এক
দক্ষিণ ফ্রান্সের ছোট্ট এক শহর । আর্লস ।
গনগনে দুপুর তখন । একদম মধ্য দুপুর ।
চারিদিকে হলুদ রোদ । পাকা গমের মত সেই রোদের রঙ যেন একটু বেশি হলুদ ।
নাকি ভ্রম ?
হতে পারে। আস্ত জীবনটাই তো একটা মায়াবী ভ্রম ।
স্থানীয় ডাকঘরের পোষ্ট মাস্টার জোসেফ রোলিন , অবাক হয়ে দেখলেন- কেমন পাগলাটে চেহারার একটা লোক হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে । লোকটার বগলের তলায় ক্যানভাস । হাতে টিনের বালতি । বালতি ভর্তি রঙ তুলি , হরেক পদের ব্রাশ ।
অন্য হাতে কাঠের ইজেল , যেঁটায় ক্যানভাস লটকে শিল্পীরা ছবি আঁকে ।
পিঠে রোল করে বাঁধা আরও অতিরিক্ত ক্যানভাস ।
লোকটার গায়ে আইভরি রঙা নরম সুতার সাদা জামা । আখের গুড়ের রঙ্গের প্যানট । মাথায়, খড় দিয়ে হাতে বানানো টুপি ।
‘ কে এই পাগল ? যাচ্ছে কোথায় , এই রোদের মধ্যে ?’ আনমনে বলে উঠলেন পোস্ট মাষ্টার ।
' নতুন পাগল স্যার ।' পাশ থেকে ব্যাখ্যা করলো সহকারী । যে কি না, ঘন বাদামি রঙ্গের মোটা রুটি আর ফ্যাঁকাসে হলদে মাখন দিয়ে হালকা ভোজ দিচ্ছিল ।
খালি খিদে পায় ওর । সাথে টম্যাটো- লেটুস এই সব থাকলে ভাল হত। নেই।
তাছাড়া কাজের চাপ অনেক। খাওয়া শেষেই চটের বস্তার চিঠি বের করতে হবে। তারপর বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিলির কাজ তো আছেই। নীল রঙের নতুন কতগুলো ডাকটিকিট এসেছে । গুণে গুছিয়ে রাখতে হবে দেরাজের মধ্যে ।
তবে কাজের ফাক ফোঁকর দিয়ে কফি গিলে নিতে হবে আরও এক বার। নইলে কেমন অলস ভাব এসে যায়।
' পাগল নাকি ?' নিশ্চিন্ত হতে চাইলেন জোসেফ ।
'পাগল না হলে কী আর স্যার, অমন খাঁ - খাঁ দুপুরের মধ্যে সূর্যমুখী খেতে দাঁড়িয়ে ছবি আঁকে ? মনে হয় তেমন একটা রঙ নেই বেচারার কাছে। শুধু হলুদ আর হলুদ । আর ছবির কী যে ছিরি । গোবদা গোবদা রেখা টেনে খামাখাই রঙ নষ্ট করে শুধু শুধু । আমি অমন ও শুনেছি ওর ছবি নাকি বিক্রি হয় না । কেউ কেনে না ওর ছবি । কিনবেই বা কেন বলুন ? অমন বিচ্ছিরি ছবি পয়সা খরচ করে কিনে কী লাভ ? আমাকে মাগনা দিলেও নেব না । '
'তা কোথায় উঠেছে শুনি ?'
' আরে ওই যে লা মাইসন জো- তে।'
' মানে ওই হলুদ দালানটায় । ওখানে? '
' হ্যাঁ, স্যার। '
যতক্ষণ দেখা গেল লোকটাকে দেখলেন পোস্ট মাস্টার জোসেফ রোলিন। স্বপ্নে ডাক পাওয়া মানুষের মত হেঁটে যাচ্ছে লোকটা।
দুনিয়ার কোন দিকে খেয়াল নেই।
হেঁটে যাচ্ছে একটার পর একটা পা ফেলে।
দুই
---
‘ সব কিছুর পরও আমি আবার উঠে দাঁড়াব । হতাশ হয়ে যে পেন্সিলটা ফেলে দিয়েছিলাম, সেটা তুলে নিয়ে আবার ছবি আঁকব ।’
= ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ ।
ভিনসেন্ট ।
ভ্যান গঘ নামটা সবাই বলে । কিন্তু সে নিজের ছবিতে ভিনসেন্ট লিখতো । ওই নামটাই নাকি ভাল লাগে ওর ।
আরও ভাল লাগে হলুদ রঙ । হলুদ রোদ । আর সূর্যমুখি ফুল । পাকা হলুদ গমের খেত।
এই সবই আঁকে । ওর আঁকা সূর্যমুখী ছবির ছক আর রঙ অমন , আজকাল যে কোন লোক হাফ মাইল দূর থেকে ছবিটা দেখলেই বুঝে ফেলে , ওটা গঘের আঁকা।
সেই সঙ্গে পরিষ্কার হয়ে যায় যেই আঁকুক, এই ফুলের প্রতি দুর্বল ছিল মানুষটা ।
জীবন সে এক মহাকাব্যিক যাত্রা। দিশেহারা নাবিকের মত। নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের মত। পূবালী হাওয়ায় কাঁপতে থাকা চৈতালি ঘাসের মত।
আঁকা ছবি বিক্রি করতে পারতো না । কেউ কিনত না । তবে বিশ্বাস ছিল , মানুষ একদিন ওর ছবি পছন্দ করবে ।
অহ মনে পড়েছে, বেঁচে থাকতে একটা ছবি বিক্রি হয়েছিল ।
মাত্র একটা !
আহা !
আর এই সব মিলেই হলুদ মৃত্যুর কাহিনি ।
তিন
ভ্যান গঘ , অদ্ভুত বিষাদ মাখা একটা চরিত্র । পেইন্টিঙের জগতে অমন আর কেউ আসবে কি না সন্দেহ !
পাগলাটে এক লোক যে কেটে ফেলেছিল নিজের বাম কান । ভিনসেন্ট ছিল এই ধুলা মাটির পৃথিবীর জন্য খুব ভঙ্গুর এক মানুষ । পাখির ডিমের মত ভঙ্কুর । তাহিতি দ্বীপের বিজন ঘাসের মত নরম ।
সূর্যমুখী ফুলের মত অভিমানী ।
সারা জীবন অসুখ আর বিষণ্ণতায় ভুগেছে । বন্দরের অচল জাহাজের নোঙরে সেঁটে থাকা শামুকের মত গুঁটিয়ে থাকতো । একা।
খাবার কেনার মত পয়সা থাকতো না পকেটে । প্রেম ছিল না জীবনে ।
আত্নহত্যা করেছে অল্প বয়েসেই । নাকি হত্যা ? যানা যায়নি।
ছবির ইতিহাসে সবচেয়ে দুঃখজনক চরিত্র ।
আজও ।
সে নিজেই বলতো , নিজের স্বপ্ন , লক্ষ্য ঠিক করা কখনও কখনও খানিক দেরি হতে পারে । খুব দেরি তেমন হয় না, কক্ষণই না । স্বপ্ন ঠিকই ধরা দেয় হাতের মুঠোয় ।
ছবি আঁকবে , তেমন স্বপ্ন কখনই দেখেনি । বাপের মতই যাজক হতে চেয়েছিল । এমন কি কৃষক ও হতে চেয়েছে । সাতাশ বছর বয়সে ঠিক করে , আপাদমস্তক শিল্পী হবে সে । ঐ যে, নিয়তি ।
ছোট ভাই থিও আর ভ্যান গঘ ছিলো হরিহর আত্মা । এক আত্মা দুই শরীর নিয়ে পৃথিবীতে আসে, অমন থিউরি যারা বিশ্বাস করে তাদের বকোয়াজ বলা মোটেও ঠিক হবে না ।
দিনের পর দিন ছোট ভাই থিও টাকা পয়সা দিয়েছে, আমাদের ভিনসেন্টকে । বড় ভাই যাতে রঙ , তুলি , ক্যানভাস কিনতে পারে । ঘর ভাড়া দিতে পারে, খাবার কিনতে পারে ।
চিঠি লিখত আমাদের এই শিল্পী । বলা যায়, চিঠি লিখতে পছন্দ করতো ।
মোট নয়শো তিনটে চিঠি পাওয়া গেছে । ছোট ভাইয়ের কাছে আটশো কুড়িটা লিখেছিল ভিনসেন্ট । থিও লিখেছিল ৮৩টা । ২১টা চিঠি গেছে ছোট বোনের কাছে । বাদবাকি চিঠি গেছে সহশিল্পী আর কাছের মানুষদের ঘরে ।
সেই সব চিঠি সংগ্রহ করে বই বের করা হয়েছে ।
পড়তে পড়তে পাঠক উদাস হয়ে যায় । বিষাদের গহীন অরন্যে ধীরে ধীরে ডুবে যায় তার আবেগি মন ।
দুপুরের রোদে দাঁড়িয়ে গম খেতের ছবি আঁকতে পছন্দ করতো ভিনসেন্ট ।
রোদে না দাঁড়ালে রোদের ছবি আঁকা যায় না , অমনটা তার যুক্তি । বিশ্বাস করতো , রোদ ঈশ্বরের সেরা উপহার । রোদে ভিজলে অচেনা শক্তি আসে মনে ।
ছবি আঁকার নিজস্ব একটা স্টাইল বের করেছিল । সেই সময় এই স্টাইলটা কেউ পছন্দ করতো না। সরু তুলির বদলে মোটা তুলি । প্রচুর রঙ মেখে ঘন করে লেপে দিতো । এই কায়দাটাকে বলে - ইমপাস্তো (impasto) ।
অনেক সময় তুলির বদলে প্যালেট ছুরি ব্যবহার করতো ।
প্যালেট ছুরি চিনলেন না ? আরে ওই যে, রাজমিস্ত্রিরা সিমেনট লেপে দেয়ার জন্য যেমন জিনিস ব্যবহার করে না ? তেমন দেখতে, পিচ্চি একটা জিনিস ।
আজকাল অনেকেই ভিনসেন্টকে বুনো প্রতিভা বা পাগল শিল্পী বলে । আদর করেই বলে ।
সারা জাগানো ছবি 'দ্যা স্টেরি নাইট' এর কথাই ধরা যাক ?
ওর কল্পনা থেকেই এঁকেছে । অনেকে বলে , ফ্রান্সে থাকার সময় ওর জানালার বাইরে অমন একটা দৃশ্য ছিল ।
যদিও প্রমাণ নেই ।
বাংলায় কি নাম ছবিটার ?
তারকাময় রাত্রি ? নক্ষত্রের রাত ?
কী আছে ছবিতে ?
শুনশান রাত । ঠিক যেন জানালা দিয়ে দেখা । বাইরে নীল অন্ধকার । উদাস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ি সাইপ্রেস গাছ । পাক খেয়ে যাওয়া বাতাসের হাহাকার । নক্ষত্রের ইশারা । যেন কী সব প্রতীকতা রয়ে গেছে ছবিতে । ঠিক যেন বিজ্ঞান আর গণিতের মিশ্রণ । আকাশ , কিন্তু রয়েছে মহাকাশের ছায়া । বাতাসের পাক খাওয়ার মধ্যে রয়েছে নিহারিকা এম ৫১ এর ছায়া । মাত্রা আর সীমা ভেঙ্গে ফেলেছে এই ছবি।
নাইট ক্যাফে ছবিটা ১৮৮৮ সালের আঁকা। গঘের নিজের মতে ছবিটা তত ভাল হয়নি।
হিসাবে এই ছবিতে গঘের ব্যাক্তিগত ছায়া পড়েছে। তন্দ্রাহারা রাত, একাকীত্ব। চঞ্চল মন ।
কামরাটা কেমন যেন ঢালু। বিকৃত কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো। দম বন্ধ করা পরিবেশ।
গভীর ঘুম নেমে আসার আগে আপনার মাথার ভেতরে যেমন ভাব হয় ছবিটার পরিবেশ ওই রকম।
ছবির চরিত্রগুলো সবাই ঘুম ঘুমে। একজন তো টেবিলে বসে মনে হয় ঘুমিয়েই যাচ্ছে।
দেয়ালে লটকে আছে প্রাচীন ঘড়ি । রাত বোধ হয় বারোটা পনের।
রক্তিম লালের সাথে সবুজ রঙ নিয়ে খেলা করেছে গঘ। সাথে হলুদ তো থাকবেই। কোন ভাবেই কামরার পরিবেশ আকর্ষণীয় বানাতে চায় নি সে।
চারটে ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে আলো নেমে আসছে। গোল চক্রা চক্রা আলো ঘুম ঘুম ভাব। তিনটে টেবিল ছেড়ে খদ্দের চলে গেছে। এঁটো পানপাত্র , শূন্য বোতল।
বিলিয়ার্ড টেবিলের উপর সাজানো লাঠি। তিনটে বল।
ক্ষুদে বার। ফুলদানি ভর্তি ফুল।
বাইরে যাবার পথটা উজ্জ্বল।
পুরো ছবিটা ক্লান্তিকর। ভ্যান গঘের মনের ভেতরের কামরার মত।
চার
----
ইংল্যান্ডের চেয়ে অনেক ছোট দেশ , হল্যান্ড । হল্যান্ড কিন্তু বেশ বিখ্যাত ।
কেন বিখ্যাত ?
উইন্ডমিলের জন্য ।
সারা বছর এখানে পাগলা হাওয়া বয়ে যায় । সব মউসুমে । সব সময় । ডাকাতিয়া হাওয়া সাঁই সাঁই করে । বাতাস এখানে বাচাল । সারাক্ষণ কথা বলে । সেইজন্য, আগাড়ে বাগাড়ে প্রচুর উইন্ডমিল বানায় সেই দেশের মানুষ ।
হাওয়া ছাড়া আর কি আছে ওখানে ?
ফুল আছে । তামাম জাত বেজাতের ফুল । নানান রঙের ফুল । টিউলিপের কথা না বলে পারছি না। খুবই বিখ্যাত । টিউলিপ মানেই হল্যান্ড।
তো , মার্চ ৩০, ১৮৫৩ । হল্যান্ডের গ্রুট-জান্ডার্ট নামে সুনসান এক শহরতলী । পুরানো ধাঁচের একটা বাড়ি । বারান্দার বাইরে পাদ্রী থিওডোরাস ভ্যান গঘ চুপচাপ বসে আছেন । হাতে বাইবেল । চিন্তিত । বিষণ্ণ । তাদের আগের ছেলেটা মারা গেছে । সেইজন্য ।
বাড়ির কাজের মেয়েটা দৌড়ে এসে খুশি খুশি গলায় বলল , ‘ সাহেব, আপনার একটা ছেলে হয়েছে । বাবাটা অনেক সুন্দর।‘
বাইবেল বুকে ধরলেন পাদ্রী থিওডোরাস। বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাদুকর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেন , আমার ছেলেটাকে বাঁচিয়ে রেখ প্রভু । কোন রকম কষ্ট দিও না ।
তখনও তিনি জানতেন না , ঈশ্বর ব্যস্ত থাকায় তার এই প্রার্থনা গ্রহণ করেনি ।
তার আদরের এই ছেলেটি , জীবনের বেশিরভাগ সময় গুরুতর মানসিক অস্থিরতার মধ্য থেকে যন্ত্রণা ভোগ করবে, অল্প বয়সে মারা যাবে এবং শেষ পর্যন্ত শিল্পের ইতিহাস ও বদলে ফেলবে ।
জন্ম হল গঘের ।
গঘের বাবা চার্জে কাজ করেন । ধর্ম যাজক । বেতন খুব বেশি না। সেইজন্য চার্জ থেকে তাকে বাড়ি দিয়েছে থাকার জন্য । সাথে দেয়া হয়েছিল - কাজের মেয়ে , দুইজন বাবুর্চি, একজন মালী, একটি টমটম গাড়ি এবং একটি ঘোড়া । পাদ্রী থিওডোরাস রোজ বাইবেল পড়েন । রোজ । ভুল হয় না।
ভিনসেন্টের মায়ের নাম, অ্যানা কর্ণেলিয়া । ভাল পরিবারের খুবই ধার্মিক মেয়ে । সময় পেলেই উল দিয়ে গরম কাপড় বানায় । গঘের জন্মের আগের বছর ওর যে ভাই হয়ে মারা গিয়েছিল , ওর নামও ছিল ভিনসেন্ট । সেইজন্য মা গঘকে অনেক আদর করতো । মড়া ভাইয়ের আদর আর পাওনা আদর । ডাবল ।
আগে মরে যাওয়া বাচ্চাটাকে বাড়ির পিছনেই কবর দিয়েছিল শোকাকুল বাপ-মা । কবরের মাথায় বড় একটা পাথরের উপর লেখা ছিল – ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ ।
ছোট বেলা থেকেই গঘ নিজের নামের সাথে নাম মিলিয়ে একটা কবর সাথে নিয়ে শৈশব পাড় করেছিল ।
না জানি কেমন সেই অনুভূতি !
আট বছর বয়েসে স্থানীয় স্কুলে পাঠানো হল গঘকে ।
ক্ষুদে গঘ শান্ত বালক । প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শান্ত । প্রাচীন দিঘির কালো জলের মত ।
সঙ্গীরা যখন খেলতো, গঘ একা দাঁড়িয়ে দূরের দানবের মত লম্বা গাছ দেখতো । পাখি দেখতো ।
শুধু দেখতেই ভাল লাগে ওর । আরও দেখত , গোবরে পোকা । নাম না জানা পাখি । সাদা মেঘ । মাকড়সার জাল । রোদ ।
সাই সাই হাওয়া সব দুলিয়ে যায় ।
সব সময় একা সে । সব সময় ।
বাড়ি ফেরার সময় মাঠ থেকে রঙিন পোকা মাকড় ধরে বাসায় ফিরে । কাচের বয়ামে রেখে সময় নিয়ে দেখবে ।
কালো পোকার গায়ে কে মাখাল অমন লাল লাল ফুটকি ? কেন মাখালো ? আলাদা কেন এটা ? আর আরেকটা পোকা তো একেবারে পোখরাজের টুকরো । সবুজ রত্নের মত ঘাস ফড়িং ।
কে এদের এত বর্ণিল বানায় ? কে ?
তো স্কুলের পড়া শেষ হতেই গঘকে ডেকে বাবা বললেন , ‘ তুই এক কাজ কর । তোর কাকার দোকানের জন্য একজন কর্মচারী লাগবে । তুই গিয়ে শুরু কর । ‘
‘কাজটা কী ধরনের ?’ জানতে চাইল গঘ ।
‘ছবি বিক্রি করবি । দেখ ভাল লাগে কি না । আমার তো মনে হয় ভালই লাগবে ।‘
জীবনের প্রথম চাকরি পেয়ে গেল, কাকার আর্ট গ্যালারীতে । হরেক পদের ছবি বিক্রি করতেন কাকা । গঘের কাজ ছিল খদ্দেরের কাছে ছবি বিক্রি করা ।
এখানে কাজ করতে গিয়েই ছবি চিনলো গঘ । জানলো অনেক অনেক শিল্পীর নাম ।
এই আর্ট গ্যালারীতেই তিন বছর কাজ করেছিল সে । সন্দেহ নেই কাজটা উপভোগ করতো । সারাক্ষণ বর্ণিল সব ছবির সাথে থাকা সন্দেহ নেই , দারুণ ব্যাপার । যদিও মনে হত, খদ্দের ফালতু টাইপের ছবি বেশি কেনে । ভাল ছবি চেনে না। আরও মনে হত, টাকাওয়ালা খদ্দের তাদের টাকার গরম দেখানোর জন্য ছবি কেনে । শিল্পী একটু নাম করলে সেই শিল্পীর ছবি ছাড়া আর অন্য কারও ছবি কিনতে চায় না কেউ । ফিরেও দেখে না। কত ভাল ভাল ছবি পরে থাকে অনাদরে । শিল্পীর নাম নেই বলে ফিরেও দেখে না ক্রেতা ।
তবে শিল্পী হতে চায়নি সে । তখন পর্যন্ত ও ।
প্যারিসের এক আর্ট গ্যালারিতে বদলি হয়ে চলে গেল। কাজ করছিল মন দিয়েই । তারপরও কাজটা চলে গেল । সামান্য কারনে ।
একবার মস্ত এক ধনী লোক এলো ছবি কিনতে ।
‘কেমন ছবি চাইছেন স্যার ?’ বিনয়ে জানতে চাইল গঘ ।
‘ তুমিই পছন্দ করে দাও ।‘ জবাব দিল খদ্দের।
নিজে বেঁছে একটা পেইন্টিং তুলে দিল সে খদ্দেরের হাতে।
খদ্দের খুশি হয়ে পঞ্চাশ হাজার ফ্রাঙ্ক দাম চুকিয়ে চলে গেল। খদ্দের চলে যেতেই মালিকের সে কি তম্বি ।
‘ তুমি কি বেকুব নাকি ?’ রাগে কাঁপছে মালিক । ‘ শহরের সবচেয়ে ধনী লোকটা এসেছে ছবি কিনতে । উনার বাজেট ছিল দুই লক্ষ ফ্রাঙ্ক । ইচ্ছা করলেই তারচেয়ে বেশি দামের ছবি গছিয়ে দিতে পারতে তুমি । টাকার অভাব নেই উনার। পেইন্টিং কিনে খরচ করতেই এসেছিল । আর তুমি কি না দোকানের সবচেয়ে সস্তা ছবিটা গছিয়ে দিলে। অমন মূর্খ কর্মচারী লাগবে না আমার। বেরোও । বুরবাক কাহিকে ।‘
কয়েকদিন বেকার থাকে । এরপর ইংরেজি শেখার জন্য লন্ডনে যায় গঘ । তিন বছর থাকে সেখানে । স্কুলের মাস্টারির কাজও করে সামান্য কয়েকদিন । মনে মনে আসলে সেইরকম তৃপ্তি পাচ্ছিল না। ভাবে , এইসব বোধ হয় আমার কাজ না।
ততদিনে ডাচ, ইংরেজি এবং ফরাসি এই তিন ভাষায় বলতে , লিখতে এবং পড়তে পারে গঘ ।
শেষে ওর মনে হয়, গির্জার যাজকের কাজটাই ভাল । বাবাকে দেখেছে সারা জীবন তাই করতে । বাবাও চাইত ছেলে যাজক হোক ।
বাড়ির কথা সব সময় মনে পড়ে ।
যেখানেই থাকুক না কেন, হল্যান্ডের বাড়িটার কথা মনে পড়ে সব সময় ।
গভীর ঘুমের মধ্যে ও গির্জার ঘণ্টার শব্দ পায় ।
লন্ডনে থাকার সময়, হাতে সময় পেলেই গির্জায় যেতো গঘ ।
আর নিয়ম করে গ্রামের পথে হাঁটতে বের হত ।
দূরে কোথাও ঘুরতে গেলে মনে হত, প্রকৃতি আর ঈশ্বর আলাদা কোন সত্তা না । একই ।
শহরের বাইরে গেলেই কেমন খাঁ খাঁ করা বিরান ফসলের মাঠ । মউসুম ভেদে সবুজ কাঁচা ফসল । বা হলুদ হয়ে পেকে আছে। কাজ করছে শ্রমিক ।
দূরে ভাঙ্গাচোরা পুরানো ধাচের বাড়িঘর । চিমনি উঠে গেছে আকাশে । বিষণ্ণ বৃষ্টির পর, বাড়ির ছাদে শেওলা জমে গেছে ঘন হয়ে । কয়েকটা ওক গাছ বাড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে, হাতে হাত ধরে । উপরে ঘন নীল আকাশ । এত নীল হয় কেমন করে ? কে এমন রঙের জাদু দেখায় আমাদের ? ঈশ্বর তা হলে তো মস্ত বড় শিল্পী ।
বাতাসে ফসলের ঘ্রান, ফেলে আসা বাড়ির কথা মনে করিয়ে দেয় ।
বাদামী পাকা যব ভর্তি গাড়ি হেলেদুলে শহরে যাচ্ছে । গ্রামে একটা লাল গির্জা , পুরানো ধাঁচের। কুঁড়েঘরগুলো বানানো হয় ঘাসের চাপড়া দিয়ে । তুলার টুকরোর মত ভেড়া । এক দঙ্গল ভেড়া নিয়ে অলস পায়ে বাড়ি ফেরে রাখাল ছেলে । পথের ধারে পপলার গাছের তলায় মায়াবী এক সরাইখানা । বুড়ি এক মহিলা কালো লোহার পাত্রে , কি যেন রান্না করছে । লোভাতুর ঘ্রান ।
বাদামি রুটি আর টিনের মগে করে কফি নিয়ে গঘ বসে সেই সরাইখানায় ।
ভাবে । ভাবতে ভাল লাগে ।
হাঁটতে গেলেই দেখে চারিদিকটা ।
স্বপ্নে পাওয়া মানুষের মত হাঁটে ।
দূরে জলপাইয়ের বন । হাত ছানি দিয়ে ডাকে ।
পাঁচ
------------
' হলুদ কত সুন্দর রঙ , হলুদ মানেই সূর্য।'
' মাঝে মাঝে মনে হয় দিনের চেয়ে রাত বেশি প্রাণবন্ত , এবং একটু বেশি রঙিন ।'
( ভ্যান গঘ )
হলুদ রঙের প্রতি কতখানি পাগল হতে পারে একজন মানুষ ? কত খানি ?
পাগলামির চূড়ান্তে গিয়ে টিউব থেকে রঙ বের করে খেয়ে ফেলেছিল এই ভ্যান গঘ । হলুদ রঙের সাথে ডিমের কুসুম মেশাতো ভিনসেন্ট । কায়দাটা নতুন কিছু না । ইউরোপের অনেক শিল্পী করতো ।
আর কোন কায়দা ছিল ওর পকেটে ? তুরুপের তাসের মত ?
নাহ, ছিল না ।
একটা ফিচারে দেখেছিলাম, গঘের ‘জলপাই গাছ’ ছবিতে ঘাসপোকা পাওয়া গেছে। মানে ছবির রঙের সাথে । আরেক ছবির ব্রাশস্ট্রোকের মধ্যে ঘাসের দানা আর মড়া গুল্ম ছিল ।
মাঠে দাঁড়িয়ে ছবি আঁকতো আমাদের ভ্যান । ফসল কাটার মউসুম । বা পাকা ফসলের সময় । অকস্মাৎ দমকা হাওয়া ঝুপ করে নেমে আসতো রোন উপত্যাকা (Rhône Valley’s) বেয়ে । মৌসুমি এই হাওয়ার নাম মিস্ট্রাল ।
সেইসব পোকা, ধূলা , উড়ে এসে বসতে পারে ছবিতে । সঙ্গত কারনেই লেপটে যাবে ।
নিছক দুর্ঘটনা । কোন কায়দা না । মার্সেরো ডিগালান , শিল্প সমালোচক বলেছেন, গঘের এই জলপাই গাছ ছবিটা আঁকার সময়, বাইরের পরিবেশ আর কেমন ছিল সেটা এই পোকাটা দেখেই আমরা কল্পনা করে নিতে পারি। পোকাটার জন্য সেটা হয়তো খারাপ দিন ছিল । আবার ভাল দিন , কারণ মড়ার এত বছর পরও শিল্পীর কাজের সাথে সাক্ষী হিসাবে রয়ে গেছে ।
তো, কি সেই রহস্য , যার জন্য ভ্যান গঘের ছবির ভক্ত আজকের দিনে বেড়ে উঠেছে রক্তবীজের মত ?
কেন সেই সময়ের মানুষজন তার আঁকা পছন্দ করত না ?
আজ আমস্টারডামে ভ্যানগঘ মিউজিয়ামে প্রতি বছর দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ছেই । ২০০০ সালে ছিল ১৩ লক্ষ ১২ হাজার ২০৪ জন । ২০১৮ সালে সেটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লক্ষ ৯০ হাজারে ।
দামি রঙ ব্যবহার করতো না ভ্যান গঘ । সস্তা টিউব কিনতো । সবচেয়ে সস্তাটা । রঙের বাহার ছিল কম - মেটে হলুদ - অনেকে গৈরিক মাটি বলে , ক্রোম হলুদ, ক্যাডমিয়াম হলুদ, কমলা, সিঁদুর, প্রুশিয়ান নীল, ঘন নীল , সীসা সাদা, দস্তা সাদা, পান্না সবুজ, রুবি লাল, মেটে লাল , কাঁচা সিয়েনা এবং কালো ।
জীবিকার জন্য অনেক কিছুই করার চেষ্টা করেছিল গঘ । ইস্কুলের মাস্টারি থেকে বইয়ের দোকানে কাজ পর্যন্ত । শেষে মনে হল গির্জার যাজকের কাজটাই বোধ হয় ভালে লাগে । কেমন শান্তি শান্তি ।
ইচ্ছে করলে গ্রামে ফিরে চাষবাস করতে পারে । দোকানদার হলেও না করলো কে ?
মনে মনে যা হবার ইচ্ছা করে সেটা করাই ভাল ।
তখন নিয়ম করে প্রতিদিন চার থেকে ছয় মাইল হাঁটতো সে ।
সূর্য উঠার আগেই ঘুম থেকে উঠে বাইবেল পড়তো । এক টুকরো বাদামী রুটি আর এক গ্লাস বিয়ার দিয়ে জলখাবার শেষ করে জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে থাকে ।
সামনে বন্দর । জীবিকার জন্য শ্রমিকরা চলে এসেছে । দিনমান কাজ করবে ওরা । আয়ু ক্ষয় করে আয়ু বাঁচানোর খাবার কিনবে ।
সেই সময়, ষোল থেকে আঠারো ঘণ্টা পড়তো গঘ , সাহিত্য আর ব্যাকরনের বই ।
আবিস্কার করলো , একঘেয়ে পড়াশোনা ক্লান্ত করে ফেলছে ওকে । কী মনে করে বেলজিয়ামে চলে গেল দুম করেই ।
খানিকটা বৈচিত্রতা দরকার ছিল ।
জায়গাটার নাম - বরিন্যাগ । কয়লা খনির জন্য বিখ্যাত । এবং গঘের দেখার চোখ খুলে দিল এই জায়গাটা । এখানে না এলে হয়তো কখনই ছবি আঁকতে পারতো না সে ।
কয়লা খনি কেমন হয় জানতো না । জানলো ।
বিশাল খাদ । দূরে শ্রমিকদের বস্তি । চারিদিকে ময়লা , আবর্জনা । কুকুর, সেইসব ঘেঁটে দিচ্ছে ইচ্ছামত । এখানের আকাশও ময়লা । ঘন নীল হয় না কখনই । ঘন নীল দূরের কথা ফিকে নীল ও হয় না । দলবেঁধে শ্রমিকরা কাজে যায় । গায়ে মোটা কাপড়ের পোশাক । ছেঁড়া , ময়লা । ওদের সবার শরীর কালো হতে হতে জ্যান্ত কয়লা হয়ে গেছে যেন । শুধু চোখের দুই জমিন সাদা । ওখানেও প্রাণের কোন চিহ্ন নেই ।
ভোর রাতে কাজে যায় । লিফটের মত কেমন একটা কপিকলে চেপে নেমে যায় খনির তলায় । শেষ বিকেলে বের হয়ে আসে খনির ভেতর থেকে ।
মাটি থেকে ৭০০ মিটার নিচে কাটে জীবনের অনেকগুলো সোনালী সময় ।
খনিতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে । বিষাক্ত গ্যাস জমে বিস্ফোরণ হয় । খনি ধসে পড়ে। আচমকা বগ বগ করে জল জমে মারা যায় ওরা ।
কত শ্রমিক যে মারা যায় সেই হিসাব কেউ রাখে না ।
সেইসময় গঘের হাতে টাকা , খাবার যা থাকতো সবই বস্তির শ্রমিকদের মধ্যে বিলিয়ে দিতো ।
ওরা আদর করে গঘকে ডাকতো - কয়লাখনির যীশু !
ছয়
১৯ জুলাই, ১৮৯০ সালে মারা যায় ভ্যানগঘ । মাত্র সাইত্রিশ বছর বয়সে ।
জীবনের কি অপচয় !
তার কর্মকাণ্ড এবং জীবন নিয়ে বেশ কিছু মুভি বানানো হয়েছে। লাস্ট ফর লাইফ , মিডনাইট ইন প্যারিস, লাভিং ভিনসেনট ।
বাজারে কিংবদন্তী আছে, সারা জীবনে মাত্র একটা ছবি বিক্রি করতে পেরেছিলো এই শিল্পী ।
তবে এটা কোন বানোয়াট গল্প না। সত্যি।
গঘ যে সব গল্পগাঁথার জন্ম দিয়েছিলো তার মধ্যে একটা হচ্ছে , কফি আর রুটি খেয়ে দিনের পর দিন কাটাতো সে ।
এটা ও সত্য ।
বেশির ভাগ সময় তাও জুটতো না ।
রাতের বেলা ছবি আঁকার সময় মাথার উপর খড়ের টুপির প্রান্তে মোমবাতি বসিয়ে নিতো ।
নাহ , এই গুজবের প্রমাণ নেই । তবে সিনেমায় অমন একটা দৃশ্য দেখান হয়েছে ।
আর ‘স্টেরি নাইট’ ছবিটা , রাস্তার গ্যাসের বাতির নিচে দাঁড়িয়ে এঁকেছিল, এমন কথা নিজেই বলেছিল ।
আনুমানিক সাতাশ বা আটাশ বছর বয়সে ছবি আঁকা শুরু করে ভিনসেন্ট । মোট নয়শো ছবি এঁকেছে । অর্থাৎ বছরে নব্বইটা ছবি, মাসে সাতটার ও বেশি ।
আরও রয়ে গেছে কাগজে আঁকা ১১০০ ছবি।
অ্যান্টন মউভে নামের এক ভদ্রলোকের কাছে ছবি আঁকা শিখেছিল গঘ , উনি গঘের দূর সম্পর্কের আত্মীয় । তেল আর জলরঙের ব্যাপারে প্রাথমিক জ্ঞান উনার কাছ থেকেই পাওয়া ।
এই কয়লাখনির পরিবেশে এসে গঘের মনে হল, আসলে ছবি আঁকা দরকার । রঙ তুলির দরকার নেই । সস্তা মোটা কাগজের উপর কয়লা দিয়ে আঁকলেই না করবে কে ? বাঁধা দেবে কে ?
ছোট ভাই থিওকে চিঠি লিখে ব্যাপারটা জানালো। চিঠির সাথে আঁকা কিছু ছবিও পাঠিয়ে দিল । থিও বেচারা ছবি দেখে মহাখুশি । বলল , প্রতিমাসেই একশো ফ্রাঙ্ক করে পাঠাবে গঘের কাছে । রঙ তুলি কেনার জন্য ।
কাজে লেগে গেল গঘ ।
সেই সময়গুলোতে প্রচুর ছবি আঁকলো গঘ ।
তো , ১৮৮৩ সালে নুয়েন শহরে চলে গেল । পিচ্চি একটা বাসা ভাড়া করে নিজের স্টুডিয়ো বানিয়ে ফেললো । এক ভদ্রলোকের দোতলা বাড়ির পাশে ছোট্ট মত ঘর । তবে বেশি দিন থাকতে পারেনি এখানে । সময় মত ভাড়া দিতে পারতো না , তাই ।
নিজের স্টুডিয়ো ! গঘের স্বপ্ন ।
একজন শিল্পীর নিজের স্টুডিয়ো না থাকা আর আত্মার কোন শরীর না থাকা বিলকুল এক কথা ।
১৮৮৫ সালে বাবা মারা গেল । গঘের বাবা , ভাল একটা মানুষ । সারাজীবন চেয়েছিলেন ছেলে উনার মত যাজক হোক । হলো না । বাবাকে কষ্ট দিল বোকা গঘ ?
কিন্তু মা তো বলেছে, সব বাপ মায়েই চায় ছেলে তার মনের মত কাজ করুক ।
গঘের মনে হয়, শোক তাপ ভুলে যাবার জন্য কাজ হচ্ছে সবচেয়ে বড় দাওয়াই ।
প্রথম মাস্টারপিস ছবিটা তখনই আঁকলো , দ্যা পটেটু ইটারস । তেলরঙের আঁকা , ছোট একটা কামরা । ছায়া ছায়া , ধূসর । চার নারী এক পুরুষ , বসে আছে বর্গাকার খাবার টেবিলে । মাথার উপরে ঝুলছে গ্যাসের আলো । সেই গহন হলুদ আলোতে মায়াবী দেখাচ্ছে কামরাটা । দেয়ালে বাধাই করা ছবি । ঘড়ি । টেবিলের উপর সিদ্ধ করা আলু , রাখা হয়েছে একটা তশতরীতে । ওরা কাঁটা চামচ দিয়ে খাচ্ছে । বয়স্কা এক মহিলা কেতলি থেকে কফি ঢালছেন । চারটে চিনামাটির পেয়ালা । পাশের তন্দুরির উপর আরেকটা কেতলি । শূন্য পেয়ালা ভরে দেয়ার জন্য বাড়িয়ে রেখেছে একজন ।
গৃহকর্তা তার রোগা হাড় বের করা হাত বাড়িয়ে কাটা চামচ দিয়ে তুলে নিতে চাইছে একটা আলু ।
শুধু সিদ্ধ আলু আর কফি দিয়ে রাতের খাবারের আয়োজন।
ছবিতে অভাব , কষ্টের সাথে ভালবাসাটা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিল গঘ ।
ভাল করে লক্ষ্য করলে মনে হবে, ছবির চরিত্ররা ফিসফিস করে কথা বলছে । কান পাতলেই শোনা যাবে তাদের রাতের খাবারের আলোচনা ।
জীবনের বড় একটা সময় ভ্যান গঘ ক্যাফে , পানশালা বা সরাইখানায় কাটিয়েছে । ছোট ভাইকে লেখা চিঠিতে সেব সব কথা এসেছে বারবার । হল্যান্ডের লোকজন আলুখেকো । গঘের ছবিটার দেখা যাচ্ছে শ্রমজীবী এক পরিবার রাতের খাবার খেতে বসেছে ।ঘন গাড়ো টোনে আঁকা ছবিতে অভাব আর নোংরা পরিবেশের ছাপ স্পষ্ট । অভাবে চেহারা রুক্ষ । হাতের আঙ্গুলের হাড় দেখা যাচ্ছে ।
ভিনসেন্টের ভাষায় - ' সৎ ভাবে তারা খাবারের জন্য উপার্জন করে ।'
ছবিটার ডাচ নাম - দ্যা আরডাপল ইটারস । আরডাপল aardappel মানে আর্থ আপেল । আলুর আরেক নাম, মাটির আপেল । কী মায়াবী নাম ! ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী কাব্যময় ।
১৭৯৪ সালের রান্নার বইগুলো ঘাঁটলে দেখা যায় বৈচিত্রতার জন্য আলু ভিন্ন একটা কায়দা করে খেত হল্যান্ডের লোকজন । বিশেষ করে গ্রামের গরিব লোকজন ।
কে না জানে , আলু ছিল আমেরিকান আদিবাসি রেডইনডিয়ানদের খাবার । স্প্যানিশদের জন্য সেটা ছড়িয়ে পড়ে সারা ইউরোপে । সেখান থেকে আর সব জায়গায় । প্রথম দিকে গবাদি পশুর খাবার হিসাবেও ব্যবহার করা হত ।
১৭০০ সালের দিকে হল্যান্ডের সব পরিবারেই আলু খাওয়া শুরু হয় ।
১৭৬৭ সালে বার্নে শহরের মেয়র একটা মজার কথা বলেছিলেন - 'আলু , গরীবরা খায় প্রয়োজনে , ধনীরা খায় মুখের স্বাদের জন্য !'
এত বছর পরও এই সংলাপটা দাগ কাটে মনে ।
সেই সময় আলু খাওয়া হত খোসা সহ বা ছাড়া । গরিব লোকজন খেত খোসা সহ ।
দারিদ্রটা সর্বগুণনাশিনী ।
লবণ জলে সিদ্ধ করা হত আলু । হাফ সিদ্ধ হবার পর পাত্রের অর্ধেক জল ফেলে দিয়ে মুরগির স্টক বা মাংসের ঝোল দেয়া হত । মুরগির পা এবং চামড়া সিদ্ধ জল স্টক হিসাবে চালাত । দেয়া হত সামান্য মাখন । গোলমরিচের গুড়া । আরও স্টক ঢেলে ডুবিয়ে দেয়া হত সব আলু । সিদ্ধ হলেই চ্যাপ্টা থালায় ঢেলে খেতে বসে যাও । সামান্য লবণ দেয়া যেতে পারে ।
ছোট ভাইয়ের পাঠানো টাকা দিয়ে প্রথমেই ছবি আঁকার জিনিসপত্র কিনতো ভ্যান গঘ । মডেলকে কিছু টাকা দিতে হত । টাকা ছাড়া মডেল পাওয়া যেত না। কে বসে থাকবে খামখাই ? বাকি টাকা দিয়ে খাওয়া দাওয়া করতো । সকালে এক পেয়ালা কফি আর রুটি । দুপুরে এক পেয়ালা কফি আর রুটি । রাতে কখনও কখনও এক ফালি পনির , রুটি আর কফি ।
ময়দার রুটি দাম , রাইয়ের কালো রুটি খেতো । সস্তা ।
তামাকের প্রতি দুর্বলতা ছিল গঘের । যতক্ষণ জেগে থাকতো মুখে থাকতো পাইপ ।
একটা পানীয়ের প্রতি ছিল গভীর প্রেম । অ্যাবসিন্থ । কাছের মানুষদের মুখ থেকে জানা যায় , রোজ সন্ধ্যাবেলায় স্থানীয় বারে গিয়ে বসে থাকতো গঘ । সামনে থাকতো এক পাত্র অ্যাবসিন্থ ।
সবুজ রঙের এই পানীয়টার জন্ম সুইটযারল্যান্ড । মন মাতানো মৌরীর সৌরভ থাকার পরও সবাই এটাকে ' বোতল ভর্তি শয়তান ' বলতো । কারন অ্যালকোহলের পরিমাণ ৭৪% । অনেক দেশে দীর্ঘসময় নিষিদ্ধ ছিল এটা ।অ্যাবসিন্থ পানের পর সবাই বেশ মারদাঙ্গা হয়ে যেত । বাধ্য হয়ে কেনা বেচা বাদ দেয়া হয়েছিল।
আজকাল ইউরোপে খুব সাধারণ পানীয় এই অ্যাবসিন্থ । অস্কার ওয়াইল্ড আর আরনেসট হেমিংওয়ে এই পানীয়ের ভক্ত ছিলেন ।
বারে গিয়ে গঘ আবিস্কার করলো , ফিটফাট ঝরঝরে ভাবে অ্যাবসিন্থ পান করা যায় না । সামান্য নাটক করতে হয় ।
এর জন্য আবার একদম আলাদা গ্লাস দরকার হয় । বাবল গ্লাস বা অ্যাবসিন্থ গ্লাস নামেই বাজারে পাওয়া যায় । মাত্র এক আউন্স অ্যাবসিন্থ ঢেলে, গ্লাসের উপর রাখতে হয় এক ধরনের চামচ । ওটার নামও অ্যাবসিন্থ চামচ । চামচের মাঝখানে খাঁজকাটা নকশা করা ছিদ্র । ওটার অভাবে কাঁটাচামচ রাখে অনেকে। সেটার উপর রাখতে হয় চিনির কিউব । এবার উপর থেকে বরফের মত ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিতে হয় চিনির কিউবের উপর । চিনি গলা জলে গ্লাস ভর্তি হতে থাকে । ঘাসের মত নরম সবুজ পানীয়টা তখন দুধের মত ঘোলাটে হয়ে যাবে ।
সেই সময় গঘ প্রায়ই মাতাল থাকতো । অনেক ছবিতেই অ্যাবসিন্থের পাত্র বা গ্লাস এঁকেছিল । দ্যা ড্রিংকারস আর ক্যাফে টেবিল উইথ অ্যাবসিন্থ, দুটো বিখ্যাত ছবি ।
সাত
আবার একটু নড়াচড়া করার দরকার মনে হল গঘের ।
কোথায় যাবে ?
ফ্রান্স । ছোট ভাই থিও থাকে ওখানে । ওর কাছেই গেল ।
ভাই বেশ কাজের । বেশ কয়েকজন শিল্পীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল গঘকে । ক্লড মোনেট । এমিলি বার্নার্ড । হেনরি ডি টালুউস লট্রেক । উনারা বেশ নাম ধাম কামিয়েছেন তখন । তিনজনের আঁকার স্টাইল আলাদা । রঙের ব্যবহার , ছবির ছাঁদ সব আলাদা । সবাই মিলে তুমুল আড্ডা দিত তখন । দিন রাত আড্ডা । নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বয়ান করতো সবাই । পল গগুইন নামের একজনের সাথে খুব ভাল সখ্যতা গজিয়ে উঠলো গঘের । ওর আঁকা ভাল । সে বলল , গঘের আঁকা ও নাকি ভাল !
উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার তখনই শিখলো গঘ ।
আগের আঁকা সব ছবি কেমন ফ্যাঁকাসে বিবর্ণ রঙে ।
সেটা কি কয়লা খনির পরিবেশের জন্য ? কে বলবে ?
প্যারিসের মধ্য শহরে ভাই থিও -ওর সাথে এক কামরার রুমে থাকতো গঘ । ও গঘের চেয়ে তিন বছরের ছোট । ভাল চাকরি করতো । তখনও হাত খরচের টাকা দিত গঘকে । কারন, ছবি বিক্রি করতে পারতো না গঘ । কয়েকটা স্টুডিয়ো আর গ্যালারীতে নিয়ে গেছে ।
বিদায় করে দিয়েছে । বলেছে এমন ছবি রাখলে নাকি জিন্দেগিতেও বেচা হবে না ।
প্যারিস জায়গা খারাপ না । কিন্তু মানুষ বেশি । গাড়ি ঘোড়াও বেশি । গঘের বুকের ভেতরে সূর্যমুখী ফুলের জন্য কেমন একটা হাহাকার জাগে । শ্বাস নিলেই নাকের ভেতরে ফসল ভরা মাঠের ঘ্রান পায় । মনে হয় কত হাজার বছর ভুট্টার খেত দেখে না । ঝলমল করা স্বর্ণরেণুর মত রোদও দেখে না ।
এইগুলো ছাড়া কি বাঁচা যায় ? মানুষ বাঁচে কেমন করে ? মায়াবী প্যারিসে দুই বছর থেকেই গঘের দম বন্ধ করা ভাব তৈরি হল । শেষে একদিন পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লো গঘ ।
নেমে পড়লো নিঝুম একটা গ্রামে । আরলস ।
খাসা একটা জায়গা । যেমনটা চেয়েছিল সে । রঙের কী বাহার । এখানের আকাশ অনেক নীল । তুঁতের মত । অমন নীল আকাশ আর কোথাও হয় না । আর হলুদ ভর্তি চারিদিক । আবার সেই সাইসাই বাতাস ।
ছবি আঁকার জন্য দরকার এমন একটা জায়গা ।
আরেকটা অবাক করার মত কাণ্ড হচ্ছে, থাকার জন্য চার কামরার একটা বাসা পেয়ে গেল । বললে বিশ্বাস হবে না, বাড়িটার রঙ হলুদ ।
কি কাণ্ড !
বিশ্বাস হয় ?
মে ১, ১৮৮৮ । হলুদ বাড়ি ভাড়া নেয়ার জন্য চুক্তিপত্রে সাইন করলো গঘ ।
দোতলায় কামরার ভেতরে ঢুকে জানালা খোলা মাত্র অবাক হয়ে গেল । জানালার বাইরেই গাছ । ডাল ভর্তি সাদা থোকা থোকা ফুল। নিমন্ত্রণ না পেয়েও ওরা জানালা দিয়ে ভেতরে এসে পড়ছিল ।
খট খটে কাঠের টুলে বসে , সাথে সাথেই ছোট ভাইকে চিঠি লিখতে বসে গেল ।
' থিও , দালানের ডান দিকের কামরা আজ ভাড়া নিলাম। বাইরের দিক দিয়ে হলুদ রঙ করা । ভেতরে সাদা । সাদার মধ্যে কচি লেবুর একটা ভাব আছে । একেবারে রোদে ঝলমল । ভাড়া মাসে মাত্র পনের ফ্রাঙ্ক । ছবি আঁকা শুরু করেছি । সূর্যমুখী , নীল অর্কিড ফুল , উপকূলে নৌকার সারি, খেতে কাজ করা লোকজন ...।'
সারা জীবন পিচ্চি বাজে ধরনের কামরায় জীবন কাটিয়েছে গঘ । বেশির ভাগ আবার চিলেকোঠা । সস্তা হোটেল ।
এই প্রথম আরামদায়ক , আধা বিচ্ছিন্ন বাড়ি পেল ।
বাড়িটা চল্লিশ বছর আগের । খুব একটা মজবুত না। কিন্তু ভাড়াটা বেশ শালীন ।
নীচে একটি রান্নাঘর । আর একটি বসার ঘর ছিল, বসার ঘরটা স্টুডিও হিসাবে পরিবেশন করতো , উপরে দুটি শোবার ঘর ছিল। স্নানের জায়গা ছিল না । জল পাওয়া যেত মেপে । ভেতরে গরম । তামাক আর রঙের গন্ধে বেশ বিচ্ছিরি অবস্থা ।
তারপরও নিজের বাসা । ভেতরের দরজা সবুজ রঙের । যেমনটা গঘ চাইতো । অত কিছুর দরকারও নেই । কফির একটা পট , বিছানা , আয়না । একটা টেবিল আর দুটো চেয়ার দরকার ছিল । আসবাবপত্রের দোকানে গেল । জোগাড় হয়ে গেল । লোহার একটা পাত্র কিনে নিল । সূপ টুপ বানাতে পারবে। বাদলার রাতে রুটির সাথে ...।
চেয়ার দুটো কেন ?
যদি কেউ চলে আসে ? আবেগি কোন রাতে ! বসতে যদি চায় গঘের সাথে ?
বাড়ির নিচতলায় , শামিয়ানার নীচে একটি মুদি দোকান ছিল । ধারে ওখান থেকেই দরকারি জিনিস কিনত গঘ । সারা মাস চলতো । পরের মাসের শুরুতে পোস্টআপিসে ওর টাকা আসতো । পোস্ট মাষ্টার জোসেফ রোলিন এসে সেই টাকা তুলে দিত ওর হাতে।
হলুদ এই বাড়িটার প্রভাব খুবই বেশি পড়লো শিল্পীর জীবনে । বাড়ির উল্টা দিকে ছিল বাগান , ছিল একটা অল নাইট ক্যাফে। মানে সারারাত খোলা থাকতো । নাম , ক্যাফে দে লা গারে । ওটার ছবিও এঁকেছিল গঘ । আরও বাম দিকে, একটি গাছের পিছনে গোলাপী ভবনে, সত্তর বছর বয়সী বুড়ি মার্গুয়েরিট ভেনিসাকের রেস্তোরাঁ ছিল, যেখানে ভ্যান গগ তার নৈশভোজ সেরে নিত হাতে টাকা থাকলে । ডানদিকে, রুট ডি তারাসকন গ্রামাঞ্চল । যেখানে ভ্যান গগ তার সেরা কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্য তৈরি করেছিলেন।
সাথেই সদর থানা ।
বড় রাস্তার উলটা দিকে খুব কাছে দুটি ভায়াডাক্টের উপর দিয়ে ট্রেন চলত, তাই এলাকাটি সব সময় কোলাহলপূর্ণ থাকত।
খুব কম সময় ঘুমাতো গঘ । রাতের পর রাত জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতো । জানালা দিয়েই দেখা যেত ক্যাফে ডি লা গ্যারে ।
লোকজন দেখতো । রাতের নক্ষত্রের আলোয় ভিজে ভিজে লোকজন পানাহার করে, দেখতে ভাল লাগে ।
এই বেডরুমেরই তিনটে ছবি এঁকেছিল সে । রঙের ঘনত্ব বাড়িয়ে কমিয়ে ।
হলুদ বিছানা । দুটো বালিশ , দুটো বালিশ কেন ? যাতে নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে না হয় । হালকা বেগুনি দেয়াল । দেয়ালে গঘের নিজের একটা ছবি ঝুলছে, পাশে একটা সুন্দরমত মেয়ের ছবি । মেয়েটা কে সেটা বলার দরকার দেখি না । খটখটে কাঠের টেবিল, চেয়ার, আয়না , তোয়ালে সব মিলিয়ে স্বপ্নের মত মায়াবী গঘের কামরা ।
আরও একটা ব্যাপার, আরল শহরে আসার পর থেকে নীল আর হলুদ রঙ ওর মাথার ভেতরে গেঁথে গেছে । ভাই থিওকে চিঠি লেখার সময় এই হলুদ বাড়ির স্কেচ এঁকে পাঠিয়েছিল ।
এই হলুদ বাড়ি আর এই মায়াবী শহর গঘের মনে বসন্ত এনে দিল । পাগলের মত ছবি আঁকতে লাগলো । বিক্রি হয় না তো কি হয়েছে ? এইসব ওর নিজের জিনিস। থাকুক ওর কাছেই ।
কফি পটের ছবিও এঁকে ফেললো ।
সেপ্টেম্বরে নতুন একটা বিছানা কিনে ফেলল । গেস্ট রুমের জন্য । খুব ইচ্ছে হত , শহরের শিল্পী বন্ধুরা ওর হলুদ বাড়িটা দেখতে আসুক । পছন্দের শিল্পীদের তালিকায় প্রথম ছিল শিল্পী পল গগুইন ।
অক্টোবরের শেষের দিকে পল চলে এলো ।
আট
গঘের সব সময় মনে হত , সবারই উচিৎ একবার তার চারিদিকটা ঘুরে দেখা ।
দূরে কোথাও যাওয়া দরকার । জীবনে একবার হলেও ফসলের মাঠ দেখা দরকার ।
দেখার চোখ থাকলে প্রকৃতির সব সৌন্দর্য ধরা দেবে । গঘের কাছে প্রকৃতিকে ভালবাসা আর ঈশ্বরকে ভালবাসা এক অর্থে সমান ।
এখানেই কিছু চেস্টনাট গাছ পেল গঘ । বেশ সুন্দর । লোকজনের বাড়ির বাগানে লাইলাক , হরথন , ল্যাবানাম ফুল ফুটে থাকে । দেখার মত জিনিস ।
মানুষ নয়টা পাঁচটা আপিস করে জীবনটা কেমন শেষ করে ফেলে । তাজ্জব । এই যে আর্লস শহর , এখানে না এলে কি জিনিস হারাতো জীবন থেকে, গঘ সেটা ভাবতেই পারে না !
সূর্যমুখী ফুলের মাঠে দাঁড়ালে ওর মাথা কেমন ঝিমঝিম করে ।
গহন রোদের মধ্যে ফসলের খেত । কিছু শ্রমিক কাজ করে , মধ্য দুপুরে খেতের কোনে ছায়ায় শুয়ে বিশ্রাম নেয় । মাথার উপর খড়ের টুপি দিয়ে চোখ আড়াল রাখে । ঘুম দেয় ওরা ।
একদিন সন্ধ্যার খানিক আগে বাড়ি ফেরার সময় দেখে, শেষ বিকেলের আলো গিয়ে পড়েছে কারও বাড়ির জানালার শার্সিতে । দামি রত্নের মত জ্বলছে জানালার কাচ । পুকুরের জলে তরল সোনা মিশিয়ে দিয়েছে কেউ । কুইপের আঁকা ছবির মত ।
অমন রঙের বাহার শিখতে পারব ? মনে মনে ভাবে গঘ।
শিল্পীর সংজ্ঞা কি ?
কেন লোকজন নিয়ম বেঁধে দেয় অমুক নিয়মে ছবি আঁকতেই হবে ? কেন ? এই নিয়ম বানানর সে কে ?
গঘের রঙতুলিতে কোন ব্যাকরণ নেই ।
হাঁটতে হাঁটতে একবার দিয়েপ উপকূলের কাছে চলে গিয়েছিল সে ।
আকাশ আর সমুদ্র আলাদা দুই নীল রঙ । বন্দর ভর্তি রঙ চটা পুরানো নৌকা , মাছ ধরার ধূসর জাল । বিবর্ণ নৌকার পাল । জেলেদের মুখে গিজগিজে দাড়ি । তেলতেলে ময়লা জামা ওদের গায়ে ।
বন্দরের পাশে ছোট ছোট বাড়ি । ফাঁকে ফাঁকে দুই চারটে রেস্তোরা । বাতাসে জানালার সবুজ পর্দা উড়ছে ।
বাড়ি ফেরার সময় রাত হয়ে যায় । এলম গাছের ফাঁক দিয়ে রাতের বাতাস হিস হিস করে চলে যায় । রাতের বাতাস কিছু বলতে চায় যেন । কত হাজার বছরের গল্প সে জানে । জলভরা মেঘের ফাঁক দিয়ে নেমে আসে চাঁদের আলো । পথ দেখায় দিশেহারা পথিককে ।
অবেলায় ঘুমিয়ে গেলে, কখনও কখনও জেগে উঠে মাঝরাতে । বাইরে শান্ত রাত । পৃথিবীর সব কোলাহল থেমে গেলে রাতের নক্ষত্র আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে যায় । মিটমিট আলোর সংকেত দিয়ে ঈশ্বর বলতে চান , আমি আছি । তোমাদের সাথেই আছি । মহাকালের শেষ পর্যন্ত । আবার থাকব শুরু থেকে ।
এক রাতে ঘুম ভেঙ্গে জানালা দিয়ে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায় গঘ । হাজার হাজার নক্ষত্র ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে নেমে আসছে নিচে । ভাল করে চোখ কচলে দেখে , বৃষ্টি হচ্ছে । ঠাণ্ডা হাওয়া । কামরার ভেতরে কেরসিনের লন্ঠন কেপে কেপে আলো দিচ্ছে । লন্ঠনের কাচ তম্বী ।
আরও একবার আবিস্কার করলো , দিনের চেয়ে রাত বেশি সুন্দরী । রঙিন ।
আরেকটা ব্যাপার , শিল্পীর ভাল একটা কাজের জায়গা দরকার । ভাল কাজের জন্যই এটা দরকার । শিল্পীর দরকার পড়ার । প্রচুর পড়তে হয় । গঘ ধার চেয়ে চেয়ে বই পড়ে , হাতের কাছে মদের বোতল পেলে ওর লেবেলও পড়ে ।
শীতের মউসুম বই পড়ার জন্য সেরা ।
নিজের আঁকা ছবিতে ভিনসেন্ট নাম সই করে সে । ভ্যান গঘ লিখতে চায় না । কারন লোকজন উচ্চারণ করতে ভুল করে । সবাইকে বেশ কয়েকবার বলার পরও ভুল নাম বলে ।
ছবি বিক্রি হছে না। সমস্যা । তবে কেন যেন মনে হয়, একদিন ভাল দামেই বিক্রি হবে ।
চেষ্টা করছিল রঙ দিয়ে ঋতু ধরার জন্য । মনে হয় ছবিতে গরমের মউসুম ধরা খানিক কষ্টকর । সেটা হলুদ রঙ করতে পারে। বসন্ত হতে পারে সবুজ , নীল , আর লাল । হেমন্ত হতে পারে হলুদ আর বেগুনি । শীত কালো , ধূসর ।
অনুভুতি বড় একটা বিষয় । সেটা সব সময় লাগবে, নইলে পানশালায় বসে এক পাত্র মদ গেলাও একঘেয়ে হয়ে যাবে ।
একবার বইয়ের দোকান ঘুরে দুটো বই পেল সে । আঙ্কেল টমাস কেবিন , লা মিজারেবল । টান টান এই বই দুটো সবারই পড়া দরকার । আরও ঠিক করলো , চার্লস ডিকেন্সের সবগুলো বই কিনবে । টাকা হলেই কিনবে । ফরাসি বিপ্লব নিয়ে উনার ' আ টেল অফ টু সিটিজ' সেরা একটা কাজ ।
সময় পেলে একটা বইয়ের দোকানের ছবি আঁকবে । দোকানের রঙ হবে হলুদ আর গোলাপি । সময়টা হবে সন্ধ্যাবেলায় । কালো রঙের ছায়া ছায়া কিছু লোকজন দোকানের সামনে দেখা যাবে। সারা জীবনে বারোটা সূর্যমুখী ফুল এঁকেছিল সে ।তারমধ্যে প্যারিসে থাকতে এঁকেছিল পাঁচটা । বাকি সাতটা, এই আরল শহরে আসার পর এঁকেছে ।
যদিও লোকজন তেমন পছন্দ করেনি ছবিগুলো । কেন জানি না । বলতে পারবে না গঘ । মডেল বসিয়ে যাদের ছবি এঁকেছিল তারাও পছন্দ করেনি । শুধু পোষ্ট মাস্টার জোসেফ রোলিন গঘের ছবির প্রশংসা করতেন । উনার একটা ছবিও গঘ এঁকেছিল । খুবই সজ্জন ব্যক্তি । গঘকে পছন্দ করেন । ভাল বন্ধু । ডাকঘরের পাশ দিয়ে যাওয়া - আসার সময় ডেকে কফি খাওয়ান ।
সব সময় খোঁজ নেন। বলেন এই শিল্পী একদিন এই শহরকে বিখ্যাত বানিয়ে দেবে ।
উনার গিন্নি এবং বাচ্চাদের ছবিও এঁকেছিল গঘ ।
ছবি আঁকায় ব্যস্ত থাকলেও নিঃসঙ্গতায় ভুগতো । একঘেয়ে লাগত । মানুষের সঙ্গ ভাল লাগত বলেই ক্যাফে আর রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে লোকজনের সাথে কথা বলতো ।
পল গগুইন চলে আসায় মনটা ভাল হয়ে গেল । পল ওর বন্ধু ।
পাশের পিচ্চি রুমটা দিল ওকে থাকার জন্য । সেই রুমের দেয়াল ভর্তি সূর্যমুখীর ছবিগুলো ছিল । টুকটাক মেরামত করে ঘরটা সুন্দর বানিয়ে ফেলল ।
দুইজনের আড্ডা দিতো । দুপুরের রোদে ভিজে টো টো করে ঘুরতো । সমস্যা হল ওদের দুইজনের মধ্যে প্রচুর তর্ক আর ঝগড়া হত । পলের ধরনা, সে নিজেই অনেক বড় শিল্পী । গঘের আঁকার মধ্যে অনেক খুঁত আছে ।
হয়তো গঘের ছবি ভাল না । কিন্তু পরোয়া করে না সে , আঁকতে ভাল লাগে। আঁকে । না এঁকে থাকতে পারে না।
ওদের হলুদ বাড়িটা ছিল বিচ্ছিরি ডিজাইনের । সবচেয়ে লম্বা দেয়ালটা ছিল ২৪ ফুট , আড়াআড়ি ১৬ ফুট । আরেক সাইড ছিল সাড়ে নয় ফুট । একদম পিচ্চি বলা যাবে না । তবে জায়গার খুব অভাব ।
আরও একটা ব্যাপার নিয়ে দুই বন্ধুর ঝগড়া হত , পল স্মৃতি থেকে ছবি আঁকতে পছন্দ করতো । গঘ সামনে মডেল রেখে ছবি আঁকতে পছন্দ করে । রোদে বা খোলা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে ছবি আঁকতে পছন্দ করে না পল । বাসায় বসে নির্জন ভাবে ওর পছন্দ। গঘ আবার খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে আঁকতে ভালোবাসে ।
দুইজনের মধ্যে সেইরকম ঝগড়া হত । সব সময় ।
১৮৮৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর, রাত এগারোটার দিকে দুইজনের মধ্যে প্রায় কুরুক্ষেত্র লেগে গেল । আর পল গগুইন ওর জিনিসপত্র নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেল ।রাগে দুঃখে হাতের কাছের ক্ষুর পেয়ে সেটা দিয়ে নিজের কান কেটে ফেললো গঘ । না, পুরো কান না। শুধু কানের লতি ।
পরে কি হয়েছিল মনে নেই ।
পরদিন জ্ঞান ফিরল হাসপাতালে । কারা নাকি ওকে ধরে এনে ভর্তি করিয়েছে । আরও খারাপ খবর সেই কাঁটা কানের টুকরো গঘ ওর পছন্দের একটা মেয়ের কাছে প্যাকেট করে পাঠিয়েছিল ।
মেয়েটা ওর বান্ধবী । ক্যাফেতে পরিচয় ।
কিন্তু এত কিছু কখন করলো গঘ ?
গ্যাব্রিয়েল বার্লাটিয়ার , সুন্দর মত মেয়েটা চাকরানীর কাজ করে । গঘের সাথে ক্যাফেতে দেখা হয়েছিল বেশ কয়েকবার । আগে সেই ক্যাফেতেই কাজ করতো । বাড়ি ফেরার পথে কুকুর ওর পায়ে কামড়ে দিয়েছিল । ওষুধের দাম বেশি । খরচা পোষানোর জন্য ঝাড়া পোছার কাজ নিয়েছে ইদানিং ।
মেয়েটাকে সে পচ্ছন্দ করতো । একবার নাকি মেয়েটা বলেছিল , তোমার কানদুটো বেশ সুন্দর ।
কে জানে !
সেই রাতে কাজের জায়গার বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল গ্যাব্রিয়েল । আচমকা হাজির হল ভ্যান গঘ । মাথায় কেমন ব্যান্ডেজ । অত রাতে নারীসঙ্গের জন্য হাজির হয়েছে গঘ , সেটা মোটেও বিশ্বাস করে না গ্যাব্রিয়েল । ওর হাতে কাগজে মোড়ানো একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিল গঘ । ফিসফিস করে বলল , জিনিসটা যত্ন করে রেখে দিও ।'
বলেই হাওয়া হয়ে গেল ।
প্যাকেট খুলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল গ্যাব্রিয়েল । ভেতরে রক্তমাখা কানের লতি ।
জ্ঞান ফেরার পরও কেমন পুতুল হয়ে বসে ছিল গ্যাব্রিয়েল ।
সকাল বেলা লোকজন গিয়ে দেখে বিছানায় শুয়ে আছেন গঘ । কানে ব্যান্ডেজ । জ্বরে জবুথুবু ।
সবাই মিলে হাসপাতালে নিয়ে গেল । কী ভাবে কি হয়েছে কিছুই বলতে পারে না সে। নিজেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছে খানিকটা । বেশ কিছুদিন থাকতে হল হাসপাতালে। এখানে বসেই ছবি আঁকলো কয়েকটা । বিখ্যাত সেই আত্মপ্রতিকৃতি । গায়ে সবুজ কোট , মুখে পাইপ , কানে পট্টি । ছবিতে ডান কানে ব্যান্ডেজ দেখা গেলেও আসলে বাম কান কেটেছিল ।
আয়নার সামনে বসে আঁকলে যা হয় আরকি !
খানিক সুস্থ হয়ে উঠলো আমাদের এই পাগল শিল্পী । আর এর মাঝে নাকি একবার টিউব থেকে হলুদ রঙ বের করে খেয়ে ফেলেছিল !
ছোট ভাই থিও সব সময় খোঁজ খবর রাখতো । ব্যর্থ বড় ভাইটাকে খুব ভালবাসত যে । ঠিক করলো নিজে দেখাশোনা করবে ভাইয়ের । আরল থেকে ট্রেনে চেপে ভ্যানগঘ চলে গেল , আওরভাস সুর অসে। উত্তর ফ্রান্সের ছোট্ট একটা গ্রামে ।
ছোট ভাইয়ের খুব কাছে । সেখানে ডক্টর পল গ্যাসে নামের এক ভদ্রলোক গঘকে দেখাশোনা করে রাখবেন অমন কথা দিলেন থিওকে ।
শিল্পরসিক হিসাবে উনার বেশ সুনাম আছে । উনার বাড়িতেই উঠলো গঘ ।
এখানে বেশ নতুন উদ্যম নিয়ে ছবি আঁকা শুরু করলো ভ্যান ।
গ্যাসের একটা ছবি তো আঁকা হয়েছেই । পাশের বাগান, গমের খেত সব কিছুই এঁকে ফেলল সে ।
তবে সেই সময় গঘের মানসিক অবস্থা খুব খারাপ যাচ্ছিল । লোকমুখে শুনেছে, ছোট ভাই থিও গঘের চাকরি চলে যাবে , যে কোন সময় । নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অস্থির হয়ে গেলো ভ্যান । কোথায় জীবনের হাল ধরবে তা না উল্টা ছোট ভাইয়ের আয়ের উপর বেঁচে আছে।
পরিবারের বোঝা । সবার বোঝা ।
আর ছবি বিক্রি হবে তেমন কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কেমন করে চলবে শেষের দিনগুলো ?
নয়
২৭ জুলাই , ১৮৯০, রবিবার ।
সকালের জলখাবারের পর বের হয়ে গেল গঘ । পিঠে ব্যাগে রঙ তুলি , হাতে ক্যানভাস । আর সব দিনের মতই ।
আর্থার রাভাক্স ইন, বাড়িটার পাঁচ নাম্বার রুমে থাকে সে। নিচে ক্যাফে ।
উপরে অল্প কিছু ভাড়াটে থাকে ।
আজকাল সবাই বাড়িটাকে ' হাউজ অভ ভ্যান গঘ ' বলে । কারন জীবনের শেষ সত্তরটা দিন এই বাড়িতেই কাটিয়েছিল গঘ ।
অ্যাডলাইন রাভাক্স, বাড়ির গৃহকর্তার মেয়ে রান্নাঘরে কাজ করছিল । দুপুরের খাবার বানাচ্ছে । আচমকা গুলির শব্দ শুনতে পেল সে । দূরের গম খেত থেকে সেই শব্দ এসেছে ।
সারাদিন চলে গেল । আবছা অন্ধকার নেমে আসার পরও বাড়ি ফিরলো না গঘ । সারাদিন বাইরেই ছিল । ইদানীং সন্ধ্যা ঘন হবার আগেই বাড়ি ফিরে আসতো । আজ দেরি দেখে সবাই চিন্তা করছে ।
ঠিক রাত নয়টার সময় ক্লান্ত পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরলো গঘ । হাত দিয়ে বুকের কাছটা ধরে রেখেছে ।
অ্যাডলাইনের মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ কোন সমস্যা হয়েছে নাকি , ভিনসেন্ট ?
মাথা নাড়লো ভ্যান । বিড়বিড় করে বললো , ' না মনে হয় ...।'
সিঁড়ি বেয়ে সোজা উপরে নিজের কামরায় চলে গেল । সিঁড়িতে রক্তের ফোঁটা !
বাড়ির সবাই বুঝতে পারলো মস্ত কোন ঘটনা ঘটেছে । দৌড়ে উপরে গেল খোঁজ নিতে ।
বুকের ক্ষত দেখে আঁতকে উঠলো সবাই । ভ্যান গঘ আমতা আমতা করে স্বীকার করলো , দুপুর বেলা গমখেতেই বসে ছিল । যেখানেই গত কয়েকদিন ধরে ছবি আঁকছিল । পিস্তল দিয়ে নিজের বুকেই গুলি করেছে । সন্ধ্যাবেলায় হিম হিম ঠাণ্ডা হাওয়ায় জ্ঞান ফিরে আসে তার । তারপর হেঁটে চলে এসেছে বাড়িতে ।
ভ্যানের কাছে পিস্তল ছিল ?
ছিল । অমন গল্প পরে কেউ কেউ বলেছে, শেষ ছবিটা আঁকার সময় মাঠে এক ঝাঁক কাক বিরক্ত করতো । বাধ্য হয়ে পিস্তল কিনেছিল ।
কাক তাড়ানোর জন্য পিস্তল ?
বেখাপ্পা ।
গুলি লাগার পর গম খেত থেকে হেঁটে আর্থার রাভাক্স ইনে গেছেন ভ্যান । পথের দূরত্ব আধ মাইল । উঁচু নিচু পথ। গুলি খাওয়া একজন মানুষ এতদূর হেঁটে গেছে ব্যাপারটা কষ্টকর ।
দুপুরে, গমখেতের সচেয়ে কাছের বাড়ির বুড়ো গৃহকর্তা, গুলির শব্দ শুনে বাইরে বের হয়েছিলেন । খেতের দিকে অনেকক্ষণ উঁকি ঝুঁকি মেরেও কাউকে দেখতে পাননি ।
ডাক্তার গ্যাসে , ভ্যানের বুকের ভেতর বুলেট আবিস্কার করেন ।
স্থানীয় পুলিশ রিপোর্টে লিখে দিল , গুলিটা খুব বিচ্ছিরি এঙ্গেলে বুকে ঢুকেছে । বেশ দূর থেকেই গুলি করা হয়েছিল । নিজের হাতে পিস্তল ধরলে এত দূর হাত যাবে না ।
তবে কোন রকম তদন্ত বা ফরেনসিক কাজ করা হয়নি সেই সময় ।
অফিসার জিজ্ঞেস করছিল , ' তুমি কি আত্নহত্যা করতে চেয়েছিলে ?'
পাইপ টানতে টানতে ভ্যান বলেছিল , ' মনে হয় । অন্য কাউকে দোষ দেবেন না।'
সোমবার সকালে পোষ্ট অফিস খুলতেই অ্যাডলাইনের বাবা দৌড়ে গিয়ে ভ্যানের ছোট ভাই থিওকে টেলিগ্রাম করে দিলেন । দুপুরের ট্রেনেই থিও চলে এলো ।
অজ্ঞান হয়ে ছিল ভ্যান । জ্ঞান ফেরার পর ছোট ভাইয়ের সাথে অনেক কথা বলে ।
২৯ জুলাই রাত একটায় মারা যায় অভিমানী , ব্যর্থ , হতাশ , বিচিত্র এই মায়াবী শিল্পী ।
জুলাই ৩০, দুপুরবেলা কবর দেয়া হয় ভ্যানকে । হলুদ ডালিয়া আর সূর্যমুখী ফুল দিয়ে লাশ সাজিয়ে দেয়া হয়েছিল।
দশ
দিনটা ছিল গরম ।
শহরের প্রায় সবাই উপস্থিত ছিল । ছিল শিল্পী বন্ধুরা । ডাক্তার গ্যাসে , ছোট ভাই থিও । চোখ ভর্তি জল নিয়ে ডাক্তার গ্যাসে বললেন , ' সে ছিল একজন সৎ মানুষ এবং দুর্দান্ত শিল্পী ... যার দুটি লক্ষ্য ছিল, শিল্প আর মানবতা।'
পিস্তলটা পাওয়া যায়নি । কোথাও না ।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার , জিনিসটা ভ্যানের কাছে এলো কোত্থেকে ? নিঝুম একটা গ্রামে সেই সময় একটা পিস্তল কি ভাবে পেল সে ? কিনেছে ? টাকা কই ? চুরি করেছিল কারও পিস্তল ? সে ভদ্রলোক চুরির রিপোর্ট দেয়নি কেন ?
গমের খেতে পরদিন আঁতিপাঁতি করে খোঁজ করা হয়েছিল ।
পাওয়া যায়নি কিছু । এমন কি, শিল্পীর শেষ আঁকা ছবি , ইজেল , রঙতুলি কিচ্ছু পাওয়া যায়নি ।
কে যেন নিয়ে গেছে সব ।
১৯৬৫ সালে সেই গমখেতে কাজ করার সময় মরচে ধরা একটা রিভলবার খুঁজে পায় স্থানীয় এক কৃষক । অস্ত্রটি বেলজিয়ামের তৈরি লেফাউচাক্স পিনফায়ার রিভলবার, উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের সবচেয়ে জনপ্রিয় বেসামরিক হ্যান্ডগানদের মধ্যে ছিল এটা । ১৮৯৩ সালের পর এই ধরনের রিভলবার আর তৈরি হত না। বাজার থেকে হারিয়ে যায়, নতুন মডেলের জন্য ।
সাত মিলিমিটার ক্যালিবার । একই ক্যালিবারের বুলেট বের করা হয়েছিল ভ্যানের শরীর থেকে ।
ধারনা করা হয় এই রিভলবার দিয়েই আত্নহত্যা করেন শিল্পী ।
পরীক্ষা করে দেখা যায় , ১৮৯০ সাল থেকেই মাটিতে পড়ে ছিল রিভলবারটা । পরীক্ষায় আরও জানা যায় লো পাওয়ারের গান ছিল সেটা । সেইজন্য ভ্যান সাথে সাথেই মারা যায়নি ।
তবে ১৯৯৩ সালে এক প্রাক্তন ফরাসী সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট দাবি করেছেন , বন্দুকটি ওখানে খুঁজে পাওয়া, দীর্ঘ মেয়াদি একটি প্রতারণার অংশ , ১৯৫৫ সালের পর গমখেতে কায়দা করে ফেলে রাখা হয়েছিল ওটা । ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে ।
২০১৬ সালে এই অস্ত্র আমস্টারডামে ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে দর্শকদের জন্য রাখা হয় ।ট্যাগ দেয়া হয় ' শিল্প জগতের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত অস্ত্র ।'
২০১৯ সালে নিলামে তোলা হয় সেই জিনিসটা । প্যারিস নিলাম সংস্থা – র্যামি লে ফুর আগ্নেয়াস্ত্রটি ষাট হাজার ডলার দাম চেয়ে বসে । আঠারো বার দামদামি করে শেষে ১ লক্ষ ৮০ হাজার ডলারে বিক্রি করা হয় । অজ্ঞাত পরিচয়ের কোন এক ব্যক্তি টেলিফোনের মাধ্যমে রিভলবারটা কিনে নেন ।
ভ্যান বেঁচে থাকতে বহুল আলোচিত প্রশ্ন ছিল শিল্পী কান কেটেছিল কেন ? মরার পর আলোচিত প্রশ্ন - আত্নহত্যা নাকি খুন ?
গঘের ডাক্তার পল গাসেট বিশ্বাস করেন শিল্পী আত্নহত্যা করেছে । শিল্পীর মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পরে আবার চিঠি লিখে থিওকে জানান , গঘ আত্নহত্যা করেছে ।
ছোট ভাই থিও যে গঘের বিছানার পাশে শেষ বারো ঘণ্টা বসে ছিল এবং কথা বলে গেছে ভাইয়ের সাথে, সে নিজেও বিশ্বাস করে ভাই আত্নহত্যা করেছে । কোন রকম সন্দেহের কথা পুলিশকে জানায়নি সে ।
ভ্যান গঘের নিকটতম বন্ধু এমিল বার্নার্ড শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছিলেন এবং ডাঃ গাসেট এবং থিওর সাথে কথা বলেছেন। ডাঃ গ্যাসেট বার্নার্ডকে বলেছিল , তিনি আশা করেছিলেন গঘ বেঁচে যাবে , তবে ভিনসেন্ট তাকে সতর্ক করেছিলেন, "তাহলে আমাকে আবার এমন করতে হবে । "
শেষকৃত্যে দুই দিন পরে, বার্নার্ড সমালোচক অ্যালবার্ট অরিয়ারের কাছে একটি বিশদ বিবরণ লিখেছিলেন: “তিনি নিজেকে হত্যা করেছিলেন। রবিবার সন্ধ্যায় তিনি আউভার্সের আশেপাশের গ্রামে গিয়েছিলেন, একটি খড়ের গাঁদায় নিজের ইজিলটি রেখে পিছনে গিয়ে নিজেই গুলি চালিয়েছিলেন।
বন্ধু পল গগুইন বিশ্বাস করেছিলেন এটি আত্মহত্যা।
গান শ্যুটিং সম্পর্কে কোনও পুলিশ রেকর্ড নেই, সেইদিন গোলাগুলি হয়েছে অমনটা বিশ্বাস করে না পুলিশ ।
উনাদের মতে এটা খাঁটি আত্নহত্যা ।
আর্থিক সমস্যার কারনে আত্নহত্যা করেছে ভ্যান গঘ , কমবেশি সেটাই বিশ্বাস করে সবাই । সারাজীবন ছোট ভাই থিও-র কাছ থেকে মাসিক খরচ দিয়ে চলছিল সে । থিও বিয়ে করেছে এবং জানুয়ারি ১৮৯০ , সম্প্রতি তার বাচ্চা ছেলে হয়েছে । থিও-র চাকরি চলে যাবে অমনটা শুনেছিল গঘ । কারন গ্যালারির মালিকের সাথে থিও-র সম্পর্ক ভাল যাচ্ছিল না । সব মিলিয়ে তার ভেতরে মানসিক এক টানাপোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল । নিজেকে বোঝা মনে করতে শুরু করেছিল সে।
কে জানে সেই দুপুরের হলুদ রোদে পাকা গমখেতে বসে কী কি ভাবছিল বেচারা । তার মনের ভেতরে কি সব আবেগ তৈরি হয়েছিল তার খবর আমরা জানব কেমন করে ?
সেই চাপ থেকে মুক্তি পেতে নিজেকে পৃথিবীর বুক থেকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিল এই লোকটা ?
অ্যাডলাইন রাভাক্স। ভিনসেন্টের শেষ যে বাসভবনে ছিল তার মালিকের তের বছরের মেয়ে ( ভিনসেন্ট ওর ছবি এঁকেছিল , তাও তিনবার ) । গঘের মৃত্যুর পর সেই দিনের ঘটনার বিবরণ ওর কাছ থেকেই পাওয়া যায়।
১৯৫৩ সালে ইতিহাসের ছায়া থেকে বের হয়ে পঁচাত্তর বছর বয়সী বিধবা হিসাবে আবির্ভূত হয় সে । ভ্যান গগের মৃত্যুর দৃশ্যের একেবারে প্রাঞ্জল বিবরণ দেয় এবার । পরে তিনি এই সাক্ষ্যটি পরিবর্তন করেছিলেন, সম্ভবত প্রভাবশালী বা সরকারের চাপে।
জানা যায় , তার বাচ্চা কাঁচ্চা ছিল । কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের কোন হদিস পাওয়া যায়নি ।
এই রহস্যময় মহিলা ১৯৬৫ সালে আটানব্বই বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন। তিনি কথায় বা কাগজে এই বিশাল নাটককে তার ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট কোন তথ্য দিয়ে যান নি ।
সেই গ্রীষ্মে তিনবার ছবি আঁকতে গিয়ে সামনে মডেল হয়ে বসেছিল অ্যাডলাইন। গঘের সাথে কোন রকম সম্পর্ক হয়েছিল ? যার কারন হিসাবে শিল্পীকে মরতে হয়েছিল ।
মেয়েটার কামরা থেকে উঠান পেরিয়ে গেলেই গমের খেত । যেখানে দাঁড়িয়ে ভ্যান গঘ ছবি আঁকতো । প্রায়ই দুপুরে সে ওখানে গিয়ে দেখা করতো শিল্পীর সাথে। সে নিজেই বলেছিল গঘ রোমান্টিক মেজাজের মানুষ ।
মরার আগে সে এও বলেছিল , হারানো রিভলবারটা তার বাবার হতে পারে !
হতে পারে ?
কেন যেন মনে হয়, উনার কোন ভূমিকা ছিল । আজ জানার উপায় নেই ।
পরবর্তীতে যারা ভ্যান গঘের জীবনী লিখতে গিয়েছে , তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছিল সেই কিশোরী অ্যাডলাইন রাভাক্স সম্পকে প্রায় কোন তথ্যই পাওয়া যায় না ।
কোন কোন নিষ্ঠুর সমালোচক গঘের হত্যার পিছনে ছোট ভাই থিও-র হাত আছে অমনটা মনে করেন ।
কি ভাবে সম্ভব ?
সারাজীবন বড় ভাইয়ের পাশে থেকে উৎসাহ দিয়ে শেষ পর্যন্ত ...? মোটিভ ছিল কি ?
বড় ভাই বোঝা হয়ে উঠেছিল তার জীবনে ? হতাশ হয়ে গিয়েছিল বড় ভাইয়ের জন্য । সে যদি ট্রিগার চেপে থাকে দুই ভাই সেই সত্য নিজেরা হজম করে ফেলেছিল ? সেইজন্য কাউকে দায়ী করতে চায়নি ভ্যান গঘ । তবে ... ইতিহাসের ভ্রাতৃত্ববোধের সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্তটি কি বাস্তবে এমন গোলমেলে আর ভয়াল কাহিনি হতে পারে? আগের দিন সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সেই গ্রামে গিয়েছিল থিও ?
মনে হয় না ।
ছোট ভাই থিও-র মৃত্যু ছিল বেশ রহস্যময় ।
১৯৯০ সালে ছোট ভাই থিও ভ্যান গঘের সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং রহস্যজনক মৃত্যুর মেডিকেল রেকর্ডগুলি নতুন করে উন্মুক্ত করা হয়েছিল।
দেখাগেল , ফাইলের শেষ পাতাগুলি – যেখানে থিও-র জীবনের শেষ চার দিনের রেকর্ড রাখা হয়েছিল , অদ্ভুত কারনে সেই পাতাগুলো সব অদৃশ্য হয়ে গেছে। এই পৃষ্ঠাগুলিতে সেই গ্রামের বাড়ির রহস্য সম্পর্কিত অন্যান্য তথ্যগুলির সাথে থিয়ো তার শেষ সময়ে স্বীকারোক্তি সহ যা কিছু বলেছিল তার বিবরণ ছিল ।
ক্লিনিকের এক মুখপাত্র দাবি করেছেন , ফাইলগুলো এমন জায়গায় রাখা , সেখানে অন্য কারও প্রবেশের অনুমতি ছিল না, পৃষ্ঠাগুলি অবশ্যই ভ্যান গগ পরিবারের কেউ নিয়েছে । কি হয়েছেল এই পৃষ্ঠাগুলোর ?
কি রহস্য লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল ভ্যান গঘের পরিবার ?
ডাক্তার গ্যাসেট, তার জীবনের শেষ দুই দশকের বেশিরভাগ সময় ভ্যান গগ সম্পর্কে একটা স্মৃতিকথা লেখার কাজে ব্যয় করেছিলেন । প্রায়শই তিনি কাছের লোকজনদের বা অতিথিদের বিরক্ত করতেন। ভ্যান গঘের ব্যাপারে তথ্য জোগাড় করতেন , শিল্পীর সম্পর্কে অনেক অজ্ঞাত সত্য প্রকাশ করতেন ঘরোয়া আড্ডায় ।
তবে বইটি কখনই প্রকাশিত হয়নি !
অদ্ভুত ব্যাপার পাণ্ডুলিপির কোনও একটি পৃষ্ঠা ও পাওয়া যায়নি । এমনকি চিকিৎসকের হাতের লেখায় কোন কাগজ পত্র টিকে নেই ।
কারও কারও অনুমান অনুসারে বইটি কেবল ভ্যান গগ হত্যার কথাই নয়, ইতিহাসের সম্ভবত সবচেয়ে মনমুগ্ধকর সিরিয়াল- খুনের রহস্য লুকিয়ে ছিল !
ডাক্তার গ্যাসেটের মেডিক্যাল ফাইল , যাতে ভ্যান গঘের শেষদিনগুলোর ব্যাপারে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লিখে রেখেছিলেন সবই হারিয়ে গেছে রহস্যময় ভাবে ।
তের-বছরের কিশোরীর সাথে ধরা যাক ভ্যান গঘের কোন রকম সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল ।
বাবা আর্থার রাভাক্সের মনের ভাব কেমন হয়েছিল ? শোনা যায় শিল্পীকে সে একদম পছন্দ করতেন না।
পিস্তলটা ও নাকি তার ছিল । হলুদ রোদের সেই দুপুরে গমের খেতে গিয়ে নিজেই গুলি করেছিল ?
শোনা যায় গঘের মৃত্যুর পর তার আঁকা সবগুলো ছবি নাকি ময়লার স্তূপে ফেলে দিতে বলেছিলেন আর্থার রাভাক্স ।
পুরো ঘটনা কি তার করা ?
গঘের মৃতুর পর সেইজন্যই কি নিজের মেয়েকে আড়ালে রেখে দিয়েছিলেন ?
২০১১ সালে দুইজন আমেরিকান গবেষক অনেক তথ্য প্রমাণ ঘেঁটে দাবি করেন, ভ্যান আত্নহত্যা করেনি ।
দুর্ঘটনার শিকার ।
সেই সময় গমখেতে দুইজন অল্প বয়স্ক ছেলে এই রিভলবার নিয়ে খেলছিল । দুর্ঘটনাবশত ট্রিগারে চাপ পড়ে যায়। গুলি গিয়ে সোজা শিল্পীর গায়ে লাগে । অস্ত্র ফেলে পালায় দুই ভাই ।
গঘকে পছন্দ করতো না দুইজন কিশোর । তার উসকো খুসকো চুল , আধ ময়লা কুঁচকানো কাপড় , তার উপর এক কানের লতি কাটা।
নানা রকম কায়দা করে শিল্পীকে বিরক্ত করতো ওরা দুই ভাই ।
কফির পেয়ালার লবণ ঢেলে দিত । শুকনো তুলিতে মরিচের গুড়ো মাখিয়ে দিত। কারন ওরা খেয়াল করেছে , চিন্তা করার সময় অন্যমনস্ক ভাবে তুলি নিয়ে মুখের ভেতরে রেখে চুষে গঘ । এমন কি একবার রঙ আর ক্যানভাসের বাক্সে হলুদ- কালো চিত্রিওয়ালা সাপ (গ্রাস স্নেক) রেখে দিয়েছিল !
আমেরিকান দুই গবেষক লেখক মনে করেন, স্থানীয় দুই দুষ্ট বালক ভ্যান গঘকে গুলি করেছিল সেই দিন ।
বালকদের প্রধান ছিল রেনে সেক্রেটান । রেনে ছুটি কাটাতে গিয়েছিল সেই শহরে । যার মূল কাজই ছিল ভান গঘের পিছনে লেগে থাকা ।
বালক রেনে ছিল পশ্চিমা ওয়েস্টান কাহিনির ভক্ত । সেই রকম করে জামা কাপড় , বুট , ঝালর লাগানো কোট এবং কোমরে বেল্টের সাথে হোলস্টারে রিভলবার নিয়ে ঘুরতো । নিজেকে বাফেলো বিল হিসাবে কল্পনা করতো । নিজের পরিচয় ও দিত - বাফেলো বিল । মাত্র কিছুদিন আগে প্যারিসে এক্সপোশন ইউনিভার্সলে ওয়াইল ওয়েস্ট শো দেখে মাথাটা গেছে ওর ।
সঙ্গী ছিল বড় ভাই গ্যাস্তন ।
মাছ ধরা , শিকার আর টই টই করে ঘুরে বেড়ানো ছিল মূল কাজ ।
তো অমন হতে পারে, দুই ভাই সেই দুপুরে গমের ক্ষেতে খেলছিল রিভলবার নিয়ে । অসতর্কতায় গুলি লেগেছিল গঘের পেটে । শিল্পীকে মৃত মনে করে পালিয়েছিল দুই ভাই ।
সেইজন্য পিস্তল পাওয়া যায়নি ।
সন্দেহের শেষ তালিকায় আছে এই রেন সিক্রিটান ।
১৯৫৭ সালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর । মৃতুর কয়েক মাস আগে গঘ সম্পর্কে সিক্রিটান প্রকাশ্যে যে বক্তব্য প্রকাশ করেছিলেন, সেটা ছিল এস্কুলাপ জার্নালে প্রকাশিত একটি সাক্ষাত্কার ।
সে বার বার দাবি করেছে গঘকে সে গুলি করেনি । তার পিস্তল কোন ভাবে গঘ নিয়ে নিজেকে নিজেই গুলি করেছে ।
কত খানি বিশ্বাস করা যায় মৃত্যুপথযাত্রী এক জনের বক্তব্য ?
কেনই বা তাকে দীর্ঘ অনেকগুলো বছর ধরে গঘের খুনি হিসাবে সন্দেহ করা হয়েছিল ?
কারন , ঘটনার সময় সে ছিল সেই শহরেই । একই জায়গায় । সেই দুপুরে ।
গঘের ছবি আঁকার জিনিসপত্র গায়েব হয়ে গিয়েছিল গম ক্ষেত থেকে ।
যদি আত্নহত্যাই করবে গঘ তবে ছবি আঁকার জিনিস পত্র নিয়ে যাবে কেন ?
আর মাথায় গুলি না করে পেটে করতে যাবে কেন ?
তাছাড়া প্রমাণ হয়েছে, বেশ দূর থেকে গুলি করা হয়েছিল গঘকে । নিজের হাতে কেউ অত দূর থেকে রিভলবার ধরতে পারে না ।
সন্ধ্যায় জ্ঞান ফেরার পর হেঁটে হোটেলে ফিরেছিল সে। মারা গিয়েছিল ত্রিশ ঘণ্টা পর ।
পুলিশ কেন খোঁজ করেনি , সেই শহরে সেই সময় কার কার কাছে রিভলবার আছে ? এবং সেইগুলো এখন কোথায় ?
মরার আগে রেনে বলেছিল তার রিভলবার গঘ চুরি করেছিল !
তাই ?
কাউকে এতদিন বলেনি কেন ?
প্যারিসের একজন বিশিষ্ট ধনী ফার্মাসিস্টের ষোল বছরের ছেলে রেনে সেক্রিটান। তাঁর ধনী পিতা আউভারস-সুর-ওয়েস অঞ্চলে একটি বাড়ির মালিক । এবং প্রতি জুনে, পরিবারটি মাছ ধরার মরসুমে এই এলাকায় বেড়াতে আসতো ।
টাকার গরম এবং প্রভাব দুটোই আছে উনাদের । সেইজন্য সব প্রমাণ মুছে ফেলেছিল ?
আরেকটা কথা ভ্যান রেনেকে বাফেলো বিল ডাকতে গিয়ে উচ্চারণ দোষে ' পুফালো পিল ' ডাকতো । সেই নিয়ে বেশ গোপন ক্রোধ ছিল রেনের মনে ।
বেশির ভাগ লোকে বলে গঘ বুকে গুলি করেছিল । কেন বলে জানি না । ডাঃ পল গ্যাসেট জানিয়েছেন , বুলেটটি "পাঁজরের নীচে" পেটে প্রবেশ করেছে। এটি বুকের ক্ষত নয়, এবং এই তত্ত্বটিকে সমর্থন করে , ভিনসেন্টকে দুর্ঘটনাক্রমে অন্য কারও দ্বারা গুলি করা হয়েছিল।
পুলিশ রিপোর্টে বলা হয়েছে , ভিনসেন্টকে গুলি করা হয়েছিল "খুব দূর থেকে "।
বেশ কিছু নোট হারিয়ে গেছে শিল্পীর টেবিল থেকে । পাওয়া যায়নি কোন সুইসাইড নোট । আধ সমাপ্ত একটা কিশোরের ছবি পাওয়া গেছে । রহস্যময় সেই কিশোর দেখতে রেনের মত খানিকটা !
অনেকে আবার এমনটাও বলে , ভিনসেন্ট জানত, জীবিত শিল্পীর চেয়ে মৃত শিল্পীর কদর বেশি । মৃত শিল্পীর কাজ বেশি দামে বিক্রি হয় । তাই সব কিছু হয়তো সাজানো । সেইজন্য মরেছে গঘ ।
কে না জানে , মানুষ রহস্যের পূজারী । সাদামাটা কাহিনির চেয়ে মিথ , রোমাঞ্চ , রহস্য , অব্যাখ্যাত জিনিসের প্রতি টান অমোঘ ।
সব কিছু মিলিয়ে আমাদের এই ভ্যান গঘ এক প্যারাডক্স নয়তো ?
পুরো ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে , সন্দেহ নেই ।
মরার আগে গঘের সেই কথাটা কানে বাজে , ' কাঁদবে না, সবার ভালর জন্যই আমি এমন করেছি ।'
ভিনসেন্ট এই কথাগুলি বলেছিলো , তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি জেনে, তার ভাই থিয়োকে আর্থিক সহায়তার চাপ থেকে মুক্তি দেওয়া হবে , এবং তাঁর বক্তব্যটি দুটি বাচ্চা ছেলেকে হত্যাযজ্ঞের অভিযোগ থেকে রক্ষা করবে।
মরে গিয়েও সবাই বাঁচিয়ে গেল !
ওই দিকে মরার আগে রেনে বলেছে - রিভলবারটা তারই ছিল ।
শেষ কথা -
আমি মিলন গাঙ্গুলী , শিল্প সাহিত্যের প্রতি আলাদা রকম মমতা রয়েছে আমার । অভিমানী এই শিল্পীর প্রতি রয়েছে অন্যরকম ভালবাসা ।
গঘকে নিয়ে লেখা একগাদা বই জোগাড় করেছি । কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে পড়েছি সবগুলো । কল্পনা করার চেষ্টা করেছি, কি হয়েছিল সেই সময় । সহজ সরল ভাষায় জানাতে চেয়েছি সেই হলুদ দুপুরের গল্প ।
মন দিয়ে আমার কথা শোনার জন্য আপনাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ । শিল্পী ভ্যান গঘের পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ ।
1 .Lust for Life by Irving Stone
2 . The Yellow House by Martin Gayford
3. The Letters of Vincent Van Gogh by Vincent Van Gogh (Author), Ronald de Leeuw (Editor), Arnold Pomerans
4 . Vincent van Gogh: A Life in Letters –by Nienke Bakke
5. The Murder of Vincent van Gogh by Nick van der Leek
6.Killing Vincent: The Man, The Myth, and The Murder by Irving Kaufman Arenberg
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন