সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইঁদুর

 ভূমিকা



শহরের সবচেয়ে প্রাচীন কবরটার সাথেই গির্জা ।
তেমন একটা জমজমাট না । মানে লোকজন তেমন আসে যায় না । বুড়ো এক পাদ্রী দেখা শোনা করে । উনিও আবার নতুন এসেছেন । এসেই আবিস্কার করলেন সন্ধ্যা না হতেই কবরের ওখানে পেল্লাই সাইজের এক দঙ্গল ইঁদুর ঘুর ঘুর করে । বিড়াল এনেছিলেন একটা । বেচারা বিড়াল সারাদিন ঘুম ঘুম চোখে ইঁদুরের দৌড় ঝাঁপ দেখে। এমনও হয়েছে দুইতিনটে ইঁদুর মিলে বিড়ালটাকেই ধাওয়ানি দিয়েছে ।
বিষ মেশানো খাবার দিয়েছেন । সাথে রেখেছেন লোহার ফাঁদ ।

কাজ হয়নি ।

ইঁদুরের এহেন অস্তিত্বের কথা এখানে আসার আগেই শুনেছেন ।
বেশির ভাগ সময় শব্দ শুনেন তিনি । কিচকিচ শব্দ । দুই এক ঝলক দেখেছেন ওদের । সাইজ দেখে সত্যি সত্যি তাজ্জব হয়ে গেছেন ।
মাঝে মাঝে কবর খোঁড়ার সময় গোর খোদকরা অবাক হয়ে আবিস্কার করতো মাটির তলায় বড় বড় সুড়ঙ্গ । এত বড় যে একজন মানুষ হামাগুড়ি দিয়ে যেতে পারবে অনায়াসে । ইঁদুর এত বড় বড় গর্ত করে ?
পাদ্রী এমনও গুজব শুনেছেন , অনেক অনেক বছর আগে বহু দূরের অচেনা বন্দর থেকে বড় বড় রহস্যময় কার্গো এসেছিল । ইঁদুরগুলো এসেছিল সেইসময় ।


এই ধরনের গল্প কারা ছড়ায় কে জানে !


তিনি আরও শুনেছেন মধ্যযুগের গা হিমহিম করা, ভয়ংকর ভুলে যাওয়া সব ইতিহাসের কথা । তখন গজিয়ে উঠেছিল হাজার রকম গুপ্তসঙ্ঘ । নিউ ইংল্যান্ডের ধর্মযাজক কটন মাথার শয়তানের সংঘগুলোকে ধ্বংস করেছিলেন একার চেষ্টায় ।
শয়তান হেকেটের সাধনা যারা করতো সবাই মরে গিয়েছিল তখন ? শুনেছিলেন প্রাচীন সালেমের কবরস্থানে দুনিয়ার সবচেয়ে অশুভ ইঁদুরগুলো রয়ে গেছে ।
অশুভ ইঁদুর !
যেগুলো নাকি নরক আর সালেম শহরের মধ্যে নিয়মিত আসা যাওয়া করতো । ওগুলোই কি চলে এসেছে ? ইচ্ছা করে কেউ এনেছে ?

তিনি আরও শুনেছেন যারা কাল্টের নেতা ছিল তারা ইঁদুরগুলোকে নির্দেশ দিতে পারতো , হুকুম তামিল করতো ইঁদুরগুলো । প্লেগ কি ঐভাবেই ছড়িয়েছিল । সেই সময়ে মানব সভ্যতা প্রায় ধ্বংস করে ফেলতে চেয়েছিল এই রোগের আড়ালে ?


তিনি এই গোরস্তানের ইঁদুরগুলোর ব্যাপারে আগ্রহী । আপাতত দৃষ্টিতে মনে হয় ওরা প্রায় অদৃশ্য ।
রাতের বেলা তিনি ওদের কিচকিচ শব্দ শুনতে শুনতে কল্পনায় ক্ষুরের মত ধারালো দাঁত দেখতে পান । তিনি জানেন কবরের লাশের মাংস খায় ওরা । অবাক হয়ে ভাবেন, ইচ্ছা করে ওদের জন্য বাইরের রুমগুলো ছেড়ে দেয়া হয়েছে ? আগে যারা ছিল এখানে, তারাই করেছে অমন ?


দীর্ঘ মেয়াদী তদন্তের পর ফাদার ম্যাসনের মনে হল , ইঁদুরগুলো যেন কারও নির্দেশে কাজ করে । কেউ ওদের ট্রেনিং দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে ? না আজও নিয়ন্ত্রন করে নিয়মিত ?
ইঁদুর দমনের জন্য যতদূর সম্ভব চেষ্টা করতে লাগলেন তিনি । একটা জিনিস পেলেন অবাক করার মত । যেই সব মৃতদেহের দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধাই করা সেগুলোর মাংস খায় না ইঁদুর ।
অতীতের র্যাট কিং বা ইঁদুরের রাজার কিংবদন্তী জানেন তিনি । আধুনিক মানুষজন তেমন জানে না । ভুলে গেছে ।
১৫৬৪ সালে এই গল্পগাথা মানুষের সামনে চলে চলে আসে । জার্মানির অনেক শহরের জাদুঘরে কাচের বাক্সে রাসায়নিক দ্রবণে আজও রাখা আছে ইঁদুরের রাজাদের ।
১৯৩০ সালে নিউজিল্যান্ডে ধরা পড়ে ওরা ।


১৯৬৩ সালে নেদারল্যান্ডের এক কৃষক যখন খামারের মাটির তলায় 'র্যাট কিং' খুঁজে পায় তখন সারা দুনিয়ায় এর খবর ছড়িয়ে পড়ে । ক্রিপ্টোজুলজিতে স্থান পায় । র্যাট কিং জিনিসটা আর কিছুই না একগাদা ইঁদুর সেটা হতে পারে সাত থেকে দশ, নিজের লেজের সাথে ল্যাজ গিঁট মেরে কেমন বৃত্তাকার হয়ে জীবন যাপন করে । মনে হয় ওরা সবাই মিলে একটা ইঁদুর । নিজেরা নিজেদের রক্ষা করছে ।
ষোড়শ শতাব্দীর কাঠের খোঁদাই করা একটা চিত্রে অমনটা দেখেছেন ফাদার ম্যাশন ।
এক বৃষ্টির রাতে গির্জার এক কামরায় আগের ফাদারের রেখে যাওয়া একটা নোটবুক পেয়ে অবাক হলেন তিনি ।
সেই ডায়েরীতে বা নোটবইতে কি লেখা ছিল জানার কোন উপায় নেই।
পরদিন সকালে মৃত পাওয়া যায় তাকে ।

নোটবইটা ইঁদুরে কেটে কুচিকুচি করে ফেলেছে ।
অমন অদ্ভুত ঘটনা সেই গোরস্থানে আর হয়নি কখনও ।



এক
বাড়িটা পুরানো ।
দিগন্ত ভরা ফসলের জমির পাশে নিঃসঙ্গ বাড়ি । লোকজন তেমন কেউ আসে না। যায়ও না। রঙ উঠে গেছে । চুনকাম করা হয়নি অনেক গুলো বছর । জানালার কাচ বেশির ভাগ ভেঙ্গে গেছে । এক সময় দুষ্টু কিছু বাচ্চা খেলতে এসে অমনটা করেছে । পরে খরচ বাঁচানর জন্য কাচের জায়গায় টিন লাগানো হয়েছে ।
পিছনের বড় একটা নর্দমা বাড়ির পরিবেশটাই বাজে করে ফেলেছে । পচা গন্ধ । সামান্য বাতাসে সেই বাজে গন্ধ পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরে বেড়ায় ।
বাড়িটার প্রতি কেউ কোন রকম আগ্রহ দেখায় না।
বাচ্চারাও কেউ খেলতে আসে না।
তবে বাড়িটা একদম খালি না।
বুড়ি একটা মহিলা থাকেন । একা । কয়েক বছর আগে বুড়ির স্বামী মারা যাবার পর একদম একা হয়ে গেছেন উনি । উনার বাচ্চা কাচ্চারা শহরে থাকে। তেমন খোঁজ খবর নেয় না কেউ ।
বুড়ি তেমন বাইরে বের হয় না।
জানালার মিহি পর্দার আড়ালে বুড়ির ছায়া ছায়া ভঙ্কুর কাঠামো দেখা যায় কখনও কখনও ।
মহল্লার মুদির দোকানদার সপ্তাহে একদিন এসে বাড়ির দরজার বাইরে চাল ,আটা , আলু , ময়দা ঐসব হাবিজাবি পণ্য রেখে যায় । তুচ্ছ এই জিনিসগুলো প্রান বাঁচাতে কি রকম কাজে লাগে সবাই জানে।
মুদির দোকানীর বিল মাসে মাসে চলে আসে মোবাইল ফোনের একাউনটে । শহর থেকে বুড়ির বাচ্চারা পাঠায় । আরও অনেক দোকানীর মত এই মুদিও মাপে কম দেয় । বাজে পণ্য হালকা পাতলা করে মিলিয়ে দেয় । ভাবে বুড়ি জানবে কি করে ?
তাকে একটা লিস্ট দেয়া হয়েছিল । প্রত্যেক সপ্তাহে আর মাসে কি কি পণ্য বুড়ির দরজায় রাখতে হবে। তালিকা মিলিয়েই রাখতো সে। তবে কখনও কখনও গুড়া দুধের কৌটা বা চিনির প্যাকেট ভুলে গেলেও অবাক হয়ে আবিস্কার করেছে বুড়ি কোন অভিযোগ করেনি ।
বুড়িকে অনেক বছর আগে থেকেই চিনত দোকানদার । তার স্বামী বেঁচে থাকতে বাইরের বারান্দায় দুইজনে বসেই আড্ডা দিত । উনাদের নাকি একটা ছেলে মারা গিয়েছিল ।
যাকগে, এক সপ্তাহে মালসামান দিতে গিয়ে অবাক হয়ে আবিস্কার করে দোকানের বাইরে গত সপ্তাহের সব জিনিস পরে আছে।
বাধ্য হয়ে সে পুলিশে ফোন দিল । মনটা তার খারাপ হয়ে গেল , কারন মনে হচ্ছিল নিয়মিত এই সাপ্লাইয়ের কাজটা শেষ হয়ে গেল ।
যাই হোক পুলিশ এলো ।

বাড়ির ভেতরে বুড়ির লাশ পাওয়া গেল । তিন চারদিন আগে মারা গেছে । কান চোখ নাক খেয়ে ফেলেছে ইঁদুরে ।
লাশ দাফনের জন্য উনার ছেলেদের খবর দেয়া হল।
সব ঠিক ঠাক মিটে গেল ।
বাড়িটা খালি হয়ে গেল আবার । কেউ বসবাস করতে চায় না। তবে বাড়িতে কেউ ইঁদুর দেখেনি ।
মুদির মন খারাপ । নিয়মিত ক্রেতাটা হারিয়ে ফেলেছে সে।
দূর থেকে বাড়িটা দেখা যেত ।
নিঃসঙ্গ । বড় বড় গাছপালায় ঠাঁসা । কেউ জানেও না বাড়ির নিচে অসংখ্য সুড়ঙ্গ আছে । ইঁদুরের কাজ । ওরা ওখানে নিজেদের নিরাপদ আস্তানা বানিয়ে ফেলেছে । ওরা সব জানে । সব অনুমান করতে পারে।
ওরা ওখানেই থাকবে যতদিন না বাড়ি ভাঙ্গার কাজ ধরা হবে।



দুই
মান্নান মিয়া ক্যানভাসার । রোগা । প্যাঁকাটি শরীর । লুঙ্গি আর আধ ময়লা জামা পড়ে হাটে বাজারে ঘুরে বেড়ায় ।
কাধের ঝোলা ভর্তি পুরিয়া সাইজের ওষুধের প্যাকেট । আরেক কাধে বাঁশের সাথে সেঁটে রাখা একটা ব্যানার । ব্যানারে পেল্লাই সাইজের একটা ইঁদুরের ছবি । ওটার শরীর ভর্তি লোম । কালো পুঁতির মত চোখ । সতর্ক গোঁফ । সব মিলিয়ে বেশ ছমছমে ব্যাপার ।
ক্যানভাসারদের মধ্যে অনেকে অভিযোজনকারী প্রাণীর মত । নানান তল্লাটে ঘুরে বেড়ায় । অনেক পথ ঘুরে আবার নিজের বাড়িতে ফিরে আসে।
বাদবাকি অনেক ক্যানভাসার নিদিষ্ট কোন হাট বাজারে গিয়ে চিল্লা ফাল্লা করে নিজের পণ্য বিকিকিনি করে ।
এই দুইয়ের মিশ্রণ মান্নান মিয়া ।
গ্রামে নামকাওয়াস্তে বাড়ি আছে । ঝরঝর অবস্থা । যে কোন বৈশাখের প্রথম ঝড়ে উড়ে যাবে সেটা। এখনও যায়নি সেটা বাপদাদার খাস দিলের দোয়া ছাড়া আর কিছু না।
পরিবার নেই । বিয়ে হয়েছিল । বউ চলে গেছে । যে উপার্জন তাতে নাকি খেয়ে পড়ে থাকা যায় না।
কষ্ট পেলেও কিছু করার নেই । আর কোন কাজ জানে না মান্নান মিয়া । সেই ছোট বেলায় হাটে ইঁদুর মারার বিষ বিক্রি করতে দেখে উৎসাহ পেয়েছিল । তখন থেকেই এই কাজে ঢুকে পড়েছে । বদলাতে পারেনি ।
সপ্তাহে একদিন শহরে গিয়ে মহাজনের কাছ থেকে বিষ কিনে আনে বাকিতে । বিক্রি হলে গিয়ে শোধ করে । মার্জিন প্রফিট তেমন থাকে না ।
পয়সা বাঁচানর জন্য অর্ধেক জীবন দুপুরে চা , কলা , লাঠি বিস্কুট বা সিঙ্গারা খেয়ে কাটায় । শুধু রাত্রে ভাত জোটে ।
পেশা হিসাবে ইঁদুরের মারার ওষুধ ( না কি বিষ ?) বিক্রি করা বেছে নেয়ার জন্য ছোট্ট একটা ঘটনা আছে ।
মান্নান মিয়ার দাদায় মারা গিয়েছিল একলা ঘরে ।
লাশ আবিস্কার হয়েছিল তিনদিন পর । দেখা গেল ইঁদুর এসে লাশের দুই চোখ আর ঠোঁট খেয়ে ফেলেছে। বীভৎস দেখাচ্ছিল সেটা ।
অবচেতন মনে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য হয়তো ইঁদুরের বিষ বেচা শুরু করেছিল । দুর্বলের প্রতিশোধ ।
ইঁদুর ঘৃনা করে সে ।
কুৎসিত লোমশ তুলতুলে এই প্রাণীটা দেখলেই গা রি রি করে উঠে । বাড়িতে ইঁদুর থাকলেও যে বাজে গন্ধ পাওয়া যায় সেটা ওর মেজাজ উতপ্ত করে ফেলে।
ঈশ্বরের দুনিয়ায় এত জানোয়ার থাকতে ঐসব আজেবাজে জিনিস কেন বানিয়েছেন উনি ?কি কাজে লাগে ?
ফসল পাকার মৌসুমে ওরা খেতের ফসল খাওয়া শুরু করে । সেই ইঁদুর খাওয়ার লোভে খেতে চলে আসে সাপ । ফসল কাটার সময় সাপের কামড়ে মারা যায় গরীব খেত মজুর বা কৃষক ।
দুনিয়ার সব বাজে নোংরা ড্রেনে সাঁতার কেটে মানুষের ঘর দুয়ারে ঢুকে পড়ে ওরা । বড় বড় সড়কের নিচে ড্রেন আর নর্দমার পাইপ দিয়ে দুনিয়ার সব জায়গায় চলে যায় । একবার বিষ বিক্রি করতে গিয়ে শুনেছিল কোন এক পাঁচতলা বাড়ির বাথরুমের কোমডের ভেতর দিয়ে বের হয়ে গৃহিণীর নিতম্বে কামড়ে দিয়েছিল ।
বন্ধ দুর্গন্ধওয়ালা জায়গা পছন্দ করে হারামির বাচ্চারা ।আর বাচ্চার বহর দেয় । ওর ওস্তাদ হরিপদ হাজরা বলেছিলেন ইঁদুর মিয়া বিবি নাকি সারা জীবনে ছয় হাজার বাচ্চা পয়দা করে ।
ছয় হাজার !
যতদিন ইঁদুর বেঁচে থাকে কামড় দেয় বা জিনিস পত্র চিবুতে থাকে। ওটা নাকি ওদের করতেই হবে। মোটামুটি সাত বছর বাঁচে এক ইঁদুর । সারা জীবন ওদের দাঁত বড় হয় । দাঁত থাকে তীক্ষ্ণ সূচালো । জিনিস পত্র কামড়ে নিজের দাঁতের সাইজ ঠিক রাখতে হয় ওদের । কোন কথা হল ?
সারা জীবন ইঁদুরের এই বিরক্তকর চক্র দেখে বড় হয়েছে মান্নান মিয়া ।
ইঁদুর ঘৃনা করার সঙ্গত কারন আছে ।


চোখের সামনে দাদার সেই ভয়াল মৃতদেহটা ঘুমের মধ্যে আজও দেখে সে ।
পাইকার বাবুও কোন এক অদ্ভুত কারনে ইঁদুর দেখতে পারে না।
মান্নান মিয়ার সাথে দেখা হলেই বিরক্তমাখা গলায় বলেন , মাইনসে ক্যামনে যে ইদনুরের অত্যাচার সহ্য করে আল্লাই জানে । তোমার বেচা বিক্রি এত কম কেন ? ইন্দুর কি সব শেষ অইয়া গেল দুনিয়ারতে ?'
একটা জিনিস দুইজনেই অবাক হয়ে আবিস্কার করলো এক বিষ বেশিদিন ব্যবহার করা যায় না । সেই বিষ হজম করার ক্ষমতা বানিয়ে ফেলে ইঁদুরের দল । কোন কাজ করে না । অথবা খাবারে সেই বিষ মিশিয়ে দিলে চিনে ফেলে।
শেষে নিজেই বিষ বানানো শুরু করলো মান্নান মিয়া।
দীর্ঘ দশ বছরের অভিজ্ঞতা ।
নিজের নামে প্যাকেট বানিয়ে বাজারে ছাড়ল । অন্য সব বিষের চেয়ে ভাল রকম বিক্রি হতে লাগল ।
স্বপ্ন দেখে একদিন খুব নাম করা কোম্পানি হয়ে যাবে । বড় মহাজন হবে ।
রাতে বাড়ি ফিরে শুয়ে বসে উথাল পাথাল স্বপ্ন দেখে। ছোটেবেলায় ইস্কুলের মাষ্টারের কাছে শুনেছিল দূরের কোন এক দেশ জার্মান । সেখানে নাকি অনেক বছর আগে কোন এক শহরে ইঁদুরের উৎপাত শুরু হয়েছিল । শেষে অদ্ভুত রকমের একটা লোক এসে বাঁশি বাজিয়ে সব ইঁদুর নদীর জলে ডুবিয়ে মেরেছিল । কিন্তু শহরের লোকজন বিশ্বাসঘাতক । পাওনা মোহর দেয়নি লোকটাকে । শেষে বাচ্চাদের নিয়ে গিয়েছিল ।
কি ভয়ংকর গল্প ।
ছোটবেলায় সেইজন্য অচেনা লোক দেখলেই ভয় পেত মান্নান মিয়া ।
বাড়ি ফিরে মোটা একটা নোটবইতে ইঁদুর নিয়ে যাবতীয় তথ্য টুকে রাখে মান্নান মিয়া । কেন এমনটা করে জানে না। ওর হাতের লেখা ভাল না । বানান প্রচুর ভুল । তারপরও কাজটা যত্নের সাথে করে ।
নিয়মিত ।


তথ্য লিখতে গিয়ে অবাক হল । যেমন, উত্তাল সাগরে ইঁদুর টানা তিনদিন সাঁতার কাটতে পারে । জলের নিচে তিন মিনিট দম আঁটকে ডুবে থাকতে পারে ।বাসা চিনতে পারে । যে বাসায় একবার গিয়েছিল মনে করে আবার সেই বাড়ি চিনে ফিরতে পারে।
কুৎসিত লোমে শরীর ঢাকা থাকায় ওরা ঘামে না । কিন্তু লেজ ওদের শরীরের তাপমাত্রা ঠাণ্ডা রাখে ।
প্রজাতি কম নেই । ছাপ্পান্ন ধরনের ইঁদুর আছে । বাজে ব্যাপার হল ওরা রোগ ছড়ায় । প্রায় পয়ত্রিশ ধরনের রোগের জীবাণু বহন করে ।
পেল্লাই সাইজের ইঁদুর আছে দুনিয়ার সব দেশেই । আমাদের দেশেই আছে । হুট হাট চোখে পরে না। কিন্তু আছে ।
এদের রহস্যময় একটা স্বভাব হচ্ছে ঘুমন্ত মানুষের শরীরে কামড় দেয়া । যার কোন ব্যাখ্যা নেই । কেন করে ?
যে জিনিসটা শুনে অবাক হল মান্নান মিয়া সেটা বড় বিচিত্র । ইঁদুর দুই একটা বাড়ি লক্ষ্য করে ওদের ঘাঁটি বানায় । এবং সাইকোলজি একটা জিনিস প্রমাণ করেছে - বাড়িতে আপনি যত বেশি ইঁদুর দৌড়ঝাঁপ করতে দেখবেন তত বেশি মানসিক ভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়বেন । আত্নহত্যা পর্যন্ত গড়াতে পারে ।
ব্যাপারটা বেশ আতঙ্কজনক ।
পণীর , সেদ্দ ভুট্টা, ডিম ভাঁজা ওদের প্রিয় ।
ইঁদুরকে খুব সহজ একটা প্রাণী মনে হল না মান্নান মিয়ার কাছে ।
অশুভ । অপয়া । খারাপ ।
দুনিয়ার বিশ পারসেন্ট ফসল নষ্ট করে ফেলে এই হতচ্ছাড়া শয়তানগুলো । দাঁতের জোড় সাংঘাতিক । প্রতি ইঞ্চিতে সাত হাজার পাউনড চাপ দেয় কামড়ে । প্রায় কুমিরের সমান । এদের সাইজ বড় হলে কি অবস্থা হত ভাবতেই দিশে হারিয়ে ফেলে সে ।
সহজে ব্যাথা পায়না । পঞ্চাশ ফুট উচু থেকে পড়ে গেলেও কিচ্ছু হয় না এদের । এত কিছুর পরও চোখে ভাল দেখে না ওরা । কালার বাইন্ড । রঙ চেনে না । প্রকৃতি সেটা পুষিয়ে দিয়ে কান দিয়ে । হালকা সামান্য শব্দও ওরা শুনতে পায় ।


খুব নিরীহ বলা যাবে না ওদের। তেরে এসে আক্রমণ করার ঘটনা প্রচুর। দুর্বল মানুষ বুঝে ওরা আক্রমণ করে । খোদ আমেরিকাতেই চৌদ্দ হাজার আক্রমণের ঘটনা রিপোর্ট লেখা হয় প্রতি বছর ।
বেশ কিছু তথ্য জমা হতেই শরীরে কেমন একটা উদ্দীপনা পেল মান্নান মিয়া । নিজের বানানো বিষটা আরও শক্তিশালি করার জন্য মন প্রান ঢেলে দিল । ইঁদুর ওর শত্রু । ঘৃনা করে এদের ।
এদের কিচকিচ শব্দ শুনলেই ওর মাথায় আগুন জ্বলে যায় ।
কিন্তু মান্নান মিয়া অনেক কিছুই জানে না । যেইসব গোপন তথ্য অনেকেই জানে না। জানার কথাও না।
মান্নান মিয়ার বাড়ির তলায় সুড়ঙ্গ বানিয়ে ফেলেছে এক পাল ইঁদুর । রোজ আসা যাওয়া করে । বিবর্তনের ফলে ওদের মধ্যে অনেক গুণাবলী এসে গেছে কেউ তার খোঁজ রাখে না ।
প্রতিটা মানুষকে আলাদা আলাদা ভাবে মনে রাখে ওরা । শত্রু চিনে ফেলে । এক সাথে জমা হয় ওরা । নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করে ।
মান্নান মিয়া জানতেও পারল না আজকাল কেন এত অবসাদে ভুগে । জানার কথা না । হাতে সামান্য টাকা আসায় প্রায়ই মদ খেয়ে বাড়ি ফেরে সে। বিছানায় শুয়ে টের পায় বাড়ির আনাচে কানাচে ইঁদুরের পাল দৌড়ে বেড়ায় । ওর দেয়া ওষুধ ভুলেও খায় না। কি অদ্ভুত সতর্কতার সাথে ঘরের কোন জিনিসে দাঁত ছোঁয়ায় না ওরা ।
দিন দিন আরও অলস আর তপ্ত মেজাজের মানুষ হতে লাগল মান্নান মিয়া । টানা এক বর্ষার সপ্তাহে বাড়ি থেকে বের হল না।
বাসায় রইল ।
প্রতিবেশীরা খোঁজ করে মরা লাশ পেল । মুখের মাংস ইঁদুরে খেয়ে ফেলেছে । কে না জানে মুখের নরম মাংস ওদের প্রিয় ।


লাশ নিয়ে চলে যেতেই গর্ত থেকে উঁকি দিয়ে দৃশ্যটা দেখল একটা কালো রঙের ইঁদুর । উত্তেজনায় ওর গোঁফ কাপছে। ভেজা চোখ পিটপিট করে ফিরে চলল আবার । দলের সবাইকে খবরটা দিতে হবে ।
মাটির নিচে সুড়ঙ্গ । চলল । সামনে যার সাথে দেখা হল কিচকিচ করে বলে দিল । অই বাড়ির কাজ শেষ ।
দূরে কোথাও মাটির নিচের অনেক ড্রেন দিয়ে সবাই চলল । কেউ জানে না ছিমছাম শহরের নিচে কত হাজা মজা ড্রেন আছে। কে রাখে তার খবর ? কিছু ড্রেনের কথা পৌরসভার কর্মকর্তারা ভুলে যায় । নতুন শহরের নকশা বানানোর সময় সে সবের কথা উল্লেখ করা হয় না আর । কোন খোঁজ থাকে না । অমন একটা সিমেন্টের গোল পাইপের মধ্যে ওদের একটা আস্তানা ।


এক দঙ্গল ইঁদুর বসে আছে । স্তন্যপায়ী প্রাণীদের অনেকের মত ওদের দলনেতা আছে।
সামনে খড়ের বিছানায় দলনেতা । আকারে সামান্য বড় । শরীরে ঘা । জন্মের পর থেকে খুব একটা নড়া চড়া করে না সে । গোঁফ বড় । অন্ধ । সর্দার সব সময় অন্ধ হয় । কিন্তু বাজে ব্যাপারটা হচ্ছে ওর দুই মাথা ।
চিন্তা ভাবনা মানুষের চেয়েও প্রখর ।




সব শুনে নতুন নির্দেশ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো সর্দার । ঘুমের মধ্যেও সবার সাথে যোগাযোগ করতে পারে সে ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...