ছুটি ছিল এক মাস ।
গরমের ছুটি ।
হাওয়াই মেঠাইয়ের মত মিলিয়ে গেল সময়টা ।
ছুটি শেষ হতেই ভানটু যখন ইশকুলে গেল, প্রথমেই দেখা হল পুনম টিচারের সাথে।
বেশিদিন হয়নি এই ইশকুলে এসেছেন পুনম টিচার । প্রায় নতুনই বলা যায় । চোখে গোল গোল চশমায় বেশ দিদিমনি মার্কা একটা ভাব আছে উনার।
'ছুটি কেমন গেল ভানটু ?' লাইব্রেরি রুমে ভানটুর সাথে দেখা হতেই জানতে চাইলেন উনি । ' তোমারকে যে হোম ওয়ার্ক দিয়েছিলাম শেষ করেছ ?'
'হোম ওয়ার্ক শেষ করার সময় পাইনি টিচার।' মন খারাপ করা গলায় বলল ভানটু ।
'কেন ?'
'বললে হয়তো আপনি বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু সত্য । আমার এইবারের গরমের ছুটিটা ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য আর রোমাঞ্চকর । কিন্তু কাউকে বলতেও পারছি না।‘
‘কারণ?’
‘কেউ বিশ্বাস করবে না ।‘
‘আচ্ছা বল শুনি ।‘
ভানটু বলতে লাগল ।
‘ আপনি তো ইলিশমারি নদীটা চেনেন ?
প্রচুর ইলিশ ধরা হয় বলে ওটার অমন নাম । আমাদের দেশের সব নদীতে ইলিশ পাওয়া যায় না। মাছ পাওয়া না পাওয়ার সঙ্গে অমাবস্যা-পূর্ণিমা, জলের গতি, ঘোলাত্ব এবং বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক কারণ জড়িত থাকে। শুনেছি পূর্ণিমা রাতে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে । আর ইলিশ মাছ বৃষ্টি খুব পছন্দ করে । ইলশেগুড়ি বৃষ্টি শুরু হলেই নদীর জল খলবল করে গিয়ে মেশে সাগরের মোহনায় । তখন ইলিশ ডিম পাড়ার জন্য পাগলের মত মিষ্টি জলে চলে আসে । ইলিশ প্ল্যাঙ্কটোনভোজী। নীল-সবুজ শৈবাল, ডায়াটম, ডেসমিড, কোপিপোড, রটিফার এই সব খেয়ে বাঁচে ।
সেইজন্য ইলিশের স্বাদ এত চনমন করা ।
অক্টোবর মাসের পূর্ণিমা রাতে সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে । সেই ইলিশ চক্রাকারে সাজিয়ে বরফের কুঁচি দিয়ে চলে যায় আবার রামচন্দ্রপুরের ঘাঁটে । সেখান থেকে দেশের সারা জেলায় । বিদেশেও যায় । সুইডিশ ভাষায় ইলিশকে বলা হয় হিনডিস্ক স্টাকসিল।
বাংলাদেশের ডাকটিকিটে সেই ১৯৭৩ সালের ৩০ এপ্রিল প্রথম ইলিশ মাছ দিয়ে ডাকটিকিট বের করেছিল । গোলাপি রঙের এই টিকিটটার দাম ছিল পঞ্চাশ পয়সা ।
যাই হোক আসল কথায় আসি ।
ইলিশমারি নদীর পাড়ে গিয়েছিলাম হাঁটতে ।
ইচ্ছা, ভাল কোন শামুক পেলে বাসায় এনে সাজিয়ে রাখব ।আর ঝিনুক পেলে ছিদ্র করে কাইতন দিয়ে গলায় পড়ব , তাহিতি দ্বীপের আদিবাসীরা যেমন করে । পেলাম না। আগের মত শামুক ঝিনুক নেই । কমে গেছে ।কিছু মানুষ আবার শামুক ঝিনুক পুড়িয়ে চুন বানিয়ে বিক্রি করে । ব্যাপারটা খুব খারাপ ।
শামুক ঝিনুক কমে যাওয়া পরিবেশের জন্য খুবই খারাপ ।
আচমকা দেখি, নরম বালির উপর পড়ে আছে একটা পুরানো দিনের গোলগাল বোতল । মুখটা কর্কের ছিপি দিয়ে আটকানো। ভেতরে হলুদ হয়ে যাওয়া কেমন তুলট একটা কাগজ । দেখেই বুঝতে পারলাম দামি কিছু আছে ।
হয়তো গুপ্তধনের নকশা ।
নদী বা সাগর তীরে অমন কাচের বোতল পেলে সেটা মোটেও হেলাফেলা করার জিনিস না। আজও বিজ্ঞানীরা সাগরের স্রোতের দিশা বের করতে অমন বোতলের ভেতরে মেসেজ লিখে সাগরে ফেলে দেয়। ভেতরে কাগজের মধ্যে লেখা থাকে, বোতলটা পেলে যেন অমুক ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। সামান্য পুরস্কারের লোভ দেয়া থাকে।
লোকজন পাঠিয়ে দেয় ।
সেই বোতলের ভেতরের কাগজ পেয়ে, বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারে বোতলটা ভেসে ভেসে কতদূর পর্যন্ত গিয়েছে । সাগরের স্রোতের দিশা পাওয়া যায় তখন ।
এই যে বোতল গুলি পাওয়া যায়, সবসময় যে টাটকা বোতল পাওয়া যায় তাও না। অনেক অনেক পুরনো বোতল ও পাওয়া যায় ।
২০১৮ সালে, অস্ট্রেলিয়ার এক পরিবারের সব সদস্য পার্থের এক সৈকতে পিকনিক করতে গিয়ে একটা বোতল পায় । বোতলটা সাগরে ফেলার ১৩২ বছর পর পেয়েছেন তারা । বিজ্ঞানীরা ভালো মত পরীক্ষা করে দেখে বলল , জার্মান জাহাজ, বার্ক পলা থেকে থেকে ফেলেছিল বোতলটা। তাও আবার ১৮৮৬ সালের ১২ জুন মাসে ।
ভাবা যায় ?
কারণ ? কেন ফেলা হয়েছিল ?
ঐ যে বললাম ।
মহাসাগরের স্রোতগুলির বয়ে যাবার পথ আরও ভালভাবে বুঝতে । এবং আরো দক্ষ শিপিং রুট খুঁজে পেতে সমুদ্রবিজ্ঞান পরীক্ষার অংশ হিসাবে ফেলা হয়েছিল এই বোতলগুলো ।
আবার ২০১৩ সালের মার্চে, একজন জার্মান জেলে , বালটিক সাগরের কিল উপকূলে একটা বোতল খুঁজে পান। বোতলের ভিতরে ছিল রিচার্ড প্লাটজ নামে একজনের লেখা পোস্টকার্ড। এবং তারিখ ছিল ১ ৭ ই মে, ১৯১৩ সাল ।
এই কিছুদিন আগে নরওয়ের একটা সোডা কোম্পানি অনেকগুলো বোতলে তাদের কোম্পানির ছবিওয়ালা কুপন ভরে সাগরে ফেলে দিয়েছিল। বলা হয়েছিল যারা এই বোতল গুলি পাবে, ভেতরের সেই কুপণ নিয়ে স্থানীয় দোকানে হাজির হলেই এক বাক্স করে সোডা পাবে। এটা ছিল বেশ অন্য রকম একটা বিজ্ঞাপন ।
বেশ মজার তাই না ?
বোতলের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীনতম বার্তা গ্রীক পাঠিয়েছিলেন দার্শনিক থিওফ্রাস্টাস , যিনি এরিস্টটলের অন্যতম ছাত্র। তিনি অনুমান করেছিলেন , আটলান্টিক মহাসাগর গিয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রবাহিত হয়। সেই পরীক্ষার অংশ হিসাবে বোতলের ভেতরে চিরকুট ভরে সাগরে ফেলে দেন ভদ্রলোক ।
এমনকি টাইটানিক জাহাজ ডুবে যাবার সময় ও এক যুবক বোতলে ভরে মেসেজ ফেলে দেয় সাগরের জলে । মেসেজে লেখা ছিল - "টাইটানিক থেকে, সবাইকে বিদায়, বার্ক অফ গ্লানমায়ার, কর্ক।"
‘ বাহ সাগরে ভেসে যাওয়া এসব বোতল নিয়ে তো অনেক কিছু জানো তুমি ! খুশি খুশি গলায় বললেন পুনম টিচার ।
‘ সে আর বলতে । বোতলের ইতিহাসে বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হবে । আমার এত কথা বলার সময় নেই। আমি সংক্ষেপে আমার ছুটির ব্যাপারটা বলছি।‘ বলল ভানটু ।
‘হ্যাঁ তাই বল ।‘ সায় দিলেন পুনম টিচার ।
‘ বোতলটা হাতে নিয়েই বুঝেছি , ওটার ভেতর গুপ্তধনের নকশা আছে। হলুদ হয়ে যাওয়া তুলট একটা কাগজ । কী সব আঁকিবুঁকি আঁকা । ছিপি খুলতে যাব , ওমা কোত্থেকে একটা সবুজ রঙের দাঁড় কাক এসে ছো মেরে আমার বোতলটা নিয়ে গেল।
আমি কি করবো ? আমি কি ছেড়ে দিতে পারি ?
আমিও দৌড় দিলাম ওর পিছে পিছে ,। যে কোন ভাবেই হোক পাখিটা ধরতে হবে । ওর মুখের মধ্যে তখন গুপ্তধনের নকশা ভর্তি বোতলটা।
পাখিটার পিছন পিছন আমি দৌড়ে গেলাম একদম বন্দরে শেষ পর্যন্ত । বন্দরে শেষ মাথায় ছিল একটা পালতোলা জাহাজ। পাখিটা গিয়ে ওই জাহাজের মাস্তুলের বসলো । আমিও তক্তা বেয়ে উঠলাম। ভাবতে ও পারিনি, সেটা ছিল জলদস্যুদের জাহাজ। ওরা মাত্র লুটপাট করে এখানে এসে নেমেছে । আমাকে দেখে মোটেও খুশি হলো না ওরা। হয়তো আমাকে রয়েল নেভির গুপ্তচর ভেবেছিল।
আর কে না জানে রয়্যাল নেভির লোকজন যদি ওদের ধরতে পারে তবে সাথে সাথে ফাঁসি দিয়ে দেবে । জলদস্যুদের সবাই খোলা তলোয়ার , যেটাকে কবি সাহিত্যিকরা নাঙ্গা তলোয়ার বলে, নিয়ে আমাকে ধাওয়া করলো ।
ওদের সরদারকে আমি চিনে ফেললাম। এক চোখে পট্টি বাঁধা । কানে পিতলের দুল । গাল ভর্তি লাল গিজগিজে দাঁড়ি । সম্ভবত ক্যাপ্টেন রেড বিয়ারড হবে ।
বাকি সব জলদস্যু দেখতে বেশ কুৎসিত । এঁকে তো জামা কাপড় কাচে না। ময়লা । মুখের দাঁত নেই কারও । সেটার কারণ সাগর যাত্রায় তাজা সবজি খায় না ওরা । পাবে কোথায় ?
ভিটামিনের অভাবে স্কার্ভি রোগে টপাটপ করে মুখের সব দাঁত খসে যায় পাকা ফলের মত ।
প্রাণ বাঁচাতে আমি ঝাপিয়ে পড়লাম নদীর জলে। ভীষণ ঠাণ্ডা জল ।
সাঁতার জানি ভালই । বেঁচেই যাব । কিন্তু সে দিনটা ছিল আমার জন্য খুব খারাপ একটা দিন । তৎক্ষণাৎ আমি গিয়ে পড়লাম ক্ষুধার্ত এক স্কুইডের মুখে। যেমন তেমন স্কুইড না । একদম জায়ান্ট স্কুইড।
স্কুইড এর হাত থেকে তো বাঁচার কোন উপায় নেই । ওরা বড় বড় হাঙর আর অন্য স্কুইড পর্যন্ত কপকপ করে গিলে ফেলে । বেশি খিদে পেলে নিজেরা নিজেদের খায় । কী ভয়ংকর ! আমিতো নিতান্ত পিচ্চি একটা মানুষ ।
বড় বড় গোল্লা গোল্লা চোখে স্কুইডটা দেখছিল আমাকে।
নিজের মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়ে গেলাম । হায় জীবন এত ছোট কেন ?
স্কুইড এর চোখ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চোখ। একটা চোখ একদম রেস্টুরেন্টের ডিনার প্লেট এর মত বড় । আর তিনটা করে হৃদপিণ্ড আছে এই পাঁজি প্রাণীটার ।
জায়ান্ট স্কুইড কত বড় হয় আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের কাছে সেটা একটা রহস্য ! ৪০ থেকে ৮0 ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। কিন্তু এখনও শিওর না । বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেক তর্ক বিতর্ক হয়েছে । এবং প্রতি বছরই নানা ধরনের বিশাল বিশাল সাইজের স্কুল ধরা পড়ছে।
মারাই যেতাম। কিন্তু তখনই পাশে ভেসে উঠলো লোহার তৈরী একটা পেল্লাই সাইজের সাবমেরিন।
সাবমেরিনটা দেখে ভয় পেয়েছিলাম ।
কি রকম পুরনো দিনের লোহার জং ধরা মনে হচ্ছে। কিন্তু আসলে ডিজাইনটা একটু পুরনো দিনের ।
সাবমেরিনের ভেতর থেকে দুইজন লোক বেরিয়ে এসে কুড়াল হাতে তেড়ে আক্রমণ করে বসলো জায়ান্ট স্কুইডটাকে । দানব স্কুইডটা কালি ছিটিয়ে একটু পিছিয়ে যেতেই লোকদুটো আমাকে উদ্ধার করে ভেতরে নিয়ে গেল।
ভেতরে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম ।
আচ্ছা , তাহলে এই ব্যাপার । এইজন্যই আমার কাছে সাবমেরিনটাকে চেনা চেনা লাগছিল !
ক্যাপ্টেনকে দেখেই চিনতে পারলাম।
উনার নাম ক্যাপ্টেন নিমো ।
যারা জুল ভারন সাহেবের ' টুয়েন্টি থাউজ্যানড লীগস আন্ডার দ্য সি' বইটা পড়েছে তাদের কিন্তু এই ক্যাপ্টেনের চেনার কথা।
লোকটা গম্ভীর । গালভর্তি শাদা দাড়ি । মাথায় একটা ক্যাপ্টেন টুপি । শাদা এক ধরনের পোশাক গায়ে আছেন । ওটাও জাহাজি পোশাক ।
সামনের টেবিলে অনেকগুলো ম্যাপ আর কাটা কম্পাস ।
সেগুলো দিয়ে কি সব হিসেব করছেন। পাশের টেবিলে সমুদ্রের শেওলা দিয়ে বানানো সালাদ ।
হাঙরের চোয়াল দিয়ে বানানো কাটা চামচ দিয়ে সেই সালাদ তুলে তুলে অন্যমনস্ক ভাবে খাচ্ছেন তিনি ।
ক্যাপ্টেনের রুমটা দেখার মত !
কী নেই ওখানে ?
দেওয়ালে বেশ কয়েকটা পেইন্টিং, তেল রঙে আঁকা । সাগরের বিচিত্র মাছ , তিমি, হাঙ্গর এই সবের ছবি । শিল্পী অনেক যত্ন করে এঁকেছে । একটা মায়াবী নিঝুম বন্দরের ছবিও দেখলাম । ঘন নীল রঙ্গের আলো জ্বলছে উপর থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় ।
পাশের দেওয়ালে গোল কাচের জানালা । বাইরে সাঁতার কেটে যাচ্ছে নানা রকমের রংবেরঙের মাছ।
এক পাশের দেয়ালের আলমারিতে প্রচুর বই । কয়েকটা বই চিনতে পারলাম । মৎস্য চাষ চিংড়ি চাষ এ ধরনের বই। কে জানে এসব বই পড়ে উনি কি করেন ? বেশিভাগই ক্লাসিক বই দেখলাম । ভালো কোনো গোয়েন্দা বা কিশোর উপন্যাস দেখতে পেলাম না । দুইটা মাত্র বাংলা বই আছে। রবীন্দ্রনাথের নৌকাডুবি আর সোনারতরী ।
ব্যাপারটা খুব খারাপ।
কামরার মেঝেতে সুন্দর নীল রঙের কার্পেট বিছানো । ওখানে আবার তারা মাছের ছবি । সব মিলিয়ে ক্যাপ্টেন রুমটা আমার পছন্দ হল।
কিন্তু উনি কোন কথা না বলে আমাকে কাজে লাগিয়ে দিলেন ।
আমার কাজ রান্নাঘরে মাছের নাড়িভুঁড়ি পরিষ্কার করা। ঝিনুকের খোসা পরিষ্কার করা। আর সাগর শসা দিয়ে আচার বানানো। ভাগ্যকে মেনে নিলাম ।
বানাতে গিয়ে দেখলাম , সাগর শসার আচার বেশ মজার জিনিস । মালয় দ্বীপের আদিবাসিদের রেসিপি অনুয়ায়ি বানানো হয় ওটা । শাদা চিনি , ভিনেগার , লবণ , ছোট গাজর , আদার কুঁচি , লবঙ্গ , তেজপাতা , পেঁয়াজের কুঁচি আর গোল মরিচ লাগে ।
নটিলাসে আমরা যা খেতাম তা হচ্ছে সামুদ্রিক সাপের মাংসের ফালি। পাফার মাছ যেটাকে পটকা মাছ বলে সেটার ভাঁজা। অক্টোপাসের পুডিঙ । স্পারম হোয়েলের দুধ । এমনকি সাগরের শেওলা দিয়ে বানানো সিগার দিয়ে ধূমপান করেন নিমো ।
বেশ কয়েকবার ইচ্ছে হয়েছিল ক্যাপ্টেন নিমো সাথে কথা বলব ।
কিন্তু উনি সভ্য মানুষের উপর খুব বিরক্ত , তাই কথা হয়নি। বেশিরভাগ সময় দেখতাম বসে বসে বই পড়ছে,।নানা রকম বই । তার মধ্যে শেক্সপিয়ারের নাটক ও দেখতে পেয়েছি।
সাগর এবং মহাসাগরের স্রোত নিয়ে অনেক ম্যাপ আছে উনার কাছে ।সময় পেলে উনি বসে বসে দেখেন সেইসব । উনার রুমে একটা ভূগোলক দেখেছি সেটাও তিমি মাছের হাড়ের তৈরি।
মহাদেশ আর দেশগুলো নানান রকম রঙ্গিন প্রবাল দিয়ে আলাদা চিহ্ন করা ।
সাগর ভালবাসেন উনি । সাগর বিশাল । জীবনের মতই বিশাল । সাগর মহাসাগর নিয়ে উনার অগাধ জ্ঞান ।
তিমি মাছেরা কোন মৌসুমে ক্রিল খেতে যায় সেটা ও জানেন।
উনার মুখ থেকেই অশ্ব অক্ষাংশর ব্যাপারে জানতে পারলাম । সেই প্রাচীনকালে, পালতোলা জাহাজের আমলে স্পেন থেকে জাহাজ ভর্তি করে ঘোড়া নিয়ে যাওয়া হত আমেরিকায় । সাগরের এই এলাকাতে বাতাস এত কম থাকতো যে পালতোলা জাহাজ নড়তে চড়তে পারতো না সহজে । তখন জল আর খাবারের অভাবে ঘোড়াগুলোকে সমুদ্রের ওই জায়গায় ফেলে দিত নাবিকেরা । সেই থেকেই নাম হয়েছে অক্ষ অক্ষাংশ।
নটিলাসে কিন্তু আমাদের খাবারের কোন অভাব হতো না ।
সমুদ্র থেকে নানারকম মাছ শেওলা এসব ধরে খাওয়ার আয়োজন হতো। বিচিত্র এবং মজার দিনগুলি হয়তো এভাবে কেটে যেত।
আমিও ভেবেছিলাম বাকি জীবন হতো ক্যাপ্টেন নিমোর সাথে অতল মহাসাগরের তলায় ঘুরে বেড়াতে হবে ।
কিন্তু না ।
একদিন টাটকা বাতাস নেওয়ার জন্য সাবমেরিনটা ভেসে উঠলো ।
সাবমেরিনের হ্যাচ খুলে মুক্ত বাতাস নেওয়ার জন্য মাত্র মাথাটা বের করেছি, ওমনি মাথায় উপর এক বালতি ময়লা ঢেলে দিল কেউ।
আসলে একটা ব্রিজের তলায় এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের সাবমেরিন । ব্রিজের উপর ছিল একটা চায়ের দোকান । বাতিল চায়ের পাতা সব একটা বালতিতে করে উপর থেকে ফেলছিল দোকানদার । অমন উজবুকদের জন্যই আজকাল নদী সাগর দুষিত হয়ে যাচ্ছে । রাগে কিছু বলতে যাব অবাক হয়ে দেখি আমরা কিভাবে যেন পুরোনো দিনে ফিরে গেছি । সবাই পুরানো দিনের মত কাপড় পরে হাঁটছে, দুই চারটে কচ্ছপ মার্কা গাড়ি । কলের গান বাজছে একটা চায়ের দোকানে।
'সেটা কিভাবে সম্ভব ? ' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন পুনম টিচার ।
' সব কিছু পুরনো লাগলেও আসলে এটা সিনেমার শুটিং চলছিল । একটা স্টেজ বানানো হয়েছে একদম পুরানো দিনের মত করে । সবামেরিন থেকে নেমে পড়লাম । কারণ দেখি সেই সবুজ কাকটা সেখানেই ঘুরঘুর করছে । কাকের মুখে সেই বোতল , যার ভেতরে গুপ্তধনের নকশা।
আমাকে দেখি সবুজ কাকটা উড়াল দিল।
কী করবো বুঝতে পারছি না।
তখন দেখি দূরে এক ভদ্রলোক বেলুনে করে উড়তে যাচ্ছেন।
জিজ্ঞেস করে জানলাম উনার নাম নাকি ফিলিয়াস ফগ । উনার চাকর প্যাসপারতুকে নিয়ে আশি দিনে বিশ্বভ্রমণ এর জন্য বের হয়েছেন । রিফর্ম ক্লাবের সদস্যদের সাথে বিশ হাজার পাউনড বাজি ধরেছেন ।
জানতে চাইলাম আমাকে সাথে নেয়া যাবে কিনা ?
উনি জানালেন বেলুনে করে যাবেন না। বাতাসের গতির যে অবস্থা তাতে সাগর পাড়ি দিতে পারবেন না। তাছাড়া জুলভারন সাহেব ‘ বেলুনে পাঁচ সপ্তাহ’ নামে আরেকটা বই লিখে ফেলেছে । কাজেই আমি চাইলে বেলুনটা নিয়ে নিতে পারি ।
উঠে পড়লাম ।
বেলুন আকাশে উঠে চঞ্চলা বাতাসে ভাসতে লাগল । চললাম মেঘের ছায়ায় ছায়ায় ।
আচমকা সবুজ কাকটা এসে ওর পায়ের নখ দিয়ে আমাদের বেলুনের উপরটা ফুটো করে দিল।
হুউউস করে বাতাস বের হতে লাগল । বেগ সামলাতে না পেরে আমি ধপাস করে নিচে পরে গেলাম । ভাগ্য ভাল মাত্র কয়েক হাত নিচেই ছিল মরুভূমির নরম বালি ।
নরম বালির কারনেই শরীরের দুইশ ছয়টা হাড়ের মধ্যে একটাও ভাঙ্গল না ।
আরও ভাগ্য ভাল । পাশেই পড়লো কাচের বোতলটা । বোতলটা বগলে নিয়ে উঠে হাঁটতে লাগলাম ।
তাকিয়ে দেখি সামনে পিরামিড দেখা যাচ্ছে ।
ভাবা যায় ?
হেঁটে পিরামিডের ভেতর ঢুকে পরলাম । কাজটা ভালো করিনি । হাজার বছর ধরে ঘুমাচ্ছিল কিছু মমি । সম্ভবত আমার নড়াচড়ায় ঘুম থেকে উঠে আমাকে ধাওয়া করলো । প্রাণভয়ে দৌড়াতে লাগলাম । ওদের সাথে শেয়াল মাথা দেবতা ছিল আনুবিস থাকায় বেশি ভয় পেয়েছি।
প্রখর তাপে মরুভূমির বালি গরম হয়ে আছে । অনেকটা বাদাম ভাজা কড়াই এর মত। ওর মধ্যে দিয়ে দৌড়াচ্ছি ।
পিছন পিছন দৌড়ে আসছে সেই ভয়াল দর্শন মমিগুলো ।
আমাকে ধরেই ফেলত প্রায় ।
আকাশে বিকট কিসের শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখি একটা কেমন স্পেসশিপ নিয়ে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে আমাদের মহল্লার আবু বক্কর আঙ্কেল । উনি পুরনো লোহার ব্যবসা করেন । এবং অবসর সময়ে সেসব বাতিল লোহা লক্কড় ঝালাই দিয়ে স্পেসশিপ বানানোর চেষ্টা করেন । আইজাক আসিমভের অনেক অনেক বই পড়ে উনার মাথাটা গেছে ।
দেখে অবাক হলাম ।
তার মানে শেষ পর্যন্ত বানিয়ে ফেলেছেন । আসলে চেষ্টায় কি না হয় ?
আবু বক্কর আঙ্কেল উপর থেকে একটা লম্বা তার ফেলতেই সেটা বেয়ে উঠে গেলাম।
তারপর আমাকে নিয়ে চলে গেলেন মহাশূন্যের বাইরে ।
সেখানে বেশ কয়েকটা দিন কাটালাম আমরা ।
ধূমকেতুর নমুনা সংগ্রহ করলাম । ধূমকেতুর মধ্যে কত বিচিত্র ধাতু থাকে সেটা বলার মত না। আঙ্কেল ঠিক করলেন ধুমকেতু ধরে ধরে সেখান থেকে মূল্যবান ধাতু বের করে বিক্রি করবেন । নতুন ধরনের ব্যবসা আর কি ।
আমরা চাঁদ থেকে প্রচুর পাথর আর ধূলা সংগ্রহ করলাম । বিভিন্ন নক্ষত্রের তাপমাত্রা মাপলাম । মঙ্গল গ্রহের নদীগুলো দেখলাম । ওখানে বরফের পরিমাণ দেখে খুশি হলাম । মানুষ যদি মঙ্গল গ্রহে বসবাস শুরু করে তবে শরবতের দোকান দিতে অসুবিধে হবে না। মঙ্গল গ্রহে পুরানো ভাঙ্গা কিছু দালান দেখে বুঝলাম , অনেক অনেক আগে এখানে সভ্য মানুষ ছিল ।
ওরা চলে গেছে অন্য কোথাও ।
আরও ঘুরতাম ।
কিন্তু আচমকা স্পেসসিপের জ্বালানি শেষ হতেই আঙ্কেল আবু বক্কর আমাকে পৃথিবীতে এনে একটা ক্যারাবিয়ান দ্বীপে নামিয়ে দিলেন ।
দ্বীপটা একেবারেই নির্জন । কোন মানুষ জনের বসতি নেই ।
আমার খুব পছন্দ হয়ে গেল । নির্জন দ্বীপে কিভাবে থাকতে হয়, সেটা তো রবিনসন ক্রুসো , সুইট ফ্যামিলি রবিনসন, প্রবাল দ্বীপ এইসব বই পড়ে আগে ভাগেই শিখে গেছি।
টিকে থাকা আমার জন্য খুব একটা কষ্ট হলো না । লেগুনের ভেতর থেকে বড় বড় মাছ ধরলাম । জঙ্গল থেকে ডালপালা যোগাড় করে আগুন জ্বেলে , সে আগুনে ঝলসে খেলাম । বেশ কিছু ঝিনুক আর বড় বড় গলদা চিংড়িও পেয়েছি।
এক জায়গায় বৃষ্টির জল আটকে ছিলো। পিচ্চি একটা ঝর্ণা থাকায় জলের কোন অভাব হচ্ছিল না । ভালোমতন খাচ্ছিলাম।
দিনগুলো হয়তো কেটে যেত । কিন্তু আবার সেই সবুজ কাকটা উড়ে এসে আমার বোতলটা নিয়ে গেল ।'
হতাশ গলায় বলল ভানটু ।
' তুমি কি নিশ্চিত , সেই আগের কাকটাই? অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন পুনম টিচার ।
'হ্যাঁ আমি শিওর এটাই সেই, না চেনার বা ভুল হবার কোন মানেই হয়না।' আত্ন বিশ্বাসের সাথে জবাব দিল ভানটু । ' আমার কোন ধারণা নেই এই পাজী সবুজ কাকটা আমাকে আবার কিভাবে খুজে পেল। তখন আমি সবুজ কাকটার পিছন পিছন ছুটতে লাগলাম।
বললে বিশ্বাস করবেন না , ওর জন্য সারা দুনিয়া আমাকে দৌড়াতে হয়েছিল। প্রথমে একটা ভেলা বানিয়ে ওর পিছনে ছুটলাম। পৌঁছে গেলাম তুরস্কের বাজারে ।
এক দোকানে কার্পেট বিক্রি হচ্ছিল । বিক্রেতা লোকটা জানালো , এই কার্পেট নাকি আলাদিনের কার্পেট । বসে হুকুম দিলেই আকাশে উড়াল দেয় । বিশ্বাস করলাম না। কিন্তু উনি জোর গলায় জানালেন, আলাদিনের পরিবারের লোকজন আজকাল এই ধরনের কার্পেট বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে ।
পকেটে কিছু টাকা ছিল । কার্পেট কিনে নিয়ে বসে দেখলাম সত্যি সত্যি সেটা কাজ ও করছে।
তখন সেই উড়ন্ত কার্পেটে করে আমি সবুজ কাকটার পিছু ছুটলাম । চীনের প্রাচীরের উপর দিয়ে গেলাম । বালটিক সাগরের উপর দিয়ে গেলাম । শেষে এমনকি হিমালয়ের উপরে পৌঁছে গেলাম।
হিমালয়ের উপরে বড় বড় গুহার সামনে পাথরের টেবিলের উপর কয়েকটি ইয়েতি বসে বসে রুন খাচ্ছিলো । রুন হচ্ছে এক ধরনের শেওলা । এই রুন খেয়ে বেঁচে থাকে এরা । একটা ইয়েতি থামা মেরে কাকটাকে ধরে ফেলল । কাকের মুখ থেকে বোতলটা নিচে পরে যেতেই আমি সেটা ধরে ফেললাম দুই হাতের মুঠোয় ।
কিন্তু আমার জাদুর কার্পেটটা পাথরের ঘষা খেয়ে ছিদ্র হয়ে গেছে। আর কাজ করছে না । তখন মনে পড়লো আমার আবু বক্কর আঙ্কেল আমাকে জেট প্যাক দিয়েছিল । পিছনে বেঁধে নিলাম স্কুল ব্যাগের মতো । সেটা চালু করতেই উড়ে গেলাম আকাশে ।
এবার ম্যাপ দেখে সেই গুপ্তধনের জায়গায় যেতে আর দেরি কিসের ? ম্যাপের মধ্যে চিহ্ন করা ছিল কক্সবাজার সৈকতের এক জায়গা। সেখানেই নেমে পড়লাম । সৈকতের একধারে বড় এক পাথরের উপর গুণ চিহ্ন দেয়া । সেখানেই গুপ্তধন । আমি পাশের একটা মুদি দোকান থেকে
বেলচা আর গাইতি কিনে নিয়ে বালি খুড়তে শুরু করলাম ।
আমার চারপাশে তখন লোকজনের বেশ ভিড় জমে গেছে । আমি সবাইকে কথা দিলাম, গুপ্তধন যা পাবো সবাইকে সমান ভাগ করে দেবো । লোকজনের খুশি আর দেখে কে । বেশ কিছুক্ষণ খোঁড়ার পর থং করে কেমন একটা শব্দ হলো ।
ওমা দেখি কাঠের পুরনো দিনের একটা বাক্স ।
সবাই হই হই করে উঠলো ।
বাক্স খুলে দেখি ...যা ভেবেছিলাম তেমন কিছু না । শুধু কেজি পাঁচেক হলুদ রঙের গুঁড়ের বাতাসা । শনিবারে মন্দিরে হরিলুটের সময় যেরকম বাতাসা ভোগ দেয় , সেরকম ।
এ কেমন গুপ্তধন ?
পাশের একটা খ্যাঙরা লোক বলল, দাদা ভাই এগুলি আসলে ভবানী বাবু নামে এক লোক লুকিয়ে রেখেছে । উনি এখানে লুকিয়ে রাখত এবং পরে এসে গোপনে খেত । উনার ডায়াবেটিস ছিল তাই বাড়ির সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে অমন করতো । আমরা অনেক খুঁজেও উনার বাতাসা পাইনি ।
যাই হোক।
কথা যখন দিয়েছি । সবাইকে বাতাসা বিলিয়ে দিলাম।
এই হচ্ছে আমার গুপ্তধন খোঁজার গল্প । কিছুই পেলাম না। কিন্তু আমার মনে হয় গরমের ছুটিটা ভালোই কেটেছে। কারণ পুরনো দিনের কোন এক লেখক বলেছেন, অজানার পথে যাহারা বাইর হয় তাহারা যে অনাবিল আনন্দ লাভ করে , তাহা আর অন্য কিছুতে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না । আর আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আপনি আমার এই গল্পটা বিশ্বাস করছেন না । তাই না ? এই ঝামেলার কারনেই বাড়িতে হোম ওয়ার্ক করতে পারিনি। এখন আপনি যদি হেডমাস্টারের কাছে আমার নামে কোন রকম নালিশ না দেন তবে খুবই কৃতজ্ঞ থাকব।'
কথা শেষ করে মাথা নিচু করে চলে গেল ভানটু ।
পুনম টিচার বসে বসে ভাবতে লাগলেন ।
ছেলেটা বাড়ির কাজ করেনি ঠিকই, কিন্তু এই একমাস যে বাড়িতে থেকে থেকে রাজ্যের বই পড়েছে সেটা কিন্তু প্রমাণ হয় । এবং ওর একটা কল্পনাবিলাসী মন আছে। সেটা সবার থাকে না ।
মনে মনে মুচকি হাসলেন তিনি ।
এবং ঠিক করলেন , হেডমাস্টারের কাছে কোন রকম নালিশ দেবেন না।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন