সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ছায়া শিকারি

 এক

 

পিচ্চিটার বয়স বেশি হবে না।

টেনেটুনে চৌদ্দ ।

মাথায় নরম কাপড়ের  বারান্দাওয়ালা গোল   টুপি। গায়ে নীল জিন্সের জ্যাকেট ,  আর জ্বলে যাওয়া জিন্সের প্যান্ট। চামড়ার  নাক থ্যাবড়া জুতো  । পকেটে একটা ম্যাকগাইভার চাকু আর  চাইনিজ দোকানে বিক্রি  হয় অমন   সস্তা একটা   কম্পাস নিয়ে এডভেঞ্চারের লোভে বের হয়ে পড়েছে,  ভর দুপুরে।

কী   মনে করে কোমরে কায়দা করে একটা  টর্চ লাইট ঝুলিয়ে নিয়েছে । দুপুর বেলা  টর্চ লাইট দিয়ে কি হবে নিজেও ভাল বলতে পারবে না। কেউ অবশ্য জানতেও চায়নি ।

সাথে থাকলে ভাল , সেইজন্য নিয়েছে ।  

দোষটা ওর বয়সের।

সাথে আরও একটা দোষ আছে।

বইপড়া।

 রাজ্যের সব গোয়েন্দা কাহিনি আর অ্যাডভেঞ্চার মার্কা বই পড়ে পড়ে  ওর মাথাটা গেছে।  নিজেকে মস্ত বড়   দুঃসাহসী  হিরো ভাবছে। সারাক্ষণ  মাথার ভেতরে  কিলবিল  করছে অদ্ভুত সব আইডিয়া। জীবনে আর আছে কী মার্কা একটা ভাব।  

জায়গাটা নিঝুম ।

  ছোট ছোট পাথর  বিছানো সরু পথ চলে গেছে। দুই পাশে ঘন ঝোপ ঝাঁপ। আকন্দ, বনতুলসি,  হিমরাজ, কলকাসুন্দা , চোরকাঁটা,  হাতির শুঁড়  

জায়গাটা পতিত।

মানুষজন কেউ ভুলেও আসে না।

  পিচ্চি অবশ্য  পাতলা  জঙ্গলের  ভেতর দিয়েই চলছে। মনে মনে ভেবে নিচ্ছে, ওটা কঙ্গোর গভীর অরন্য । ভাবতে দোষ কি ? কে বাঁধা দিচ্ছে ?

 সব ঠিক ঠাক মতই  যাচ্ছিল । পায়ের সামনে গজিয়ে উঠা শক্ত ঘাসের দলার সাথে আচমকা   হোঁচট খেতেই উবু হয়ে সামনে পড়ে গেল।

 আর কি ভাবে যেন কুমড়ার মত  গড়াতে গড়াতে আরও সামনে চলে গেল। আর কি আশ্চর্য , গিয়ে  পড়লো অগভীর একটা গর্তের ভেতরে।

নিজের অজান্তে চেঁচিয়ে উঠছিল পিচ্চি।

সেইজন্য লজ্জা  ও পেল।  চেঁচানোর দরকার ছিল না।    হাচরে পাছরে উঠে বসে আবিস্কার করলো একটা  বেদীর মত জায়গায় বসে আছে। লাফ দিলে আরও নিচে নামা যাবে। ওটা এক মানুষ সমান নিচে । আর ওখানে  মাঝারি   কামরার সাইজের একটা গুহা।

জল না চাইতেই শরবত । দারুন একটা অ্যাডভেঞ্চার করে ফিরবে আজ,  ভাবল পিচ্চি।

দুপুরের কড়া রোদ গুহার  ভেতরে তেমন প্রবেশ করেনি। চাপ চাপ অন্ধকার। ছানার জলের মত আলো। পরিষ্কার দেখা  যায় না।  বাধ্য হয়ে টর্চ  জ্বেলে নিল।   টর্চটা আসলে ওর বাপের। ব্যাটারি  পুরানো।  কেমন পানসে আলো জ্বলল। তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। তারপরও  বুঝতে পারলো এটা একটা গুহা। আর গুহার দেয়ালে  লালচে রঙের কি সব আঁকা।

নীচে নেমে ভাল করে দেখবে কি না ভাবল  পিচ্চি। তখনই মনে হল গুহার ভেতরে কিছু একটা বোধ হয় আছে।  সারা জীবন যত ভৌতিক বই পড়েছে সবগুলো গল্পের প্লট মনে পড়ে গেল কি ভাবে যেন।  পড়ি মড়ি করে ঘাসের শেকড় মুঠো করে বেয়ে গুহার বাইরে চলে এলো।

ঝেড়ে দৌড় দিল তারপর ।

নিমগঞ্জ থানার  দারোগা  বেলায়েত খান মোটা মানুষ । দীর্ঘদিন অপরাধীদের সাথে ঘষা খাওয়ার পরও  চেহারায় ভাল মানুষের ভাবটা মুছে যায়নি।  কাঁচা পাকা জুলফি আর জল্লাদের মত গোঁফে দারুন মানিয়েছে ভদ্রলোককে । গোঁফটা প্রায় সাদা। কালোর ভাগ  কম।   কার্তিকের  এই মধ্য  দুপুরে বসে বসে  সুকুমার  রায় রচনাসমগ্র’  পড়ছিলেন । সময় পেলেই বইটা পড়েন। কতবার যে  বইটা শেষ করেছেন নিজেও জানেন না।   এখন পড়ছিলেন , অবাক জলপান গল্পটা। এটা অবশ্য গল্প না নাটক । আগে রেডিওয়ে শুনেছেন অনেকবার । হাসতে হাসতে জান শেষ। গরমের মধ্যে পথিকের   জলতেষ্টায় কি করুন অবস্থা। আরেক বেকুব বলছে এটা তো জলপাইয়ের সময় না , কাঁচা আম  হলে দিতে পারি।

কি কাণ্ড !

পড়ছিলেন আর ফিকফিক করে হাসছিলেন বেলায়েত খান। এমন সময় পিচ্চি হুড়মুড় করে থানার ভেতরে ঢুকে হব হব করে কি সব বলতে লাগল। ঘামে পিচ্চির শরীর ভিজে গেছে। মনে হয়  স্নান করে এসেছে।

কি হয়েছে বাবা ?  বাজারের ব্যাগ চোরে নিয়ে গেছে ?  না সাইকেল চুরি হয়েছে ?  সস্নেহে জানতে চাইলেন বেলায়েত খান।

স্যার, আপনাকে একটু  আসতে হবে আমার সাথে।উত্তেজিত ভাবে বলল পিচ্চি। একটা গুহা স্যার, ভেতরে কি যেন । দারুন কিছু...। আসলে হয়তো...

উত্তেজনায় খেই হারিয়ে ফেলছে পিচ্চি।

তুমি জল খাও আগে এক গ্লাস। তারপর শান্ত হয়ে ঘটনাটা  বল তো।সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে দিলেন  বেলায়েত খান।

 

মিনিট পাঁচেক পর।

শেয়ালের গর্ত না তো ?’  সব শুনে সন্দেহের সুরে বললেন তিনি।

শেয়ালের গর্ত এত বড় হয় কি করে ? আর দেয়ালের আঁকিবুঁকি আমি নিজের চোখে দেখেছি।’   প্রতিবাদের সুরে বলল পিচ্চি।

যুক্তি সুন্দর। একেবারে  সিমেন্টের মত পোক্ত।   চল গিয়ে দেখে আসি।

লক্কড় মার্কা জীপটা গিয়ে থামল সেই গর্তের সামনে।

লাফ দিয়ে আগে নেমে গেল পিচ্চি। আঙুল তুলে দেখাল - ‘ঐ যে স্যার, সামনে।

শান্তভাবে নামলেন বেলায়েত খান। পিচ্চি অনুসরণ করলো  অফিসারকে । গুহার মুখে নেপিয়ারের ঘাসে দঙ্গল। খানিক লেপটে আছে। পিচ্চির জন্যই ।  ধিরে সুস্থে নামলেন তিনি, টর্চ জ্বালালেন।

অন্ধকার।

 দেয়ালে আলো  পড়তেই অবাক হলেন। খাকি রঙের দেয়ালে  জাফরানি আর মেরুন রঙ দিয়ে কি সব আঁকা। এত  দূর থেকে ভাল মত  দেখতে  না  পেলেও একটা শিকারি  বর্শা হাতে  বিশাল একটা বাইসনের দিকে তেড়ে যাচ্ছে সেটা  পরিষ্কার দেখতে পেলেন। আরও আঁকিবুঁকি আছে সেটাও বুঝলেন।

আমাদের ভেতরে যাওয়া ঠিক হবে না।শান্ত গলায় বললেন বেলায়েত খান। এই ধরনের আবিস্কার বেশ মূল্যবান হয়। বিশেষজ্ঞ লোক ভেতরে নেমে  পরীক্ষা করে দেখলে ভাল হয়। আমরা হয়তো ঘাঁটাঘাঁটি করে জিনিস নষ্ট করে ফেলব। অ্যানটিক ভ্যালু না কি বলে, সেইসব  কমে যাবে।

আপনি ঠিক বলেছেন স্যার।বিশেষজ্ঞদের মত একটা ভঙ্গী করে বলল পিচ্চি।

 

 এক সপ্তাহ পরের কথা।

গুহার বাইরে বেলায়েত খানের জিপ আর   খাকি রঙের মাঝাঁরি একটা তাবু। উচ্চ মহলে  বেলায়েত খানের তেমন যোগাযোগ নেই।  মিডিয়া বা সাংবাদিকদের কাউকে  খবর দেয়ার ইচ্ছা হয়নি তার।   নিমগঞ্জ কলেজের প্রত্নতাত্ত্বিক  বিভাগের এক শিক্ষিকাকে চিনতেন। ভদ্রমহিলার নাম - রেহানা । বয়স সাতচল্লিশ হবে। এই সব ব্যাপারে দারুন আগ্রহ ভদ্রমহিলার।   খবর পাবার  সাথে সাথেই উনার দুইজন ছাত্র ছাত্রী নিয়ে হাজির হয়েছেন।  পরীক্ষা নিরীক্ষার পর  সংবাদ সম্মেলন করে  সবাইকে জানানো হবে। তাবু খাটাতে দেখেই উৎসাহী বেকার ,ভবঘুরে আর গুলতানিবাজ মানুষ জড় হতে চেয়েছিল। বেলায়েত খান কড়া নির্দেশ দিয়েছেন তাবুর আধা মাইলের মধ্যে কাউকে দেখলে ধরে নিয়ে থানার চৌদ্দ শিকের ভেতরে পুরে রাখবেন।

ধমকে কাজ হয়েছে।

মই নামিয়ে গুহার ভেতরে  দলটা নেমেছে। কাজ চলছে, বড় বড় স্পট লাইটের আলোতে  ।  রেহানা  বেগমের ছাত্র আর ছাত্রী দুইজন  ব্রাশ দিয়ে দেয়ালের ধূলা  সরিয়ে    আতশি কাচ দিয়ে কি সব দেখছে আর নোটবইতে লিখে রাখছে। রেহানা বেগম ক্যামেরাতে ছবি তুলছেন।

খানিক দুরে দারিয়ে আছেন বেলায়েত খান আর পিচ্চি।

গুহাটা জেনুইন।অনেক সময় পর কথা বললেন রেহানা। নিমগঞ্জ বিখ্যাত হয়ে যাবে এখন,   সন্দেহ নেই।

আবিস্কারক  হিসাবে পিচ্চির নাম যেন থাকে ?অনুরোধ করলেন বেলায়েত খান।

সেটা আবার বলতে।হাসলেন রেহানা। ‘  বাংলাদেশে যে গুহা নেই তা কিন্তু না। খাগড়াছড়ির  আলুটিলা গুহা নিজেই দেখে এসেছি। বান্দরবানে  আলীকদমগুহা তো টুরিস্টদের প্রিয় জায়গা। ভেতরে বাদুর, আর শামুক আছে। শামুক খাবার লোভে পাখি ঢুকে পড়ে। কিন্তু গুহাচিত্র কোথাও পাওয়া যায়নি।

কত পুরানো এটা ?

বলা মুশকিল। আরও পরীক্ষা করতে হবে। বেশির ভাগ গুহাচিত্র   বত্রিশ হাজার  বছর বা তার আগের। এশিয়া, ইউরোপে বেশি গুহাচিত্র পাওয়া গেছে।

আমি বইতে পড়েছিলাম বৃষ্টির দিনে গুহায় যে সব লোকজন আঁটকে থাকতো তারা এইসব গুহাচিত্র আঁকত ?

জাস্ট একটা অনুমান।হাসি মুখে জবাব দিলেন রেহানা। কেন এইসব ছবি আঁকত আজও জানা যায়নি। অনেকে বলে এটা ছিল যোগাযোগের মাধ্যম। ভাষা বা লিপি চালু হয়নি তখনও। ধর্মীয় কারণও বলে অনেকে।  ব্ল্যাক ম্যাজিক বা কালো জাদুর কথাও বলেন । আমার বিশ্বাস হয় না অত আগে কালো জাদুর চর্চা  শুরু হয়েছিল। তবে মূলত সবগুহাচিত্রের বিষয়বস্তু শিকার, জীবজন্তু আর  হাতের পাঞ্জার ছাপ। জলাভুমির কাছের গুহায় মাছের ছবিও পাওয়া গেছে। সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপার হচ্ছে যেই সব গুহায় এই গুহাচিত্র পাওয়া গেছে বেশির ভাগই দুর্গম এলাকায়। আশেপাশের  দূর দূরান্ত পর্যন্ত বসতির কোন চিহ্ন পাওয়া  যায়নি। অমন জায়গা বেছে কেন ছবি আঁকত সেটা জানা সম্ভব্য হয়নি।

রঙের ব্যবহার  করতো কেমন করে ?

লাল, সাদা, হলুদ, কালো। নীল আর সবুজ খুব কম ব্যবহার হয়েছে। পশুর রক্ত, চর্বি ,কয়লা আর মাটি দিয়েই রঙ বানানো হত। গাছের ডাল আর জন্তুর হাড় দিয়ে তুলি। সহজ হিসাব।

কথা শুনতে শুনতে  সামনের দিকের দেয়ালের কাছে এগিয়ে যাচ্ছিলেন বেলায়েত খান।

থামুন।হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন  রেহানা । আর সামনে  যাবেন না।

সরি।লজ্জিত গলায় বললেন বেলায়েত খান। কিছু নষ্ট  করলাম না তো ?

হ্যাঁ। এখানেই আদিম মানুষের একটা পায়ের ছাপ দেখেছিলাম। সেটার উপরই আপনি পা দিয়েছেন। আরও সাবধান হবেন।

এই দেয়ালে ওটা কিসের ছবি ?’  পিচ্চির প্রশ্ন।

ওটা ? ওটা একটা বাইসন।

কিন্তু আমাদের দেশে কি বাইসন ছিল ?

থাকবে না কেন ? গয়াল বলে এটাকে। আমাদের দেশে আজও আছে। চিটাগাং বাইসন বলে। লবণ খেতে পছন্দ করে ওরা।  লবণের দলা ফেলে ফাঁদ পেতে আজও গয়াল ধরে   পার্বত্য চট্টগ্রামে । দল বেঁধে থাকে গয়াল।

কি খায় ?

ঘাস, লতা, পাতা।

আর ঐ দেয়ালের ছবিটা ?

সামনে এগিয়ে গেলেন রেহানা বেগম। হলুদ পাণ্ডুর  দেয়ালে একজন আদিম শিকারির ছবি আঁকা। হাতে বর্শা নিয়ে দাড়িয়ে আছে। আক্রমণের ভঙ্গিতে। শিকারির ডানে কেমন একটা বড় সড় গোলক।

শিকারির ছবি।ব্যাখ্যা করলেন রেহানা  বেগম। গোলক জিনিসটা ঠিক পরিষ্কার না। সূর্য হতে পারে। আবার কোন সিম্বল হতে পারে।। শক্তির উৎস । উপাসনার কিছু।   বা বিশ্বাস করে এই গোলক ওদের রক্ষা করবে। অনেক গুহাচিত্রে অমন জিনিস পাওয়া গেছে। কেউ কেউ বলে   ufo বিশ্বাস করে আদিম মানুষ ভিনগ্রহের বাসিন্দাদের দেখা পেয়ে ছিল। সেটাও প্রমানিত নয়।

দারুন তো।জবাব দিল পিচ্চি। অনেক কিছু জানলাম।

মই বেয়ে তিনজনেই বাইরে চলে এলো।

রেহানা বেগমের ছাত্র ছাত্রী নীচেই রইল। কাজ আছে ওদের।

বাইরে ঝাঁঝাল রোদ । হালকা বাতাস বইছে। বাতাসে ঘাস আর বনতুলসির ঘ্রাণ।

আমি ভাগি। মা   বকাঝকা করবে। সময় পেলেই এসে দেখে যাব।বলল পিচ্চি। ধন্যবাদ আপনাদের।

‘  যখন তোমার খুশি।হাসি মুখে বললেন রেহানা বেগম। আদর করে পিচ্চির মাথার চুল এলো মেলো করে দিলেন।

দৌড়ে চলে গেল পিচ্চি।

আপনাদের কাজ কেমন চলছে ?জানতে চাইলেন বেলায়েত খান।

ভালই। শতাব্দীর সেরা একটা আবিস্কার হতে যাচ্ছে এটা।  ছবি তোলা শেষ হলে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠাব। মিডিয়ার লোকদের জানাব। তার আগে কুইন্সল্যান্ডে পরিচিত এক বিজ্ঞানীকেও খবর দেব। তারও  আগে আপনি এই জায়গাটাকে  প্রটেক্ট দেবেন।

কেন ? কোন সমস্যা ?

আমার সন্দেহ হচ্ছে,  রাতের বেলা গুহায় কেউ নামে।

চুরি হয়েছে কিছু ?

তা হয়নি। কিন্তু জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করেছে কেউ। পরিষ্কার বুঝতে পারছি আমি। চুরির মতলবে কেউ আসে না। মনে হয় ভয় দেখাতে চায়।

আরে নাহ,  শেয়াল মেয়াল ঢুকে পড়েছিল হয়তো।’  প্যান্টটা  দুই আঙুল দিয়ে উপরের দিকে তুলে নিজের ভূরিটা সামাল দিতে দিতে বললেন বেলায়েত খান।

তাই ? আপনার কি মনে হয় ? শেয়াল এই ভাবে কোন প্রাণী মারতে পারে ?আঙুল দিয়ে সামনের দিকে দেখালেন রেহানা বেগম।

 নীল রঙের প্ল্যাস্টিকে   মুড়ে কি যেন একটা সামনে রাখা। উবু হয়ে বসে প্ল্যাস্টিক সরালেন বেলায়েত খান।  কালো কুচকুচে মরা ছাগল একটা  । গলার কাছে বড় একটা ফুটো।  কিছুর আঘাতে মারা গেছে। সারা শরীরের চামড়া টেনে তুলে ফেলা হয়েছে ।  । কিন্তু মাংস খাওয়া হয়নি এক ছটাকও।

কুকুর বা  শেয়ালই হবে ।’  চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন বেলায়েত খান।

মাংস খায়নি কেন ?ভ্রু কুচকে  গম্ভীর  গলায়  জানতে চাইলেন রেহানা বেগম।

ঠিক জানি না।মাথা নেড়ে নিজের অজ্ঞতা  স্বীকার করলেন  নিমগঞ্জ থানার দারোগা। হয়তো পেট ভরা  ছিল জানোয়ারটার।  পশু পাখির আচরণ কখনো কখনো ব্যাখ্যাতীত হয়। কে না জানে।

কেউ আমাদের ভয় দেখাতে চাইছে।চিন্তিত সুরে বললেন ভদ্রমহিলা।

কে হতে পারে ?

জায়গার মালিক ।

এটা  তো সরকারী জায়গা। যতদূর জানি।

সামনের ওখানের সাইন বোর্ড দেখুন। জায়গার মালিক  জাবের ভূঁইয়া।

কথা শেষ হবার মাত্র দেখা গেল রোগা ভোগা একটা লোক হনহন করে হেঁটে আসছে। ঢোলা প্যান্ট। গায়ে আইভরি রঙের ফতুয়া। মাথায় বাবরি চুল।

নাম নেয়া মাত্র বান্দা হাজির।চাপা গলায় বললেন রেহানা বেগম। বহু দিন বাচবে।

বেশ একটা  জোশ নিয়ে আসছিল লোকটা । বেলায়েত খানকে দেখে মুখটা কেমন তোম্বা হয়ে গেল। সামনে এসে  সালামের মত একটা ভঙ্গী করলো। ইচ্ছা না থাকার পর সালাম দিতে হলে লোকজন অমন করে।

জাক ভাই বালই অইল দুইজনরেই পাইলাম। আপনেগ এই  খুরা খুরির কাম শেষ অইব কবে কন দেহি ?বিরক্ত মুখে প্রশ্ন করলো জাবের ভূঁইয়া।

কোন সমস্যা ?আন্তরিক ভাবেই প্রশ্ন করলেন বেলায়েত।

সমেইস্যা অইব না আবার। সামনে আমার জমি। বাপ দাদার আমলের। কারো জিনিস দখল করি নাই। বাভছিলাম কয়ডা  ঘর তুইল্লা ভাড়া দিমু। আপনেরা যে নাটক শুরু করছেন হেডা তো শেষ করেন আগে। মাটি খুইরা কি হাতির ডিম পাইবেন ?  ডিমের মামলেট বানাইয়া বেচবেন ?  

ভদ্রভাবে কথা বলুন।রুক্ষ গলায় বললেন  রেহানা বেগম। আপনার জায়গা থেকে অনেক দূরে আমাদের প্রজেক্ট। আমাদের ভয় দেখানোর জন্য রাতের বেলা এখানে ঘুর ঘুর করেন নাকি ?

আ মর জ্বালা।বিচিত্র ভঙ্গিতে নিজের কপালে ঠাস করে চড় মেরে বলল জাবের ভূঁইয়া। রাইতের বেলা এই গর্তের  সামনে আমি গুর গুর করমু ক্যান ?  খাইয়া লইয়া কাম নাই আমার ?

না বুঝার ভান করবেন না। আপনি ভাল করেই জানেন কি বলছি আমি।’   

রেহানা  ম্যাডাম সন্দেহ করেন আপনি বা অন্য কেউ রাতের বেলায় নীচের গুহায় নেমে জিনিসপত্র  নাড়াচাড়া করেন।সাবধানে বললেন বেলায়েত খান।

একদম ডাকাইত্তা মিছা কতা স্যার।হাহাকার করে উঠলো জাবের ভূঁইয়া। রাইতের বেলা ভাল মতন চুখে দেহি না আমি। আর হাপের কামড়ের ডরে এই গর্তে কে হানব ? আপনেই কন ? এই মাতারির কামের  লিজ্ঞা আমি বাড়ির কাম ধরতে পারতাছি না।

ভাষা সংযত করুন।শান্ত গলায় বললেন বেলায়েত খান । ইতিহাসের অনেক বড় জিনিস আবিস্কার হয়েছে এখানে সেটা জানেন ?

ইতিহাস দিয়া আমি কি করমু । আচার বানাইয়া খামু ? আমি চাইতাছিলাম...

বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দেবেন তো ?বাঁধা দিয়ে বললেন বেলায়েত খান। কয়েক মাস পর কাজ ধরুন। আর দয়া করে এই  প্রত্নতাত্ত্বিক  কাজে বাঁধা দেবেন না ।

হুহ, মাছের রাজা ইলিশ আর  চাকরির রাজা পুলিশ।বিড়বিড় করে বলল জাবের ভূঁইয়া।

পাই করে ঘুরে  হনহন  করে চলে গেল।

ভদ্রলোক আশা করছি আর ঝামেলা করবে না।মুচকি হেসে বললেন বেলায়েত খান।

 

দুই

 

দুই পাশে মোটা ঘাস। চোরাকাঁটা ভর্তি। শুকনো ধুতরা গাছের ডালে ছাগলের চামড়া খানিক লেগে আছে । বাতাসে দুলছে। সময় নিয়ে পরীক্ষা করলেন বেলায়েত খান।

আমার ছাগল স্যার।বলল বুড়ো হাতেম আলী। কাইল রাইতে  খোঁয়াড়ের তন ক্যামনে জানি বাইর অইয়া গেছিল গা। তখনই বুঝছি আর পামু না।

কেন ?অবাক হলেন বেলায়েত খান। পাবেন না কেন ?’   

দাদায় কইত এই জঙ্গলের বিৎরে  রাইতের বেলা ছাগল গরু গেলে  পিসাচে মাইরা ফালায়। সাত বছর আগে আমার  একটা ভেড়া চুরি হইছিল । আপনে  নিমগঞ্জে  নতুন তাই বিষয়টা জানেন না।

  লোকটার  বলার  ভঙ্গী   আর সিরিয়াস চেহারা   দেখে মনে মনে হাসলেন বেলায়েত খান। মুখে কিছু বললেন না। কত ভুল ধারনা নিয়ে যে মানুষ বাঁচে।

 

গুহার দেয়ালের সামনে একগাদা ছবি হাতে দাড়িয়ে রেহানা বেগম। চেহারায় চিন্তার ছাপ। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করছেন, কোন রকম ভুল হচ্ছে না তো ? ছবি ভুল বলে কি করে ?  

বিকেল হয়ে গেছে ম্যাডাম।পিছন থেকে বলল তার ছাত্র। চটপটে এক তরুণ। খাকি রঙের  ক্যাম্বিসের ব্যাগে হাতুড়ি, বাটালি আর দরকারি সব  জিনিসপত্র ভরে জানতে চাইল ,  বাসায় যাবেন না  ?

তোমরা চলে যাও। আমি একা থাকতে চাই।চিন্তিত  গলায় বললেন রেহানা বেগম।

খানিকটা  বিশ্রাম  আপনার ও দরকার ছিল ম্যাডাম ।বলল ছাত্রীটা।

উহু, আমি ঠিক আছি।’  

কাল শুক্রবার।   রবিবার আমরা আসব।

ঠিক আছে।অন্যমনস্ক ভাবে বললেন। গভীর ভাবে ভাবছেন  তখনও।

আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল ছেলেটা। কাজের মধ্যে ডুবে আছেন ম্যাডাম বুঝতে পেরে কাঁধ ঝাঁকিয়ে মই বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। অনুসরণ করলো ছাত্রীটা।

তখনও গভীরভাবে ভাবছেন রেহানা বেগম।

 

বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। সূর্যটা মুসুরি ডালের রঙ ধরে পশ্চিম আকাশে খাবি  খাচ্ছে । আবীর রঙা আলোতে সব কেমন অচেনা লাগছে। মারাত্নক এক সময়। দিনরাত্রির মাঝখানে সুতোর মত ঝুলে আছে সময়টা। রহস্যময় এই প্রকৃতি। এই সময়টাকে কেন যেন ভয় পান বেলায়েত খান। প্রকৃতির অনেক গহীন গোপন রহস্য ধরা দেয় দেয় করে যেন পালিয়ে যায় এই সময়। মহাজগত কিছু যেন বলতে চায়।  কিন্তু বলে না।

আরেকটা শেয়ালকাঁটা গাছের গোঁড়ায় ছাগলটার গায়ের চামড়া খুঁজে পেলেন দারোগা সাহেব।  বড় একটা পাথরের উপরে দাড়িয়ে  নীচের দিকে  তাকালেন।

লম্বা একটা  মেঠো পথ। এই বিজন পথে কারা যায় আসে ?  এখান থেকে গুহা সিকি মাইল দূর  । তবে হাতেম আলীর খামার বেশি দূর না। মানে ছাগলটা রাতে বের হয়েছিল। দুষ্ট লোকটা  অবলা প্রাণীটা মেরে  অতটা পথ টেনে হেঁচড়ে নিয়ে গুহার সামনে ফেলে রেখেছে ।

 কিন্তু কেন ? উদ্দেশ্য কি ?  

অনেক ভেবেও কোন কূলকিনারা পেলেন না।

শেষে হাঁটতে শুরু করলেন। গুহার কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে  সন্ধ্যা গড়িয়ে অন্ধকার হয়ে যাবে। জিপ ওখানেই রেখে এসেছেন।

গুহার ভেতরে কাজ করছেন রেহানা। চার্জ লাইট আছে। সমস্যা হচ্ছে না। ভাবছেন গভীর ভাবে। বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে। পরোয়া করছেন না। মেজাজ খিঁচে গেছে তার। অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হল । মনে হচ্ছে আড়াল থেকে কেউ লক্ষ্য রাখছে তার উপর। আচ্ছা, চোর তাহলে আজই ধরা পড়বে ?

 

বেলায়েত খান যখন গুহার কাছে  পৌছলেন তখন সন্ধ্যা । বেশ অন্ধকার। অবাক হয়ে দেখলেন জায়গাটা বড্ড বেশি নিঝুম। কোন জোনাকি পোকার আলো বা ঝিঝি পোকার ডাক নেই। প্রত্নতাত্ত্বিক দলটা চলে গেছে। গুহার চারিদিকে বড় বড় কয়েকটা   স্পট  লাইট জ্বলছে। ব্যাটারির সাহায়্যে।   আজ বিকেলে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। নীচেও থাকার কথা। কি মনে করে মই বেয়ে গুহায় নেমে এলেন তিনি।

হ্যালো, নীচে কেউ আছেন নাকি ?নামতে নামতে  হাঁক  দিলেন বেলায়েত খান।

জবাব দিল না কেউ।  নীচে একটা মাত্র চার্জ লাইট জ্বলছে। এত বড় গুহাটা এই সামান্য আলোতে আলোকিত হবার প্রশ্ন আসে না। নিজের টর্চ লাইট জ্বেলে নিলেন তিনি।  আচমকা মনে হল এক কোনে কে যেন  ঘাপটি মেরে  আছে।

কে ওখানে ?’   পাই করে ঘুরে টর্চের আলো ফেললেন। অহ,  আমাকে বেশ ভয় পাইয়ে দিয়েছেন আপনি।ঢোক গিলে বললেন বেলায়েত খান।

গুহার এক কোনে দাড়িয়ে আছেন রেহানা।

আপনি এখনও এখানে ?নিজেকে সামলে নিয়ে আবার প্রশ্ন করলেন দারোগা।

আপনি ফিরে এলেন কি মনে করে ?ঠাণ্ডা গলায়  প্রশ্ন করলেন রেহানা।  চোখে সন্দেহ।

চারদিকটা তল্লাশি করলাম। তেমন কিছু পেলাম না।  সকালে থানায় খোঁজ নিয়েছি। এই এলাকায় প্রায়ই নাকি   জানোয়ার মারা যায়। বা হারায় । পুরো জায়গাটার কেন্দ্র হচ্ছে এই গুহা ।সারা বিকেল খোঁজ করে ফিরে যাচ্ছিলাম মনে হল দেখে যাই গুহাটা।

আমি যাইনি কারন আমি বিশ্বাস করি রাতে কেউ গুহায় ঢুকে জিনিস নাড়াচাড়া তো করেই দেয়ালের ছবি পর্যন্ত নতুন করে আঁকে। প্রতি রাতেই অমনটা হয়। ’  চিন্তিত সুরে বললেন  রেহানা।

অ্যাঁ ?পুরোপুরি বেকুব হয়ে গেলেন  বেলায়েত খান।

দাঁড়ান,  দেখাচ্ছি।’  

গুহার এক কোণেই কাঠের ফোলডিঙ করা  একটা   ক্যাম্পিং টেবিল আছে। ওটার উপর দরকারি অনেক কিছু রাখা ।  প্রত্নতাত্ত্বিক কাজে যা যা লাগে,  সব । ওখান থেকে কয়েকটা ছবি তুলে আনলেন রেহানা।এই দেখুন এই ছবিটা। গত তিন দিন আগে তোলা। আর আজকেরটাও   দেখুন।

ভাল করে ছবি আর দেয়ালে আঁকা গুহাচিত্রটা দেখলেন বেলায়েত খান।

ছবিতে দেখুন। গোলকের ডানে শিকারি দাড়িয়ে আছে। হাতের বর্শা উপর দিকে তোলা । এখন দেয়ালে  দেখুন গোলকের বামে শিকারি দাড়িয়ে আছে। হাতের বর্শা নীচে নামানো।ব্যাখ্যা করলেন রেহানা।

বলার দরকার ছিল না।

নিজের চোখেই দেখতে পারছেন বেলায়েত খান।

অদ্ভুত ব্যাপার। আমি নিশ্চিত কেউ ফাজলামো করছে।মাথা ঝাঁকালেন দারোগা।

‘  গুহাচিত্রের দাম টাকা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।  চোখ বুজে পাঁচ হাজার বছর আগের   এই গুহাটা। বা ছবিগুলো।  আরও পুরানো হতে পারে। সেই কত আগে কোন হারিয়ে যাওয়া আদিম  মানুষদের কেউ ছিল এই গুহার ।  আর কোন  মূর্খ নষ্ট করছে এই অমুল্য সম্পদ।

আপনি চাইলে কাল থেকে আমি গুহার বাইরে দুইজন কনস্টেবল বসাতে পারি।’  

কিন্তু আজ রাতে ?

উহু,  রাতের বেলায় আমি অন্তত থাকতে পারব না। আমি আসলে রাত জাগতে পারি না। আর এখনই অতিরিক্ত কনস্টেবল থানায় পাব না।

  গুহাতে পাহারা দিতে আমি থাকব।

কি মুশকিল।

‘   কিছু একটা হয় এই গুহায়। তাও শুধু রাতের বেলা।   দিনের বেলায়  লোকজন থাকে।কিন্তু রাতে কেউ গুহায় আসে।    আপনি চলে যান। আমি তাবু থেকে  কম্বল নিয়ে এসেছি। কোনে চেয়ারে বসে বই পড়ে কাটিয়ে দেব।

কিছু বলার জন্য মুখ খুলছিলেন বেলায়েত খান।

যান বাড়িতে গিয়ে ঘুম দিন । কাল সকালে দেখা হবে। গুড নাইট।হাত তুলে টাটা দিলেন রেহানা।

বোকার মত কিছুক্ষণ দাড়িয়ে রইলেন বেলায়েত খান। তারপর মই বেয়ে চলে  এলেন বাইরে। নাহ , মহিলা ভীষণ কড়া।

সোজা গিয়ে বসলেন জিপে। চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট দেয়ার পর মনে মনে  নিজেকেই গালি দিলেন কয়েকটা। স্টার্ট বন্ধ করে গাড়ির ভেতরে ঘুমানোর আয়োজন করলেন।

রাতটা এখানেই কাটাবেন তিনি।

বাড়িতে গিয়ে ঘুমাবেন আর ভদ্রমহিলা একা এই গুহায় থাকবে ? অসম্ভব !

রাত গড়িয়ে চলল।

হিমহিম হাওয়া বইতে লাগল । শুকনো পাতা নূপুর পড়ে খসখস শব্দে দৌড়ে  চলল এদিক সেদিক। চুমকির মত তারা উঠলো আকাশ ভর্তি করে।

গুহার ভেতরে ক্যাম্পবেড নামিয়েছিলেন একটা। সেটার মধ্যে শুয়ে ছিলেন রেহানা। হাতে বই। ঘুমিয়ে পড়েছিলেন নিজের বেখেয়ালে। হালকা কিসের শব্দ কানে যেতেই জেগে গেলেন। মানুষের পায়ের শব্দ। দৌড়ে যাচ্ছে কেউ। সেই সঙ্গে পশুর  গর্জন যেন। গুহার ভেতরে ? কি করে সম্ভব ?

লাফ দিয়ে উঠে  দাঁড়ালেন তিনি।

 বিছানার পাশেরই জঙ্গল বুট। দ্রুত পায়ে গলিয়ে কি মনে করে দৌড়ে চলে গেলেন দেয়ালের কাছে।   চার্জলাইটের আলোয় যথেষ্ট পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। তারপরও আলোটা তুলে নিয়ে দেয়ালের উপর ফেললেন। দেয়ালে বাইসনটা দেখা যাচ্ছে। পাশের দেয়ালে গোলকটা আঁকা। কিন্তু শিকারি নেই। কেউ মুছে ফেলেছে।

কিন্তু তাই বা হয় কেমন করে ?

আবার গর্জন শুনতে পেলেন। আদিম কোন জন্তু।

কে ওখানে ?চিৎকার করে উঠলেন রেহানা।  কে ?

তার মনে  হল কতগুলো ছায়া ছায়া শরীর  দৌড়ে  বেড়াচ্ছে গুহার চারিদিকে। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে চাইছে ওরা। আতংকে হিম হয়ে গেল অধ্যাপিকার  শরীর।  

দৌড়ে চলে গেলেন মইয়ের কাছে। ওটা বেয়ে বাইরে চলে গেলেই মুক্ত পৃথিবী। ভয়  পাচ্ছেন তিনি। ভীষণ ভয়। এই ভয়ের ব্যাখা তিনি জানেন। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করবে না।

গাড়ির ভেতরে আরামদায়ক পরিবেশ পেয়ে  ঘুমিয়ে পড়ছিলেন বেলায়েত খান।

চিৎকার শুনে এক  পলকেই উঠে  এলেন  ঘুমের  গহীন স্তর থেকে।

রেহানার চিৎকার !

দৌড়ে মই বেয়ে গুহায় নেমে পড়লেন।

ম্যাডাম আপনি ঠিক আছেন তো ?’  চেঁচিয়ে উঠলেন বেলায়েত খান।

চোখ গেল  মেঝেতে।  মইয়ের কাছেই উপুর হয়ে পড়ে আছেন রেহানা । দৌড়ে পালাতে চেয়েছিলেন। পারেননি। পিঠে   গেঁথে আছে প্রাচীন আমলের বর্শা। গাছের শক্ত ডালের আগায় পাথরের শক্ত  ফালি  বেঁধে বানানো । পাথর ঘষে লোহার ফলার মত ধারালো আর  সুচালো করা হয়েছে । মারাত্নক জিনিস  ।কুলকুল করে রক্ত বেরুছে রেহানার শরীর থেকে।

গলার কাছের শিরায় হাত দিয়েই বুঝলেন ,    মারা গেছে বেচারি। ততক্ষণে পিস্তলটা বের হয়ে এসেছে হাতে।

 খুনি ভেতরেই আছে- নিশ্চিত তিনি।

 টর্চ বের করে সতর্ক পায়ে ঘুরতে লাগলেন গুহার চারিদিকে। বেশ বড় গুহাটা। প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি হয়েছে প্রায় পাঁচ শতাংশ  বা তার বেশি  জায়গা জুড়ে। পাথরের বীম থাকায় খানিক গোলকধাঁধার মত লাগছে ।  

হালকা গর্জন শুনতে পেলেন। মানুষ ? নাকি পশু ? কেউ কি দ্রুত দৌড়ে গেল না ? চারিদিকটা ঘুরে ফিরে  এলেন গুহার মুখের কাছে। মইয়ের গোঁড়ায়।

ধাক্কাটা ভালই খেলেন।

রেহানার লাশ নেই।

একদম গায়েব।

পাগলের মত তাকাচ্ছেন চারিদিকে। আচমকা চোখ গেল দেয়ালে। কালো বড় বড় দুটো পিঁপড়া হেঁটে বেড়াচ্ছে  বিবর্ণ  হলদে রঙা দেয়ালে ?

 সতর্ক পায়ে সামনে গেলেন। বোকার মত চেয়ে রইলেন।

 সারাদিনের ধকল আর কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় নিশ্চয়ই আবোল তাবোল দেখছেন তিনি ? অথবা পাগল  হয়ে গেছেন। নিশ্চয়ই তাই হবে।

অসম্ভব ! হতেই পারে না !’  চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি।

দেয়ালের আঁকা ছবিগুলো  পিঁপড়ের মত নড়ছে। একটা শিকারি  হেঁটে যাচ্ছে। টেনে  নিয়ে যাচ্ছে এক মহিলার লাশ। লাশের পিঠে বর্শা। ধিরে ধিরে নড়ছে ছবি।  গোলকের পাশে লাশটা ফেলে দাঁড়ালো শিকারির ছবিটা। আর গোলকের উল্টা দিকে আরও এক গাদা শিকারি পিঁপড়ার মত হেঁটে আসছে। সবার হাতে পুরানো পাথর যুগের অস্ত্র।  

পিছনে শব্দ হতেই চমকে ফিরে তাকালেন তিনি।

কেউ আছে ।

 ঘুরেই  গুলি করলেন। ছায়া ছায়া কেউ পালিয়ে গেল। আবার গুলি করলেন। গুহার দেয়ালেই লাগল।    পাগলের মত গুলি করে চেম্বার খালি করে ফেললেন।   বন্ধ জায়গায় গুলির শব্দ বোমার মত  লাগছে  ।  প্রতিধবনিত   শব্দে কানে তালা লেগে গেছে। একটাও গুলি লাগেনি কোন  প্রতিপক্ষের গায়ে।

বুঝে গেলেন ব্যাপারটা এক লহমায়।

 হাজার বছর আগের  হারিয়ে যাওয়া ছায়া শরীরে  গুলি লাগবে কি করে ?

গুহার এক কোনে এক বালতি জল ছিল। রেহানার দল রেখেছিল। হাত ধোয়া বা  যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করার জন্য। সাথে জুতার ব্রাশের মত বড় শক্ত একটা ব্রাশ।  সেগুলো নিয়ে দেয়ালের সামনে চলে গেলেন বেলায়েত খান। পাগলের মত দেয়ালের ছবি মুছতে লাগলেন ব্রাশ দিয়ে। যত দ্রুত সম্ভব।

 এক এক করে মুছে ফেলছেন সব ছবি। কারন জানেন এই গুহা থেকে আর কখনই বের হতে পারবেন না তিনি। শিকার করে ফেলবে ওরা তাকে ।

তিনি জানেন না  , ঠিক তার পিছনেই দাড়িয়ে আছে বেঁটে কুঁজো মত এক লোক। কপাল বড়, চোয়াল উঁচু।  নিঠুর চোখ।  গলায় পাথরের মালা। শরীর ভর্তি লোম। হাজার হাজার বছর আগের হারিয়ে যাওয়া একজন গুহামানব সে।

 অবাক হয়ে দেখছে দারোগা বেলায়েত খানকে।

 তার নতুন শিকার।

হাতের বর্শা তুলে লক্ষ্যস্থির করলো গুহামানব। ছুড়ে মারলে সোজা গিয়ে লাগবে শিকারের শরীরে।

ঠিক তখনই দেয়ালে আঁকা   শেষ শিকারির ছবিটার গায়ে ব্রাশ ঘষছিলেন বেলায়েত খান। ধিরে ধিরে মুছে গেল শিকারির ছবিটা। আর একই  সময়ে তার পিছনে   দাঁড়ানো গুহামানবের শরীরটা ঝাপসা হতে হতে মিলিয়ে গেল বাতাসে।

পাগলের মত সব ছবি মুছে মই বেয়ে উপরে চলে এলেন বেলায়েত খান। ক্লান্ত।  ঘামে ইউনিফর্ম ভিজে জব জব করছে। খোলা আকাশের নীচে দাঁড়ালেন তিনি। হা করে বড় বড় দম নিচ্ছেন।

উপরে পাকা ব্লু বেরি ফলের মত নীল  আকাশ। দমকা হাওয়া মায়ের হাতের পরশ বুলিয়ে দিল সারা শরীরে।

সময়- ভাবলেন বেলায়েত খান।

 এই গুহামানবরা হাজার হাজার  বছর আগে ছিল।  

 সময় হচ্ছে মহাজগতের সবচেয়ে রহস্যময় জিনিস। কিছুই নাকি হারায় না এই জগতে। সব ফিরে ফিরে আসে।

সব।

  আর সব কিছুই নাকি ঘটে  চলেছে। বারবার। একই কাহিনি।  গোধূলি বেলার মতই বাস্তব আর পরাবাস্তব জগতের মধ্যে একটা দেয়াল আছে। ওখান  দিয়েই অতীত চলে আসে বর্তমানে। বর্তমান চলে যায় অন্য কোথাও।

বড্ড রহস্যময় এই জগত।  

কেউ এর নাগাল পায় না।

কেউ না।

 

  (Paul Chitlik  এর  The Hunters  কাহিনির ছায়া অবলম্বনে )

 

 

 

 

 

  

 

‘   


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...