সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রাতের খাবার

 আকাশের অবস্তা  যা বুঝতাসি রাইতে ঝড় অইব’  চোখ মুখ কুঁচকে বলল হারু শেখ

আকাশের দিকে চাইল বাদলমাঝি ব্যাটা বেশি বলছেকালো মেঘ জমেছে ঈশান কোনে, সত্যিকিন্তু ঝড় টড় উঠবে বলে মনে হয় নাবাঙলায় কি মাস চলছে ?  শ্রাবণের শেষ না ? এই সময় কি ঝড় হয় নাকি ?

ঢাকা থেকে যখন রওনা হয়েছিলাম তখন কিন্তু আকাশ পরিষ্কার ছিলবুঝতে পারিনি এমন মেঘ জমবেসাফাই গাইল বাদল

ধাহা শহরে কি কিলিয়ার আকাশ দেখন যাই নিখালি তো  বড় বড় দয়লান ভর্তিগোঁফে তা দিতে দিতে বলল হারু শেখ চেহারায় এমন ভাব যেন শহর বিশেষজ্ঞবা সারা জীবন ঢাকায় থেকেছে

ভট ভট শব্দ করে নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে।   ইঞ্জিন  বসানোবৈঠা মারলে ঠেলা বের  হয়ে  যেতঢাকা নিয়ে আর জ্ঞানী মার্কা সংলাপ দিতে পারত নাচুপ চাপ বসে আছে বাদলনৌকায় একা যাত্রীঅন্য কোন লোক তুলেনি হারুবাদলকে  ভাল করে চেনে হারুগত বছর শীতে একবার এসেছিলসাহেব লোক ভালএকটু পাগল লম্বা কেমন পাইপে করে পাখি দেখেআর কাগজে কি সব লেখে।  ইস্কুলের মাষ্টার নাকি ? খবরের কাগজের লোক হতে পারেবাদলকে দেখা মাত্র নৌকা রিজার্ভ  হিসাবে চালিয়ে দিয়েছে

আফনে পাখির জীবনী লেখেন ?’   সাহস করে প্রশ্ন করে বসলো হারু শেখ

নাহ’  হাসল বাদল‘  পাখিদের  নিয়ে লিখিমাইগ্রেশন বার্ডমানে   দেশান্তরী  পাখি।   কিছু পাখি সব মৌসুমে আমাদের দেশে আসে না, জানেন বোধ হয় ? আবার বিলুপ্ত  হয়ে যাওয়া পাখিদের নিয়ে ও লিখিঅনেক পাখি হারিয়ে যাচ্ছেওদের খোঁজ পাওয়া যায় কি না দেখিবর্মি কাঠঠোকরা  পাখির কথাই ধরুনআছেতবে খুব রেয়ারমানে হঠাৎ করেই  কখনও কখনও দেখা যায়কয়েক বছর পর হয়তো আর পাওয়া যাবে না।   পাতাঠুটি ধনেশ পাখির  কথাই ধরুনএটা আমাদের দেশের পাখি  না  বাইরে থেকে আমাদের দেশে আসে আজ ও জানা যায়নিসেই ২০০৮ সালে শেষ দেখা গেছে।     এই সব নিয়ে লিখিবিদেশি পত্রিকায়  ছবি সহ  লেখা  পাঠিয়ে দিলে  মজুরি   পাই

থামল বাদলহারু শেখ কথা শুনছে কিন্তু কত টুকু কি বুঝছে কে বলবে ?     চোখ মুখ কুঁচকে চেয়ে আছে  বাদলের দিকে।  হারু শেখকে দেখাছে একটা পাখির মত ।   আরও কিছু বলতো বাদলপাখি নিয়ে  কথা বলতে ওর ভাল লাগেকিন্তু নৌকার ইঞ্জিনের ভট ভট শব্দ ছাপিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করছে নাএমনিতেই গলা শুকিয়ে গেছে।  এক পেয়ালা চা দরকারনৌকায় ওঠার আগে মনে হয়েছিল।  ঘাটে একটা টঙের দোকান ছিল  ।   কি মনে করে চা নেয়া হয়নি।  আকাশ কালো দেখে সময় নষ্ট  করতে  চায়নি ।  ভেবেছিল  ঘাসের চরে  গিয়ে মানিক মিয়ার হোটেলে  উঠেই চা খাওয়া যাবে

মানিক মিয়ার হোটেলের কথা মনে হতেই বেশ একটা উদ্যম পেল বাদলব্যাটা কেমন একটা হোটেল  ফেঁদে বসে আছে  নির্জন দ্বীপের মধ্যেচলে দারুন।  ঘাসের চরের কথা একটা দৈনিক পত্রিকায় পড়েছিল বাদল।  সবাই  সেন্ট মার্টিনে দৌড়ে যায়কিন্তু এই দ্বীপটায় কেউ যায় নাটুরিস্টদের মুখেও তেমন নাম নেইভোলা সদর থেকে ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপাসাগরের কোল ঘেষে মেঘনার বুকে জেগে ওঠা ঘাসের  চর।      দ্বীপটা ছোটমাত্র  তিন  মাইলজন বসতি নেইএকদম খালি।   অনেক আগে জলদস্যুদের আস্তানা ছিলমগেরা নাকি ডাকাতি করে এই দ্বীপেই লুকিয়ে থাকতো।   কবে  থেকে  নাকি মানিক মিয়া নামে একজন   দ্বীপটা  লীজ নিয়ে  নির্জনবাস নামে  পিচ্চি একটা হোটেল চালাচ্ছেব্যসআর কিছু জানত না বাদল

বছর খানেক আগে এসে উঠেছিল ঘাসের চরে।  দ্বীপটা বিখ্যাত না হোক,  কে যেন বলেছিল জীব বৈচিত্র দারুন রকমেরকেওরা বন আর ম্যানগ্রোভ জাতীয় গাছ আছে প্রচুরসৈকতে কাছিম ডিম পারেকাঁকড়ার বাসা আছেআরও আছে পাখির ঝাঁকহলুদ বুটিওয়ালা তিতির পাখি আর নীল ভিমরাজ আছে নাকিশোনা কথায় কান দিতে নেই।   কি মনে করে  চলে এলোঅবাক  হয়ে আবিস্কার    করলো   পাখি দেখার জন্য  বেশ দারুন একটা জায়গাপাথরের খাঁজে  খাঁজে   পাখির বাসা  দেখে বুঝল   আরও আগে আসা দরকার ছিলটানা এক সপ্তাহ ছিল সেইবার।   আবার চলে এসেছে।  পত্রিকার অফিস কাঁকড়ার বাসার একটা ছবি দেখে বলেছে অমন আরও কিছু ছবি দিতে পারলে একটা ফিচার করা যেতে পারে।  

 আকাশ দেখে ভয় পেল  বাদলসাঁতার জানে না।  নদী  টলমল করছেকালো কুচকুচে দেখাচ্ছে পানি।  ঝড় নামবে ?  আশা  করা যায় তার আগেই  ঘাসের চরে পৌঁছে যাবেনির্জনবাসে একবার ঢুকতে পারলে ঝড় বৃষ্টি কে কেয়ার করে  ?  ঢেউ বড় হচ্ছে আগের চেয়ে।  ভাগ্য ভাল  নদী  আরও উত্তাল হয়ে উঠার আগে ঘাসের চরে এসে গেল নৌকাব্যাকপ্যাকার নিয়ে সাবধানে নামলো বাদলফিরে তাকাল  হারু শেখের দিকেআপনি কই যাবেন ?’

এই হানে থাইক্কা লাভ কি ?’ আকাশের দিকে চেয়ে  জবাব দিল মাঝি আমি ফিরা যাই

ঝড়ের মধ্যে পড়বেন তোআকাশ কিন্তু অনেক কালোমানিক মিয়ার হোটেলে চলে আসেনবাইরে  বসে  সময়  কাটিয়ে  দিতে পারবেন আকাশ ভাল হলে ফিরে যাবেন না হয়  ।  

চুপ করে রইল হারু শেখভাবছে

ভাত খাওয়াব আপনাকেমাছ দিয়েগত বার পাবদা মাছের ঝোল খেয়েছিলামসাথে ফালি  করা বেগুন।  লোভ দেখাল বাদলখারাপ লাগছে লোকটার জন্য

সব দাঁত বের করে হাসল  হারু শেখদ্রুত লাফিয়ে  নামলো নৌকা থেকেসিমেন্টে বাধানো  ঘাটলায় শক্ত করে বেধে নিল নৌকাটাটালমাটাল ঢেউয়ের পাল্লায় পরে যাতে পালিয়ে না যায় দূর নদীর বুকে।    সিমেন্টের  ঘাটলায় জমে আছে  শ্যাওলার মোটা চাদরমখমলের মত।      হাঁটতে লাগল দুইজননদীর পারের মাটি  সন্দেশের মত নরম।  পায়ের তলায়  টল মল করছে  পৃথিবী।   দুরে অনেক শন ঘাসমেঘলা কালো বাতাসে সাই সাই করে নড়ছেআরও দূরে আবছামত মানিক মিয়ার হোটেল দেখা যাচ্ছেকালো একটা ছায়ার মতবারান্দায় কাচের লণ্ঠন ঝুলেআজ অন্ধকার

হাঁটছে ওরাকুড়মুড় করে ভাঙছে শামুকের খোল।  পায়ের শব্দে দৌড়ে ভাগছে বালিমাখা কাঁকড়াআকাশে মেঘ আরও কালো হয়েছেরঙ সীসের মত

যত কাছাকাছি আসছে তত পষ্ট হয়ে উঠছে মানিক মিয়ার  নির্জনবাসদোতলা দালানপাথরের  ব্লক আর চুনা মাটি মিশিয়ে বানানো।  ইতিহাস নিয়ে যারা ঘাঁটাঘাঁটি করে তারা বলেন   পর্তুগিজ  বা বার্মিজ  জলদস্যুরাই   এই পিচ্চি দোতলা বাড়িটা বানিয়েছিলগোপন ঘাঁটি হিসাবেপরে কত কাল  পড়ে ছিল এই জিনিস এক টুকরো পাথরের মত কেউ জানে নাঝড়ের ফাঁদে পড়লে মাছ ধরার নৌকা ভিড়ত ঘাসের চরেকেউ কেউ রাত কাটাততারপরও এমনিতেই পড়ে ছিলমানিক মিয়া দ্বীপটা লীজ নেবার পর বাড়িটা মেরামত করেছেমেরামত মানে চুনকাম করিয়েছেসামান্য বাঁশের আর কাঠের আসবাবপত্র কিনে দারুন এক হোটেল বানিয়ে ফেলেছেধন্যবাদ প্রাপ্য মানিক মিয়া

মাত্র বিকেলকিন্তু আবহাওয়ার কারনে মনে হচ্ছে  সন্ধ্যা হয়ে গেছে  ।  মানিক মিয়ার নির্জনবাসের বারান্দায় কমলা রঙের লণ্ঠন জ্বলছেহাওয়ায় দুলছে অল্প অল্পপুরো বাড়ি অন্ধকারজেনারেটর নেই নির্জনবাসেলণ্ঠন আর মোমবাতির আলোতে কাজ চলে

দোতলা বাড়িটার সামনে ওরা দাঁড়ানো মাত্র আড়াল থেকে কর্কশ গলায় হাঁক দিল কেউ -‘ কে ? কে ওখানে ?’

গলার স্বর চেনা চেনাপরক্ষণেই চিনতে পারল বাদলমানিক মিয়ার গলা

মানিক বাই আমরাজবাব দিল হারু শেখলগে পাখিওয়ালা সাম্বাদিক বাদলা বাই

অন্ধকার থেকে বের হয়ে এলো বেঁটে মত একজন মানুষফর্সাবেশ গোলগাল চেহারামাথায় হালকা টাকচুল লেপটে আঁচরে টাক ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছেআর সব হোটেল ব্যবসায়ীদের মত চেহারায় ধুরন্ধর কোন ভাব নেই।   চেক শাট আর  ঢোলা পায়জামায় বেশ মাই ডিয়ার মার্কা চেহারাবাদল আর হারু শেখকে দেখে কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল মানিক মিয়া

সে কি !  আপনারা ?’ বিব্রত গলায় বলল   মানিক মিয়া

সিক্স সেন্স বলে একটা কথা আছেসারা দুনিয়ার হাজার লোক এটা বিশ্বাস করেঅনেকে আবার ভোগাস মনে করে।  বাদল মনে প্রাণে বিশ্বাস করে সিক্স সেন্স বলে  কিছু একটা আছেএবং ওর সিক্স সেন্স বলছে , মস্ত বড় একটা ঘাপলা হচ্ছে

হ্যাঁ, আমি বাদল চিনতে পেরেছেন ? গত বছর  শীতে  এসেছিলাম।  দারুন আপ্যায়ন করেছেন আমাকেআপনার বাবুর্চি  মন্নান সাহেবের রান্নার হাত দারুনআবার এলামগত সপ্তাহে ফোনে বুকিং দিয়েছিলাম যে আমি আসব

কোন রকম বিকার দেখা গেল না মানিক মিয়ার চেহারায়এক পলক বাদলের দিকে চেয়েই চোখ ফিরিয়ে নিলকোন রকম আগ্রহ দেখা গেল না চেহারায়ভাব সাব দেখে মনে হয় না চিনতে পেরেছেঅথচ কি কাণ্ড,  গত বার কি দারুন আন্তরিক ব্যবহার  করেছিল

আজ যে আপনি আসবেন সেটা কিন্তু বলেননি ’  নিস্প্রাণ গলায় বলল মানিক মিয়া কথা বলছে বাদলের সাথে কিন্তু চেয়ে আছে হারু শেখের দিকে

অবাক হল বাদলসমস্যা কি তাতে ?’

হোটেল রিজার্ভ ভাড়া হয়ে গেছেসংক্ষিপ্ত জবাব দিল মানিক মিয়া

ফাজলামি নাকি ?’  চটে  গেল বাদল পুরা হোটেল ভাড়া হয়ে গেছে ? মানুষ কই ? একটা আলো পযন্ত জ্বলছে নাআর আপনি বলছেন হোটেল রিজার্ভ লোকজন কই ?’

একটু থমকে গেল মানিক মিয়াদ্রুত জবাব দিল - ‘ ইয়ে মানে সব খদ্দের আসেনি এখনও আকাশের অবস্থা ভাল না তাইএসে পড়বে

তো , আমাকে কি করতে বলেন ?’ কেন যেন রেগে যাচ্ছে বাদললোকটার অমন গা ছাড়া আচরণ রাগিয়ে তুলছে ওকে

বললাম না হোটেল রিজার্ভমুখ শক্ত করে বলল মানিক মিয়াআপনাকে কোথায় থাকতে দেব ?’

ভাই আপনার গেস্ট এখনো আসেনি তাই না ? অথচ এটা পিকনিকের সিজন নাআপনার ব্যবসা যে এত রমরমা হয়ে গেছে এক বছরে তাই জানতাম নাগত শীতে যখন এলাম দেখি হোটেলে মাত্র ছয় জন গেস্টআর আজ এই বাদলার দিনে ফুল হাউসকিন্তু গেস্ট কেউ আসেনিআর আমাকে বলছেন কোথায় থাকতে দেবেন ?’

এমন আচমকা আক্রমণে খানিক থতমত খেয়ে গেলে মানিক মিয়ামুখ শক্ত করে বলল আপনাকে থাকতে দেয়া যাবে নাকাল হলে সম্ভব ছিলকিন্তু আজ না

আফনে পাগল অইছেন মানিক বাইএই প্রথম কথা বলল হারু শেখ দরিয়ার অবস্তা দেখছেন ? মাঝ দরিয়ায় গেলে জদি তুফান নামে ?

মুখ শক্ত করে দাড়িয়ে আছে মানিক মিয়াযেন কঠিন কোন  সিধান্ত নিতে পারছে না

শহরের এক কাসটমার এমুন কইরা ফেরত গেলে লাল বাত্তি জ্বলতে সমুয় ল্যাগব না কইলামবাইয়ে কিন্তুক সাম্বাদিকপেফারে লেইক্ষা দিব ’  বাদলের পক্ষে তরফদারি করে  হারু শেখ

চুপ চাপ কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকে মানিক মিয়াকি যেন ভাবছেচোখ মুখ কুঁচকে আছেলোকটার ভাব ভঙ্গি দেখে অবাক হয় বাদলএমন কি সমস্যায় পড়েছে বেচারা ?  কারা এর হোটেল পুরা রিজার্ভ করেছে ?

আচ্ছা ঠিক আছেঅনেকক্ষণ ভেবে জবাব দেয় মানিক মিয়াএকটা রুম খালি আছে দোতলায়একদম কোনায়কিন্তু রাতের খাবার নয়টার মধ্যে খেয়ে নিতে হবেএর পর নিচে নামতে পারবেন নাঠিক আছে ? ’

 লোকটার ভাব চক্কর দেখে অবাক হল বাদলমানুষের চরিত্র বড় বিচিত্রপ্রয়োজনে বদলায়অপ্রয়োজনে বদলায়কিন্তু এই লোক এমন করছে কেন ? গত বারের মানিক মিয়ার সাথে এই লোকের কোন মিল নেইএমন করছে কেন লোকটা ? একদিনে বেশি খদ্দের পেয়ে গেছে তাই ? ওর মহল্লার চায়ের দোকানদার বিল্লালের মত ? যে কিনা  দোকান খালি থাকলে ভাল করে  আপ্যায়ন করেআবার  সন্ধ্যার সময় বেশি খদ্দের পেলে ভাব দেখিয়ে কথা বলে না

মানিক মিয়ার হোটেলের নীচ তলায় আহা মরি তেমন কিছু নেইকয়েকটা গোবদা গোবদা বাঁশের সোফা আছে বসার জন্যকোন টিভি নেইরেডিও আছেকোন খবরের কাগজ নেই হোটেল নির্জনবাসেরিসিপশনের মত একটা পিচ্চি কাউনটার  আছেখানিক দুরে রান্নাঘর।  সাদা টুপি মাথায় মধ্যবয়স্ক  এক লোক একা সামলায় সবগেস্ট যতই আসুক এক পেয়ালা চা হোক বা রাতের খাবার সব একা  এই   মন্নান ভাণ্ডারী সামাল দেয়সেই  অর্থে রাজকীয় খাবার সাপ্লাই  করা হয় নাসকালে পরোটা- ডিম ভাঁজাদুপুরে যে কোন একটা মাছডিমের তরকারিরাতে ডাল মাংসকখন ও  পেঁয়াজ টম্যাটোর সালাদ।  ।  সবই নির্ভর করে হোটেলের মওজুদের উপর।  যাই রান্না করা হয় অপূর্ব স্বাদমন্নান ভাণ্ডারীর হাতে জাদু আছেঅথবা কয়লার চুলায় রান্না করা হয় সেটা একটা কারননীচতলায় পেল্লায় একটা টেবিল আছে বারোজন মানুষ এক সাথে বসে খেতে পারে।  এটাই  নির্জনবাস হোটেলের সব চেয়ে সুন্দর জিনিস

একদিন ভাড়ার টাকা অগ্রিম রাখে মানিক মিয়াখাওয়ার বিল সাথে সাথে দিতে হয়চা, পানি বা অন্য যাই কেনা হোক নগদ কড়ি

নিচতলায় মাত্র চার কামরাসিঁড়ি দিয়ে দোতলায় গেলে ওখানে আরও ছয় কামরাখুব পিচ্চি পিচ্চি কিন্তু সুন্দরদোতলায় একদম শেষ মাথায় রুম পেল বাদল কাঠের মেঝে হাঁটলেই মচ মচ শব্দ হয়বাঁশের বিছানাসস্তা তোষক, উপরে বাহারি রঙ্গিন চাদরনতুন নাকিন্তু পরিষ্কারদুটো বালিশপাতলা তুলট কম্বল।   কোনটাই  দামি নাআহা মরি সুন্দর  না কিন্তু  পরিষ্কারবাঁশের  টেবিলের উপর  হারিকেল জ্বলছেকাচের চিমনি  হীরের মত পরিষ্কারনরম আলো ছড়াচ্ছে

মানিক মিয়ার হোটেলে  খুঁত  একটাইটয়লেট   আর গোসলখানা নীচ তলায়মাত্র এক জোড়া করেমেহমান যতই থাকুক সবাই মিলেমিশে ব্যবহার করেসমস্যা হয় নাতেমন হিজিবিজি কখনই হয়নি

গোসল করতে গিয়ে সারাদিনের ক্লান্তি আর মানিক মিয়ার উপর  জমে  থাকা  রাগ  দূর  হয়ে  গেল  বরফের মত ঠাণ্ডা পানি  মাটির মটকা ভর্তি টিনের মগ দিয়ে ইচ্ছা মত ঢাললতোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে বের হবার সময় আবিষ্কার করলো বাইরে ঝুম বৃষ্টি নেমেছেসোঁ সো বাতাস বইছেআকাশ কুচকুচে কালোহারু শেখ কিচেনের বাইরে একটা টুলে বসে চা খাচ্ছেচোখে চোখ পড়তেই হাসল

রাতের খাবার কি ?’ জানতে চাইল বাদল

রুই মাছদাইল আর পাওপা বর্তাহাসি মুখে জবাব দিল হারু শেখ

শেষের জিনিসটা সম্ভবত পেঁপে ভর্তা বলেছেঅনুমান করলো বাদলরুমে ফিরে পোশাক পাল্টে নিলব্যাগ থেকে দরকারি কাগজ, কলম, দূরবীন, ক্যামেরা বের করে গুছিয়ে নিতে নিতে রাত নয়টাবৃষ্টির বিরাম নেইনদীর গর্জন শোনা  যাচ্ছে টিনের চালে হাজার কাক  নেচে বেড়ালে যেমন শব্দ হয় তেমন শব্দ হচ্ছে বৃষ্টির জন্যমানিক মিয়া এসে জানাল রাতের খাওয়া শেষ করে নিতে হবে

সামান্য রান্নাস্বাদের কথা জীবনেও  ভুলতে পারবে না বাদলমানিক মিয়া এই বাবুর্চিকে যোগাড়  করলো কোত্থেকে ? খাওয়ার টেবিলে প্রচুর গল্প করলো দুইজনেপাশে দাড়িয়ে পরিবেশন করলো মন্নান  ভাণ্ডারী  ক্যাশের সামনে গম্ভীর মুখে বসে রইল  মানিক মিয়াকথা বলছে না

হারু শেখের বিল বাদল দিলকথা দিয়েছিল লোকটাকে খাওয়াবে ।  গেস্টদের কোন রুমে হারুকে রাখা  যাবে নাকিচেনের স্টোর রুমে থাকতে পারবে এমনটা জানাল মানিক মিয়ারাজি  না হবার কোন কারন দেখল না কেউ

রাত দশটার মধ্যে সব শেষদোতলায় চলে গেল বাদলবৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছেদুরে কথাও কড় কড়াৎ করে বাজ পড়ছে হঠাৎ হঠাৎ ।  বই নিয়ে বিছানায় চলে এলো ।  দুটো বই ক্যারি করেছে এইবারসালিম আলীর - দ্যা বুক অভ ইনডিয়ান বার্ডস ।   আরেকটা জেমস বন্ডের - বার্ডস অভ দ্যা ওয়েস্ট ইন্ডিজজেমস বন্ড নামে যে একজন পাখি বিজ্ঞানী ছিল কে  জানত  ? লেখক ইয়েন ফ্লেমিং তার থ্রিলার লেখার সময় সুন্দর একটা নাম খুঁজছিলেন মূল  চরিত্রের জন্যশেষে এই নামটা ব্যবহার করেন

বইয়ের ভেতরে দ্রুত ডুবে গেল বাদলনীলঝুটি বালিহাঁসের চ্যাপ্টারটা পড়ছেশীতের শুরুতে নদীর পাশে দেখা যায় এদেরভেজা বালিতে ডিম পারেহালকা নীল হয় ডিমের খোসাশুকনো শ্যাওলা দিয়ে ডিম ঢেকে রাখেবালি রোদের তাপে গরম হয়ে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়শীত শেষ হলে উড়ে যায় অন্য কোথাও

বই পড়ার জন্য অপূর্ব এক রাত।    নদীর মাঝে ঘাসের দ্বীপদ্বীপের মাঝে হোটেলপুরানোবাইরে ঝড়ের রাতউত্তাল নদীবৃষ্টি আর হাওয়ায় মাতামাতি বিদ্যুতের চমককম্বল মুড়ি দিয়ে পছন্দের বই পড়ার মত আনন্দের আর কিছু নেইএমনিতে অনেক দেরি করে ঘুমায় বাদলকিন্তু পথের ক্লান্তি আর আরামদায়ক গোসলের  পর অমন  স্বপ্নিল রাত পেয়ে  জেগে থাকতে পারল নানিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়লো

ঘুম ভাঙ্গার পর কয়েক মুহূর্ত লাগল বুঝে উঠতে ,  কোথায় আছে ওমনে পড়লো সব।  ঝুম  বৃষ্টি থেমে গেছেহালকা বাতাসের গর্জন আর ইলশেগুড়িবাতাসের বেগ কমেনিটেবিলেরর  উপর  হারিকেল জ্বলছেবিছানার পাশে বইঘুম ঘুম চোখে ঘড়ি দেখলসাড়ে বারোটালম্বা একটা ঘুম দিয়ে কাল সকালে উঠে চা গিলতে হবেহারিকেনের সলতে কমিয়ে দিতে যাবে তখনই মনে হল নীচ তলায় কিসের যেন শব্দএত রাতেও মানিক মিয়া আর মন্নান ভাণ্ডারী জেগে আছে ?


বাদলার রাতে কি করে ওরা ?

আরে ধ্যাতআমার কি ? ভাবল বাদলফিরে ঘুমাতে যাবে তখনই মনে হল নীচ তলায় অনেক মানুষনিঃশব্দে কিছু একটা করার চেষ্টা করছেঅ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেল বাদলদ্রুত নেমে পড়লো বিছানা থেকেব্যাগ থেকে বের করে নিল  চার্জ দেয়া টর্চলাইটালঘু পায়ে নামতে লাগলো নীচেদোতলার শেষ মাথায় সিঁড়িনিচের ডাইনিং টেবিল দেখা যায় এখান থেকেমনে মনে বড় ধাক্কা খেলনিচের  ডাইনিং টেবিলে একগাদা লোক বসে খাওয়া দাওয়া করছেতারমানে   মানিক মিয়ার কথা সত্য।  কিন্তু কারা এরা ? কেমন তরো মধ্যরাতের  মেহমান ? এই বাদলার রাতে নদী পাড়ি দিল কিভাবে ?

নীচে গিয়ে প্রস্রাব করে আসবে সাথে লোকগুলো দেখে আসবেভাবল বাদলমাত্র দুই কদম পা বাড়িয়েছে গায়ের উপর  গণ্ডারের মত ঝাঁপিয়ে পড়লো কে যেনএতই আচমকা যে তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেল কানের কাছে চিবিয়ে চিবিয়ে মানিক মিয়া বলল- ‘ আপনাকে কিন্তু  বলা হয়েছিল রাতের বেলা নীচে নামতে পারবেন না কেন নেমেছেন ? কেন ? ’

ঘটনার আকস্মিকতায় কেমন যেন ভড়কে গেছে বাদলযতটা দ্রুত রিফ্লেক্স করার কথা ছিল ততটা পারলো নাতারপরও লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালোহিস হিস  করে  বলল- ‘থাপড়ে দাঁত ফেলে দেব মিয়াআমার গায়ে হাত  তুলেছেন ? দাঁড়ান মজা দেখচ্ছি নীচে কারা ? রাতের বেলা  কারা  গোপনে আসে আপনার হোটেলে  ?    জলদস্যুদের সাথে আঁতাত করে ব্যবসা করছেন তাই না ?’

আরও খানিক ঝুঁকে নীচের দিকে তাকাল বাদলএকগাদা লোক বসে আছে টেবিলেসামনে খাবারখাচ্ছে ওরা সবাইলোকগুলো দেখেই শরীর হিম হয়ে গেল বাদলেরমনে হল চোখের ভুলহারিকেনের আলোতে মনে হল লোকগুলো মোমের তৈরিগলে গেছে নানান জায়গায় ।  কাঁদা মাখা পোশাক পরে বসে আছে সবাইসবার শরীর বেঢপ ফোলানোংরা।  কুৎসিতপ্রানহীন পাথুরে চেহারাকোন বিকার নেই মুখে

কারা ওরা ?’ ঢোক গিলে বলল বাদলশিরশির করছে  মেরুদণ্ডটাদমকা বাতাসে  নীচ থেকে পচা গন্ধ ভেসে এলো ভুর ভুর করে ।  গা গুলিয়ে  উঠলো

চার বছর আগে  নদীতে ডুবে যাওয়া জাহাজ রুস্তমের যাত্রীরাফিসফিস করে বলল মানিক মিয়াসবার লাশ  পাওয়া গিয়েছিলএই কয়েকজনের লাশ পাওয়া যায়নিপ্রতি বছর এই রাতেই ওরা হাজির হয় আমার হোটেলেপেট ভরা  খিদে নিয়ে মারা গিয়েছিল ওরা

 

 

   

 

 

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...