‘আকাশের অবস্তা যা বুঝতাসি রাইতে ঝড় অইব।’ চোখ মুখ কুঁচকে বলল হারু শেখ।
আকাশের দিকে চাইল বাদল। মাঝি ব্যাটা বেশি বলছে। কালো মেঘ জমেছে ঈশান কোনে, সত্যি। কিন্তু ঝড় টড় উঠবে বলে মনে হয় না। বাঙলায় কি মাস চলছে ? শ্রাবণের শেষ না ? এই সময় কি ঝড় হয় নাকি ?
‘ ঢাকা থেকে যখন রওনা হয়েছিলাম তখন কিন্তু আকাশ পরিষ্কার ছিল। বুঝতে পারিনি এমন মেঘ জমবে।’ সাফাই গাইল বাদল।
‘ ধাহা শহরে কি কিলিয়ার আকাশ দেখন যাই নি। খালি তো বড় বড় দয়লান ভর্তি।’ গোঁফে তা দিতে দিতে বলল হারু শেখ । চেহারায় এমন ভাব যেন শহর বিশেষজ্ঞ। বা সারা জীবন ঢাকায় থেকেছে।
ভট ভট শব্দ করে নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে। ইঞ্জিন বসানো। বৈঠা মারলে ঠেলা বের হয়ে যেত। ঢাকা নিয়ে আর জ্ঞানী মার্কা সংলাপ দিতে পারত না। চুপ চাপ বসে আছে বাদল। নৌকায় একা যাত্রী। অন্য কোন লোক তুলেনি হারু। বাদলকে ভাল করে চেনে হারু। গত বছর শীতে একবার এসেছিল। সাহেব লোক ভাল। একটু পাগল । লম্বা কেমন পাইপে করে পাখি দেখে। আর কাগজে কি সব লেখে। ইস্কুলের মাষ্টার নাকি ? খবরের কাগজের লোক হতে পারে। বাদলকে দেখা মাত্র নৌকা রিজার্ভ হিসাবে চালিয়ে দিয়েছে।
‘ আফনে পাখির জীবনী লেখেন ?’ সাহস করে প্রশ্ন করে বসলো হারু শেখ ।
‘ নাহ।’ হাসল বাদল। ‘ পাখিদের নিয়ে লিখি। মাইগ্রেশন বার্ড। মানে দেশান্তরী পাখি। কিছু পাখি সব মৌসুমে আমাদের দেশে আসে না, জানেন বোধ হয় ? আবার বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পাখিদের নিয়ে ও লিখি। অনেক পাখি হারিয়ে যাচ্ছে। ওদের খোঁজ পাওয়া যায় কি না দেখি। বর্মি কাঠঠোকরা পাখির কথাই ধরুন। আছে। তবে খুব রেয়ার। মানে হঠাৎ করেই কখনও কখনও দেখা যায়। কয়েক বছর পর হয়তো আর পাওয়া যাবে না। পাতাঠুটি ধনেশ পাখির কথাই ধরুন। এটা আমাদের দেশের পাখি না বাইরে থেকে আমাদের দেশে আসে আজ ও জানা যায়নি। সেই ২০০৮ সালে শেষ দেখা গেছে। এই সব নিয়ে লিখি। বিদেশি পত্রিকায় ছবি সহ লেখা পাঠিয়ে দিলে মজুরি পাই।’
থামল বাদল। হারু শেখ কথা শুনছে । কিন্তু কত টুকু কি বুঝছে কে বলবে ? চোখ মুখ কুঁচকে চেয়ে আছে বাদলের দিকে। হারু শেখকে দেখাছে একটা পাখির মত । আরও কিছু বলতো বাদল। পাখি নিয়ে কথা বলতে ওর ভাল লাগে। কিন্তু নৌকার ইঞ্জিনের ভট ভট শব্দ ছাপিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। এমনিতেই গলা শুকিয়ে গেছে। এক পেয়ালা চা দরকার। নৌকায় ওঠার আগে মনে হয়েছিল। ঘাটে একটা টঙের দোকান ছিল । কি মনে করে চা নেয়া হয়নি। আকাশ কালো দেখে সময় নষ্ট করতে চায়নি । ভেবেছিল ঘাসের চরে গিয়ে মানিক মিয়ার হোটেলে উঠেই চা খাওয়া যাবে।
মানিক মিয়ার হোটেলের কথা মনে হতেই বেশ একটা উদ্যম পেল বাদল। ব্যাটা কেমন একটা হোটেল ফেঁদে বসে আছে নির্জন দ্বীপের মধ্যে। চলে দারুন। ঘাসের চরের কথা একটা দৈনিক পত্রিকায় পড়েছিল বাদল। সবাই সেন্ট মার্টিনে দৌড়ে যায়। কিন্তু এই দ্বীপটায় কেউ যায় না। টুরিস্টদের মুখেও তেমন নাম নেই। ভোলা সদর থেকে ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপাসাগরের কোল ঘেষে মেঘনার বুকে জেগে ওঠা ঘাসের চর। দ্বীপটা ছোট। মাত্র তিন মাইল। জন বসতি নেই। একদম খালি। অনেক আগে জলদস্যুদের আস্তানা ছিল। মগেরা নাকি ডাকাতি করে এই দ্বীপেই লুকিয়ে থাকতো। কবে থেকে নাকি মানিক মিয়া নামে একজন দ্বীপটা লীজ নিয়ে নির্জনবাস নামে পিচ্চি একটা হোটেল চালাচ্ছে। ব্যস। আর কিছু জানত না বাদল।
বছর খানেক আগে এসে উঠেছিল ঘাসের চরে। দ্বীপটা বিখ্যাত না হোক, কে যেন বলেছিল জীব বৈচিত্র দারুন রকমের। কেওরা বন আর ম্যানগ্রোভ জাতীয় গাছ আছে প্রচুর। সৈকতে কাছিম ডিম পারে। কাঁকড়ার বাসা আছে। আরও আছে পাখির ঝাঁক। হলুদ বুটিওয়ালা তিতির পাখি আর নীল ভিমরাজ আছে নাকি। শোনা কথায় কান দিতে নেই। কি মনে করে চলে এলো। অবাক হয়ে আবিস্কার করলো পাখি দেখার জন্য বেশ দারুন একটা জায়গা। পাথরের খাঁজে খাঁজে পাখির বাসা দেখে বুঝল আরও আগে আসা দরকার ছিল। টানা এক সপ্তাহ ছিল সেইবার। আবার চলে এসেছে। পত্রিকার অফিস কাঁকড়ার বাসার একটা ছবি দেখে বলেছে অমন আরও কিছু ছবি দিতে পারলে একটা ফিচার করা যেতে পারে।
আকাশ দেখে ভয় পেল বাদল। সাঁতার জানে না। নদী টলমল করছে। কালো কুচকুচে দেখাচ্ছে পানি। ঝড় নামবে ? আশা করা যায় তার আগেই ঘাসের চরে পৌঁছে যাবে। নির্জনবাসে একবার ঢুকতে পারলে ঝড় বৃষ্টি কে কেয়ার করে ? ঢেউ বড় হচ্ছে আগের চেয়ে। ভাগ্য ভাল নদী আরও উত্তাল হয়ে উঠার আগে ঘাসের চরে এসে গেল নৌকা। ব্যাকপ্যাকার নিয়ে সাবধানে নামলো বাদল। ফিরে তাকাল হারু শেখের দিকে। ‘ আপনি কই যাবেন ?’
‘ এই হানে থাইক্কা লাভ কি ?’ আকাশের দিকে চেয়ে জবাব দিল মাঝি । ‘ আমি ফিরা যাই।’
‘ ঝড়ের মধ্যে পড়বেন তো।আকাশ কিন্তু অনেক কালো। মানিক মিয়ার হোটেলে চলে আসেন। বাইরে বসে সময় কাটিয়ে দিতে পারবেন । আকাশ ভাল হলে ফিরে যাবেন না হয় । ’
চুপ করে রইল হারু শেখ। ভাবছে।
‘ ভাত খাওয়াব আপনাকে। মাছ দিয়ে। গত বার পাবদা মাছের ঝোল খেয়েছিলাম। সাথে ফালি করা বেগুন। ’ লোভ দেখাল বাদল। খারাপ লাগছে লোকটার জন্য।
সব দাঁত বের করে হাসল হারু শেখ। দ্রুত লাফিয়ে নামলো নৌকা থেকে। সিমেন্টে বাধানো ঘাটলায় শক্ত করে বেধে নিল নৌকাটা। টালমাটাল ঢেউয়ের পাল্লায় পরে যাতে পালিয়ে না যায় দূর নদীর বুকে। সিমেন্টের ঘাটলায় জমে আছে শ্যাওলার মোটা চাদর। মখমলের মত। হাঁটতে লাগল দুইজন। নদীর পারের মাটি সন্দেশের মত নরম। পায়ের তলায় টল মল করছে পৃথিবী। দুরে অনেক শন ঘাস। মেঘলা কালো বাতাসে সাই সাই করে নড়ছে। আরও দূরে আবছামত মানিক মিয়ার হোটেল দেখা যাচ্ছে। কালো একটা ছায়ার মত। বারান্দায় কাচের লণ্ঠন ঝুলে। আজ অন্ধকার।
হাঁটছে ওরা। কুড়মুড় করে ভাঙছে শামুকের খোল। পায়ের শব্দে দৌড়ে ভাগছে বালিমাখা কাঁকড়া। আকাশে মেঘ আরও কালো হয়েছে। রঙ সীসের মত ।
যত কাছাকাছি আসছে তত পষ্ট হয়ে উঠছে মানিক মিয়ার ‘নির্জনবাস’ । দোতলা দালান। পাথরের ব্লক আর চুনা মাটি মিশিয়ে বানানো। ইতিহাস নিয়ে যারা ঘাঁটাঘাঁটি করে তারা বলেন পর্তুগিজ বা বার্মিজ জলদস্যুরাই এই পিচ্চি দোতলা বাড়িটা বানিয়েছিল। গোপন ঘাঁটি হিসাবে। পরে কত কাল পড়ে ছিল এই জিনিস এক টুকরো পাথরের মত কেউ জানে না। ঝড়ের ফাঁদে পড়লে মাছ ধরার নৌকা ভিড়ত ঘাসের চরে। কেউ কেউ রাত কাটাত। তারপরও এমনিতেই পড়ে ছিল। মানিক মিয়া দ্বীপটা লীজ নেবার পর বাড়িটা মেরামত করেছে। মেরামত মানে চুনকাম করিয়েছে। সামান্য বাঁশের আর কাঠের আসবাবপত্র কিনে দারুন এক হোটেল বানিয়ে ফেলেছে। ধন্যবাদ প্রাপ্য মানিক মিয়া।
মাত্র বিকেল। কিন্তু আবহাওয়ার কারনে মনে হচ্ছে সন্ধ্যা হয়ে গেছে । মানিক মিয়ার নির্জনবাসের বারান্দায় কমলা রঙের লণ্ঠন জ্বলছে। হাওয়ায় দুলছে অল্প অল্প। পুরো বাড়ি অন্ধকার। জেনারেটর নেই নির্জনবাসে। লণ্ঠন আর মোমবাতির আলোতে কাজ চলে।
দোতলা বাড়িটার সামনে ওরা দাঁড়ানো মাত্র আড়াল থেকে কর্কশ গলায় হাঁক দিল কেউ -‘ কে ? কে ওখানে ?’
গলার স্বর চেনা চেনা। পরক্ষণেই চিনতে পারল বাদল। মানিক মিয়ার গলা।
‘ মানিক বাই আমরা।’ জবাব দিল হারু শেখ। ‘ লগে পাখিওয়ালা সাম্বাদিক বাদলা বাই।’
অন্ধকার থেকে বের হয়ে এলো বেঁটে মত একজন মানুষ। ফর্সা। বেশ গোলগাল চেহারা। মাথায় হালকা টাক। চুল লেপটে আঁচরে টাক ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে। আর সব হোটেল ব্যবসায়ীদের মত চেহারায় ধুরন্ধর কোন ভাব নেই। চেক শাট আর ঢোলা পায়জামায় বেশ মাই ডিয়ার মার্কা চেহারা। বাদল আর হারু শেখকে দেখে কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল মানিক মিয়া।
‘ সে কি ! আপনারা ?’ বিব্রত গলায় বলল মানিক মিয়া।
সিক্স সেন্স বলে একটা কথা আছে। সারা দুনিয়ার হাজার লোক এটা বিশ্বাস করে। অনেকে আবার ভোগাস মনে করে। বাদল মনে প্রাণে বিশ্বাস করে সিক্স সেন্স বলে কিছু একটা আছে। এবং ওর সিক্স সেন্স বলছে , মস্ত বড় একটা ঘাপলা হচ্ছে।
‘ হ্যাঁ, আমি বাদল । চিনতে পেরেছেন ? গত বছর শীতে এসেছিলাম। দারুন আপ্যায়ন করেছেন আমাকে। আপনার বাবুর্চি মন্নান সাহেবের রান্নার হাত দারুন। আবার এলাম। গত সপ্তাহে ফোনে বুকিং দিয়েছিলাম যে আমি আসব। ’
কোন রকম বিকার দেখা গেল না মানিক মিয়ার চেহারায়। এক পলক বাদলের দিকে চেয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল। কোন রকম আগ্রহ দেখা গেল না চেহারায়। ভাব সাব দেখে মনে হয় না চিনতে পেরেছে। অথচ কি কাণ্ড, গত বার কি দারুন আন্তরিক ব্যবহার করেছিল।
‘ আজ যে আপনি আসবেন সেটা কিন্তু বলেননি ।’ নিস্প্রাণ গলায় বলল মানিক মিয়া । কথা বলছে বাদলের সাথে কিন্তু চেয়ে আছে হারু শেখের দিকে ।
অবাক হল বাদল। ‘ সমস্যা কি তাতে ?’
‘হোটেল রিজার্ভ । ভাড়া হয়ে গেছে।’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিল মানিক মিয়া।
‘ ফাজলামি নাকি ?’ চটে গেল বাদল । ‘ পুরা হোটেল ভাড়া হয়ে গেছে ? মানুষ কই ? একটা আলো পযন্ত জ্বলছে না। আর আপনি বলছেন হোটেল রিজার্ভ । লোকজন কই ?’
একটু থমকে গেল মানিক মিয়া। দ্রুত জবাব দিল - ‘ ইয়ে মানে সব খদ্দের আসেনি এখনও । আকাশের অবস্থা ভাল না তাই। এসে পড়বে।’
‘তো , আমাকে কি করতে বলেন ?’ কেন যেন রেগে যাচ্ছে বাদল। লোকটার অমন গা ছাড়া আচরণ রাগিয়ে তুলছে ওকে।
‘ বললাম না হোটেল রিজার্ভ।’ মুখ শক্ত করে বলল মানিক মিয়া। ‘ আপনাকে কোথায় থাকতে দেব ?’
‘ ভাই আপনার গেস্ট এখনো আসেনি তাই না ? অথচ এটা পিকনিকের সিজন না। আপনার ব্যবসা যে এত রমরমা হয়ে গেছে এক বছরে তাই জানতাম না। গত শীতে যখন এলাম দেখি হোটেলে মাত্র ছয় জন গেস্ট। আর আজ এই বাদলার দিনে ফুল হাউস। কিন্তু গেস্ট কেউ আসেনি। আর আমাকে বলছেন কোথায় থাকতে দেবেন ?’
এমন আচমকা আক্রমণে খানিক থতমত খেয়ে গেলে মানিক মিয়া। মুখ শক্ত করে বলল ’ আপনাকে থাকতে দেয়া যাবে না। কাল হলে সম্ভব ছিল। কিন্তু আজ না ।’
‘ আফনে পাগল অইছেন মানিক বাই।’ এই প্রথম কথা বলল হারু শেখ । ‘ দরিয়ার অবস্তা দেখছেন ? মাঝ দরিয়ায় গেলে জদি তুফান নামে ?
মুখ শক্ত করে দাড়িয়ে আছে মানিক মিয়া। যেন কঠিন কোন সিধান্ত নিতে পারছে না।
‘ শহরের এক কাসটমার এমুন কইরা ফেরত গেলে লাল বাত্তি জ্বলতে সমুয় ল্যাগব না কইলাম।বাইয়ে কিন্তুক সাম্বাদিক। পেফারে লেইক্ষা দিব ।’ বাদলের পক্ষে তরফদারি করে হারু শেখ ।
চুপ চাপ কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকে মানিক মিয়া। কি যেন ভাবছে। চোখ মুখ কুঁচকে আছে। লোকটার ভাব ভঙ্গি দেখে অবাক হয় বাদল। এমন কি সমস্যায় পড়েছে বেচারা ? কারা এর হোটেল পুরা রিজার্ভ করেছে ?
‘ আচ্ছা ঠিক আছে।’ অনেকক্ষণ ভেবে জবাব দেয় মানিক মিয়া। ‘ একটা রুম খালি আছে দোতলায়। একদম কোনায়। কিন্তু রাতের খাবার নয়টার মধ্যে খেয়ে নিতে হবে। এর পর নিচে নামতে পারবেন না।ঠিক আছে ? ’
লোকটার ভাব চক্কর দেখে অবাক হল বাদল। মানুষের চরিত্র বড় বিচিত্র। প্রয়োজনে বদলায়। অপ্রয়োজনে বদলায়। কিন্তু এই লোক এমন করছে কেন ? গত বারের মানিক মিয়ার সাথে এই লোকের কোন মিল নেই। এমন করছে কেন লোকটা ? একদিনে বেশি খদ্দের পেয়ে গেছে তাই ? ওর মহল্লার চায়ের দোকানদার বিল্লালের মত ? যে কিনা দোকান খালি থাকলে ভাল করে আপ্যায়ন করে। আবার সন্ধ্যার সময় বেশি খদ্দের পেলে ভাব দেখিয়ে কথা বলে না ।
মানিক মিয়ার হোটেলের নীচ তলায় আহা মরি তেমন কিছু নেই। কয়েকটা গোবদা গোবদা বাঁশের সোফা আছে বসার জন্য। কোন টিভি নেই। রেডিও আছে। কোন খবরের কাগজ নেই হোটেল নির্জনবাসে। রিসিপশনের মত একটা পিচ্চি কাউনটার আছে। খানিক দুরে রান্নাঘর। সাদা টুপি মাথায় মধ্যবয়স্ক এক লোক একা সামলায় সব। গেস্ট যতই আসুক এক পেয়ালা চা হোক বা রাতের খাবার সব একা এই মন্নান ভাণ্ডারী সামাল দেয়। সেই অর্থে রাজকীয় খাবার সাপ্লাই করা হয় না। সকালে পরোটা- ডিম ভাঁজা। দুপুরে যে কোন একটা মাছ। ডিমের তরকারি। রাতে ডাল মাংস। কখন ও পেঁয়াজ টম্যাটোর সালাদ। । সবই নির্ভর করে হোটেলের মওজুদের উপর। যাই রান্না করা হয় অপূর্ব স্বাদ। মন্নান ভাণ্ডারীর হাতে জাদু আছে। অথবা কয়লার চুলায় রান্না করা হয় সেটা একটা কারন। নীচতলায় পেল্লায় একটা টেবিল আছে বারোজন মানুষ এক সাথে বসে খেতে পারে। এটাই নির্জনবাস হোটেলের সব চেয়ে সুন্দর জিনিস।
একদিন ভাড়ার টাকা অগ্রিম রাখে মানিক মিয়া। খাওয়ার বিল সাথে সাথে দিতে হয়। চা, পানি বা অন্য যাই কেনা হোক নগদ কড়ি ।
নিচতলায় মাত্র চার কামরা। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় গেলে ওখানে আরও ছয় কামরা। খুব পিচ্চি পিচ্চি । কিন্তু সুন্দর। দোতলায় একদম শেষ মাথায় রুম পেল বাদল । কাঠের মেঝে । হাঁটলেই মচ মচ শব্দ হয়। বাঁশের বিছানা। সস্তা তোষক, উপরে বাহারি রঙ্গিন চাদর। নতুন না। কিন্তু পরিষ্কার। দুটো বালিশ। পাতলা তুলট কম্বল। কোনটাই দামি না। আহা মরি সুন্দর না । কিন্তু পরিষ্কার। বাঁশের টেবিলের উপর হারিকেল জ্বলছে। কাচের চিমনি হীরের মত পরিষ্কার। নরম আলো ছড়াচ্ছে।
মানিক মিয়ার হোটেলে খুঁত একটাই। টয়লেট আর গোসলখানা নীচ তলায়। মাত্র এক জোড়া করে। মেহমান যতই থাকুক সবাই মিলেমিশে ব্যবহার করে। সমস্যা হয় না। তেমন হিজিবিজি কখনই হয়নি।
গোসল করতে গিয়ে সারাদিনের ক্লান্তি আর মানিক মিয়ার উপর জমে থাকা রাগ দূর হয়ে গেল । বরফের মত ঠাণ্ডা পানি মাটির মটকা ভর্তি । টিনের মগ দিয়ে ইচ্ছা মত ঢালল। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে বের হবার সময় আবিষ্কার করলো বাইরে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। সোঁ সো বাতাস বইছে। আকাশ কুচকুচে কালো।হারু শেখ কিচেনের বাইরে একটা টুলে বসে চা খাচ্ছে। চোখে চোখ পড়তেই হাসল।
‘ রাতের খাবার কি ?’ জানতে চাইল বাদল।
‘ রুই মাছ। দাইল আর পাওপা বর্তা।’ হাসি মুখে জবাব দিল হারু শেখ।
শেষের জিনিসটা সম্ভবত পেঁপে ভর্তা বলেছে। অনুমান করলো বাদল। রুমে ফিরে পোশাক পাল্টে নিল। ব্যাগ থেকে দরকারি কাগজ, কলম, দূরবীন, ক্যামেরা বের করে গুছিয়ে নিতে নিতে রাত নয়টা। বৃষ্টির বিরাম নেই। নদীর গর্জন শোনা যাচ্ছে । টিনের চালে হাজার কাক নেচে বেড়ালে যেমন শব্দ হয় তেমন শব্দ হচ্ছে বৃষ্টির জন্য। মানিক মিয়া এসে জানাল রাতের খাওয়া শেষ করে নিতে হবে।
সামান্য রান্না। স্বাদের কথা জীবনেও ভুলতে পারবে না বাদল। মানিক মিয়া এই বাবুর্চিকে যোগাড় করলো কোত্থেকে ? খাওয়ার টেবিলে প্রচুর গল্প করলো দুইজনে। পাশে দাড়িয়ে পরিবেশন করলো মন্নান ভাণ্ডারী । ক্যাশের সামনে গম্ভীর মুখে বসে রইল মানিক মিয়া। কথা বলছে না।
হারু শেখের বিল বাদল দিল। কথা দিয়েছিল লোকটাকে খাওয়াবে । গেস্টদের কোন রুমে হারুকে রাখা যাবে না। কিচেনের স্টোর রুমে থাকতে পারবে এমনটা জানাল মানিক মিয়া।রাজি না হবার কোন কারন দেখল না কেউ ।
রাত দশটার মধ্যে সব শেষ। দোতলায় চলে গেল বাদল। বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। দুরে কথাও কড় কড়াৎ করে বাজ পড়ছে হঠাৎ হঠাৎ । বই নিয়ে বিছানায় চলে এলো । দুটো বই ক্যারি করেছে এইবার। সালিম আলীর - দ্যা বুক অভ ইনডিয়ান বার্ডস । আরেকটা জেমস বন্ডের - বার্ডস অভ দ্যা ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জেমস বন্ড নামে যে একজন পাখি বিজ্ঞানী ছিল কে জানত ? লেখক ইয়েন ফ্লেমিং তার থ্রিলার লেখার সময় সুন্দর একটা নাম খুঁজছিলেন মূল চরিত্রের জন্য। শেষে এই নামটা ব্যবহার করেন।
বইয়ের ভেতরে দ্রুত ডুবে গেল বাদল। নীলঝুটি বালিহাঁসের চ্যাপ্টারটা পড়ছে। শীতের শুরুতে নদীর পাশে দেখা যায় এদের। ভেজা বালিতে ডিম পারে। হালকা নীল হয় ডিমের খোসা। শুকনো শ্যাওলা দিয়ে ডিম ঢেকে রাখে। বালি রোদের তাপে গরম হয়ে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। শীত শেষ হলে উড়ে যায় অন্য কোথাও।
বই পড়ার জন্য অপূর্ব এক রাত। নদীর মাঝে ঘাসের দ্বীপ। দ্বীপের মাঝে হোটেল। পুরানো। বাইরে ঝড়ের রাত। উত্তাল নদী। বৃষ্টি আর হাওয়ায় মাতামাতি । বিদ্যুতের চমক। কম্বল মুড়ি দিয়ে পছন্দের বই পড়ার মত আনন্দের আর কিছু নেই। এমনিতে অনেক দেরি করে ঘুমায় বাদল। কিন্তু পথের ক্লান্তি আর আরামদায়ক গোসলের পর অমন স্বপ্নিল রাত পেয়ে জেগে থাকতে পারল না। নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়লো।
ঘুম ভাঙ্গার পর কয়েক মুহূর্ত লাগল বুঝে উঠতে , কোথায় আছে ও। মনে পড়লো সব। ঝুম বৃষ্টি থেমে গেছে। হালকা বাতাসের গর্জন আর ইলশেগুড়ি। বাতাসের বেগ কমেনি। টেবিলেরর উপর হারিকেল জ্বলছে। বিছানার পাশে বই। ঘুম ঘুম চোখে ঘড়ি দেখল। সাড়ে বারোটা। লম্বা একটা ঘুম দিয়ে কাল সকালে উঠে চা গিলতে হবে। হারিকেনের সলতে কমিয়ে দিতে যাবে তখনই মনে হল নীচ তলায় কিসের যেন শব্দ। এত রাতেও মানিক মিয়া আর মন্নান ভাণ্ডারী জেগে আছে ?
বাদলার রাতে কি করে ওরা ?
আরে ধ্যাত। আমার কি ? ভাবল বাদল। ফিরে ঘুমাতে যাবে তখনই মনে হল নীচ তলায় অনেক মানুষ। নিঃশব্দে কিছু একটা করার চেষ্টা করছে। অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেল বাদল। দ্রুত নেমে পড়লো বিছানা থেকে। ব্যাগ থেকে বের করে নিল চার্জ দেয়া টর্চলাইটা। লঘু পায়ে নামতে লাগলো নীচে। দোতলার শেষ মাথায় সিঁড়ি। নিচের ডাইনিং টেবিল দেখা যায় এখান থেকে। মনে মনে বড় ধাক্কা খেল। নিচের ডাইনিং টেবিলে একগাদা লোক বসে খাওয়া দাওয়া করছে। তারমানে মানিক মিয়ার কথা সত্য। কিন্তু কারা এরা ? কেমন তরো মধ্যরাতের মেহমান ? এই বাদলার রাতে নদী পাড়ি দিল কিভাবে ?
নীচে গিয়ে প্রস্রাব করে আসবে সাথে লোকগুলো দেখে আসবে। ভাবল বাদল। মাত্র দুই কদম পা বাড়িয়েছে গায়ের উপর গণ্ডারের মত ঝাঁপিয়ে পড়লো কে যেন। এতই আচমকা যে তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেল । কানের কাছে চিবিয়ে চিবিয়ে মানিক মিয়া বলল- ‘ আপনাকে কিন্তু বলা হয়েছিল রাতের বেলা নীচে নামতে পারবেন না । কেন নেমেছেন ? কেন ? ’
ঘটনার আকস্মিকতায় কেমন যেন ভড়কে গেছে বাদল। যতটা দ্রুত রিফ্লেক্স করার কথা ছিল ততটা পারলো না। তারপরও লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। হিস হিস করে বলল- ‘থাপড়ে দাঁত ফেলে দেব মিয়া। আমার গায়ে হাত তুলেছেন ? দাঁড়ান মজা দেখচ্ছি । নীচে কারা ? রাতের বেলা কারা গোপনে আসে আপনার হোটেলে ? জলদস্যুদের সাথে আঁতাত করে ব্যবসা করছেন তাই না ?’
আরও খানিক ঝুঁকে নীচের দিকে তাকাল বাদল। একগাদা লোক বসে আছে টেবিলে। সামনে খাবার। খাচ্ছে ওরা সবাই। লোকগুলো দেখেই শরীর হিম হয়ে গেল বাদলের। মনে হল চোখের ভুল। হারিকেনের আলোতে মনে হল লোকগুলো মোমের তৈরি। গলে গেছে নানান জায়গায় । কাঁদা মাখা পোশাক পরে বসে আছে সবাই। সবার শরীর বেঢপ ফোলা। নোংরা। কুৎসিত। প্রানহীন পাথুরে চেহারা।কোন বিকার নেই মুখে।
‘ কারা ওরা ?’ ঢোক গিলে বলল বাদল। শিরশির করছে মেরুদণ্ডটা। দমকা বাতাসে নীচ থেকে পচা গন্ধ ভেসে এলো ভুর ভুর করে । গা গুলিয়ে উঠলো।
‘ চার বছর আগে নদীতে ডুবে যাওয়া জাহাজ রুস্তমের যাত্রীরা।’ ফিসফিস করে বলল মানিক মিয়া। ‘ সবার লাশ পাওয়া গিয়েছিল। এই কয়েকজনের লাশ পাওয়া যায়নি। প্রতি বছর এই রাতেই ওরা হাজির হয় আমার হোটেলে। পেট ভরা খিদে নিয়ে মারা গিয়েছিল ওরা।’

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন