সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ছায়া নামে চন্দনের বনে

রয়্যাল ব্লু ক্লাব । আজকালকার অকস্মাৎ গজিয়ে উঠা কোন ধনী ব্যক্তি , ব্যাংক লোন গায়েব করে আর মন্ত্রী – সংসদ সদস্য হাতে রেখে ক্লাবটা বানায়নি । অনেক পুরানো ক্লাব। ইংরেজদের আমলের । নাম ধাম আছে। মেম্বার হওয়া কঠিন । চাইলেই হওয়া যায় না। দুষ্ট টাইপের লোকেরা বলে, কুড়ি লক্ষ টাকা নাকি আবেদনপত্রের দাম । সেটা চুকিয়ে সদস্য হবার জন্য উপর মহলের লোক ধরতে হয় । সন্ধ্যার পর কাচের পানপাত্র হাতে , রয়্যাল ক্লাবে বসে থাকাটা অনেকের কাছেই আভিজাত্যের বড় একটা অংশ । সব কথা মাথায় রেখে , ক্লাবের বড় কর্তারা ডিজে পার্টি বা শিশা বারের নামে মাদক চালু করেনি । সপ্তাহে একদিন ক্লাসিক , আর আধুনিক গানের আসর বসায় । লোকজন পছন্দ করে কিনা জানি না। কেউ অবশ্য অভিযোগ করেনি। গত এক বছর ধরে রবিবার সন্ধ্যায় এখানে পপ গান , বা গজল পরিবেশন করে গায়িকা সুমিত্রা । এবং এই ক্লাবের বড় একটা আকর্ষণ হচ্ছে , সুমিত্রা নামের মেয়েটা । গল্পটা সুমিত্রাকে নিয়েই । ক্লাবের পিছনে গ্রিন রুম। সবাই প্রবেশ করতে পারে না। গ্রিনরুমের ভেতরে সুমিত্রার জিনিসপত্র গোছ গাছ করছিল বুড়ি ননীবালা । কী মনে করে সুমিত্রার দামি একটা চাদর গায়ে পেঁচিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখছিল সে । অনেক বয়স ননীবালার । গায়ে ক্লাবের ইউনিফর্ম । উপরে আপ্রন । ওটাতেও ক্লাবের লগো । গ্রিনরুমে পেল্লাই এক আয়না । আয়নার চারিদিকে তামার ফ্রেম । কাঠের দেরাজ ভর্তি চুমকির কাজ করা পোশাক । মখমলের গদিওয়ালা বসার চেয়ার এক হালি । পোড়া মাটির ভাস ভর্তি তাজা ফুল । ভক্তরা দিয়েছে । ছোট একটা কাঠের টেবিলের উপর এলুমিনিয়ামের পিচ্চি বালতি, বরফের জন্য । শাদা একটা বোতল , ভেতরে লিচুর দানার রঙের পানীয় । বোতলের পাশে আনারসের শরীরের মত খাঁজকাটা একটা গ্লাস। বাইরে হাততালির শব্দ শুনতেই গায়ের চাদরটা খুলে দৌড়ে কাঠের দেরাজে রেখে দিল ননীবালা । খাঁজকাটা গ্লাসের মধ্যে বরফ ঢেলে তৈরি হয়ে গেল বুড়ি । গানের শেষে ম্যাডামের গলা শুকিয়ে যায় । পানীয় না পেলে বখশিশ দেবে না । ধরাম করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লো সুমিত্রা । মেয়েটার গলা ভাল । অনেক পুরানো আর হারানো দিনের গজল বেশ গায়। দর্শক শ্রোতা মদিরার পাত্র হাতে কেমন বিবাগী হয়ে গান শোনে । যদিও বাজে ধরনের লোকেরা বলে , উনারা মেয়েটার রুপ সুধা পান করতে যায়। ছি , কী বিচ্ছিরি উপমা , রুপ সুধা ! কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, মেয়েটা একদম বুকে চাক্কু মারা সুন্দরী । লম্বা । বাঙালি মেয়েরা এতটা লম্বা হয় না। বেতের মত ছিপছিপে শরীর । হাসিটা সুন্দর । যতক্ষণ গান গায় ডালিম দানার মত দাঁত দেখাই যায় । পুরুষরা সেই কারনেও কুপোকাত হয়ে যায় । মুখটা লম্বাটে । চোয়ালের দুই হাড় সামান্য উঁচু । কিন্তু অতেও চেহারাটা নষ্ট হয়ে যায়নি। কেমন একটা বুনো ভাব এসে গেছে । মাথা ভর্তি চুল । যত বেশি কালো আবার ততটা বেশি মসৃণ । আর আছে দুই চোখ , দুনিয়ার তাবৎ পুরুষ ঘায়েল করার অস্ত্র । কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছিল সুমিত্রা। লাইন কেটে টেবিলের উপর ফোন রেখে, গ্লাসটা নিল ননীবালার হাত থেকে । নিজেই বোতল খুলে ঢেলে নিল লিচুর দানার রঙের ঘন পানীয় । ' অনুষ্ঠান খুব ভাল হয়েছে । আপনার গলা অসাধারণ ।' চুমকি আর কাচের কাজ করা কোটিটা ম্যাডামের শরীর থেকে খুলতে সাহায়্য করল ননীবালা। এক ঢোকে পানপাত্রের পানীয় শেষ করলো সুমিত্রা । ননীবালার দিকে ফিরে বলল ' তুমি সব সময় বল আমার গলা ভাল। সত্যি সত্যি ? নাকি খুশি করার জন্য বলো ?' ' আপনার গলা আসলেই অপূর্ব । মিথ্যা বলতে যাব কেন ?' সংকুচিত ভাবে জবাব দিল বয়সের ভারে পরাজিত ননীবালা । 'ভাল না ছাই। বখশিশের লোভে বল অমনটা ।' বুড়ি দিশেহারা হয়ে গেল । কি জবাব দেবে ভেবেই পেল না। কিছু বলে সাফাই দিতে যাবে তার আগেই সুমিত্রা বলল , ' আসলে আজ খুব ক্লান্ত । তোমাকেও ক্লান্ত দেখাচ্ছে। বাড়ি চলে যাও । বিশ্রাম নাও গে ।' শূন্য পানপাত্রটা ঘুরিয়ে ভেতরে থাকা বরফের কুচির শব্দ করতে লাগল সে । 'ঠিক আছে ম্যাডাম । আপনি যা বলেন ।' দমে যাওয়া গলা ননীবালার । এপ্রনটা খুলে ভরে নিল কাপড়ের ব্যাগে। তারপর হ্যাঙ্গারে রাখা নিজের বিবর্ণ শাল চাদরটা গায়ে পেঁচিয়ে দরজার সামনে গিয়ে আশা ভরা চোখে চেয়ে বলল , ' যাচ্ছি তবে ম্যাডাম ।' ' যাও ।' বুড়ির দিকে ফিরে জবাব দিল সুমিত্রা। চলে গেল জীর্ণ সেকেলে ননীবালা। মনে কষ্ট পেয়েছে। ম্যাডাম ওকে ভাগিয়ে দিতে চাইছে কেন ? পানপাত্রে আরও সামান্য লিচুর দানার রঙের পানীয় ঢেলে নিল সুমিত্রা। বেশি না , বুড়ো আঙুলের প্রথম কড়ের সমান । চুমুক দিতে দিতে ড্রেসিং টেবিলের সামনের টুলে গিয়ে বসলো । খুলে ফেলল ভারী ভারী কানের দুল দুটো । পান্না রঙা পাথর বসানো দুলগুলো স্টেজের আলোতে সুন্দর দেখায়। কিন্তু খুব ভারী । আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে লাগল। চেহারা না, সম্পদ । না দেখলে বুঝবে কিভাবে, কতটা দিন ওটা দিয়ে চলতে পারবে ? দরজাটা হালকা শব্দে খুলে গেল। কালো ট্রাউজার আর একই রঙের পাতলা কাপড়ের কোট পরা লম্বা মত একজন লোক ভেতরে ঢুকল । পায়ের জুতা একদম নতুন । কিন্তু এই জুতা সুমিত্রা চেনে। এক জন পছন্দ করতো, অমন জুতা । মচমচ শব্দ করে লোকটা ওর পিছনে এসে দাঁড়ালো । পানপাত্রটা শক্ত করে ধরে চেয়ারে আরাম করে হেলান দিল সুমিত্রা । অস্বাভাবিক শান্ত গলায় বলল , ' আমি জানতাম তুমি আসবেই জয়ন্ত ।' এইবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখল আগন্তুককে । জয়ন্তের বয়স পয়ত্রিশের সামান্য এদিক সেদিক হবে। বয়সের তুলনায় একটু বেশি পুরাতন হয়ে গেছে মাথার চুল । কপালে ভাঁজ । চেহারায় রুক্ষ নির্দয় একটা ভাব। এই ধরনের লোকদের বিশ্বাস করা কঠিন। যা খুশি তা করে ফেলে এরা । ' জেল থেকে চিঠি পাঠানো কঠিন । তারপরও মিয়া সাবদের ঘুষ দিয়ে পাঠিয়েছিলাম ।' ড্রেসিং টেবিলের কয়েকটা সৌরভের শিশি আর প্রসাধনীর কৌটা হাত দিয়ে অনাদরে সরিয়ে জায়গা করে ওখানেই বসলো জয়ন্ত স্যান্নাল । 'তোমার ঐ হুমকি ভরা চিঠি পেয়েছিলাম ।' জবাব দিল সুমিত্রা। 'হুমকি ? মোটেই না। লাভ লেটার বলতে পার।' জবাব দিল না সুমিত্রা । উঠে চলে গেল কাপড় বদলানোর স্ট্যান্ডের দিকে। অ্যালুমিনিয়াম আর কাপড়ের তৈরি তিন পাল্লা দরজার মত। ভাঁজ করে এক পাল্লা বানিয়ে রাখা যায় । এটার পিছনে দাঁড়ালে ওর মাথা শুধু নজরে আসবে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাক্তির । কামিজের জিপার খুলতে লাগল সুমিত্রা। চেয়ে আছে জয়ন্ত । মাখন রঙা পিঠ । আগের মতই লোভনীয় । আজও । ' সব সময় বেশি চিন্তা কর তুমি ।' ধারালো গলায় বলল জয়ন্ত । ' এত ভালবাসার পরও বাচ্চা নিতে চাওনি । বলতে , ছেলে বড় হয়ে যদি জানে বাপ অপরাধী , তখন কি হবে ? জেলে প্রথম দিকে হাতে গোনা মাত্র কয়েকবার গেছ আমাকে দেখতে । তারপর একদম গায়েব হয়ে গেলে।' ‘ মেয়েরা ভুল করতেই পারে। সহজাত ব্যাপার।' পোশাক বদলাতে বদলাতেই জবাব দিল সুমিত্রা। সাবধানে কথার চাল দিচ্ছে। সন্দেহ নেই জয়ন্তের ফিরে আসা ওর নিস্তরঙ্গ জীবনে ভাল কিছু বয়ে আনবে না। এত বছর ধরে যে নিরাপদ জীবন বানিয়ে ফেলেছে সেটা ধসে যাবে। সব কিছুই এখন হুমকির মধ্যে । যা খুশি তা হয়ে যেতে পারে । টেবিলের উপর থেকে কাচের বোতলটা তুলে নিল জয়ন্ত । ছিপি খুলে ভেতরের সোনালী গরলের সৌরভ নাক দিয়ে টেনে নিল । ঘ্রানে বুঝতে পারল অনেক দামি জিনিস। 'জন্মদিনের শুভেচ্ছা বা অমন একটা ছোট খাট উপলক্ষে চিঠি বা ফোন দিতে পারতে। দেখা না করলেও চলতো । সাত বছর অনেক লম্বা সময় । নয় কি ?' ততক্ষণে পোশাক পাল্টে শাড়ি ব্লাউজ পরে একদম ঘরোয়া মেয়ে হয়ে গেছে সুমিত্রা। খানিক আগের চটকদার সেই মেয়েটা বলে মনে হচ্ছেই না। টেবিলের উপর থেকে হ্যান্ডব্যাগটা নিতে গেল । ওর বাহু খপ করে ধরে মুখমুখি দাড় করাল জয়ন্ত । হিসশিসে গলায় বলল , ' তুমি যে এত ভাল গান বাজনা কর, সেটা কিন্তু জানতাম না। একেবারে কোকিল । ' ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো সুমিত্রা , ' কি চাও তুমি ?' 'সাত বছর । দীর্ঘ সাতটা শূন্য অন্ধকার বছর । এখন হারামি বলে কি চাও তুমি ? অ্যাঁ ?' খেঁকিয়ে উঠলো জয়ন্ত । ঝটকা মেরে নিজেকে ছড়িয়ে দূরে চলে গেল সুমিত্রা । এক হাত দিয়ে বাহুর জায়গাটা ঢলতে লাগল। লাল হয়ে গেছে । ব্যাথা পেয়েছে ভালই । শয়তানের মত জোর জয়ন্তের গায়ে। তারপরও দৌড়ে ভেগে যাবে সেই সাহস পেল না। এই লোক সব করতে পারে। এঁকে চটিয়ে বিপদ বাড়ানোর মানে নেই। বিপদ এমনিতেই হবে। বসে পড়লো ধপাস করে চেয়ারের উপর। ' আমি অপেক্ষায় থাকতাম।' বলতে লাগল জয়ন্ত স্যান্নাল । গলায় চাপা ক্রোধ । ' দিনের পর দিন অপেক্ষায় থাকতাম । ভাবতাম, একদিন ঠিকই আসবে দেখা করতে । আমার উকিলের সাথে দেখা করবে। চেষ্টা করবে আমাকে জামিনে বের করে আনতে । কিন্তু সবই আকাশ কুসুম। হারিয়ে গেলে একদম । কিন্তু না। নিয়তি । জেলে খবরের কাগজ পেতাম, নিয়মিত। একদিন তোমার ছবি পেলাম । বাপরে । মানুষ কত বদলায় । অ্যাঁ ? ভাবা যায় ? প্রথম তো চিনতেই পারিনি । চুলের কাটিং বদলে ফেলেছ । দামি কাপড় । কি সব চুনি পান্না মানিক রতন ওয়ালা গহনা । কে জানতো , নাম পালটিয়ে ক্লাবে গান গায় আমার সেই ময়না পাখি ? কি নাম রেখেছ ? কুমকুম । হা হাহা কি খাসা নাম রে বাবা। কুমকুম হে হে হে । ' খ্যাক খ্যাক করে বিচ্ছিরি আর বাজে ভঙ্গিতে হাসল জয়ন্ত স্যান্নাল । উঠে গিয়ে বোতল থেকে লিচুর দানা রঙের পানীয় ঢেলে নিল গ্লাসে। মুড এসে গেছে ওর। ' তো আরও খবর পেলাম ঢাকার কোন এক ক্লাবে গান গাইতে গাইতেই সেখানের ব্যান্ডদলের ভোকালিসট না কাকে যেন বিয়ে করলে । কি হয়েছিল সেই গায়কের ? মদে ডুবে থাকতো রাতদিন । মানে খবরের কাগজে অমনই লিখল তো। শেষে নাকি আত্নহত্যা করেছে । কি সাঙ্ঘাতিক । ভাবা যায় ? উম্ম ? কাগজে তোমার ভগ্নহৃদয়ের কথা ছাপা হল ভাল করেই । সাংবাদিকরা দুঃখে মারা যাবে যেন । ' গ্লাসে চুমুক দিয়ে কি যেন মনে পড়েছে অমন একটা ভঙ্গী করে বলল জয়ন্ত , ' আরে এইসব তো তোমার প্রথম স্বামীর কথা বলছিলাম । যে তোমাকে ক্লাবে গান গাইবার সুযোগ দিয়ে, অভিজাত সমাজের সাথে মিশিয়ে মরে গেল । তোমার শূন্য হৃদয় পূর্ণ করতে কত মানুষ এলো তোমাকে আপন করতে । প্রকৃতির নিয়ম। শূন্য জায়গা নাকি কোন ভাবেই শূন্য থাকে না। এইবার এক বুড়োকে বিয়ে করলে । অনেক বুড়ো । তিনটে তেলের পাম্প , দুটো গার্মেন্টস আর কয়েকটা বাড়ি থাকতে হলে যতটা বুড়ো হতে হয় তেমন ধামরা বুড়ো আর কি । হে হে ।' মোষের শিঙের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল সুমিত্রা । শুনছিল জয়ন্ত স্যান্নালের সংলাপ । চিরুনিটা শব্দ করে ফেলে দিল ড্রেসিং টেবিলের উপর , ' এইসব অকেজো বেহুদা প্যাচাল পেরে আমার কানের পোকা বের করার জন্য এসেছ নাকি ?' খ্যাক খ্যাক করে হাসল জয়ন্ত স্যান্নাল , ' সত্য সব সময়ই তেতো । উচিৎ কথার ফ্রাইড রাইস নাই। তোমার কি মনে হয় ? তোমাকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য এসেছি ?' 'চেষ্টা করলেও পারবে না। তেমন কোন প্রমাণ নেই তোমার হাতে ।' ‘ তাই নাকি ?' শয়তানের মত মুখভঙ্গি করলো জয়ন্ত । ' কিন্তু কথায় তো বলে পুরানো পাপ একশো হাত কাঁদার তলা থেকেও গন্ধ ছড়ায় । তুমি নিশ্চয়ই সেই প্রবাদটা জানো, একটা কাগজ হাজার টুকরো করে ফেলে দিলেও কোথাও না কোথাও একটা টুকরো থেকে যায়। খুঁজলেই পাওয়া যায় সেটা ।' জবাব দিল না সুমিত্রা। সময় কত বদলে গেছে। অথচ এই লোকটাকেই এক সময় ভালবাসত সে। নড়ে বসতে যাবে কিভাবে যেন ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে কানের দুলের একটা পড়ে গেল কার্পেটের উপর। উঠিয়ে আনার আগেই জয়ন্ত ঝুঁকে পরে হাতে তুলে নিল । পাক্কা জহুরীর মত দেখলো ,' এমিটিশনের বলে তো মনে হচ্ছে না। একদম আসল জিনিস। পাম্প দিয়ে না জানি কত টাকা খসিয়েছ সেই পেট্রোল পাম্পওয়ালা বুড়োর কাছ থেকে । অ্যাঁ ?' খানিক চিন্তার ভান করে বলল , ' অমন কিছু হীরা চুনি পেলে ভাল হত। জিনিসপত্রের যেই দাম । গত সাত বছরে সব কিছুর দাম বেড়ে প্রায় চারগুণ হয়ে গেছে ।' 'কি রকম দাম চাও তুমি ?' সাবধানে কথার চাল দিল সুমিত্রা । যে করেই হোক এই দুষ্টগ্রহের হাত থেকে মুক্তি পেতে হবে। সামনে ঘনিয়ে এলো জয়ন্ত । আলতো করে কানের দুলটা পড়িয়ে দিল সুমিত্রার কানে। অনেকগুলো বছর আগে যেমন করতো । ওর কানের লতির উপর দুর্বল ছিল জয়ন্ত । মনে আছে ? মনে থাকে ? আলতো করে ঘাড়ে হাত দিল জয়ন্ত । তারপর চুলের মুঠি খপ করে ধরে মুখটা সামনে এনে হিসশিস করে বলল , ' সাত বছর। ভাবা যায় ? রোজ গভীর রাতে কারাগারের মধ্যে ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠেছি আমি। রোজ রাতে। ঘুম ভাংলেই মনে পড়তো তোমার কথা । সব কিছু করেছি তোমার জন্য । কিন্তু তুমি একদম হাপিস হয়ে গেছ । নিয়মিত দেখা তো দূরের কথা , একদম বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে আইডেনটি পর্যন্ত গায়েব করে ফেলেছ। অথচ একবার হলেও আমার কথা ভাবা উচিৎ ছিল । আমাদের দিনগুলো কত সুন্দর ছিল । তাই নয় কি ? মনে পড়ে পাষাণী ? ' জোর করে ঝটকা মেরে চুল ছড়িয়ে নিল সুমিত্রা। ব্যাথায় চোখে জল এসে গেছে । ঘাড়ের কাছটা ডলতে ডলতে বলল , ' অনেক আগেই সব কিছু ভুলে গেছি আমি। বলতে পার ভুলে যেতে বাধ্য হয়েছি ।' সামান্য সময় চুপ করে রইল জয়ন্ত । চোখ বুজে ফেলল কেমন একটা অজানা আবেগে । শেষে চোখ মেলে বলল , ' কিন্তু আমি কিছুই ভুলতে পারি নি । আর এমন হবার কথাও ছিল না।ছিল কি ? তোমার সব দোষ নিজেই যুক্তি দিয়ে মাফ করে দিয়েছি । আমি জেলে , তখনই তুমি আমার জমানো টাকা নিয়ে পালিয়ে গেলে , সেই খবরটা পেয়েও আমি কষ্ট পাইনি । নিজেকেই যুক্তি দেখিয়েছি, কঠিন এই শহরে একটা মেয়ে টিকবে কেমন করে ? আরও ভেবেছি সামান্য এই টাকায় মেয়েটা কতদিন চলবে ?' 'একা একটা মেয়ে এই শহরে থাকতে পারে না।' উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হ্যাঙ্গার থেকে পশমি কাপড়ের লম্বা লেডিস কোটটা গায়ে চাপাতে চাপাতে বলল সুমিত্রা । ' অনন্ত কাল একটা মেয়ে অপেক্ষা করতে পারে না। ওর বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হয়। এটা সাদা কালোর আমলের বাংলা সিনেমার যুগ না।' ' অথচ অমন হবার কথা ছিল না।' শান্ত সামুরাই তলোয়ারের মত ধারালো গলা জয়ন্তের । ' যদি অপেক্ষায় থাকতে ভাল লাগত আমার। নতুন করে শুরু করতে পারতাম জীবন । কত কিছুই তো হয় জীবনে।' ঘামছে সুমিত্রা । ' এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি ।' বলল । ‘ ঠিক আমরা সব নতুন করে আবার শুরু করতে পারি । নাকি ?' ' কত টাকা চাও তুমি ?' কাজের কথায় চলে গেল সুমিত্রা। পুরানো দিনের লাভ স্টোরি মার্কা বইয়ের মত প্রেমালাপ করায় সময় , ইচ্ছা কোনটাই নেই ওর । সময় গড়িয়ে যাচ্ছে । ক্লাবের কর্তাদের মধ্যে যে কেউ হুট করে চলে আসতে পারে গ্রিন রুমে। তখন মস্ত নটখট শুরু হয়ে যাবে ? কে এই লোক সেটার জবাব দিতেই জান প্রাণ ঘেমে শেষ হয়ে যাবে। বের হয়ে আসবে ওর অতীত । তখন ? সামনে চলে এলো জয়ন্ত । ' তুমিই ছিলে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ । মনে রেখে সাত বছর কত কিছু থেকে বঞ্চিত হয়েছি আমি । সাত বছর ।' ঢোক গিলে শক্ত গলায় সুমিত্রা বলল , ' কত টাকা পেলে দূরে চলে যাবে ? ' ' পরিমাণ লেখার জন্য চেক বই লাগবে । আছে তোমার ?' ব্যবসায়িক হাব ভাব জয়ন্তের মধ্যে । ' চলো গাড়িতে । গ্রিন রুমে কথা বলা ঠিক না। ' কথা শেষ করে দরজা খুলে সাবধানে বাইরে উঁকি দিল সুমিত্রা। করিডোর খালি । শেষ মাথা থেকে বেয়ারা , আর্দালিদের কথা বার্তা ভেসে আসছে । এখান দিয়ে বের হলে ক্লাবের পিছনের রাস্তা দিয়ে সোজা চলে যাওয়া যাবে । লোকের চোখে পড়বে না। সতর্ক ভাবে করিডোরে চলে এলো সুমিত্রা। ওকে ছায়ার মত অনুসরণ করলো জয়ন্ত স্যান্নাল । করিডোরের উল্টা দিক দিয়ে বাইরে চলে এলো দুইজনে । বাইরে অন্ধকার। ছায়া ছায়া জায়গা । এক সারি নানান সাইজের , হরেক ডিজাইনের গাড়ি পার্ক করা। বড় বড় কয়েকটা ছাতিম গাছ, জায়গাটাকে শুনশান বানিয়ে ফেলছে। দূরে একটা ল্যাম্পপোস্ট , খোসা ছড়ানো আইরিশ আলুর রঙের মত আলো ছড়াচ্ছে । একটা গাড়ির সামনে দাঁড়ালো সুমিত্রা । ‘ ড্রাইভার নেই ?' সকৌতুকে জানতে চাইল জয়ন্ত স্যান্নাল । ' খুব দামি গাড়ি না দেখছি। পুরানো মডেলের ।' ' কাজ চলে যায় ।' চাবি দিয়ে লক খুলতেই জয়ন্ত দরজার পাল্লা খুলে দাঁড়িয়ে রইল বাটলারের ভঙ্গিতে । মেয়েটা ড্রাইভিং সিটে বসতেই নিজেও ঘুরে উল্টা দিকের দরজা খুলে ভেতরে চলে এলো। ' তোমার কি মনে আছে একবার আমরা বেগমগঞ্জের ...।' কথা শুরু করতে চাইল জয়ন্ত। ' আমি কিছুই মনে করতে চাই না।' খেঁকিয়ে উঠলো সুমিত্রা। তারপর চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট দিল । গাড়ি ঘুরিয়ে ক্লাবের পিছনে চলে এলো ওরা । লোহার তাগড়াই ফটকের সামনে । পিছনের ফটকের দারোয়ান এত সতর্ক নয় । মোবাইল টিপে গেইম খেলছিল । সালামের মত একটা ভঙ্গী করে , ভাল মত না দেখেই গেইট খুলে দিল । বাড়তি সতর্কটা হিসাবে জয়ন্ত এক হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে অন্য দিকে তাকিয়ে রাতের আকাশের রঙ দেখার ভান করছিল । গাড়ি গিয়ে উঠলো বড় রাস্তায় । চলতে লাগল । কোথায় , সেটা জয়ন্ত জানে না। এই শহরে নতুন সে। রাতের পথঘাট চেনে না। হাত বাড়িয়ে গাড়ির মিউজিক সেটটা অন করতেই গান বেজে উঠলো। কপাল আর কাকে বলে , পুরানো দিনের গান । ‘ মনে আছে গানটা ? খুশি খুশি গলায় বলল জয়ন্ত । যেন মস্ত কোন খুশির খবর । বিরাট কিছু। ' আমরা যখন একে অপরকে চিনছি, তখনকার হিট গান। আসলেই পুরানো গান সব সময় সেরা। পুরানো টিউন সব সময় স্মৃতি জাগিয়ে তোলে । কথায় বলে না পুরানো গান, পুরানো মদ, পুরানো প্রেম সব সময় সেরা। যাচ্ছ কোথায় সেটা তো বলবে ?' ' তুমিই বল, কোথায় যাবে ।' জবাব দিল সুমিত্রা। ফিরে চাইল জয়ন্ত । গলার স্বর হারানো দিনের সুমিত্রার মত। এইভাবেই তো কথা বলতো মেয়েটা । তাই না ? ' কিন্তু তোমার পেট্রোলওয়ালা স্বামী ? দেরিতে ফিরলে গৃহস্থালি বা গৃহপালিত ঝামেলা করবে না ?' আগ্রহের সাথে সামনে ঝুঁকে এলো জয়ন্ত । ' উনি ব্যবসায়িক কাজে শহরের বাইরে গেছে । ফিরবে দুই তিন দিন পর।' ' বাড়ির চাকর বাকর , দারোয়ান ।' ' সন্ধ্যার পর চাকর বাকর থাকে না। দারোয়ানকে ম্যানেজ করতে পারব ।' 'শুনেই ভাল লাগছে। বেশ আরামদায়ক প্রস্তাব ।' গা ছড়িয়ে বসলো জয়ন্ত স্যান্নাল । ‘ মাঝখানে একটা পেট্রোল পাম্প আছে। থেমে তেল ভরে নেব গাড়িতে । কিছু খাবার কেনা যাবে,। বলল সুমিত্রা । কিছু বলল না জয়ন্ত । গাড়ি চলছে। শীতের রাত। লোকজন কমে গেছে রাস্তায় । একদম হতভাগা ধরনের মানুষগুলো ফুটপাথে ঘুমানোর আয়োজন করছে। পৌষ মাস । কুয়াশা পড়েনি। কিন্তু রাস্তায় ধূলা । চোখে কুয়াশার মত বিভ্রম দেয় । কী মনে করে গাড়ির জানালার কাচ সামান্য নামিয়েছে জয়ন্ত । হিম হিম হাওয়া এলো মেলো করে দিচ্ছে ওর চুল । শীতের আমেজটা উপভোগ করছে । খানিক চলতেই হাইওয়ে পড়লো । আরও নিঝুম । দেখা গেল দূর থেকে, পেট্রোলপাম্পটা । লাল নীল বাতি জ্বলছে । তারপরও ততবেশি আলোকিত এলাকা না। চটপটে সুদর্শন এক তরুণ, তেল ভরে দিচ্ছে তেষ্টায় কাতর গাড়ির শূন্য ট্যাংকিতে । সামনের গাড়িটা চলে যেতেই সেই জায়গায় থামল সুমিত্রার গাড়ি। ' ফুল ট্যাঙ্ক ম্যাডাম ?' বিনয়ের সাথে জবাব দিল চটপটে তরুণ । সুমিত্রা হ্যাঁ সূচক মাথা ঝাঁকাতেই কাজে লেগে গেল চটপটে । দরজা খুলে বাইরে বের হবার উপক্রম করতেই ওর কোটের হাতা ধরে বাঁধা দিল সুমিত্রা , ' এখানে নামছ কেন ?' ' সেটা জেনে করবে কি ?' খেঁকিয়ে উঠলো জয়ন্ত । ' আমাকে বাঁধা দেয়ার তুমি কে ? সাত বছর কোন খোঁজ না রেখে এখন এসেছ অধিকার ফলাতে ? অ্যা ?' আরও কি সব বলতো ক্ষ্যাপা জয়ন্ত । কিন্তু চটপটে তরুণ গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে লম্বা লাঠিওয়ালা ন্যাকড়া আর সাবান জল দিয়ে উইন্ডশীল্ড পরিষ্কার করা শুরু করেছে । গলার পর্দা কয়েক ধাপ নামিয়ে ফেলল জয়ন্ত , ‘ সাত বছর । সুস্থ কোন মানুষ হলে তোমাকে ঘৃণা করতো। আমিও করি। সামান্য নীতিবোধ থাকলে তুমি অনুতপ্ত হতে । ভাবতে বাধ্য হতে।' 'বার বার ফাটা রেকর্ডের একই কথা বলছ কেন ? এইসব বলার জন্যই এসেছ ?' নরম গলায় বলল সুমিত্রা। 'না, আসলে বলতে এসেছি তোমাকে ঘৃণা করি । তোমাকে দরকার নেই আমার। আমি জয়ন্ত স্যান্নাল । আজ ও বাতিল হয়ে যাইনি।' দরজা খুলে বের হবার চেষ্টা করলো আরেকবার। আগের মতই বাঁধা দিল সুমিত্রা, 'এখানে নেমো না প্লিজ।' গলায় অনুনয় । যেন মস্ত কোন একটা ষড়যন্ত্র ধরে ফেলেছে অমন ভাবে বলল জয়ন্ত , ' ও আচ্ছা , বুঝেছি । ঘন ঘন এই জায়গায় আসো মনে হয় ? ভক্তরা চিনে ফেলবে তাই না ? হে হে। ' ' হ্যাঁ , ঠিকই ধরেছ ।' খানিক কুণ্ঠিত সুর সুমিতার গলায় । ' বাহ , মাথাটা আগের মতই আছে।' গ্যাল ঘ্যালে ভাবে হাসল জয়ন্ত । ' বাইরে উজ্জল আলো, গাড়ি থেকে বের হলে লোকে দেখে ফেলবে আমাকে । হয়তো এখানে সিসি ক্যামেরাও আছে । পরদিন গসিপ ছাড়াতে পারে তাই না। সত্যি, কে বলবে , অতীতে আমার করা সব অপরাধের নীল নকশা , প্ল্যান পরিকল্পনা সব তুমি করতে ? শুধু রুপ না ঘিলু ও আছে তোমার । এই জন্য আমি ক্লাবের দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে ছিলাম । আশা করি ওখানেও কেউ আমাকে দেখেনি ।' 'ঠিকই বলেছ ।' 'ভাল তো।' আবার হাসল জয়ন্ত । ' কিন্তু মনে রেখো সব ঘুঘু একদিন ফাঁদে পড়ে।' হাত বাড়িয়ে চাপ দিয়ে গাড়ির ড্যাশ বোর্ড খুলে ফেলল সুমিত্রা। ভেতরে অন্ধকার থাকায় পিস্তলটা নজরে পড়লো না জয়ন্তের । পাশেই ছিল ক্রেডিট কার্ড হোল্ডার। সেখান থেকে একটা কার্ড বের করে চটপটে তরুণের হাতে তুলে দিল সুমিত্রা । ধন্যবাদ জানিয়ে আপিসরুমের দিকে চলে গেল চটপটে। মাথা নিচু করতেই ড্যাশবোর্ডে রাখা পিস্তলটার দিকে নজর পড়লো জয়ন্তের । চোখের তারা বড় বড় করে উদ্ভট কোন জিনিস দেখছে অমন ভাবে চেয়ে রইল । আড়চোখে জয়ন্তের চেহারার রূপান্তর দেখছিল সুমিত্রা । মদির গলায় বলল , ' নাও জয়ন্ত । তোমার খেলনা।' ‘ আমার পিস্তল।' কাঁপা কাঁপা গলা জয়ন্তের । আবেগে কেঁপে গেছে গালের পেশি । মোহগ্রস্থের মত হাত বাড়িয়ে তুলে নিল ঠাণ্ডা ধাতব জিনিসটা । ' আমার সেই পিস্তল । তুমি যত্ন করে রেখে দিয়েছ ?' কথা বলতে পারছে না জয়ন্ত । এই সেই পিস্তল। ওর প্রিয় খেলনা। অপরাধ জীবনে কত অস্ত্র ব্যবহার করেছে । কিন্তু এটা ছিল ওর সত্ত্বার মত । আন্ডারগ্রাউনডের সবাই বলতো এই জিনিসটা শুধু ওর হাতেই মানায় । লক্ষ্যভেদী শুটার ছিল জয়ন্ত । পুলিশ পর্যন্ত ভয় পেত । ‘ নাহ , আমি আর এইসব হাতে তুলে নিতে চাই না।' মাথা ঝাকিয়ে সব ভাবাবেগ দূর করে দিল জয়ন্ত । তখনই জুতার শব্দ করে ফিরে আসতে লাগল পেট্রল পাম্পের চট পটে যুবকটা । শব্দ শুনেই ড্যাশবোর্ডের ভেতরে পিস্তলটা রেখে দিল জয়ন্ত । হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে বাইরের দিকে চেয়ে চুপচাপ বসে রইল । 'এখানে সাইন করতে হবে ম্যাডাম ।' কার্ড ফেরত দিয়ে রিসিটটা একটা পিচবোর্ডের উপর রেখে সামনে বাড়িয়ে দিল যুবক । গাড়ির খোলা জানালার উপর পিচবোর্ডটা রেখে অনেক সময় ধরে সাইন করলো সুমিত্রা। যুবক বাইরে দাঁড়িয়ে দুই হাতের তালু ঘষে ঘষে গরম করার চেষ্টা করছে। মাথায় কোম্পানির টুপি । গায়ে চামড়ার জ্যাকেট । রিসিট সহ বোর্ড ফেরত দিয়ে অভিযোগ করলো সুমিত্রা , ' কী ফালতু কলম দিয়েছেন। কালি জমে গেছে। আটকে আটকে লেখা হয়। দেখেন তো লেখাটা বোঝেন কি না ?' ' হ্যাঁ , পারব ম্যাডাম।' অমায়িক একটা ভাবে বলল যুবক । রিসিট সহ বোর্ডটা হাতে নিয়েই থমকে গেল। অবাক বিস্ময়ে ফিরে চাইল সুমিত্রার দিকে। দুই চোখে কেমন একটা ইশারা করলো সুমিত্রা। জয়ন্ত জানলো না। খানিক ঝুঁকে গাড়ির ভেতরের দিকে চাইল যুবক । সাবধানী চোখ মুখ । অন্য দিকে চেয়ে আছে জয়ন্ত। ' আচ্ছা নদীর ধারে যে নতুন রেস্তুরেনটটা চালু হয়েছে ওটা কি এখনও খোলা পাব ?' জানতে চাইল সুমিত্রা। ' অ্যাঁ ... হ্যাঁ। নিশ্চয়ই । প্রায় সারা রাত খোলা থাকে।' প্রাণ পণে নিজেকে সামলে বলল চটপটে যুবক । ' যাক বাঁচালেন ভাই।' হাসি হাসি মুখ সুমিত্রার । ' যাব যাব বলেও যাওয়া হয়নি। এখনই যাচ্ছি। শুনেছি ওরা নাকি লাউ দিয়ে চিংড়ি মাছ রান্না করে। খুবই মজার। ধন্যবাদ ।' গাড়ি স্টার্ট দিয়ে হুউস করে চলে গেল ওরা। বোকার মত কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল চটপটে। তারপর জান কলজে হাতে নিয়ে দৌড় দিল আপিস রুমের দিকে। সর্বনাশ হতে যাচ্ছে ! গাড়ি চলছে । দূরে নদী । আলোর মালা ঝুলছে যেন। ' সব সময় শো-তে যাবার আগে তেল ভর্তি করে নেই।' হালকা চালে কথা চালু করলো সুমিত্রা । ' আজ ভুলে গিয়েছিলাম । একটা ভুল সব কিছু গুবলেট করে দেয় ।' 'আমার তো মনে হয় তুমি কেমন যেন নার্ভাস আচরণ করছ ।' সকৌতুক হাসিটা ফেরত এসেছে জয়ন্তর চেহারায় । ' নাকি ভেবেছিলে জেল থেকে বের হয়েই তোমাকে খুন টুন করার চেষ্টা করব ?' ‘ অসম্ভব কি ? চিঠিতে অমন হুমকি দিয়েছিলে না ?' ‘ সেটা কি অস্বাভাবিক কিছু ?' আবার রেগে গেল জয়ন্ত স্যান্নাল। ' অপেক্ষায় ছিলাম না আমি ? সবচেয়ে বড় কথা আমাদের ডিভোর্স হয়নি । কাগজ পত্রে আমরা তো এখনও স্বামী স্ত্রী ।' 'হ্যাঁ, সেই ভয়ও ছিল । কে জানে সেইসব কাগজ নিয়ে যদি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে আস । সেটাও ভাবতাম। বিশেষ করে যখন জানতে পারলাম আজকালের মধ্যেই তুমি জেল থেকে ছাড়া পাবে।' ‘ শোন মেয়ে।' গলা চড়িয়ে ফেলল জয়ন্ত । ' আমি ক্রিমিনাল কিন্তু সস্তা দরের ব্ল্যাকমেইলার না। চাই না তুমি আমার জীবনে আর ফেরত আসো । শুধু মনে হয়েছিল একবার মুখমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করি আমার বিপদে কেন ভেগে গিয়েছিলে । এখন সেই সবেরও ইচ্ছা নেই। নতুন জীবন নিয়ে সুখী থাক তুমি । স্বপ্নের প্রাসাদ ভেঙ্গে তোমাকে রাস্তায় নামানোর কোন ইচ্ছা নেই আমার। এখনই নেমে যাচ্ছি গাড়ি থেকে ।' ' এই আধো অন্ধকারে অচেনা রাস্তায় নামবে কোথায় ? আমাকে বল আমিই তোমাকে নামিয়ে দিচ্ছি ।' 'বাসে করে ফিরব ।' 'এত রাতে এখানে বাস পাবে না।' ' হেঁটে ফিরব । অসুবিধা আছে ?' ‘ বললাম না আমিই তোমাকে নামিয়ে দেব ।' ফিরে চাইল ওর দিকে জয়ন্ত । ' এত দয়া দেখাচ্ছ কেন ? এই একটা লিফট দিলেই সব অপরাধ মাফ হয়ে যাবে তোমার ? ' তোমার যা খুশি ভাবতে পার । ' ' উহ লাগবে না। আমি নেমে যাব । গোল্লায় যাও তুমি ।' আচমকা গাড়ির পিছনে বেশ দূর থেকে উজ্জ্বল লাল আলোর ঝলকানি আর পুলিশের সাইরেন শোনা গেল। চমকে গেল জয়ন্ত ।‘ পুলিশ ? কী ব্যাপার ?' দারুণ খেলা দেখাল সুমিত্রা। বাম হাতে গাড়ি স্টিয়ারিং ধরে ডান হাতে খুলে ফেলল ড্যাশবোর্ড । বের করে আনল পিস্তলটা । সাথে সাথেই ব্রেক কষে থামিয়ে ফেলল গাড়ি। আচমকা ব্রেক কষায় তাল সামলাতে না পেরে উবু হয়ে নাকটা থেতলে ফেলল জয়ন্ত । নিজেকে সামলে যখন সোজা হয়ে বসলো, আবিস্কার করলো ওর দিকেই পিস্তল ধরে আছে সুমিত্রা। ' আমি ভেবেছিলাম পেট্রোল পাম্পেই তুমি আমাকে খুন করার চেষ্টা করবে। কিন্তু বুঝলাম সাত বছর জেলে থেকে তোমার নার্ভ নষ্ট হয়ে গেছে । একদম বাতিল মাল তুমি।' হিস হিস করে বলল সুমিত্রা। দূর আকাশের তারার মত ঝিকিমিকি করছে ওর দুচোখ । ঠোঁটের কোনে বিদ্রুপের হাসি । 'আমি তোমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে আসিনি !' বোকার মত চেয়ে আছে জয়ন্ত স্যান্নাল । এক সময়কার নাম করা ঘাঘু অপরাধী , এখন কেমন উজবুক হয়ে চেয়ে আছে । ' কোন রকম মতলব ছাড়া তুমি এত দূর এসেছ সেটা আমি বিশ্বাস করি না। মনে মনে তৈরি ছিলাম আমি। তুমি আসবেই ।' 'তোমার কাছ থেকে টাকা বা অন্য কোন কিছু চাইনা ।' চেঁচিয়ে উঠলো জয়ন্ত । 'আমরা এক সাথে কত অপরাধ করেছি , মনে আছে ? আর তোমার কাছ থেকেই শিখেছি , পুরানো সঙ্গীকে বিশ্বাস করা যায় না। যত পুরানোই হোক । আর পিছনের পায়ের ছাপ মুছে ফেলতে হয়। তাই করলাম ।' ট্রিগারে চাপ দিল মেয়েটা হাসি মুখেই। গাড়ির ভেতরে জায়গা কম । প্রায় কামানের মতই শব্দ হল । এত কাছ থেকে ছয় মাসের একটা শিশুও মনে হয় মিস করবে না। একদম বুকের মধ্যে লাগল। কোন রকম প্রতিবাদ আপত্তি না করে, সামান্য একটা ঝাঁকুনি দিয়ে সাথে সাথেই মারা গেল, এক সময়ের কুখ্যাত অপরাধী জয়ন্ত স্যান্নাল । পিস্তলটা আস্তে করে বসার সিটে রেখে তৈরি হয়ে নিল সুমিত্রা। কাহিনির বাকি অংশ নির্ভর করছে ওর অভিনয়ের উপর। পুলিশের গাড়িটা ঘ্যাস করে এসে থামল পাশেই । গাড়ি থেকে ব্যাঙের মত লাফ দিয়ে নামলো বড় একজন অফিসার । আর তিনজন সেপাই বা কনস্টেবল মার্কা কেউ । এক হাত লম্বা টর্চ নিয়ে সাবধানে সামনে এগিয়ে এলো বড় অফিসার । দূর থেকে সব পরীক্ষা করলো , খাবারের দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গরিব মানুষের মত। তারপর আরও সামনে এসে ভেতরে টর্চের আলো ফেলল । ঘন ঘন আলো ফেলে দুইজনের চেহারা দেখল ভাল করে। জানালার ফাঁক দিয়ে জয়ন্তের গলার শিরায় হাত রেখে , শেষে আবার নাকের সামনে আঙুল নিয়ে নিশ্চিন্ত হল শ্বাস চলছে না। পেশাদারী একটা ভঙ্গিতে সুমিতার চোখের উপর উজ্জ্বল টর্চের আলো ফেলে জানতে চাইল , ' কী হয়েছিল ম্যাডাম ?' হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলল সুমিত্রা। গাল বেয়ে নামছে চোখের জল , ' আমাকে খুন করতে চাইছিল লোকটা। লোকটা আমাকে ... অল্পের জন্য বেঁচে গেছি ।' থানার ভেতরে। অফিসার গাউস চৌধুরী চেয়ারে বসে আছেন। হাতে পেট্রোল পাম্পের রিসিট । মুখ কুঁচকে সেটা দেখছেন । ভেঙ্গে ভেঙ্গে শব্দ করে পড়লেন , ' লোকটা আমাকে খুন করতে চাইছে। পুলিশ ডাকুন ।' পড়া শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন । উল্টা দিকের আধ পুরানো সোফায় বসে আছে সুমিত্রা। কাঁদছে এখনও। পাশে প্রায় বুড়ো একজন মানুষ - ধনী ব্যবসায়ী নন্দলাল বিহারী । ষাটের মত বয়স । দামি কোট গায়ে । চেহারায় বিরক্ত আর শঙ্কা । উনি সুমিত্রার স্বামী । 'এই মেসেজ বা অভিযোগ পত্রটা কি আপনি লিখেছিলেন ? পেট্রলপাম্পের ছোকড়া মুহাম্মদ হাবিবুল্লার সামনে ?' ‘হ্যাঁ , সম্মতি সূচক মাথা ঝাঁকাল সুমিত্রা। ‘ দেখি জিনিসটা ?' হাত বাড়ালেন বিহারী । চেহারা লাল হয়ে আছে। ‘ আসলে তখন আমার মাথা কাজ করছিল না।' কাঁপা কাঁপা গলায় বলল সুমিত্রা । ' ফোনে হাত দিলে তো মেরেই ফেলবে। বাধ্য হয়ে অমন কায়দা করলাম । মনে হল ওটাই নিরাপদ।' গাউস চৌধুরী হাত থেকে কাগজটা নিয়ে ভালমত দেখে আবার ফেরত দিলেন বিহারী বাবু। বউয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্তনা দিতে লাগলেন । হায় হায়। বউ মরলে কী হত ?' ' লোকটাকে কি চেনেন ? ' জেরা শুরু করলেন গাউস চৌধুরী । হালকা চালে। 'একদমই না।' মাথা নাড়লো সুমিত্রা । ' মানে আগে কক্ষনো কোথাও দেখেছেন ?' ' এই জন্মে না ।' মুখ কুঁচকে কী যেন ভাবছেন গাউস চৌধুরী । চা হলে ভাল হত । মাথা কাজ করতো । কিন্তু থানার সামনের টঙ বন্ধ হয়ে গেছে । মুফতে চা পাবার উপায় নেই। ' তো আপনার গাড়িতে সেই ভদ্রলোক ...সরি মানে ক্রিমিনালটা ঢুকল কেমন করে ?' অপার বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইলেন গাউস চৌধুরী । ' সম্ভবত ক্লাবের দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকেছিল । আমি গাড়ি লক করি না। কেন করব ? ক্লাবের ভেতরে তো গাড়ি একদম নিরাপদ। লোকটা দরজা খুলে ভেতরে ঘাপটি মেরে বসেছিল । পরে মেইন রাস্তায় উঠে আসতেই পিস্তল বের করে জিম্মি করার চেষ্টা করলো ।' স্বচ্ছ প্লাস্টিক মোড়া পিস্তলটা তুলে নিলেন গাউস চৌধুরী টেবিলের উপর থেকে। পিস্তলের সাথে বুকমার্কের মত কাগজের ট্যাগ ঝুঁকছে । ট্যাগে হাবিজাবি লেখা। হাবিজাবি মানে - কিছু তথ্য । তারিখ । কোথায় পাওয়া গেছে । সময় । কী অবস্থায় পাওয়া গেছে। হেন তেন । ' এই পিস্তলটা ছিল লোকটার হাতে, তাই না ? ' সতর্ক ভাবে সুমিত্রার চোখে চেয়ে জানতে চাইলেন গাউস চৌধুরী । জিনিসটা মনোযোগ দিয়ে দেখার ভান করলো মেয়েটা । তারপর যেন সাপ দেখেছে অমন একটা ভঙ্গী করে আঁতকে উঠার ভান করে কেঁদে ফেলল , ' এটাই । আমি ... আমি ভেবেছি টাকা পয়সা চায়। দিতেও রাজি হয়েছি। বললাম ক্যাশ নেই। এটিএম আছে। বুথ থেকে তুলে দেব...। ' ‘তারপর ?' তাগাদা দিতে লাগলেন গাউস চৌধুরী । ‘ বদ লোকটা রাজি হল ।' কাঁদো কাঁদো গলায় বলে যেতে লাগল সুমিত্রা । ' তখন গাড়ির তেল গেল শেষ হয়ে। পেট্রোল পাম্পের ছেলেটাকে কায়দা করে চিঠি দিলাম ।' 'কেন ?' ' ভয় হচ্ছিল টাকা পাবার পর যদি মেরে ফেলে । পেট্রোল পাম্প থেকে বের হয়ে সামান্য গিয়েছি তখন পিছনে পুলিশ চলে এসেছে । সাইরেনের শব্দ শুনে লোকটা পিস্তল ঠেকিয়ে হুকুম করল গাড়ি যেন জোরে চালাই । আমি ভয়ে গাড়ি থামিয়ে ফেলেছিলাম । আসলে ব্রেকে পা পরে গিয়েছিল । তখনই গুলি করতে যায় লোকটা। আমাদের মধ্যে হাতা হাতি হয় । আর দুর্ভাগ্য লোকটার গায়েই গুলি লাগে ।' শব্দ করে কেঁদে বিহারী বাবুর কোটের হাতায় মুখ রাখল সুমিত্রা। শেষের দিকে ওর গলা হাস্যকর হয়ে গেল । কোটের পকেট থেকে দামি রুমাল বের করে গিন্নির চোখ মুছিয়ে দিলেন প্রাচীন পতি । 'অফিসার ।' গর্জে উঠলেন নন্দলাল বিহারী । ' শুনলেন তো ? আমার ওয়াইফ ওর বক্তব্য লিখে দিয়েছে একবার। ঐ পেট্রলপাম্পের ছেলেটা দিয়েছে। আমি দিলাম। ঘটনা জায়গায় উপস্থিত পুলিশ অফিসারটাও দিয়েছে । আমার মনে হয় এইবার আমাদের ছেড়ে দেয়া দরকার । মস্ত ঝামেলা গেছে আমার ওয়াইফের উপর দিয়ে । বাসায় ফিরে খানিক বিশ্রাম করতে দেবেন আমাদের ? নাকি ? কী ঝামেলা আমাদের উপর দিয়ে যাচ্ছে আপনি বুঝবেন কেমন করে ? আপনার তো রোজকার ডিউটি । ' ধাতানিটা চুপচাপ হজম করলেন গাউস চৌধুরী । চেহারায় কোন ভাব নেই । ছোট বেলায় ভুলে একবার কাঁচা আমের আচার মনে করে করলা ভাঁজা খেয়ে ফেলেছিলেন , তখনকার মত করে রেখেছেন মুখটা । ‘ আসলে আপনাদের বসিয়ে রাখার মত কোন যুক্তি ও নেই ।' দায় স্বীকার করলেন তিনি । ' পিস্তল তো আমাদের হাতেই। আপনার গিন্নির গাড়িটা থাকুক। দিন দশেক পর ফেরত পাবেন। খানিকটা অফিসিয়াল কাজ আছে। নিয়ম আরকি । লাশ মর্গে চলে গেছে। উম্ম আর তো কিছু বাকি নেই। আপনার সাহায়ের জন্য ধন্যবাদ । আপনি আর আপনার ওয়াইফ যদি কয়েকটা কাগজ সাইন করেন, খুশি হব। তেমন কিছু না। জাস্ট ফর্মালিটি , নিয়মে বন্দি আমরা। বোঝেনই তো । ঘটনা যা ঘটেছে তাতে আপনার ওয়াইফের কোন হাত ছিল না। সেলফ ডিফেন্স । আদালতে আমিই সাক্ষী দেব সেটা । ' কথা শেষ করে টেবিলের উপরে রাখা ফোন তুলে ডায়াল করতে লাগলেন গাউস চৌধুরী । তখনও মাথা নিচু করে কাঁদছে সুমিত্রা । কেউ দেখল না আনন্দে ওর চোখ চুমকির মত চিকচিক করছে । এক সপ্তাহ পরের কথা । শীতের কমলা বিকেল । বাইরে মন কেমন করা রোদ। বসার ঘরে মস্ত সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে সুমিত্রা। সামনে ঝিনুক শঙ্খের কাজ করা কফি টেবিল । বিকেলের জল খাবারের আয়োজন । চীনা মাটির কেটলি ভর্তি চা। ধাউস এক তশতরী উপচে আছে শহরের নাম করা বেকারির তৈরি সুস্বাদু কেক । এক ঝুড়ি পাকা কমলা লেবু । সোনালী রিমওয়ালা দারুণ রকম একটা পেয়ালাতে চা নিয়ে সুমিত্রার হাতে তুলে দিলেন নন্দলাল বিহারী , ' যাক, সব ভাল যার শেষ ভাল। সব কিছু সুন্দর ভাবে মিটলো । কতবার বলেছি তোমার এই শখের গান বাজনা করার দরকার নেই । শুনলে না। মানি একজন শিল্পী কখনই তার চর্চা ছাড়তে পারে না । কিন্তু এখন হল তো ? আর কখনই ড্রাইভার ছাড়া বাইরে বের হবে না। কতবার বলেছিলাম সেটা। সব দোষ আমার । কালকেই আটকে ছিলাম বিজনেস মিটিঙে । নইলে নিজেই যেতাম তোমাকে পিক করতে । ' ' যা হয়েছে , হয়েছে।' আবেগ বর্জিত গলা সুমিত্রার । ‘ আমাদের উচিৎ এখন লম্বা একটা ছুটি কাটানো । গদ গদ গলায় বললেন বিহারী । ' কোথায় যেতে চাও ? বাহামা , মেক্সিকো , সাউথ আমেরিকার কোপাকাবানা ? ' ' অহ কত ভালবাস তুমি আমাকে।' হাসি হাসি মুখে পেয়ালা হাত থেকে নামিয়ে আরও কাছে এসে বসলো সুমিত্রা। ' খুবই খুশি হব । সত্যি একটা ছুটি দরকার ।' ' তাহলে আমি সব ব্যবস্থা করছি । কেমন ? ' সুমিত্রাকে জড়িয়ে ধরলেন বিহারী । ' সেই রাতের কথা ভাবলে আজও ভয় পাই। কত কিছু হয়ে যেতে পারতো ।' আরও কিছু বলতেন । কি বলতেন কে জানে । দরজার কলিং বেল বেজে উঠলো । ' কে এলো আবার ?' আপন মনেই বললেন বিহারী । ' যদি দেখি আবার কোন সাংবাদিক এসেছে । ব্যাটাকে রাম ধোলাই দেব ।' উঠে গিয়ে দরজা খুলে কড়া গলায় বলতে লাগলেন , ' আরে ভাই, হাজারবার বলেছি তো ...আরে এ তো দেখছি ক্রাইম ব্রাঞ্জের গাউস চৌধুরী । আসুন স্যার ভেতরে আসুন ।' নাম শুনেই বিরক্ত হল সুমিত্রা। ভেতরে ঢুকে পড়লেন গাউস চৌধুরী । গায়ে সেই রাতের পোশাক । একটাই কোট আছে বোধ হয় উনার । তবে দারুণ রকমের একটা টাই ঝুলিয়েছেন গলায়। লাল কালো আড়াআড়ি স্টেইপওয়ালা অক্সফোর্ড টাই । ' আপনার গিন্নির গাড়িটা ফেরত নিয়ে আসলাম । আমাদের কাজ শেষ ।' বিনয়ের সাথে বললেন গাউস চৌধুরী । ‘খুব ভাল করেছেন ।‘ হাসি ফুটলো বিহারির মুখে । ‘ আমরা সামান্য চা পান করছিলাম । আসুন না আমাদের সাথে । নাইরোবি থেকে চায়ের পাতা আনিয়েছি।' 'না না ধন্যবাদ । সারা দিনে আট দশ পেয়ালা চা খাওয়া হয় ।' তারপর সুমিত্রার চোখে চোখ পড়তেই জানতে চাইলেন , ' কেমন আছেন মিসেস কুমকুম ? এই নিন আপনার গাড়ির চাবি । ' ‘ অনেক অনেক ধন্যবাদ ।' চাবির গোছা নিতে নিতে হাসি মুখে জবাব দিল সুমিত্রা । ' সেই মৃত লোকটার ব্যাপারে আমরা খোঁজ নিয়েছিলাম। ' গম্ভীর গলায় বললেন গাউস চৌধুরী । ' এক সপ্তাহ তদন্ত করে অবিশ্বাস্য সব ব্যাপার জানলাম ।' ‘ আপনি বসুন না। তারপর সব বলুন।' বললেন বিহারী । খানিক দূরের একটা সোফায় বসলেন গাউস চৌধুরী ।' যাক, আসলেও বড় বাঁচা বেঁচে গেছেন। আপনি ভাগ্যবতী । খুব বিপদজনক একটা লোকের সাথে মোকাবেলা করেছেন আপনি। এবং ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছেন ।' মুখটা থমথমে বানিয়ে বসে রইল সুমিত্রা। বুক ঢিপ ঢিপ করছে । ' আপনার কোন ভয় নেই।' বলতে লাগলেন গাউস চৌধুরী । ' সেলফ ডিফেন্স হিসাবে আপনি খালাস । ' হাসি ফুটল বাকি দুইজনের মুখে । ' তবে লোকটা ছিল আমাদের জন্য এক যন্ত্রণা ।' বলেই চলছেন গাউস চৌধুরী । ‘ যন্ত্রনা মানে ?' অবাক হবার ভান করলো সুমিত্রা ওরফে কুমকুম । ' আসলেই যন্ত্রণা । হেড কোয়াটার থেকে ঐ লোকটার নামে ফুল রিপোর্ট এসেছে । ওর নাম জয়ন্ত স্যান্নাল । এক সময়ের কুখ্যাত অপরাধী । হেন কাজ নেই করেনি, সাত আগে ধরা পড়ে জেলে গেছে। সারা জীবনের জন্য জেল হত। কিন্তু ভাল ব্যবহারের জন্য জামানতে ছাড়া পেয়েছে অল্প কিছুদিনের জন্য । জেল সুপার নিজে সেই ব্যবস্থা করেছেন। বাইরে এসেছিল ব্যবসা করতে । ' ‘ ব্যবসা করতে , ঠিক বুঝলাম না ? ' বিহারী অবাক । ' সেটাই ।' বলতে লাগলেন গাউস চৌধুরী । ' জয়ন্তের মগজ ছিল ভাল । জেলে থাকতেই পড়া শোনা করতো প্রচুর। কম্পিউটরের কাজ শিখেছিল । ওখানে বসেই কয়েকটা সফটওয়্যার আর ভিডিও গেইম বানিয়েছে । জেল সুপারের সাহায়্যে সেইসব জিনিস বিদেশে বিক্রি করবে অমন ডিল হয়েছে । মড়ার কয়েক ঘণ্টা আগে এক লক্ষ ডলার পেয়েও গেছে ওর ব্যাঙ্কে ।' ‘ তারপর ? অবাক বিস্ময়ে বললেন বিহারী । ' আমাদের কাজ বেড়ে গেল ।' তম্বা মুখে বললেন গাউস চৌধুরী । ' আমরা জেনেছি অপরাধ জীবনে সুমিত্রা নামে একটা মেয়েকে ভালবাসত । এখন আমাদের কাজ হচ্ছে সেই মেয়েটাকে খুঁজে, ওর হাতে সব টাকা পয়সা বুঝিয়ে দেয়া । কারণ জেলে থাকতেই অমন একটা উইশ করে রেখে গেছে জেলার সাহেবের কাছে । তো, আমাদের কাজ হচ্ছে একটাই । সাত বছর আগের ক্রাইম ট্র্যাক ঘেঁটে এই মেয়েটাকে খুঁজে বের করতে হবে। কঠিন কিছু না। আজ বা কাল ঠিকই পেয়ে যাব । আহা বেচারা বড্ড ভালবাসত এই সুমিত্রাকে ।' বুকের ভেতরে কেমন একটা কাঁপুনি টের পেল মিসেস কুমকুম ওরফে সুমিত্রা ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...