এক
কেউ বলেনি আমাকে।
অথচ উচিত ছিল।
অন্তত দাদু বলতে পারতেন । তিনিও বলেননি। মরার আগে উনি রসগোল্লা খেতে চেয়েছিলেন। একজন লোক দৌড়ে গিয়ে নবীগঞ্জের বাজার থেকে মাটির হাড়ি ভর্তি পাঁচ কেজি রসগোল্লা নিয়ে এসেছিল।
দাদু টপাটপ করে সব রসগোল্লা আর সিরা খেয়ে আফসোস করে বললেন- ‘ আগের মত খেতে পারি না। বিষ্ণুপদের দোকানের রসগোল্লা আনতে পারলি না ? ওর দোকানের রসগোল্লাগুলো অনেক তুলতুলে আর গরম সিরায় ডুবানো থাকে। একটা কাজ যদি ঠিক মত হত তোদের দিয়ে । ’
তারপর আমার দিকে চেয়ে সতর্ক ভাবে বললেন- নাতি আমাদের বাগানে কিন্তু...।’
কথা শেষ না করেই থাস করে মরে গেলেন।
সেইদিন একটা বিয়ে বাড়ির দাওয়াত ছিল। দাদু মরে যাওয়ায় দাওয়াতটা ভণ্ডুল হয়ে গেল। অথচ কষে খাওয়ার প্ল্যান ছিল। লুচি আর পাঁঠার মাংস।
বাবা কখনও কিছু বলেননি। উনার কথা বলার সময় কই ? সারাদিন ধরে আছেন তাস খেলা নিয়ে। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে দিনরাত তাস পেটাচ্ছেন। চিড়ে, রুইতন, হরতন , টেক্কা এইসব হাবিজাবি শব্দ ছাড়া উনার মুখে ভাল কিছু কখনও শুনিনি। তার উপর মুখ ভর্তি থাকে পান। ব্রনটোসরাসের মত তাই চিবুন সারাক্ষণ। কথা বলতে গেলেই পিচকি পরে জামাকাপড় বাটিকের প্রিন্ট হয়ে যায়।
বাবার সাথে কথা বলাই মুশকিল।
বসে বসে তাস খেলছিল তখন পুলিশ এসে বাবা তার ইয়ার দোস্তদের ধরে নিয়ে গেল। উনারা নাকি নগদ পয়সা দিয়ে জুয়া খেলছিল। যদিও সবাই দাবি করলো বাজারে যাচ্ছিল সওদাই কেনার জন্য । পুলিশ কোন কথাই শুনল না। যাবার সময় বাবা বললেন- জেলে তুই রোজ মুরগির মাংস আর পটল ভাঁজা, শুক্তোর ডাল সাথে পাঁচজনের মাপের ভাত নিয়ে যাবি। নইলে জেল থেকে বের হয়ে তোর গিলা কলিজা বের করে ফেলব।
আমি একদিনও যাইনি।
সেইবার পরীক্ষায় খুব বাজে রেজাল্ট করলাম। প্রায় ফেল বলা যায়। টেনেটুনে পাশ। মা পরামর্শ দিল- গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কয়েকদিন মন দিয়ে পড়তে। নিরিবিলি আছে। আড্ডা ফাডডা নেই।
গেলাম। সাথে দশ কেজি বই।হাফ ডজন কলম। আর যথেষ্ট কাগজ।
একতলা সুন্দরমত পুরানো আমলের একটা বাড়ি। সবুজ রঙের দরজা জানালা। কাঠের ফালি দেয়া ফ্রেঞ্জ উইনডো। ভেতর থেকে বাইরের সব দেখা যায়। বাইরের কেউ ভেতরের কিছু দেখতে পারবে না। সাতরঙা কাঁচের ফালি জানালার উপর । কামরার ভেতরে আলো জ্বললে রামধ্নুর মত দেখায়।
অনেক জায়গা জুড়ে বাগান।
বাড়ির দেয়ালে বড় করে লেখা-
‘ গাঙ্গুলী ভিলা,ওদের ধরে কিলা। ওদের সবার মাথার স্ক্রুপ ঢিলা। ওরা খায় বান্দরের গিলা। ’
ঈর্ষাপরায়ণ দুষ্টু কোন লোকের কাজ।
বাথরুমে পিতলের কল। দুইবেলা জল আসে। ড্রাম ভরে রাখতে হয়।
সেই পিচ্চিবেলায় এসেছিলাম, আবার অনেক বছর পর এলাম।
একাই থাকব। দিনরাত পড়াশোনা করব। দুপুরে নিজেই রান্না করব। ভাত-ডাল। ডিম ভাঁজা্ । হেন তেন ।
প্রথম দিনই বুঝতে পারলাম , খুবই নিঝুম আর নিঃসঙ্গ লাগছে। সেইসময় জেরাল্ড ডুয়েলের বই প্রচুর প্ড়ছিলাম। ভাবলাম একটা পোষা প্রাণী হলে ভাল হয়। ততটা নিঃসঙ্গ মনে হবে না। শহরে ফিরে কাঁটাবনে খোঁজ করতেই একটা পেটশপ পেলাম। নাম- কুত্তা বিলাই ষ্টোর । বড় করে লেখা - যে কোন ধরনের জীবজন্তু, পাখী , আর একুরিয়ামের মাছ সাপ্লাই দেয়া হয়। পাইকারি বা খুচরা ।
দোকানের মালিক গিরিবাজ পাইক খুব সজ্জন ব্যক্তি। উনার চেহারাও কেমন যেন ধনেশ পাখীর মত। মাথা ভর্তি টাক। পেন্সিলের আঁকিবুঁকির মত সামান্য চুল আছে। না থাকলেই ভাল হত খুবই আন্তরিক আপ্যায়ন করলেন।
জিজ্ঞেস করলাম , ‘ কুত্তা বিলাই শপ , দোকানের নাম এত বাজে কেন ?’
‘ চলতি বাংলা রাখলাম স্যার। আজকাল পার্লারের নাম রাখে- রূপের দেমাগ। খাবারের দোকানের নাম রাখে- আমারও পরাণ যাহা চায়। রুটির দোকানের নাম- চাঁদ উঠেছিল গগনে। ’
‘ ঠিক আছে । ঠিক আছে। ।ভাল জাতের কুকুর আছে ?’
উনি হাসি মুখে বললেন- ‘ কি করবেন কুকুর দিয়ে ? বিরিয়ানি খাবেন ?’
‘কুকুর দিয়ে বিরিয়ানি খায় নাকি মানুষ ?’ বিরক্ত হলাম।
‘ খায় স্যার। শেয়াল দিয়েও খায়। অনেকেই আমার কাছ থেকে কুকুর কিনে কোরিয়ানদের কাছে বিক্রি করে। ভাল ব্যবসা। আজকাল দেখবেন রাস্তায় আগের মত কুকুর নেই। শেয়াল বা কাকও কমে গেছে একই কারনে।’
‘ আমাকে দেখে কি বিরিয়ানি লাভার মনে হচ্ছে ? তাও কুকুরের মাংস দিয়ে ?’
‘ চেহারা দেখে কি আর মানুষ চেনা যায় স্যার। তবে ওটা স্যার যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। যার যেমন রুচি। কেউ খায় বাকরখানি আর কেউ খায় লুচি। ’
‘থাক লাগবে না। বিড়াল দাম কেমন ?’
‘সঙ্গী হিসাবে বিড়াল ভাল না স্যার। সারাক্ষণ ঘুমায়। অলস। আর দামী খাবার পছন্দ করে। দুধ, মাছ পনীর। কথা বলা পাখী নিয়ে যান স্যার। জলদস্যুরা পাখী পুষতো। সামান্য খাবারে হয়ে যাবে।’
‘মাছ হলে ভাল হয় না ? গোল্ড ফিস । ’
‘হয়। কিন্তু জেমস বন্ড সিনেমার ভিলেন মার্কা একটা ভাব এসে যায়। পিরানহা নিতে পারেন । বেশ গা ছমছমে একটা ভাব আছে।’
‘কিন্তু ওরা তো প্রচুর মাংস খায় ?’
‘ পাওনাদারদের বাড়িতে ডেকে এনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবেন।’
‘ভাই আপনি খুব বাজে ধরনের মানুষ। আপনার দোকান থেকে কিছু কিনব না।’ বিরক্ত হয়ে গট গট করে বের হয়ে এলাম। পিছন পিছন বেশ খানিকটা দূর পর্যন্ত গিরিবাজ পাইক দৌড়ে চলে এলেন। আরও আসতেন কিন্তু ড্রেনের মধ্যে উনার এক পা পরে যাওয়ায় আর পারলেন না।
বাসে করে ফিরে এলাম।
বাঙালীর মত পড়ুয়া জাতি দুনিয়ায় নেই। বাসে খবরের কাগজ খুলে বসলেই দুই পাশে দুই তিনটা মুণ্ডু ঝুঁকে এসে পড়া শুরু করে। পাতা উল্টাতে গেলে মিহি হেসে বলে- ভাই একটু রাখেন। পড়া শেষ অয় নাইক্কা।
এদের অনেকের মাথায় শর্ষের তেল দেয়ার জন্য মনে হয় জ্যান্ত আচার বসে আছে।
দুই একজন আমার ঠিক কানের পাশে শসা বা গাজর চিবিয়ে কাগজ পড়ে।
আরো বেশি মজা লাগে যখন আপনি পড়ছেন তখনিই কেউ বলবে, "ভাই পত্রিকাটা এদিকে দেন তো একটু।" অথবা "ভাই খেলার পৃষ্ঠাটা দেখি", "রাজনীতির পাতাটা দেখি", "দেশের খবরের পৃষ্ঠাটা কই", "অত নাম্বার পৃষ্ঠাটা উল্টান তো" সবশেষে দেখা গেলো আপনার হাতে বাসা ভাড়া বা পাত্র পাত্রী চাই এর এক পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপনের পাতা ছাড়া কিছু নেই।
মারাত্নক যন্ত্রণা ।
বাড়িটার একটা সুবিধে হচ্ছে নিঝুম। শহরে যেখানে থাকতাম ঐ মহল্লায় কুকুরদের বিরাট একটা কমিউনিটি ছিল। প্রত্যেক মাসে এলাকার সব কুকুর এক হয়ে রাস্তার উপর জনসমাবেশ ইয়ে কুকুর সমাবেশ করত। সারারাত বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতো ওরা। কেউ মুল্যবান বক্তব্য দিলে বাকি কুকুরগুলো এক সাথে বলে উঠতো - সহমত ভাইইইইইই ।
কয়েকটা দিন একটু একঘেয়ে লাগলেও পরে তেমন খারাপ লাগল না।
মানুষ আসলে যে কোন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। আর একা থাকা মস্ত এক গুন। সবাই পারে না। তবে প্রথম থেকে মনে হচ্ছিল বাড়িতে আমি একা নই। ঠিক ভুতুরে কিছু না হলেও গা ছমছমে একটা ব্যাপার আছে। প্রথম রাতেই বিদঘুঁটে কেমন একটা শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। অনেকক্ষণ কান পেতে রইলাম। সিল্কের কাপড় ন্ড়াচড়া করলে যেমন শব্দ হয় তেমন একটা শব্দ পেলাম। তবে ভয় পেলাম না। বাদুর হতে পারে।
অচেনা শব্দ নিয়ে ভয় পাবার কিচছু নেই। খুব পরিচিত শব্দ ও পরিবশের জন্য অচেনা বিদঘুঁটে মনে হয়। এই কায়দা কাজে লাগিয়ে সিনেমাতে শব্দ সংযোগের কাজে ব্যবহার করা হয়। যেমন- স্টার ওয়ারর্স মুভিতে লেসার গানের সেই টু ই টুই শব্দটা আবিস্কার করেছিল মুভি সেটের এক মিস্ত্রি -ধাতুর তারে হাতুরি দিয়ে আঘাত করতে গিয়ে।
সিনেমার শব্দ বানানোর এই কায়দাকে বলে- ফলি ( Foley ) । জ্যাক ফলি নামে এক শব্দশিল্পীর নাম অনুসারে। ১৯২০ সালে প্রথম এই কায়দা একটা রেডিও নাটকে ব্যবহার করা হয়েছিল। আজকাল ফলি আর্টিস্ট ছাড়া সিনেমা বানানো অসম্ভব। হরেক কায়দা করে ফলি আর্টিস্টরা নিখুঁত শব্দ সেটে বা স্টুডিয়ো -তে বসে বানায়।
ফালি করা শূয়রের মাংস ভাঁজার শব্দ হুবহু বৃষ্টির শব্দের মত। তাই করে । বালতি ভর্তি জল ঢেলে ঝর্ণার শব্দ বানায়। চৌবাচ্চার জলে হাত নেড়ে ছপছপ করে সাগরের ঢেউয়ের শব্দ বানায়। মুচমুচে ভুট্টার চিঁড়ের উপর হেঁটে মরুভূমি বা বরফের কুঁচির উপর দিয়ে হাঁটার শব্দ বানায়। চামড়ার টুকরো নাড়াচাড়া করলে যে শব্দ হয় সেটা দিয়ে নৌকার পালের শব্দ হিসাবে চালিয়ে দেয়। নারকেলের শুকনো মালা অর্ধেক অর্ধেক দুটো করে দুই হাতে নিয়ে মেঝেতে ঠুকলে যে শব্দ হয় সেটা ঘোড়ার খুরের শব্দ হিসাবে চালায়। ক্যাসেটের ফিতার উপর হেঁটে শব্দ বানায়, ঘাসের উপর দিয়ে হাঁটছে। হাউ মাউ করে গাজর খেলে যে শব্দ হয় সেটা ছবিতে বানায়- হাঙর এসে মানুষ খেয়ে ফেলছে। ইলেকট্রিক করাত দিয়ে লোহা বা মেঝের টাইলস কাটলে কর্কশ যে শব্দ হয় সেটা কায়দা করে ডাইনসরের চিৎকার হিসাবে ব্যবহার হয়। এক জোড়া দস্তানা একটার সাথে আরেকটা বাড়ি দিয়ে পাখীর ডানা ঝাপটানোর শব্দ বানায়।
ফলি শিল্পীদের কায়দার অভাব নেই। নিত্য নতুন কায়দা মাথা খাটিয়ে বের করে নতুন নতুন শব্দ বানায় আর দর্শক শ্রোতাদের চমকে দেয়।
এত কথা বলার দররকার ছিল না। বললাম একটা ব্যাপার বুঝানোর জন্য যে অচেনা শব্দ শুনেই ভয় পাবার কিচছু নেই। । ওটা হয়তো মামুলী কিছুর শব্দ। অমনিতে বাদুরের ডাক শুনলেও রাতে অনেকে ভয় পেতে পারে। দিনের বেলা ওটাই মনে হয় কেউ হয়তো নাক ডাকছে। বা গ্যাসের লাইনের পাইপ লিক হয়েছে।
সারাদিন তেমন কোন ঘটনা ঘটে না।
বেলা গড়িয়ে উঠি। পাউরুটি- মাখন- জেলি খাই। পড়তে বসি। দুপুরে খেয়ে একটু গড়িয়ে আবার পড়তে বসি। বিকেলে রেললাইনের ধারে হাঁটতে যাই। কয়েকটা বোতল ব্রাশ গাছের নিচে একটা চায়ের দোকান ওখানে পর পর দুই পেয়ালা চা খেয়ে বাসায় ফিরি। প্রায় পিরামিডের সাইজের সিঙ্গারা বিক্রি করে। একটা কিনলেই এক মুঠো খোসাসহ শসার ফালি দেয়। বলে ওটা নাকি সালাদ। দোকানের বাইরে টোকাই মার্কা এক পিচ্চি বসে বসে শসা কাটে । ফাকে ফাকে তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে নাক থেকে হিঙ্গাইল বের করে দূরে ছুড়ে ফেলে। । সালাদটা সম্ভবত সেই কারনেই আদ্র।
অনেক রাত জেগে পড়ি। রাতে খেয়ে দেয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে ভোর হয়ে যায়।
একটা ভাতের দোকান আবিস্কার করেছি। মাছ সবজী সব খাবারের দাম বেশ সস্তা। ভাবছি ওখানেই খাব। সমস্যা হল , ভাতের দোকানদার তার হাড়ি -পাতিল - বাসন সব পাশের ডোবার জল দিয়ে পরিষ্কার করে। সেই ডোবার অন্য পাশে কতগুলো বাচ্চা হাফপ্যান্ট সুন্দর একটা কায়দা করে গুটিয়ে বসে বসে পায়খানা করে। অন্য কোন সমস্যা নেই।
এক দুপুরে বসে পড়ছিলাম। সামনে জানালা। দূরে জংলামত ঝোপ। কচু আর কি সব গাছ যেন আছে। নাম জানি না। পড়ার সময় চোখের কোন দিয়ে দেখলাম কি যেন দৌড়ে গেল একটা। ঝট করে মুখ তুলতেই মনে হল গিরগিটি টাইপের কি যেন । বাগানে গুইসাপ আছে ? থাকতেই পারে। বাড়িটা বিশাল জায়গার উপর। তার উপর আশেপাশের মেলা দূর পর্যন্ত লোকজন বা বসতি নেই।
মনে পড়লো বাগানে বা রান্না ঘরে একটাও ইঁদুর দেখিনি। সন্ধ্যার পর ব্যাঙের ডাক বা ঝিঁঝিঁপোকার ডাক শুনিনি। ভাবতে গিয়ে মনে প্ড়লো কি অদ্ভুত বাগানে জোনাকি পোকাও দেখিনি।
তারপরও ভয় পেলাম না। কারন গুইসাপ খুব নিরীহ প্রাণী। ভয়ের কিছু নেই। গুইসাপ থাকলে বিষধর সাপ আসতে পারে না। বাগান থেকে শামুক , ইঁদুর, ব্যাঙ, কাঁকড়া বা পাখী ধরে খায় ওরা । সোনালী চামড়ার এক জাতের গুইসাপ আছে। নাম- স্বর্ণগোধিকা। চামড়ার লোভে মানুষ ওদের মেরে প্রায় শেষ করে ফেলেছে। দুঃখজনক । প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে ওরা । কয়েক বছর পর আর পাওয়াই যাবে না। অথচ ইন্দোনেশিয়ায় বড় বড় গুইসাপকে কমোডো ড্রাগন নাম দিয়ে কি সুন্দর ব্যবসা করছে। কত হাজারে বিজারে টুরিস্ট এই কমোডো ড্রাগন দেখার জন্য সেইখানে যাচ্ছে। বিদঘুঁটে সরীসৃপ দিয়ে হাজার হাজার ডলার কামাচ্ছে।
যাকগে । আমার কি?
সেই রাতে বারান্দায় বসে ছিলাম। কারেন্ট চলে গেছে। পড়ায় একটু বিরতি নেয়ার মওকা পেয়ে গেলাম। ভাবছিলাম এক পেয়ালা চা বানাবো কি না। বিকেলে হাঁটতে গিয়ে চায়ের পাতা আর চিনি কিনে এনেছি। এখানে লাল চিনি পাওয়া যায়। মোটা দানা। দেখতে বেশ।
আচমকা মনে হল বাগানের ভেতরে কি যেন একটা উড়ে চলে গেল। সাইজ দেখে মনে হল কোন ঘুড়ি হবে। এত রাতে ঘুড়ি উড়াবে কে ? নিশ্চয়ই বাদুর । তারচেয়েও রহস্যময় হচ্ছে বাদুরটা উড়ার সময় কেমন ঝুমঝুমি বাজানোর মত শব্দ হল । অন্ধকারে বাগানের শেষ প্রান্তে চেয়ে রইলাম। কিচছু দেখা যায় না। কয়লার মত অন্ধকার। আকাশে চাঁদ নেই। ডুবে গেছে।
অমন সময় আমাকে চমকে দিয়ে বাগানের শেষ প্রান্তে, দূরে আগুনে হলকা ফ্যাস ফ্যাস করে উঠলো।
ভয় পেতে গিয়েও সামলে নিলাম। বাগানের গাছ পালার ঝরা পাতা আর হরেক রকম লতাপাতা পচে মিথেন গ্যাস হয়। বাতাসের সংস্পর্শে এলেই মিথেন গ্যাস অমন জ্বলে উঠে। ঠিক করলাম- কাল দিনের বেলা বাগানটা ঘুরে দেখব।
পরদিন দুপুরে বড় একটা লাঠি হাতে , পায়ে শক্ত গামবুট গলিয়ে বাগানের ভেতরে গেলাম। এটা এক সময় বাগান ছিল। অযত্নে পরে থাকলে রামদা ও বটি হয়ে যায়। এখন এটাকে জঙ্গল বলাই মঙ্গল। ঘাস হয়ে গেছে ইয়া লম্বা। সেই ঘাস ভর্তি লালচিঁড়ের মত কিসের দানা । এই ঘাসের নাম চিড়ে ঘাস। ডুমুর গাছ থেকে পাকা ডুমুর থ্যাপ থ্যাপ করে মাটিতে পড়ছে। অবাক হয়ে দেখি সেই ফল খাওয়ার লোভে কোন পাখী এসে গাছের ডালে নিজেদের কলোনি বানায়নি। কারনটা কি ?
বাড়ির শেষ মাথায় দেয়াল। কাল রাতে এখানেই ঘুড়ি পড়তে দেখেছি। মিথেন গ্যাসের আলো ও এই দেয়ালের কাছেই দেখেছি। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছু পেলাম না। ফিরে আসছিলাম তখন চোখ গেল দেয়ালের ভাঙ্গা এক ফাটলের দিকে। বিদ্যাপাতা আর ইঁদুরকান পাতার ( যেটার আরেক নাম পেপারোমিয়া ) বড় দঙ্গলের আড়ালে ফাটলটা প্রায় লুকিয়ে আছে। উকি দিয়ে দেখি ফাটলের ভেতরে সোনালী রঙের দুটো ডিম। অমন বাহারি ডিম আগে দেখিনি। অনেকটা বেত ফলের মত।
প্রকৃতিবিদ এনিড ব্লাইটনের বইতে পড়েছি, কোথাও অমন বাসায় ডিম খুঁজে পেলে হাত দিয়ে ধরা ঠিক না। ডিম নষ্ট হয়ে যায়। বাচ্চা বের হয় না আর।
অনেকক্ষণ দেখেও বুঝতে পারলাম না কিসের ডিম। ধাই করে মনে হল গুইসাপের ডিম না তো ? ঘাঁটাঘাঁটি না করে চলে এলাম।
বিকেলে মা-কে ফোন দিলাম।
‘তর পড়াশুনা কেমন চলছে রে বাবা ? ঠিক মত খাওয়াদাওয়া করছিস তো ?’ ব্যাকুল গলায় বলল মা।
‘আমি ঠিক আছি মা। একদম চিন্তা কর না। নিজের দিকে খেয়াল রেখ। বাবার কি খবর ?
‘ জেলেই আছে। বলছে ওখানে জুয়া খেলার বেশ সুবিধে। দিন রাত ওখানেই জুয়া খেলছে। মাত্র একশো টাকা ঘুষ দিলে সারাদিন জুয়া খেলা যায়। জেলার সাহেব নিজেই টাকা নিয়ে যান। ’
‘আমাদের গ্রামের এই বাড়িতে কি গুইসাপ দেখেছিলে তুমি ? ’
‘না , আমি কিছু দেখিনি। তবে কাজের বুয়া ফুয়াদের মা একবার বাথরুমে গরম জল ঢালতেই নাকি হিলহিল করে তেঁতুল বিছের মত কি একটা দৌড়ে গেছে ড্রেনের ফাঁক দিয়ে । আর বাগানের উত্তর দিকের দেয়ালের ওখানে সোনালী রঙের ডিমের খোসা পেয়েছিল একবার। কোন সমস্যা বাবা ? তুই না হয় চলে আয়।অমন জংলা জায়গায় পরে থাকতে হবে না। ফেল করলেও সমস্যা নেই। দরকার হলে রিক্সা চালাবি।’
‘কোন সমস্যা নেই মা। গুইসাপ বিষাক্ত না। আমি কয়েক শিশি কার্বলিক অ্যাসিড রেখে দিয়েছি। গুইসাপ দূরের কথা ডাইনোসর ও আসবে না। চিন্তা কর না।’
আরও খানিক খেজুরে আলাপ সেরে কথা বন্ধ করলাম।
সেইরাতে আবারও পাখা ঝাপটানোর শব্দ পেলাম। আগুনের হলকা ও দেখলাম।
বুঝতে পারলাম , রহস্যময় কোন প্রাণী বা পাখী আছে আমাদের বাগানে। ঠিক করলাম, পড়ার ফাঁকে ফাঁকে বাগানের দিকে খানিক খেয়াল রাখতে হবে।
বাগানে বসে চারিদিকের খেয়াল রাখা বা গাছপালা দেখা একটা দারুন রকমের শখ। লেখক বিভূতিভূষণ বাবু নাকি অমনটা করতেন। মৌসুম বদলানোর সাথে সাথে প্রকৃতি কত মিষ্টি করে যে বদল হয় কেউ জানে না । দেখার মত জিনিস। নিজের বাগানটাই খোলা একটা চিড়িয়াখানা হতে পারে । কত রকমের মথ, পাখী, পোকা আর ঘাস ফড়িং আঁসতে পারে বাগানে। কেউ জানে না। ছোট্ট পুকুর থাকলে ব্যাঙ্গাচি থাকতে পারে। রাতের বেলা খাবারের লোভে চলে আসতে পারে লাল রঙের শেয়াল। সতর্ক পায়ে চলে আসবে নেংটি ইঁদুর। আদর করে উড মাউস বলে। রুপালি মাকড়সা। কমলা রঙের শুঁয়োপোকা।
বাসি পাউরুটি ছিল খানিক। দেয়ালের কাছে সেই সোনালী ডিমের ওই জায়গায় রেখে দিলাম । রুমের ভেতর থেকে দূরবীনে চোখ রেখে নজর রাখলাম । দিনের বেলা কিছু দেখলাম না। তবে বিকেলে চা গিলে ফিরে দেখি পাউরুটি নেই। যাক ভাল খবর।
রান্নাঘরের পাশে বড় একটা ড্রেন আছে। এক হাড়ি গরম জল ওটায় ফেলে অপেক্ষা করলাম খানিক সময়। তেলাপোকা বা বিছে দৌড়ে বের হল না। তবে মনে হল দূর থেকে কর্কশ পাখীর ডাক ভেসে এলো। কি যেন দৌড়ে গেল মাটির তলা দিয়ে।
সেই রাতে বারান্দায় বসে ছিলাম। ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনে চোখে দূরবীন ঠেসে তাকালাম। পিলে চমকে গেল। চাঁদ ছিল আকাশে। সাইজে বাদুরের সমান। ডানা বেশ লম্বা। তারচেয়ে বেশি লম্বা লেজ, মন্থর গতিতে উড়ে গেল। মুখ দিয়ে আগুনের হলকা বের হচ্ছে।
মাত্র দুইদিন পর সব পরিষ্কার হয়ে গেল।
সকালে খুব ভোরে উঠে পড়েছিলাম। খানিক আগেই সূর্য উঠেছে। কদমফুলের রেনুর মত রোদ। বারান্দায় বিস্কুটের টুকরো ছিল। খুঁটে খাচ্ছিল বড় বড় দুটো বিচ্ছিরি প্রাণী। গুইসাপ আর পাখীর মিশ্রণ। রঙধ্নুর মত বর্ণিল গায়ের রঙ । তবে নীলের ভাগ বেশি। রুইমাছের আঁশের মত আঁশ আছে শরীর ভর্তি। পা চারটে। মুরগির পায়ের মত। মুখটা লম্বা। মুখ ভর্তি তীক্ষ্ণ সূচালো দাঁত। শরীরের তুলনায় লেজ আরও বেশি লম্বা। লেজের শেষ প্রান্ত হুবহু তীরের ফলার মত। ডানা বড়। বাদুরের ডানার মত। কয়েক ভাগে ভাঁজ করতে পারে। আমার পায়ের শব্দ পেয়েই মখমলের কাপড়ের মত শব্দ করে উড়ে গেল।
অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম।
ড্রাগন ! আমার বাগানে !
রূপকথার কল্পিত এই জিনিসটা আমার বাগানে? কি করে সম্ভবত ?
সারা দুনিয়ার ড্রাগনের গল্প ছড়িয়ে আছে। চিন আর জাপানে একটু বেশি। যীশুর জন্মের প্রাচীন মিসরীয়দের প্যাপিরাসের পাণ্ডুলিপিতে ড্রাগনের ছবি আর বর্ণনা দুটোই আছে। প্রাচীন গ্রিকদের যেসব মাটির পাত্র, জলপাই তেলের জালা পাওয়া গেছে তাতেও ড্রাগনের ছবি আঁকা আছে। উত্তর আর দক্ষিণ ইউরোপের সব দেশের কাহিনিতে ড্রাগন এসেছে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি পর্যন্ত ড্রাগনের ছবি এঁকেছিলেন। কাল্পনিক। বাস্তবে ওরা নেই। গল্প। শুধুই গল্প।
আজ পর্যন্ত কোন বিজ্ঞানী প্রমাণ দিতে পারেনি ওরা আছে।
গল্পগুলো ছড়াল কিভাবে ? নিজের চোখে যা দেখলাম ? নাকি এরাও এক ধরনের পাখী। টিকে আছে সবার চোখের আড়ালে। কোন শৌখিন পাখী পর্যবেক্ষকের চোখে ধরা পড়েনি আজও ?
চট জলদি রেডি হয়ে নিলাম। শহরে যেতে হবে। গিরিবাজ পাইকের সাথে কথা বলতে হবে। খুব দরকার।
কুত্তা বিলাই স্টোরের সামনে এসে অবাক হয়ে গেলাম। দোকান আছে ঠিকই । সেখানে পরোটা আর ডিম ভাঁজি বিক্রি হচ্ছে। অবাক কাণ্ড। ক্যাশে গিরিবাজ পাইকের মত একটা লোক বসে আছে। জিজ্ঞেস করতেই লোকটা শোকাকুল গলায় জানাল উনি গিরিবাজের ভাই। উনার ভাইকে র্যাব ধরে নিয়ে গেছে। কারন উনার দোকানে দুস্পাপ্য বিলুপ্তপ্রায় সবুজ কচ্ছপ পাওয়া গেছে। দোকান সিলগালা করে দিয়েছে ।পরে সিল ভেঙ্গে পরোটা ডিম ভাঁজার ব্যবসা ধরেছে। ভালই চলছে।
ছোট ভাই দুঃখ করে বলল, ‘ ভাই আমরা জানব কি করে এইসব কচ্ছপ বা কাউটটা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি হিন্দুদের ধরে জেলে ভরে দেয় তবেই তো সব কচ্ছপ বেঁচে যায়। ওরাই ত কচ্ছপ খেয়ে শেষ করে ফেলছে। এই দেশে হিন্দু আছে মাত্র দেড় থেকে দুই কোটি। জেলে রাখলে কত আর খরচ পড়বে ? এই ভাইকে পরোটা দে। খেয়ে দেখুন ভাই থাপড়ানো পরোটা। রুমালের মত নরম।’
‘থাপড়ানো পরোটা কি ?’ মুখের লোল সুরুত করে টেনে জানতে চাইলাম।
দেখিয়ে দিল। পরোটা ভাঁজার পর ভীমসেনের মত তাগড়া জোয়ান এক লোক দুই হাতে পরোটাগুলো থাপরে দিচ্ছে। ওতে পরোটা নরম থাকে। আয়েশের সাথে ছেঁড়া যায়। মুখের ভেতরে সেঁধিয়ে যায় সহজে।
সন্ধ্যার একটু পর বাড়ি ফিরলাম। চারিদিকে নীল অন্ধকার। মিষ্টি হাওয়া বইছে। বাতাসে ফুলের ঘ্রাণ।
বাইরে কাঁচা লোহার গেইট খুলে ভেতরে ঢুকতেই থমকে দাঁড়ালাম। কামরার আলো জ্বলছে। অথচ পরিষ্কার মনে আছে, সব আলো নিভিয়ে গেছি। কয়েক কদম সামনে এগুতেই সতর্ক হয়ে গেলাম। শিরশির করে উঠলো শরীরটা। বিপদের গন্ধ। বারান্দায় ইজি চেয়ারে কেউ বসে আছে। মাথাটা পিছন দিকে ফেরানো। সামনের পিচ্চি একটা টেবিল। সেটার উপর চারকোণা বেটে একটা গ্লাস। কাঁচের। ভেতরে মধুরঙা পানীয়। সাথে কয়েকফালি লেবু আর দারুচিনি।
গ্লাসটা দেখেই চিনতে পারলাম। বড় চাচা। রাবণ গাঙ্গুলী।
‘তারপর ভাতিজা। বাপ জেলে তাস খেলছে আর তুমি বিদ্যার সাবমেরিন হবার জন্য এখানে চলে এসেছ?’ খসখসে গলায় টিটকারি মারলেন তিনি।
রাবণ গাঙ্গুলী আমার আপন চাচা না। বাবার জ্যাঠাত ভাই। নামেই বুঝা যায় বাজে লোক। আমাদের পছন্দ করেন না। আমরাও।
‘আপনি মদ খাচ্ছেন ?’ গলা চড়িয়ে বললাম। ভেতরে ভেতরে ভয় পেয়ে গেছি । স্বার্থ ছাড়া এই লোক নাকের সর্দিও ফেলেন না।
‘ কথা বার্তা বাপের মতই। ডারউইন সাহেব তো ঠিকই বলেছেন । তরমুজ গাছে তরমুজই হয়। আপেল হয় না। এটা মদ না। ওষুধ। ইংরেজরা বলে Hot toddie , শীতকালে সর্দি জ্বর থেকে রক্ষা করে। রাতে ভাল ঘুম হয়। কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক প্রফেসর রন ইকিলস বলেছেন, টডি ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সাহায়্য করে। গলায় কফ জমতে দেয় না। মোট কথা বিরাট দাওয়াই। আর তুমি বলছ মদ ? হাউ ফানি।
‘ টডি শব্দটা এসেছে তাড়ি শব্দ থেকে। রেসিপি একদম সোজা। ৫০ মিলি হুইস্কি। সাথে ৩ চামচ মধু। একটা লেবুর অর্ধেক চিপে সেই রস দিতে হবে, বাকি অর্ধেক ফালি করে গ্লাসে দিতে হবে। গোল চাকা করে ফালি করলে দেখতে ভাল লাগে। একটা দারুচিনির টুকরো ভেঙ্গে দুই টুকরো করে সাথে দিতে হবে। এইবার গ্লাসের বাকি অংশ গরম জল দিয়ে ভরে চামচ দিয়ে একটু নেড়ে দিতে হবে। বিরাট দাওয়াই। তুমি বলছ মদ ?’
‘ বুঝলাম দাওয়াই খাচ্ছেন। এখানে কি করছেন ?’ শান্ত গলায় বললাম। বুঝতে পারলাম মস্ত কোন ব্যাপার ঘটেছে।
‘ এখানে কি করছি ?’ ঝট করে সোজা হয়ে বসলেন চাচা। আলোতে চলে এলো চেহারাটা। বেঁটে মোটা মত লোক। মুখে সরু গোঁফ, ভিক্টোরিয়ান যুগের মঞ্চ অভিনেতাদের মত। স্বার্থপর দুই চোখ।মাথা ভর্তি চুল। তাতে প্রচুর শর্ষের তেল দেয়া। ফলে কেমন আচার আচার একটা ঘ্রাণ আসছে। রংচঙ্গা হাওয়াইয়ান জামার সাথে কোট পরে আছেন। ‘ আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমাকেই বলছ এখানে কি করছেন ? হাউ ফানি। শেক্সপিয়র সাহেব ঠিকই বলেছেন- পিপীলিকার পাখা হয় মরিবার তরে।’
‘এই বাড়ি আপনার ?’ প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম।
‘ চিৎকার করলেই যুক্তি পোক্ত হয় না। হাউ ফানি। তোমার বাবা জুয়া খেলে ফতুর হয়ে আমার কাছে এই বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন। এই নাও কাগজ।’ কোটের পকেট থেকে এক গাদা কাগজ বের করে আমার সামনে বাড়িয়ে দিলেন।
থাবা মেরে নিলাম। কথা সত্য। কাগজ তাই বলছে। হঠাৎ খুব অসহায় মনে হতে লাগল।
‘ কাল এই বাড়ি ভাঙ্গার কাজ ধরব।’ চারকোণা গ্লাসটা হাতে নিয়ে মুতের মত পানীয়তে চুমুক দিলেন। ‘ আমার পাটনার বেলায়েত হোসেন খোশনবীশ আর নিখিল দস্তিদার এই তিনজনে মিলে রিয়েল এটেসট ব্যবসা শুরু করছি। জমি চাই আমাদের। যত সম্ভব। বড় বড় দালান আর শপিংমল বানাব। আর ভাড়া দেব। এক টুকরো জায়গাও রাখব না। কেউ খেলার মাঠে যাবে না। সবাই দশতলা দালানের উপর জিমে গিয়ে ব্যায়াম করবে। কেউ কাঁচা বাজারে গিয়ে মাছ কিনবে না। সবাই ট্রলি ঠেলে প্যাকেটে ঠাসা মাছ কিনবে। কাঁঠাল পর্যন্ত কোষ খুলে দানা ফেলে প্যাকেট করে শপিং মলে বিক্রি হবে। আলু ভর্তা করে অনলাইনে বিক্রি হবে। মু হা হা।’
‘ এত সুন্দর বাড়ি বাগান ভেঙ্গে ফ্ল্যাট বানিয়ে ভাড়া দেবেন ।’ বিচলিত গলায় বললাম। আর কিছু মাথায় আসছে না।
‘হাউ ফানি। কার্ল মার্কস সাহেব বলেছেন ভূমির মালিক তার ভূমির ব্যবহার করতে পারেন। কারো কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন।’
‘ কিন্তু বাবা যে আপনার কাছে এই বাড়ি বিক্রি করে ফেলেছে সত্যি জানি না আমরা।’
এক লহমায় মুখটা থমথমে হয়ে গেল চাচার । খালি গ্লাসটা ছুড়ে মারলেন বাগানের দিকে। দূরে গিয়ে টুং টাং পিয়ানো বাজানোর মত শব্দ করে ভাঙল। ডান হাতটা শূন্যে তুলে ধরলেন। মাইকেল জ্যাকসন নাচ শেষে অমন একটা ভঙ্গিতে দাঁড়াত। চাঁদের আলোয় দেখতে পেলাম চাচার হাতে চকচক করছে একটা পিস্তল।
‘এক মিনিট সময় দিচ্ছি ।’ হিশহিশ করে উঠল উনার কণ্ঠ । ‘তোমার বই খাতা শিশি বোতল নিয়ে বের হয়ে যাও। আর কখন এই বাড়ির চতুর্ভুজের মধ্যে দেখলে ঠ্যাং ভেঙ্গে লুলা বানিয়ে দেব। ’
দুই
আমার মুখ থেকে সব শুনে মা অনেকক্ষণ হাত বুলিয়ে আদর করে দিল আমাকে। ‘ কেন ওই মিচকে শয়তানের সাথে তর্ক করতে গেছিস ? তর যদি কোন ক্ষতি করতো ? তর বাবার মুখে শুনেছি জুয়া খেলে অনেক ঋণ নিয়েছিল। বাড়ি জমি গেছে যাক। তুই তো আছিস।’
অনেকদিন পর মায়ের হাতের রান্না খেলাম। পেঁপে ভাঁজা। মটর ডাল। শর্ষে ইলিশ।
মনটা খারাপ। পাঁচদিন চলে গেছে।মাঝখানে একদিন গোপনে গিয়েছিলাম। দেখি, মস্ত এক বুলডোজার দিয়ে আমাদের বাড়ির দেয়াল ভাঙ্গা হচ্ছে। করাত কলের লোক এনে বাগানের মস্ত বড় বড় শিমুল আর বৃষ্টি গাছগুলো কাঁটা হচ্ছে। বারান্দায় চাচা বসে মুতের রঙের সেই দাওয়াই গিলছেন। সাথে অচেনা দুই লোক। অনুমান করলাম, চাচার পাটনার বেলায়েত হোসেন খোশনবীশ আর নিখিল দস্তিদার হবে । খ্যাক খ্যাক করে হাসছে ত্রিরত্ন।
মন খারাপ করা এক সন্ধ্যায় বসে টিভি দেখছিলাম। আগারে ভাগাড়ে ফালতু সব নিউজ পাঠ করছিল। কোন এলাকায় জাম্বুরা চাষ করে জনার্দন নামে এক লোক অনেক টাকা করেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বলেছেন- কোন সন্ত্রাসীকে ছাড় দেবেন না। কোপেনহেগেনে জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনা তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। হাবি জাবি।
আচমকা একটা খবর কানে যেতেই সোজা হয়ে বসলাম। ঢাকায় খোশনবীশ মার্কেটে আগুন লেগেছে। ছয়তলা ভবন দাউদাউ করে জ্বলছে। সাংবাদিক কতজন গেছে কে জানে। সবাই ছবি তুলছে। রাস্তা ভর্তি মানুষ দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। ভিড়ের মধ্যে FBI লেখা জামা পরে কয়েকজন যুবক ব্যস্তসমস্ত ভঙ্গিতে দৌড় ঝাঁপ করছে। অবাক হলাম। FBI চলে এসেছে ? খেয়াল করে দেখি ওরা খাবার বিক্রি করছে। FBI মানে- ফুচকা, বার্গার, আইসক্রিম। নতুন একটা ফাস্টফুডের দোকান।
একজন টিভি রিপোটার ফ্যাঁকাসে চেহারায় চেয়ে আছে ক্যামেরার দিকে। উনার চোখদুটো শালগমের মত বড় হয়ে গেছে উত্তেজনায়। বলছেন - ‘ অ্যা অ্যা অ্যা , আপনারা দেখছেন খোশনবীশ মার্কেটে আগুন লেগেছে। আগুন কি ভাবে ধরল সেটা জানা যায়নি। ধারনা করা যাচ্ছে যে অ্যা অ্যা অ্যা বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারনে অমনটা হতে পারে। অ্যা অ্যা অ্যা, এখনও দমকল বাহিনী কেন আসেনি সেটা জানতে আমরা দমকল অফিসে ফোন দিয়েছি। ওরা বলছে রাতের খাবার খেয়েই ওরা রওনা হবে। অ্যা অ্যা অ্যা।’
বিরক্ত হলাম না। দেশে সাংবাদিক আর রাস্তার পলিথিনের টুকরো সংখ্যা সমান। এক সপ্তাহের কি সব কোর্স করে মানুষ সাংবাদিক হয় । শুনেছি অমন অনেক সাংবাদিক আছে যারা দিনে একশো টাকা মজুরিতে কাজ করে। সংসার চালানোর বাকি টাকা পুলিশদের কাছ থেকে পেয়ে থাকে। কোন এক অজানা কারনে।
আমি চেয়ে আছি নিউজের ইনসেটের দিকে । খোশনবীশ মার্কেটের মালিকের ছবি দেখাচ্ছে। লোকটাকে চিনতে পারলাম। চাচার সেই বিজনেস পার্টনার। লোকটার জন্য দুঃখ হল।
মন খারাপ ছিল। বাইরে ঘুরে এলাম। এত কিচছুর মধ্যে ও বাগানের সেই বিচ্ছিরি প্রাণী বা পাখী দুটোর কথা মনে হত। এক বড় ভাই বন্ধু আছে জীবজন্তু বিশেষজ্ঞ। উনাকেও পাচ্ছি না । পেলে খানিক আলাপ করতাম।
দুইদিন পর আবার টিভি দেখতে গিয়ে চমকে গেলাম। নারায়ণগঞ্জের নিখিল টাওয়ারে আগুন লেগেছে। আগের বারের মতই। কে সাংবাদিক আর কে সাধারন আম কাঁঠাল জনতা বুঝা মুশকিল। অ্যা অ্যা করে রিপোর্ট হচ্ছে। একটা পিচ্চি বাচ্চা ড্রেন থেকে এক বালতি জল নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিল আগুন নেভাতে । কি ভাবে যেন পা ফস্কে সেই ড্রেনেই পরে গেল। পিচ্চিকে ড্রেন থেকে তোলার জন্য ক্রেন আনা হল। সেই ক্রেনের মালিক হচ্ছে - গফুর জমজমাট সিমেন্ট। বাধ্য হয়ে পাঁচ মিনিট গফুর জমজমাট সিমেন্টের বিজ্ঞাপন দেখাল ওরা।
পিচ্চিকে যখন ড্রেন থেকে তোলা হল ওকে দেখাচ্ছিল উগান্ডার বানটু জাতির লোকজনের মত। সবাই পিচ্চির ইন্টারভিউ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। টিভিতে ঘোষণা দিল পিচ্চি শতাব্দীর সেরা মহানায়ক। বিদেশে থেকে থালাবাটি মেজে মস্ত বড়লোক হয়েছেন অমন একজন ঘোষণা দিলেন - বাকি জীবন পিচ্চির গোসল করার সাবানের খরচ উনি দেবেন।
মনটা খচখচ করে উঠলো নিখিল টাওয়ারের মালিক নিখিল দস্তিদারকে আমি চিনি। চাচার আরেক পার্টনার। মনে হচ্ছিল মস্ত কোন ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে। সবার অগোচরে।
ঠিক দুইদিন পর আসল খবর দেখলাম। টিতিতে।
মা রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে বলল, ‘ তর চাচার বিল্ডিং না ?
মাথা নাড়লাম। এইবার রাবণ টাওয়ার।
টিভিতে তখন ভীষণ হল্লা। মোটা চশমা চোখে পেল্লাই সাইজের কফির কাপ নিয়ে কয়েকজন লোক তর্ক করছে। এই অনুষ্ঠানের নাম টক শো। মিষ্টি শো হতেই পারে না। কারন উপস্থিত সবার চেহারায় বিরক্তির ছাপ। সবাই রেগে আছে। কে জানে উনাদের কাপে হয়তো কফি নেই। বাসায় ফিরবে সেই ভাড়াও হয়তো আয়োজকরা দেবে না।
উপস্থাপকদের একজন টেবিল চাপড়ে বারবার বলছে এইসব সিরিয়াল অগ্নিকাণ্ড এমনিতেই ঘটছে না । পিছনে কোন কালো হাত আছে। বিরোধী দল হতে পারে। আরেকজন বলছে বিদেশী শক্তি । বিদেশি বলতে দূরের কোন দেশ না। পাশের কোন দেশ । যারা ইলিশ মাছও চুরি করে নিয়ে যায়। আরেকজন বলছে , এইসব দালানে আগুন নেভানোর সরঞ্জাম ছিল না। সরকারের উচিৎ কয়েক হাজার কোটি টাকার এইসব সরঞ্জাম কিনে বাড়ি বাড়ি পৌছে দেয়া। আরেকজন কিছু বলার মত না পেয়ে বলল - ‘সেই অগ্নিপুরুষ’ নামে একটা থ্রিলার বই আছে। সেই বইয়ের লেখককে ধরে আইনের আওতায় আনা উচিৎ। অনেক তথ্য বের হবে।
ওমা, লেখকের ছেলে তখনই অনুষ্ঠানে ফোন দিয়ে সাফ জানিয়ে দিলেন সেই বইটা উনার আব্বু লেখেননি। ভুলে প্রচ্ছদে উনার নাম ছাপা হয়েছে। উনার আব্বুর সব বই অন্য লেখকরা সামান্য টাকার বিনিময়ে লেখে।
মোদ্দা কথা যার যা খুশি বলছে।
রাবণ চাচার সর্বনাশ হওয়াতে খুশি হলাম।
মাঝে কয়েকটা দিন কেটে গেল। অবাক হলেও সত্যি , আর কোন দালানে আগুন ধরল না।
এক সন্ধ্যায় দিগুবাবুর বাজার থেকে পুঁইশাক কিনে ফিরছিলাম। নির্জনমত একটা জায়গায় এসেছি, তখনই গাড়িটা এসে ঘ্যাচ করে থামল আমার সামনে। হোঁৎকা মত দুইজন লোক নেমে এসে দাঁড়াল মুখের সামনে। একজন মিহি গলায় বলল, ‘ শুধু পুঁইশাকে তো ভাল জমে না। সাথে চিংড়ি মাছ দরকার। তাই না খোকা ?’
আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চ্যাঙ দোলা করে নিয়ে গেল গাড়ির ভেতরে। ঠেসে গাড়ির ভেতরে ভরে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল দুই হোঁৎকা।
বেঁটে মত একটা লোক বসে চারকোণা কাঁচের গ্লাসে মুতের মত কি যেন পান করছে। মিষ্টি চনমনে ঘ্রানেই বুঝলাম - টডি।
আর টডি মানেই রাবণ গাঙ্গুলী ।
মন খারাপ করে বসে আছেন উনি। চেহারায় বিষাদ। উদাস চোখে বাইরে চেয়ে আছেন।
অনেকক্ষণ পর ফিরে তাকালেন আমার দিকে।
‘হাউ ফানি। হেঁটে বাড়ি ফিরছ যে । রিক্সা ভাড়ার টাকা নেই বুঝি ?’
চুপ করে রইলাম । আবার কি মতলবে এসেছে ?
উদাস ভঙ্গিতে বসে রইলেন চাচা। চেহারায় দিশেহারা ভাব। অনেক সময় পর ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ তুমি ঠিকই জানতে বাগানে ওরা আছে ?’
‘ কারা ?’ এই প্রথম জবাব দিলাম।
‘ ড্রাগন।’
‘আপনি দেখেছেন ওদের ?’
‘ হ্যাঁ। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ডিমগুলো পেয়েছিলাম প্রথমে। রাজমিস্ত্রিরা পেয়ে আমাকে দিয়েছিল। রাগে ভেঙ্গে ফেলেছিলাম। ভেবেছি গুইসাপের ডিম হবে। সেই থেকেই শুরু হল আগুন লাগা। দস্তিদার আর খোশনবীশের দালানে আগুন লাগতেই বুঝলাম শত্রু লেগেছে আমাদের পিছনে। পরের টার্গেট হব আমি। এবং তাই হল। রাতের বেলা ঘুমঘুম চোখে নিজের চোখে দেখলাম উজ্জ্বল মিক্স রঙের দুইটা ড্রাগন উড়ে বেড়াচ্ছে আমার বাসায়। মুখ দিয়ে বের করছে আগুনের হলকা। চোখের সামনে জ্বলে গেল সব। এতটাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম যে বোকার মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। কিছু করার আগেই সব জ্বলে শেষ হয়ে গেল।’
‘কারণটা বুঝেছেন ?’
‘ ডিমগুলো ভেঙ্গে ফেলেছিলাম। আসলে জগতের নিয়ম এটাই। কাউকে কষ্ট দিয়ে কেউ সুখী হয় না।’
ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন চাচা।
‘আমি চলে যাচ্ছি। আপনি ভাল থাকবেন।’ নরম সুরে বললাম।
গাড়ি থেকে নামতে যাচ্ছি পিছন থেকে চাচা বললেন, ‘ তোমার বাবাকে জুয়া খেলার বদ নেশা আমিই শিখিয়েছিলাম। পুলিশ দিয়ে আমিই ধরিয়েছিলাম।’
‘ হাউ ফানি।’ ড্রাগনের নিঃশ্বাসের মত বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
বের হয়ে গেলাম গাড়ি থেকে। কি চমৎকার বাতাস বাইরে। পয়সা ফুলের মত তারা উঠছে আকাশে।
শেষকথা
গ্রামের বাড়িতে হাজার পদের গাছ লাগিয়েছি আমি আর চাচা। দ্রুত বড় হচ্ছে ওরা। কি সবুজ ! আহা ! কয়েক বছরের মধ্য ছায়া ছায়া একটা বন হয়ে যাবে। বৃষ্টির দিনে বারান্দায় বসে দেখি মোতির দানার মত বৃষ্টিতে ভিজচ্ছে গাছপালা। হিটারে চা বসিয়ে পড়তে বসি। বাবা ভাল হয়ে গেছে । গাছের প্রতি ভালবাসা বেড়ে গেছে চাচার। সারা এলাকা একটা মই নিয়ে ঘুরে বেড়ান। পথের ধারে বড় বড় গাছে দুষ্টু লোকেরা পেরেক ঠুকে সাইনবোর্ড ঝুলায়। সাইনবোর্ড ভেঙ্গে ফেলেন তিনি। পরম মমতায় গাছের শরীর থেকে তুলে ফেলেন পেরেকগুলো ।
কেউ বাধা দিতে আসলে বিরক্ত হয়ে চাচা বলেন- গাছদের কষ্ট দিচ্ছ কেন ? অন্যকে কষ্ট দিয়ে কেউ সুখী হয় না। তুমি জামা খুলে দাঁড়াও। আমি পেরেক ঠুকি তোমার গায়ে ? ভাল লাগবে তখন ? হাউ ফানি।’
হোঁৎকা দুইজন সামনে এসে দাঁড়ায়। কেউ বাঁধা দিতে সাহস পায় না।
জঙ্গলটা হলে ড্রাগন ফিরে আসবে ?
নাকি ওরা দেশান্তরী হয় ? পুরানো জায়গায় ফিরে যায় না ? সত্যি ছিল ওরা ? আমাদের মত দুইচারজন কোন ঘটনার কারনে দেখে ফেলে ওদের ? বাদবাকি কেউ ওদের দেখা পায় না ?
আমরা অপেক্ষায় আছি।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন