সাত
এক দল আছে, যাঁরা বারমুডা ট্র্যায়াঙ্গলের রহস্য কোনও রহস্য বলে মানতে রাজি নয়। একদমই না।
তাঁদের মতে, সমুদ্রের উপর দিয়ে জাহাজ বিমান গেলে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। বারমুডার মতো আরও কিছু জায়গা আছে যেখানে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটে। যেমন কানাডা আর আমেরিকার গ্রেট লেক । জাপান সমুদ্রের মারিয়ানা আইল্যান্ড।
জাপান সমুদ্রের যে অংশটা ডেভিলস সি হিসাবে পরিচিত সেখানে জাহাজ হারাতো রহস্যময়ভাবে। জাপান সরকার ১৯৫০ সালে ঘোষণা দেয়, সাগরের ওই অংশটা সত্যিই বিপজ্জনক। কারণ হিসাবে বলা হয়েছিল, সমুদ্রের তলায় অনেক সুপ্ত আগ্নেয়গিরি রয়ে গেছে। হঠাৎ হঠাৎ করে জেগে উঠত সেই আগ্নেগিরি। তাৎক্ষণিকভাবে ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি হত। বিকল হয়ে যেত কম্পাস -রেডিও। নেভিগেশনে অন্য সব যন্ত্রপাতি কাজ করত না। ফলে কোনও রকম বিপদ সংকেত না দিয়েই হারিয়ে যেত বিশাল সব মালবাহী জাহাজগুলো।
সারা পৃথিবীতে মোট দশটা এলাকা আছে যা বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মতোই । এই দশ এলাকার অবস্থান বেশ অদ্ভুত৷। ইক্যুয়েটরের উত্তরে আছে পাঁচটি । বাকি পাঁচটা দক্ষিণে। প্রত্যেকটা এলাকার অবস্থান ৭২ ডিগ্রি দূরে দূরে। অর্থাৎ সবাই সমান দূরত্বে অবস্থিত। এটা কি পৃথিবীর মস্ত কোন ভৌগোলিক রহস্য?
ডেভিল সি-তে দীর্ঘদিন ধরে জাহাজ হারায় না। কিন্তু ১৯৯২ সালের ১৪ ই ফেব্রুয়ারী রহস্যময় ভাবে হারিয়ে যায় মাছ ধরার জাহাজ ডেইরি মারু -৩ ।
পরের বছর ফেব্রুয়ারি ১৫, বিশাল কন্টেনারবাহী জাহাজ ভেসট ওসেন হারিয়ে যায়। জানুয়ারি ৭, ১৯৯২ হারায় ইউকুমারু -৩ নামের জাহাজ। ২৫ টন মাছ বহন করছিল সে।
শেষ হারিয়েছে ২০০১ সালের এপ্রিল ১১ তারিখে হঙহি সানিয়ো জাহাজটা । ২৮ জন ক্রু নিয়ে।
১৯৬৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ত্রিশটি বিমান হারিয়েছে আমেরিকার বিখ্যাত গ্রেট লেকস এ। কিন্তু একটারও কোনও মেসেজ আসেনি। কর্তৃপক্ষ অবশ্য মনে করে বিমানগুলো হারিয়ে গেছে পাইলটের ভুলে । তুষারের স্তুপ আর দমকা হাওয়ার জন্য পাইলট বিভ্রান্ত হয়ে ভুল করেছে।
এগুলো হচ্ছে তাঁদের যুক্তি, যাঁরা বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মধ্যে কোনও রকম রহস্য আছে বলে মানতে রাজি নয়৷
আর যাঁরা মানেন, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পৃথিবী ইন্টারন্যাল ইন্টারনাল ডোরের কথা পর্যন্ত টেনে আনে।
বা সময়ের ফাঁদের কথা ও বলেন ।
তাঁদের যুক্তি মতে , জাহাজ আর বিমানগুলো সময়ের ফাঁদে পড়ে অন্য সময় চলে যায়।
হয়তো চলে গেছে ভবিষ্যত পৃথিবীতে বা অতীতে কোনও এক সময়ে ।সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে। সময়ের নাকি রহস্যময় অনেক রূপ আছে। সময় নিজেই একটা বৃত্তের মতো। এর মাঝে রয়েছে অসংখ্য ফাঁক। সেই ফাঁক দিয়ে চলে যাওয়া যায় ভিন্ন সময়ে। সময় নিজেই ব্যাখ্যাতীত এক রহস্য।
আজ কিছু বিজ্ঞানী দাবি করেন, আকাশের গায়ে ও থাকতে পারে সময় সুড়ঙ্গ , যাতে করে চলে যাওয়া যায় অন্য কোথাও। বারমুডা ট্র্যায়াঙ্গেলে থাকতে পারে অদৃশ্য চুম্বকের ঘুর্ণি যাতে হঠাৎ করে পড়ে যায় বিমান ও জাহাজ।
কিন্তু এইসব তত্ব কথায় আমাদের মত সাধারণ মানুষের চিঁড়ে ভেজে না। আমরা চাই প্রমাণ ।
তেমন কোন প্রমাণ আজও কোন বিজ্ঞানে তুলে দিতে পারেনি আমাদের হাতে।
আর প্রমাণ যখন দিতে হয় না তখন সবাই ইচ্ছে মতন তত্ত্ব তৈরি করেন।
একদল এও দাবি করেছে, আর যেখানে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল রয়েছে অতীতে সেখানেই ছিল হারানো সভ্যতা আটলান্টিস। জ্ঞানে বিজ্ঞানে অনেক উন্নত ছিল তারা।
ইলেকট্রিক ফোরস নামে এক শক্তির ব্যবহার শিখেছিল তারা। যে শক্তি ব্যবহার করে নিমেষে পৌঁছে যেত এক স্থান থেকে আরেক স্থানে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর আটলান্টিক তলিয়ে যায় সমুদ্রের অতলে। কিন্তু তাঁদের সেই শক্তির বয়ে গেছে অক্ষত। তারই প্রভাবে হারিয়ে যায় জাহাজ বিমান - সাবমেরিন ।
প্লেটোর কারণে আটলান্টিসের কাহিনি সবাই জানে।
যতদূর জানা যায়, সেই সময় সমুদ্রের বুকে আটলান্টিস নামে একটা দ্বীপ ছিল। যাঁর বাসিন্দা ছিল সেই সময়ের তুলনায় প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানে অনেক উন্নত ।
বারমুডার কাছাকাছি বিমিনি দ্বীপ। ওখানে সম্প্রতি অদ্ভূত একটা জিনিস আবিষ্কার হয়েছে। মায়ামি ইউনিভার্সিটির সমুদ্র বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডক্টর জে, ম্যানশন ভ্যালেন্টাইন বিমিনি দ্বীপের কাছাকাছি অগভীর সমুদ্রে ডুব দিয়ে কতগুলো বহু কোন বিশিষ্ট পাথরের বিশাল পিলার আবিষ্কার করেছেন। চমক লাগলে ও সত্য, প্লেটোর বর্ণনাতে ও আটলান্টিসের চারদিকে অমন বড় বড় পাথরের খুঁটি ছিল। যেগুলিকে হারকিউলিসের দরজা বলতো ।
খুঁটিগুলি আস্ত বড় বড় পাথর কেটে পালিশ করে বানানো হয়েছে। ঠিক যেন পেরুর ইনকাদের তৈরি মন্দিরের মতো। মনে হয় একই কারিগরদের কাজ।
ডুবুরিরা খুঁজে দেখতে পেল, পাথরের তৈরি অসংখ্য ব্লক চলে গেছে লম্বা সোজা একটা বড় পথ ধরে। আরেকটি ইংরেজি বর্ণমালার J হরফের মতো । এই পথের দৈর্ঘ্য ১৯০০ ফুট। হতে পারে , এটা দেওয়াল বা পথ।
১৯৬৮ সালের সেপ্টেম্বরের দুই তারিখের কথা এটা। আবিষ্কারক ডক্টর যে ভ্যালেন্টাইন বলেন, ‘… যখন দেখলাম পেল্লাই সাইজের একগাদা পাথর নির্দিষ্ট একটা ছকে পাশাপাশি সাজানো তখন অবাক না হয়ে পারিনি। নিজের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল ব্যাপারটা। প্রায় একশ গজ সাঁতরে গেলাম। শেষ পর্যন্ত বালির ভিতরে ঢুকে গেছে পাথরের পথটা।’
ডুবন্ত এই পাথরে ব্লকের পথটা বিমিনি রোড নামে পরিচিত। এটি যে আটলান্টিক সভ্যতার চিহ্ন সেই ব্যাপারে সবাই একমত না হলেও , এটা যে রহস্যময় হারানো কোন সভ্যতার নিদর্শন এই ব্যাপারে সবাই এক।
১৯৭৬ সালে লেখক ডেভিড জিঙ্ক - ‘ দ্যা স্টোন অব অ্যাটলান্টিস’ নামে বইটা লিখেন। বিস্তর খাটাখাটনি করে। জিঙ্ক সাহেবের মতে, সেই পাথরের ব্লকগুলিতে , বহু রকম তীর চিহ্ন আর জ্যামিতিক নকশা আঁকা। যার ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়নি ।
বিশিষ্ট গবেষক এডগার কেইজ বারবার দাবি করেন, বিমিনি রোড নামে পরিচিত পাতায় ব্লকই সেই কিংবদন্তি আটলান্টিসের রাস্তা। কেইজের মতে, মিশরীয় সভ্যতা আর আটলান্টিস সভ্যতা একই সাথে গড়ে উঠেছিল। এই দুই সভ্যতার মধ্যে যোগাযোগ ছিল। আটলান্টিস সম্পর্কে বহু কথাই নাকি লেখা আছে পিরামিডের দেওয়ালে। কান টানলে যেমন মাথা চলে আসে, তেমন সব রহস্যের ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে যদি আটলান্টিসের রহস্য ভেদ করা যায়।
বাহামা দ্বীপের আদিবাসীরা সেই আদিম কাল থেকেই এই দেওয়ালের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানে। ওরা বলে- দ্বীপের দেওয়াল ।
উত্তর জানা যাবে জলদি।
কোন ধরনের সভ্যতা ছিল ওখানে ? কারা ওরা ? তাহলে হয়তো অনেক রহস্য দরজা খোলা যাবে আমাদের সামনে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন