সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

একটা সোনালী খুন

 এক

 খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে স্যার চিন্তিত ভাবে বলল ভবানী বাবু চোখ মুখ কুঁচকে  লাশটার সামনে বসে আছে সে 

খানিক দূরে দাড়িয়ে আছেন ইন্সপেকটর ইমান আলী চুনুরি    ভাল করে তাকালেন তিনি   লাশটা উবু হয়ে পরে আছে শিরদাঁড়ায় গুলির ক্ষত তিন রাউনড গুলি করা হয়েছিল রক্ত জমে শুকিয়ে আছেনীল রঙ্গা  ডুমো মাছি বিনবিন করছে চারিদিকে দূর্বা ঘাসে ভর্তি তারপরও কাচা রাস্তা আছে চলে গেছে দূরে   

 স্পট ডেড খুনি ভিকটিমের পরিচিত হতে পারে খুব কাছে চলে এসে গুলি করেছেতবে পিছন থেকে    শান্ত গলায় বললেন ইমান আলী  গুলির শব্দ কেউ শুনেছে ?

 এমনিতেই জায়গাটা নিঝুম বসতবাড়ি নেই তেমন  খানিক দূরে  একটা চায়ের দোকান আছে চা- ওয়ালা আর দুই খদ্দের শুনেছে গুলির শব্দ ওরাই স্যার পুলিশে খবর দিয়েছে

 লাশের পকেটে কিছু পাওয়া গেছে ?

 না স্যার পরিচয় নিশ্চিত করার মত  কিছুই পাওয়া যায়নি টাকা বা মোবাইল কিছু না

 খুনি ইচ্ছা করেই কাজটা করেছেতবে ছিনতাইয়ের কেস  হতে পারে  সেই সম্ভবনা বেশি 

ভাল করে আবার লাশটা দেখলেন ইমান আলী যুবক বয়স আটাশ বা ত্রিশ হবে লম্বা  হালকা  রোদে পোড়া গায়ের রঙ দাড়ি গোঁফ কামানো জামা কাপড়ের অবস্থা ভাল  হলুদ নীল রঙের চেকের শার্ট আর প্রায় নতুন জিন্সের প্যান্ট পরনের  দামি জুতা    মাথা ভর্তি চুল যত্ন নিত এখন পথের ধারের কাঁদা লেপটে আছে জীবনের  কি বিচ্ছিরি অপচয় 

 লাশ মর্গে নেয়ার ব্যবস্থা  করুন দুই একদিনের মধ্যেই আশা করছি কোন মিসিং কমপ্লেইন পাব  কথা হল ভিকটিম এত নির্জন জায়গায় কেন এসেছিল ? কারও সাথে দেখা করতে ? চায়ের  দোকানে বসতে পারত  এই সুনসান জায়গায় কেন ?

 চায়ের দোকানদারকে জিজ্ঞেস করেছি ইশটিশন থেকে হেঁটে আসার সময়   দেখেছিল  লোকটাকে পিঠে একটা ব্যাগ ছিল তবে  এলাকার ছেলে না

 ভাল কথা,  লাশের পাশেই মোটর সাইকেলের চাকার দাগ খানিক থেমেছে চাকার দাগ তারপর চলে গেছে   খুনি  মোটর সাইকেলে করে এসে খুন করে গায়েব হয়ে গেছে

সহমত প্রকাশ করতে গিয়ে মাথা ঝাঁকাল ভবানী বাবু  

দূরে কয়েকজন দাড়িয়ে তামাশা দেখছিল তাদের দিকে ফিরে তাকালেন ইমান আলী  চায়ের দোকানদার কে ?

 জে স্যার আমি সামনে এগিয়ে এলো বুড়ো মত একজন ছাপা রঙিন জামা আর লুঙ্গি পড়নের গলায় ময়লা গামছা শেষ কবে ওটা সাবান জলে ডোবানো হয়েছিল কেউ বলতে পারবে না বরং গরম জলে গামছাটা কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখলে আরেক পেয়ালা চা হয়ে যাবে 

 নাম ? গম্ভীর গলায় জানতে চাইলেন ইমান আলী

 ফজলু টি স্টল হাসি মুখে জবাব দিল লোকটা

 দোকানের নাম কে জিজ্ঞেস করলো ? বিরক্ত হলেন ইমান আলী  আপনার নাম 

 দুকান যেহেতু আমার কাজেই আমার নাম ফজলু আরও বেশি দাঁত বের করে বলল 

এই লোকটাকে আসতে দেখেছিলেন ?

জে

  সাথে কেউ ছিল ?

 নাহ একলা

 পিঠে কি রকম ব্যাগ ?

 ইস্কুলের পোলাপাইনেরা জেমুন ব্যাগ নেয় তয় মাল সামান তেমুন আছিল না 

 এত কিছু খেয়াল করেন কেমন করে ? অবাক হলেন ইমান আলী

 সারাদিন দুকানে বইয়া থাকি  কাস্টমার না থাকলে মানুষ দেখিহের লাইজ্ঞা

  মটর সাইকেলে  করে কাউকে আসতে দেখেছেন ?

জে না

 লোকটার হাবভাব কেমন ছিল ? চিন্তিত ? খুশি , গম্ভীর ?

 মনে হয় টেনশনে আছিলঠিক জানি না পেসাব ধরলেও মানুষের চেহারা অমন দেহায় 

ইমান আলী বিরক্ত হলেন

 ঘটনাটা আর কেউ দেখেছে ?    জানতে চাইলেন তিনি

 নাহ স্যার আর এক সাধু ছিল বেচারা চোখ বন্ধ করে ধ্যান করছিল কিছুই দেখেনি বলল  ভবানী বাবু

 গুলির শব্দে চোখ মেলে দেখেনি ? অবাক হলেন ইমান আলী

 না স্যার বার বার নিজেকে অটোসাজেশন দিচ্ছিল-  যত শব্দ শুনবে ততই ধ্যানের গভীরে তলিয়ে যাবে আমরা ওকে লাঠির গুঁতা দিয়ে জাগিয়েছি

আরও খানিক কথা বলে হতাশ হলেন  তিনি   নাহ এই  এলাকার মানুষগুলো বেকুব সবার সাথে কথা বলেও  তেমন কোন নতুন তথ্য পাওয়া গেল না 

ক্রাইম সিনের প্রত্যেকটা  ইঞ্চি   তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন কিছু পাওয়া গেল না 

  দুই   

থানার ভেতরে বসে আছেন ইমান আলী জানালা দিয়ে বাইরের কাঠবাদাম গাছগুলোর  পাতা দেখছিলেন দেখার মত জিনিসই বটে কয়েকটা পাতা তামার মত লাল কাঠ বাদামের মউসুম কোনটা ? ফলগুলো দারুন লাগে কেমন ক্রিকেট বলের মত ভেতরে গয়নার বাক্সের মত লাল ভেলভেট ওখানে ঘন  কালো  মেঘের মত রঙের  বাদামগুলো গুঁটিশুটি হয়ে ঘুমিয়ে থাকে   

কাঠের   বাদুর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল ভাবনী প্রাসাদ

স্যার,   ভিকটিমের পরিচয় পাওয়া গেছে লাশ  দেখে ভিকটিমের বাপ মা  শনাক্ত করেছে    যুবকের নাম  বদরুল হাসান পেশায় ব্যবসায়ী   

 কিসের ব্যবসা করতো ? হাতের ফাইল ঝপাং করে বন্ধ করে জানতে চাইলেন ইমান আলী 

 ইয়ে , সেটা নাকি বাপ মা জানে না বিব্রত হল ভবানী বাবু

  সেকি !    বাপ মা জানলো কি করে আমরা লাশ পেয়েছি ?

 স্যার উনারা এসেছিলেন মিসিং কমপ্লেইন করতে  ছেলে চারদিন ধরে গায়েব ছেলের ছবি দেখাতেই আমি চিনলাম তারপর মর্গে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেছে  

 আচ্ছা  চলুন, কথা বলা যাক মাথা ঝাঁকালেন ইমান আলী     

বাইরে খটখটে কয়েকটা চেয়ার টেবিল  একজন কনস্টেবল  কালো কুচকুচে ফোন ধরে অপর প্রান্তের  কাকে যেন ধমক দিচ্ছে কাজের বুয়া চুরি করে মাল সামাল নিয়ে ভেগে গেছে অমন  রিপোর্ট দিচ্ছে টাক মাথার  এক ভদ্রলোক  লিখে নিচ্ছে এক কনস্টেবল খানিক দূরে টুল বেঞ্চিতে বসে আছে এক জোড়া দম্পতি চেহারায় শোকের ছাপ দেখেই বুঝা যাচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শোক নিয়ে বেঁচে আছে ওরা মাথা নিচু ভদ্রমহিলা চোখ মুছছে খানিক পরপর এত কিছুর পরও ইমান আলীকে দেখে উঠে দাঁড়ালো ভদ্রলোক

 বসুন অস্থির হবেন না সমবেদনার সুরে বললেন ইমান আলী  আপনাদের মনের  অবস্থা  বুঝতে পারছি তারপরও কিছু রুটিন প্রশ্ন আছে বুঝতেই পারছেন এটা একটা মার্ডার কেস 

চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন ইমান আলী সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক আর মহিলাকে জরিপ করতে লাগলেন শোকের সাগরে ভাসছে এরা জামা কাপড়ের অবস্থা ভাল গরীব ঘরের না সুখী জীবন কাটিয়েছে হয়তো কে জানে

 আমি  মইনুল হাসান অবসর প্রাপ্ত চাকুরিজীবী উনি আমার গিন্নিবদরুল আমাদের একমাত্র ছেলে কথা শেষ করেই কেঁদে ফেললেন ভদ্রলোক সাথে সাথে উনার মিসেস  

খানিক সময় চুপ করে বসে রইলেন ইমান আলী নরম গলায় বললেন,   আপনার ছেলে  কি করতো জানেন ? মানে পেশায় ?

 ব্যবসা করতো  রুমালে চোখ মুছতে মুছতে বললেন মইনুল সাহেব

 কিসের ব্যবসা ?

 ঠিক জানি না  

 কি ভাবে সম্ভবত সেটা ? বোকা বোকা গলায় বললেন ইমান আলী  ছেলে ব্যবসা করে কিন্তু কিসের ব্যবসা করে বাপ মা জানে না অবাক হলাম 

 আসলে ছেলেটা নিজেকে অনেক গুঁটিয়ে রাখতো ছোট বেলা থেকেই   খুব বেশি কথা কারও সাথেই বলতো না বন্ধু বান্ধব ছিল না কখনই কাজের সেই অর্থে কিছুই জানতাম না আমরা একদম চুপচাপ

 কবে থেকে ব্যবসা শুরু করে ?

 মাত্র দুই বছর এর আগে বলতে গেলে বেকারই ছিল 

 আটাশ ত্রিশ বছরের একটা ছেলে এতদিন ধরে বেকার

 কাজ করতে চাইত না অলস ঠিক না তবে  খেয়ালি মুডি বলতে পারেন  

 একদম বেকার ?

 বলতে পারেন

 তারপর হঠাৎ ব্যবসা  করা শুরু করলও

 হ্যাঁআমি রিটায়ার্ড করার ঠিক  বছর তিনেক পর তত দিনে পেনশনের টাকায় চলতাম কষ্ট হত কিন্তু কি করা  

 সংসার খরচ দিত নিশ্চয়ই

 হ্যাঁ,  নইলে চলব কি করে ?

 উপার্জন কেমন করতো ?

 খুবই ভাল দরাজ হাতে খরচ দিত আমাদের জন্য ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছে এর মধ্যেই  

 খারাপ কি কাজই করতো না শুরু করা মাত্র দুই বছরের মধ্যে ফ্ল্যাট কিনে ফেলছে নিশ্চয়ই দুই নাম্বার কোন ধান্ধা শুরু করেছিল আর সেই সুত্রেই খুন 

 প্রমাণ ছাড়া বাজে কথা বলবেন না এই প্রথম কথা বললেন  ভদ্রমহিলা  শোক মুছে গেছে চেহারা থেকে রাগের প্রলেপ 

 আমাদের পেশাটাই অমন শান্ত গলায় বললেন ইমান আলী  মাঝে মাঝে রদ্দি কথাও বলতে হয় তাও বলতাম না যদি নিজেরাই ছেলের পেশার ব্যাপারে সঠিক তথ্য দিতে পারতেন দুই বছরের কামাই দিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছে এবং দরাজ হাতে খরচ করতো হঠাৎ খুন হয়ে গেল সবই হয়তো আমার নোংরা কল্পনা হতে পারে শুধু ছিনতাইয়ের কেস তারপরও আপনার ছেলের ব্যাক  গ্রাউনড একটু খোঁজ করতে হবে বাসার ঠিকানা দিয়ে যান পোস্ট মরটেমের রিপোর্ট পেলেই  কাল লাশ নিয়ে যেতে  পারবেনআপনাদের ফোন  নাম্বার দিয়ে যাবেন , আরও খোঁজ খবরের জন্য ফোন দেয়া হবে আরেকটা কাজ করতে হবে আপনার ছেলের মোবাইল নাম্বারটা দিতে হবে  ওটা আমরা পাইনি নাম্বার পেলেই কললিস্ট চেক করে দেখতে পারব  কি ধরনের লোকের সাথে ওর কথাবার্তা হত বা যোগাযোগ ছিল    

 তিন 

কামরার ভেতরে  ভবানী বাবু  ঢুকতেই মুখ তুলে তাকালেন  ইমান আলী।।

 রিপোর্ট কি বলল ? চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে  জানতে চাইলেন 

   লাশের ক্ষত   দেখে যা ভেবেছিলাম   স্যার তাই হয়েছে  বিদেশি মাল না দেশি হাতুরি   ভাড়াটে খুনির কাজ 

 লিচুর দানা কোথায় ? হাত বাড়িয়ে দিলেন ইমান আলী   

 এই যে স্যার এয়ারটাইট পিচ্চি প্ল্যাস্টিকের ব্যাগটা সামনে বাড়িয়ে দিল ভবানী বাবু 

ব্যাগের ভেতরে  থেবড়ে যাওয়া তিনটে সীসের টুকরো কালচে ময়লা  

 হাতে বানানমন্তব্য করলেন ইমান আলী

 উপায় কি স্যার ঠিক যেই ভাবে পিস্তল বানায় সেই রকম লিচুর দানাও বানায় খরচ তেমন পড়ে না

 এলাকায় স্থানীয় ভাড়াটে খুনি কয়জন আছে ? লোকেশন

 বেশির ভাগ ইনডিয়া বা দুবাই ভেগে গেছে স্যার এলাকায় দুইজন আছে থানায় ধরে এনে রাম ডলা দিয়েছি সবার এক কথা    এই বদরুলের খুনের   সাথে  ওদের কোন হাত নেই কারও কাছ থেকে পিজ্জার অর্ডার ( খুনের বায়না ) পায়নি বা পরিচিত কেউ পিজ্জা ডেলেভারির কাজ হাতে নেয়নি

 হুম চিন্তিত ভঙ্গিতে সীসার টুকরো তিনটে  নাড়াচাড়া করতে করতে কি যেন ভাবছিলেন ইমান আলী  আমরা বরং গণেশ দাসের কাছে  গিয়ে সামান্য খেজুরে আলাপ পেরে আসি   এই ব্যাপারে ওর চেয়ে আর ভাল কেউ নেই মাষ্টার বলা যায়

নিঃশব্দ হাসি ফুটে উঠল ভবানী বাবুর মুখে 

কারাগারের ঠাণ্ডা মেঝের মরা তিমি মাছের মত পরে ছিল গণেশ দাস একটা মানুষ এত মোটা হতে পারে দেখলে বিশ্বাস হয় না ঠিক যেন তরমুজের উপর কদবেল বসিয়ে রাখা হয়েছে গলাটা থলথলে চেহারাটা  কোলকাতার গায়ক বাপ্পি লাহিড়ী   আর ডাইনোসরের    মিশ্রণ শান্ত চেহারায় কোন ভাব নেই

 জেলে আছে আজ বছর চারেক কোন চিন্তা নেই টেনশন নেই জেলখানায় আর  সব কয়েদীদের  মত কাজ করে বাকি সময় পরে পরে ঘুমায় ভাল ব্যবহারের জন্য খুব জলদি  বের হয়ে যাবে হাজত থেকে কাজেই বেশ সহজ একটা ছন্দে জীবন পাড় করছে গণেশ কেউ দেখা করতে আসে না নিজেও কারও জন্য হা পিত্যেশ করে না বয়স সাতচল্লিশ গায়ের রঙ আলকাতরার মত সারাক্ষণ ঘামে গরমে শরীর ঘামাচিতে ভরে যায়   বা বগলের নিচে ফোঁড়া হয়    ছাড়া জীবনের প্রতি কোন অভিযোগ নেই বেচারার

ঘটাং করে লোহার গেইট খুলে যেতেই অনেক কষ্টে ঘাড় তুলে তাকাল গণেশ অবিশ্বাস্য গতিতে তড়াৎ করে উঠে বসলো বিশ্বাস করা কঠিন  মোটা একটা মানুষ এত  দ্রুত নড়তে চড়তে পারে ! দেখার মত দৃশ্যইমান আলী আর ভবানী বাবুকে দেখে  হাসি ফুটল মুখে  সালাম সাহেবগরিবের কথা অনেক দিন পর মনে করলেন    

সেলের ভেতরে এসে দাঁড়ালেন ইমান আলী আর ভবানী বাবু একজন কনস্টেবল একটা  কাঠখোট্টা চেয়ার এনে দিতেই আয়েস করে বসে পড়লেন ইমান আলী  হাসি মুখে বললেন-   গল্পস্বল্প করার জন্য এলাম আছ কেমন ? 

 গরিবের আর থাকা  আরও বেশি হাসল গণেশ দাস 

পঞ্চবটীর কাছাকাছি লেদ মেশিনের দোকান ছিল গণেশের আশির দশকে একজন সৎ মেকানিক হিসাবে জীবন শুরু করছিল সে  হাতের কাজ ভাল থাকায় নাম করে ফেলে দ্রুত যে কোন দামি মেশিনের রেপ্লিকা বানিয়ে ফেলতে পারতো 

কদর ছিল 

নব্বইয়ের শুরুতে  চায়না থেকে সস্তা মোটর পার্টস আসতে থাকে বাংলাদেশে তখন ব্যবসা বেশ ঢিমে তালে  চলা শুরু করে এইদিকে  মাশরুমের মত   প্রচুর লেদ মেশিনের দোকান গজিয়ে উঠেছিল ততদিনে মধ্য বয়স্ক কোন লোক আর্থিক সংকটে পড়লে মাথা ঠিক থাকে না  সামান্য  এক  টুকরো  পাইপ আর বাতিল  স্প্রিং দিয়ে পাইপ গান বানিয়ে ফেলে সে মহল্লার এক ছিঁচকে মাস্তানের কাছে দুই হাজার টাকায় বিক্রি করে ফেলে পাইপ গানটা  রাজনৈতিক কোন নেতার সুনজরে না পড়ায় ছিঁচকে মাস্তানের হাতে কোন অস্ত্র ছিল না গণেশের পাইপ গান পেয়ে খুশি হয় নিজের পেশায় ব্যবহার শুরু করে দিন হিসাবে ভাড়া দিত পাইপ গানটা 

কয়েক দিনের মধ্যে আরও অমন যন্ত্রের  অর্ডার পেয়ে যায় নানান জায়গা থেকে অবাক হয় গণেশ মাত্র  আধা  ঘণ্টার খাটুনি লোহা লাগে কম বাতিল স্প্রিং  সের দরে কেনা যায় অথচ গরম গরম টাকা পুরো মেধা ঢেলে কাজ শুরু করে পকেট গরম করতে লাগল 

এলাকার একটা জমি দখল নিয়ে দুই গ্রুপ মস্তানদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার পর একটা লাশ পড়তেই গণেশের প্রতিভার ব্যাপারে পুলিশ জেনে ফেলে   খণ্ডকালীন একটা সফরে জেলের ভেতরে যেতে হয় গণেশকে খণ্ডকালীন এইজন্য যে তিনদিনের দিন ওকে জেল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায় এলাকার এক রাজনৈতিক  নেতা স্নেহ মাখা গলায় নেতা বলেন- শুধু পাইপ আর স্প্রিং দিয়ে কত আর ভাল কাজ করবি এই নে বিদেশী একটা হাতুড়ি দিলাম  তোর  ওয়ার্কশপে বসে অমন একটা বানাতে পারবি না ?

পিস্তলটা নিয়ে ফেরত আসে গণেশ টুকরো টুকরো করে জিনিসটা দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারপর কাজে হাত দেয় দুই  সপ্তাহের  মধ্যে  নিজের তৈরি হাতুড়ি নিয়ে ফিরে যায় নেতার কাছে গ্রিয  মাখিয়ে কয়েক রাউনড  ফাঁকা গুলি ছুঁড়েন নেতা পিঠ চাপড়ে প্রশংসা করেন আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি গণেশের  এইসব লাইনে যা হয় 

টানা দশ বছর শিল্পকর্ম চালিয়ে  আণ্ডারওয়ার্ল্ডের কিংবদন্তী বনে যায় গণেশ সব কিছুর  শেষ  আছে যে নেতার ছত্রছায়ায় কাজ করছিল,    বেচারা খুন হয়ে যায় প্রতিপক্ষের হাতে রাতারাতি পরিস্থিতি বদলে যায় ধরা পড়ে লম্বা সময়ের জন্য ছুটি কাটাতে গরাদের ভেতরে চলে আসে গণেশ 

গণেশের কাজের নমুনা দেখ অবাক হয়েছিলেন ইমান আলী চোখে চোখে রাখতেন তিনি  গণেশের ফাইল  আগেও কয়েক বার কথা বলেছেন আজ আবার 

 লিচুর দানা দেখে কিছু বলতে পারবে ? প্ল্যাস্টিকের ব্যাগটা সামনে এগিয়ে দিলেন ইমান আলী

আগ্রহের সাথে জিনিসটা হাতে তুলে নিল গণেশ চেহারায় কোন ভাব নেই কিন্তু চকচক করে উঠছে দুই চোখ মানুষের চরিত্র বড় বিচিত্র - ভাবলেন ইমান আলী   জিপার খুলে  তোবড়ান সীসের টুকরো তিনটে হাতে তালুতে  নিয়ে ওজন করার ভঙ্গিতে নাড়লো একটু   তর্জনী আর বুড়ো আঙুলে চাপ দিল রাস্তা ঘাটে আঙুর কেনার সময় অনেকে অমন করে

 সীসে গলিয়ে  ছাঁচে ফেলে বানান স্যার রায় দিল গণেশ  সহজ কাজপরে শিরিষ কাগজ দিয়ে ঘষে নিলেই হয়ে গেল দেশী হাতুড়ি মানে পিস্তলের জন্য দারুন জিনিস

 ভাড়াটে খুনি ?

 আর কারা করবে ?  মফস্বলের খুনি লাইনে নতুন নইলে নিয়োগকর্তা নিজেই হাতুড়ি  সাপ্লাই দিত অথবা খুনি নিজেই  ভাড়ায় যন্ত্র নিত নতুন নেমেছে মাঠে তাই কেউ হয়তো বিদেশী মাল ভাড়া দেয়নি রাজনৈতিক  অপরাধী না ওদের  নেতারাই বিদেশি  খেলনা  দেয়  

 কি ভাবে সামনে যাওয়া যায় ?  কৌতুক মাখা গলায় প্রশ্ন করলেন ইমান আলী 

 শহরে করিম বক্স নামে এক ভদ্রলোক আছেন বাঁকা হাসি হেসে বলল গণেশ  উনার পিচ্চি কারখানায় লোহার গ্রিল, আলমারি এই সব বানিয়ে বিক্রি করেন উনাকে ধরে একটু শিরিষ কাগজ দিয়ে ঘষা দিলেই সব খবর পাবেন  

চার

রাত নয়টায় করিম বক্সের কারখানা বন্ধ হয় 

এই সময়টা তিনি একা থাকেন হিসাব মিলিয়ে অনেক সময় ধরে টাকা গুনেন তারপর খানিকটা  মদ্যপান করেন এই সময় কাগজি লেবু  আর লানাচুর হলে ভাল হয় না হলেও চলে তবে এই সময় মেহমান পছন্দ করেন না 

আজ মাত্র চানাচুরের প্যাকেট খুলেছেন অমনি  টিনের  দরজায় নক পড়লো   বিরক্ত হয়ে হাক দিলেন তিনি,  কে রে ? 

বাটুল ধরনের এক লোক উঁকি দিল দরজার ফাঁক দিয়ে মাথায় বাবরি চুল চোখদুটো নিরীহ চেহারা দেখলে মনে হয় চায়ের কাপে বিস্কুট ডুবিয়ে খেতে পারে না 

 কি চাই ? বিরক্ত হয়ে বললেন করিম বক্স

 ভাই লিচুর দানা দরকার ছিল তেলতেল একটা হাসি দিয়ে বলল লোকটা

 ইয়ার্কি মারেন মিয়া  খেঁকিয়ে উঠলেন করিম বক্স  এটা কি লিচুর সিজন ? আম, জাম , কাঁঠাল, লিচু এইসব হল মধুমাসের মধু ফল বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসের জিনিস  আর আপনি এই কাত্তিক মাসে লিচুর দানা খোঁজেন তারচেয়ে বড় কথা লিচুর দানা কি কেউ জমিয়ে রাখে যে চাহিবা মাত্র দিতে বাধ্য থাকিব অ্যাঁ ?

 রাগ করবেন না ভাই আরও নরম সুরে বলল লোকটা  লাইনে নতুন পিজ্জা ডেলেভারি ম্যান নাম শুনে এসেছিহাতুড়ি ভাল পেলেও কিনব   

 নাম কোঁথায় শুনেছেন ? সতর্ক গলায় জানতে চাইল করিম বক্স

 গাল কাঁটা সিধুর কাছে 

 ওকে পেলেন কোথায় ?

   হালকা   একটা ছিনতাই করতে গিয়ে ধরা পরে শিকের দরজার ওপাশে গিয়েছিলাম এক সপ্তাহ হাওয়া খাওয়ার সময় গাল কাঁটা সিধু আর লেংরা লতিফের সাথে পরিচয় হয়েছিল উনারা বস মানুষ আপনার খুব নাম করল ভাবলাম দেখা করে যাই

 টাকা এনেছেন ?

 আরে এইসব কি আর ক্রেডিট কার্ডে কিনব নাকি ? খ্যাক খ্যাক করে হাসল লোকটা

 নাম ?

  মাখনলাল পনির

উঠে  দাঁড়ালেন করিম বক্স টিনের দরজা ভাল করে বন্ধ করে দিলেন ভেতর থেকে তার আগে গালাপাগস দ্বীপের কচ্ছপের মত গলা বের করে কারখানার বাইরের চারদিকটা সতর্ক চোখে দেখে নিলেন 

 চলুন বলেই হাঁটা ধরলেন 

পিছন পিছন লিচুর দানার  ক্রেতা,   পিজ্জা ডেলেভারি পেশায়  নবাগত  কামরার বাইরে কারখানার জমি লোহার টুকরো, কাঁটা টিন রড আর পোড়া ওয়েল্ডিঙের  লোহা মেশান ছাই পড়ে আছে শেষ মাথায় বাথরুম বাথরুমের দরজা খুলতেই দম বন্ধ হবার দশা  মাখনলালের  বাথরুমের ভেতরে  কমোড নেই বদলে দুই ইট দিয়ে দারুন একটা কায়দা করে কি সব বানান হয়েছে ওর উপর বসে ইয়ে করতে হয় 

বাথরুমের ভেতরের দরজা ঠেলা দিতেই খুলে গেল, ভেতরে আধো অন্ধকার  কামরা কোথায় সুইচ আছে করিমবক্স জানে চাপ দিতেই পচা ডালের রঙের আলো জ্বলে উঠলো খালি একটা রুম কাঠের একটা টেবিলের উপর ভাইস টাইপের যন্ত্র ফিট করা গ্রিজ আর তেলের ঘ্রান কোনায় এক কাঠের বাক্স খুলে ভেতর থেকে তেলতেলে  ন্যাকড়া প্যাঁচানো জিনিসগুলো বের করলো করিমবক্স  চটের এক ব্যাগ ভর্তি বুলেট আকৃতি সীসের টুকরো 

 ভাল হাতুড়ি আছে কেনিয়ার জঙ্গলের ভেতরে গোপনে  সন্ত্রাসীরা অমন জিনিস  বানায় সুদানের ডাকাতদল আর  সোমালিয়ার জলদস্যুদের কাছে ব্যাপক চাহিদা আছে হুবহু একই জিনিস, নাহ বলা ভুল হল এর চেয়ে পাঁচশোগুন ভাল জিনিস আমি বানিয়েছি পাঁচতলা ছাদের উপর থেকে মারবেন ভিড়ের মধ্যে আবুল মরে যাবে কি হয়েছে বুঝার আগেই হাপিস হয়ে যাবেন আপনি

এক ডজন বিভিন্ন আকারের পিস্তল টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখল করিম বক্স 

মুগ্ধ চোখে জিনিসগুলো নেড়ে চেড়ে দেখল মাখনলাল পনির 

 আপনার হাতে জাদু আছে রে ভাই খুশি খুশি গলায় বলল ক্রেতা 

 সাধে কি আর গাল কাঁটা সিধু প্রশংসা করে ?

 সব নিলে ডিসকাউন্ত দেবেন না ?

 কয়  হালি  পিজ্জার  অর্ডার পেয়েছেন ? নাকি আবাসিক এলাকায় ডাকাতি করবেন ?

 নাহ, ছোট একটা গ্যাং খোলার ইচ্ছা আছে তাই চলুন না অন্য কোথায় বসে দাম নিয়ে আলোচনা করি 

 কোথায় বসবেন ?

 থানার ভেতরে 

চমকে করিম বক্স  আবিস্কার করলেন কোন এক জাদুর মত মাখনলালের হাতে বিচ্ছিরি পিস্তল দেখা যাচ্ছে ওর নিজের বানান না পুলিশরা অমন জিনিস ব্যবহার করে

 কে ভাই আপনি ? ঢোক গিলে বললেন পিস্তলের কারিগর

 ভাবনী প্রসাদ ভবঘুরে চলুন আপনাকে  এই সিজনেও মধুমাসের মধু ফল খাওয়াব     

পাঁচ 

থানার  মেঝেতে  চিত  হয়ে পরে আছে করিম বক্স মনে হতে পারে শবাসন করছেন একটা চোখ  কালচে   পুরানো দিনের  জলদস্যুরা যেমন চোখের পট্টি দিত তেমন  ছাড়া অন্য  কোন সমস্যা নেই খালি গা

সেলের ভেতরে ইমান আলী আর ভবানী ঢুকতেই আবার এক কিস্তি মারধর খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন পিস্তলের কারিগর 

 তারপর ? কেমন বোধ করছেন ? মিহি গলায়  জানতে চাইলেন ইমান আলী

 সবই আপনাদের দোয়া   আপনারা  আছেন বলেই না আমরা আছি স্যার আপনার বাসায় একটা রলেক্স ঘড়ি আর লাখ দশেক  টাকা পাঠিয়ে দিলে চলবে  না ?  বড় বড় সমস্যা ছোট অবস্থায় সমাধান করলে ভাল কথায়  বলে না কাঁচায় না  নোয়ালে বাঁশ পাকলে করে ঠাস ঠাস  হাসি মুখে বললেন করিম বক্স

 আমি সূর্য ঘড়ি আর বালি  ঘড়ি ব্যবহার করি  দামি ঘড়ি লাগবে না   অমায়িক ভাবে বললেন ইমান আলী  আগে আমার কিছু তথ্য দরকার তারপর আপনার দশ লক্ষ টাকা নিয়ে ভাবা যাবে

 জি স্যার এটা তো তথ্য প্রযুক্তির যুগ কবি নিজেই বলে গেছেন যুক্ত কর হে সবার সঙ্গে মুক্ত কর হে বন্ধ মানে ইন্টারনেটের কথা  বলেছেন উনি  বলুন স্যার কোন তথ্য দিয়ে আপনার খে্দমত করতে পারি  খুশি খুশি গলায় বললেন করিম বক্স আশার আলো দেখতে পাচ্ছে  

  দেশি হাতুরি তোমার এলাকায় আর কে কে বানায় ?

 আমি একাই স্যার আমরা কারিগররা এলাকা ভাগ করে নিই  নিজেদের এলাকায় খেলনা  বিক্রি করি বা রেফারেন্স দিলে   দূরে  পাঠাই   আর আজকাল বিদেশি অস্ত্র এত আসে যে আমাদের বাজার আগের মত নেই নেতারা বিদেশি অস্ত্র এনে নিজের কর্মীদের দেয় সস্তা  অপরাধীরা আমাদের কাছে আসে বা হঠাৎ যন্ত্র দরকার পড়লে আমাদের কাছে যায়      আমরা কুটীর শিল্পের মত টিকে আছি সরকারের উচিত আমাদের  পৃষ্ঠপোষকতা করা বিদেশি জিনিস কিনলে দেশের টাকা বাইরে চলে যায়  স্যার  

 গত তিন মাসে কার কার কাছে হাতুরি বিক্রি করেছ সবার তালিকা দিতে পারবে ?

 স্যার রিসিট বা ক্যাশ মেম দিয়ে তো মাল বিক্রি করি নাসবার নাম ...  

 আরেকটা চোখে ঘুষি মারব না ডিম সেদ্ধ পিছন দিয়ে ভরলে...

 স্যার সবার কথাই মনে আছে আমার ব্রেইন চাচা চৌধুরীর মত অংকে একবার আশি পেয়েছিলাম চৌবাচ্চা আর পিতাপুত্রের বয়সের মিলঝুলের অঙ্ক দুটো পারিনি  নইলে একশোতে  হানড্রেট পেতাম বিলকুল  কাগজ কলম দিন সবার নাম আর ঠিকানা  দিচ্ছি আশা করি পেয়ে যাবেন কারন কবি  বলেছেন- আইনের হাত গালিভারের হাতের মত লম্বা  

 ছয়

অফিসে বসে ফাইল দেখছন ইমান আলী একগাদা কাগজ হাতে ভেতরে ঢুকল  ভবানী বাবু

 কাজ  কতদূর ? ভুরু নাচিয়ে  জানতে চাইলেন ইমান আলী 

 অনেক দূর স্যার প্রফুল্ল চিত্তে জবাব দিল ভবানী বাবু  করিম বক্স তার  খদ্দেরের তালিকা দিয়েছে তিন মাসে মোট  ষোল জনের কাছে  খেলনা বিক্রি করেছে প্রায় সবাই পুরানো চাল ( পুরানো অপরাধী )  ওদের ধরার আয়োজন করা হচ্ছে শহর ছেড়ে  একটাও পালায়নি মনে হয় না  পুরানো চালদের কেউ এই খুনটা করেছে  খেলনা   ক্রেতাদের মধ্যে     তিনজনের আগের কোন রেকর্ড নেই  একদম  নতুন  এই তিনজন আমাদের সাস্পে দুইজনকে ধরেছি  একজন প্রেমে ব্যর্থ হয়ে প্রেমিকাকে খুন করবে সেইজন্য কিনেছে ব্যর্থ প্রেমিককে  নিয়ে দুই ঘণ্টা  একান্তে সময় কাটিয়েছি স্যার সাথে গজারি কাঠের ডাণ্ডা ছিল একটা প্রেমিক ঠিক হয়ে গেছে  প্রাক্তন প্রেমিকার ছায়াও ছুঁয়ে দেখবে না জীবনে দ্বিতীয়

জনকে পেয়েছি গজারি ব্যবহারের পর   জানিয়েছে   প্রতিবেশী ভদ্রলোক রোজ পান খেয়ে তার দেয়ালে পিক ফেলে তাই ভয় দেখানোর জন্য পিস্তল কিনেছে করিম বক্সের কাছেএই দুইজনের পিস্তল চেক করেছি ব্যবহার করা হয়নি   

  তৃতীয় জন ?

 ওটাকে ধরতে পারিনি নাম সিকান্দার বাগদাদি এটাকেই সন্দেহ করছি  ঠিকানা মত গিয়ে কোন ট্রেস পাইনি গায়েব হয়ে গেছে 

 সিকান্দার বাগদাদি আমাদের মুরগি হতে পারে ?

 আমিও তাই ভাবছি স্যার 

  বদরুল হাসানের ফোন নাম্বার দিয়ে কল লিস্ট বের করেছেন ?

 হ্যাঁ স্যার  কাগজগুলো টেবিলের উপর রাখল ভবানী প্রাসাদ  খুব অদ্ভুত হলেও সত্য খুব বেশি লোকের সাথে যোগাযোগ ছিল না   খুব বেশি কল করতো না বা আসতো না

 অন্য কোন ভাবে পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ করতো ? আজকাল তো  কত রকমের  সোশ্যাল মিডিয়া আছে

 না স্যার কিছুই ব্যবহার করতো না আমরা খোঁজ নিয়েছি ইমেইল পর্যন্ত  নেই এই যুগেও    তবে  কল লিস্টে  যারাই ছিল নিয়মিত কল হত কিন্তু নিয়মিত মানে রোজ না মাসে মাসে কল করার মধ্যে হালকা একটা প্যাটান আছে আর 

 সবার কাছ থেকে একটা মাত্র মেসেজ এসেছে মেসেজটা হল- পাঁপড় ভাঁজা দরকার   সন্দেহ  আরও বাড়ে যখন দেখি  নিহত  বদরুল হাসানের সাথে যাদের যোগাযোগ ছিল তারা সবাই একটা পেশার সাথে জড়িত 

 কি সেটা ?

 সবাই স্বর্ণ  ব্যবসায়ী  !

 অদ্ভুত তো !    চোরাই স্বর্ণের ব্যবসা করতো আমাদের   বদরুল  ?  সেই সুত্রে  গোল্ড মাফিয়াদের সাথে টক্কর ?

 অসম্ভব কি ?  লিস্ট দেখে ছয় জন  বিখ্যাত স্বর্ণ  ব্যবসায়ীর নাম পেয়েছি  

 ওদের প্রত্যেকের সাথে কথা  বলতে হবে একটা না একটা সূত্র পেয়ে যাববদরুল হাসানের বাড়ির উপর নজর রেখেছেন ?

 হ্যাঁ স্যার কিন্তু কোন কিছু হাতে আসছে না মানে সন্দেহজনক  এখন কি করব স্যার ?

 ভগবান যদি চা   আনে   চা খেয়েই  প্রথমে    নিপণ জুয়েলারসে যাব লিস্টের সব  স্বর্ণ ব্যবসায়ী সাথে কথা বলব এক এক করে

 ভগবান  চা আনবে মানে ?  চমকে গেল ভবানী বাবু 

একজন কনস্টেবল দুটো ফাটা কাপ আর কনডেন্স মিল্কের টিনের এক কৌটা ভর্তি চা নিয়ে ভেতরে ঢুকল কৌটার মুখে বাসি খবরের কাগজ দিয়ে  মুড়ে দিয়েছে চা-অয়ালা যাতে চা গরম থাকে 

  এই তো ভগবান এসে গেছে উনি নতুন কনস্টেবল ভগবান পোদ্দার অতিশয় ভদ্রলোক পরিচয়  করিয়ে  দিলেন  ইমান আলী 

সাত 

বদরুলের  ছবিটা মাত্র এক পলক দেখেই  ফেরত দিলেন  হক মাওলা  জুয়েলারসের   মালিক  নিতাই মহলানবীশ    

 না স্যার চিনি না লোকটাকে জীবনেও দেখেনি  মাথা নাড়লেন তিনি বিষণ্ণ মুখে 

 আপনি নিশ্চিত ? গভীর  ভাবে নিতাইয়ের মুখের দিকে তাকালেন ইমান আলী

 খামাখা মিথ্যা বলব কেন স্যার অমায়িক একটা হাসি উপহার দিলেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী  দেখুন স্যার আমরা যারা স্বর্ণের  ব্যবসা করি তাদের চোখ আর মগজ দারুন রকমেরর হয় আকাশে কাক  উড়ে গেলে   ধরতে পারি কাকটা   স্বর্ণের  নূপুর পরে আছে না  রূপার দুল পরেছে

 নিতাই মহলানবীশের বয়স পঞ্চাশ হবে মোটা কালো  কুচকুচে গায়ের রঙ হুবহু এই রঙের মিষ্টি পাওয়া যায় কালোজাম নাম  উনার মাথার চুল কালো সাদা মিলিয়ে মোটামুটি কুচ্ছিত আর ধুরন্ধর  চেহারা ইয়া গোঁফ ঘি রঙ্গা পাঞ্জাবী আর ধুতি পড়নের ধুতিটা আরেকটু ভাল ভাবে পড়া দরকার ছিল  লোমশ উরু এবং আরও হাবিজাবি দেখা যায় 

 মহলানবীশ শব্দের অর্থ কি ? যারা মহল্লায় নতুন ? প্রশ্ন  করল  ভবানী বাবু 

 আজ্ঞে না যারা জমিদারি   আমলে  এক  একটা মহলের  আয় ব্যায়ের  হিসাব রাখত তাদের  এই উপাধি দেয়া হয়েছিল

 এই লোকের নাম   বদরুল হাসান মারা গেছে  খুন আপনি বলছেন চেনেন না কিন্তু কললিস্ট হিসাবে আপনার সাথে প্রতি মাসে কথা হত  নিয়মিত

 হতে পারে স্যার  আমি ব্যবসায়ী মানুষ  খদ্দের লক্ষ্মী  কে কখন ফোন দেয় অত খেয়াল কি থাকে  ?

 দুই বছর নিয়মিত  ফোন দিত কথা হত কিন্তু  নাম জানতেন না বা জীবনেও দেখা হয়নি ? ওটা আমাদের বিশ্বাস করতে  বলেন ?

 বললাম তো স্যার দিনে কত হাজার ধরনের ফোন আসে ব্যবসায়ী মানুষ কে অত মনে রাখে ?

 চোরাই সোনার ব্যবসা করতো বদরুল ওর কাছ থেকে সস্তায়  মাল কিনতেন আপনি তাই না ? শান্ত গলায় বললেন ইমান আলী 

হোয়াইট প্রিন্ট কাগজের মত ফ্যাকাসে হয়ে গেল  নিতাইয়ের মুখ 

 স্যার আপনাদের কোন ভুল হচ্ছে না তো ? আমি একজন সৎ ভদ্রলোক ঢোক গিলে বললেন মহলানবীশ

 আপনাকে আমরা কখন অসৎ বললাম ?  আমাদের প্রশ্নের সৎ জবাব দিলেই আমরা চলে যাব নইলে বদরুলের হত্যা মামলার আসামী হিসাবে আপনাকে জেলে চালান করতে বাধ্য হব অলস সুরে বললেন ইমান আলী

কয়েক মুহূর্ত কি  যেন ভাবলেন সৎ স্বর্ণ ব্যবসায়ী কপালে মিহি ঘাম পাঞ্জাবীর পকেট থেকে গুঁড়া মসলার কৌটা বের করে খানিক মুখে দিলেন  জর্দা  খাবেন স্যার ? বাবা জর্দা 

 আপনার বাবা জর্দা বানায় ? 

 কোম্পানির নাম

 তো বদরুলকে চিনতেন ?     

   হ্যাঁ স্যার চিনি স্বর্ণ বিক্রি করতো আমার কাছে 

 চোরাই ?

 ঠিক জানি না  কারন গয়না আনত না

 গোল্ড বার ?

 না স্যার স্বর্ণের মিহি কুঁচি  শার্পনার দিয়ে পেন্সিল কাটার পর যেমন কাঠের কুঁচি হয় তেমন স্বর্ণের কুঁচি অমন মাল আগে পরে জীবনেও দেখিনি

 কোত্থেকে আনত মাল ?   ভিয়েতনাম বা বার্মা ? সাউথ আফ্রিকা ? ওকে চালান কে দিত ?

 সেটা আসলেও জানি না  এই ব্যবসায় এত কথা কেউ বলেও না কৌতূহল বেশি দেখালে পার্টি ভেগে যায় 

  সেই স্বর্ণের রেণু বা কুঁচি আছে কিছু ? স্যাম্পল হিসাবে দেখাতে পারবেন ?

 না স্যার সাথে সাথে মাল  গলিয়ে অন্য আকার দিয়ে ফেলি এটাও আমাদের লাইনের একটা সধারন কৌশল 

 মালের কোয়ালিটি কেমন ছিল ?

 দারুন স্যার তবে খুব একটা রিফাইন করা না মনে হয় কেউ সরাসরি খনি থেকে তুলে খানিক  পরিষ্কার করেই     বদরুল সাহেবের হাতে তুলে দিচ্ছে মালগুলো  

নতুন তথ্য ইমান আলী আর ভবানী বাবুর একে অপরের দিকে তাকালেন একবার 

 আরও কিছু তথ্য দরকার আমাদেরকি ভাবে পরিচয় হল বদরুলের সাথেমাল কেনা বেচা হল কি ভাবে ? জানতে চাইলেন ইমান আলী

 চা আনাই স্যার ?  নিজেকে বেশ সামলে নিয়েছেন  নিতাই মহলানবীশ

 সাথে কয়েক  ফালি কেক আর বিস্কুট হলে ভাল হয় বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বলল ভবানী বাবু

 কিছু লাগবে না আপনি তথ্য দিন বাঘের মত বললেন ইমান আলী

 ঠিক দুই বছর আগে গুজব শুনলাম বাজারে নতুন এক খেলোয়াড় এসেছে  বলতে লাগলেন সৎ স্বর্ণ ব্যবসায়ী  খেলোয়াড় মানে যারা  নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে মাল দিতে পারে অমনিতে অনেকে স্বর্ণ   বিক্রি করে হয়তো অভাবে পড়ে বাড়ির মা বউ আসে অলংকার বিক্রি করতে দেখেই বুঝতে পারি ওদের চেহারায় সব লেখা থাকে   গয়না  থাকে পুরানো দিনের বুক ভরা ভালবাসা   নিয়ে জমিয়ে রেখেছিল নিজের কাছে জিনিসটা বিক্রি করে যাওয়ার সময় উনাদের চেহারা দেখলে মনে হয় হৃদয়টা রেখে যাচ্ছে আমার দোকানে 

 আরেক  ধরনের পার্টী আসে দেখেই বুঝি ছিনতাই করে বা চুরি করে জিনিসটা এনেছে এদের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করে বেশি  টাকা নিয়ে দ্রুত ভাগতে  চায় দোকান থেকে ক্যাশ মেমো   বা রিসিটের প্রসঙ্গ তোলে না মাদকের বা নেশার টাকার জন্য বাপ মায়ের গয়না বেচতে আসে অমন মাল  আছে

 ক্যাশ মেম বা রিসিট কাউকেই দেন না ? ইমান আলীর প্রশ্ন

  কে অত বাখনার মধ্যে যায় ? এটা  স্যার ফাস্ট ফুডের দোকান না ১০ টাকার পানি প্রিন্ট করা রিসিটে ৯০ টাকা লিখে বলব ভ্যাট সহ  সব রাবিশ স্যার

 বাহ কায়দা করে অনেক কথা তো বলেন  রাবিশ বাদ দিয়ে বলুন

 আমাদের বেশির ভাগ মাল আসে এয়ারপোর্ট থেকে

 সে কি ?

 হ্যাঁ স্যার বছরের  পর বছর  খবরে দেখবেন সত্তর কেজি  থেকে  আশি কেজি পর্যন্ত স্বর্ণ  ধরা পড়ে  একদিন দুই দিন খবরের কাগজে চিল্লা ফাল্লা হয় পরে সবাই হাল্কা প্রস্রাব করে  যার যার কাজে চলে যায় সেই স্বর্ণ পৌঁছে যায় জায়গা মত

 জায়গা মত মানে ?

 মানে স্যার উপর মহল পর্যন্ত নইলে সারা বছর এটা চলে কেমন করে

 বড় বড় রুই কাতলা জড়িত থাকে ? জানতে চাইল ভবানী বাবু

শুধু রুই কাতলা না স্যার হাঙর, ব্যারাকুডা, মিমিক অক্টোপাস, ক্ষুদে তিমি শিকারি সবাই জড়িতযারা স্বর্ণের ব্যবসা করে তারা কেউ পেটে হাত দিয়ে বলতে পারবে না জীবনে এক রত্তিও চোরাই বা অবৈধ স্বর্ণ কেনা বেচা করেনি

 তো বদরুল মাঠে নেমেছে দুই বছর আগে ?

 সঠিক জানি না আমার সাথে পরিচয়  হয়েছে দুই বছর  

কি ভাবে ?

 একদিন দোকানে হাজির স্যাম্পল দেখাল মাল পছন্দ হল দাম দিলাম বলল আরও  লাগলে যেন উনার  নাম্বারে মেসেজ দেই- পাঁপড় ভাঁজা  দরকার   পরের মাসে দিলাম মেসেজ উনি রাস্তার পাশের এক পে ফোন দিয়ে ফোন দিয়ে চলে  এলেন   আগের মতই মাল নিলাম তবে স্যার  আসল নাম ধাম জীবনেও জানতাম না  বলেনি কখনও

 নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন ?

 বেশ কয়েকবার মুখ শক্ত করে বসে ছিল

 একাই আসতো ? না সঙ্গীসহ ?

 সঙ্গী জীবনেও দেখিনি তবে  এই সব রেকেট একা চালানো যায় না কেউ না কেউ আছে হয়তো রাস্তার ওপারে দাড়িয়ে কাভার দিও ওকেসারা রাস্তা কথা বলতো না আস্তানায় গিয়ে মিলত

 কথা বার্তা কেমন ছিল ?

 এই একটা জিনিস অবাক লাগত, ঘাগু অপরাধীদের মত না চালচলন একটু সতর্ক থাকতো , ব্যস এই  এমনিতে বেশ ভদ্র আর বিনয়ী মনে হত   

 শেষ কবে আপনাকে স্বর্ণ দিয়েছে

 গত মাসে এই মাসে এখনও ওকে মেসেজ দেইনি

কথা সত্য কারন কল লিস্ট আর মেসেজ আগেই দেখেছেন ইমান আলী আর ভবানী বাবু 

 সিকান্দার বাগদাদী নামে কাউকে চেনেন ?

 নাম প্রথম শুনলাম ? কে উনি ?

 একজন দলিল লেখক  ঠিক আছে আপনি শহর ছেড়ে কোথাও যাবেন না চোরাই স্বর্ণ বেচা কেনার জন্য আপনাকে গ্রেফতার করতে পারি সে  রকম ইচ্ছা নেই বদরুলের খুনের তদন্ত করছি আগে সেটা শেষ হোক পরে আপনার সাথে দেখা হবে আর  যদি কোন রকম আলামত পাই এই খুনের সাথে আপনার সামান্য মাখনের প্রলাপ আছে তবে আমার জন্য  ঈদের আগের রাতের মত আনন্দের ব্যাপার হবে চললাম

আট 

রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে বসেছে দুইজন পাশে  খানিক দুরে একটা লোক কাচের বাক্সভর্তি তরল কি যেন বিক্রি করছে হাবিজাবি অনেক কিছুই ডুব সাঁতার দিচ্ছে বাক্সের ভেতরে ব্যাঙের ডিমগুলো চিনতে পারলেন ইমান আলী

 জিনিসটা কি ভবানী বাবু ? বমি নাকি ? জানতে চাইলেন ইমান আলী 

 না স্যার ফেলুদা না ফালুদা বলে মোগলরা গরমের দুপুরে পান করতো এখন আম জনতার জিনিস 

   দেখলেই তো ঘিন ঘিন করে 

 ওটা কিছুই না স্যার ড্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষকে বেলের শরবৎ খেতে দেখি রোজ অরা অবশ্য জীবন্ত কিংবদন্তীহুজুগে বাঙালি  তার্পিন তেল  খায়  

 মানুষ এত স্বাস্থ্য  সচেতন হয়ে গেছে ?

 আসলে স্যার বাতাসে নাকি সীসে আর লোহার পরিমাণ  বেড়ে গেছে এটা তো আর আরব্য রজনীর বাগদাদ শহর না

বাগদাদ শুনেই  কথা মনে পড়লো ইমান আলীর

  সিকান্দার বাগদাদী  লোকটার কোন খবর ?    জানতে  চাইলেন

 নাহ স্যার সম্ভবত পুরানো চাল গায়েব হয়ে গেছে করিম বক্সের কাছ থেকে ওর চেহারার বর্ণনা নিয়ে স্কেচ এঁকে আমাদের সব কবুতরদের  ( যারা পুলিশের গোপন খবর এনে দেয় )  কাছে বিলি করা হয়েছে পেয়ে যাব আপনার কি মনে হয় এই কেসে সিকান্দার বাগদাদী প্রাইম সাসপ্যাক্ট ?

 কেন যেন মনে হচ্ছে ওকে ধরতে পারলে এই কেস শেষ যদি প্রমাণ হয় এটা একটা সিম্পল ছিনতাই তবে আর কি 

 একটু ঝোল মাল লাগছে স্যার বলল ভবানী বাবু   মোট ছয় জন স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সাথে কথা বললাম  সবার কথা হুবহু এক  নিতাই মহলানবীশ যা বলেছে ঠিক একই গল্প সবার    ব্যাপারটা কেমন  একদম বোকা আর বেকার একটা ছেলে চোরাই স্বর্ণ বেচা শুরু করলো একা পিছনে কোন গ্যাঙের ছায়া তক পর্যন্ত নেই মাল আসছে কোত্থেকে ? নিয়মিত মাসে মাসে

 আমরা বদরুলের বাসায় গিয়ে ওর বাপ মায়ের সাথে খানিক কথা বলি আরও খবর পেয়ে যাব  আপনার কি মনে হয় ?

 বিলকুল স্যার জবাব দিল ভবানী প্রসাদ তারপর চা - বিক্রেতার দিকে চেয়ে খেকিয়ে উঠলো সে, অই মিয়া দুই কাপ চা দিতে এতক্ষণ লাগে ?    

 হায় হায় আপনারা চা খাইবেন ?  বিলাপ করে উঠলো চা অয়ালা  আমি ভাবেছি ঘুষের টাকা ভাগ করার নিরাপদ জায়গা হিসাবে আমার দোকান  বাইছা  নিছেনমানুষ মাত্রই ভুল স্যার দিতে আছি জলদি হায় হায়

গভীর ঘুমের মধ্যে ধরা পড়লো সিকান্দার বাগদাদী

নয় 

  সিকান্দার  প্রত্যেকবার কাজ শেষ করে   ওমর খৈয়াম বিরিয়ানি হাউজে এসে ফুল প্লেট  বিরিয়ানি   সেঁটে নেয় প্রথমে   দুনিয়ার সেরা বিরিয়ানি বানান এরা দিনে মাত্র দুই ডেকচি সকালে  পেল্লাই এক ডেকচি লাল শালু দিয়ে প্যাচিয়ে দোকানের সামনে  বসায়     দুপুরেই শেষ আবার দুপুরেরটা রাত দশটার মধ্যে গায়েব 

ধুন্ধুমার বেচা কেনা প্লেট ভর্তি করে দেয় জিনিসটা জাফরানি রঙের    রোষ্ট করা  আস্ত দুই  আলু  মুখ গুঁজে থাকে বিরিয়ানির উপর গাদা গাদা নরম মাংস আঙুল দিয়ে চাপ দিলেই খসে যায় ব্রেক আপ  হওয়া  প্রেমিক প্রেমিকার মত উপরে আধুনিক কবিতার মত  সোনালী পেঁয়াজ ভাঁজা যেটাকে ফেরেস্তা না বেরেস্তা বলে অপূর্ব স্বাদের জিনিস 

প্রতিবার বিরিয়ানি খেতে বসে অবাক হয়েছে সিকান্দার এত মাংস দেয় কি করে খেতে খেতে আবার মনে পড়ে- রাস্তা ঘাঁটে আগের মত কুকুর দেখা যায় না কেন ?  পৃথিবীতে যা কিছুই ঘটে সবই নাকি একটা ঘটনা আরেকটার সাথে জড়িত

এইবারের কাজটা শেষ করে পেট ঠেসে বিরিয়ানি খেয়ে নিল  সিকান্দার খাওয়া শেষে কিছুদিনের জন্য গায়েব হয়ে যাবে বরাবরের মত  দুরে কোথাও  বসে বসে ষোলগুঁটি খেলবে বা  চিন্তা করবে আরও নিখুঁত ভাবে কি ভাবে পরের কাজটা করা যেতে পারে   এক একটা খুনের পর মাস খানেক গায়েব থাকলেই সব ঠিক হয়ে যায় মহাবিশ্বে সব ঘটনা থিতিয়ে যায় আর এটা তো সামান্য খুন  

এইবারের কাজটা বেশ সহজ ছিল রাজনৈতিক খুনের কাজ তেমন একটা পায় না সিকান্দার টুক টাক কাজ পায় ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী বা জমি দখলের জন্য  পিজ্জার  অর্ডার  পায় অর্ধেক টাকা অগ্রিম নেয় যাকে ঘুম পাড়াতে হবে তার চেহারা চিনিয়ে দিতে হবে এক সপ্তাহ ধরে শিকারের পিছন পিছন ঘুরে  প্ল্যান  বানাবে  প্রত্যেকটা মানুষের জীবন যাপনের একটা ছক আছে বনের বাঘের মত তৃণভূমির হাতির মত সাগরের তিমি মাছের মত  কয়েকদিন খেয়াল করলেই  ছকটা চেনা যায়    তারপর একদিন সময় সুযোগ বুঝে ঝেড়ে দিতে হবে 

কাজটা করতে খারাপ লাগে না সিকান্দারের পিস্তল দেখলেই এক একজনের চেহারার যে ভাব হয় সেটা উপভোগ করে সে গুলির শব্দটা  দারুন লাশটা ধপাস করে পড়ে যায় সেটা  দেখতে ভাল লাগে সব মিলিয়ে সুন্দর একটা প্যাকেজ কাজ শেষ হলে মটর সাইকেল চালিয়ে ভেগে যাও  গাহেকের কাছে গিয়ে বাকি   অর্ধেক   টাকা  নাও সহজ সিকান্দারের স্বপ্ন একদিন ছোট রাজন বা বগা সিধুর মত নামি কন্ট্রাক্ট কিলার হবে  

গত মাসে নিজের প্রিয় পিস্তলটা ভাড়া দিয়েছিল এক সাগরেদের কাছে  ছিনতাই  করে পালাতে গিয়ে   গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা গেল সাগরেদ দশ লাখ টাকা ডাকাতি করেছিল সাগরেদ সেই টাকা নিজেরদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিল পুলিশগুলো  পিস্তলটা পুলিশ হাপিস করে দিল চুপে চাপে বিক্রি করে দিয়েছে ওরা  পুরানো পিস্তলটার জন্য অনেক মন খারাপ করেছে সিকান্দার  বিদেশি জিনিস ছিল  শেষে  করিম বক্সের কাছে গেছে দেশি হাতুরি কিনতে 

নতুন  পিজ্জার অর্ডার পেতেই মন ভাল হয়ে গেল তবে এটা খুনের বায়না ছিল না তরুণ এক  ছেলেকে অনুসরণ করতে হবে সারাক্ষণ এক মাস নিয়মিত অনুসরণ করে খদ্দেরকে জানালো বিরক্ত হয়ে খদ্দের বলল- ছেলেটার ব্যাগ ছিনতাই করে এনে দিতে ব্যাগটা আনতে গিয়েই মুশকিল হল ব্যাগ ছাড়ছিল না যুবকটা  বাধ্য হয়ে তিনটা গুলি নষ্ট করতে হল আফসোস

খাওয়া শেষ করে বনলতা আবাসিক হোটেলে গিয়ে উঠলো কয়েকদিন এখানেই থাকবে ভাড়া কম পুলিশ রাত বিরাতে হাজির হয় না হোটেলটা ভালই আবাসিক  শব্দের বা শব্দটার আলো  জ্বলে না  ফাজিল কে জনে সেই সাইনের পাশে লিখে রেখেছে  বানায়ে আপনে  মানুষ কত খারাপ

হোটেলের বাইরে একটা টঙ্গের দোকানে বসে সারাক্ষণ চা খায় আর বাসি খবরের কাগজ পড়ে মিহি চেহারার এক লোক মুখে বসন্তের দাগ সিকান্দার একটু  সতর্ক থাকলেই বুঝতে পারত   বসন্ত বাহার ভদ্রলোক পুলিশের কবুতর বুঝতে পারেনি মাশুল দিল  মিহি ঘুমের মধ্যে আবিস্কার করলো  কামারার   ভেতরে পাঁচ ছয়জন পুলিশ ঢুকে পড়েছে তাদের দলনেতা  মোটা মত গোঁফওয়ালা  এক লোক চোখদুটো একদম ভাল মানুষের মতচেহারা দেখে মনে হয় সিঙ্গারা ভেঙ্গে খেতে জানে না  

 আমাদের সাথে বিরিয়ানি খাবেন ? হাসি মুখে বললেন ইমান আলী বলেই হাত বাড়িয়ে বালিশের তলা থেকে সিকান্দারের পিস্তলটা বের করে নিল সে

চালু লোক   মনে মনে প্রশংসা না করে পারল না  বিরিয়ানি লাভার সিকান্দার 

 স্যার আমাকে থানায় সহনশীল মাত্রায় মারধর করবেন প্লিজ আবেদন জানালো সিকান্দার 

  থানায় নেয়ার দরকার নেই স্যার পিছন থেকে মিহি গলায় বলল ভবানী প্রাসাদ  এখানেই ফেলে দেই ওর পিস্তল থেকে কয়েকটা গুলি করে দেয়ালের চলটা ফেলে  দেব  পরে পরিচিত সাংবাদিকদের ডেকে সংবাদ সম্মেলন করে বললেই হবে বন্দুক যুদ্ধে বাগদাদি নিহত

 খারাপ না মুখের ভাব  বদলে  গেল  ইমান আলীর যেন মানব সভ্যতার বিকাশের পর এই প্রথম এমন আইডিয়া কেউ কাউকে দিতে পেরেছে  বঙ্কু বিহারী  হত্যা মামলায় কাউকে ধরতে পারিনি এর নাম অ্যাড করে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়  

 স্যার আমি সব তথ্য দেব ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলো বাগদাদি গত দশ বছরের অনেক খুনের তথ্য আমার কাছ থেকে পাবেন স্যার আপনাদের খেদমতের জন্য আমি আছি 

 ছেলেটাকে চেন ? পকেট থেকে ছবি বের করে দিলেন  ইমান আলী  বদরুল নাম

 কাজটা আমিই করেছি

 কারন ?

অর্ডার ছিল স্যার পাঁচ লাখ টাকার ডিল

 কার জন্য কার করেছ ? কে লাগিয়েছিল ?

 আমজাদ খান 

 শোলে সিনেমার আমজাদ খান ? সে তো মারা গেছে  অবাক হলেন ইমান আলী

 চিনেছি স্যার উত্তেজিত ভাবে বলল ভবানী বাবু অনেক পুরানো গোল্ড স্মাগলার  এই লাইনের রাজা

পার্সেল করে নিয়ে আসুন  রাজাকে  মোহরানা দিতে হবে

দশ 

আমজাদ খান প্রায় চারকোণা তেলের ড্রামের মত মোটা ধূর্ত চাহনি চেহারাতে আভিজাত্য আছে সেটা কৃত্রিম পূর্ব  পুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া নয় হারাম পয়সা অর্জন করার পর অনেকেই এমন ভাব ধরে প্রায় এক দশক ধরে  গোল্ড মাফিয়া হিসাবে নাম  করেছে  সে  যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক কিছু যায় আসে না আমজাদ খানের এই লাইনের লোকদের কিছু হয়ও না  আসলে   টানা ব্যবসা করে গায়েব হয়ে যায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে  পেট্রোল পাম্প, সুপার মার্কেট বা হোটেল খুলে  পায়ের উপর পা তুলে কাটায় শেষ জীবনটা 

দরদর করে ঘামছে সে  এই মুহূর্তে সেলের ভিতরে ছায়া ছায়া

 বদরুল হাসান মারলেন কেন ? নরম গলায় জানতে চাইলেন ইমান আলী 

 নিয়ম  উপায় ছিল না আমার ধান্ধায় পা বাড়িয়েছিল   নিঠুর হাসি হেসে বলল আমজাদ 

  কি রকম ?  সব খদ্দের ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল    

 সেটা করলে তেমন সমস্যা ছিল না শয়তানটা  অনেক কম দামে মাল দিচ্ছিল

নিজেরা আপোষ করে নিলেই হত খুন করার দরকার কি ছিল ?

 হারামজাদার সিন্ডিকেট ছিল না একা ব্যবসা করত ঘাড় ত্যাড়া মাল  

 এই ব্যবসা একা  করা যায় না সবাই বলে বদরুল করত কি করে ?

 ওর কোন সাপ্লাইয়ার ছিল না নিজের মাল নিজে বানাত

 মানে ? আকাশ থেকে পড়লেন ইমান আলী আর ভবানী প্রসাদ

 স্বর্ণ বানানের ফর্মুলা জানত বদরুল  বদের হাড্ডিটা  

বোকার মত মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন ইমান আলী আর ভবানী বাবু

 আপনি নিশ্চিত ?  বোকা বোকা ভঙ্গীতে প্রশ্ন করলেন ইমান  আলী  কেমন যেন তাল গোল পাকিয়ে যাচ্ছে সব  

 টানা দুই বছর বদরুলের উপর চোখ রেখেছি তারপর নিশ্চিত হয়ে কাজে নেমেছি ভেবেছি ওর ব্যাগের ভেতরে কোন ফর্মুলা পাব আমারই ভুল  অমন জিনিস কি ব্যাগে রাখে ?  এক  রত্তি স্বর্ণও পাইনি তবে ব্যাগ নিয়ে বের হয়েছিল  মানে মালটা অন্য কোথাও বানায় ব্যাটা বানিয়ে ওখান থেকে নিয়ে আসে 

 আপনি নিশ্চিত বদরুল কৃত্রিম স্বর্ণ বানাত ? আধুনিক আলকেমি ? এও সম্ভব ?  চেহারা থেকে অনিশ্চয়তার ভাব এখনও কাটেনি   ইমান আলীর  

  বদরুলের  বাপ মা কে ধরুন হিস হিস করে বলল আমজাদ খান  ওই মড়াখেকো বুড়ো আর কলিজাখেকো ডাইনী বুড়ি সব জানে

 আপনাকে হরর বইয়ের নাম বলতে হবে না আমাদের কি  করতে হবে  ভাল করেই জানি তবে এইসব ফিকশন মার্কা গল্প বলে আমাদের চোখে   ধূলা দিতে পারবেন না আপাতত জেলে বসে বিশ্রাম করুন গত দশ বছরের সব ফাইল বের করছি আমি দেখা হবে

 আপনার কি মনে হয় ভবানী বাবু ? আমজাদ খান  ধাপ্পা দিচ্ছে আমাদের  ?  সেলের বাইরে এসে প্রশ্ন করলেন ইমান আলী

 অবশ্যই স্যার আলকেমি এই যুগে অচল মধ্য যুগে অবশ্য অনেক গুজব ছিল অদের নিয়ে , কিন্তু নাহ  অবিশ্বাস্য আগে চলুন বদরুলের বাসা থেকে ঘুরে আসি কোন ক্লু পেতে পারি 

এগার

অভিজাত এলাকা জমি কেনা বেচা হয় না তারপরও প্রচুর ফ্ল্যাট বাড়ি বানানো হয়েছে চড়া দামে বিক্রি হয় সেই সব মোড়ের সামনে মুদির দোকান ওখানে  ট্রেটনের প্যান্ট আর চক্রাবক্রা শার্ট পরে দাড়িয়ে চানাচুর খাচ্ছিল এক লোক ঝাল বেশি হওয়ায় নাক দিয়ে শিকনি বের হচ্ছিল ঘন ঘন জামার হাতায়  নাক ঘষে আহ্লাদে আবার খাচ্ছিল গাড়ি থেকে বিশালদেহী ইমান আলীকে নামতে দেখে শশব্যস্ত হয়ে সালাম ঠুকল    

 সব ঠিক আছে মতিন ? জানতে চাইলেন ইমান আলী 

 নাহ স্যার টানা কয়েকদিন দেশি মদ খেয়েছিলাম  মাগনা পেয়ে আজ সকালে খবর পেলাম মানুষের প্রস্রাবের মধ্যে ব্যাটারি ভিজিয়ে রেখে দেশি মদ বানায় সেই থেকে শরীরটা কেমন  ঝিরকি ধরে আছে কিছু করুন স্যার মদওয়ালাদের ধরে আইনের হাতে সরপণ করুন 

 আমি দেশি মদের জন্য আসিনি বদরুলের বাসার খবর কি ?

 দিনরাত নজর রেখেছি স্যার বুড়ো বুড়ি  একাই থাকে   ভিজিটর  কেউ আসেনি সন্দেহজনক গতি বিধি পাইনি

 চব্বিশ ঘণ্টা নজর রেখেছিলে ?

  হ্যাঁ স্যার দিনে আমি রাতে বিল্লাল ভাই কোন ঢিলেমি দেয়া হয়নি

পকেট থেকে কয়েকটা নোট বের করে  দেশি মদ নিয়ে অভিযোগকারি মতিনের হাতে ধরিয়ে দিলেন ইমান আলী 

মতিন ছেলেটাকে পছন্দ করেন তিনি খুবই কাজের   আগে গঙ্গাজলের ব্যবসা করতো পুকুরের পানি  সুন্দর বোতলে ভর্তি করে লেবেল সেঁটে মন্দিরের সামনে গঙ্গাজল হিসাবে বিক্রি করতো বোতলের ছিপিতে  তরল লাল মোম  মাখিয়ে দিত  ফলে সিল গালা একটা ভাব এসে যেত একবার লেবেল  ছাপাতে গিয়ে ভুলে ছাপিয়ে ফেলেছিল ১০০% হালাল গঙ্গাজল খেয়াল করেনি বেচারা গনপিটুনি খাওয়ার সময় মর্মাহত আর মারমুখী জনতার হাত থেকে মতিনকে বাঁচিয়েছিলেন ইমান আলী সেই থেকে কবুতর হিসাবে কাজ করছে  

ছয়তলা বাড়ির সব চেয়ে উপর তলায় থাকতো বদরুল এখন বুড়ো বাপ মা উনারা অবাক হলেন ইমান আলী আর ভবানী বাবুকে দেখে সাথে আরও দুইজন পুলিশ  

 কিছু প্রশ্ন করব আর আপনাদের ফ্ল্যাট তল্লাশি করতে হবে বিনয়ের সাথে বললেন ইমান আলী  সার্চ ওয়ারেন্ট আছে আমাদের কাছে 

 খুনি ধরা পড়েছে ? জানতে চাইলেন মইনুল সাহেব  শোকার্ত  চেহারা 

 আপাতত কিন্তু রহস্যের জট খুলেনি   আপনি আমাকে বদরুলের কামরা দেখিয়ে দিন  আর  ভবানী বাবু , আপনি  পুরো ফ্ল্যাটের কোনা খামচি চেক করুন

 ইয়েস স্যার  বাইন মাছের মত দলটা ভেতরে চলে গেল 

 তিনজন মানুষ থাকতো সেই তুলনায় বেশ বড় দামি আসবাবে ঠাসা  একজন অন্ধ লোক এই  ফ্ল্যাটে  ঢুকে পড়লে বুঝতে  পারবে টাকাওয়ালার  জায়গা পেল্লাই এক ড্রয়িং  রুম আলাদা তিনতে কামরা দুই বাথরুম এক ফালি শৈশবের মত এক ফালি বারান্দা  বদরুলের  কামরায় বলতে গেলে কিছুই নেই বিছানা বেড সাইড টেবিল  একটা মাত্র রূপকথার বই - রাজকন্যা আর সাত বামুন দেয়ালে একটা ছবি মিক্স পেইন্টিং  অটাও snow white and the seven dwarfs এর থিম নিয়ে আঁকা মখমলের বিছানায় শুয়ে আছে রাজকন্যা চারিদিকে ঘিরে দাড়িয়ে আছে সাতটা বামন সবগুলো বুড়ো কয়েক জনের হাতে চারকোণা পুরানো দিনের লন্ঠন সেই  লন্ঠন তুলে কমলা আলোতে স্নো হোয়াইটকে দেখছে সবাই চেহারাতে স্নেহ আর বিস্ময় 

 আপনার ছেলের আঁকা নাকি ? জানতে চাইলেন ইমান আলী

 নাহ, স্যার অনেক বছর আগে কোন এক  একজিবিশন থেকে কিনেছিল ওর প্রিয় ছবি 

পুরো কামরা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছুই পেলেন না ইমান আলী মনে মনে রেগে গেলেন অদ্ভুত চরিত্র এই বদরুল গভীর সাগরের স্কুইড ব্যাটা   

 আপনার ছেলের কোন বন্ধু-  বান্ধব ছিল না অদ্ভুত না ব্যাপারটা ?  জানতে চাইলেন তিনি

 একদম ছোটবেলা থেকেই কারো সাথেই মিশতে পারত না কল্পনা বিলাসী নিঃসঙ্গ চুপচাপ ছন্নছাড়া ধরনের ছিল হয় খুব প্রতিভাবান ছিল বা অসামাজিক ধরা গলায় বললেন  মইনুল হাসান সাহেব

 আমরা জেনেছি বদরুল গোল্ড স্মাগলিঙ  করতো প্রমাণ  পেয়েছি তো আপনাদের কখনও কোন রকম সন্দেহ হয়নি ?

 একদম না ধরা গলায় বললেন শোকার্ত পিতা 

পুরো ফ্ল্যাট তল্লাশি করে প্রায় হতাশ অবস্থায় জিনিসটা পেল ভবানী বাবু  বাথরুমে দুটো সেভিং ক্রিমের ক্যান আচ্ছা মত ঝাঁকুনি দিয়ে চাপ দিতেই  তুষারের মত ফেনা বের হয়ে এলো দ্বিতীয়টা তুলে ঝাঁকুনি দিতেই  ধাতব শব্দ হল ছিপি খুলে হাতের তালুতে ঢেলে দিতেই চকচক করে উঠলো  কাঠ পেন্সিলের কুঁচির সমান পাঁচ ছয়টা স্বর্ণের ফালি   দম বন্ধ হয়ে গেল ভবানী বাবুর 

বারো

পরের সপ্তাহ

থানায় বসে আছেন ইমান আলী চুনুরি পাশে দাড়িয়ে  কাঠের র্যাক থেকে দরকারি কাগজ পত্র  এগিয়ে দিচ্ছে ভবানী বাবু 

বাইরের আকাশ কালো বৃষ্টি হতে পারে আবার না  হতে  মৌসুম বদলাচ্ছে  কয়েকদিন ঝিনকি দেয়া গরম পড়েছিল আমসত্ব বানানোর জন্য সেরা  রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিভীষিকা পরিমাণে শরবতের দোকান  বেড়ে গেছে  পাবলিক টয়লেট থেকে পানি এনে সরবত বানায় একই বালতিতে গ্লাসগুলো ডুবিয়ে রাখে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত 

মেঘলা বাতাসে বাইরের ডুমুর গাছ থেকে চেরির মত পাকা ডুমুর থ্যাব থ্যাব করে  মাটিতে খসে পড়ছে   ঘন   নীল রঙের কি একটা পাখি বসে আছে ডুমুরের ডালে  চুপচাপ  খিদে নেই সম্ভবত কি পাখি ওটা ? ভাবলেন ইমান আলী সময় পেলে  পাখি দেখার  জন্য একটা  দূরবীন কিনবেন গ্রামে চলে গিয়ে  পাখি দেখবেন বকুল গাছে বরইয়ের মত ফল হয় সেই ফল দিয়ে দারুন আচার বানায় ইমান আলীর দাদী আচার, বাকরখানি আর পাখি দেখা অপূর্ব ছুটির প্ল্যান করা মাত্র মন থেকে সব ক্লান্তি চলে গেল 

 যা  বুঝলাম  আলকেমি ব্যাপারটা সত্য   কাগজপত্র সব ঝপাস করে টেবিলের উপর রেখে বলল ভবানী প্রসাদ  সেই  মধ্য যুগের আগে থেকে চর্চা হত এই জিনিসটা 

 সংক্ষেপে বলতে গেলে ?  নড়েচড়ে বসলেন ইমান আলী

 নাহ স্যার সংক্ষেপে  বলা  যাবে না  এটা গাইড বই না   বিরাট  ইতিহাস  তবে ভগবান চা  দিতে যতটুকু সময় নেবে তারমধ্যে আপনাকে হালকার উপর ঝাপসা ইনফরমেশন দেই ঠিক কবে থেকে  আলকেমির চর্চা হত বলা মুশকিল মুল জিনিসটা হচ্ছে পরশ পাথর টাইপের জিনিস যার ছোঁয়ায় লোহা স্বর্ণ হয়ে যাবে জিনিসটার অস্তিত্ব ছিল অমন বহু গল্প কাহিনি শোনা যায় প্রমাণ নেই গ্রিক কাহিনি মাইডাস টাচ শুনেছেন বোধ হয় রাজা  মাইডাস যাই স্পর্শ করতেন স্বর্ণ হয়ে যেত খুশিতে বগল বাজানোর দশা তার সব কিছু হাতিয়ে পিতিয়ে  স্বর্ণ  বানিয়ে ফেললেন আদর করে  নিজের   কন্যার গায়ে হাত  দিতেই মেয়েটা স্বর্ণের পুতুল হয়ে গেল   বয়েড মরিসন নামে এক লেখক এই ঘটনা   থিম  নিয়ে একটা থ্রিলার বই লিখে ফেলেছেন  নাম - দ্যা ভল্ট বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যাও দিয়েছেন কেন এমন হতে পারে 

 পিরামিড যখন বানানো হচ্ছিল  সেই সময়  একদল লোক দাবি করতো তারা স্বর্ণ বানাতে পারে    গুপ্তবিদ্যা জানে তারা বা ঈশ্বরের আশীর্বাদ পেয়েছে সেইজন্য পারে ওদের এক দেবতা নাম  থথ  যার শরীরটা মানুষের কিন্তু মাথাটা পাখির মত সেই দেবতা এই বিদ্যা শিখিয়েছিল ওদের ফারাও রাজারা একদল লোক পুষতেন যাদের কাজ হচ্ছে দিন রাত্র স্বর্ণ বানানোর চেষ্টা করা    এটা আসলে স্যার অপবিজ্ঞান আজকের কেমিস্ট্রি জিনিসটা আসেছে এই আলকেমি থেকে কল্পনা করুন স্যার একদল লোক বন্ধ একটা ঘরে বিশাল সব  চুল্লিতে সারাদিন হাবিজাবি সেদ্ধ করছে চুল দাড়ি বড় হয়ে সবাইকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত দেখাচ্ছে আগুনের পাশে থেকে থেকে কানা হয়ে গেছে মজার ব্যাপার হল রজার বেকন আর   নিউটনের মত লোক  আলকেমি ছিলেন 

 কোন নিউটন  ?  বাথটাবে  গোসল করছিল ? পরে চিৎকার করে গামছা ছাড়া বের হয়ে গিয়েছিল সেই লোকটা ?

 নাহ ওটা স্যার আর্কিমিডিস 

  আপেল গাছ তলায় বসে ছিল যে লোকটা  ?  

 জি স্যার, আইজাক নিউটন 

 দেখা যাচ্ছে  সবারই   লোভ রয়েছে  স্বর্ণের প্রতি 

  এক অদ্ভুত জিনিস স্যার প্রকৃতিতে অমন ধাতু আর পাবেন না মরিচা ধরে না বিবর্ণ হয় নাসাগরের নোনা জলেও নষ্ট হয় না   অভিজাত্যের প্রতীক   রাজা গজাদের কাছে ক্ষমতার প্রতীক এই স্বর্ণ তো আলকেমি শব্দটার মানেটা কি বলা মুশকিল অনেক গবেষক মনে করেন ওটা মিসরীয় শব্দ কেম থেকে হয়েছে কেম মানে নীল নদের পলি বন্যার পর যেটা জমে থাকতো দুই তীরে সেই বন্যার পর ফসল ফলত দারুন রকমের আরবি শব্দ আল ক্যামাইয়া থেকেও আসতে পারে গ্রিক শব্দ কেমা থেকেও আসতে পারে মানে হচ্ছে প্রলেপ দেয়া 

 প্রথম দিকে সবাই লুকিয়ে চুরিয়ে আলকেমি চর্চা করলেই পরে সাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে যায় লিখিত দলিল পাওয়া যায় ১৮৮৭ সালের হরেক পদের বই ছিল বাজারে তখন কি ভাবে স্বর্ণ বানানো যায়  হেন তেন  জিনিসটা  যদি  ভুয়া হত তবে বছরের পর বছর এই বিদ্যা চলত না বিনা লাভে কেউ বেগার খাটতো না ধরা যায় কিছু না কিছু  স্বর্ণ ঠিকই বানানো হত তাছাড়া এটাও সত্য মধ্য যুগে  কি ভাবে যেন রহস্যময় ভাবে স্বর্ণের যোগান বেড়ে গিয়েছিল  সারা দুনিয়ায়তেই এই একটা ব্যাপার নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যাবে লেখা যেতে পারে কয়েক শত  নন ফিকশন আর ফিকশন বই   মুল ব্যাপার হচ্ছে-  ১৮৭৯ সালে বিজ্ঞানী মেনডালিয়েফ ধাতুর আণবিক গঠন আবিস্কার করেন তাতে দেখা যায় স্বর্ণের আণবিক সংখ্যা ৭৯ পারদের ৮০ আর সীসার ৮২ মানেটা হল সীসা ,পারদ আর স্বর্ণ প্রায় এক ধরনের ধাতু এদের মধ্যে   তফাৎ খুব কম আর আলকেমিরা কিন্তু এই সীসা দিয়েই স্বর্ণ বানাতে পারত অমন দাবি করতো শেষ কথা হচ্ছে চাইলে কৃত্রিম  স্বর্ণ বানানো যায় স্যার  

 বলেন কি ?

 হ্যাঁ স্যার   সমস্যা হল ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম স্বর্ণ বানাতে গেলে  খরচ অনেক বেশি পরে যায় এতই বেশি যে খরচে পোষায় না সেইজন্য কোন বহুজাতিক কোম্পানি আজও কৃত্রিম স্বর্ণ বানিয়ে বাজারে ছেরে ব্যবসা করার কথা চিন্তা করেনি

 বদরুলের স্বর্ণগুলো ?

 আসল স্বর্ণ খনি থেকে তোলা টাটকা জিনিস

 কি ভাবে সম্ভব সেটা ? বিরক্ত হলেন ইমান আলী  ছোকরা জিনিসগুলো আনত কোত্থেকে ? খনি থেকে তাও আবার  মনে হচ্ছে  সহজ  কিছু একটা  আমাদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে

 একমত স্যার পোঁ ধরল ভাবনী প্রসাদ 

 কেউ বাসায় এসে মাল দিত না  শিওর  শহরের বাইরে যেত না

 পরের ব্যাপারটা কিন্তু আমরা খোঁজ নেইনি  উত্তেজিত ভাবে বলল ভাবনী বাবু

 মতিনকে ফোন দিন মনে হচ্ছে ক্লু পাব চকচক করে উঠল ইমান আলীর চেহারা  মতিনকে বলুন  যেন প্রতিবেশী বা পাশের মুদির দোকানদারদের কাছে জিজ্ঞেস করে জেনে নেয় বদরুল কি শহরের বাইরে ঘন ঘন আসা যাওয়া করতো কি না

ভগবান চা নিয়ে ঢুকলো   সাথে সামান্য কয়েকটা বাদাম চায়ের কাপ অর্ধেক শেষ হবার আগেই টেবিলের উপর ঘুমিয়ে থাকা কালো টেলিফোনটা বিচ্ছিরি ক্লাসিক শব্দে বেজে উঠলো ফোন তুলতেই ওপাশ থেকে মতিনের  গলা  ভেসে এলো-  ভাল জায়গায় হাত দিয়েছেন স্যার

 আমি খারাপ জায়গায় হাত দেই না আসল খবর বল

 বদরুল প্রতি মাসে একবার করে ওর গ্রামের বাড়িতে যেত একা দুই দিন থেকে ফিরে আসতো রেগুলার একটা ছন্দে মনে হয়  ওখানে কিছু পাবেন

  গ্রামের বাড়ি কোথায় ? 

 নবীগঞ্জে   

চা শেষ করে বাদাম পকেটে করে উঠে পড়ুন ভবানিবাবু বদরুলের বাপ মায়ের সাথে দেখা করে নবীগঞ্জ জেতে হবে    কেসটা শেষের দিকে  আমি নিশ্চিত 

তেরো 

ওদের দুইজনকে দেখে যারপরনাই বিরক্ত হলেন মইনুল হাসান আর তার গিন্নি  

 আবার কি হল স্যার ? আপনাদের সব প্রশ্নের  জবাব দিয়েছি তো বাসা থেকে মালও নিয়ে গেছেন   নতুন করে আবার কি জানতে চান ? 

 সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন ঠিক আবার কিছু কথা বলার দরকার ছিল  কিন্তু বলেননি

 যেমন ?

মাঝে মাঝে নিয়মিত একটা বিরতির পর আপনার ছেলে নবীগঞ্জ গ্রামের   বাড়ি    গিয়ে ঘুরে আসতো সেটা একবারও বলেননি 

থতমত খেয়ে গেলেন মইনুল হাসান  সাহেব কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন,  ব্যাপারটার গুরুত্ব আমি বুঝতে পারিনি আর সত্যি কথা বলতে কি মনেও ছিল না

 কেন যেত জানেন ?

 আমরা আগে ওই বাড়িতে থাকতাম বদরুলের শৈশব কেটেছে ওখানেই জীবিকার জন্য শহরে চলে আসি আমরা তখন বদরুলের বয়স মাত্র আট   কুড়ি বছর এই শহরে আমরা  আর এর মধ্যে সময় পেলে নবীগঞ্জ যেতাম   নিয়মিত না    গত দুই বছর আগে বদরুল একাই গেল   বিষণ্ণতায় ভুগছিল ছেলেটা ফিরে  এলো জ্বর নিয়ে প্রলাপ বকছে - পুরানো বন্ধুদের দেখা পেয়েছে নাকি 

 পুরান বন্ধু ? অবাক হয়ে মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন ইমান আলী 

 ছেলেটা ছোট বেলা থেকে একটু   অস্বাভাবিক ছিল স্যার কল্পনা বিলাসি ইস্কুল থেকে সেইজন্য বের করে দেয়া হয়েছিল ইস্কুলের বাচ্চাদের কাছে আজগুবি সব গল্প করতো

কেমন গল্প ?

 ওর কিছু বন্ধু আছে  সবাই নাকি দেখে না সেই বন্ধুদের

 সব বাচ্চারাই অমন ফ্যান্টাসি গল্প বলে অন্যের মনযোগ পেতে চায় শিশুদের  স্বাভাবিক  মনজগৎ তারপর ?

 জ্বর থেকে সুস্থ হয়ে উঠে একমাস চুপচাপ বসে রইলআবার চলে গেল নবীগঞ্জে সেই থেকে নিয়মিত যেত

 ব্যবসা ধরলও সেই সময় থেকে ?

 হ্যাঁ স্যার 

 আপনারা জিজ্ঞেস করেননি ঘন ঘন নবীগঞ্জ কেন যায় ?

 ওখানের বাড়ির পিছনে ঝর্ণার পানিতে  মাছ ধরত নাকি

হঠাৎ কেমন চঞ্চল হয়ে উঠলেন ইমান আলী   আমরা নবীগঞ্জ যাব আপনার বাসাটা দেখতে আপত্তি নেই আশা করি

 না স্যার চাবি এনে দিচ্ছি  কেউ থাকে না ওখানে কেয়ার টেকার নেই  ভেতরে দামি কিছু নেই   সেইজন্য  ছেলে হারিয়েছি বাড়ি দিয়ে কি করব ?

ভেতরে চলে গেলেন মইনুল সাহেব খানিক পর ফেরত এসে পুরানো দিনের তামার দুটো চাবি তুলে দিলেন ইমান আলীর হাতে সাথে একটা ফটোগ্রাফ বাবা মায়ের সাথে  বদরুল দাড়িয়ে আছে পুরানো  আমলের একতলা একটা বাড়ির সামনে সবাই হাসি মুখে চেয়ে আছে ক্যামেরার দিকে পিচ্চি বদরুল চেয়ে আছে অন্য দিকে ছবি তোলার সময় ওর মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে অন্য কিছু    

 ভালমত ফিরে আসুন শুকনো মুখে বললেন তিনি  ছবি দিলাম, বাড়িটা যাতে চিনে নিতে পারেন গেইটের সামনে কুঞ্জলতার ঝাড় আছে একটু  বদলায়নি   

জীপটা লাফিয়ে চলছে ড্রাইভ করছে একজন কনস্টেবল পিছনে বসে তালে তালে জামঝাঁকুনি খাচ্ছেন ইমান আলী আর  ভবানী বাবু 

 ওখানে গিয়ে কি পাবেন স্যার ? জানতে চাইল ভাবনী প্রসাদ

 জানি না তবে আমার অনুমান শুনলে পাগল হয়ে যেত পারেন আপনি তাই  বলব না  আমি   চাই না পাগল হয়ে আপনি হাফ নেকেড হয়ে রাস্তার ট্রাফিক কনট্রোল  করেন  

শহর  ছেড়ে দিতেই  রাস্তাটা  সুন্দর আর নিরিবিলি হয়ে গেল দুই ধারে বড় বড় বৃষ্টি গাছ গাছভর্তি ফুল সাদা ফুল উপরে ফিকে গোলাপি রঙ ঢেলে দিয়েছে কেউ যেন  মানুষজন কম  দোকান পাট, বাজার সব লাফিয়ে পিছন চলে যাচ্ছে   আরও  সুন্দর লাগছে পরিবেশ বাতাসটা তাজা  ফালতু বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড দেখা যাচ্ছে না এটাও একটা শান্তি     একটা পুকুর ভর্তি  বেগুনি রঙের কচুরিফুল দেখে মনটা ভাল হয়ে গেল ভবানী বাবুর টিউলিপের চেয়ে সুন্দর তো !

বিকেলে নবীগঞ্জ পৌঁছে গেল তিনজনের দলটা  

বাঁশের  চটা, টিন আর বাতিল কাঠ দিয়ে বানানো একটা চায়ের দোকানে গাড়িটা থামিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস  করা হল মইনুল হাসান সাহেবের বাড়িটা চেনে কি না চেনে হাত পা মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল  দোকানি কি মনে হতেই বদরুলের   বর্তমান ছবি বের করে দেখালেন ইমান আলী মাথা নেড়ে চা ওয়ালা জানালো- হ্যাঁ মাসে মাসে এই ভাই এই পথেই  ভাড়াটে  গাড়ি করে   যেত আবার ফিরে আসতো 

আবার চলতে লাগল গাড়িটা

মাত্র দশ মিনিট পর বাড়িটা পাওয়া গেল  ফাঁকা একটা জায়গায় মন খারাপ করে দাড়িয়ে আছে নিঃসঙ্গ বাড়িটা ফটকে কুঞ্জলতার ঝাড় থির থির করছে পাতলা হাওয়ায় প্রতিবেশীদের বাড়ি ঘর দূরে

তালা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন ইমান আলী আর ভবানী বাবু কনস্টেবল রইল গাড়িতে 

পাথরের ব্লক বিছানো পথ বাক্সা ঘাসে ভর্তি হয়ে গেছে এক সময় সুন্দর বাগান ছিল এখন বুনো জংলের মত দুই একটা জংলি গোলাপ ঝাড় টিকে আছে মালিক না থাকার পরও কাঠের বারান্দা সদর দরজার তালা খুলতেও সমস্যা হল না নিয়মিত দরজা খোলা হত 

ভেতরে  দামি  কিছু নেই  বাতিল কিছু আসবাব ছাড়া   ভাঙ্গা সোফা নরম হয়ে গেছে গদি একটা বিছানা ওটায় বদরুল ঘুমাত- অনুমান করলেন ইমান আলী রান্নাঘরে কাগজের প্লেট আর পানির খালি বোতল পাওয়া গেল স্যান্ডউইচ   টাইপের খাবার নিয়ে আসতো বদরুল মনে হচ্ছে একাই আসতো বেড রুম বা অন্য সব কামরা খালি ধূলা আর মাকড়সার জাল ছাড়া কিছু নেই 

 আসলে কি খুঁজছি স্যার ? ফিসফিস করে প্রশ্ন করল ভবানী প্রাসাদ

খেয়াল করুন কোন রুমে বা জায়গায় ধূলা কম  আর খুব বেশি শব্দ করবেন না   একই রকম ফিসফিস করে  জবাব দিলেন ইমান আলী  

ঠিক কি খুঁজছে ইমান আলী বুঝতে না পারলেও কাজে নেমে পড়লো ভবানী প্রসাদ বেশীক্ষণ খুঁজতে হল না রান্নাঘরের পাশে পিচ্চি একটা রুম, সম্ভবত ভাঁড়ার রুম হিসাবে   ব্যবহার  হত সেই রুম আর কিচেনের মাঝের সংযোগস্থল বেশ  পরিষ্কার   অন্তত পুরো বাড়ির তুলনায় 

 স্যার, এই দিকে হাতের ইশারায় দেখাল ভবানী বাবু 

পাশে এসে দাঁড়ালেন ইমান আলী জায়গাটা ভাল মত পরীক্ষা করলেন জুতার দাগ আছে গত মাসে কেউ একদম দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল   কোমরে ঝুলান ভারি   ফ্ল্যাস  লাইটটা তুলে আঘাত করলেন দেয়ালের গায়ে প্রথম কয়েক বারের পর ফাঁপা শব্দ শোনা গেল 

 যা ভেবেছি বললেন ইমান আলী

 গুপ্ত কামরা ? আগ্রহের সাথে সামনে ঝুকে এলো ভাবনী প্রসাদ

 সম্ভবত দেয়ালের গায়ে আলগা টাইলস দেখতে পেয়ে চাপ দিলেন কাজ হচ্ছে বহু  কায়দা  করে খুলে নিলেন সেটা আবিস্কার হল চতুর্ভুজ একটা খোপ   ট্যাঁনেল    সেটা চলে গেছে ভেতরে  খুব বড় না তবে   হামাগুড়ি দিয়ে  প্রাপ্ত বয়স্ক একজন মানুষ অনায়াসে চলে যেতে পারবে

 চলুন অ্যাডভেঞ্চার করে আসিআমি আগে থাকব   পিছন পিছন আপনি  ফ্ল্যাস  লাইট জ্বালিয়ে হাসি মুখে বললেন তিনি  ফ্ল্যাস  লাইটের আলোতে ইমান আলীর চেহারা ভূতুড়ে দেখাল 

কথা শেষ করে বাচ্চাদের মত হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন ইমান আলী  

পিছন পিছন ভবানী প্রসাদ

সরু জায়গা মাথার উপর ছাদ একদম নিচু হঠাৎ উঠে বসতে গেলেই মাথা ফেটে তরমুজের শরবত হয়ে যাবে মেঝে মসৃণ বাতাস চলাচল করছে দমবন্ধ করা কোন ভাব নেই তার চেয়ে  বড় কথা পথটা খুব দীর্ঘ না সামনেই হালকা আলো দেখা যাচ্ছে

 আমি আগে বের হচ্ছি ভবানী বাবু আমি সংকেত দেয়ার   পরে আপনি বের হবেন  ওকে ?  অনেক  আস্তে বললেন ইমান আলী টানেলের ভেতরে গমগম করে উঠলো থেমে গেল ভবানী প্রসাদ সামনে ঝুপ করে নেমে গেলেন ইমান আলী তারপর সব চুপচাপ  ওই পাশে একটা  কামরা মিট মিটে আলো জ্বলছে কিন্তু কিছুই দেখা পাচ্ছেন না ভবানী বাবু

স্বল্প একটা সময় পরে আশ্চর্য নরম গলায় ডাক দিলেন ইমান আলী,  চলে আসুন ভবানী বাবু দেখুন পৃথিবীটা কত বিচিত্র

ভবানী প্রসাদ  দ্রুত চলে এলো বাইরেবিস্ময়ের  প্রচণ্ড ধাক্কায় কথা  বলতে পারছে  না সে বোকার মত চেয়ে আছে সামনের দিকে

 রত্নদানো ! অনেক পরে একটা শব্দই উচ্চারন করতে পারল 

 ওরাই বদরুলের ছোটবেলার বন্ধু এইজন্য সারাজীবন রুপকথার  অলীক  জগতে বাস করতো বেচারা কেউ পছন্দ করতো না ওকে ফিসফিস করে বললেন ইমান আলী 

 বড় একটা কামরা  নানান জায়গায়  বিঘত খানেক বড় বড় কাচের লণ্ঠন জ্বলছে ষড়ভুজ বিচিত্র কাচের লন্ঠন সেই আলোতে মায়াবি আর রূপকথার মত লাগছে সব লাল সাদা বড় বড় মাশরুম  সেখানে পিচ্চি একটা রেলগাড়ি একদম  খেলনা রেলগাড়ির সাইজ  কিন্তু চলে    হরেক পদের  পাথর ছড়িয়ে আছে স্তূপ হয়ে সেই জায়গায় হাতুরি বাটালি গাইতি বেলচা নিয়ে কাজ করছে সাতজন বুড়ো মানুষ   ব্যস্ত   স্বর্ণ মেশান পাথর আলাদা করে রাখছে কেউ  চালুনি দিয়ে পাথর থেকে ছেঁকে নিচ্ছে স্বর্ণের কুঁচি     সবার মাথায় শক্ত  টুপি মুখ ভর্তি দাড়ি অভিজ্ঞ খনিসন্ধানী  এক  একজন  মানুষগুলো সাইজে মাত্র  এক হাত করে লম্বা এক একজন 

রুপকথা গল্পের সেই  বুড়ো  সাত বামন !   

( শেষ )

 

   

 

 

  

 

  

 

 

 

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...