বাইরে ঝিমঝিমে দুপুর ।
ছেলেটা নোংরা একটা বলে লাথি মেরে খেলছে ।
চামড়ার বল। তবে অনেকগুলো তাপ্পি মারা।
নীল সাদা লম্বা স্ট্র্যাপ্ করা এক ধরনের পলিথিনের ব্যাগ বাজারে পাওয়া যায়। সেটা তলার দিক কেটে কায়দা করে গায়ে চাপিয়েছে সে। ব্যাগের হাতলের জায়গা দিয়ে ওর দুই হাত বের হয়েছে। মনে হচ্ছে জার্সি পরে আছে। আর্জেন্টিনার জার্সি ।
কোন সঙ্গী নেই। একাই খেলছে। ধমাধম লাথি মারছে মনের সুখে। আমাকে দেখে খুশি হল। চুনু মাছের চোখের মত বড় বড় চোখে চেয়ে রইল। অনেকক্ষণ ।
হতাশ হল সে। আমি হেঁটে যাচ্ছি বলে।
রোদটা যেন নীলগিরি পাহাড়ের চিতাবাঘের চোখের মত। উজ্জল - হলদে সোনালি । সেই রোদে উড়ে যাচ্ছে ঘাসের ফুল।অচেনা স্পেসশিপের মত। বাতাস ভর্তি রোদের ঘ্রান ।
দূরে বিপিন বাবুর আম বাগান। গাছগুলো ঝুঁকে আছে পুকুরের উপর। লাল টুকটুকে আম। বাংলা সংখ্যায় ৫ এর মত। সিঁদুরে আম বলে। পুকুরের তলায় বড় জিয়ল মাছের ছায়া ভেসে যায় ক্যাপ্টেন নিমোর সাবমেরিনের মত ।
মানুষ বাজে কথা বলে। পুকুরের জিয়ল মাছ নাকি আসলে মাছ না। খারাপ মানুষের আত্মা। মরার পর মাছের চেহারা নিয়ে বেঁচে আছে। ঠিক দুক্কুর বেলা কাউকে একা পেলে টেনে নেয় পুকুরের জলে। পুকুর ভর্তি পানা। ভয়ে কেউ যায় না মাছ ধরতে। কালচে গোলাপি কচুর দঙ্গল পুকুরের দুই পারে। থির থির করে কাঁপে। পুকুরের জলে হাটে কাচপোকা। স্টিং রে- মাছের মত ভাসে পদ্মপাতা। শ্যাওলার দঙ্গল যেন পান্নার খনি।
আমি হাঁটতে থাকি। কত কিছু দেখা বাকি।
দীঘল সবুজ ঘাসের শনশন শব্দ শুনি বাতাসে ।
হতে পারে ওরা কথা বলছে।আমরাই শুধু বুঝতে পারি না। গাছেরা ঠিকই বুঝে নেয়।
আকাশের রঙ ঘন নীল। কেউ যেন ইচ্ছা মত ক্রেয়ন পেন্সিল ঘষে দিয়েছে । সাইবাবলার হলুদ ফুল নীল আকাশের গায়ে অদ্ভুত লাগে। বিদেশী ক্যালেন্ডারের মত।
মস্ত এক বড়লোক বাবুর শাদা বাড়িতে ভিনদেশী এক গাছ বেয়ে উঠেছে আহ্লাদে। ফিকে গোলাপি ফুল ভর্তি। মনে হয় পাতলা রঙ্গিন কাগজ কেটে বানান। আমি গেইটফুল বলি । বোগানভেলিয়া না কি যেন আসল নাম। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আদর করে ‘ বাগানবিলাস ’ নাম রেখেছিলেন। বড় মনের মানুষেরা সুন্দর নাম রাখতে পারেন ।
দুপুরের পথগুলো সুনসান। কারও বাড়িতে রেডিও বাজে। বিজ্ঞাপন তরঙ্গ। কি এক আলকাতরা ব্যবহার করতে বলছে বিজ্ঞাপনে। ওতে নাকি টিনের চাল মাছের জাল আর নৌকার তলি নষ্ট হয় না।
এক বাড়ির বারান্দায় বসে কাগজের বাক্স বানাচ্ছে বুড়ো এক লোক । আর তার ছেলের বউ। বাক্স বানান হয়ে গেলে মিষ্টির দোকানে নিয়ে বিক্রি করে বুড়ো। অন্ধ এক ফকির বসে বসে গায়ের ঘামাচি গালছে। সামনে অ্যালুমিনিয়ামের থালা, বিবর্ণ কয়েকটা পয়সা। ফকির অন্ধ বলে নতুন ঝিকিমিকি করা নক্ষত্রের মত পয়সা দেয় না কেউ।
গুণগুণ করে গান গাইছে ফকির- “ ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মাদ এলো রে দুনিয়ায় । আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়...।”
আকাশে কয়েকটা ঘুড়ি। আর কয়েকটা চিল। তামার পাতলা টুকরো কেটে যেন বানান হয়েছে চিলগুলো। ঘন রোদের জন্য কাকগুলো মনে হচ্ছে নীল রঙের।
একটা লোক শুধু দানা বিক্রি করে গলির মোড়ে। কুমড়ার দানা, লাউয়ের দানা, লালশাকের দানা। মোট কথা সব সবজি আর ফলের দানা বিক্রি করে। বড় বড় টিনের কৌটা ভর্তি দানা। লেবেলে ইংরেজিতে কি সব লেখা। সামনে বাসি খবরের কাগজ বিছানো। ওখানেই যত্ন করে রাখা বিচিত্র সব দানা।
পাশে চিত্রলেখা হাউজ। ওরা ছবি বাঁধাই করে আর সাইনবোর্ড লিখে।যেমন - বাড়ি ভাড়া দেয়া হবে। TO- LET । প্রবেশ নিষেধ। কুকুর হইতে সাবধান । হেন তেন।
পথের ধারে ভিন গলির মোড়েই আবিস্কার করলাম অদ্ভুত এক অচেনা গাছ।
নাম জানি না। জীবনেও দেখিনি। ঝাঁকড়া মত গাছ। গাছ ভর্তি ফল। ফলের জন্য পাতা দেখা যাচ্ছে না। সবুজ পান্নার মত কাঁচা ফল। আবার চুনির মত লাল পাকা ফল।গাছের তলায় স্তূপ হয়ে আছে পাকা ফল। ওরা বেশি পেকে ঝরে গেছে। কি ফল এটা ?
ভয়ে ভয়ে মুখে দিলাম। মিষ্টি। ভেতরে চিনির দানা ভর্তি। কি স্বাদ ! আরও কয়েকটা মুখে দিলাম। কেন বাসায় এই ফল আনা হয়নি ? জামার বুক পকেটে ভরে নিলাম কতগুলো অমৃত ফল। বাড়ি ফিরে মা কে দেখাব । মা নিশ্চয়ই অবাক হয়ে যাবে ?
কি রে মিলু কি করছিস ? পিছন থেকে বলল কেউ।
ফিরে দেখি বাসন্তী পিসির বাবা। বগলে ছাতা। ঘামে ভেজা মুখ। আপিস থেকে ফিরছেন।নদীর ওপারে পাট কলে চাকরি করেন উনি। হিসাব রাখেন বিকিকিনির। কেরানি।
কি গাছ ওটা। কি ফল ? বিহ্বলতা কাটছে না আমার।
আরে ওটা চিনির ফল গাছ । হেসে বললেন উনি। অনেকে সুজিফল হলে। সুজি চিনিস তো। ওই যে সকালে হালুয়া বানায় যে। প্রকৃতি কত কায়দা করে আমাদের খাবার দেয়। ডুমুর রান্না করে খেয়ে দেখবি একদম মাংসের মত লাগে। শর্ষে পিষলে তেল বের হয়। ডাবের মধ্যে যেমন কায়দা করে মিষ্টি জল থাকে। আচ্ছা বল তো এটা কি - খোদার কি কুদরত। লাঠির ভেতরে শরবত ।
হায় হায়। জানি না তো। লাঠির ভেতরে শরবত থাকে কি করে ?
থাকে রে। ওটা হচ্ছে আখ। হেসে ফেললেন বাসন্তী পিসি্র বাবা। প্রশান্ত মহাসাগরে কাঁঠালের মত একটা ফল হয়। পুড়িয়ে খেলে মনে হয় আভেন থেকে বের করা রুটি খাচ্ছিস । নাম ব্রেড ফ্রুট । কি বুঝলি ?
খেতে হবে। এক কথায় জবাব দিলাম।
আমি গেলাম। হাঁটতে লাগলেন দাদু মানে বাসন্তী পিসির বাবা। তুই চলে আয়।
পরে আসব। জবাব দিয়ে বসে পড়লাম গাছের পাশেই।
বিদেশী আর দামি ফল হলেই আদর ?
আপেলের নাম শুনলে মানুষের চোখ চক চক করে । আপেল কি ফলের রাজা ? আমার তো ভাল লাগে না। কিন্তু এই চিনির ফল গাছ ... কি অদ্ভুত তাই না ? গাছ ভর্তি ফল। ভর্তি ফল চিনির দানা। চেরি বা ব্লু বেরি গাছ কি এর চেয়ে সুন্দর ? মনে হয় না। সবাই তাদের বাড়িতে এই চিনি ফল গাছ বুনে না কেন ? কেন কেউ চেনে না গাছটা ? কেন আদর করে না ?
বিবাগী দুপুরে চেয়ে থাকি অবাক বিস্ময়ে।
মনে থাকবে গাছটার কথা । সারাজীবন।
যদি হাজার বছর বাঁচি তবু ও।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন