সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কাচ পোকার ঘুম

 আতিকুর রহমান তখন বাগানের গ্রিল রঙ করছিলেন 

অমন ধনী এক লোক , এত এত  টাকার মালিক,  নিজের হাতে তুচ্ছ মরচে পরা লোহার গ্রিল রঙ করবেন নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।

  ফাল্গুনী  হাওয়ায়  বাগানের ফুলগুলো গল্প করছে গুণগুণ করে  ।  অনেক রকম ফুল।

  

আমাকে দেখে তিনি   লজ্জিত ভঙ্গিতে হেসে সাফাই গাইলেন , ' সময় কাটছিল না  খুব একা লাগছিল  তাই রঙ করছি  জিনিস পত্র রঙ্গিন হলে যদি  মনের কালো দাগ যদি দূর হয় '

জবাবে আমিও মুচকি হাসি ফেরত দিলাম 

পঞ্চান্ন বছর বয়স হলেও আতিকুর রহমানের শরীর দারুন রকমের ফিট  চর্বির ভাণ্ডার হয়ে যায়নি  মেদ বিহীন একহারা শরীর  মাথার চুল শাদা কালো মাখামাখি  মেপে মেপে অর্ধেক শাদা বাকি অর্ধেক কালো 

নারকেলের ফোঁপরার রঙের ফুল হাতা জামা আর  বাদামের  খোসা  রঙের ঢোলা প্যান্টে বেশ মানিয়েছে 

'তবে রঙ করা শেষ হলেই লম্বা  একটা ছুটি নেব  দূরে কোথাও চলে যাব কয়েকদিনের জন্য ' ম্লান মুখে বললেন আতিকুর রহমান 

'কোথায় যাবেন ?' কৌতূহল না, কথার চরকা ঘোরানর জন্যই বললাম 

'জানি না কোথায় যাব ' ফোঁস করে  দম ফেললেন । দুঃখী মানুষের মত ।

'কত দিনের জন্য ?' জানতে চাইলাম 

'ঠিক জানি না। আপনি কি আমার সাথে যাবেন ? দূরে কোথাও  যে খানে দুই চোখ যায় ' ছেলেমানুষের মত জবাব দিলেন উনি 

'কি বলতে চাইছেন আসলে ' হেসে ফেললাম  

হাসিতে কোন রকম ইঙ্গিত ছিল না।

এইবার ভদ্রলোক লজ্জায় পড়ে  গেলেন  এক হাতে মুখ ঢেকে লজ্জিত ভঙ্গিতে বললেন , ' জানি বোকার মত আচরণ করছি  হয়তো আপনি আমাকে  বুড়ো  ভাম মনে করছেন  কিন্তু কেউ জীবনেও ভাবতে পারবে না,  কি রকম বিচ্ছিরি ভাবে আমি আপনাকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছি '

হাতটা যখন সরালেন দেখি ব্রাশের রঙ আতিকুর রহমানের নাকে লেগে কেমন সার্কাসের  ক্লাউন মার্কা একটা ভাব হয়ে গেছে   যে কেউ হেসে ফেলবে ।

পকেট থেকে রুমাল বের করে ভদ্রলোকের নাকের রঙ মুছে  দিতে দিতে   বললাম ,' না আমি জীবনেও অমন মিষ্টি রঙ্গিলা প্রস্তাব পাইনি '

উনি আবার হাসলেন , ' ঠিক আছে  গ্রিল রঙ করা শেষ করে আবার প্রস্তাব দেব  আপনি ... মানে তুমি আমার সাথে দূরে কোথাও যাবে ? অনেক দূরে  যাবে ?'

 

 

থামলো লিলি রহমান  ওরফে মিসেস আতিকুর রহমান 

মনোযোগ দিয়ে শুনছিল শহরের সবচেয়ে ঘাগু এবং চোস্ত ক্রিমিনাল এটর্নি হাদি হোসেন  

এই পর্যন্ত শুনেই  আগ্রহ হারিয়ে ফেলল , ' বুঝলাম চমৎকার একটা রোমান্টিক গল্প আছে আপনার জীবনে  একেবারে আগের দিনের পেপারব্যাক বই 'হাতে রাখ তোমার   হাত ,  চন্দনের মায়াবী  বনে , আমরা দুজনে একা,   এই কিসিমের কাহিনি  কিন্তু এতে আমার কী   কাজ ? খুন ফুন কই ?'

'আমি তো সেই পর্যন্ত আসিনি এখনও ' খানিক রাগের বুদ্বুদ দেখা গেল লিলির গহন কালো চোখে 

হ্যাঁ , চোখ আছে মহিলার  বুকে চাক্কু মেরে দেয়া চাহনি 

'আমার স্থির বিশ্বাস , আমার স্বামী আতিকুর রহমান তার প্রথম স্ত্রী শেফালী বেগমকে খুন করেছে  আমি নিজে শেফালী বেগমের ব্যক্তিগত নার্স ছিলাম  রোজ বারো ঘণ্টা করে দেখভাল করেছি ভদ্রমহিলাকে  উনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিলেন  আচমকা মারা যেতে পারেন না। অসম্ভব  এটা একদম স্বাভাবিক মৃত্যু নয় '

রাগি রাগি গলায় বলল লিলি  

হাদি হোসেন আবিস্কার করলো রাগলে মেয়েটাকে বেশ লাগে 

 

টেবিলের সাথে নিতম্ব ঠেকিয়ে  দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে  শুনছিল হাদি হোসেন ।

ঘুরে এসে ধপাস করে বসে পড়লো লিলির পাশের চেয়ারে ।

' হতে পারে । কিন্তু প্রমাণ কই ? তাছাড়া আমার মনে হচ্ছে , আপনি হয়তো খানিকটা অনুশোচনায় ভুগছেন । অনুশোচনার কারণ,  শেফালী বেগমের মৃত্যুর ঠিক মাস খানেকের মধ্যে আপনি আতিকুর রহমান সাহেবকে বিয়ে করে ফেলেছেন । আর কিছু না। এই গ্লানি একদম স্বাভাবিক । একদম ঝকঝকে তকতকে  সুন্দরী এক মেয়ে তার আড়াই গুণ বেশি বয়স্ক  এক ধনী ভদ্রলোককে বিয়ে করেছে । এই ধনী ভদ্রলোকের প্রথম স্ত্রী ছিল আবার  আপনার পেসেনট । সব মিলিয়ে একটা মানসিক জগাখিচুরি না কাচ্চি বিরিয়ানি কী যেন বলে না ? সেই রকম অবস্থা । একদম স্বাভাবিক ।সবই আপনার  মানসিক  টানাপোড়নের  গল্প ।    '

এক দমে কথাগুলো বলে গেল হাদি হোসেন ।

'উহু ।‘  মাথা নাড়ল লিলি । ভদ্রমহিলার দিকে আমি নিজে খেয়াল রেখেছিলাম । বেশ ভাল টাকা দিত আমাকে । উনার স্বাস্থ্য ভাল হচ্ছিল ধীরে ধীরে । অমন আচমকা মারা যেতেই পারে না ।'


'বুঝলাম।' তর্কের খাতিরে সহজ হল হাদি হোসেন । ' বুঝলাম ভদ্রমহিলা শেফালী না কি যেন উনি মারা গেছেন । এবং সেটা হত্যাকাণ্ড । কিন্তু কী    প্রমাণ দেখাতে পারবেন ? আপনার এই দাবীর পিছনে যুক্তি কী   ?'


'না প্রমাণ দেখাতে পারব না।' এইবার আরও খানিক নরম হল লিলি । ' কিন্তু হানিমুন থেকে ফেরার পর আবিস্কার করলাম পরিস্থিতি কেমন যেন পাল্টে গেছে । আগের চেনা আতিকুর রহমানের সাথে এখনকার লোকটা একদম আলাদা । আমাকে যেন নজর বন্দি করে রাখছেন উনি ।‘  

 

কল্পনায় সেইদিনগুলোতে ফিরে গেল  লিলি ।   

মাত্র সপ্তাহ কয়েক হবে মধুচন্দ্রিমা থেকে ফিরেছে এই দম্পতি 

বাসার রুমে ফোনে কথা বলছিল লিলি, ' হ্যাঁ , হ্যাঁ চিন্তা করবে না। আমি তোমার স্বামীকে এসে দেখে যাব  আজ ? না আজ হবে না। কালকে সময় দিতে পারব  চিন্তা করবে না। আচ্ছা  বাই '

পাশে এসে  দাঁড়িয়েছেন আতিকুর রহমান  লিলি ফোনটা রাখতেই খানিক কড়া গলায় প্রশ্ন করলেন , ‘ কে ছিল শুনি ?'

'আমার বান্ধবী শান্তা ' ডাইনিঙ টেবিলের সামনের চেয়ারে বসে   জবাব দিল লিলি  ' কাল বিকেলে আমাদের বাসায় একটু আসতে চাচ্ছে '

না করে দাও ' বিরক্ত মুখে কমলার রস ভর্তি কাচের গ্লাসটা মুখের সামনে তুলতে তুলতে তেতো গলায় বললেন আতিকুর রহমান  ' তোমার ওই সব পুরানো বান্ধবীদের সাথে মেলামেশা বাদ দাও  কি আর গল্প করবে  কাল বিকেলে আমরাই বরং বসার ঘরে বসে জম্পেস আড্ডা দেব  সেটাই ভাল  বাইরের লোক পারিবারিক জীবনের শান্তি নষ্ট করে '

'কিন্তু হানিমুন থেকে ফেরত আসার পর আমরা আর কোথাও যাইনি ' জবাব দিল লিলি 

'এই বিশাল বাড়ি , বাগান, সুইমিং পুল পছন্দ হয় না তোমার ?'

' হয়। হবে না কেন ? কিন্তু তারপরও বাইরে যাওয়া ভাল। আমরা তো মুভি দেখতে যেতে পারি  বা শপিং করতে ...'

তুমি কি সুখী না আমার সাথে ?' খামাখাই গলা উচিয়ে ফেললেন আতিকুর রহমান 

'অবশ্যই  কী বলছ এসব ? কিন্তু আমার পুরানো বন্ধু বান্ধবদের সাথে মোটেও মেলামেশা করতে দিচ্ছ না তুমি  একদম বিচ্ছিন্না করে ফেলেছ আমাকে  এই ভাবে তো চলা সম্ভব না।'

' কেন সম্ভব না ?' হাতের গ্লাস নামিয়ে রেখে ব্যাখ্যা দাবি করলেন তিনি 

লিলি জবাব দেয়ার আগেই রান্নাঘর থেকে এসে পড়লো নাজিমুদ্দিনের মা  

বাধ্য হয়ে থেমে গেল কবির লড়াই  

নাজিমুদ্দিনের মা বুয়া  রান্না করা হতে ঘর সামলানোর কাজ করে  সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত  হাতে  হাফ ডজন  খাম  চিঠির বাক্স খুলে বের করে নিয়ে এসেছে  রহমান দম্পতির সামনে খাম দুটো রেখে বলল , ' এই লন  চিদি। বেগম সাহেবা আপনেরে আরেক কাপ কুফি দিমু ?'

লাগবে না।' হাতের ইশারায় নাজিমুদ্দিনের মা কে বিদায় করে খামের দিকে হাত বাড়াল লিলি 

একই সাথে আতিকুর রহমান  

খামগুলো চট জলদি নিজের হাতে তুলে নিলেন আতিকুর রহমান  বেছে নিজেরগুলো রেখে বাকি দুটো খাম ফেরত দিলেন লিলির হাতে , ' আমার চিঠি শুধু ব্যাঙ্ক আর ব্যবসার কাগজ  তেমন আকর্ষণীয় কিছু না  তোমারগুলো মনে হয় বেশ রোমাঞ্চর কর '

কথার মধ্যে কেমন একটা ইঙ্গিত ছিল  সেটা না বোঝার ভান করে নিজের খাম খুলে চিঠি পড়তে পড়তে লিলি  বলল , ' আমার সব চিঠিই আগের পেসেনটদের। রোমাঞ্চকর কিছু না  উনাদের চিকিৎসা আজ কাল না করলেও অনেকেই যোগাযোগ রাখতে চায়  যেমন এই চিঠিটা '

'নিশ্চয়ই ছেলে ছোকরা হবে ?' অতিরিক্ত কৌতূহলী গলায় জানতে চাইলেন আতিকুর রহমান  

'হ্যাঁ , কিন্তু ছোকরা না। বয়স্ক এক ভদ্রলোক  উনার স্ত্রীর নার্সও আমিই ছিলাম  আমার বিয়েতে আসতে পারেনি ,চিঠি দিয়ে জানতে চাইছে কি ধরনের গিফট পাঠালে আমি খুশি হব ' শান্ত গলায় জবাব দিল লিলি 

ফোন করে বলে দাও বড়লোকের ঘরে বিয়ে হয়েছে তোমার  যা যা দরকার সবই আছে  কোন রকম উপহার পাঠানোর দরকার নেই ' বেশ একটু ভাব দেখান গলায় বললেন তিনি 

উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল লিলি 

সেই রাতে 

ঘুমাচ্ছিল লিলি 

 আচমকা ঘুম ভেঙ্গে যেতেই আবিস্কার করলো পাশে  আতিকুর রহমান নেই 

 

কামরা সেই অর্থে অন্ধকার নয়  

খানিক দূরে  কাঠের টেবিলের উপর আছে কাচের লণ্ঠন  নীলচে পাখির ডিমের সাইজের বাল্ব কেমন  ঘুমঘুম আলো দেয়  

একদম  ঘুঁটঘুট্টি   অন্ধকারে ঘুমুতে পারেন না আতিকুর রহমান  

সেই  নীলচে  রহস্যময়     আলোতে লিলি  দেখতে পেল ,  ওর স্বামী আতিকুর রহমান কেমন জম্বির মত হাঁটছে  

প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেও সামলে নিল  এতদিনে সে ব্যাপারটা জানে।  আগেও দেখেছে ।  ঘুমের মধ্যে হাঁটেন আতিকুর রহমান  স্লিপওয়াকিং 

প্রায় রাতেই অমন করেন 

নতুন কিছু না।

টেবিলের উপর যেখানে ওষুধ রাখা থাকে ওখানেই দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে ওষুধ নেয়ার মত ভঙ্গী করে  রোবটের মত  ফিরে বিছানার পাশে দাঁড়ালেন তিনি  নরম গলায় বললেন , ' ডার্লিঙ ওষুধটা খেয়ে নাও প্লিজ  খেলেই ঘুম এসে যাবে  জানি খানিক আগেই তুমি ওষুধ খেয়েছ  কিন্তু নার্স লিলি আমাকে বলে গেছে আরেক ডোজ বেশি  করে খেতে  নাও নাও ...খেয়ে ফেল  এই তো লক্ষ্মী মেয়ে '

বিছানার সামনে ঝুঁকে ওষুধ খাওয়ানোর মত একটা ভঙ্গী করে দাঁড়িয়ে আছেন আতিকুর রহমান 

দৃশ্যটা দেখে এসির হিম হিম হাওয়ার মধ্যেও ঘেমে উঠলো লিলি 

ওই দিকে ওষুধ খাওয়ানোর পর্ব শেষ করে আবার জম্বির মত হেঁটে বিছানায় এসে সুন্দর করে শুয়ে পড়লেন আতিকুর রহমান  গভীর শ্বাস প্রশ্বাস নিতে লাগলেন নিয়মিত ছন্দে। ঘুমিয়েই ছিলেন  আরও অতলে চলে গেলেন 

আতঙ্কে কাঁপতে লাগল লিলি 

 

 

 

 

তো ?' বলে উঠলো হাদি হোসেন 

'উনি    কখনই শেফালী বেগমকে ওষুধ দিত না।' ঢোক গিলে নিজেকে সামলে বলল লিলি  ' রাতের শেষ ডোজ ওষুধ দিয়ে আমি ছুটি নিতাম  ওটাই শেষ ডোজ  পই পই করে বলা হয়েছিল '

মরমী বন্ধুর মত মাথা ঝাঁকাল হাদি হোসেন  ' ব্যাপারটা জটিল সন্দেহ নেই  আর ঘটনাটা   খুন হিসাবে প্রমাণ করা  আরও বেশি কঠিন  ঘুমের মধ্যে হেঁটে বউকে ওভার ডোজ ওষুধ দিয়ে খুন ! নাহ ধোপে টিকবে না ম্যাডাম '

'কিন্তু আমি নিশ্চিত উনি খুনটা করেছেন ' চেঁচিয়ে উঠলো লিলি  চেহারায় ভয়ের ছাপ  

বুঝতে পেরেছি ' শান্ত গলায় জবাব দিল হাদি    মোটেও উত্তেজিত হয়নি  পেশাদার  ঠাণ্ডা মাথার জন্য বিখ্যাত  ' কিন্তু লিগ্যাল অ্যাকশন নেয়ার জন্য আরও পোক্ত প্রমাণ লাগবে  এই স্বপ্নের হাঁটা ওভার ডোজ ওষুধ ... কিছুই প্রমাণ করতে পারব না '

'কিন্তু এইভাবে আমি থাকতে পারছি না।' উঠে দাঁড়ালো লিলি  ' এক সাথে এক বিছানায় আমরা ঘুমাচ্ছি ভাবতেই সারাক্ষণ ভয় লাগে  কে জানে যদি আমাকেও ...'

পাশে এসে দাঁড়ালো হাদি  ' আপনাকে খুন করতে যাবে কেন ? উম্মম  করতে পারে  আচ্ছা আপনার নামে কি কোন রকম ইনস্যুরেন্স পলিসি করিয়েছে ?'

'মানে কী ?'

মানে যদি আপনি খোঁজ নিয়ে প্রমাণ করতে পারেন শেফালী বেগমের মৃত্যুর আগে আপনার স্বামী বিপুল অর্থের কোন লাইফ ইনস্যুরেন্স করিয়েছিল বা এখন আপনার নামে করিয়েছে  তবে কিছু একটা প্যাটার্ন পাওয়া যায়  লোকটাকে ফাঁদে ফেলার একটা হলেও উপায় থাকে '

চুপ করে রইল লিলি  

ভাবছে 

' আমি এখন কি করব বুঝতে পারছি না।' ভয়ার্ত গলা লিলির 

'আচ্ছা আপনি বলেছিলেন ঘুমের মধ্যে নাকি আপনি কথা বলেন  এটা কি আপনার স্বামী জানেন ?' খানিক গম্ভীর ভাবে জানতে চাইল হাদি  

' বলতে পারব না ' এইবার সত্যি সত্যি যেন কেঁদে ফেলবে লিলি  ' আমি নিজেও জানি না কখন কি ভাবে ঘুমের মধ্যে কথা বলি  কিন্তু ছোট বেলা থেকেই আমার এই রোগ  আর ঘুমের মধ্যে যদি আমার সন্দেহের কথা বলে ফেলি আর সেটা যদি উনি শুনে ফেলেন ?   তবে খুব জলদি মারা যাব আমি  খুন করবে আমাকে আতিকুর রহমান । কিন্তু কেউ জানবে না ।

 

 

 

এখন রাত অনেক।

বাইরের হাওয়ার মতিগতি বোঝা মুস্কিল  কেমন যেন ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে পরিবেশটা  

ভয়েজ রেকর্ডার অন করে সোফায় বসল বিখ্যাত ক্রাইম এটর্নি হাদি হোসেন । হাতে গ্লাস  ভর্তি   সোনালী   অনল ।    মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিয়ে বলা শুরু করলো 

'আমি হাদি হোসেন , শহরের সবাই আমাকে চেনে  কথাগুলো বলে রাখা দরকার  আগের অংশ সব শুনেছেন আশা করছি  লিলি রহমানের কেসটা নেয়ার পনের দিনের মধ্যে উনার স্বামী আতিকুর রহমান ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্নহত্যা করলেন  সন্দেহ নেই প্রথম স্ত্রীকে হত্যার অনুশোচনা বইতে পারছিলেন না এই বুড়ো বয়সে  খুনটা উনি করেছেন ,    হতে পারে যুবতী সুন্দরী নার্স লিলিকে বিয়ে করার জন্যই  পুরুষ মানুষ কত কি করতে পারে 

আপাতত তখনও আমি  ঘটনাটা  অমন ভাবে চিন্তা করছিলাম  

আতিকুর রহমানের মৃত্যুর পর শহরের সেরা ধনী মহিলা হয়ে গেলেন লিলি রহমান    তিন একর জায়গার উপর  বিশাল  বাড়ি ছাড়াও ব্যাঙ্কের কোটি কোটি টাকা আর ব্যবসা উনার হয়ে গেল   মফস্বলে   আরও দুটো বাগানবাড়ি আর একটা হোটেলের মালিকানার কথা বলার দরকার দেখি না। বিচ্ছিরি রকমের ধনী মহিলা এখন লিলি রহমান  উনি আমার কাছেই এলেন  আইনগত  ভাবে উনি সব  পেলেন  আমিই সাহায়্য করলাম  উনি চান,  উনার ব্যবসা দেখাশোনার জন্য একজন মানুষ  একা নাকি সেইসব সামাল দিতে পারবেন না ... '

 

 

কয়েকদিন আগের কথা ।

ফাইলগুলো সুন্দর করে লিলি রহমানের হাতে তুলে দিয়ে আশ্বাস দিয়ে হাদি হোসেন বলল , ' এই টুকু আপনাকে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি বাকি জীবন... উম... আসলে বাকি জীবন না আগামী কয়েক জীবন টাকা পয়সার কোন অভাব হবে না আপনার  ফেলে ছড়িয়ে খেতে পারবেন '

ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল লিলি  ' লোকটা আমাকে সত্যি ভালবাসত  কত আজে বাজে সন্দেহ করেছি  অথচ আমার কোন ক্ষতি করেনি '

' সব এখন বাদ দিন তো '

'উনি আত্নহত্যা করতে গেলেন কেন ?' চোখ ছলছল করছে লিলির 

'অনুশোচনা , বিবেকের দংশন , মনস্তাপ , তীব্র অনুতাপ  এই রকম ব্যাপার হবে  আর কি ? শেষ জীবনে এসে প্রথম স্ত্রীকে খুন করার দায় সব সময় পীড়া দিত হয়তো  ' জবাব দিল হাদি হোসেন  

'আপনার কি মনে হয় খুনটা সে করেছে ?' ভেজা চোখে চেয়ে আছে লিলি 

' অবশ্যই , আর তো কোন কারণ দেখছি না।'

' অথচ আমি হাজার চেষ্টা করলেও প্রমাণ করতে পারতাম না।'

'আমিও না।' চিন্তিত মুখে বলল হাদি হোসেন  ' তো এখন কি করবেন ? এই বাড়ি বিক্রি করবেন অমন শুনলাম '

'আসলে বুঝতে পারছি না কি করব ' হতাশ গলা লিলির  ' আপনার কি মনে হয় ? কী করা উচিৎ এখন আমার ? কোন আইডিয়া দিতে পারেন ?'

সামনে এগিয়ে গিয়ে লিলির হাতের উপর হাত রাখল হাদি হোসেন  নরম শান্ত গলায় বলল , ' সময় নিন  সময় সব ব্যাথার ওষুধ  ভাবুন  চাইলে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন  যোগ্য ছেলের অভাব হবে না আপনার জন্য '

গভীর ভাবে একে অপরের চোখের দিকে চাইল  দুইজনে । বাইরে শিস দিয়ে উঠলো নাম না জানা একটা পাখি ।

নরনারীর আকর্ষণ , প্রাচীন আদিম এক জ্যামিতি  সূত্র নেই 

কত কথা হয়ে গেল দুজনের মধ্যে 

এক লহমায় 

 

 

আজ রাতের কথা ।  

 বাইরে হাওয়ার মতিগতি বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে ।

আরামদায়ক চেয়ারে বসে কাজ করছে হাদি  টেবিলের উপর ফাইলের   স্তূপ  । ব্যস্ত  কোটি টাকার মামলা  শাঁসালো মক্কেল 

'রাত অনেক হয়েছে, ঘুমাতে যাবে না ?' পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল লিলি রহমান  না এখন  লিলি হোসেন  ' খুব ইম্পরট্যান্ট কেস না কি ?'

'খুবই ইম্পরট্যান্ট ' চিন্তিত সুরে জবাব দিল হাদি হোসেন  ' আসল ব্যাপারটা এখন জানি  দেখি আমার মক্কেলের জন্য কি করতে পারি  বেচারা ফাঁসির দড়ির কয়েক বিঘৎ সামনে দাঁড়িয়ে আছে  যত চাইব তত টাকাই দেবে এখন  আমি ছাড়া কেউ বাঁচাতে পারবে না।'

'আমি তাহলে শুয়ে পড়ি গিয়ে ' এখন ও  জড়িয়ে আছে লিলি 

প্রসাধনী আর সেন্টের মিষ্টি সৌরভ পেল হাদি  মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো  কামনা । মানুষের প্রথম রিপু ।

'আমাদের এই রোমান্টিক মুহূর্তে ফাজিল ক্লায়েন্টের ফাইল বাগড়া দিচ্ছে  কিন্তু কাজটা শেষ করতেই হচ্ছে ' লিলির  গালে গাল ঘষতে লাগল হাদি 

'কতক্ষণ লাগবে ?' লিলির মদির কণ্ঠ 

'মিনিট পনের '

নিজেকে ছাড়িয়ে নিল মেয়েটা  'যাই বেডরুমে গিয়ে শুয়ে পড়ি  চলে এসো জলদি '

হেঁটে চলে গেল লিলি  পার্সিয়ান গোলাপ রঙা নাইট ড্রেসের ভেতরে   মাথা নষ্ট করে দেয়ার মত শরীর 

মিনিট পনেরোর  মধ্যে হাদির কাজ শেষ হল 

ধীর পায়ে চলে গেল বেডরুমে।

হালকা নীল ঘুমঘুম আলো 

লিলি ঘুমাচ্ছে বিছানায়  গা এলিয়ে দেয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়ে  সব সময়  ভাল গুণ  

পাশে এসে বসলো হাদি  ঝুঁকে পড়লো চুমু খাবে বলে  ঘুমের মধ্যে গুঙ্গিয়ে উঠলো মেয়েটা  স্বপ্ন দেখছে হয়তো  বিড়বিড় করে কি যেন বলছে  অস্পষ্ট 

 কী   মনে করে সামনে ঝুঁকে কান পাতল হাদি হোসেন । পেশায়  ক্রাইম  এটর্নি সে । অচেতন মনের প্রভাবেই করল না কৌতূহলে সেটা পরিষ্কার না ।

বিড়বিড় করছে লিলি  কিন্তু কথা এখন খানিক পরিষ্কার, 'ওষুধটা নিন ...নিন বলছি  আমার কথা শুনুন। খেয়ে ফেলুন ওষুধটা  জানি এই কিছুক্ষণ আগে খেয়েছেন  কিন্তু আজ ডাবল ডোজ নিতে হবে। আমি চাই দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন আপনি ... নিন ।ম্যাডাম শেফালী  খেলেই দারুন ঘুম আসবে ... '

ঘুমের মধ্যে কেমন একটা আক্ষেপে শরীর মোচড়াচ্ছে লিলি 

বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল হাদি হোসেনের 

দ্রুত সোজা হয়ে বসতে  যাবে ,  হাত লেগে বেড সাইড টেবিলের উপর থেকে ওদের হানিমুনের সময়ের   বাঁধাই করা ছবিটা শব্দ করে পড়ে গেল কার্পেটের উপর 

তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে তুলে ফেলল ওটা হাদি হোসেন 

শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেছে লিলির। জেগে বিছানার পাশে হাদিকে দেখে চোখ বন্ধ করে মটকা মেরে রইল 

ভয় পেয়ে গেছে  

চুপচাপ বেড়ালের চেয়েও বেশি নিঃশব্দে ঘুমের কামরা থেকে বের হয়ে গেল হাদি হোসেন 

আতঙ্কের ছায়া ওর মুখে 

আরও মিনিট দশেক  অপেক্ষা করলো লিলি  তারপর উঠে পড়লো বিছানা ছেড়ে 

 

স্টাডিরুমে ভয়েজ রেকর্ডারটা একা একাই বেজে চলছে 

 রেকর্ড করার পর হাদি আবার প্লে করেছিল নিশ্চয়ই   অথবা কোন ভাবে চাপ লেগে আবার প্রথম থেকে প্লে হচ্ছে ।

হাদির কণ্ঠস্বর  আসছে  স্পিকার থেকে  ... ' পুরো ব্যাপারটা যা বুঝলাম আমার স্ত্রী লিলি আমাকে মিথ্যা বলেছে  সবকিছু  পরিষ্কার এখন আমার কাছে । সব ।  সে নিজেই শেফালী বেগমকে অতিরিক্ত ডোজ ওষুধ দিয়ে খুন করেছে  আর আতিকুর রহমান সাহেবও আত্নহত্যা করেননি  লিলি বিষ দিয়ে খুন করেছে বেচারাকে । এই বিষ  মেডিক্যাল স্টুডেন্টরা সহজেই যোগাড় করতে পারে । অপরাধের   মোটিভ একদম ক্লিয়ার  টাকা পয়সা,  ধন সম্পদ   সব গ্রাস করার জন্য  আমার বিশ্বাস দুই দুইটা লাভ জনক  এবং  ব্যবসা সফল খুন করার পর মেয়েটা থেমে যাবে না   সংখ্যাটা তিন হবেই  চার  হতে পারে  কে বলবে ? আজ বা কাল সে যখন টের পাবে ঘুমের মধ্যে বলা  ওর কথা আমি শুনে ফেলেছি তখন আমাকে আচমকা খুন করে বসবে  সব রেকর্ড করে অনেকগুলো কপি করে আমার বক্তব্য রেখে যাব আফিসের লকারে বা আরও নানান জায়গায়  কারও হাতে পড়তে বুঝতে পারবে ...'

কামরার মাঝে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখল লিলি 

মেরুন রঙা কার্পেটের উপর চিত হয়ে পড়ে আছে হাদি হোসেন  চেয়ার গেছে উল্টে  টেবিলের উপর খাঁজকাটা দামি ক্রিস্টালের ডিক্যানটার   পানীয় ভর্তি  ছিল  এখন অর্ধেক নেই  

পাশে  পুরানো দিনের  একটা লাল টেলিফোন চুপচাপ সব দেখছে  

হাদির হাতের মুঠোয় ওল্ড ফ্যাশন গ্লাস  ওর দুই চোখ খোলা  তাকিয়ে আছে  প্রাণের চিহ্ন   নেই সেখানে   

হাদির হাতের মুঠো থেকে ওল্ড ফ্যাশন গ্লাসটা নিল লিলি। কামরার এক কোনে মিনি বার  ওখানে পিতলের বেসিন আর কল  কল ছেড়ে গ্লাস আর ক্রিস্টালের ডিক্যানটারটা ভাল করে ধুয়ে বার টাওয়েল দিয়ে  সুন্দর করে মুছে শুকিয়ে বারের আর সব গ্লাস বোতলের সাথে রেখে দিল 

ফিরে এলো টেবিলের সামনে 

ভয়েয রেকডারটা  তুলে রান্নাঘরের জ্বলন্ত চুলার উপর রেখে দাঁড়িয়ে রইল  কিছুক্ষণ ।

জ্বলন্ত পোড়া অংশটুকু  চিমটা দিয়ে তুলে বাথরুমের কমোডে ফেলে ফ্ল্যাস করে দিতেই সব হারিয়ে গেল।

যেমন যায় 

মনে মনে হিসাব কষলো 

কত যেন আছে হাদির সয় সম্পতি ?

পরিমাণটা আনন্দ দিল ওকে। 

 

বিদেশি  গল্পের ছায়া অবলম্বনে


 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...