পাঁচ
আলোচনার শুরুতে অ্যাভেঞ্জার বিমান ফ্লাইট 19 নিয়ে কথা বলেছি।
ওটা নিয়ে প্রচুর লেখা হয়েছে। কয়েক হালি বই বের হয়েছে বাজারে। এখন ও বাজারে পাওয়া যায়।
বিমান হারানোর কাহিনি এটাই যে প্রথম তা নয় কিন্তু। আগেও হারিয়ে গেছে। কিন্তু ফ্লাইট নাইনটিনের মতো সারা দুনিয়া কাঁপানো আকাশ রহস্য আগে হয়নি।
জুলাই ৩ , ১৯৪৭ চার ইঞ্জিনের C- 54 বিমান হারিয়ে গেল. মাত্র কয়েক মাস পর ১৯৪৮ সালের ৩১শে জানুয়ারি, রহস্যময় ভাবে হারিয়ে গেল স্টার টাইগার বিমানটা। একুশ জন যাত্রী আর ক্রু সহ।
সান্তামারিয়া থেকে অ্যাজর (দক্ষিণ অ্যাটল্যান্টিকের বিখ্যাত এক দ্বীপ) হয়ে বারমুডা ফিরছিলেন। বিমানে ক্যাপ্টেন ছিল ব্রায়ান ম্যাকমিলান।
বারমুডাতে ফেরার দুই ঘণ্টা বাকি । তখনই বারমুডার রেডিও অপারেটর রাত ৩,১৭ মিনিটে স্টার টাইগার থেকে রেডিও মেসেজ পান। কিন্তু খুবই অস্পষ্ট ছিল সেই মেসেজ । কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
বারমুডার রেডিও অপারেটর ৩,৫০ পর্যন্ত স্টার টাইগার এর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করতে লাগলেন। কোনও লাভ হল না। এরপর আর কোনও মেসেজ পাঠায়নি স্টার টাইগার। কোনও মেসেজের জবাবও দেয় নি ।
ছাব্বিশটা বিমান ৮৮২ ঘণ্টা ধরে তল্লাশি চালায় সমুদ্র উপকূল। যেখান থেকে শেষ মেসেজ পাওয়া গিয়েছিল বলে অনুমান করা হয়েছে সেখান থেকে শুরু করে সম্ভাব্য গতিপথ পর্যন্ত।
কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
সিভিল এয়ার মন্ত্রণালয় থেকে রিপোর্ট দেওয়া হল - ঠিক কী কারণে বা কী করে স্টার টাইগার হারিয়ে গেছে সেটা বলা যাচ্ছে না। সম্ভবত জ্বালানি ফুরিয়ে গিয়েছিল। উড়তে উড়তে রুটের বাইরে চলে গেছিল বিমানটা। তারপর সমুদ্রের বুকে কোথাও পড়ে গেছে।
সঙ্গত কারণে ব্যাখ্যাটা খুব দুর্বল মনে হয়েছে সবার কাছে।
আবহাওয়া ?
হ্যাঁ , আবহাওয়া খুব ভাল ছিল । সেদিন ঝড়ো বাতাস বয়নি , যে জোরালো বাতাসে ধাক্কা খেয়ে বিমান রুটের বাইরে চলে যাবে। বা বিমানে প্রপেলারের ক্ষতি হয়ে খসে সমুদ্রে পড়ে যাবে।
বৈদ্যুতিক ঝড় হয়নি সেদিন, যে রেডিও বিকল হয়ে বা ফুয়েল ট্যাংক ছিদ্র হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়বে।
শেষ মেসেজ হিসাবে বারমুডা থেকে স্টার টাইগার ছিল ৩০ মাইল দূরে । ওখানে যদি বিমান খসে পড়ত, তবে বারমুডার আশপাশে ছোট দ্বীপগুলোতে বিমান পড়ার কথা। আর জ্বালানি শেষ হয়ে গেলেও দুই ইঞ্জিনের সাহায্যে নিরাপদে বন্দরে ফিরে আসতে পারত।
রিপোর্টের শেষ কথা ছিল-
সমস্ত তথ্য প্রমাণ দেখে অনুমান করা কষ্ট , স্টার টাইগার বিমানটায় আসলে কী হয়েছিল? দুর্ঘটনার কারণ হিসাবে যা কিছু থাকার দরকার তেমন কোন আলামত নেই। অনেক রকম অনুমান করলেও প্রমাণ নেই কিছুর । তবে ধারণা করা যায় মানুষ এবং মেশিন দুটি পরস্পর বিরোধী জিনিস । এমন বৈপরীত্য কোনও চরিত্র পাশাপাশি দীর্ঘক্ষন অবস্থান করলে যে কোনও রকম ভুল হতে পারে। আর সেই ভুলের ফলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। স্টার টাইগার একটি অমীমাংসিত রহস্য।
রিপোর্টটা আপনার কাছে কেমন লাগল জানি না । আমার কাছে একদম হাস্যকর রিপোর্ট এটা । উনারা কী বলেছেন উনারাই ভালো জানেন।
স্টার টাইগার এর রেশ ফুরিয়ে যেতে না যেতেই ১৯৫০ সালের জানুয়ারি ১৭ হারিয়ে গেল স্টার এরিয়েল। বিমানটা মাত্র টেক অফ করেছিল। সাথে ছিল উনিশ জন ক্রু এবং যাত্রী। ক্যাপ্টেন জন ম্যাকফি দুটো মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। যাতে মনে হয় আপাতত তাঁরা নিরাপদে ফ্লাই করছেন। আকাশে কোনওরকম সমস্যা নেই।
আর কোনও মেসেজ পাওয়া যায়নি।
মিলিটারি জাহাজ আর কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছু পায়নি। ফলাফল স্টার টাইগারের মতোই অমীমাংসিত।
১৯৫২ সালের ডিসেম্বর ২১, হারাল কার্টিস C 46 বিমানটা। মাল বহন করতো। ক্রু ছিল তিনজন। আবহাওয়া ছিল চমৎকার। ঝড় বৃষ্টি ছিল না।
বিমান হারানোর প্রত্যেকটা রিপোর্ট , আমি নিজে সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়লান। কোন বৈচিত্র নেই।
মোটামুটি একই রকম ঘটনা । হারিয়ে গেছে কিন্তু সেদিন আকাশ ছিল পরিষ্কার । ঝড় বৃষ্টি তো দূরের কথা এক টুকরো মেঘও ছিল না আকাশে।
সঙ্গত কারণেই হারানো সব বিমানের তালিকা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলাম না।
সবচেয়ে অবাক হয়েছি, যখন খেয়াল করলাম - মিলিটারি বিমান হারিয়ে গেছে একটার পর একটা৷ অথচ মিলিটারি বিমানগুলিতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে সর্বোচ্চ পরিমাণে।
ঠিক কী পরিমাণে মিলিটারি বিমান হারিয়ে গেছে , সংখ্যাটা আজও অজ্ঞাত। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বহু বিমান হারিয়েছে আটলান্টিক মহাসাগরে নানা জায়গাতে। সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি আজও।
১৯৪০ থেকে ১৯৬ দীর্ঘ দুই যুগে বিমানে মডেল এবং কারিগরি ব্যবস্থার উন্নত হয়েছিল যথেষ্ট ৷ তাতে তেমন বেশি লাভ হয়নি। পুরনো দিনের মতোই নীরবে হারিয়ে গেছে নতুন যুগের আধুনিক বিমানগুলো । পাওয়া যায়নি কোনও ধ্বংসাবশেষ৷
কখনো কখনও অগভীর সমুদ্রেও হারিয়ে গেছে ওরা।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন