একটানা। কর্কশ আর বিচ্ছিরি সেই শব্দ । কেনার আগে এই শব্দ শুনে পরীক্ষা করে কিনেছিল মহুয়া ।
বিছানার পাশে , টেবিলের উপরে ঘড়িটা বিদঘুঁটে ভাবে চেঁচিয়ে যাচ্ছে ।
সোমনাথের চোখে মুখে ঘুমের রেশ মাকড়সার জালের মত জড়িয়ে আছে ।
উঠতে ইচ্ছা করছে না।
মনে মনে একবার ধমক দিল ঘড়িটাকে । ঘড়িটা শুনলো না। বাধ্য হয়ে হাত বাড়িয়ে থাবা দিয়ে যন্ত্রটার চিৎকার বন্ধ করলো ।
নানান কায়দা করে আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে বসল বিছানায় । খানিক দূরে ঘুমিয়ে আছে মহুয়া । গভীর ঘুম, নিঃশ্বাসে দুলছে অল্প অল্প ।
খানিক চেয়ে রইল সোমনাথ । মুগ্ধ ।
মাত্র এক মাস চলছে বিয়ের বয়স । সুখী । তবে আরও আগে থেকেই মেয়েটাকে চিনত । গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিল সে। যদিও এইসব বই পত্র তেমন একটা পড়ে না। কিন্তু তাতে কি ? ওর বন্ধু বান্ধবরা সবাই মহুয়ার কঠিন ভক্ত। এমনকি ওর মাসতুতো পিসতুতো বোনের বাড়িতেও মহুয়ার অনেক বই দেখেছে । বইয়ের ফ্ল্যাপে মেয়েটার ছবি দেখেই মনে মনে বোধ হয় প্রেমে পরে গিয়েছিল ।
বিয়েটা হয়ে গেল ।
ঘুমন্ত মহুয়ার চোখের পাতার চুমু খেল সে।
আধো ঘুমের মধ্যেও মেয়েটার মুখে হাসি হাসি ভাব দেখা গেল ।
বাথরুমে গিয়ে পরিষ্কার হয়ে কিচেনে চলে এলো । কফি , টোষ্ট, মাখন আর ডিমের সানি সাইড আপ পোঁচ করে ফেলল কয়েক মুহূর্তেই । কাল রাতে অনেক সময় ধরে লিখেছে মহুয়া । কাজেই চোস্ত একটা জলখাবার ওর পাওনা ।
ঘুম থেকে জোড় করেই তুলে দিল মহুয়াকে । নইলে হয়তো আরও ঘুমুবে।
কিচেনে এসে নাকের পাটা ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে বলল , ' দারুণ ঘ্রাণ তো । কী কী করেছেন বাবুর্চি ।'
ওকে আনন্দিত দেখাচ্ছে।
কে না জানে, সকালের জলখাবারের ঘ্রাণ পৃথিবীর সেরা সৌরভ ।
হাত বাড়িয়ে দেখাল সোমনাথ ।
' নাহ, সত্যি বলছি, তৈরি জলখাবার হাতে পাওয়া মস্ত বড় এক ভাগ্যের ব্যাপার। কত দিন করে খাওয়াবে ?'
'কাজের লোক না পাওয়া পর্যন্ত । একা থাকতে পারবে না ? '
পারব । সমস্যা হবে না। তুমি গেলেই লিখতে বসব ।' টোস্টে কামড় বসাল
মেয়েটা ।
নাম করা লেখিকা না মহুয়া । শখের বসত লেখে। সিরিয়াস ভাবে নেবে অমন কোন ইচ্ছার কথা জানায়নি ।
‘আমার ফিরতে দেরি হতে পারে। বাজার করে ফিরব ।'
‘ আরে খামাখাই চিন্তা করছ । নতুন জায়গা সেইজন্য ?'
‘সেটা তো বটেই । পোস্টিং এমন সময় দিয়েছে । কি আর করব । এলাকার লোকজন কেমন তাও জানি না । প্রতিবেশী কেমন পেয়েছি তাই বা কে বলবে ?'
কেটলি থেকে পেয়ালায় কফি ঢেলে চেয়ার টেনে বসলো সোমনাথ ।
‘ আমার তো প্রতিবেশীগুলো ভালই লেগেছে । আন্তরিক । পরের ব্যাপারে নাক গলায় না। কথা বার্তায় ভাল । পরশু দিন পাশের বাড়ির সুলতানা খালার কাছে গিয়েছিলাম খানিক তেজপাতা চাইতে । দিয়ে দিল ।'
‘ বাহ আসতে না আসতেই ধার কর্জ শুরু করেছ ?' হেসে ফেলল সোমনাথ ।
'আরে মহিলা আমার মাসির মত । খালা বলে ডাকি। '
‘ মাসি পিসিও পেয়ে গেছ ? ভাল । আমি গেলে কি করবে ?'
‘লিখব , বিকেল দিকে বারান্দায় বসে থাকব । ওখানে বসলে দূরের রাস্তাটা বেশ লাগে । আর তোমার জন্য সারপ্রাইজ রান্না করব। তুমি জানো না, আমার অনেক গোপন প্রতিভা আছে ।'
ঘড়ি দেখে তড়াত করে উঠে পড়লো সোমনাথ , ‘ হায় হায়। দেরি হয়ে যাবে। আমি যাচ্ছি । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরব । চিন্তা করবে না।'
মুখের টোষ্ট চিবুতে চিবুতে জুতার ফিতে বাঁধা শুরু করলো ।
খানিক পর ।
গাড়ি চালু করে সামনের বাড়িটার দিকে আসতেই নজরে গেল, প্রায় বাঁধাকপির মত মোটা আর বয়স্কা এক ভদ্রমহিলা বাড়ির সামনের ফুল বাগানে জল দিচ্ছেন । হাতে বদনা টাইপের জিনিস। নলে প্রচুর ছিদ্র । বৃষ্টির মত জল পড়ে ।
‘গুড মর্নিং। এত সকাল সকাল কাজে যাচ্ছেন যে ।' বললেন সুলতানা খালা । মুখে আপনজনের হাসি ।
‘ নতুন শহর , নতুন রাস্তা। কিছুদিন একটু আগে আগে যাই । পরে ঠিক হয়ে যাবে। ' হাসি মুখে বিনয়ের সাথে জবাব দিল সোমনাথ ।
সুলতানা খালার মধ্যে আত্মীয় আত্মীয় একটা ভাব আছে । বেশ স্নেহ মাখন দেখান । হাসি খুশি সব সময়।
সুলতানা খালার বাগানের অবস্থাও বেশ ভালই ।
গাছপালা তেমন চেনে না সোমনাথ। তারপরও , কসমস আর বাটারকাপ চিনতে পারল । কসমসের রঙ দেখলে মাথা ঝিম ঝিম করে । বাগানটা আলো করে ফেলেছে সিঙ্গাপুর ডেইজির দঙ্গল । সবারই একটা পিচ্চি ধরনের বাগান থাকা দরকার।
' আপনি চিন্তা করবেন না।' হাসি মুখে বললেন সুলতানা খালা । ' আপনার নতুন বউয়ের দিকে খেয়াল রাখব আমি ।'
'তেমনটা হলে আমি আন্তরিক ভাবেই কৃতজ্ঞ থাকব ।' মন থেকেই জবাব দিল সোমনাথ ।
তারপর আরও দুটো ভাল মন্দ সামাজিক কথা বলে গাড়ি চালু করে দিল শরীফ ।
দুপুর।
কিচেনে ব্যস্ত মহুয়া । টেবিলের উপর ময়দা, বাদামি চিনি, ইস্ট অমন হাবিজাবি নিয়ে নাকানি চুবানি খাচ্ছে । বাইরে খট খট শুনে দরজা খুলতেই দেখে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে সুলতানা খালা ।
‘বিরক্ত করলাম না তো ?'
‘আরে না। আসুন ভেতরে।' হাসি মুখে জবাব দিল মহুয়া । ‘ তবে কিচেনের অবস্থা খুব খারাপ । কিছু মনে করবেন না। কেক বানাচ্ছিলাম একটা । অনলাইনে ক্লাস করে শিখেছি। চা খাবেন ?'
‘এই দুপুরে? না বাবা ।'
‘তাহলে আইস টি দেই ? গোলাপের পাপড়ি আর দারুচিনি সহ।'
‘শুনেই লোভ লাগছে। দাও।'
ফ্রিজ থেকে পেল্লাই কিন্তু হিম শীতল কাচের একটা বয়াম বের করে মহুয়া। ভেতরে ঠাণ্ডা চা।গোলাপের পাপড়ি আর লম্বা দারুচিনির টুকরো ডুব সাঁতার দিচ্ছে বয়ামের ভেতরে।
হারিকেলের চিমনীর মত দেখতে সুন্দর দুটো গ্লাসে বরফের কিউব রেখে ঠাণ্ডা চা ঢেলে দিল মহুয়া।
‘তোমরা শহর ছেড়ে আচমকা রসুলপুরের মত অমন মফস্বলে চলে এলে যে ।' ঘেমে উঠা গ্লাস হাতে নিতে নিতে প্রতিবেশীসুলভ প্রশ্ন করলেন সুলতানা খালা ।
‘আসলে নিরিবিলি জায়গা দরকার আমার। ডাক্তার অমনটাই বলেছে। শহরের হই চই ক্লান্ত আর অসুস্থ করে তোলে। এই দিকে কাকতালীয় ভাবে সোমনাথের পোস্টিং যখন এখানে হল আমিই বেশি খুশি হয়েছি । কতদিন থাকব জানি না। ওর বদলি ঘন ঘন হয় । সোফাতে বসুন না। '
‘ ডাক্তার বলেছে ?' সোফায় বসতে বসতে বললেন খালা । ‘ কিন্তু তোমাকে তো অসুস্থ বা তেমন বিমারি বলে মনে হচ্ছে না মা জননী।'
‘ না না, আমি সুস্থ হয়ে গেছি। আসলে মাস ছয়েক আগে ঢাকায় একটা দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছি । স্নায়ুর উপর অনেক চাপ পড়েছিল তখন ।'
'দুর্ঘটনা ?' গল্পের চনমন করা ঘ্রাণ পেলেন বাধাকপি খালা ।
উনার ভাবভঙ্গি দেখে হেসে ফেলল মহুয়া । ‘ তেমন কিছু না। হরতাল চলছিল । আমি ছিলাম বাসে । আচমকা একদল লোক বাসের বাইরের দরজা দড়ি দিয়ে বেঁধে পেট্রোল বোমা ফেলে দেয় জানালার কাঁচ ভেঙ্গে । প্রায় মারাই যেতাম । কিভাবে বেঁচে গেছি সেটা উপরওয়ালা জানেন । তখনই পরিচয় হয় সোমনাথ বাবুর সাথে । তারপর ওই আর কী...।'
‘বাহ একদম পুরানো দিনের মিনা কুমারী মার্কা সিনেমা । খুব মজা পেলাম।' মহিলা আনন্দে হাততালি দিয়ে ফেললেন । যার পর নাই খুশি ।
‘সেই থেকে বড় শহর আর যানবাহন ভয় পাই ।' বিষণ্ণ চোখে বলল মহুয়া ।
‘আরে না। আমাদের রসুলপুর একদম নিরিবিলি জায়গা। দেখবে কয়েক দিনে এত ভাল লাগবে যে আর যেতেই চাইবে না। '
‘আমারও বেশ ভালই লাগছে জায়গাটা । বেশ নিরিবিলি । কেমন পুরানো দিনের মত , আমি যে শহরে থাকতাম ছোটবেলায়, অনেকটা তেমন । কেমন একটা মফস্বলের মত ঘ্রাণ ।'
‘ এমনই থাকুক । ঐ সব শপিং মল আর রাজ্যের দোকান ভাল লাগে না। যাই হোক আমি বাজারে যাব, সাথে যাবে ? কিছু লাগবে না কি তোমার ?' খালি গ্লাসটা টেবিলে রেখে বললেন সুলতানা খালা।
‘নাহ নাহ আমি বাসায়ই থাকব। বললাম না কেক বানাচ্ছি । সোমনাথকে সারপ্রাইজ দিতে চাই । ভুল ভাল বেকড করে নিজেই সারপ্রাইজড হতে চাই না ।'
হা হা করে হেসে ফেললেন সুলতানা খালা। ‘ কেক বানানোর মাল মসলা এত মেপে দিতে হয় মনে হয় বোমা বানাচ্ছি । আজও পাটিশাপটা আর ভাপা পিঠা ছাড়া কিছু বানাতে পারলাম না। যাই হোক, এবার উঠি। পরের বার আমার সাথে বাজারে যাবে। এখানের বাজার খুব দারুণ একটা জিনিস। গ্রাম থেকে একদম টাটকা শাক-সবজি আসে। সস্তায় ভাল মুরগিও পাবে। মাছ তো মনে হয় নদীতে ছেড়ে দিলে আবার ভেগে যাবে এত টাটকা।'
খল খল করে উঠে চলে গেলেন সুলতানা খালা।
বিকেলে কাজ শেষ হতেই বাড়ির দিকে চলল সোমনাথ।
মনে মনে স্বীকার করল , শহরটা বেশ সুন্দর । ঘন একটা নদী চলে গেছে বড় রাস্তার পাশ দিয়ে । নদীর পাড়ের শহরের সমস্ত দোকান পাট। মফস্বলে যেমন হয় আরকি । বাড়িঘর পাতলা । ছড়িয়ে ছিটিয়ে ।
রাাস্তার দুই পাশে কি এক ধরনের দানব সাইজের গাছ সারি করে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। কেমন ছায়া ছায়া হয়ে একদম ছায়াপথ হয়ে গেছে।
বাতাসে গাড়ির পেট্রোল পোড়া বা অমন কোন শহুরে বিটকেলে ঘ্রাণ নেই।
সরু রাস্তা দিয়ে এঁকে বেঁকে মহল্লায় ঢুকে পড়লো ।
দূরে ক্লান্ত বিকেলের রোদ।
বাতাসে আমলকীর সৌরভ।
বাগানে কেমন একটা লোহার চেয়ারে বসে পত্রিকা পড়ছেন সুলতানা খালা। সিনেমার আজগুবি খবরে ভর্তি থাকে এই ধরনের পত্রিকা । কোন পরিচালক সারাজীবনের সঞ্চয় ধরে সিনেমা বানিয়েছেন কিন্তু পরে দেখা গেল সেটা চুরির সিনেমা। কোন চিত্রনায়িকারা আগের ঘরের একটা পিচ্চি বাচ্চা আছে এই ধরনের হেন তেন মার্কা খবর দিয়ে ভর্তি।
চোখাচোখি হতেই ভদ্রতা সূচক হাসি দেয়া নেয়া করলো দুইজনেই।
গাড়ি থেকে নেমে বাজারের সওদাই পাতি ভর্তি ব্যাগদুটো হাতে নিয়ে বাসার দিকে এগোল সোমনাথ । হাঁক দিল , ‘মহুয়া'।
একতলা বাড়ি।
মফস্বলের জন্য বেশ সুন্দর। শহরে আজকাল অনেকে এই টাইপের বাড়ি বানিয়ে নাম রাখে - বাংলো ।শান্তি কুটির।
ঢঙ আরকি !
গাড়ির শব্দেই রোজ দরজার কাছে চলে আসে মহুয়া । আজ তেমন হল না। বাথরুমে থাকতে পারে ।
‘মহুয়া। দরজা খোল । আমি বাইরে ।' আরেক দফা হাঁক দিল সে।
কোন খবর নেই।
পকেট থেকে চাবি বের করে নিজেই দরজা খুলল ।
সাথে সাথে ধোঁয়ার কুণ্ডলী এসে ধাক্কা মারল ওর নাকে ।
বাড়ির ভেতর থেকে ডাইনির চুলের মত এঁকে বেঁকে বাতাসে ভেসে আসছে ধোঁয়া । ভেতরে শব্দ করে গান বাজছে ।
‘আজও খাবার পুড়িয়েছে নির্ঘাত ।' দৌড়ে ভেতরে চলে এলো সোমনাথ । ব্যাগ দুটো মেঝেতে রেখে দৌড়ে প্রথমে রেডিওটা বন্ধ করলো । ‘আভেনে খাবার দিয়ে কেন যে স্নানঘরে যাও ।'
এবার গিয়ে আভেনের পাল্লা খুলে ফেলল।
ভেতর থেকে গলগল করে বের হচ্ছে ধোঁয়া । অফ করলো সমস্ত সুইচ । কাপড়ের মোটা গ্লাভস পরে আভেনের ভেতর থেকে টান দিয়ে বের করে আনল বেকিং ট্রে- টা। কেক ছিল । এখন কালা কুত্তার গু হয়ে গেছে। উহু আসলে পোড়া ঝামা ।
বাইরে ফেলে দিল সেই ঝামা।
কিন্তু মহুয়া কোথায় ? বাথরুমের দরজা তো খোলা !
দৌড়ে বেডরুমে চলে এলো ।
মেঝেতে পরে আছে মেয়েটা ।
‘মহু, ঠিক আছ তো তুমি। কি হয়েছে ?' অজান্তেই গলার পর্দা তুলে ফেলল সে। যত্ন আর ভালবাসা দিয়ে পাজকোলা করে তুলে বিছানায় শুয়ে দিল মেয়েটাকে। কপালের এক জায়গায় সামান্য চোট পেয়েছে। নীল হয়ে আছে।
রক্ত ? নেই ।
মেয়েটাকে বিছানায় রাখার পর আবিস্কার করলো ওর ডান হাতের মুঠোয় কি যেন !
খুলে দেখে অচেনা একটা ফুল । নীল রঙের।
ফুলটা দেখে খানিক অবাক হল সোমনাথ । ওদের বাগানে কোন ফুল নেই । কয়েকটা মরিচের চারা বুনেছে ফায়জা কয়েকদিন আগে । ফুলটা, সুলতানা খালার কাছ থেকে নিল নাকি ?
পাতলা চাদর দিয়ে , যত্ন করে মহুয়ার দেহটা ঢেকে দিল ।
বারান্দায় গিয়ে চেঁচিয়ে সুলতানা খালাকে ডাকল কয়েকবার। ফ্রিজ থেকে টনিক ওয়াটারের বোতল নিয়ে দেখে চোখ মেলে চেয়ে আছে মহুয়া ।
শূন্য দৃষ্টি । চেয়ে আছে কিন্তু কিছু যেন দেখছে না। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে আছে যেন ।
ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে টনিক ওয়াটার ঢেলে দিল মহুয়ার মুখে। খেয়াল রাখল যেন কষ বেয়ে গড়িয়ে না পরে।
ফিসফিস করে কি যেন বলল মহুয়া । বুঝতে পারল না সোম নাথ । মাথাটা নিচে নামিয়ে মহুয়ার ঠোঁটের কাছে কান নামিয়ে আনল ।
‘লোকটা আমাকে খুন করতে চেয়েছিল ।' ফিসফিস করে বসল মহুয়া।
‘কি বললে ?' হতভম্ভ হয়ে গেল সোমনাথ ।
‘লোকটা আমাকে খুন করতে চেয়েছিল ।' আগের চেয়ে খানিক স্পষ্ট উচ্চারণে একই জবাব দিল মহুয়া ।
'কে ?'
‘কেক , আমি রান্নাঘরে গিয়েছিলাম । কেকটা দেখতে । ' ধরে ধীরে বলছে মহুয়া । চোখের তারায় আতঙ্ক । ‘ আভেন খুলে কেকটা কতদূর হয়েছে দেখে উঠে দাঁড়িয়েছি তখনই দেখলাম লোকটাকে । দাঁড়িয়ে আছে । আমি ভেবেছিলাম সেলসম্যান । বাড়ি বাড়ি ঘুরে জিনিসপত্র বিক্রি করে অমন কেউ । লোকটার হাতে কেমন একটা হাতুরি । ওটা বাগিয়ে ধরে টাকা চাইল আমার কাছে। আমি চিৎকার করে উঠতেই কপালে আঘাত করেছে। আমাকে...আমাকে খুন ...।'
বাইরে সুলতানা খালার গলা। ‘হয়েছেটা কি ? অ্যাঁ ? শোরগোল কিসের ? ভেতরে আসব ? কেউ কথা বলে না কেন ? '
দৌড়ে দরজার সামনে এসে সোমনাথ উত্তেজিত ভাবে বলল , ‘ খালা আপনার পরিচিত কোন ডাক্তার আছে ? ফোন দিতে পারবেন দয়া করে ? কেউ আমাদের বাসায় ঢুকে মহুয়াকে আঘাত করেছে । '
‘হায় হায় ! সে কি ?’ বিচিত্র ভঙ্গিতে বিলাপ করে উঠলেন সুলতানা খালা । ‘ কি করে এমন হল ? কে এমন... ? ডাকছি, ডাকছি। ডাক্তার শিবশঙ্কর চাকলাদার আমার খুব পরিচিত । ফোন দিচ্ছি ।'
মোটা শরীর নিয়ে ভদ্রমহিলা বেশ দ্রুত চলে গেলেন।
কামরায় ফিরে মহুয়ার হাত ধরল সোমনাথ। ‘ভয় পেও না। ডাক্তার আসছেন । কিচ্ছু হবে না তোমার ।'
খানিক পর।
বাড়ির বাইরে দুইচার হালি প্রতিবেশী দাঁড়িয়ে আছে , তামাশা দেখার লোভে। তাদের খেদিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন সুলতানা খালা ।
বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সোমনাথ । ওর সামনে তোম্বা চেহারা করে দাঁড়িয়ে আছে রোগা পটকা পুলিশ ডিটেকটিভ ইয়াসিন মোল্লা ।
কি মনে করে সিগারেট ধরিয়েছেন ভদ্রলোক । যেন বইয়ে পড়া বা সিনেমায় দেখা ডিটেকটিভ মার্কা একটা ভাব চলে আসে, সেইজন্য হয়তো । বনগাঁয়ে শেয়াল রাজা ।
‘ ঠিক কয়টার সময় আপনি বাসায় ফিরছেন সোমনাথ বাবু ?' শান্ত ধূর্ত চোখে প্রশ্ন করলেন ইয়াসিন মোল্লা । ভাব, দেখ আমি কিন্তু তোমাকেই সন্দেহ করছি । জামাই বউকে খুন করে বা করার চেষ্টা করে , একটা একটা সাধারণ ব্যাপার। পান্তা ভাতে লবণের মতই ।
‘পাঁচটার পর । একদম কাঁটায় কাঁটায় সময়টা বলতে পারব না।' সোমনাথ জবাব দিল ।
‘পথে কোথাও থেমেছিলেন ?'
‘ শহরেই একটা বাজারের মত আছে না ? ওখানে থেমে কিছু জিনিস কেনা কাটা করেছিলাম ।'
‘ আপনার আপিস কোথায় যেন ?'
প্রতিষ্ঠানের নাম বলল সোমনাথ ।
ঐদিকে অন্য এক অফিসার ,থানার ওসি আজমল রব্বানী একপাশে দাঁড়িয়ে সুলতানা খালাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে , ‘আপনি কোন শব্দ মব্দ পাননি ? চিৎকার , বাঁচাও বাঁচাও অমন চিল্লানি ? '
আমতা আমতা করে মাথা নাড়লেন সুলতানা খালা , ‘উম্ম না, না তো । কিছুই পাইনি। তবে মনে হয় কেক আভেনে দেয়ার বেশ খানিক পরই হয়েছে ঘটনাটা । আমি ওর সাথে যখন দেখা করি তখনও মাল মসলা মেশাচ্ছিল । আধা ঘণ্টা পর আভেনে দেবে বলেছে। আর কেক রেডি হতে নব্বই মিনিট লাগার কথা। কেক গেছে পুড়ে, এইবার আপনি হিসাব করে বের করুন কখন কী হয়েছিল ।'
দুইজন সেপাই কিসিমের পুলিশ হেলে দুলে এসে দাঁড়ালো সামনে । একজন পেশাদারী গলায় বলল , ' স্যার বেকতেরে জিগাইলাম । কেউ কাউরে আইতে জাইতে দেহে নাই। খালি ঐ কোনার দিকের বুড়ি মাতারি কইল দুপুরের দিকে লম্বা চুওরা জুয়ান মর্দ মার্কা একটা লোকরে এই পিছনের রাস্তা দিয়া হাইটটা জাইতে দেখছে। চেহারা ভাল মতন দেহে না । তারপরও আবার দেখলে চিনতে পারব । '
‘কোন রকম বর্ণনা ?' নোট বই বের করে প্রশ্ন করলেন ওসি আজমল রব্বানী ।
‘ জে স্যার, লম্বা হেডা তো কইলামই । জিনসের প্যান্ট । ছাই রঙের পাতলা কাপড়ের কোট শইলে ।'
সিপাই দুইজন আবার চলে গেল হেলতে দুলতে ।
‘ওকে সুলতানা ম্যাডাম ।' গম্ভীর গলায় বললেন আজমল রব্বানী। ‘ দরকার মনে করলে আপনার সাথে আবার যোগাযোগ করব । আপনারও কিছু মনে পড়লে আমাদের ফোন দেবেন ।'
‘ঠিক আছে , আমি এখানেই দাঁড়াই । ডাক্তার শিবশঙ্কর চাকলাদার বের হলে মেয়েটার একটু খবর নেব ।' মন খারাপের গলায় বললেন সুলতানা খালা। ‘খারাপ লাগছে মেয়েটার জন্য ।'
ঘন ঘন মাথা নাড়লেন খালা।
‘ঠিক আছে ।' সমর্থন জানিয়ে সামনে পা চালালেন আজমল রব্বানী ।
বকের মত লম্বা লম্বা পা ফেলে ডিটেকটিভ ইয়াসিন মোল্লার সামনে চলে গেলেন তিনি । খানিক সম্মান রেখেই বললেন , ‘তেমন কিছু পেলাম না স্যার ।তবে একজন আই উইথনেস পেয়েছি। লম্বা মত একটা লোককে বাড়ির পিছনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে দেখেছে । ছাই রঙা কোট গায়ে । '
‘এমন শহরতলীতে গরমের মধ্যে কোট গায়ে দেয়া লোক আবার এলো কোত্থেকে ?' ডিটেকটিভ অবাক ।
‘হতেই পারে স্যার। শখের দাম একশো টাকা তোলা । '
‘বাড়ির ভেতরটা দেখবেন না কি ? আমি কিন্তু কিচ্ছু খুঁজে পাইনি ।'
'
‘তারপরও দেখি স্যার। কবি বলেছেন, পাইলেও পাইতে পার মানিক রতন ।'
কথা শেষ করে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন আজমল রব্বানী ।
‘বাসায় ঢুকে আপনি দেখলেন রেডিও বাজছে ?'সোমনাথের দিকে ফিরে আগের কথার খেই ধরলেন ডিটেকটিভ ইয়াসিন মোল্লা ।
‘জি স্যার ।'
‘এবং ভেতরে ঢুকেই আপনি প্রথমেই রেডিও অফ করেছেন, তাই তো ?'
‘ জি স্যার, একদম সেইরকম। '
‘ ঘরের জিনিস পত্র হুবহু এমনই ছিল? মানে আমরা এসে যেমনটা পেয়েছি ?'
খানিক মাথা চুলকে নিল সোমনাথ । ‘ইয়ে, আসলে আমি জানালা খুলেছি। ধোঁয়া যাতে বের হয়ে পারে। আর আভেন থেকে পোড়া কেক বের করে আভেন অফ করেছি । '
‘ বেশ গুছিয়ে কাজ করেছেন দেখছি ।' কেমন একটা সুরে বললেন মোল্লা ।
লোকটার হাবভাব ভাল না। যেন জাল গুঁটিয়ে আনছে।
তখনই বেডরুম থেকে ডাক্তার শিবশঙ্কর চাকলাদারকে বের হতে দেখে দৌড়ে গেল সোমনাথ। ‘কেমন দেখলেন ডাক্তার বাবু ?'
‘ খুব সিরিয়াস কিছু না।' নিজেই কেমন সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন চাকলাদার । ‘পরীক্ষা করে সব স্বাভাবিকই পেলাম । রেস্ট দরকার আর কি । মানসিক ভাবে আঘাত পেয়েছে । বেশ শক্ত আঘাত । এই মুহূর্তে তেমন কিছু বলতে পারছি না। চেম্বারে গিয়ে ব্লাড প্রেসার আর হাবিজাবির রিপোর্ট দেখে ফাইনাল কিছু জানাব আপনাকে । এই সময়টা উনার বিশ্রাম দরকার ।'
‘উনাকে কিছু প্রশ্ন করা যাবে ? ' এগিয়ে এলেন মোল্লা ।
‘একদমই না। মানসিক ভাবে মস্ত আঘাত পেয়েছে, বললাম না। কথা পর্যন্ত গুছিয়ে বলতে পারছে না। এখন প্রশ্ন করলে চাপ পড়বে ব্রেইনের উপর। হিতে বিপরীত হবে। পারমানেনট ড্যামেজ হতে পারে ব্রেইনের । তখন আমি কোন দায় নেব না। আমার মনে হয় কাল বিকেল দিকে আপনার উনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন ।'
‘উনার সাথে কথা বলতে পারলে ভাল হত।' বিড়বিড় করে বললেন মোল্লা ।
'কি জন্য ?' খানিক রাগ দেখাল সোমনাথ । ডাক্তারের কথাও দেখছি আপনি কেয়ার করছেন না।’
‘কথা বলে দেখতাম কোন ক্লু পাই কি না।' ধাতানিটা হজম করে জবাব দিলেন মোল্লা । ‘ কেসটার কিছুই বুঝতে পারছি না আমি। কথা দিলাম আপনার গিন্নিকে কোন রকম বিরক্ত করব না।'
‘ আমি পরামর্শ দেব আজ রেস্ট নিক । কালকে বাইরে সময় কাটিয়ে আসেন খানিকটা । বাড়ির ভেতরে ভয়ের স্মৃতি কাজ করবে। বাইরে থেকে ঘুরে আসলে একদম ফ্রেজ হয়ে যাবে। বাইরে খেতে পারেন । বা শহরে কোন আত্মীয়য়ের কাছে গিয়েও উঠতে পারেন। একা এই বাসায় রাখবেন না।' সুজনের মত পরামর্শ দিলেন ডাক্তার চাকলাদার ।
‘তাই করব।' বাধ্য ছেলের মত জবাব দিল সোমনাথ।
‘আমি কাল বিকেলে এসে দেখে যাব ।' বলেই চামড়ার ব্যাগটা বগলে নিয়ে বের হয়ে গেলেন ডাক্তার চাকলাদার ।
সারা বাড়ি চক্কর দিয়ে ফিরে এলেন ওসি আজমল রব্বানী।
‘পেলেন কিছু ?' আশা ভরা চোখে চেয়ে জানতে চাইলেন ডিটেকটিভ মোল্লা ।
‘না স্যার ।' হতাশ আজমল রব্বানী ।
চিন্তিত ভঙ্গিতে প্যান্টের পকেটে দুই হাত ভরে নিজের দুই উরু চুলকাতে চুলকাতে মোল্লা বললেন , ‘ একদম অন্ধকারে আছি । আমার শহরে এমন কাণ্ড ! কিছু বলেছিল আপনার গিন্নি ? কালপ্রিট হারামজাদা দেখতে কেমন ? কোন রকম তথ্য । মনে করুন প্লিজ ।'
‘শুধু বলেছিল লোকটা লম্বা , গায়ের রঙ কালো । আর ছাই রঙা কোট গায়ে দিয়েছে । ধরতে পারবেন অমন কাউকে ?' সোমনাথ ক্লান্ত ।
‘অমন সামান্য বর্ণনা শুনে কাউকে ধরা বা শনাক্ত করা খুব কঠিন কাজ সোমনাথ বাবু ।' থমথমে গলা মোল্লার ।
‘কিন্তু আপনি এই শহরে আছেন অনেক বছর । কাউকে না কাউকে তো চেনেন যে এমন কাজ করতে পারে ?' সামান্য বিরক্ত সোমনাথ ।
‘ ভাল যুক্তি , কিন্তু রাস্তায় ছাই রঙা কোট পড়া কোন লোককে দেখা মাত্র ক্যাঁক করে ধরাও বেশ বোকামি হয়ে যাবে না ?' এই প্রথম হাসলেন ডিটেকটিভ মোল্লা । ‘আপনার গিন্নিকে আরও তথ্য দিতে হবে, কথা বলতে হবে আমাদের সাথে । সূত্র পেতে হবে আমাদের। তবেই না।'
‘কিছু তো করতেই পারেন ?'
‘করব । অবশ্যই করব । আমি এই শহরের লোক । আপনি নতুন এসেছেন । আর আসা মাত্রই এমন বিপদে পড়েছেন । কিছু না করলে আমার মান সম্মান থাকবে না। সময় দিন আমাকে। ডিটেকটিভ ইয়াসিন মোল্লা কিল খেয়ে কিল হজম করে না।'
‘ধন্যবাদ স্যার ।' মন থেকেই বলল সোমনাথ।
‘ ঐ কথাই রইল। আপনার গিন্নি একটু সুস্থ হলেই আমাকে ফোন দেবেন । কথা বলব উনার সাথে। একটা দুটো কথা হলেই সূত্র পেয়ে যাব। অপরাধী কখনই ছাপ মুছে যেতে পারে না।আমরা যাচ্ছি এখন। '
‘ঠিক আছে স্যার ।'
সোমনাথ দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল তাদের।
চলে গেল সবাই।
রাত নেমে এলো । গভীর হল । বাইরে জোনাকি জ্বলছে। আকাশে বিন্নিধানের খৈয়ের মত অগুনতি নক্ষত্র । ফসলবিলাসী হাওয়ার রাত।
বিছানায় মড়ার মত ঘুমাচ্ছে মহুয়া । সোমনাথ পাশে বসে আছে । একটার পর একটা সিগারেট শেষ করছে ।
গভীর ভাবে ভাবছে ।
কামরার ভেতরে দেয়াল ঘড়ির কাটা কিট কিট একঘেয়ে শব্দে হেঁটে যাচ্ছে । এক সেকেন্ডের পথ ওর জন্য মাপা।
ফোঁস করে একটা দম ফেলে শব্দ করে বলে উঠল, ‘ হারামির বাচ্চাকে পেলেই খুন করব আমি । '
ওর গলার শব্দে যেন জেগে উঠল মহুয়া । বিড়বিড় করে বলল , ‘হ্যাঁ , হ্যাঁ । একদম ।'
আবার ঘুমিয়ে গেল। অমন ভাবে আগে কখনই ঘুমাত না মেয়েটা।
সকাল বেলায় হাজির হলেন মানিকজোড় ।
ডিটেকটিভ ইয়াসিন মোল্লা আর ওসি আজমল রাব্বানী ।
‘কিছু বলেছে নাকি আপনার গিন্নি ?' জানতে চাইলেন ডিটেকটিভ ।
‘ওর ঘুম ভাঙ্গেনি এখনও ।দুপুরে ওকে নিয়ে বাইরে যাব । বাইরেই কোথাও খাওয়া দাওয়া করব । শহরে কোন আত্মীয়ের বাসায় কয়েকটা দিন কাটিয়ে ফিরব। তেমনটাই বললেন তো ডাক্তার চাকলাদার।' বিরক্ত মাখা চেহারা নিয়ে বলল সোমনাথ। ‘আপনারা কিছু পেলেন ?'
‘না। পাইনি।' হব হব করে বলে গেলেন ডিটেকটিভ । ‘শহরের বড় বড় রাস্তায় দোকানদার আর স্থানীয় সব লোকদের সাথে কথা বলছি । নতুন কোন আগন্তুক এসেছে কি না শহরে সেটা খোঁজ নিচ্ছি। পুরানো দাগী আসামিদের কেউ ছাই রঙা কোট পরে হাঁটা চলা করেছে কি না তেমনটাও দেখছি। যাই হোক দুপুরে খাওয়ার পর আপনার গিন্নি যেন আমাকে একটা ফোন দেয়। অথবা যখন উনার শরীরটা একটু ভাল বলে মনে করেন আরকি ! '
প্রায় পালিয়ে গেল মানিকজোড় ।
ভেতরে ঢুকে দেখে ঘুম ভেঙ্গেছে মহুয়ার। পাশে বসে সোমনাথ ওকে জড়িয়ে ধরল ।
‘একটু ফ্রেস হয়ে নাও। বাইরে খাব আজ। পরে শহরে গিয়ে বাবা মায়ের সাথে এক সপ্তাহ থেকে আসব। ডাক্তার অমন বলছে ।'
ঠিক আছে।' ঘুম ঘুম গলায় জবাব দিল মহুয়া ।
গাড়ি চলছে ।
সুন্দর রোদ। চারিদিকে ঝিকিমিকি করছে । আশ্বিন মাসের রোদ অমন কাঞ্চন রঙা হয়?
‘এখানে ভাল হোটেল কোথায় পাব জানি না, আগে খানিক ড্রাইভ করি ? খোলা বাতাসে ভাল লাগবে তোমার। তারপর ভাল কোন খাবারের দোকান পেলে নেমে পড়ব ।' গাড়ি চালাতে চালাতে বলল সোমনাথ ।
‘সেটাই ভাল হয়।' ঘুম ঘুম গলায় বলল মহুয়া । চেহারা ভাবলেশহীন । চোখের তারায় ক্লান্তি।
সরু পথ দিয়ে গাড়ি চলছে ধীর গতিতে। দুই পাশে ছোট ছোট দোকান । মিষ্টির দোকান , লুঙ্গি গামছা, বইয়ের দোকান । ভাই ভাই স্টোর । বিল্লাল অ্যান্ড সন্স । দেয়ালে পোস্টার । চুন দিয়ে লেখা - এখানে প্রস্রাব করিবেন না।
টুং টাং করে রিক্সা চলছে। একটা দুটো গাড়ি পার্ক করা পথের দুই পাশের নানা জায়গায় ।
আড় চোখে কয়েকবার মহুয়ার দিকে চাইল সে । কেমন ঘুম ঘুম চোখে বাইরে চেয়ে আছে।
শহরতলি ছেড়ে বড় রাস্তায় উঠে এলো ওদের গাড়ি । মহুয়া তখনও একই ভাবে বাইরে চেয়ে আছে ।
আচমকা ফিসফিস করে বলে উঠলো , ‘ঐ যে ঐ লোকটা। ঐ লোকটা ।'
গাড়ির গতি কমিয়ে রাস্তার দিকে চাইল সোমনাথ।
সরু রোগা একটা লোক হেঁটে যাচ্ছে। হাতে চ্যাপটা ব্রিফকেস । লোকটার গায়ে ছাই রঙা জ্যালজ্যালে হয়ে যাওয়া কোট । এক সময় দামি জিনিস ছিল । অনেক বছর লণ্ড্রীতে না দিয়ে বাসায় হাতে সাবান মেখে কাচায় এই অবস্থা ।
লোকটা ফুটপাত ধরে হাঁটছিল। আচমকা একটা আবাসিক হোটেলের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো ।
খানিক সামনে গিয়ে গাড়িটা পার্ক করলো সোমনাথ। ওর চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেছে।
' তুমি খানিকটা সময় একা বসতে পারবে ?' মহুয়ার দিকে ফিরে নরম গলায় জানতে চাইল সোমনাথ ।
মাথা কাত করে সম্মতি জানালো মহুয়া । চেহারায় এখনও কেমন দিশেহারা ভাব।
বাম হাত দিয়ে ড্রাইভিং সিটের তলা থেকে আধ হাত লম্বা এডজাস্টেবল রেন্সটা তুলে নিল সোমনাথ । সব সময় ওখানেই রাখে যন্ত্রটা। পোক্ত জিনিস। কায়দা করে হাতের তালুর মধ্যে রেখে ফুল হাতা জামার হাতায় ঢুকিয়ে নিল ।
গাড়ি থেকে ভালো মানুষের মতো নেমে একদম নিরীহ গোবেচারা মত চেহারা করে হোটেলটার দিকে এগিয়ে গেল। সরু লম্বাটে , চারতলা পুরানো ধাঁচের দালান । টিনের সাইনবোর্ডে লেখা - হোটেল মধুমিতা । নামের নিচে ছোট হরফে ব্রেকেডে লেখা- আবাসিক ।
সেটার নিচে পিচ্চি পিচ্চি হরফে করে অনেক কিছু লেখা। যার অর্থ দিনচুক্তি খাওয়া যাবে। চব্বিশ ঘণ্টা জল থাকে । শান্ত নিরিবিলি । হেন তেন । মোদ্দা কথা এই হোটেলে না উঠলে জনম ব্যর্থ ।
ঢুকেই দেখে লবি। মহাভারতের আমলের কালো সোফা। গা এলিয়ে আরাম করে একজন বসে খবরের কাগজ পড়ছে।
ডান দিকে কাউনটার । সেখানে লম্বা ফাইল খাতা নিয়ে টাকমাথার মধ্যবয়স্ক রিসেপশনিস্ট সেবাদানের জন্য দাঁড়িয়ে । উপরে ভ্যান ভ্যান করে বৈদ্যুতিক পাখা চলছে ।
রিসেপশনিস্টের পিছনে একটা অয়েল পেন্টিং । ওটার বিষয়বস্ত কি, খোদ শিল্পী ছাড়া কেউ বলতে পারবে না।
ছাইরঙা কোটকে দেখে টাকলা রিসেপশনিস্ট বিনয়ে মিহি গলায় বলল , ' জি স্যার ?'
' রুম নাম্বার তিনশো দুই ।' ভারী গলায় বলল ছাই কোট। হাতে ব্রিফকেসটা শক্ত করে ধরে আছে।
‘জি স্যার, জি স্যার।' দেয়ালে একগাদা চাবি শুটকি মাছের মত ঝুলানো । সেখান থেকে একটা নিয়ে ছাইরঙা কোটের হাতে ধরিয়ে দিল টাকমাথা ।
চাবি নিয়ে এগোল ছাইকোট পরা হারামি। সিঁড়ি আর লিফট পাশাপাশি । ভেবেছিল সিঁড়ি দিয়ে উঠবে । কিন্তু না। লিফটের সামনে দাঁড়ালো । চারিদিকে সতর্ক ভাবে চেয়ে হালকা শান্ত পায়ে হেঁটে সোমনাথ ও গিয়ে দাঁড়ালো লোকটার পাশে।
ছাইকোট ওর দিকে চেয়ে ভদ্রতাসূচক হাসি উপহার দিল। তাতে মোটেও কোন রকম আনাবিল আনন্দের খোরাক পেল না সোমনাথ ।
লিফটে উঠে তিনতলার সুইচ চেপে দিল ছাই কোট । ' আপনি কয়তলায় যাবেন ?' জানতে চাইল ভদ্রতা করে।
' রুম নাম্বার তিনশো দুই স্যার ।' গলায় অতিরিক্ত বিনয় ঢেলে জবাব দিল সোমনাথ ।রেঞ্জটা হাতের তালুর মধ্যে এনে দেখালো , ' বাথরুমের পাইপ একটু টাইট দিতে হবে ।প্লাম্বার স্যার । '
'তিনশো দুই তো আমার রুম ।' অবাক হল ছাই কোট । ' সকালেই তো সব ঠিক ছিল। আবার কি হল ?'
' রুটিন চেক স্যার। খানিক আগেই কয়েকজন অভিযোগ করেছে লাইন কাজ করছে না। ' চেহারায় দুঃখ মাখিয়ে কেমন একটা ভাব করে বলল সোমনাথ।
কাঁধ ঝাঁকল ছাই কোট। কিছু বলল না।
সতর্ক ভাবে লোকটার চেহারা জরিপ করছে সোমনাথ । চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে, বদমায়েশ কিসিমের লোক। পেঁপের মত মুখে সরু গোঁফ । চোখে শয়তানীর ছাপ। সোমনাথের ভেতর থেকে ক্রোধের বাস্প বের হয়ে আসতে চাইল টগবগ করে। অনেক কষ্টে সামলে নিল ।
ততক্ষণে লিফট উঠে গেছে তিন তলায়।
সরু করিডোর। ওরা দুইজন ছাড়া অন্য কেউ নেই ।
বাইরে দুপুর হলেও করিডোরে কল্কাফুলের মত ল্যাম্পশেডে আলো জ্বলছে ।
নিজের কামরার সামনে এসে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ফেলল ছাইকোট । ' নিন জলদি করুন । আমাকে আবার শাওয়ার নিতে হবে। বাইরে যা ধূলা ময়লা।'
'আপনার স্যাহায়্য লাগবে খানিক ।' বাথরুমের সামনে গিয়ে বিনীত ভাবে বলল সোমনাথ ।
'আমি কি প্লাম্বার না কি ?' বিরক্ত হল লোকটা । ‘কি করতে হবে ? ' বলতে বলতে চলে এলো বাথরুমের সামনে ।
' না না তেমন কিছু না। আসলে তোয়ালে ফোয়ালে আর যা যা আছে একটু ভেতরে নিলেই হবে।'
'অ ।'
বাথরুমের ভেতরে ঢুকে পড়লো লোকটা। ওর মাথাটা এখনসোমনাথর সামনে । পিছন ফিরে আছে।
রেন্সটা উপরে তুলে গায়ের জোরে নামিয়ে আনল ।
একবার , দুইবার। বার বার।
থ্যাপ থ্যাপ করে কয়েকবার বিচ্ছিরি কেমন একটা শব্দ হল ।
কাজটা করতে গিয়ে কোন রকম ইতস্তত বোধ করেনি সে । হাত কাঁপা বা বিবেকের দংশন অনুভব করেনি মোটেও ।
শোধ । দাঁতের বদলে দাঁত এই নীতিতে বিশ্বাসী সে । লোকটাকে ধরে আইনের হাতে তুলে দিতে পারতো ।
কি লাভ হত দিনের শেষে ?
দশ পাঁচ দিন জেল খেটে জামিনে বের হয়ে আসতো । মামলা চলতো বছর পাঁচেক সময় ধরে। ততদিনে দুনিয়া যেত উল্টে । দিনের শেষে লাভ হত লব ডঙ্কা ।
নিজের হাতে শাস্তি দিতে পেরে মনটা ভাল হয়ে গেছে ওর।মহুয়া ওর দুনিয়া। কেউ ওর দুনিয়া নষ্ট করতে চাইলে শিক্ষা দিতে হবে।
তোয়ালে দিয়ে প্যাচিয়ে ট্যাঁপ খুলে হাতের রক্ত পরিষ্কার করে নিল । রেন্সটা ভাল মত ধুয়ে কোমরের কাছে প্যান্টে গুঁজে নিল । হোটেলের বাইরেই নর্দমা আছে। ফেলে দেবে। অথবা সাথে করে নিয়ে নদীতে ফেলে দেবে।
শেষ বারের মত রক্তাক্ত লাশটার দিকে চাইল ।
মনে করার চেষ্টা করলো দরজার নব বা অমন কিছুতে হাত দিয়েছিল কি না।
না । কোথাও আঙুলের ছাপ পড়েনি।
বাইরে উঁকি দিল। কেউ নেই করিডোরে ।
একদম বিন্দাস একটা ভাব ধরে লিফটের কাছে এসে রুমাল চেপে সুইচে চাপ দিয়ে নেমে এলো নিচে। তাড়াহুড়া করলো না। তাতে লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।
সুন্দর করে হেঁটে চলে এলো বাইরে।
গাড়ির ভেতরে ঘুম ঘুম কেমন চোখে বসে আছে মহুয়া । বসে গাড়ি স্টার্ট দিল সোমনাথ ।
ভেবেছিল মহুয়া হয়তো জানতে চাইবে কোথায় ছিল এতক্ষণ । মনে মনে মিথ্যা কথা রেডি করেই রেখেছিল । মহুয়া কিছু জানতে চাইল না।
‘আমরা নদীর পারে যাই কেমন ?’ মহুয়ার মতামত জানতে চাইল সোমনাথ । ' ওখানে খুব ভাল একটা হোটেল আছে। নদীর হাওয়ায় তোমার মন ভাল হয়ে যাবে। হোটেলের খাবারও নাকি বেশ ভাল । টাটকা গলদা চিংড়ি পাওয়া যায় । খাবে ?'
‘হু , খুব ভাল হবে।' নিস্তেজ গলায় জবাব দিল মহুয়া ।
সবাই ডাকে নাজিমুদ্দিনের মা । মোটাসোটা গাঁট্টাগোঁটটা মহিলা । বয়স অনেক হলেও বেশ খাটতে পারে। গত দশ বছর ধরে কাজ করছে হোটেল মধুমিতায় । রুমে ঝাড়ু দেয়। বিছানার চাদর পাল্টে দেয় । অমন হাবিজাবি কাজ ।
দৌড়াতে দৌড়াতে তিন তলা থেকে কাউনটারে চলে এলো মহিলা । উত্তেজনায় লিফট ব্যবহার করতে ভুলে গেছে ।
‘স্যার জলদি আসেন ।' চেঁচাচ্ছে নাজিমুদ্দিনের মা।
' আহা, আবার কি হল ?' ম্যানেজার বিরক্ত ।
'তিনশো দুই নাম্বার রুম গো স্যার। একদম মাঠার কেস স্যার , জলদি আসেন গো স্যার , একদম মাঠার কেস ।'
নদীর ধারে রাস্তাটা পাকা । বড় হাইওয়ে । হু হু করে ভেজা বাতাস বইছে । নৌকার পাল আর অমন আরও জলযান দেখা যাচ্ছে এত দূর থেকেও ।
ফুরেফুরে হাওয়ায় মনটা ভাল হয়ে গেল সোমনাথর ।
আচমকা কেমন যেন চমকে গিয়ে সোজা হয়ে বসল মহুয়া । ফিসফিস করে বলল , ' ঐ যে, ঐ লোকটা । ঐ লোকটা ।'
দুই চোখ বড় বড় হয়ে গেছে মহুয়ার ।
খানিক চেয়ে থেকে আবার ঘুম ঘুম চোখে বসে রইল ।
মস্ত বড় একটা ধাক্কা খেল সোমনাথ । রাস্তায় কেউ নেই। ফাঁকা ।
আচমকা মোবাইল বেজে উঠলোসোমনাথের । এতই অকস্মাৎ প্রায় চমকে উঠলো সে।
বাজছেই ।
গাড়ি ড্রাইভ করতে করতেই ফোন রিসিভ করলো ।
‘ হ্যালোসোমনাথ বাবু ?' ডাক্তার চাকলাদারের গলা ।
‘বলছি।’
' আপনার স্ত্রীকে আমার এক ছাত্র চিনেছে। উনার মধ্যে সিজোফ্রেনিয়া লক্ষণ আছে । ছোটবেলায় রান্নাঘরে আগুন ধরে গিয়েছিল । তখন থেকেই উনি এই রোগে আক্রান্ত। তার উপর কিছুদিন আগে নাকি বাসের মধ্যে হরতালের সময় ...হ্যালো আপনি শুনছেন ?'
'হ্যাঁ।' অনেক কষ্টে শুধু এই বলতে পারল সোমনাথ ।
'আপনার বাসায় ওকে কেউ আক্রমণ করেনি । কেউ না। সব ওর মনের ভুল । অমনিতেই পরে গিয়ে কপালে সামান্য ব্যাথা পেয়েছে । হ্যালো ...লাইন ক্লিয়ার ?'
দরদর করে ঘামছে সোমনাথ ।
দূর থেকে ভেসে আসছে পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ ।
শেষ

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন