সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বিষচক্র

 চটের বস্তা খুলে বাণ্ডিলগুলো টেবিলের উপর ঢেলে ফেলল ইয়াকুব বেগ 

 

বিচিত্র ধুপ ধাপ শব্দ করে পড়লো,   রাবারব্যান্ড দিয়ে আটকে রাখা নোটগুলো   

নরম চোখে জিনিসগুলো দেখছে লোকটা  

চেহারায় কোন ভাব নেই  যেন টাকা না কাঁঠাল পাতা  

 

' ভাল করে দেখে নাও গোপী ' শান্ত ঘড়ঘড়ে গলায় বলল ইয়াকুব বেগ 'তোমার জীবনের প্রথম   উপার্জন '

 

বেশি না

মাত্র ত্রিশ লক্ষ টাকা ওদের সামনে সামান্য কিছু খুচরা আছে , না বলার মতই   

ওদের দুইজনের ভাগে পনের লক্ষ করে  মোটেও খারাপ বলা যাবে না যতটা আশা করছিল তারচেয়ে অনেক, অনেকগুণ বেশি   

দিন চলে যাবে ঘিয়ে মাখনে  

 এত অল্প সময়ে এত   টাকা একসাথে হাতে আসবে, ভাবতেও পারেনি গোপী 

কিন্তু সমস্যা একটাই    এখান থেকে এক টাকা তো দূরের কথা,  একটা পাই  পয়সা ও খরচ করার কোন উপায় নেই 

 

দ্রুত হাতে,   কালো রঙের পাতলা একটা ব্রিফকেসের মধ্যে বাণ্ডিলগুলো  ভরে নিল গোপী  বস্তাটা ফেলে দিতে হবে  

কাজ শেষ করে বিছানায় শুয়ে, দুই হাতের আঙুল দিয়ে মাথায় তবলার মত বাজাতে লাগল গোপী  মুদ্রাদোষ  অথবা টেনশনে আছে    

' আমি বাইরে যাচ্ছি ' অনেকক্ষণ পর বলল ইয়াকুব

'কোথায় যাবেন ?' গোপীর প্রশ্ন 

' খাবার কিনে আনিগে খবরের কাগজও কিনব নতুন কিছু ছাপা হল কি না কে জানে একটু হেঁটে পরিবেশটাও জরিপ করে আসি '

গোপীর চেহারা শালগমের মত সাদা হয়ে গেল

' ব্যাপারটা নিরাপদ হবে তো ইয়াকুব ভাই  ?'ঢোক গিলে জানতে চাইল

' অত মাথা ঘামাতে হবে না তোমার  মাথাটা যদি সব সময় একটু  কম ঘামাতে তবে আজ  এত সমস্যা হত না'

 

ঘাড় ফিরিয়ে এক কামরার  জায়গাটা আবার দেখল ইয়াকুব দুই দিন ধরে আনন্দময়ী হোটেলের  ক্ষুদে এই  কামরায় ঘাপটি মেরে বসে আছে ওরা

এক রকম বন্দিই বলা যায়  

 

আনন্দময়ী সস্তাদরের হোটেল  ছিরিছাঁদ নেই দেয়ালে   সর্দির দাগ  ফাটা বেসিন হলুদ বাথরুমের কল প্ল্যাস্টিকের   ভাল মত প্যাঁচ কষে না টিপ টিপ করে জল পড়ছে সারাক্ষণ   যেন কেউ লাগাতার হিসু করছে

  কখনই  সুনাম বা দুর্নাম অর্জন করতে পারেনি হোটেলটা  

 

দেয়ালের  পেরেকের মধ্যে গাঁথা জ্যাকেটটা তুলে গায়ে চাপাল ইয়াকুব 

 

' বাইরে গিয়ে ধরা পড়লে কিন্তু আমাকে দোষ দেবেন না' আতঙ্কিত গলায় চিঁচিঁ করে উঠলো গোপী  ' চারিদিকে পুলিশের লোক আর ফর্মা দিয়ে ভর্তি অঘটন ঘটে যেতে কতক্ষণ ? '

 

'চুপ কর তো ' খেঁকিয়ে উঠলো ইয়াকুব ' আমি ধরা পড়লে তুমিও শেষ  যদি আমি ধরা পড়ি,  ভাবব,  তুমিই ফোন করে পুলিশকে আমার খোঁজ দিয়েছ সেটা মোটেও ভাল কিছু হবে না চান্দু রুমে বসে বসে দোয়া খায়ের কর আমার জন্য ব্যাপারটা ক্লিয়ার ?  '

 

ওই মাতারি  হয়তো আমাদের চেহারার বর্ণনা দিয়েছে পুলিশের কাছে' আবারও যুক্তি দেখাল গোপী 

 

'মাথাটা এত খাটাতে কে বলেছে তোমাকে ?' বিরক্ত হল ইয়াকুব যেটা নেই সেটার ব্যবহার করতে যাও কেন ?’

 

'মজা করছি না ভেবে দেখেন বাইরে যাওয়া কি সত্যি দরকার ?'  যুক্তির তোড়ে  গোপী তাড়াতাড়ি উঠে বসলো বিছানার উপর

 

জবাব না দিয়ে কেমন একটু হাসল ইয়াকুব বরফ গলা  ঠাণ্ডা হাসি আন্তরিকতার ছায়া  নেই  দেখলেই বুকের ভেতরে কেমন  কাঁপন  ধরে যায়

 

সাধে কী আর তিন তিনবার জেলের ভাত খেয়ে এসেছে ?

 

নরম কাপড়ের,  বেসবল খেলোয়াড়দের একটা  টুপি ছিল   টেবিলের উপর  জিনিসটা  মাথায় দিয়ে যত্ন করে অ্যাডজাস্ট করে নিল ইয়াকুব  বেশ কাজের জিনিসমুখটা নিচু করে হাঁটলে অর্ধেক চেহারা ঢেকে যাবে 

 

' বিপদের আর কিছুই নেই ' দরজা খুলতে খুলতে বলল ইয়াকুব ' যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়ে ফেলছি আমরা  এখন সেই মহিলার ভার তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও '

 

কাঁধের হোলস্টার থেকে   স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন থার্টি এইথ , ক্যালিবারের পিস্তলটা বের করলো ইয়াকুব  

বুলেটগুলো পরীক্ষা করলো যথেষ্ট  সময় নিয়ে  গোপীর মনে হল ,  সম্ভবত সব কিছু ঠিক ঠাক আছে সেইজন্য  লোকটা   মাথা ঝাঁকিয়ে পিস্তলটা আবার রেখে দিল হোলস্টারে 

 

ইয়াকুবের নড়াচড়া একদম সহজ সরল   শিথিল  কোন তাড়া নেই  যেন হাজার বছর ধরে ঐসবই করছে করে যাবে  

পিছন থেকে দৃশ্যটা দেখছিল গোপী  

মনে মনে  আরেকবার স্বীকার করলো , একদম পাক্কা ঘাগু অপরাধীর সাথে কাজ করছে সে  একশো পারসেন্ট  পেশাদার ক্রিমিনাল  সাধে লোকটা এত নাম করেনি  

গোপী ঢোক গিলল , ' নিশ্চয়ই ইয়াকুব ভাই আপনার উপর আমার বিশ্বাস আছে ষোল আনা '

 

 

 

রাস্তায় নেমে এলো ইয়াকুব 

হাঁটছে 

একগাদা বাচ্চা কাচ্চা হল্লা করে পথের উপর খেলছে   মলিন চেহারা ময়লা কাপড়    

বাচ্চা পছন্দ করে সে বিশেষ করে যখন ঘাপটি মেরে থাকে , তখন  পোলাপান রাস্তায় খেলাধূলা করলে পুলিশ সহজে গুলি ছুড়তে চায় না দৌড়ে ভাগতে সুবিধে হয়

হেন তেন  নানা কিছু  

 

এমন ভাবে হাঁটতে লাগল ইয়াকুব, কেউ দেখলে ভাববে ,  যেন মোড়ের দোকান থেকে দরকারি কিছু কিনতে যাচ্ছে সিগারেট , খবরের কাগজ বা চায়ের পাতা, চিনি বা মশার কয়েল  

কেউ একবারের জায়গায় দুইবার ফিরে দেখবে না ওর দিকে তারপরও এই  এলাকার অন্য সবার চেয়ে ওর পোশাক অনেকটাই  ভাল সেটাও খানিক অস্বস্তির ভাব দিচ্ছিল ওর মনে 

 

চারিদিকে বেশ কয়েকটা বস্তি  ঘিঞ্জি ঘিঞ্জি  জনবহুল    

কিন্তু হোটেল আনন্দময়ী জায়গাটা এক কথায়  সেরা  একশো ভাগ নিরাপদ গেস্ট সহজে আসে না  বা যায়ও  না এখানে  কোন মতে টিকে আছে 

কখনও জমজমাট ছিল না, হবেও না 

গোপীর শেষ কথাটা মাথায় ঘুর ঘুর করছিল ওর  আপনার উপর আমার বিশ্বাস আছে ষোল আনা 

সত্যি তাই 

গোপীকে এক কথায়  পিচ্চি বাচ্চা বলা যায়  বয়স কত ওর  ? একুশ  দিন দুনিয়ার কিছু দেখেনি জীবনের প্রথম  মাঠে নেমেছে  কত সহজে আশ্বস্ত করে এসেছে ওকে জানে না মহিলাটাকে নিয়ে কী প্ল্যান করেছে ইয়াকুব মনে মনে

 

ওরা ছিল তিনজন  

কাজটা এত সুন্দর ভাবে হয়েছে বলার মত না  আর বেশ সহজ টার্গেট  

 

নিতাইগঞ্জের  নদীর পাড়ে  পুরানো একটা ব্যাঙ্ক আছে নতুন না অনেক বছর ধরেই আছে শহরের প্রাচীন ব্যাঙ্ক   এক তলা দালান  ফাটা ঠাণ্ডা দেয়াল  এই যুগেও জানালায় কাঠের ঝিলিমিলি  মোটেও জমজমাট না শহরের চালু এলাকায় এত এত  নতুন সব  বেসরকারি ব্যাঙ্ক হয়েছে  কে আর  যাবে শহরের শেষ মাথায় ভাঙ্গা একটা ব্যাঙ্কে টাকা পয়সার লেনদেন করতে  ?

চলে আরকি  

নদীর পাড়ের বাজারের পুরানো ব্যাপারিরা  এই ব্যাঙ্কে টাকা পয়সা  রাখে  মহাজনেরা লেন দেন করতে এই ব্যাঙ্কে পাশ বই খোলে    

ব্যাঙ্কের কর্মচারীরা বেশ অলস ভাবে কাজ করে সিকিউরিটি বলতে পেট মোটা একটা গার্ড  হাতে শোলে সিনেমার গব্বরের ব্যবহার করা রাইফেলের মত একটা কেমন অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পান চিবোয়   কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত আড়াআড়ি করে ঝুলানো মোটা বেল্টে  খোসা সহ বুলেট   মহিলা গ্রাহক গেলে একটু বেশি কথা বলে 

 

প্রথমে খবরটা  দিল সিদ্দিক মিয়া

আর কাজটা শুরু হল এইভাবে

সিদ্দিক মিয়ার শরীরটা গাঁট্টাগোটটা  সব সময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে  জীবনের প্রতি  আসক্ত  লোভের মাত্রা অসীম   টিনের বালটিতে পেয়ালা ডুবিয়ে অন্য হাতে ইয়া বড় ফ্ল্যাক্স নিয়ে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করে ব্যাঙ্কের ভেতরে নিত্য আসা যাওয়া  ঘুলঘুলিতে   পায়রা   যেমন যায় আসে তেমন   

 সিদ্দিক মিয়া খবর দিল গোপীকে  

গোপী বেকার টুকটাক  খুচরা অপরাধ করে কিন্তু পালে হাওয়া দিতে পারছে না সাহস কম  কিন্তু স্বপ্ন দেখে,  একদিন বড় মাপের হাত সাফাই করবে  দুইজনে মিলে ভাবে আর ভাবে 

হিসাব করে ওরা দেখে ,  ব্যাঙ্কে ভালই লেনদেন হয়  বিশেষ করে , সপ্তাহের ছুটির আগের দিন ভাল টাকা জমা পড়ে অথচ নিরাপত্তা বলতে কিচ্ছু নেই বাচ্চার হাত থেকে খেলনা কেড়ে নেয়ার মত সহজ কাজ

কিন্তু একটা মাথা দরকার  সূক্ষ্ম ভাবে ব্যাপারটা সামাল দিতে পারবে তেমন লোক দরকার একই সাথে হতে হবে সাহসী আর ঠাণ্ডা মাথার   

ইয়াকুবের নাম জানত ওরা শহরের  পুরানো চাল আদিম কালের  অপরাধী   

আরও জানে ,  লাভের বখরা দিলে ইয়াকুব সব ধরনের কাজ করে  উকিল পাড়ার রামকানাই মন্দিরের আশে পাশের পানের দোকানগুলোতে  খোঁজ নিতেই ইয়াকুবের সাথে দেখা হয়ে গেল ওদের

কথা হল তিনজনে

প্ল্যান পরিকল্পনা বেশি করতে হয়নি সহজ  নির্জন  লোকেশন   ব্যাংকটা সবাই চেনে তারপরও ইয়াকুব গিয়ে আরও কয়েকবার জরিপ করে এলো   

গোপীর কাছে আগে থেকেই  পিস্তল ছিল  ইদানিং পেয়েছে  পুরানো এক অপরাধীর কাছ থেকে ভাড়ায় এনেছিল  সেই অপরাধী আচমকা হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা গেলে জিনিসটা ওর হয়ে গেছে এইসব কী আর রসিদ সহ ভাড়া দেয় কেউ ?    

সিদ্দিক মিয়ার পিস্তল দরকার ছিল না ওর কাজ ছিল ব্যাঙ্কের মেইন গেইটের বাইরে দাঁড়িয়ে সব দিকে নজর রাখা সমস্যা দেখলে  ময়না পাখির ডাক দিয়ে ওদের সতর্ক  করে দেবে  কেউ টেণ্ডাই মেনডাই করতে এলে তাকেও  সামাল  দেবে

 

সব ঠিক ঠাক হচ্ছিল  

 

ওরা সময়টা বেছে  নিয়েছিল সুন্দর  দারোয়ানকে বাথরুমে আটকে  রেখেছিল   ইয়াকুব আর  গোপী  দারোয়ানের বন্দুকের স্প্রিং নষ্ট করে  ক্যাশিয়ারের হাতে তুলে দিয়ে   বলে ,  সুভেনিয়র হিসাবে রেখে দিতে  সব  কার্তুজ বাথরুমের কমোডে ফেলে দেয় ওরা            

চটের ব্যাগে টাকা ভর্তি করে পালানোর সময়, কী  ভাবে যেন দারোয়ান বের হয়ে আসে বাথরুম থেকে  বাহাদুরি দেখানোর জন্য বা পুরস্কারের লোভে ব্যাঙ্কের বারান্দায় দাঁড়িয়ে  চেঁচাতে থাকে   

 তখনই গুলি করে বসে গোপী  

কপাল আর কাকে বলে ?

দারোয়ানের গায়ে না লেগে  বুকে দুই গুলি খেয়ে ওখানেই চিত হয়ে পড়ে যায় সিদ্দিক মিয়া    

লোকটা বেঁচে আছে না মরে গেছে এখনও জানে না ইয়াকুব 

সে সব নিয়ে মোটেও চিন্তিত না 

 বেঁচে থাকলে পুলিশ ওর মুখ থেকে সব খবর বের করে নিয়েছে এরই মধ্যে  

তাতেও সমস্যা নেই 

ইয়াকুব ধরা পড়বে না ওর হাতে এখন অনেক টাকা 

আর টাকা সব সমস্যার সমাধান করতে পারে নকল আইডি আছে ওর হারিয়ে যেতে পারবে , কেউ খুঁজে পাবে না  

 ধান্ধার জন্য কত কিছু করেছে  কিন্তু গত বিশ বছরে এত টাকা কামাতে পারেনি ইয়াকুব  অথচ মাত্র সামান্য পরিশ্রম আর সময় লেগেছে এই বারের জিলিপি বানানোর কাজে  

ত্রিশ লক্ষ টাকা !

 ভুলেও কল্পনা করেনি ওরা ভেবেছিল বড় জোর আট দশ লাখ টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরবে  ভাগ্য আর  কাকে বলে

 

জেলে যেতে চায় না ইয়াকুব আর না   তিন তিনবার জেল খেটেছে  এই বার ভেতরে ঢুকলে ইহ জিন্দেগিতে খোলা আকাশ আর দেখতে পাবে কি না সন্দেহ বাকি জীবন লোহার  গারদের ভেতরে কাটবে

আরেকবার নিজেকে মনে করিয়ে দিল ইয়াকুব , ওর হাতে প্রচুর টাকা এখন ইশকুলে  পড়েছিল  টাকায় কি না হয় ? করণে সপ্তমী   অপাদানে কি যেন  

এখন শুধু  মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে  

পুলিশ যদি ওদের খোঁজ না পায় , টাকাগুলো তখনই হজম করা যাবে  এর আগ পর্যন্ত ঐগুলোর   এক কানা কড়ি দাম নেই শুধু কাগজের বাণ্ডিল  

পুরো ব্যাপারটা আরও সুন্দর ভাবে মিটে যায় যদি, সেই সাক্ষীর মুখ বন্ধ করা  সম্ভব হয়  

সাক্ষী মহিলাটাকে অনেক দেরিতে দেখতে পেয়েছিল ওরা 

 ভদ্রমহিলা ছিল ব্যাঙ্কের উল্টা দিকের চারতলা একটা বাড়ির দরজার সামনে মহিলার  মাথা ভর্তি চুল  সেটা আবার রঙ করা ফিগারটা ফাটাফাটি  বড় বড়  ধারালো চোখে চেয়ে চেয়ে ওদের কার্যকলাপ দেখছিল  সে  

এত বড় একটা নাটক দেখেও মহিলার মুখের ভাব একটু  বদলায়নি ইয়াকুবের চোখে চোখ  পর্যন্ত পড়েছিল  আরও  দেখল গুলি খেয়ে সিদ্দিক মিয়া বুক চেপে ফুটপাথে চিৎ পটাং হয়ে   গেল বুক দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হয়ে আসছে

মহিলা তখনই লাফ দিয়ে  চৌকাঠ পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে,  খটাস করে  দরজা বন্ধ করে দিল 

পিচ্চি গোপীর তেল বেশি দরজা ভেঙ্গে সেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে মহিলার একটা ব্যবস্থা করতে চাইছিল  ইয়াকুব বাধা দেয়  গুলির শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত গেছে দেরি করে নতুন কোন বিপদ ডেকে আনার মানে হয় না

মোড়ের সামনে একটা অটোরিক্সা ছিল  ওটায় চড়ে ভেগে বাস স্ট্যান্ড  সেখান থেকে অনেক বার পথ বদলে চলে এসেছে হোটেল আনন্দময়ীতে  

 

হাঁটতে হাঁটতে ইয়াকুব একটি নিউজস্ট্যান্ডের কাছে থামল এক প্যাকেট সিগারেট , কয়েকটা পিপারমেনট  লজেন্স আর খবরের কাগজ কিনল 

এসেছে খবরটা  প্রথম পৃষ্ঠায়  

পাতার নিচে সুন্দর বক্স করা খবর  ওখানে দাঁড়িয়েই  পড়লো  না, নতুন কিছু ছাপেনি  যা জানে তাই ছেপেছে সেই চুলে রঙ করা মহিলার কথা  ছেপেছে মহিলার নাম আলতা বানু  ঢঙ !

খবরে প্রকাশ ,  উনি দেখেছেন , দুইজন লোক চটের বস্তা হাতে দৌড়ে যাচ্ছে প্রকাশ্য দিবালোকে   গুলি খেয়ে নিরীহ চা বিক্রেতা চোখের সামনে লুটিয়ে পড়লো  

হেন তেন 

সংবাদদাতা আরও জানিয়েছেন , এখন পুলিশ যদি কাউকে গ্রেফতার করে , তবে মহিলা তাদের  দেখে বলতে পারবে সেই  দুইজন ছিল কি না 

শেষের লাইনটা পড়ে  লম্বা করে দম নিল ইয়াকুব  

ভাল ঝামেলা তো !

সামনে একটা খাবারের দোকান 

 এক ডজন পরোটা আর দুইজনের পেট ভরবে অমন  বেশ খানিকটা মাংস প্যাকেট করে নিল  ছোট্ট একটা মুদির দোকানে গোপনে বিয়ার বিক্রি করে  হিমহিম  ঠাণ্ডা দেখে  ছয়টা নিয়ে নিল 

তারপর পা বাড়াল হোটেল আনন্দময়ীর দিকে 

মাথার ভেতরে চিন্তার ঝড় বইছে 

রুমের ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই , থাবা মেরে খবরের কাগজটা কেড়ে নিল গোপী  

এক নিঃশ্বাসে পড়া শেষ করে  ফিরে চাইল ইয়াকুবের দিকে চেহারায় ভয়ের ছাপ 

'এখন কী হবে ইয়াকুব ভাই ?'

মাথা ঠাণ্ডা রাখ টেক ইট ইজি না কি বলে না ? ওটা কর ' ঠোস করে বিয়ারের ক্যান খুলতে খুলতে বলল ইয়াকুব  

' আপনি তামাশা করছেন না কি ?' খিচিয়ে উঠলো গোপী  ' এই মাতারির মুখের  বর্ণনা শুনে পুলিশ পুরানো ফাইল ঘাঁটলেই আপনার  ছবি পেয়ে যাবে সেটা মহিলাকে দেখালেই চিনে ফেলবে তখন ? '

'তখন কি হবে ?' অবাক হল ইয়াকুব গোপীর ভয় উপভোগ করছে 

'আপনি ধরা পড়লে আমার কী হবে ?' প্রায় কেঁদে ফেলবে যেন  গোপী 

পিস্তলটা বের করে ন্যাকড়া নিয়ে পরিষ্কার করতে বসলো ইয়াকুব  ' এত সব সমস্যা হয়েছে তোমার ঘিলু ছাড়া মাথার কারনে  দারোয়ানকে গুলি করতে গিয়েছিলে কোন আক্কেলে ? জীবনে গুলতি ছুড়ে দেখনাই এখন গেছ ডাইরেক্ট শুট করতে

নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম ইয়াকুব ভাই মিন মিন করে বলল গোপী

নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম ইয়াকুব ভাইহুবহু গোপীর গলা নকল করে ভেংচে উঠলো ইয়াকুব    খানিক বিয়ার গিলে বলল   চিন্তার কিছু নেই  মহিলার মুখ বন্ধ করার ব্যবস্থা করছি

যেন প্রতিজ্ঞা করছে অমন ভঙ্গিতে বলল সে 

'কি ভাবে ?এতক্ষণে মহিলার বাসার সামনে কমপক্ষে এক ডজন পুলিশ পাহারা দিচ্ছে কোন রকম সুযোগ হেলায় হারাবে না পুলিশ  আর আপনি বলছেন উনার মুখ বন্ধ করবেন ! কিন্তু কিভাবে ? '

 

'আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে  কিন্তু চান্দু ,  আমার উপর ভরসা রাখতে হবে তোমাকে  ইয়াকুব ওস্তাদের সাথে কাজ করছ তুমি ব্যাপারটা মাথায় রাখলেই দেখবে  সব টেনশন গায়েব হয়ে গেছে   কথা ক্লিয়ার ? না কোন রকম    গাঁদ   আছে ?'

 

 

'কিন্তু কি ভাবে ?' আবারও ছেলেমানুষের  মত  জানতে চাইল  গোপী 

 

' বললাম না চুপ থাকতে' শক্ত কঠিন চোখে ইয়াকুব চাইল গোপীর দিকে  ' শুধু মনে রেখ পুরো ব্যাপারটা জটিল হয়ে গেছে তোমার গাধামির জন্য আগামীতে  হুট হাট করে কিছু করে বস না দয়া করে '

ওরা পরোটা মাংস খেল শিশির  ঠাণ্ডা  বিয়ার পান করলো সময় নিয়ে   

খাওয়া শেষে বিছানার তলা থেকে কালো ব্রিফকেসটা বের করলো ইয়াকুব

ডালা খুলে ভেতর থেকে পাতলা দেখে একটা নোটের বাণ্ডিল তুলে প্যান্টের পকেটে ভরে নিল 

'আরে কী ব্যাপার !' অবাক বিস্ময়ে বলে উঠলো গোপী   

হট্টগোল বা চিল্লাফাল্লা  করার কিছুই নেই বাইরে যাচ্ছি যে কাজে হাত দিচ্ছি সামান্য টাকা পয়সা  লাগবে  আমাদের কাজেই লাগবে যতক্ষণ বাইরে আছি বাদবাকি টাকাগুলোর খেয়াল রাখবে তুমি  টুকু বিশ্বাস তোমার উপর তো রাখা যায়  নাকি ? '

 

আবার পেরেকের উপর থেকে জ্যাকেট তুলে গায়ে চাপাল ইয়াকুব ' টেনশন করে নিজেকে কাহিল বানানোর কোন  দরকার নেই আমি যতক্ষণ না ফিরছি কোথাও যাবে না তুমি আর নিজের হাতটা সামলে রেখ নিজে নিজেই ব্রেইন খাটিয়ে আজগুবি  কোন সিদ্ধান্ত   নিতে যেও না'

'ঠিক আছে ইয়াকুব ভাই ' পিচ্চি গোপী জবাব দিল 

 

 

 

দিনটা গরমের  

রিক্সা পেতে বেশ ভুগতে হল  অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে শেষ অটো পেল একটা অটোওয়ালাকে বলল নারায়ণগঞ্জের সুলতান টাওয়ারের ওখানে নামিয়ে দিতে

সুলতান টাওয়ার সাত তলা ব্যবসায়ীদের অফিসের জন্য বিখ্যাত  ট্র্যাভেল এজেন্ট থেকে শুরু করে  হস্তরেখা বিচার করে  উপকারি পাথর দেয়  অমন জ্যোতিষের চেম্বার পর্যন্ত আছে 

পাঁচ তলায় সোজা চলে এলো ইয়াকুব 

ঘোলাটে কাচের তৈরি খাঁচার মত একটা রিসিপশনের  কাউন্টার  অল্প বয়সী চটকদার চেহারার  একটা মেয়ে বসা 

'বিল্লালের সাথে দেখা করতে চাই ' বলল ইয়াকুব

' দুঃখিত , স্যার এখন জরুরি মিটিঙে আছেন'

' চাপা মারার আর জায়গা পাও না ? ফোন তুলে ওকে বল , পুরানো বন্ধু ইয়াকুব বেগ দেখা করতে চায়  নাম বললেই চিনবে ওর  মিটিঙের কথা শুনতে শুনতে কান পচে গেল '

 

মুখ বেঁকিয়ে মেয়েটা  বিরক্ত প্রকাশ করলেও সাথে সাথেই সামনে থাকা ইন্টারকমে ফোন দিল   

যে লোকটা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো , বয়ামের মত অস্বস্তিকর ধরনের বেঁটে আর থলথলে ভুঁড়িওয়ালা একজন গোবেচারা চেহারার মানুষ সে  গায়ে রেশমের হাফ হাতা জামা ঘাড়ের কাছে সূর্যাস্ত রঙের টাই আলগা ভাবে ল্যাগব্যাগ করে  ঝুলছে  

'আরে ইয়াকুব যে' কেমন যেন   ঘাবড়ে  গিয়ে  চারিদিকটা দেখে নিচু গলায় বলল লোকটা ' আমরা হলরুমেই বসি ভেতরে একজন খদ্দের বসে আছে '

' কী ব্যাপার বিল্লাল ? পুরানো বন্ধুকে দেখে লজ্জা লাগছে নাকি ?'

'প্লিজ ইয়াকুব ...বাদ দাও তো '

হলওয়ের এক কোনে দুইজনে বসলো 

মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বিল্লাল বলল , ' আমি কতবার তোমাকে বলেছি,  আমার আপিসে আসবে না আমাদের দুইজনের জন্যই ব্যাপারটা খারাপ  তাছাড়া ফোনেই তো আমরা সব ব্যবসা করতে পারি  সরাসরি দেখা করার কী  দরকার  '

 

' ভুল বুঝছ দোস্ত তোমার কাছে কিছু কিনতে বা বিক্রি করতে আসিনি আমি চোরাই জিনিসের ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছি কবেই  '

 

' তাহলে ? ঘটনা কী ?'

 

বিল্লালের গার্মেন্টস ব্যবসা  আপাতত অতীতে জুয়া আর মাদক ব্যবসা করতো  চোরাই মালপত্র কেনা বেচায় এক সময় বেশ  বিখ্যাত ছিল  বয়স হয়ে গেছে আগের মত ঝক্কি নিতে পারে না যৌবনের পুঁজি সব ঢেলে এখন গার্মেন্টস চালিয়ে ভদ্রলোক হয়ে গেছে  সঙ্গত কারনেই পুরানো সঙ্গীদের দেখলে বিব্রত হয় 

 

পুরানো বন্ধু হিসাবে সামান্য মদদ চাইছি আরকি ' বলল ইয়াকুব 

' আরে বলেই ফেল না সাধ্যের মধ্যে হলে করব নিশ্চয়ই ' বিল্লালের চালু ধূর্ত চোখদুটো সরু হয়ে গেছে  

বেচারা আসলেও বিপদে পড়ে   গেছে 

' তুমি না কি আজকাল কোথায় কোথায় ইউনিফর্ম সাপ্লাই দাও অমনটা শুনেছি '

 

'হ্যাঁ , তেমন কিছু না নেভিতে আর পুলিশের ইউনিফর্ম আমি সাপ্লাই দেই তাতে কী ?'

 

'তেমন আহামরি কিছু না, শুধু পুলিশের একটা ইউনিফর্ম চাই আমি একদম নতুন হতে হবে ব্যস আর কিচ্ছু না' সহজ ভাবে বলল ইয়াকুব

 

' দেখ বন্ধু...' কিছু বলতে যাচ্ছিল বিল্লাল 

 

' হতাশ কর না প্লিজ অনেক পুরানো বন্ধু আমরা  দুই দশক হবে কাজেই ফিরিয়ে দিও না কথা দিচ্ছি  খারাপ কাজে ব্যবহার করব না একজনকে শুধু ভয় দেখাব  জানি চাইলেই তুমি সাহায়্য করতে পারবে  একদম সহজ কাজ তোমার জন্য  ভবিষ্যতে যে কোন কাজে  আমার হেল্প পাবে '

 

 

খানিক ভাবল বিল্লাল  'ঠিক আছে বন্ধু  একদম কড়কড়ে নতুন পাবে না খানিক পুরানো কিন্তু দোস্ত ব্যাচ আর পিস্তলের খাপ দিতে পারব না চলবে ?'

' চলবে না মানে , একদম দৌড় দেবে কিন্তু জিনিসটা কি পাশ করবে ? মানে লোকজন দেখে কি মনে করবে ? ধর অন্য পুলিশ দেখল ? ওরাও কি আসল জিনিস মনে করবে ?'

 

' হ্যাঁ, হ্যাঁ , আবার জজ্ঞেস করে  আমি নিজে গ্যারান্টি দিচ্ছি'

 

' তাহলে ব্যবস্থা করে দাও ' হাসি হাসি মুখে বলল ইয়াকুব  ' মনে রেখ পুরানো বন্ধুর খাতিরে  পুরানো বন্ধু আর পুরানো মদ দামি জিনিস  '

বিল্লালের চেহারায় সন্দেহ দেখে সাথে সাথে ইয়াকুব যোগ করলো , ' আরে ভয়ের কিছু নেই  একজনের সাথে শুধু মজা করার জন্য নিচ্ছি জিনিসটা  বেচারা পুলিশ ভয় পায় সাংঘাতিক  একটু স্ক্রু টাইট দিয়ে আসব ওকে

 

 

খানিক পর

রাস্তা দিয়ে অলস ভাবে হেঁটে যাচ্ছে ইয়াকুব বগলে কাগজের লম্বা আর চ্যাপ্টা  বাক্স  মুখের ভাব সহজ সরল  যেন দর্জির দোকান থেকে ফিরছে  হাত বাড়িয়ে একটা অটো ডেকে নিতাইগঞ্জের দিকে যেতে বলল 

অটো থামল সেই জায়গায় , যেখান থেকে সেই ব্যাঙ্ক আর সিদ্দিক মিয়ার গুলি খাওয়ার রাস্তাটা একদম কাছে 

এখনও  ব্যাপারটা খানিক অনিশ্চিত  

 

আলতা বানু এখন কোথায় ?- ইয়াকুব জানে না হয়তো কোন পুলিশ ষ্টেশনে বসে দারোগার সাথে রসালাপ করছে  ইতিমধ্যে সব বলে দিয়েছে ? নাকি নিজের বাসায় বসে আছে , আর বাইরে একদল পুলিশ পাহারা দিচ্ছে 

রাস্তা ধরে কয়েক কদম এগিয়ে যেতেই উত্তরটা পেয়ে গেল 

রাস্তার উল্টা দিকে সেই চারতলা  বাড়িটা বাইরেই পুলিশের একটা গাড়ি  দুইজন ইউনিফর্ম পরা ছোকরা বয়সের পুলিশ কাঠের টুলের উপর বসে ষোলগুটি টাইপের কী যেন খেলছে 

ধনেশ পাখির মত গলা বাড়িয়ে চারিদিকটা দেখতে লাগল ইয়াকুব কী খুঁজছে নিজেও জানে না কিন্তু জিনিসটা চোখে পড়তেই বুঝল এটাই খুঁজছে সে

বেশ খানিক দূরে , লাল ডোরাকাটা শামিয়ানা টাঙ্গানো একটি ছোট রেস্টুরেন্ট  ডাল ভাতের দোকান  বেতের ঝুড়ি ভর্তি  সাদা ভাত রেখেছে বাইরে 

দ্রুত এগিয়ে গেল 

রঙ জ্বলা সাইনবোর্ড ' গৌরনিতাই ভাতের হোটেল '

বাইরে কাপড়ের ব্যানারে মেনু  অচেনা একটা প্রাণীর ছবি এঁকে লিখে রেখেছে - এক নাম্বার খাসির মাংস পাওয়া যায় কেমন বিচিত্র একটা  মাছের ছবি এঁকে লিখেছে - পদ্মার তাজা ইলিশ 

বড় বড় করে লেখা- নো বিফ  পুরো মেনুতে এই একটাই ইংরেজি শব্দ !

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল ইয়াকুব

ভেতরে ঢুকেই সতর্ক ভাবে জরিপ করলো কামরাটা বেশ প্রশস্ত  পরিষ্কার পরিছন্ন  দেখতে বেশ তেমন লোকজন নেই অল্প কিছু  খদ্দের  নানান জায়গায় বসে খাচ্ছে কামরার শেষ মাথায় হাত ধোয়ার বেসিনের সাথেই একটা টয়লেট 

ওটাই খুঁজছিল ইয়াকুব 

এমন একটা জায়গায় বসলো ইয়াকুব, যেখান থেকে ক্যাশিয়ারে বসা লোকটা ওর চেহারা দেখতে পাবে না বাইরে হেঁটে যাওয়া লোকজনও শুধু ওর পিঠ দেখতে পাবে 

উদাস বিষণ্ণ চেহারার একজন ওয়েটার ওর অর্ডার নিয়ে গেল তার আগে তোতাপাখির মত পই পই করে  বলে গেল কি কি পাওয়া যাবে 

এক থালা শক্ত ভাত আর হাড্ডির সাথে সামান্য চর্বি সহ মাংসের টুকরা দিয়ে গেল ডাল নামে যেটা দিয়েছে সেটা ডাল হতেও পারে আবার নাও হয়ে পারে

অসীম ধৈর্য্য আর বিরক্তি নিয়ে জিনিসগুলো খেল ইয়াকুব টেবিলে বসেই দাম শোধ করলো যখন দেখল লোকজনের মনোযোগ ফিকে হয়ে গেছে ওর উপর থেকে,  তখনই বাথরুমে ঢুকে পড়লো সুরুৎ করে

বাক্স থেকে পুলিশের ইউনিফর্ম বের করে গায়ে চাপিয়ে নিল নিজের পোশাক ভরে ফেলল কাগজের  বাক্সের ভেতরে বাক্স আবার পাটের  সুতা দিয়ে শক্ত করে বাঁধল  

 

আসার আগে ,  পুলিশের একটা ব্যাজ যোগাড় করেছিল নাটক পাড়া থেকে বুকে সেঁটে নিল যত্ন করে হোলস্টারে পয়েন্ট থার্টি এইট পিস্তল গুঁজে বাক্সটা হাতে ধরে গট গট করে বেড়িয়ে এলো ভাতের হোটেল থেকে

হোটেলের বাইরেই একটা ডাস্টবিন  সবজির খোসা, দইয়ের ভাঙ্গা পাতিল , ময়লার স্তূপ বাক্সটা ওখানেই ফেলে দিল সে 

 

তারপর নির্বিকারভাবে রাস্তা পার হয়ে সোজা চলে গেল চারতলা  বাড়িটার দিকে যেখানে আলতাবানু থাকার কথা 

ষোলগুটি খেলায় ব্যস্ত দুই পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বলল , ' তোমরা কি এসআই জিঞ্জির খানকে আসতে দেখছ ?'

 

জিঞ্জির খানের নামটা ব্যবহার করলো ইয়াকুব অনেক আগে পরিচয় হয়েছিল  খুব খাতির হয়ে গিয়েছিল তখন টহল দিতে গিয়ে যে সব মাদক ধরত সব থানায় জমা দিত না জিঞ্জির খান দশ ভাগের এক ভাগ চার্জশিটে লিখে আসামিকে হাজতে চালান দিত ভদ্রলোক  বাকি মাল বিক্রি করে সামান্য নগদ নারায়ণ উপার্জন করতো জিঞ্জির খান  তখন ইয়াকুবকে ব্যবহার করতো

'জিঞ্জির খান ?' অবাক গলায় বলল এক পুলিশ  'উনি এখানে আসবেন ?  কই জানি না তো ! আসার কথা নাকি ?'

' ব্যাটা এখনও আসেনি  আগের মতই অলস রয়ে গেছে   নবীগঞ্জ থানা থেকে এসেছি আমি  কাল রাতে টহল দেয়ার সময় জিঞ্জির খান আর আমি মিলে এক ব্যাটাকে ধরেছিলাম  মনে হচ্ছে এই ব্যাঙ্ক ডাকাতির সাথে জড়িত সেইজন্য এখানে আসলাম  '

 

'কী দরকার আমাদের বলতে পারেন' এক পুলিশ বলল 

' আসলে আমি নিজেও জানি না কি অ্যাকশন নেব জিঞ্জির খান থাকলে ভাল হত'

' কাজটা কী বলুন না' বলল দ্বিতীয় পুলিসটা  ' প্রমোশন ফমোশন হলে কিন্তু আমাদের কথা মনে রাখবেন স্যার '

' মহিলার নাম আলতা বানু না ? উনার সাথে দেখা করতে পারলে ভাল হত  উনি কোথায় ?'

' ভেতরেই আছেন শুয়ে আছেন বোধহয় আমিও শুতে পারলে খুশি হতাম ' কথা বলা শেষ করেই বাহবা পাওয়ার আশায় চকচকে চোখে সঙ্গীর  দিকে চাইল ছোকরা   

ভাবখানা , দেখ কেমন একটা ডার্টি জোক করলাম 

মহিলার সাথে কথা বলতে পারলে  বেশ হত' বলল ইয়াকুব ' উনার বর্ণনার সাথে আমাদের ধরা পার্টির চেহারা মিলে কি না দেখতাম  তাহলেই কেস সলভ  উনার সাহায়্য লাগবে '

'আমি জানি না ' গাল চুলকালো প্রথম পুলিশটা  ' আমরা তো কিছুই শুনিনি এই ব্যাপারে'

' এত কথার দরকার নেই স্যার উনি চারতলায় বি নাম্বার রুমে আছেন আপনি উপরে  যেতে পারেন' সঙ্গীর উপর বিরক্ত হয়ে জবাব দিল দ্বিতীয় পুলিশটা  কল্পনায় নিজের প্রমোশন দেখতে পারছে  পরিষ্কার , ঝকঝকে  

'ঠিক আছে' পা বাড়াল ইয়াকুব ' খানিক গিয়ে পিছন ফিরে বলল, ‘ জিঞ্জির খান চলে আসলে বলবে, আমি উপরে আছিঠিক আছে ? '

' ঠিক আছে স্যার'

ভেতরে ঢুকে ফোঁস করে দম ফেলল ইয়াকুব খানিক দাঁড়িয়ে পেশি শিথিল করে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল  সোজা চারতলা মহিলার রুম খুঁজে পেতে সমস্যা হল না দরজা নরম ভঙ্গিতে নক করতেই ভেতর থেকে মেয়েলী গলা শোনা গেল , ' কে ?' মহিলার গলার স্বরে ভয় নেই ক্লান্তি  ' কে ওখানে ? '

পুলিশ ' চট করে বলল ইয়াকুব ' আপনাকে একটা ছবি দেখাতে চাই'

কিসের ছবি ?' গলার স্বর এখন দরজার পাল্লার সাথেই  

'কাল রাতে এক আসামিকে ধরেছি   মনে হচ্ছে এই লোকটাকেই খুঁজছি আমরা দেখুন তো '

দরজার চেইন সরানোর শব্দ শুনতে পেল ইয়াকুব  

তারপর খুলে গেল সেটা  মুখমুখি দাঁড়িয়ে আছে দুইজন

আবিস্কার করলো,  দূর থেকে আলতাবানুকে দেখে যতটা সুন্দরী আর সরস মনে হয়েছিল,  ততটা না 

রং জ্বলা একটা মেক্সি না কি বলে , পরে আছে মহিলা গায়ের রঙ মাখনের মত এই বাজে পোশাক পরায়  ফিগারটা লাগছে একেবারে গরম তন্দুরির মত সব ছারখার হয়ে যাবে  

ভেতরে ঢুকে মাথার ক্যাপ খুলে নরম গলায় ইয়াকুব বলল , ' বেশি সময় লাগবে না ম্যাডাম  মাত্র এক মিনিটের মামলা ‘  

তারপর নিজেই  দরজা বন্ধ করে দিল 

আলতা বানু মুখ ফিরিয়ে রুমের ভেতর দিকে হাঁটতে লাগল বেচারি জানেও না কি হতে যাচ্ছে  

তাড়াহুড়া করলো না,  আস্তে করে হোলস্টার থেকে পিস্তলটা বের করলো ইয়াকুব

মেয়েটা যখন ঘুরে দাঁড়ালো, আবিস্কার করলো পিস্তলের নলের মুখমুখি সে

 

 

 

বিহ্বল মেয়েটা হাঁ করলো কিন্তু একটা শব্দও বের হল না মুখ দিয়ে 

'একটা শব্দ করলেই গুলি করব আমি' আগের মতই শান্ত ভাবে বলল ইয়াকুব  ' পাশের রুমটা কিসের ?'

'বেডরুম '

'ওখানে চল '

মেয়েটা এইবার কী বুঝে মুচকি হাসল হয়তো ভাবছে অন্য রকম মৌজ ফুর্তি করার জন্য অফিসার তার কাছে এসেছে যেমনটা থানার অনেক বাবু করে

বিছানার উপর আধশোয়া ভঙ্গিতে বসে পড়লো আলতাবানু

একটা বালিশ তুলে মেয়েটার পেটে রেখে হুকুম দিল ইয়াকুব , ' ধরে রাখ '

মেয়েটা সেরকমই করলো বুঝে উঠতে পারছে না আসলে 

বালিশের উপর পিস্তলের নল চেপে ট্রিগার চেপে ধরল ইয়াকুব  

মেয়েটার চেহারায় প্রথমে বিস্ময় ফুটে উঠলো তারপর ক্ষোভ  শেষে প্রতারিত হবার বঞ্চনা  তারপর তো মারাই গেল

বুলেটের শব্দটা যথেষ্ট চাপা দেয়া হয়েছিল তারপরও ভালই আওয়াজ হয়েছে দ্রুত জানালার পাশে দিয়ে নিচে তাকাল ইয়াকুব

নিচে এখনও সেই দুই পুলিশ বসে বসে ষোলগুটি খেলছে চেহারায় কোন বিকার নেই

একজন বোধ হয় দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে কান খোঁচাচ্ছে 

হাসল ইয়াকুব

পিস্তলটা হোলস্টারে রেখে বের হয়ে গেল আলতাবানুর ফ্ল্যাট ছেড়ে

নিচের দুই পুলিশ বারবার বিরক্ত হচ্ছে খেলা ভণ্ডুল হওয়ায় প্রথম জন শুধু জানতে চাইল, ‘ কাজ হয়েছে স্যার ?

দাঁত বের করে কাষ্ঠ হাসি হাসল ইয়াকুব , ' খামাখাই সময় নষ্ট  মহিলা বলছে,  তেমন কিছু নাকি দেখেনি সেইদিন ইশ,  জিঞ্জির খান শুনলে ভীষণ চটে যাবে যাই থানায় কি আর করা দেখা হবে'

' দেখা হবে' দায়সারা ভাবে বলে আবার খেলায় ডুবে গেল দুইজন টাকা দিয়ে খেলছে মনে হয় 

নইলে অত ডুবে থাকে কিভাবে ?

 

সামনে হেঁটে যেতেই একটা অটো পেয়ে গেল সে

উঠে বসতেই অটোওয়ালা দাঁত বের করে কেমন মিহি হেসে বলল , ' কী ব্যাপার স্যার  ? আপনার গাড়ি কী চুরি হয়ে গেছে না কি ?'

পাকনা পাকনা ডায়ালগ না দিয়ে অটো চালাও' শান্ত গলায় বলল ইয়াকুব ' নইলে থানায় চালান দেব  লাইসেন্স আছে তোমার ? '

অটোওয়ালা তোম্বা করে ফেলল মুখটা

 

বসে বসে ব্রিফকেস ভর্তি নোটগুলোর কথা ভাবতে লাগল ইয়াকুব 

আবার কয়েক জায়গায় নেমে,  অটো পাল্টে হোটেল আনন্দময়ীর এলাকার সামনে এসে দাঁড়ালো  

দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে গেছে বাইরে কাকের পালকের মত অন্ধকার পাড়াটা নিঝুম 

বস্তির মাঠে এখনও কয়েকটা বাচ্চা খেলছে তাপ্পি মারা বল নিয়ে

 

ইয়াকুবকে দেখে দুই একজন বলে উঠলো , ' ঠোলা ঠোলা.. (  অশ্লীল একটা শব্দ  ) পোলা'

তারপর দৌড় দিল

 

মুচকি হেসে হোটেল আনন্দময়ীর সিঁড়িতে পা দিল সে  মনটা ভাল হয়ে গেছে দারুণ গেছে দিনটা  সব সুন্দর ভাবে শেষ হয়েছে  

পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খোলা মাত্রই কোত্থেকে যেন   গুলি এসে আঘাত করলো  ওর তলপেটে   ব্যাথায় পিছিয়ে গেল এক পা

   আতঙ্কিত গোপী ওর পিস্তল দিয়ে  গুলি চালাল আবারও   

কী ভুল করেছে ইয়াকুব  সেটা বুঝে উঠার আগেই , গোপীর দ্বিতীয় গুলিটা ওর কপালের মাঝখানটা ফুটো করে দিল  

 

 

শেষ

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...