সেই কবে ।
হাফ প্যান্ট পরি তখন। একদম ছোট।
হাঁটতে গিয়ে , পথ হারিয়ে চলে গিয়েছিলাম অচেনা এক জায়গায়।
একদম অচেনা নামবিহীন জায়গায়।
অবাক হয়ে দেখি, কেমন স্বপ্নের মত মিষ্টি একটা জায়গায় চলে এসেছি। নিদ্রালু একটা রেল ইষ্টিশন। লাল গুমটি ঘর। ভেতরে আদ্দিকালের ঘড়ি। ঘড়ির কাঁটা রোমান হরফের। iv মানে যে চার v মানে পাঁচ vi মানে ছয় তখন ও জানতাম না।
টেলিগ্রাফ নামে অশৈলী যন্ত্র আছে তাই বা কে জানে। টুক টুক করে কাজ করছে সেটা। সব কিছুই রহস্যময় আমার কাছে।
আর ইষ্টিশনের বাইরের পরিবেশ এক কথায় ছবির মত।অথবা তেল রঙ্গে আঁকা ইউরোপিয়ান কোন শিল্পীর ছবি যেন ।
কচি বারমুডা ঘাসের দঙ্গল। কালো কুচকুচে এক পুকুর। চারিদিকে নেপিয়ারের ঘাসের বন । বুনো তুলসির জঙ্গল থেকে ঝাঁ ঝাঁ করা কেমন এক মাতাল করা ঘ্রাণ ভেসে আসছিল।
সব মিলিয়ে পাগল হবার দশা আমার।
হেঁটে গিয়েছিলাম বহু দূর পর্যন্ত। যতক্ষণ না সূর্যটা মসুরি ডালের মত হয়ে দূরের কোন এক ধনীর দালান- বাড়ির কার্নিশ ধরে ল্যাগব্যাগ করে ঝুলছিল, ততক্ষণ হেঁটে গেছি।
সেই থেকে নেশার মত হয়ে গেছে ।
ছুটিতে দেশে আসলে হাঁটতে যাই রেল লাইন ধরে। শহরের সব রাস্তা ভর্তি চা আর শরবতের দোকান। রাস্তার ড্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে বেলের শরবৎ খায় অদ্ভুত কিছু মানুষ। পাকুর গাছের নিচে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে টেম্পোর ড্রাইভার।
কিন্তু রেললাইনগুলো আজও পুরানো বন্ধুর মত। ওরাও বদলে গেছে। কিন্তু আমাকে দেখলে খোশ খবর জিজ্ঞেস করে।
কাল বিকেলে হাঁটতে গিয়ে দেখি নির্জন মত জায়গায়, আকন্দ গাছের ওখানে উঁকি ঝুঁকি মারছে নরম সোনালি রঙের একটা বেজি।
শেষ বিকেলের আলোয় ওকে বেশ ভদ্রলোক বলেই মনে হচ্ছে। খাবার খুঁজছে হয়তো। চেহারায় চিন্তার ছাপ।
কোন এক তস্কর পাশের ডোবা ভর্তি করে মার্কেট করছে। ওর বাসা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বা ওদের বাসা। আমার সাথে চোখা চোখি হতেই পালিয়ে গেল।
আমরা তখন রাম বাবুর পুকুর পাড়ে থাকতাম। কাঠের পাটাতন ঘর।
বললে বিশ্বাস করবে না, বাসার নিচেই টলটলে পুকুর। আর সেই পুকুর ভর্তি ছিল ডজন ডজন কচ্ছপ। শীতের দুপুরে ওরা রোদ পোহানোর জন্য উঠে আসতো। বড় শুকনো গাছের গুড়িতে কয়েকজন মিলে বসে সুখ দুঃখের আলাপ জমাতো। ওদের আড্ডা দেখে মাঝে মাঝে নতুন কোন সঙ্গী চলে আসতো। সেও চেষ্টা করতো গাছের গুড়িতে উঠতে । অন্যরা বাঁধা দিত- এই উঠিস না, উঠিস না।
ততক্ষণে নতুন কচ্ছপ উঠে যেত। আর গাছের গুঁড়িটা টলমল করে পাক খেয়ে সবাই মিলে ঝুপুস করে বরফের মত ঠাণ্ডা জলে তলিয়ে যেত। দেখে বেজায় হাসি হাসতাম।
ঝাঁকড়া চুলের বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন- তুমি যদি গভীর ভাবে প্রকৃতিকে দেখ, তাহলে সব কিছুই ভাল ভাবে বুঝতে পারবে।
আমেরিকান স্থপতি ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট বলছেন- প্রকৃতিকে ভালবাসো, প্রকৃতিকে ভাল করে পর্যবেক্ষণ কর, প্রকৃতির কাছে থাকো । তুমি কখনই ব্যর্থ হবে না।
দার্শনিক রালফ ওয়াল্ডো এমারসন যিনি কবিতাও লিখতেন , তিনি বলেছেন- ফুল হচ্ছে পৃথিবীর হাসি।
ভ্যান গগের নাম শুনেছ ? যেই পাগল শিল্পী। হলুদ রঙের পাগল ছিলেন। মায়াবী সব ছবি এঁকেছিলেন। বলেছিলেন- তুমি যদি প্রকৃতিকে সত্যি ভালবাস তবে চারিদিকেই সুন্দর খুঁজে পাবে।
আমি ছিলাম ভাগ্যবান । সুন্দর, সবুজ আর মায়াবী পরিবেশে বড় হয়েছি। চারিদিকে দেখেছি প্রকৃতির নানান আয়োজন। আমাকে মুগ্ধ করতো।
উড়ে যাওয়া কাঁচ পোকা দেখে অবাক হতাম। তেমনই বিস্ময়ে চেয়ে থাকতাম কুমোর পোকার কাঁদামাখা বাসা দেখে। কোথায় পায় কাঁদা ওরা ? কিভাবে মুখে করে কাঁদা এনে আফ্রিকান বাঁনটুদের মত বাসা বানায়।
তখন মহল্লার মুদি দোকানে দুই টাকা করে গুলতি বিক্রি করতো । ইংরেজি বড় V হরফের মত কাঠের এক টুকরোর সাথে টায়ারের টিউব ফালি করে কেটে জুড়ে দিয়ে বানানো হত এই গুলতি। বাচ্চা কাচ্চা দেদার কিনত।
কি মনে করে কিনেছিলাম। মায়ের মুখটা থমথমে হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, ‘ বাবা পাখি মারতে নেই। ওর বাচ্চা কাচ্চা বাসায় অপেক্ষা করে মা কখন খাবার নিয়ে ফিরবে। পিচ্চি পাখী মরে গেলে মা পাখী কষ্ট পায়। কারও বুক খালি করলে অনেক কষ্ট পেতে হয়।’
মায়ের বাচন ভঙ্গিতে তিরস্কার ছিল না। বিষাদ ছিল।
তারপর থেকে গুলতি ছুয়ে দেখিনি বাকিজীবন । এয়ারগান বা শিকার করার রাইফেল হাতে পেয়েও কোন প্রাণীর দিকে সেটা তুলতে পারিনি।
মহাভারতের গুরু দ্রোণ, অর্জুনকে বলেছিলেন, কি দেখতে পারছো ?
অর্জুন তীর ধনুক হাতে দাঁড়িয়ে । বলেছিল, শুধু পাখীর মাথা দেখতে পারছি।
তেমনি, আমি শুধু পাখীর মায়াভরা চোখ দেখতে পাই।
কালো বিচ্ছিরি কাক ও আমার কাছে জলে ধোয়া পাথুরে কয়লার মত সুন্দর লাগে। অমন একটা কাক বসে থাকে আমাদের রান্নাঘরের বাইরে। রোজ দুপুরে । মা খাবার দেয়। বলে , আমাদের কোন পূর্ব পুরুষ কাক সেজে এসেছে আমাদের দেখতে। প্রমাণ হিসাবে মা বলে- কাকটা কোন চিল্লাফাল্লা করে না। খাবার মুখে নিয়েই চলে যায়।
কথাটা হাড়ে হাড়ে সত্যি। খাবার না পেলে কাকটা মন খারাপ করে। পরপর কয়েকদিন আর আসে না !
প্রকৃতির পাঠশালা বলতে একটা কথা আছে। যেখানে প্রকৃতির খুব কাছে চলে যাওয়া যায়। শেখা যায় প্রকৃতির সব নিয়ম ।
আমার তেমনি কয়েকটা জায়গা ছিল।
বাড়ির কাছেই ছিল শীতলক্ষ্যা নদী আর বাংলোর মাঠ। আরেকটু বড় হয়ে দূরের সস্তাপুরের চাঁদমারি।
যে পুকুরের সাথে থাকতাম সেটাও কি কম বিচিত্র ?
ভরা বর্ষার আগে পুকুর ভরে যেত টকটকে হলুদ রঙের বোয়াল মাছের পোনায়। এক সাথে জটলা বেঁধে গিজগিজ করতো ওরা।
কত পদের জলজ শাক আর পানা দেখেছি বলার মত না। টলমলে বৃষ্টি হলে পুকুর থেকে লাফিয়ে রাস্তায় উঠে আসতো মাগুর আর কৈ মাছ।
একবার দেখি তুমুল বৃষ্টির মধ্যে এক রিক্সাওয়ালা রিক্সা থামিয়ে গামছা দিয়ে একটার পর একটা কৈ মাছ ধরছে। আনন্দে ওর মুখ আধখোলা দেশলাইয়ের বাক্সের মত হয়ে গেছে।
হেলেঞ্চা শাক নেয়ার জন্য একদল আসমানি আসতো। ওদের নাম জানি না। আমি আসমানি ডাকি। ওদের চেহারা সবার এক রকম । উসকো খুসকো লাল চুল। ময়লা ছিটের ফ্রক পরা।
ব্যাগ ভর্তি করে হেলেঞ্চা শাক নিয়ে যেত।
পুকুরের পারের বালি মাখা নরম মাটিতে ডিম পেরে চাপা দিয়ে যেত মা কচ্ছপ। বিশাল এক বোয়াল মাছ ছিল পুকুরে। কত শৌখিন মৎস্য শিকারি এসেছিল। কেউ মারতে পারেনি ওটাকে। পীরের বোয়াল। কে কবে মানত করে ছেড়েছে। সবাই দেখেছিল, মাছের মাথায় সিঁদুরের দাগ।
হলুদ কালো সুন্দর ডোরা কাঁটা অপূর্ব একটা মাছ দেখেছিলাম- নাম বৌ রানী। কি মিষ্টি নাম ! সাদা কালো ছোপ ছোপ পিচ্চি একটা মাছের নাম- ইউসুফের জাংলা । কে রেখেছে অমন নাম ?
নেপালি চাকুর মত ফলি মাছ। পিয়ালি, টাকি, তিতপুঁতি, খলসে আরও কি সব নামের মাছ। আজকাল ওদের নামও শুনি না। পুরানো পয়সার মত হারিয়ে গেছে ওরা।
সারা দুনিয়ায় দশ হাজার রকমের ঘাস আছে। আমি শুধু জানতাম লেবুর সুগন্ধিওয়ালা বিচিত্র ঘাস , সেটাই হয়ে আছে পুকুরের চারিদিকে।
টলটলে এক পুকুর আমাকে দেখিয়ে দিয়েছে জীব জগৎ কত বৈচিত্রে ভরা।
অলস দুপুরে দেখতাম , জলজ ঘাসের ঢগার মধ্যে উড়ে বসার চেষ্টা করছে লাল টুকটুকে ফড়িঙ। ওর শরীরের ভারে বারবার ডুবে যাচ্ছে জলজ ঘাস। কিন্তু বেচারা গোঁ ধরেছে। এই ঘাসের উপরই বসবে। অন্য ঘাস হলে চলবে না ওর ।
আধ পচা গাছের গুঁড়ির উপর জন্মে আছে কমলা রঙের সুন্দর ফ্যাঙ্গাস। এত লোভনীয় রঙ। খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা করতো।
মনে হত মঙ্গল গ্রহের রেস্টুরেন্টে অমন ফ্যাঙ্গাস বিক্রি করে । আমরা কেউ জানি না । শুধু মঙ্গলের বাসিন্দারা জানে।
আমার বাড়ির ওখানে উড়ে বেড়াতো সাদা কালো ফুটিওয়ালা প্রজাপতি। মনে হচ্ছে বল প্রিন্টের জামা পরে আছে । পুকুরে কত পদের জলপানা দেখেছি আজ ভুলেও গেছি। ওদের নানান ক্লাস আছে। বংশ মর্যাদার মত। শৈবাল, ব্রায়োফাইট, টেরিডোফাইট।
সবার নাম ধাম জানি না। নিজেই নাম দিয়েছি । ক্লাসের সব ছেলের নাম যেমন জানতাম না ।
নিজেই নাম দিতাম- নাকে হিঙ্গাইল ওয়ালা ছেলেটা, ময়লা জামা ছেলেটা, মাথায় বেশি করে শর্ষের তেল দেয়া ছেলেটা। হেন তেন।
কিছু মানুষের উদ্যম থাকে দারুন। যেমন-
কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের গণিতের অধ্যাপক চার্লস ব্যারন ক্লার্ক (Charles Baron Clarke, ১৮১২-১৯০৯) পূর্ববঙ্গের স্কুল পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত থাকাকালে আড়াই বছর নৌকায় ভ্রমণ করে প্রায় ৭০০০ উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। বাহবা দিতেই হয় এই ইংরেজ বাবুকে।
পুরানো বাড়ির দেয়ালে কিছুটা ভেজা জায়গায় দারুন একটা পাতাওয়ালা গাছ হয়। নাম বিদ্যাপাতা। এই পাতা বইয়ের ভাঁজে রেখে দিলে শুকিয়ে সুন্দর মচমচে হয়ে যায়। সুভেনিয়রের মত। এটার ইংরেজি নাম- মেইডেন হেয়ার। বেশ কাজের জিনিস।
ইউরোপের দেশগুলোতে অতীতে এই বিদ্যাপাতা দিয়ে কাশির সিরাপ বানাত । হিমালয়ের কাছাকাছি যে সব আদিবাসি বাস করে ওরা আজও বিদ্যাপাতা দিয়ে ওষুধ বানায়।
সন্ধ্যা হতেই বারান্দার কমলা আলোর জন্য দূর থেকে ছুটে আসতো নানার রকমের পোকা আর গঙ্গাফড়িঙ।কোমল সবুজ রঙের শরীর ওর। ঘন সবুজের সাথে মাখন মেশালে অমন রঙ হয়।
এই রঙের একটা ককটেল আছে। ওটার নামও গ্রাস হপার।
চারিদিকের প্রকৃতির বিপুল আয়োজন। মুগ্ধ হয়ে দেখি আমি।
ভেজা জলজ ঘাস বেয়ে কাঠের বারান্দায় গুঁটিগুঁটি সতর্ক পায়ে উঠে আসে বাহারি শামুক।
এক একটার কি রঙ !
খোলসের কি বাহার ! বিদেশি ক্যান্ডির মত । একটা দেখতে বেশ গোলগাল। ওটার নাম আপেল শামুক।
ওদের পছন্দ করি। এক একটা শামুক নাকি তিন বছরও ঘুমিয়ে কাটায়। ঘাসের গায়ে শামুকের ডিম দেখেছি। কর্কশিটের গুঁড়োর মত।
ঢ্যাঙ্গা কালো মত এক লোক এসে পুকুর থেকে শামুক তুলে নিয়ে যায় বেতের ঝুড়ি ভর্তি করে। শামুক পুড়িয়ে চুন বানান। মায়া লাগে।
শামুক হচ্ছে পুকুরের রত্ন। প্রায় ৪৩ হাজার প্রজাতির শামুক আছে সারা দুনিয়ায়। নানান কাজে লাগে।
তারপর একদিন হাঁটতে গিয়ে সস্তাপুরের ওখানের চাঁদমারি টিলা আবিস্কার করি। শীতের শুরুতে শৌখিন মানুষজন পিকনিক করতে যেত ওখানে। রাইফেল ক্লাবের সদস্যরা শীতের শেষে টার্গেট প্যাকট্রিস করতো।
কেমন এক যন্ত্র দিয়ে মাটির তশতরি ছুড়ে দিত শূন্যে আর রাইফেলের গুলি দিয়ে সেই জিনিস ভেঙ্গে নিজের দক্ষতা দেখাত সদস্যরা। সেই প্রথম আমি দেখলাম জিন্সের প্যান্ট আর চামড়ার জ্যাকেট পরা সুন্দরমত এক মেয়ে, একটার পর একটা গুলি করে সব তশতরি ভেঙ্গে ফেলল। মেয়েটা দেখতে ‘যেট’ গুঁড়ো সাবানের বাক্সের গায়ে ছাপা মেয়েটার মত। কানে পুঁতির দুল। ভারি রাইফেলটা ওর হাতে সুন্দর মানিয়েছে।
জায়গাটার শুরুতেই দাঁড়িয়ে আছে দানবের মত দুই কৃষ্ণচুড়া গাছ । জ্বলন্ত কয়লার মত ফুল ভর্তি। অদ্ভুত হলুদ রঙের মাটি ওখানের । মায়ের শাড়ির মত পথ। নিচে কয়েকটা শনের ঘর। কয়েকটা ছাগল খামখাই ভ্যা ভ্যা করছে।
তারপর বিশাল এক জায়গা জুড়ে শুধু লম্বা ঘাস। আর চোর কাঁটা। পেল্লাই একটা টিলা। টিলা বানানো হয়েছে যাতে শুটিঙের গুলি গিয়ে ওটার গায়ে বেঁধে। টিলার পিছনে টলটলে ডোবা। ডানে বামে আরও কয়েকটা ডোবা। ভর্তি কচুরিপানা। কয়েকটা গরু ডোবার মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিয়মিত কচুরি পানা খায় । ভাব দেখে মনে হয় মোটা মত কোন লোক সালাদের বোলের মধ্যে বসে সিজার সালাদ খাচ্ছে।
শ্যামা ঘাস নামে সুন্দর একটা ঘাস হত। গায়ে ধান বা গমের ছড়ার মত। গাইয়া ঘাস বলে । শুনেছি এটা খেলে গরু বেশি দুধ দেয়। অনেক আগে এই জনপদে শ্যামা ঘাসের দানার ভাত খেত লোকজন।
ছোট্ট হলুদ রঙের একটা ফুল দেখতাম। সূর্যকন্যা নাম। কারা দেয় অমন কাব্যিক নাম ? ইংরেজিতে সিঙ্গাপুর ডেইজি ও বলে।
কম পাতাওয়ালা একটা ঝোপ পেতাম। সারা বছর পিচ্চি এক চিমটি তুলার মত ফুল ধরে থাকতো। ফুলের রঙ বেগুনি। অমন সুন্দর ফুল দেখিনি কোথাও। নাম-কুকসিম। ইংরেজিতে বলে- লিটল আয়রনউইড। ফুল শুকিয়ে সাদা রঙ হয়ে উড়ে যায় অন্য কোথাও। কোথায় যায় কেউ জানে না।
দূরে কোথাও।
আয়ুবেদে এই গাছের কথা আছে। অনেক রোগের ওষুধ নাকি বানানো হয়।
হলুদ একটা ফুল দেখতাম। অনেক পরে নাম জেনেছি - স্বর্ণঝিন্টি। বিদেশি লেটুসের মত একটা আগাছা দেখতাম। তুষারের কুঁচি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে রাখলে যেমন দেখায় , তেমন দেখতে । এত লোভ হত , মনে হত সাদা তশতরিতে রেখে , সামান্য সোনালি জলপাই তেল মেখে দিলেই খাওয়া যাবে।আগাছার নামটা জানা হয়নি। আগে বা পরে আর দেখিনি সেই আগাছাটা। কে জানে হয়তো অভিমানে হারিয়ে গেছে।
ডোবাগুলো প্রকৃতিক।
নিচু জায়গাগুলো বৃষ্টির জল ভরে অমনটা হয়েছে। কাউয়াঠুকরি নামে জলজ উদ্ভিদ পেতাম। শালুকঘাস বলে। Guayanese Arrowhead , প্রথমে ভিন্ন জাতের কচুরিপানা ভেবেছি। পরে জানলাম ভুল। পাতা তীরের ফলার মত। শরৎ আর বর্ষাকালে সাদা সুন্দর ফুল হয়।
জলজ ফুলের মধ্যে যেটা আমাকে বিবশ করে দিয়েছিল সেটা হচ্ছে- পানচুলি। ইংরেজিতে ওয়াটার স্নো ফ্লেক বলে। অণুবীক্ষণ কাচের নীচে তুষারের একটা কণা যেমন দেখায় এই ফুলটা তেমন। সাদা ধপধপে। মাঝে হলুদ রঙের একটা ফোঁটা। পাঁচ থেকে আটটা পাপড়ি । মনে হয় অক্টোপাস হতে গিয়ে ভুলে ফুল হয়ে গেছে।
ঠিক যেমন কচুরি পানার ফুল - ময়ূর হতে গিয়ে ভুলে ফুল হয়ে গেছে। পুকুর ভর্তি কচুরিপানার ফুল দেখছ কখনও ? সুযোগ পেলে দেখ।
হল্যান্ডের টিউলিপ ফুলের চেয়ে সুন্দর।
শুধু দেখার চোখ থাকতে হবে।
ডোবাগুলো অগভীর। কিন্তু জলজ ঘাস আর লতার জন্য জল শরবতের মত ঠাণ্ডা। শ্যাওলার তলায় যৌথ পরিবার নিয়ে থাকতো খলসে মাছের বিশাল দঙ্গল।
ফাল্গুন-চৈত্র মাসের সোনালি অ্যাসিডের মত রোদে পুড়ে ডোবার জলে ঝাঁপিয়ে পরে মনে হচ্ছে পিরামিডের শীতল চেম্বারে ঢুকে পড়েছি। বা এস্কিমোদের ইগলুতে। টিলা ভর্তি ঘাস আর নাম জানা অজানা প্রচুর ঝোপ ছিল। থানকুনি পাতা চিনতাম। পার্সিয়ান কার্পেটের মত ছেয়ে আছে। থানকুনির পাতা দেখলে মনে হয় শার্পনার দিয়ে কাঠপেন্সিল চাঁছা হয়েছে।
মোটা দূর্বা ছিল । ব্লেডের মত ধার। রক্তের মত ছিটে দাগ।
টিলার মধ্যে এক গহীন গর্ত পেলাম। বিচ্ছিরি কোন প্রাণীর বাসা যেন । কে যেন বলল, শিয়ালের গর্ত। এই এলাকায় একটা শিয়াল আছে শুনেছি। রাতে এসে গরিব মানুষের পোষা মুরগি চুরি করে খেয়ে ফেলে। চুরি করে কথাটা খামাখাই বললাম। ওকে নিশ্চয়ই কেউ নিমন্ত্রণ করে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে মোরগ পোলাও বা কেন্তাকি শহরের ভাঁজা মুরগি খাওয়াবে না।
শেষে একদিন ধরা পড়লো শেয়াল।
একগাদা মানুষ লাঠি সোটা নিয়ে বিকেল বেলা চলে এলো শেয়ালের গর্তের কাছে। শুকনো মরিচ আর ডালাপালা দিয়ে আগুন ধরিয়ে ধোঁয়া দেয়া হল গর্তের মুখে । বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না।
দৌড়ে বাইরে চলে এলো ।
জাল পাতাই ছিল। ধরা পড়লো।
শেষ বিকেলের কমলা রঙের আলোয় শেয়ালটার গায়ের লাল রঙ রুবির মত জ্বলছিল। খুব অসহায় লাগছিল । খিদের চোটে খেয়েছে। এখন শাস্তি পাচ্ছে। ওর চেহারায় আতঙ্ক। হয়তো বলতে চাইছে- আরে ভাই আমি খাব কি বলুন ?
শিয়াল ধরা পড়তেই নানা রকম মতলববাজ চলে এলো। এক কবিরাজ এলো। উনি শেয়ালের তেল শিশি ভর্তি করে বাজারে বিক্রি করেন। বাতের ব্যাথা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ সেই তেল মাজায় গর্দানে ব্যবহার করে।
আরেক দল এলো শিয়ালের মাংস কিনতে। ঐ মাংস রান্না করে খাবে। কি সব জটিল কুটিল রোগ ভাল হয়ে যাবে।
বুনো প্রাণী বা ঐসব জীব জানোয়ার যাদের আমরা অবহেলা করি, ওদের জীবন সহজ নয়। বেশ কষ্ট করেই বেঁচে থাকে। নাথিং ফ্রি ইন দিস ওয়ার্ল্ড।
শুধু মাত্র খাবার আর বাসস্থানের জন্য ওরা পাড়ি দেয় হাজার হাজার মাইল। এটাকে বলে মাইগ্রেশন ।
যেমন ধর- লেদার ব্যাক সামুদ্রিক কচ্ছপের কথা। সব কচ্ছপই দেশান্তরী হয়, কম বেশি। খাবারের জন্য বহু দূরের পথ পাড়ি দেয় ওরা। কিন্তু পেল্লাই সাইজের এই লেদার ব্যাক কচ্ছপ ১০ হাজার মাইল বা তারও বেশি পথ পাড়ি দেয় দেশান্তরী হবার জন্য।
নরওয়ে থেকে সাঁতার কেটে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত যায়। ওদের পিঠের খোল তেলতেলে কেমন মোটা চামড়ার মত, সেইজন্য এই নাম।
এইরকম বিচ্ছিরি পিঠের খোলের জন্য সাগরের বরফগলা শীতল স্রোত ওরা কেয়ার করে না। দুই তিন বছর পর পর ওরা বহু দূরের নিরাপদ সৈকতে গিয়ে ডিম পারে। আরও তাজ্জব ব্যাপার যেই সৈকতে ওরা জন্ম নেয়, সেখানে প্রায়ই গিয়ে ঘুরে আসে। এটা কি স্মৃতিকাতরতা ? নাকি সামার হলি ডে কে বলবে ?
আমি জানি না।
সবচেয়ে বিপদজনক দেশান্তরী গল্প হচ্ছে এক ধরনের আফ্রিকান হরিণের।গনু বলে ওদের । কেমন যেন মোষ আর হরিণ মেশান প্রাণী । দেখতে বেশ। কেমন বাইসন বাইসন ভাব। ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকে ।
জুলাই থেকে অক্টোবর প্রায় ২০ লাখের মত এই গনু হরিণ তানজানিয়া থেকে কেনিয়ার মাসাইমারায় রওনা হয়। পথের দূরত্ব ৫০০ মাইল। এই যাত্রাটা কিন্তু তীর্থযাত্রার মোটেও নিরাপদ না।
মারা নদীর দুই পাশে পেট ভর্তি খিদে নিয়ে উত পেতে থাকে পেল্লাই সব কুমির। দুই পাশের ঝোপে থাবা চেটে অপেক্ষা করে সিংহ আর হায়েনা। আড়াই লাখের মত গনু হরিণ মারা যায় দেশান্তরী হতে গিয়ে। টিভিতে দেখেছিলাম, একটা ফিচার মুভিতে। খুব দুঃখজনক।
কত বিপদ শেষে নিরাপদে ঐ পাড়ে পৌঁছে যায় একটা দল। মা হরিণটা পৌছায়। কিন্তু বাচ্চাটা ছিল পিছনে। বাচ্চাটাকে কুমিরে ধরে নিয়ে যায়। মা হরিণটা নদীর পাড়ে পাগলনীর মত আথালি পাথালি করতে থাকে। দলের সবাই চলে যায়।
মা থেকে যায় একা ।
অনেক অনেক পরে মা বুকের ভেতরে হাজার সমুদ্র যন্ত্রণা নিয়ে ওদের অনুসরণ করে।
আহা !
তারপরে ধর আফ্রিকান বাদুরের কথা।
ওদের বলে - খড় রঙের ফলখেকো বাদুর। বছরের একটা সময়ে প্রায় ৮০ লক্ষ বাদুর কঙ্গো থেকে জাম্বিয়া উড়ে যায়। শুধু মাত্র প্রিয় একটা ফল খাবার জন্য। ফলের নাম মুসুকু ( musuku) ।
বুনো ফলটা দেখতে আমাদের দেশের কাউ ফলের মত। খোসা শক্ত। ভেতরের শাঁস নরম আর মিষ্টি । দানা আছে। বর্ষার মৌসুমে জাম্বিয়ায় এই ফলটা প্রচুর হয়। জাম্বিয়ার কাসাঙ্কা ন্যাশনাল পার্কের ১০ হাজার একর জুড়ে মুসুকু ফলের গাছ। আর গাছ ভর্তি মিষ্টি ফল। কিন্তু কোন এক বিচিত্র কারনে বাদুরগুলো মাত্র এক একর জায়গার গাছ পছন্দ করে। মাত্র একটা গাছেই নাকি প্রায় ১০ লক্ষ বাদুর পা উপর দিকে তুলে লটকে থাকে। কল্পনায় লোকাল বাসের কথা কেন যেন মনে হয় আমার ।
ঝুলে থাকা বাদুরগুলোর ওজন হয় মোট দশ টনের মত। আর যতক্ষণ জেগে থাকে শুধু ফল খায়।খেয়ে ঘুমায়। ঘুম থেকে উঠে আবার খাওয়া শুরু করে।
দেশান্তরী প্রাণীদের কথা বলতে গেলে তিমি মাছের কথা না বললে মস্ত অন্যায় হয়ে যাবে।
তিমি আসলে পেল্লাই এক স্তন্যপায়ী প্রাণী। সব তিমি ক্রিল খেয়ে বেঁচে থাকে। ক্রিল জিনিসটা কুঁচো চিংড়ীর মত একটা জিনিস।পৃথিবীর সব সাগর মহাসাগরে ক্রিল পাওয়া যায়। ক্রিল নামটি এসেছে নরওয়েজিয়ান শব্দ ক্রিল থেকে, যার অর্থ " ছোট্ট ভাঁজা মাছ বা ক্ষুদে চিংড়ি । "
তো তিমিরা সেটাই খায়। যেখানে বেশি ক্রিল পাওয়া যাবে সেখানেই চলে যায় ওরা ।
হ্যাম্পব্যাক তিমি বাচ্চা জন্ম দেয়ার জন্য মেরু অঞ্চল থেকে সাঁতরে বিষুবরেখা সাগরের কাছে চলে যায়। বছরে ৬ হাজার মাইল সাঁতার কাটে দেশান্তরী হতে গিয়ে।
ধূসর তিমি গরম কালে আলাস্কা থেকে সাঁতরে রাশিয়া চলে যায়। যাত্রাপথ ১২ হাজার মাইল।পশুপাখীর দেশান্তরী হবার গল্প এক মহাকাব্যের মত। বলে শেষ করা যাবে না। কত বিচিত্র আর রোমাঞ্চকর সেই যাত্রা।
সস্তাপুরের সেই জায়গাটার কাছে গেলে মন ভাল হয়ে যেত। আরও মজার ব্যাপার একেক মৌসুমে জায়গাটা একেক রকম লাগত।
বর্ষার মৌসুমে জলাভূমিগুলো উপচে যেত জলে , ঘাস হত আরও সবুজ। তকতকে সবুজ।
অ্যালুমিনিয়ামের পাঁচ পয়সার মত ক্ষুদে পিচ্চি মাছ ভর্তি হয়ে যেত।
শীতের মৌসুমে বিকেল বেলায় শিশিরের ছোপ পেতাম জুতার ফিতায় । কচুর ঝোপে মাকড়সার জালে শিশিরের ফোঁটা ঝুলে থাকে। শেষ বিকেলের পাকা গমের মত রোদ পড়ে মনে হত মণিমুক্তা বসানো কোন অলঙ্কার ঝুলছে।
কোন কোন বিকেলে অবাক হয়ে দেখতাম ইন্দ্রজালের মত কুয়াশা নেমে আসছে। নীলচে সাদা কুয়াশার গায়ে মিষ্টি একটা ঘ্রাণ।
গরমকালে মনে হত টেক্সাসের কোন বিজনপ্রান্তে বসে আছি। টিলার উল্টোদিকে চামড়ার তাবুর সামনে বসে আছে রেড ইনডিয়ানরা। ওদের মুখে রঙের ছোপ। মাথায় বাজপাখীর পালকের মুকুট। ধোঁয়া দিয়ে স্যামন আর রেইনবো ট্রাউট মাছ ঝলসে নিচ্ছে।
শুধু শীতকালে কিছু ছেলে পিলে ক্রিকেট খেলতে আসতো।
ওরা ধনীর বাচ্চা কাচ্চা। সবার সাদা হাফ শার্ট আর প্যান্ট পরনের। কেউ কেউ আয়েশ করে গায়ে সাদা সোয়েটার চাপিয়েছে। ওদের ঢং দেখে আর বাঁচতাম না।
আমাদের পরিচিত এক বড় ভাই ছিলেন। ধরা যাক তার নাম অমুক ভাই। সেই অমুক ভাই দুটো ক্রিকেটের ব্যাট, ছয়টা লাঠি যেগুলোর এক মাথা সূচালো , স্ট্যাম্প বলে নাকি। দুই জোড়া বিচ্ছিরি গ্লাভস যা দিয়ে নিখুঁত ভাবে খুন করা যাবে না আর একটা লাল বল যেটার পেটের দিয়ে মোটা সুতা দিয়ে সেলাই করা অমন কতগুলো জিনিস ক্রিকেট খেলার জন্য কিনেছিলেন। যার দাম এক হাজার টাকা।
ব্যাপারটা সাংঘাতিক ।
কারন আমার বন্ধু নেপালের বাবা নাকি মাসে বেতন পেতেন তিন হাজার টাকা।
বাদবাকি সময় বিশাল এলাকাটা নিঝুম হয়ে থাকতো।
টিলার উপর দাঁড়ালে বহু দূর পর্যন্ত দেখা যায় । ঘাস, ধইঞ্চা গাছের দঙ্গল। রাধাচুড়া আর কড়ই গাছ। অনেক দূরে শহর - ছায়া ছায়া দেখা যায় ।
কল্পনায় ভাবি- ওটা নিউইয়র্ক। খানিকদূরে রেললাইন। ওটা চলে গেছে টেক্সাস । রেল ভর্তি ঈগলের ছাপ দেয়া সোনার মোহর । সেইসব লুট করার জন্য ঝোপের পাশে আছে তস্কর।
ফেরার পথে ছাপরা দেয়া পিচ্চি একটা দোকান পেতাম মাত্র। দোকানের ভেতরে এক নিঃসঙ্গ বুড়ো। চোখে ভারি পাওয়ারের চশমা। মাথায় সাদা কালো চেক চেক একটা কাপড় প্যাচিয়ে বাঁধা।
বুড়োর সামনে অ্যালুমিনিয়ামের মস্ত একটা থালা। সব মিলিয়ে মাত্র দশবারোটা আলুর চপ, বেগুনি, ডালপুরি।
দোকানের ভেতরে ফিকে কমলা রঙের হারিকেন জ্বলে। হারিকেনের চিমনিতে বাদুরের ছাপ।
সারাক্ষণ কি যেন ভাবতো বুড়ো দোকানদার। কখনই তেমন কোন খদ্দের দেখিনি।
আহা কি সুখের দিন ছিল !
আজকাল তো ড্রেনের সামনে মানুষ দাঁড়িয়ে পরোটা আর গরুর কলিজার ভুনা খায় মানুষজন।
টিভিতে দেখি দূরের প্রাণীদের জীবনযাপন।
বরফের মাঠ পাড়ি দিচ্ছে মা আর বাচ্চা ভাল্লুক। চারিদিক সাদা। জলদি সবুজ ঘাসে ভরা জায়গায় যেতে হবে। নইলে না খেয়ে থাকতে হবে। শীতে কষ্ট হবে। বড় একটা বরফে ছাওয়া দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে গেল মা ভাল্লুক। উপরে বড় চওড়া পথ। তারপরই খানিক গেলে ঘাসের নিঝুম ভূমি।
পিচ্চি খোকা ভাল্লুকটা যে কিনা দেখতে খেলনা একটা টেডি বিয়ারের মত সে পারছে না। অনেক পথ বেয়ে উঠে। তারপর হর হর করে পিছলে নেমে যায় নীচে। আবার চেষ্টা করে। আবার পরে যায়। উপরে মা ভাল্লুক কি সব বলে সাহস দিচ্ছে খোকাকে।
ও চেষ্টা করেই যাচ্ছে। একবার তো শেষ মাথার মাত্র এক বিঘৎ বাকি তখন পরে গেল। মা থাবা মেরে ধরতে চেয়েছিল। কিন্তু ওদের তো আমাদের মত আঙ্গুল নেই।
আমি প্রায় হতাশ হয়ে যাচ্ছি। কষ্ট পাচ্ছি, তখন আটবারের বার খয়েরি রঙের খোকাটা উঠে গেল উপরে।
মা সামান্য বকুনি দিল। খুশির বকুনি। মা হাঁটতে লাগল। সে রাস্তা চেনে তো। বাবুটা টালুমালু পায়ে অনুসরণ করলো মা-কে। খুশি।
আমিও খুশি। আবার খচ করে উঠলো বুকের ভেতরে। সামনে অন্য কোথাও অন্য কোনখানে রাইফেল হাতে উজবুক কোন শিকারি অপেক্ষা করছে না তো ?
এই মুহূর্তে পৃথিবীর অবস্থা কি ?
কেমন আছে সেই মায়াবী ঘাসফুল, গোবরে পোকা, সুন্দর ছোপ দেয়া শামুক ?
ওরা কেউ ভাল নেই।
বিজ্ঞানীরা বলেন গত চল্লিশ বছরে পৃথিবী অর্ধেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জুওলজিক্যাল সোসাইটি অভ লন্ডন একই কথা বলে। আর এর জন্য দায়ী আমরা।
তুমি, আমি। আমরা সবাই। আমাদের দোষে হারিয়ে যাচ্ছে ঘাসফড়িং, মিষ্টি পাখী, সুন্দর গুল্ম।
লক্ষ লক্ষ টন আবর্জনা তৈরি করছি আমরা। প্রতিদিন। সব গিয়ে পরছে সাগরে।
প্লাস্টিক বানানোর মূল উপাদান হচ্ছে- প্রকৃতিক গ্যাস আর তেল। এটাকে তুমি পোড়াতে পারবে , ছিঁড়তে পারবে, ভেঙ্গে ফেলে দিতে পারবে। কিন্তু আর সব প্রকৃতিক উপাদানের মত পচে যাবে না ওটা। যেমন পচে যায় বাসি পাউরুটি।
আনুমানিক হিসাবে আমরা ৬.৩ বিলিয়ন টন প্লাস্টিক বানিয়েছি। মানে উৎপাদন করেছি। মাত্র ৯% পুনব্যাবহার করেছি। তো, হিসাবে ৪.৯ বিলিয়ন টন ময়লা বাতিল প্লাস্টিক জমা করেছি আমরা। দুনিয়ার সব ময়লা বাতিল প্লাস্টিক এক জায়গায় জমা করলে সেইগুলো মিলে হিমালয় পাহাড়ের চেয়ে উচু হয়ে যাবে ।
ঘুরে ফিরে সব প্লাস্টিক সাগরে গিয়ে পরে।
শুধুমাত্র প্লাস্টিক ব্যাগের জন্য প্রতিবছর ১০ লাখের বেশি সামুদ্রিক মাছ, কচ্ছপ আর ডলফিন মারা যায়। জেলিফিস মনে করে প্লাস্টিক ব্যাগ খাওয়ার চেষ্টা করে কচ্ছপ। তখনও মারা যায়।
একটা প্রমান্য চিত্রে দেখেছি- বিজ্ঞানীরা কচ্ছপ ধরে দেখেছেন ওদের চোখে বা কপালে ঢুকে গেছে প্লাস্টিকের স্ট্র । ব্যাথায় কষ্ট পেয়ে মারা যাচ্ছে ওরা।
প্রতিদিন হাজার হাজার স্ট্র গিয়ে পরছে সাগরে। আজকাল আমরা বোতলের জল ও স্ট্র দিয়ে পান করি। কি কাণ্ড !
আমেরিকার কয়েকটা প্রতিষ্ঠান ঠিক করেছে , ওরা কাগজের স্ট্র ব্যবহার শুরু করবে। করছেও। সমুদ্র থেকে বিশেষ ভাবে ডিজাইন করা জাহাজ দিয়ে সংগ্রহ করা হচ্ছে প্লাস্টিক আর বোতল।
সাগরে ফেলে দেয়া হচ্ছে অদ্ভুত রকমের ময়লার বিন। যাতে আটকে থাকবে প্লাস্টিক। সেই বিন তুলে আনা হবে প্রতি সপ্তাহে।
ভাঙ্গা কাচের বোতল মেশিনে দিয়ে গুড়ো করে বালি বানানো হচ্ছে। একটা বিয়ারের বোতল ২০০ গ্রাম বালি বানাতে পারে।
বিয়ার বা কোমল পানীয়ের টিনগুলো ছয়টা করে প্লাস্টিকের রিঙে আটকে বিক্রি করে। এই রিঙকে বলে সিক্সপ্যাক রিঙ। খদ্দেরের নিতে সুবিধে হয়। এই রিঙের সাথে আটকে মারা যায় সাগরের প্রাণী।
সল্টওয়াটার নামে এক কোম্পানি বিয়ারের জন্য এই রিঙ বানাচ্ছে গম আর বার্লি দিয়ে। শক্ত।প্লাস্টিকের মতই। সাগরে পরার পর বিস্কুটের মত সেগুলো কামড়ে খায় মাছ আর কচ্ছপেরা।
প্রতি বছর ১০০ কোটি বাতিল টুথব্রাশ ফেলে দেয়া হচ্ছে। সবই প্ল্যাস্টিক আর নাইলনের তৈরি। এই বাতিল ব্রাশ পরিবেশ নষ্ট করে।
সুইডিশ এক কোম্পানি বাঁশ দিয়ে টুথ ব্রাশ বানাচ্ছে । এক কোটি ব্রাশ বিক্রি হচ্ছে বছরে।
ওভারফিশিং আর সাগর দূষণের জন্য টুনা, হেরিং,ম্যাকরেলের মত হাজার পদের মাছ হারিয়ে যাচ্ছে।
আনুমানিক ২০৪৮ সালে সারা দুনিয়ার মাছ ধরার সব কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাবে। বিপদে পড়বে হাজার সি-ফুড রেস্টুরেন্ট। নতুন আইন করা হচ্ছে কোন- কোন মৌসুমে কোন মাছ ধরা যাবে বা কি পরিমাণ ধরা হবে।
সোর্ড ফিস আর টুনার মত মাছ বিক্রি করতে হলে লাইসেন্স নিতে হবে আলাদা করে।
গুড ক্যাচ নামে একটা সি-ফুড কোম্পানি ছোলা , সয়াবিন, মটরশুঁটি, ডাল, শিমের দানা, আর শাদা রঙের নাভা মটরশুঁটি, সাগরের শ্যাওলা, তেল, লবণ দিয়ে কৃত্রিম ভাবে টুনা মাছের ফালি বানিয়ে বাজারে ছেড়েছে। স্বাদ বিলকুল টুনার মত। পুষ্টিগুন ও রয়েছে পরিমাণ মত ।
বাতিল হয়ে যাওয়া টায়ার কুচি করে সেইসব দিয়ে বানানো হচ্ছে বাচ্চাদের খেলনা।
আর এর মধ্যে দারুন এক কাণ্ড করেছে অ্যাডিডাস কোম্পানি। ওরা সাগর থেকে তুলে আনা বাতিল প্লাস্টিক দিয়ে বানিয়েছে দারুন রকমের জুতো। ইতিমধ্যে সেই জুতা দশ লক্ষ জোড়া বিক্রিও করে ফেলেছে।
আমরা যদি একটু সচেতন হই তবে বেঁচে থাকবে ওরা। আরও অনেকগুলো বছর। আমাদেরও করার আছে অনেক কিছু। চেষ্টা করলে তুমি ও হতে পার একজন ন্যাচার লাভার। প্রকৃতি প্রেমিক।
গাছপালা বা প্রকৃতির সাথে মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত পার করলেই দেখবে সারাদিনের ক্লান্তি অবসাদ চলে যাবে। শরীরের কোষ নতুন করে কাজ করা শুরু করবে।
হাঁটতে গিয়ে শুধু দালানবাড়ি না দেখে পথের ধারে কাঠবাদাম গাছটা দেখ। ওর তামার মত লাল পাতা দেখে অবাক হবে। অবাক হবে চালতা গাছের ফুল দেখে, কেমন ফ্লাইং সসারের মত সেই ফুল।
প্রকৃতির এই পাঠ নেয়ার জন্য তোমাকে গহীন বনে যেতে হবে না। পাহাড়ে গিয়ে ক্যাম্পিং করতে হবে না। মাথায় টুপি আর হাতে আতশি কাচ নিয়ে রোদে মেঘে ভিজতে হবে না। শুধু চোখ কান খোলা রাখলেই হবে।
বিভূতিভূষণ বলেছেন- "অচেনার আনন্দকে পাইতে হইলে পৃথিবী ঘুরিয়া বেড়াইতে হইবে,তাহার মানে নাই।’’
প্রকৃতির কাছে আসলেই চোখ মেলে দেখবে। কান পাতবে ।
শুনতে পাবে প্রকৃতির হিজিবিজি কথা। নিমপাখীর ডাক, ঘাসফড়িঙের বিনবিন পাখার শব্দ। খড়ের বাসায় পাখীর নীলচে ডিম।
বাতাস কেমন ভিন্ন সুরে বয়ে যায়। পোকা মাকড়ের ডাকও কি মায়াবী। গাছের গুড়িতে অচেনার মশলার মত জন্মে আছে ছোপ ছোপ সবুজ শ্যাওলা। বাওকুড়ানি হাওয়ায় ভেসে যায় ঘাসের দানা।
পথের ধারের পাঁচটা বুনো ফুল বা গাছ যদি চিনতে পার বুঝবে তুমি প্রকৃতি ভালবাস।
ওরাও তোমাকে ভালবাসে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন