সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বেনামি পাপ

 এক

 

আমার কোন দোষ নেই। 

বিশ্বাস করুন  

মানুষ হিসাবে আমি ততটা খারাপ নই। দুনিয়ার এইসব  ঘোর প্যাঁচ মাথায় খেলে না। পরিকল্পনা করে বা ছক বেঁধে কারও ক্ষতি করতে পারি না।করিনি কখনও।  

আসলে যা ঘটে গেছে, নিয়তির লিখন ছাড়া আর কিছু না।

আমি শুধু রেবেকাকে আপন করে  পেতে চেয়েছিলাম । সেই সাথে চেয়েছিলাম ওকে সুখী করতে।

কে জানত সব কিছু অমন এলো মেলো হয়ে যাবে ?

কোন কিছুর উপরই আমার হাত ছিল না। সবই ঘটে যাচ্ছিল নিয়তির অমোঘ টানে।  আমার নিয়ন্ত্রনে ছিল না কিছুই  

আমাকে হয়তো আপনি লোভী ভাবতে পারেন। স্বীকার করছি, সাদাকালো বিচারে আমার আচরণ তখন হয়েছিল লোভীর মত। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আমার জায়গায় থাকলে আপনি তেমন কিছু করতেন না ?

এই মুহূর্তে বসে আছি  পার্কের বেঞ্চিতে   বাড়ি ফেরার সাহস নেই। সারাদিন না খাওয়া। শীতে কাঁপছি  চোখ বড় বড় করে চেয়ে দেখছি , হাসি খুশি দম্পতি। প্যারাম্বুলেটর ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। ভেতরে শুয়ে হাত পা  নাড়াচাড়া করছে ক্ষুদে শিশুটা। অথবা অবোধ ক্লান্তি নিয়ে ঘুমাচ্ছে  

আমার  বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসছে বার বার।  নিজের বোকামির জন্য নিজের মাথার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে।

কিন্তু হায়,  তাতে যদি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত !

রেবেকার সাথে আমার পরিচয় গত বছর ক্রিসমাসের সময়  যখন ওর সাথে পরিচয় হল , তখন  ছিল প্রেগনেন্ট  আচ্ছা তাহলে সব খুলে বলি , কেমন ?

আমার নাম রবার্ট কেইন।

ছোটমোট একটা শপ চালাই। জিনিসপত্র বন্ধক রেখে টাকা ধার দেই। সুদ সহ আসল টাকা ফেরত দিলে জিনিস ফেরত দেই। নিয়ম অনুসারে তিন মাসের মধ্যে কেউ যোগাযোগ না করলে বন্ধকী জিনিস আমার হয়ে যায়। বিক্রি করে দেই ভাল দাম পেলে।

আপনারা জানেন তো,  এইসব ক্ষেত্রে কুড়ি ডলারের জিনিস রেখে বড় জোড় এক বা দেড় ডলার বড় জোড় দুই ডলার পর্যন্ত ঋণ দেই।

ব্যবসাটা আসলে লাভের উপর লাভ।

নিশ্চয়ই খেয়াল করে দেখেছেন , সারা দুনিয়ায় নানান দেশে  চাইনিজরা এই ব্যবসাটা জান প্রাণ দিয়ে করে থাকে।

আমাদের এই ব্যবসাটা চালু করেছিল বাবা। 

অল্প দিনের মধ্যে  বেশ ভালই করেছিলেন উনি।

বাবা মারা যাবার পর ব্যবসার হাল আমি ধরেছি। একাই। কোন কর্মচারী রাখতাম না। ওতে ব্যবসার গোপন রহস্য ফাঁক হয়ে যায়। 

একাই সব করতাম।

তেমন কোন ঝক্কি অবশ্য পোহাতে হত না। 

এই সব দোকানে তো আর লাইন ধরে খদ্দের আসে না। এক আধজন আসে প্রতি এক আধ ঘণ্টা পর- পর। যারা আসে,  তারাও ঝট পট কাজ শেষ করে চলে যেতে চায়। বিশেষ করে চুরির মাল যেগুলো,  সেইসব তো আধা মিনিটের মধ্যে রফা দফা  হয়ে যায়।

এত কিছু বলতাম না। বললাম , যাতে আপনার চোখের সামনে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। আমাকে ভুল না বুঝেন।

ফ্লেমিংটন রোডে আমার দোকান। নির্জন জায়গা। নীচ তলায় দোকান। দোতলায় থাকি। এই জন্যই বেঁচে গেছি। দৌড় ঝাঁপ করতে হয় না। ট্রাম বাস ট্রেনের বালাই নেই।

বাপের আমলের দোকান বলে রক্ষা। আজ কাল অমনটা সারা নিউ ইয়র্ক খুঁজলেও পাবেন না।

নিঃসঙ্গ জীবন যাপন। মা বাবা দুইজনেই মারা গেছেন অনেক কাল। একা মানুষ। সকাল দশটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত দোকান চালাই। বন্ধ করে দোতলায় গিয়ে কিছু রান্না করে খাই।

রান্না করতে মন না চাইলে টেকওয়ে খাবার দোকানগুলোতে ফোন করে খাবারের অর্ডার দেই 

টিভি দেখি।

মাঝে সাঝে একটা বিয়ার। 

না, কোন বদঅভ্যাস নেই। মেয়ে মানুষ বা অন্য রকম কোন ড্রাগের নেশা নেই।

মাঝে সাঝে দুই একটা প্রাপ্ত বয়স্ক দের জন্য ছবিওয়ালা পত্রিকা ঘাঁটি  

সাত দিন দোকান চালাই। রবিবার হাফ।

দিন চলে যাচ্ছিল দিনের মত করে। কোন বৈচিত্র্য নেই। ক্লান্তি লাগে। একঘেয়েমিতে আক্রান্ত হই। 

তারপরও একই রুটিন মেনে চলে যাচ্ছিল আমার দিন রাত্র। 

ত্রিশ বছর হয়ে গেলেও কেউ আসেনি আমার জীবনে। মেয়েদের সামনে সহজ হতে পারি না। আনাড়ি। অদক্ষ। সবাইকে খদ্দের হিসাবেই দেখি। 

ক্রিসমাসের চারদিন আগে রেবেকা এলো আমার জীবনে।

আসলে বলা দরকার আমার দোকানে।


দোকান বন্ধ করতে আধা ঘণ্টার মত বাকি ছিল। তখনও  

খদ্দের ছিল না। ক্রিসমাসের ছুটির আমেজ চারিদিকে  লোকজন ছুটে যাচ্ছে প্রিয়জনের কাছে।

আমার যাবার কোন জায়গা নেই। দোকান খুলে বসে আছি সেইজন্য 

কোথাও যেতে পারলে ভাল হত। যাবার জায়গা নেই।

পাশে কেউ বসে থাকলে ভাল লাগত। কেউ নেই।

তেমন একটা খদ্দের পাইনি সারাদিন। যাও এসেছে দুই একজন। সব চুরির মাল।

দেখেই বুঝেছি।

দোকান বন্ধ করব কই না ভাবছি। তখনই রেবেকা ঢুকল  অবশ্য তখনও জানি না ওর নাম রেবেকা।

পরে জেনেছি। তাতে কী। রেবেকা সব সময় আমার কাছে রেবেকা । কাঁপছিল বেচারি, প্রচণ্ড শীতে।

আধ ময়লা, পুরানো রঙ জ্বলা হুডি পরেছিল গায়ে। ভেজা বালির মত রঙ । প্রথমে ভেবেছিলাম মোটা মত কোন মহিলা। পরে দেখি যুবতী।

পেটে বাচ্চা থাকায় চেহারায় কেমন একটা ক্লান্তি। 

কেন যেন মনে হল, সারাটা দিন না খেয়ে আছে।

ব্যবসায়ী মানুষ, এইসব তুচ্ছ কিন্তু সহজ জিনিস বুঝতে পারি।

ওর চেহারায় মিলে মিশে ছিল রাজ্যের ক্লান্তি, হতাশা, ব্যর্থতা। এত কিছুর পরও লাবন্য নষ্ট হয়নি  এক বিন্দু প্রসাধনী নেই। তারপরও রেবেকা সুন্দরী।

'আপনি কি দোকান বন্ধ করে ফেলছেন ?' প্রায়হাহাকার করে উঠলো সে ।


' আজ্ঞে না। এখনও বন্ধ করিনি। মেলা দেরি। ' হাসি মুখে বললাম । ' বলুন কী করতে পারি ?'

'এটার জন্য কত দেবেন ?' হাতটা বাড়িয়ে দিল সামনে ।

মুঠো খুলতেই দেখতে পেলাম। তালুর মধ্যে পরে আছে জিনিসটা। কুণ্ডলী পাকিয়ে। স্বর্ণের চেইন। পুরানো দিনের ডিজাইন।

একই সাথে চেইন আর মেয়েটাকে দেখলাম।

চুরির মাল বিক্রি করতে এসেছে, দেখে মনে হল না।

আমার মনের ভাব বুঝতে পেরেই বলল , ' জিনিসটা আমারই। দিদিমার জিনিস। দিদিমা মাকে দিয়েছিল। মা আমাকে। বিক্রি করতাম না। খুব হাতটান যাচ্ছে। নইলে কিছুতেই বেচতাম না। দেখুন না কত দিতে পারবেন ?'

'ইয়ে... মানে আগে একটু পরীক্ষা করতে হবে।' পেশাদারী একটা ভাব নিয়ে বললাম। আড় চোখে মেয়েটাকেই দেখছি।  আসল রত্ন তো ওটাই।

হাত বাড়িয়ে জিনিসটা নিলাম।

কাউনটারের এই পাশে , মানে আমার দিকে একটা টেবিল আছে। নানান ধরনের যন্ত্রপাতি দিয়ে ঠাসা। ওখান থেকে কষ্টি পাথর আর আতশি কাচটা তুলে নিলাম।

হালকা ঘষা দিয়ে আতশি কাচের নীচে রেখে  উল্টে পাল্টে জিনিসটা পরীক্ষা করতে লাগলাম।

এত নাটক করার দরকার ছিল না। চেইনটা হাতে নিয়েই বুঝতে পেরেছিলাম। একশো ভাগ খাঁটি জিনিস, আজকাল এই ধরনের জিনিস পাওয়া যায় না। ক্যালিফোনিয়ার  স্বর্ণ । ওখানের এক জুয়েলারি থেকেই বানানো হয়েছিল। ডিজাইনটাও পুরানো। গাধা মার্কা কোন খদ্দের পেলে অ্যানটিক হিসাবে বিক্রি করতে পারব।

জলদি করুন ।' কাউনটারের ওপাশ থেকে অস্থির ভাবে বলল মেয়েটা। ' আমার একটু তাড়া আছে।'

'কোথায় যাবেন ?' খামাখাই বললাম। অন্য রকম অচেনা অনুভূতি হচ্ছে। মনে হচ্ছে , আহা এ রকম একটা সঙ্গী  যদি থাকতো আমার !

ক্রিসমাসে মাত্র কয়েক দিন বাকি। বাড়িতে টার্কি রান্না করতে পারতাম।

আলু বেকড করতাম আভেনে। পাস্তা। সালাদ। সাথে বাদামী রঙের  মায়াবী আপেল পাই। ঝিম ঠাণ্ডা এক বোতল শ্যাম্পেন ।

হিটারের গরম হাওয়ার পাশে বসে আড্ডা দিতাম। সাথে রুবি রঙের ওয়াইন।

কয়েক মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলাম।

কী সব আবোল তাবোল ভাবছি !

বাবা সব সময় বলতেন, খদ্দের সব সময় খদ্দের। বাড়তি দরদ দেখাতে হয় না।

' সান্তামনিকা যাব।' ব্যাকুল গলায় জবাব দিল ।' শেষ ট্রেন মিস করলে বিপদে পরে যাব আমি ।'

ওহ ম্যাডাম।' দুঃখ প্রকাশ করলাম। ' আপনি তো ট্রেন মিস করেছেন । কাল সন্ধ্যার আগে আর ট্রেন পাবেন না।'

মেয়েটার চেহারায় হতাশার রঙ আরও এক পোঁচ ঘন হল।

কাঁধ দুটো আরও খানিক ঝুঁকে গেল।

'ইস আমার হাতে টাকা নেই।' দুঃখিনীর মত বলল সে। ' দেখি , কালকেই যেতে হবে।'

'এই শহরে কেউ নেই আপনার ?'

'ছিল।' নিজের পেটে হাত বুলাতে বুলাতে বলল । ' আমার বয়ফ্রেন্ড ছিল। এক সপ্তাহ আগে আমার জমানো টাকা পয়সা আর দরকারি সব কিছু নিয়ে ভেগে গেছে।'

'অন্য মেয়ে ?'

'এছাড়া আর কী ?' করুন হাসি হাসল। ' আপনি দয়া করে জলদি বলুন , কত দিতে পারবেন ? আমার শরীর খুব খারাপ লাগছে।'

' নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই ।' চেইনটা ওজন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম । ' যাবেন কোথায় এখন ? ক্রিসমাসে একা থাকতে হয় না। প্রিয়জনের সাথে থাকতে হয়।'

'জানি না কোথায় যাব।' বিড়বিড় করে বলল মেয়েটা। ' বাবা মা নেই আমার। একা।'

 


চমকে গেলাম মনে মনে। কি অদ্ভুত মিল দুজনের।


'জলদি করুন।' আবারও তাড়া দিল মেয়েটা।

চেহারা দেখেই বুঝতে পারলাম অসুস্থ। ঠোঁট জোড়া সাদা হয়ে গেছে । শরীর কাঁপছে থিরথির করে। শুকনো গোলাপের ডালের মত।

তাড়াহুড়া করে ওজন করলাম। ব্যবসা বুদ্ধি কাজ করছে না। কিছুতেই ঠকাতে পারব না মেয়েটাকে।


'আমি একশো ডলার দিতে পারব।' মেয়েটার চোখে চোখ রেখে বললাম। অন্য কেউ হলে ষাট বা সত্তর ডলারের বেশি বলতাম না। আপনার প্রতি ব্যক্তিগত ভাবে সহানুভূতি দেখাচ্ছি আমি। সত্য কথাই বললাম, একদম খাঁটি সোনার জিনিস। কথা দিচ্ছি দশ বছর পর হলেও ফেরত নিতে পারবেন। সুদ দিতে হবে না। আমি চাই না আপনার দিদিমার স্মৃতি হারিয়ে যাক এই ভাবে।'

বিচিত্র এক টুকরো হাসি ফুটল মেয়েটার মুখে।

আহা কোন সে গর্দভ , এই মেয়েকে এইভাবে ফেলে পালিয়ে গেছে?

'একশো ডলার ?' বিড়বিড় করে বলল মেয়েটা। ' আমি...আচ্ছা ঠিক আছে তাই দিন।'


চেইনটা পকেটে ভরে ড্রয়ার থেকে ক্যাশমেমো বের করলাম । চোরাই জিনিস না। কাজেই রিসিট ছাড়া লেনদেন করব কেন ?

শব্দটা তখনই শুনতে পেলাম।

মনে হল ভারি কিছু আছড়ে পড়েছে দোকানের ভেতরে।

একবার মনে হল , কেউ আক্রমণ করে বসলো না তো ? যদিও তেমনটা সম্ভব না। কাউনটার ভেঙ্গে ভেতরে আক্রমণ করতে পারবে না কেউ । নিরাপত্তার  ব্যবস্থা খুবই কড়া ।

ঝট করে ফিরে চাইতেই অবাক হলাম। মেয়েটা নেই। অথচ দরজা খুলে বেরও হয়ে যায়নি। টাকা না নিয়ে চলে যাবে কেন ?

ব্যাপারটা বুঝতে পেরে , আসলে অনুমান করতে পেরে কাউনটারের সামনে গিয়ে উঁকি দিলাম।

যা ভেবেছি।

মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পরে আছে মেয়েটা।

দিশা হারিয়ে ফেললাম ।

মনেও হল না, এটা একটা ফাঁদ হতে পারে। দৌড়ে বের হয়ে এলাম কাউনটারের বাইরে । দ্রুত হাতে ফোন তুলে হাসপাতালে কল দিলাম।

সেই রাতেই রেবেকা বাচ্চাটার জন্ম দিল । হাসপাতালে। আর তিন দিন পর রেবেকা হাসপাতাল থেকে ফিরে এলো ।

কোথায় ?

কোথায় আবার ?

আমার বাড়িতে।

আর সেইদিন ছিল ক্রিসমাস । বিশ্বাস হয় ?

আহা, এত সুন্দর ক্রিসমাস আগে কখনও কাটাইনি আমি। দোকান আর বাড়ি সাজিয়েছিলাম । ছোট ছোট লাল সবুজ বাতি দিয়ে। গত বছরের ক্রিসমাস ট্রি , সেলার রুমে পরে ছিল। ঝেড়ে ঝুরে পরিষ্কার করে সাজালাম। ক্ষুদে ক্ষুদে  বাতি আর সান্তাক্লজের মোজা ঝুলিয়ে দিলাম ।

অনেক অনেক বছর পর অমন ক্রিসমাস পেলাম আমি।

সেই মা-বাবা মারা যাবার পর।

কতগুলো বছর একা কেটেছে । অথচ এই ক্রিসমাস , কত সুন্দর !

বসে আছি কফির পেয়ালা হাতে । পিচ্চি বাবুটার জন্য দুধ গরম করছে রেবেকা। খোকাটা দোনলায় শুয়ে ট্যাঁ ট্যাঁ করে অদ্ভুত রকম শব্দ করে কাঁদছে। ওর মাথার উপর ঝুম ঝুমি মার্কা খেলনা। ঝুলে আছে। নড়াচড়ায় টুং টুং শব্দ হয় ।

পিচ্চিটার নাম রেখেছি জুনিয়র। জুন ডাকি আমরা। অপূর্ব সুন্দর টোবলা টোবলা ধরনের বাচ্চা। চোখ দুটো নীল। যেন ড্রপার দিয়ে দুই ফোঁটা ঘন নীল রঙ ফেলে দেয়া হয়েছে ওর চোখের ভেতরে। মুখে রাজ্যের অভিমান।

হাত দুটো সারাক্ষণ মুষ্টিবদ্ধ । যেন বক্সিঙের রিঙে  নামবে যে কোন সময়।

কী অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য !

বাচ্চাটা , মানে জুনিয়র একদম সুস্থ আর সবল। শুধু ওর পিঠে একটা জন্মদাগ আছে। অনেক খানি জায়গা জুড়ে বিদঘুটে কেমন বাদামী একটা দাগ। যেন অচেনা কোন দেশের ম্যাপ।

ওই তো দুধ গরম করে শিশিটা জুনের মুখের সামনে ধরেছে রেবেকা। রাজ্যের খিদে নিয়ে চো চো করে খাচ্ছে ক্ষুদে শয়তানটা।

আমি সুখী ।

আমাদের দিন কেটে যেতে লাগল স্বপ্নের মত।

মুহূর্ত কেটে যায় বাতাসের ভেসে।

সারাদিন দোকান চালাই। রেবেকা রান্না বান্না করে। রাতে দোকান বন্ধ করে উপরে চলে আসি। বিশ্রাম নিই। টিভি দেখি।

এবং মাত্র চার মাস যেতেই বিরক্ত ধরে গেল।

আর কিছুই না। রেবেকার আচরণ।

বাচ্চাটাকে নিয়েই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে।

প্রথম প্রথম কিছু বলতাম না। ভাবতাম - আহা বেচারি। বয় ফ্রেন্ড ওকে ফেলে গেছে। মা-বাবা ও নেই। না জানি কতটা কষ্টে গেছে ওর শৈশব। ছোট একটা বাচ্চা যদি ওর সমস্ত কষ্ট দূর করে দিতে পারে ক্ষতি কী ?

তারপর বিরক্তি বাড়তেই লাগল।

কাঁহাতক আর সহ্য করা যায় ?

সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে দোকান বন্ধ করে উপরে উঠে আসি।

দেখি, দোলনার সামনে বসে বাচ্চাটাকে দোলাচ্ছে, আধো আধো ঢঙে কথা বলছে বাচ্চার সাথে।

জামা কাপড় পাল্টাই। শাওয়ার সেরে বাসি পত্রিকা হাতে বসে থাকি।

ঘণ্টা খানেক পর আমার দিকে খেয়াল হয় রেবেকার। দৌড়ে গিয়ে এক বাউল পাস্তা ঠেসে ঢুকিয়ে দেয় মাইক্রোআভেনের ভেতরে। যখন বাউলটা আমার হাতে এনে দেয় তখন দেখি , হয় পাস্তা তখনও ঠাণ্ডা । বা এত বেশি গরম করে ফেলেছে , পনীরের কুঁচিগুলো শুকিয়ে চিড়বিড় করছে ।

কফির আশায় বসে থাকি। মাত্র তিন চার মিনিটের কাজ। সেটা দিতেই আধা ঘণ্টা লেগে যায়।

যেটা বানিয়ে দেয়, হয় পাঁচনের মত তেতো বা তার্পিন তেলের মত টল টলে। রাতে এক সাথে খেতে বসলে, তিন থেকে চারবার উঠে গিয়ে দেখে আসে বাচ্চাটার কী অবস্থা !

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারলাম রেবেকা কঠিন অবসেশনে ভুগছে। দিন দিন এর মাত্রা গভীর থেকে গভীর হচ্ছে।

সন্তানের প্রতি মায়ের অবসেশন নতুন কিছু না।

অতীতে এই রকম বহু ঘটনা নিজেই দেখেছি।

ডালাসে  এক মহিলা তার স্বামীকে খুন করেছিল। কারণ, মহিলা অবচেতন ভাবে বিশ্বাস করতেন , তার স্বামী আগের ঘরের সন্তানের ক্ষতি করতে পারে।

রেবেকার ব্যাপারে , অসীম ধৈয়্য ধরেও কোন রকম ফল পেলাম না।

এমন কি বলতে লজ্জা লাগছে, বাচ্চাটার জন্য আমরা ঘনিষ্ঠ হতে পারছিলাম না। দুই এক বার চেষ্টা করেছিলাম। ঠিক মাঝপথে দোলনার মধ্যে কেঁদে উঠেছিল জুনিয়র। আর তাতেই সব কিছু ভণ্ডুল করে ছুটে গিয়েছিল রেবেকা।

পরে আর কিছুতেই রাজি হয়নি। যদি মাঝপথে আবার কেঁদে উঠে জুনিয়র ?

রাগে ব্রহ্মতালু সহ জ্বালা করতো।

এই দিকে খরচ বেড়েই যাচ্ছিল।

বাচ্চার খাবার, পোশাক, বেবি অয়েল হতে শুরু করে কারেন্ট বিল, জলের বিল সব। অন্ধকারে জুনিয়র কেঁদে উঠতে পারে ভেবে সারারাত পাশের কামরার আলো জ্বেলে রাখত রেবেকা।

সারা জীবন ঘুঁটঘুটটি অন্ধকারে ঘুমাতাম। এখন এই আলো,  ঘুমের ছক নষ্ট করে দেয়। তাছাড়া কারেন্ট বিল , সেটাও ভাবতে হবে।

এক বিছানায় ঘুমাতে চায় না রেবেকা। পাশের রুমের সোফায় শুয়ে ঘুমায়। যদি বাচ্চার খিদে পায় আচমকা। বা কান্নাকাটি করে উঠে ।

অন্য কেউ হলে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারতাম। রেবেকার বেলায় পারছি না।

রেবেকাকে কিছুতেই হারাতে পারব না। তবে জুনিয়রের প্রতি রাগ ক্ষোভ বাড়ছেই। দিনের পর দিন।

ক্ষুদে এই দেবশিশুটাকে ভিলেন মনে হতে লাগল।  বুঝতে পারলাম ও থাকলে রেবেকার মনোযোগ জীবনেও পাব না।

চূড়ান্ত মাত্রায় বাচ্চার প্রতি অবসেশড হয়ে আছে মেয়েটা।

এখন মূল ঘটনা শুরু হল।

 

দুই

রেবেকার মন পাবার জন্য বাচ্চার প্রতি মনোযোগ বাড়িয়ে দিলাম।

নিজের হাতে খাইয়ে দিতে লাগলাম। জামা কাপড় বদলানো হতে শুরু করে ন্যাপি বদলানোর মত বাজে কাজটাও করতাম । আর নিয়ম করে বিকেলে পার্কে হাঁটতে নিয়ে যেতাম।

আবারও বলছি , নিয়ম করে। হু , নিয়ম করে।

বাড়ির খানিক দূরেই পার্ক। বিশাল এলাকা জুড়ে। এবং নির্জন । পরিষ্কার ।

লম্বা দানব সাইজের মেপল গাছ ভর্তি।

বিকেলের দিকে অনেকেই যায়।

প্যারাম্বুলেটরে জুনিয়রকে চাপিয়ে আমরা হেঁটে বেরাই। বেঞ্চিতে বসে গল্প করি।

দূরের একটা খাবারের দোকান থেকে হালকা কিছু কিনে খাই।আবার হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরে আসি।

সপ্তাহে দুই বিকেল দোকান বন্ধ রাখতে হয়। ব্যবসায়ী হিসাবে বুকটা খচখচ করে তবে জানি আখেরে লাভ আমারই হবে।

এটা ও এক রকম ব্যবসা।

এবং ঘটনাটা ঘটেই গেল।

সেই বিকেলটা ছিল বেশ সুন সান। পার্কে তেমন লোকজন ছিল না। বেশ ফাঁকা ফাঁকা।

সিমেন্টের বেঞ্চি পর্যন্ত আসতেই রেবেকাকে বললাম , ' তুমি বস, আমি খাবার নিয়ে আসি । কি আনব ? গরম সসেজ ? হট ডগ উইথ বান ? না কি ডোনাট ? '

ডোনাট ই এনো , ক্রিম ছাড়া ।' হাসি মুখে বলল রেবেকা। সামনে প্যারাম্বুলেটর ।

ভেতরে জুনিয়র। হাত পা নেড়ে খেলছে।

চলে গেলাম ডোনাট আনতে ।

একা বসে রইল রেবেকা।

দোকানটা খানিক দূরে। ঠিক দোকান বলা যাবে না। ছোট্ট একটা টঙ জাতীয় জিনিস। জাহাজে যে সব কনটেইনার ভর্তি করে মাল সামাল যায় , তেমন একটা বাতিল কনটেইনার কেটে কায়দা করে বানিয়েছে ।

খানিক দূরে বিচিত্র পোশাক পরা এক জোড়া যুবক যুবতী নাটকের মহড়া দিচ্ছে । ওদের মুখে সাদা রঙ মাখান ।

মঞ্চনাটকের মূক অভিনেতারা যেমন করে। মাথায় সার্কাসের ক্লাউনদের টুপি।

অদ্ভুত কায়দা করে ব্যালে ড্যান্সারদের মত নড়া চড়া করছে আর সেই সাথে সংলাপ দিচ্ছে ওরা।

মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল রেবেকা। নাটক পছন্দ করে ও ।

কান পেতে শোনার চেষ্টা করছে সংলাপগুলো। পরিচিত মনে হচ্ছে ? শেক্সপীয়র হবে ?

নাকি জন বুকানের কাহিনি অবলম্বনে ?

সমস্যা হচ্ছে, সংলাপ দিতে দিতে ওরা নাচের মত ভঙ্গী করে খানিকটা দূরে চলে গেছে।

পরিষ্কার শুনতে পারছে না রেবেকা। নিজের অজান্তেই সিমেন্টের বেঞ্চির উপর থেকে উঠে দাঁড়ালো ।

এগিয়ে গেল দুই কদম।

টুক টাক সংলাপ কানে গেছে ওর।

কাহিনি চেনা।

ওথেলো।

পুরুষটা ওথেলোর ভুমিকা নিয়েছে। মেয়েটা ওথেলোর স্ত্রী ডেসডেমনার ভূমিকায়। নাটকের শেষ অংকের চর্চা করছে ওরা। পুরুষটা মানে ওথেলো বলছে, ' ডেসডেমনার , আমি যে তোমাকে স্ট্রবেরি আঁকা রুমালটা উপহার দিয়েছিলাম , কই সেটা ?'

মেয়েটা ডেসডেমনার হিসাবেই বলছে, ' হায় হায়। আমি তো রুমালটা হারিয়ে ফেলেছি। খুঁজে পাচ্ছি না।

 

গর্জে উঠলো ওথেলো , ' শয়তান তুই মিথ্যা কথা বলছিস। নিশ্চয়ই ক্যাসিওকে সেই রুমালটা উপহার দিয়েছিস ?'

'না তুমি ভুল বুঝেছ ।' কাতর কণ্ঠে অনুরোধ করতে গেল ডেসডেমনা ।

তার আগেই এগিয়ে গেল ওথেলো । বা হাত দিয়ে কষে একটা চড় লাগাল ডেসডেমনার গালে।

'অ্যাই।' চেঁচিয়ে উঠলো রেবেকা। ' এই নাটক হাজার বার পড়েছি আমি। এখানে ডেসডেমনাকে চড় মারার কোন ঘটনা নেই। তোমরা কী চিত্রনাট্য বদলে দেবে না কি ?'

থতমত খেয়ে গেল ওথেলো আর ডেসডেমনার , দুজনেই ।

'দুঃখিত ম্যাডাম।' মাথা নীচু করে ক্ষমা প্রার্থনা করলো ওথেলো রুপী পুরুষটা । ' আসলে চরিত্রের ভেতরে এতটাই ঢুকে গিয়েছিলাম যে ভেতরে আলাদা একটা এনার্জি চলে এসেছিল। দুঃখিত মাফ করবেন।'

কিছু বলল না রেবেকা।

ততক্ষণে নাটকের চরিত্র দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ব্যালে নাচের মত একটা ভঙ্গী করতে করতে এগিয়ে যেতে লাগল।

হারিয়ে গেল বড় গাছপালার আড়ালে।

স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বেঞ্চির দিকে ফিরে এলো রেবেকা।

বেঞ্চি থেকে খানিক দূর থাকতেই চোখ গেল প্যারাম্বুলেটরের উপর।

বুকের ভেতরটা ছ্যাত করে উঠলো।

শূন্য প্যারাম্বুলেটর ।

ভেতরে জুনিয়র নেই।

মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত গেছে , কে নিয়ে গেল জুনিয়রকে।

সামনে এগিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো রেবেকা , ' জুনিয়র।'

ঠিক তখনই লোকটাকে দেখতে পেল।

রংজ্বলা জিনস আর কালো চামড়ার জ্যাকেট গায়ে, মাথায় উলের গোল টুপি খুলি কামড়ে আছে। তারপরও বাইরে বের হয়ে এসেছে ইঁদুরের লেজের মত নোংরা চুল। দৌড়ে পালাচ্ছে কোলে জুনিয়রকে নিয়ে।

রেবেকার চিৎকার কানে যেতেই পিছন ফিরে চাইল লোকটা।

চোয়াড়ের মত চেহারা। গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি । কাঁচা পাকা। গোঁফ আছে। মোটা গোঁপ। চাপা ভাঙ্গা।

রেবেকার সাথে চোখা চোখি হতেই ঝেড়ে দৌড় দিল।

হাতে বাদামী কাগজের ডোনাটের ব্যাগ নিয়ে, ঠিক তখনই ফিরে আসছিলাম আমি।

দৃশ্যটা চোখে পড়তেই সব বুঝে ফেললাম। রেবেকার চিৎকার তো তখন আকাশ বাতাস ফাটিয়ে ফেলছে। পার্কটা বড্ড বেশি শুনশান । দূরে মোটা মোটা কয়েকটা বুড়ো বুড়ি ঘাসের উপর চাদর বিছিয়ে বসে আছে। সবার সামনেই খাবার। হাপুস হুপুস করে খাচ্ছে।

প্রতি দিনের রুটিন। নামে ব্যায়াম করতে আসে। পাঁচ সাত মিনিট নানান কায়দা করে শরীর দোলানর পর হাঁপিয়ে বসে পরে। তারপর যে যার বাক্স খুলে খাওয়া শুরু করে পিশাচের মত।

খাদ্য প্রেমিক দলটা হাঁ করে চেয়ে পুরো ঘটনাটাই দেখছে।

কিন্তু ওদের কিছুই করার নেই।

বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে যে সময় লাগবে তাতে পৃথিবীতে বরফ যুগ এসে যাবে।

ডোনাটের ব্যাগ ছুড়ে ফেলে ঝেড়ে দৌড় দিলাম।

চিৎকার করছি , ' অ্যাই শয়তান। থাম তুই। আমাদের বাচ্চা নিয়ে জাচ্ছিস কোথায় হারামজাদা ?

আমাকে দেখে দৌড়ের গতি বাড়িয়ে দিল শয়তানটা। বাই বাই করে দৌড়াচ্ছে। ঝাকুনির চোটে জুনিয়রের ঘুম ভেঙে গেছে ।  কাঁদছে বেচারা। সর্বশক্তি দিয়ে দৌড়াচ্ছি । দূর থেকে সবাই দেখছে।

পার্কের শেষ মাথায় ফোয়ারা। ওখানে আসতেই লাফ  দিয়ে বড় রাস্তায় চলে গেল অপহরণকারী। আমি তখনো বহুদূরে। তবে এখন রেবেকা আর অন্য দর্শকরা আমাকে দেখতে পারছে না । অনেকগুলো বড় বড় উইলোর ঝোপ আড়াল করে ফেলেছে আমাদের।

ফোয়ারা আর বড় রাস্তার মাঝে কোমর সমান উঁচু লোহার দেয়াল। তস্করটা একটা লাফ দিয়ে সেটা পার হয়েছে। আমিও পারতাম।

দিলাম লাফ । কিভাবে যেন হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম । চিৎকার করে উঠলাম কাতর ভাবে।

হারিয়ে ফেলেছি ততক্ষণে লোকটাকে। জুনিয়রকে কোলে নিয়ে চলতি একটা ট্যাক্সির মধ্যে কিভাবে যেন উঠে গেল ।

এবার হাসলাম ।

সাফল্যের হাসি।

রেবেকা যখন এলো , তখন কাঁদছি  আমি।

 

তিন

 

পুলিশ অফিসারটা নাছোড়বান্দা।

একই কথা হাজার বার প্যাঁচালো।

কথা বের করার চেষ্টা করল নানান কায়দা করে। অপহরণকারীর চেহারার বর্ণনা নিল প্রায় মিনিট কুড়ি ধরে। আমার দিকে অমন ভাবে তাকাল , যেন আমার ভুমিকা হওয়া ছিল সুপারম্যানের মত।

কেন আমি দৌড়ে তস্করটাকে ধরতে পারলাম না ?

তবে সেই খাদক দলটা কসম খেয়ে জানালো , আমি চেষ্টার কোন ক্রুটি করিনি। আক্ষরিক অর্থেই জান প্রাণ দিয়ে দৌড়িয়েছি ।

পার্ক থেকে পুলিশ স্টেশন।  সেখান থেকে বাড়ি আসা পর্যন্ত একটা কথাও বলেনি রেবেকা, কেঁদেই যাচ্ছে।

অফিসার অনেক মেহনত করে রেবেকার ইন্টারভিউ বা বক্তব্য নিল ।

লোকটাকে আগে কখনও দেখেছি কি না , এ প্রশ্নও ডজন খানেক বার করলো অফিসার।

কেন যেন বেচারার মনে হচ্ছে, কেউ প্রতিশোধ নিতে চাইছে আমার উপর। সুদের ব্যবসা করি। হতেও পারে।

ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমিও ইঙ্গিত দিলাম , হতে পারে রেবেকার আগের বয়ফ্রেন্ড এই কাণ্ড করিয়েছে। ভাড়াটে  লোক মারফত।

অমন একটা তাজা ক্লু পেয়ে অফিসার খুশি মনে বিদায় নিল ।

সান্তনা দিতে লাগলাম রেবেকাকে।

যাক বাবা। গেল ঝামেলা। কয়েকটা দিন কেঁদে ঠিক হয়ে যাবে বেচারি।

চার

টানা এক সপ্তাহ কাঁদল রেবেকা।

খাওয়া দাওয়া তো বন্ধ করে দিয়েছে। এক পেয়ালা জল ছাড়া সারদিন আর কিছুই মুখে দেয়াতে পারিনি। হাজার চেষ্টা করেও।

পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে গেল আমাদের জীবন।

সব কিছুই চলে গেছে নিয়ন্ত্রনের বাইরে।

সবচেয়ে মারাত্নক ঘটনা হল , গভীর রাতে নীচের দরজা খুলে পার্কে চলে গেছে দুই তিন বার।

ভাগ্য ভাল শব্দ শুনে টের পেয়ে , দৌড়ে গিয়ে ধরে এনেছি।

ভেবেছিলাম সব ঠিক হয়ে যাবে আস্তে ধীরে । ভুলে যাবে বাচ্চার শোক। সান্তনা দেয়ার ছলে ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছি দু'চারবার। লাভ হয়নি। ঝাড়া দিয়ে উঠে চলে গেছে। হাতের কাছে থাকা জুনিয়েরের খেলনা দিয়ে আঘাত করে বসেছে নাকে মুখে।

বুঝতে পেরেছি , সব সময় প্ল্যান করে কাজ হয় না। নোংরা বুদ্ধি দিয়ে দুনিয়া চলে না।টানা দশ দিন পরও যখন রেবেকার মুখে খাবার উঠলো না , ঘুমাতে গেল না , তখন বাড়ি থেকে বের হলাম । যদিও রেবেকাকে একা রেখে যেতে খারাপ লাগছিল । তবুও। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।

 চার্লির আস্তানা ভালো করেই চেনা আছে । জ্যাকসন হাইটের অখ্যাত এক গলির ভেতরে , উল্টোদিকের এক সরু রাস্তায়,  সস্তা একটা বার আর নোংরা একটা নাইট ক্লাব আছে। ভদ্র লোকজন এখানে ভুলেও আসে না । গলিটা কানা । গলির শেষ মাথায় ছোট্ট অফিসটা । এক কামরার । বাইরে গাঁট্টা গোঁটটা এক লোক দাঁড়িয়ে। নিগ্রো ।

ভালো করেই চেনে আমাকে ।

তারপরও খেঁকিয়ে উঠলো , ‘ কি চাই ?’

' চার্লিকে। ' সংক্ষেপে জবাব দিলাম।

শক্ত এক জোড়া হাত দিয়ে ভালোমতন সার্চ করল আমাকে। পিস্তল, চাকু এই ধরনের কিছু না পেয়ে হতাশই হলো যেন ।

'যাও, ভেতরে যাও ।' অযথাই খেঁকিয়ে উঠলো আবার ।

ঢুকলাম।

তেমন কিছু নেই কামরার ভেতরে । বিশাল একটা টেবিল ছাড়া।

টেবিলের উপর কালো কুচকুচে একটা পুরানো দিনের টেলিফোন আর পেতলের ছাইদানি ছাড়া কিচ্ছু নেই।

এক পাশে একটা চেয়ার পেতে বসে বসে দোল খাচ্ছে চার্লি। যেন অবসর যাপন করছে। মুখে দাঁত দিয়ে কামড়ে  রেখেছে একটা হাভানা চুরুট। চার্লির চল্লিশ থেকে পয়তাল্লিশ । অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের জন্য বয়সটা বেশি মনে হয় । মাথার চুল পাতলা হয়ে গেছে । চোখের নীচে পুটলি । সারা মুখে মাকড়সার জালের মত ভাঁজ । মাথায় নরম কাপড়ের একটা হ্যাভানা হ্যাট । আইভরি রঙের স্যুট গায়ে । একই রঙের প্যান্ট , টাই।

আমাকে দেখে হেসে ফেলল চার্লি , ' আরে রবার্ট যে। কী মনে করে ?'

'বাচ্চাটাকে ফেরত চাই আমি।' সোজা কাজের কথায় চলে গেলাম । '  জুনিয়রকে চাই আমি।'

খুব অবাক হয়েছে অমন একটা মুখভঙ্গি করলো চার্লি । পিটপিট করে কয়েকবার তাকালো আমার দিকে। কানে জল ঢুকে গেছে এবং সেটা বের করছে এমন ভঙ্গিতে মাথা ঝাকালো কয়েকবার।

'নিশ্চয়ই।' পুরো ব্যাপারটা সাবানের ফেনার মতো পরিষ্কার এমন একটা ভঙ্গিতে বলল চার্লি । ' কাস্টমারকে যেকোনো ধরনের সার্ভিস দিতে প্রস্তুত এই চার্লি মহাশয় । কিন্তু সার্ভিস  বলতে একটা কথা আছে, জানো নিশ্চয়ই ? দশ হাজার ডলার হলেই হবে এবার।'

' দশ হাজার ডলার ?' চেঁচিয়ে উঠলাম। ' কিন্তু বাচ্চাটাকে কিডন্যাপ করার জন্য তো  মাত্র পাঁচ হাজার ডলার নিয়েছিলে। আমার বাচ্চা আমি ফেরত নেব । ডাবল টাকা দিতে হবে কেন ?'

' হায় হায় ।' বিচিত্র ভঙ্গিতে বিলাপ করে উঠলো চার্লি। ' সার্ভিস চার্জ বলতে একটা ব্যাপার আছে না ? তাছাড়া বাচ্চা আমরা এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে পারি ।'

' আমার বাচ্চা ফেরত দাও চার্লি ।' চেঁচিয়ে উঠলাম। ভীতুর ডিম হিসাবে বিখ্যাত আমি। কিন্তু এই মুহূর্তে আর ভয় পাচ্ছি না। ' যদি না দাও তবে আমি সোজা থানায় যাব।'

থানায় যাবে ?' এমন ভাবে আমার দিকে তাকাল চার্লি যেন জীবনে এই প্রথম থানা শব্দটা শুনল ।

বোকার মত পিট পিট করে তাকাচ্ছে ।

'হ্যাঁ , থানায় যাচ্ছি ।'

'এই মাইক , এই জ্যাক কোথায় তোরা ?' আচমকাই চেঁচিয়ে উঠলো চার্লি । ' জলদি আয় তো ।'

এক কোনের দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকল দুইজন মানুষ নাকি দানব কে বলবে ?

ছয় ফুটের উপর লম্বা। শরীর না তো যেন মাংসের দোকান । পেশি কিববিল করছে। নিষ্ঠুর কুৎসিত চেহারা। এদের কাছে দয়া মায়া আশা করা বৃথা ।

লোক দুটো আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। ওদের ভাব ভঙ্গী দেখেই বুঝা যায় দিনের পর দিন এরা চার্লির হুকুম তামিল করে চলছে। মানুষকে মেরামত করাই এদের কাজ।

ভয় পেয়ে গেলাম।

'কি অবস্থা বস ?' একজন জানতে চাইল। চেয়ে আছে অবশ্য আমার দিকে।

'এই ভদ্রলোক আমাকে পুলিশের ভয় দেখাচ্ছে।' বাচ্চারা যেমন করে গুরুজনের কাছে নালিশ করে তেমন করে নালিশের সুরে বলল চার্লি।

'তাই নাকি ?' অবাক গলায় বলল একটা মাংসের দোকান ।

ঘুষিটা কখন , কেমন করে মারল বুঝতেই পারলাম না। ছিটকে যখন কার্পেটের উপর পড়লাম তখন সারা দুনিয়া বো বো করছিল। হামাগুড়ি দিয়ে উঠার আগেই দ্বিতীয় জন এসে লাথি মারল । পাঁজরের হাড়ে চিড় ধরল সন্দেহ নেই।

ইচ্ছে করলেই ওরা মেরে ফেলতে পারত আমাকে, ডাল-ভাত ব্যাপার ওদের জন্য । ছেড়ে দিল, তবে সন্দেহ নেই টাইট দিয়ে দিল ভালো করে।

কার্পেটের উপর থেকে দুজনে মিলে শক্ত করে তুলে দাঁড় করালো আমাকে ।

' বাচ্চা ফেরত চাইলে দশ হাজার ডলার দিতে হবে।' শান্ত গলায় বলল চার্লি । ' পুলিশে যেতে পারো । লাভ হবে না। বাচ্চা যাবে। তুমি যাবে ।রেবেকা না বারাকা ? সেও যাবে । ভাগো এখান থেকে।'

টলতে টলতে বের হয়ে এলাম।

মিথ্যে বলেনি চার্লি । পুলিশে গিয়ে লাভ হবে না। ওর অফিস থেকে বের হয় বাইরে গেলেই কেউ না কেউ অনুসরণ করবে আমাকে। চার্লির গ্যাং অনেক বড়। চোরাই মাল বিক্রি করতে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল ওর সাথে । সব ধরনের অপকর্ম করে ।খারাপ লোকদের সাথে সু-সম্পর্ক রাখলে সবসময়ই আখেরে মাশুল দিতে হয়।

টলমল করে পথে নামলাম।

টাকা দরকার। দশ হাজার ডলার।

পাঁচ হাজার ডলার দিয়ে আমিই ওদের ভাড়া করেছিলাম । জুনিয়রকে সরানোর জন্য । ভেবেছিলাম জুনিয়র চলে গেলে  রেবেকা  আমার হয়ে যাবে।

হয়নি।

দেবশিশুকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছিলাম।

টাকা আছে আমার কাছে ।

প্রথম পাঁচ , এখন দশ  চলে গেলে আর্থিকভাবে খানিক দুর্বল হয়ে যাব। তাতে কী ?

রেবেকাকে সুস্থ করে তুলতে হবে। সেইসাথে জুনিয়রকে ও চাই।

না জানি কোথায় আর কিভাবে ওকে রেখেছে চার্লি  বেজন্মাটা।

বড় ধাক্কা খেলাম, ব্যাংক থেকে যখন টাকা তুলে চার্লির আস্তানায় আবার ফেরত গেলাম।

শুকনো মুখে চার্লি জানালো , বাচ্চাটাকে বিক্রি করে ফেলেছে ।

মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল আমার । চিৎকার করে বললাম, কেন এমনটা করেছে সে ?

চার্লি খেঁকিয়ে জবাব দিল , ‘ যে কাস্টমার আগে আসবে তাকে তো আর ফেরাতে পারি না । তাছাড়া পরের বাচ্চা যে তুমি এতগুলো টাকা দিয়ে কিনবে সেটা বিশ্বাস হয়নি। নিঃসন্তান দম্পতির কাছে জুনিয়রকে বিক্রি করে দিয়েছে ওরা।'

মাথা ঘুরছিল বন বন করে।

ক্লান্ত পায়ে বাড়ি ফিরে গেলাম।

নিচের তলার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই রেবেকার গলা শুনতে পেলাম । হাসি হাসি খুশি ভরা গলায় কথা বলছে কারো সাথে।

ঝুমঝুমিটা জোরে জোরে বাজাচ্ছে।

বুকটা ছ্যাত করে উঠলো।

জুনিয়রের সাথে কথা বলছে রেবেকা।

কিভাবে ?

আরে তাইতো ।

জুনিয়র খেতে চাইছে না বলে বকাঝকা করছে রেবেকা । মাঝে মাঝে হেসে ফেলেছে । ' আমার সোনামনি...যাদুমনি' মার্কা আবোল তাবোল শব্দ বলছে।

অজানা আশংকায় বুকটা কেঁপে উঠল আমার।

সিঁড়ি বেয়ে পড়িমড়ি করে ছুটলাম দোতলায়।

দোলনার পাশে বসে আছে রেবেকা । হাতে দুধের বোতল। কোলে একটা বাচ্চা । জোর করে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে ।

' কার বাচ্চা ? কী করে এল ? হায় হায় ? এসব কি রেবেকা ? ' দরজার সামনে থেকেই ডাক দিলাম ওকে ।

' তুমি চলে এসেছ ? ' হাসিমুখে বলল রেবেকা ।

আহা , কত দিন পর হাসলো রেবেকা।

' দেখ না জুনিয়র কিছুই খেতে চাইছে না।' অভিযোগ করলো সে । ' কত দিন না খেয়ে ছিল কে জানে ?

'জুনিয়রকে পেলে কোথায় ?'

' এই দেখ না।' কোলের বাচ্চাটাকে তুলে ধরল রেবেকা ।

বুকের ভেতর হিম হয়ে গেল আমার।

রেবেকার কোলের মধ্যে শুয়ে আছে নোংরা , ময়লা আর খানিকটা পোড়া বীভৎস একটা খেলনা পুতুল।

রাস্তার কোন ময়লার বিন থেকে তুলে এনেছে। সন্দেহ নেই।

খিল খিল করে হাসল রেবেকা।

সে  হাসি স্বাভাবিক মানুষের হাসি না।

 

পাঁচ

গতকাল হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে এসেছে রেবেকা ।

একটুও ভালো হয়নি । সারাক্ষণ দোতলায় থাকে । তবে নিচ তলায় কোন খদ্দের আসলেই উপর থেকে পড়িমড়ি করে দৌড় চলে আসে দেখার জন্য । যদি কেউ জুনিয়রকে ফেরত নিয়ে আসে !

ঘটনার আকস্মিকতায় মাথা কাজ করছে না আমার ।

পুলিশের কাছে যেতে পারছি না চার্লির ভয়ে । আর এখন তো চার্লিও পুলিশকে বলে দেবে, কিডন্যাপের কাজটা আমি করেছিলাম ওদের ভাড়া করে ।

দোকান বন্ধ করে এই শীতের মধ্যে পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি । বাসায় রেবেকা । তালা দিয়ে এসেছি ।

হাসপাতাল ওকে রাখা যাবে না । ডাক্তার বলেছে কোন রোগ নেই । পরিবারের কাছে থাকলেই ভাল হয়ে যাবে নাকি ।

পার্কের বেঞ্চিতে বসে কত কথাই না ভাবছি।

এমন সময় মহিলাার উপরে চোখ পড়লো । বেঞ্চিতে বসে আছে। সামনে একটা প্যারাম্বুলেটর । ভেতরে একটা বাচ্চা ঘুমিয়ে আছে । কারো জন্য অপেক্ষা করছে মহিলা । ঘনঘন হাত ঘড়ি দেখছে।

বিদ্যুৎ চমকের মত আইডিয়াটা এলো ।

তাইতো !

বহু দূর দূরান্ত পর্যন্ত ফাঁকা।

আমি যদি ...মানে কোন ভাবে বাচ্চাটা নিয়ে রেবেকার হাতে তুলে দিলেই হবে। নিশ্চয়ই রেবেকা ভাল হয়ে যাবে ? আমি জানি। ভাল হবেই হবে। ওর শুধু একটা বাচ্চা পেলেই হবে।

ভাল করে দেখলাম চারিদিকটা। কেউ নেই।

অলস পায়ে উঠে হাঁটতে হাঁটতে সামনে গেলাম।

'কেমন আছেন ? বাচ্চাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন না কি ?' কুশলাদি জিজ্ঞেস করার ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে গেলাম। ' বাহ, বেশ সুন্দর তো আপনার খোকাটা ।'

একেবারে গলে গেলেন ভদ্রমহিলা।

ততক্ষণে একেবারে সামনে চলে গেছি। মহিলা কিছু বুঝে উঠার আগেই প্যারাম্বুলেটর থেকে বাচ্চাটা তুলে নিলাম দুই হাতে । উপরে ধরে শূন্যে দোলাতে দোলাতে বললাম,’  বাহ -বেশ তো । ছেলে না মেয়ে ?'

'ছেলে।' কৃত্রিম একটা হাসি দিয়ে বললেন ভদ্রমহিলা । ' দয়া করে এভাবে উঁচুতে তুলবেন না। ফিরিয়ে দিন প্লিজ।'

'দিচ্ছি।' হাসলাম । ' আমাদের ও একটা বাচ্চা আছে । নাম জুন।'

'ও আচ্ছা ।' কথার কথা বলছেন মহিলা। চেহারাতে রাজ্যের শঙ্কা । হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সামনে বাচ্চাটা আমার হাত থেকে নেবেন বলে।

' বয়স কত ওর ?' তখনো হাসছি । মহিলা কি উত্তর দিয়েছিলেন মাথায় ঢুকেনি। ততক্ষণে ঝেড়ে দৌড় দিয়েছি আমি। ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে কয়েকটা মুহূর্ত বসে রইলেন ভদ্রমহিলা । যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম ততক্ষনে আমি বেশ দূরে। জান প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড়াচ্ছি ।

চিৎকার করে উঠলেন ভদ্রমহিলা, ' হেল্প হেল্প প্লিজ কেউ সাহায্য করো আমার বাচ্চা নিয়ে ভাবছে চোর।'

ততক্ষণে গাছপালার আড়াল থেকে বের হয়ে এসেছে একদল যুবক । আজকে পার্কে এসেছে  কি মনে করে  ?  সবার শরীরে স্পোর্টস টি শার্ট আর শর্ট। বেশ তাগড়া শরীর সবার। কয়েকজনের হাতে হালকা ব্যায়ামের যন্ত্রপাতি আর রাগবির বল।

আমারই কপাল খারাপ।

আসার আর সময় পায়নি গাধাগুলো।

মহিলার চিৎকারে সবাই ফিরে তাকাল। দুইয়ে দুইয়ে চার বানিয়ে ফেলল সহজেই । তারপরে সবাই ধেয়ে এলো আমার দিকে।

ব্যাপারটা দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছুই না। জীবনে ও  এই পার্কে এত পোলা পান আসে না। আজই এলো সবগুলো ? মড়ার আর সময় পেল না ?

হ্যাহ ।

বাচ্চাটাকে হাতে করে দৌড়াচ্ছি ।

বেশিদূর যেতে হবেনা । শেষ মাথায় জলের ফোয়ারা । ওটার পাশে লোহার রেলিং । টপকে পার হতে পারলেই বড় রাস্তা। রাস্তায় নেমে উল্টা দিকের গলিতে ঢুকে একটা ট্যাক্সি চেপে বসলেই হল।

সোজা বাড়ি।

রেবেকার হাতে খোকাটাকে তুলে দিলেই আবার আগের মত হয়ে যাবে সব। রেবেকা ভাল হয়ে যাবে নিশ্চিত।

রেবেকাকে হারাতে চাই না।

ফোয়ারাটা খানিক বাকি।

একটা বড় মোটা গুড়িওয়ালা গাছ। কি জানি নাম হবে গাছটার । খসখসে বাকল । শীতকালে প্রচুর পাতা ঝরে । গাছটার আড়াল থেকে বের হলো লোকটা । আস্তে করে পা বাড়িয়ে দিল সামনে। ল্যাঙ ভালই খেলাম ।

ছিটকে পড়লাম দূরে। তারপরও দুই হাত দিয়ে বাচ্চাটাকে পেঁচিয়ে রেখেছি বুকের কাছে , যাতে ব্যথা না পায়।  মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায়ও ফিরে তাকালাম ।

 এসে দাঁড়িয়েছে সামনে ।  বিশাল শরীর, মাংসের দোকান যেন।  মুখে দয়া মায়ার কোন চিহ্ন নেই। দেখেই চিনতে পারলাম । চার্লির পোষা কুকুর।

'জানতাম ।' সমঝদারের ভঙ্গিতে বলল পোষা কুকুর। ' এমন কিছু একটা করার চেষ্টা করবি। সেইজন্য বস তোর উপর চোখ রাখতে বলেছিল । পার্কে যখন ঘুর ঘুর করছিলি তখনই সন্দেহ হয়েছিল। ধরাও পড়লি ইডিয়েটরের বাচ্চা।'

সামনে এগিয়ে এক পা তুলে দিল বুকের উপর। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলাম । ছোটদের হাত থেকে যে ভাবে খেলনা কেড়ে নেয় সেইভাবে আমার হাত থেকে খোকাটা নিয়ে গেল শয়তানটা।

ততক্ষণে যুবক দল এসে গেছে। আমার চারিদিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ধমাধম লাথি কিল ঘুষি হাঁকাতে লাগল। সবার পায়ে খেলোয়াড়দের বুট। ব্যাথায় চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলাম।

দরদর করে রক্ত বের হয়ে এলো নাক মুখ দিয়ে।

ওদের দয়া ভিক্ষা করতে লাগলাম কাতর ভাবে।

লাভ হলো না। মেরেই যাচ্ছে।

ভদ্রমহিলাটা চলে এসেছে দৌড়ে। উম্মাদীনির মত লাগছে। আসলে সব মা এক। সন্তানের জন্য সবার ভালবাসা অসীম । অনেক অনেক বছর পর নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে গেল।

চার্লির পোষা লোকটার হাত থেকে পরম মমতায় বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলেন ভদ্রমহিলা ।

হাত লেগে খোকাটার জামা খানিক উপরে উঠে গেল। দেখতে পেলাম খোকাটার পিঠের খানিকটা । চমকে গেলাম, খোকাটার পিঠের চামড়ায় রয়েছে অদ্ভুত এক জন্ম দাগ । বিদঘুঁটে বাদামী রঙের। যেন অচেনা কোন এক দেশের ম্যাপ।

এক মুহূর্ত লাগল ও না চিনতে । এ যে জুনিয়র । আমাদের জুন।

রেবেকার বাচ্চা। আমার আর রেবেকার বাচ্চা।

মড়ার আগে এটাই ছিল আমার শেষ চিন্তা !

 

 

 

 

 

 

 

 

Bottom of Form

 

 

 

Bottom of Form

 

 

 

 

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...