মদ্যপান করতে হয় সন্ধ্যার পরে।
এইসব সোনালী গরল পান করার জন্য দুপুরবেলা সময়টা ততবেশি যুতসই হয় না । অ্যালকোহল দ্রুত মিশে যায় রক্তের সাথে। মাথা ধরে।যন্ত্রণা। কষ্ট হয়।
মোতালেব জানত না ব্যাপারটা।
ঢাকায় পৌঁছে প্রথম পেটচুক্তি বিরিয়ানি খেয়েছে। ঢাকায় যাবে আর বিরিয়ানি খাবে না এটা হয় না।
তাছাড়া রাস্তার পাশের দোকানের সামনে বুড়ো থুরথুরে এক চাচা দাঁড়িয়ে ছিল। গলায় লাল গামছা। গায়ে হাতির দাঁতের রঙের পাঞ্জাবি । চেক কাঁটা লুঙ্গি।
সেই চাচা রাস্তার লোকজনদের জাপটে ধরে ধরে দোকানের ভেতরে ঢোকাচ্ছিল। মুখে মেশিনগানের মত বুলি ফুটছিল- ‘ খায়া যান , খায়া যান। দুলাভাইয়ের বিরিয়ানি। বোরহানি ফ্রি এক গেলেস ।খায়া যান - খায়া যান। দুলাভাইয়ের বিরিয়ানি।’
গেলেস মানে গ্লাস।
উনার নূরানি চেহারা আর গায়ে শয়তানের মত জোরের কারনে লোকজন ভেতরে ঢুকছিল বেশ। তাছাড়া বিরিয়ানির ঘ্রাণটা বেশ ঝিনকি দেয়া।
বেশ আরাম করে খেল মোতালেব।
হাড্ডি কম । মাংস বেশি। অতিরিক্ত তেলে চপচপ করছে না। আবার দারুন এক ফালি আলুও দিয়েছে। রোস্ট করা।
বোরহানিটা ভাল। বাচ্চাদের বমির মত না।
খাওয়া শেষ আবিষ্কার করলো দোকানের পিছনে একটা ঘুপসি মত জায়গায় পলিথিন ব্যাগে করে দেশি মদ বিক্রি হচ্ছে। চাইলে ওখানে বসেও খাওয়া যায়।
গ্লাস দেয়া হবে। গ্লাসের জন্য আলাদা দাম।
কি মনে করে এক গ্লাস কিনে টুলে বসে গেল।
পরিবেশটা ততটা ভাল না। ঘাম আর প্রস্রাবের গন্ধ। সিগারেটের ধোঁয়া।
অনেকেই মদ্যপান করছে ।
বাইরে খটখটে রোদ । কিন্তু গান বাজছে , এই বৃষ্টি ভেজা রাতে চলে যেও না ।
ঝাল চানাচুর, ঘুগনি বা আলু কাবালি লাগবে কি না জিজ্ঞেস করলো গম্ভীর মদ বিক্রেতা। কাওয়ালী গায়কদের মত উনার চেহারা। মাথায় উল্টানো নৌকার মত জরির টুপি।
একবার ভাবল নেবে। কিন্তু মনে পড়লো, মালটা ডেলেভারি দিতে হবে। গাহেক অপেক্ষা করছে। এই পুরানো কয়েক পাতা কাগজ পৌঁছে দিলেই বিশ হাজার টাকা দেবে।
নাহ, আগে কাজ। পরে আনন্দ।কাজই জীবন।
বের হয়ে গেল দোকান থেকে।
সামান্য টলছিল। বের হতে না হতেই বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় পরে গেল।
মাথা ফেটে গেল তরমুজের মত।
মরার আগে মনে হল, মদ না খেয়ে গাহেকের কাছে আগে গেলে ভাল হত।
এক
থানার বাইরে বেশ কয়েকটা কাঠ বাদাম গাছ। অনেকেই জংলী বাদাম বা বাক্সবাদাম বলে।
জানালা দিয়ে গাছগুলো দেখছিলেন ইমান আলী চুনুরি। এই গাছগুলো একেক মৌসুমে একেক রূপ ধরে । পাতাগুলো সবুজ, আর সব গাছের পাতার মতই। সেটা বদলে হয়ে যায় দুর্লভ অচেনা কোন ধাতুর মত লাল টুকটুকে। সেটা বদলে হয় হলুদ। শেষে বাদামী।
দেখার মত জিনিস।
আর ফলগুলো যেন গয়নার বাক্স। ভেতরে মেরুন ভেলভেটের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে বাদামগুলো। খুব উপকারি জিনিস । কিন্তু বেশি খেলে মনে হয় গা গুলিয়ে আসে। বেশি সব কিছুই খারাপ। বেশি অমৃত খেলেও নিশ্চয়ই কোন সমস্যা হবে ? বেশি অমৃত পানে দেবতাদের স্বভাব নষ্ট হয়। পুরাণ পড়লেই বুঝা যায়।
বসে বসে গাছ দেখাতেই আনন্দ পান ইমান আলী চুনুরি।
তাই দেখছিলেন।
মনে মনে ঠিক করলেন, অবসর নেয়ার পর গ্রামের বাড়ি চলে যাবেন।
লালটালির একতলা একটা বাড়ি বানাবেন। বারান্দা বানাবেন সুন্দর করে। ওখানে বসে কমলার ঘ্রাণওয়ালা চা খাবেন চীনেমাটির পেয়ালা ভর্তি করে। প্রচুর গাছপালা থাকবে চারিদিকে। রাতের বেলা পাতা ঝরার শব্দ শুনতে শুনতে গরম ভাত আর বাঁশপাতা মাছের ঝোল খাবেন। সাথে ধনেপাতা আর লাল পেঁয়াজের সালাদ। হলুদ শর্ষে বাটা।
মনে মনে আরেক চামচ ধনে পাতা আর লাল পেঁয়াজের সালাদ নিচ্ছিলেন তখনই বাদুরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল ভবানী প্রসাদ ভবঘুরে।
'কোন খবর ?' মুখের লালা সুরুত করে টেনে জানতে চাইলেন ইমান আলী।
'সিরিয়াস কিছু না স্যার।' জবাব দিল কনস্টেবল ভবানী প্রসাদ। ' বটতলার এক সাধু শুয়ে ঘুমাচ্ছিল। ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করে তার পরনের লালসালু চুরি হয়ে গেছে ।'
'আহারে। মানুষ কত খারাপ । ' দুঃখ প্রকাশ করলেন ইমান আলী।
'পরে আমরা আবিস্কার করি খানিক দূরে, দুলাভাই বিরিয়ানি হাউজের সামনে বিরিয়ানির ডেকচিতে সেই লালসালু পেঁচিয়ে রেখেছে। সেটা বাজেয়াপ্ত করে সাধুকে ফিরিয়ে দিয়েছি।'
' ভাল করেছেন । সাধু এতক্ষণ ছিল কি ভাবে ?' অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন ইমান আলী ।
' দুটো বড় বড় বটের পাতা ব্যবহার করেছিল।'
'আসলে প্রকৃতিই আমাদের রক্ষা করে।' বড় একটা শ্বাস ফেলে বললেন ইমান আলী। ' একটা জিনিস বুঝলাম না বিরিয়ানির দোকানে হাড়িগুলোতে লাল কাপড় পেঁচিয়ে রাখে কেন ?'
' দুটো কারনে স্যার। এক হচ্ছে খদ্দেরের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। লাল রঙ দূর থেকেই চোখে পড়ে।'
'আর দ্বিতীয় কারন ?'
'পাতিলের তলার কালো কুচকুচে রঙ আড়ালে রাখার জন্য। খারাপ লোক যেমন করে দামী পোশাক পরে নিজের কালো চরিত্র লুকাতে চায় তেমনই।'
' তো, এইই। আর কিছু হয়নি আজ ?'
'দুলাভাই বিরিয়ানি হাউজের উল্টাদিকে রাস্তায় একটা ডেডবডি পেয়েছি স্যার।’
'বিরিয়ানি খেয়ে মারা গেছে ?'
'না স্যার, রোড এক্সিডেন্ট। রাস্তার পাশের ট্র্যাফিক পুলিশ ড্রাইভারকে আটক করেছে। মাতাল ছিল লোকটা ?'
'ড্রাইভার ?'
'না মরা লোকটা।'
'তার মানে মদ খেয়ে হাঁটতে গিয়ে গাড়ির তলায় পড়েছে, তাইতো ? নির্জলা দুর্ঘটনা । '
'ব্যাপারটা তেমন ই স্যার।' জবাব দিল ভবানী প্রসাদ। 'ড্রাইভারকে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। বিরিয়ানি দোকানের মালিক আর আশেপাশের দোকানগুলোর সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সবার বর্ণনা এক। মদ খেয়ে সামান্য টলছিল। বাসের সাথে বাড়ি খেয়ে পটল বা কি যেন সবজী তোলে না ? সেটাই তুলেছে।'
'ভিকটিমের পরিচয় ?'
'জানা জায়নি। চেষ্টা করা হচ্ছে। ভাল খবর হচ্ছে ভিকটিমের মোবাইল চুরি হয়নি। এইসব ক্ষেত্রে লাশের পকেট থেকে টাকা-মোবাইল হাপিস করে দেয় কিছু ‘ মাসুম জানোয়ার’ । এখানে পারেনি। আমরা মোবাইলের কল লিস্ট থেকে ওর পরিচয় পেয়ে যাব।'
'সামান্য কেস।' হতাশ সুরে মন্তব্য করলেন ইমান আলী।
'হতে পারে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে লোকটার ব্যাগে একদম হলুদ হয়ে যাওয়া কতগুলো কাগজ পাওয়া গেছে। দলিলের মত মনে হলেও দলিল না। সংস্কৃতি ভাষায় লেখা। কিন্তু প্রত্যেকটা পাতায় সিঁদুর দিয়ে মা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের চিহ্ন আঁকা। মনে হচ্ছে লক্ষ্মীর পাঁচালী। কিন্তু এইযুগে অমন হাতে লেখা জিনিস নিয়ে কেউ ঘুরবে কেন ? এটাই বড় পয়েন্ট না । ভিকটিমের পকেটে একটা বিজনেস কার্ড পেয়েছি। সামান্য রক্ত লেগে গেলেও নষ্ট হয়নি জিনিসটা।'
' কার্ডের নাম্বারে ফোন দিয়েছেন তাই না ?' হাসলেন ইমান আলী চুনুরি।
'হ্যাঁ, স্যার। কোন এক রাশেদুল হাসান নামের এক ভদ্রলোকের। উনি রামকানাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক। জিজ্ঞেস করলাম এমন জামাকাপড় পরা এই নাম্বারের কাউকে চেনেন নাকি?'
'চেনে?'
'নাহ। সাফ সাফ বলে দিলেন কাউকে চেনেন না। হয়তো কোন ভাবে কুঁড়িয়ে বা অন্য কোন ভাবে উনার কার্ড পেয়েছে। ঘটনা শেষ নয়। ভিকটিমের মোবাইল খুলে চেক করলাম। শেষ কল করা হয়েছিল এই অধ্যাপক সাহেবকে। আগেও দুইচার বার অমন ফোন করেছিল। '
'তার মানে অধ্যাপক রাশেদুল হাসান মিথ্যা কথা বলেছেন আপনার কাছে?'
'একদম স্যার।'
'আর যেখানে মিথ্যা সেখানেই ক্রাইম।' গম্ভীর মুখে বললেন ইমান আলী।
‘ মিথ্যা কেন বলে সেটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার স্যার। চরম সত্যবাদী মানুষ পাওয়া মুশকিল। ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির ও নাকি একবার মিথ্যা বলেছিলেন। সেটা লোভে পড়ে বা কাইল্লা কৃষ্ণের প্ররোচনায় । সেই সব আলোচনা বাদ। কথা হল অধ্যাপক রাশেদুল হাসান নির্জলা মিথ্যা বলেছেন। মৃত ব্যক্তি শেষ কল করেছিল তাকে অথচ সে নাকি চেনে না।'
'লক্ষ্মীর পাঁচালীটা দেখি।' হাত বাড়ালেন ইমান আলী।
'এই যে স্যার।' পলিথিনের ব্যাগে করে জিনিসটা বয়ে বেড়াচ্ছিল ভবানী প্রসাদ। বের করে দিল। ‘ রক্ত লেগে নষ্ট হয়নি।’
মাত্র দশ পাতার কাগজ। পুরানো। রঙটা তেজপাতার মত হয়ে গেছে। পোকায় কাটেনি। যত্নে ছিল।
প্রথমেই মা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। করঞ্চা তেল আর সিন্দুর মাখিয়ে ছাপ দেয়া। উজ্জ্বল রঙ এখনও বসন্তের সূর্যাস্তের মত জ্বলছে। পুরানো দিনের মানুষ রঙ বানাতে হরেক কায়দা করতো। আজ সেই সব আমরা জানি না।
ভ্যান গগ হলুদ রঙের সাথে ডিমের কুসুম মিশিয়ে নিত। কখনও ঘাসপোকার উজ্জল ডানা। সেই রঙ হত অপার্থিব।
'কি লেখা এতে ?' অবাক হলেন ইমান আলী। 'সংস্কৃত ভাষা তাই না?'
'জি স্যার। কিন্তু আমি পড়তে পারি না।' লজ্জিত গলা ভবানী বাবুর।
'হিন্দুর ছেলে হয়ে…।' বিরক্ত হলেন ইমান আলী।
'আরে স্যার আমি রামায়ণ পর্যন্ত পড়িনি ।কারন আমার বাবার নাম ছিল রামগোপাল। আর সংস্কৃত তো মরা ভাষা।'
'মরা ভাষা মানে ? ভাষার আবার ডেড বডি আছে নাকি ?'
'আছে স্যার। প্রতি চৌদ্দ দিনে পৃথিবী থেকে একটা করে আঞ্চলিক ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। যে ভাষায় লোকজন কথা বলে না সেটাই মরা ভাষা। যেমন, ল্যাতিন ভাষা। এক সময় সারা দুনিয়ায় চর্চা হত। কবিতা উপন্যাস লেখা হত। অভিজাত লোকজন আহ্লাদ করে শিখতো। এখন বাতিল ।অনেক ভাষাই হাঁরিয়ে যায়। এক গবেষক বলেছেন তুমুল জনপ্রিয় ইংরেজি ভাষাও নাকি এক সময় হারিয়ে যাবে। আবার যেমন বুশম্যানদের ভাষা। মাত্র আঠারো জন মানুষ এই ভাষায় কথা বলে। কিন্তু টিকে আছে।'
'আগে কি আমরা বাংলার অধ্যাপক রাশেদুল হাসানের সাথে কথা বলব ? মনে হচ্ছে উনাকে ধরলে মৃতের পরিচয় যাবে।' জানতে চাইলেন ইমান আলী।
'আমারও সেইরকম মনে হচ্ছে স্যার। এই রাশেদুল বেশ ঝোলের মাছ।'
'মানে ?'
'কোন মানুষ বেশি ভদ্রলোক হলে ভাল লাগে না আমার।'মুখ কুঁচকে বলল ভবানী বাবু । ' স্বর্ণে খাদ মিশিয়ে গয়না বানাতে হয়। সহজ হিসাব। কিন্তু অধ্যাপক রাশেদুল হাসান খুব বেশি ভদ্রলোক যেন। মিহি গলায় কথা বলেন। উনার শখ পুরানো বই, পয়সা আর পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করা। এইসব শখ প্রথমে নির্দোষ থাকে। পরে আর ততটা নির্দোষ থাকে না। ব্যবসা আর লোভ ঢুকে যায়। দুর্লভ বই বা ডাকটিকিটেরর জন্য খুন খারাবি হতে দেখেছি।'
' আপনি কি ইঙ্গিতে কিছু বলতে চাইছেন ?' অবাক হলেন ইমান আলী।
'স্যার আমি খবর পেয়েছি এই রাশেদুল হাসান পুরানো বই আর পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেন । আর কি কাণ্ড, মরা লোকটার ব্যাগে আমরা পুরানো দিনের একটা লক্ষ্মীর পাঁচালী পেয়েছি। কাকতালীয় না ?'
'কাকতালীয় না একদম কবুতরতালীয়।' ক্রু হেসে বললেন ইমান আলী। 'রাশেদুলকে ফোন করে । ওর ঠিকানা নিন। দেখে আসি বাংলার প্রফেসরকে। দেখি আমাদের বাংলা কেমন । কত নাম্বার দেয় আমাদের । '
দুই
বাড়িটা নির্জন জায়গায়।
পুরানো দিনের বাড়ি। আজকাল কেউ গাছ বুনে না। এই বাড়িতে গাছেরা ভাল আছে।
বাইরে পাকা ভুট্টার দানার রঙের রোদ।
রাশেদুল হাসানের বয়স কম না । মধ্য বয়স্ক অধ্যাপক। টিশার্টে- জিন্সের প্যান্টে ক্যাঁচরা ছোকরা মনে হয়। পায়ে ফিলা ব্র্যান্ডের স্যান্ডেল । তবে বসার রুমটা দেখার মত। তিন দেয়াল জুড়ে কাঠের আলমারি ।
ঠাসা বই। বই আর বই। আজকাল কোন দোকানেও এত বই থাকে না। দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধাই করা কলের গানের রেকডের কভার। সব মিলিয়ে সংগ্রাহকের বাড়ি।
' চা দিতে বলি ?' মিহি গলায় বলল রাশেদুল হাসান।
'সাথে কিছু ভাল মানের বিস্কুট দিতে বলবেন।' একগাল হেসে বলল ভবানী বাবু। ' আজকাল মেহমানদের ভাল বিস্কুট দেয় না কেউ । আমাদের সময় দিত। বরফি বিস্কুট, কাচ্চা বিস্কুট, ক্রিম দেয়া বিস্কুট। একদম আলাদা বয়ামে করে রেখে দিত বাড়ির লোকজন। সেইসব দিন গত হয়েছে। চা ও দিতে চায় না লোকজন। বলে বাড়িতে গ্যাস নেই। কি কাণ্ড, চাইলে হিটারে চা বানানো যায়।'
'চা লাগবে না।' গম্ভীর গলায় বললেন ইমান আলী। ' কিছু তথ্যের জন্য আপনার কাছে এসেছি প্রফেসর সাহেব।'
'আমি আগেও বলেছি অমন কোন লোক আমি চিনি না।' হালকা বিরক্ত হল রাশেদুল হাসান।
'কিন্তু মরার কুড়ি মিনিট আগে আপনাকে ফোন দিয়েছে।'
'আমার নাম্বার অনেকেই জানে ।
'অনেকেই জানবে কেন ?'
'বারে, আমি দেয়ালে দেয়ালে পোষ্টার সাঁটিয়ে দেই। ওখানেই নাম্বার দেয়া থাকে।'
'কিসের পোষ্টার ?' ইমান আলী অবাক।
'ঐ যে পড়াইতে চাই লেখা পোষ্টার।'
‘ আজকাল শিক্ষকরা পোষ্টার দিয়ে ছাত্র যোগাড় করে নাকি ?' আরও অবাক ইমান আলী।
'জি স্যার। আপনি খেয়াল করেননি। আমি করেছি। বেশির ভাগ দেয়াল ভর্তি এইসব পোস্টারে । ইংরেজি শেখাবেন অ্যান্টনি স্যার। অঙ্কে কাঁচা ? যোগাযোগ করুন সমীকরণ স্যার। সমাজ বিজ্ঞান শেখাবেন ডেইজি আপা। এইসব হাবিজাবি।' দ্রুত বলল ভবানী বাবু।
'শিক্ষার কি করুন অবস্থা।' মুখ দিয়ে চুকচুক করে আফসোস করলেন ইমান আলী।
' শুধু করুন না স্যার। একদম ফের ফেরে অবস্থা। দেশে চায়ের দোকানের চেয়ে কলেজ বেশি। দুইতলা দালান লেখা- লেলিনগ্রাদ আন্তজাতিক বিশ্ব বিদ্যালয়। পাশ করার পর লোকজন শুধু টাই পড়তে শেখে। সেটায় বাহবা দেয়ার কি আছে? টাই তো আজকাল কুত্তা আর শেয়ালের গলায় থাকে। রাস্তায় শরবৎ বিক্রেতা গায়ে কোট পরে।'
'তো ভিকটিম আপনাকে ফোন করে কি বলেছিল ?' জানতে চাইলেন ইমান আলী।
'মনে নেই স্যার।' হতাশ সুরে বলল রাশেদুল হাসান।
'আগে পরে কখনই ফোন দেয়নি ?'
'না স্যার।'
'কিন্তু কল রেকর্ড তো বলছে আপনারা নিয়মিত কথা বলতেন।' কৃত্রিম ভৎসনার সুরে বললেন ইমান আলী।
'বললাম তো স্যার, অনেকেই ফোন করে আমাকে। শিক্ষক মানুষ। মহল্লার ডিমওয়ালাও ফোন করে জানতে চায় কয়েক হালি রাজহাঁসের ডিম আমার বাসায় পাঠিয়ে দেবে কি না। প্রযুক্তি সহজলভ্য হলে অমন ঝামেলা হয়। জানেনই তো। '
যেন মহাচিন্তায় পড়ে গেছেন অমন মুখভঙ্গি করে ইমান আলী বললেন, ' মরা লোকটার কাছে চটের একটা ব্যাগে হলুদ হয়ে যাওয়া কিছু কাগজ পেয়েছি। ফালতু বাতিল কাগজ। পরীক্ষার খাতা হতে পারে। কে জানে। আমরা ওগুলো ঝালমুড়িওয়ালাকে দিয়ে দেব ভাবছি।কোন কাজেই আসবে না। '
এই প্রথম চঞ্চল হয়ে উঠলো বাংলার অধ্যাপক।
'জিনিসগুলো কি আমি দেখতে পারি ?' লোভাতুর গলা অধ্যাপকের।
'কারন কি জানতে পারি ?' মুচকি হাসলেন ইমান আলী।
'পুরানো পুঁথি, বই, পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করি আমি। দেখতে বুঝতে পারতাম ওটার কদর কতখানি।'
'মনে হয় না দামী কিছু। বাতিল করে দিলেই হবে।'
'প্লিজ স্যার। আমাকে একটু দেখতে দিন।' অনুনয় ফুটে উঠলো রাশেদুল হাসানের গলায়।
' মৃত ব্যক্তিকে আপনি চিনতেন। আপনার জন্য এই লক্ষ্মীর পাঁচালী নিয়ে শহরে আসছিল তাই না ? পরে দুর্ঘটনায় মারা গেছে।' চকমকে চোখে ভদ্রলোকের দিকে চাইলেন ইমান আলী।
কামরার ভেতরে তত গরম না। মাথার উপর সিলিং ফ্যান বাতাস ঘুঁটে দিচ্ছিল। তারপরও মনে হচ্ছে রাশেদুল হাসান ঘেমে উঠলো।
'আমরা জানি হরেক কায়দা করে পুরানো বই, পয়সা আর পাণ্ডুলিপি কেনেন আপনি। সব মাল সহজে আপনার হাতে আসে না। চোরাই মালও কেনেন ।’
মুখটা কয়েকবার অব অব করে খুলে বন্ধ করলো রাশেদুল হাসান। বালটিক সাগর থেকে স্যামন মাছ ধরা পড়লে মাছগুলো অমন করে।
'বলছি স্যার।' কাপা কাপা নার্ভাস গলায় বলল সে। 'আপনারা চা নিন।'
'এতক্ষণ লাগে নাকি চা দিতে।' মন্তব্য করল ভবানী বাবু।
ট্রে করে চিনামাটির পেয়ালা ভর্তি চা আর তশতরি ভর্তি বিস্কুট এলো। কোন আক্কেলে একটা আপেল ফালি ফালি করে কেটে দিয়েছে। বিবর্ণ হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।
'লোকটার নাম মোতালেব। নিমগঞ্জে বাড়ি।' একটা পেয়ালা হাতে তুলে নিতে নিতে বলল রাশেদুল। 'পেশায় ছিঁচকে চোর। গ্রামের মানুষদের হাবিজাবি জিনিস চুরি করে গঞ্জের হাটে বিক্রি করে। অমন কি বদনা বা টিউবওয়েলের হাতল পর্যন্ত বিক্রি করে।'
' তো অমন একজন ছিঁচকে চোরের সাথে আপনার পরিচয় হল কি ভাবে ?' আগ্রহের সাথে জানতে চাইলেন ইমান আলী। ‘ বাংলা শিখতে চাইতো নাকি ?’
' বলছি।' জিভ পুড়ে যাবার ভয়ে সাবধানে পেয়ালাতে চুমুক দিতে দিতে বলল রাশেদুল ।
'পুরানো জিনিস সবাই সংগ্রহ করে না। সময়, টাকা, স্থান সবই লাগে। আমার এক বন্ধুর বাবা তার পাঁচ হাজার বই বিক্রি করে দিয়েছিলেন শুধুমাত্র বাড়িতে রাখার জায়গা নেই বলে । ফেরিওয়ালারা এ ব্যাপারটা ভাল জানে।
‘ আমার শৈশবে নানাজানের কাছ থেকে তামার একটা পয়সা পেয়েছিলাম। পরে জেনেছি ওটা ইস্ট ইনডিয়া কোম্পানির মুদ্রা। ইংরেজরা ১৭১৫ সালে নিজস্ব মুদ্রা চালু করেছিল। তখন মোগল শাসন থাকলেও সারা দেশেই চলতো কোম্পানির মুদ্রা। অবশ্য মোগলদের অনুমতি নিয়েই নাকি কোম্পানি মুদ্রা বের করেছিল। অনেকদিন ছিল জিনিসটা আমার কাছে। বোকার মত সবাইকে দেখাতাম। পরে ইশকুলের এক স্যার জিনিসটা চেয়ে নিয়ে যায় আমার কাছ থেকে। মাত্র দশ টাকা দেয়। বয়স কম থাকায় বুঝে উঠতে পারিনি কি ভীষণ ভাবে আমাকে ঠকিয়েছিলেন সেই শিক্ষক ভদ্রলোক। আজও চোখে ভাসে তামার পয়সাটা। এক পিঠে ইস্টইনডিয়া কোম্পানির লোগো। আরেক পিঠে লেখা এক আনা।
' আরেকটু বড় হবার পর এইসব জিনিস সংগ্রহের নেশায় ভাল মতই জড়িয়ে গেলাম। যে চেনে না তার কাছে কোন দাম নেই। যে চেনে সে সংগ্রহের জন্য পাগল হয়ে যায়। আমি সবই কিনতাম। বিক্রি করে মুনাফা হত। সেই টাকা দিয়ে আরও জিনিস কিনতাম। প্রাচীন পুঁথি পাওয়া যেত বেশ। আজকালকার মানুষ চেনে না পুঁথি। তখন বেশ চলতো। তালপাতা, ভুরজছাল, কাপড়ের পটে লেখা হত। পুঁথির বিষয়বস্তু হত নানা ধরনের -যেমন কাব্যসাহিত্য, চরিতকাব্য, মহাকাব্য, মঙ্গলকাব্য, অনুবাদ সাহিত্য, ধর্মকথা, জঙ্গনামা, নবী কাহিনী, দেব-দেবী-পীর আউলিয়া বন্দনা, তন্ত্রমন্ত্র, পূজাবিধি, রাজবন্দনা, পাঁচালি, পদাবলী হেন তেন।'
'সব পুঁথিই কি বাংলায় লেখা ?' জানতে চাইলেন ইমান আলী। বেশ আগ্রহ বোধ করছিলেন।
' বেশির ভাগই বাংলা। আরবী হরফে পাওয়া গেছে সামান্য। মনসামঙ্গল লেখা হয়েছিল কাইথি লিপিতে। আরেকটা হচ্ছে নাগরী লিপি। পুঁথি অনেকেই সংগ্রহ করতো তবে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ ছিলেন সেরা। সেই সময়ের প্রধান এন্টারটেইন ছিল পুঁথি পাঠ। কল্পনা করুন - বই নেই, মুভি নেই, ইন্টারনেট নেই। মানুষের হাতে সময় অঢেল। দিনে দশ ঘণ্টা খেটে শুধু বাড়ি আর বাসা ভাড়া যোগাড় করতে হয় না। দিনের আলো নিভে গেলেই হ্যরিকেন জ্বেলে বসতো । একজন সুর করে পড়তো বাকি সবাই শুনত। যারা পুঁথি লিখত সমাজে তাদের সম্মান ছিল পীর ফকির বা বামুনের মত।
এইসব পুঁথি শুধু আমাদের দেশেই ছিল না। বাইরেও ছিল। যেমন বুক অভ এনখ। প্রাচীন হিব্রু ভাষায় লেখা ধর্মীয় পুস্তক। বললে বিশ্বাস করবেন না আজকের থ্রিলার বই ফেল। এই এনখ ছিলেন নোয়ার প্রপিতামহ। তার কাছে দেবদূতেরা এসে বলে দিল, আগামীদিনে মহাপ্লাবন হবে। নোয়া যেন কাঠের নৌকা বানিয়ে সব জীবজন্তু আর গাছপালার বীজ নিয়ে তৈরি থাকে। আরও আছে শয়তান আর দৈত্যের জন্মবৃত্তান্ত। কিভাবে দৈত্যরা দুনিয়া দখল করে ফেলেছিল।'
ইমান আলী বুঝতে পারলেন, প্রিয় প্রসঙ্গ পেয়ে বেশি কথা বলছে অধ্যাপক। 'চোর মোতালেব, শয়তান আর দানবের মধ্যে এলো কিভাবে ?'
'সরি স্যার।' লজ্জিত ভাবে হাসল রাশেদুল হাসান। ' আমার এক খদ্দের নাম্বার দিয়েছিল ওকে। কয়েকটা পয়সা নিয়ে এসেছিল বিক্রি করতে। দামী কিছু না। রামসীতার ছবি খোঁদাই করা। আসলে পয়সা না। পুনের মন্দিরে অমন মুদ্রা ব্যবহার করে। ভক্তরা প্রণামী হিসাবে মন্দিরে দেয়। তো মোতালেব বললাম অন্য কিছু হলে যেন নিয়ে আসে। পরের বার গাধাটা কতগুলো রবীন্দ্ররচনাবলী আর পুরানো অভিধান নিয়ে এলো। ভেবেছিল দামী কিছু। অল্প দামে কিনে রাখলাম। তখন কথায় কথায় বলল নিমগঞ্জের কোন এক কাঞ্জিলাল বাবুর বাড়িতে নাকি হাতে লেখা লক্ষ্মীর পাঁচালী আছে। নিজের চোখে দেখেছে ও। জানালো পরের বার সেটাই চুরি করে আনবে। তো জিনিসটা ঠিকই হাতিয়েছিল। কপাল দোষে মদ্যপান করতে গিয়েছিল । নইলে ওটা এখন আমার হাতে থাকতো।'
'মদ পান করাকে সবাই মদ্যপান বলে কেন ?' এতক্ষণে কথা বলল ভবানী বাবু।
'শুনতে ভাল লাগে। রুই মাছকে অনেকে আহ্লাদ করে বলে না রোহিত মাছ। বা রাঘব মাছ।'
'কিন্তু রাঘব তো রামের আসল নাম। বেচারাকে সব কাজেই টানা হয় কেন ?'
'কারন অবতারদের মধ্যে উনিই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।'
'আমরা বোধ হয় প্রসঙ্গ থেকে কয়েক ক্রোশ দূরে সরে যাচ্ছি।' ট্র্যাফিক পুলিশদের মত হাত তুলে দুইজনকে থামিয়ে দিলেন ইমান আলী। ' তো মোতালেবের চুরি করা জিনিসটা আপনি দেখেননি ?'
'হাতে আসলে তো দেখব ?' রাশেদুল হাসান হতাশ । 'আমাকে ফোন দিয়েছিল, জিনিসটা নাকি ওর হাতে এসেছে। বললাম বাসায় দিয়ে টাকা নিয়ে যাও। হারামজাদা গেছে মদ খেতে। যা, এখন হাবিয়া দোজখে বসে বসে বালতি ভর্তি মদ খা।'
'মরা মানুষকে গালি দেবেন না।' রাগি রাগি গলা ইমান আলীর।
‘ভুল হয়ে গেছে, এখন থেকে জ্যান্ত মানুষকে গালি দেব।’
'চোরাই অ্যানটিক ব্যবসার তদন্ত করছি না আমি। কেউ কোন রকম অভিযোগ ও করেনি । তাই আপনাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছি না। কিন্তু আমার অনুমতি ছাড়া শহরের বাইরে যাবেন না। ঠিক আছে ?'
'জি স্যার।' হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেন অধ্যাপক। ' আমি বাসায় বসে বসে মুভি দেখব ।'
'কি মুভি ?' সন্দেহজনক চোখে তাকাল ভবানী বাবু ।
' হরর মুভি ।'
'নাম কি ?'
' নাম ভুলে গেছি । রুটির নামে নাম ।'
'পাউরুটি ?'
'না স্যার ?'
'আটার রুটি ? '
' নানরুটি ?'
'হ্যাঁ স্যার । মুভির নাম - দ্যা নান । দিনের বেলায় দেখি । রাতে দেখে ঘুমাতে পারি না । সারারাত লাইট জ্বেলে রাখতে হয় । কারেন্ট বিল বেশি
আসে ।
' ভাল মুভি পরের পার্টটা নাকি তত ভাল না। '
'অমনই হয় স্যার । দেখেন না দ্যা এক্সসরসিসট টু আর থ্রি ডাহা
ফ্লপ । বকোয়াজ মুভি একেবারে । '
'নিমগঞ্জের কাঞ্জিলাল না কাঞ্জিনীল বাবুর ঠিকানা জানেন ?' বাধা দিয়ে বললেন ইমান আলী চুনুরি ।
'না স্যার। তবে পেয়ে যাবেন সহজেই। কাঞ্জিলাল রায়। দেশভাগের আগে উনার পূর্বপুরুষ নিমগঞ্জের জমিদার ছিলেন।' হাসি মুখে জবাব দিল বাংলার অধ্যাপক ।
তিন
'ভগবান। চা দিয়ে যাও ।' হাক দিলেন ইমান আলী।
থানার ভেতরে বসে আছেন ইমান আলী । সামনে ভবানী বাবু। টেবিলের উপর পিচ্চি কাগজের ঠোঙায় বাদাম। একটা একটা করে খাকি রঙের বাদাম তুলে নিচ্ছেন। টেবিলে ঠুসে মারতেই ভেঙ্গে যাচ্ছে, ভেতর থেকে লাল জ্যাকেট পড়া যমজ ভাইয়ের মত বাদাম বের হয়ে আসছে। আঙুলে ঘষে ওদের উপর ফুউউউ দিতেই জামাকাপড় খুলে লেংটা হয়ে যাচ্ছে বাদামগুলো। তারপর মুখে পুরে চিবুতে লাগলেন।
'বাদাম খেলে স্মরণশক্তি বাড়ে।' হালকা সুরে বললেন ইমান আলী ।
'আমার তো স্যার রোজই খেতে ইচ্ছা করে কিন্তু কিনতে ভুলে যাই।' অসহায় গলায় বলল ভবানী বাবু।
কনস্টেবল ভগবান পোদ্দার টিনের কৌটায় চা নিয়ে এলো। কনডেন্স মিল্কের খালি কৌটা কেটে বানানো হয়েছে। উপরে খবরের কাগজ চাপা দেয়া । চা যাতে ঠাণ্ডা হয়ে না যায়। সাথে পিচ্চি দুই সিরামিকের পেয়ালা। ও দুটোর অবস্থা খুবই খারাপ । ইচ্ছা করলেই জাদুঘরে রেখে দেয়া যায়। নিচে লিখে দিলেই হবে- রাজা মিলন সেনের আমলের । খ্রিস্টপূর্ব অত সালের। সবাই বিশ্বাস করবে।
'আমরা যখন বাইরে ছিলাম তখন কোন ফোন এসেছিল ভগবান ?' মুখভর্তি বাদাম নিয়ে আউয়াউ করে বললেন ইমান আলী।
'আজ্ঞে স্যার একটা ছেলে ফোন দিয়েছিল।' পেয়ালাতে সাবধানে চা ঢালতে ঢালতে বলল ভগবান পোদ্দার।
'কি বলল?''
'ছেলেটা উত্তেজিত ভাবে বলল, এটা কি পুলিশ স্টেশন ? আমি হ্যাঁ বলতেই ছেলেটা বলল, স্যার বিশ্বাস করবেন না আমি এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি ,ওখানের মাটির তলায় কয়েকশো লাশ আছে। জলদি আসেন।'
‘ সেকি ?' ইমান আলী অবাক।
'হ্যাঁ স্যার। সঙ্গে সঙ্গে গেলাম। গিয়ে দেখি গোরস্থানের ভেতরে বসে ফোন দিয়েছে ছেলেটা। মাতাল। ওর প্রেমিকা চলে গেছে , এই দুঃখে দিনের বেলায় পচা আমলকীর মদ খেয়ে মাতাল হয়ে গিয়েছিল। বাধ্য হয়ে গজারি কাঠের লাঠি ব্যবহার করে চলে এসেছি।'
'ভাল করেছেন।' সায় দিলেন ইমান আলী।
পেয়ালাতে হেমলক ঢালার মত চা ঢেলে চলে গেল ভগবান।
'চোর মোতালেবের লাশ নেয়ার জন্য কেউ এসেছে ?' পেয়ালাতে ফু দিয়ে ভাসমান মরা পিঁপড়ার লাশ সরাতে সরাতে প্রশ্ন করলেন ইমান আলী।'
' ওর ফোনের কললিস্টে প্রায় সবাই চোর। বাগধারা আছে না স্যার , চোরে চোরে ফেসবুক মিডচুয়াল ফ্রেন্ড , অমনই। তবে ওর দূর সম্পর্কের এক চাচা ফোন ধরে রেগে বলল, মরে গিয়ে ভাল হয়েছে। বেঁচে থাকতে নাকি অনেক জ্বালিয়েছিল চোর মোতালেব। চাইলে আমরা লাশ দাফন করে দিতে পারি। উনার কোন দায় নেই।'
'হায়রে মানুষ ।' আফসোস করেন ইমান আলী। 'লক্ষ্মীর পাঁচালীটা পড়ার দরকার ছিল। সাধারন একটা পাঁচালী অত দাম দিয়ে কিনতে যাবে কেন রাশেদুল ? নিশ্চয়ই কোন ব্যাখ্যান আছে। '
'সেলে আমার পরিচিত এক বামুন আছে। নাম- স্বামী শ্রী শ্রী নিগুঢানন্দ পরমহংস । উনাকে দিয়ে পড়াই ?'
' পরমহংস মানে কি ? যারা হাঁসের মাংস পছন্দ করে ?'
‘ না স্যার, হাঁসকে এক পাতিল দুধ দিলে সেখান থেকে জলটা খায়। পাতিলের নিচে ছানা পরে থাকে। তো পরমহংস যারা তারা পাপের দুনিয়া থেকে ভাল জিনিসটা নেয় । বাদবাকি সব অনাদরে ফেলে দেয়। এক সাধু বলেছেন জীবনটা হচ্ছে আতাফলের মত। দানা ফেলে মাখন খেতে হয়। '
'ভাল বলেছেন সাধু । স্বামী শ্রী শ্রী নিগুঢানন্দ পরমহংসের কাছে যাওয়া যাক, চলুন।'
চার
আর সব সেলের চেয়ে স্বামী শ্রী শ্রী নিগুঢানন্দ পরমহংসের সেল অনেক পরিষ্কার। দেয়ালে দেবদেবীর কয়েকটা পোষ্টার সেঁটে আছে। উনারা হাসি মুখে অভয়মুদ্রা ভঙ্গি করে আছেন। বাইরে কতগুলো গাঁদা আর জবাফুলের গাছ। ফুল দিয়ে পূজা দেন উনি।
ইমান আলী চুনুরি আর ভবানী প্রসাদ যখন পৌঁছলেন তখন লাইনের জল দিয়ে স্নান সেরে লাল গামছা পরে পুজায় বসেছিলেন স্বামী। হাতে মোটা একটা গীতা। সামনে পেতলের থালা । হলুদ রঙের তিনটে বাতাসা আর শাদা নকুল থালায়।
স্বামী শ্রী শ্রী নিগুঢানন্দ পরমহংস তিন বছর ধরে আছেন। খুনের মামলায় এসেছেন। উনার ডাক নাম রাজু পাঁড়ে। বেগমগঞ্জের একটা মন্দিরের পুরোহিত ছিলেন।
জমজমাট ধরনের মন্দির না। পুরানো দিনের মন্দির। দেয়ালে টেরাকোটার কাজ করা। দশ অবতারের ভিন্ন ভিন্ন মূর্তি। কয়েকটা বেল গাছ। তুলসীর চারা। নিম গাছ। মন্দিরের দেয়ালের রঙ ফিরোজা । বিষ্ণুর শরীরের রঙ।
সকাল সন্ধ্যা দুই বেলা পূজা দিতেন রাজু পাঁড়ে। প্রণামীর বাক্সে যে নোট বা মুদ্রা পড়তো সেটা দিয়েই চলতেন। দুপুরে নিজেই রান্না করতেন। সবজীর ল্যাবড়া। ফ্যানসা ভাত।
দিন এমনিতেই চলে যেত। কিন্তু বেফাঁস কিছু ঘটে সবারই জীবনে।
মন্দিরের সামনে এক ঠ্যালাওয়ালা দোকান দিল। বেসনে ভিজিয়ে চিংড়ির মাথা বিক্রি করবে। বাজার থেকে আধপচা চিংড়ির মাথার খোসা কিনে আনতো। খুব সুন্দর করে বেসনের গোলা বানাত। ঝাল দিত বেশি। খদ্দের ধরতে পারতো না মাছের খোসা পচা। বিচিত্র কায়দা করে বিটলবণ দিয়ে পরিবেশন করতো সেই ভাঁজা খোসা।
সমস্যা হবার কথা না।
বেশি পচে যাওয়া চিংড়ির খোসা মন্দিরের সিঁড়িতে ফেলে যেত লোকটা। বারবার অভিযোগ অনুরোধ করেও কাজ হয়নি। উল্টা গ্রাম থেকে তার এক ইয়ারকে নিয়ে এসেছিল । দুইজনে মিলে সারাক্ষণ হাউ কাউ করতো। একদিন ইয়ার লোকটা সিঙ্গারার ভেতরে মাছ ভাঁজা ঠেসে রাজু পাঁড়েকে খেতে দিল।
বৃহসস্পতি বার শুধু সবজী খায় রাজু পাঁড়ে। আবিষ্কার করলো , কায়দা করে তাকে মাছ খাইয়েছে।
শান্ত লোকটা কেমন খেপে গেল।
সন্ধ্যাবেলা মহল্লার দারোয়ান আবিষ্কার করলো। দোকানদার আর তার ইয়ারকে পিলারের সাথে বেঁধে রেখেছে রাজু পাঁড়ে। মস্ত এক থালা ভর্তি মাছভাঁজা নিয়ে ওদের মুখে ঠেসে ঠেসে দিচ্ছে সে।
পুলিশ যখন এলো তখন ইয়ার মারা গেছে। মুখভর্তি ভাঁজা মাছ। দোকানদার প্রায় মৃত।
সেই থেকে জেলে আছেন রাজু পাঁড়ে।
অনেক সময় নিয়ে পূজা শেষ করলেন তিনি। দিনের বেশির ভাগ সময় এই করে কাটে ।
পূজা শেষ করে ফিরে তাকালেন ইমান আলী আর ভবানী বাবুর দিকে।
'আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।' বিনয়ের সাথে বললেন ইমান আলী।
'আগে প্রসাদ নিয়ে নিন।' বললেন রাজু পাঁড়ে। মিষ্টি নরম কণ্ঠস্বর।
উনার শরীরের রঙ কাঁঠালের পাকা কোয়ার মত।
আগের দিনের হিন্দুদের গাঁয়ের রঙ সুন্দর হত। এখন সবগুলো কাইল্লা হয় কেন ? মনে মনে ভাবলেন ইমান আলী।
রাজু পাঁড়ের ব্যাক্তিত্বের কাছে দুইজনেই কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ভোরের আলোর কাছে রাতের শিশিরের মত।
মাথা নীচ করে হাত পেতে বাতাসা আর নকুল নিল । পেতলের ঘটি ভর্তি মহাকাশের মত ঠাণ্ডা জল দেয়া হলো। জলের মধ্যে ধাতব কিন্তু মিষ্টি একটা স্বাদ মেশানো।
'জেলের ভেতরে নলকূপ আছে।' ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ব্যাখ্যা করলেন রাজু পাঁড়ে। ' আমি ট্যাঁনকির জল পান করি না। যে কোন বন্ধ জলে, জলের শক্তি নষ্ট হয়ে যায়। ঝর্ণা বা নদীর প্রবাহ জলে মহাজগতের সব শক্তি জমা থাকে।'
'কুয়ার জল ?' ইমান আলীর কৌতূহল।
'ওটাও ভাল। পাতালের জল, ভাল না হবার কথা না। সত্য যুগে শুধু দানবেরাই পাতালের জল পেত। দেবতারা আফসোস করতো।'
লোকটার বাচনভঙ্গি সুন্দর।
' অসুর আর দানব কারা আসলে ?' বোকা বোকা ভঙ্গিতে জানতে চাইল ভবানী বাবু।
'আমরা হচ্ছি মানব।' স্মিত হেসে বললেন রাজু পাঁড়ে। ' অসুর মানে সুর বিরোধী। সুর মানে দেবতা। যারা দেবতাদের কাজ কর্ম পছন্দ করতো না, বিরোধিতা করতো তারাই অসুর। আর দানব সম্ভবত সেই সময়ের উন্নত কোন জাতি। যারা জ্ঞানে বিজ্ঞানে এগিয়েছিল সময়ের চেয়ে বেশি। দৈহিক ভাবে ছিল লম্বা চওড়া। মাংস- মদ পছন্দ করতো। পুরাণের বর্ণনা মতে দূর সাগর তীরে আর মাটির তলায় ছিল তাদের বাসভূমি। তাদের বাড়িঘর ছিল বহুতল। মানে কি ? বড় বড় দালান। এমনকি সাগরের বুকে ভাসমান প্রাসাদ বানিয়ে ভেসে বেড়াতো দানবেরা। ভাসমান প্রাসাদ মানে বড় বড় জাহাজ। সবই সম্ভব। পুরাণ বেদ গাঁজাখুরি না মোটেও। বিষ্ণুপুরাণে আছে , পৃথিবীর উত্তর দিকে ক্রমাগত যেতে থাকলে পাওয়া যাবে ক্ষীরের সমুদ্র। যেখানে অন্ধকার আর বরফের চীর আবাস। আপনাদের মনে হয় না উত্তর মেরুর কথা বলা হয়েছে ? '
' কিন্তু ক্ষীরের সমুদ্র ?' মুচকি হাসলেন ইমান আলী।
' স্যাটেলাইটে তোলা উত্তর মেরুর ছবি দেখুন না। মনে হবে এক বাটি ক্ষীর।' এই প্রথম হাসলেন রাজু পাঁড়ে।
'আমি অমনটা পড়েছিলাম অতীতের মানুষ জানত পৃথিবী গোল।'
'এস্কিমোদের পোপল ভু পুরানেই লেখা আছে পৃথিবী গোল।'
প্রসঙ্গ থেকে সরে আসলেন ইমান আলী । 'আপনার কেসটার ফাইল পড়েছি। দুঃখজনক।'
' মোটেই না।' আবারও হাসলেন জ্ঞানী পুরোহিত । 'ওটা নিয়তি। নিয়তি খণ্ডানো যায় না।'
‘ নিজের ক্রাইমকে নিয়তির উপর ঝেড়ে দিলেন ?' টিটকারি না মেরে পারলেন না ইমান আলী।
'ওটা আমার বিশ্বাস।' অম্লান বদনে বললেন রাজু পাঁড়ে। ' ব্রহ্মার একদিন আমাদের পৃথিবীর ৪৩২ কোটি বছর। দিনের শুরুতে তিনি সব কিছু তৈরি করে ছেড়ে দিয়েছেন। কলের গানের রেকর্ডের মত সব চলবে। ঘটনা পাল্টান যাবে না। এই যে আপনি আমার সামনে বসে আছেন এটাও ৪৩২ কোটি বছর আগে ঠিক করা হয়ে গেছে। তো আমার মনে হয় কোন দরকারে এসেছেন আপনারা। এইসব তত্বকথা শোনার জন্য না।'
'বিলকুল। একটা লক্ষ্মীর পাঁচালী আছে আমাদের কাছে। সংস্কৃতি ভাষায়। আপনি যদি একটু পড়ে অনুবাদ করে দিতেন।' বললেন ইমান আলী।
'দেখি জিনিসটা।'
ব্যাগ থেকে বের করে দিল ভবানী প্রসাদ। দুই হাত দিয়ে কাগজগুলো ধরে ভক্তিভরে কপালে ঠেকালেন রাজু পাঁড়ে।
হিন্দুদের এই ভঙ্গিটা খুব ভাল লাগে ইমান আলীর। কোন খাঁদ নেই। ভক্তি ভালবাসার অপূর্ব দেহমুদ্রা।
'এমনিতেই বৃহস্পতি বারে লক্ষ্মীর পাঁচালী পড়া হয় বাংলার ঘরে ঘরে।' বললেন রাজু পাঁড়ে। ' আবার আশ্বিন মাসে কোজাগরী পূর্ণিমা রাতেও লক্ষ্মী পূজা হয় বড় করে। লক্ষ্মী হলেন ধন সম্পত্তির দেবী। আবার শস্যের ও দেবী। এইজন্য দেখবেন পূজার উপাচারে কলাপাতা আর ধানের ছড়া রাখা হয়।'
'কোজাগরী জিনিসটা কি ?'
'কোজাগরী সম্ভবত বুদ্ধদেব গুহের একটা উপন্যাসের নাম। আমি পড়েছি। ছোটবেলায় জণ্ডিস হয়েছিল একবার। সারাদিন বাসায় বসে বসে বই পড়তাম। তখন পড়েছি । দারুন বর্ণনা। শালবন, কয়লার আগুনের উম, পাহাড়ি মুরগী, একটা মেয়ে ছিল নাম তিতলি।'
আরও কি কি বলত ভবানী বাবু। ইমান আলী হাত তুলে থামিয়ে দিলেন।
' কোজাগরী শব্দের অর্থ কো জাগতি। মানে কে জেগে আছ ? ' মুচকি হেসে বললেন ব্রামন রাজু পাঁড়ে। ' আদিম বাংলার মানুষজন এই রাতে জেগে থাকতো। সারারাত জেগে মা লক্ষ্মীর আরাধনা করতো। কৃষক রাত জেগে পাহারা দিত ধানের খেত। কোন কোন ভাগ্যবান দেখে ফেলত কিশোরী এক মেয়ে ধান খেত থেকে ধানের ছড়া তুলে নিচ্ছে। তার পায়ে নুপুর আর আলতা। ওটাই মা লক্ষ্মী।'
ইমান আলীর মনে হলো রাজু পাঁড়ে স্বভাব কবি।
' ধন সম্পদের দেবী হলেও কৃষি সমাজের প্রভাব অনেক বেশি। তাই পূজার উপাচারে ধান, পান কড়ি, হলুদ, হরতকি দেয়া হয়। প্রসাদ দেখুন- তিলের, নারকেলের নাড়ু। খই আর মুড়ির মোয়া। মা লক্ষ্মীর বাহন হচ্ছে পেঁচা । এর ব্যাখ্যা এমন হতে পারে- ধানক্ষেতের আশেপাশে ইঁদুর থাকে এবং এরা ধানের ক্ষতি করে থাকে। পেঁচক বা পেঁচার আহার হল এই ইঁদুর। পেঁচা এই ইঁদুরকে খেয়ে খাদ্যশস্য রক্ষা করে।
'তবে লক্ষ্মী পূজা যে ইদানিংকার পুজা তেমন না। লাভার নিচে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পম্পে শহরে হাতির দাঁতের মা লক্ষ্মীর মূর্তি পাওয়া গেছে। ওটা ওখানে গেল কিভাবে সে এক রহস্য। তবে মূর্তির চেয়ে পটে বা সরার লক্ষ্মী পূজা বেশি জনপ্রিয়। '
'একটা জিনিস বুঝলাম না দেবীদের তিনচোখ হয় কেন ?ইমান আলীর প্রশ্ন।
'মেয়ে মাত্রই ত্রিনয়না। ওদের কাছে কিছু ফাঁকি দিতে পারবেন না। মেয়ে মাত্রই দেবী।'
চুপ করে রইলেন দুই অফিসার।
জোড় আসনে বসে প্রণাম দিয়ে পড়া শুরু করলেন রাজু পাঁড়ে।
মিনিট খানেক পর উনার সহজ সরল ভঙ্গি আড়ষ্ট হয়ে গেল। জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলেন।
'কি হল ?' জানতে চাইলেন ইমান আলী।
'এটা আসলে মা লক্ষ্মীর মন্দিরে লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের বর্ণনা। কেউ একজন অনেক অনেক ধন রত্ন লুকিয়ে রেখেছে কায়দা করে।' ঢোক গিলে বললেন রাজু পাঁড়ে।
'আপনি বলছেন এটা লক্ষ্মীর পাঁচালী না ?' অবাক একটা ভঙ্গিতে বললেন ইমান আলী। 'গুপ্তধনের নকশা ? '
'প্রথম আট পাতা লক্ষ্মীর পাঁচালী। আর দশটা লক্ষ্মীর পাঁচালীর মতই। ছড়ার মত করে বর্ণনা করা মা লক্ষ্মীর ব্রতকথা। যেমন-
গুরুবারে সন্ধ্যাকালে যত নারীগণ।
পূজা করি ব্রতকথা করিবে শ্রবণ।।
ধন ধান্য যশ মান বাড়িবে সবার।
অশান্তি ঘুচিয়া হবে সুখের সংসার।।
পাঁচালী শেষ হবার পর পরই কোন এক লোকের ব্যক্তিগত কথা লেখা আছে। সেটাও ছড়ার মত করে। মনে হচ্ছে কোন এক ধনী ব্যক্তি তার প্রজাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ দুর্দিনের জন্য লক্ষ্মী মন্দিরে লুকিয়ে রেখেছেন।'
'কোন এলাকায় সেটা লেখা আছে ?' ঢোক গিলে বলল ভবানী বাবু।
'নাহ, মাথা নাড়লেন রাজু পাঁড়ে। 'এমন কি ভদ্রলোকের নামও লেখা নেই।সেটা অস্বাভাবিক না। সেই সময় অনেক ব্যক্তি যেমন প্রচার চাইতেন তেমন প্রচার বিমুখ মানুষ ও ছিলেন। তবে উনি জমিদার বা রাজা ছিলেন। নইলে প্রজাদের কাছ থেকে সম্পদ নেবেন কি ভাবে। আর প্রজারা স্বেচ্ছায় দিয়েছে। '
'একটু পরিষ্কার করে বলবেন ?' ইমান আলীর অনুরোধ।
'প্রথম পুরুষে লেখা। ভদ্রলোক একটা লক্ষ্মীর মন্দির নির্মাণ করেন শখ করে। বেশির ভাগ সময় শুধু লক্ষ্মীর মন্দির নির্মাণ হয় না। লক্ষ্মীর সাথে তার স্বামী নারায়ণ থাকে। অর্থাৎ লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দির। যারা পৃথিবীতে রাম-সীতা রুপে এসেছিলেন। পরের জন্মে এসেছিলেন কৃষ্ণ - রুক্মিণী রুপে। তো এই মন্দির বানানোর পর জমিদার ভদ্রলোক তার প্রজাদের কাছে থেকে এক মুঠো করে স্বর্ণ যোগাড় করেন। সবাই লাইন ধরে গিয়ে মন্দিরে জমিদারের কাছে স্বর্ণ দিয়ে আসে। আর সেই সব স্বর্ণ সাতটা মাটির জালায় ভরে মন্দিরে মা লক্ষ্মীর প্রতিমার পিছনের মাটি তলায় রাখা আছে।'
চুপ হয়ে গেল তিনজনেই। ভাবছে । সবাই।
' গরীব প্রজারা এক মুঠো করে স্বর্ণ দিয়েছে। এটাই হজম হচ্ছে না আমার।' দীর্ঘ বিরতির পর বললেন ইমান আলী।
'অসম্ভব না ও হতে পারে। জমিদার চেয়েছে। না করলে উপায় আছে। লেখা পড়ে মনে হল সবাই খুশি মনেই দিয়েছে। নারায়ঙ্গঞ্জের সোনার গাঁ গ্রামেই এক সময় নদীর জলের সাথে নাকি স্বর্ণের কুঁচি পাওয়া যেত । কোন গালগল্প একদম বেকার হয় না । ' নরম গলায় বললেন রাজু পাঁড়ে।
আবার চুপ করে রইল তিনজন। বলার মত সব কথা ফুরিয়ে গেছে যেন।
'জিনিসগুলো এখনও জায়গা মত আছে আমার মনে হয় না।' যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে অমন গলায় বললেন ইমান আলী।
' সম্ভবনা খুব কম।' খানিক চিন্তা করে জবাব দিলেন রাজু পাঁড়ে। ' সব প্রজারা জানে ব্যাপারটা। জমিদার বাবু তাদের কাছ থেকে খাজনা হিসাবে এক মুঠো করে স্বর্ণ নিয়েছে। মন্দিরে রেখেছে এটাও নিশ্চয়ই কেউ না কেউ জানে। তো ? কেউ না কেউ গায়েব করে ফেলেছে। সম্পদের লোভে হিন্দু মন্দির, বৌদ্ধ মঠ লুটপাট নতুন কিছু না। আজকাল তো মন্দিরের পুরোহিত নিজেই চুরি করে বা লোক দিয়ে ডাকাতি করায়। কম দেখলাম না তো।'
'আমারও তাই মনে হয়।' উঠে দাঁড়ালেন ইমান আলী। 'আপনাকে কষ্ট দেয়ার জন্য দুঃখিত। আপনার যাতে জামিন হয় সেই ব্যাপারটা দেখব আমি। এমনিতে কিছু লাগবে ?'
'আমি পূজা দিতে বসলেই কিছু মিয়া সাব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেবদেবী নিয়ে বাজে মন্তব্য করে। পারলে কথাটা জেলার সাহেবকে জানাবেন।'
'জানাবো। আর পাঁচালীর শেষ পাতাগুলো বাংলায় অনুবাদ করে দিতে পারবেন আমাদের জন্য ? '
বাইরে জলপাই তেলের মত রোদ। কয়েক পোঁটলা মেঘ উড়ছে আকাশে।
দূরে কয়েকটা পলাশ গাছ। কমলা রঙের অপূর্ব ফুল অনাদরে পড়ে আছে গাছের তলায়। দেখার মত দৃশ্য। যে দেখবে সেইই ফিরে তাকাবে। সেই গাছ তলায় বসে ভিক্ষা করছে অন্ধ এক বুড়ি। ঈশ্বরের কৌতুক।
হাত পেতে আছে বুড়ি। অন্য হাতে লাঠি। মুখে মাকড়সার জালের মত বলিরেখা। দুই একটা ফুল পড়ছে পেতে রাখা হাতে। ফুলের মত বুড়ির হাতে খাবার এসে পড়তো যদি ?
ভাবলেন ইমান আলী।
ইমান আলী বললেন, ভবানী বাবু খেয়াল করেছেন বেশির ভাগ হুজুর একটু ভাল উপার্জন করলে বা ভাল বক্তা হলেই গায়ে কোট চাপায়। মন্দিরের পুরোহিতগুলো সারা জীবন গায়ে শাল চাদর দেয় কেন?'
'দুটো কারনে হতে পারে স্যার। সামান্য চিন্তা করে বলল ভবানী বাবু। ' শাল চাদর পাওয়া যায় কিন্তু সেগুন চাদর পাওয়া যায় না। আর পুরোহিতগুলো তো ওঁয়াজ করতে পারে না স্যার।'
'রাজু পাঁড়ের জামিন চাওয়া হয়নি?' জানতে চাইলেন।
'কে চাইবে স্যার। ত্রিভুবনে কেউ নেই উনার। সরকারি উকিলদের কাজ জানেন তো।'
'একমাত্র মায়ের দুধটা টাকা ছাড়া পাওয়া যায় । দেখি থানায় গিয়ে কাঞ্জিলাল না কাঞ্জিনীল বাবুর সাথে কথা বলি। উনাদের পারিবারিক জিনিস। কথা বললে সমাধানে আসা যাবে।'
পাঁচ
থানায় বসে আছেন দুইজনে। ভবানী বাবুর সামনে ফাইল। পড়ছেন। কেটে ঘষে বাক্য মেরামত করছেন। অপেক্ষায় আছেন ভগবান চা নিয়ে আসবে।
বাইরে সুন্দর দিন। বাতাস বইছে। রোজ অমন বাতাস নেমে আসে না। গাছের ডালে বসে অলস সুরে ডাকছে একটা টুনটুনি । ওরা দেখতে প্রায় চড়ুইয়ের মত । তবে চড়ুই হয় পাটকিলে রঙ্গের। টুনটুনি হয় ফিকে জলপাই রঙের।
'কি অবস্থা বুঝলেন ?' অনেক সময় পর আড়মোড়া ভেঙ্গে জানতে চাইলেন ইমান আলী।
'অধ্যাপক রাশেদুল হাসানকে ফোন দিয়েছি। উনি আসলে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি হিসাবেই সংগ্রহ করতে চেয়েছিল এই লক্ষ্মীর পাঁচালীটা। অন্য কিছু জানেন না। নিমগঞ্জের থানায় ফোন দিয়েছি। কাঞ্জিলাল রায় নামে এক ভদ্রলোক সত্যিই আছেন। পুরানো একটা লক্ষ্মী দেবীর মন্দির আজও আছে। বেশ পুরানো।'
'সব মিলে যায়।আপনার মত কি ? '
'নিমগঞ্জ খুব দূর না স্যার। এখান থেকে বাসে করে নেমে দুইটাকা দিয়ে নৌকা পার হলাম। তারপর রিক্সা সকালে গেলে রাতের বেলায় তদন্ত করে ফিরে আসতে পারব। ভেতরটা কেমন টগবগ করছে। ছেলেবেলার অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ পাচ্ছি।'
'ছেলেবেলাটা জীবনের সুন্দর সময়।' ফোঁস করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললেন ইমান আলী। ' অল্প মায়াবী কিছু সময়। বাকি জীবন সেটা ভাঙ্গিয়ে চলি আমরা।'
ভগবান পোদ্দার চা নিয়ে এলো।
'আমরা বাইরে থাকতে কোন ফোন এসেছিল ?' জানতে চাইলেন ।
'হ্যাঁ, স্যার। কাল রাতে একজন ফোন করে বলল হাজারিবাগের ওখানে কোন এক হিন্দু ভদ্রলোককে নাকি জ্যান্ত কবর দেয়া হয়েছে। ভদ্রলোকের বয়স নাকি ১২০ বছর । জলদি গেলাম। গিয়ে দেখি সেই মাতালটা দাঁড়িয়ে আছে। একটা সিমেনটের ব্লকের সামনে। ওখানে লেখা নারায়ণগঞ্জ ১২০ কিমি। মাতালটা ভেবেছিল ওরা একটা কবরের এপিটাফ। মৃত ভদ্রলোকের নাম নারায়ণ আর ফেমিলি নেইম গঞ্জ। কিমি মনে করেছে ভদ্রলোকের জন্মস্থান। ১২০ সংখ্যা মনে করেছে মৃত ব্যক্তির বয়স । বাধ্য হয়ে গজারি ব্যবহার করে চলে এসেছি।'
' ভাল করেছেন।' পেয়ালা হাতে নিতে নিতে বললেন ইমান আলী।
ছয়
বাস থেকে নামতেই নদীর ঘাঁট। বিদেশ হলে এটা একটা টুরিস্ট স্পট হতে পারতো।
মা তারা হোটেলটা ঘাটের পাশেই। হিন্দুরা ভয়ে দেবদেবীর নামে হোটেল ক্যাফের নাম রাখে না। কিছু হলেই এইসব দোকানে আগে লুটপাট হয়। মা তারা হোটেলের নাম বদলানো হয়নি কারন অনেক পুরানো হোটেল এটা। নামে চেনে অনেকে। দূর থেকে লোকজন খেতে আসে। আজও কলাপাতায় ভাত আর শালপাতার থালায় তরকারি পরিবেশন করা হয়।
চারাপোনা, পাবদা, চিংড়ি, তেলাপিয়া, রুপচাদা আর মৌসুমে ইলিশ পাওয়া যায়। ঝাল করে বা ঘন শর্ষে বাটা দেয়া। ডিমের তরকারি আর মুরগী করে নিয়মিত। সপ্তাহে একদিন খিচুড়ি। ঐ দিন প্রথম দশজন খদ্দেরের কাছ থেকে পয়সা নেয়া হয় না।
প্রায় পিশাচের মত খেলেন ইমান আলী।
ভবানী বাবুর ভাব দেখে মনে হচ্ছিল অনেক গুলো বছর দুর্ভিক্ষ পীড়িত এলাকায় ছিল। আজকের খাওয়া শেষ করে আবার তাকে সেই এলাকায় পাঠানো হবে।
' শহরে এই রকম ভাত পাই না কেন ?' খেতে খেতে প্রশ্ন করলেন ইমান আলী।
' স্থানীয় উৎপাদন স্যার।' ক্যাশে বসে থাকা ধপধপে শাদা ধুতি পড়া বুড়ো লোকটা জবাব দিলেন। 'রত্নচুরি চাল বলে। শহরে গেলেও দাম পায় না। বাধ্য হয়ে আমরা খাই। আরেকটা দারুন চাল আছে। লাল রঙের ভাত । কাট্টুয়ানম চাল। তামিল ভাষায় যার অর্থ বুনো হাতি।'
'নামের হেতু ? হাতি সেই ভাত খায় নাকি ?' মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে আউ আউ করে জানতে চাইল ভবানী প্রসাদ।
'না, স্যার । ধান গাছ অনেক লম্বা হয়। এত লম্বা যেন হাতি লুকিয়ে থাকতে পারবে। আজকাল অনেকে চালটাকে কবিরাজশাল বলে। ভাতের যে স্বাদ , বলার মত না ।' ব্যাখ্যা দিলেন ধুতিরাম।
খাওয়া শেষ হতেই উনাদের সামনে চিনামাটির তশতরিতে রাখা মৌরি আর কি কি সব মশলা রেখে গেল একজন।
'খাওয়া শেষে মশলা চিবায় কেন লোকজন ?' জানতে চাইলেন ইমান আলী।
'ঢং দেখানর জন্য।' মুখে যেটা আসলো সেটাই বলে দিল ভবানী প্রসাদ। ভাল মন্দ খাওয়ার পর ভবানী বাবুর ঘুম আসে। নদীর পারের তাজা বাতাসে সারা পৃথিবীর রাত জাগা মানুষের ঘুম আসছে উনার চোখে।
গুদারা ঘাটে নৌকা দাঁড়িয়ে ছিল। নদীর ঢেউয়ের সাথে নাচানাচি করছিল ওরা।
পোক্ত দেখে একটা নৌকায় উঠলেন ইমান আলী। খামাখাই টাইটানিক সিনেমার কথা মনে হল। সেই সাথে মনে হল সাঁতার জানেন না।
মাঝি ইচ্ছামত লোক তুলেছে। চেহারায় কলম্বাসের গাম্ভীর্য। ভাবে সিন্দাবাদ। মাথায় রঙ জ্বলা গামছা জরানো। রকস্টার ভাব।
নৌকা প্রায় ডুবুডুবু । মাঝি বোধহয় দুনিয়ার সব গাছপালার নমুনা আর জীবজন্তুর জোড়া তুলে তবেই নৌকা ছাড়বে।
ইতিমধ্যে তিনটা ছাগল, একটা বাছুর আর এক হালি মুরগী উঠে গেছে।
ইমান আলী কষে ধমক লাগাতেই পানখাওয়া দাঁত বের করে বেহায়ার মত হেসে নৌকা ছাড়ল দেশি কলম্বাস।
'অনেক দিন পর নৌকা ভ্রমণ করছি, খুব ভাল লাগছে স্যার।' হাসিমুখে বলল ভবানী বাবু।' ইশকুলের পরীক্ষায় জার্নি বাই বোট কমন পড়েছিল। বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকায় ততটা গুছিয়ে লিখতে পারিনি।'
'নদীগুলো সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।' বিষাদ মাখা গলায় বললেন ইমান আলি। অথচ বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ।'
'নিজের মাকে খেতে দেয় না আর নদী তো দেশের মা।'
নৌকার পাটাতনে বসা ভাবুক চেহারার একজন গেয়ে উঠলো, ‘ চুক জে মুনের কতা বলে ।’
‘ বাকিটুকু গাইলে লাথি মেরে নদীতে ফেলে দেব।’ হিম হিম গলায় বলল ভবানী বাবু।
কাঞ্জিলাল বাবুর বাড়িতে যখন পৌঁছল , তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। সূর্যটা মধ্য আকাশ থেকে অনেক পথ নিচে নেমে গেছে। নদীর হাওয়ার কারনে তত গরম নেই। আকাশে খুচরা কিছু মেঘ।
কাঞ্জিলাল রায়ের অবস্থা খুব ভাল ছিল এক সময়। দেখেই বুঝা যায়। গ্রামের মধ্যে দোতলা বাড়ি। বাড়ি যত বড় বারান্দা তারচেয়ে বেশি বড়। ঘনঘন পিলার। পিলারের গায়ে ফুল তলা পাতার ছবি আঁকা। ফিরোজা রঙের ছিল। জ্বলে বিচিত্র রঙ ধারন করেছে।
দরজা জানালার উপরে লোহার প্রাচীন নকশা করা গ্রিল। তস্কর ঠেকানোর জন্য না। সৌন্দর্যের জন্য।
'কাকে চাই ?' অবাক হয়ে একজন এগিয়ে এলো। মধ্য বয়স্ক। গাঁয়ের রঙ খোসা ছড়ানো আইরিশ আলুর মত ফর্শা।
'রিক্সাওয়ালা বলল এটা কাঞ্জিলাল বাবুর বাড়ি।' বিনয়ের সাথে বলল ভবানী প্রসাদ।
' শুধু রিক্সাওয়ালা বলবে কেন ? সবাই বলবে ।কারন এটাই কাঞ্জিলালের বাড়ি।' লোকটা বিরক্ত।
'উনি বাড়িতে আছেন ?'
'আপনাদের সামনেই বর্তমান।'
নিজেদের পরিচয় দিয়ে ক্যানভাসের বামব্যাগ থেকে লক্ষ্মীর পাঁচালীটা বের করে ইমান আলী বললেন, 'ছোট্ট একটা ব্যাপার তদন্ত করতে আমরা এসেছি। দেখুন, জিনিসটা চেনেন কি না । '
'আরে এটা তো আমাদের পারিবারিক লক্ষ্মীর পাঁচালী।' চেঁচিয়ে উঠলেন কাঞ্জিলাল। 'কয়েকদিন আগে চুরি গেছে। গিন্নি সন্ধ্যাবেলায় পূজা করতে গিয়ে দেখে পাঁচালীটা নেই। ভেরি স্যাড। সম্ভবত ক্লাসিক চোর মোতালেব ওটা চুরি করেছে। কারন সেইদিন থেকে ওকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুনলাম শহরে গিয়ে মারা গেছে। আপনারা পেলেন কি করে ?'
সংক্ষেপে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল ভবানী প্রসাদ।
'আপনাকে ফেরত দিতে চাই জিনিসটা। সাথে কিছু প্রশ্ন ছিল।' বললেন ইমান আলী।
'বলুন, না করলো কে ?' খুশি খুশি গলা কাঞ্জিলালের ।
'নৌকার মাঝি বলল এই গ্রামে নাকি একটা লক্ষ্মী মন্দির আছ।'
' শুধু নৌকার মাঝি বলবে কেন ? সবাই বলবে। কারন সত্যিই এই গ্রামে একটা লক্ষ্মী মন্দির আছে। সেটা আবার আমার দাদু বানিয়েছিলেন।' গর্বে বুকটা চিতিয়ে বললেন কাঞ্জিলাল বাবু।
'আপনারা জমিদার ছিলেন ?'
‘ বলা যায়। প্রচুর জমি ছিল। অনেক ঘর প্রজা ছিল। সবাই আমার দাদু জরাসন্ধ রায়কে সম্মান করতো। প্রজাদের জন্য উনি মা লক্ষ্মীর মন্দির বানিয়েছিলেন। এই মন্দির বানানোর পর থেকে নিমগঞ্জে সবার জমির ফসল দ্বিগুণ বা তিনগুন হয়ে গিয়েছিল । '
'আমাদের মন্দিরে নিয়ে যেতে পারবেন ?'
'ওটা এখন তেমন জমজমাট না। বামুন রাখার পয়সা নেই আমার, দেশভাগের পর আমরা ফকির হয়ে গেছি।' দুঃখী মানুষের মত বললেন জমিদারের নাতি।
'আমাদের ধারনা লক্ষ্মীর মন্দিরে আপনার দাদু টাকা পয়সা লুকিয়ে রেখেছিলেন।'
'অসম্ভব।' মাথা নেড়ে বললেন কাঞ্জিলাল। 'সেরকম কিছু হলে দাদু বাবাকে বলে যেতেন। বাবা আমাকে বলে যেতেন। আমাকে আর সকাল বেলা শসা বাতাসা দিয়ে জলখাবার খেতে হত না।'
জমিদারের নাতির গলায় অভিমান।
'উনি মানে দাদু কি প্রজাদের কাছ থেকে মন্দির বানানোর সময় কোন রকম দান গ্রহণ করেছিলেন ?'
'না, স্যার। নিজের খরচে বানিয়েছিলেন।'
'কিন্তু পাঁচালীতে লেখা সব প্রজাদের কাছ থেকে এক মুঠো করে স্বর্ণ নিয়েছিলেন।'
'কি নিয়েছিলেন ?'
'স্বর্ণ।' গলার তেজ অনেক কমে গেছে ইমান আলীর।
বাচ্চাদের হুপিং কাশির মত শব্দ করে হেসে ফেললেন নাতি। ' কি সব রোমাঞ্চ উপন্যাসের প্লট নিয়ে হাজির হয়েছেন স্যার।'
আরও খানিক হুপিং কাশির মত শব্দ করে হাসলেন কাঞ্জিলাল বাবু।
'তবে একটা কথা বলি ? মন্দির বানানোর পর থেকে আমাদের নিমগঞ্জে চাষিদের আর্থিক অবস্থা ভাল হয়েছিল। সবার জমিতে প্রচুর ফসল ফলতো। ধানের ঘ্রাণে পাগল হবার দশা। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন না বসন্তের ঐ ড্রাংকেন ওয়েদারে ? ওরকম আরকি। নবান্ন উৎসব হত দেখাত মত। সংক্রান্তির উৎসব। আহা কত কি ।'
হারানো দিনে ডুবে গেছে নাতি।
'আপনি আমাদের একটু মন্দিরে নিয়ে যাবেন ?' অনুরোধ করলেন ইমান আলী।
' সন্ধ্যা হয়ে আসছে। জংলা জায়গা। সাপ খোপ আছে।' আপত্তি জানালেন নাতি।
'খোপ কি ? অনেক ক্ষণ পর সুযোগ পেয়ে জানতে চাইলো ভবানী বাবু।
'মাত্র বাজে দুপুর তিনটে। সূর্য ডুববে সাতটার সময়। লাঠি আর কোদাল নিয়ে নিন সাথে। ' গ্ম্ভীর গলায় বললেন ইমান আলী।
সাত
বেশিদূর হাঁটতে হল না।
পথ সামান্য। দুইপাশে সুন্দর সব গাছপালা। ঝোপ। লতাগুল্ম। বেশির ভাগ চেনেন না ইমান আলী। একটা গাছে লাল লাল ফল ধরে আছে। দেখলেই খেতে ইচ্ছা করে। পাখিদের খাবার। কমলাগোটা নাম। খেতে কেমন ?
মন্দিরটা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন।
এত সুন্দর !
যে সরকার আসুক উনারা চাইলে পুরানো এইসব মন্দির সামান্য খরচে রক্ষনাবেক্ষণ করতে পারেন। দেশের সম্পদ। ইউরোপে পুরানো গির্জা দেখার জন্য মানুষ যায় দূর দূরান্ত থেকে।
যত্নের অভাবে একটু বিবর্ণ হয়ে গেছে। নানান জায়গায় বিদ্যাপাতা আর শ্যাওলা জন্মেছে পার্সিয়ান কার্পেটের মত। ছাদ ত্রিভুজ। স্থাপত্য রীতি হিসাবে রত্ন মন্দির বলে। উপরে গম্বুজ আছে। বড় বারান্দা। পোড়া মাটির দেয়াল। দেয়ালে টেরাকোটার কাজ। যত্নের অভাবে ক্ষয়ে গেছে।
'পূজা হয় না ?' জানতে চাইল ভবানী প্রসাদ।
'না। আগে বৃহসস্পতি বার দাদু নিজেই পাঁচালী পড়তেন। পরে একজন পুরোহিত রাখা হয়েছিল। আমার আমলে তাও নেই। শুধু বছরে একদিন কোজাগরী পূজার সময় গ্রামের বউ- ঝিরা আসে। মন্দিরের বারান্দায় আলপনা এঁকে দেয়। ভেতরে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালায়।' মন খারাপ করা গলায় বললেন কাঞ্জিলাল।
বাইরে জুতা খুলে ভেতরে ঢুকলেন কাঞ্জিলাল। বাকি দুইজন তাকে নকল করলো।
ভেতরে ঠাণ্ডা। মন ভাল করা পরিবেশ। ঘুঘলি দিয়ে আলো আসছে। ঠাণ্ডা পাথরের মেঝেতে লাল রঙের পদ্মফুল আঁকা। সামনে এক মানুষ সমান লম্বা মা লক্ষ্মী দেবীর মূর্তি। পাথর কেটে বানানো। পাশে পাথরের একটা পেঁচাও আছে। আজও যে চুরি হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে যায়নি সেটাই অবাক করার বিষয়।
' প্রতিমার ডান দিকের দেয়ালের নিচে তাই না ?' জানতে চাইলেন ইমান আলী।
'হ্যাঁ, স্যার।' অনুবাদ করা কাগজ বের করে ডাবল চেক করে বলল ভবানী প্রসাদ।
'কাঞ্জিলাল বাবু। আমরা কাজ করি। মেঝে দেয়াল মেরামত আমরাই করে দেব। যা পাওয়া যাবে সেটা থেকে আপনার আইন সঙ্গত অংশ আপনি পাবেন।'
কাঞ্জিলাল বাবুর চেহারায় লোভের আভা।' পাঁচালীতে দাদু এত কথা লিখে গেছে জীবনেও জানতাম না। শুভ কাজে দেরি কিসের ? চলুন।'
গাইতি আর কোদাল হাতে কাজে নেমে পড়লেন ইমান আলী আর তার যোগ্য সহকারী।
গাইতি দিয়ে পাথুরে মেঝেতে আঘাত করতেই কেমন ত্যাম ত্যাম ধরনের শব্দ করে উঠলো।
'কিছু একটা আছে।' কারন ছাড়াই ফিসফিস করে বললেন ইমান আলী।
'আমার ও তাই মনে হয় স্যরা । কত হাজার বার মাটি খুড়ে গুম হয়ে যাওয়া লাশ বের করলাম। এই প্রথম ধন সম্পদ খুঁজছি। নিয়তির খেলা।' একই ভাবে জবাব দিল ভবানী বাবু।
বেশি খুঁড়তে হল না।
মাত্র হাত খানিক মাটি খোঁড়ার পর মাটির কলসিটা নজরে এলো। সাবধানে খুড়ে যেতে লাগলেন দুইজন। কলসির গায়ে আঘাত যাতে না লাগে। আরও মাটি সরানোর পর দেখা গেল জরাসন্ধ রায়ের বর্ণনা মত সাতটা মাটির কলসি সাজানো আছে। কলসির গায়ে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। কলসির মুখ গালা আর তুঁত জাতীয় কিছুর প্রলেপ দিয়ে বন্ধ করা।
পরিশ্রম আর উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে দুইজন। কিছু না করেও হাঁপাচ্ছে কাঞ্জিলাল।
সাতকলসি তুলে আনা হল মাটির তলা থেকে।
'কাঞ্জিলাল বাবু।' পকেট থেকে জলের বোতল বের করে এক ঢোক গিলে বললেন ইমান আলী । 'আপনার পূর্বপুরুষের জিনিস আপনিই কলসির মুখ খুলুন।'
উত্তেজনায় কাঁপছেন কাঞ্জিলাল বাবুর। হাত বাড়িয়ে গাইতি তুলে নিয়ে বিড়বিড় করে কি যেন বলে আঘাত করলেন কলসির মুখে।
সাধারণ মাটির কলসি। তারপরও শুকনো জায়গায় থাকায় ভালই ছিল। প্রথম আঘাতেই কলসির গলা ভেঙ্গে গেল।
যথেষ্ট আলো আছে। তারপরও পাঁচ ব্যাটারির হান্টিং টর্চ লাইটটা জ্বেলে আলো ফেলেছিলেন ইমান আলী। স্পটলাইটের মত উজ্জ্বল আলোর ফালিতে দেখা গেল কলসির ভেরত থেকে ঝুর ঝুর ঝরে পড়ছে সোনালী মিহি দানা। কালের আঘাতে নষ্ট হয়ে গেছে কিছু। কিন্তু আজও উজ্জ্বল সোনালী। বেশির ভাগ নষ্ট হয়ে বিচিত্র ধাতুর রঙ ধারন করেছে, পোকায় খেয়ে নষ্ট করে ফেলেছে বাদবাকি।
'একি ? হায় হায়।' বিচিত্র ভঙ্গিতে বিলাপ করে উঠলেন কাঞ্জিলাল।
বাকি সবগুলো কলসির মুখ ভেঙ্গে ফেললেন তিনি।
ঈশ্বরের আশীর্বাদের মত বের হয়ে এলো আরও আরও সোনালী রঙের মা লক্ষ্মীর প্রিয় সম্পদ।
'অনেক আগেই বুঝেছিলাম আমি।' হাসি মুখে বললেন ইমান আলী। 'প্রিয় প্রজাদের কাছ থেকে টাকা পয়সা বা সোনাদানা নেননি আপনার দয়ালু পূর্বপুরুষ। এক মুঠো করে ধান নিয়েছিলেন । উনার কাছে সেটাই ছিল এক মুঠো স্বর্ণ। ভাল জাতের ধানের বীজ কোন ভাবে যোগাড় করেছিলেন তিনি। বিলিয়ে দিয়েছেন প্রজাদের মাঝে । সেইজন্য তখন আপনাদের গ্রামে ফসল উৎপাদন বেড়ে গিয়েছিল চারগুন। পুরানো দিনের নথি খুঁজে আমি নিজে পড়েছি । পানাম নগর আর নিমগঞ্জের ধান বার্মা-কলকাতায় যেত। এই ধানের নাম ছিল লক্ষ্মী বিলাস বা স্বর্ণ ধান । ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতায় এই মা লক্ষ্মীর মন্দির বানিয়েছিলেন উনি। প্রজারা খাজনা দিতে চাইলে উনি মাত্র এক মুঠো করে ধান নিয়েছেন। যাতে ভবিষতে বীজ হিসাবে ব্যবহার করা যায়।'
মন্দিরের ভেতরে অখণ্ড নিরবতা।
শেষ বিকেলের রোদ এসে পড়ছে নষ্ট ধানের উপর।
সোনার কুঁচির মত লাগছে।
রোদের রঙ তরল সোনার মত। জীবনটাও সোনালী বলে ভ্রম জাগে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন