তোমরা যারা ' ক্ষুদে তিমি শিকারি' বইটা পড়েছে , তারা আমাকে ভাল করেই চেন ।
নতুন করে কিছু বলার দরকার নেই ।
কিন্তু যারা বইটার নাম গন্ধ জীবনেও শুন নাই, তাদের জন্য বাধ্য সামান্য পুরানো কাসুন্দি ঘাঁটতে হচ্ছে ।
অনেক - অনেক- আরও অনেকগুলো বছর আগে, আমার ইচ্ছা ছিল সমুদ্রগামী জাহাজে উঠে চলে যাব নরওয়ে বা আলাস্কায় । তিমি শিকার করে তেল বিক্রি করে কোটিপতি হব ।
অথবা বাড়ি থেকে পালিয়ে জাহাজের খালসি হিসাবে কাজ করব ।
জাহাজ ডুবে গেলে সেটা তো সোনায় সোহাগা ।
সাঁতার কেটে কোন নির্জন দ্বীপে উঠব । সেখানেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেব । লোকে আমাকে মিলনসন ক্রুসো হিসাবে চিনবে । ড্যানিয়েল ডিফো নামে এক ভদ্রলোক যেমন বই লিখেছিলেন তেমন ' দেলোয়ার দেলু' নামে কোন লেখক আমার জীবনী নিয়ে মস্ত বড় একটা বই লিখবে ।
বেঢপ ধরনের হাস্যকর চিন্তাভাবনা মনে হলেও, আসলে তখন আমার মাথা মুথা নষ্ট করার জন্য দায়ী ছিল কিছু বই ।
সি উলফ , প্রবাল দ্বীপ , সুইসফ্যামিলি রবিনসন , রবিনসন ক্রুসো , দ্যা ওল্ড ম্যান আন দা সি , কনটিকি অভিযান এবং জুল ভার্ন সাহেবের বেশ কিছু বই ।
প্রায় ছত্রিশ- সাইত্রিশ বছর আগের কথা এইসব ।
মাঝে ফাল্গুনী হাওয়ায় ভেসে গেছে অনেকগুলো বছর । অথচ মনে হয়, এই তো - মাত্র গত কালের কথা ।
না। নাবিক বা জাহাজি হতে পারিনি ।
তবে এর মাঝে আমি পৃথিবীর প্রায় সব দেশ ঘুরে ফেলেছি । প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপে গিয়ে রুটিফল পুড়িয়ে খেয়েছি । নরওয়ের তুষার ঝড় দেখেছি । আফ্রিকার গনগনে রোদে পুড়ে ভুট্টার জাউ আর কাঁচা কলার ভর্তা মাটোকে খেয়েছি । সিডনি শহরের ক্লিভল্যান্ড সড়কে মজার- জাদুর একটা বাসায় থেকেছি । লন্ডন শহরের ঘুমের মধ্যে বিগ বেনের ঘণ্টার শব্দ শুনে রোমাঞ্চিত হয়েছি ।
ফিনল্যান্ডের পুমালা গ্রামের গোরস্থানের পাশে নিঝুম একটা বাড়িতে একা থেকেছি। বাড়িটার নাম দিয়েছিলাম - অক্টোপাসের বাসা। নামটা সুন্দর না ?
এখন আমি আর আগের মত চঞ্চল না ।
হুট হাট করে দূরে কোথাও চলে যাই না। ছুটির দিনে ফায়ারপ্লেসের পাশে বসে কেপার আর জলপাইয়ের সালাদ খাই । সাথে ধোঁয়া দিয়ে শুকানো স্যামন মাছের পাতলা ফালি ।
কিন্তু যাই হোক না কেন, আমার লেখার টেবিলে একটা কম্পাস থাকে । থাকে একটা বালি ঘড়ি । সার্ডিন মাছের একটা কৌটা পেপার ওয়েট হিসাবে ব্যবহার করি । নিজেকে জাহাজের ক্যাপ্টেন টাইপের কেউ একজন মনে হয় । জলপাই তেলে ভেজানো কিছু মাছ সব সময় আমার টেবিলে । বেশ জাহাজি ব্যাপার স্যাপার !
তো , রবিবার আমার ছুটি ।
গভীর রাতে পুরানো দিনের গান শুনি । পুরানো গান শুনলে কেমন যেন হাহাকার লাগে। যদি সম্ভব হত পুরানো সব গান আমি মুছে ফেলতাম মহাকালের স্মৃতি থেকে ।
বাইরে সাদা তুষার আর নীল রাত ।
আমি বসে বসে মারিয়ানা আইল্যান্ডের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলি । সেই বন্দর । লেগুন । হাঙরের পাখনা । সানএন্টোনিও গ্রাম । বৃষ্টি । ঘাসের বন । রুটিফল ।
এমন কি সেই জাহাজি বই মানে ‘বাঊনটিতে বিদ্রোহ’ মার্কা বইগুলো ও বেশ মিস করি ।
নরডিক দেশগুলোতে ইংরেজি বই তেমন পাওয়া যায় না ।
লাইব্রেরিতে গেলে চশমাওয়ালা বুড়ো লাইব্রেরিয়ান মিহি হেসে বলে - না অমুক আর তমুক বই তো নেই ।
সব সময় এমন হয় ।
আর এর মধ্যে একদিন দেখি চিংড়ি মাছের মত ব্যাকা এক বুড়ো ভদ্রলোক, তার বাড়ির সামনের উঠানে সব বই রেখে বিলিয়ে দিচ্ছেন । যার যত খুশি নিতে পার । না বলবে না ।
অনেক আঁতিপাঁতি করে একটা মাত্র ইংরেজি বই পেলাম ।মাত্র একটা !
মোবি ডিক ।
একদম ইটের সাইজের মত সেই মহাকব্যিক বই । বিশাল এই কাহিনির শুরু হয়েছে সাদামাটা একটা লাইন দিয়ে - ' তোমরা আমাকে ইষমেল বলে ডাকবে ।'
বইটা সাদা রঙের একটা তিমি শিকার নিয়ে লেখা । কাহিনি সামান্য , ক্যাপ্টেন এহ্যাব সাদা তিমিটা শিকারের জন্য পাগল হয়ে আছেন । কারণ সেই সাদা তিমিটা তার একটা পা খেয়ে ফেলেছিল ।
কি ভয়াল !
প্রতিশোধ নিতে চান তিনি ।
এখন তোমরা যারা ' মোবি ডিক' বইটা পড়ে ফেলেছ তাদের কিছু বলার নেই । যারা নানান কারনে পড়ে উঠতে পারনি তাদের জন্য খানিক খেজুরে আলাপ করার ইচ্ছা আছে।
আর কে না জানে ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয় ।
বইটা লিখেছেন - জনাব হারমান মেলভিল । উনি একজন আমেরিকান ।
১৮৫০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বইটা লেখার কাজে হাত দেন তিনি । পরের বছর মানে ১৮৫১ সালের ১৮ অক্টোবর ইংল্যান্ডে বইটা ছাপা হয় ।
৬৩৫ পাতার এই বইটা ছাপা হয়েছিল ২২৩০ কপি ।
তেমন ভাল বিক্রি হয়নি ।
ভাল বিক্রি হয়নি , তাই আর ছাপা হয়নি । এমন কি হারমান মেলভিল সাহেবের মৃত্যুর সময় বইটা আর বাজারে ছিল না ।
যেটাকে সবাই - 'আউট অভ প্রিন্ট' বলে আর কি ।
অনেকগুলো বছর পর লেখক ডি এইচ লরেন্স বলেন, ' সমুদ্র নিয়ে লেখা সবচেয়ে সেরা বই হচ্ছে মোবি ডিক। '
তিনি আরও বলেন – ‘ বিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং সবচেয়ে দুর্দান্ত বই হচ্ছে এটা।‘
তখন সারা দুনিয়ার পাঠক সমাজ বেশ নড়ে চড়ে বসে । এবং বেশ আঁতিপাঁতি আর তল্লাশি করে খুঁজে বইটা পড়া শুরু করে । সবাই ।
লেখক মেলভিল সাহেব ১৮৪১ সাল থেকে ১৮৪৪ সাল পর্যন্ত নিজেই তিমি শিকারিদের জাহাজে কাজ করেছিলেন । কাজেই নিজের অভিজ্ঞতাগুলো বেশ দারুন রকম করে , চনমন করা ভাষায় উপন্যাসে বর্ণনা করেছিলেন ।
এই উপন্যাসের ইষমেল চরিত্রটাই লেখক নিজে ।
তো আচমকা প্রশ্ন করতে পারো সেই সময় লোকে দল বেঁধে তিমি শিকার করতে যেত কেন ? খুব লাভজনক পেশা ছিল নাকি ?
তা তো বটেই ।
নইলে কেউ সেধে অমন ঝক্কিওয়ালা কাজে যাবে কেন ?
তিমির শরীরে ইয়া মোটা চর্বির স্তর থাকে । ইস্কুলে পড়া শিখে না গেলে স্যারেরা যেমন বলতেন - ‘বুঝেছি মিলন তর শরীরে চর্বি জমে গেছে ।’ তেমনই আর কি !
তিমির এই চর্বির স্তর অনেক মোটা । একে বলে - ব্লাবার ( Blubber) । ব্লাবার ১২ ইঞ্চিরও বেশি মোটা হয় । শিকারিরা তিমি মেরে ওদের শরীর থেকে এই ব্লাবার মানে চর্বি কেটে সংগ্রহ করতো ।
তিমি মেরে কপিকলে করে জাহাজে তোলা হত । সঙ্গে সঙ্গে একগাদা ক্রু মানে জাহাজি কামলা কাজে লেগে যেত ।
ওদের শিফট ছিল ছয় ঘণ্টা করে ।
মড়া তিমির শরীর থেকে কেটে বেছে চর্বি বের করতে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত লাগত ।
পুরো ব্যাপারটা নির্ভর করতো তিমির সাইজ , আবহাওয়া - মানে ঝড় বৃষ্টির উপর । সাথে যোগ হত কামলা... সরি , ক্রু-দের দক্ষতার উপর ।
কাজটা আবার একটু তড়িঘড়ি করতে হত। তিমির শরীরটা যদি জাহাজের বাইরে ঝুলে থাকে তবে নিমন্ত্রণ না দিলেও একগাদা হাঙর এসে কামড়ে কামড়ে খাওয়া শুরু করতো ।
হ্যাংলা আর কাকে বলে ।
লম্বা ফালি করে কাটা চর্বির টুকরাগুলো পেল্লাই সাইজের লোহার ডেকচিতে গরম করলেই হয়ে যেত তিমির তেল । জিনিসটা তরল মোমের মত । বাদবাকি বাতিল অংশ ফেলে দিত সাগরে । ওখানেই ঘুর ঘুর করছে হ্যাংলা হাঙ্গর । মেরে কেটে এক একটা তিমি থেকে ১৯০০ লিটারের মত তেল পাওয়া যেত । পরে বন্দরে ফিরেই সেই তেল, বোতল বা ক্যানেস্তারায় করে বিক্রি করতো নানান কোম্পানি।
তা কি কাজে লাগত তিমির তেল ?
বলছি। আগে এক গ্লাস বেলের শরবৎ খেয়ে নিই । যা গরম পড়েছে ।
তো যা বলছিলাম, তিমির তেল খুব কাজের জিনিস । তখন কিন্তু বাড়িতে বাড়িতে বিজলি ছিল না । কেরোসিন ও ছিল না । সবার বাড়িতে হ্যারিকেনের মত লন্ঠন ছিল । সুন্দর কাচের চিমনি । সেই লন্ঠনের তেল হিসাবে তিমির তেল ব্যবহার করতো সবাই ।
ঘুটঘুটটি অন্ধকারে তো আর বসে থাকা যায় না।
তোমরা এখন জানো না। আমাদের পিচ্চিবেলায় প্রায়ই সন্ধ্যার সময় আচমকা বিজলি চলে যেত । মা পাঠাতো দোকানে।
কাচের বোতলে করে ছটাক বা পোয়াখানেক কেরসিন নিয়ে ফিরতাম ।
তখন গ্রামের মানুষ গঞ্জের হাট থেকে ফেরার সময় সবাই হাতে করে কাচের একটা শিশি নিয়ে ফিরতো । শিশির গলায় পাটের সুতা দিয়ে ফাঁস দেয়া । যেন শিশিটা অভিমান করে গলায় দড়ি দিয়ে আত্নহত্যা করেছে । আসলে ওভাবে শিশি বহন করতে সুবিধে হত আর কি ।
তো ১৮৫৪ সালের আগ পর্যন্ত সবার বাড়িতে তিমির তেল দিয়ে প্রদীপ বা হারিকেল জ্বালানো হত ।
বললাম না কেরসিন নেই । কেরসিন আবিস্কার হয়েছিল ১৮৫৪ সালের পর। তাও বেশ দামী জিনিস । সবাই কিনতে পারতো না ।
আমাদের দেশে সেই সময় ভেন্নার তেল দিয়ে প্রদীপ বা হারিকেল জ্বালানো হত । ভেন্নার তেলকে আবার অনেকে রেডির তেল বলে । গাছটা দেখতে পেঁপে গাছের মত। কবি জসিমউদ্দিন আসমানি কবিতায় লিখেছেন না -
‘ বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি ।
একটু খানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পরে পানি ।,
এটা সেই ভেন্না গাছ । ফলটা যেন একটা কাঁটাওয়ালা ভাইরাস । ফলের দানা পিষলে তেল বের হয় । ক্যাস্টর অয়েল বলে । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসুখ বিসুখ হলে ডাক্তার তাকে এক চামচ ক্যাস্টর অয়েল গিলিয়ে দিত । উনার ছেলেবেলা বইতে উনি নিজের মুখে সেই কথা বলেছেন ।
তো কোন কথা থেকে কোন কথায় চলে গেছি । কথার কুমড়া শুধু গড়ায় ।
প্রদীপের জ্বালানী ছাড়াও তিমির তেল দিয়ে মোমবাতি বানানো হত । সাবান বানাত । বার্নিশ বানাত । চামড়া পাকা করতে লাগত । কলকব্জায় মরচে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করতে ব্যবহার করতো ।
অমন হাজারে বিজারে বহু কাজে লাগত তিমির তেল ।
আশা করছি ব্যাপারটা একদম পরিষ্কার ।
বলতে ভুলে গেছি , তিমির তেল দিয়ে যে মোমবাতি বানানো হত সেই মোমের আলো মৌচাকের মোমের আলোর চেয়ে চার থেকে ছয় গুণ বেশি উজ্জ্বল হত । কাজের জিনিস বটে । সেইজন্য তখন রাস্তার দুই পাশে ল্যাম্পপোস্টে ও তিমির তেলের প্রদীপ ব্যবহার করা হত ।
সন্ধ্যাবেলায় মেয়রের লোক এসে তিমির তেল ভর্তি বাটির মধ্যে সলতে রেখে আগুন জ্বালিয়ে চলে যেত । সেই ল্যাম্পপোস্টের কাচের ভেতরে সকাল পর্যন্ত পাকা গমের মত সুন্দর আলো জ্বলত ।
আর তিমির হাড় দিয়ে জামার বোতাম , চশমার ফ্রেম , ছাতার হাতল, পিয়ানোর চাবি হতে কত পদের জিনিস যে বানানো হত তার আর কোন লেখাজোখা নেই ।
পুরানো কাগজ পত্র ঘেঁটে জানতে পারলাম , সেই ১৮৯১ সালেই এক পাউনড তিমির হাড্ডির দাম ছিল সাত আমেরিকান ডলার । আজকের দিনের দুইশো ডলার ।
হায় হায় !
তো, ফিরে আসি মোবিডিক উপন্যাসে ।
কাহিনি শুরু হয় ইষমেলের ডায়ালগ দিয়ে ।
ইষমেল চেয়েছিল জাহাজে চাকরি নিয়ে দুনিয়ার সব সাগর বন্দর দেখে বেড়াবে । ঠিক অনেকগুলো বছর আগে যেমনটা আমি ভাবতাম !
পিকোড নামে একটা তিমি শিকারিদের জাহাজে কাজ পেয়ে গেল ইষমেল । জাহাজের ক্যাপ্টেনের নাম - এহ্যাব । সে এক বিচ্ছিরি চরিত্র । মোটেও ফুলের মত পবিত্র না ।
এক কুয়াশা ভেজা হিম হিম সকালে কেপকর্ড শহরের নানটাকেট বন্দর থেকে যাত্রা শুরু হল ।
উদ্দেশ্য ?
ওই আরকি - তিমি শিকার করা । এতক্ষণ যা বললাম ।
প্রথমে মনে হয়েছিল আসলে তিমি মেরে তেল সংগ্রহ করাই উদ্দেশ্য । কিন্তু না।
খানিক পর ইষমেল বুঝতে পারলো ক্যাপ্টেন এহ্যাবের মতলব আলাদা । উনি আসলে পেল্লাই সাইজের সাদা তিমি মারতে চান । সেই তিমির নামই হচ্ছে – মোবিডিক ।
মোবিডিককে নিয়ে নাবিকদের মুখে রয়েছে হাজারে বিজারে গল্প ।
এই সাদা তিমিটাকে নাকি একই সময়ে অনেক জায়গায় দেখা যায় । কখন কোথায় থাকে তিমিটা, কেউ জানে না।
আচমকা এক এক সাগরে ভুউসস করে ভেসে উঠে । পৃথিবীর কোন হারপুন বা অন্য অস্ত্র দিয়ে তিমিটাকে মারা যাবে না । ক্যাপ্টেন এহ্যাব জাহাজে একটা নোটিশ ঝুলিয়ে দিলেন - যে প্রথম
সাদা তিমিটা দেখতে পাবে তাকে প্রচুর টাকা পুরস্কার দেয়া হবে ।
ক্যাপ্টেনের এক পা নেই । অনেক বছর আগে এই মবিডিককে মারতে গিয়ে অমন দশা হয়েছিল তার । আগেই বলেছি ।
তিনটে নৌকা নিয়ে ক্যাপ্টেন আহ্যাব মোবিডিককে হামলা করেছিলেন । লেজের ঝাপটা দিয়ে সব কয়টা নৌকা ডুবিয়ে দিয়েছিল তিমিটা । হারপুন তারপুন সব জলে পড়ে গিয়েছিল । ছিল মাত্র একটা চাকু । সেটাও মাত্র ছয় ইঞ্চি লম্বা ।
সেই চাকু দিয়েই মোবিডিককে মারতে গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন এহ্যাব ।
পারেননি ।
সম্ভবও না।
উল্টা মোবিডিক হালকা কামড় দিয়ে ক্যাপ্টেনের একটা পা খেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।
সেই প্রতিশোধ নেয়ার জন্য এই বারের যাত্রা ।
ক্যাপ্টেন ভীষণ চিড়বিড়ে চরিত্রের রাগি মানুষ ।
স্পার্ম হোয়েল নামে এক ধরনের তিমির চোয়ালের হাড় সুন্দর ভাবে কেটে ল্যাংড়া পায়ের জায়গায় সেটা ফিট করে নিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন এহ্যাব । বগলে কাঠের ক্র্যাচ দিয়ে জাহাজের ডেকে ঠক ঠক শব্দ করে যখন হেঁটে বেড়াতেন সেই দৃশ্য দেখলে বুকের রক্ত কেমন জমাট বেঁধে যেত ।
আজব চরিত্র আমাদের এই ক্যাপ্টেন ।
মোবিডিক উপন্যাসের আসল সম্পদ হচ্ছে , ভাষা ।
এত নিখুঁত টোনে লেখা ইংরেজি সাহিত্যে আর কোন বই আছে কি না সেটা আমার জানা নেই ।
আর কি বর্ণনা !
যেমন - '
' অদ্ভুত রকম নিঝঝুম সব রাস্তা ঘাট ! গোরস্থানের মত এখানে-সেখানে দেখা যাচ্ছে দুএকটা মোমবাতি।'
"সরাইখানার প্রথম ঘরটার এক পাশের দেয়ালে তেলরঙে আঁকা প্রকাণ্ড এক ছবি । নানারকম ময়লা আর বছরের পর বছরের জমে উঠা ধুলোয় সেটার এমন অবস্থা যে বোঝা কঠিন, কীসের ছবি ওটা। তারপরও খুব ধৈর্য ধরে খেয়াল করলে বোঝা যায়, শিল্পী একেছেন মাঝরাতের ঝড়ে উথাল-পাতাল কৃষ্ণসাগর। ''
'' প্রবেশপথের মুখে পাওয়া গেল সী-বুটের শব্দ। দড়াম করে দুপাশে খুলে গেল দরজা । হল্লামল্লা করে ভেতরে ঢুকে পড়ল এক দঙ্গল নাবিক। পরনে তাদের ওয়চ কোট, মাথা ঢাকা পশমী মাফলারে, দাড়ি থেকে ঝুলছে পেরেকের মত বরফ। কাউন্টারের বুড়ো ব্যস্ত হয়ে মদ ঢালতে লাগল টাম্বলারে। এক নাবিক বলল, তার মগজের ভেতরটা পর্যন্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তার দিকে জিন আর চিটা গুড়ের একটা পিচের মত কালো মিশ্রণ এগিয়ে দিল বুড়ো।''
পিকোড জাহাজে ইষমেল একজন বন্ধু পেয়েছিল ।
নাম কুইকেগ ।
প্রশান্ত মহাসাগরের কোন এক দ্বীপের বাসিন্দা । পেশায় হারপুনার । সারাক্ষণ হারপুন নিয়েই আছে । সারা শরীর ভর্তি উল্কি । এ আরেক অদ্ভুত চরিত্র । ঘুমায় একটা কফিনের ভেতরে ! ওটাই নাকি বিছানা ।
কুইকেগ কোন রকম অভিযোগ ছাড়াই সারাক্ষণ কাজ করে । এমন কি চরম বিপদের সময়ও ওর মাথা থাকে শরবতের মত ঠাণ্ডা !
উপন্যাসে আছে, সাগর যাত্রার মনোরম বর্ণনা । জলদস্যু , সাগরের তুমুল ঝড় , জায়ান্ট স্কুইড আর তিমির পিছনে ধাওয়া করে বেড়ানোর চনমন করা বর্ণনা ।
এ উপন্যাস শুধু মাত্র দূর সাগর যাত্রা বা তিমি শিকারিদের জীবন তুলে ধরেনি । আছে মানুষ আর প্রকৃতির ইতিহাস । অ্যাডভেঞ্চার দিয়ে শুরু , করুণ মোড় দিয়ে কাহিনি শেষ ।
মেলভিল সাহেব যখন বইটা লিখেন বা ছাপা হয় তখনও তিমি শিকারিদের ব্যবসা ছিল জমজমাট। তারপরও এই পেশা বা ব্যবসার অন্ধকার দিক সম্পর্কে কিছুই গোপন রাখেননি তিনি।
সব তুলে ধরেছেন পাঠকদের সামনে । সৎ এবং আন্তরিক ভাবেই ।
গল্পের ফাঁকে ফাঁকে রান্না-খাবার , আইন , অর্থনীতি , প্রাণীবিদ্যা , পৌরাণিক কাহিনি , এবং বিভিন্ন ধর্ম আর বিভিন্ন জাতির নানান বিষয়ে মজার সব তথ্য দিয়েছেন । লেখক সাহেবের হাতে জাদু আছে । পাঠককে ধরে রেখেছেন শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত । মনে মনে স্বীকার করতে হয় , আমরা সবাই ক্যাপ্টেন এহ্যাবের মতই। জীবনে কোন না কোন সাদা তিমিকে ধাওয়া করে ফিরছি। সব সময় ।
তো বেশ খানিক আড্ডা মারলাম ক্লাসিক ' মোবিডিক ' উপন্যাসটা নিয়ে।
আমার বিশ্বাস সময় আর সুযোগ পেলেই তোমরা পড়ে ফেলবে সেটা ।
এখন তোমাদের মধ্যে দুম করে কেউ প্রশ্ন করে বসবে এই যে পেল্লাই সাইজের কাহিনি, সেটা কি সত্য ?
মানে অনেক সময় দেখা যায় ঘটনার পিছনে আবার ঘটনা থাকে । তুমি ক্লাসে পড়া শিখে যাওনি , কিন্তু স্যারকে বলে বসলে - স্যার আমি তিন দিন ইস্কুলে আসিনি , তাছাড়া আমার বই চুরি হয়ে গেছে ।
এটা সাফাই হতে পারে আবার ঘটনার পিছনে ঘটনা হতে পারে ।
সবই সম্ভব !
চাপা স্বরে একটু জল্পনা কল্পনা করা যাক ।
আবার পিছনের কাগজ পত্র ঘাঁটি ।
সত্যি সত্যি কি অমন বিচ্ছিরি ঘটনা ঘটেছিল ?
ভাল কথা , তাহলে বলি সেই কাহিনি।
১৮১৯ সালের ১২ আগস্ট ।
এসেক্স নামে একটা তিমি শিকারিদের জাহাজ নানটাকেট বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে । নানটাকেট বন্দর জায়গাটা আসলে ত্রিশ মাইল লম্বা পিচ্চি একটা দ্বীপ । বন্দর হিসাবে ব্যবহার হত । সেই সময়ে খুবই বিখ্যাত জায়গা । তিমি শিকারিদের যাত্রা , তেলের ব্যবসা সব মিলিয়ে জমজমাট আয়োজন ।
সারাক্ষণ জাহাজ আসছে । যাচ্ছে । এই বন্দর থেকে জাহাজ চলে যাচ্ছে দুনিয়ার চেনা অচেনা সব বন্দরে । আবার সব বন্দরের জাহাজ এসে ভিড়ছে এখানেই । তেল ভর্তি কাঠের পিপে নামানো হচ্ছে । কেনা বেচা হচ্ছে ।
তখন হোয়েলিং ইন্ডাস্ট্রি সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা । কাজেই নানটাকেট দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই সরগরম ।
খানিক আগেই কিন্তু বেলের শরবৎ খাওয়ার ফাঁকে আমি বলেছিলাম - তখন কেরসিন তেল বা পেট্রোল ব্যবহার শুরু হয়নি । তিমির তেলের চাহিদার কথা আবার নতুন করে ব
লার দরকার নেই ।
তিমির তেলকে - 'তৈলাক্ত স্বর্ণ ' বলা যেতেই পারে ।
আর সাগরে তো তিমির অভাব নেই । মারলেই তেল । আর তেল মানে টাকা ।
মানুষ লোভী প্রাণী - কে না জানে !
এসেক্স জাহাজটা তিন মাস্তুল ওয়ালা ,সাদা ওক কাঠের ২৩৯ টনি বেশ পোক্ত জাহাজ । লম্বায় ৮৭ ফুট ৭ ইঞ্চি । এই প্রথম দূরপাল্লা যাত্রা করছে অমন না কিন্তু ।আরও আগেও কয়েক বার সাগরে গেছে । হাজারে বিজারে তিমি মেরে টনে টনে লিটারে লিটারে তেল জোগাড় করেছে ।
নতুন কিছু না । একদম ডাল ভাত ।
ক্যাপ্টেনের নাম -জর্জ পোলার্ড জুনিয়র । একদম ভদ্রলোক । অভিজ্ঞ । বয়স মাত্র আটাশ বছর । চার বছর ধরে এসেক্স জাহাজে আছে । অত অল্প বয়সেই জাহাজের দুঁদে ক্যাপ্টেন । ভাবা যায় ! আজকালকার অমন বয়সের ছেলেপিলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে লাঠি বিস্কুট দিয়ে চা খায় !
যাত্রা শুরু করলো এসেক্স। সাথে নাবিক , কেবিন বয় , স্টুয়ার্ড মিলিয়ে একুশ জন ।
স্টুয়ার্ডকে তোমরা চাইলে বাবুর্চি বলতে পার। শুধু রান্না করে অমনটা না। জাহাজের খরচের হিসাবও রাখে সে। রুটি বানানো হতে আপেলের পিঠা বানানো ও এদের কাজ ।
কেবিন বয় হত সবচেয়ে পিচ্চিটা। রান্নাঘরের আলুর খোসা ছাড়ানো হতে শুরু করে তিমি মাছ দেখলে চিল্লা ফাল্লা করে সবাইকে ডাক দেয়া সব কাজই করতো সে।
খাটুনি বেশি - বেতন কম ।
সাগরে তিমি দেখলে চিৎকার করে বলতে হত – চিমনিস আফায়ার । মানে, ওই দেখা যায় তিমি ।
এই ধরনের বিদঘুটে শব্দ শুধু জাহাজিরা ব্যবহার করে ।
সব পেশায় কিছু শব্দ আছে না ? যেমন বাস ড্রাইভারের সাগরেদ বলে না – ওস্তাদ সামনে ঠোলা ।
এখন এই ঠোলা কিন্তু বিচিত্র কোন কাগজের ঠোঙা না । একজন অতি ভালমানুষ পুলিশ যে হয়তো এক পেয়ালা গরম চা কেনার পয়সার অভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে । মহান কোন ড্রাইভার পেলে টাকা চাইবে কাকুতি মিনতি করে ।
জাহাজের ভাষাই অমন । যেমন – শো দ্যা রোপস । দড়ি দেখিয়ে দাও । মানে জাহাজে নতুন কেউ কাজে এসেছে । তাকে দড়ির গিঁট শেখাতে হবে ।
ইন ডিপ ওয়াটার । মানে গভীর জল হলেও জাহাজিরা বুঝবে সামনে কোন সমস্যা । বা নিরাপদ বন্দর থেকে সত্যি সত্যি অচেনা জায়গায় এসে গেছে সবাই ।
তিন পর্দা বাতাস । থ্রি শিটস অভ উইন্ড । আসল অর্থ – মাতাল নাবিক ।
হাঙ্কি ডোরি (Hunky-Dory) মানে যাই হোক এর অর্থ সব ঠিক ঠাক আছে । ধর তোমাকে কেউ জিজ্ঞেস করল – অংক পরীক্ষায় প্রশ্ন কেমন হয়েছিল ?
তুমি জবাব দিলে হাঙ্কি ডোরি ।
তো এমন প্রচুর জাহাজি শব্দ আছে বলতে গেলে বিকট সাইজের একটা ডিকশনারি হয়ে যাবে ।
কাজেই বাদ ।
এসেক্স জাহাজের কেবিন বয়ের নাম টমাস নিকারসন । দলের মধ্যে সবচেয়ে পিচ্চি সে। চৌদ্দ বছর বয়স । মাত্র। জাহাজে উঠে সে কিন্তু মহাখুশি । সবাইকে বলেছিল – এটা ওর জীবনের সবচেয়ে সেরা মুহূর্ত !
মাল্লা আর নাবিকদের মধ্যে সতেরো বছরের পিচ্চি ওয়েন কফিন ছিল ক্যাপ্টেনের চাচাতো ভাই । কফিনের বুজুম ফ্রেন্ড চার্লস র্যামডেল ছিল সাথে।
নানটাকেট থেকে সাতজন অভিজ্ঞ নাবিক নেয়া হয়েছিল ।
আরও ছিল সাতজন কালো নাবিক । ওরা নানটাকেটের লোক না । আমেরিকার নানান জায়গা থেকে যোগাড় করা হয়েছিল । কালো মাল্লা নেয়া হত, কারণ- ওদের কম বেতন দিতে হবে, সেইজন্য । ওদের বেশি খাটানো যায় । বাজে খাবার দিলেও কোন রকম ট্যাঁ ফো করে না। ওদের থাকার জায়গাও একেবারে বিচ্ছিরি ধরনের । ছোট এক ফালি জায়গায় সবাইকে ঠেসে রাখলেও চুপচাপ ঘুমায় । প্রায় সারাক্ষণ ডেকে দাঁড়িয়ে কাজ করে ।
যা বলছিলাম ।
দুই বছরের পরিকল্পনা করে বন্দর ছাড়ল এসেক্স । দক্ষিণ আমেরিকার সাগর ঘুরে পিপে ভর্তি তেল নিয়ে ফিরবে । পুরানো আর ছোট জাহাজ হলেও এসেক্স জাহাজটাকে সবাই পয়া মনে করতো । কিন্তু এসেক্স জাহাজের এইবারের যাত্রাটা ছিল একদম অপয়া ।
অশুভ যাত্রা যাকে বলে ।
মাত্র দুইদিন হলো যাত্রা করেছে । গন্তব্য এখনও হাজার হাজার মাইল বাকি । গলফ উপকূলে পৌঁছতেই তৃতীয় দিনে বিশাল এক ঝড়ের মুখোমুখি হল এসেক্স । ঝড়টা ওদের একদম নাস্তানাবুদ করে ফেলল । প্রায় ডুবে যায় আরকি !
ঝড়টা সংক্ষিপ্ত হলেও বিশাল ক্ষতি করে দিয়ে গেছে জাহাজের ।
পাঁচটা হোয়েলিং বোটের মধ্যে দুইটা গেছে হারিয়ে । পেল্লাই সাইজের ঢেউ কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ওদের কে বলবে ? একটা হোয়েলিং বোট আবার গেছে ভেঙ্গে । তিমি শিকার করতে হলে কমপক্ষে পাঁচটা ভাল ডিঙ্গি না হলে মুস্কিল হয়ে যায় ।
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মত জাহাজের বেশির ভাগ পাল ছিঁড়ে ঘর মোছার ন্যাকড়া হয়ে গেছে । ভাঙ্গা অংশ মেরামত হল বটে কিন্তু নাবিক আর ক্রু-দের মনে ভয় ঢুকে গেছে । চাপা গলায় ফিসফিস করছে ওরা- যাত্রাটা অশুভ । সামনে বিপদ !
ক্যাপ্টেন জর্জ সবার কথা হেসে উড়িয়ে দিলেন । কানেই তুললেন না কোন অভিযোগ ।
যাত্রা আগের মতই চলল ।
সামনে ভাল দিন এলো না খুব একটা ।
আরও পিচ্চি পিচ্চি কয়েকটা ঝড়ের মুখোমুখি হল সবাই ।
অদ্ভুত ব্যাপার, যাত্রা পথে মাত্র একটা তিমির দেখা পেল ওরা । মাত্র একটা ?
অথচ মোটেও অমনটা হবার কথা না। একজন ক্রু মেম্বার মহা বিরক্ত হয়ে জানালো - যথেষ্ট হয়েছে । এই ফালতু যাত্রায় সে আর থাকতে চায় না। সামনে কোন বন্দরে যেন তাকে নামিয়ে দেয়া হয় ।
হতাশ কালো নাবিকটার নাম ছিল - হেনরি উিউইট ।
বাধ্য হয়ে তাকে ইকুয়েডর-এর উপকূলে নামিয়ে দেয়া হল। রুটিন হিসাবে সেখানে জাহাজ থামার কথা , অল্প সময়ের জন্য ।
সন্দেহ নেই বিরাট বাঁচা বেঁচে গেছে হেনরি ।
জাহাজে এখন নাবিকের সংখ্যা বিশ ।
নতুন যাত্রা পথে কিন্তু তেমন কোন তিমির দেখা পেল না এসেক্স জাহাজের নাবিকেরা ।
যে সব হোয়েলিং গ্রাউনডে সব সময় তিমি গিজগিজ করতো এবার সেইসব জায়গা খালি ।
জাহাজ চলছে ।
পথের মাঝে অন্য একটা তিমি শিকারিদের জাহাজ দেখতে পেল । ওরা নাকি নতুন একটা হোয়েলিং গ্রাউনড পেয়েছে । তিমিতে কিল বিল করছে । ওখানে এত তিমি যে মেরে শেষ করা যাবে না।
এখান থেকে মাত্র ২৫০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ।
নটিক্যাল মাইল হচ্ছে সাগরের দূরত্বের হিসাব । ১ নটিক্যাল মাইল হচ্ছে গিয়ে তোমার ১ .১৫০৮ মাইল । বা ৬০৭৬ ফিট।
খবরটা শুনেই মহানন্দে ক্যাপ্টেন জর্জ পোলার্ড জুনিয়র জাহাজের কোর্স সেই দিকে ঠিক করে রওনা হল ।
মাঝে পড়লো গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ । একশো সাতাশটা নানান সাইজের দ্বীপ মিলিয়ে এই গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ। এর মধ্যে আঠারোটা দ্বীপ বেশ পেল্লাই সাইজের। বাকিগুলো ছোট মোট।
তো এখানে খানিকটা থেমে জাহাজের রেশন মানে খাবারের স্টক বাড়িয়ে নেয়ার কথা ভাবল সবাই ।
এখন গ্যালাপাগোস দ্বীপে তো আর মুদি দোকান নেই । ইচ্ছা মত ময়দা , চিনি , ডিম বা হেন তেন কিনে জাহাজ ভর্তি করে নেবে ।
কিন্তু তোমরা জানো না, সেই সময় গ্যালাপাগোস দ্বীপে হোঁৎকা সাইজের কচ্ছপ পাওয়া যেত । আর ধরাও খুব সহজ ।
সবাই মিলে একশো আশিটা হোঁৎকা সাইজের কচ্ছপ ধরে জাহাজে তুলে ফেলল ।লম্বা সময়ের সাগর যাত্রার জন্য কচ্ছপ একটা দারুন জিনিস । খেতে মজা, পুষ্টিকর সেটা তো আছেই । শুকনো নোনা যে কোন মাংসের চেয়ে আস্ত জ্যান্ত কচ্ছপ নেয়া অনেক ভাল।
সংরক্ষণ করাও সহজ ।
সাইজে ছোট কিন্তু উঁচু একটা বাক্সের মধ্যে একটার উপর আরেকটা কচ্ছপ রেখে বাক্সের ঢাকনা আটকে দিলেই কাজ শেষ । ওরা পালাতে বা নড়তে চড়তে পারবে না । খাওয়া আর জল ছাড়া এক একটা কচ্ছপ ঐভাবে এক বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকবে । এখন মাংসের দরকার হলে এক একটা কচ্ছপ বের করে রান্না করলেই ল্যাঠা চুকে যায় । এমনিতেই যদি জাহাজের ডেকের মধ্যে দুই চারটা কচ্ছপ ছেড়ে দেয়া হয় ওরা অলস পায়ে হেঁটে বেড়ায় । পালাতে পারে না । দরকার মত ধরে রান্না করলেই হয়ে গেল ।
কিন্তু তখনও কেউ ভাবতে পারেনি সামনে কি রকম ভয়াল দিন আসছে।
গ্যালাপাগোস দ্বীপের কচ্ছপ ধ্বংস করেই থামল না এসেক্স জাহাজের কর্মচারীরা ।
মজা করার ছলে, পাশের চার্লস দ্বীপের ঝোপ ঝাড়ে আগুন ধরিয়ে দিল । এই দ্বীপটা খুবই বিখ্যাত। আগে নাম ছিল ফ্লোরিয়ানা। পরে ১৭০০ সালের শেষের দিকে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের নামে নাম দেয়া হয়েছিল। এখানে ক্ষুদে একটা ডাকঘর ছিল । নানটাকেটের সমস্ত নাবিক- তিমি শিকারি- মাল্লা সবাই চিঠি পত্র এই দ্বীপের ডাকঘরে ফেলে দিত। সেই সব চিঠি চলে যেত সবার পরিবারের কাছে।
একদম অযথাই মানুষ কত কাজ যে করে তার একটা পাক্কা উদাহরণ ।
দেখতে দেখতে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো সেই আগুন । মুহূর্তেই চার্লস দ্বীপের সমস্ত গাছপালা আর জীবজন্তু পুড়ে ছাই হয়ে গেল ।
পরবর্তীতে অনেক গবেষক স্বীকার করেছে, সেই আগুনের জন্য দ্বীপের অনেক অচিন লতাপাতা আর জীবজন্তু একেবারে হারিয়ে গেছে প্রকৃতি থেকে ।সারা জীবনের জন্য।
আগুনের লঙ্কাকাণ্ড দেখে জাহাজের পাল তুলে সবাই ভেগে গেল ।
তবে ক্যাপ্টেন পোলার্ড ভীষণ রাগ করলেন ক্রুদের এমন আচরণ দেখে ।
অভিশাপ কথাটা আসলেও সত্য ।
এই ঘটনার পরে এসেক্স জাহাজের গায়ে অভিশাপ লেগে গেল ।
একদম ।
কিনত এখন আর তীরে বা বন্দরে ফেরার কোন উপায় নেই ।
নভেম্বর ২০, ১৮২০ ।
প্রায় এক বছর হয়ে গেছে নানটাকেট বন্দর ছাড়ার পর। এবং অবশেষে এতদিনে এসেক্স জাহাজ এসে পৌঁছলো সেই হোয়েল হান্টিং গ্রাউনডে । অন্য জাহাজিদের মুখে যে জায়গার গল্প তারা এতদিন শুনে এসেছে । যেখানে গিজগিজ করছে তিমি আর তিমি । এবং আরও তিমি ।
এক সাথে এত তিমি আগে কেউ কখনও দেখেনি ।
এখানে জলের চেয়ে যেন তিমি বেশি । চারিদিকে ব্যস্তবাগীশ হয়ে ছুটছে, সাঁতার কাটছে । ফোয়ারার মত ছিটিয়ে দিচ্ছে জল।
বিপুল উৎসাহে কাজে লেগে পড়লো জাহাজের ক্রুরা । বুঝে গেছে, ভাগ্য বদলে গেছে সবার ।তেল ভর্তি পিপে নিয়ে বন্দরে ফিরলে বন্দরের লোকজন কেমন গোল্লা গোল্লা চোখে তাকাবে সেটা কল্পনা করেই সবার হাসি কানের লতি পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে।
পিচ্চি হোয়েলিং বোট নিয়ে শিকারিরা জলে নেমে পড়লো । বড় এক দঙ্গল তিমি লক্ষ্য করে ধাওয়া করলো সবাই ।
তিমি শিকার বেশ নিষ্ঠুর একটা পেশা।
প্রথমে ডিঙ্গি নৌকা করে চুপচাপ যতটা সম্ভব তিমির কাছাকাছি যেতে হয় ।
ডিঙ্গি বৈঠার ছপ ছপ শব্দ তিমি বহু দূর থেকেই শুনতে পায় । চেষ্টা করে পালিয়ে যেতে । তারপরও যত সম্ভব কাছে চলে আসে শিকারিরা ।
গায়ের জোড়ে ছুড়ে দিতে হয় হারপুন। হারপুন লম্বায় পাঁচ থেকে ফুট লম্বা হয় । তিমির গায়ে সেটা বিঁধলেই তিমি পালানোর চেষ্টা করে । পিছন পিছন ধাওয়া করে শিকারিরা। পালাতে পালাতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেই একটার পর একটা নতুন হারপুনের আঘাত করে খুন করা হয় বেচারাকে। মোট দশ থেকে পনের বার আঘাত করতে হয় । তাও হৃৎপিণ্ড বা ফুসফুসে । নইলে ঘায়েল করা যায় না সাগরের এই আদিম আর ভদ্র দানবটাকে ।
ফিনকি দিয়ে লাল রক্ত বের হয়ে আসে । লাল হয়ে যায় নীল সাগরের জল ।সচরাচর অমনই হয় ।
তবে সব সময় ঘটনা একই রকম ঘটে না।
এটাও নিয়ম ।
সেই তিমির দলে ছিল ধাউস সাইজের একটা তিমি । ওরা কিন্তু একদম শান্ত প্রাণী । শিকারিরা না এলে ওদের নিয়মেই সুন্দর জীবন চলে যায়। সাঁতার কাটে। খায়। ঘুরে বেড়ায় মহাসাগর থেকে সাগরে। শে এক দারুণ জীবন।
তো, এই ধাউস তিমিটা যখন দেখল ওর পরিবারের সদস্য , বন্ধু- বান্ধব , আর সাগরের সাঁতার সঙ্গীরা এক জনের পর একজন এসেক্স জাহাজের শিকারিদের হাতে মারা পড়ছে , তখন নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না।
কেমন যেন ক্ষেপে গেল ।
ব্যাপারটার এক হাত দেখে নিতে চাইলো সে ।
ভাল কথা ওদের কিন্তু হাত আছে । মাথার পাশে ওর যে দুটো ফ্লিপার আছে সেটার চামড়ার তলায় মানুষের হাতের মতই ওর হাতের হাড়।
তো এই বদমেজাজি ধাউস তিমিটার সাইজ ছিল প্রায় ছাব্বিশ মিটার । ওজনে প্রায় আশি টন । ও কি করলো, গভীর একটা ডুব দিয়ে তীরের মত উঠে এসে গায়ের সব শক্তি দিয়ে আঘাত করলো সেসেক্স জাহাজের তলায় ।
যারা হোয়েলিং জাহাজে কাজ করে তাদের কাছে অমন ধাক্কা ফাক্কা নতুন কিছু না ।একদম সাধারণ ব্যাপার । অনেকটা যেমন পল্টন থেকে বাসে করে নিমগঞ্জ ফেরার সময় পাশের সিটের যাত্রী খামখাই বমি করে দেয় শরীরের উপর তেমনটাই ।
বা ভাড়া দেয়ার পরও কনটাকটার ঘুম থেকে তুলে আমাকে বলে- ভাই বাড়াটা দ্যান' -তেমনই।
তারপরও তিমি অমন তেড়ে এসে আক্রমণ করে অমন ঘটনা হর হামেশা শোনা যায় না । বেশ দুর্লভ ঘটনা। নাবিকেরা নিজেদের সামলে নিয়ে তিমিটাকে পাল্টা আক্রমণের জন্য তৈরি হয়ে গেল । উচিৎ শিক্ষা দিতে হবে ব্যাটাকে।
কিন্তু পরের ঘটনা আরও ভয়ানক ।
প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তখন যেন তিমিটা পাগল হয়ে গেছে । সাঁতরে চলে গেল অনেক দূরে । দ্রুত ঘুরে এসেই দ্বিগুণ গতিতে আরেকটা ভয়ানক আঘাত করে বসলো সে । এইবারের আঘাতটা জাহাজের পোর্ট বো- এর দিকে ।
জাহাজের নাক যদি তোমার নাক বরাবর রাখি তবে ওর ডান বা বাম দিকটাই পোর্ট বো বলে ।
দ্বিতীয় আঘাতটা ছিল বেশি মারাত্নক । টলমল করে উঠলো এসেক্স । সেই আঘাত শেষ করেই মনের তৃপ্তি নিয়ে পারদের রঙের মত সাগরের তলায় ডুব দিয়ে হারিয়ে গেল রাগি তিমিটা ।
মাথায় সামান্য ব্যাথা পেলেও মনে শান্তি ।
এই দিকে গল গল করে সাগরের নোনা জল ঢুকতে শুরু করেছে জাহাজের ভেতরে । এইবার আর রক্ষা নেই । হোয়েলিং বোটগুলো , যারা তিমি শিকার করতে গিয়েছিল , ফিরে এসে দেখতে পেল জাহাজের অবস্থা শেষ ।
কি হয়েছে - অবাক হয়ে জানতে চাইলেন ক্যাপ্টেন জর্জ ।
দ্রুত ব্যাখ্যা করলো ফাস্ট মেট।
ক্যাপ্টেন টের পেলেন হাতে আর সময় নেই। ডুবছে এসেক্স । দ্রুত তৈরি হয়ে নিল সবাই । বাঁচার জন্য লাগবে অমন দরকারি কিছু জোগাড় করে নৌকায় উঠতে লাগল । হাতেগোণা কয়েকটা কচ্ছপ নিল । সাথে গাঁদা বন্দুক যেটাকে মাস্কেট বলে । ৬৫ গ্যালন মিষ্টি জল । মিষ্টি জল মানে চিনি মেশানো না। সাধারণ জল, তেষ্টায় পান করার জন্য ।
আর ছয়শো পাউনড বিস্কুট ।
বিস্কুট শুনে আনন্দে বগল বাজানোর কোন দরকার নেই ।
এটা কিন্তু মহল্লার মোড়ের মর্ডান বেকারিতে বানানো ঘি আর ক্রিম দেয়া মজার বিস্কুট না ।
এই বিস্কুটগুলকে অনেকে জাহাজি বিস্কুট বলে । ভাল নাম - হার্ড ট্যাঁক । একদম বাজে জিনিস । স্বাদ গন্ধ কিচ্ছু নেই । কুকুরেও খাবে না। আটা আর লবণ দিয়ে বানানো । পাথরের মত শক্ত । সহজে নষ্ট হয় না এই যা সুবিধে । দূরের যাত্রার সময় এই জিনিস নেয়া বেশ সুবিধের। অনেক আগে আমেরিকান সৈনিকদের এই বিস্কুট আর কফি সকালের জল খাবার হিসাবে দেয়া হত ।
এমন জায়গায় জাহাজটা ডুবছে , স্থলভাগ হাজার হাজার মাইল দূরে ।
নৌকা চালাতে লাগবে অমন দরকারি কিছু জিনিস নিয়ে উঠে গেল সবাই । বিশেষ করে ক্যাপ্টেনের ন্যাভিগেশনের যন্ত্রপাতিগুলো ছিল তাদের জন্য অমূল্য সম্পদ । কম্পাস -ম্যাপ এইসব আরকি ।ওগুলো ছাড়া খোলা সাগরে থেকে বাড়ি ফেরা অসম্ভব হয়ে যাবে ।
বিশ জন লোক ভাগ করে তিন ডিঙিতে উঠেছে । এক এক ডিঙ্গির জন্য ভাগে পড়েছে দুইশ পাউনড করে সেই বিস্কুট । ৬৫ গ্যালন জল আর দুটো করে কচ্ছপ । বাকি কচ্ছপ তিমি আঘাতের সময় ছিটকে ছুটকে কথায় যেন হারিয়ে গেছে ।
প্রতিটা ডিঙ্গির নেতা পেল পিস্তল আর মাস্কেট বন্দুক ।
চোখের সামনে ধীরে ধীরে ডুবে গেল এসেক্স । কতবার সাগর যাত্রা করে ফিরেছে সে । এইবার চলে গেল সাগরতলে । সারাজীবনের জন্য । বন্দরে ফেরা হবে না আর।
কখনই না।
নৌকায় বসে খাবারগুলোর হিসাব নিলেন ক্যাপ্টেন জর্জ । গুনেপিনে দেখলেন, এক এক জন যদি দিনে হাফ পাইন্ট , মানে আধা গ্লাস করে জল আর সাথে মাত্র একটা করে আটার বিস্কুট খায় তবে এই রসদে তাদের ষাট দিন চলবে । একটা বিস্কুটের ওজন মাত্র ছয় আউন্স । ভাবা যায় ?
সাবধান হওয়াই ভাল । কতদিন খোলা সাগরে নৌকায় থাকতে হবে কে বলবে ?
ক্যাপ্টেন হিসাব করে দেখলেন -সবচেয়ে কাছে হচ্ছে , বারোশো মাইল দূরের ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জ ।
উনার বিশ্বাস, ওখানে গেলে বেঁচে থাকার সুযোগ আছে । সবচেয়ে কাছে । জল টল আছে ।
কিন্তু সঙ্গী নাবিকেরা সবাই আপত্তি করে বসলো । ওরা কার কাছে নাকি শুনেছে সেইসব দ্বীপের আদিবাসিরা মানুষ খায় । ওদের পেলেই কাবাব বানিয়ে খেয়ে ফেলবে ।
বদলে সবাই ঠিক করলো চিলির দিকে যাবে । চিলি দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের কাছাকাছি একটা দেশ । একটু বেশি দূর হয়ে যায় । কিন্তু টানা বাতাস - আর স্রোত থাকলে বৈঠা মেরে ষাট দিনে চলে যাওয়া সম্ভব ।
কিন্তু এই একটু বেশি দূরের পথের জন্য ভয়ানক চড়া দাম দিতে হয়েছিল সবাইকে । বলছি সেই সব কথা।
শুরু হল কষ্টকর যাত্রা ।
স্রোত আর বাতাসের উপর নির্ভর করে চলছে সবাই ।
দিনের পর রাত , রাতের পর দিন।
খিদে তেষ্টার কষ্ট। কড়া হলুদ রোদ ঝলসে দিচ্ছে সবাইকে । রোদের জন্য তেষ্টা বেড়ে যাচ্ছে । কিন্তু জল মাপা । আধা গ্লাস । উপরি বোনাস কষ্ট হিসাবে একটার পর একটা ঝড় এসে আঘাত করছিল ওদের উপর ।
আরও একটা কাণ্ড ঘটে গেছে । তিমির আক্রমণের সময় সেই আটার বিস্কুটের মধ্যে কিভাবে যেন সাগরের নোনা জল পড়ে গিয়েছিল । জল শুকিয়ে বিস্কুট হয়ে গেছে নোনতা। বিস্বাদ । এটা খাওয়া এখন আরও কষ্টকর । তারপরও খাচ্ছিল ।
জলের অভাবে কয়েক জন প্রস্রাব খেয়ে আরও বিপদে পড়ে গেল । সবাই জলশূন্যতায় ভুগছে । জিভ ফুলে ভারি হয়ে দাঁতের মাঝে আটকে গেছে । মুখের ভেতরটা সিরিস কাগজের মত । কথা বলতে পারছে না কেউ ।
নরকের মত কষ্টকর একটা মাস চলে গেল নৌকার মধ্যে ।
ডিসেম্বর ২০ । আচমকা একদিন দিগন্তের কাছে মাশরুমের মাথার মত দাগ দেখা গেল ।
ডাঙ্গা !
প্রাণপণে দাড় বাইতে লাগল সবাই । উৎসাহ এসে গেছে সবার ভেতরে । বেঁচে থাকার আশা এর চেয়ে বড় কোন উদ্দীপনা নেই । হতেই পারে না ।
ওই খানে নিশ্চয়ই খাবার পাওয়া যাবে ? জল । পাওয়া যাবে আশ্রয় ।
এমন কি হতে পারে সভ্য কোন মানুষের বাসভূমি !
তীরে নেমে হতাশ হতে হল ।
যেমনটা ভেবেছিল তেমন কোন স্বর্গদ্বীপ না !
দ্বীপটার নাম - হেনডারসন আইল্যান্ড । বসতি নেই । মানুষ নেই ।
আর খাবার ?
ক্ষুদে আকৃতির কিছু পাখি আর কাঁকড়া আছে । পাওয়া গেল পাখির কিছু ডিম । আরেকটা জিনিস আছে অঢেল । পিপার ঘ্রাস । ঘাসই বলা যায় । আসলে গুল্ম । অনেকটা শর্ষে শাকের মত । সালাদ হিসাবে কাচা খাওয়া যায় । সেদ্ধ করে নিলে আরও ভাল । অনেকটা কলমি শাক বা টাকাপাতার মত স্বাদ । পিপার ঘাসের শুকনো দানা মরিচ হিসাবে ব্যবহার করা যায় ।
ব্যস , এইই ।
কিন্তু রাক্ষসের মত ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর কিস্যু হবে না ।
তিমি শিকারিরা মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই পিচ্চি হেনডারসন আইল্যান্ডের সব পাখি -কাঁকড়া খেয়ে শেষ করে ফেলল ।
জল পেয়েছিল ।
দ্বীপের নানান জায়গায় পাথুরে গর্তে বৃষ্টির জল জমে ছিল । এই জল শরবতের বাপ । ঠাণ্ডা। মিষ্টি ।
তো সব যখন শেষ হয়ে গেল আবার বিপাকে পড়লো সবাই ।
কারণ পিচ্চি এই দ্বীপটা যে কোন মহাদেশ থেকে অনেক অনেক দূরে । এত দূরে কোন বানিজ্যিক জাহাজ ভুলেও আসবে না । মাছ ধরার জাহাজ ও আসবে না। ওদের কেউ এসে উদ্ধার করবে তেমন চিন্তা করা একদম অবাস্তব । বাংলা ব্যাকরণ বইতে সেই যে আকাশ আর ডিমের কুসুম বলে না ? - তেমনই আরকি ।
মোদ্দা কথা একদম অসম্ভব ।
ঠিক করলো দ্বীপ ছেড়ে আবার সাগরে ডিঙ্গি ভাসাবে । চেষ্টা করবে স্থলভাগে ফেরার । সোজা ডিঙ্গি চালিয়ে গেলে কাছের উপকূল চিলিতে পৌঁছতে পারবে।
সেটাও আবার এক হাজার মাইল দূরে !
মানে আবারও নোনা বিস্কুট আর সামান্য জল নিয়ে আগের বারের মত ভয়ানক যাত্রা ।
উপায় নেই ।
হেনডারসন দ্বীপে কিচ্ছু নেই যে খেয়ে বাঁচতে পারবে ।
কিন্তু দলের মধ্যে তিনজন কিছুতেই রাজি হল না । না, ওরা এই পিচ্চি দ্বীপেই থাকবে । সাগরে নেমে আবার নতুন করে জান প্রাণের রিস্ক নেবে না। এই তিনজনের মধ্যে কিভাবে যেন বিশ্বাস জন্মে গেছে - ওদের নাকি বাকি জীবন সাগরেই কাটাতে হবে। জীবনেও স্থল ভাগে ফিরতে পারবে না।
মনের ডাক !
রয়ে গেল তিনজন । ওরা জেদ করেছে দরকার হলে পিপার ঘাস আর জল খেয়েই বাকি জীবন কাটাবে । এই ঘাস সারা বছর ধরেই জন্মে । ঘাস তো নিয়মিত বড় হবে, মেঘ জমে বৃষ্টিও নিশ্চয়ই হবে ?
বাকি সবাই ডিঙ্গি ভাসাল নীল সাগরে ।
তিনটে ডিঙিতে ওরা এখন সতেরো জন।
আবার সেই যাত্রা ।
কল্পনা করতে পারো ? সারা দিনে একটা বিস্কুট । সেটা আবার তক্তি বিস্কুটের মত শক্ত । নোনা জলে ভিজে লবণে ঠাসা । নোনতা কিছু খেলে তেষ্টা পায় আরও বেশি ।
বিশ্বাস না করলে এখনই মুখে কয়েকটা দানা লবণ দিয়ে দেখ ।
যাত্রা করতে না করতেই তুমুল বাতাসে ডিঙ্গি চলে গেল ভুল পথে । হিসাব কষে ক্যাপ্টেন দেখলেন - এইরে অনেক দূর চলে গেছে ডিঙ্গি ।
চিলি অনেক দূরে । সামনে আছে আবার একটা পিচ্চি দ্বীপ - মাস এ টিয়েরা ।
আজকাল ম্যাপে খুঁজলে এই নামে কোন দ্বীপ পাবে না । কারণ পরবর্তীতে এটার নাম পাল্টে রবিনসন ক্রুসো আইল্যান্ড রাখা হয়েছে ।
কেন ?
সেটা আবার অন্য এক কাহিনি। আরেক দিন বলব ।
তো, দলের সবাই যখন জানতে পারলো চিলির উপকূলে পৌছার আশা একদম নেই , সবাই বেশ হতাশ হয়ে গেল।
কে না জানে, হতাশা সবগুণনাশিনী ।
সেটা ছিল জানুয়ারির দশ তারিখ ।
সেকেন্ড মেট ম্যাথিউ জয় মারা গেল ।
সাগর যাত্রার ঝক্কি সামাল দিতে পারেনি । অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল বেচারা । নাবিকদের পুরানো নিয়ম অনুসারে ওর লাশটা সাগরে ফেলে দেয়া হল। সন্দেহ নেই দলের সবার মন আরও খারাপ হয়ে গেল । এই সেইদিন এক সাথে যাত্রা করেছিল ।
আজ সঙ্গীর লাশ চল গেল ঠাণ্ডা অন্ধকার সাগরের তলায় ।
ম্যাথিউ-র ডিঙ্গির নতুন সর্দার হল হেনড্রিক। নতুন সর্দার আবিস্কার করলো, মরার আগে ম্যাথিউ ডিঙ্গির রেশন ঠিক মত হিসাব রাখেনি । বা চোখে চোখে রাখেনি । ফলে একটাও বিস্কুট নেই ।এমন কি জল ও গায়েব !
এখান থেকে সব কিছু আরও বিচ্ছিরি হয়ে উঠলো ।
আরেকটা ঝড় এসে আঘাত করলো ডিঙ্গিগুলোর উপর। এরা সব সময় পাশাপাশি ছিল । কিন্তু ঝড়ের শেষে দেখা গেল একটা ডিঙ্গি নেই ।
কোথায় যেন হারিয়ে গেছে ।
ব্যাপারটা খুব কষ্টকর ।
পাশাপাশি তিন ডিঙ্গি ভাসছিল । ঝড় শেষ ...একটা নেই । খাঁ খাঁ চারিদিক ।
বেশ খানিক খোঁজাখুজি করেও কোন লাভ হল না। পুরো দলটা দুই ভাগ হয়ে গেল । দুটো এক সাথে। বাকি একটা ডিঙ্গি যেটার সর্দার ছিল ওয়েন চেইস ওটা হারিয়ে গেছে।
ওয়েন চেইসের ডিঙ্গি একা একা চলল সেই অনন্ত যাত্রায়।
একা ।
আগে তবু পাশে সঙ্গীরা ছিল ।
এই নিঃসঙ্গ ডিঙ্গির এক মাত্র নিগ্রো নাবিক রিচার্ড পিটারসন মারা গেল । নোনা বিস্কুট , তেষ্টা আর রোদ সব মিলিয়ে তার জীবনীশক্তি ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ করে ফেলছিল । আর পারছিল না।
ওর মৃতদেহটাও ফেলে দেয়া হল সাগরে । কি করবে ?
একটা কথা না বলে পারছি না তিমি শিকারিদের জাহাজে কালো মানুষদের খাবার দেয়া হত , সঙ্গী শাদাদের তুলনায় কম । অপুষ্টির শিকার হত ওরাই বেশি । অন্যদের তুলনায় ওদের শরীরে চর্বির পরিমাণ একদমই থাকতো না।
আর উপবাস করতে গেলে শরীরের চর্বির ভূমিকা অনেক বড়। সঙ্গত কারনেই মোটা সোটা নাদুস নুদুস মানুষ রোগা পটকাদের তুলনায় না খেয়ে বেশিদিন টিকতে পারবে ।
আইজাক কোল মারা গেল এইবার ।
অপুষ্টি আর খিদে নিয়ে এটা দ্বিতীয় মৃত্যু ।
এই প্রথম বাকি তিন সঙ্গী তার লাশটা সাগরে ফেলে দিতে গিয়ে কেমন যেন দোটানায় ভুগতে লাগল।
এবং যা সিদ্ধান্ত নিল সেটা শিউরে উঠার মত । গা ছমছমে । হাড় হিম করা ব্যাপার ।
রোগা হাড় জিরজিরে শরীরটা দেখে মনে হল চামড়ার ব্যাগ ভর্তি কিছু হাড় গোড় । এতই খারাপ অবস্থা ।
বাকি তিনজন আর সময় নষ্ট করলো না। চাকু দিয়ে আইজাকের শরীরের মাংস কেটে খাওয়া শুরু করলো।মনে হল মাংস খানিকটা শক্ত । কাজেই হৃৎপিণ্ড , যকৃৎ আর কলিজা বের করে খাওয়া শুরু করলো । যতদূর সম্ভব শরীরের মাংস খেয়ে বাকি অংশ সাগরে ফেলে দিল ।
দুঃখজনক একটা ব্যাপার ।
২০শে জানুয়ারি ।
অবিড হেনড্রিকস যে ডিঙ্গির সর্দার সেখানের কালো নাবিক লসন টমাস মারা গেল।
খাবারের অভাব, ক্যাপ্টেন পোলারড আর হেনড্রিক মিলে ভয়ানক এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন ।
সঙ্গীর মৃতদেহের মাংস খাওয়া যেতে পারে । নিয়তি আর কাকে বলে । নরখাদক আদিবাসীদের ভয়ে এত দূরের পথ পাড়ি দিয়ে শেষে নিজেরাই নরখাদক হয়ে গেল ।
টমাসের শরীর থেকে টেনে টুনে ত্রিশ পাউনডের মত চর্বিহীন শক্ত মাংস পাওয়া গেল ।
খুব বেশি না। কিন্তু সেই হার্ডট্যাঁক (hardtack ) নামের বাজে নোনা বিস্কুটও ছিল না। শেষ হয়ে গেছে । কাজেই এই মাংস খেয়ে বেশ খুশিই হল সবাই ।
জানুয়ারি ২৩। আরেকজন কালো নাবিক চার্লস শটার মারা গেল। ও ছিল ক্যাপ্টেন পোলাডের ডিঙিতে ।
ওর শরীরটাও খাওয়া হল ।
অনেকের মনে হতে পারে শুধু মাত্র কালো নাবিকরা মারা যাচ্ছে কেন আর ওদের শুধু খাওয়া হচ্ছে এটা কি আসল সত্য ?
আসলে আগেই বলেছি শাদাদের তুলনায় ওদের শরীর স্বাস্থ্য ভাল ছিল না। আর এখানে বিখ্যাত লেখক ড্যানিয়েল জেমস ব্রাউন বলেছেন -
'বেঁচে থাকার তাগিদে যখন খুন করতে হয় তখন কাছের চেয়ে দূরের সম্পর্ক আগে খুন করা যায় । ঘোড়া মারার আগে ভেড়া বা ছাগল মারা যায় । মানুষ মারার আগে কুকুর , পরিচিতের আগে অচেনা কেউ , বন্ধুর আগে অচেনা । পরিবারের আগে বন্ধু। '
ইসায়াইয়া শেপারড , হেনড্রিকসের নৌকার আরেক কালো নাবিক । জানুয়ারি ২৭ মারা গেল।
সাতদিনের মধ্যে মোট তিনজন কালো নাবিককে খাওয়া হল ।
পরের দিন মানে জানুয়ারি ২৮ , ক্যাপ্টেন পোলারডের ডিঙ্গির কালো নাবিক স্যামুয়েল রীড মারা গেল।
খাওয়া হলো ওর মাংস !
উইলিয়াম বন্ড ,শেষ কালো নাবিক । এখন বেঁচে আছে ।
আপাতত মনে হতে পারে ওরা কি প্রচুর মাংস খাচ্ছে না ?
উত্তর -না। মানুষগুলো আসলেও ছিল রোগা পটকা । চর্বির পরিমাণ একদম নেই। সেই মাংস হজম করতেও সমস্যা হচ্ছিল । চর্বি ছাড়া শরীরে দ্রুত পুষ্টি ফিরেও আসে না। কাজেই খাওয়া দাওয়ার পরও ওদের খিদে বেড়ে যাচ্ছিল বিচ্ছিরি ভাবে।
জানুয়ারি ২৯। হেনড্রিক্সের ডিঙিটা হারিয়ে গেল।
আসলেও তাই । কোথাও দেখা যাচ্ছে না ওদের ডিঙিটা ।
দুঃখের বিষয় ওই ডিঙিতে নেভিগেশনের কোন যন্ত্রপাতি ছিল না। একটা কম্পাস পর্যন্ত না।
দুই সপ্তাহ পর্যন্ত ওদের খোঁজা হল ।
পাওয়া গেল না।
সামান্য তিমি শিকারিদের জীবনে এত কিছু ঘটবে কে জানতো ?
কোথায় পিপে ভর্তি তেল নিয়ে বন্দরে টাকা গুনবে , না - নিজেদের নিজেরা খাচ্ছে ।
এখন আর কি বাকি আছে ।
খুন !
নিজেদের কাউকে খুন করতে হবে কে জনাতো ?
ফেব্রুয়ারি ৬, ক্যাপ্টেন পোলাডের ডিঙিতে খাবার শেষ । কিছু নেই । আগের দুই মৃত সঙ্গীর মাংস খেয়ে শেষ করে ফেলেছে । এখন স্বাভাবিক মৃত্যু কেউ বেছে নিতে চাইছে না।
মানে কেউ না খেয়ে মরার কথা ভাবতেই পারছে না। নাবিক চার্লস রামসডেল রোমহর্ষক এক আইডিয়া দিল । সবার নাম দিয়ে লটারি করা হোক । লটারিতে যার নাম উঠবে তাকে খুন করে খাওয়া হবে ।
ভাবা যায় এইসব ?
অভিশাপ ।
এত কিছুর পরও ক্যাপ্টেন পোলারড রাজি হলেন না। শত হলেও ক্যাপ্টেন যে । কিন্তু বাকি দুই নাবিক কফিন আর রে মিলে যখন চার্লসের সাথে তাল দিল তখন ক্যাপ্টেন নিজের অটল মনোভাব থেকে গুটিয়ে গেল ।
কাগজের টুকরোয় সবার নাম লিখে টুপির মধ্যে রাখা হল । যার নাম উঠবে তাকে ...।
ওয়েন কফিনের নাম উঠলো ।
আহা।
দলের সবচেয়ে পিচ্চি সদস্য । বয়স মাত্র সতেরো । এই ক্ষুদে অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ছেলেটার এটাই ছিল প্রথম সমুদ্র যাত্রা । আগে বলেছি কি না মনে নেই কফিন ছিল ক্যাপ্টেনের চাচাতো ভাই । বাড়ি থেকে যাত্রার সময় ক্যাপ্টেন বাড়ির লোকদের কথা দিয়েছিল পিচ্চিকে নিরাপদে দেখে শুনে রাখবেন।
এখন কি হবে ?
মাস্কেট বাগিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন ক্যাপ্টেন - ' আমার ভাইকে যে স্পর্শ করবে তাকেই গুলি করব ।'
কফিনের বদলে নিজেকে তুলে দিতে চাইলেন খাদ্য হিসাবে।
কিন্তু ভালমানুষ কফিন বাঁধা দিল । নিজের ভাগ্য মেনে নিয়েছে সে।
'আমার বদলে যদি তোমরা বেঁচে থাক, আমি খুশি হব ।' জবাব দিল কফিন।
কে খুন করবে কফিনকে ? - আবার লটারি করা হল ।
রামসডেলের নাম উঠলো । যে কি না এই খুন করে খাওয়া দাওয়ার বুদ্ধি দিয়েছে । এইবার রামসডেল পিছিয়ে গেল । কফিন ওর ছোটবেলার বন্ধু যে । বন্ধুকে কেউ নিজের হাতে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করতে পারে ?
করা হল ।
কফিনের মাথার পিছনে মাস্কেট ধরে গুলি করা হল ।
খুব জানতে ইচ্ছা করছে , তখন কেমন ছিল তার মনের ভাব ? কি কি ভাবছিল ? বাড়ির কার কথা মনে পড়ছিল ? খুব অল্প জীবন পেয়েছিল বেচারা । মরার আগে কফিন ওর মায়ের কাছে একটা খবর পৌঁছে দিতে বলেছিল । অনুরোধ করেছিল ক্যাপ্টেন পোলারডের কাছে । চাচাতো ভাইয়ের কাছে কথা দিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন , যদি কোন ভাবে নানটাকেটে ফিরতে পারেন তবে পিচ্চির মায়ের কাছে পৌঁছে দেবেন ওর খবর।
পিচ্চি কফিনকে খুন করে ওর মাংস কেটে খাওয়া হল ।
একটা ডিঙ্গির সর্দার ছিল ফাস্ট মেট ওয়েন চেইস মনে আছে ?
যেখানে আইজাক কোল নামে কালো নাবিককে খেয়েছে ওরা । ওরা অত সহজে নরখাদক হবার কথা ভাবেনি । অন্তত অন্য ডিঙ্গির লোকদের মত ।
ফেব্রুয়ারি ৮ , আইজাক কোল জ্বরে ভুগে চিৎকার করে প্রলাপ বকতে বকতে খিঁচুনি দিয়ে মারা গিয়েছিল ।
মরার ঘণ্টা খানেক আগে তার কথা বলার শক্তি ও শেষ হয়ে গিয়েছিল ।
সেই দুপুরেই মারা গিয়েছিল সে ।
আগেই বলেছি সেইসব ।
ততদিনে ৭৮ দিন পার হয়ে গেছে খোলা সাগরে ।
ফেব্রুয়ারি ১৪ তারিখের মধ্যে কোলের মাংস খেয়ে শেষ করলো । ততক্ষণে মাংস হয়ে গিয়েছিল সবুজ , বিস্বাদ আর বাজে গন্ধ ।
চারদিন পর ব্রেঞ্জামিন লরেন্স ক্লান্ত ভাবে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালো ।
নিজের চোখে যা দেখছে সত্য ?
নাকি মারা যাবার আগের বিভ্রম ?
দিগন্তের কাছে জাহাজের পাল দেখা যাচ্ছে ।
ওর অবস্থা দেখে বাকি দুই সঙ্গীও উঠে দাঁড়ালো ।
লন্ডন থেকে একটা জাহাজ সেই পথেই যাচ্ছিল । জাহাজের নাম - ইনডিয়ান ।
ওদের দেখতে পেয়ে জাহাজটা সাবধানে ডিঙ্গির পাশে ভিড়ল । জানতে চাইলো - কারা তোমরা ? পরিচয় ?
ফাস্ট মেট ওয়েন চেইস অনেক কষ্টে ফুলে উঠে জিভ নেড়ে কোন মতে শুধু বলতে পারলো - এসেক্স , হোয়েলশিপ , নানটুকেট ।
ইনডিয়ান জাহাজের খালাসি আর মাল্লারা তড়িঘড়ি করে চেইস , নিকারসন আর লরেন্স এই তিনজনকে জাহাজে তুলে ফেলল । সোজা নিয়ে গেল ইনডিইয়ান জাহাজের ক্যাপ্টেনের কাছে ।
ওদের দেখে ক্যাপ্টেনের মনে হল - ' কষ্ট আর দুর্দশার জ্যান্ত প্রতিমূর্তি ।'
অমনটাই তিনি ডায়েরিতে লিখেছিলেন ।
এই সময় তিনশো মাইল দূরে ছিল ক্যাপ্টেন পোলারডের ডিঙিটা । ওরা তিনজন বেঁচে ছিল। রে , চার্লস রামসডেল আর ক্যাপ্টেন । তবে বারো দিন আগে বারজিলাই রে মারা গেছে । অসুখে ভুগে।
সঙ্গত কারনেই ক্যাপ্টেন আর রামসডেল দুই জনে মিলে ওর শরীরটা খেয়েছে ।
শুধু তাই না হতাশ আর ক্ষুধার্ত এই দুইজন রে-এর শরীরের হাড় গোড় থেকে মজ্জা চুষে খাওয়া শুরু করেছিল ।
এইজন্যই বেঁচে গেল তারা ।
শুনতে খারাপ হলেও । কারণ এই একটা কায়দা করার জন্য প্রয়োজনীয় চর্বি পেল, বেঁচে থাকতে যা খুবই দরকার ।
ঘটনা আরও বেশি হতে পারতো । শেষ হয়ে গেল ।
ফেব্রুয়ারি ২৩, জাহাজ ডাউফিন ওদের দুইজনকে খুঁজে পেল ।
জাহাজের নাবিকেরা ডিঙ্গির পাশে পৌঁছে ওখানের দৃশ্য দেখে সবার শরীরের রক্ত জল হয়ে গেল ।
বাকি জীবন ভুলতে পারবে না।
রোগা জিরজিরে জ্যান্ত কঙ্কালের মত দুই লোক বসে তখনও মৃত সঙ্গীর দেহের হাড়গোড় চুষে খাচ্ছে । কিচ্ছু নেই। তারপরও খাচ্ছে সেই হাড় । চারিদিকে রক্ত , হাড় । আবর্জনা ।
এমনকি যারা তাদের উদ্ধার করতে গিয়েছিল তাদের আক্রমণ করতে চেয়েছিল হতভাগা ক্যাপ্টেন আর সঙ্গী ।
ভেবেছিল খাওয়ার ভাগ নিতে এসেছে ওরা !
আরেকটা জাহাজ পাঠানো হল হেনডারসন আইল্যান্ডে ।
সেটা কেন ?
মনে আছে সেই যে তিনজন দ্বীপে থাকতে চেয়েছিল । বলেছিল , মরে গেলেও ডিঙ্গি দিয়ে সাগর যাত্রা করবে না ।
ওদের খোঁজ নেয়ার জন্যই এই যাত্রা ।
কি অদ্ভুত কাণ্ড !
গিয়ে দেখা গেল সেই তিনজন বেশ ভাল আর সুস্থ আছে। দ্বীপের পিপার ঘাস, পাখি , বৃষ্টির জল , কাঁকড়া আর মাছ খেয়ে বেশ একটা পিকনিক মুডে আছে তিন নাবিক।
সন্দেহ নেই এই কাহিনিতে এরা তিনজনই ভাগ্যবান ।
সবার ভাগ্য সমান হয় না।
বাকি রইল একটা ডিঙ্গি ।
যেটার সর্দার অবে হেনড্রিকস । হারিয়ে গিয়েছিল যে । ওই ডিঙিতে দুইজনের মাংস খাওয়া হলেও তিনজন জীবিত ছিল ।
জসেপ ওয়েস্ট । উইলিয়াম বন্ড । আর সর্দার হেনড্রিক ।
ওদের ডিঙ্গিটা পাওয়া গেল নিঝুম জনমানব বসতিহীন একটা দ্বীপের সৈকতে ।
রোদে শুকিয়ে খটখট করছে তিনজনের কঙ্কাল । কেউ কারও মাংস খায়নি । মারা গেছে ।
বন্দর থেকে একুশ জন যাত্রা করেছিল এই মাত্র সেইদিন । আট জন জীবিত ফিরেছে বন্দরে । না খেয়ে মারা গেছে তিনজন ।
মাংস খাওয়া হয়েছে সাত জনের ।
এই হচ্ছে তিমি শিকারি এসেক্স জাহাজের গল্প ।
রাতারাতি সব খবরের কাগজে ছাপা হল এই কাহিনি । আর সেটা গিয়ে পড়লো আমাদের লেখক হারমান মেলভিল সাহেবের কাছে ।
তিনি নিজে গিয়ে দেখা করেন ফাস্ট মেট ওয়েন চেইসের ছেলে উইলিয়াম হেনরি চেইসের সাথে । বাবার কাছে থেকে ঘটনার খুঁটিনাটি সব জেনেছিল হেনরি চেইস ।
সব শুনে কাহিনীটা লিখে ফেলেন মেলভিল সাহেব । ছাপা হয় বিখ্যাত বই - মোবি ডিক ।
অনেকের মনে করে এসেক্স জাহাজের গল্পটা মোবি ডিক উপন্যাসের কাহিনির চেয়ে বেশি গা ছমছমে , রোমাঞ্চকর ।
কিন্তু মেলভিন সাহেব আমাদের জন্য সেই নরখাদকের কাহিনি লিখতে চান নি । তিনি রূপক উপন্যাসের মধ্যে পাঠকদের মেসেজ দিতে চেয়েছিলেন । মোবি ডিক উপন্যাসে শুধু মাত্র ইষমেল বেঁচে থাকে । আর সবাই মারা যায় ।
কাঠের একটা কফিন আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকে সে অথৈ সাগরে ।
কফিন !
মনে পড়ে ? ওয়েন কফিন ? ক্যাপ্টেনের চাচাতো ভাই , লটারিতে যার নাম উঠেছিল । পিচ্চি জাহাজি । ভাগ্যকে মেনে সবাইকে বাচিয়ে দিয়েছিল যে ।
এটাই হয়তো মেলভিল সাহেবের সংকেত ।
বাড়ি ফেরার পর ক্যাপ্টেন জর্জ পোলারড নতুন করে জীবন শুরু করেন । সামান্য বিরতির পর 'টু ব্রাদার্স ' জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসাবে সমুদ্র যাত্রা করেন আবার । সেটা মার্চ ৫, ১৮২১ ।
হাওয়াই দ্বীপের কাছে গিয়ে 'টু ব্রাদার্স' ঝড়ের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে ডুবে যায় । কবি সাহিত্যিকরা যেটাকে সলিল সমাধি না কি যেন বলে সেটাই । মনে হচ্ছে ক্যাপ্টেন পোলারড সত্যি সত্যি অপয়া । উনার উচিৎ ছিল রাস্তার ধারে লেবুর শরবৎ বিক্রি করা।
এইবার ফিরে আসার পর আর কেউ বেচারাকে চাকরি দিতে চায় না। বাধ্য হয়ে বাকি জীবন বন্দরের দারোয়ান হিসাবে কাজ করে অপয়া ক্যাপ্টেন ।
আটাত্তর বছর বয়সে সেকসট্যান্ট হাতে নিয়ে মারা যায় সে।
যতদিন বেঁচে ছিলেন প্রতি বছর ২০শে নভেম্বর উপবাস থাকতেন । মৃত সঙ্গীদের কথা স্মরণ করে ।
ফাস্ট মেট ওয়েন চেইজ নতুন উদ্যমে ক্যারিয়ার গঠন করার কাজে লেগে পড়ে । এবং ভালই কাজ দেখায় । তিমি শিকারিদের কাজে লাগে সে । কাজ করে টানা কুড়ি বছর ।
কিন্তু অবসর গ্রহণ করার পর অদ্ভুদ মানসিক সমস্যা দেখা দেয় ওর ।
সব সময় বাড়ির চিলে কোঠায় খাবার লুকিয়ে রাখত । যেন কেউ কেড়ে নেবে ওর কাছ থেকে। মাথা ব্যাথা আর মানসিক অসুস্থতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভুগিয়েছে ওকে । মারা যায় মানসিক হাসপাতালে ১৮৬৯ সালে । পরের বছর মারা যায় ক্যাপ্টেন ।
বেশ কয়েক দশক নানটাকেট বন্দর ছিল সরগরম ।
মানুষের মাংস খাওয়া!
অবশ্যই বাজে ব্যাপার । আরও একটা ব্যাপার আলোচনার মধ্যে এসেছিল- হয়তো ইচ্ছা করেই কালো নাবিকদের মেরে খেয়েছে ।
হয়তো !
এটা নিয়ে কালো জাহাজি আর নাবিকদের মধ্যে নানা রকমের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল।
বেশ একটা বিক্ষোভ আর আন্দোলনের মত আরকি । অনেক সময় লেগেছিল নতুন করে কালো নাবিক আর জাহাজি পেতে । কেউ এই পেশায় আসতে চাইত না ।
সময় সব কিছু ঠিক করে ফেলে । কে না জানে ?
তো এই হচ্ছে মেলভিল সাহেবের সাদা তিমির সম্পূর্ণ কাহিনি ।
আসল । অকৃত্রিম ।
আমার জানা দুঃখজনক কাহিনির মধ্যে একটা ।
তোমাদের জন্য এই গল্প বলতে গিয়ে অনেক বই আর কাগজ পত্র ঘাঁটতে হয়েছে আমার । বিন্দু মাত্র কষ্ট লাগেনি ।
আগামীতে সাগরের আরও ভয়াল আর রোমাঞ্চকর কাহিনি নিয়ে বসব তোমাদের সাথে ।
জানো নিশ্চয়ই, সাগরের রহস্যের কোন শেষ নেই ।
ধৈর্য ধরে আমার কথা শোনার জন্য ধন্যবাদ ।









মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন