এক
বিপদবাবু আবিস্কার করলেন উনার বাড়িটা যথেষ্ট রোমাঞ্চকর না।
বিরক্তকর।
একঘেয়ে।
ক্লাসিক সাদাকালো মুভি বা অস্কার পাওয়া আর্ট ফিল্মের মত সাদাসিধে।
কোন উত্তেজনা নেই।
প্রাণ নেই।
কেমন পানসে।
বিপদবাবুর আসল নাম বিপদনাশিনী । লোকজন সেটাকে ছোট করে বিপদ বানিয়ে ফেলেছে। নাম ছোট করা একটা শিল্প। সবাই জানে না। যারা পারে তারা মস্ত কারিগর।
অত কথা ফেনিয়ে লাভ নেই। আমরা আসল কাহিনিতে চলে যাই।
বিপদবাবু একা থাকেন। বয়স মাত্র পঞ্চাশ। দেখলে আরও বেশি মনে হয়। মাথায় প্রফেসর শঙ্কুর মত টাক। মুখে বীজগণিতের সেকেন্ড ব্র্যাকেটের মত গোঁপ। বিয়ে করেননি। উনি মনে করেন, বিয়ে মানেই ঝামেলা। বারতি খরচ।
বাড়িটা একতলা । খানিকটা পুরানো ধাঁচের।
কারও সাথে মেলামেশা করেন না।
কেউ নিমন্ত্রণ দিলে যান না। নিজেও কাউকে নিমন্ত্রণ দেন না। বন্ধু-বান্ধব নেই। বন্ধু থাকলে চা বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করতে হবে সেইজন্য বন্ধু বানাতে চান না। টিভি দেখেন না , কারেন্ট বিল আসবে সেই জন্য। খবরের কাগজ রাখেন না। রাস্তায় মোড়ে দাঁড়িয়ে দেয়ালে সাঁটানো খবরের কাগজ পড়ে বাড়ি চলে আসেন। সকাল বিকাল এক পেয়ালা চা খান। তাও চা পাতা কেনেন না। গাঁদা ফুলের পাঁপড়ি শুকিয়ে গরম জলে সিদ্ধ করে সেটাই ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে খান। কখনও শুকনো কাঁঠাল পাতা কুঁচি করে অমন চা বানান। অপরাজিতা ফুল দিয়েও অমন চা বানানো যায়।
কাউকে পছন্দ করেন না। বাড়ির সামনের রোঁয়াকে এক ফকির এসে রাতের বেলা ঘুমাত । সেই ফকিরের পাছায় লাত্থি মেরে কয়েকবার উঠিয়ে দিয়েছেন। ফকির এখন পাশের দালানের সিঁড়ির নিচে ঘুমায়। পাশের দালানের দারোয়ান রুস্তম খান কয়েকবার সালাম দিয়েছিল। কষে ধমক দিয়ে রুস্তম খানকে থামিয়ে দিয়েছেন। এখন কথা বলে না রুস্তম।
কোন বন্ধু নেই।
একা।
এক সময় মনে হল, বিরক্তকর এই জীবন থেকে মুক্তি পাওয়া দরকার।
বাড়িটা একটু রোমাঞ্চকর হলে ভাল হয়। যেমন রাতের বেলা বাথরুমের কলটা হঠাৎ করেই খুলে যাবে।সাদা কাপড় পরা কেউ বারান্দার দরজায় খটখট করে কড়া নাড়বে। বিছানার তলা থেকে দুটো হাত এসে বিপদবাবুর পা টেনে ধরবে।
এইসব আর কি।
তিনি অনেক দিন ধরে খেয়াল করেছেন - সুলতানগঞ্জ থেকে ফেরার পথে নদীর পারে যে রাস্তাটা , ওখানে পুরানো আমলের কতগুলো দোকান আছে। মশলা , সৈন্ধব লবণ , আমলকী , অমন হাবিজাবি কবিরাজি ওষুধ বিক্রি হয়। ওখানেই একটা দোকান দেখেছেন। দোকানের নাম- পিশাচ বিতান। অনেকবার ভেতরে ঢুকবেন করেও ঢোকা হয়নি। ভেতরে টিমটিমে কমলা রঙের একটা আলো জ্বলে। তাক ভর্তি কাচের বয়াম ছাড়া আর কিছু নেই।
বিকেল বেলা অফিস শেষ করে একদিন কি মনে করে পুরানো সেই দোকানটায় চলে গেলেন।
আদ্দিকালের দালান।
উল্টো দিকে নাৎসি বিরিয়ানি হাউজ। ভাল চলে। এই দোকানের মালিক বক্সি মিয়া হিটলারের জন্য বিরিয়ানি রান্না করতো । হিটলার নাকি সেই বিরিয়ানি বেশ পছন্দ করতেন। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর বক্সিমিয়া দেশে ফিরে এই দোকান চালু করেন।
দুই ধরনের বিরিয়ানি রান্না হয় । কাচ্চি বিরিয়ানি আর পাক্কি বিরিয়ানি। যেই বিরিয়ানিতে মাংস টক দই আর মসলা দিয়ে মাখিয়ে চালের সাথে মিশিয়ে একসাথে রান্না হয় সেটা কাচ্চি বিরিয়ানি। আর পাক্কি বিরিয়ানিতে রান্না করা মাংস অর্ধেক রান্না করা চালের সাথে মিশিয়ে তারপর দমে আঁচ দিয়ে বানানো হয়। আজ্ঞে না, খাসির মাংসের কথা বলে কুকুর বা শেয়ালের মাংস দেয় না। বোরহানিটাও ভাল। লম্বা বাস জার্নির পর মানুষ যেমন বমির করে, বোরহানিটা দেখতে তেমন লাগে না।
উল্টো দিকেই পিশাচ বিতান। আসলে দোকানের নাম- ‘ আদি ও আসল পিশাচ বিতান ’। কিন্তু পাখির ল্যাদার কারনে আদিও ও আসল কথাটা দেখা যায় না দূর থেকে। সম্ভবত দুনিয়ার সব পাখি এই লেখার উপর টয়লেট করে। নিচে লেখা- আমাদের কোথাও কোন শাখা নেই।
তখন মাত্র বিকেল।
কিন্তু দোকানের ভেতরে হালকা অন্ধকার। কমলা রঙের আলো জ্বলছে পুরানো স্টাইলের লাল বাল্বে । আজকালকার মত বাল্বের কাচ ঘোলা না। বা বাল্বের রঙ দুধ সাদা না। মোটা মত একটা লোক কাউনটারের উল্টো দিকে বসে আছে। হাতে পঞ্জিকা। সেটাই পড়ছে। মুখ ভর্তি মৌরির দানা। চিবুছে হালকা তালে।
দরজার সামনে পুঁতির মালার মত কি সব ঝুলছে। কেউ ভেতরে ঢুকতে গেলেই ঝুমঝুম করে শব্দ হয়। সেই শব্দে মুখ তুলে তাকালো মোটা মত লোকটা। নাকের নিচে অসুরের মত গোঁফ। বিপদবাবুকে দেখে ফিক করে হাসল। কমলা আলোতে ঝিকিয়ে উঠলো মুখের ভেতরের দাঁত। একটা দাঁত আবার সোনা দিয়ে বাঁধাই করা। ঢঙ !
‘ আসুন আসুন। স্বাগতম । আমি সেনাপতি লস্কর। বলুন কি সেবা করতে পারি আপনার ?’ হাসিমুখে বলল লোকটা। গোঁফের নিচে দাঁত দেখা যাচ্ছে। মানে, হাসছে।
‘ দোকান তো ভালই। তবে কি খুঁজছি ঠিক জানি না।’ চালবাজি মার্কা জবাব দিলেন বিপদবাবু।
‘ এটা কোন কথা বললেন, স্যার ?’ দুঃখী দুঃখী গলায় বলল সেনাপতি। ‘ সাত পুরুষের ব্যবসা আমাদের। কত জমিদার, কত রাজা গজা আমাদের কাছ থেকে পিশাচ, শয়তান, পিচ্চি সাইজের দানব কিনে নিয়ে যেত। স্বীকার করছি আমাদের কোথাও কোন শাখা নেই। এর মানেই না আপনি যা খুঁজছেন পাবেন না। খুঁজলে ভগবানকে পাওয়া যায় আর এ তো সামান্য পিশাচ মাত্র। বলুন কি চাইছেন ?’
‘ গা ছমছম করা পিশাচ আছে ? মানে ভয়ংকর কিছু না। বাসায় থাকবে। রাতের বেলা সারা বাড়িতে হাঁটাহাঁটি করবে। মানুষজন জানবে ওটা পিশাচের বাড়ি। এই আর কি । হবে ?’
‘ না হবার কিছু নেই।’ আশ্বাসের সুরে বলল সেনাপতি লস্কর। ‘ আমরা আমাদের গ্রাহকদের সব রকম সেবা দেয়ার প্রয়াস করে থাকি।
‘ প্রয়াস জিনিসটা কি ?’
‘ চেষ্টা করি আর কি। আপনার মত খদ্দেরের জন্য রয়েছে এক অমূল্য অফার।’
‘ কি সেটা ? তবে হ্যাঁ, দাম যেন বেশি না হয়। ’
‘ খদ্দের ঠকিয়ে ব্যবসা করি না ভায়া। সাত পুরুষের ব্যবসা।’
তাকের সামনে চলে গেল সেনাপতি বাবু।
ওখানে নানান সাইজের বয়াম। বয়ামের গায়ে কাগজের লেবেল সাঁটা। কয়েক মুহূর্ত সময় ব্যয় করে মাঝারি সাইজের একটা বয়াম তুলে নিল সেনাপতি। ড্রয়ার খুলে বের করলো একটা আতশি কাচ। মনোযোগ দিয়ে কাচের ভেতর দিয়ে লেবেলের লেখা পড়লো। দশ নাম্বারি ফুটবলের মত মাথাটা ঝাঁকিয়ে বলল ‘ হুম, এটাই খুঁজছিলাম। পারিবারিক পিশাচ। অনেকেই কেনে এটা। বাসায় থাকবে। কোন রকম ঝুঁটঝামেলা নেই। দামও কম । মাত্র সত্তর টাকা। নিয়ে যান।’
বয়ামটা ঘন নীল রঙের। উপরে কাগজের লেবেল আছে সেটা আগেই বলা হয়েছে। লেবেলে কি লেখা সেটা বিপদবাবু পড়তে পারলেন না। ছাপা অক্ষরগুলো পিঁপড়ার চেয়ে ছোট। ব্যাকটেরিয়ার চেয়ে একটু বড়। ভেতরে কিছু আছে বলে মনে হয় না। বয়ামের ছিপি কর্কের। মোমের গালা দিয়ে বন্ধ করা।
‘ ঐ মিয়া ভেতরে তো কিছুই নেই।’ গলায় ঝাঁঝ ঢেলে বললেন বিপদ বাবু।
‘ খালি চর্ম চোখে তো ভাই দেখা যাবে না। এটা বাসায় নিয়ে রাখবেন। বয়ামের চারিদিকে এক সের চিনি রেখে জুনিপারের ডাল পুড়িয়ে ধোঁয়া দেবেন , ভেতর থেকে সব পিশাচ বের হয়ে আসবে। সাত পুরুষের ব্যবসা আমাদের। দেখছেন না কর্কের ছিপি। সেটাও আবার মোমের গালা দিয়ে বন্ধ করা। অক গাছের গুড়ি থেকে এই কর্ক বানানো হয় ।কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আজকাল ওষুধ বা ওয়াইনের বোতলের ছিপিও কর্ক দিয়ে বানান না। হায়রে মানুষ। ’
‘ এখন জুনিপারের ডাল কোথায় পাব ?’ বিরক্ত হলেন বিপদ বাবু।
‘ ওটাও সমস্যা নেই । শুকনো গোলাপ গাছের ডালা পালা পুড়িয়ে ধোঁয়া দিলেই কাজ হবে। বিফলে মূল্য ফেরত।’
‘ দাম ?’
‘ সত্তর টাকা। খদ্দেরের গলা কাটি না আমরা। খদ্দের হল আমাদের কাছে শয়তান।’
‘খদ্দের শয়তান ?’ অবাক হলেন বিপদ বাবু।
‘ মানে অন্য ব্যবসায়ীরা যাকে বলে খদ্দের হল লক্ষ্মী, আমরা বলি খদ্দের হল শয়তান।’ ব্যাখ্যা করে দিল সেনাপতি লস্কর।
‘ দাম কম হবে না ?’
‘ এক দাম।’
‘চিনির বদলে স্য্যাকারিন বা গুড় দিলে চলবে ?’
‘চিনিই ভাল।’
‘সাদা চিনি না লাল চিনি ?’
‘লালটা হলে বেশি ভাল হয়। সাদাটায় ক্যামিকেল দিয়ে পরিষ্কার করা হয়।’
‘যদি কাজ না হয় তবে ?’
‘ দোকানে এসে বয়ামটা আমার মাথায় ভেঙ্গে যাবেন। সাত পুরুষের ব্যবসা আমাদের।’
‘আপনার মাথায় একটা কাটা দাগ দেখছি । কেউ বয়াম ভেঙ্গেছিল না কি ?’
‘ আরে না না । ওটা ছোট বেলায় ন্যাড়া হয়ে বেল তলায় গিয়েছিলাম । তখন হয়েছিল ।‘
‘আচ্ছা প্যাকেট করে দিন। সাথে বিজনেস কার্ড থাকলে দিন একটা।’
‘বিজনেস কার্ড রাখি না ভায়া। সবাই চেয়ে নেয় । পরে রাস্তায় উঠে ফেলে দেয়। অনেকে বিজনেস কার্ড চেয়ে চেয়ে জমায়। শেষে ঝালমুড়ি বা ঘুগনিওয়ালার কাছে বিক্রি করে দেয় কেজি দরে। লোকজন সেই বিজনেস কার্ড দিয়ে ঘুগনি আর ঝালমুড়ি খায়। কি বিচ্ছিরি ব্যাপার। আমি নিজেই একবার ঘুগনি খেতে গিয়ে আমার দোকানেরই বিজনেস কার্ড পেয়েছিলাম একবার । ’
‘আসলেও দুঃখজনক।’ একমত না হয়ে পারলেন না বিপদবাবু। ‘হায় রে মানুষ।’
বাদামি একটা কাগজের ঠোঙায় বয়ামটা ভরে দিল সেনাপতি লস্কর। ঠোঙাটা খুব সুন্দর। ওটার গায়ে বড় করে দোকানের নাম লেখা। সাথে বিচ্ছিরি চেহারায় একটা পিশাচের ছবি। পিশাচটার দাঁতগুলো ঢ্যাঁড়সের মত। চোখ দুটো খোসা ছড়ানো লটকা ফলের মত। কান দুটো পুঁই পাতার মত বড় বড়।
‘ছবিটা বোধহয় ব্যবসার লোগো তাই না।’ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন বিপদ বাবু।
‘ ঠিকই ধরেছেন। ঠোংগার গায়ে দোকানের ফোন নাম্বার আছে। দরকার হলেই ফোন দেবেন।’
‘কিন্তু এটা তো ল্যান্ডলাইন। চব্বিশ ঘণ্টা কি দোকানে থাকেন নাকি ? ’
‘ ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা না। তেইশ ঘণ্টা, ছাপান্ন মিনিট চার সেকেন্ড থাকি।’
‘ সে কি ?’
‘হ্যাঁ, কারন বিজ্ঞানীরা বলেছেন কাঁটায় কাঁটায় চব্বিশ ঘণ্টায় একদিন হয় না। তেইশ ঘণ্টা, ছাপান্ন মিনিট চার সেকেন্ডে এক দিন হয়। তাই বললাম।’
‘সারারাত দোকানে কি করেন ?’
‘ বই পড়ি , পিশাচ কাহিনি আমার প্রিয়। গান শুনি , মধ্য রাতে একটু ঘুমাই। খুব ভোরে বয়ামগুলো গুছিয়ে রাখি। রোজ রাতেই বয়ামগুলো নিজেরা নিজেরা নড়াচড়া করে। এই ব্যবসায় এটাই হল মুশকিল। যে কোন ব্যবসায় একটা না একটা ঝামেলা থাকবেই । ল অভ বিজনেস । ’
‘ বয়ামটার আর কোন যত্ন নিতে হবে ?’
‘ না। পিশাচগুলো বের হয়ে বিছানার তলা, বাথরুম অমন জায়গায় থাকবে। দিনের বেলা বয়ামের ভেতর ঘুমুবে। যদি পারেন খানিক তুলা রেখে দেবেন বয়ামের ভেতরে। কর্পূর সহ। দারুন একটা চনমন করা ঘ্রাণ বের হবে। আর মেঘলা দিনে রোদে দিতে পারেন।’
‘ মেঘলা দিনে রোদ পাব কোথায় ?’
‘ যদি উঠে আরকি ! মেঘের আড়ালেই তো সূর্য থাকে । ’
খুশি হয়ে টাকাটা দিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে এলেন বিপদবাবু।
সুলতানগঞ্জ থেকে ফেরার পথে এক কেজি লাল চিনি কিনে আনলেন। চিনিতে পিঁপড়ে হাঁটছিল কয়েকটা, সেটা দেখে দোকানদারকে ধাতানি দিলেন, ‘ আরে মিয়া তোমার চিনিতে তো পিঁপড়ে লং মার্চ করছে।’
‘ চিনি থাকলে পিঁপড়ে আসবেই।’ বেহায়ার মত হেসে বলল দোকানদার। ‘ লবণে তো আর পিঁপড়া আসে না । ওটা জগতের নিয়ম। শাস্ত্রে আছে- চিনিনং রাখতিং পিপ্রে হাটন্তিং। মানে হচ্ছে- হে ভক্ত, যেখানে চিনি রাখবে সেখানেই পিঁপড়ে হেঁটে যাবে।’
‘ এটা শাস্ত্রে আছে ?’ রাগি গলায় বললেন বিপদবাবু।
‘ থাকার তো কথা ।’
‘কোন শাস্ত্রে ?’
‘সম্ভবত চিনিপোনিষদ । অথবা পিঁপড়েপুরানে থাকার কথা। ভুলে গেছি।’
‘চাপা মারার জায়গা পান না ?’
‘ আসলে স্যার অমন বড় বড় কথা বললে খদ্দের খুব উৎফুল্ল উঠে । তাই বলি। আর কথার শেষে অং বং করলেই কি সুন্দর সংস্কৃতি হয়ে যায়। কে ধরতে পারবে ? আর আমি আসলে বুঝতে পারিনি আপনি হিন্দু।’
‘গলায় রুদ্রাক্ষের মালা ঝুলছে তারপরও বুঝতে পারনি ?’
‘ ওটা রুদ্রাক্ষের মালা ? হায় হায়।’ বিচিত্র ভঙ্গিতে বিলাপ করে উঠলো দোকানদার । ‘ আমি ভেবেছি শুকনো বরই।’
‘শুকনো বরই মালা গেথে কি কেউ গলায় ঝুলিয়ে রাখে ?’ হতাশ হলেন বিপদবাবু। কি সব বিচ্ছিরি যুক্তি দেখাচ্ছে লোকটা ! হায়রে মানুষ !
‘ রাখতেও তো পারে। আমার মেজ পিসির ছোট ছেলের সেজ মেয়ের নাতনির জামাই পকেটে এক রোল আমসত্ত্ব রাখেন। অন্য পকেটে এক বোতল দুধ রাখেন। অন্য পকেটে একটা আস্ত পাউরুটি রাখেন। পথে খিদে পেলেই খেয়ে নেন। রাস্তার পাশের খোলা খাবার তিনি খান না। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ। আরেক পকেটে...।’
‘ উনার পকেট কয়টা ?’
‘ব্যাগি প্যান্ট পরেন উনি। হালি হালি পকেট। আর গায়ে সাংবাদিকদের সেই ভেসট । ’
‘থাক ভাই, দয়া করে আমার চিনি দিয়ে বিদায় করুন।’
দোকানির চিনি মাপা শেষ হতেই বিপদবাবু বললেন ‘ ওখানে চারটে পিঁপড়ে আছে। ফেলে দিয়ে চারটে চিনির দানা বেশি দিন। এক একটা পিঁপড়ার ওজন চিনির দানার সমানুপাতিক । ওজনে কম পাচ্ছি আমি।’
ভয়ে ভয়ে তাই করল দোকানদার।
সন্ধ্যার খানিক আগে বাড়ি ফিরলেন বিপদবাবু।
মোড়ের কাছের ‘ক্যাফে দা লোল’ থেকে রাতের খাবার নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। ওদের খাবার ভাল। দামও সস্তা। সাইন বোর্ডে বড় করে লেখা- ক্যাফে দা লোল। আপনার মুখের লোল ফেলাই আমাদের আনন্দ।
বাড়ির সামনে এসে বিরক্ত হলেন বিপদবাবু। আজও ফকিরটা তার বাড়ির সিঁড়ির নিচে বসে মাটির সানকী নিয়ে খাওয়ার আয়োজন করছে। ওর পাছায় দারুন একটা লাত্থি মারতেই ফকিরটা আই বাপ বলে পড়িমরি করে দৌড়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে গেল। পাশের বাড়ির দারোয়ান রুস্তম খান ডিউটিতে এসে গেছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পান খাচ্ছে।
‘ এত ঘন ঘন পানের পিক ফেল কেন ?’ বিরক্ত হলেন বিপদ বাবু। রুস্তম খান আজকাল তাকে সালাম দেয় না।
‘পিক ফেলা, পান খাওয়ার সবচেয়ে সুন্দরতম জিনিস স্যার। গরু ছাগল যদি জাবর কাটার সময় পিক ফেলত তবে সেটাও দারুন একটা জিনিস হত । আপনি বুঝবেন না স্যার।’ অম্লান বদনে বলল রুস্তম।
‘ ভাল কথা পান খাওয়া শেষ হলে আঙ্গুলের চুন আমার দেয়ালে মুছে ফেলবে। নিয়মিত অমন করলে দেয়ালে চুনকাম করতে হবে না।’
গটগট করে বাড়ির গেইটের ভেতরে চলে গেলেন বিপদ বাবু।
ভেতরে শুকনো জঞ্জাল। এক সময় বাগান ছিল, যত্ন না নেয়ায় সব গাছ মরে শুকিয়ে শুটকি হয়ে গেছে। ওখান থেকে খুঁজে কয়েকটা গোলাপের ডালপালা বের করে নিয়ে সোজা চলে গেলেন ভেতরে।
মাত্র এক বালতি জল খরচ করে স্নান করে নিলেন। জলের বিলের কথা ভাবতে হবে। মহল্লার মোড়ে গিয়ে সকালে দাঁত মাজেন। ওখানে সরকারি কল আছে। জল ফ্রি। দূরের গরিব মানুষ লাইন দিয়ে জল নেয় আর হাউকাউ করে ঝগড়া করে।
‘ ক্যাফে দা লোল’ থেকে আনা বাক্স খুলে রাতের খাবার খেয়ে নিলেন। ভাত, আলুর ভর্তা, অদ্ভুত সাইজের কি একটা মাছের টুকরা আর ডাল। এটাই সবচেয়ে সস্তা খাবার। খাওয়া শেষে দাঁত মাজলেন না। জলের খরচ আর টুথপেস্টের খরচ ভাবতে হবে।
ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছে চারিদিকে। অন্ধকারে হাঁটতে অভ্যাস হয়ে গেছে। জানেন কোথায় কি আছে। খুব দরকার হলে মোমবাতি জ্বালান। পঞ্জিকা দেখে খোঁজ রাখেন কবে পূর্ণিমা। সেই কয়েক রাত মোমবাতিও জ্বালান না।
ড্রয়িং রুমের টেবিলের উপর কাচের বয়ামটা রেখে চারিদিকে চিনি ছড়িয়ে দিলেন। পাশে যত্ন করে রাখলেন গোলাপের শুকনো ডালপালা। হালকা আগুন ধরিয়ে দিলেন। দারুন চনমন করা ধোঁয়া উঠতে লাগল। সমস্যা নেই, টেবিলটা শ্বেত পাথরের । কোন ক্ষতি হবে না। ধোঁয়ার জন্য পরিবেশটা বেশ রোমাঞ্চকর লাগছে। যেমনটা বিপদবাবু চান।
এবার অপেক্ষা।
জানালার ধারে গিয়ে বই নিয়ে বসলেন । বইটার নাম- পারুল আপা আর তিনটে ব্রণটোসরাস। এই লেখকের বই বেশ ভাল। সমস্যা হল লেখক খরচের কথা না ভেবে দুইবার বিয়ে করেছেন। খুব খারাপ।
বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলো জানালা দিয়ে রুমের ভেতরে চলে আসে। সেই আলোতে পড়াশোনার কাজটা হয়ে যায়। জানালার সাথে একটা আয়না ফিট করেছেন। সেই আয়নায় ল্যাম্পপোস্টের আলো প্রতিফলিত হয়ে রান্নাঘর পর্যন্ত আলো চলে যায়। সব মিলিয়ে সেভ দ্যা পাওয়ার আন্দোলনের মত অবস্থা বিপদবাবুর।
বইটা পড়তে পড়তে কখন যেন চোখ লেগে গিয়েছিল বিপদবাবুর।
গির্জার ঘণ্টা ঘং করে বেজে উঠতেই চমকে উঠে বসলেন। তার মানে রাত বারোটা। বাসায় তিনি ঘড়ি ব্যবহার করেন না। ব্যাটারির খরচের কথা ভাবতে হবে।
বেশির ভাগ সময় ইজি চেয়ারে বসে ঘুমান তিনি। তাতে বিছানার চাদর, বালিশ আর কম্বল কম ময়লা হয়। বইটা রেখে আবার ঘুমাতে যাবেন , মনে হল কিসের যেন শব্দ শুনতে পেলেন। বিড়াল না তো ? কিন্তু গত দশ বছর ধরে ভুলেও কোন বিড়াল তার বাসায় ঢুকে না। কি লাভ ? রাজ্যের সব বিড়াল জানে এই বাসায় কিছু পাওয়া যাবে না।ওরা ভুলে কেউ ঢুকে পড়লেও মিউ মিউ করে কাঁদতে কাঁদতে চলে যায়।
টেবিলের উপর এক গ্লাস জল ছিল। ঢাকনা দেয়া। গ্লাস খালি।
বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। শ্বেত পাথরের টেবিলের উপর নজর পড়তেই অবাক হলেন। চিনি নেই। বয়ামের মুখের ছিপি খোলা। কি ভাবে হল ?
‘ অ্যাঁয়, তোরা কি বের হয়ে গেছিস ?’ হাঁক দিলেন বিপদবাবু।
কেউ জবাব দিল না।
চারিদিকটা কেমন যেন নিঝুম লাগছে না ? কেমন যেন নীলচে ধোঁয়ার মত পাক খেয়ে যাচ্ছে না ? সাথে সাথে বুঝতে পারলেন গোলাপের ডালপালা পোড়ার জন্য অমন লাগছে।
বিছানার নিচে কে যেন শুয়ে আছে। বেগুনি রঙের কম্বলের মত শরীর । দুটো হাত বাইরে। বড় বড় নখ দেখা যাচ্ছে। উঁকি দিলেন বিপদবাবু । বিড়ালের চোখের মত দুটো চোখ জ্বলজ্বল করছে।
‘ তুমি নিশ্চয়ই পিশাচ ?’ জানতে চাইলেন বিপদবাবু।
‘ আজ্ঞে হ্যাঁ।’ জবাব এলো বিছানার তলা থেকে।
‘ আরও ভয়ংকর কিছু আশা করছিলাম। নখগুলো তো যথেষ্ট বড় না। নেইলপলিস লাগানো নাকি ?’
‘ঠিকই ধরেছেন।’
‘চোখ তিনটে হলে ভাল হত। কপালে একটা চোখ থাকলে দারুন ছমছমে ব্যাপার হয়। অমন বিচ্ছিরি দুই চোখ তো ভেড়ারও হয়।’
পিশাচটা লজ্জায় চুপ করে রইল। ওর বলার কিছু নেই।
গটগট করে ইজি চেয়ারে গিয়ে শুয়ে পড়লেন তিনি । গায়ে চাদরটা টেনে নিতে যাবেন তখনই দেখলেন বাথরুমের দরজায় কি যেন একটা দাঁড়িয়ে আছে। উজ্জ্বল নীল রঙের। মনে হয় সিল্কের নীল রঙের গাউন পরে আছে।
‘ কি ব্যাপার ওখানে দাঁড়িয়ে যে।’ হাঁক দিলেন বিপদ বাবু। ‘ বাথরুম পাহারা দেবে নাকি ? নাম কি তোমার ?’
‘ নীল পিশাচ ।’ জবাব দিল বাথরুমের দারোয়ান।
‘ তোমার অবস্থা তো আরও খারাপ। মুখ ভর্তি মূলার মত দাঁত থাকলে ভাল হত। বা পিরানহার মত দাঁত হলেও চলত । নেই বোধহয় ?’
‘ আজ্ঞে ঠিক। ছিল। চিনি খেতে খেতে দাঁত পরে গেছে। ’
‘ মোট কয়জন তোমরা বয়াম বন্দি ছিলে ?’
‘তিনজন ।’
‘আরেকজন কই ?’
‘ বারান্দায়। কাপড় শুকানোর দড়িতে ঝুলছে।’
‘একেই বলে সস্তার তিন অবস্থা। সত্তর টাকা জলেই গেল ।’
চুপ করে রইল লজ্জিত নীল রাক্ষস। ওর ও বলার মত কিছু নেই।
গটগট করে বারান্দায় চলে গেলেন বিপদবাবু। কাপড় শুকানোর দড়িটা আছে। অল্প কয়েকটা মোজা আর তালি দেয়া স্যানডো গেঞ্জি ঝুলছে। মোজাগুলোর কোনটার সাথে কোনটার মিল নেই। সব বেজোড়। ওখানেই পলিথিন ব্যাগের মত পাতলা একটা পিশাচ ঝুলছে। বিপদবাবুকে দেখে সালাম বা নমস্কারের মত একটা ভঙ্গি করে আগের মতই ঝুলতে লাগল।
কামরায় ফিরে পিশাচ বিতানের বাদামি ব্যাগটা তুলে নিলেন বিপদবাবু।
ফোন নাম্বারটা দেখে মনে মনে কয়েকবার বলে মুখস্ত করে নিলেন। বেডরুমে কাকের মত কালো পুরানো দিনের একটা ফোন আছে। । তর্জনী দিয়ে জিলিপির মত প্যাচিয়ে ডায়াল করতে হয়। ওপাশে রিং হতেই রোবটের মত গলা শোনা গেল- ‘ সেনাপতি লস্কর ব্যস্ত আছেন। অনুগ্রহপূর্বক অপেক্ষা করুন। হাতের কাজ শেষ করেই উনি আপনার ফোন ধরবেন।’
কথা শেষ হতেই পিনিং পিনিং করে যন্ত্র সঙ্গীত বেজে উঠল। দেশাত্মবোধক গান। ধনধান্যে পুস্পে ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা ।
গানটা দুই লাইন শেষ না হতেই ফোন ধরল সেনাপতি লস্কর।কায়দা করে বলল- ইয়েলো।
কিছু মানুষের এই এক সমস্যা । হ্যালো বলতে গিয়ে বিচ্ছিরি সব শব্দ বলে।কেউ কেউ হালু বা হালাই ও বলে। শ্যালো ও বলে অনেকে ।
‘ হ্যালো সেনাপতি বাবু। আমি বিপদ বলছি। আজ বিকেলে মাল নিলাম।’
‘ গলার স্বরেই চিনেছি ভায়া । কেমন আছেন ? খেতে বসেছিলাম। বিঘৎ খানেক সাইজের কই মাছের ঝোল, ফুলকপির বড়া সাথে এক দিস্তা লুচি। লুচি না খেলে শরীরটা কেমন রিমিঝিম রিমিঝিম করে । এখন গিয়ে সেলফের বয়াম গুছিয়ে রাখব। ওরা এর মধ্যেই নড়া চড়া শুরু করেছে। একটা ফচকে ধরনের পিশাচ আছে, কেউ ফোন করলে ও ব্যাটা ফোন তুলে খানিক যন্ত্র সঙ্গীত বাজিয়ে শোনায়। সব ঠিক আছে তো ?’
‘ মোটেই না। বয়ামের ভেতরে মোট তিনটে পিশাচ পেয়েছি। একটারও অবস্থা ভাল না। আমি আরও রোমাঞ্চকর পিশাচ চেয়েছিলাম।’
‘ দেখুন , আমাদের সাত পুরুষের ব্যবসা, খদ্দের হল শয়তান। কিন্তু সত্তর টাকা দিয়ে এর চেয়ে ভাল পিশাচ আপনি পাবেন না। আগের মত বিচ্ছিরি পিশাচ ধরা মুশকিল।। রাজা বিক্রমদিত্যের দুটো পিশাচ ছিল জানেন। একটার নাম তাল। আরেকটার নাম বেতাল । সেই দুটো ও আমরা সাপ্লাই দিয়েছিলাম। কিন্তু খুব ভয়ংকর বা পৈশাচিক ধরনের পিশাচ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।’
‘ ভাই আমি এই ফালতু পিশাচ রাখতে চাই না। ফেরত দিতে চাই।’
‘সমস্যা নেই ভায়া। যে কোন সময় চলে আসবেন দোকানে। ঠোঙার ব্যাগটা নিয়ে আসবেন দয়া করে। ঠিক আছে ?’
ফোন কেটে দিলেন বিপদ বাবু।
বিরক্ত হয়ে চেয়ে দেখেন দুই পিশাচ তখন ও আগের জায়গায়। একটা বিছানার তলায়। আরেকটা বাথরুমে দাঁড়িয়ে হারপিক খাচ্ছে। বারান্দায় যেটা সেটা নিশ্চয়ই কাপড় শুকানোর দড়িতেই ঝুলছে ?
‘ হারপিক খাচ্ছ কেন ?’ রাগি গলায় বললেন বিপদবাবু।
‘ ফ্লেভারটা দারুন। স্বাদও ভাল। নীল রঙের ব্লু বেরি ফলের জুসের মত। কিছুটা ব্লু হাওয়াইয়ের মত। আপনি চেখে দেখতে পারেন। খারাপ না।’ জবাব দিল নীল পিশাচ।
হতাশ হয়ে ইজি চেয়ারে গিয়ে বসে রইলেন তিনি। ঘুমানোর আয়োজন করতে হবে। নইলে সকাল বেলা উঠতে দেরি হবে। মেজাজ খারাপ হয়ে আছে । সহজে ঘুম আসবে বলে মনে হয় না।
বিপদবাবু কিন্তু জানেন না কত বড় বিপদ ধেয়ে আসছে তার উপর।
তাকে খুন করার জন্য আসছে মস্ত ঘাঘু এক অপরাধী।
সাথে দুর্দান্ত দুই সাগরেদ।
দুই
এক বুক জ্বালা নিয়ে বেঁচে আছে হরিহর খরগোশ।
একটাই স্বপ্ন- প্রতিশোধ নিতে হবে।
হরিহর আগে খরগোশ বিক্রি করতো। সেইজন্য সবাই নামের শেষে খরগোশ শব্দটা যোগ করে দিয়েছে। দেখতেও খরগোশের মত। গায়ের রঙ ফর্শা, চোখ দুটো লাল। কান বড় বড়। সামনের দুটো দাঁত একদম খরগোশের মত ।
হরিহরের দাদু ছিল নাম করা ডাকাত। শম্ভু ডাকাত নাম শুনেই মানুষ ঘরের খিল এঁটে বসে থাকতো। একদিন শম্ভু ডাকাত পুলিশের হাতে ধরা পরে জেলে গেল। হরিহর তখন খুব ছোট। পাঁচ কেজি গা ছমছম করা চমচম নিয়ে জেলে দাদুকে দেখতে গেল। দাদু ফিসফিস করে বলল- ‘ হরিহর, পারলে প্রতিশোধ নিবি নাতি। আমার এই অবস্থার জন্য দায়ী মদন তপাদার।’
‘ কি করেছে মদন তপাদার ?’ জানতে চাইল পিচ্চি হরিহর।
‘ ও আমার বন্ধু। ওর বাসায় গিয়েছি আড্ডা দিতে। শীতের মধ্যে শয়তানটা আমাকে টক দই আর আইসক্রিম দিয়েছে খেতে। লোভে পরে সব খেয়ে ফেলছি। পরে ঠাণ্ডা লেগে গলা বসে গিয়েছিল। ডাকাতি করতে গিয়ে চেঁচিয়ে বলতে গেছি- হা রে রে রে। আক্রমণ কর। কিন্তু ঠাণ্ডায় গলা বসে যাওয়ায় আমার চিৎকার কেউ শোনেনি। পুলিশ হামলা করেছে । বলেছি- পালাও। সেটাও কেউ শোনেনি। তাই সবাই ধরা পড়েছি। সর্দার হিসাবে আমার ক্যারিয়ার শেষ। বাকি জীবন সব ডাকাত আমার নাম শুনেই থু থু দেবে। তুই প্রতিশোধ নিবি।’
হরিহর দাদুর ঝাঁকড়া চুল ছুয়ে প্রতিজ্ঞা করলো। দাদু শম্ভু পাঁচ কেজি কালো রঙের গা ছমছম করা চমচম খেয়ে জেলের ভেতরে ঠুস করে মারা গেল।
মন খারাপ করে ফিরে এলো হরিহর। থানার পুলিশ তল্লাশির নামে ওদের বাড়ির পিছনের জায়গায় মাটি খুঁড়ল ভাল করে। ভেবেছিল লুকানো লুটের মাল পাবে। পাওয়া যায়নি। পরের বছর সেই জমিতে প্রচুর ঘাস , মূলা আর গাজর হয়েছিল। সেই সবজি খাওয়ার লোভে রোজ রাতে খরগোশ আসতো। ফাঁদ সেই খরগোশ ধরে বিক্রি করতে লাগল হরিহর। হয়ে গেল বিশিষ্ট খরগোশ ব্যবসায়ী।
সেই সাথে চোখ কান খোলা রেখেছে। মদন তপাদারকে চেনে। নিজের হাতে খুন করতে পারলে ভাল হত। কিন্তু কোন এক বিয়ে বাড়িতে গিয়ে চৌত্রিশটা লুচি, এক বালতি ল্যাবড়া, তিন বাউল পাঁঠার মাংস , এক ডজন মোহনভোগ, যথেষ্ট মিহিদানা খেয়ে ওখানেই মারা গেলেন।
শোধ নেয়া হল না। কিন্তু হরিহর খবর পেল , মদন বাবুর ছেলে বিপদবাবু আছে। ঠিক করলো বিপদ বাবুকে পৈশাচিক ভাবে খুন করে প্রতিশোধ নেবে সে।
অনেক বছর ধরে নিজেকে তৈরি করেছে। যোগার করেছে দুই সাগরেদ । একজনের নাম - মানিক ওরফে রতন। আরেক জনের নাম জগাই ওরফে মাধাই। মানিকের আসল নাম মানিক। পরে মানিকের বাবা শুনলেন মানিকের চেয়ে রতনের দাম বেশি। তাই নাম বদলে দিয়েছিলেন। জাগাইয়ের নাম জগাই কিন্তু ভোটার আইডিতে ভুলে মাধাই ছাপা হয়েছে। এইজন্য নামের এই ঝামেলা।
গভীর রাতে হনহন করে হেঁটে আসছে ওরা তিনজন। বিপদ বাবুর বাড়ির একশো গজ দূরে এসে থামল তিনজন।
‘ সবাই তৈরি ?’ জানতে চাইল হরিহর খরগোশ।
‘ হ্যাঁ, সর্দার।’ জবাব দিল বাকি দুইজন।
‘ বেশ।’ হাত তুলে দরবেশের মত একটা ভঙ্গি করে বলল হরিহর খরগোশ । সাথের ব্যাগ খুলে বের করে আনল জুতার কালি। ‘ নাও সবাই ভাল করে মুখে হাতে মেখে নাও। শিশি ভর্তি করঞ্চা তেল আছে। সারা শরীরে মেখে নাও। তিন জোড়া কানের রিঙ আছে। কানে দাও। গলার মাকড়ী গলায় পরে নাও। মাথায় লাল কাপড়ের টুকরো বেধে নাও। বিপ্লবীরা যেমন করে। তারপর আক্রমণ করব।’
‘সর্দার জবা ফুল নেই ?’ জানতে চাইল জগাই ওরফে মাধাই ।
‘ আমরা ভ্যালেনটাইনে যাচ্ছি না।’ দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলল খরগোশ। ‘ জবা ফুল দিয়ে কি করবে ?’
‘কানে গুঁজে নিতাম ।’ মিহি হেসে জবাব দিল জগাই ওরফে মাধাই। ‘ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বীরপুরুষ নামে কবিতায় পড়েছিলাম। ডাকাতের বর্ণনায় কবিগুরু লিখেছেন- হাতে লাঠি, মাথায় ঝাঁকড়া চুল , কানে তাদের গোঁজা জবার ফুল ।’
‘কবিতাটা আমিও পড়েছি।’ উকালতি করল মানিক ওরফে রতন। ‘ খুব সুন্দর করে ডাকাতদের বর্ণনা দিয়েছেন রবি ঠাকুর। মনে হয় উনি নিজেই ঘটনার সময় ছিলেন। বা নিজেই ডাকাত দলের সদস্য ছিলেন।’
‘অসম্ভব কি ?’ সায় দিল জগাই ওরফে মাধাই। ‘ বাংলাদেশের বেশির ভাগ জমিদার তো ডাকাত ছিল। আবার হতে পারে সানডে ম্যান মানে রবিবাবুর আউট নলেজ এমনিতেই বেশি। যেমন গত বছর মঙ্গল গ্রহে যে রহস্যময় আলো দেখা গেছে, সেটা দেখার পঞ্চাশ বছর আগেই তিনি লিখেছেন-
মঙ্গল দ্বীপ জ্বেলে
অন্ধকারে দুচোখ আলোয় ভরো প্রভু
তবু যারা বিশ্বাস করে না তুমি আছ
তাদের মার্জনা করো তুমি।।’
‘ আরে গাধা এটা বাপ্পি লাহিড়ীর গান।বিরক্ত হয়ে বলল খরগোশ। ‘ আর হারামজাদারা আমরা কি সাহিত্যের ক্লাস করতে এসেছি ? অ্যা ?’
‘ কিন্তু কানে জবা ফুল হলে ভাল হত।’ গাই গুই করলো জগাই ওরফে মাধাই।
‘ জবা কিন্তু দুই প্রকার।’ লেকচারের ভঙ্গিতে বলল মানিক। ‘ রক্ত জবা আর মরিচ জবা । আমরা মরিচ জবা নেব না কারন ওটা বাবুর্চিদের জন্য। রক্তজবা শুনতেই বেশ হরর একটা ভাব আছে।’
‘ কিন্তু এটা জবার মউসুম না। বাদ দাও।’ ঘেউ ঘেউ করে উঠলো খরগোশ। ‘ যাও জলদি শিমুল গাছের উপর থেকে অস্ত্র নামিয়ে আনো।’
ওদের সামনেই ছিল পেল্লাই এক শিমুল গাছ। ওটার গা বেয়ে তরতর করে উঠে গেল জগাই। গাছের মগডালের সাথে কাপড়ের একটা পুঁটুলি বেধে রেখে গেছে কয়েকদিন আগে এসে। সেটাই নামিয়ে আনল। পুঁটুলির ভেতরে বড় বড় তিনটে রাম দা।
‘হু, জিনিস ঠিক মতই আছে। কাজ শুরু কর।’ গম্ভীর গলায় বলল খরগোশ।
তিনজনেই সারা শরীরে করঞ্চা তেল মেখে নিল। মুখে মেকআপ নেয়ার মত জুতার কালি মেখে কানের দুল আর গলায় মাকড়ি পরে নিল। বেশ দেখাচ্ছে ওদের। রামদা তিনতেই সিঁদুর মাখিয়ে খরগোশ হুঙ্কার দিয়ে বলল- ‘ জয় মা কালি।’
‘সামান্য মদ্যপান করে নিলে ভাল হত সর্দার।’ আবদার ধরল জগাই।
‘ উহু, বিজ্ঞানীরা বলেছেন- ডোন্ট ড্রিংক অ্যান্ড ডাকাতি।’ ব্যাখ্যা করলো খরগোশ। ‘ মানে হচ্ছে মদ্যপ অবস্থায় ডাকাতি করবে না। ফিনল্যান্ডে মদ খেয়ে গাড়ি চালালে দশ বছরের জেল হয়। ব্যাপারটা সাংঘাতিক। তাছাড়া পুলিশ ধরলে আমাদের শুধু অ্যাটেম্প টু রবারি হিসাবে ধরবে , মাতাল হিসাবে ধরবে না।’
‘ গুরু , এই জন্য মা বলতো অরে জগাই তিনবেলা তোর সর্দারের পা ধুয়ে চিনি আর ইসবগুলের ভুষি দিয়ে জল খা।’ হাহাকার করে উঠলো জগাই। ‘ আপনি জীবন্ত ডিকশনারি । ‘
জোড় হাতে ঝুপ করে খরগোশের পায়ের উপর পরে প্রনাম করে নিল জগাই ওরফে মাধাই। অল্পের জন্য রামদা দিয়ে খরগোশের গলাটা কেটে গেল না।
‘উহু ওটা জীবন্ত বিশ্বকোষ হবে ।‘ ভুল শুধরে দিল মানিক ওরফে রতন ।
‘চল এইবার মা কালির নাম নিয়ে বিপদবাবুর মুণ্ডুটা কেটে ফেলি।’ ফিসফিস করে বলল খরগোশ । ‘ শরীরটা পরে থাকবে বাসায় । মুণ্ডুটা নিয়ে সুলতানগঞ্জের থানার বাইরে বড় যে পাকুর গাছটা আছে, সেখানে ঝুলিয়ে রাখব ।’
‘ওখানে মাথা ঝুলিয়ে লাভ কি ?’ অবাক হয়ে বলল মানিক।
‘সারা শহরে আমাদের নাম ছড়িয়ে যাবে। যত নাম তত আতঙ্ক। আর আমাদের তত ক্যারিয়ার।’
‘ মুণ্ডুর সাথে কি আমাদের তিনজনের পাসপোর্ট সাইজের ছবিও রেখে দেব ?’
‘ না। আমরা থাকব আড়ালে। কেউ যেন অনুমান করতে না পারে আমরা দেখতে কেমন । ওতে বেশি রহস্য তৈরি হয়। যেই লেখক ইন্টারভিউ দেয় না তাকে যেমন সবাই কিংবদন্তি বলে তেমন ই আর কি। চল কাজে নেমে যাওয়া যাক। দাদুর আত্মার শান্তির জন্য খুনটা করা দরকার।’
‘ ঠিকই বলেছেন সর্দার। হতে পারে উনি আশেপাশে কোথাও লুকিয়ে আমাদের দেখছেন।’ ফিসফিস করে বলল মানিক ওরফে রতন।
কথাটা শুনে সবার শরীর কেমন ছমছম করে উঠলো।
মাথার উপর দিয়ে কি যেন কালো মত উড়ে গেল ।
‘ চাদর গায়ে দিয়ে দাদু উড়ে গেলেন না তো ? সেই রকম রোগা ছিপছিপে শরীর। গায়ের রঙ আলকাতরার মত কালো। ’ ঢোক গিলে বলল জগাই ওরফে মাধাই।
‘ উহু, ওটা বাদুর।’ শান্ত গলায় বলল খরগোশ। ‘ জলদি চল ।’
গুঁটিগুঁটি পায়ে তিনজনের দলটা হেঁটে চলে এলো বিপদবাবুর বাসার সামনে।
তিন রাস্তার শেষ মাথায় বাড়িটা। একদম নিঝুম। আশেপাশের বেশ খানিক দূর পর্যন্ত ফাঁকা। শুধু উল্টো দিকে একটা বাড়ি। ওটার দারোয়ান রুস্তম শেখ । ওই বাড়ির বাইরে কাথামুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে একজন ভিখিরি যার নাম আমির খান।
এই ব্যাপারগুলো আগে থেকেই খোঁজ নিয়ে এসেছে ওরা। প্রায় পনের দিন বাড়ির বাইরে আর এলাকায় টহল দিয়ে জায়গাটা রেকি দিয়ে গেছে । ভয়ের কোন কারন নেই। সহজ আর সিম্পল জব। বিপদবাবুর জন্য দুঃখ হল খরগোশের।
‘ আমরা বাড়ির পিছন দিয়ে ঢুকব।’ আস্তে করে বলল খরগোশ । ‘ নইলে অন্য বাড়ির দারোয়ান দেখে ফেলবে। জগাই তুমি বারান্দা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা কর। মূল দরজার সামনে মানিক দাঁড়িয়ে থাকবে। কাউকে আসতে দেখলে সঙ্কেত দেবে।আর আমি পিছনের রান্নাঘরের জানালার গ্রিল খুলে ভেতরে ঢুকব। যে আগে ঢুকবে সে গিয়ে মূল দরজা খুলে দেবে। ’
‘ আমাদের একটা পাসওয়ার্ড থাকা দরকার। যাতে অন্ধকারে একে অপরকে চিনতে পারি।’ বলল জগাই ওরফে মাধাই।
‘ঠিক, পাসওয়ার্ড হচ্ছে - পথিক আসিয়া কামড় দিল কুকুরের পায়। সতেন্দ্র নাথ দত্তের লাইন। ’
‘ পথিক আসিয়া কামড় দিল কুকুরের পায় ? আপনি নিশ্চিত লাইনটা অমন ?’
‘ লাইনটা অন্য রকম শুনেছিলাম। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা নিয়ে বাহাস করার সময় নেই। চলো মা কালির নাম নিয়ে কাজটা শেষ করি। এটা আমাদের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।’
‘ ঠিক। ঠিক।’ বাকি দুইজন এক সাথে মাথা ঝাঁকাল ।
তিনজন আলাদা হয়ে বিপদবাবুর বাড়ির তিনদিক দিয়ে ঢুকে পড়লো।
বাড়ির বাইরে কয়েকটা জামরুল আর কাঠবাদাম গাছ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। পরিবেশটা খুন খারাবি করার জন্য এক কথায় আদর্শ। প্রতিটা রাত যদি অমন হত তবে খুনিরা প্রতি রাতেই এক হালি করে খুন করতো। খুন শেষ করে সাবান মেখে পুকুরে স্নান করে বাসায় বসে কবিতার বই পড়তো।
মানিক ওরফে রতন মূল দরজার সামনে ঘাপটি মেরে বসে রইল। কাঠের ভারি দরজা। ভাঙ্গা যাবে না । বাইরে থেকে খোলার কোন উপায় নেই। খরগোশ চলে গেলে রান্নাঘরের পিছনের জানালার কাছে। রান্নার তেল আর ময়লা মিশে জানালার কাঁচ দুর্লভ কালো হিরার মত লাগছে। হাত দিয়েই খরগোশে হাত তেলে মাখামাখি হয়ে গেল।
জগাই সবচেয়ে ভাগ্যবান। বারান্দায় গ্রিল নেই। দড়িতে কয়েকটা মোজা আর পলিথিনের একটা ব্যাগ ঝুলছে। চটপট মোজাগুলো ওর প্যান্টের পকেটে ভরে ফেলল। সামনে শীত আসছে । মোজার দরকার আছে। আর মোজা ছিঁড়ে গেলেও সমস্যা নেই । বেলের শরবত বা চা-পাতা ছাঁকতে পুরানো মোজা বেশ কাজে লাগে।
পলিথিনের ব্যাগটা দেখে অবাক হল জগাই ওরফে মাধাই।
দেশে তো পলিথিন নিষিদ্ধ। তারপরও বিপদ ব্যাটা অমন কাণ্ড করেছে। ওকে খুন করা মানে দেশের মঙ্গল করা। থাবা মেরে পলিথিনটা নিতে যাবে তার আগেই অদ্ভুত একটা কাণ্ড হল। দড়ি থেকে লাফ দিয়ে বাতাসে উড়তে লাগল পলিথিনটা। কেমন অদ্ভুত কায়দায় উড়তে উড়তে জগাইয়ের সামনে এসে ওর মুখের উপর সেঁটে গেল ।
থাবা মেরে ও মুখের উপর থেকে ব্যাগটা সরাতে পারছে না জগাই। চোখে কিছু দেখতে পারছে না। দম নিতে পারছে না। দ্রুত পিছাতে গিয়ে মাথা ঠুকে গেল বারান্দার দেয়ালের সাথে। ওখান থেকে সরতে গিয়েই পায়ের সাথে এক জোড়া পুরানো জুতার টক্কর লাগল। জুতো জোড়া ফিতে পরস্পরের সাথে বাঁধা থাকায় ল্যাসোর ফাঁসের মত জগাইয়ের দুই পা পেঁচিয়ে গেল। মুখের উপর তখন পলিথিনের ব্যাগ সেঁটে আছে। কি ভাবে সম্ভব সেটা ? পলিথিনের ব্যাগটা মনে হয় হাসছে !
দ্রুত পিছাতে গিয়ে বারান্দার রেলিঙের সাথে ধাক্কা খেয়ে তাল হারিয়ে ফেলল জগাই। মাটি ভর্তি তিনটে ফুলের টব নিয়ে ধরাম করে বাগানের মধ্যে পড়লো সে।
বিনা আপত্তিতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
হাতের তালু দিয়ে কিচেনের জানালা পরিষ্কার করে ভেতরে উঁকি দিতেই কলজে হিম হয়ে গেল খরগোশের। কিচেন একটা সিরামিকের প্লেটে বড় বড় দুটো চোখ। সোজা চেয়ে আছে ওর দিকে । ভয়ংকর দৃশ্য। আতংকে মারাই যেত। পরমুহূর্তে আবিস্কার করলো- ও দুটো আসলে খোসা ছাড়ানো দুটো লিচু।
বারান্দা থেকে কেমন একটা শব্দ হল ,তারমানে জগাই বারান্দার দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
ভাল ভাল।
ইজি চেয়ার থেকে ধরমড় করে উঠে দাঁড়ালেন বিপদ বাবু।
সতর্ক হয়ে গেলেন। বাড়িতে চোর ঢুকেছে বা ঢোকার চেষ্টা করছে এটা নিশ্চিত। অনেকের ধারনা বিপদবাবু প্রচুর টাকা পয়সার মালিক। এবং টাকাপয়সা তার বাড়িতেই আছে। বারান্দার জানালা দিয়ে উঁকি দিতেই দেখেন বাগানে একটা লোক পরে আছে চিত হয়ে । ওর মুখে পাতলা পিশাচটা বসে আছে। তিনটে ফুলের টব ভাঙ্গা। আহারে । মাত্র মাটি দিয়েছিলেন। পুঁইশাক আর ধনেপাতা বোনার ইচ্ছা ছিল।
ইচ্ছেগুলো নিয়তির চাপে হারিয়ে যায় ।
চোর নিশ্চয়ই একা আসেনি ? থানায় ফোন দেয়া দরকার। দৌড়ে গিয়ে ফোন তুলতেই বুকটা ধড়াস করে উঠলো।
ফোন ডেড।
খরচ বাঁচাতে মোবাইল ফোন নেননি । এইবার ?
দরজার সামনে আসতেই মানিকের মনে পড়লো মাত্র কিছুদিন আগে একটা ইংরেজি মুভিতে দেখেছিল। ঠিক এই রকম ঘটনা। মা আর মেয়ে এক বাসায় থাকে। রাতে তিন ডাকাত আসে। ওরা কি ভাবে ডাকাতি করে ভাবতে গিয়েই মনে পরে - হায় হায়। টেলিফোনের লাইন । একদম মাথায় ছিল না। খানিক খুঁজতেই লাইন পেয়ে গেল। রামদা দিয়ে ঘচাং করে কেটে দিল তার। যাক সর্দার খুশি হবে পরে।
নিজের উপর নিজেই খুশি হয়ে গেল। প্রায় চাচা চৌধুরীর মত প্রখর ব্রেইনের অধিকারী সে। ব্যাপারটা ফেলে দেয়ার মত না কিন্তু !
এইবার কিচেনের শব্দটা শুনতে পেলেন বিপদবাবু।
দৌড়ে চলে এলেন। আবছা আলোতে দেখলেন কালো কুৎসিত একটা লোক জানালার গ্রিল খোলার চেষ্টা করছে।
‘এই তোমরা কোথায় ?’ হাঁক দিলেন বিপদবাবু। ‘ বাড়িতে চোর এসেছে আমাকে সাহায়্য কর।’
বিছানার নিচে যে পিশাচটা ছিল সে একটা বালিশ টেনে আরও গভীরে চলে গেল। হাই তুলতে তুলতে জবাব দিল- ‘ আমি দাবা খেলা ছাড়া আর কিছু জানি না।’
নীল পিশাচটা হারপিক খাওয়া শেষ করে বালতির জল চুকচুক করে খাচ্ছিল। লজ্জিত ভাবে বলল, ‘ আমরা তো আসলে ভয় দেখাতে পারি না।’
‘ আমি কি তবে দরজা খুলে দৌড়ে বাইরে যাব ?’
‘ সেটা খুব ঝুঁকির হয়ে যায়।’ দুঃখী গলায় বলল নীল। ‘ কারন আমার হিসাবে দরজার কাছে ঘাপটি মেরে দুইএকজন থাকবে। বের হবা মাত্র মুরগি ধরার মত ক্যাক করে আপনাকে ধরে ফেলবে।’
‘তা হলে উপায় ?’
‘ লড়াই করে পারবেন না। ওদের কাছে রামদা আছে। বুদ্ধি ব্যবহার করুন। রান্নাঘরে বোমা তোমা রাখেন না ?
‘ কয়েক হালি গ্রেনেড, আর আট দশটা মিসাইল আছে। খুঁজলে চালের ড্রামে পুরানো অ্যাটম বোমা পেতে পারি। বেকুব কোথাকার।’ রেগে গেলেন বিপদ বাবু ।
‘ সরি।’ মাথা নিচু করে লজ্জিত ভাবে মাথা নাড়ল নীল পিশাচটা। ‘ খুঁজে দেখুন কিছু পান কি না যা দিয়ে আত্ন্ররক্ষা করা যায় কি না। সব সময় অস্ত্র দরকার হয় না শস্ত্র দিয়েও কাজ হয়। মহাভারতে খড় দিয়েও লড়াইয়ের কথা আছে। ’
‘খারাপ বলনি।’ চিন্তিত মুখে বললেন বিপদ বাবু। ‘ একটা মুভি দেখেছিলাম বাচ্চা একটা ছেলে বাসায় থাকে বড়দিনের ছুটিতে । দুইজন তস্কর আসে বাড়িতে। বাচ্চাটা কায়দা চোরদের ঘায়েল করে।’
‘সেটাই তো বললাম।’
মাথায় বুদ্ধি এসেছে একটা। বাথরুমে গিয়ে মগের মধ্যে শ্যাম্পু ঢেলে নিলেন। জল দিয়ে ভাল করে মেশালেন। আস্তে আস্তে পা টিপে কিচেনে গিয়ে মরিচের গুঁড়ো আর লবণ ঢেলে, বড় একটা কাঠের চামচ দিয়ে মগের ভেতরের মিশ্রণটা ভাল করে ঘুঁটা দিয়ে নিলেন । বাইরের কালো চেহারার লোকটা তখনও জানালার গ্রিল খোলার চেষ্টা করছে। কিছুই টের পায়নি সে। চুপচাপ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন বিপদবাবু।
খুট শব্দ করে অর্ধেক গ্রিল খুলে ফেলল খরগোশ। আস্তে করে নামিয়ে রাখল ঘাসের উপর। কচ্ছপের মত গলাটা বাড়িয়ে দিল ভেতরে। আড়াল থেকে বের হয়ে এলেন বিপদ বাবু। মগ ভর্তি বিচ্ছিরি সেই তরল ছুড়ে দিলেন খরগোশের মুখের উপর। চমকে উঠলো খরগোশ। দ্রুত মাথাটা টেনে বাইরে নেয়ার চেষ্টা করতেই লোহার গ্রিলের সাথে ঠুং করে লেগে ব্যাথায় চেঁচিয়ে উঠলো। নাক মুখ চোখে শ্যাম্পু, মরিচ আর লবণের গোলা পড়তেই আরেক দফা চেঁচিয়ে উঠলো ষাঁড়ের মত।
মূল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসি হাসল মানিক ওরফে রতন। বিপদ বাবু শেষ। এটাই মরণ চিৎকার।
ওস্তাদের প্রতি মাথা ঝুঁকে গেল। অনেক ভাগ্য হলে অমন ওস্তাদ পাওয়া যায়। ঠিক করলো বেতন না দিলেও কাজ করবে ওস্তাদের সাথে , সারাজীবন ।
রাস্তার উল্টো দিকে বাড়ির সামনে বসে ষোলগুঁটি খেলছিল দারোয়ান রুস্তম। সাথে ওর বন্ধু, এলাকার টহল গার্ড রজনীকান্ত। পুরো এলাকা হেঁটে টহল দেয়া ওর কাজ। কিন্তু মাত্র একটা দুটো টহল দিয়েই চলে আসে রুস্তমের কাছে। সারারাত রাজ্যের আড্ডা দেয়।
আজ ষোলগুঁটি খেলতে খেলতে বলল,’ রুস্তম ভাই , আপনি জানেন বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেছে মহাকাশে হাজারে বিজারে ধূমকেতু আছে যেগুলো অ্যালকোহলে ভর্তি।’
‘ না জানব কি করে । আমি কি মহাকাশ বিজ্ঞানী নাকি ?’ চাল দিতে দিতে বলল রুস্তম।
‘ এখন মঙ্গল গ্রহে জল আর বরফ পাওয়া গেছে। অন্য কোন গ্রহে চানাচুর পাওয়া গেলেই গ্লাস নিয়ে আমরা সেখানে চলে যাব। আপনি কি বলেন ? ’
‘ফালতু চিন্তা তোমার। এই কারো চিৎকারের শব্দ শুনলাম মনে হচ্ছে।’
‘ নাহ রুস্তম ভাই। টিভিতে ঢোলা প্যান্ট পরা একটা গায়কের গানের অনুষ্ঠান হচ্ছে মনে হয় ।’
‘ উহু, বিপদবাবুর বাড়ি থেকে আসছে মনে হয়। চলো দেখে আসি।’
‘কিন্তু ওই ব্যাটা খুব কৃপণ। খুব বাজে ব্যবহার করে আমাদের সাথে। উনার বিপদে কেন যাব ?’
‘ কিন্তু হাদিসে লেখা আছে চল্লিশ ঘর পর্যন্ত প্রতিবেশীর খোঁজ নেয়া আমাদের দায়িত্ব ।’
‘ আমরা রাস্তার উল্টো দিক থেকে চল্লিশ ঘর প্রতিবেশী গুনলেই পারি। তবেই বিপদ বাবুর বাড়ি আমাদের প্রতিবেশী হবে না।’
‘ থাকো তুমি। আমি চললাম।’ উঠে দাঁড়ালো রুস্তম।
শব্দ শুনে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে ফকির আমির খান। ‘ আমিও আসছি।’ বলল সে।
হনহন করে দুইজন রওনা হল বিপদবাবুর বাড়ির দিকে। পিছন পিছন বাধ্য হয়ে চলল রজনী কান্ত।
মানিক ওরফে রতন অবাক হয়ে দেখল তিনজন লোক হন হন করে বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। কারা এরা ? বোকার মত চেঁচিয়ে বলল- ‘ পথিক আসিয়া কামড় দিল কুকুরের পায়ে।’
তিনজন লোক এক সাথের ঝাঁপিয়ে পড়লো মানিকের উপর। হাত দুটো পিছনে নিয়ে মুহূর্তেই বেঁধে ফেলল ওকে। চেঁচিয়ে রুস্তম বলল- ‘ বিপদ স্যার, আমি রুস্তম দরজা খুলুন। আপনি ঠিক আছেন তো।’
‘ছি রুস্তম তুমিও ওদের দলে ? লজ্জা হওয়া উচিৎ।’ ভেতর থেকে জবাব দিলেন বিপদ বাবু। ‘ দরজা খুলছি না আমি।’
‘ আমরা আপনাকে সাহায়্য করতে এসেছি। বিশ্বাস করুন পুলিশে ও ফোন দিয়েছি।’
খুব দ্রুত পুলিশ চলে এলো।
মোটা মত এক দারোগা বা ওসি সাহেব কিছু না বুঝেই জিপ থেকে লাফিয়ে নেমে চ্যাঁচ্যাঁতে লাগল- ‘ খবরদার। আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না প্লিজ।’
জগাইকে পাওয়া গেল বাগানে। চিত হয়ে পরে আছে। খরগোশকে পাওয়া গেল খানিক দূরের পচা পুকুরে। একটার পর একটা ডুব দিয়েই যাচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে , ‘ মরে গেলাম রে। আমি অন্ধ হয়ে গেছি রে।’
এত রাতেও কয়েকজন সাংবাদিক চলে এসেছে।
এরা টিভিতে লাইভ দেখাচ্ছে। যার যেমন মর্জি তেমন খবর পেশ করছে। যেমন - এক সাংবাদিক বলছে, বাড়িতে এখনও কয়েকজন জিম্মি আছে যাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আরেক সাংবাদিক বলছে- বিদেশিদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য বিরোধী দলের কেউ কেউ এই কাজের সাথে জড়িয়ে। এক সাংবাদিক বলেই বসল- তিনজন হিন্দু জঙ্গি ধরা পড়েছে।
অপরাধী তিনজনকেই প্যাকেট করে থানায় নেয়া হল।
পরদিন বিপদ বাবু গিয়েছিলেন পিশাচ বিতানে।
সব শুনে সেনাপতি বলল- আমার মনে হয় আপনার বাড়িতে পিশাচ আর মানুষের সহবস্থান ই ভাল লক্ষণ। নিজেকে বদলান দেখবেন সব সুন্দর হয়ে গেছে।
বিপদ বাবু অনেক বদলে গেছেন ।
গরিবদের সাহায়্য করেন। মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার করেন। ফকির আমির খানকে একটা কারখানায় কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন। বাড়ির সামনে বাগানে নতুন নতুন ফুলের গাছ বুনেছেন। ফুল ধরার মৌসুম এলে দেখা যাবে কেমন হয়। এখনও জানা যাচ্ছে না।
তিনটে পিশাচ বাড়িতেই আছে।
ওরা আর যাবে কোথায় ?
পিশাচ তিনটের কথা সবাই জানে। রাতের বেলা বিপদ বাবুর বাসায় নীলচে ভৌতিক আলো অনেকেই দেখেছে। ওটাই নীল পিশাচ। বারান্দায় কাপড় শুকানোর দড়িতে একটা পলিথিনের মত ঝুলেই থাকে। ওটা হালকা গান গায় বুউউউউ করে।
তোমরা যারা আমার গল্প বিশ্বাস কর না, তারা ইচ্ছা করলে আমার সাথে দেখা করতে পারো। তা ছাড়া সুলতানগঞ্জের সেই দোকানটা এখনও আছে। কাল বিকেলেই হাঁটতে গিয়ে দেখে এসেছি। দোকানদার সেনাপতি লস্কর আমাকে একটা কাগজের ব্যাগ এমনিতেই দিয়েছে।
কি ভাল মানুষ !

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন