ওর বোনটাও ।
এইবার সব দর্শক বুঝল জাদু না, সত্যি সত্যি ঘায়েল হয়েছে জাদু সম্রাট ।
দর্শকদের ভিড় থেকে প্রথমে উঠে এলো কামিনী । গায়ে চুমকির কাজ করা
অপূর্ব পোশাক । পরীর মত লাগছে ওকে।
সোজা গিয়ে দাঁড়ালো উল্লাস দত্তের পাশে ।
' ধন্যবাদ কামিনী ।' ভরাট গলায় কথাটা বলে কামিনীর হাতে ক্যামেরা ছেড়ে দিয়ে পাশের চেয়ার থেকে কোটাটা তুলে নিল উল্লাস দত্ত । গায়ে চাপিয়ে পা বাড়াল সামনে । ক্যামেরা রোল করতে লাগল কামিনী ।
এর মধ্যে থিয়েটারের দর্শক দৌড়ে ভাগছে ।
পাঁকাল মাছের মত হাচরে পাছড়ে সামনের দিকে যাচ্ছে আর সাহায়্যের আশায় চেঁচাচ্ছে রাঘব । এক জোড়া পা থামল ওর মুখের সামনে ।
উল্লাস দত্ত ।
'আমাকে সাহায়্য করুন দয়া করে ।' আকুতি জানাল রাঘব ।
'দুঃখের বিষয় , মড়া মানুষের সিন্দুক প্রজেক্টটা আমাদের লাখপতি করতে পারবে না।' আফসোসের সুরে বলল উল্লাস ।
রাঘব কিছু বলার আগেই হো হো করে হেসে ফেলল উল্লাস দত্ত ।
তারপর পিঠের বাঁধা চাদরটার এক প্রান্ত ধরে ইন্দ্রপুরীর নর্তকীর মত কয়েকটা পাক দিল মঞ্চের উপর । নীল কুয়াশা পাক খেতে লাগল লোকটার চারিদিকে । শরীর থেকে চুমকির মত কীসব খসে পড়লো । কোটের পকেট থেকে বের হয়ে গেল এক ঝাঁক জোনাকি ।
পাক খেয়ে স্থির হয়েই হাসি মুখে চাইল রাঘবের মুখের দিকে ।
চমকে উঠলো রাঘব ।
ব্যাথা যন্ত্রণা সব ভুলে গেল ।
ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে মদনলাল সেরাওগি ।
' মদনলাল ! আপনি ?' শুধু এইটুকু বলতে পারল রাঘব ।
' খোকা বাবু আমার লাশটা নদীর জলে ফেলে দেয়ার আগে একবার ভাল করে দেখা দরকার ছিল আমি মরেছিলাম কি না ।’ হাসি মুখে বলল মদনলাল সেরাওগি । ' একই ভুল বারবার করলেন কেন ? হো হো হো ।'
বলা শেষ করেই আরেকবার চরকির মত পাক দিল বুড়ো যাদুকর ।
হাসির শব্দে কানে তালা লেগে যাবে রাঘবের ।
আবার কুয়াশার ঘূর্ণিপাক । চেহারা পাল্টাচ্ছে না মদনলালের ? তাইতো !
শেষ পাক দিয়ে রাঘবের মুখোমুখি হল বুড়ো মত লোকটা । মুখ দিয়ে বিচিত্র ' তাডান' শব্দ করলো । লোকটাকে চেনে রাঘব ।
'গণপতি বাবু আপনি ?' আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলো সে।
দাঁড়িয়ে আছে রাঘবের ওস্তাদ গণপতি রায় । যাকে নিজের হাতে খুন করেছে রাঘব ।
' হ্যাঁ , বাবা ।' নরম সুরে বলল গণপতি রায় । ' শিষ্য সারা জীবন শিষ্যই থাকে । গুরুর সিংহাসন টলাতে পারে না । তোমাকে বরখাস্ত করা হল ।'
' আপনি বেঁচে ...।' কথা বলা শেষ করতে পারলো না রাঘব ।
হেসে উঠল গণপতি রায় , ' না , মরিনি । প্রথম দিন যেদিন আমার শিষ্য হতে ভর্তি হলে। সেই দিনই সন্দেহ হয়েছিল , বদ মতলব নিয়ে ঢুকেছ তুমি । তারপর যে সব ঘটনা ঘটেছে সবই মায়া । কখনই ঘটেইনি । আমাকে নিয়ে যা করতে চেয়েছ সব তোমার সামনে আমিই দেখিয়েছি । ওটাই আমার জাদু । মাত্র কয়েক মিনিট সময় কাটিয়েছ আমার সাথে অথচ তোমার মনে হয়েছে পাঁচ বছর । হাহ হাহ হা । তবে তোমার যন্ত্রণা আর মৃত্যু হবে আসল । এটাও আমার জাদু ।'
ধপাস করে মাথাটা মেঝেতে পরে গেল রাঘবের ।
মারা গেছে ।
'দর্শকমণ্ডলী দুর্ঘটনায় আমাদের একজন নতুন কর্মচারী মারা গেছে ।' মঞ্চে ঘোষণা দিচ্ছে কামিনী । কৌতূহল সামলাতে না পেরে মড়া মানুষের সিন্দুকে ঢুকে পরেছিল । কাল থেকে আবার আমাদের অনুষ্ঠান চলবে । ঘোষণাটি শেষ হল ।'
বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন