নিখুঁতভাবে খুন করা একটি শিল্পকর্ম।
শুনতে একটু কেমন মনে হলেও আসলে ব্যাপ্যারটা তাই।অন্তত রুমানা তাই মনে করে।
কাজেই যখন নিখুঁতভাবে রুমানা ওর স্বামী মাহবুবকে হত্যা করল,এবং পুলিশ এর কোনও সুরাহা করতে পারল না,তখন খুশিতে বগল বাজাতে ইচ্ছে করল ওর।কিন্তু উপর দিয়ে দিয়ে মুখটা এমন বিমর্ষ করে রাখল, দেখে মনে হল,স্বামীর মৃত্যুতে ওর প্রাণ পাখিটা দুঃখে খাঁচা ছেড়ে যেকোনো মুহুর্তে উড়ে যাবে।
অভিনয় ভালোই করল রুমানা।সবাই স্বীকার করতে বাধ্য হল,মেয়েটা স্বামীর দুঃখে সত্যিই দুঃখিনী।ওর কান্না দেখে থানার বড় দারোগা নিজেই রুমাল এগিয়ে দিয়ে ছিল চোখ মোছার জন্য।
এবং অবশেষে সবকিছু ভালভাবেই মিটল ,কোনো ঝামেলা ছাড়াই।স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে একা হল শেষ পর্যন্ত রুমানা।
রুমানা একজন লেখিকা।মাত্র অল্পদিন হল লেখালেখি শুরু করেছে।অল্পদিন মানে দেড় বছর।বই লিখেছে চারটে।মাত্র চারটে বই লিখে বাংলাদেশে জনপ্রিয় হওয়া প্রায় অসম্ভব।সবার ধারণা এদেশে লেখকদের গন্ডায় গন্ডায় লিখতে হয়।দিনরাত চেয়ার টেবিলে বসে খস খস করে শুধু লিখতেই হয়।বই বের করতে হয় বইমেলার সময়।নইলে সব বই গুদামে পড়ে থাকে,ইত্যাদি।রুমানার বেলায় সহজ চলতি এই ধারণাগুলো খাটল না।
রুমানার সহজ সরল লেখার ভঙ্গি।টান টান কাহিনী,কলজে কাঁপানো সংলাপ,ঘটনার ঘনঘটা আর আকস্মিক মোড় ঘোরা,সব মিলিয়ে প্রথম বইটা দারুন চলল বাজারে।ইংরেজরা যেটাকে বলে হটকেকের মত বিক্রি হওয়া।
প্রকাশক দারুণ খুশি।
এমনিতে নতুন লেখকদের বই চলতে চায়না।কিন্তু রুমানা তার জন্য পয়মন্ত।জিজ্ঞেস করল প্রকাশক,ম্যাডাম,আরো একটা দিতে পারবেন?
‘না’করার কোনো কারন নেই।রুমানা খুশি।ছোটবেলা থেকেই ওর স্বপ্ন ছিল লেখিকা হবে।আলমারি ভর্তি থাকবে ওর লেখা বই।আর লিখতে কোনও ক্লান্তি নেই তার।কাগজ আর কলম হলেই হবে।যে কোনো পরিবেশে বসেই লিখে ফেলতে পারে ইটের মত ঢাউস কোনও উপন্যাস।
তবে সমস্যা একটাই।রুমানা একটা বিষয় নিয়েই লিখতে পছন্দ করে।সেটা হচ্ছে খুন।হত্যাকান্ড।আগাথা ক্রিস্টি তার আইডল।মনে প্রাণে সে বিশ্বাসও করে,চাইলে আগাথা ক্রিস্টির চেয়ে ভাল লিখতে পারবে সে একদিন না একদিন।
হেনরি স্লেসারের ছোট গল্পগুলোও পছন্দ করে রুমানা।সবই খুনের গল্প।কী চমৎকার দক্ষতায় খুনি খুনগুলো করে!অদ্ভুত!অতুলনীয়!
এ ধরনের কাহিনী লিখবার সময় দারুণ উত্তেজনা বোধ করে সে।কাজেই একের পর এক লিখে যায় সে তিনটে উপন্যাস।সবই খুনের কাহিনী।পাঠক সেগুলো দারুণ পছন্দ করে।বইগুলোর বিক্রি দেখে পুরনো লেখকরা বেশ বিরক্ত হন।এ আবার কে এল তাদের ভাতের হাঁড়ি ধরে টান দিতে!
রুমানার স্বামী মাহবুব,স্ত্রীর গর্বে বুকটা চিতিয়ে চলাফেরা করেন।কয়জনের থাকে এমন লেখিকা স্ত্রী।তা-ও আবার রহস্য উপন্যাস লেখিকা।
মাহবুবের বয়স পঞ্চাশ।দেখতে আরো বেশি বুড়ো মনে হয়।অত্যাধিক আয়েশী জীবন-যাপন করার ফল।পূর্ব পুরুষের রেখে যাওয়া মার্কেট,দোকান আর বাড়ি ভাড়ার টাকা তুলে খায়।কাজ করতে হ্য়না।
রুমানার বয়স পয়ত্রিশ।দেখে অবশ্য আরো কম বলে মনে হয়।এদের দুজনের বয়সের এই বিরাট ব্যাবধান থাকার পরও এরা সুখী।অন্তত লোকজন তো তাই বলত।কোনো একটা অজানা রসায়ন কাজ করত এদের মধ্যে।
আর আপনি তো জানেনই,ভালবাসার মূল উপাদান হচ্ছে দুজন নর-নারীর মধ্যকার রাসায়নিক উপাদানগুলোই,আর কিছু না।অন্তত রসায়নবিদরা তো তাই বলেন।এটা আমার কথা না।
লিখতে গিয়ে রুমানা আবিষ্কার করল আর সবকিছুর চেয়ে তার কাছে লেখাই বড়।এর মধ্যে ডুবে যেতে পারে সে,ঘন্টার পর ঘন্টা।প্রহরের পর প্রহর।সে ছিল প্রশংসা লোভী।পাঠকদের প্রশংসা,চিঠিপত্র,ই-মেইল,স্তুতি,দারুণ পছন্দ করত।অন্য লেখকদের খুন খারাপির গল্প পাঠক ছুঁয়েও দেখে না।
অথচ তার বইগুলো একটার পর একটা মূদ্রণ হচ্ছেই।দারুণ ব্যাপার!
হঠাৎ করেই এক রাতে বুদ্ধিটা মাথায় এল রুমানার।নিখুঁত একটা হত্যারহস্য নিয়ে আরও ভাল একটা রহস্যোপন্যাস কীভাবে লেখা যায়?
কীভাবে?
সে নিজে যদি একটা খুন করে!কেমন হয়?আর সেই ঘটনার উপর ভিত্তি করেই লিখে ফেলতে পারে একটা দারুণ জমজমাট রহস্যোপন্যাস।
বিদেশি একটা ম্যাগাজিনে একবার পড়েছিল রুমানা,অনেকেরই ধারণা এডগার এলান পো নিজে নাকি একটা হত্যা করেছিলেন।তাঁর লেখা কোনও এক গল্পের সাথে হুবহু মিলে গিয়েছিল এক হত্যার ঘটনা।
দিনরাত অনেক ভাবল রুমানা।
আর আপনি নিশ্চয়ই জানেন,হত্যা করার জন্য কাছের মানুষই সবচেয়ে সেরা।ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে অচেনা কারো সাথে প্রতারণা বা বিশ্বাসঘাতকতার চেয়ে নিজের কাছের লোক যেমন-বন্ধু-বান্ধব,আত্মীয়-স্ব্জন বা ভাই বোনদের সাথে ওগুলো করা অনেক সহজ!
রুমানা বেছে নিল মাহবুবকে।
হত্যা করার জন্য বিষ দারুণ একটা জিনিস হতে পারে।যদি পোস্টমর্টেমে সেটা ধরা না পরে।অথবা মৃত ব্যাক্তির শরীরে বিষক্রিয়ার কোনো লক্ষণ ফুটে না ওঠে।
নেপলিয়নকে পর্যন্ত আর্সেনিক বিষ দিয়ে ধীরে ধীরে হত্যা করা হয়েছিল।
প্রাচীন ভারতে রাজনৈ্তিক সব গুপ্তহত্যার জন্য বিষ ব্যাবহার করা হত হরদম।এমনকী বিষকন্যা পর্যন্ত ব্যাবহার করা হত।
প্রাচীণ মিশরে বিষের ব্যাবহার চলত জলভাতের মত।সেই পাঁচ হাজার বছর আগে আর্সেনিকের মত বিষের ব্যাবহার জানত সে সময়ের ফারাওদের পুরোহিতেরা।ব্যাবহারও করত।পিরামিডের গুপ্ত স্থানে যে সব রাজার মমি রাখা ছিল ,সেগুলোতে এবং সমস্ত ধনরত্নে কায়দা করে বিষ মাখিয়ে রাখত।কত অভিযাত্রী সেই সব গুপ্তধন আর মমি স্পর্শ করে বিষে আক্রান্ত হয়ে রহস্যজনক ভাবে মারা গেছে!
আরব্য রজনীতে বিষ দিয়ে মানুষ মারার দারুন একটা গল্প আছে!
এক বাদশাহর ছিল একজন হেকিম।চমৎকার চিকিৎসা করতে পারত সেই হেকিম।বাদশাহ যখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল,তখন কোনও এক দূরদেশ থেকে এই হেকিম এসে তার চিকিৎসা দিয়ে বাদশাহকে সুস্থ করে তুলেছিল।সেই থেকে হেকিম বাদশাহর খুব প্রিয় ছিল।
এতে অন্যান্য হেকিমদের গা জ্বলে যেত।তারাই নানা রকম উস্কানি দিয়ে বাদশাহকে উত্তেজিত করে তোলে।তাদের যুক্তি,যে হেকিম দাওয়াই দিয়ে মৃতপ্রায় মানুষকে সুস্থ করে তুলতে পারে,সে নিশ্চয়ই ইচ্ছে করলেই শুধু ওষুধ দিয়েই যে কাউকে মেরে ফেলতে পারে!
বাদশাহরও বলিহারি বুদ্ধি!রেগে গিয়ে জল্লাদদের বলল,হেকিমের গর্দান নিতে। হেকিম বেচারা সব শুনে বাদশাহকে অনুরোধ জানিয়ে বলল,তার গর্দান নেয়ার পর তার কাটা মুন্ডুটা যেন বাদশাহ একটা প্লেটে করে টেবিলের উপর রাখে।তারপর তার পুঁথিটা খুলে বাদশাহ যে কোনো প্রশ্ন করলেই সেই কাটা মাথাটাই বাদশাহর সব প্রশ্নের উত্তর দেবে।
ব্যাপারটা এতই চমকপ্রদ আর আকর্ষণীয় মনে হল যে তৎক্ষণাৎ হেকিমের শেষ অনুরোধ রাখা হল।হেকিমের ঘর থেকে আনা হল সেই মহামূল্যবান পুঁথি।বাদশাহর সামনের টেবিলে রুপার প্লেটে রাখা হল হেকিমের কাটা মুন্ডু।সারা দরবারের সব লোক অবাক হয়ে দেখতে লাগল এই অশৈ্লী ব্যাপার-স্যাপার।
পুঁথি খুলে প্রশ্ন করে যেতে লাগল মহামতি বাদশাহ।আর সত্যি সত্যি হেকিমের সেই কাটা মুন্ডু উত্তর দিয়ে যেতে লাগল বাদশাহর সব প্রশ্নের।
বাদশাহ একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে লাগল।তার কাছে দারুণ একটা থ্রিলের মত লাগছে ব্যাপারটা।সমস্যা হচ্ছে পুঁথিটা এতই পুরনো যে পাতাগুলো সবই একটার সাথে আরেকটা সেঁটে আছে।নিজের তর্জনী জিভে ভিজিয়ে সেই থুথু দিয়ে বারবার পৃষ্ঠা উল্টে যেতে লাগল বাদশাহ।যখন শেষে পৃষ্ঠা এল,ততক্ষণে বাদশাহর সারা শরীরে যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে।তেষ্টা পাচ্ছে তার,চোখে অন্ধকার দেখছে।
তখন হেকিমের কাটা মুন্ডুটা হেসে বলল,জনাব ভোঁতা বুদ্ধির বাদশাহর কাছ থেকে কৃ্তজ্ঞতা আশা করা যায়না কখনই।আমি আপনার প্রাণ বাচিয়েছিলাম,সেটা আপনি দিব্যি ভুলে গেছেন চাটুকারদের পাল্লায় পড়ে।
আপনি এরকম কিছু করতে পারেন আমার আগেই ধারণা হয়েছিল।তাই এই পুঁথির প্রত্যেকটা পৃষ্ঠায় আমি বিষ মাখিয়ে রেখেছিলাম আগেই।আপনি পাতা উল্টানোর সময় সেই বিষ একটু একটু করে প্রত্যেকবার চলে গেছে আপনার জিভে।এখুনি মারা যাবেন আপনি।কোনোও হেকিমই আপনাকে সুস্থ করে তুলতে পারবেনা।এটাই আমার প্রতিশোধ।
হেকিমের কথা শেষ হওয়া মাত্র বাদশাহ চিৎকার করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
কী দারুণ থ্রিল!একেবারে জেমস হ্যাডলি চেজের রহস্যোপন্যাসের মত।
ভাবতে থাকে রুমানা।মাহবুব তাকে পাগলের মত ভালবাসলেও রুমানা ঠিক ততটা টান অনুভব করেনা।লোকটা এক্কেবারে ক্ষ্যাত।ভুলেও কোনও বই পড়েনা।কবিতা পছন্দ করেনা।জামা কাপড়ের ম্যাচ বোঝেনা।সবুজ গ্যাবার্ডিনের প্যান্টের সাথে হলুদ টি-শা্র্ট পরে।শব্দ করে চা খায়।বিচ্ছিরি ঢেকুর তোলে।আরো কত কী! এক কথায় অসহ্য।
অথচ রুমানার ভক্তদের মাঝেই রয়েছে কত আকর্ষণীয় চেহারার যুবক!
ভাবতে থাকে রুমানা।
কলেজ জীবনে রুমানার সাবজেক্ট ছিল কেমিস্ট্রি।কাজেই সে তার চেনা পথ ধরেই এগিয়ে গেল।খুব সহজেই যোগার করে ফেলল কিছু আর্সেনিক।একটা পরিমাণে প্রতিদিন খাবারের সাথে মাহবুবকে পরিবেশন করতে লাগল জিনিসটা।
তিন্ বেলা!প্রত্যেকদিন!
আর্সেনিক বা সীসার চমৎকার একটা গুণ,এটা শরীরের প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে বিকল করে ফেলে।কোনও ডাক্তারের বাপও ধরতে পারবেনা।
অসুস্থ হতে লাগল মাহবুব।চিকিৎসার জন্য ছুটতে লাগল নানা ডাক্তারের চেম্বারে।কেউ বুঝতেই পারছেনা কী হয়েছে তার।ধীরে ধীরে চুল পড়ে যেতে লাগল।এমনই হবার কথা।মনে মনে দারুণ মজা পাচ্ছে রুমানা।নিজের কাহিনির প্লটটাও এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।
গুরুতর অসুস্থ হতেই মাহবুব তার সয় সম্পত্তি লিখে দিল স্ত্রীর নামে।এটাও রুমানার হিসেবের মধ্যে ছিল।
তবে এত কিছুর পরও মাহবুবের চোখে চোখ রাখতে গিয়ে ভয় পেত সে।মনে হত,এই বুঝি ধরা পড়ে গেল সে।মাহবুব কি কিছু বুঝতে পারছে?হবে হয়ত।নইলে কখনো কখনো এমনভাবে তাকায় কেন ওর দিকে?এ কী ভালবাসাপূর্ণ চাহনি?না কি…
ব্যাপারটা আর টেনে লম্বা করতে চাইল না রুমানা।এর মধ্যে এক দুপুরে হাঁপানির টান উঠল মাহবুবের।চিৎকার করে রুমানাকে বলল,ইনহেলারটা নিয়ে আসতে।পাশের ঘরেই আছে সেটা।শরীর এত দুর্বল হয়ে গেছে বেচারার, যে আজকাল বিছানা ছেড়ে উঠতেও কষ্ট হয়।
পড়িমড়ি করে ছুটল রুমানা পাশের রুমে।যেম ইনহেলারটার জন্য নরকের শেষ রাস্তায় যেতে পারে সে।তারপর দরজা বন্ধ করে বসে টিভি দেখতে লাগল।বাংলা একটা সিনেমা চলছিল-‘রাস্তার ছেলে ফকিরনীর মেয়ে’বা এই রকম একটা নাম।
প্রায় বিশ মিনিট পর বেডরুমে এসে উকি দিল রুমানা।ততক্ষণে…
হাসপাতালে ফোন দিল সে।পারিবারিক ডাক্তার মৃধা ছুটে এলেন।পুলিশ এল খামোকাই।ধনী মারা গেলে এরা আসে নানান ফায়দা লুটতে।ভাবখানা,পুলিশ জনগনের বন্ধু।
খুব দ্রুত সব নিষ্পত্তি হল।
প্রচুর শোকবার্তা পেল রুমানা।প্রকাশক পাঠক আর শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে।
মাহবুবকে কবর দিয়ে সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ফিরল রুমানা,তখন বেশ ভালই লাগছিল তার।নিজেকে মুক্ত পাখির মত মনে হচ্ছিল।বিশাল্ এই বাড়িতে সে একা।সম্পুর্ণ স্বাধীন।যতক্ষণ খুশি লিখতে পারবে।যখন খুশি ঘুম থেকে উঠতে পারবে।কেউ তাকে শাষন করার জন্য নেই।আহ কী শান্তি!
সবচেয়ে বড় কথা নতুন উপন্যাসের প্লটটাও পেয়ে গেছে সে ইতোমধ্যে।
এক কাপ কড়া ইন্দোনেশিয়ান জাভা কফি তৈরী করল সে নিজের জন্য।কাজের মানুষ দুজন সকালে আসবে।কুছ পরোয়া নেই।টুকটাক ব্যাপারগুলো সে একাই সামাল দিতে পারে।
কফি শেষ করে কাগজ কলম নিয়ে বসল।নিজের বানানো প্লটটা এবার লিখে ফেলা যাক।কাগজ কলম নিয়ে বসলেই হাত চল্র রুমানার।আজকে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল চেষ্টা করেও লিখতে পারছে না কিছুতেই।এটাই কি রাইটার ব্লক(writer block)যা কিনা প্রায় প্রত্যেক লেখকের জীবনে একবার করে হলেও ঘটে।হাজার চেষ্টা করলেও এ সময় লেখক কিছু লিখতে পারেনা।বইপত্রে এই ব্যাপারটা পড়েছে সে।
প্রায় ঘন্টা খানিক কাগজ কলম নিয়ে বসে থাকার পর হাল ছেড়ে দিল রুমানা।থাক,আজ আর লেখার দরকার নেই।
টিভিটা ছেড়ে ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসল।কিছুক্ষণ টিভি দেখা যাক।বেডরুমে ওয়াইল্ড টার্কির একটা বোতল আছে।একবার ভাবল গিয়ে নিয়ে আসা যাক।এসব জিনিস ওর খারাপ লাগেনা।এমন সময় হালকা কাশির শব্দটা পেল সে।বেডরুম থেকেই আসছে।
প্রথমে ভাবল মনের ভুল।একা থাকলে এরকম কত শব্দই শোনা যায়।মগজ গরম হলে নাকি এরকম হয়।কিন্তু আবার যখন কাশির শব্দটা শুনতে পেল ঝপ করে টিভির ভলিউম কমিয়ে দিল।খরগোশের মত কান খাড়া করে রইল।মিনিট খানেক কেটে গেল চুপচাপ।কোনও শব্দ নেই।দেয়ালে শুধু একটা টিকটিকি ‘টিকটিক’ করে শব্দ করে উঠল।ভারি একটা ট্রাক শব্দ করে চলে গেল দুরে কোথাও।
মনে মনে হেসে আবার টিভির ভলিউমটা বাড়াতে যাবে,এমন সময় আবার শুনতে পেল শব্দটা।কেউ কাশছে।বেডরুমের ভেতরে।চোর!চোর এসে লুকিয়ে আছে?
বিড়ালের মত শব্দহীনভাবে উঠে দাড়াল রুমানা।পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল বেডরুমের দরজার সামনে।এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল।তারপর ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলল ভারী কাঠের দরজাটা।বিছানায় সাইড ল্যাম্পটা জ্বলছে।তাতে হালকা সবই দেখা যাচ্ছে ভেতরটা।
রুমানা যদি দেখত বিছানায় একটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার শুয়ে আছে অথবা দশ মাথা ওয়ালা কোনও দানব,তাতেও বোধহয় এতটা চমকাত না।বদলে দেখল বিছানাতে শুয়ে আছে মাহবুব।অসুস্থ,রোগাক্রান্ত!মাথায় চুল নেই।উজ্বল চোখে চেয়ে আছে রুমানার দিকে।চেয়েই আছে।কিছু বলছে না।
রুমানার মনে হল অনন্তকাল ধরে সে দাড়িয়ে আছে দরজার সামনে।বাইরের পৃথিবীতে কেটে গেছে কোটি কোটি বছর।হুঁশ ফিরল যখন,মাহবুব দুর্বল গলায় বলল,এক কাপ কফি দেবে রুমানা?
আতঙ্কে কাপতে কাপতে দরজাটা বন্ধ করে দিল সে।এ কী দেখছে!দুঃস্বপ্ন!নাকি হ্যালুসিনেশন!
সোজা ছাদে চলে এল সে।ঠান্ডা খোলা বাতাস দরকার এই মুহুর্তে।রাত বেশি হয়নি তখন।ফাল্গুন মাস।আবহাওয়াটা দারুণ।চমৎকার বাতাসে শিরিসের ডাল পালাগুলো শব্দ করছে।
ঘন্টা খানেক ছাদের উপর হেঁটে বেড়াল।মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে বলল-যা দেখেছি ভুল দেখেছি।শেষে মনটা শক্ত করে নীচে নেমে এল।দুরুদুরু বুকে গিয়ে দাড়াল বেডরুমের বন্ধ দরজার সামনে।মনের সব শক্তি একত্র করে হালকাভাবে ধাক্কা দিল দরজাটা।ধুকপুক করছে বুকের ভেতরটা।
অনেক সময় নিয়ে ধীরে ধীরে খুলে গেল দরজাটা।ভেতরে কেউ নেই।
শূন্য।
স্বস্তির নিঃশ্বাসটা ফেলে কাঁপা কাঁপা গলায় হেসে উঠল রুমানা।চলে এল ডাইনিংরুমে।ফ্রিজ থেকে বিরিয়ানীর প্যাকেট বের করে মাইক্রোআভেনে গরম করে নিল।তারপর সেরে ফেলল রাতের খাবার।আরও এক কাপ কড়া কফি বানিয়ে চলে এল লেখার টেবিলে।লেখা দরকার।
এবার আর অসুবিধে হলনা।কাগজ কলম নিয়ে বসতেই তর তর করে লেখা বেরোতে লাগল।মাত্র এক পাতা লিখেই চমকে উঠল।আসব কী লিখে যাচ্ছে সে!আতঙ্কে শরীরটা হিম হয়ে গেল।শুধু একটা বাক্যই লিখে গেছে সে পৃষ্ঠা ভর্তি করে।বারবার অসংখ্যবার।
আমার স্ত্রী রুমানা আমাকে হত্যা করেছে।
আমার স্ত্রী রুমানা আমাকে হত্যা করেছে।
আমার স্ত্রী রুমানা আমাকে হত্যা করেছে।
আমার…
সবচেয়ে ভয়াল ব্যাপ্যারটা হল,হাতের লেখাটা তার নয়।মাহবুবের।যেন মাহবুব লিখে রেখে গেছে!টান দিয়ে পৃষ্ঠাটা ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ফেলল রুমানা।তারপর ফেলে দিল পেপার বিনে।নতুন একটা কাগজ নিয়ে আবার লেখা শুরু করল।এবং আবিষ্কার করল;এবারও একই বাক্য লিখছে সে।বারবার।এবং হাতের লেখাটা মাহবুবের।
ছিড়ে ফেলে দিল পৃষ্ঠাটা।নতুন আরেকটা পৃষ্ঠা নিয়ে আবার লেখা শুরু করল।একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে লাগল বারবার।
অদ্ভুত একটা পাগলামী যেন চেপে বসেছে রুমানার ভেতর।পাগলের মত সে লিখে যাচ্ছে সে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা।টান দিয়ে ফেলে দিচ্ছে সেটা মেঝেতে।কারণ-হাতের লেখাটা মাহবুবের।আর ওই একটা বাক্যই সে লিখছে বারবার।অশ্লীল আর বিচ্ছিরি বাক্যটা।
কতক্ষণ সে ভূতগ্রস্থের মত লিখে গেছে বলতে পারবেনা।ততক্ষণে মেঝেতে অসংখ্য কাগজ জমে গেছে।লেখা থামাতে বাধ্য হল,কারন বেডরুমের বাইরে এসে দাড়িয়েছে মাহবুব।মুখে হাসি।
চোখদুটো উজ্বল।মাথায় চুল নেই।রোগাক্রান্ত,বিষন্ন চেহারা।তারপরও হাসছে!কাঠের পুতুলের মত চেয়ারে বসে রইল রুমানা।উঠে দৌড় দেবে সে শক্তিটুকুও নেই।ধীরে ধীরে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে মাহবুব এগিয়ে গেল রান্নাঘরে।কেবিনেটের ভেতর থেকে বের করে আনল গুড়ের মত লালচে রং-এর শিশিটা।বিষ ভর্তি।রুমানাই লুকিয়ে রেখেছিল সেটা এতদিন।
ছোট্ট সাদা একটা পেয়ালাতে ধীরে ধীরে বিষটুকু ঢালল মাহবুব।তারপর অভিজাত ক্যাফের ওয়েটারদের মত সম্ভ্রান্ত ভঙ্গিতে রাখল সেটা রুমানার সামনে।হাসি হাসি মুখে চেয়ে রইল রুমানার দিকে।সে দৃষ্টিতে না আছে কোনও রাগ,না ক্ষোভ বা হিংসা।
***
পরদিন পুলিশ এসে দরজা ভেঙ্গে ঢুকল ভেতরে।
‘সত্যিই,মহিলা দারুণ ভালবাসতেন তাঁর স্বামীকে,’বলল প্রথম অফিসার।‘এরকম স্ত্রী পাওয়া দারুণ ভাগ্যের ব্যাপার।’
‘ঠিকই বলেছেন,স্যার,’সায় দিল দ্বিতীয় অফিসার।অপেক্ষাকৃত তরুণ সে।সদ্য জয়েন করেছে।স্বামীর মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরে হার্টফেল করে মারা গেছেন বেচারী।’
চুক চুক করে দুঃখ প্রকাশ করলেন প্রথম অফিসার।তাঁদের সামনে লেখার টেবিলে বসে আছে রুমানা।মাথাটা চেয়ারের পেছন দিকে ঠেস দেয়া।লম্বা চুলগুলো ঝুলছে।বড় বড় চোখ দুটো খোলা,নিস্প্রাণ দৃষ্টি।রুমানার সামনে টেবিলের উপর এবং মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে একগাদা সাদা কাগজ।সব সাদা।কখনোই কিছু লেখা হয়নি তাতে।পেপার বিনে কিছু কাগজের কুঁচি।সেগুলোও সাদা।কখনোই কিছু লেখা হয়নি।
তার সামনে সুন্দর একটা পেয়ালা।এক সময় কফি ছিল,এখন খালি।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন