এক
পেল্লাই সব দালান কোঠা দেখে ঢাকার মতই মনে হল জাফরের কাছে ।
নওয়াবগঞ্জ নামেই মফস্বল।
মনে মনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল । যাক বাবা, একেবারে গহীন জলে পড়তে হবে না ওকে। শুনেছিল বটে, নওয়াবগঞ্জ জায়গাটা নিরিবিলি। নিরিবিলি জায়গা ওর পছন্দ না। বড় বড় দালান বাড়ি, হোটেল, ক্যাফে, বার , রেস্টুরেন্ট ভর্তি , অমন জায়গা ওর পছন্দ। এখানে আসতে হবে শুনে খানিকটা মন মরা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বেতনের অংকটা শুনে আর সামলে রাখতে পারেনি।
ওর নতুন বস সালাম চৌধুরী, টাকার কুমির অমন একটা গুজব বহুবার শুনেছে। টাকার কুমিরদের আশেপাশে থাকতে ওর ভাল লাগে।
বাস স্টপেজে নেমে মনটা খামাখাই ভাল হয়ে গেল।
হই হল্লা নেই। পরিবেশ নোংরা না । পরিচ্ছন্নই বলা যায়। রাস্তার পাশে দাড়িয়ে প্যান্টের জিপার খুলে বল্টু বের করে কেউ হিসু করছে না। পান খেয়ে দেয়ালে বাড়তি রঙ কেউ করেনি ।
ট্যাক্সির আশায় এদিক সেদিক তাকাল কয়েকবার। কাউকে পাঠাবে না অমনটা বলেছিল সালাম সাহেব। পরামর্শ দিয়েছিল, জাফর যেন নিজেই একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে আসে সালাম ম্যানসনে । নওয়াবগঞ্জের সবাই নাকি চেনে ওটা। ভাড়ার টাকা কোম্পানি দেবে অবশ্য।
ট্যাক্সি ডাকতে হল না। একজন মিহি চেহারার নিজেই ট্যাক্সির জানালা দিয়ে কচ্ছপের মত গলা বের করে জানতে চাইল, ‘ কই যাইবেন স্যার ?’
সালাম ম্যানসনের নাম বললেই লোকটার ভাব চক্কর বদলে গেল। দ্রুত নেমে এসে দরজা খুলে দিল।
জাফরের কাছে তেমন কোন মালপত্র নেই। একটা ল্যাগেজ সম্বল। চাকা লাগানো। হাতল ধরে টেনে নেয়া যায়। ড্রাইভারই তুলে দিল সেটা ব্যাক সিটে।
তারপর ছুটল সে হাওয়ার বেগে।
জানালা দিয়ে নওয়াবগঞ্জের পরিবেশ দেখছিল জাফর। কতদিন থাকতে হবে কে জানে ? কথা বার্তা শুনে অবশ্য সালাম চৌধুরীকে বেশ মাই ডিয়ার টাইপের লোক বলেই মনে হয়েছে। টাকা পয়সাওয়ালা মানুষদের হাজার রকম বাতিক থাকে। দুর থেকে তেমন বুঝা যায় না। সামনে গেলে ধরা যায়। তখন ওদের সাথে চলা মুশকিল হয়ে পড়ে। ধনী লোকজন আর কিছু না বুঝলেও ‘ টাকার শক্তি’ শব্দটা ভাল বুঝে।
জানালা দিয়ে যা বুঝল, নওয়াবগঞ্জে অনেক ফাঁকা জায়গা আছে। এবং ঢাকা থেকেই শুনে এসেছে জমির দাম বেশ কম। পথ চলতে চলতে সালাম রেস্টুরেন্ট, সালাম গার্মেন্টস, সালাম ফার্নিচার, এমন আরও বহু সালাম নামের জিনিস দেখতে পেল।
ওর মনের ভাব টের পেয়ে গায়ে পড়ে ট্যাক্সি ড্রাইভার তথ্য দিল- ওগুলো সবই সালাম চৌধুরীর। সালাম ম্যানসন আর এইসবের মালিক একই ভদ্রলোক ।
ঢোক গিলল জাফর। সালাম চৌধুরী রুই কাতলা না। তিমি মাছ।
মাত্র সাত মিনিটের মাথায় সালাম ম্যানসনের সামনে এসে গেল ওরা।
নেমে ভাড়া চুকিয়ে দিল ।
বকসিস পেয়ে খটাস করে স্যালুট ঠুকে যতগুলো দাঁত আছে সব বের করে হাসতে হাসতে বিদায় নিল ড্রাইভার।
সালাম ম্যানসন আট তলা দালান। বিশাল।
ব্যস্ত পথের পাশে দাঁড়িয়ে আছে । শুধু উল্টো দিকে ছয়তলা একটা দালান ছাড়া আশে পাশে বড় কোন দালান নেই। সবই ছোট ছোট দোকান ঘর, ব্যাংক, পোস্ট অফিস, মিষ্টির দোকান ।এই কিশোরী বিকেল বেলাতেই কেমন নিঝুম লাগছে।
আটতলা দালানের একতলা থেকে চারতলা পর্যন্ত অফিস স্পেস হিসাবে ভাড়া দেয়া। বাকি তিনতলা অ্যাপার্টমেনট হিসাবে ভাড়া দেয়া। ধনী আর বিজনেস টাইকুনরা থাকে । একদম উপরের তলা সালাম চৌধুরীর বাসা প্লাস অফিস ।
মে মাসের গরমে ঘামছিল জাফর।
তারপরও হবু মালিকের একটা মাত্র প্রতিষ্ঠান দেখেই শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল । ব্যাটা স্টাইল নিয়ে বেঁচে আছে- ভাবল মনে মনে।
ম্যানসনের সামনে দারোয়ান থাকার দরকার ছিল ।
নেই।
লিফটের সামনে একজন লিফটম্যান থাকার দরকার ছিল। তাও নেই।
ল্যাগেজটা হাতে করে সিঁড়ি বেয়ে ম্যানসনের উপর উঠলো জাফর। দৃঢ় পায়ে কাচের ভারি দরজা ঠেলে সোজা গেল লিফটের দিকে।
সুইচে চাপ দিয়ে লিফটের দরজা বন্ধ করবে তখনই দেখতে পেল মেয়েটাকে। বাইরের কাচের দরজা ঠেলে ঢুকছে।
একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে চেয়ে রইল জাফর। মেয়ে দেখে লাড্ডু হয়ে যাওয়ার বান্দা জাফর না। কিংবা ভ্যাবলার মত চেয়েও থাকে না। কিন্তু এটা তো মেয়ে না। অপ্সরা। অথবা পরী। ডানাদুটো খুলে কোথাও রেখে এসেছে।
লম্বায় সাড়ে পাঁচ ফুট হবে। একহারা শরীর। কোমরের নীচে শরীর ভারি হয়ে গেছে। লম্বা চুল। কাল- ঘন- খোলা। বাতাসে উড়ছে ! চুলের ফ্রেমে বন্দি হয়ে আছে পান পাতার মত আপেল রাঙ্গা মুখটা। সেখানে প্রজাপতির মত চঞ্চল দুই চোখ রয়েছে পুরুষদের খুন করার জন্য । মিষ্টি একটা নাক। আর লোভনীয় ঠোঁট।
কমলা রঙের শিফনের শাড়ি পড়েছে মেয়েটা। সাথে ম্যাচ করে একই রঙের ব্লাউজ আর উঁচু হিলের স্যান্ডেল। এমন কি কপালের টিপ আর কানের দুল ও একই রঙের।
কমলাফুলি । কমলা ফুলি। কমলালেবুর ফুল।
ভাবল জাফর।
লিফটের দরজা বন্ধ হচ্ছিল নিজস্ব নিয়মে । দ্রুত হাত বাড়িয়ে দিল জাফর। বাঁধা পেয়ে খুলে গেল দরজা। দ্রুত কয়েক কদম এগিয়ে লিফটের ভেতরে ঢুকে পড়লো কমলালেবুটা।
‘ ধন্যবাদ।’ মিষ্টি হেসে বলল কমলাফুলি ।
হাসিটাও সুন্দর !
‘ কয়তলায় যাবেন ?’ ভদ্রতাসূচক হাসি হেসে জানতে চাইল জাফর।
‘ একদম সোজা আটতলায়।’ সুরেলা ঝংকার তুলে বলল কমলাপরীটা।
‘কাণ্ড দেখুন , আমিও ।’ সুইচে চাপ দিয়ে বলল জাফর। ‘ সালাম চৌধুরীর অফিসে।’
জবাব দিল না কমলাসুন্দরী।
সর সর করে যান্ত্রিক শব্দ করে উপরে উঠতে লাগল লিফট । ভেতরে আশ্চর্য মিষ্টি একটা সৌরভ । দুর্লভ কোন অর্কিডের মত।
কি পারফিউম ব্যবহার করে মেয়েটা কে জানে ! অচেনা মিষ্টি এই সৌরভটা কেমন যেন মাতাল করে ফেলছে ওকে।
খুব বেশি সময় লাগল না । জায়গামত লিফট পৌঁছে টুং শব্দ করে দরজা খুলে গেল।
‘নিন পৌঁছে গেছি ।’ মেয়েটাকে বের হবার সুযোগ দিয়ে বলল জাফর।
ভদ্রতাসূচক মাপা একটা হাসি দিয়ে বের হয়ে গেল কমলাসুন্দরী ।
বাইরে করিডোর।
হাই হিলের টুকটাক শব্দ করতে করতে করিডোরের শেষ মাথায় চলে গেল সে। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল জাফর। মেয়েটা বেশ। একই দালানের একই তলায় যখন, নিশ্চয়ই আরও দেখা হবে। ঘটনা ঘন ঘন হলে ভাল হয়।
সামনে তাকাল।
ভারী কাঠের দরজা । উপরে প্লাস্টিকের নেইমপ্লেট সাঁটা। সালাম চৌধুরী। ব্যস আর কিছু না ।
দরজায় বেল আছে । চাপতেই টুং টাং শব্দ হল । প্রায় সাথে সাথেই খুলে গেল দরজা। বেঁটে -মোটা বয়ামের সাইজের একটা লোক এসে দাঁড়ালো। ভারী গলায় বলল , ‘ নিশ্চয়ই জাফর সাহেব ? ভেতরে আসুন। আমি সালাম চৌধুরী। যাত্রা কেমন হয়েছে ?’
দুই
বিশাল একটা টেবিলের উল্টোদিকে বসে হাসি হাসি মুখে সালাম চৌধুরী চেয়ে আছে জাফরের দিকে । দুই চোখের তারায় কৌতুক। কোন প্রশ্ন করছে না। শুধু জাফরের চোখের দিকে চেয়েই যেন সব কিছু জেনে নিচ্ছে ভদ্রলোক ।
লোকটার বয়স হয়তো পঞ্চাশ । কিন্তু পরিশ্রম না করায় আর দীর্ঘ আয়েশি জীবন যাপন করায় মেদ জমে গেছে শরীরে। ফলে বয়স অনেক বেশি দেখাচ্ছে।
মাথা ভর্তি ফিনফিনে চুল । চুল যা থাকার কথা চার ভাগের তিন ভাগও নেই। পাতলা , কাঁচাপাকা। মুখটা হাঁড়ির মত বড়। সরল শিশুর মত দুই চোখ। দেখলে মনে হয় না ঘাঘু ব্যবসায়ী।
হাফ হাতা চক্রা বক্রা হাওয়াইয়ান জামা আর খাকি রঙের ঢোলা প্যান্ট পরনের।
‘ তারপর জাফর সাহেব কেমন লাগছে আমার অফিস কাম বাসা ?’ হাসি মুখে প্রশ্ন করলো সালাম চৌধুরী।
উত্তর দেয়ার আগে আরও একবার বসার রুমটায় চোখ বুলিয়ে নিল জাফর। বসার কামরাটাই অফিস হিসাবে ব্যবহার করছে জাফর চৌধুরী।
না জানি মোট কয়টা কামরা আছে পুরো ফ্ল্যাটে। শুধু অফিস রুম দেখেই মাথা বনবন করে ঘুরছে জাফরের।
বিদেশী সিনেমায় অমন সাজানো রুম দেখা যায়। টেবিলের উপর ল্যাবটপ ছাড়া আর কিছু নেই। একটা দেয়াল আসলে কাচের বিশাল একটা শো-কেস। সেটা ভর্তি নানান রকম দামি সুভেনিয়র। দেখেই বুঝা যায় অ্যানটিকস হবে। ভুং ভাং জিনিস না। এমন কি পায়ের কাছে কার্পেটের উপর সাজিয়ে রাখা বিশাল যে গ্লোবটা দেখা যাচ্ছে সেটাও মামুলি জিনিস না। পুরো গ্লোবটা দামি পাথরের তৈরি। প্রত্যেকটা দেশ ভিন্ন ভিন্ন রঙের দামি পাথর দিয়ে বানান। নীল সমুদ্র আলাদা নীল রঙের পাথরের। আলো পড়তেই ঝিকিয়ে উঠছে।
বাকি দুই দেয়াল ভর্তি পেইন্টিং। জলরঙ আর তেলরঙ। কোন শিল্পীদের আঁকা জানে না জাফর। তবে জিনিসগুলো অরজিনাল। হয়তো নিলাম থেকে সংগ্রহ করা। পেইন্টিঙের ফ্রেমগুলো পিতলের। সুন্দর ফুল লতাপাতা ডিজাইন করা। প্রত্যেকটা পেইন্টিঙের উপর হাল্কা আলো ঝুলছে উপর থেকে। কামরার ঠিক মাঝখানে একটা ঝাড়বাতি। হিরের কুচির মত মিহি আলো ছড়াচ্ছে।
‘ খুব ভাল লাগছে স্যার।’ হাসি মুখে বলল জাফর। ‘ আপনার রুচির প্রশংসা না করে পারছি না।’
‘ আপনি একটা বেকুব।’ অট্টহাসি হেসে সাগর কলার মত মোটা একটা চুরুট জ্বালাতে জ্বালাতে বলল সালাম চৌধুরী। হাসির চোটে ভুরিটা থল থল করে উঠলো। ‘ রুচি ফুচি কিছু না। মানুষকে তাক লাগানোর জন্য এইসব করি আমি।’
চুপ করে গেল জাফর।
‘ এখানের প্রত্যেকটা জিনিসের বাজারি মুল্য আছে।’ চুরুটে টান দিয়ে চোখের সামনে ধোঁয়ার মেঘ বানাতে বানাতে বলল সালাম চৌধুরী। ‘ আর প্রত্যেকটা জিনিস বেছে বেছে কিনেছি আমি। যাতে আমার অফিসে আসা মানুষগুলো প্রথম দর্শনেই ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায়। কিন্তু খামাখাই নাটক করি না। কারন ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। প্রত্যেকটা পেইন্টিং গ্যালারি থেকে কিনেছি । এক লক্ষ টাকা থেকে তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত। অপেক্ষায় আছি। শিল্পী মরলে বা আরও একটু বিখ্যাত হলেই ছবির দাম দশগুন বেড়ে যাবে। তখন বিক্রি করব।
‘ একই কথা অ্যানটিকগুলোর ব্যাপারে। কিনেছি। সাজিয়ে রেখেছি। টাকাওয়ালা বেকুব পেলেই বিক্রি করে দেব। বাজারি মূল্যটাই আসল আমার কাছে। আর কিছুই না। দুনিয়ায় টিকতে হলে সবারই বিক্রয় যোগ্য প্রডাক্ট থাকতে হবে।’
‘ তা হলে স্যার, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত এইসব ব্যাপারে আপনার কোন আগ্রহ নেই ?’ বোকা বোকা ভাবে বলল জাফর।
‘ নাহ ।‘ মাথা নাড়ল সালাম চৌধুরী। ‘ একদমই নেই। গরিব মানুষদের কাছে শিল্প, সঙ্গীত আর সাহিত্য বেঁচে থাকার প্রেরণা। কিন্তু আমাদের মত ধনী মানুষদের কাছে সেইগুলো ব্যবসা করার পণ্য। তবে দুটো জিনিসের প্রতি আমার আগ্রহ কখনই কমে না।”
‘ সেইগুলো কি কি স্যার ?’
‘ টাকা আর মেয়েমানুষ ।’
‘ অ্যাঁ ?’
‘ ভুল শোনেননি। টাকা আর মেয়েমানুষের জন্য পুরুষরা কাজ করে। আর সমাজটা পুরুষরা চালায়। চলুন বারান্দায় যাই।’
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সালাম চৌধুরী। পিছনের কাচের বড় একটা দরজা। দরজার ওপাশে সন্ধ্যা নামছে। এক পাশে টান দিতেই দরজা খুলে গেল। নিচের গাড়ি আর মানুষের হালকা গর্জন ঢুকে পড়লো ভেতরে। পাগলা হাওয়া এসে আঘাত করলো ওদের মুখে।
‘ তাকিয়ে দেখুন তো শহরটা ।’ দরাজ গলায় বলল সালাম চৌধুরী। ‘ কি দেখছেন নওয়াবগঞ্জে ?’
‘ সুন্দর শহর স্যার।’ সত্যি কথাই বলল জাফর। ‘ দারুন সব দালান কোঠা আছে। দূরে নদী দেখা যাচ্ছে। রাস্তায় দামি গাড়িও আছে বেশ। মনেই হয় না মফস্বল। ‘
‘ হ্যাঁ, আপনি যা দেখছেন তা হল টাকা আর মেয়ে মানুষ। এই দুটোর জন্যই এই শহরটা তৈরি হয়েছে। শুধু এই শহর না। দুনিয়ার সব শহর তৈরি হয় টাকা আর মেয়ে মানুষের জন্য। পৃথিবীর সব ঘটনা ঘটে টাকা আর মেয়ে মানুষের জন্য। বিশ্বাস করুন বা না করুন।’
পাগল নাকি লোকটা ? মনে মনে ভাবল জাফর। মুখে বলল, ‘বিশ্বাস করি স্যার।’
বারান্দা থেকে ফিরে এসে আবার মুখোমুখি বসলো দুইজন।
চুপ করে রইল জাফর।
কথা যা বলার সালাম সাহেবই বলবে। ওর কাজ শুনে যাওয়া। আধা মিনিট নিরবে চুরুট টেনে সেটা ছাইদানিতে ঠেসে রাখল সালাম চৌধুরী।
‘ আপনার প্রোফাইল আমি দেখেছি ।’ বলতে লাগল সে । ‘ যেমন মানুষ আমি খুঁজছিলাম, আপনি তেমনই। আমি ব্যবসায়ী মানুষ। হরেক রকম ব্যবসা করতে পছন্দ করি। টাকা পয়সা ছিল আমার বাপের। অঢেল। মাত্র তেইশ বছর বয়সে ছোট বেলার বন্ধু ইয়াকুব আলীকে নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। কাগজের ব্যবসা হতে শুটকি মাছের ব্যবসা কিছুই বাদ দেইনি।
‘ বন্ধু ইয়াকুবের সাথে আলাদা হয়ে গেছি তিন বছর আগে ।ব্যক্তিগত কারনে। পার্টনার ভাল লাগে না। নতুন কিছু করতে চাই। আসলে টাকার খিদে আমার জীবনেও শেষ হবে না। হঠাৎ মনে হল, আমার কাছে প্রচুর জমি জমা আছে। সেগুলো দিয়ে ব্যবসা করলে কেমন হয় ? কোন ভাই বোন ছিল না। বাপের সম্পত্তি, জমি জমা একাই পেয়েছি। নিজেও কিনেছি গণ্ডায় গণ্ডায়। খামাখাই পড়ে আছে। দূর্বা ঘাস আর হেলেঞ্চা শাক হয়ে আছে জমিতে। যদি হাউজিং ব্যবসা করি ভাল হবে। ফ্ল্যাট বানাও, ভাড়া দাও । অথবা বিক্রি কর।
‘ আপনার খোঁজ পেলাম সুইট হাউজ রিয়েল রিয়েল এস্টেটের কাছে। ওদের ম্যানেজার হিসাবে বহু বছর কাজ করেছেন আপনি ।’
‘ জ্বী স্যার , পাঁচ বছর।’ অনেকক্ষণ পর কথা বলল জাফর।
‘ এবং সার্ভিস ভালই দিয়েছেন । ওরা দিন দিন ফুলে তাল গাছ হয়ে গেছে। আপনার অবস্থা যেই লাউ সেই কদুই রয়ে গেছে। বেতন বোধহয় পাঁচ বছর আগেরটাই রয়ে গেছে। তাই না ?’
দুঃখী মানুষের মত মাথা নাড়ল জাফর। মুখে কিছু বলল না। ঘটনা বোধহয় ভালর দিকেই যাচ্ছে।
‘ আমার প্রস্তাব, আপনি আমার হাউজিং ব্যবসার ম্যনেজার হবেন।’ দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে সফল মানুষদের মত একটা ভঙ্গী করে বলল সালাম চৌধুরী। ‘ সুইট হাউজ যত দিচ্ছিল তার ডাবল আপনার বেতন। মাঠ পর্যায়ের কাজ অবশ্যই আপনি দেখাশোনা করবেন। এই বয়সে শ্রমিক, কনট্রাকটর, বা এই টাইপের লেবার মার্কা লোকজনদের সাথে গ্যাজ গ্যাজ করার রুচি আমার নেই। প্রয়োজনীয় লোকবল পাবেন আপনি। আমি এক ফোন দিলেই শহরের সব ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেকচার লুঙ্গি কাছা দিয়ে দৌড়ে আসবে।’
‘ বেতনটা আমার কম মনে হচ্ছে পরিশ্রম আর দায়িত্বের তুলনায়।’ চাঁছা ছোলা ভাবে বলল জাফর। মনে মনে অবশ্য দারুন খুশি। ডাবল বেতন ? খাইসেরে !
‘ আমি জানতাম।’ রাক্ষসের মত অট্টহাসি হেসে বলল সালাম সাহেব। ‘ ঠিক আছে প্রফিটের থ্রি পারসেনট আপনি পাবেন। লোভনীয় অফার তাই না ? কোটিপতি হয়ে যাবেন মিয়া । রাজি হলে হাত মেলান ।’
ভাল্লুকের মত বিশাল হাতের পাঞ্জাটা সামনে বাড়িয়ে দিল সালাম চৌধুরী।
দুই বিপরীত হাত এক হল।
‘ তো এই উপলক্ষে এক গ্লাস করে কর্নিয়াক হয়ে যাক ?’ অনুমতি চাইল সালাম সাহেব।
‘ এই ভর সন্ধ্যাবেলায় গিলতে বসবে নাকি ?’ মিষ্টি রিনরিনে মেয়েলী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো পিছন থেকে।
ঘাড় ফিরিয়ে চাইল জাফর।
বুকটা ধড়াস করে উঠলো। কারণ ছাড়াই ।
সেই মেয়েটা এসেছে। লিফটে যার সাথে দেখা হয়েছিল। কমলা পরী।
‘ আরে চলে এসেছ ?’ সহাস্যে বলল সালাম চৌধুরী। ‘ এসো পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।’
কমলাপরী হেঁটে গিয়ে সালাম চৌধুরীর পাশে দাঁড়ালো । সোজা চেয়ে আছে জাফরের দিকে। কোনরকমের জড়তা নেই বিশাল চোখদুটোতে । কৌতূহলী হয়ে জাফরকে দেখছে সে।
‘ মিস্টার জাফর, পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।’ কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে বলল সালাম সাহেব। ‘ আমার স্ত্রী মিসেস সালাম চৌধুরী। আমি অবশ্য কুমকুম বলে ডাকি। আর কুমকুম উনি আমাদের নতুন ম্যানেজার মিস্টার জাফর।’
ধাক্কাটা বেশ ভালই খেল জাফর।
সালাম সাহেবের স্ত্রী এই কমলা সুন্দরী ! কমলাপরীর বয়স একুশ বা বাইশের বেশি হবে না। নিশ্চয়ই টাকার লোভে বিয়ে করেছে বুড়ো ভামটাকে !
‘ অবাক হয়েছেন তাই না ?’ হাসতে হাসতে বলল সালাম চৌধুরী । ‘ সবাই আপনার মত বেকুব হয়ে যায়।’
‘ আরে নাহ ।’ বিব্রত হল জাফর।
‘ কুমকুম আসলে আমার সেক্রেটারি ছিল।’ ছেলেমানুষি হাসি হেসে বলল সালাম চৌধুরী। ‘ আমিই বেচারির প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। এই আর কি, হে হে ।’
‘ তোমাদের কর্নিয়াক দেব ?’ খসখসে গলায় জানতে চাইল কুমকুম।
‘ আরে দাও, দাও।’ আসর জমানোর মত একটা ভঙ্গী করে বলল সালাম সাহেব।
এক কোনে ক্যাবিনেট । সেটা ঠাসা বিচিত্র সব বোতল, হরেক গ্লাস আর আইস পিকার। বেঁটে একটা বোতল বের করে আনল কুমকুম । আড়চোখে তাকাতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল জাফর । মেয়েটা ওকেই দেখছে। এক মুহূর্তের জন্যও নজর সরায়নি ওর উপর থেকে।
‘ কোথায় উঠেছেন আপনি মিস্টার জাফর ?’ বেলুন গ্লাসে পচা গুড়ের রঙের পানীয় ঢালতে ঢালতে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত প্রশ্নটা করে বসলো কুমকুম।
‘ ঠিক জানি না ম্যাডাম।’ সত্যি কথাই বলল জাফর।
‘ থাকার ব্যবস্থাও আমার।’ মুনি ঋষিরা যেই ভাবে হাত তুলে বরদান করে ঠিক সেইভাবে হাত তুলে একটা ভঙ্গী করে বলল সালাম সাহেব। ‘ বেচারা নতুন এসেছে। থাকার ব্যাপারটাও আমাকে দেখতে হবে। চিন্তা করবেন না জাফর সাহব। নদীর পাশে একতলা একটা বাড়ি আছে আমার। ফুল ফার্নিশড । জল , কারেন্ট সব আছে। ওটা গেস্ট হাউজ হিসাবে ব্যবহার করি। আমার ড্রাইভার আপনাকে ওখানে নামিয়ে দিয়ে আসবে। সমস্যা হল জায়গাটা খুব নির্জন । একা থাকতে হবে। দারোয়ান বা বাবুর্চি নেই। তিন বেলা হোটেল থেকে খেয়ে নিতে হবে আপনাকে । বিল আমি অর্থাৎ কোম্পানি দেবে। আজ যাবার সময় এক প্যাকেট বিরিয়ানি কিনে নেবেন। নাম্বার ওয়ান বিরিয়ানি কোথায় পাওয়া যাবে সেটা আমার ড্রাইভার জানে।’
জাফর তখনও চেয়ে আছে কুমকুমের দিকে। মেয়েটা হাসছে ? কিন্তু কেন ? চোখা চোখি হতেই ঠোঁট টিপে হাসল আবারও । মেয়েটার চোখের তারায় দুষ্টুমি ঝিকিমিকি করে উঠলো যেন ।
জমুক খেলা। মনে মনে ভাবল জাফর।
তিন
এক সপ্তাহ পরের কথা ।
পাথর বিছানো পথটা ধরে হেঁটে যাচ্ছে কুমকুম। টাইট সালোয়ার কামিজে রূপ যেন ফেটে পড়ছে। বাহারি রঙের সিল্কের একটা স্কাফ মাথা ,ঘাড় গলা পেঁচিয়ে রেখেছে । ফলে দূর থেকে চেহারাটা বুঝার উপায় নেই। চোখে প্রায় পিরিচের সমান বড় সানগ্লাস।
ঠিক দুপুরবেলা। বেশ গরম। হলুদ রোদ।
নদীর পারে নির্জন একতলা একটা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। ঘাড় ঘুরিয়ে চারিদিকটা দেখে নিল সতর্ক ভাবে। নিজের গাড়িটা অনেক দূর রেখে হেঁটে এসেছে। ড্রাইভার নেই ওর।
বাড়িটা সুন্দর। টাকা আর রুচি না থাকলে বানান যায় না অমন বাড়ি। লাল টালির ছাদ। বাইরে বাগান। লালটানা আর বুনো গোলাপের ঝাড়।
বেল টিপল কুমকুম।
বেশ খানিক সময় পর দরজা খুলে গেল। জাফর দাঁড়িয়ে ওপাশে। হাতে কফির মগ । সেন্ডো গেঞ্জি আর রঙ জ্বলা গাবাডিনের শর্টসে দারুন লাগছে। খেলোয়াড় সুলভ ফিগার।
‘ কী ম্যানেজার সাহেব ? ছুটির দিন পেয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলেন নাকি ? এই দুপুরে কফি ? ভেতরে আসব ?’ দুষ্টু হাসি হেসে বলল কুমকুম।
‘ আমার কাছে কফিও যা বিষও তা।’ বিশ্বপ্রেমিক মার্কা হাসি উপহার দিয়ে বলল জাফর । ‘ আসুন ভেতরে । কেন যেন মনে হচ্ছিল আজ আপনার দেখা পাব ।’
‘ বাপরে, তলে তলে এতদূর ?’ ভেতরে ঢুকে নিজেই দরজা বন্ধ করে দিল কুমকুম।
হাসছে সে। মদির । ‘ মালিকের বউকে নিয়ে এত ভাবে কেউ ?’
‘ ভিখিরি ও নাকি কখনও কখনও ডাকাত হতে চায়।’ মগটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল জাফর।
দূরত্ব অল্পই ছিল দুইজনের মাঝে । প্রজাপতির মত উড়ে চলে এলো কুমকুম। কিছু বুঝে উঠার আগেই ওরা আবিস্কার করলো, একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে। পিষে ফেলবে যেন। পাগলের মত আচরণ করছে দুইজনেই । অথচ এটাও স্বাভাবিক আচরণ। দুই জোড়া ঠোঁট সেঁটে আছে একে অপরের সাথে।
পায়ে পায়ে কখন যে বেডরুমে চলে এসেছে কেউ জানে না।
আবিস্কার করলো বিছানাতে।
ব্যস্ত দুইজন।
চার
পাশাপাশি দুইজনে শুয়ে আছে । নগ্ন। চাদরে বুক পর্যন্ত ঢাকা। মেঝেতে নানান জায়গায় ছড়িয়ে আছে ওদের জামাকাপড়।
কামরার ভেতরে আধো ছায়া। আধো অন্ধকার। কুমকুমের গায়ে ধীরে ধীরে আঙুল বোলাচ্ছে জাফর। আইভরির মত মসৃণ শরীর। নরম। তৃপ্তিদায়ক। বিড়ালের মত চোখ বুজে আছে কুমকুম।
‘ আমি জানতাম তুমি আসবে।’ বলার মত নতুন কিছু না পেয়ে আগের কথাটাই আবার বলল জাফর।
‘ বুড়োটার সাথে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম ।আর পারছিলাম না।’ ধীরে ধীরে বলল কুমকুম। ‘ কেন যেন মনে হচ্ছিল তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেবে না।’
‘ সালাম সাহেব বাড়িতে নেই আজ ?’
‘ না। ছুটির দিনে বুড়ো ভামটা চলে যায় টাউন হাউজ ক্লাবে। গলফ খেলে দুপুরে। লাঞ্চ খেয়ে একদম সন্ধ্যায় ফেরে। এই একদিনই খানিকটা সময় আমি মুক্তি পাই।’
‘ তোমাকে সাথে করে নিয়ে যেতে চায় না ?’
‘ চায় না আবার ? বিয়ের পর কয়েকবার গিয়েছি। ভাল লাগেনি। সালামের বন্ধু বান্ধবরা ওর মতই সব। বুড়ো হাবড়া আর টাকা ছাড়া কিছু বুঝে না। আমি গেলে কেমন লোভীর মত তাকায়। গা ঘিনঘিন করে। পরে আর যেতে চাইতাম না। প্রথম প্রথম জোড় করতো সালাম। পরে বুঝে গেছে। একাই যায়।’
কুমকুমকে জড়িয়ে ধরে ওর ঠোঁটে চুমু খেল জাফর। সাড়া দিল মেয়েটা।
নিজেকে মহাভাগ্যবান মনে হতে লাগল জাফরের। অবশ্য নিজের উপর আস্থা আছে ষোল আনা। মেদহীন এক হারা শরীর ওর। প্রায় ছয় ফুট লম্বা। মুখটা লম্বাটে । থুতুনিতে ভাঁজ আছে। মাথা ভর্তি একগাদা চুল। এলোমেলো। আকর্ষণীয় চোখ। নিয়মিত ব্যায়াম করায় নড়াচড়ায় খেলোয়াড় সুলভ একটা ভাব আছে।
আরও একবার প্রেম করলো ওরা।
জাফরের মাথার ভেতরে জটিল একটা প্ল্যান হামাগুড়ি দিচ্ছে।
কোন বিখ্যাত বা মহান লোক বলেছিলেন - সুযোগ কখন কখন খুব আস্তে আস্তে কড়া নাড়ে। কান পেতে থাকতে হয়। আর জাফরের বেলায় তো সুযোগ দরজায় এসে ধমা ধম লাথি মারছে ।
কাজ বাগাতে হবে।
পাখি নিজেই উড়ে চলে এসেছে ।
‘ সালাম সাহেবের সাথে সম্পর্ক হল কেমন করে ?’ অন্ধকারে সিগারেট ধরাতে ধরাতে জানতে চাইল জাফর।
জাফরের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল কুমকুম।
‘সেক্রেটারি হিসাবে কাজ করতাম পেটের দায়ে।’ ধীরে ধীরে বলতে লাগল কুমকুম। কণ্ঠস্বরে রাজ্যের বিষাদ। ‘ বেতন ভালই দিত। তবে সময় সুযোগ পেলেই গায়ে হাত দিত। চাকরী ছেড়ে দেব সেই উপায় ছিল না। ওর কাছ থেকে চলে গেলে নওয়াবগঞ্জে কেউ চাকরী দেবে না। শেষে শর্ত দিলাম বিয়ে করতে হবে। করলো । কিন্তু সুখ জিনিসটা কি আজও বুঝিনি। বুড়োটা টাকার পিছনে দৌড়ায় শুধু। আর বয়সের তফাৎটার জন্য লোকজন খুব হাসত। ব্যঙ্গ করতো নানান রকম। লিফটে তোমাকে দেখেই পাগল হয়ে গিয়েছিলাম।’
‘ আমিও সোনা।’ সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে টিপে মারতে মারতে বলল জাফর। ‘ তোমাকে চাই আমি।’
‘ পাবে। রোজ শুক্রবার চলে আসব।’
‘ উহু, একেবারে চাই।’
‘তা কি করে সম্ভব ? ‘ হাসল কুমকুম।
‘ সম্ভব হবে না কেন ?’ কুমকুমকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে বলল জাফর। ‘ কোন রকম দুর্ঘটনায় মারা যেতে পারেন না সালাম চৌধুরী ?’
‘ পাগল হয়ে গেলে না তো ?’ দম আটকে শিউরে উঠলো কুমকুম।
‘ সম্ভবত পাগলই হয়ে গেছি।’ মাথা নাড়ল জাফর। ‘ জানি না। তবে তোমাকে পাবার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ আর নোংরা কাজ করতে রাজি আছি।’
‘ তোমার কথা শুনে আমার কেমন ভয় করছে জাফর।’ ফিসফিস করে বলল কুমকুম।
‘ সত্যি করে বল তো, তুমি আমাকে চাও কি না ?’ ধীরে ধীরে চাল দিচ্ছে জাফর। মনে মনে জানে ফাঁদে আঁটকে গেছে বোকা মেয়েটা। নড়া চড়া করবে। গাইগুই করবে। কিন্তু ফাঁদ থেকে বের হতে পারবে না।
‘চাই তো। কিন্তু...।’ আকুল ভাবে বলল কুমকুম।
‘ কোন কিন্তু না। যা করার আমি করব। তার আগে বল তো সালাম সাহেব উইল টুইল কিছু করেছেন ? আগের ঘরের কোন বাচ্চা কাচ্চা আছে ? ‘
‘ না ,নেই। আগে বিয়ে করেনি। উইলের ব্যাপারে কিছু জানি না। তবে এক কোটি টাকার জীবনবীমা করেছিল ওটা জানি। ওটার নমিনি আমি। কোন রকম দুর্ঘটনায় সালাম মারা গেলে টাকাটা আমি পাব। সম্পত্তির ব্যাপারে খোঁজ নিতে হবে।’
‘ নাও। দুর্ঘটনা অনেক ভাবে ঘটতে পারে।’ নেকড়ের মত ধূর্ত হাসি হাসল জাফর। ‘মাতাল অবস্থায় আট তলার বারান্দা থেকে পড়ে যেতে পারে না লোকটা ? সবাই জানে সন্ধ্যার পর বারান্দায় বসে ঘণ্টা দুইয়েক মদ খায় সালাম চৌধুরী। আর তোমাদের বারান্দার রেলিঙ খুব ছোট। পেট পর্যন্ত লোহার গ্রিল ও বসায়নি গাধাটা । প্রকৃতির শোভা আর তাজা বাতাস পছন্দ করে বেকুব বুড়ো।’
জাফরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল কুমকুম। কাঁপা গলায় বলল ,’ আমার জন্য তুমি এত বড় ঝুঁকি নেবে ?’
‘নেব সোনা ।কারন তোমাকে আমি চাই।’ আবেগি গলায় বলল জাফর।
পাঁচ
তিন মাস পর।
রাত সাড়ে নয়টা। সালাম ম্যানসন।
দরজা খুলেই দরাজ গলায় হেসে ফেলল সালাম চৌধুরী। ‘ আরে জাফর সাহেব যে । আসুন আসুন।’
ভেতরে ঢুকে পড়লো জাফর।
হাতে পাতলা ব্রিফকেস। দরকারি কাগজপত্রে ভর্তি। ইনডিগো ব্লু সামার স্যুটে জাফরকে বেশ চোস্ত আর চৌকস লাগছে।
প্রথমেই নজর গেল কুমকুমের উপর। নরম চামড়ার সোফার উপর বসে আছে। আড় চোখে জাফরের দিকে তাকাল। দুষ্টুমিতে ঝিকিমিকি করে উঠলো ওর গভীর কালো চোখের তারা। পরক্ষণেই চোখ ফিরিয়ে নিল।
কুমকুমকে দেখে ঢোক গিলল জাফর। লাল রঙের শাড়ি, ব্লাউজ, স্যান্ডেল, কপালের টিপ, আর কানের দুল। সব মিলিয়ে জ্বলন্ত একটা কয়লার মত লাগছে। সবাইকে আর সব কিছুকে পোড়াবে এই মেয়ে- ভাবল মনে মনে। সালাম শূয়রের বাচ্চা ভাগ্যবান , এমন একটা মেয়েকে পেয়েছে। যে কেউ বর্তে যাবে কুমকুমের মত মেয়েকে জীবনসঙ্গী হিসাবে পেলে।
‘ ধন্যবাদ স্যার।’ শান্ত গলায় বলল জাফর। ‘ মাঠে খুব বিজি ছিলাম। তাই ফিরতে এত দেরি হল। প্রজেক্টের কাজ একটু দেখতে হবে আপনাকে ।’
‘ নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।’ প্রাণবন্ত হাসি হাসলো সালাম চৌধুরী। ‘ নাহ মিয়া, আপনি আমার জন্য খুব লাকি। দারুন কাজ দেখাচ্ছেন।’
‘ কাজ করছি নিজের গরজে স্যার।’ বিনয় দেখাল জাফর । ‘ প্রজেক্ট সফল হলে আমার লাভ।’
‘ আরে তাইতো, ব্যাপারটা তো আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।’ চোখ মটকে হাসল সালাম চৌধুরী। সুদর্শন এই তরুণের উপর মনে মনে দারুন খুশি।
দারুন কাজ দেখাচ্ছে ছেলেটা।
সপ্তাহের ছয় দিন, সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত কাজ করে জাফর। শহরে যতগুলো জমি সালাম সাহেবের আছে, সবগুলো নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পরীক্ষা করেছে জাফর। কাগজ পত্র ঠিক ঠাক করেছে। একটা প্রজেক্ট শুরু করছে সামনের সপ্তাহ থেকে। করটেয টাইপের অ্যাপারমেনট বানানো হবে। তারপর ভাড়া। মাস গেলেই ত্রিশ লাখ টাকা ভাড়া পাবে সালাম সাহেব । বসে বসেই।
সপ্তাহে একদিন ছুটি পায় জাফর।
কয়েক বার টাউন হাউজ ক্লাবে নিয়ে যেতে চেয়েছিল সে। কিন্তু জাফর রাজি হয়নি একবারও। ছুটির দিনটা প্রায় ঘুমিয়ে কাটায়। ক্লান্ত থাকে।
সেটাই স্বাভাবিক !
‘ আমাদের খানিক কর্নিয়াক দাও তো কুমকুম।’ বউয়ের দিকে ফিরে অনুরোধ করল সালাম চৌধুরী। তারপর জাফরের দিকে ফিরে খুশি খুশি গলায় বলল, ’ প্রজেক্টের কাজ শুরু করব সামনের সপ্তাহে। অথচ দেখুন গত তিন দিন আগে থেকেই কাস্টমার পাওয়া শুরু করেছি। ফোন আসছে নানান জায়গা থেকে। কত বড় করটেয় ? এক একটা ফ্ল্যাট কত স্কয়ার ফুট হবে ? কিছু না দেখেই বুকিং দিতে চাচ্ছে লোকে ! আজব তো ! কি ভাবে করলেন মিয়া ?’
‘ জনসংযোগ স্যার ।’ মিষ্টি হেসে বলল জাফর। ‘ মাত্র একটা প্রজেক্ট শেষ হলেই দেখবেন নব্য ধনী, অলস আর কালো টাকার মালিকরা সবাই ছুটে আসবে আপনার কাছে। আপনার এই বাড়ি কেনার জন্য একটা ক্রেজ তৈরি হবে। নওয়াবগঞ্জে জমির দাম বাড়তে বাড়তে জমির দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে ভাবতে পারেন ?’
‘ পারি ।’কর্নিয়াকের বেলুন গ্লাস হাতে নিতে নিতে বলল সালাম সাহেব।
‘ আর এই শহরে সবচেয়ে বেশি জমির মালিক কিন্তু আপনি।’ মনে করিয়ে দিল জাফর।
ব্রিফকেস খুলে কতগুলো প্রিন্ট করা কাগজ বের করতে লাগল ব্যস্ত হাতে।
হাসতে হাসতে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো সালাম চৌধুরী। মুখে তৃপ্তির হাসি।
‘ হ্যাঁ, জাফর।’ গ্লাস ভর্তি কর্নিয়াকে চুমুক দিতে দিতে বলল সে।‘ স্বপ্নের এই শহরটা আমার হাতেই থাকছে এই ভেবে ভাল লাগছে । মুকুটহীন সম্রাট হতে চাই আমি এই শহরের । আমার প্রতিদ্বন্দ্বী এক জনই ছিল - ইয়াকুব আলী । বেচারা ঠাণ্ডা মেরে গেছে বহু আগেই। হা হা হা।’
দ্রুত চারিদিকটা দেখে নিল জাফর।
ওদের পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে সালাম চৌধুরী। চেয়ে আছে দূরের দালান বাড়িগুলোর দিকে। ওখানের হলুদ - কমলা আলোগুলো সব সময় মুগ্ধ করে তাকে।
গত তিন মাসে, প্রতি সপ্তাহে বেশ কয়েকদিন করে এখানে এসেছে জাফর । সালাম চৌধুরীর প্রত্যেকটা পদক্ষেপ মুখস্থ ওর । বারান্দায় দাঁড়িয়ে মিনিট পাঁচেক বকবক করবে। আরও খানিক কর্নিয়াক গিলবে। আবার এসে বসবে টেবিলে। তারপর ব্যবসা সংক্রান্ত কথা বলে বিদায় করবে ওকে।
সময় খুব কম।
ঘাড় ফিরিয়ে কুমকুমের দিকে তাকালো জাফর। সোজা ওর চোখের দিকে চেয়ে আছে মেয়েটা ।
কিছুটা উত্তেজিত । ঠোঁটদুটো বাঁকা করে অদ্ভুত একটা ইঙ্গিত করলো।
‘ঠিকই বলেছেন স্যার।’ গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে কথা বলতে বলতে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল জাফর । হাতে কয়েকটা কাগজ। ‘ এই ধরনের প্রজেক্ট সব সময় সুপারহিট হয়। তবে মূল কয়েকটা পয়েন্ট...।’
ততক্ষণে সালাম চৌধুরীর একদম পাশে এসে দাঁড়িয়েছে জাফর। দরদর করে ঘামছে।
ইচ্ছে করেই হাত থেকে কাগজগুলো ফেলে দিল। পড়লো একদম সালাম সাহেবের পায়ের কাছে। কথা বলতে বলতে ঝপ করে বসে পড়লো জাফর। কাগজগুলো তুলবে অমন একটা ভাব। খপ করে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল সালাম চৌধুরীর দুই পায়ের গোড়ালি। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঠেলে দিল উপরের দিকে । রেলিঙের বাইরে।
ভয়াল চিৎকার করে উঠলো সালাম চৌধুরী।
ডুবন্ত মানুষের মত দুই হাত দিয়ে শূন্যে কিছু ধরার চেষ্টা করলো। কি ভাবে যেন এক হাত দিয়ে মুঠো করে রেলিঙটা ধরে ফেলল। অন্য হাত বাড়িয়ে দিতেই জাফরের গলার টাইটা নাগাল পেল।
কাকতালীয় ভাবে ধরে ফেলল সেটা ও । চেঁচাচ্ছে পাগলের মত।
‘ বাঁচাও, বাঁচাও ।’ বিরতিহীন ভাবে চিৎকার করছে সালাম চৌধুরী। ঝুলন্ত অবস্থায় ঘাড় ফিরিয়ে একবার নীচের দিকে তাকালো । শিউরে উঠলো শরীরটা। চোখদুটো পানতুয়ার মত বড় বড় হয়ে গেছে। চেহারাতে আতঙ্ক, অবিশ্বাস আর ঘৃনা। সাহায়্যের আশায় চিৎকার করে উঠলো , ‘ কুমকুম আমাকে বাঁচাও।’
মনে মনে প্রমাদ গুনলো জাফর। হারামজাদাটা যে ভাবে চেঁচাচ্ছে তাতে না পুরো শহরের মানুষ এসে এই বিল্ডিঙের নীচে জড় হয়ে যায়। গায়ের সমস্ত শক্তি একত্র করে ঘুসি মারলো জাফর। সালাম চৌধুরীর চেহারা বরাবর। থেপাত করে বিচ্ছিরি একটা শব্দ হল। সম্ভবত বিকেল থেকেই মদের নেশায় চুর হয়ে ছিল। এক ঘুষিতেই হাত খসে গেল।
তীব্র একটা আর্তনাদ করে পড়তে লাগল মোটা শরীরটা। কয়েক সেকেন্ড পরই নীচের শক্ত পিচ ঢালাই করা রাস্তায় গিয়ে পড়লো। এত উপর থেকেও তরমুজ ফাটার মত বিচ্ছিরি শব্দ পেল ওরা দুজন। ভাঙ্গা পুতুলের মত পড়ে আছে সালাম চৌধুরী। রক্ত আর হলুদ মগজে মাখামাখি।
দ্রুত বেলকনির সামনে থেকে সরে গেল জাফর। হৈ হল্লা করে লোকজন ছুটে আসছে নীচে।
চেয়ে দেখল আগের মতই সোফায় বসে আছে কুমকুম। হাতে একটা সিনে ম্যাগাজিন ধরা । চোখদুটো বিস্ফোরিত। ঠোঁট দুটো পরস্পরের উপর শক্ত ভাবে সেঁটে আছে ।
‘ তুমি ব্রিফকেস আর কাগজ নিয়ে এই দরজা দিয়ে ভেতরে চলে যাও।’ দ্রুত বলল কুমকুম। ‘ সোজা আমাদের বেডরুম পাবে। ডানে একটা দরজা আছে। ওখানে সরু একটা সিঁড়ি। আগুন লাগলে যাতে পালানো যায়। ঐ সিঁড়ি দিয়ে বাড়ির পিছনের গ্যারেজে নেমে যেতে পারবে। কোম্পানি তোমাকে গাড়ি দিয়েছে না ওটা কোথায় রেখেছ ?’
‘ বাড়িতে রেখে হেঁটে এসেছি।’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল জাফর।
‘ দারুন কাজ। যাও গ্যারেজ থেকে বের হলেই সরু গলির একটা রাস্তা পাবে। ওটা পাড় হলে বড় রাস্তা। হেঁটে বাড়ি ফিরবে। ট্যাক্সি নেবে না। সাক্ষী থেকে যাবে। বা ট্যাক্সি করে নদীর পাড়ের কফি শপে নামবে। ওখান থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরবে। জলদি কর । নীচে সাংঘাতিক গোলমাল হচ্ছে। থানায় ফোন করছি আমি। বলব, বিকেল থেকেই অতিরিক্ত মদ গিলছিল সালাম। ’
মাথা ঝাঁকিয়ে বিদায় নিল জাফর।
গত তিন মাসে প্রত্যেক শুক্রবার ওর বাসায় এসেছিল কুমকুম। প্ল্যানটা নিয়ে হাজারবার আলোচনা করেছে ওরা। একদম নিখুঁত। পুলিশের বাপের ও সাধ্য নেই ধরার।
জাফর চলে যেতেই কর্নিয়াকের বোতলটা পুরো খালি করলো কুমকুম। বাথরুমের কমোডে কর্নিয়াক ঢেলে ফ্ল্যাশ করে খালি বোতলটা বারান্দায় নিয়ে রাখল। গ্লাসটা নিয়েই নীচে পড়েছে বুড়ো ভামটা। এবার টেলিফোন তুলেই থানায় ডায়াল করলো ।
যতদূর সম্ভবত হাউ মাউ করে কাঁদতে হবে- নিজেকে মনে করিয়ে দিলো কুমকুম।
ছয়
সেই রাতেই।
রাত সাড়ে দশটা।
সোফায় বসে কাঁদছে কুমকুম। সামনে অন্য একটা সোফায় বসে আছেন নওয়াবগঞ্জ থানার ওসি হায়দার খান। এবং সামনে তালগাছের মত দাঁড়িয়ে আছে ইন্সপেক্টর এফ, রহমান। উনার হাতে একটা নোট বই।
জাফর বসে আছে চেয়ারে। টেবিলের উল্টোপাশের যে চেয়ারে হর হামেশা ও বসে ।
ঝপাং করে নোট বইটা বন্ধ করলো ইন্সপেক্টর এফ, রহমান। ধূর্ত চোখে চারিদিকটা দেখছে সে। যা লেখার লিখে নিয়েছে নোট বইতে। এতক্ষণ দুইজন মিলে টানা জেরা করেছে কুমকুম আর জাফরকে। ওসি হায়দার খানই ফোন করে জাফরকে ডেকে এনেছে।
‘ ব্যাপারটা খুব দুঃখজনক।’ সহানুভূতির সাথে মাথা নেড়ে বললেন হায়দার খান। ‘ যা বুঝলাম পুরো ব্যাপারটাই একটা দুর্ঘটনা। সালাম সাহেবকে দীর্ঘ অনেকগুলো বছর ধরেই চিনতাম। কতবার বলেছি, আপনি হয় মদ খাওয়া কমান অথবা মাতাল অবস্থায় বারান্দায় বসে হাওয়া খাওয়ার অভ্যাস বন্ধ করুন। কথা কানে তুললে তো ? এখন দেখুন নিয়তি আর কাকে বলে !’
আর কি বলবেন বুঝতে না পেরে চুপ করলেন হায়দার খান।
তখনও কেঁদেই যাচ্ছে কুমকুম। যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারবে বেচারি একদম ভেঙ্গে পড়েছে !
‘ আমরা উঠছি এখন।’ বিশাল শরীর নিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাড়াতে দাড়াতে বললেন হায়দার খান। ‘ সালাম সাহেবের ডেড বডি মর্গে নেয়া হয়েছে। কথা দিচ্ছি যত দ্রুত সম্ভব রিলিজের ব্যবস্থা করা হবে। তদন্ত করার মত কিছু নেই। দোয়া করি শোকটা যেন সামলে নিতে পারেন। আর জাফর সাহেব আপনি কুমকুম ম্যাডামের দিকে খেয়াল রাখবেন। ব্যবসার হাল আপনার ম্যাডাম ধরবেন। আশা করি পাশে থেকে আপনি পূর্ণ সহযোগীটা করবেন।’
সুবোধ বালকের মত মাথা নাড়ল জাফর। চেহারায় শোকের ছায়া।
‘ কী ব্যাপার রহমান সাহেব ? কিছু বলবেন নাকি ? দাঁড়িয়ে রইলেন যে ?’ বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করলেন হায়দার খান।
‘ শেষ একটা প্রশ্ন ছিল ।’ শুকনো মুখে বলল এফ, রহমান। ‘ কুমকুম ম্যাডাম আপনার স্বামী কোন রকম ইনস্যুরেন্স করেছিল অমন কিছু আপনি জানেন ?’ মানে লাইফ ইনস্যুরেন্স। উনি মারা গেলে টাকা পয়সা ...।’
‘ না।’ কাঁদতে কাঁদতে বলল কুমকুম। ‘ এইসব নিয়ে কখনই আমাদের মধ্যে কথা হয়নি। বেচারা আমাকে পাগলের মত ভালবাসতো। লাইফ ইনস্যুরেন্সের কথা এই প্রথমবার আপনার মুখে শুনলাম।’
‘ কি সব আবোল তাবোল প্রশ্ন করেন না আপনি রহমান সাহেব ।’ বিরক্ত হলেন হায়দার খান। ‘ আর কোন টপিক পেলেন না ? আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন না লাইফ ইনস্যুরেন্সের টাকার জন্য কুমকুম ম্যাডাম উনার স্বামীকে ব্যালকনি দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে ? অ্যাঁ ? আচ্ছা লোক আপনি। এই সালাম ম্যানসনটাই তো বিয়ের সময় ম্যাডামের নামে লিখে দিয়েছিলেন সালাম সাহেব। সবাই জানে। টাকার অভাব আছে নাকি উনাদের ? এমনিতেই সব কুমকুম ম্যাডাম পাবেন । নাহ। আপনি ভাই পারেন ও।’
গজ গজ করতে করতে বের হয়ে গেলেন ওসি হায়দার খান।
কয়েক মুহূর্ত বোকার মত দাঁড়িয়ে রইল ইন্সপেক্টর এফ রহমান । শেষ চেষ্টা হিসাবে জাফর আর কুমকুমের দিকে কয়েকবার কুটিল চোখে তাকাল। তারপর ওসি সাহেবকে অনুসরণ করলো।
বেশ কয়েক মুহূর্ত নিজেদের জায়গায় বসে রইল ওরা। জাফরই প্রথম উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। আর কুমকুম ব্যালকনির ওখানে গিয়ে বারান্দার দরজা বন্ধ করল। কায়দা করে দেখে নিল নীচে কেউ আছে কি না। নেই। পুলিশের শেষ গাড়িটা পর্যন্ত চলে গেছে।
চারিদিক একদম সুনসান।
‘ তারপর ?’ সকৌতুকে জানতে চাইল জাফর।
ফিক করে হেসে ফেলল কুমকুম।
‘ সালাম সাহেবের মৃত্যু কাল সারাদিন টক অভ দ্যা টাউন হবে।’ হাসতে হাসতে বলল সে। ‘ এক সপ্তাহ থাকবে অমনটা। তারপর সব আগের মতই হয়ে যাবে। লোকজন সব ভুলে যাবে ধীরে ধীরে।তখন আমরা কি করব গো ?’
‘ কি আর করব ?’ কৃত্রিম চিন্তিত একটা ভঙ্গী করে বলল জাফর। ‘ মাস ছয়েক অপেক্ষা করব। প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করব। টাউন হাউজ ক্লাবে ডিনার করতে যাব দুইজনে মিলে, এই ভাবে আরও মাস তিনেক যাবার পর বড় একটা অনুষ্ঠান করে বিয়ে করে ফেলব।’
দৌড়ে এসে জাফরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো কুমকুম। পাগলের মত মুখ ঘষতে লাগল ওর বুকে ।
‘ তোমাকে অনেক ভালবাসি সোনা ।’ ফিস ফিস করে বলল মেয়েটা। ‘ রাক্ষসপুরী থেকে বাঁচাতে তুমি এসেছ আমার জীবনে।’
‘ আমিই তোমার রাজপুত্র।’ চুমু খেতে খেতে বলল জাফর। মনে মনে হাসছে। যাক, প্ল্যানমতই যাচ্ছে সব। সুদর্শন গর্দভ হয়ে জন্ম নেয়নি ও। ক্ষুরধার একটা মগজ ও আছে। কত দ্রুত মেয়েটাকে ফাঁসিয়ে কাজ বাগিয়ে ফেলেছে । ভাবা যায় ?
আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লো ওরা। সোফার উপর ধপাস করে শুয়ে পড়লো। আজ আর কোন ভয় , বাঁধা নেই। মাত্র নিজের জামা খুলেছে জাফর তখনই ওদের পিলে চমকে দিয়ে ডোর বেল বেজে উঠলো।
‘ হায় হায়। কে এলো এই সময়ে ?’ ভয়ার্ত সুরে বলল কুমকুম।
‘ তুমি জলদি বেডরুমে গিয়ে পোশাক ঠিক করে এসো। আমি দরজা খুলছি ।’ ফিসফিস করে বলল জাফর।
নিজেকে সামলাতে সামলাতে দ্রুত পাশের কামরায় চলে গেল কুমকুম। আর দরজার দিকে এগিয়ে গেল জাফর। জামা পরছে। যত দ্রুত সম্ভব। ডোরবেলটা আবারও বেজে উঠলো। বাইরে যেই থাকুক ধৈয়্য কম।
দরজা খুলে অবাক হল জাফর।
রোগা বাঁটুল ধরনের একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে। মাথা ভর্তি টাক। অল্প কিছু চুল লেপটে আছে। চেহারায় কোন ভাব নেই। চোখদুটো ভেড়ার চোখের মত মড়া।
‘ সরি আপনাকে তো ঠিক...।’ কথা বলা শুরু করলো জাফর। তার আগেই লোকটা ওকে ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লো। ইতিউতি তাকাচ্ছে। শেয়ালের মত।
‘ কুমকুম কোথায় ?’ কর্কশ গলায় বলল আগন্তুক।
রেগে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল জাফর। লোকটার ভাব চক্কর সুবিধার ঠেকছে না। চেহারা আর চাল চলনে এমন একটা ধাঁচ আছে যে সহজে তাচ্ছিল্য করা যায় না। দুষ্টু প্রকৃতির মানুষ না। তবে সাধু ও না। কেমন যেন !
‘ স্যার, আপনার পরিচয় ?’ নরম সুরে বলল জাফর। কাউকেই চটাতে চায় না সে এই মুহূর্তে। কঠিন খেলা চলছে। কে জানে, কোথাও কোন ভুল হলে যদি দাবার বোর্ড উল্টে যায় ।
এই প্রথম জাফরের চোখের দিকে তাকাল আগন্তুক । তীব্র চাউনি। জাফরের ইস্ত্রি বিহীন শার্ট দেখল অনেকটা সময় ধরে। পরক্ষণেই মেঝেতে পড়ে থাকা টাইয়ের দিকে চোখ গেল।
মনে মনে হায় হায় করে উঠলো জাফর। টাইটা তুলে নিতে ভুলে গিয়েছিল। তবু ভাল কুমকুমের ব্রা পড়ে ছিল না।
‘ আমাকে আপনি চিনবেন না।’ কর্কশ কিন্তু মাপা গলায় বলল লোকটা। ‘ আমি আপনাদের রঙ্গলীলা দেখার জন্য এখানে আসিনি। দরকারি কাজ না থাকলে যেখানে সেখানে নাক গলায় না ইয়াকুব আলী।’
ইয়াকুব আলী !
নামটা চেনা চেনা লাগছিল।
কোথায় যেন শুনেছে।
পরক্ষণেই ধুম করে মনে পড়ে গেল। ইয়াকুব আলী- সালাম চৌধুরীর পুরানো বন্ধু । বিজনেস পাটনার ছিল। এই লোক এখানে কেন ?
কিছু বলতে যাবে জাফর তার আগেই দরজার সামনে থেকে হিসিয়ে উঠলো কুমকুম- ‘ আপনি ? আপনি এখানে কি করতে এসেছেন ? ’
মুচকি হাসি উপহার দিল ইয়াকুব আলী।
কেমন যেন ফিচেল মার্কা হাসি। ‘ আমাকে হাসালে তুমি কুমকুম। পুরানো বন্ধু মরে গেছে আর আমি মৃত বন্ধুর বাড়িতে তার সদ্য বিধবা বউকে দেখে যেতে পারি না ?’
‘ চলে যান এখান থেকে।’ রাগি গলায় বলল কুমকুম। ‘ আপনার চেহারাও দেখতে চাই না আমি। আপনি একটা নোংরা রুচির মানুষ।’
‘ তা অবশ্য ঠিক বলেছ।’ এখন আর হাসছে না ইয়াকুব আলী। চেহারা আগের মতই গম্ভীর। ফিরে তাকাল সে জাফরের দিকে । ‘ মিস্টার জাফর , আপনি জানেন না, অনেকগুলো বছর আগে আমি কুমকুমের প্রেমে পড়েছিলাম। সে তখন সামান্য বেতনের একটা চাকরী খুঁজে বেড়াচ্ছিল এই শহরের সবগুলো অফিসে। আমি তাকে আমার অফিসে কাজ দিয়েছিলাম। আমরা বেশ কাছাকাছি এসেছিলাম। তাই না কুমকুম ?’
অশ্লীল ভঙ্গীতে চোখ টিপল ইয়াকুব আলী।
‘ মোটেই না।’ চিৎকার করে বলল কুমকুম। ‘ আপনি আমাকে হ্যারাস করতেন। বাধ্য হয়ে আমি সালামের কাছে চাকরির জন্য এসেছিলাম।’
‘ এবং তুমি তাকে বিয়ে করেছ ।’
‘ অন্যায় কিছু করিনি।’
‘ তা করনি , কিন্তু আমি সত্যি সত্যি তোমার প্রেমে পড়েছিলাম।’
‘ নিকুচি করি আপনার প্রেমের।’ রাগে উম্মাদিনীর মত লাগছে কুমকুমের চেহারা। দুই চোখ ভাঁটার মত জ্বলছে। রাগি ড্রাগনের মত ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলছে ।
বোকার মত চুপচাপ দাঁড়িয়ে ওদের মঞ্চ নাটক দেখছিল জাফর।
ঘটনা যে বিচ্ছিরি দিকে মোড় নিচ্ছে। বুঝতে পারছে পরিষ্কার।
‘ তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেছ কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য তোমাকে ভুলতে পারিনি।’ ফিসফিস করে বলতে লাগল বুড়ো প্রেমিক ইয়াকুব আলী। ‘ সারাক্ষণ তোমাকে কামনা করতাম আমি। এবং দোস্ত সালাম হারামজাদা সেটা বুঝে গেল। আমরা আলাদা হয়ে গেলাম। একে অপরের চরম শত্রু হয়ে গেলাম । তবু তোমার প্রতি ভালবাসা এক রত্তিও কমলো না।’
‘ ওটা আপনার ভালবাসা না। লালসা।’ খেঁকিয়ে উঠলো কুমকুম। ‘ বন্ধুর বউয়ের দিকে নোংরা নজর দিতে খারাপ লাগে না আপনার ?’
‘ নাহ। লাগে না । ’ শুকনো থমথমে গলায় বলল ইয়াকুব আলী। ‘ কারন ভালবাসা অন্ধ । তোমাকে পাবার কোন উপায় নেই তারপরও কেমন যেন বিকারগ্রস্থ হয়ে গেলাম। মেডিকেলের ভাষায় অবসেসড না কি যেন বলে । তোমাদের এই সালাম ম্যানসনের সামনে ছয়তলা দালানটা আছে না ? অ্যাপার্টমেনট হিসাবে ভাড়া দেয় যে। ছয়তলার ফ্ল্যাটটা গোপনে ভাড়া নিলাম আমি। কেউ জানত না , প্রতিদিন সন্ধ্যায় চলে আসতাম । রাত আটটা, নয়টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেই ফ্ল্যাটের সব লাইট অফ করে বারান্দায় বসে থাকতাম আমি। হাতে শক্তিশালী একটা টেলিস্কোপ আর সেই টেলিস্কোপের সাথে ফিট করা থাকতো দামি একটা ক্যামেরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তোমাদের জামাই বউকে দেখতাম। আসলে ভুল বললাম, শুধু তোমাকে দেখতাম। তোমার প্রতিটা নড়াচড়া মুগ্ধ করতো আমাকে। নতুন করে আবার তোমাকে পেতে চাইতাম। ঈর্ষা করতাম সালাম মটকুটাকে । মাঝে মাঝে তো তোমরা বেডরুমের লাইট অফ করতে ভুলে যেতে। ইচ্ছা মত ছবি তুলতাম আমি।’
চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলে যাচ্ছিল ইয়াকুব আলী। চেহারায় কোন ভাব নেই।
সাক্ষীগোপালের মত এক পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল জাফর। কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না । তবে মনোযোগ দিয়ে প্রত্যেকটা শব্দ গিলছিল। প্রত্যেকটা বাক্য, শব্দ গুরুত্বপূর্ণ ।
হঠাৎ কি একটা সম্ভবনার কথা মনে হতেই ঘাড়ের চুলগুলো সরসর করে দাঁড়িয়ে গেল। ঝট করে ফিরে তাকাল ইয়াকুব আলীর দিকে।
তোম্বা মুখে ওর দিকেই চেয়ে আছে ইয়াকুব আলী। অলস পায়ে হেঁটে গিয়ে ধপাস করে সোফায় বসে পড়লো।
‘ আজ সন্ধ্যা থেকেও বসে ছিলাম।’ নাকের ভেতরে আঙুল ঢুকিয়ে ময়লা বের করে আনতে আনতে বলল ইয়াকুব আলী। ‘ টেলিস্কোপ আর ক্যামেরা নিয়ে উপভোগ করছিলাম সন্ধ্যাটা । তারপর আর কি, বোনাস বলতে একটা কথা আছে না ? আজ আমার বোনাস পিরিয়ড ছিল। তুললাম ছবি। অপূর্ব, অদ্ভুত, শৈল্পিক। তবে...।’
‘ কী বলতে চাইছেন আপনি ?’ এই প্রথম গলা চড়ালো জাফর। তবে ততক্ষণে কুমকুমও বুঝে গেছে। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে।
‘ ছবি।’ শান্ত গলায় বলল ইয়াকুব আলী। ‘ বন্ধুর মৃত্যুর দুর্লভ ছবি তুললাম। আট তলার উপর থেকে বেচারা পড়ছে। ধাক্কা দিচ্ছে সুদর্শন ম্যানেজার। দূরে ম্যাগাজিন হাতে বসে আছে বন্ধুর স্ত্রী। ভাবছি এই ছবিগুলো ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে আর থানার ওসি হায়দার খানের হাতে তুলে দিলে ব্যাপারটা কেমন টক দইয়ের মত জমে যাবে না ?’
‘ বেজন্মা, শূয়রের বাচ্চা।’ চিলের মত ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল কুমকুম।
পিছন থেকে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বাঁধা দিল জাফর , ‘ শান্ত হও প্লিজ । তুমি শান্ত হও।’
ঠেলে কুমকুমকে পিছনে সরিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো জাফর।‘ ভাল গল্প ফেঁদেছেন স্যার।’ টিটকারির সুরে বলল। ‘ কোন প্রমাণ আছে আপনার কাছে ?’
প্রশ্নটার জন্য যেন তৈরিই ছিল ।
কোটের বুকের ভেতরে হাত গলিয়ে দিল ইয়াকুব আলী। বের করে আনল রঙ্গিন তিনটে ছবি। ছুড়ে দিল সামনে। প্রজাপতির মত নেচে উড়ে ছবি তিনটে ঘুরে ফিরে কার্পেটের উপর পড়লো।
‘ কম্পিউটরে ঢুকিয়ে প্রিন্ট করে নিয়ে এসেছি।’ শান্ত সুরে বলল ব্ল্যাকমেইলার। ‘ ভাল করে দেখ দুইজনেই। এই ছবির দাম এখন কোটি টাকা। উফ, কে জানত এত ভাল ফটোগ্রাফার আমি। হায় হায় , নিজেকেই পুরস্কার দিতে ইচ্ছা করছে রে ।’
কার্পেটের উপর থেকে ছবিগুলো তুলে নিল জাফর। যা বুঝার বুঝে গেছে।
মোটেও ধাপ্পা দিচ্ছে না এই লোক।
ছবিগুলো দেখতে দেখতে মাথার ভেতরে চক্কর দিয়ে উঠলো জাফরের।
শক্তিশালী টেলিস্কোপের জুম দিয়ে খুব কাছে এনে তোলা হয়েছে ছবিগুলো । ক্যামেরাও ভাল। একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে - সালাম চৌধুরীর দুই পা ধরে রেলিঙের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে জাফর। দ্বিতীয় ছবিতে ব্যালকনি ধরে ঝুলছে সালাম সাহেব। ওর মুখে ঘুষি মারছে জাফর। দূরে সোফায় বসে চেয়ে চেয়ে তাই দেখছে কুমকুম। তৃতীয় এবং শেষ ছবিতে তেমন নতুন কিছু নেই। বেলকনি থেকে হাত খসে গিয়ে নীচে পড়ে যাচ্ছে সালাম বুড়ো। এবং পড়ছে।
সারা দুনিয়াটা যেন চোখের সামনে ঘুরছে জাফরের। পা কাঁপছে থর থর করে। বড় করে একটা ঢোক গিলে কুমকুমের দিকে তাকাল । কুমকুম যেন অজ্ঞান হয়ে যাবে। দুই হাত দিয়ে মাথা ধরে রেখেছে।
‘ আপনি আসলে কি চান ?’ নিজেকে সামলে নিয়েছে জাফর। ‘ বলুন কত টাকা দিতে হবে আপনাকে ? নাকি বিজনেসের ভাগ ?’
‘ ও সব কিছু চাই না আমি।’ শান্ত গলায় বলল ইয়াকুব আলী। চেহারায় কোন ভাব নেই । ‘ টাকা পয়সা যথেষ্ট কামিয়েছি। এক জীবনে অত টাকা লাগেও না মানুষের । তবে আমি যা চাই তা ঠিকই আদায় করে নিই। সবাই জানে।’
‘ এখন কী চান সেটা তো বলবেন ?’
‘ আমি কুমকুমের ভাগ চাই ।’
‘ কী বলছেন আবোল তাবোল ?’
‘ আবোল তাবোল না। কুমকুমকে আপনিই পাবেন। আমি শুধু কিছুটা সময় এই রস মালাইটাকে শেয়ার করতে চাই ।’
অশ্লীল ভাবে চোখ টিপল ইয়াকুব আলী।
‘ মানেটা কি ?’ ঢোক গিলল জাফর। কান ঝাঁ ঝাঁ করছে ওর ।
‘ ন্যাকা সাজবেন না মিস্টার লাভার বয়। তিন মাসের জন্য কুমকুমকে চাই আমি। রোজ রাতে চলে যাবে আমার কাছে। সকালে চলে যাবে আপনার কাছে। মাত্র তিন মাস।’
‘শূয়রের বাচ্চা।’ চিৎকার করে উঠলো কুমকুম।
‘ থামো প্লিজ।’ কুমকুমকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করাতে গিয়ে বলল জাফর।
‘ তিন মাস পর ? জানতে চাইল।
‘ ছবির মূল কপি নষ্ট করে ফেলব আমি।সব ভুলে যাবো। আপনারা বিয়ে সাদি করে সুখী জীবন যাপন করবেন।’ নাকের ভেতরের ময়লা বের করতে করতে বলল ইয়াকুব আলী।
‘ বিশ্বাস কি আপনাকে ? যদি কোন কপি গোপনে রেখে দেন নিজের কাছে ? তখন ?’
‘ আমাকে বিশ্বাস করা ছাড়া অন্য কোন উপায় আছে আপনার কাছে ? নেই । পুরো বিশ্ব জগত চলছে বিশ্বাসের উপর।’ দার্শনিক একটা ভাব ধরে বলল ইয়াকুব আলী। ‘ আমি চললাম। কাল রাত আটটায় কুমকুমকে চাই আমি। অবনী সেন রোডে আমার একটা অ্যাপার্টমেনট আছে। ওখানেই যেন চলে যায়। কোন রকম চালাকির চেষ্টা করবেন না। বাইরে বডিগার্ড থাকবে। বন্দুকসহ । ঠিক সাড়ে আটটার মধ্যে কুমকুম না গেলে আমিই নিজের গরজে থানায় চলে যাব। বন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেয়া হয়ে যাবে। নওয়াবগঞ্জের হিরো হয়ে যাবো রাতারাতি। পাব্লিসিটি আর কাকে বলে। তোমরা আম পচার মত পচবে জেলের ভেতরে। মজাই মজা । তা হলে ঐ কথাই রইলো ?’
কারো কোন তোয়াক্কা না করেই গুন গুন করে একটা অশ্লীল গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে চলে গেল ইয়াকুব আলী ।
সাত
শুরু হল দুঃস্বপ্নের দিনরাত্রি।
ওদের দুইজনের জন্যই।
প্রতিরাত , আটটার সময় গাড়ি নিয়ে কুমকুম চলে যায় ইয়াকুব আলীর অ্যাপার্টম্যানটে । ফেরে পরদিন সকালে ।
ক্লান্ত। অসহায়। বিধ্বস্ত। ফিরের মড়ার মত পড়ে থাকে বিছানায়।
সালাম চৌধুরীর ব্যবসার হাল কুমকুম ধরেছে। পাশে থেকে সাহায়্য করছে জাফর। ছায়াসঙ্গীর মত। কিন্তু এক বিন্দু সুখ নেই ওদের জীবনে।
বিশেষ করে জাফর। অদ্ভুত এক জটিলটায় ভুগছে সে। কুমকুমকে ব্যবহার করে ভয়ংকর খেলায় নেমেছিল । কিন্তু ঘটনা যে এমন ভাবে মোড় নেবে কে জানত ?
আবিস্কার করলো সত্যি সত্যি কমকুমের প্রেমে পড়ে গেছে ও- নিজের অজান্তেই। বোকা সরল মেয়েটা ওকে বিশ্বাস করে ওরই ভুলে কি ক্লেদাক্ত জীবন যাপন করছে, ভাবতেই নিজের প্রতি রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা সব মিলিয়ে মিশ্র একটা অনুভূতির জন্ম নেয়।
কুমকুম চলে যাবার পর প্রতি রাতেই একা একা বারান্দায় বসে থাকে জাফর। সেই বারান্দায় !
মনে পড়ে পুরানো দিনগুলোর কথা।
সালাম চৌধুরীর হাসি মাখা মুখটা বার বার ভেসে উঠে চোখের সামনে। কি দিলখোলা মানুষ ছিল। সেই মস্তিবাজ কণ্ঠস্বর আজও শুনতে পায় জাফর- ‘ বুঝলেন মিয়া, টাকা আর মেয়েমানুষের জন্য দুনিয়ায় সব ঘটনা ঘটে। ’
মদের বোতল নিয়ে সারারাত বারান্দায় বসে থাকে জাফর। গ্লাসের পর গ্লাস গিলতে থাকে।
আবছা আবছা ভাবে মনে হয় পাশে যেন সালাম সাহেব বসে আছে ! হাসছে ওর দুরবস্তা দেখে ।
রাত গড়িয়ে সকাল হয়।
ক্লান্ত কুমকুম বাড়ি ফেরে। এসেই ধপাস করে বেডরুমে গিয়ে পড়ে যায়।
এক সকালে দরজার সামনেই হুড়মুড় করে পড়ে গেল কুমকুম । দৌড়ে গিয়ে ধরল জাফর।
‘ তুমি ঠিক আছ সোনা ?’ ব্যাকুল ভাবে জানতে চাইল।
‘ নাহ, আমি ঠিক নেই।’ ক্লান্ত সুরে বলল কুমকুম। ‘ ইয়াকুব কুত্তার বাচ্চাটা কাল রাতে ওর বন্ধু- বান্ধব নিয়ে এসেছিল। আমাকে ওরা...।’
কথা শেষ না করেই হু হু করে কেঁদে ফেলল মেয়েটা।
ওকে জড়িয়ে ধরে পাথরের মত বসে রইল জাফর।
মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল ও।
আট
ক্লান্ত হয়ে অ্যাপার্টমেনটে ঢুকলো কুমকুম।
অবাক হল। জাফর নেই। রোজ কি হোলে চাবি ঢুকানোর শব্দ পেলেই জাফর দৌড়ে চলে আসে। আজ কী হল ?
ঘুমিয়ে পড়েছে ? উহু ।
অসম্ভব। সারারাত এক ফোঁটাও ঘুমায় না বেচারা। চোখের নীচে কালি পড়ে গেছে। আচ্ছা, বাথরুমে গেল না তো ?
নেই। পুরো ফ্ল্যাটে কোথাও নেই জাফর।
দ্রুত সচেতন হয়ে গেল মেয়েটা। অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠলো। পাগলের মত ছুটে গেল লিফটের দিকে। নিশ্চয়ই নদীর পাড়ের নিজের বাসায় আছে জাফর ? কিন্তু কেন ?
বাড়ির একদম দরজার সামনে গাড়ি পার্ক করলো কুমকুম। কে দেখল না দেখল তাতে কিছু যায় আসে না আজ। দরজার সামনেই জাফরের কালো গাড়িটা পার্ক করা। কোম্পানির তরফ থেকে দেয়া হয়েছিল জাফরকে।
বেল টিপল কয়েক বার । ঘন ঘন।
কেউ দরজা খুলল না।
নিজের কাছে বাড়তি চাবি আছে। ভেতরে ঢুকে সোজা দৌড়ে গেল বেডরুমে। যা ভেবেছিল তাই। বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে জাফর। জানালার পর্দা তোলা। বাইরের আলো যথেষ্ট চলে এসেছে ভেতরে। মড়ার মত পড়ে আছে বেচারা। মুখ ভর্তি গিজগিজে দাড়ি। চেহারায় ক্লান্তি আর হতাশার ছাপ।
‘ কি হয়েছে জাফর ?’ স্থান কাল ভুলে চিৎকার করে উঠলো কুমকুম। বসে পড়লো বিছানার পাশে। জাফরের দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিতে লাগল ঘন ঘন। ‘ কি হয়েছে , বল, কথা বল ।’
চোখ মেলে তাকাল জাফর। বহু কষ্টে। যেন চোখের পাতাদুটো সীসের মত ভারি।
বিছানার পাশেই হলুদ এয়ারটাইট প্ল্যাস্টিকের কৌটাটা পেল কুমকুম। উপরে লেবেল সাঁটা- Rizam । একদম খালি !
‘ কয়টা খেয়েছ ?’ চেঁচিয়ে উঠলো কুমকুম ।
‘ আটচল্লিশটা।’ নিস্তেজ গলায় বলল জাফর ।
‘ সর্বনাশ।’ চেঁচিয়ে উঠলো কুমকুম। ‘ দাঁড়াও আমি হাসপাতালে ফোন দিচ্ছি।’
‘ না। নিস্তেজ ভাবে মাথা নাড়লো । ‘ চিঠিটা রাখ। থানায় জমা দিয়ে ইয়াকুব আলীর ফাঁদ থেকে বের হও।’
দুর্বল হাতে টেবিলের উপরটা দেখাল জাফর।
এক গুছ নীল আর বেগুনি রঙের অর্কিড রাখা টেবিলের উপর। ওটার তলায় ভাঁজ করা ঘি রঙের এক টুকরো কাগজ।
তুলে নিয়ে পড়লো কুমকুম। অল্প কয়েকটা লাইনের চিঠি।
‘ জনাব হায়দার সাহেব। সালাম চৌধুরী সাহেবের হত্যার জন্য আমি একা দায়ী। কুমকুম ম্যাডামের কোন দোষ নেই।’
নীচে জাফরের নাম লেখা। আজকের তারিখ সহ ।
‘ তুমি থানায় ফোন দিয়েছিলে ?’ ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করলো কুমকুম।
দুর্বল ভাবে মাথা নাড়ল জাফর।
না । দেয়নি।
চোখ ভারি হয়ে যাচ্ছে ওর। ঘুমের অতলে ডুবে যাচ্ছে ।
কয়েক মুহূর্ত জাফরের দিকে চেয়ে রইল কুমকুম। টেবিলের উপর থেকে গ্যাস লাইটারটা তুলে নিয়ে চাপ দিতেই হিস করে জ্বলে উঠলো নীলচে কমলা আগুন। শিখার উপরে ধরল চিঠিটা। আগুন এসে আঙুল ছোঁয়ার আগেই ফেলে দিল ওটা কাচের ছাইদানিতে।
পুড়ে কুঁকড়ে কালো হল। ছাই হল চিঠিটা।
‘ হায় আমার বোকা প্রেমিক।’ ফিসফিস করে বলল কুমকুম। ‘তোমার জন্য খারাপই লাগছে।‘
আধো চোখে জাফর তখনও চেয়ে আছে কুমকুমের দিকে। কিন্তু চেহারায় কোন প্রতিক্রিয়া নেই।
হাসি মুখে উঠে দাঁড়ালো কুমকুম। বের হয়ে গেল কামরা থেকে।
গাড়িতে বসতেই পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল ইয়াকুব আলী।
‘কাজ হয়েছে ?’ নাকের ভেতর থেকে ময়লা বের করতে করতে জানতে চাইল ইয়াকুব আলী।
‘ হবে না আবার।’ খিল খিল করে হেসে ফেলল কুমকুম। ‘আটচল্লিশটা ঘুমের বড়ি। ঘুমাচ্ছে এখন। শেষ ঘুম।’
‘ কোন রকম চিঠি ?’
‘ হ্যাঁ, লিখেছিল। নিজের দোষ স্বীকার করে। পুড়িয়ে ফেলেছি ওটা।’
‘ ভাল করেছ। সালামের মৃত্যু দুর্ঘটনা হয়ে থাকুক। ইন্সুরেন্সের টাকা পাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তদন্তকারি অফিসারদের টাকা খাইয়ে কিনে ফেলব। যাক সব কিছু আমাদের প্ল্যান মাফিকই হল।কবে থেকে জাফরের মত একটা মক্কেল খুঁজছিলাম।’
‘ একদম ঠিক।’ খিলখিল করে আবারও হেসে ফেলল কুমকুম।
‘এবার বিয়েটা সেরে ফেলতে হবে।’ স্বপ্নিল গলায় বলল ইয়াকুব আলী।
লাজুক হাসি হেসে গাড়ি স্টার্ট দিল কুমকুম।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন