তিন একর জায়গার উপর বসতি।
ছয় ঘর ভাড়াটে। এক দম ফাঁকা ফাঁকা। পুরো বাসিন্দাদের মধ্যে আমিই এক মাত্র পিচ্চি। নেভি ব্লু ইংলিশ হাফ প্যান্ট আর কচি কলা পাতা রঙের একটা হাফ হাতা জামা পড়ে পুরো এলাকা ঘুরে বেড়াতাম।
বাড়িটা হিন্দু সম্পত্তি। মালিক কোলকাতায় চলে গেছেন। একাত্তরের সময়।হাঙরের মত কিছু মানুষ পুরো বাড়ি ঘর খেয়ে ফেলেছে।
অদ্ভুত সুন্দর জায়গা। প্রচুর বাসক পাতা আর বনতেজ পাতার দঙ্গল চারিদিকে।আমাদের ঘরের পিছনেই হা রে রে রে করে গজিয়েছে বেশ কিছু শেয়াল কাঁটার ঝোপ।হলুদ ফুল ফুটে ওটায়। মনে হয় দামি চিনা কাপড় কেটে বানানো।
পিছন দিকে কাদের যেন পতিত বাড়ি। আম গাছের একটা জয়েন্ট ফ্যামিলি থাকে ওখানে।
কোন একটা মৌসুমে বাঙলার সংখ্যা পাঁচের মত মানে ঠিক ৫ এর মত হাজারে বিজারে আম ধরে থাকে।গাছে আম ধরার আগে সোনালী মকুল না মঞ্জুরি কী যেন হয় জানো বোধ হয় ?সেই মকুল বা মঞ্জুরি থেকে মাতাল করা এক মিষ্টি ঘ্রান বের হয়।
ঘ্রানে যে কেউ পাগল হয়ে যেতে পারে। আমি হইনি। পরিচিত কেউ হয়েছে অমনটা ঠিক জানি না ।
কিন্তু আমার মনে হয় ব্যাপারটা অসম্ভব না।
সেই ঘ্রানে সারাক্ষণ বিং বিং করে সোনালী রঙের মৌমাছি আর বোলতা উড়ে বেড়ায়। দূর অচেনা এলাকা থেকে বড় কিছু ছেলে আসতো আম খাওয়ার লোভে। খালি গা।কাছা মেরে লুঙ্গি পড়া। মনে হয় অদ্ভুত ধরনের বারমুডা শট প্যান্ট পড়েছে।ওরাই কাঁচা আম গুলো ঝিনুকের ছুরি দিয়ে কেটে খেত। হাতের তালুর মত একটা বড় ঝিনুক দেয়ালে ঘষলেই ওর পিঠ ক্ষয় হয়ে যেত।ওখানে আম ঘষলেই খোসা উঠে যেত। বিচিত্র এক পিলার ।
কাঁচা আম লবণ দিয়ে খেতে নাকি মজার। আমার অবশ্য ভাল লাগে না। দাঁত টকে কেমন যেন হয়ে যায়। তখন কিছুরই স্বাদ পাই না। গোবর খেলে ও স্বাদ পাওয়া যাবে না।
কাঁচা আমের আঁটি দিয়ে কারও দেয়ালে কিছু লিখলে সহজে দাগ উঠে না এটা জানি।প্রতিবেশী দফাদার সাহেবের দেয়ালে লিখেছি-
দফাদার চোরা ,তালের বড়া।
কারন আর কিছুই না আমি একবার ন্যাড়া হয়েছিলাম। ভদ্রলোক আমার মাথায় তবলা বাজিয়ে বলেছিলেন-ঠাউল্লা মাথা টাকুর টুকুর ইচা মাছের ঝোল।
বিচ্ছিরি রুচি ভদ্রলোকের।
আমি কাঁচা আম পছন্দ না করলেও বাবা প্রতেকদিন ভাত খাবার সময় আমের ডালের টক না পেলে ঝগড়া করে।সে এক বিরক্তি কর ব্যাপার। রোজ একটা মানুষ আমের ডালের টক খায় কেমন করে ?
অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন আম গাছদের আদি বাসস্থান ছিল ভারত। পরে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। গৌতম বৌন্ধ আম গাছের ছায়ার তলায় বসে ধ্যান করতো অমন কথা শোনা যায়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭-এ আলেকজান্ডার সিন্ধু উপত্যকায় আম দেখে ও খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
আম গাছ ১১৫ থেকে ১৩০ ফুট পযন্ত লম্বা হয়।৩০০ বছর বাঁচে অমন আম গাছ ও নাকি আছে। একটা মৌসুমে পাঁচ পাপড়িওয়ালা সোনালী মুকুলে ভরে যায়।তারপর আম ধরে। সবুজ গাছ ভর্তি কমলা, হলুদ, লাল আর সবুজ রঙের আম ঝুলে থাকে ওদের ইচ্ছা মত। দুই একটা আম ঝুলে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে টুপ টাপ করে খসে পরে গাছ থেকে। হঠাৎ ঝড়ো বাতাস বইলে আহ্লাদে অনেকেই গাছ থেকে খসে যায়।
জরিপ করে দেখা গেছে সারা দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি যে ফল খাওয়া হয় সেটা হল- আম।অনেক দেশেই এক ঝুড়ি আম পাঠানো হয় বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসাবে।আমাকে অবশ্য আজ তক কেউ দেয় নি। ব্যাপারটা খারাপ।আমি আমের আশা করতেই পারি। আমাশা নয়।
আম দিয়ে হাজার বিজার খাওয়া বানানো যায়। আমের চাটনি, হতে শুরু করে পুডিং,দই, লাচ্ছি, কাঁচা আমের শরবত, কাঁচা আম আর আদা দিয়ে সালাদ, এমন কি আমের মদ ও আছে। যেটা সময় আর সুযোগ পেলেই আট দশ বোতল খাব আমি।
ফিলিপাইনে আম জাতীয় ফল।আমাদের দেশে আম গাছ জাতীয় গাছ।দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে বছরে ১৮মিলিয়ন টন আম উৎপন্ন হয়- যা কিনা বিশ্বের মোট আম উৎপাদনের ৪০%
হরেক পদের আম পাওয়া গেলেও ফজলি আর লেংড়া আমের নাম বেশি শুনি। সেই জন্য ইস্কুলের ফজল স্যারকে আমরা সম্মান দিয়ে আড়ালে ফজলি আম ডাকি।
একবার মহল্লায় মোড়ে এক ফেরিওয়ালা চিৎকার করে বলছিল- ‘আম আছে আম ,লেংড়া আম।’
ফচকে ধরনের এক ছোকরা বলেছিল- ‘ভাই এটা যে লেংড়া আম তার প্রমান কি?’
আমওয়ালা মাখনের মত হাসি দিয়ে বলেছিল- ‘লেংড়া দেইখাই তো ঝুড়িতে নিয়া বেচি। নাইলে তো আম গুলানরে হাঁটাইয়া লয়া যাইতাম।’
কী যুক্তি রে বাবা !
ভাল কথা,আমের ইংরেজি নাম Mango। বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাংগিফেরা ইন্ডিকা।৬৩২-৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দে চীন দেশের পর্যটক হিউয়েন সাং ভারতবর্ষে বেড়াতে আসেন। সেই সময় অনেক আম নিজের দেশে নিয়ে যান।
আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে আম গাছ গুলো দেখতাম। ওরা হাত ধরা ধরি করে দাঁড়িয়ে থাকে । পূবালী হাওয়াতে সারাক্ষণ ওদের পাতা আর ডাল পালা নড়ত। হয়তো কথা বলতে চাইতো আমার সাথে। জানালার পাশে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওদের দেখতাম।পাতাগুলো শুকিয়ে হলুদ হয়ে টুপটাপ করে খসে পড়তো কালো পিচ বাঁধানো পথের উপর। মনে হত সোনার ফালি পরে আছে।
বৈশাখ মাসের অনেক বিকেলে আকাশ কালো হয়ে কালবৈশাখী নামত।
শন শন বাতাসে আম গাছ গুলো বড্ড বিব্রত হয়ে যেত। বুড়ো আঙুলের সমান কচি আমগুলো ছড়িয়ে পড়তো চারিদিকে। দুই হাত দুই গালে রেখে বসে বসে দেখতাম পাগল করা সেই প্রকৃতির রূপ।আর কোথাও দেখিনি অমন।
বড় রাস্তাটা চলে গেছে বহু দূর দূরান্ত পযন্ত। হয়তো গিয়ে শেষ হয়েছে অচেনা কোন দেশে।তবে খানিক পথ গেলেই বড় একটা কদম গাছ আছে। বর্ষা কাল এলেই কদম ফুলে গাছ ভর্তি হয়ে যায়।ফুলগুলো স্কটল্যান্ডের উলের বলের মত ।
সেই কদম গাছের তলায় বসে সেদ্ধ মিষ্টি আলু বিক্রি করে এক বুড়ী মা।
বুড়ী মা একদম বুড়ী।চোখে দেখে না সে। তার চোখ দুটো পুরানো রাজ প্রাসদের জানালার ঘষা কাঁচের মত।যেন চোখের সামনে ঝুলে আছে নিরাক পড়া জোসনা। সামনে অ্যালুমিনিয়ামের মস্ত এক থালা। ওখানে অবহেলায় শুয়ে আছে সেদ্দ করা কত গুলো মিষ্টি আলু। এক দম পিচ্চি পিচ্চি। সবচেয়ে বড়টা হাতের মধ্যমা আঙুলের মত।
অদ্ভুত এক কারনে আলুগুলো কালো কুচকুচে।দাম একটা আলু চার আনা করে। মানে পঁচিশ পয়সা। তখন নক্ষত্রের মত ঝিকিমিকি করা এক মুদ্রা ছিল। ওরা চার ভাই মিলে এক টাকা হত। তেমন একটা মুদ্রা দিলেই যে কোন একটা মিষ্টি আলু নেয়া যেত। বেছে নাও ,নিজের মত।
দিনের শেষে আবির রঙা বিকেলে খুচরা পয়সা পুঁটুলিতে গুঁজে অ্যালুমিনিয়ামের থালা বগলে নিয়ে হেঁটে যেত বুড়ী । কোথায় থাকে কে জানে ? হাতে ছিল এক লাঠি। ঠক ঠক করে শব্দ তুলে হাঁটত। যেন অ্যালুমিনিয়ামের মস্ত চাঁদটাকে বগলে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে চাঁদের বুড়ী।
ঝুম বৃষ্টি নামলে বুড়ী মা কদম গাছের তলায় বসে থাকে। বসে বসে ভিজে। মুখ তার মাকড়শার জালের মত।অতীত দিনের কথা ভেবে একা একাই হাসে । মাথায় উপর ঘন সবুজ কদম গাছ।হলুদ ফুলে ভর্তি। পাগল করা এক মিষ্টি ঘ্রান।
কদম ফুল আর বর্ষা কাল একই জিনিস। কাউকে ফেলে কাউকে নেয়া যায় না। কদমের পাগল করা ঘ্রানে বাদুর আর কাঠ বিড়ালী চলে আসে। ফুলের রেণু ফেলে দিলেই ন্যাড়া মাথার মত শক্ত বল পাওয়া যায়। বাদুর আর কাঠ বিড়ালীর প্রিয় খাবার।
কদম গাছ হিন্দুদের প্রিয় গাছ। কারন বিষ্ণু পৃথিবীতে নয় বার এসেছিলেন।শেষ বার এসেছিলেন কৃষ্ণ হয়ে। এই কৃষ্ণ কদম গাছের তলায় বসে থাকতো।বেশির ভাগ কৃষ্ণ মার্কা গানে দেখবে কদম গাছের কথা আছে।
রাতের বেলা কদম গাছের তলায় বসে থাকলে কদম ফুলের ঘ্রানে নাকি নেশা হয় ।ভারতের কোন কোন জায়গায় কদম গাছের গোঁড়ায় গর্ত করে ছোলা আর লবঙ্গ রেখে দেয়। সারারাত গাছের রসে ভিজে ফুলে ফেপে যায় ছোলার দানা।পরদিন সেই ছোলা খেলে নেশা হয়।
কবিরাজদের কাছে কদম গাছের কদর বেশ। পাতা, ফুল সবই ওষুধ বানানোর কাজে লাগায়।আমি জুতার বাক্স দিয়ে গাড়ি বানাই। আর কদম ফুলের পাপড়ি ফেলে দিয়ে যে বল পাই সেই বলে ঝাড়ুর শলা গেঁথে দিলেই গাড়ির চাকা হয়ে যায় ।
বাদলার দিনে জানালার পাশে বসে এইসব দেখি আমি।
রেইন কোট পরে এক লোককে হেঁটে যেতে দেখতাম। হাতে মাছের পোঁটলা।
শুধু ঝুম বৃষ্টি হলেই লোকটাকে দেখতাম।দূরে বউ বাজার থেকে ফিরছে। বৃষ্টি হলেই এই বাজারের সব জিনিস সস্তা হয়ে যায়।রুপালী মাছ, সবুজ শাক সবজী । সব।
দোকানীরা বিকি কিনি করতে চায় না।
তখন রেইন কোট আর গাম বুট পড়া এই লোকটা সব কাজ ফেলে চলে যায় বউ বাজারে। কিনে আনে কয়েক ভাগা কাচকি, চাপালি , রয়না , চান্দা, দারকিনা, তিত পুঁটি, খলসে , কাজলি, বাতাসি, বা চিংড়ি মাছ। চিংড়ি মাছকে লোকটা ইচা মাছ বলে।আমি শুনেছি।
পথে কারও সাথে দেখা হলেই সে মাছের পোঁটলা বের করে দাঁত বের করে হেসে বলে কত দিয়ে আনলো।আর সবাই বেশ আফসোস করে। সবাই বলে ,তাদের রেইন কোট আর গাম বুট থাকলে তারাও এই বৃষ্টির মধ্যে বাজারে যেত। সস্তায় মাছ পেত।
তামাম শহরে বোধ হয় এই একজনের কাছেই রেইন কোট আর গাম বুট আছে। আর সবাই তাকে হিংসা করে। কারন বৃষ্টি এলে সে এগুলো পরে গট গট করে হেঁটে যেতে পারে। একটুও ভিজে যায় না।
বড় হলে আমিও রেইন কোট আর গাম বুট কিনব।হেঁটে যাব রিমঝিমে বৃষ্টির মধ্যে।
বৃষ্টি শেষ হলে গাছ পালা আরও সবুজ হয়ে যায়। আকাশটা হয়ে যায় রাংতার মত ঝক ঝকে।
তখন সারাদিন টিভি চলতো না। শুধু বিকেল পাঁচটার পর টিভি স্টেশন চালু হত। একজন মুরুব্বী কোরআন তেলওয়াত আর তরজমা করে অনুষ্ঠান চালু করতো। টিভির ঝিরঝিরে পর্দায় আমার চোখ আঁটকে থাকতো না।
বাইরের দুনিয়া দেখতাম। পাখ পাখালি, ফুল ,গাছ আর লতা গুল্ম।সেমাইয়ের মত স্বর্ণলতার ঝাড় দেখে অবাক হতাম।
হাঁটতে হাঁটতে বহু দূর চলে যেতাম ।দেখি ওখানে বড় বড় ঝুপসি কিছু গাছ আছে। পাতা গুলো কেমন তেজপাতার মত। আর ওদের বাকল শুকিয়ে দারুচিনির মত লাগছে। নিজেরাই খুলে আসছে গাছের গোঁড়া থেকে।
হলুদ রঙা খা খা দুপুরে মুঠো মুঠো সেই দারুচিনি নিয়ে আসি মায়ের জন্য।কত সামান্য দারুচিনি বহু দাম দিয়ে কিনি আমরা পাকরাশিদের দোকান থেকে।আর এখানেই তো কত কেজি কেজি দারুচিনি।
আর কেউ জানে না এখানে এই সব দামি জিনিস পাওয়া যায় ?
আমার সংগ্রহ করা দারুচিনি গুলো দেখে মা বলল - ওগুলো দারুচিনি না। ইউক্যালিপটাস গাছের বাকল। মায়াবী কোন সৌরভ নেই।
হায় হায়।
মায়ের কোন উপকার করতে পারলাম না বলে দুঃখ পেলাম।
আমার শহরে তখন গাছ গাছালি ছিল বেশ রকম। প্রতিবেশীর মত ওরা ছিল আমার চারিদিকে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসতো হিজল গাছের ছায়ায় ছায়ায়। শীতের হাওয়াতে কাঁপত আমলকী গাছ। গরমের দুপুরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে ঝিমাতো তাল গাছ।
রামকৃষ্ণ মঠের সাথেই লাল রঙের পিচ্চি একটা পোস্ট অফিস। ওর উপরে দৈত্যের মত দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বড় একটা কাঠ বাদাম গাছ। পাতাগুলো হত হাতের তালুর মত বড় বড়। অনেক ঠাসা হয় পাতা গুলো। আর কী সুন্দর ঘন সবুজ রঙ।
ফুল হয়।
বরই গাছে যেমন নাক ফুলের মত ফুল ধরে তেমনই। সবুজ লম্বাটে বিদঘুটে এক ফল হয়। ফলটা পেকে গেলে লাল রঙের ক্রিকেট বলের মত হয়ে যায়। কাটলে দেখা যায় ভেতরে লাল রঙের মখমলের মধ্যে লম্বা কালো রঙের দানা দানা বাদামগুলো ঘুমিয়ে আছে।
খেতে দারুন। অনেকেই কাঠ বাদামকে বাক্স বাদাম বলে । জংলী বাদামও বলে। বাক্স বাদাম নামটা দারুন না ?
শীতের মৌসুমে এই গাছের পাতা প্রথমে গোলাপি রঙের হয়ে যায়। তারপর লাল , তারপর হলুদ হয়ে টপ টপ করে সারাক্ষণ খসে পড়তে থাকে। এই গাছের পাতা খসে পড়া দেখতে ও দারুন লাগে ।
আদর্শ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে মিষ্টি আর সন্দেশ কেনা হত। ওরা শুকনো কাঁঠাল পাতা জোড়া দিয়ে দারুন রকম একটা বাউলের মত বানিয়ে মিষ্টি - সন্দেশ দিত। বাদামী রঙের পাতার এই ঠোঙা দেখলে মনটা কেমন হয়ে যেত। তখন ও বাহারি রঙের ব্র্যান্ড করা বাক্স চলু হয়নি।
লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দিরের বাইরে কতগুলো মহিলা সারাদিন শুকনো পাতা কুড়াতো। ওরা পাতা কুড়ানি। মন্দিরের বাইরে ছিল এক গাদা কাঁঠাল গাছ। খানিক পর পরই ওরা ওদের শুকনো পাতাগুলো ফেলে দিত।বিষণ্ণ বাতাসে ভেসে ভেসে পাতাগুলো পড়তো। হারিয়ে ফেলা প্রিয়জনদের মত।
একটা মৌসুমে নাদুস নুদুস কাঁঠালে গাছ ভর্তি হয়ে যায়।কাঁঠালের মন মাতানো ঘ্রানের জন্য সবাই কাঁঠাল পছন্দ করে ।আবার এই ঘ্রানের জন্যই অনেকে অপছন্দ করে।
ছোট বেলায় ছবিওয়ালা ইংরেজি বইতে পড়েছি কাঁঠালের ইংরেজি হচ্ছে জ্যাক ফ্রুট। আমাদের ইস্কুলের স্যারটা ছিল বোকা। সে বলত- শেয়াল কাঁঠাল খেতে পছন্দ করে তাই একে বলে জ্যাক ফ্রুট। জ্যাক মানে শিয়াল। আসলে স্যার ভুল বলেছিল। জ্যাক ফ্রুট মানে হচ্ছে সাধারন লোকের ফল। ধনীদের ফল না। সবাই খেতে পারে। কাঁঠালের বৈজ্ঞানিক নাম আর্টোকার্পাস হেটেরোফাইলাস Artocarpus heterophyllus ।
বিচ্ছিরি নাম , যে কোন সহজ জিনিসের বৈজ্ঞানিক নাম গাল ভরা বা কঠিন হয়। যেমন, আমার বৈজ্ঞানিক নাম হতে পারে - মিলনাসক গানগুলীপ্তিস।
কাঁঠাল গাছ নিয়ে সারাদিন কথা বললেও শেষ হবে না।
এই গাছের সব কিছুই কাজে লাগে। পাতা ছাগলে খায়। ঈদের দিন যারাই ছাগল কিনে সবাই পাগলের মত কাঁঠাল পাতার খোঁজে বের হয়ে যায়। পুরো তল্লাট কাঁঠাল গাছ খোঁজে। অথচ সারাজীবন এরা কাঁঠাল গাছের কোন খোঁজ খবর নেয় না। দেখলেও চেনে না।
লোকে কাঁঠাল খেয়ে এর দানা বহু কায়দা করে খায়। দানা ভাজলে একদম দামি বাদামের মত লাগে খেতে। আখরোট মাখরোটের চেয়ে ভাল। মা কাচকি মাছের সাথে মিহি করে কাঁঠাল দানার কুঁচি দিয়ে তরকারি রান্না করে। পুরানো দিনের কবিগণ অমৃতসম না কি যেন বলতেন না ?
অমন লাগে।
প্রতিবেশী বাসন্তী পিসীর মা কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে তরকারি রান্না করে। খেতে নাকি একদম পাঁঠার মাংসের মত। আর এই জন্যই উনারা কাঁঠালকে গাছপাঠা বলে।
বলেছে রান্না করে একদিন আমাকে নিমন্ত্রণ করবে।
আমি অপেক্ষায় আছি।
কাঁঠালের খোসা যেটাকে বোথা বলে সেটাও দেখি গরু আহ্লাদ করে খায়। ভাতের গরম মাড়ের সাথে বোথা দিলে গরু চোখ বন্ধ করে চিবোয়। মনে হয় কাঁঠালের পুডিং খাচ্ছে বেচারা। কাঁঠাল গাছের কাঠ ও খুব ভাল। ভাল আসবারপত্র হয় নাকি। আসবারপত্র মানে ঐ যে আলমারি, সিন্দুক, আলনা , বিছানা এই সব হাবিজাবি ।
আরও অনেক রকম গাছ ছিল আমার প্রতিবেশী হিসাবে।
একটা বড় চালতা গাছ ছিল খাঁজ কাঁটা ওদের পাতা। সবুজ বলের মত ঝুলে থাকতো চালতা।
চালতার বৈজ্ঞানিক নাম Dillenia indica। উচ্চতায় ১৫ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। একটি গাছে বছরে ৯০-১০০ কেজি চালতার ফলন হয়। চালতা গাছ সাধারণত ৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। বর্ষার শুরুতে গাছে সাদা রঙের ফুল ফুটে। আর কি মিষ্টি ঘ্রান বের হয়। ইংরেজিতে চালতাকে Elephant apple বলে। হাতির আপেল।
শুনেছি হাতি নাকি চালতা খেতে পছন্দ করে। প্রতিবেশী কেউ হাতি পোষে না।তাই ব্যাপারটা সত্য কী না জানি না।
বিবর্ণ ধূসর এক বাড়ির সামনে পুরানো এক আতা গাছ ছিল।
মাখন রঙা পাকা আতা হয়ে থাকতো গাছ ভর্তি। বারান্দায় বুড়ো এক লোক বসে বসে পুরানো পঞ্জিকা পড়তো। বাড়ির ভেতর থেকে গানের সুর ভেসে আসতো। হেঁটে যেতে যেতে আমি দেখতাম।
আহা বড় সুখের দিন ছিল । মনির ভাইয়ের মুদির দোকানের পিছনে মস্ত বড় দুই ডুমুর গাছ ছিল। পাশাপাশি হাত ধরে । যেন দুই ভাই।
এই দুই গাছের কথা কি ভোলা যাবে ? পুকুরের উপর অনেক খানি ঝুঁকে ছিল দুই ডুমুর । খোঁজ নিয়ে জেনেছি ওরা যজ্ঞ ডুমুর। ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় ওরা ভাল থাকে। বেশির ভাগ ডুমুর গাছই নাকি পুকুর পাড়ে জন্মায় বা ভাল থাকে।
বর্ষা শেষ হলেই দেখতাম গাছ ভর্তি হয়ে গেছে ডুমুরে। আর কিছুদিন পরই পেকে লাল হয়ে আছে। দখিণা হাওয়াতে সারাক্ষণ ট্যাঁস ট্যাঁস করে গাছ থেকে পাকা ডুমুর খসে পড়তো। ওদের ভেতরে পোকা। সেই পোকা ভর্তি ডুমুর খাওয়ার লোভে এক গাদা কাক সারাক্ষণ এসে ঝামেলা পাকাতো।
কাকডুমুর নামে এক অন্য প্রজাতির ডুমুর গাছ আছে। ওদের ফল অনেক খেয়েছি। মিষ্টি মাংসল স্বাদ।রাতের বেলা বাদুর ও ডুমুর খাওয়ার লোভে ঘুড়ির মত উড়ে আসে।
প্রতিবেশী এক বুড়োকে রোজ ডুমুর খেতে দেখতাম। ডুমুর খেলে ডায়াবেটিস ভাল হয় নাকি । ডুমুর গাছদুটোর ওখানেই ছিল এক খোলা বাথরুম। যারা হাগু মুতু করতে যেত খানিক পরপরই তাদের মাথায় ডুমুর পড়ায় যার পর নাই বিরক্ত হত।
রামসীতা মন্দিরে একটা তাল গাছ ছিল। বহু দূর থেকে গাছটা দেখে বুঝতাম বাড়ির কাছাকাছি এসে গেছি। চিনির ফল নামে বিচিত্র এক গাছ ভর্তি পাকা চেরির মত লাল ফল ভর্তি হয়ে থাকতো। মিষ্টি। ভেতরে সুজির মত দানা দানা ।অনেকে সুজি ফলও বলতো।
লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দিরের বাইরেই বড় এক দীঘি। জিওস দীঘি। উল্টো দিকে বড় বড় দুই বট গাছ। হিন্দুরা ঐ দুই গাছের পূজা করতো। অনেক পুরানো গাছ নাকি। শোল আর গজার মাছ পুড়িয়ে শনি দেবতার নামে ভোগ দিত। যাতে শনি দেবতা বিরক্ত না হয়। গাছের গোঁড়ায় দগ দগ করতো লাল রঙের মেটে সিন্দুর। সন্ধ্যা বেলায় একা হেঁটে যাবার সময় ভয় পেতাম।
শহরের সবচেয়ে ধনী লোকটার লাল ইটের বাড়ির বাইরে এক গাদা বাবলা গাছ ছিল।তেঁতুল পাতার মত ঝিরিঝিরি পাতা।হলুদ সুন্দর ফুল ভর্তি।
ঠিক কয়টা কৃষ্ণচুড়া গাছ ছিল আমার শহরে ?
এই মুহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না।
যাদের চিনতাম একটা ছিল রামবাবুর পুকুর পাড়ে। পেল্লাই সাইজের।
নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের বাইরে ছিল একটা। দিগু বাজারের ভেতরে একটা। ওটার নীচে আবার সিমেন্টের বাঁধাই করা বেঞ্চি ছিল। বাজার সওদাই করে ক্লান্ত সওদাগরেরা বসত সেই বেঞ্চিতে।
তখন হয়তো দুপুরের দাবদাহ । কাঞ্চন রঙ্গা রোদ।
পৌর পাঠাগারের বাইরে ছিল একটা।
সস্তাপুরের ওখানে নিরালা পথের ধারে দুটো ছিল পাশাপাশি। ওদের বৈজ্ঞানিক নাম ডেলোনিক্স রেজিয়া। ঐসব রেজিয়া ফেজিয়ার চেয়ে কৃষ্ণচুড়া বেশ সুন্দর। নবাবী আমলে গুল মোহর বলতো।
শুনেছি ওদের বাড়ি মাদাগাস্কারে। কোন এক পাদ্রি ওকে এই কাজল দেশে নিয়ে এসেছিল ভালবেসে।
আমাদের দেশে বসন্ত কালে ওর ফুল ফোটে। ফুল তো নয় একবারে জ্বলন্ত কয়লা। তবে পৃথিবীর সব দেশে একই সময়ে এই ফুল ফুটে না।
কেন ?
সেটা ওদের মজি। আমি জানব কেমন করে ?
এই গাছের কোন অংশ খাওয়া যায় না। কিন্তু কবিরাজি চিকিৎসায় এর শিকড় বাকড় অনেক কাজে লাগে। ফুলের ক্বাথ ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় কার্যকর। গাছের ছাল জ্বাল দিয়ে সেই পাঁচন খেলে পেটের সমস্যা ভাল হয়ে যায়। হেন তেন।
শামসুর রাহমান লিখেছিলেন-
''আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে
কেমন নিবিড় হয়ে। কখনো মিছিলে কখনো-বা
একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়—ফুল নয়, ওরা
শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর।
একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনার রঙ।''
রেইলাইনের দুই পাশে ছিল অসংখ্য কড়ই গাছ। লাইন ধরে দাঁড়িয়ে ছিল ওরা। প্রহরে প্রহরে কুউউ ঝিঁক ঝিঁক করে রেলগাড়ি যেত ওদের পাশ দিয়ে। শীতের কমলা রঙের বিকেলে হেঁটে যেতাম। হলুদ গোল গোল পাতা ঝরে পড়তো । মনে হত অচেনা জগতের কোন এক মহারাজা খুশি হয়ে মুঠো ভর্তি সোনার মোহর ছুড়ে দিচ্ছে আমাকে ।
শহরের প্রতি মোড়ে, অথবা বড় রাস্তায়, প্রিয়জনের মত হাসি মুখে এক একটা গাছ দাঁড়িয়ে থাকতো । বুক ভরা ভালবাসা নিয়ে। কেউ মিষ্টি কোন ফল দিত, কেউ ছায়া দিত, ফুল দিত।
আর যে কিছুই দিতে পারতো না সে লজ্জায় নিজের শুকনো পাতা গুলো ফেলে দিত বিবাগী হাওয়ায়।
আগেও বলেছি । আবারও বলছি, বড় বড় এই গাছগুলো আমার বন্ধুর মত ছিল। ওরা ছিল আমার স্মৃতি
আর কল্পনায়। ওরা বেঁচে ছিল আমার সময়ে। অথচ ওরা জন্মেছিল আমার আগে। ওদের রোজ দেখতাম। ওরাও নিশ্চয় আমাকে দেখত? চিনত নিশ্চয়ই ? কোন বিজ্ঞানী না বলেছেন- গাছ মানুষকে মনে রাখতে পারে।আমাকে মনে রেখেছে না ওরা ?
আজও কমলা শীতের বিকেলে হাঁটতে বের হই। গরমের অলস হলুদ দুপুরে ছন্নছাড়ার মত টই টই করে হাটি । বর্ষার জলে ভিজে ওদের খুঁজি। একটা চেনা গাছ ও নেই।
একটাও না। কোনটাই না।
রাস্তা পাকা করার সময় কেটেছে কদম আর বট গাছ। মন্দির বড় করতে গিয়ে কেটেছে সব কাঁঠাল আর কাঠ বাদাম গাছ।একশো গাছ কেটে একটা নতুন গাছ বুনেছে কি না সন্দেহ।রেললাইনের দুই পাশের সব কড়ই গাছ কেটে বিক্রি করেছে এলাকার চেয়ারম্যান। ওখানে চায়ের দোকান , ভাতের হোটেল আর মুদী দোকান হয়েছে লাইন ধরে।
মনির ভাইয়ের দোকানের পিছনের ডুমুর গাছ কেটে বড় ফ্ল্যাট বাড়ি হয়েছে। এক গাদা মানুষ থাকে ওখানে মুরগীর মত।
শহরের সবচেয়ে ধনী লোকটার বাড়ির সব গুলো সাই বাবলা কেটে ওখানে টেনিস খেলে কেউ কেউ।
চেনা কোন গাছ নেই। যারা আমার শৈশব থেকেই ছিল। ওরা ছিল আমার আত্মীয়ের মত।
যাদের আজও খুঁজি। নেই।
ওরা সব চলে গেছে। চোখ বন্ধ করলে ওদের দেখি আজও। কান পাতলে পাতা খসার শব্দ পাই।
এই গাছেরা আমার শৈশব কৈশোর রঙ্গিন করে রেখেছিল।
কত গনগনে গরমের দুপুরে বগলে ক্লাসিক বই হাতে করে হেঁটে গেছি এই সব গাছের তলা দিয়ে।
রাস্তা ভর্তি হয়ে যেত ওদের লাল ফুলে। যেন পারস্যের গালিচা।
একটা একটা করে ওদের কেটে ফেলেছে। আমি যখন দেশে আসি দেখি ওরা নেই। নতুন করেও কেউ বুনেনি।
তবে চোখ বুজলেই ওদের দেখা পাই।
বৃষ্টির পর গাছগুলো স্নান করে কেমন একটা অপরূপা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতো। হেঁটে যেতাম আমি। হাতে - সি উলফ। বাস্কারভিলের হাউনড। রুদ্র প্রয়াগের চিতা।
সেই কিশোর এখনও গাছগুলোর জন্য কষ্ট পায়। কেউ জানে না।
(শেষ)

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন