সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

হেমলকে ভেজানো আমাদের সময়

রুমঝুমপুর    থেকে ফেরার পথে একদিন চায়ের দোকানটা আবিস্কার করলাম

আবিস্কার করা শব্দটা কেমন না ?

কিন্তু আসলেও আবিস্কার।  অমন নিঝুম একটা জায়গায় এমন নন্দন কাননের  মত শৈল্পিক একটা জিনিস পড়ে আছে  কে জানতো ?

চা  পছন্দ করি নাবিরক্তি কর একটা পানীয়অহনা খুব পছন্দ করেপেয়ালা পেয়ালা চা গিলে ফেলে মেয়েটাজাফরানি রঙের  এই  পানীয়তে কি আছে   কে জানে !  

 

 

টিউশনি করে ফিরছিলামরুমঝুমপুর কেমন একটা মফস্বল এলাকাআজও এমন আজব সব জায়গা টিকে আছে  নগরায়নের  ফাঁদ এড়িয়ে।   

 

অদ্ভুত   মিষ্টি একটা জায়গা।  পুরানো দিনের লেখকদের লেখায় অমন বর্ণনা পাওয়া যায়।   যেই সব লেখকরা ভাল লিখে কিন্তু নাম করতে পারে না, তাদের লেখায়

 

 কালো পিচের  সড়ক শেষ হতেই লাল ইট বিছানো পথ।  দুই পাশে ছাতিম গাছফিকে গোলাপি আর সাদা মেশানো  কেমন এক ফুলে গাছ ভর্তিহালকা বাতাসেই সোনালি রঙের মরা পাতা খসে পড়ে গাছ থেকেমনে হয় পুরানো আমলের সোনার  ডাবলুন।  পথের ধারে রাংচিতা আর অচেনা বেগুনি রঙের মন কেমন করা ফুলঅমন ফুলের ছবি  পাওয়া যায় বিদেশী চীনামাটির   পেয়ালা আর তশতরীতেপিচ্চি পিচ্চি ফুলদেখেননি কখনও ? হাঁটতে গিয়ে  একলা পথে ?  হয়ে থাকে ওরা থোকায় থোকায়

 

 

 

একটা  টিউশনির   জন্য এত দূর আসা  ঠিক পোষায় নাছাত্রটাও গবেটমাথা ভর্তি গোবরগরুর রচনা শিখতে তিন মাস পার করে দিয়েছেকিছু জিজ্ঞেস করলে দুই চোখ গোল্লা গোল্লা করে চেয়ে থাকেমনে হয় এখনই কেউ ওকে ধরে  নাৎসি-দের সেই গ্যাস চেম্বারে নিয়ে যাবে।  

 

বিরক্তকর

 

 

   কিন্তু পথের ধারের এই অপূর্ব সব জিনিস  মন ভাল করে দেয়যাওয়া আর আসা  দুই বেলা পথের বিচিত্র   শোভা উপভোগ করতে করতে ভাবি, নাহ জীবনটা নেহায়েত  মন্দ না।   বেশ  ভাল হয় যদি আরও একটা টিউশনি পাওয়া যায়এই নিরালা পথে আরও যেন  হাঁটতে পারি।  

 

ফেরার সময় সন্ধ্যা নেমে আসেপথের  ধারের বুনো তুলসির ঝাঁঝালো ঘ্রানে হৃদয়ের গহীন গোপন সব অসুখ ভাল হয়ে যায়।   

 

 

এক সন্ধ্যায় টিউশনি শেষ করে ফেরার পথে ঝুম বৃষ্টি নামলোছোট কবিতার মত  বৃষ্টি নানিটোল গদ্যের মত রিমিঝিমি বৃষ্টিছাতা বগলে বাইরে যাই নাঅভ্যাস নেইছাতা নিয়ে বের হলেই কেমন বোকা  বোকা লাগেঘটক বা   সবজির পাইকার মনে হয়।  লোকজন চেয়ে থাকেবাস থেকে হুড়মুড় করে নেমে গেলে  ভুলে যাই সাথে রঙ জ্বলা এক ছাতা ছিলতাপ্পিমারামরচে পড়া শিক।    কিছু হারালেও কষ্ট লাগে।  মন  খারাপ হয়ে যায় ।  ঝামেলা

 

 

 

  বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে পড়তেই মনে হল  আশ্রয় দরকারগাছ তলায়  দাড়ালে চলে ? বড় কোন ঝুপসি গাছ নেই ? চোখে গেল খানিক দূরেশনঘাস আর  নাম না জানা ঝোপের আড়ালেই ছোট্ট মত দোকানমুদি দোকান ভেবেছি প্রথম

 

কমলা রঙের আলো জ্বলছে

 রাত তখন আটটা হবে

নীলচে অন্ধকার ছিল

সেই নীলচে অন্ধকারে কমলা রঙের আলোতে কেমন অচিনপুর লাগছিল দূরের  দোকানটা

 দৌড়ে চলে  এলাম, ভিজে গেছি ততক্ষণে

তারপরও নিজের অজান্তেই বলে ফেললাম-  ‘ বাহ, দারুন তো !’   

 

 

শহরে ময়লার স্তূপের পাশে বা ড্রেনের পাশে কত পদের চায়ের দোকান দেখেছি হররোজ ।     বেকার, অলস , ভবঘুরে ,  গপ্পোবাজ লোকজন বসে চা খায়দূরে লোভী চেহারার কুকুর বসে থাকেবসে এক পেয়ালা চা খাবার রুচি হয়নি কখনওকিন্তু এটা কেমন চায়ের দোকান ?  বাস্তবে কখনও অমন হয় ?

 

দোকানটা একটা বড়  একটা পাকুড় গাছের নীচেপাকুড় , বট আর  অশ্বত্থ গাছের মধ্যে অনেকেই তালগোল পাকিয়ে ফেলেকিন্তু খেয়াল করলেই এই তিন গাছের পাতার মধ্যে ভিন্নতা বুঝতে পারবেনবর্ষা শেষে পাকুড় গাছে কমলা রঙের ফল ধরেআর গাছের পাতাগুলো ও পানপাতার মত হয়লম্বাটে ব্যাঙ্গাচির মত নাআর বটগাছে ঘন মায়াবী লাল রঙের ফল ধরে।  

 

 

গাছের তলায় মরচে পড়া টিনের তৈরি দোকানটাএক সময়  টিনগুলো  রুপার পাতের মত ছিল হয়তো।  রঙ জ্বলে এখন  মনে হয় বাটা মশলার প্রলেপ  মাখানো  হয়েছে উপরে ।  

 

দোকানের উপরে মমতা দিয়ে ঝুঁকে আছে পাকুড় গাছটা ।   গাছের ডালে  হারিকেন ঝুলছে একটা।  বাদুরে ছাপ দেয়া   পরিষ্কার চিমনি দিয়ে বের হয়ে আসছে ইটালিয়ান পনিরের মত আলোসেই আলোতে মায়াবী লাগছে চায়ের দোকানটাযেন কোন গ্রিক  নাট্যকারের মঞ্চসজ্জা।  এসকাইলাস   বা ইউরিপিদেসের নাটকের দৃশ্য

 

 

 বৃষ্টির জলে ভিজে পাকুড় গাছের পাতা জ্বল জ্বল করছেমনে হয় দুর্লভ কোন ধাতুর তৈরিএমন ধাতু সব জায়গায় পাওয়া যায় নাদুর্গম   বভেট আইল্যান্ডের  মরা   আগ্নেয়গিরির  লাভার স্রোতে পাওয়া যায়দুঃসাহসী খনিসন্ধানীরা জান  বাজি রেখে গিয়ে নিয়ে এসে সেই জিনিস

 

 

আর দশটা চায়ের দোকানের মতইতারপরও আলাদাঅনেক পরিষ্কারআর গোছানঠিক যেন প্রিয় কবির কোন কবিতার মতএক গাদা কাচের বয়ামভেতরে  সস্তা বিস্কুটগোলাপি রঙের নোনতা বিস্কুট,  বাদামী রঙের লাঠি বিস্কুটবাসি চিনির মিষ্টিবালুসা বলেরস ছাড়াতাই নষ্ট হয় না সহজেএকফানা হলুদ কলা ঝুলে আছে অজানা কোন পিশাচের হাতের মতসাথেই পলিথিনের ব্যাগ ভর্তি পাউরুটি কিছুউত্তম সুচিত্রার মত  কলা পাউরুটির জোড়া

 

ছোট একটা পেতলের স্টোভের উপর হাতির শূরের মত নাক নিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে এলুমিনিয়ামের কেতলিপাশে টিনের ট্রেতে ওর বন্ধুরামানে পেয়ালা আর তশতরী

 

পেয়ালাগুলো  ছোট ছোট চা না খেয়ে বিষ খাওয়ার জন্য ব্যবহার  হলে বেশি মানানসই হত।  হেমলক ।    

 দোকানের বাইরে টুল ফুল নেইবাঁশের  ফালি পাতলা করে কেটে আরও চারটে বাঁশের উপর পেরেক ঠুকে বানান হয়েছে কেমন এক টুলদোকানের ভেতরে হোগলার চাটাই  বিছানো

 

 

ওখানেই লোকটা বসে আছেহাতে বিবর্ণ একটা বই

আমাকে দেখ  হাসল  সেরোগা ভোগা চেহারালম্বা চুল কাঁচা পাকাদাড়ি গোঁফে মুখ মাখাচোখ দুটো চুনু মাছের মতউঠে বসল

 

চা  খাবেন ?’  জানতে চাইল

এই লোককে না বলি কি করে ? আর বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য এমনিতেই বসে থাকি কি করে বেহায়ার মত ?

 

দিন’  টুলে বসতে বসতে জবাব দিলাম

ব্যস্ত হয়ে পড়লো লোকটাসব কাজ সবার হাতে মানায় নাএর কাজ দেখেই মনে  হচ্ছে চা বানানো একটা শিল্প

 সবাই পারে নাকেউ কেউ অনেক সাধনা বলে শিখে যায় এই গুপ্তবিদ্যাটা

 

স্টোভের আঁচ বাড়িয়ে দিলক্যারাবিয়ান   সাগরের গর্জনের মত  শব্দ  উঠলো কেটলির ভেতরেভাল করে  পরিষ্কার করে নিল পেয়ালাটা।  ততক্ষণে  লোভনীয় সৌরভে ভরে গেছে চারিদিকবৃষ্টির সোঁদা ঘ্রান  আর চায়ের পাতার সৌরভ  মিলিয়ে একদম আলাদা এক পরিবেশস্বপ্নিল

 

 

  টিনের ছাঁকনি রেখে পাতা ছেঁকে চা আলাদা করলো।  জিজ্ঞেস করলো লেবু বা তুলসি পাতা  দেবে কি না, বারন করতেই    লাল চিনি  আর কৌটার ঘন দুধ  মেশাল কায়দা করেশেষে  তুলে দিল আমার হাতেনাকের কাছে নেয়ার আগেই  ঘ্রানে মুগ্ধ হলাম। । চুমুক দিতেই  বিস্ময়ে আবার তাকালাম চা -ওয়ালার দিকে

দারুন তো’  বললাম

 

হাসল চা ওয়ালাআমার কাছ থেকে অমন প্রতিক্রিয়াই আশা করছিল।  

 

 আবার মনে পড়লো অহনার কথা ওকে নিয়ে আসব একবার আমি নিশ্চিত,  শহরের কোথাও এত সুন্দর চা পাওয়া যায় না।  ও আসবে না ?

 

কি পড়ছিলেন ?’ খেজুরে  আলাপ জমানোর চেষ্টা  করলাম।  পেয়ালা ভর্তিবৃষ্টি ও সহজে শেষ হবে না

 

কবিতার বই ’  জবাব দিল চা ওয়ালা।  গালিবের কবিতা

 

বাহ, ভাবলাম মনে মনেমফস্বলের এক চায়ের দোকানদার বসে বসে বৃষ্টির সন্ধ্যায় গালিবের কবিতা পড়ছেযদিও এইসব শাঁয়েরী ফায়েরি আমার ভাল লাগে নাবিরক্তকরআগের দিনের নবাবরা অমন দুই একজন কবি পুষতকবুতর পোষাঁর মত

 

একটা কবিতা বলি ?’  অনুমতি চাইল  সে

আবৃতি ভাল লাগে নাবিরক্তকর।  তারপরও নিম রাজি হলাম

 

 

 সুযোগ পেয়ে লোকটা  আবৃতি করে উঠলো - ‘ইয়ে না থি হামারি কিসমতকে বিসাল এ ইয়ার হোতাআগার অউর ভি জিতা  রেহতাএ ইন্তেজার হোতাকেমন লাগল ?’

 

কিছু ই বুঝিনি ফালতু ।  ’    কাপে ঠোঁট ঠেকিয়ে বললাম

 

খুব সহজ’  হাসল সে।  মানে  হচ্ছে , প্রিয়তম আরও কিছু দিন বেঁচে থাকলেও বিরহই থাকতো আমার ভাগ্যেসুন্দর না ?’

জবাব দিলাম নাকেন যেন অহনার কথা মনে পড়লোআবারও।  

 

 

এই সব শায়েরির একটা মজার জিনিস কি জানেন ?’  হাসি মুখে বলল সে।  জুল জুল চোখে চেয়ে আছে আমার দিকে

 

কি ?’

আপনি যদি প্রেমে পড়েন তবে  শায়েরি  শোনা মাত্র তারই কথা মনে পড়বে  প্রথমেকি ঠিক না ?’

 

 

আপনি কি আসলেই চায়ের দোকানদার ?’  খস খসে গলায় বললাম।  

 

‘   আগে একটা ইস্কুলে পড়াতামবাঙলার স্যার ছিলামইস্কুল কমিটির নোংরা রাজনীতির শিকার হয়েছিলামআমার ছাত্ররাই আমার বাড়ির জানালার কাচ  ভেঙ্গেছিল  ঢিল মেরে।  লজ্জা পেয়েছিলামআমারই ছাত্রএতদিন কি পড়িয়েছি ওদের ? রেগে মেগে চাকরি ছেড়ে চলে এসেছি  এই রুমঝুমপুরে  

 

 

ভাল লাগে ?’

না লাগার কি আছে  ?’ অবাক হয়ে আমার দিকে চাইলো সে

 

তা ঠিক’  আমতা আমতা করে বললাম

ভাল লাগা না মন্দ লাগা অন্যের নির্বাচন করে দেয়া কাঠামোর উপর নির্ভর করে না’  বলল সে।  আপনার আগে ভাল লাগতে হবেযাই  করুন না কেন আপনার ভাল লাগল তো সব ভালআপ ভ্যালা তো জগত ভ্যালা এই  থিউরি একদম সত্য’‘

 

 

দিন কাটে কি করে ?’

সহজ তোচা বানাইবিক্রি করিসপ্তাহে একদিন নারায়ণগঞ্জে যাইচা পাতা চিনি হাবিজাবি কিনিমিন্নত আলির মাজারের পিছনের ফুটপাথের    দোকান থেকে   বই কিনি একটা আধটাসারা  সপ্তাহ সেটাই উল্টাই পালটাইকবিতা পড়িদোকানের  পিছে থাকিওখানেই রান্না করিখাইঘুমাই

 

অবাক হয়ে আবারও তাকালাম লোকটার দিকেএই যুগে কি অদ্ভুত জীবন যাপন করছেখাপছাড়া কিন্তু খারাপ কি ?

 

 

জীবন অনেকেই অর্থহীন মনে করেচিনির  বয়াম গুছিয়ে রাখতে গিয়ে বলল  চা-ওয়ালা।  নানা কারনে অমনটা মনে হতেই পারেকিন্তু এই যে পোকাগুলো দেখুন।  মাত্র জন্ম নিয়েছেমহাবিশ্বের কিছুই জানে না, জন্মেই দেখল আগুনের আলো বা হারিকেনের মায়াবী লাল আলোউড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লোমারাও গেল জীবনের কি অপচয় ! কিছুই জানল না দেখল না পুড়ে মরে গেল।  প্রকৃতিতে অমন অনেক পোকা, জীবাণু বা কীট আছে যাদের জীবনের  স্থায়িত্ব কাল মাত্র এক সেকেন্ডের জন্যএই পলের মত ক্ষুদ্র জীবনে কি পায় ওরা ?  আমরা মানুষ তো অনেক ভাগ্যবানযত সমস্যাই থাকুক প্রিয়জনের সামনে বসার সুযোগ হয় অনেক বারএটাও খারাপ কি ?’

 

 

বাইরে আগের মতই টিপ টিপ বৃষ্টি

 

 

পাকুড় গাছের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে শব্দ আরও দ্বিগুণ বা ছয় গুন বেড়ে যাচ্ছেযত পাতা তত বেশি  শব্দশন শন হাওয়া বইছে

 

হারিকেনের কমলা রঙের রহস্যময় আলোদূরে  ব্যাঙের ডাকসব মিলিয়ে স্বপ্নিল পরিবেশ

 আরেকটা শাঁয়েরি বলব ?’ অনুমতি চাইল লোকটা

 

নাকড়া গলায় বললাম।  এই সব শোনার মুড নেইএকবার বলার সুযোগ দিলেই আরও বলবেএকবার মাখললাল নামের এক লোকের সাথে পরিচয় হয়েছিলকি এক প্রশ্ন করতেই  লোকটা  কৃষ্ণের বাল্য লীলা, যৌবন লীলা সব লীলার  বর্ণনা করে গেছেন টানা এক ঘণ্টা ধরে।   

 

কোত্থেকে এমন আজগুবি তথ্য পেয়েছেন কে জানে  ।  বিরক্তিকর ব্যাপারভদ্রতার খাতিরে কিছু বলা যায় না

 

হালকা শব্দ করে হেসে ফেলল লোকটাএই দোকানের পরিবেশই এমনপ্রিয়জনের কথা মনে পড়ে যাবে’  

 

 উত্তর না দিয়ে  আমি বসে বসে অহনার কথা ভাবতে লাগলাম

অহনার সাথে পরিচয় হয়েছিল পুরানো বই কিনতে গিয়ে।  

 

 

রোজ বিকেলে পৌর পাঠাগারে যেতামপুরানো দালানবাইরে পেল্লায় এক  কৃষ্ণচুড়া গাছজ্বলন্ত কয়লার মত ফুল  ঝরে   লাল   কার্পেটের মত হয়ে থাকেইংরেজদের  আমলের মত প্রাচীন ল্যাম্পপোস্ট।  ফালি  করা সুইস পনিরের মত আলো ছড়ায়  সন্ধ্যার পর

 

 

তখন পৌর পাঠাগারের বাইরে কাগজে সেঁটে বিজ্ঞাপন দিত কেউ কেউবেশির ভাগই বাড়ি ভাড়া দেয়া হবেরুমমেট চাই, বাসায় গিয়ে পড়াইতে চাই হেন তেনঅনেক দুষ্ট লোক পড়াইতে চাই শব্দের আগে থাশব্দটা যোগ করে দিত

 

 

একদিন  বিজ্ঞাপন দেখলামকোন এক রাধামাধব বাবু নাকি উনার  সংগ্রহের প্রায় তিন হাজার বই বিক্রি করে দেবেনসাথে একটা ফোন নাম্বার দেয়া

 ল্যান্ড নাম্বার।  

 

ফোন দিতেই বুড়ো মত এক লোক ফোন ধরলেনকানে কম শোনেন, গলার স্বরেও কেমন কফ জড়ানোউনার কথা আমি বুঝি নাআমার কথা উনি কানেই নেন না।  সাড়ে  তিন মিনিট প্যাচাল পেরে  বুঝাতে পারলাম আমরা  আসলে কি নিয়ে কথা বলছি

 

  বুড়ো জানিয়ে দিলেন সস্তাপুরে উনার বাসাওখানেই যেতে হবেআর  বই নিয়ে  দামাদামি করলে চলবে না

 

 রাজি হলাম।   

  স্কুল   লাইফে অনেক সময় দল বেঁধে বা একা একা হাঁটতে যেতাম ওখানেবুড়ির দোকান নামে এক দোকানে থুড়থুড়ে এক বুড়ি পিঁয়াজু , আলুর চপ  আর ডালপুরি বিক্রি করতো।   

 

ডালপুরির ভেতরে সাইবাবলা ফুলের রেনুর মত হলুদ ডাল ঠাসাঝাল ঝাল স্বাদ।   

   বুড়ির দোকান   ছাড়িয়ে গেলে কতগুলো বাঁশের দোকানবাঁশ বিক্রি করেএকটা দোকানের নাম - বাঁশবাগানকি কাব্যিক নামরবীন্দ্রনাথের নাতির ঘরে পুতিজায়গাটা পার হবার সময় কাঁচা বাঁশের  কেমন একটা  ঘ্রাণ নাকে এসে ধাক্কা দিতভালই লাগত

 

 

পাশে কালো টলটলে জলের এক ডোবাওটা ভর্তি জলকলমি আর   কচুরিপানাপ্রচুর ফুল ধরতফিকে বেগুনি পাপড়িহলুদ ফোঁটাযেন হাজার হাজার ময়ূর পেখম তুলে দাড়িয়ে আছে মুফতে হয় বলে কচুরিফুলের দাম নেইওটা ছাড়িয়ে গেলেই একটা মন্দির।  কাঁসর ঘণ্টা বাজেধুপের ঘ্রান।  মিষ্টি আলুর খোসার মত   মন্দিরের রঙ।   

 

 

 

আজও বদলায়নি কিছু।  উটকো কিছু বাড়ি ঘর  হয়েছেবসতি বেড়েছে।  কিন্তু মন ভাল করা পরিবেশ রয়ে গেছে।  রাধামাধব বাবুর  বাড়ি খুঁজে পেলামদোতলা পুরানো ধাঁচের বাড়ি ।  গাছপালায় ঠাসাবেলগাছ গলা বাড়িয়ে আগন্তুকদের  শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।  বাড়ির গেইটের বাইরে  পরীর মত  সুন্দর  যে মেয়েটা ওর বান্ধবী নিয়ে বসে     ছিল  সেই অহনানা বললেও বুঝতে পারতেনতাই না ?   

 

 

অহনা  বই কিনতে এসেছেকে জানত ?  আমি ভেবেছিলাম  রাধামাধব বাবুর কেউমেয়ে বা নাতনীআমাকে দেখেই  সে ঝংকার দিয়ে উঠলো  কি ব্যাপার বাসায় কেউ নেই নাকি ? সেই কতক্ষণ ধরে কলিং বেল বাজাচ্ছিফোন ও তো ধরছে না কেউ ? ব্যাপার কি ?’

 

 

অনেক কষ্টে ব্যাখা দিলামআমি রাধামাধব বাবুর কেউ নাআমি ও  এসেছি বই কিনতেশুনে  বিরক্ত হল, ভাবতেই পারেনি পুরানো বই কিনতে গিয়েও এমন প্রতিপক্ষ পেয়ে যাবে

 

সুন্দরী একটা মেয়ের চেহারায় বিদ্বেষ বা হিংসা খারাপ লাগেএকদম মানায় নাখারাপ লাগলবান্ধবীর সাথে নিচু স্বরে গুজ গুজ করে কি যেন বলতে লাগলআমাকে   পাত্তা  দিচ্ছে না তবে চোরা চোখে দেখে নিতে ভুল করছে নামেয়েরা এই কাজে পটু

 

 

 লম্বা হিলহিলে প্রায় সাজনার মত দেখতে এক বুড়োর আগমন  হল।  পালিশ  করা একটা লাঠি হাতেকোন গাছের  ডাল দিয়ে বানানো জানা হয়নি ।  বিকেলের ভ্রমণ শেষে ফিরছেন ।  মুখ ভর্তি শনপাপড়ির মত দাড়িচোখে   চশমা নেইদিব্যি দেখছে চশমা ছাড়াইমাথা ভর্তি কাশফুলের মত চুল।  

 

 

আপনারা কারা ?’ ভীষণ বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করলো বুড়োযেন রাস্তার ভিখিরি উঠে বসে আছে তার বাড়ির রোয়াকে

 

আপনি কি রাধামাধব বাবু ?’ জানতে চাইলাম

আমি রাধামাধব বাবু হলে কোন উপকার হয় ?  অনাবিল আনন্দের কোন ব্যাপার হয় ? এই এলাকায় কি এক হালি রাধামাধব বাবু আছে ?  অ্যা ?   ’

 

আমরা বই কিনতে এসেছি’  জবাব দিল অহনা

 

এতক্ষণে যেন থৈ খুঁজে পেলেন ভদ্রলোক

আরে তাইতোআপনাদের তো আসার কথাভুলে গেছিমগজের ধার  কমে গেছে  ছোট বেলায় মাছ কম খেতাম তো , তাই এই অবস্থাআর এখন তো খেতে চাইলেও খাওয়া যায় নাবাজারে মাছ উঠেই নাউঠলেও যে দাম কেনার মত অবস্থা নেইচারটে মাগুর মাছ নাকি  ছয়শো  টাকাআগের মত মাছ পাওয়াই যায় নাবাঁশপাতা মাছের নাম শুনেছেন ? মনে হয় না।  তারপর  ধরুন প্রচুর পেঁয়াজ দিয়ে  গজার মাছের পোনার ভুনা খেয়েছেন ? মনে হয় না ? মধু পাবদার নাম শুনেছেন ? ট্যাপা বা ট্যাটারি মাছের নাম শুনেছেন ? নাহ শুনবেন কি করে ? মালদাতে আমার পিসি থাকেকৈ মাছ রান্না করতোবুঝলেন, মাছের এক পিঠ হত ঝালআরেক পিঠ হত মিষ্টিঅমন আর কাউকেই রান্না করতে দেখিনিতারপর ধরুন...

 

 

হায় হায়লোকটা মানুষ না রেডিও ?

আমরা আসলে বইয়ের ব্যাপারে ..., মানে বইগুলো আছে না আপনার কাছে ?’ দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলামনইলে মাছ আর শেষ হবে নাতিমি বা ব্যারাকুডা  মাছের রেসিপিও বলে বসবেন

 

নিশ্চয়ইজোর দিয়ে বললেন রাধামাধব বাবুফালতু আলাপ করার জন্য আপনাদের ডেকে আনিনিবই আছেদেখুন পছন্দ হয় কি নাদামাদামি করবেন নাসেই ছেলেবেলা থেকে  খরচ বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে এই বইগুলো কিনেছি    এখন ছেলে আর ছেলের বউ বইয়ের যত্ন নেয় নামরে গেলেই আদর্শ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠোঙা হয়ে যাবেচলুন  ভেতরে  চলুন

 

 

দরজার তালা খুলে  ভেতরে নিয়ে গেলেনবসার রুমটাই তার বইয়ের রুমদেখে থ হয়ে গেলাম, কোন বইয়ের দোকানে ও এত বই থাকে না আজকালকালো   আলমারি ভর্তি ঠাঁসা বই।  আলমারির কাচ  নদীর জলের মত  ঘোলাটে হয়ে গেছে সময়ের ঘষায়

বাহ, এত বইএই প্রথম কথা বলল অহনা

বলেছিলাম না খুশি খুশি গলায় বললেন  রাধামাধবনিন বই দেখুনযেটা পছন্দ হয় বলবেননামিয়ে দেবচা খাওয়াতে পারব না , তবে শসা আর বাতাসা আছে চলবে ?  বা নারকেলের নাড়ু ।  

 

 

উহুবই কেনা শেষ হলে মোড়ের কাছের একটা চায়ের দোকানে গিয়ে আপনাকে চা খাওয়াবএত বইবাপরেখুশি খুশি গলা অহনার।   

 

হ্যাঁ, দেখুন     জীবনানন্দ দাশের ধূসর পাণ্ডুলিপি প্রথম  মুদ্রন কপি  রয়েছে ১৯৩৬ সালের ছাপাএকদম রেয়ার বইকড়ি দিয়ে কিনলাম আছেবিমল মিত্রেররবীন্দ্র রচনাবলী আছে পুরো সেট।    চার্লস  ডিকেন্সের সব বই আছেষোলটা ডিকশনারি আছে অক্সফোরড ইউনিভারসিটিরআজব সব বই পাবেন।  রিপ্লের বইগুলো পাবেনআউট অভ প্রিন্ট  বহু বছরএমন অনেক বই পাবেন যা প্রিন্ট শেষ হবার পর আর ছাপা হয়নি।  

 

আলমারি খুলে দিয়ে  রাধামাধব বাবু কথা বলেই যাচ্ছেনআমি আর অহনা  পাগলের মত বই দেখছিঘাঁটছি।   চোরা চোখে একে অপরের দিকে দেখছি ভাল বা দুর্লভ বই প্রতিপক্ষ পেয়ে গেল না তো ? উনি  বইগুলো বেশ যত্নেই রেখেছেনআলমারির  ভেতরে তিতির পাখির ডিমের মত সাদা ন্যাপথালিন দেয়ানিমপাতা শুকিয়ে রেখেছেনযাতে রুপালি রঙের সিলভার ওয়ার্ম আক্রমণ করতে না পারে বইয়ের পাতায় পাতায়দেখেই বুঝা যায় নিয়মিত যত্ন নিতেনতুঁত মাখানো কাগজ সেঁটে মেরামত করেছেন অনেক বই।   এখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন

 

 

অহনার  সহেলি বই পড়ে নাবা পছন্দ করে না।  বুড়োর আলমারির শো পিসগুলো  দেখছে বেহায়ার মত

 

 

 

রাধামাধব বাবু গলা উচিয়ে ট্যাপা না কাকে যেন বলল-  লক্ষ্মী পূজার নাড়ু দিতেরান্নাঘরে কোন বয়ামে আছে নাকি।  শুনে খুশি হলাম

বইগুলো  পুরানো।   তেজপাতার মত রঙ হয়ে গেছে কিছু বইয়ের পাতা

আমাদের বই বাছাইয়ে কোন সমস্যা হচ্ছিল নাগোল বাধল  দ্যা  হিস্টোরি অভ  অ্যাণসেন্ট এলিয়েন    বইগুলোর   বেলায়।  আট পর্বের  অর্ধেক ও  নিয়েছে ।  আমি পেয়েছি কয়েক পর্ব।   আমাকে বলছে বাকিগুলো ওকে  দিতে  পুরো সেট লাগবে ।  আমি রাজি নাজান গেলেও এই বই দেব নাবহু বছর এই বই খুঁজেছি, পুরা ভলিউম আগে পাইনিপাব সেই  সম্ভবনা খুবই কম।  

 

অহনা বই ছাড়বে নাআমিও নাশেষে বুকে চাক্কু মারা ওর  হাসি আর চোখের অতল সাগরে ডুবে যাওয়ার চাহনি দেখে হার মানলাম।  বই  অর্ধেক আমি নিলাম পড়া শেষ করে  অহনাকে ফেরত দেব।  বিজয়িনীর হাসি হাসল মেয়েটাতখনই জানলাম ওর নাম - অহনাকি সুন্দর নাম না ? বারবার  ডাকতেই ইচ্ছা করে

 

আমাদের জন্য নাড়ু দিয়েছেন  রাধামাধব বাবুপিতলের ফুলতোলা জামবাটিতে করেঘরের তৈরি জিনিসের স্বাদ কত মায়াবী হয়কে না জানেপেতলের গ্লাসে জল খেলাম যেন হাজার বছর পর

বস্তাভর্তি বই নিয়ে দাঁড়ালাম রাধামাধব বাবুর সামনেবই দেখে উনি দাম বললেনআমরা দামাদামি না করে টাকা মিটিয়ে দিলাম

বুঝলেনসে একটা দিন ছিলগলা খাঁকারি দিয়ে বলতে লাগলেন রাধামাধব বাবু।  ইস্কুল জীবনে বই কেনা শুরু করেছিলামতখন এত প্রকাশনী ছিল নাবই ছিল নাবাবা  দূর শহরে  চাকরি করত।  ছুটিতে বাড়ি  ফেরার  আগে সদরঘাঁট থেকে বই কিনে   তবেই বাড়ি  ফিরত

 

আহা কি সুন্দর দিন গেছে আমাদেরআমিও পয়সা জমিয়ে বই কিনতামআমার গিন্নি বই পড়তো খুবচিঠি লিখত  আমাকে পূজার ছুটিতে যেন বই নিয়ে বাড়ি ফিরিবিমল মিত্র, শঙ্করহেমেদ্রকুমার রায়ের যখের ধন।   কত কত বইপাগলের মত বই কিনতাম।  সব   বইয়ের পাতায় ঢেঁকি শাক আর বিদ্যাপাতা রেখে দিত আমার  গিন্নিতখন বুক মার্ক  ব্যবহারের  রেওয়াজ ছিল না তো ।  তাই

 

 

অদ্ভুত বিষাদ মাখা রাধামাধব বাবুর গলা

কি মনে হতেই একটা বইয়ের পাতা  উপুর করে উল্টাতে লাগলাম।  ভেতর থেকে  টুপ করে খসে পড়লো বাদামী শুকনো পাতা অদ্ভুত সুন্দর মিহি আর ডিজাইন করা  এক গুচ্ছ পাতা  সেটাচেনা চেনা লাগছেছোট বেলায় ভেজা দেয়ালে দেখতাম

কি ওটা ?’ জানতে চাইল অহনা

বিদ্যাপাতাভেজা গলায় বললেন রাধামাধবআমার গিন্নি রেখেছিলঅনেকগুলো বছর  আগে’  

কামরার পরিবেশ কেমন বিষাদ মাখা হয়ে গেল এক লহমায়কত কালের কত বিষাদমাখা কবিতা মাকড়শার জালের মত ঝুলে রইল  নগ্ন নির্জন কামরার কোনে কোনেএই ঘরেই হয়তো বসে বই পড়তেন রাধামাধব বাবুর গিন্নিহলুদ রঙের গরমের দুপুরেবা জাফরানি রঙের শীতের বিকেলে।  কালিগোলা বর্ষার সন্ধ্যায়

 

কল্পনায় দেখতে পাই বিছানায় উপুর হয়ে বই পড়ছেন আদ্যিকালের কোন কমলাসুন্দরীশাড়ির আঁচলে মস্ত চাবির গোছাচাইমের মত ঝুন ঝুন করে বেজে উঠছে সামান্য নাড়াচাড়াতেইমগ্ন তিনি বইয়ের পাতায়বাইরে পিপুল আর বাবলাগাছের ডালে বাতাসের খোশগল্পশিন শিন শব্দ করতে ডালে ডালেসন্ধ্যামালতি গাছ ঠেসে  ধরেছে  কলের গানের চোঙার মত  জামফলের ভেতরের রঙের   ফুল বুনো তুলসি আর বেগুনি রঙের নালতা ফুল

 

 

বারান্দায় ঝুলছে কাঠের খাঁচাশখের ময়নাটা আহ্লাদে খাচ্ছে ভেজা নরম ছোলাঘুলঘুলিতে কবুতর

 

জীবন সুন্দর ছিল তখন

 যেমন হওয়া দরকার

 যেমনটা সবাই চায়

আশা করি বইগুলো তোমাদের কাছে যত্নে থাকবেআবেগের বশে  আপনি থেকে তুমিতে চলে গেলেন রাধামাধব বাবু‘  পুরানো   জিনিস বড় অদ্ভুতকারও কাছে গুপ্তধনকারও কাছে আবর্জনা

এই দুইজন কে ?’ দেয়ালে বাঁধানো সাদাকালো একটা ছবি দেখিয়ে বলল  অহনার বান্ধবী যার নাম অনেক পরে জেনেছিপপি বা  আফিম অমন কিছু

‘  আমরা আমি আর মাধবিলতা’  বললেন রাধামাধব বাবু

 

 

হলদে ফ্যাকাসে আইভরি রঙা ছবিপুরান দিনের হারিয়ে যাওয়া এক জোড়া চলচ্চিত্রের সফল জুটির মত উনারা দুইজনকে জানত যৌবনে রাধামাধব বাবু অমন রাজকুমার ছিলেনআর মাধবিলতা দেবী ছিলেন  পৃথিবীর সেরা রাঙ্গা  রাজকন্যার মত।  যে তার ডালিমফুলের মত রুপ নিয়ে চলে গেছে  বহু দূরে ।     

বাইরে মায়াবী বিকেল

 সন্ধ্যা হব হব করছে

  সূর্যটা  পশ্চিম আকাশে দূরের এক বাড়ির ছাদের ট্যাংকির পানি উপর ঝুলে    জল  খাচ্ছে তেষ্টা পেয়েছে ওর।  

আমরা ফিরে এলামসাথে এক গাদা বইআর স্বর্ণরেণুর মত কিছু স্মৃতি নিয়ে

অহনার সাথে পরিচয় এই ভাবেই

 আসার সময় মোড়ের দোকান থেকে এক পেয়ালা করে  চা খেয়েছি আমরা সবাই  ।  

 

পরের সপ্তাহে আবার গেলাম বই কিনতেতখন শীত পরে গিয়েছিল বেশ ।  রাধামাধব বাবুর বাড়ির  পিছনের   বারান্দায়  বসে  ছিলাম সামনে পিচ্চি এক   পুকুরউপরে ঝুঁকে আছে পেল্লাই এক ডুমুর গাছ।  নিজের ছায়া দেখছে টিয়াপাখির পালকের মত   সবুজ ঘাসদূরে আবছা মত দেখা যাচ্ছে ইশটিশনলাল রঙের গুমটি ঘর।  ঠাণ্ডায় রাধামাধব বাবুর  পুরানো   জানালার শার্শি ঘোলাটে হয়ে আসছিলফেলে আসা দিনের স্মৃতির মত।   

 

 

 রাধামাধব বাবুকে নিয়ে মোড়ের দোকানে বসলাম ।  তখনই জানলাম অহনা একদম চা খেকোতিন পেয়ালা চা একাই খেল।  

ও বলল , ভাত না খেলে যত না খারাপ লাগে  তার চেয়ে বেশি খারাপ লাগে চা খেতে না পারলে

হেসে বললাম-  ‘ আগের জন্মে আপনি নিশ্চয়ই চা বাগানে কাজ করতেনকুলি ছিলেন হয়তো ’  

মুঠো  তুলে   কিল দেখাল  আমাকে

 তৃতীয়বার বই কিনতে গিয়ে শুনি রাধামাধব আর নেইমারা গেছেনকি অদ্ভুত মানুষের এই চলে যাওয়ামাত্র পনের দিন আগেও আমরা মোড়ের চায়ের দোকানে বসে সিরামিকের   পেয়ালা  শূন্য করেছিগল্প করেছি কত।   রাধামাধব বাবুর ছেলের বউকে পেলামদজ্জাল মহিলাআমাদের ভেতরে ঢুকতেই দিল নাবই কেনা বা নেয়া আরও পরের ব্যাপারমৃত শ্বশুরের উপর ভীষণ বিরক্ত  ভদ্রমহিলা।  কেন কে জানে ! গজগজ করে বকুনি দিচ্ছিল

বুক ভরা অচেনা শোক নিয়ে ফিরে এলাম আমরা

রাধামাধব বাবু নেইকিন্তু  আমি আর অহনা খুব ভাল বন্ধু হয়ে রইলামআপনি থেকে তুমিতে চলে গেলাম সহজ সমীকরণে ।   অ্যানসেন্ট এলিয়েন সব পর্ব অহনাকে দিয়েছিলামঅকাতরে।   

 

সপ্তাহে একদিন এক সাথে চায়ের দোকানে বসতামচা খাবার বাজে অভ্যাসটা ওর জন্যই হয়ে গেল এখন রাজ্যের কত ফালতু চা বিক্রি করেকত ঢং চালু হয়েছেকিছু বেকুব নাকি মরিচ চা খায়।   গরম চায়ের মধ্যে ফালি করা মরিচের কুঁচিঅহ কি গাধাসেই সময় আমরা বেছে বেছে  কাব্যিক সব চায়ের দোকান খুঁজে নিতামকফিশপ তখন ও  ততবেশি নাম করেনি এই শহরেএকটা মাত্র কফিশপ ছিল খুব ধনী লোকজন যেতস্টাইল করে কফি খেত।     

আমাদের দিনগুলো ছিল স্বপ্নের মত

 ছোটরঙ্গিনআনন্দের

ভাল লাগার অনুভূতি অন্য রকমফাজিল আর ফচকে ছেলে মেয়েরা যাকে ক্রাশ বলে তেমন না কিন্তু   । এবং আবিস্কার করলাম অহনাকে ভালবাসি ।

 

 

কাজটা মোটেও ভাল নয় । কারন কাউকে ভালবাসার অর্থই, দুঃখের একটা খামার বানিয়ে ফেলা ।

সব মৌসুমেই এই খামারে দুঃখ জন্মাবে ।

এই ফসলের দাম পাওয়া যাবে না ।

আমরা হাঁটতাম মফস্বলের ইট বিছানো ভুট্টার মত পথ ধরে।  খড় কুটো যোগাড় করে কি ভাবে বাসা বানায় পাটকিলে চড়ুই- দেখতামদেখতাম,  বেতফল আর বনতেজপাতার ঝোপপাখিদের বাড়ি ফেরা।    

রেললাইনের ওখানে মিষ্টি কবিতার মত এক পথসেই পথে হাঁটতে গিয়ে পাশাপাশি দুটো গাছ দেখলাম একদিনএকটায় আগুনের ফুলকির মত লাল ফুলঅন্যটায়  মায়াবী হলুদ রঙের ফুল

চেন ওটা ?’ বলল  অহনা

একটা তো  কৃষ্ণচুড়া  আরেকটা হলুদ কৃষ্ণচুড়া

মোটেই নাহাসল সে।  হলুদ ফুলওয়ালা গাছটা হচ্ছে রাধাচুড়া

হায় হায়জানতাম না তো !’

জানোটা কি ! কৃষ্ণচুড়া আর রাধাচুড়া গাছ পাশাপাশি পাওয়া খুব রেয়ারসহজে পাবে নাআর রাধাচুড়া গাছ হারিয়ে যাচ্ছে

রাধা হারিয়ে যায়কংশ থাকে

গাধা কোথাকার

 চেনা আকাশে ভর করে পাখিরা উড়ে যায়বসে গাছের ছায়ায়খুঁটে খায় ঘাসের দানাআমরা দেখি

' পাখিদের চেন ?' বলে অহনা

' কাক আর চড়ুই ছাড়া কিছু চিনি না' অসহায় ভাবে বলি

' মাছরাঙ্গা দেখনি কখনো ? বিলের ধারেফিঙ্গে , বক বা জলপিপি ?'

' দেখলেও চিনি না'

'ঐ যে কমলা উলের বলের মত পাখিটাছাই রঙের পিঠওটার নাম কমলা বউ'

' ছেলে পাখিটা নিশ্চয়ই কমলা জামাই ? '

' আজ্ঞে না মশাই, সবাই তোমার মত চিন্তা করে নাকমলাদামা বলে সবাইআর দূরে যে পাখিটা দেখছ মনে হচ্ছে চোখে কাজল দেয়া , ওটার নাম কসাই '

' পাখির নাম কসাই ?  বিচ্ছিরি নাম।  মাংস বেচে নাকি ?'

' আজ্ঞে না মশাই,  অনেক বেশি পোকা খায়সেইজন্য এই নামনামটা খারাপ লাগল কেন ?'

' আরে নাহ, খারাপ কই ? মদনটাকের চেয়ে তো ভাল'

 মায়াবী বিকেলে  সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে ছিলাম আমরাবিজন ঘাসে ভরা মাঠ চারিদিকেকাঁচপোকা আর কচিলেবু পাতার মত ঘাসফড়িঙেরা ছিল গুলতানিতে ব্যস্ত

' তোমার নামটা মিষ্টি লাগে আমার কাছ ' বললাম একদিন

' যদি আমার নাম অহনা না হয়ে নিত্যকালি সেন হত ভাল লাগত ?'

' মনে হয় না' হাসলাম

' আনারকলির আসল নাম কি ছিল জানো ?'

'নাহ '

'আনারকলির আসল নাম ছিল -কারফুন্নেসা '

' বাপরে'

 মাঘের শেষদিকেই আমগাছে সোনালি রঙের মুকুল ধরে যায়গত শীতেই ওরা সব প্রাচীন পাতা হারিয়েছেসেই জন্য খানিক দুঃখ কষ্ট ছিল গাছের মনেআমরা দেখেছি কালো পিচ ঢালা পথে হলুদ রঙের পাতা পরে ছিলবেহিসাবিএই বার কালচে মেরুন রঙের পাতা দেখা দিল গাছেখুব কচিকয়েকদিনেই পাকা তামার মত রঙ ধরলআরও পরে হয়ে গেল সবুজ

রাজ্যের সব চড়ুই আর টুনটুনি এসে ঠুকরে খেতে থাকে আমের মুকুলওদের চেহারা দেখেই বুঝা যায় মজার কিছু খাচ্ছেতৃপ্তিতে চোখ বুজে যাচ্ছে পাখিদের

' আমের মুকুল দিয়ে যে দারুন টক ডাল খাওয়া যায় জানো ?' হেসে প্রশ্ন করলো অহনা

' মানুষে খায় ? না পাখিরা ?'

' বুঝেছি জীবনেও ভাল মন্দ পাতে পড়েনি'

'এহআমরা খাওয়া শেষ ফালতু টক ডাল খাই না'

' আমি খাইবরইয়ের দিনে বরই দিয়ে, আমড়ার সময় আমড়া দিয়েএছাড়া জলপাই, চালতা, তেঁতুল, করমচা, কামরাঙা, অরবরই দিয়ে আর কিছু না থাকলেও পাকা লেবু দিয়ে আচার বানাইএই তো মুখে জল এসে গেছে তোমারছোঁচা কোথাকার'

 চিরল বিরল লাল কাঁকর বিছানো পথে হাঁটতে গিয়ে পথের শেষ মাথায় পেলাম এক মিষ্টির দোকানসামনে পেতলের থালার উপর ডাই করে রাখা নিমকি আর গুড়ের জিলিপিপেল্লাই এক কালো কড়াইতে দুধ গরম হচ্ছেহলদে সরকাচের মিটসেফের ভেতরে বাউল ভর্তি মিষ্টি সিরার মধ্য সাঁতার কাটছে

লোকজন নেই তেমন

' নিমকি খাবে ?' বলল অহনা'দেখতে বেশ'

টিনের কালাই করা পিচ্চি তশতরিতে নিমকি নিলামঘিয়ে ভাঁজাছিন্নমূল কালিজিরার ছটানোনতা

খেতে খেতে দোকারের দেয়ালে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাঁধাই করা সাদাকালো ছবি দেখে দুইজনেই বেশ অবাক

' বিভু বাবুর ছবি না ?' অবাক হয়ে বলল অহনা' কিন্তু বাম গালে এত বড় জড়ুল ছিল উনার ?'

' তাতো জানি না' সত্য কথাই বললাম আমি

' ছবিটা কার ? বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ?' যে কর্মচারীটা মিষ্টির উপর থেকে মাছি খেদাচ্ছিল তাকেই প্রশ্ন করল অহনা

' নাহ বিবু বাবু নাআমাগো মালিক গদাই চন্দ্র ঘোষগেল বচ্ছর মইরা গেছে' বিরস মুখে জবাব দিল মাছি তারুয়া

এত দুঃখেও আমরা হেসে ফেললাম

হায় অহনা

নিরালা পথের ধারে  কালো  রোগা মত  একটা মেয়ে বসে জঙ্গুলে শাক বিক্রি করতোসাথে ওর বোবা স্বামী।  দুইজনের জামা কাপড়ের অবস্থা কাহিল।  চেহারায়  দারিদ্র আর অপুষ্টিতারপরও হাসিখুশি।  কত পদের হাবিজাবি শাকবাপের জন্মে দেখিনি আগেহেলেঞ্চা আর জলকলমি চিনতামবাদবাকি ভিন গ্রহের শাকসেই ভোরে ওরা নানান জায়গা ঘুরে এই সব জোগাড় করে পশরা সাজিয়ে বসতোঅনেক সময় নিয়ে বেছে বেছে আঁটি বাঁধতো।   কখনো গোলাপি রঙের কলার মোচামাত্র তিনটে হলুদ ভুট্টাছয়- সাতটা  সবুজ টম্যাটো এক মুঠো উচ্ছে

হাঁটতে গেলেই ওদের কাছ থেকে এইসব জিনিস কিনত অহনাদীপাবলির দিন চৌদ্দ শাক খেতে হয়নিয়ম ।    ওল, কেঁউ, বেতো, সর্ষে, , নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, ভাঁটপাতা এবং শুষণীসেইদিন ওদের কাছ থেকে  অনেক কেনাকাটা করতামদুটো পয়সা পেয়ে খুশি হত ওরা।    আহা কি সব দিন গেছে !   

কি নিয়ে কথা বলি আমরা ? জানি নামনে হয় অর্থহীন সব প্রলাপকিন্তু অহনার  কথা শুনে ক্লান্তি আসে না আমারকখনই না।  

 আইভরির মত বিবর্ণ এই শহরে আমরা হেঁটেছিলামপাশাপাশিএখন সেইসব সমুদ্রের নীলাভ রত্নের মত দামি স্মৃতি

বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বর্ণনার মত বাতিল বাসের ডিপো।  হলুদ রোদের দুপুরে বাস থেকে নামতেরোদের রঙ সাইবাবলা ফুলের রেনুর মত ।  শহরের সব   উড়ে যাওয়া  পলাতক মেঘ   অহনার   চুলের খোপায়  বন্দি হয়ে যেত এক লহমায়চিত্তরঞ্জন কটন মিল ছাড়িয়ে গেলে পাঠান ভিলাসাথে আনন্দ কেবিনফুলকো লুচি আর ঘিয়ে  ভাঁজা  বাগদা চিংড়ির কাটলেটের হৃদয়  খুন করা ঘ্রান বনেদি বাড়ির লোহার গেইটে মায়াবিনী বাগানবিলাস।  আমাদের এই শহরটা ও আমাদের মত নিস্পাপ ছিল

সারাক্ষণ অচেনা গুল্মের মিষ্টি ঘ্রান ভেসে আসতো যেন কোন গোপন বাগান থেকে

আমরা হাঁটতামগুড়ের রঙের শিশি ভর্তি বিচিত্র তরল পেট ভর্তি করে  নিয়ে কবিরাজি দোকানপাশে তাজমহল প্রিন্টিং প্রেসমিষ্টির বাক্স হতে খুঁজলির ওষুধের বিজ্ঞাপন ছাপায় ওরা।  সদ্য চুন করা সাদা দেয়ালে লাল রঙে পুঁজিবাদী নিপাত যাক মার্কা শ্লোগানসেঁটে আছে সস্তা সিনেমার বিদঘুটে পোস্টারসবুজ বাতিল ডাবের খোসা জানিয়ে দেয় বর্ষা আসেনি এখনও।  মরচে পরা চাঁদ ঝুলে থাকতো আকাশেফরাসী লণ্ঠনের মতসুখ দুঃখের কত কথা বলতাম কত ।  পথ হয়ে যেত স্বপ্নের মত ক্ষণস্থায়ীবাতাসে কমলার ঘ্রানতুঁতরঙা অন্ধকারকাঁচপোকার ডানার মত সেলুনের ভাঙ্গা জানালা

 ভিক্ষুক, রুটিওয়ালা, সাধু সন্ত আর কাঠ ফড়িঙের মত রিক্সাফেরার পথে কখনো  শুধু   পরাজিত ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোর নীচে দাঁড়িয়ে বলা হয়নি - ভালবাসি

সব সময় মনে পড়ে অহনার কথা।  

 দীপাবলির আগের রাতে চৌদ্দটা প্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে অহনার কথা মনে পড়েনক্ষত্র জ্বলা রাতে ছাদে বসি।   তখনও মনে পড়েপুরানো বই কিনতে গেলে মনে পড়ে।   মনে পড়ে বাদলার দিনে চায়ের  পেয়ালায়  চুমুক দিতে গিয়েগরমের  বাউ কুড়ানি হাওয়ায় মনে পড়েঘাস ফুল উড়ে যায় তখন মনে পড়ে

 নগরের যত দুঃখ আমাকে গ্রাস করে  ।  এই যে বাস্তবতাবেঁচে থাকা এটাও বড় কোন স্বপ্ন না তো ?

 অহনা , বিকেলের রোদ কি মনে রাখে আমাদের ? গাছেরা হয়তোঅনিদ্রায় ভুগতে থাকা এই শহর ? বাইসনের মত রাগি হাওয়া শন শননিদ্রালু বিড়াল স্বপ্ন দেখে সোনালি মাছের স্তূপ নীল বিষে মাখা আকাশ কি জানে , সারা বছর দেবদারু কত পাতা হারায় ? ল্যাম্পপোস্টগুলো বুকঝিম আবেগ নিয়ে পাহারা দেয় রাত্রিগুলোকেবলে- একটু থাকো, তুমি চলে গেলে আমি বেকার

কেন আজকাল পুরানো ঘোড়ার মত বসে স্মৃতির জাবর কাটি ?

বেনামী মেঘের মত ফিরে আসতে যদি !

 দেবলোকের বাতিল কার্পেট ফেলে রেখেছিল সামনেযেগুলো এখন ঘাসের দঙ্গলবিজ্ঞাপনের নিয়ন আলোয় সব সত্য মুছে যায়পকেট ভর্তি স্বপ্ন নিয়ে হাটিরাস্তাগুলো ও যেন মজে যাওয়া নদীলেবেলবিহীন ওষুধের বোতলের মত বাতিল মনে হয় নিজেকে

নিজের ছায়ার সাথে হেঁটে যাই

 কয়েক দিন ধরে বিকেলের পর হাওয়া কেমন যেন পরিচিত লাগেবাগান থেকে পিচ্চি কয়েকটা মথ উড়ে আসে কামরায়সোনালি রঙেরডানায় হলুদ ফোঁটাবাচ্চারা কাগজের বিমান বানায় যেমন সাইজের মথটা দেখতে সেই রকমস্বর্ণের কুঁচি দিয়ে বানানো যেনকি নাম ওর ?  আর কেউ না জানলেও অহনা জানবে ।  

অহনা বোধহয়   চা পছন্দ করে না আজকালফেইসবুকে নামি সব কফিশপের ছবি সহ চেক ইন দেয়সাথে হাসি হাসি মুখের ছবিদেখা হলে জিজ্ঞেস করব  রুমঝুমপুরের   এই চায়ের দোকানে একবার বসবে কি না দেখাটা হয় না আজকাল

 কিছু মানুষ দূরে চলে যায়

 এমনিতেই

     

 

 

 

  


মন্তব্যসমূহ

  1. এই গল্পটা পড়বো বলে ছাপার মূল্যের দ্বিগুণ খরচ করে ওপাড় থেকে সবুজ বসন্ত বইটি আনিয়েছিলাম!

    অহনারা হারিয়ে যায়, স্মৃতি রেখে যায়, আর সাথে রেখে যায় তাদের কিছু অভ্যাস।

    রুবির ছিলো কফির নেশা, দিনে ৫-৬ মগ কফি না হলে তার চলতো না। বাজারের চলতি ইনস্ট্যান্ট কফিতেও তার মন বসতো না, নিজে কফিবীজ কিনে সেসব প্রক্রিয়া করে গুড়ো করে কাঁচের জার ভরে রাখতো। একেকটা মুক্তোদানার মতোই সে এসব কফির দানাকে ট্রিট করতো। তার পাল্লায় পরে কফির নেশায় ধরেছিলো, দিনে দুইতিনমগ আমারও খাওয়া হতো।

    এখন তার স্টুডেন্টরা ফেসবুকে ছবি দিলে দেখি তার সামনে টিব্যাগ ঝোলানো চায়ের কাপ, সম্ভবত কফির বদলে সে চায়েই স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পেয়েছে।
    আমি অবশ্য কফিতেই আটকা পরে আছি, ছাড়তে পারি নি৷ মাঝেমধ্যে মনে হয়, একআধটা নেশার বস্তু থাকা খারাপ না, বেঁচে থাকার কারণ হিসাবে আরেকটু জোর দেয়।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...