অনেক অনেক বছর আগে । বছরের এই সময়টাতে নতুন ক্লাসে উঠতাম।
প্রথম দিনেই ইস্কুলে চলে যেতাম ।
নতুন ক্লাসের দরজার বাইরে সাদা কাগজে সবার নাম আর রোল নম্বর সাঁটা থাকতো।
ক্লাসে বসার খানিক পরই ক্লাস টিচার ঢুকে পড়তেন। বগলে নাম ডাকার খাতা। একেবারে নতুন। টাটকা ।
দপ্তরীর কাছ থেকে হয়তো আজই নেয়া হয়েছে।
স্যারের গায়ে সেই পুরানো উলের সোয়েটার । রঙ বিবর্ণ। গত বছর ও এটা দেখেছি গায়ে। হয়তো একটাই সোয়েটার আছে উনার।
শীতে কাঁপতে কাঁপতে নাম ডাকা শেষ করেন স্যার। সবার রোল নাম্বার অদল বদল হয়। যারটা কমে সে দাঁত বের করে হাসে। যারটা বাড়ে তার চেহারা তোম্বা হয়ে যায়।
বেচারার দুর্দশা দেখে আমরা হাসি।
পিচ্চি একটা লেকচার দেন স্যার- ‘গত বছরের মত এইবারও তরা ফাঁকি ঝুঁকি দিবি না। বড় হচ্ছিস তরা। সামনে নতুন ভবিষ্যৎ। এক সময় কলেজে যাবি...। পরিবারের হাল ধরবি । জীবনে অনেক কিছু করতে হবে। লাইফ ইজ নট দ্যা ফ্লাওয়ার অভ রোজ।’
হেন তেন।
তারপর বুক লিস্ট পেতাম।
পরম লোভনীয় সেই বুক লিস্ট। বেশি হলে দশ বারোটা বইয়ের নাম থাকতো।
আরও কম ও হত । আজকের মত পুরা বইয়ের দোকান গছিয়ে দেয়া হত না ।
সবচেয়ে মোটা আর বিচ্ছিরি বই হত বাংলা ব্যাকরণ বইটা। সমাস, পদ, ক্রিয়া এমন ফালতু জিনিসে ভর্তি।সবচেয়ে আতঙ্কের বইটার নাম ছিল - ইংরেজি গ্রামারের বই।লাল বা নীল রঙের বইটা। দেখলেই গায়ে পীত জ্বর চলে আসতো। অমন জ্বরে ক্যারাবিয়ান জলদস্যুরা মরে সাফ হয়ে যেত জাহাজ বন্দরে যাবার আগেই ।
বুক লিস্ট নিয়ে শান্তিমত ফেরার উপায় নেই।
যেই স্যারের সাথে দেখা হবে সেই স্যারই মাগনা একগাদা উপদেশ দেবেন।
অঙ্ক স্যারের সাথে দেখা হলে উনি বলবেন- 'বীজ গনিতের মত সোজা জিনিস তর এত ভুল হয় কেন ভগবানই জানেন।'
ভগবান নামে কেউ বোধ হয় ভাল অংকের স্যার- মনে মনে ভাবি।
'সূত্রগুলো মুখস্ত করলেই তো কোন সমস্যা থাকার কথা না ।' বিরক্ত হয়ে বলেন অঙ্ক স্যার। 'নাহ তর ভবিষ্যত খারাপ। বড় হয়ে রিক্সা চালাবি। যাহ্ প্রথম দিনে মা সরস্বতীর নাম নিয়ে শুরু করে দে পড়াশোনা। নইলে ...হু হু।’
কথা শেষ করেন না স্যার। হাতের খবরের কাগজটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরেন।
এর পর দেখা হল হয়তো ইংরেজি স্যারের সাথে। উনার মুখ ভর্তি পান। আফ্রিকার বাইসন যেমন রসালো ঘাস খায় তেমনি তিনিও সারাক্ষণ পান খান।
পান জিনিসটা সম্ভবত ভালই। আমি নিজে একটা সিনেমাতে অমিতাভ বচ্চনকে পান খেতে খেতে গান গাইতে দেখেছি- ‘খাইকে পান বানারসওয়ালা । খুল যায় বন্ধ অকল কা তালা...।’
হেন তেন।
পানখেকো স্যার আমাকে ইচ্ছামতন কচলে দিলেন। সরবত বানানোর সময় যেমন করে আমরা লেবু কচলাই।
ইংরেজি স্যারের ঘুরে ফিরে একটাই কথা। উনার কাছে ব্যাচ পড়তে গেলেই আমি ইংরেজিতে এত ভাল হব যে লোকজন ভুলে আমাকে ইংরেজের বাচ্চা মনে করবে।
বাজারে গিয়ে মাছওয়ালাকে জিজ্ঞেস করব- ‘হাউ মাচ?’
আর মাছওয়ালা ভয়ে ভয়ে বলবে-'স্যার এটা তো হাউ মাছ না এটা তো বাতাসি মাছ।নিবেন ? '
তো, আমি ইংরেজি স্যারের কথা কানে দেই না।
এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দেই। উনার ও ধরনা বড় হয়ে আমি রিক্সা চালাব।
হ্যাহ।
আমি রিক্সা চালাব আর উনি হেলিকপটার চালাবেন ?
যতসব।
বাইরে শীতের হাওয়া।
গগনশিরীষ আর বাবলার ডালা পালাগুলো শীতে কাঁপছে।
অনেক দিন ইস্কুল বন্ধ ছিল। খোলার আগের দিনে ঝাড়া মোছা করা হয়েছে। বেশ পরিষ্কার তকতকে চারিদিক।
রোদের রঙ গাঁদা ফুলের পাপড়ির মত। বট গাছের শুকনো পাতা খসে খসে পড়ছে একটা বা অনেকগুলো করে। যেমন ওদের মর্জি।
ইস্কুলের দালানগুলোর রঙ দৈ এর মত । এক গাদা ছেলে পিলে হৈ হল্লা করছে।
কারন ছাড়াই মনটা ভাল হয়ে যায়।
হাতে বুক লিস্ট। ওটা নিয়ে হেঁটে যাই।
শীতলক্ষা নদীর বুক থেকে ঠাণ্ডা আর ভেজা বাতাস এসে কাপিয়ে দেয় ইস্কুল বাড়িটা।
বাসায় এসে বুক লিস্টটা মায়ের হাতে তুলে দিলেই আমার দায়িত্ব শেষ।
ইস্কুলের ফালতু সাদা জামাটা বদলে দারুন একটা ফুল লতাপাতার ছাপ দেয়া জামা পরে টই টই করতে বের হয়ে যাই
।ঝাঁ ঝাঁ রোদ বাইরে। রুদ্র প্রয়াগের চিতার চোখের মত জ্বলছে চারিদিক।
মুদি দোকানদার ফটিক চৌরাস্তা ভাই গোল একটা সাবান কাটছিলেন।
সাবানগুলো দেখতে পনিরের মত। ইটালিয়ান পনির। মনে হয় খাওয়া যাবে। আসলে সস্তা সাবান। আমরা বাংলা সাবান বলি।
বিদেশী হলে বিলাতি সাবান বলতাম হয়তো।
খুব কায়দা করে বাংলা সাবান কাটেন মুদি দোকানদার ফটিক চৌরাস্তা ভাই।
বড় এক টুকরো তার শক্ত করে বেঁধে রেখেছেন। ওটার শেষ মাথায় একটা হলুদ বাঁধা। সাইকো কিলাররা সুন্দরী মেয়েদের গলা যেমন করে কাটেন ঠিক তেমন করেই তিনি বাংলা সাবান কাটেন । সমান চার টুকরো। সব ভাগে সমান। জ্যামিতি ফেল।
পিথাগোরাসের নাতি বোধ হয় ফটিক চৌরাস্তা ভাই।
আমাকে দেখে দাঁত মুখ খিচিয়ে বললেন- "এই দুপুরের রঈদের মদ্দে ঘুর ক্যান ?'
'আপনার বোধ হয় জানা নেই।' গম্ভীর গলায় বললাম।' রোদের মধ্যে প্রচুর ভিটামিন থাকে।'
ফটিক চৌরাস্তা ভাইয়ের দোকানের এক পাশে একটা বিড়াল বেঁধে রাখা হয়েছে। তক্তার সাথে শক্ত করে। বিড়ালটার হাত পা চার দিকে টানা করে বাঁধা। বাংলা সিনেমায় নায়ককে ধরে নিয়ে গিয়ে ভিলেনরা এই ভাবে বেঁধে রাখে। এরপর নায়িকার একটা বিচ্ছিরি নাচ হয়। এক গাদা ভিলেন বেঢপ বোতল ভর্তি মদ খায় আর সেই নাচ দেখে।
ফালতু ।
'ওর কি দোষ?' কৌতুহল লাগল।
' হালায় আইলসা।' বিরক্ত মুখে জবাব দিলেন ফটিক চৌরাস্তা। " দুকান ভর্তি ইন্দুর।একটাও ধরে না। গুমায় দিন রাইত। কিন্তু তুমার ভাবি রান্ধনের লিজ্ঞা মাছ কুইটটা রাখছে ।হালায় টপাটপ দুই পিস মানে দুই টুকরা খাইয়া লাইছে।'
বিড়ালটা অসহায় ভাবে বন্দি হয়ে আছে। ওর চেহারায় অপরাধের ছাপ।
বেচারা বুঝতে পারছে কাজটা ভাল করেনি। খিদের জন্য সবাই অপরাধ করে।মানুষদের মধ্যে যাদের খিদে না থাকে তাদের মুখ দিয়েই শুধু ভাল ভাল কথা বের হয়।
উনাদের না খাইয়ে রাখলে উনারাও খারাপ মানুষ হয়ে যাবেন।
'বিড়ালটাকে ছেড়ে দিন। বেচারা কষ্ট পাচ্ছে।' বললাম।
'আরে এটা কি কইলা ।'অবাক হলেন ফটিক চৌরাস্তা। ' বিলাইয়ের জান বড় শক্ত।একবার পাঁচ তালার তন একটা বিলাই পইড়া গেছিল। হালায় মরে নাই। ওর শাস্তি দরকার আছে। নাইলে শুধরাইব না।'
'আরে বাপরে।' বলে পাশে দাঁড়ানো এক খদ্দের চিৎকার করে উঠল।
' আবার কি অইল ?' ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ফটিক ভাই।
একটা বড় রশির কুণ্ডলী ঝোলান থাকে দোকানের বাইরে।ওটার এক মাথায় আগুন দেয়া থাকে। ধিকিধিকি করে জ্বলে সব সময়। যেই সব সিগারেটখোর খদ্দের সিগারেট কেনে ওখান থেকেই সিগারেট জ্বালিয়ে নেয়।
এই বেচারা বিড়ালের শাস্তি দেখায় এতই মশগুল ছিল , কখন যে দড়ির কুণ্ডলীর একদম কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে টেরই পায়নি।
পিঠ পুড়ে গেছে।
দুপুর বেলা বাবা ভাত খেতে বাসায় আসেন।
শীতের দুপুরগুলো কেমন যেন হয়। চট করে শেষ হয়ে যায়। রোদ এই আছে এই নেই।
আমলকীর ডালে শীতের বাতাস শনশন শব্দ হয়। বাতাসে শর্ষে ফুলের ঘ্রান।
ফসল কাঁটা হয়ে গেছে। বিকেল বেলা এক ঝাঁক মিহি পোকা উড়ে বেড়ায়। হতে পারে ফসলের ক্ষেত থেকে উড়ে আসে ওরা। উজ্জ্বল রঙের জামা কাপড় পরে বাইরে বের হলে ক্ষুদে পোকাগুলো ছেঁকে ধরে তাকে।আমরা বেচারার দুর্দশা দেখে হাসি।
বাইরে কে যেন বার বার চিৎকার করে বলছে- মৌগলি। এই মৌগলি।
হায় হায়। মৌগলি তো 'দ্যা জঙ্গল বুক ' বইয়ের সেই পিচ্চি বাচ্চাটা।
বনের পশুরা যাকে পেলে পুষে বড় করেছিল
আমাদের মহল্লায় সে আসবে কেমন করে?
দৌড়ে গেলাম।
আসলে এক লোক মুরগি বিক্রি করছে। এক গাদা সোনালী কমলা রঙের মুরগির ঠ্যাং ধরে মাথা নীচে ঝুলিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সে। চিৎকার করে বলছে -মুরগী।
মাগুর মাছের তরকারি, ফুলকপির বড়া আর ডাল দিয়ে খাওয়া শেষ করেন বাবা।
মা বুক লিস্টটা বাবার হাতে দিয়ে নরম গলায় বলে-' বইগুলো আনতে হবে।'
বুক লিস্ট হাতে নিয়ে বাবার চেহারা বেশ সিরিয়াস হয়ে যায়।
ওটা কপালে ঠেকিয়ে বের হয়ে যান বাড়ি থেকে।
আমি অপেক্ষায় থাকি।
নতুন ক্লাসের বই আসবে।
সন্ধ্যার পর থেকেই উত্তুরে হাওয়া বইতে থাকে ।
বাড়ির সামনে পুরানো দিনের পুকুর । কালো কাঁচের মত জল। ওখান থেকে ধোঁয়া উঠে । বাউল ভর্তি সূপ থেকে যেমন উঠে।
নিঝুম হয়ে যেত এলাকাটা। জাম গাছের পাতা থেকে টপটপ করে শিশির ঝরে ।
এখনকার মত রাত জাগত না কেউ তখন।
প্রতিবেশী মজুমদার বাবু চেঁচিয়ে তার ছেলেকে বলতেন- 'ডাইনে মোচড় দে ।আস্তে কর।উপর তোল। আর নাড়া চাড়া করিস না।'
রোজ সন্ধ্যায় মজুমদার বাবুর এই চিৎকার শোনা যেত। মনে হত ছেলেকে দিয়ে বিচ্ছিরি আর অশ্লীল কোন কাজ করিয়ে নিচ্ছেন তিনি।
আসলে না।
উনি ভারতীয় দূরদর্শন দেখতে পছন্দ করতেন।তখন এত হাজারে বিজারে চ্যানেল ছিল না।
টিভির অ্যান্টেনায় অনেকগুলো এলুমিনিয়ামের হাড়ি পাতিল আর পাতিলের সড়া ঝুলিয়ে রেখেছেন। ওতে নাকি পরিষ্কার সব দেখা যায়। অনেকের বাড়ির টিভির অ্যান্টেনার সাথে হালি হালি হাড়ি পাতিল ঝুলত। বদনা পর্যন্ত দেখেছি।
ভারতীয় দূরদর্শন দেখতে বসলেই ছেলেকে বাইরে পাঠাতেন বাঁশের গোঁড়া ধরে নড়াচড়া করার জন্য। যাতে সিগন্যাল পরিষ্কার আসে।
সন্ধ্যার খানিক পর দোকানের কর্মচারী এসে হাজির হয় ।
বিশাল একটা পোঁটলা হাতে । পোঁটলা ভর্তি নতুন ক্লাসের বই। সাথে নতুন বছরের একটা ক্যালেন্ডার।
তখন পুরো সেট বই এক দোকান থেকে কিনলে দোকানি একটা ক্যালেন্ডার দিত।
ছয় পাতার। এক পাতা দুই মাস। দারুন সব বিদেশের ছবিওয়ালা।
গাছ পাতা ফুল আর সমুদ্র বন্দর।
চিৎকার করে বইয়ের প্যাকেট হাতে তুলে নেই । পাটের সূতলি দিয়ে বাঁধা।
ভেতরে নতুন মচমচে বই। মিষ্টি একটা ঘ্রান । এমন মন মাতানো সৌরভ আগে আর পাইনি।পরেও পাইনি।
কি আনন্দ !
এক গাদা বই। এক ডজন খাতা। বই সেলানোর জন্য সাদা - লালপ্যাঁচানো সূতলি।
অনেক সময় ধরে বইগুলো নাড়াচাড়া করি। বাংলা বইটা বেশি ভাল লাগে। ওটায় দুই অংশ। গদ্যাংশ। আর পদ্যাংশ।
অচেনা মহান সব লেখকদের মজার সব গল্প আর কবিতা। ওটাই আগে পড়ি।গদ্য আর পদ্য যতটা বিভোর করে দেয় আর অন্য কোন সাবজেক্ট ততটা পারে না।
প্রথম দিনেই বাংলা বইটা শেষ করে ফেলি। ওখানে মন বিবাগী করা কতগুলো কাহিনি থাকে।
অপু আর দুর্গা নামে দুই ভাই বোন ওদের কালো গাইটা খুঁজতে মাঠের পারে দূরের দেশে যায়।
বিভূতি বাবুর কি সুন্দর বর্ণনা। কাশ বন, ভাট ফুল , বন তুলসী , সাই বাবলা, পথের ধারে অযত্নে জন্মানো ঘেঁটু ফুল।
আরেক কবি আছে যে ট্রামের তলায় চাপা পড়ে মারা গেছে কোন এক হলুদ বিকেলে। তিনি এই বাংলায় ফিরে আসতে চেয়েছেন। শঙ্খচিল অথবা শালিক হয়ে। ভোর বেলা কাঁঠাল পাতা ঝরে যাবার কথা আছে।
ক্যালেন্ডারটা ঝুলিয়ে রাখি পড়ার টেবিলের সামনে।
রঙ বেরঙের ছবি ওতে। কত সুন্দর চকলেটের মত ম্যা্পল পাতা। লাল রঙের চেরি ফুল। দূরের কিলিমানজারো পাহাড়। পাহাড়ের গলায় মেঘের দলা ঝুলে আছে ওর মাফলারের মত। সান্তামোণিকার লাল ট্রাম। ক্যারাবিয়ান পাইন ট্রি।ওর গোঁড়ায় জমে আছে সাদা সাদা বরফ।
কারা থাকে সেই রূপকথার দেশে ?
কত দূরে সেই দেশ ? ওটাই কী অচিনপুর ?
পুরানো ক্যালেন্ডার দিয়ে নতুন বইগুলো বাধাই করি।
সুই সুতো দিয়ে কয়েকটা দিস্তা কাগজ সেলাই করি। ইংরেজি খাতার উপরে লিখি -অত্যাচারি ইংরেজ খাতা । বাংলা খাতার উপর লিখি, আমার খাতা । বীজগণিত খাতার উপর কতগুলো বিচিত্র ফলের দানার ছবি আঁকি। দানা মানে বীজ।
আরও আছে হাবিজাবি খাতা। জগাখিচুরি খাতা। আর পাঁচ মিশালী খাতা।
ঘণ্টা তিনেক খাটুনি করে পড়াশোনার একটা রুটিন বানিয়ে ফেলি।
ওটা দেখলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হতে শেক্সপীয়র সবাই ভয় পেয়ে যাবে।
আতঙ্কে মারা টারা ও যেতে পারে। আর কিছু না হউক নিদেন পক্ষে ভয়ে আট দশ গ্লাস লাচ্ছি খেয়ে ফেলতে পারে।
কারন প্রতিদিন মোট বারো থেকে চৌদ্দ ঘণ্টা পড়ালেখার কথা উল্লেখ আছে রুটিনে।
সবাই জানে রুটিন লেখা আর সাঁটানো পযন্ত আমার কাজ।
পড়ার নামে ঘণ্টা।
জানুয়ারি মাসের অর্ধেক হয়ে যেত ।
তারপরও তেমন ছেলে পিলে ক্লাসে আসতো না।
স্যার রোজই নাম ডাকার সময় বিরক্ত হয়ে বলতেন- 'কি ব্যাপার বাকিগুলান কই ? জাহান্নামের চৌরাস্তায় গেল নাকি ?'
স্যারের মুখে এই জাহান্নামের চৌরাস্তার মোড়ের কথা অনেক শুনেছি। সম্ভবত সত্যিই আছে। স্যার তো আর খামাখাই মিথ্যা কথা বলবেন না।
তারপরই স্যার খেঁকিয়ে উঠতেন -'অ্যাঁয়ই তরা বই খোল সবাই। কবি বলেছেন...।কি ব্যাপার মিলন ? বই আন নাই ?'
'না স্যার।' জবাব দিতাম।
'কেন ?' স্যার অবাক।
' স্যার , এত বই আনা যায় না যায়।' সাফাই গাইতাম। ‘আট ক্লাসের আটটা বই সাথে খাতা।বিরাট ওজন স্যার। দশ কেজির মত হয়ে যায় স্যার। এত ওজন নিয়ে হাঁটা যায় না।'
' এত ওজন নিয়ে হাঁটা যায় না ?’ দাঁত কিড়মিড় করে বলেন স্যার। ‘ খাড়া তর ওজন আমি বাইর করতাছি।'
কি অশ্লীল কথা বার্তা।
একবার বাংলা স্যার কি কারনে ইস্কুলে আসেনি। অঙ্ক স্যার এসেছে উনার ক্লাস করাতে। উনি পড়াচ্ছিলেন- ‘ দিনে দিনে শশীকলার মত বড় হয়ে উঠতে লাগল রাজকুমার।’
একজন জিজ্ঞেস করে বসলো- স্যার, শশীকলা কি ?’
‘ওটা আসলে শবরী কলা হবে। দিনেদিনে শবরী কলার মত বড় হয়ে উঠলো রাজকুমার। ভুলে শশীকলা ছাপা হয়ে গেছে।’স্যার ব্যাখ্যা দিলেন।
আমি হেসে ফেলেছিলাম, শাস্তি হিসাবে আমার কান মুচড়ে দিয়েছিলেন স্যার। সেতারের কানের মত।
আমিও ভুল করি। যেমন কৃষিবিজ্ঞানের স্যার জিজ্ঞেস করলেন - রবিশস্য কাকে বলে ?
আমি বললাম- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবসর সময়ে চাষবাস করতেন। যেমন- ফুলকপি,বাধাকপি,মূলা,গাজর,লাউ,সীম,টমেটো,শীতকালীন সবজি,বোরো ধান,গম,আলু এবং সরিষা। এগুলোকেই রবিশস্য বলে।
ভাল পিটুনি খেলাম।
' শায়েস্তা খানের আমলে এক টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত।' খুশি খুশি গলায় বললেন ইতিহাসের স্যার ।
'তখন সাধারণ মানুষের বেতন কত ছিল?' মিহি গলায় জানতে চাইলাম ।
স্যারের চেহারা কেমন তোম্বা হয়ে গেল ।
অনেক দিন কথা বলেননি উনি আমার সাথে ।
একটা ব্যাপার প্রায়ই হত । কোন কোন স্যার দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলতো , ‘ কি ব্যাপার মিলন ক্লাসটা কি আমি নিচ্ছি না তুমি নিচ্ছ ?’
অবাক হতাম।
উনারা নিজেরাও জানেন না ক্লাস উনারা নিচ্ছেন ?
বেশি কিছু বললেই স্যারেরা বলতেন, ' বুঝেছি গাঙ্গুলী তোর ‘মিত্যুর পাখা’ গজিয়েছে।'
ক্লাসে সঠিক উত্তর দিলেও স্যারদের মারধোর খেতে হত।
যেমন ইংরেজি স্যার জিজ্ঞেস করলেন- বলতো জীবন ফুলের শয্যা নয় ইংরেজিতে কি হবে ?
আমি সাদা মনে জবাব দিলাম- লাইফ ইজ নট হানিমুন।
স্যার মারলেন।
এখানে আমার দোষটা কোথায় ?
বাংলা স্যার দুম করে বলে বসলেন, রবীন্দ্রনাথের ভাল কয়েকটা বইয়ের নাম বল তো মিলন ।
ভাল কিছু বই ?' আকাশ থেকে পড়েছি অমন একটা ভাব ভঙ্গি করে বললাম। 'আপনি এইভাবে বলতে পারেন না স্যার। উনার সব লেখাই বিশ্বমানের।
ঠাণ্ডা চোখে চেয়ে রইলেন স্যার। মেক্সিকান স্নাইপারদের চোখের দৃষ্টি অমন হয়।
অনেক সময় পর বললেন ,' আচ্ছা ? আরে আমি তো ভুলে গেছি ক্লাসটা আপনি নিচ্ছেন। বেশ তো উনার বিশ্বমানের কয়েকটা বইয়ে নাম বলেন স্যার মিলন।'
' রবীন্দ্র রচনাবলী আর রবীন্দ্র সমগ্র।' বেহায়ার মত হেসে জবাব দিলাম।
নীরবতা বেশিক্ষণ রইল না।
সমাজ বিজ্ঞান স্যার বললেন , ' আদিম মানুষ যখন গুহায় থাকতো তখনই সে পশুর চামড়া আর গাছের বাকল দিয়ে কায়দা করে শরীর ঢেকে রাখত । মূলত শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য এবং লজ্জা নিবারণের জন্য । আর এই ভাবেই পোশাকের জন্ম । কোন প্রশ্ন ?'
' না স্যার । তবে আমার মনে হয় শুধু শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য অমন করা শুরু হয়েছিল । লজ্জা নিবারণের জন্য না।' দাঁড়িয়ে মন্তব্য করলাম ।
না দাঁড়িয়ে কথা বললে স্যার রাগ করেন ।
'লজ্জা নিবারণের জন্য না ?' স্যার অবাক ।
'সেটাই স্যার , তখন তো সবাই লেঙটা । আর সবাই যদি লেঙটা হয় লজ্জাটা পাবে কেন ?'
'মিলন লেঙটা না বলে নগ্ন বা উলঙ্গ বলতে পারতে । ভাল শোনাত । ' স্যারের গলায় আক্ষেপ ।
'তাতে তো লেঙটার অবস্থায় কোন হের ফের হত না। মনে করেন বললাম দিগম্বর তাতেও তো চোখের সামনে ওই...।'
'মানে চোখের সামনে তুই সব দেখতে পাস ?'
তুই তুকারি শুরু করেছেন স্যার । উনার ভদ্রতা উলঙ্গ হয়ে গেছে ।
' যে কোন শব্দ দৃশ্য জন্ম দেয় স্যার ।' বিনয়ের সাথে বললাম ।
'তুই কাল থেকে ইস্কুলে আসিস না ।' জোড় হাত করে বললেন স্যার । ' তাহলে আমরা যা শিখেছি সব ভুলে যাব ।'
খানিক পর হেডস্যার আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন ।
আমি নাকি ক্লাসে অশ্লীল কথা বার্তা বলি !
হায় হায় ।
মনোজ স্যার ইংরেজিতে পাকা । তবে সব ক্লাসই নিতে পারতেন। ক্লাস নিতে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন আলাপ পারতেন । সেটা বেশির ভাগ সময় মস্ত ঝামেলা হত ।
একবার জিজ্ঞেস করলেন , ' দুখু মিয়া আসানসোলে কোথায় কাজ করতেন ?
'রুটির দোকানে স্যার ।' সবাই এক সাথে সুর করে বলল ।
ভাব দেখে মনে হচ্ছে সবাই একই সাথে সেই রুটির দোকানে কাজ করতো । অথবা দুখু মিয়ার হাত থেকেই রুটি আর হালুয়া কিনে সকালের জলখাবার সারতো ।
'খুব ভাল ।' স্যার খুশি হলেন । ' এ ছাড়া আর কি করতেন ? মিলন তুই বল ।'
জানতাম । আমাকেই ।
সব স্যার কঠিন জিনিসগুলো আমাকে জিজ্ঞেস করে । ভাব দেখে মনে হচ্ছে আমাকে গড়ে পিঠে মানুষ করে উনাদের মেয়ের জামাই বানাবে ।
'স্যার উনি রুটির দোকানে কাজ করতো । এ ছাড়া বিভিন্ন ধরণের পাউরুটি , বিস্কুট , কেক আর পুডিং বানাতেন ।'
মনের মাধুরী দীক্ষিত মিশিয়ে বললাম । কিছু না বলার চেয়ে কিছু বলা ভাল ।
শান্ত মুখে স্যার বললেন , ' মানুষের ইজ্জতের হালিম বানানো তোমার ( এখন আমাকে তুমি বলছেন ) মজ্জাগত অভ্যাস । মজ্জা কি জানো নিশ্চয়ই ?'
'জী স্যার , মাউরার হোটেলের খাসির রেজালার পায়ার মধ্যে থাকে । চুষে খাওয়া যায় ।' পাশ থেকে বলল এক পাকনা । আমার দুর্দশায় খুশি ।
'তো এই অভ্যাস তোমার ইহ জিন্দেগিতে যাবে না ।' বলেই যাচ্ছেন স্যার । কথা বলার মুড এসে গেছে উনার । ' ওটা তোমার জন্মগত প্রতিভা । সাধে কি আর সত্যজিৎ রায় লালমোহন গাঙ্গুলী চরিত্রটা বানিয়েছে ? উনি ইচ্ছা করলেই লালমোহন দাস, লালমোহন সাহা , লালমোহন গুপ্ত বানাতে পারতেন । করেননি । কারন ? বুঝে শুনেই বানিয়েছেন । উনার জীবনেও তোমার মত কেউ এসেছিল । তোমরা সব একই গোয়ালের বাফেলো । কথা বার্তার ধাইস একই । আসল উত্তর হল দুখু মিয়া মক্তব্যের শিক্ষক হিসাবে কাজ করেছেন । এ ছাড়া তিনি লেটোর দলের গান লিখতেন । আর তুমি কি না উনাকে দিয়ে পাউরুটি , বিস্কুর জ্যাম জেলি বানানোর কাজ করিয়ে নিলে। লজ্জা হওয়া উচিত ।'
'স্যার জ্যাম জেলির কথা বলিনি । আমি আসলে নিজের মাথার মগজ খাটিয়ে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করছিলাম । রুটির দোকান মানেই বেকারি । আলেকজান্ডার বেকারির সামনে দিয়ে গেলে আমার উত্তরের যুক্তি আপনিও বুঝতে পারতেন ।'
' মাথার মগজ খাটিয়েছিলে ? ' দারুন অবাক হয়েছেন অমন একটা ভাব ধরে বললেন স্যার । ' যা নেই সেটার ব্যবহার কর কিভাবে ?'
' আমি এখন কি করব স্যার ।' উজবুকের মত প্রশ্ন করলাম ।
'আপাতত বাইরে গিয়ে কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকো ।'
' জাতীয় কবিকে অপমান করলো আর আপনি কিছুই বললেন না ।' কুতকুতে চোখের আরেকজন কেমন একটা ঘোঁট পাকানোর চেষ্টা করলো । ওর নামের শুরুতে কাজী আছে । কাজী দ্যা ক্রিমিনালস । ' রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কিছু বললে তো ঠিকই শাস্তি দিতেন । আপনি জানেন ? রবীন্দ্রনাথ বাবু নজরুলের লেখার খাতা চুরি করে নোবেল প্রাইজ পেয়েছিল ?'
'না জানি না। তুই জানিস ?' স্যারের জবাব ।
' নিচ্ছয়ই জানি । ' বুক চিতিয়ে বলল কুতকুতে চোখ । ' একদিন রবীন্দ্রনাথ দুপুরের বাজার শেষ করে নজরুলের বাসায় গেছেন লেখার আইডিয়া নিয়ে আলোচনা করতে । গিয়ে দেখেন নজরুল বাথরুমে গেছে গোসল করতে । উনার মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল থাকার জন্য গোসল করতে সময় বেশি লাগত । রবীন্দ্র তখন বাইরে অপেক্ষা করছিলেন । দেখেই বাঁধাই করা ইয়া মোটা খাতা । সেটা লম্বা আলখেল্লার ভেতরে ঢুকিয়ে সোজা হাঁটা ধরলেন । সেই সপ্তাহেই গীতাঞ্জলী বের হল । নজরুল শ্যাম্পু নিতে বাইরে বের হয়ে দেখেন উনার খাতা চুরি হয়ে গেছে । রাগের মাথায় লিখল আমি উল্কা আমি ভগবানের বুকে এঁকে দেই পায়ের চিহ্ন । ভগবান বলতে রবি ঠাকুরকে বুঝিয়েছেন । ঠাকুর মানেই ভগবান । রুপক সমাস । এত কাহিনির আপনি কিছুই জানেন না ?'
কুতকুতের চোখে মুখে হাহাকার ।
'না জানি না। আপনার কাছ থেকে জানলাম । আপনিও মিলনের পাশে গিয়ে কান ধরে দাড়িয়ে থাকেন ।'
চলে এলো নজরুল গবেষক ।
' খুব ভাল করেছেন স্যার ।' আনন্দে আট দুগুনে ষোলখানা হয়ে বলল আরেক জন । টিফিনের ভাগ পায় না বলে আমাকে ঘৃণা করে । '
ক্লাসের বারোটা বাজাচ্ছে মিলন । সত্যজিৎ রায় না বুঝে গাঙ্গুলীর ব্যাপারে লিখেননি ।'
'তুই সত্যজিৎ রায়ের কিছু পড়েছিস ?' স্যার খানিক নরম হলেন ।
' পড়েছি স্যার । ইয়া মোটা বই পথের পাঁচালী । ফাটাফাটি বই । আপনিও সময় পেলে পড়বেন ।'
'ওটা সত্যজিতের লেখা ?' মিহি গলায় বললেন স্যার ।
'আমি যেটা পড়েছি ওটার মলাট ছেঁড়া ছিল না । তবে উনি ছাড়া আর কে লিখবে অমন বই ?'
'তুমিও কান ধরে বাইরে গিয়ে দাঁড়াও ।'
বিপিন স্যার একবার বললেন- ' মিলন তর হাতের লেখা খারাপ। চেষ্টা কর হাতের লেখা ভাল করতে।'
‘ওতে লাভ কি স্যার ?’ বেহায়ার মত জানতে চাইলাম।
‘বারে, হাতের লেখা ভাল হলে পরীক্ষায় ভাল নাম্বার পাওয়া যায়।’
‘ ভাল নাম্বার পেলে কি হবে স্যার ?’ আবারো বেহায়ার মত বললাম।
‘ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবি।’
‘কিন্তু স্যার ডাক্তার বা ইঞ্জিয়ারদের হাতের লেখা তো খুবই বিচ্ছিরি। আর যাদের হাতের লেখা ভাল তারা তো ফুটপাতে বসে সাইনবোর্ড লেখে। যেমন-বাসা ভাড়া দেয়া হবে। পড়াইতে চাই । হেন তেন।’
যুক্তিতে কি ভুল ছিল কে জানে। স্যার মারলেন। এখানে আমার দোষটা কোথায় ?
বেকাজেও ঝামেলা হয়।
বিজ্ঞান স্যার একবার জিজ্ঞেস করলেন - আর্কিমিডিস কোথায় গোসল করছিলেন এবং কি নিয়ে গোসল করছিলেন ?
বুকচিতিয়ে জবাব দিলাম , ‘সাবান আর তোয়ালে নিয়ে গোসল করছিল । সম্ভবত বাথরুমে হবে। সবাই তো বাথরুমেই গোসল করে । পাবলিক লাইব্রেরিতে তো করে না । ’
স্যার বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ বেতিয়ে পিঠের ছাল তুলে ফেলব। উনি মুকুট নিয়ে গোসল করছিলেন। আর চৌবাচ্চায় গোসল করছিলেন।’
ব্যাপারটা হালকা পাতলা জানি। কোন রাজার মুকুটে কি যেন সমস্যা ছিল। খাদ বা ভেজাল। কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলাম, ‘ স্যার এটাই কি সেই চৌবাচ্চা যেটার অনেকগুলো নল। আর কোন একটা বিকারগ্রস্থ লোক সেই নল কয়েকটা খোলা রাখে আর কয়েকটা বন্ধ রাখে ?’
‘ এই জিনিস পেলি কোথায় ?’ স্যার অবাক।
‘পাটিগণিত বইতে পেয়েছি স্যার।’ হাসি মুখে বললাম।
স্যার অনেক সময় নিয়ে আমার দুই কান মুচরে দিলেন।
বিজ্ঞান স্যারের চেহারা অনেকটা ডারউইনের মত । দাড়ি গোঁপে মাখামাখি । সব সময় শাদা কাপড় পরেন । এত পরিষ্কার !
এক ক্লাসে বললেন , ' বিজ্ঞানে ধ্রুব সত্য বলে কিছু নেই ।'
'ওটা আবার কি ?' ফিসফিস করে বলল গাবলু ।
' আরে সত্য সাহা আর শুভ্র দে-র কেউ হবে ।' একই রকম ফিসফিস করে বলল সেন্টু ।
' সেন্টু তুমি কান ধরে বাইরে গিয়ে দাঁড়াও ।' বললেন স্যার ।
সেন্টু বাইরের জগতে চলে গেল ।
' ধ্রুব সত্য হচ্ছে চিরন্তন সত্য ।' ব্যাখ্যা করলেন স্যার ।
'একটু বুঝিয়ে দেবেন স্যার ?' মিহি গলায় বলল এক পাকনা । এ রকম প্রশ্ন করে স্যারের চোখে ভাল সাজে । স্যারের নয়নের মণি হয় । আর আমরা হই সাপের মণি ।
'মানে বিজ্ঞান আজ যেটা সত্য বলছে কাল সেটা সত্য না ও হতে পারে ।' খুশি গলায় ব্যাখ্যা করলেন স্যার ।
'মানে সকাল বেলা রাজা আর ফকির সন্ধ্যা বেলা ।' বলল মোয়াজ্জেম । আমরা ওকে বলি - মদ জ্যাম । হায়রে মানুষ !
ওর কথা শুনে স্যার কিছু বললেন না । কারন মদজ্যামের বাবা ইস্কুল কমিটির সাথে জড়িত । মিন্নত আলী মাজারে শুক্রবারে খুৎবা পড়ান । উকিল পাড়ায় ওদের তিনটে দোকান আছে ।
'যেমন ইথার নামে একটা পদার্থের অস্তিত্ব বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞানীরা । ভাবতেন বাতাসের সাথে মিশে আছে । আজ প্রমাণ হয়েছে ইথার বলতে কিছু নেই ।' প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যাখ্যা করলেন স্যার ।
'তাহলে স্যার আজ অমন কিছু আমরা পড়ছি আগামীতে ভুল প্রমানিত হতে পারে ?' সতর্ক ভাবে কথার চাল দিলাম ।
মন বলছে সামনে বিপদ ।
'একদম সত্য বাবা ।' হাসিমুখে বললেন স্যার ।
'তাহলে পড়া না পারলে আমাদের মারধোর করা ঠিক না। হয়তো ভুল কারনে মার খাচ্ছি আমরা । কারন যেই জন্য মার খাচ্ছি সেটা হয়তো সামনে ভুল প্রমানিত হবে । হতে পারে না স্যার ?'
বাইরে গরম । পাকা ভুট্টার মত রোদ । একটা গরু চিত্তহারী ভঙ্গিতে ঘাস খাচ্ছে ।
স্যারের চেহারা থমথমে । উনাকে দেখাচ্ছিল সাইকো থ্রিলার বইয়ের এক ডাক্তারের মত । যে ভুল ইনজেকশন দিয়ে মানুষ মারে । কেউ জানে না সেটা ।
' এক গজার মাছের জন্য পুকুরের সব মাছ নষ্ট হয় ।' চশমার কাচ মুছে বললেন ডারউইন । ' বাইরে গিয়ে কানে ধরে দাড়িয়ে থাকো ।'
রোদ পোহাতে চলে গেলাম ।
অন্য ক্লাস থেকে শহর আলী স্যার উঁকি দিয়ে বললেন , ' এটা কোন শাস্তিই না। কপালে চারা রেখে রোদের দিকে চাইয়া থাকলে বুঝব । এইসব তো ডাইল ভাত ।'
আমাকে দেখে খুশি হল সেনটু , ' দোস্ত ভাল হয়েছে তুই আসায় । একা একা ছিলাম ।'
কান ধরে গল্প শুরু করলাম । আরও দুই চারজন চলে আসবে ।
স্যারদের আরও একটা ব্যাপার বিরক্তকর। খুব বাজে উদাহরণ দেন উনারা। যেমন ধরা যাক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ' কি ব্যাপার মিলন তুই বারান্দায় দাঁড়াইয়া আছস কেন ?'
আমি হয়তো বিনয়ের সাথে বললাম, ' স্যার আমি একা না, অমুকে ও দাঁড়িয়ে আছে।’
স্যার অবাক হয়ে বলবেন- অমুকে গু খাইলে তুই ও গু খাবি ?
কি বিচ্ছিরী উদাহরণ।
অথচ চাইলেই উনি বলতে পারতেন- অমুকে টক দই খেলে তুই ও টক দই খাবি ?
কিন্তু না।
রুচির ব্যাপার আছে না ?
অমন করে না বললে যেন উনাদের পেটের ভাত হজম হয় না।
বাংলা স্যার প্রশ্ন করলেন- কবি কিসের রূপে এই বাংলায় ফিরে আসতে চেয়েছেন?
বেশির ভাগ প্রশ্ন আমাকে করা হত। কারন আমি লাস্ট বেঞ্চে বসতাম। আর আমার চেহারা নাকি মেক্সিকান ক্রিমিনালদের মত। এই অভিযোগটা একদম মিথ্যা। কারন মা বলতো- আমি দেখতে রাজকুমারদের মত ।
কবিতাটা পড়া ছিল । তাই বুক চিতিয়ে জবাব দিলাম , ' স্যার কবি শিয়াল, কাউয়া,প্যাচা, চড়ুই ,শকুন, শালিক, চিল যা যা সম্ভব বা সম্ভব না সব রুপেই আসতে চেয়েছেন। কিন্তু তিনি মানুষ রূপে আসবেন না। কারন তিনি বলেছেন, হয়তো মানুষ নয় বা ইস্কুলের স্যার নয়।'
উত্তর শুনে স্যারের চেহারা কেমন তম্বা হয়ে গেল।
অবাক হয়ে বললেন, ' বইতে এই কথা লেখা আছে ?'
আমি আরও অবাক হয়ে বললাম, ' হায় হায়, স্যার কবিতাটা আপনি পড়েননি ?'
সুন্দর ডোরা কাঁটা একটা বেত দিয়ে স্যার আমার জামার ধুলা ঝেড়ে দিলেন।
ভালই হল। অমন না হলে শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করে।
কিন্তু এখানে আমার দোষ কোথায় ? আমি কি কবির কথা নিজের ভাষায় ব্যক্ত করতে পারিনি ?
আলুর অভিস্রবণ ব্যাখ্যা করে বিজ্ঞান স্যার বললেন, আর কোন প্রশ্ন ?
' স্যার লজ্জাবতী গাছে হাত দিলে পাতা কুঁকড়ে যায় কেন ?' আগ্রহের সাথে জানতে চাইলাম।
'ভাল কোন প্রশ্ন করতে পারিস না ?' খেঁকিয়ে উঠলেন স্যার ।
প্রশ্নটা খারাপ কোন অর্থে আজও রহস্য।
স্যার বললেই পারতেন উনি ভুলে গেছেন।
' বাংলা পরীক্ষায় বেশি নম্বর কি ভাবে পাওয়া যায় জানিস ?' স্যার জানতে চাইলেন।
' না স্যার। জানলে তো বেশি নাম্বারই পেতাম।' জবাব দিলাম।
'কথাটা একটু বেশি বল তুমি।' বিরক্ত হলেন স্যার। ' তোমার বাপ মাকে বল তোমার লেখাপড়ার পিছে টাকা নষ্ট না করে সেই টাকা জমিয়ে রাখতে। যাতে বুড়ো বয়সে টাকাগুলো উনাদের কাজে লাগে।'
চুপ করে রইলাম।
কারন সবাই দাঁত বের করে হাসছে।
'যা বলছিলাম বেশি নামবার পেতে হলে তোমাকে কোটেশন দিতে হবে।'' ব্যাখ্যা করলেন স্যার।
'কোটেশন কি স্যার ?' মিহি গলায় জানতে চাইল একজন।
ভাব দেখে মনে হচ্ছে সামনের পরীক্ষায় জাহাজ ভর্তি করে নাম্বার নেবে সে।
' কোটেশন হচ্ছে বিখ্যাত ব্যাক্তিদের কথা। উনারা কি বলেছেন সেটা লিখে অ্যাড করলেই নাম্বার ঠ্যাকায় কে ।' প্রফুল্ল চিত্তে বললেন স্যার।
'কিন্তু স্যার আপনিই বলেছেন কে কবে কি বলেছে সেটা নিয়ে মোটেও মাথা ঘামানো উচিৎ না। সবারই উচিৎ অন্যকে অনুসরণ না করে স্বকীয়তা অর্জন করা।' দাঁড়িয়ে বললাম আমি।
স্যারের চেহারা কেমন ফ্যাঁকাসে হয়ে গেল। মনে হচ্ছে মুহূর্তেই বয়স বেড়ে গেছে কয়েক হাজার।
পিরামিডের ভেতরে উনাকে রেখে দিলে সবাই মমি হিসাবেই উনার দেহটা সংরক্ষণ করবে।
বাংলা স্যার অনেক কঠিন ভাষায় আমাদের তিরস্কার করতেন। যেমন বলতেন, তোরা গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাচ্ছিস।
এখন এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করায় বুঝতে পারতাম না উনি আমাদের প্রশংসা করছেন না কি ভৎসনা জানাচ্ছেন।
আমরা তো খুশি হতাম এই ভেবে কোন একটা শক্তিশালী প্রবাহে ভেসে যাচ্ছি।
খারাপ কি !
অনেক স্যার বলতেন- তর বাপ মা কে বলবি তর পিছনে যেন টাকা পয়সা নষ্ট না করে।
কি কাণ্ড ! আমি কি ক্যাসিনো নাকি ?
বিজ্ঞান স্যার একবার বললেন, ' চিকিৎসা বিজ্ঞান যে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে সেটা নিশ্চয়ই তরা জানিস। মিলন তুই কিছু বলবি ? ইবনেসিনা থেকে হ্যানিমেন সাহেবের আলোকে।'
'তেমন একটা উন্নত হয়নি স্যার।' সত্য কথাই বললাম।
'সেকি ?' অবাক হলেন স্যার।
'দেখেন না স্যার। আজও তেতো ওষুধ খেতে হয়। বা ইনজেকশন নিতে হয় দুটোই বিরক্তকর। অথচ উচিৎ ছিল যে কোন রোগের জন্য ওষুধের বদলে পথ্য। যেমন- দিনে তিনবেলা বিরিয়ানি। সাথে পাঁচটা করে রসগোল্লা। অমন আর কি ।'
সাদামনেই বললাম।
স্যারের চেহারা কেমন যেন হয়ে গেল। মনে হচ্ছে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন উনি।
'তর নিজস্ব চিন্তাভাবনা ?' অনেক সময় পর দম নিতে নিতে বললেন স্যার।
জি স্যার।' বেহায়ার মত হেসে বললাম।
'এই কেউ একজন গিয়ে অফিসরুম থেকে বেতটা নিয়ে আয় তো।' মারমুখী গলায় বললেন স্যার।
পরের ঘটনা বলতে আমি বাধ্য নই।
আসলে স্বাধীন চিন্তাভাবনার কোন মূল্য নেই।
অনেক স্যার খেজুরে আলাপ পাড়তেন। ওটা আবার বিপদজনক দিকে মোড় নিত। যেমন, ফেরদৌস স্যার বললেন - মার্ক টোয়েন কি বলেছেন জানিস ?
ব্যাপারটা বিরক্তকর। আমরা জানব কি করে উনি কি বলেছেন ? আমরা কি সামনে ছিলাম ? উনি কি আমাদের মহল্লার লোক ? প্রতিবেশী ? না আমরা একই ক্লাসে পড়ি ?
জানি না স্যার। সবাই এক বাক্যে বললাম।
‘ মার্ক টোয়েন বলেছেন যে সবার কথায় তাল দেয় সে ব্যক্তিত্বহীন।' স্যার বললেন।
'ঠিক বলেছেন স্যার। মার্ক টোয়েন অপ্রিয় সত্য সুন্দর করে বলতেন । ' পাশ থেকে জবাব দিল নাকে হিঙ্গাইল CowSir. আসলে ওর নাম কায়সার।আমরা কাউস্যার বলি।
‘ তুই ঠিক বলেছিস।’ স্যার মাথা ঝাঁকালেন।
'স্যার CowSir আর আপনি, দুই জনেই দুইজনের কথায় তাল দিলেন ।' হাসিমুখে বললাম।
স্যামান্য একটা ব্যাপার মারধর পর্যন্ত গড়াল।
দুঃখজনক।
' স্যার বাংলা দ্বিতীয় পত্রে কি কি চিঠি কমন পড়তে পারে ?' মিহি গলায় জানতে চাইল এক পাকনা।
অমন করার উদ্দেশ্য স্যারের চোখে রত্ন প্রমাণ হওয়া। সাংবাদিকরা যেমন চিত্রনায়িকাদের জিজ্ঞেস করে - ' রাত্রে কি দিয়ে লাঞ্চ করেন ?'
স্যারকে প্রশ্ন করে আমরা কাঁটাগোল্লা খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। অথবা কাগজ দিয়ে বিমান বানাই। ইদানিং এই কাজটা বেশ দারুন লাগে। চেষ্টা করছি আরও কম ভাঁজ দিয়ে কিভাবে জলদি বিমান বানানো যায়। নিজেকে নাসার স্পেসশিপ ডিজাইনার জোসেফ ব্লু মরিসের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হয়।
'মাত্র দুটো চিঠি মুখস্থ করলে সারাজীবন চলতে পারবি তরা।' দরবেশ মার্কা হাসি হেসে বলেন স্যার।
'দুটো চিঠি কি কি স্যার ?' আরেক পাকনার প্রশ্ন।
' এক হচ্ছে বোনের বিয়ের নিমন্ত্রণ জানিয়ে বন্ধুকে চিঠি লিখ। আর দুই ভিপিপি ডাকযোগে কিছু বইয়ের অর্ডার জানিয়ে পুস্তক ব্যবসায়ীর নিকট আবেদন। কমন পড়বেই। আমার কাছে ব্যাচ পড়লেও কমন পড়বে সব। কি ব্যাপার মিলন তুমি উঠে দাঁড়ালে কেন ?'
'স্যার যাদের বোন নেই । অথবা যারা স্থানীয় ফুটপাথ অথবা বইবিচিত্রা বা কিতাবঘর থেকে বই কিনে তাদের এই চিঠি মুখস্থ করে কি উপকারে আসবে ?' বেশ মার্জিত গলায় প্রশ্ন করলাম।
স্যারের চেহারা দেখে মনে হল এই দুনিয়ার তার আপন কেউ নেই। কেমন দিশেহারা ভাব। কবির ভাষায়- হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারিয়েছে দিশা।
কিংবা টাইটানিক ডুবে যাবার সময় জাহাজের ক্যাপ্তেনের চেহারা।
কিংবা ডাইনোসর অবাক হয়ে দেখছে উল্কাবৃষ্টি। যার ফলে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল ওরা সবাই।
স্যারের চেহারা ইতালিয়ান টম্যাটোর মত লাল হয়ে গেল । উনি কি মারা যাবেন ?
লম্বা একটা দম নিয়ে বললেন- সেন্টু অফিস রুম থেকে সবচেয়ে মোটা বেতটা নিয়ে আয় তো বাবা।
পিরানহা মাছের মত মুখ ভর্তি দাঁত দেখা গেল সেন্টুর মুখে।
' অখনি আন্তাছি স্যার।' খুশি খুশি গলায় বলল ।
ও কি লটারির টিকিট পেয়েছে ? এত খুশি কেন ?
পরের ঘটনা লিখতে চাই না। লেখাটা এমনিতেও অনেক বড় হয়ে গেছে।
ইস্কুলের বেশ কয়েকজন স্যার নরখাদক মানে মানুষখেকো ছিলেন । রেগে গেলেই বলতেন- মিলন আইজ তরে খাইছি ।
যতগুলো বাংলা সিনেমায় নায়কের মা কান্না ভেজা গলায় বলেছে, ' আজ যদি তর বাবা বেঁচে থাকতো ?'
তার চেয়ে কয়েক বিলিয়ন বেশি বার ইসকুলের স্যারেরা আমাকে বলেছেন, ' বড় হয়ে তুই রিক্সা চালাবি।'
'সাগর আর মহাসাগরের জল নোনা হয় কেন ?'
আচমকাই বিজ্ঞান স্যার জানতে চাইলেন।
এটা হচ্ছে উনার মস্ত দোষ। লাগাতার এমন সব প্রশ্ন করে যে উত্তর দেয়া কঠিন হয়ে যায়।
সবাই সব কিছু জানবে এটা কোন কথা ? স্বয়ং নিউটন বলেছেন জ্ঞানের সাগরের তীরে উনি শুধু কিছু পাথর কুড়িয়েছেন।
প্রথম জন উঠে বলল, 'স্যার ওটা আল্লাহর কুদরত।'
স্যার কিছু বললেন না।
কারন উনি হিন্দু। কিছু বললে বা প্রতিবাদ করলে চাকরি তো যাবেই। উনাকে ইনডিয়া পাঠিয়ে দেয়া হতে পারে।
কল্পনায় উনি দেখলেন, হাওড়া স্টেশনে বসে উনি তম্বুরা বাজিয়ে গান গেয়ে ভিক্ষা করছেন,'একটি টাকা দাও না বাবু একটি টাকা দাওনা। একশো টাকা, পাঁচশো টাকা, হাজার টাকা চাই না।'
উনার স্ত্রী স্টেশনে চা বিক্রি করছে। উনার ছেলে মহল্লার মোড়ে দাঁড়িয়ে ক্যারাম খেলছে।
' তুই বল।' দ্বিতীয়জনকে ধরলেন।
'স্যার পুরাণে আছে লবনাসুরের মৃতদেহ সাগরে পড়ায় সাগর লোনা হয়ে গেছে।' ডাহা মিথ্যা বলল সে।
স্যার বিপদে পড়ে গেলেন। উনি বামুন না। ধর্মের সব কিছু জানেন না। পুজায় এগারো টাকা চাঁদা দিয়েই খালাস। রামায়ণ, গীতা ছুঁয়েও দেখেননি। মহাভারত কি হরর না সায়েন্স ফিকশন জানেন না।
পরের জনকে ধরলেন,' মিলন তুই বল।'
' স্যার আমি তিনদিন ইশকুলে আসি নাই। তাছাড়া আমার বই চুরি হয়ে গেছে। টিফিনের পর এসে দেখি বেঞ্চির উপর থেকে বই গায়েব।' নাকে মুখে মিথ্যা বললাম।
'প্রশ্নটা বই থেকে করা হয়নি। আউট নলেজ।' জলপিশাচের মত হেসে বললেন স্যার।
'আসলে স্যার। আমার মনে হয় বাসার কাজের বুয়ারা বা মায়েরা লবণ দিয়ে শিং মাছ , মাগুর মাছ ভাল করে ধোয়। বছরের পর বছর সেই লবণ সাগরে মিশে জল নোনা হয়ে গেছে। সেই সাথে মেহনতি মানুষের ঘাম, কান্না তো আছেই।'
স্যারের চেহারা অমন হয়ে গেল কেন ? উনি কি ডাক্তার জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইডের মত কোন দুর্ঘটনার শিকার ? উনি কি সাইকো মুভির কোন অডিশন পাওয়া অভিনেতা ?
সাক্ষাৎ জ্যাক দ্যা রিপারের ছায়া কি উনি আমার মধ্যে দেখেছেন ?
ক্লাসে স্যার যখন অন্য ছেলেদের মারতো সেই দৃশ্য দেখে যে মানসিক শান্তি আর অনাবিল আনন্দ পেতাম সেটা বাকি জীবনে আর পাইনি।
তবে ব্যাপারটা কম হত। বেশির ভাগ সময় ভাজ্য, বিভাজ্য বা ভাজক আমিই হতাম।
মাঝে মাঝেই হেডস্যারের রুমে ডাক পড়তো। উনি যে দাবা খেলার জন্য বা খোশগল্প করার জন্য আমাকে নিয়ে গেছেন তেমন না। কোন কোন স্যার উনার কাছে গিয়ে কানভারি করেছে।
গিয়ে দেখতাম হেডস্যার বসে আছেন। উনার সামনে পেল্লাই সাইজের টেবিল। টেবিলের উপর একটা গ্লোব।
আজও ক্লিয়ার না হেডস্যারের টেবিলে গ্লোব থাকতো কেন ? উনি কি ভূগোলে কম নাম্বার পেয়েছিলেন ? নাকিও দুনিয়ার সব দেশের নাম আজও মুখস্থ করে চলেছেন ? নাকি উনার দুষ্ট ছাত্ররা লুকিয়ে আছে সারাদুনিয়ায়। ওদের অবস্থান নির্ণয়ের প্রয়াস করছেন ?
ইশকুলের স্যারদের আরও একটা জিনিস বুঝতাম না । টানা পনের মিনিট মারধর করার পর বলতেন- বুঝলি মিলন তোকে বেশি ভালবাসি তো তাই বেশি শাসন করি। শাসনটা ভালবাসার প্রকাশ।
আমি বলতে পারি না। স্যার আমিও আপনাকে ভালবাসি। কিন্তু প্রকাশ করার উপায় নেই।
তবে একটা খারাপ কাজ করতাম। প্রত্যেকবার পরীক্ষা হলে প্রশ্ন হাতে নিয়েই বলতাম- স্যার একটা প্রশ্নও বই থেকে আসে নাই।
পরীক্ষা হলে প্রায়ই মাত্র এক ঘণ্টা পর খাতা জমা দিয়ে ফেলতাম। স্যার অবাক।
' সব অ্যানস্যার করেছিস ?' অবাক হয়ে বলতেন।
'নাহ স্যার।'
তাহলে ?'
'বাসায় চলে যাচ্ছি পরের সেমিস্টারের জন্য প্রস্তুতি নিতে।' বেহায়ার মত হেসে বলতাম।
স্যারের চেহারা দেখে মনে হত জম্বি জিনিসটা ভুয়া কোন হরর গল্প নয়। ওরা বাস্তব। এবং ওরা আসে পরীক্ষা হলে।
' পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান লোক হচ্ছে আলবার্ট আইনস্টাইন ।' স্যার বললেন এক ক্লাসে ।
' জী স্যার , উনার ব্রেইন নাকি কাচের বয়ামে ভরে রেখেছে গবেষণাগারে ।' বলল ক্লাস ক্যাপ্টেন ।
ওকে আমরা ঘৃণা করি । ঘৃণার বিষে মাখিয়ে রাখি ।
'নাহ স্যার , ভুল । সবচেয়ে বুদ্ধিমান হচ্ছে ম্যাক গাইভার । ' বলল নেপাল ।
'তর মাথা আর আমার মুণ্ডু ।' খেঁকিয়ে উঠলেন স্যার ।
' দুই একটা পর্ব দেখলে আপনিও বুঝবেন স্যার ।' সাফাই গাইল নেপাল । ' সামান্য তারকাটা দিয়ে ...।
' কান ধরে বাইরে গিয়ে দাড়া ।' খেঁকিয়ে উঠলেন আবার ।
'বাদ দেন ওর কথা ।' সতর্ক ভাবে কথা চাল দিলাম । যাতে আমাকে পড়া জিজ্ঞেস না করে । ' কাকে কি জিজ্ঞেস করেন । আর মানুষ পান না ? ওর মাথায় তো গোবর ভর্তি । আসলে নাপিতরা হচ্ছে জন্মগত ভাবে বুদ্ধিমান ।'
'আচ্ছা এই তথ্য আপনি পেলেন কোথায় ?'
স্যার আমাকে আপনি বলছে । সেটা সম্মান দিতে না । আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে ।
'স্যার যে কোন চলতি গল্পেই পাবেন । নাপিত কি ভাবে চালাকি করে বিপদ থেকে রক্ষা পায় , বা রাজকন্যাকে বিয়ে করে অমন প্রচুর গল্প পাবেন । পাঠ্য বইয়ে ডুবে থাকলে তো হবে না স্যার ।'
' খাড়া তরে ডুবন্ত অবস্থা থেকে ভাসাচ্ছি আমি ।' কেমন ভিলেন মার্কা মুখের ভঙ্গি করে বললেন স্যার।
খানিক পর দেখা গেল বাইরে আমি আর নেপাল কান ধরে দাড়িয়ে আছি ।
খোশগল্প করছি ।
অথচ স্যার ভাবছেন শাস্তি পাচ্ছি ।
ভুল । সবই ভুল ।
শীত শুরু হতে না হতেই এক স্যার টাইট একটা সোয়েটার গায়ে দিয়ে ইশকুলে আসা শুরু করতেন।
কারও সমস্যা হবার কথা না। কিন্তু উনি সোয়েটারের নীচে ইয়া ঢোলা একটা জামা গায়ে দিতেন। সেটা আবার প্যান্টের ভেতরে ইন করতেন না। ফলে মনে হত রোমানদের পোশাক পরে আছেন। আরও সুন্দর ভাবে বলতে গেলে মনে হত পেটিকোট আর ব্লাউজ পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
হাসতে হাসতে মড়ার দশা হত আমার।
স্যার প্রচুর মারতেন। কিন্তু কখনই জানতে পারেন নি আমার হাসি রহস্য।
ইস্কুলে যাবার সময় নেপালকে নিয়ে যেতে হত । ওর বাড়ি সামনেই ।
এক সকালে গিয়ে দেখি বিচ্ছিরি একটা মদের বোতল নিয়ে রোদে বসে আছে নেপাল ।
বোতলের ভেতরে ঘন মালাইয়ের মত জিনিস । অবিকল কোকোলোপেজ ।
এত ছোট বয়সে মদ খাওয়া শিখে গেছে ? খারাপ লাগল ।
সিনেমা দেখে ওই বোতল চিনি । নায়ক মদ খেয়ে বাড়ি ফেরে । নায়কের বড় ভাই মিত্র ( বিদ্যুৎ মিত্র বা বিমল মিত্র হবে ) ধরা গলায় বলে , ' তুই মদ খেয়ে এসেছিস ?'
নায়ক দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলে , ' হ্যাঁ হ্যাঁ আমি ...হেন তেন ।'
আমাকে দেখে নেপাল মিহি হেসে বলল , ' মিলু দাঁড়া । মুখ শুকিয়ে গেছে । শীতের বাতাস বড্ড কড়া রে ।'
খানিক পর বোতলের শাদা চাক গলে নরম হয়ে গেল । আচ্ছা করে মুখে মেখে বলল , ' শীতে নারকেল তেল জমে চাক্কা হয়ে যায় । তরা তো গ্লিসারিন দিস নায়িকাদের মত ।'
দুই বন্ধু পা চালাই ।
ইশকুলের স্যারদের তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
১। ধৃতরাষ্ট্র স্যার ।
২। দুর্যোধন স্যার।
৩। শকুনি স্যার।
ধৃতরাষ্ট্র স্যারেরা অন্ধ কৌরব রাজার মতই । আমাকেই প্রথম পড়া জিজ্ঞেস করতেন। আর কাউকেই দেখতেন না। একেবারে দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া কিসিমের ম্যাপার। উনার ব্যাচে যারা পড়তো ওরা পড়া শিখে না আসলেও উনারা সেটা দেখতেন না।
দুর্যোধন স্যারদের হাতে বেত থাকতোই। মুহা হা করে হেসে পিটুনি দিতেন। মুখের অঙ্গভঙ্গি ছিল দেখার মত।মাথায় রক্তজবার তেল দিয়ে জবজবে চুলে ভয়ংকর লাগতো তাদের।
শকুনি স্যারেরা আসলেই শকুনি। উনাদের ব্যাপারে বিস্তারিত বলার দরকার দেখি না। উনারা মারতেন কম বলতেন বেশি। মিহি মিহি হেসে বলতেন- বাসায় তিন বেলা ছাতু খাবি। শরীরটা তাগড়া হলে বড় হয়ে কুলিগিরি করতে পারবি।'
সব কথা শেষ হবার সাথে সাথেই এক গাদা ছোকরাকে জিজ্ঞেস করতেন- কি রে ঠিক কইছি না ?
সেই কৌরব সৈন্যরা সাগরের গর্জনের মত সায় দিত - ঠিক কইছেন স্যার।'
বিশাল একটা কৃষ্ণচুড়া গাছ ছিল ইস্কুল বাড়ির সামনে।
একটা মৌসুমে জ্বলন্ত কয়লার মত লাল টুকটুকে ফুল দিয়ে গাছ ভর্তি হয়ে যেত। ফুলের যন্ত্রণায় চিরল চিরল পাতা দেখা যেত না। আর গাছের তলা কার্পেটের মত হয়ে যেত ঝরা ফুল দিয়ে।
বাগদাদের কার্পেট যেন।
ইস্কুলের পিছনে আধা একরের মত খালি জায়গা ছিল। জংলা ঘাসে ভর্তি। বন মেথি, টাকা পাতা, হাতির শুর ভর্তি। বিচিত্র সব চেনা অচেনা ঘাস ছিল। কখনই ওদের নাম জানা হয়নি।
একটা বরই গাছ ছিল। জানুয়ারিতেই গোল মরিচের সাইজের বরই ধরত।
বড় হতে পারতো না।
নিয়ম করে দুই বেলা গাছের ডালা পালা ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে সব ফল গায়েব করে ফেলত বড় ক্লাসের ছেলেরা।
আম গাছ ছিল বেশ কয়েকটা। আম গাছ ছাড়া ইস্কুল কল্পনা করা যায় না।
বছরের শুরুতেই সোনালী রঙের মুকুল ধরত গাছের ডালে ডালে।
কচি পাতা গুলোর রঙ হত তামার মত। পাকা আমের মুকুলে পাগল করা একটা ঘ্রান আছে। মনটা বিবাগী হয়ে যায়। পড়ায় মন বসে না।
আম গাছ শৈশবের প্রতীক।
আমার মনে হয় সব ইস্কুলের সামনে বা পিছে আম গাছ থাকা দরকার।
মুকুল থেকে আমগুলো বুড়ো আঙুলের সমান হতে পারতো না।
তার আগেই খেয়ে শেষ করে ফেলত সবাই । অনেকে আবার পকেটে করে লবণ নিয়ে আসতো কাঁচা আম খাওয়ার জন্য।টিফিন পিরিয়ডে আম গাছের বিভিন্ন ডালা পালায় পা ঝুলিয়ে বসে থাকতো কয়েকজন ।
গরমের দুপুরগুলো কেমন যেন ঝিম ধরা হত।
স্যার আমাদের জন্য কিছু একটা কাজ ধরিয়ে দিয়ে বসে বসে ঝিমাত।
কাজ মানে কঠিন কোন অঙ্ক বা ‘ কবি কি বলতে চেয়েছেন’ এমন ধরনের কোন লেখা।
হতে পারে ভাব সম্পসারণ কর- পুস্প আপনার জন্য ফুটে না।
এখন আমাদের কাজ হচ্ছে সেই ছোট কথাটা ফেনিয়ে ফেনিয়ে কয়েক পাতা লেখা।
একদম ফালতু জিনিস। সবচেয়ে বিচ্ছিরি জিনিস হল- কবি কি বলতে চেয়েছেন? কথা হল, উনি কি বলতে চেয়েছেন সেটা আমরা জানব কেমন করে ? আজব তো।
অথবা ইংরেজিতে কর- লোকটা গেল তো গেলই , এমন ভাবে গেল আর ফিরে এলো না।
ঝিম ধরা গরমে দেখতাম ইস্কুল বাড়ির বাইরে বট গাছের ছায়ায় বসে বুড়ো মত একটা লোক বিশ্রাম করছে। লোকটার সাথে একটা বানর।বানরের খেলা দেখায় সে।
দুই জনের অবস্থাই বেশ খারাপ। বুড়োটার জামা কাপড় ময়লা। মুখ ভর্তি দাঁড়ি । চেহারায় গভীর ভাঁজ।
চোখে হতাশা। হাতে ডুগ ডুগি। বানরটার পেটে খিদে। চেহারায় হতাশা। দুই জনেই বন্দি।
বুড়ো লোকটা বন্দি অভাবের কাছে। বানরটা বন্দি বুড়ো লোকটার কাছে।
দুইজনেই এক সাথে আছে পেটের দায়ে। একজন নাচে। আরেকজন নাচায়। ডুগডুগি বাজায়। লোকজন খেলা দেখে পয়সা দিলে দুই জনের আহার জোটে।
খিদে পেলে বানরটা বেশ উসখুশ করে।
অবাক হয় এই ভেবে , ওর মালিক মানে যে ওকে বন্দি করে রেখেছে সেই লোকটা খাবার কেনে না কেন ?
আরও অবাক হয়- এত মানুষ ওর নাচ দেখে তারপরও পয়সা এত কম হয় কেন ? পেট ভরে খাবার জোটে না কেন?
ও যখন মুক্ত ছিল তখন তো ভালই ছিল। খাবার জুটত বেশ। সঙ্গী সাথী নিয়ে ভালই তো ছিল।
হারামি মানুষ ফাঁদ পেতে ওকে ধরে নিয়ে এসেছে ইট পাথরের জঙ্গলে। নিজের সুখের দিনগুলোর কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোনালী বানরটা।
আর বুড়োটাও ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভেবে উদাস হয়ে যায় রোদে ভরা এই দুপুরে।
ইস্কুল বাড়িটা আমার খুব প্রিয়।
কারন এটা বিশাল বড়। এখানের গাছগুলো বড় বড়। মাঠ দুটো বড়। স্যারগুলো ও দানবের মত বড় বড়।
বিশাল সব জিনিসের সামনে দাঁড়ালে নিজের ভেতরেও বড় হবার বাসনা জাগে মনে মনে।
এর দরজা জানালাগুলো পুরানো। ভারি। সবুজ রঙ করা।
দোতলার শেষ মাথায় একটা কামরা বন্ধ থাকে সব সময় । জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে অবাক হয়ে যাই।
কাঁচের বিদঘুটে সব জটিল যন্ত্রপাঁতি ভর্তি। টেস্ট টিউব, বিকার, কাঁচের মগ হাবি জাবি অনেক কিছু। একটা কঙ্কাল ও আছে। কাঁচের আলমারির ভেতরে। দাঁত বের করে হাসছে ওটা।
কি নিঝুম পরিবেশ।
'ওটা একটা ছাত্র ছিল।' ফিস ফিস করে কঙ্কালটা দেখিয়ে বলল এক বন্ধু। 'ইস্কুল ছুটির পর বেচারা আটকা পড়ে গিয়েছিল। শেষে মরে শুকিয়ে শুটকি হয়ে কঙ্কাল হয়ে গেছে। এখন ক্লাস নাইন টেইনের ছেলেরা এই কঙ্কাল দিয়ে প্যাকটিকেল না কি যেন করে।'
‘প্যাকটিকেল কি ?” অবাক হয়ে বলি।
‘বড়রা যা করে তাই প্যাকটিকেল।’ জবাব দেয় বন্ধু।
বাদলার দিনে ইস্কুল বাড়িটার মন খারাপ থাকতো।
ছেলে পিলে অনেকেই আসতো না। মাত্র আট দশ জন ক্লাসে বসা।
স্যার বিরক্ত। ঘেউ ঘেউ করে বলেন -' তরা আইতে গেলি ক্যান।বাসায় গুমাইতি।'
স্যারের বিরক্ত হবার কারন উনার ছাতা নেই। অনেক দূর পথ হেঁটে আসতে হয়েছে তাকে। নদীর ওপার থেকেও আসেন কয়েক জন স্যার।
বাদলার দিনে গুদারা ঘাট পিচ্ছিল হয়ে থাকে। রোজই দুই একজন আছাড় খান।
দুই হাতের চেটোয় গাল রেখে ঝিমাতে থাকেন স্যার।
পিছনের মাঠ জলে ভর্তি। ছোট খাট লেক হয়ে গেছে। ব্যাঙ ডাকছে। ঘুল ঘুলিতে কয়েকটা পাটকিলে রঙের চড়াই ভিজে বসে আছে।
মাত্র এক বা দুই ক্লাস নেয়ার পর ছুটি হয়ে যেত।জল কাঁদা মারিয়ে বাড়ি ফিরতাম।
ইস্কুল বাড়ির সামনে একটা বুড়ো লোক বসে কলম, কালি আর দোয়াত বিক্রি করতো।
সন্ধ্যার পর রাস্তাটা কেমন নিঝুম হয়ে যেত।
প্রতি বছর যখন দেশে আসি কোন এক শীতের বিকেলে বা গরমের সন্ধ্যায় ইস্কুল বাড়িটার সামনে গিয়ে দাড়াই।
কৃষ্ণচুড়া গাছটা নেই। কেটে বিক্রি করে ফেলেছে। সামনে বটগাছটা ও নেই।ধূসর বটের পাতা ঝরে পড়ে না আর।
ভেঙ্গে নতুন করা হয়েছে ইস্কুল বাড়িটা। একদম চেনা যায় না। কেমন যেন মেক্সিকান জেলখানার মত লাগে। সারা দুনিয়ার মাদক পাচারকারীদের এমন হাজতে রাখা হয়।
ইস্কুল বাড়ির সামনে একটা বইয়ের দোকান ছিল। উঠে গেছে।
সেখানে নাম করা প্ল্যাস্টিক কোম্পানির দোকান হয়েছে। বালতি হতে বদনা সবই বিক্রি করে ওরা। বই নাকি তেমন বিক্রি হয় না।
এক বুড়ো বসে কলম বিক্রি করতো না ?
নেই।
চার বছর আগে নাকি মারা গেছে। চল্লিশ বছর ধরে এখানেই বসতো।
চার বছর আগে মারা গেছে ?
কই আমার তো মনে হয় গত সপ্তাহে ও দেখেছি। কাঠের একটা বাক্সে সুন্দর করে সাজানো থাকতো সোনালী রঙের কলমের ক্যাপ। বাটুল ধরনের কালির দোয়াত।
মারা গেছে ? আমি তো ভেবেছি যতদিন ইস্কুল বাড়ির ছেলে পিলেরা লিখবে ততদিন বেঁচে থাকবে সে।
বট গাছটা কাটল কেন ?
ডুমুরের মত লাল রঙের কত কত বট গাছের ফল ঝরে থাকতো এই পথে।
ওদের ধূসর পাতা ঝরে পড়ত বিদর্ভ নগরীর দীর্ঘ শ্বাসের মত।
কেন কাটল ওরা বট গাছটা ? কেন ? কেন ?
ইস্কুলের পিছে কয়েক ডজন আম গাছ ? ওদের কাটতে হল মাঠ বড় করার জন্য ? আম গাছ ছাড়া কী ইস্কুল বাড়ি কল্পনা করা যায়?
আম গাছ ছাড়া কী আমাদের শৈশব হয় ? ফাগুন মাসে আমের মুকুলের পাগল করা একটা ঘ্রান বের হয় সেটা কেউ জানে ?
এর ডালে পা ছড়িয়ে বসে কচি আম খেত কত ক্লাস ফাঁকি দেয়া ছেলে।
আমের সাদা আঁটি দিয়ে দেয়ালে স্যারদের নিয়ে মজার কার্টুন আঁকতাম। মেরুন রঙ ধরে থাকতো সেই আঁকাআঁকি গুলো।
খেলার মাঠ বানানোর জন্য কি মাঠ সিমেন্টে ঢালাই করতে হয়?
ইস্কুল বাড়িতে ঘাস, ফার্ন আর বুনো লতা পাতা না থাকলে সবুজের ঘ্রান পাবে কি করে বাচ্চারা? খেলতে গিয়ে ব্যাথা পেলে দূর্বা ঘাস চিবিয়ে ক্ষতস্থানে লাগালে যে দ্রুত ক্ষত শুকিয়ে যায় এখনকার বাচ্চারা কি জানে ?
ইস্কুল বাড়িটা অনেক উন্নত হয়েছে। প্রতি বছর পাশের হার বেড়েছে।
কিন্তু ছেলেগুলো রোবট হয়ে বের হচ্ছে।
ওরা কি আমাদের সময়কার মত মজার শৈশব পাচ্ছে ?
আনন্দের সাথে পড়তে পারছে ওরা ?
নাকি শুধু মোটা মোটা গাইড বই পড়ে একই ছকে ছাপা সন্দেশের মত বের হচ্ছে ওরা ?
বাদলার দিনে কোন স্যার ওদের বলছে - গোয়ালন্দ ঘাটে ইলিশ মাছ ধরার গল্প ?
সেই ইলিশ মাছ দিয়ে শর্ষে ইলিশ রান্না করেছিল স্যারের দাদীমা। রাতের বেলা রান্না ঘরে মেছো ভূত চলে এসেছিল সেই শর্ষে ইলিশের ঘ্রানে।
ক্লাসে কি আজও কোন বাচাল মিলন গাঙ্গুলী আছে ? যাকে স্যার জিজ্ঞেস করেছিল- পাঁচটা মাছের নাম বল তো বাবা।
সেই পিচ্চি মিলন বলেছিল- স্যার তিনটা ইলিশ আর দুইটা রুই। এই হল মোট পাঁচটা মাছের নাম ।
পাশ থেকে এক জন ভাঙ্গানি দিত- স্যার দেহেন দেহেন মিলনে আপ্নের লগে মস্কারি করে।
লাস্ট বেঞ্চিতে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার মজা ওরা জানে ?
ইস্কুল ছুটি হলে আজও কি এক দঙ্গল ছেলে হৈ চৈ করে বের হয় ?
বদলে যাওয়া পৃথিবীর পুরানো নিয়ম।
তারপরও পুরানো ইস্কুল বাড়িটার জন্য বুকের ভেতরে দুঃখ বোধ জন্ম নেয় কেন ?

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন