সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রেলগাড়ি আর চিতা বাঘের গল্প

 এক পিচ্চি পাঠক একবার জানতে চেয়েছিল,  অনেক কাহিনিতে আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কেন বাঘ নিয়ে আসিবা বাঘ নিয়ে কেন এত গল্প লিখেছি?

 



 সত্যিই তো ?  কেন ?

আসলে আমার চোখে  বাঘ হচ্ছে দারুন চটপটে, চিত্তহারী , মনোরম , পেশল আর সুন্দর একটা প্রাণী

হ্যাঁ, ব্যাপারটা সত্যি , স্বীকার করছি না  খিদের সময় ওরা গেরস্থের পোষা প্রাণী ধরে নিয়ে যায় খাওয়ার জন্যকিন্তু খুব বিপদে না পড়লে ওরা অমনটা  করে না

 

জঙ্গলে আর পাহাড়ে ওরা মুক্ত অনেক অনেক জায়গা আছে ওদের জন্যতখন  মানুষদের কাছ থেকে সচেতন ভাবেই ওরা  দূরে থাকে

 আর থাকার চেষ্টা করে

 বাঘ আর চিতা ছাড়া ভারতবর্ষ   কল্পনা করতেই পারি না

রাজপুরের ওখানে বড় শাল বন আছে ঘন সবুজ আর পাতা ভর্তি বনকয়েকদিন আগে বৃষ্টি হয়েছিল  গাছের  সব পাতা চকচক করছিল

মুসৌরি থেকে ফিরছিলামমধ্য রাত দেখলাম,  পথের ওপাশে বাঁধাই করা পাথুরে প্রাচীরের উপর বসে আছে চিতাবাঘটাখানিক দূরে ঝোপ ঝাড়ের মধ্যে ওর তিনটে তুলতুলে বাচ্চা খেলছেশেষ চিতা দেখেছিলাম পাহাড়েকয়েক বছর আগেমানুষের  বসতির এত কাছে আগে দেখিনি

 

হিমালয়ের গোঁড়ার দিকে পিচ্চি একটা  ইষ্টিশন ওখানেই থেমেছিরাত দশটা হবে তখন

স্থানীয় এক আদিবাসীকে দেখলাম  গার্ড বা খালাসি হিসাবে কাজ করছে ইষ্টিশনে ওরা সবাই বিজন প্রান্তরে মোষ চড়ায় এই বেচারা প্রথা ভেঙ্গে নতুন কাজ  নিয়েছে

রাতের বেলা  দেখি কেরসিনের লণ্ঠন নিয়ে জঙ্গলের সরু পথ ধরে কোথায় যেন যাচ্ছে

" যাচ্ছ কোথায় ? " জানতে চাইলাম

"টানেলটা পরিষ্কার কি না দেখতে যাচ্ছি" জবাব দিল"কুড়ি মিনিটের মধ্যে মেইল  ট্রেন আসবে"

টানেল আবার কিভাবে পরিষ্কার করে ?

খালাসির পিছু নিলাম

কয়েক গজ দুরেই টানেলটাভেতরে ঘুটঘুটটি অন্ধকার

রোজ রাতে খালাসিটা কেরসিনের লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে থাকে 

আলো দেখে নিজের অবস্থান বুঝতে পারে ট্রেনের ড্রাইভার এবং ঠিক জায়গায় রেল গাড়িটা থামাতে পারে

আমরা টানেলের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলামমনে হচ্ছিল ট্রেনটা  বোধ হয়  অনেক সময় নিচ্ছে আসার জন্য

আকাশে চাঁদ নেই

ঘন জঙ্গলের জন্য চারিদিক আরও  বেশি অন্ধকার লাগছে

 জঙ্গল থেকে বিচিত্র শব্দ ভেসে আসছে রাতের বাতাসে শম্বরের ডাক, শেয়ালের চিৎকার আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে চিতাবাঘ আছে ধারে কাছেশিকারের আশায় চুপিসারে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে

ভেসে আসছে অদ্ভুত রকমের পোকা আর পাখির ডাক  আবার একদম  থমথমে হয়ে যাচ্ছে কখনও কখনও

খালাসিটা টানেলের বাইরে দাঁড়িয়ে হাতের লণ্ঠনটা ধীরে ধীরে দোলাচ্ছিল

 কান পেতে জঙ্গলের ডাক শুনছিল মাঝে মাঝেযদিও সারাটা জীবন পার করেছে  এই মাতাল করা ডাক শুনে তারপরও । জঙ্গল কি কখনও পুরানো হয় ?

  ট্যাঁনেলের ভেতরে কিছু একটা আছে সাহেব। ' বলল খালাসিটা

এত আস্তে ফিসফিস করে  কথা বলল খালাসিটা,  প্রথমে শুনতে পাইনি কি বললভেবেছিলাম  গাছের ডালের আর বাতাসের শব্দ বুঝিরাতের বাতাস এসে গাছের ডালে বাড়ি খেয়ে এমন শব্দ করে অহরহ

'বাঘা' ফিস ফিস করে বলল খালাসিঅনেক আস্তেতারপরও বুঝতে পারলাম

বুঝতে পারলাম টানেলের ভেতরে একটা চিতা বাঘের বাচ্চা বসে আছে

'যে কোন মুহূর্তে ট্রেন এসে যাবে' ফিস ফিস করে বলল খালাসি ট্যাঁনেলের   ভেতর থেকে চিতার বাচ্চাটাকে খেদিয়ে বের করে আনতে হবেনইলে  বেচারা মারা যাবে '

অবাক হলাম

ও আমার মনের অবস্থা বুঝে বলল,' চিন্তা করবেন না সাহেব চিতাটাকে আমি চিনিবেশ কয়েকবার মুখোমুখি হয়েছি আমরাবলতে গেলে রোজই দেখা হয়বাচ্চা কুকুর আর ছাগল আক্রমণ করেছে শুনেছিকিন্তু আমাদের কোন ক্ষতি করেনি"

আমার হাতে একটা ছোট হাত কুড়াল ধরিয়ে দিয়ে লণ্ঠন হাতে ট্যাঁনেলের দিকে হাঁটতে লাগল খালাসিটামুখ দিয়ে বিচিত্র শব্দ করতে লাগলগরু ছাগল বা ভেড়া তাড়ানোর সময় যেমন করি আমরা

 টানেলের ভেতরে বিশ গজ হেঁটে যাবার পরই খালাসিটার লণ্ঠনের আলোতে দেখতে পেলাম, রেললাইনের উপর গুঁটিসুটি মেরে শুয়ে আছে চিতা বাঘটাআমাদের ঠিক পনেরো গজ সামনেই

ঠিক বড় চিতা নাকিন্তু পেশল আর চটপটেলণ্ঠনের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল ওর হলুদ চোখসাদা দাঁত খিঁচিয়ে গর গর করলোলেজটা বাড়ি দিতে লাগল শরীরের দুই পাশেআমি নিশ্চিত, যে কোন মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়বে আমাদের উপর

দূরে দাঁড়িয়ে খালাসি আর আমি চেঁচাতে লাগলাম

বন্ধ টানেলের ভেতরে আমাদের চিৎকার প্রতিধ্বনি হয়ে বহুগু হয়ে ফিরে এলো

চিতাটা  মনে হয় বুঝতে পারলো না,   জন মানুষ চিৎকার করছেউঠে দাঁড়িয়ে বিরাট একটা লাফ দিয়ে ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল

আমরা টানেলের মুখের কাছে আসতেই গুমগুম শব্দ শুনতে পেলাম

মানে ট্রেন এসে গেছে

 রেল লাইনের পাতের উপর হাত রাখতেই  কম্পন টের পেলামখানিক পরই  টানেলের  মুখের  কাছে রেলগাড়ি চলে এলো

কু - ঝিঁক ঝিঁক  শব্দ করছেচাকা আর লোহার লাইনের ঘর্ষণে কমলা  আগুনের ফুলকি ছড়াচ্ছে অন্ধকারে

হুস হাস করে চলে গেলছোট বেলায় আমার স্বপ্নে যেমন করে ড্রাগন আসতো

রেলগাড়ির ঝমাঝম শব্দ মিলিয়ে যেতেই আবার নিঝুম হয়ে গেল চারিদিকটা

বনভূমি দম নেয়া শুরু করলো আবার

শুধু রেললাইন অল্প অল্প কাঁপছে

ফিরে এলাম আমরা

আজও কল্পনায় দেখি- পাহাড়ের গোঁড়ায় বনের ধারে বেঁটে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে লণ্ঠন হাতেকমলা রঙের আলো ছড়াচ্ছে লণ্ঠন থেকে

চারিদিকে লক্ষ অযুত জোনাকি জ্বলছে ঝিঁকিমিকি করে

 

লোকটা আমার পরিচিত সেই খালাসি। । রেলগাড়ি আসার আগে সে দেখতে যায় কোন বাচ্চা চিতা ঘুমিয়ে আছে কিনা রেললাইনের উপর

আমার মত অ্যাডভেঞ্চারের লোভে সে যায় নাএটাই বেচারার চাকরি

প্রতিরাতের ডিউটি

আজও মনে পড়ে

 

রাস্কিন বন্ড এর  Big - Cat Tales এর  ছায়া অবলম্বনে


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...