সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ধাপ্পাবাজ ইত্যাদি

 খুব কম বয়সে আমার বিয়ে হয়নি। এমএ পাশ করলাম, এক বছর শান্তিনিকেতনে, এক বছর কলকাতায় অধ্যাপনা করলাম। তারপর বিয়ে হয়ে যখন সংসার করতে লাগলাম, তখন দেখি কিছুই জানি না। সংসারের হালচালই বুঝি না। সবাইকে বিশ্বাস করি। ভবানীপুরে একটা দোতলার ফ্ল্যাটে থাকতাম। দুপুরে চাকরবাকররা নাওয়া-খাওয়া করতে চলে যেত। তখন আমি একা থাকতাম।

একদিন এক ফিটফাট বাবু এসে উপস্থিত। বলল, ‘বাড়িওয়ালা পাঠিয়েছেন। তাঁর সব ভাড়াটেদের পাখা আমরা সারিয়ে রং করে দিই।’
আমি বললাম, ‘আমাদের নিজেদের পাখা। ওসবের দরকার নেই।’
লোকটি বলল, ‘আহা, আপনি আমার কথা বুঝতে পারছেন না, মা, টাকাকড়ি দিতে হবে না। বাড়িওয়ালার সঙ্গে আমাদের কোম্পানির এইরকম ব্যবস্থা আছে, নিজেদের খরচায় পাখা খুলে নিয়ে গিয়ে, একেবারে নতুন বানিয়ে আবার টাঙিয়ে দিয়ে যাব। সাত দিন লাগবে।’
আমি বললাম, ‘আমাদের সব পাখা আনকোরা নতুন, কাজেই আপনাদের কষ্ট করতে হবে না। ধন্যবাদ।’ এই বলে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। বাড়িওয়ালা আমাদের আত্মীয়, তাঁকে ব্যাপারটা বলা হল, পাছে কিছু মনে করেন। তিনি তো আকাশ থেকে পড়লেন! ‘সে কী! আমি তো কারও সঙ্গে ও-রকম কোনও ব্যবস্থা করিনি! ভাগ্যিস পাখাগুলো দাওনি, দিলে আর ফিরে পেতে না।’
শুনে আমি হাঁ! লোকটাকে একটুও সন্দেহ করিনি। পুরনো পাখা হলে হয়তো দিয়েই ফেলতাম। বাড়ির মালিক বললেন, ‘খুব সাবধানে থেকো। আজকাল যা কাণ্ড হচ্ছে, কাউকে দিয়ে বিশ্বাস নেই। এই তো সেদিন যোধপুর হাউসে মস্ত এক লরি নিয়ে এক ফিরিঙ্গি সায়েব, লম্বা একটা ফর্মা দেখিয়ে দারোয়ানকে বলল, ‘মালিকরা বড়দিনে কলকাতায় আসবেন। আমাদের আপিসে চিঠি দিয়েছেন সব পাখা খুলে সাফ করে তেল দিয়ে, নতুন রং দিয়ে আবার টাঙিয়ে দিতে হবে। এই দেখো মালিকের চিঠি আর এই যে আমাদের বড় সায়েবের সই দেওয়া রসিদ।’
দারোয়ান দেবনাগরি ছাড়া কিছু পড়তে পারে না। তার ওপর সায়েব আর লরি আর ইংরেজিতে সই দেওয়া কাগজ দেখে হকচকিয়ে ঘরদোর খুলে দিল। লরিতে সিঁড়ি, হাতিয়ার, মজুর সব ছিল। দেখতে দেখতে ৪২টি পাখা নামিয়ে লরিতে তুলে, সিঁড়ি ধরে থাকার জন্য দারোয়ানকে দু’টাকা বখশিস দিয়ে, দিব্যি সুন্দর চলে গেল।
দুপুরে এস্টেট ম্যানেজার এসে ব্যাপার দেখে চক্ষুস্থির! দারোয়ানকে ধমক-ধামক করে কোনও লাভ হল না। তাঁর নিজের ওখানে সকাল থেকে থাকার কথা। শেষ পর্যন্ত পুলিশে খবর দেওয়া হল। রসিদে লেখা— ৪২টি পাখা পেলাম, তারপর দুষ্পাঠ্য এক সই! বলাবাহুল্য কোনও ফল পাওয়া গেল না। মোট কথা, কাউকে দরজা খুলো না।’
এরপর কিছুদিন কেটে গেল, আমিও অনেকটা পোক্ত হয়ে উঠলাম। নির্দোষ কারিগর, মিস্ত্রি ইত্যাদিকে সন্দেহের চোখে দেখতে লাগলাম। এমন সময় একদিন সন্ধেবেলায় আমাদের বেয়ারা হারাণ একজন আরমানি যুবককে নিয়ে এল। সাদা ইউনিফর্ম পরা ভারী ভদ্রগোছের চেহারা। সে এসেই বলল, ‘মাপ করবেন, কিন্তু আমরা খবর পেয়েছি আপনাদের বাড়িতে বেআইনি মদ চোলাই হয়। আমি আবগারি বিভাগ থেকে এসেছি, এই দেখুন আমার অর্ডার। আপনাদের বাড়ি ইন্সপেকট করব।’
আমি বেজায় আশ্চর্য হয়ে গিয়ে বললাম, ‘বেশ তো, দেখুন খুঁজে যদি কিছু পান। আমি তো কিছু পাইনি।’ হারাণকে বললাম, ‘বাড়িঘর দেখিয়ে দে।’ হারাণ তাকে সঙ্গে করে খাবারঘর, রান্নাঘর, শোবার ঘর, স্নানের ঘর সব দেখাল। সমস্ত পরিষ্কার ফটফট করছে, কোথাও বেআইনি কিছু নেই।
তখন লোকটি বলল, ‘নীচে গুদোম নেই?’ বললাম, ‘আছেই তো। গ্যারাজ আছে, বাবুর্চির ঘর আছে, বেয়ারার ঘর আছে। দেখে আসুন গে।’ তার পণ্ডশ্রমের কথা ভেবে আমার বেজায় হাসি পাচ্ছিল। হারাণ তাকে সব খুঁটিয়ে দেখাল।
সত্যিই লোকটি ভারী ভদ্র। একটু পরে ফিরে এসে আমাকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইল। বলল, ‘এইরকমই হয়। উড়ো খবর পেয়ে আমরা তল্লাশি করি, লোকে বিরক্ত হয়। আবার মাঝেমাঝে দুষ্কৃতকারীদের ধরেও ফেলি। কিছু মনে করবেন না, ম্যাডাম, এইরকম আমাদের ডিউটি। গুডনাইট।’
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আমার স্বামী চা খেতে বসলে, আমি ফলাও করে ওই গল্প করছি, হারাণ চা দিচ্ছে। হঠাৎ সে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, ভাগ্যিস আগে থাকতে খবর পেয়ে হাঁড়াগুলোকে পাশের গলির পোড়া বাড়িতে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল! নইলে তো হয়েই গেছিল!!’
শুনে আমার চক্ষুস্থির! ‘বলিস কী রে! কীসের হাঁড়া?’ হারাণের জিভের জড়তা ছিল। আস্তে আস্তে বলল, ‘ওই যে বাবুর্চির আর আমার মদ চোলাইয়ের বাসনপত্রগুলো।’
বেজায় রেগে গেলাম আমরা। হারাণকে পই পই করে বলে দিলাম, ‘খবরদার এমন কাজ করবি না। চাকরি যাবে, জেলে যাবি, সর্বনাশ হবে। আর ওই বাবুর্চিটার সঙ্গ ছাড়।’
এর পর বাবুর্চি আর হারাণ দুজনেই চাকরি ছেড়ে দিল। পোস্টাপিসে হারাণের নাকি একশো টাকা জমেছে, তাই দিয়ে ওরা ব্যাবসা করবে। কীসের ব্যাবসা জিজ্ঞেস করিনি। মদের নিশ্চয়।
এর চল্লিশ বছর বাদে ঝুরঝুরে বুড়ো শরীর নিয়ে হারাণ একদিন দেখা করে বলে গেল, ‘আপনি ঠিকই বলেছিলেন, মা, ওতে সত্যিই সর্বনাশ হয়!’




লীলা মজুমদার

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...