এক
বড় রাস্তা থেকে ফুটপাথে উঠতেই লোকটার সাথে ধাক্কা খেল রফিক ।
মুখ ফস্কে গালি দিতে গিয়েও থমকে গেল ।
লোকটা বুড়ো । রোগা । হাড় জিরজিরে শরীর দেখে বুঝা গেল ইচ্ছা করে ধাক্কা খায়নি । সরল দুর্ঘটনা । হয়ে গেছে । যেমন হয় । হর রোজ।
' দুঃখিত , তাল সামলাতে পারিনি ।' ফিনফিনে ভাল মানুষের মত গলায় বলল বুড়ো । ‘ তবে কিছু সিরিয়াস কথা বলার দরকার ছিল আপনার সাথে, ইব্রাহিম লোদি সাহেব ।'
' আমার মনে হয় আপনি ভুল করছেন ।' সুন্দর একটা হাসি উপহার দিয়ে জবাব দিল রফিক । ' আমার মত দেখতে অন্য কেউ হবে। যাক ভুল হতেই পারে । আমি লোদি বা লাদা কেউ না। '
‘ না , না স্যার ভুল হয়নি । ' কেমন একটা ফিচেল মার্কা হাসি সরবরাহ করলো বুড়ো । ' কোন নামে ডাকব ? রফিক না ইব্রাহিম লোদি ?'
থমকে গেল রফিক ।
বুড়ো ওর অন্য নামটাও জানে ? সর্বনাশ ।
'দেখুন আমি খুবই ব্যস্ত এখন ।' জোর করে মুখে হাসি টেনে জবাব দিল । ' জরুরি কাজ আছে । তাছাড়া এই ভর দুপুরে রাস্তায় অচেনা লোকের সাথে কথা বলার ফুরসৎ নেই আমার ।'
' তা জানি ।' আবারও ফিচেল মার্কা গা জ্বালা করা হাসি সরবরাহ করলো বুড়ো । ' এই পাশেই লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে বসে যদি এক পেয়ালা চা আর দুটো বাকরখানি খাই, সাথে বড় বড় দুটো করে যদি চমচম থাকে, তাহলে ব্যাপারটা কেমন ফাটাফাটি হয় না ? খরচ আমারই। আপনার লাভই হবে। খানিক ব্যবসা নিয়ে কথা বলতাম আর কি ।'
মনে মনে সায় দিচ্ছিল না রফিকের ।
কিন্তু লোকটা ওর আসল নাম জানে ।
কি করবে এখন ?
ভাল করে লোকটার চেহারা জরিপ করলো রফিক ।
বয়স পঞ্চান্ন থেকে ষাট হবে । রোগা ভোগা ভঙ্কুর চেহারা । মাথার টাক রোদ পড়ে চকচক করছে । সামান্য চুল সেটা আবার কায়দা করে তেল বা জল দিয়ে উল্টা সিঁথিতে আঁচড়িয়ে রেখেছে । নিজেকে নিশ্চয়ই বুড়ো জেমস বন্ড ভাবছে ? কিন্তু দেখাচ্ছে বাটপারের মত ।
নাকটা শকুনের ঠোঁটের মত । চোখ দুটো নতুন পয়সার মত ঝিকিমিকি করছে। কিন্তু সেখানেই মতলব- স্বার্থ আর কি কি সব যেন গিজগিজ করছে ।
মুখের দাঁত ত্যারাব্যাকা । খোসা ছাড়ানো বাদামের মত রঙ ।
এত গরমেও গায়ে রঙ জ্বলা কোট । ঢোলা । টেট্রনের প্যান্ট থেকে রোঁয়া উঠে গেছে ।
সন্দেহ নেই বিরক্তকর এবং বকোয়াজ চরিত্র ।
' দেখুন ব্যাপারটা বিরক্তকর এবং কিছুটা ফাজলামোর । আমার সময়ের দাম আছে । তারপরও আসুন আপনার কথা শেষ করি। কিন্তু যদি গ্যাঁজানোর জন্য বসেন তাহলে কিন্তু আপনার পিণ্ডি শেষ করে ফেলব ।'
রাগি রাগি সুরে বলল বটে কিন্তু মনে তেমন জোর পাচ্ছে না রফিক ।
ওর আসল নাম জানল কি করে ব্যাটা ?
'কি যে বলেন না হুজুর ।' আবার সেই ফিচেল মার্কা গ্যাল গ্যালে হাসি সরবরাহ করলো বুড়ো । ' একটু কষ্ট করে সময় দিন আমাকে । জানেনই তো, কষ্ট বিনে সুখ লাভ হয় কি মোহিতে ?'
লক্ষ্মী-নারায়ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার উল্টা দিকে ।
বসা হল । ময়লা গামছা দিয়ে টেবিল পরিষ্কার করে চমচম বাকরখানি দিয়ে গেল হাতাকাটা সেন্ডো গেঞ্জি পরা ওয়েটার । ভূরির জন্য গেঞ্জি কুঁচকে বুকের কাছে উঠে গেছে । মনে হয় লুঙ্গি আর ব্লাউজ পরে আছে ।
চমচম আর বাকরখানির উপর হামলে পড়লো বুড়ো । মনে হয় টানা কুড়ি বছর উপবাস শেষ করে খাদ্য গ্রহণ করছে ।
রফিকের মুখে কিছু উঠছে না। চায়ের অপেক্ষায় আছে । দোকানের বাইরে আরেকজন লুঙ্গি ব্লাউজ (!) পরা ভীমসেনের মত লোক কেটলি থেকে কায়দা করে চা ঢালছে । কেটলি তুলেছে তিন হাত উপরে । পেয়ালা ধরেছে নিচে । ভাব দেখে মনে হয় সার্কাস দেখাচ্ছে । লোকজন এখনই বখশিস দেবে । নিদেন পক্ষে হাত তালি তো দেবেই ।
' আপনার নামটা কিন্তু জানা হয়নি ।' মনের অস্বস্তি চেপে সহজ গলায় জানতে চাইল রফিক ।'
'আমার নাম শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব স্যার ।' ফিকে গলায় হাসি মুখে উত্তর দিল । দাঁতের ফাঁকে চমচম ঢুকে ঘাপটি মেরে আছে । পরে নিশ্চয়ই সবার সামনেই টুথপিক দিয়ে খুঁচিয়ে বের করে খাবে ?
' বামুনের ছেলে হলেও কপাল দোষে প্রাইভেট ডিটেকটিভ ।' কথাটা শেষ করে কড়া চোখে রফিকের দিকে চাইল । রফিকের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইছে আর কি ।
ভেতরে ভেতরে ঘেমে গেছে রফিক ।
সর্বনাশ ! প্রাইভেট ডিটেকটিভ !
কেন ?
সবচেয়ে বড় কথা লোকটা ওর আসল নাম জানে ।
‘ তো আমার কাছে কি জন্য ?' আগ্রহ পাচ্ছে না অমন একটা ভঙ্গী করে জানতে চাইল । ভেতর ভেতর খাবি খাচ্ছে আতঙ্কে।
চিনা মাটির পেয়ালা করে চা এসে গেছে টেবিলে । চুমুক দিচ্ছে না। স্নায়ু টানটান ।
' বলছি বলছি ।' পকেট থেকে সিল্কের ময়লা একটা রুমাল বের করে মুখ মুছে নিল শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব । আচরণে কোন রকম তাড়া নেই । ' গত বছর চিটাগাঙের এক বয়স্ক ব্যবসায়ীর সুন্দরী যুবতী বউ ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্নহত্যা করে । বেশ সুন্দরী ছিল মেয়েটা । বিশেষ করে ইয়ে দুটো বেশ বড় বড়... মানে চোখ দুটোর কথা বলছি। পুলিশ ব্যবসায়ীকে ফাঁসানোর অনেক চেষ্টা করলো । পারেনি । জানা গেছে মেয়েটা সুদর্শন কোন এক যুবকের সাথে অবৈধ প্রেম চালাচ্ছিল । প্রেম আবার অবৈধ হয় কি করে ? সব প্রেমই তো এক । যাক গে মেয়েটা মোট অংকের হাত খরচ দিত যুবককে । স্বামী সেটা ধরে ফেলায় লজ্জায় ঘুমের ওষুধ ...।'
'এই সবে আমার ...।' বাধা দেয়ার চেষ্টা করলো রফিক । বুকের ভেতরে হাতুড়ির ঘা পড়ছে ।
'বলছি স্যার ...বলছি ।' পিত্তি জ্বালানো হাসিটা পাইকারি ভাবে সরবরাহ করেই যাচ্ছে বুড়ো । ' একই রকম ঘটনা ঘটেছে সুলতানগঞ্জে । মেয়েটা ধনী এক ব্যবসায়ীর বউ । তরুণ এক যুবকের সাথে মাখামাখি করতো । ওই আরকি একই যুবক । মেয়েদের সাথে প্রেমের অভিনয় করে টাকা খসিয়ে ভেগে যেত । আসলে স্বভাব যায় না মরলে । মাছি চন্দন ছেড়ে হাগুর মধ্যে গিয়ে বসে । '
' ভাই আসল কথায় আসেন তো ।' খেঁকিয়ে উঠতে চাইল রফিক । কিন্তু গলায় জোড় নেই । কেমন নিস্তেজ শোনাল । ' আমাকে ঐসব হাবিজাবি গল্প শোনাচ্ছেন কেন ?'
'কারন সেই যুবকের নাম ইব্রাহিম খাঁ লোদি । আজকাল সে নাম পাল্টে রফিক সেজে এই শহরেই আছে । শহরের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি সরফরাজ খান সাহবের অল্প বয়স্কা কিন্তু বুকে চাক্কু মারা মারাত্নক সুন্দরী গিন্নি রুমকি ম্যাডামের সাথে প্রেম প্রেম খেলা চালিয়ে যাচ্ছে । জানি না , এইবার টাকা পয়সা হাতিয়ে ভেগে যাবে ? নাকি রুমকিকে বিয়ে করবে । ঠিক জানি না। আর আপনিই সেই ইব্রাহিম খাঁ লোদি ওরফে আমাদের রফিক ভাই ।স্লামালেকুম রফিক ভাই । '
ভয়ের জায়গায় ক্রোধ চলে এলো । খপ করে এক হাত দিয়ে চেপে ধরল রোগা লোকটার গলা ।
‘ পাবলিক প্লেসে পাগলামি করবেন না দয়া করে ।‘ শান্ত গলায় বলল শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব । মোটেও ভয় পায়নি । চমচমের সিরা মাখান হাত দিয়ে আস্তে করে ছাড়িয়ে নিল রফিকের হাতটা ।
‘ কি প্রমাণ আছে আমিই সেই ইব্রাহিম খাঁ ?' অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত করলো রফিক । বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে । মিথ্যা বলে লাভ নেই। ধরা পরে গেছে । আসলেও বোকার মত একটা নাটক করতে যাচ্ছিল সে।
দুপুর বেলা , খদ্দের কম। নইলে লোকজন নিশ্চয়ই অবাক হত ।
'দেখুন আমার এক ক্লায়েন্ট আপনার পিছনে লেলিয়ে দিয়েছে আমাকে। কোথায় যান । কার সাথে মেলামেশা করেন , আপনার অতীত সব তাকে জানাতে হবে।' টিনের কালাই করা শূন্য প্লেট সামনে ঠেলা দিয়ে সরিয়ে বলতে লাগল শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব । ' কিন্তু সমস্যা হল এই বিশাল কাজের জন্য দিনে মাত্র দুই হাজার করে টাকা পাই। এটা কোন টাকা হল ? রাস্তায় চিতুই পিঠা যারা বিক্রি করে তারাও এরচেয়ে বেশি কামায় ।মূল্যস্ফিতির জন্য…। '
'আপনার ক্লায়েন্ট কে ?' ফস করে বলে বসলো রফিক ।
তিরস্কারের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে মুখ টিপে হাসলো শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব , ' সেটা বলা যাবে না। বিজনেস সিক্রেট ।'
'কি চান আসলে আমার কাছে ?' বুকের ভেতরের আতংকটা কিছুতেই কমছে না রফিকের ।
'দেখুন আমার বয়স হয়ে গেছে । অবসর গ্রহণ করতে চাই আমি। এই লোকজনের পিছন পিছন গিয়ে গোপনে অনুসরণ করা। দূরবীন দিয়ে কারও বাসায় নজর রাখা। গোপনে নোংরা ছবি তোলা আর ভাল লাগে না । তাই ভাবছি লাখ দশেক টাকা হলে একটু চুপচাপ শান্তিতে বসতে পারতাম । তেমন টাকা নয় এই দশ লাখ । শুনতে সোনারগাঁ আসলে মাটি আর গর্ত । বা শুনতে মোগলাই বিরিয়ানি কিন্তু মাত্র এক টুকরো আলু। তো আপনি যদি টাকাটা আমাকে দেন তবেই আরকি হে হে ...।'
'আমি কেন আপনাকে টাকাটা দিতে যাব ?' রেগে গেল রফিক ।
যদিও জানে কারণটা। কেন টাকা দিতে হবে ভাল করেই জানে ।
‘ দেবেন না কেন ?' চোখ পিট পিট করে অবাক হবার ভান করলো শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব । ' তা না হলে আমি রুমকি ম্যাডামের কাছে গিয়ে আপনার অতীত বলে দেব। অথবা সরফরাস খানের কাছে গিয়ে সব বলে দেব। উনি আপনাকে ভাড়াটে খুনি দিয়ে মেরে ফেলবেন একদম । অথবা সোজা পুলিশের কাছে যাব । জানেন না অনেক পুলিশ অফিসার আমাকে গুরু মানে। ওদের অনেক কাজ করে দেই তো, সেইজন্য । অথবা তিনটা কাণ্ড এক সাথে করব আমি । ব্যাকরণ বইয়ের মত একের ভেতরে তিন। এখন ভেবে দেখেন কি করবেন ? সব আপনার উপর স্যার । দশ লাখ কিন্তু খুব সামান্য টাকা । এই বিপদের তুলনায় একেবারেই সামান্য । একেই বলে যত মুস্কিল তত আহসান ।‘
‘ কিন্তু এই মুহূর্তে দশ লাখ টাকা আমি পাব কিভাবে ?’ অসহায় একটা ভঙ্গী করলো জাফর ।
‘ টাকা তো না থাকার কথা না স্যার ।' শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব অবাক । ' এই দুনিয়ায় কোন কাজ কি টাকার অভাবে থেমে রয়েছে ? দরকার মনে করলে আপনি রুমকি ম্যাডামের কাছে হাত পাতুন । উনি না করবেন না । ধার হিসাবে বা একেবারে দিয়ে দেবে । আপনাকে ভালবাসে যে। অনেক প্রেম অনেক জ্বালা । বড় প্রেম শুধু কাছেও টানে না , টাকা পয়সাও দেয় । তা হলে ওই কথাই রইল ? এক সপ্তাহ সময় দিলাম ।'
ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে , বাইরের ভেজা রোদের দুপুরে হন হন করে লোকটা চলে গেল ।
হারিয়ে গেল মানুষের ভিড়ে ।
খাবারের দাম দেয়নি ।
দুই
আজ রুমকির সাথে কোন ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টে বসেনি ।
বরাবর অমন কোন জায়গায় দেখা করে । খাওয়া দাওয়া শেষ করে চলে আসে অখ্যাত কোন হোটেল বা রিসোর্টে ।
আজ মুড নেই ।
শীতলক্ষ্যার পাড়ে নির্জন মত একটা জায়গায় গাড়ি পার্ক করেছে রুমকি । লোকজন তেমন আসে না এই জায়গায় । দুই একটা মাছ ধরার নৌকা বা গয়না নৌকা দেখা যায় দূরে, অনেক দূরে ।
লাল টকটকে ফুল ভর্তি বড় একটা কৃষ্ণচুড়া গাছ। তলায় গাড়িটা । ভেতরে ওরা দুইজন ।
' কি হয়েছে বলতো ? ফোনে তো কিছুই বললে না । অমন অস্থির দেখাচ্ছে কেন ?' সুন্দর চোখ দুটো বড় বড় করে জানতে চাইল রুমকি ।
মেয়েটা এত সুন্দর !
' কারন ব্যাপারটা মজার কিছু না । মস্ত বড় ভজকট লেগে গেছে ।'
এত বড় বিপদের মধ্যেও মোহিত না হয়ে পারল না রফিক । শুধু মাত্র টাকা আছে বলেই, রুমকির মত মেয়েরা , সরফরাজ খানের মত কুৎসিত মানুষগুলোর ঘরে চলে যায় ।
'আজ যখন বাসা থেকে বের হয়েছ, সরফরাজ খান কোথায় ছিলেন ? বাসায় ?' চিন্তিত সুরে জানতে চাইল রফিক ।
' না তো । সকাল বেলাই বাইরে গিয়েছিল । যখন বের হলাম তখনও ফেরেনি । কিন্তু কেন ?'
‘ আমার মনে হয় যতটা গোপনে আমরা মেলামেশা করছি ব্যাপারটা আসলে ততটা গোপনে নেই । তোমার হাজব্যান্ড আমাদের সব ব্যাপার জানে । গোপনে নজর রাখছে আমাদের উপর ।'
' হতেই পারে না ।' জোর গলায় প্রতিবাদ করলো রুমকি ।
' হতেই পারে । অসম্ভব কি ? আজ দুপুরে রোগা খ্যাঙরা মত এক লোকের সাথে টক্কর লেগেছিল আমার । লোকটা একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ । জানালো উনার এক ক্লায়েন্ট নাকি আমাদের পিছনে সাঁটিয়ে দিয়েছে । আমাদের খবর রাখার জন্য । নজরদারি আর কি ।'
' সরফরাজই হবে ।' রাগি রাগি মুখে স্বীকার করলো রুমকি । ' ওর চরিত্রই অমন । সামনা সামনি দাঁড়িয়ে কিছু বলবে সেই রকম মুরোদ নেই । আড়াল থেকে কল কাঠি নাড়া ওর কাজ ।'
' শুধু তাই না ।' রাগে কয়েক ধাপ উঠে গেল রফিকের গলা । গাড়ির দরজা খুলে বের হয়ে কৃষ্ণচুড়া গাছের তলায় ভাঙ্গা সিমেন্টের বেঞ্চির উপর গিয়ে বসলো । ওকে অনুসরণ করলো রুমকি । ' ওই গোয়েন্দা হারামজাদা আমাকে হুমকি দিয়েছে। সব গিয়ে নাকি বলে দেবে সরফরাজ খানকে । ব্যাটা একটা আস্ত বদমায়েশ , ঘেয়ো কুকুর , বেতো গাধা, ইত্যাদি, ইত্যাদি ।'
' খুবই খারাপ কথা ডার্লিঙ । বুঝতে পারছি না কি বলব ।' চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে মেয়েটার । বড় বড় সুন্দর দুই চোখে আতঙ্ক ।
' ব্যাটা টাকা চেয়েছে আমার কাছ থেকে । তাহলেই না কি মুখ বন্ধ রাখবে ।’
'তাহলে দিয়ে দাও ।'
'অবশ্যই । কাল আমার বাগানে গিয়েই টাকার গাছগুলোতে জোরে জোরে ঝাঁকুনি দেব ।খসে খসে সব টাকা মাটিতে পড়বে। তারপর সব টাকা কুড়িয়ে বস্তায় করে লোকটাকে দিয়ে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলব।' খ্যাঁকরে গলায় বলল সে ।
‘ কত টাকা চেয়েছে ?' নরম গলায় জানতে চাইল রুমকি ।
' দশ লাখ । হারামজাদার ভাষায় মাত্র । '
মুখটা চুপসে গেল রুমকির । ' ইস গত মাসেই বেশ কিছু টাকা ছিল আমার একাউনটে । খামাখাই ইউরোপ ট্যুরে গিয়ে খরচ করে আসলাম । থাকলে বেশ কাজে দিত । এই মুহূর্তে একদম হাত শূন্য । কে জানত বিপদ অমনি হাজির হবে ।'
রুমকির কান্না কান্না চেহারা দেখে খারাপই লাগল রফিকের ।
‘ বলতে খারাপই লাগছে ।' খানিক ইতস্তত করে বলল রুমকি । ' মাত্র এক মাস আগে সরফরাজের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল । তখন যদি কোন ভাবে টেঁসে যেত তবে আজ এই বিপদ হত না। এতদিনে আমরা বিয়ে করে ফেলতে পারতাম । '
চুপ করে থাকল রফিক ।
মনে আছে ঘটনাটা । সেই মাসে ওরা তেমন একটা দেখা করতে পারেনি ।
'আচমকা আরেক বার যদি হয়ে যায় ... হতে পারে না ? ওর শরীরের অবস্থা একদম বাতিল । পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত মদ গিলছে । এখন তো সারাক্ষণই বোতল গ্লাস নিয়ে বসে থাকে ...যদি আচমকা আরেকবার ...।'
কথা শেষ করলো না রুমকি । কি এক প্রত্যাশা ভরা চোখে ফিরে চাইল রফিকের দিকে ।
মুচকি হাসল রফিক ।
আইডিয়া সাথে সাথে এসে গেছে ওর ধুরন্ধর মগজে ।
'আমরা বোধ হয় কাজটা এগিয়ে নিতে পারি ।' বলল রফিক । ' আজ বিকেলে তুমি বাইরে চলে যাবে । কিছু কেনা কাটা করবে । তারপর সন্ধ্যার পর রেড ফক্স ক্যাফেতে গিয়ে বসবে , চেষ্টা করবে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত ওখানে থাকতে । খাবে দাবে আড্ডা দেবে । সাথে কোন বান্ধবী থাকলে ভাল হয় । ওয়েটারকে মোটা বখশিশ দেবে যাতে তোমার চেহারাটা মনে থাকে । পরে সাক্ষী দিতে পারবে তুমি ওই সময়টা ওখানেই ছিলে ।'
'আরেকটা ভাল জিনিস, রেড ফক্স ক্যাফেতে সিসি ক্যামেরা আছে ।' যোগ করলো রুমকি ।
'বেশ খাসা। ওই সময় তোমাদের বাসায় , দারোয়ান ছাড়া আর কেউ থাকে না তো ! তাই না ?' খুশি হয়ে গেল রফিক ।
‘ না। রাতে বাড়িতে কাজের কোন লোক রাখতে চায় না সরফরাজ । দারোয়ান রমজান আলী গেটের সামনে থেকে এক চুল নড়ে না । বসে বসে ঝিমায় । আর রাস্তার সামনে দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে আড্ডা জমানোর চেষ্টা করে ।'
'ঠিক আছে । রাত আটটার মধ্যে কাজ শেষ করে ফেলব আমি ।' হাসল রফিক ।
'অত বড় ঝুঁকি নিতে যাচ্ছ তুমি ?' ম্লান হয়ে গেল রুমকি ।
' আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য । চিন্তা করবে না। একদম দুর্ঘটনার মত দেখাবে। বিশ্বাস রাখ আমার উপর ।'
হাতে হাত ধরে আরও কাছে চলে এলো দুইজন ।
অন্তরঙ্গ ।
তিন
সরফরাজ খান বসে আছেন ডাইনিঙ টেবিলের সামনে । টেবিলের উপর সিরামিকের দামি এক বাউল । ফুলকপি আর সাদা পেঁয়াজের সূপ । রাতে তিনি শুধু স্যুপ খান । শরীরের অবস্থা শেষ ।
কাঁপা কাঁপা হাতে বেশ কয়েক বার চেষ্টার পর বাউলটা মুখের সামনে তুলে মাত্র এক চুমুক খেতে পারলেন ।
দেখছ শরীরের অবস্থা ? হাত কাঁপছে কি রকম। আমি শেষ।
ভাবলেন মনে মনে ।
বাড়িটা একদম নিঝুম । রাতে চাকর বাকর রাখা পছন্দ করেন না । প্রাইভেসি নষ্ট হয় ।
রুমকি তো রাত সাড়ে সাতটার বেশি দেরি করে না কখনও । আজ হচ্ছে কেন ?কোথায় গেল ?
তখনই দরজার সামনে পায়ের শব্দ । মুখে তুলে যার পর নাই অবাক হলেন সরফরাজ খান ।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রফিক ।
' ভেতরে আসতে পারি ?' রফিকের প্রশ্ন ।
' রমজান আলী আপনাকে ঢুকতে দিল ? কি মনে করে এই সময় ?'
' বিদায় নিতে এলাম স্যার । চলে যাচ্ছি শহর ছেড়ে । '
খানিক আগেই খান ভিলার বাইরে হাজির হয়েছিল রফিক ।
দারোয়ান রমজান আলী ঢুকতে দেয়নি । সে গেটের বাইরে খানিক দূরে অন্য বাড়ির এক দারোয়ানের সাথে গল্প করছিল ।
বাড়ির চারিদিকে এক মানুষ সমান উচু দেয়াল । উপরে বোতল ভাঙ্গা দিয়ে তস্কর আটকানোর চেষ্টা করা হয়েছে । হাওয়া- রোদে- জলে সেই ভাঙ্গা বোতলের ধার কমে গেছে । দুই হাতের তালুতে দুটো রুমাল পেঁচিয়ে লাফ দিয়ে দেয়ালে উঠে চলে এসেছে ।
কেউ দেখেনি ।
রফিককে দেখেই মেজাজ চড়ে গেছে সরফরাজ খানের । চিড়বিড় করে বললেন । 'আপনার কলজে অনেক বড় । আমার বাড়ির ভেতরে ঢোকার সাহস হল কি করে ?'
উঠে টলমল করে টেবিলের সামনে গেলেন । ওখানে দামি একটা ক্রিস্টালের ডিক্যানটার আর আনারসের শরীরের মত খাঁজ কাটা কিছু ওল্ড ফ্যাশন গ্লাস আছে । একটা গ্লাস বেছে নিয়ে ডিক্যানটারের ছিপি খুলে ঢক ঢক করে ঢেলে নিলেন পোখরাজ রঙ্গা মদিরা ।
'যেই থালায় খায় মানুষ, সেই থালায় থু থু ফেলে - কথার কথা। কিন্তু আপনি একটা দারুন উদাহরণ ।' হিসিয়ে উঠলেন সরফরাজ খান । ' হাঙ্গর টাইপের চরিত্র । ছয় মাস আগে চাকরির ভিক্ষা করতে আমার অফিসে এসেছিলেন। শেষে মাস না গড়াতেই রুমকির সাথে বাজে সম্পর্কে জড়িয়ে গেলেন । আপনি একটা পিশাচ ।বিশ্বাসঘাতক। '
বলা শেষ করেই গ্লাসের সব তরল মুখে ঢেলে গিলে ফেললেন । অ্যালকোহলের ঝাঁঝে বিকৃত হয়ে গেল চেহারা ।
'আপনি চান আমি রুমকির জীবন থেকে চলে যাই এই তো ?' দরজার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলো রফিক । সময় কম । যা করার দ্রুত করতে হবে।
'অবশ্যই । আপনি একটা ঘেয়ো কুকুর । দূর হয়ে যান সামনে থেকে । আমি জানি রুমকি আমাকে টাকার লোভে বিয়ে করেছে । কিন্তু আমি সত্যি সত্যি ওর প্রেমে পড়েছিলাম । ভেবেছিলাম বয়সের তফাৎ যাই হোক , সুখী হব । টাকার অভাব নেই আমার । দুনিয়ার সব রত্ন ঢেলে দেব ওর পায়ের সামনে । বদলে ভালবাসবে না কেন ? কিন্তু, আপনারা দুইজনেই এক জোড়া হাঙ্গর । '
' জানেন যখন বউয়ের চরিত্র ভাল না , তখন ছেড়ে দিলেই পারেন। ' বিচ্ছিরি একটা হাসি হাসল রফিক ।
'বললাম না আমি ওকে এখনও ভালবাসি ।' খেঁকিয়ে উঠলেন সরফরাজ খান ।
'উহ। হোয়াট এ লাভ ! নাকি ডিভোর্স দিলে যে মোটা টাকার ভরণ পোষণ দিতে হবে সেটা থেকে বাঁচার জন্য ভালবাসার ঢঙ করছেন ?' লোকটাকে তাঁতিয়ে দিতে চাইছে রফিক ।
কাজ হল ।
দাঁতমুখ খিচিয়ে সামনে চলে এলেন সরফরাজ খান । ' ব্লাডি রাস্কেল আমি তোর মত হারামি...।'
কথা শেষ করার আগেই রফিকের ঘুষি পড়লো বুড়ো মাতাল লোকটার মুখে ।
কোন প্রতিবাদ না করে পাকা ফলের মত টুপ করে শক্ত মেঝেতে পরে গেলেন তিনি।
দ্রুত সামনে গিয়ে দাঁড়ালো রফিক । হায় , হায়।
ব্যাটা এক ঘুষিতে মরে গেলে সব ভণ্ডুল হয়ে যাবে ।
শরীরটা টেনে সোজা বাথরুমে নিয়ে গেল । রুমকির কাছ থেকে আগেই পই পই জেনে নিয়েছে বাড়ির কোথায় কোন কামরা ।
বাথরুম দেখে মাথায় চক্কর দিয়ে উঠলো । টাকা থাকলে কি না হয় ?
সাদা পাথরের বাথটাব , এটার দাম কত ?
হায় হায় , কতগুলো তোয়ালে ?
চিন্তার কিছু নেই । এই বাথরুমের মালিক ও হতে যাচ্ছে সে । কিছু দিনের মধ্যে। বাথটাবের ছিপি এঁটে কল ছেড়ে দিতেই ঠাণ্ডা জল ভর্তি হতে লাগলো । সেই সময়ের মধ্যে সরফরাজ খানের শরীর থেকে খুলে নিল সমস্ত কাপড় চোপড় ।
একদম নগ্ন ।
অল্প অল্প নড়ছেন সরফরাজ খান । জ্ঞান ফিরে আসবে যে কোন সময় । কবজি উল্টে ঘড়ি দেখল রফিক ।
সময় দ্রুত গড়িয়ে যাচ্ছে । যে কোন সময় ফিরে আসবে রুমকি । অমনটাই কথা ।
নিজের হাত ঘড়িটা খুলে পকেটে ভরে নিল রফিক । শার্টের ফুল হাতা গুটিয়ে নিল ভাল করে । ভিজে যাতে না যায় ।
অর্ধেক বাথটাব ভর্তি হতেই টেনে হিঁচড়ে সরফরাজ খানের দেহটা নিয়ে এলো । ওজন তেমন নেই বুড়োর । বাথটাবের মধ্যে উপুর করে দেহটা রেখে মুখটা চেপে ধরল জলের মধ্যে । বেশি না , মাত্র মিনিট খানেক ছট ফট করেই একদম চুপচাপ হয়ে গেল ধনী বর্ষীয়ান লোকটা ।
এমনিতেই আর বাঁচত কয় বছর ?
নিশ্চিত হবার জন্য আরও মিনিট দুয়েক মুখটা চেপে রাখল । সন্তুষ্ট চিত্তে ছেড়ে দিল শেষে।
নরম একটা তোয়ালে বেছে বাথটাবের কল মুছল । যেখানে হাতের তালুর চাপ দিয়ে বসেছিল সেই জায়গাটাও অনেক সময় নিয়ে মুছল । পুলিশ যেন আঙুলের ছাপ খুঁজে না পায় ।
সহজ ছন্দে জল গড়াচ্ছে কল দিয়ে । পড়ুক । যেন স্নান করা অবস্থায় আচমকা বুকের ব্যাথা শুরু হওয়ায় তড়িঘড়ি উঠে বসতে চাইছিল । পা ফস্কে ডুবে গেছে । বা আচমকা হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল ।
দরজা পর্যন্ত গিয়ে হাতলটা ধরতেই নিজেকে বিচ্ছিরি গালি দিয়ে নতুন আরেকটা তোয়ালে দিয়ে ধাতুর হাতলটা যত্ন করে মুছে ফেলল ।
শেষ বারের মত লাশটা দেখে আস্তে করে বের হয়ে এলো বাথরুম থেকে।
আবিস্কার করলো শরীর কাঁপছে ।
কম ধকল যায়নি গত দুইদিন ।
জামার হাতা ঠিক করলো । আবিস্কার করলো গলা শুকিয়ে হিজল কাঠ হয়ে গেছে । তেষ্টায় মারা যাবে যেন ।
সোজা গেল টেবিলের ডিক্যানটারের সামনে । ব্যাটা সুরা রসিক ছিল । আরও এক হালি ডিক্যানটার আছে। নানা বর্ণের তরল ভেতরে । একটার ছিপি খুলে মধু রঙ্গা মদিরা ঢেলে নিল পানপাত্রে । ঢক ঢক করে অর্ধেকটা গিলে ফেলল ।
মাত্র ব্রাণ্ডি গিলেছে তখনই খুঁট করে দরজা খুলে গেল । এতই আচমকা ভীষণ ভাবে চমকে গেল রফিক ।
রুমকি এত জলদি চলে এলো ?
ফিরে তাকাতেই আরও বেশি ধাক্কা খেল ।
রোগা ভোগা খ্যাঙ্গারে চেহারার একটা লোক শান্ত পায়ে ঢুকে পড়েছে কামরার ভেতরে ।এই গরমেও একটা কোট গায়ে দেয়া । ট্রেটনের প্যান্টটা পুরানো হতে হতে আঁশ উঠে গেছে ।
কামরার নরম আলোতে সব গুলো দাঁত দেখিয়ে হাসছে শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব !
চার
‘ ভাল কথা, ইব্রাহিম লোদি ওরফে রফিক সাহেব । আপনি এই অসময়ে খান ভিলায় কি করছেন ?’ সহাস্যে জানতে চাইলো শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব ।
কোন তাড়া নেই অমন ভাব চক্কর ।
' আজ দুপুরে সরফরাজ সাহেবের সাথে দেখা করতে এসে সিগারেট আর লাইটার ফেলে গিয়েছিলাম । সেটা নিতে এসেছি ।' মুখে যা আসলো সেটাই বলে দিল রফিক ।
মাথা মগজ কাজ করছে না।
এত আচমকা এসে হাজির হয়েছে ব্যাটা ।
'আমিও ঘন ঘন লাইটার হারাই ।' দেঁতো হাসি শ্যাম সুন্দরের মুখে । ' সরফরাজ খান সাহেব কোথায় ?'
'জানি না। বাসায় ঢুকে দেখি উনারা কেউ নেই ।' দ্রুত চিন্তা করছে রফিক ।
'কেউ নেই ? তাহলে আপনি ঢুকলেন কি ভাবে ?'
' দরজা খোলা ছিল । এমন কি মেইন গেইটে দারোয়ানও ছিল না ।' কথাগুলো বলে দ্রুত দরজার দিকে এগোল রফিক ।
'লাইটার পেয়েছেন ?' চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলছে বৈষ্ণব । দেখেই বুঝা যাচ্ছে রফিকের একটা কথাও বিশ্বাস করছে না।
'ভাল মত খুঁজে দেখিনি । মনে হয় অন্য কোথায়ও হারিয়েছি । আমাকে যেতে হচ্ছে , অনেক কাজ বাকি ...।'
‘ কোথাও থেকে কি জল পড়ার শব্দ পাচ্ছি ?' মাথাটা মোরগের মত এক দিকে কাত করলো বৈষ্ণব । ' মনে হয় বাথরুমে । চলুন তো একটু দেখে আসি ।'
‘ বললাম না আমার অনেক কাজ আছে ।' দাঁত মুখ খিচিয়ে বলল রফিক ।
হন হন করে এগিয়ে গেল দরজার দিকে ।
'আমি বলছি, আসুন দুইজনে মিলে দেখি বাথরুমটা । কথা কানে যায় না ?' শ্যাম সুন্দরের গলার সুরে অমন কিছু ছিল , থেমে ঝট করে পিছন ফিরে চাইতে বাধ্য হল রফিক ।
সাথে সাথেই ওর অন্তরাত্না কেঁপে গেল ।
কামরার ভেতরের মায়াবী কমলা রঙের আলোতে চকচক করে উঠলো জিনিসটা ।
রোগা ভোগা প্রাইভেট ডিটেকটিভের হাতে দেখা যাচ্ছে একটা আইভার জনসন থার্টি এইট রিভলবার । জিনিসটার ডিজাইন-ই অমন বিচ্ছিরি , দেখা মাত্র যে কারও আত্না উড়ে যাবে । গুলি চালাতে হবে না।
রিভলবারের নল দিয়ে ইঙ্গিত করে বাথরুমে নিয়ে গেল ওকে বৈষ্ণব । দরজা ঠেলা দেয়া মাত্র ভেতরের দৃশ্য দেখে থমকে গেল ব্যক্তিগত গোয়েন্দা । দৌড়ে গিয়ে লাশটা দেখল । বাম হাত দিয়ে মুচড়ে বন্ধ করে দিল ট্যাঁপের মুখ ।
এক মুহূর্তের জন্যও রিভলবারের নল রফিকের বুকের কাছ থেকে সরেনি । দেখতে যাই হোক , লোকটা পাক্কা প্রফেশনাল ।
'কি হয়েছে উনার ?' ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলো রফিক । যেন দুধ ভাত খায় সে ।
'প্রশ্নটা করার কথা আমার । আর আপনি উল্টা আমার উপর বাইন মারছেন ইব্রাহিম লোদি সাহেব ?'
সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো বৈষ্ণব । এগিয়ে এলো সামনে । ' আমি জানতাম শেষ পর্যন্ত এমনটাই করবেন । সেইজন্যই তক্কে তক্কে ছিলাম ।'
' আমি কিছুই করিনি ।' চেঁচিয়ে উঠলো রফিক ।
' লোক মুখে শুনেছি আপনি উনাকে হুমকি দিয়েছেন । শেষ পর্যন্ত তাই করলেন ?'
' আমি কিছু করিনি । আমি উনাকে জীবনেও হুমকি দেইনি । ভদ্রলোকের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে আবার । আগের বার যেমন হয়েছিল । এইবার ঠাণ্ডা জলে গোসল করার সময় হয়েছে আর মারা গেছে । ' গলাবাজি করছে রফিক জান প্রাণ দিয়ে ।
' মিথ্যা সাফাই গেয়ে লাভ নেই । ' ফিন ফিনে হাসিটা আবার ফিরে আসছে বৈষ্ণবের ঠোঁটে । ' সরফরাজ খানের হার্টের কোন সমস্যা সারা জীবনেও ছিল না ।'
‘ ছিল , আপনি জানেন না । রুমকি আমাকে বলেছে । উনার হার্টের সমস্যা ছিল । একবার হার্ট অ্যাটাক করেছে গত মাসেই ।'
' সরফরাজ খান শহরের সেরা ধনী ব্যক্তি । উনার হার্টের সমস্যা থাকলে উনি কি চিকিৎসা করাতেন না ? ডাক্তার দেখাতেন না ? দেশের বাইরে গিয়ে কি থেরাপি নিতেন না ?' সকৌতুকে হাসল বৈষ্ণব ।
থমকে গেল রফিক ।
কয়েক মুহূর্ত ভাবল ।
' আপনি আমাকে বোকা বানাতে চাইছেন ।' আবারও চেঁচাল।
‘ সেটা বানাতে যাব কেন ? আপনি আসলেও বোকা চন্দন । এবার চুপচাপ সামনের ঘরে গিয়ে বসুন ।' রিভলবার দেখিয়ে ইঙ্গিত করলো বৈষ্ণব ।
ঘুরে হাঁটতে লাগল রফিক । পিছন পিছন রোগা গোয়েন্দা ।
এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল রফিক । আচমকা নব্বই ডিগ্রি উল্টা পাক ঘুরে ঝাঁপিয়ে পড়লো বৈষ্ণবের উপর ।
কিন্তু আজকের দিনটা ওর জন্য কুফা ।
তৈরি ছিল বুড়ো ডিটেকটিভ । বাউলি কেটে সরে গিয়েই রিভলবারের বাট দিয়ে আঘাত করে বসলো ওর মাথায় ।
এক ঘায়ে কাজ করে ফেলল বৈষ্ণব । কাত হয়ে মাগুর মাছের মত মেঝেতে পড়ে গেল রফিক । চোখে মুখে অন্ধকার দেখছে । টন টন করছে মাথাটা ।
যন্ত্রণায় মারা যাবে যেন ।
দ্রুত গিয়ে সোফায় বসে পড়লো বৈষ্ণব । পাশের টেবিল থেকে তুলে নিল টেলিফোনের রিসিভার । ডায়াল করছে ।
‘ পুলিশকে ফোন দিচ্ছেন ?' মেঝে থেকে উঠে বসার চেষ্টা করলো রফিক ।
'হ্যাঁ , কিন্তু তার আগে আমার ক্লায়েন্টকে ফোন দিচ্ছি ।'
‘ ক্লায়েন্ট ? মাথা চেপে ধরে আছে রফিক । জ্ঞান হারাবে যে কোন সময় । ' কিন্তু সে তো মারা গেছে ।'
কেমন গা ছম ছম করা একটা হাসি হাসল প্রাইভেট ডিটেকটিভ শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব । ' হ্যাঁ আমার ক্লায়েন্টেই ফোন দিচ্ছি । যিনি আমাকে ভাড়া করেছেন মোটা টাকা দিয়ে । সারা সন্ধ্যা অপেক্ষায় আছেন আমার ফোনের জন্য । রুমকি ম্যাডাম আমার ক্লায়েন্ট ।'
জ্ঞান হারাল রফিক ওরফে ইব্রাহিম লোদি ।
James Causey এর গল্পের কাঠামো অনুসরণ করে

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন