এক
সেপ্টেম্বরের কয়েকটা বিকেল কেমন যেন অদ্ভুত রকমের মায়াবী হয়ে যায় ।
জানালার পাশে সস্তা ধরনের বাগান ।
যত্ন নিলে নন্দনকানন হত। যত্ন নেয়া হয় না। সেইসব বুনো গোলাপের ঝাড়, যারা আমার অবহেলা নিয়েও বেঁচে আছে, নিশ্চয়ই দিনরাত অভিশাপ দেয় আমাকে ?
বিকেল বেলা কয়েকটা কাচপোকা উড়ে আসে। ওদের পাখা দিয়ে নাকি মেয়েদের টিপ বানাত কোন এক সময়। মিনাবাজারের মনিহারী দোকানে বিক্রি হত , তোমার মত কমলা সুন্দরীদের জন্য।
অদ্ভুত একটা লাল রঙের পোকা দেখি আজকাল । পিঠে কালো ছোপ। ছোপগুলো মিলে কেমন মুখোশ হয়ে গেছে। হাওয়াই দ্বীপের যুদ্ধদেবতার মুখের মত। পলিনেশিয়ান দ্বীপেও অমন মুখোশ পরে নাচে লোকজন।
কি নাম এই লাল পোকার ?
প্রথমে ভেবেছিলাম রেডলিলি বিটেল হবে। পরে দেখি, না। হংকং রেড বাগ, নাম ওর।
তো, এত দূর হংকং থেকে আমার বারান্দার শার্সিতে ওরা কেন ?
পথ ভুলে ? ছন্নছাড়া পোকা ? বেড়াতে এসেছে ?
দেখ, গ্যালিকানা গোলাপের যত্ন নেইনি বলে ওরা অভিমান করেছে। কিন্তু জোনাকি ফুলগুলো, গোলাপের মত বা তোমার মত অভিমানী মেয়ে না। ওদের ভালবাসা না দিলেও ঘন নীলরঙের ফুল দিয়ে ভর্তি হয়ে থাকে বেহায়ার মত।
বাসি খবরের কাগজ জমে আছে।
রেগুলার ফেরিওয়ালাটা আসছে না কয়েকদিন ধরে , তাই। কোরবানি ঈদে বাড়ি গেছে। প্রচুর গরু খেয়ে অসুস্থ হয়ে চোখ হলুদ করে শহরে ফিরবে।
এসেই বলবে- দাদা মইরাই জাইতাম । খালি বিলাই বাবার লিজ্ঞা বাইচ্চা আছি।
ওর বিলাই বাবার কথা আগেও শুনেছি। বিরাট এলেমদার মানুষ। তার খানকা শরীফে কয়েক ডজন বিলাই... ইয়ে বিড়াল আছে। সবগুলো বিড়াল কোন না কোন মহৎ মানুষের আত্মা। বিড়ালের ভেতরে ঢুকে গেছে কোন এক ভাবে।
সেই বিড়ালের খেদমত করে বিলাই বাবা এত বড় কামেল হয়েছেন।
বাসি খবরের কাগজ কিছু চলে গেছে রান্না ঘরে।
তাকের মধ্যে রাখা হবে। মসলার মন খারাপ করা দাগ যেন না পরে তাকের ভাজে ভাঁজে।
একটা কাগজ মেঝেতে পরে আউলা বাতাসে তুরস্কের নর্তকদের মত ঘুরছিল।
আমি পড়ি না এইসব বেহুদা খবরের কাগজ। যার অর্ধেক দখল করে থাকে চালবাজ বহুজাতীক কোম্পানির রঙচঙা বিজ্ঞাপন।
পাত্রী চাই, জমি বিক্রয়, সুলভে অফিসের প্লট, সস্তায় বিদেশ গমন। আরও থাকে হতাশ মানুষদের জন্য ভাগ্যফল। কুৎসিত আমলাদের হাসিমুখের ছবি।
বাকি কাগজ ভর্তি নানান আতঙ্কজনক আর হতাশার খবর। জিন্দেগীতে খবরের কাগজ পড়ে মন ভাল হয়নি আমার।
আজ তুলে নিলাম ।
বিচিত্র এক খবর নাচতে নাচতে চলে এলো চোখের সামনে । কোন এক ৯৮ বছরের বুড়ো, রেল ইশটিশনের বাইরে বসে কবিতা পড়ে শুনায় , দৌড়ে বাড়ি ফেরা মানুষদের।
নিজের লেখা কবিতা।
কোন উপার্জন নেই তার। বাড়িতে গিন্নি অসুস্থ। গিন্নির বয়স ৮৫। শুধুমাত্র ফিজিওথেরাপি’র জন্যই দিনে পাঁচশো টাকা লাগে। রয়েছে ওষুধের খরচ।
কি অদ্ভুত !
যখন আমি ডেনিম জিনসের প্যান্টের সাথে ইনডিগো ব্লু টেনিস স্যু ম্যাচ করবে কি না ভাবছি, তখন ৯৮ বছরের এক বুড়ো কবিতা পড়ে সামান্য উপার্জনের আশায় বসে আছে দুঃখের ইশটিশনে।
টের পাই কেমন একটা কষ্টের দানা জমা হয় আমার মনের খামারে।
এক লহমায় সেটা হয়ে যায় বিষাদের
ঘন অরণ্য ।
মন কেমন করে আমার।
তুমি তো বল, সব পুরুষ এক।
একদমই না। কিছু পুরুষ যে কবি হয় , প্রেমিক হয় সেটা তো জানো না।
যদি জানতে !
দুই
--------
শীতের বিকেল হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় ,মায়াবী, আর মন হাহাকার করা সময়।
কে না জানে, অমন এক প্রহরের জন্য সারা বছর অপেক্ষা করা যায়।
শীতের মৌসুমে , দুপুরের পর রোদটা আরও হলুদ হয়ে যায়। গহন ঘন হলুদ ।
অমন হলুদ রোদের জন্য হাহাকার করতো ভ্যানগগ। পাগলের মত সে ভালবাসত হলুদ রঙ। টিউব থেকে হলুদ রঙ বের করে তাতে মেশাতো ডিমের কুসুম। ওতে রঙ হয়ে যেত আরও মায়াবী। কাব্যিক। ভাললাগার।
রোদে দাড়িয়ে ছবি আঁকতো পাগলটা। থাকতো হলুদ রঙের বাড়িতে। কি ভাগ্য, বেচারা ছবি বিক্রি করতে পারত না । কেউ কিনত না ওর ছবি ।
কেউ না।
যে সূর্যমুখী ফুলের ছবিটা ৩৯.৮৫ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হল, সেটাও যদি দশ হাজার ভাগের এক ভাগ দামে ও বিক্রি হত, তবেই বেঁচে থাকত অভিমানী এই শিল্পী।
কিনতে পারত আরও কিছু বাদামি রুটি । আরও কয়েক পেয়ালা কালো কফি। এক পাত্র ফেনিল বিয়ার।
কি আফসোস ! কি আফসোস !
বারান্দার শার্শি দিয়ে হলুদ রোদ সতর্ক পায়ে ঢুকে পরে কামরার ভেতরে। আরও খানিক পর ঘন হতে হতে কমলা হয়ে যাবে। ক্রিট দ্বীপের পাকা কমলার মত ।
দীর্ঘ এই সময়টা ইজি চেয়ারে বসে থাকি। হাতে বিকট সাইজের পেপার ব্যাক।
গল্প কাহিনিতে মন তরল হয় না আর। নন ফিকশনের মৌতাতে আছি আজকাল ।
পড়ছি নরওয়ের সাগর দানব ক্রাকেনের ( kraken) কথা। এইসব বিদঘুঁটে জিনিস মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছ তুমি।
হ্যাঁ, তুমি।
সময় বদলানোর সাথে সাথে বিকেলটা যে কেমন হয়ে যায়, তুমি জানতে ও পারবে না। পশ্চিম দিকে সূর্যটা চলে গেলে, বাগানের কাঠবাদাম আর কাঁঠাল গাছের পাতা ফাঁকি দিয়ে টুকরো টুকরো রোদ আসে।
বিষণ্ণ লাজুক রোদ।
সস্তা থিয়েটারের মঞ্চসজ্জার দুঃখী আলোর মত সেই রোদ । বসে বসে দেখি তাই।
এই মউসুমে গাছেরা পাতা হারায়। কাঠ বাদামের পাতা হয়ে গেছে ঘন লাল। কাঁঠালপাতা গুলো বাদামি। আগের দিনের পোস্ট কার্ডের মত । ওদের মর্জি মত ওরা খসে খসে পড়ছে।
শব্দ পাই।
রাতের বেলা শিশির আর ঝরা পাতার শব্দ মিলিয়ে বিচিত্র এক শব্দমালা তৈরি হয়। যে না শুনেছে তাকে হাজার বর্ণনা করেও বোঝান যাবে না।
পাতা ঝরার শব্দে মনে পড়ে, অনেকগুলো বছর আগে আমরা পাহাড় দেখতে গিয়েছিলাম।
কে না জানে, জীবনে একবার হলেও পাহাড় দেখতে হয়। নইলে আত্মা বড় হয় না। সেইজন্য শিবের উপাসকরা পাহাড়ে চলে যেত। হিমালয়ে গিয়ে ওদের মনে হত, স্বর্গের কাছাকাছি চলে গেছে। ঈশ্বরের হাতের ছায়া পেত ওরা।
ইনকারা থাকতো আন্দিজ পাহাড়ে। গুয়েতেমালায় থাকতো মায়া জাতি।
নীল নক্ষত্রের রাতগুলোতে, আদিম সব দেবতারা পাহাড়ে নেমে আসে , যারা এখানেই ছিল, জগৎ শুরুর আগে।
সেই সব রাতে অকস্মাৎ স্বর্গের দরজা খুলে যায় । ভাগ্যবান দুই চারজন স্বশরীরে চলে যায় ইন্দ্রপুরীতে ।
আকাশগঙ্গায় স্নান করে ফেলে দেয় নশ্বর শরীর।
তুমি পাহাড় পছন্দ করতে।
খুঁজে পেতে যোগাড় করলে পাহাড় ঘেঁষা ছোট এক শহর। যেখানে বিদেশি ধাঁচের কাঠের বাংলো আছে । গরমের সময় বড্ড ভিড় হয় এইসব নাম না জানা শহরে । শীতে থাকে শীতঘুমে।
এক শীতের সকালে আমরা গেলাম।
চারিদিকে মহুয়া আর শালের বন।
আদিবাসীরা টকটকে লাল রঙের বনমুরগি আর পান্না রঙের জঙ্গুলে শাক বিক্রি করতে আসে। আরও থাকে পোখরাজ রঙের বুনো আলু । সিন্দাবাদের তলোয়ারের মত মৌ শিম।
কাঠের বাংলোটা এত সুন্দর !
শুধু সিনেমায় দেখা যায় অমন। অথবা বিদেশি ক্যালেন্ডারে।
সামনে উজবুকের মত দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। বেচারা যেন বুঝতে পারছে না কি করবে ।
কালো রঙের এক আদিবাসি ছেলেকে দেখি, তীর ধনুক নিয়ে শিকারে যাচ্ছে। সাথে ডুরে শাড়ি পরা এক মেয়ে। বউ বা বান্ধবী। মনে হচ্ছে রাম সীতা হেঁটে যাচ্ছে পঞ্চবটীর বনে।
তুমি বললে- সারাজীবন থাকা যায় না এমন নির্জনবাসে ?
আমি হেসেছিলাম।
মানুষ অনন্তকাল স্বর্গে ও থাকতে পারে না। একঘেয়ে লাগে তার কাছে।
পানসে হয়ে যায় অমৃত। কিন্নরীর গান বিরক্ত লাগে। অপ্সরার নাচ বিম্বিসা জাগায় ।
তাই তো সে আবার জন্ম নেয় ধূলামাটির পৃথিবীতে।
করে পাপ । প্রেমে পড়ে। ঈর্ষা করে । ঘৃণা করে।
সেটা ছিল দারুন এক শীতের হিম হিম বেলা।
সন্ধ্যাবেলার নারকেল তেল জমানো কড়া শীতে , শামুকের মত কুঁকড়ে ছিল শহরটা।
কেয়ারটেকার লোকটা বাংলোর বাইরে জ্বালিয়ে দিয়েছিল ঝরা পাতার আগুন। ঝলসানো হচ্ছিল, চেনা-অচেনা মশলা মাখানো বনমোরগ।
আমাদের বিনোদন দিতে , কোত্থেকে দুই নর্তক আমদানি করেছিল কেয়ার টেকার।
একজন ভয়ংকর রকমের রোগা। সারা শরীরে সাদা রঙের পোঁচ মাখিয়ে কঙ্কালের রূপ দেয়া হয়েছে। জ্যান্ত কঙ্কালের মত লাগছে।
আরেকজন ইয়া মোটা। সারা শরীরে সবুজ রঙ মাখিয়ে ওকে দৈত্য বানান হয়েছে। মাথায় মোষের শিং। মুখের ভেতরে লাল রঙ মাখা।
ভয়াবহ ব্যাপার।
সারাক্ষণ হাসি মুখে ছিল দৈত্যটা। পিলে চমকে যাবার মত দৃশ্য। এই প্রবল শীতেও একটা জাইঙ্গা ছাড়া আর কিছু নেই ওদের শরীরে।
ওরা ঘণ্টা দুইয়েক নাচল। যদি ওই সব নড়াচড়াকে নাচ বলা যায় আর কি !
যদিও কেয়ার টেকার বলছিল বারবার - এই ভূতের নাচ খুব শৈল্পিক ব্যাপার। অত্র অঞ্চলে ওরা খুব বিখ্যাত ।
ওদের মজুরি মাত্র পঞ্চাশ টাকা । আর আমাদের ঝুটা খাবার থাকলে ওরা খাবে।
হায় ! হায় !
এই দিয়ে চলে কেমন করে ওদের ?
পাঁচশো টাকার এক - একটা নোট নিয়ে ওরা পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইল। ওদের নাচ দেখে অনেকেই নাকি টাকা পয়সা দেয় না। ঝুটা খাবারও থাকে না।
আমরা খাবার দিতেই না খেয়ে দুইজনেই প্যাক করে নিল শালপাতার ঠোঙায় মুড়িয়ে । বাড়িতে নাকি ওদের বউ বাচ্চা আছে। অধীর আগ্রহে থাকে, যদি ওরা খাবার নিয়ে ফেরে ।
বেশির ভাগ সময় খালি হাতে ফিরতে হয়।
কি রকম অভিমানের কথা।
এক পেয়ালা করে কফি খুব আগ্রহের
সাথেই খেল দুই ভূত। এমন চনমন করা তেতো ‘ চা ’ নাকি জীবনেও খায়নি ।
আশীর্বাদ করলো আমাদের জন্য । সাতজন্ম আমরা যাতে এক সাথে থাকি ।
কী সব দিন গেছে আমাদের !
অনন্ত সব নক্ষত্র আর ছায়াপথ সাক্ষী রেখে, সেই রাতে আমরা বলেছিলাম- সারাজীবন পাশাপাশি থাকব।
কিন্তু রাত্রির সব প্রহরে কত নক্ষত্র ঝরে যায় , আকাশ কি মনে রাখে ?
তিন
---------
আমাদের বাড়ির উত্তরের জানালাটা, জাদুর জানালা।
ম্যাজিক উইনডো ।
বছরের কোন কোন সময় অদ্ভুত মিষ্টি হাওয়া চলে আসে। যেন গোপন কোন বাক্স ভর্তি ছিল ।
খুলে গেছে কারও ভুলে।
যেমন এই কয়েকটা দিন বাতাসে পূজার ঘ্রান পাচ্ছি।
এমনিতে খোলা জানালা দিয়ে চাইলে বোতল ব্রাশ গাছটা দেখি। ওটা ভর্তি টকটকে লাল ফুল। লাল ফুলের উপরে আবার সোনালি রেনু । ইচ্ছা করলেই যেন বোতল পরিষ্কার করা যাবে। ইংরেজিতে উইপিং বোতল ব্রাশ বলে।
কাঁটামান্দার গাছটা কে বুনেছিল- বলতে পারব না। ওর বাকলগুলো ফাটা। যেন রূপচর্চার অভাবে নিজের ত্বক নষ্ট করে ফেলেছে কোন রূপবতী। শরীর ভর্তি কাঁটার জন্য ছোট বেলায় বিরক্ত হতাম। কিন্তু যখন থেকে ওর সিঁদুরে রঙা ফুল দেখে মুগ্ধ হওয়া শুরু করেছি তখন থেকেই ওর জন্য আলাদা দরদ আছে ।
ফাল্গুনের শুরুতে ফুল হয় ওর। ছোট বেলায় মা বলেছিল- মান্দারের কাঠ দিয়ে দেশলাই বানায় । তখন থেকে এক বাক্স দেশলাই পেলে, মন খারাপ করে ভাবতাম, কোন পথের কোন গাছের দেহ এটা ?
বিদঘুটে সব খাবারের শখ ছিল তোমার।
বলেছিলে- পাকা তেঁতুল, শর্ষের তেল আর মান্দারের সিঁদুর রঙা ফুল চটকে এক রকম চাটনি বানায় নাকি । বরিশালের লোকেরা তেঁতুল বানানি বলে।
কই ? জীবনানন্দ দাশের কোন কবিতায় অমন কথা তো পেলাম না । উনি হয়তো শিঙাড়ার সাথে তেঁতুল বানানি মেখে খায় নি।
নীলচিতার ঝাড়টা নেই।
সুন্দর নীল রঙের ফুল ধরত আগে । ঘন নীলে যেন এক ফোঁটা দুধ ফেলা হয়েছে। নীলফুল দারুন লাগে। কে যেন বলেছিল গাছটা বিষাক্ত। কেটে ফেলতে। পারিনি।
শাস্ত্রে আছে ,নিজ হাতে বিষবৃক্ষ রোপণ করে ও কাটতে নেই। মানে কি কথাটার ?
লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দিরের বুড়ো বামুনের কাছে ব্যাপারটা জানতে হবে।
শনিবার মন্দিরে যাবার কথা।
সন্ধ্যার সময় শনি চিনি দেয়া হয়। ছোট বেলায় মা চিনি দিয়ে শনির পূজা দিত।
মন্দিরে দেখি মিছরি দেয়। ওগুলো দেখতে কিম্বালির খনির হিরের মত ।
কাঠমালতী গাছটা আছে।
জাহাজের প্রপেলারের মত সাদা সুন্দর ফুল ধরে আজও। এটার আরেক নাম কি টগর ? জানতে হবে। কাউকে জিজ্ঞেস করে কিছু শেখা যায় না আজকাল।
যাকেই জিজ্ঞেস করবে, বলবে- জানি না।
দীর্ঘদিন জরিপ করে দেখেছি, নতুন কোন জায়গায় গিয়ে যদি জিজ্ঞেস করি, ভাই খাজা মার্কেট চেনেন বা সুলতান টাওয়ার কোথায় জানেন ?
অপরপক্ষ বেহায়ার মত মিহি হেসে বলবে- আমি এই জায়গায় নতুন এসেছি।
কচি কলাপাতার মত সবুজ দেখতে, জাহাজের প্রপেলারের মত চার পাতা ওটা সুষুনি শাক। তিন পাতা হলে নাকি আমরুল।
লালশাকের মত একটা পাতাবাহার আছে ওটার নাম কোলিয়াস। পুদিনাপাতার মত দেখতে একটা ঝোপের পাতা। কোন ঘ্রাণ নেই পাতায়। সরু মঞ্জুরিতে নীল অপার্থিব ফুল ধরে। ওটা নীলকণ্ঠী।
গত শীতে গাঁদাফুলের চা বানিয়েছিলাম।
পুরানো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বইপত্র ঘেঁটে , তুমি এইসব আজগুবি জিনিস বের করতে। জিনিসটা কঠিন কিছু না।
কয়েকটা গাঁদা ফুলের পাঁপড়ি ছিঁড়ে রোদে শুকিয়ে রাখতে হয়। চা বানানোর সময় গরম জলে এক টেবিল চামচ শুকনো পাঁপড়ি ঢেলে, অল্প আঁচে মিনিট দশেক রেখে দিতে হবে। ছাকনি দিয়ে ছেঁকে পাতা ফেলে এক চামচ সোনালি মধু মেশাতে হবে।
হয়ে গেল গাঁদা ফুলের চা।
এই চা পান করলে নাকি অনেক আধিব্যাধি পালিয়ে যায়।
উত্তরের জানালা দিয়ে সারাবছর গাছগুলো দেখি।
ওরাও আমাকে দেখে। আমাকে একা আর নিঃসঙ্গ দেখে নিশ্চয়ই অবাক হয় ।
বিস্কুট আর চা নিয়ে বাগানে বসার জো নেই। পাটকিলে রঙের কয়েকটা চড়াই আমার অনুমতির তোয়াক্কা না করেই বিস্কুট খেয়ে ফেলে। কমনসেন্সের অভার থাকলে যা হয়। চা-ও খেত। গরম বলে পারে না। অথবা ওরা চা খায় না।
হয়তো কফি বা বেলের শরবৎ পছন্দ করে। অথবা পাকা জলপাই দেয়া মারটিনি। অথবা আপেলের ব্রান্ডি দিয়ে বানানো ককটেল - নিউটন আপেল।
আজকেই দেখলাম দুটো টুনটুনি পাখি জুটি বেঁধে বাসা খুঁজছে । নতুন বিয়ে করেছে পালিয়ে এসছে। কেউ সেল্টার দিচ্ছেনা ।বাড়ি ভাড়া চাইল ।
দিয়ে দিলাম ।
কাঁচা জলপাই রঙের দুটো পাখি খড়কুটো জোগাড় করে বাসা বানাচ্ছে। ওদের একটা সুবিধা আছে কোন কাজেই মিস্তুরি লাগে না।
খয়েরি রঙের একটা পাখি দেখেছি। চোখে কমলা রঙের কাজল দেয়া। সুন্দরী তো, খুব অহংকারী।
কাল দেখি কয়েক কেজি ফড়িঙ উড়ছে।
এত ফড়িঙ কেন ?
ওদের কোন উৎসব নাকি ?
প্রণয়ের মৌসুম না তো ?
কত ভাগ্যবান আমরা । অফুরন্ত মহাকালের মত সারা বছরই আমাদের প্রণয়ের ঋতু। তারপরও এত সহজে কেন আমরা হারিয়ে ফেলি একে অপরকে ?
চার
==========
সেই গুহাযুগে কোন এক পুরুষ শিকার শেষ করে বিচিত্র বাহারি ফুল নিয়ে বাড়ি মানে গুহায় ফিরেছিল।
তার মেয়েমানুষটা খুশি হয়েছিল ফুল দেখে ।
অথবা এনে দিয়েছিল কোন শামুকের খোল- প্রবাল। কালক্রমে যেটা গহনা হয়েছে।
আজও তোমার মত মেয়েরা ফুলের জন্য ব্যাকুল হও। জাপানি কবি বলেছিল –
বোকা ছেলে করবে না ভুল।
বসন্তে মেয়েটাকে দেবে রঙ্গিন কিছু ফুল।
কবির নাম ভুলে গেছি। মনে থাকলে ভাল হত।
এই যে আজকাল অনুভূতিগুলো সব দেখি, অনেকটাই বানিজ্যিক লাগে।
প্রেমিকা মাত্রই নীল শাড়ি হবে কেন ? প্রেমিক মাত্রই বিচ্ছিরি রঙের পাঞ্জাবী গায়ে দেবে কেন ?
তুমি পরতে আমলকী রঙের শাড়ি । কখন কখন কলাবতী ফুলের রঙের শাড়ি।
তাতেই বিবশ হয়ে যেতাম আমি।
দারুন একটা কমিক স্ট্রিপ দেখেছিলাম এক বিদেশী ম্যাগাজিনে।
মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে টম্যাটোর কেচাপ। আইসক্রিম দুঃখী গলায় বলছে- রাগ করো না। তুমি অন্য কারও জন্য । আমার জন্য নও।
চলে যায় আইসক্রিম ।
কাঁদতে থাকে কেচাপের বোতল।
আলু ভাঁজা হেঁটে যাচ্ছিল সেই পথে। থমকে দাঁড়িয়ে বলল- তুমি ঠিক আছ তো ?
কি সব থিউরি আছে । সোল মেইড।
হৃদয়ের অর্ধেক টুকরো নিয়ে ঘুরে বেড়াই আমরা। বাকি টুকরো রয়ে গেছে আরেক জায়গায়। অন্য জনের কাছে। তাকে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। পাগলের মত খুঁজি ।
ভুল মানুষের সাথে দেখা হয় শুধু ।
তারপরও একদিন আসল মানুষটা ঠিকই চলে আসবে । দাঁড়িয়ে বলবে- তুমি ঠিক আছ তো ?
পাঁচ
-------------
শরীর খারাপ ছিল।
ঘুমিয়ে পড়ছিলাম অবেলায় ।
অচেনা সময় ঘুম ভাঙলে দিশেহারা হয়ে যাই। মুহূর্ত কাল বুঝতে পারি না স্থান বা কাল। বিড়ালের চোখের মত জ্বলজ্বলে ঘড়ির কাঁটা বলে দেয় সময়।
বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে চলে এসে নিচ্ছে আমার খোঁজ খবর। প্রতিবেশী কেউ রান্না করছে । কোন এক মউসুমি সবজির ঘ্যাঁট। পাঁচ ফোঁড়নের লোভনীয় ঘ্রান।
রান্নাঘরে বাসি লুচি আছে কয়েকটা, মনে পড়লো ।
মোড়ের কাছে কবিরাজি দোকানটায় গিয়েছিলাম আজ । সভ্যতা সব কিছু গ্রাস করে নেয়ার পরও এই বিদঘুঁটে দোকানটা টিকে আছে।
কবিরাজ কাকুর বয়সের গাছপাথর নেই। জীবন্ত ফসিল। বউ মারা গেছে। ছেলে খোঁজ নেয় না। সবাই কোলকাতা চলে গেছে। মগজের কোষে কোষে অতীত দিনের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে বেচারা । অনেক সব গল্প বলে , অবিশ্বাস্য মনে হয়।
ছোট বেলায় সে নাকি ইংরেজ দেখেছে । টমটম ঘোড়ায় চড়ে ওর দোকানের সামনে দিয়ে যেত। শীতলক্ষ্যা নদীর কাছে ছিল হলুদ রঙের হংস থিয়েটার । নাটক হত ওখানে।
কবিরাজ কাকু আমার শহরের এমন বর্ণনা দেয় - মনে হয়, হারিয়ে যাওয়া কোন অচেনা শহরের কথা বলছে। নিনেভ বা ব্যাবিলনের মত।
সেই শহর আজকের বাতিল শহরের চেয়ে অনেক সুন্দর ছিল বলার অপেক্ষা রাখে না।
ঘুড়ি উড়ানোর মৌসুম চলে যায়। বিচ্ছিন পরাজিত কিছু ঘুড়ি লটকে থাকে বিষণ্ণ শহরের দালান বাড়ির ছাদে ।
তার দোকান ক্লাসিক। কালো কাঠের আলমারি। বেশির ভাগ কাচ ভাঙ্গা। স্বচ্ছ আঠালো টেপ দিয়ে সেঁটে রেখেছেন। ভেতরে কাচের শিশি।
বেশির ভাগ সাদা। বাদবাকি কিছু গুড়ের রঙের। বোতলের গায়ে কাগজের বরফি কাটা দাগ। দাগ মেপে ওষুধ খেতে হয়।
আমাকে দেখেই সাদাকালো চেক মাফলারটা গলায় সাপের মত প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে কবিরাজ কাকু বলল - নিয়ম ভাঙলে নানান আধিব্যাধি ধরে। এত নিয়ম ভাঙিস কেন ? আগে মানুষ রাত জাগত না। যখন থেকে রাত জাগা শুরু করলো তখন থেকেই এই ক্যান্সার রোগ শুরু হল।
আমি ক্লান্ত অলস হাসির মত একটা ভঙ্গি করলাম।
ক্যান্সার নতুন রোগ না। জবাব দিলাম। অনেক পুরানো ব্যাধি। শাস্ত্রে ওটা কর্কট রোগ বলে।
হা হা করে হেসে ফেলল শহরের শেষ কবিরাজ । মুখে মাত্র তিনটে দাঁত। খোসা ছাড়ানো বাদামের মত।
কবিরাজ কাকু প্রথম দিন তোমাকে দেখে বলেছিল - মেয়েটা দেখছি শঙ্খ-কণ্ঠী রে। একে হাত ছাড়া করিস না।
শঙ্খ-কণ্ঠী আবার কি ? আমার বোকা বোকা প্রশ্ন ।
ওর গলা দেখ । শঙ্খের মত তিনটে ভাঁজ আছে। খেয়াল করিস নি ? শুভ লক্ষণ। মা লক্ষ্মীর মত। এই মেয়েকে পাওয়া আর রত্ন পাওয়া সমান কথা। বিয়ের পরই স্বামীর ভাগ্য খুলে যাবে।
জ্যোতিষ চর্চা কর নাকি তুমি ? রাগের ভান করে বলেছিলাম।
মনটা ছিল খুশি। মনে হচ্ছে ইনকাদের হারিয়ে যাওয়া সব স্বর্ণ পেয়ে গেছি ।
ক্ষুধার্ত বিড়াল ঘুমঘুম চোখে রাতের আকাশের উল্কা দেখে ভাবে- অচেনা কোন মাছ ভাঁজা।
ছয়
---------
কাল তোমাকে চিঠি লেখার কথা।
লেখা হয়নি।
বিষাদ মেখে প্রহরগুলো নষ্ট করেছি।
বিকেলে দেখি বরই গাছে মেয়েদের নাকফুলের মত মিষ্টি ফুল ধরেছে। সুগন্ধে ভীমরুল বিনবিন করছে।
মানে, ঋতু বদলাচ্ছে। ছোটবেলায় বরই ফুল দেখলে খুশি হতাম। বরই ফুল মানে সামনে শীত। পরীক্ষা শেষ হবে। ইশকুল বন্ধ।
লেপটে বই পড়ব। এখনও এই ফুল দেখলে ব্রেইনের কোষগুলো ভাল লাগার অনুভূতি দেয়। আগের স্মৃতি জমিয়ে রেখেছে বোকা মগজ।
আগের মত মৌমাছি দেখি না বাগানে।
পরিবেশ দূষণের জন্য ওরা কমে যাচ্ছে দিনকে দিন। বিজ্ঞানীরা ভয় পাচ্ছেন- ওরা হারিয়ে গেলে ফসল ফলানো কষ্টকর হয়ে যাবে।
প্রথম হারিয়ে যাবে কফি। আর তুলার গাছ। তারপর ঘাস । আর কুমড়া।
খাদ্যসঙ্কটে ভুগবে গবাদি পশু। মাংসের দাম যাবে বেড়ে ।
সারা দুনিয়ার অর্থনীতি নড়ে যাবে। কোন কোন সায়েন্স জার্নালে অমনও লেখা হয়েছে- মানব সভ্যতা হুমকির মুখে পড়বে তখন ।
মহাবিশ্বের সব জায়গায় রয়েছে এই কর্মফলের চক্র। বাটারফ্লাই এফেক্ট।
মজা করে তোমাকে একবার বলেছিলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবসর সময়ে চাষবাস করতেন।
যেমন- ফুলকপি,বাধাকপি,মূলা,গাজর,লাউ,সীম,টমেটো,শীতকালীন সবজি,বোরো ধান,গম,আলু এবং সরিষা। এগুলোকেই রবিশস্য বলে।
আমার এই উত্তর শুনে ঝাড়া এক মিনিট চেয়েছিলে তুমি।
আজও মনে পড়ে।
হতাশ হয়ে বলেছিলে, এই ব্রেইন নিয়ে ঘুমাও কেমন করে ?
ঘুমাই না তো।
সারারাত জেগে বাতাসের পর্দা টাঙাই। গুনে দেখি কোন কোন নক্ষত্র বেশি জ্বলছে। কোনটা জ্বলছে কম। ওদের জন্য শরবৎ বানাই। রাতের বেলা বাগানের গাছেরা ঘুমিয়ে নাক ডাকে সেইসব শুনি।
রবিশস্যকে চৈতালি ফসল বলে।
কে জানতো তখন ?
কাল বিকেলে দেখি কতগুলো ঘাসের দানা উড়ে যাচ্ছে।
ঘাসদের দেশান্তরিত হবার সময় হলে ওরা অমন করে। দানা ফেটে পালকের বলের মত বা অচেনা স্পেসসিপের মত উড়ে যায় অনেক অনেক দূর দেশে।
পছন্দ মত জায়গায় নেমে যায়। ওখানের নরম মাটি আর জল হাওয়া পেলে দানা থেকে জন্মায় কচি নরম ঘাস। এই ঘাস জানে না ওর মা কোথায় !
কিছু ব্যাঙের ছাতা অমন করে। ফেটে গিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দেয় নিজের বাচ্চাদের।
অমন অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে ধুমকেতু। মহাকাশের রহস্যময় এলাকা থেকে ওরাও উড়ে আসে।
আছড়ে পড়ে নানান গ্রহে। ধুমকেতুর মধ্যে শুধু গ্যাস আর ধাতু থাকে না। আরও থাকে অদ্ভুত সব প্রানের বীজ। কোন গ্রহ পছন্দ হলে টিকে যায় ওরা। বেড়ে উঠে সেখানে।
কোন কোন বিজ্ঞানী মনে করেন আমাদের নীলগ্রহেও অমনটা হয়েছিল। অনেক অনেক পুরানো উল্কার পাথর পাওয়া গেছে। অণুজীবের জীবাশ্ম রয়ে গেছে ওগুলোতে।
ওরা এসেছিল। হয়তো বেঁচে গিয়েছিল। কোটি বছরের বিবর্তনে ওরাই এমিব্যা থেকে আজকের এই অবস্থায় এসেছে।
আমরা মানুষরাই আসলে এলিয়েন।
সেইজন্যই কেউ কাউকে বুঝতে পারি না।
হারিয়ে ফেলি প্রিয়জনকে।
সাত
----------
শহরের এক কোনে সবচেয়ে পুরানো বাড়িটায় কোন শৌখিন মানুষ বাস করে ।
আচমকা কখনও কখনও রাতের প্রথম প্রহরে সেই বাড়ি থেকে ভেসে আসে পুরানো জামানার কলের গানের শব্দ ।
পিনের খসখস শব্দটা পর্যন্ত শুনতে পাওয়া যায় রাতের নীল অন্ধকারে ।
চাঁদটা তখন বাকরখানির মত লেপটে থাকে বিদ্যুতের খুঁটির মাথায় । শহরের এই নাগরদোলায় কেউ কাউকে দেখে না। রেস্তোরার বাইরের ময়লা ঘাঁটে অন্ধ বিড়াল ।
আজ লক্ষ্মী-নারায়ণ মন্দিরে গিয়েছিলাম। এটার বয়স অনেক। মেয়র আপিসের নথি ঘাঁটলে প্রমাণ হয়- চারশো বছর।
নতুন মন্দির ভাল লাগে না। ঝকঝকে টাইলস করা মন্দিরে ঈশ্বর বিব্রতবোধ করেন। সেইসব মন্দিরে কেমন বেণিয়া ঘ্রাণ থাকে।
পুরানো মন্দির, ঘি-য়ের প্রদীপ, পাকুড় গাছ, বুড়ো পুরোহিত থাকলে মন শান্ত হয়। মনে হয় মন্দিরের চত্বরে দুই দণ্ড বসি। ওখানে বসে ঈশ্বরকে কিছু বললে উনি সেইসব অনুরোধ ফেলতে পারেন না।
মন্দিরের বাইরে কয়েকটা বট, কদম আর কাঁঠাল গাছ। সারা বছর পাতা খসে পড়ে। বিকলাঙ্গ এক কিশোর যে কিনা আবার বুদ্ধি প্রতিবন্ধী , সারা বিকেল ঝরা পাতা কুড়ায়। খুব ছোট বেলায় ওকে মন্দিরের সিঁড়িতে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল কেউ। সেই থেকে আছে এখানেই। অক্লান্ত ভাবে পাতা কুড়ায়। ওর বাপ মা কি লুকিয়ে দেখে ওকে ?
হয়তো।
ভাবতে ভাল লাগে । জটিল অঙ্ক কষার মত মনে করি- ধরা যাক ওর বাপ মা ওকে দেখে যায় লুকিয়ে।
মন্দিরের বাইরে পাকুড় গাছটার নিচে মাঝে মাঝে গরিব এক বাচ্চাকে দেখি। সারা শরীরে নীল রঙ মাখা। গলায় হাতে রুদ্রাক্ষের মালা। মাথায় চুলের জটা, হাতে পিচ্চি একটা ত্রিশূল। আর ডমরু। সেটাও পিচ্চি।
শিব সেজে দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষ জ্যান্ত শিব দেখে দয়া করে দুই এক টাকা দেয়। ওটা দিয়েই সংসার চালায় পিচ্চি। একদিন জানলাম ও ছেলে নয়। মেয়ে।
বললাম- কি রে তুই তো ঈশ্বরের সাথে প্রতারণা করছিস।
সে কি এক হাসি দিল মেয়ে শিব। শিবানী ।
ঈশ্বরের দুনিয়ায় নকল ঈশ্বর সেজে দুই মুঠো ভাত যোগার করছে বেচারি । উপরে যিনি আছেন তিনিও নিশ্চয়ই কৌতূহলের সাথে সব দেখছেন ?
আজ কয়েক সপ্তাহ ধরে বোরকা পড়া এক মহিলা দশ থেকে বারোটা তেলের পিঠা আর এক কলসি জল নিয়ে বাইরে বসে ।
মহিলা খুব বিব্রত। কারন পিঠা বিক্রি হচ্ছে না। কেউ কিনছে না।
আমরা কিন্তু এমন এক ঘটনা দেখেছিলাম সস্তাপুরে হাঁটতে গিয়ে।
ওখানে রেললাইনের ধারে - ঢোল কলমির ঝোপের পাশে এক মহিলা তার পিচ্চি বাচ্চা নিয়ে চিতুই পিঠা বেচতে বসতো। সাথে টকটকে লাল চ্যাপ্যা শুটকির ভর্তা। কালোজিরার ভর্তা। হলদে সাদা শর্ষে বাটা।
তখন এক টাকা করে ছিল এক- একটা পিঠা। দুটো খেয়ে পাঁচ টাকার নোট দেয়া মাত্র মহিলা হাউ মাউ করে উঠলো। উনার কাছে ভাংতি নেই। মাত্র বউনি করেছেন।
যত বলি বকসিস হিসাবে রেখে দেন , তত ভয়ে চিমসে হয়ে যান তিনি। শেষে বললাম- পরের দিন হাঁটতে গিয়ে পিঠা খেয়ে দাম কাটাকুটি করে দেব।
উনি যেন বেঁচে গেলেন। তার সেই হাসিমুখের কথা সারাজীবন মনে থাকবে।
গিয়েছিলাম পরের দিন।
আমাকে দেখে উনি যেন হাজার বছরের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেলেন। দ্রুত হাতে বানিয়ে দিলেন নতুন পিঠা। বললেন - দোয়া করতে। বাচ্চাটাকে যেন মানুষ করতে পারেন।
কত ছোট ছোট সুখ আশা নিয়ে বেঁচে থাকে মানুষ।
পুনশ্চ- চোখে কমলা রঙের কাজল দেয়া যে পাখিটা আমার বিস্কুট খেয়ে ফেলেছে ওটার নাম- ভাত শালিক। গোবরে শালিক মতই। গোবরে শালিক পোকামাকড় খায় । বাসা বানাতে পছন্দ করে না ওরা । পারলে ভাড়া থাকতো। ভাত শালিক ভাত, চিরে, মুড়ি, চাল খেতে পছন্দ করে। এটা বিস্কুট খায়। তাই বিস্কুট শালিক নাম দিলাম।
আট
-------------------
রাতের শেষ প্রহরের মত ক্ষণস্থায়ী আয়ু নিয়ে আসি পৃথিবীতে। মাগনা মুফতে পেয়ে যাই মায়ের ভালবাসা। তার হাসি মুখ।
কখন চোখ মেলে দেখি না বিপুলা পৃথিবী কত জাদু আর মায়া বিছিয়ে হাসিমুখে চেয়ে আছে আমাদের দিকে। বলছে - সব তোমাদের। নিয়ে নাও। মুঠো ভর্তি করে নাও জীবনের সোনালি রেণু।
মধ্যরাতের টক- শোতে এক নায়িকা এসেছিল খেজুরে আলাপ পারতে।
বেয়াদপ চেহারার উপস্থাপক চালবাজির সুরে প্রশ্ন করে যাচ্ছিল। একটা প্রশ্ন ছিল - তার দুঃখের কোন স্মৃতি আছে ?
নায়িকা ঢঙি আর ন্যাকা গলায় বলল- ছোট বেলায় লাল রঙের সোয়েটারের শখ ছিল। তার মা কিনে দেয়নি।
আশা করি নায়িকার মা বেঁচে ছিল।
টিভিতে দেখছিল হয়তো। কে জানে বেচারির কেমন লেগেছিল ? এইসব তুচ্ছ কথা বলে প্রিয়জনকে কষ্ট দেয়ার মানে কি ?
দুঃখবিলাস মস্ত অসুখ।
সবাই দুঃখের খামার বানায় মনের গহীনে। কষ্টের চাষাবাদ করে সযত্নে ।
কত- কত মস্ত কিছু ঘটে যায় আমাদের সাথে । কেউ খেয়াল রাখি না।
বেখবর মাতাল মন। লুকিয়ে থাকে স্বার্থের গহীন অতলে।
খবরের কাগজ ঘাঁটতে গিয়ে বুকের ভেতরে বাওকুড়ানি হাওয়া সব অনুভূতির খিড়কি নাড়া দিয়ে যায়।
অনেক সময় ধরে খবরটা পড়ি। ভুলে যাই পাশে ছিল বুনো ফুলের সৌরভ মেশানো চা। আর কালো ফরেস্ট কেক।
খবরটা দুই বছরের পিচ্চি বাচ্চা ব্রডিকে নিয়ে। ওর ক্যান্সার হয়ে শেষ পর্যায়ে চলছে। ওর পরিবার বুঝতে পেরেছে সামনের ক্রিসমাস দেখতে পারবে না পিচ্চি। অচেনা বলগা হরিণের স্লেজে চেপে তার আগেই চলে যাবে ঈশ্বরের বাগানে।
ক্রিসমাস আসতে তো অনেক দেরি। পিচ্চি যে খুব ভালবাসে ক্রিসমাস। মাত্র দুটো ক্রিসমাস পেয়েছে বেচারা। সামনেরটা আর পাবে না।
কিন্তু তাতে কি ?
এবার বড়দিন আগেই চলে এলো ওদের বাড়িতে। গত সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখে পিচ্চি ব্রডি ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠলো। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ,পেল্লাই এক ক্রিসমাস ট্রি।
সারা বাড়িতে লাল -নীল- সবুজ আলো জ্বলছে । ফায়ারপ্লেসের উপর উলের বড় বড় ক্রিসমাসের মোজা ঝুলছে। বাড়ি ভর্তি ওর জন্য উপহার। বারান্দায় সান্তাক্লজ আর স্নো-ম্যানের পুতুল।
খুব খুশি পিচ্চি।
ব্রডির ২১ বছরের বোন ম্যাককেঞ্জি অ্যালেন, সাংবাদিকদের জানিয়েছে- ‘ক্ষুদে ভাইটা মোটেও বুঝতে পারেনি এটা মিথ্যা ক্রিসমাস।
ও খুবই খুশি। উপভোগ করছে।
তবে বাড়ি সাজানোর জন্য আরও ডেকোরেশনের জিনিস পেলে ভাল হত।
পাওয়া যায়নি।
এই সেপ্টেম্বরে তেমন বেশি দোকানে ক্রিসমাসের জিনিস বেচা শুরু হয়নি।’
প্রতিবেশিরা সবাই পিচ্চির সাথে দেখা করেছে। উপহার নিয়ে।
খবরটা কয়েকবার পড়লাম।
জানি কয়েকটা প্রহর খারাপ কাটবে । প্রার্থনা করি- যেন মিরাকল কিছু হয়। কোন রহস্যময় উপায়ে ভাল হয়ে যায় পিচ্চি।
আর আমি কথা দিচ্ছি - তুচ্ছ কোন বিষয়ে কোন অভিযোগ করব না ভাগ্যের কাছে।
তিন সত্য।
নয়
-------------
তোমার জন্য যে চিঠিগুলো অত সময় নিয়ে লিখছি বেশির ভাগই পোস্ট করা হবে না।
দরকারি চিঠি বেশির ভাগ সময় পোস্ট করা হয়ও না। একটা সময় আমরা হয়তো চিঠি লেখা ভুলে যাবো । বন্ধ হয়ে যাবে লালরঙের ডাকঘর। পোস্ট বক্সের ভেতরে জন্ম নেবে পেপারোমিয়ার ঝাড়। কচি কলাপাতা আর আকাশী রঙের খামে পুরে সরকারী আমলাদের দেয়া হবে ঘুষের টাকা।
তুমি কি খেয়াল করে দেখছ ? কয়েকটা রাতে অনেক অনেক তারা উঠে আকাশে।
বহু আগে মরে যাওয়া নক্ষত্রেরাও কোন অলৌকিক উপায়ে জ্বলে উঠে।
আসলে সেই রাতে নতুন করে শুরু হয় নক্ষত্র সভ্যতা। বিচিত্র স্পেসশিপে করে অচেনা মহাকাশের মানুষজন বের হয়ে পরে নিজেদের বাতিল গ্যালাক্সি ছেড়ে।
ব্ল্যাকহোল জিনিসটা আসলে ইরেজার। গ্যালাক্সির সব ভুল মুছে ফেলে সে। ব্ল্যাকহোলের শেষ মাথায় আছে অদ্ভুত এক গারবেজ বিন। জমা হচ্ছে মহাকালের সব জঞ্জাল।
আমাদের বাড়িতে প্রথমবার এসে দারুন অবাক হয়ে ছেলেমানুষের মত বলেছিলে - এত গাছ কোত্থেকে এলো তোমাদের বাসায় ?
কি অদ্ভুত প্রশ্ন !
আমি বলেছিলাম - ওরা হেঁটে হেঁটে এসেছে।
রাজ্যের সব গাছে ভর্তি আমাদের বাড়িটা। করমচা, নারকেল, কাঁঠাল, কাঠবাদাম। মা নাকি গাছের পাতা খসা দেখার জন্য কাঠবাদাম গাছ বুনেছিল।
আরেক পাগলী !
নতুন মচমচে কাগজের মত ফুলগুলো বেশ লাগে। দক্ষিণ আমেরিকার এই ফুলগুলো ভাল করেই আমাদের দেশি বাগানে বেঁচে থাকে। বোগেনভেলিয়া নাম ওর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আদর করে নাম দিয়েছিল - বাগানবিলাস। আমি গেইট ফুল বলতাম। শুনে হাসতে তুমি।
একদম নিঝুম শহরতলিতে বা অচেনা কোন ইষ্টিশনের বাইরে , বা হারিয়ে যাওয়া কোন পথের বাঁকে এক একটা চায়ের দোকান থাকে।
বললে বিশ্বাস করবে না ওই সব চায়ের দোকানগুলো কোন একটা গাছের তলায় বা ছায়ায় হয়।
সেটা অবাক হবার কি আছে ?
তাই না ?
কিন্তু খেয়াল করে দেখবে অমন গাছ আর কোথাও পাবে না। খুব রহস্যময় গাছ। বিচিত্র দর্শন এই গাছ আগে বা পরে কোথাও হাজার খুঁজলেও পাওয়া যাবে না। কোন নার্সারিতে পাবে না। উদ্ভিদবিদ্যার কোন বইতে পাবে না।
সেইবার অমন এক গাছ দেখে বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম।
বেঁটে গাছ। মমতায় জড়িয়ে রেখেছে চায়ের দোকান। পাতাগুলো একদম গোল গোল।
কাঁটা কম্পাস দিয়ে আঁকা যেন। সব একই মাপের। হাতের তালুর রেখার মত শিরা উপশিরা ভর্তি। নিখুঁত কারিগরের বানানো শিল্পকর্ম।
যে কারিগরের কাজ আমাদের বোধের বাইরে।
অমন মায়াবী বৃক্ষ দেখিনি আগে পরে। আজও।
দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, গাছটার নাম কি ?
হিমালয়ের সাধুদের মত উদাস ভঙ্গিতে বলল- কে জানে !
হয়তো জানো না, আশ্বিন মাসের পূর্ণিমাকে বলে কোজাগরী । কোজাগরী শব্দটা এসেছে- কে জাগতি , মানে কে জেগে আছ ? এই রাতে জেগে থাকতে হয়।
সেই কবে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোতে লক্ষ্মীপূজার সময় ঘরের বউ ঝি জেগে থাকতো।
পাকা ধানের ক্ষেতে নেমে আসতো লক্ষ্মী। কেউ কেউ তাকে দেখতে পেত। পাকা ধানের গোছা হাতে হেঁটে যাচ্ছে মিষ্টি মত এক মেয়ে। পায়ে আলতা।
কোন এক কোজাগরী পূর্ণিমায় ‘ বাংলার ফুল’ নামে দারুন একটা বই দিয়েছিল মা । ভেতরে রঙ্গিন ছবির বদলে জলরঙে আঁকা ছিল ফুলের ছবি। মা আফসোস করেছিল । বলেছিল - অফসেট কাগজে রঙ্গিন ছবি হলে ভাল হত। আমার কিন্তু সাদাকালো জলরঙের ছবিই ভাল লেগেছিল।
এইসব বাগান, ফুল, বই , সব কিছু যে বর্ষার দিনের কাচের বয়ামে রাখা লবণের মত বাতিল হয়ে যাবে কে জানতো ? আজকাল স্মৃতিগুলো সব খুচরা পয়সার মত হাঁটতে গেলেই শব্দ করে।
জাফরানি রঙের এক বিকেলে চিনামাটির পেয়ালা ভর্তি চা নিয়ে বসেছিলাম বাগানে। চা-য়ের পাতার জারে কমলালেবুর খোসা শুকিয়ে কুঁচি করে রেখে দিলেই হয়ে যায় মায়াবী সুগন্ধি কমলা চা।
মজার একটা টি ব্যাগ দেখেছিলাম ম্যাগাজিনের বিজ্ঞাপনের পাতায় । হলুদ কাগজের ব্যাগে টি -ব্যাগটা। ব্যাগটা সুতোর সাথে ঝুলছে । সুতোর শেষ মাথায় হলুদ কাগজের এক প্রজাপতির সাথে ব্যাগটা গাঁথা। পেয়ালাতে টি-ব্যাগ ডুবিয়ে রাখলে প্রজাপতিটা পেয়ালায় বসে থাকে সুন্দর করে।
তুমি বলেছিলে- আমাকে কিনে দেবে অমন টি-ব্যাগ ?
দেয়া হয়নি।
গাছেরা কথা বলে ? জানতে চেয়েছিলে একদিন।
বলে তো। আমার জবাব। দেখ না বাতাসে ফিসফিস করে পাতার শব্দ হয়। কে জানে ওটাই হয়তো ওদের ভাষা।
কত আবোল তাবোল জবাব দিতাম।
আমার মনে হয় ওরা টেলিপ্যাথি জানে। তুমি বলেছিলে।
কতগুলো বছর পর আজ বিদেশী জার্নাল পড়তে গিয়ে জানলাম - গাছেরা সত্যি সত্যি নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে। গাছের শেকড়ে শেকড়ে জন্ম নেয় এক ধরনের ছত্রাক। এই ছত্রাক গাছকে পুষ্টি দেয় । বদলে গাছের কাছ থেকে নেয় চিনি। ওরা মাটির নিচ দিয়ে ছড়িয়ে যায় অন্য সব গাছের শিকড়ের কাছে। এই ভাবে প্রতিটা গাছ অন্য গাছের সাথে অদ্ভুত উপায়ে যোগাযোগ করে। একে বলে- অরন্যের বিস্তীর্ণ জাল।
এই ভাবে পুরানো গাছটা যেটা মা গাছ বলতে পার সেটা অন্য দুর্বল গাছদের দূর থেকেই পুষ্টি যোগায়, যাতে বেঁচে থাকতে পারে দুর্বলটা।
যে গাছটা বুড়ো হয়ে বা দুষ্টু জীবাণুর আক্রমণে অসুখে ভুগে মারা যায়, মরার আগে সে তার ছত্রাকগুলো পাশের গাছগুলোতে পাঠিয়ে দেয়। মরার আগে প্রতিবেশী গাছগুলোকে মেসেজ পাঠিয়ে দেয়। তখন প্রতিবেশী গাছগুলোতে নতুন রাসায়নিক পদার্থ জন্ম নেয়।
জীবাণু আর কিছুই করতে পারে না। ব্যর্থ হয় জীবাণুর আক্রমণ। বেঁচে থাকে গাছেরা ।
আজকাল বাগানে বসলেই নীরবে কান পাতি আমি। শেকড়ে শেকড়ে কত কথা বলে গাছেরা।
শুনতে পাই।
দশ
--------------------
চিঠি লেখা হয়নি তোমায়।
কবির ভাষায় বলতে পারি- চন্দন কাঠের কলম ছিল না । ছিল না রেশমি সুগন্ধি কাগজ। তাই লেখা হয়নি ভালবাসার কথামালা।
মিথ্যে অজুহাত সেইসব। ছিলাম ব্যস্ত ঘাসফড়িঙের মত। অভিমান করে কথা বন্ধ করে দিলেও নিঃশব্দে ভালবাসা যায়।
জন্মদিন ছিল আমার ।
অপেক্ষায় ছিলাম পথ ভুলে যদি চলে আসো। মনিহারি দোকান থেকে ফরমায়েশ দিয়ে আনা হয়েছিল কেক। কেকের রঙ মাসাই মেয়েদের গায়ের রঙের মত ।
রাতে বসেছিলাম খোলা বারান্দায়। আমাদের এই বারান্দা কালো সাদা ছক কাঁটা। মস্ত এক দাবার বোর্ডের মত । বাইরে তুমুল জোছনা।
বছর ঘুরে কোজাগরী পূর্ণিমায় পরে আমার জন্মদিন। তুমি সবসময় বলতে জোছনা নাকি দুই প্রকার।ভরা জোছনা আর মরা জোছনা।
নামের কি ছিরি !
কোন রাতের জোছনা নাকি টিমটিমে আলো দেয় সেটাই মরা জোছনা। আর কোন রাতে আলো ছড়ায় একটু বেশি সেটাই ভরা জোছনা। চাঁদটা মনে হয় নিজের আলো চার্জ দিয়ে আনে। কোথায় যেন পড়েছিলাম- বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে এর। আকাশে জলীয় বাস্প কম বেশি জমলে জোছনা কম বেশি হয়।
কাক জোছনা তো আছেই। অমন রাতে এত বেশি জোছনা হয় কাকেরা মধ্যরাতেই মনে, করে হায় হায় ভোর হয়ে গেছে। ওরা চিল্লাফাল্লা শুরু করে রাতের বেলা।
ওটাই কাক জোছনা।
শহরে জোছনা তেমন দেখা যায় না।
ল্যাম্পপোস্টের আলোর সাথে ওরা অভিমান করে নেমে আসে না । ওরা নামে দূরের নির্জন পথে। যেখানে জলের তেষ্টায় পাহাড় থেকে নেমে আসে নীলগাই। সৈকতের চিনির মত লাল বালির তলা থেকে বের হয়ে আসে নীল কাঁকড়া। দাঁরা দিয়ে ধরতে চায় আস্ত চাঁদ।
তরল জোছনা আমার বারান্দায় নেমে আসে অকাতরে । কাঠগোলাপের ডালপালা খামচি মেরে দেয় চাঁদের গালে। অরন্যের লেখক বিভূতিবাবু সাধে বলেছেন- ‘‘ জীবনে একবারও সে জ্যোৎস্নারাত্রি দেখা উচিত; যে না দেখিয়াছে, ভগবানের সৃষ্টির একটি অপূর্ব রূপ তাহার নিকট চির-অপরিচিত রহিয়া গেল। ”
দেখি ।
ভাগ্যিস আলাদা করে কোন বিল দিতে হয় না এই সোনালি আলোর জন্য।
আদিম মানুষ ঘোর লাগা চোখে চেয়ে থাকতো চাঁদের দিকে। জন্মসূত্রে আমরাও।
কোন এক সায়েন্স ম্যাগাজিনে পড়লাম কি এক অদ্ভুত কায়দা করে চাঁদে বসতি গড়ার কায়দা করছে ধূর্ত মানুষ। ওরা নাম দিয়েছে টেরাফর্ম মুন।
কাল বা পরশু লোটা কম্বল নিয়ে চাঁদে দৌড়ে যাবে না লোকজন ।
সময় লাগবে।
প্রথম ভেবেছিল মঙ্গলগ্রহে অমনটা করবে। পরে ঠিক করলো চাঁদই হবে সেরা। কারন মঙ্গলের চেয়ে চাঁদে সূর্যের আলো দ্বিগুণ পড়ে আর পৃথিবী থেকে মাত্র তিনদিনের যাত্রা পথ। খরচ আর সময় লাগবে অনেক কম।
প্রথমে বায়ুমণ্ডল দরকার চাঁদের বুকে। ওটাই সবচেয়ে মজার অংশ। কয়েক শত বরফের উল্কা ছুড়ে ফেলা হবে চাঁদের বুকে।
বরফের উল্কার নাম -আইসিটারোয়েডস । অমন উল্কা হরহামেশা ঘুরে বেড়ায় আমাদের পৃথিবীর কক্ষপথে।
দরকার হলে পৃথিবীর সাগর থেকে জল নিয়ে আমরা অমন উল্কা বানিয়ে নেব।
চাঁদের বুকে পড়া মাত্র উল্কা গলে জলে থই থই করবে। ভরে যাবে নিচু জমি। তৈরি হবে কার্বন ডাই অক্সাইড, অ্যামোনিয়া আর মিথেন। সব গ্যাস মিলেমিশে বানিয়ে ফেলবে বায়ুমণ্ডল।
আর জলাভূমি তো হয়েই গেছে। পৃথিবী থেকে চাঁদকে তখন দুর্দান্ত লাগবে। জোছনা হবে আজকের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি।
আরও কিছু বরফের উল্কা ফেলা হবে। যতবেশি হয় ততই ভাল।
চাঁদের জলাভূমিতে স্পেসশিপ ভর্তি করে নিয়ে ফেলা হবে সামুদ্রিক শ্যাওলা। যারা বৈরী পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে। যেমন- আলজি। যারা অক্সিজেন বানায়।
তখন চাঁদের আকাশে জমবে তোমার চুলের রঙের মত ঘন কালো মেঘ। হুড়মুড় করে নামবে বৃষ্টি। বাদলার মৌসুম চলে আসবে ।
চাঁদ তখন তৈরি হয়ে যাবে আমাদের জন্য।
পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা গিয়ে শুরু করবে চাষাবাদ। নির্বাচিত মানুষজন গিয়ে থাকা শুরু করবে ওখানে। আমাদের জন্য নতুন বাসভূমি।
গল্প ? কল্পকাহিনী ?
কখন কি ভেবে দেখেছ দাদুর কলের গান বাতিল হয়ে ফিতেওয়ালা ক্যাসেট আসবে ? সেটা বাতিল হয়ে কমপ্যাক্ট ডিস্ক। সেটাও বাতিল হয়ে পেনড্রাইভ ?
পৃথিবী থেকে তখন জোছনা কেমন দেখাবে ?
কেমন হবে সেই সময়ের প্রেম ?
এগারো
------------
প্রত্যেকটা মৌসুম বদলানোর সাথে সাথে বাতাসের ঘ্রাণ রহস্যময় ভাবে বদলে যায়।
শহরে তেমন বুঝা না গেলেও মফস্বলে গেলে টের পাওয়া যায়। সুগন্ধির ফেলে দেয়া শিশি নাকের সামনে নিলে যেমন ধরা যায়, তেমনই।
আমার বাগানটা জানিয়ে দেয় মৌসুম বদলাচ্ছে। ফ্রান্সেস হডসন বার্নেট - এর সিক্রেট গার্ডেন মনে হয়। সামনের দালানবাড়িটা না উঠলে মনে হত দূর থেকে গাউর বা বাইসন নেমে আসবে।
বাতাসে পূজার ঘ্রাণ।
অমন হাওয়া বইলে সেইসময়ে ইংরেজরা যারা নীলের কারবার করে মুনাফা লাভের আশায় এসেছিল, বলত- ‘ যানে বাঁচিয়া গেলাম।সিত জলডি আসুক।’
আরও অনেক অনেক বছর আগে পূজার কতদিন আগে থেকেই মন্দিরের চাতালে ঘুরঘুর করতাম। দূর থেকে বায়না করা শিল্পীরা আসতো। মাটি ছেনে ছেনে প্রতিমা বানাত। রাতের বেলা খড়ের বিছানায় ঘুমাত শিল্পীরা। দুপুরে মাটির পাতিলে ভাত আর সবজির ল্যাবরা রান্না করে খেয়ে নিত। সন্ধ্যার পর পেত মন্দিরের প্রসাদ ।
সন্ধ্যার পর আবদার ধরলে মা বাইরে বের হতে অনুমতি দিত। গিয়ে দেখি- ঝুলন্ত এক বাল্ব জ্বেলে কাজ করছে কারিগররা। অসুরের মাথায় কোঁকড়া চুল বসিয়ে দিয়েছে। হাতে বিরাট খড়গ। ভয়ংকর ব্যাপার।
ষষ্ঠীর দিনে ঘুম ভেঙ্গেই আবিস্কার করতাম আদর্শ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের বাক্স ভর্তি করে হলুদ লাড্ডু আর জিলিপির বড় ভাই আমৃতি আনা হয়েছে।
আহা কি সব দিন গেছে।
মনে আছে ? গতবার আমরা নয়আনা গ্রামে গিয়েছিলাম ? অনেক আগে কোন এক রাজা এই গ্রামের সমস্ত মানুষের কাছ থেকে খাজনা হিসাবে নয়আনা করে নিত সেই থেকে গ্রামের নাম নয়আনা । চার পয়সায় হত এক আনা । মানে ছত্রিশ পয়সা পেতেন রাজা মশায় ।
ওখানে বুড়ির দোকান নামে এক সস্তা হোটেলে খেয়েছি।
বেগুনবিচি নামে যে একটা চাল আছে কে জানতো ? মিহি একদম বেগুনের দানার মত। ভাত রান্না করলেও মনে হয় পোলাও । বুড়ি রান্নায় দ্রোপদী। যা অর্ডার করবে মুহূর্তেই বানিয়ে দেবে। আমরা খেলাম বেগুনের বিরিয়ানি। মাছ বা মাংসের বদলে বিরিয়ানির স্তরে স্তরে গোল গ্লোব বেগুনের অর্ধেক করে ফালি দেয়া।
অপূর্ব স্বাদ। সাথে আমলকীর আচার। ট্যাংরা মাছের টক আর ছাতুর শরবৎ।
যে না খেয়েছে তার মানব জন্ম বৃথা। মরার পর শ্মশানে শ্মশানে ভূত হয়ে ঘুরে বেড়াবে সে।
বারো
----------
আষাঢ়ের মেঘলা এক বিকেলে হাজির হলে তুমি।
পরনের কামরাঙা রঙের শাড়ি। হাতে কামরাঙা ফুল। কামরাঙা ফুল হচ্ছে মাথা খারাপ করার মত সুন্দর এক জিনিস। হালকা বেগুনি আর হালকা গোলাপি মিশিয়ে কেমন এক রঙ।
আসার পথে একটা বই নিয়ে এসেছ। বাস থেকে নামলেই একটা বইয়ের দোকান আছে। কি মনে করে দাবা খেলার এক বই এনেছ।
কভারটা দারুন। হলুদ- সোনালি রঙের কয়েকটা দাবার গুঁটি এলো মেলো হয়ে পড়ে আছে।
ভাল দাবা খেলতে পারি না। ধৈর্য কম। মানুষ কি ভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাড় গুঁজে এই খেলাটা খেলে কে জানে ? এক সময়ে মোড়ের রোঁয়াকে বসে মহল্লার দুই একটা বুড়ো জটায়ু টাইপের মানুষকে দেখতাম দাবা খেলছে । ঘাড়ের উপর দিয়ে হাফ ডজন লোক খেলা দেখছে। টানা দুই ঘণ্টা ও এক খেলা শেষ হত।
একবার বিরক্ত হয়ে এক দর্শকে বললাম এত ভাল লাগলে আপনি খেলুন না।
দর্শক হাত পা নেড়ে বলল- নারে ভাই আমার অত ধৈর্য নেই।
তোমার পাল্লায় পরে কয়েকদিন দাবা খেলেছি। প্রতিবার গো হারা হেরে গেছি। তোমার দাবি, দাবার বোর্ডের দিকে না চেয়ে তোমার দিকে চেয়ে থাকতাম। কি কাণ্ড। আমি কি অমন না কি ?
আর সেইজন্যই দাবা খেলার বই।
এক অলস মেঘে ভেজা বিকেলে বইটা নিয়ে বসলাম।
দাবার ইতিহাস দিয়ে শুরু। আছে চোখ ধাঁধানো চালের হিসাব। আর মজার তথ্য।
যেমন - হিসাবে সবচেয়ে বেশি চাল দেয়া খেলা হচ্ছে ৫৯৪৯ চাল। সারা দুনিয়ায় ৬০ কোটি মানুষ দাবা খেলতে পারে। আর কত বছর আগে এই খেলার শুরু কেউ জানে না। গৌতম বুদ্ধ নাকি শিষ্যদের সাথে দাবা খেলতেন। পার্সিয়ানদের কাছ থেকে আমাদের গুপ্ত বংশের রাজারা দাবা খেলা এই দেশে এনেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলে এই খেলাটা আসলে ভারতের প্রাচীন খেলা।
কত বিভিন্ন কায়দায় দাবা খেলা যেতে পারে ? সেটার সংখ্যা নাকি মহাবিশ্বের ইলেকট্রনের সংখ্যার চেয়েও বেশি। ইলেকট্রনের সংখ্যা প্রায় ১০ ^ ৭৯ হতে পারে, আর দাবা খেলার সংখ্যা ১০ ^ ১২০ ।
এক খেলায় ঘোড়া নাকি সর্বাধিক ১২২ মিলিয়ন বার মুভ করতে পারে।
কাণ্ড দেখেছ ?
কাজেই হতে পারে আমাদের বারবার দেখা হবে চলতি পথে। এই শহরটা একটা দাবার বোর্ড ই তো !
তেরো
-----------
মাঝে মাঝে অমন হয়।
কামরার চারিদিক তন্ন তন্ন করেও খুঁজে পাচ্ছি না দরকারি কোন জিনিস।
চাবি, চিঠি বা কোন তুচ্ছ কিন্তু দরকারি জিনিস।অথচ সেটা তেঁতুলের দানার রঙা টেবিলের উপরই ছিল। কিন্তু এখন নেই।
পরে সেটা পাওয়া যায় অন্য কোন জায়গায়। যেখানে আমি রাখিনি। কেউই রাখেনি। মনে হতে পারে- রেখে নিজেই ভুলে গেছি।
আসলে সেই পিচ্চি কিন্তু অনন্ত কাল সময়ে আমি বা আমরা ঘুরে এসেছি প্যারালাল জগৎ থেকে। মাত্র কয়েক মুহূর্তেই সব নিখুঁত কপি করে ফেলেছে দুই জগৎ।
একটু আধটু ভুলের জন্য চাবি বা সেই দরকারি জিনিসটা জায়গা মত রাখতে পারেনি প্রকৃতি।
আমরা ধরতে পারি না।
চৌদ্দ
অনেকগুলো বছর আগে , অদ্ভুত একটা চিরুনি কিনেছিল মা। সাদা ধপধপে । প্ল্যাস্টিকের। চিরুনির গায়ে কমলা রঙের বিচিত্র কয়েকটা ছোপ।
আচমকা দেখলে মনে হত, এক মুঠো শিউলি ফুল । অমন মনোহরা চিরুনি দেখিনি আগে বা পরে।
চিরুনি সংগ্রহের বাতিক ছিল আমার মায়ের। হরিণের শিঙের , কচ্ছপের খোলার, টিনের, আলুমিনিয়ামের, তামার, কাঠের।
কত রকমের চিরুনি যে কিনত।
একটা চিরুনি ছিল মৎস্যকুমারীর মত।
কি সুন্দর!
আজকাল অমন পাওয়া যায় না।
আচমকা শিউলি ফুলের মত চিরুনিটার কথা বললাম কেন ?
বললে বিশ্বাস করবে না, অদ্ভুত রকমের মিষ্টি একটা সৌরভ ছিল চিরুনিটায়। কিনে আনার সাথে সাথেই আবিস্কার করলাম ব্যাপারটা। টানা দশ বছর ব্যবহার করার পর ফিকে হয়ে গিয়েছিল ঘ্রাণটা। কিন্তু তিরতির করে ছিল ওটা । বাসিফুলের মত ।
কে জানে কি অদ্ভুত কৌশলে কোন কারিগর বানিয়েছিল অমন চিরুনি ? আগে বা পরে অমন জিনিস আর দেখিনি।
চিরুনির কথা দিয়ে কেন চিঠি শুরু করলাম ?
জানি না। মনে হল, তাই লিখে দিলাম।
আশির দশকে অনেক তরুণ পকেটে চিরুনি রাখতো। সময় পেলেই সাইসাই করে মাথায় চালিয়ে নিজেকে চোখা করে রাখতো। সজারুর কাঁটার মত স্পাইক ফ্যাশন চালু হয়নি।
নিজেকে ম্যাক গাইভার মনে করে চুলে চিরুনি ছোঁয়াতাম না। আক্ষরিক অর্থেই চুল ছিল কাকের বাসা। ইস্কুলের স্যারেরা বলত, - ‘ ভালমত খুঁজলে ভেতরে পাখির ডিম পাবি।’
কত বিচিত্র কথা মনে পড়ে আজকাল।
শীতের শুরুতেই চেককাটা মাফলার আর নস্যি রঙের চাদর হারিয়ে ফেলত বাবা। আজও অমীমাংসিত রহস্য প্রতি শীতে কেন অমন হত ?
সেই সময় আমি জিনসের জ্যাকেট পড়ে নিজেকে ম্যাকগাইভার হিসাবে জাহির করতাম ছোট্ট শহরের আনাচে কানাচে। তুমি বললে, এক শীতে একটা স্যুট বানিয়ে নাও।
সেই সময় তোমার পাল্লায় পরে নামকরা দর্জিবাড়ি থেকে ক্যান্ডি স্টেইপওয়ালা ফুলহাতা জামা বানিয়ে পরে আবিস্কার করলাম- নিজেকে বেশ ভদ্র আর মার্জিত মনে হয়।
অমন পোশাকেই মানায় তোমার পাশে ।
পোশাক মানুষের মুড বদলে দেয়। সাইকোলজি নাকি তেমন বলে।
তাই হয়তো লন্ডনের কোন দর্জির বানানো স্যুটের জন্য গুনতে হয় ২৮ হাজার মার্কিন ডলার। দর্জি আনজা ডি'আরসির (Enzo D’Orsi) ডিজাইন করা স্যুটের দাম পরে ৬০ হাজার মার্কিন ডলার।
তোমার কি সেই ঘটনা মনে আছে ?
বাংলাদেশি একটা বিমান ক্রাশ হয়েছিল নেপালে । মারা গিয়েছিল কত যাত্রী। পোড়া লাগেজে এক জামা পাওয়া গিয়েছিল। সাথে পিচ্চি কাগজের একটা চিরকুট- ‘ জানি না জিনিসটা পছন্দ হবে কি না। কিন্তু গায়ে দিও ।’
কি ব্যাকুলতা !
পনের
------------
কালীপূজার রাতে বাড়ি ফেরার সময় হালকা শিরশিরে বাতাস পেলাম। অমন হাওয়া পেলে ছেলেবেলায় বুঝতাম শীত আসছে ।
লক্ষ্মী নারায়ন মন্দিরের পাশে বিশাল দীঘি । ওটার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল, এই সপ্তাহে ও তোমাকে চিঠি লেখা হয়নি !
দীঘির নাম ছিল জিওস দীঘি । নামের পিছনের কাহিনীটা ভুলে গেছি। দীঘিটা মরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সারা এলাকার মানুষ ময়লা ফেলে দীঘির নানান কোনে। বছর ঘুরতেই সেখানে মাটি ফেলে দোকান খুলে বসে।
গত সপ্তাহেই দেখি একটা নতুন ফার্নিচারের দোকান হয়েছে, আটা ময়দা ভাঙ্গানোর দোকান, আরেক দোকানে বিচ্ছিরি এক জোড়া তবলা নিয়ে খামাখাই বাজাচ্ছে নিঃসঙ্গ এক হাড়গিলে চেহারার মানুষ। উনি নাকি সঙ্গীতের ইশকুল খুলেছেন। ছাত্র আসা শুরু করবে সামনের মাসে।
দীঘিটার মৃত্যু দেখে কষ্ট পেলাম। মানুষ এক মাত্র প্রাণী যে শুধু অন্য মানুষকেই খুন করে না । প্রকৃতির সব কিছুই সে খুন করে।
বছর দশেক আগে ও দীপাবলির রাতে এই দীঘিতে লক্ষ প্রদীপ ভাসাত এলাকার মানুষ। যার আর্থিক সঙ্গতি কম ছিল সে-ও কলাগাছের পিচ্চি একটা টুকরোর উপর সামান্য তেল আর সলতে দিয়ে প্রদীপ বানিয়ে পূর্বপুরুষের মঙ্গল কামনা করে ছেড়ে দিত দীঘির জলে।
সে এক দেখার মত জিনিস। আকাশে লক্ষ তারা আর দিঘী ভর্তি লক্ষ প্রদীপ। জলের নাচনে কাঁপছে।
কি সব দিন ছিল।
চৌদ্দ পুরুষের ভূত আসবে আমাদের দেখতে। তাই চৌদ্দ প্রদীপ জ্বালিয়ে চৌদ্দশাক ভাঁজা রান্না করতো মা। সাথে আলু আর বেগুনের ছক্কা।
আয়ুর্বেদ অনুযায়ী চোদ্দ শাকগুলি হল — ওল, কেঁউ, বেতো, সর্ষে, কালকাসুন্দে, নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, ভাঁটপাতা এবং সুষণী।
কিন্তু এর মধ্যে অনেকগুলো এখন পাওয়াই যায়না। তাতে কিছু এসে যায় না। যে কোন চৌদ্দ শাক হলেই হবে। বাজারের সামনের রাস্তায় কিছু মানুষ অমন মিলিয়ে চৌদ্দশাকের আঁটি বানিয়ে বিক্রি করে।
সেই সময় আমার শহরে এক পেয়ালা চা খাবার মত কোন দোকান ছিল না । যেখানে তোমাকে নিয়ে বসা যাবে। এখন তো মানুষের চেয়ে দোকান বেশি। শ্যাম্পেনের গ্লাসে সাদা কোমল পানীয় ঢেলে এক ফালি লেবুর রিঙ দিয়ে- সামার ফ্রিজ আপ নামে বিক্রি করে। গলাকাটা দামে।
আমার সঙ্গতি ছিল না দামি কোথাও তোমাকে নিয়ে বসব। তুমি ও বুঝতে। কখনও অভিমানী আহ্লাদ করতে না।
আমলকী বা জয়ন্তী ফুলের রঙের শাড়ী পরে রিক্সা থেকে নামতে। হেঁটে যেতাম দূরের পথে। পথের শেষে পাকুর গাছের তলায় এক চায়ের দোকান।
১০৮ টা নীলপদ্মে আজকাল ভালবাসা দেখানো হয় না।
ভালবাসা আজ মনিহারী দোকানের পণ্য। ভ্যালেনটাইনের দিনে স্পেশাল পিজ্জা পাওয়া যায় ৪২০০ মার্কিন ডলারে। পিজ্জা বানানোর উপাদানগুলো সাগর থেকে মুক্তা আহরণের মত বাছাই করা। যেমন- দীর্ঘদিন শ্যাম্পেনে ভিজিয়ে রাখা দুর্লভ ক্যাভিয়ার, ধোঁয়ায় ঝলসানো স্যামন মাছের ফালি, দামি কর্নিয়াকে ম্যারিনেট করা বাগদা চিংড়ীর লেজ, সাথে ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের প্রলেপ।
মানুষ কেন এইসব খায় ?
অন্যদের চিত্তহারি মনোরম ঈর্ষা জন্মানোর জন্য ?
সবচেয়ে মজা লেগেছে কোনটা জানো ?
২০১০ সালে একদল ডুবুরি ব্যালটিক সাগরে ডুব দিয়ে ভাঙ্গা এক জাহাজের ভেতর থেকে ১৬৮ বোতল শ্যাম্পেন উদ্ধার করেছে। বোতলগুলোর বয়স ১৭০ বছর।
দীর্ঘ এতগুলো বছর বোতলগুলো ছিল সাগর তলায় বরফের মত ঠাণ্ডা জলে ভিজে। ফলে বোতলের ভেতরের স্বাদ ঘ্রাণ হয়ে গেছে অপার্থিব আর মায়াবী। সোমলতার রসের মত। শুধু স্বর্গের ইন্দ্রপুরীতেই পাওয়া যায় মুফতে।
সেই বোতল এক একটা ২৪ হাজার ইউরো করে নিলামে বিক্রি হচ্ছে। যেমন করে ধনীরা চিনির দানার মত এক চিমটে হীরা কিনে খুশি করতে চায় তাদের প্রিয়তমাদের।
আমাদের সেইসবের দরকার নেই। রাতটা সুন্দরী এক মেয়ের মত। নক্ষত্রের শাড়ি পড়ে । জোসনার মদ দেয় সে আমাদের । জীবনের পানপাত্র ভরে।
ষোল
------------
এক প্রজাতির মানুষ আছে গতিই তাদের কাছে নিদ্রা।
এরা বাসায় ঘুমাতে পারে না। কিন্তু বাসে ট্রেনে লঞ্চে উঠলেই পরীদের রেশমি রুমালের মত নরম ঘুম এসে জড়িয়ে যায় দুচোখে। মুখের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে মহাজাগতিক লালা । যেন এইচ,পি লভক্রাফটের লেখা হরর গল্পের অজানা দানবের মুখ থেকে বের হয়ে আসা যাবতীয় বিদ্বেষ, লোভ লালসার চিহ্ন।
শরীর খারাপ থাকায় জীবনের প্রথম ঘুমিয়ে পরেছিলাম বাসের ভেতরে।
বাইরে কখন যেন নেমেছে রিমঝিমি বৃষ্টি ।
শ্রাবণ মাসের নিটোল বৃষ্টি । আকাশে মেঘের দলা। মেঘের রঙ স্টিং রে মাছের পাখনার মত। রুপার কাঁটা চামচের মত বিজলি চামকায় ।
বৃষ্টির ছাঁট জানালার কাচে জলকণা হয়ে সেঁটে গেছে। দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া গাড়ির টেল লাইটের লাল হলুদ আলোগুলো ঘষা ঘষা হয়ে দেখা দিচ্ছে ।
বাইরের সবকিছু যেন তেল রঙ্গে আঁকা ছবি ।
মগজে কেমন বিহ্বলতার বোধ জন্ম দেয়। দমকা হাওয়ায় শীত শীত লাগে। আজ হাওয়া দেখাচ্ছে তার ভেল্কিবাজির খেলা।
মনে হয় দূরের শালবন আর পাহাড়গুলো চলে এসেছে শহরের কাছে।
রাস্তার সব ময়লা পায়ে নূপুর পড়ে দৌড়ে যাচ্ছে ড্রেনের ভেতরে ।
পাশের সীটে বসে থাকা যুবকের হাতে কবিতার বই । এই শহরে কেউ কবিতা পড়ে আজকাল ?
আমি তো জানি কবিরা সব নির্বাসনে গেছে । ল্যাভেন্ডারে ঝোপে বা পাঠকের বুকে থাকার কথা কবিতার বই।
কিন্তু সুতার বান্ডিলে বাধা হয়ে কবিতার বই থাকে ফুটপাতে। রোদে ওদের পাতা হলুদ হয়ে তেজপাতার মত দুঃখী রঙ ধারণ করে।
কবিদের সময় কাটে সারাদিন বিড়ালের সাথে কথা বলে। বা কার্নিশে রোদের প্রতারক আলো ছায়া দেখে।
আমি কবিতা সমগ্র পড়তে পারি না। ইয়া মোটা বইটা আমাকে স্বস্তি দেয় না এক লহমার জন্য ও । মনে হয় বসে আছি বাচাল কোন মানুষের সাথে । যা শুনতে চাই তারচেয়ে বেশি কথা বলছে সে । একমাত্র, পছন্দের মেয়েটা বেশি কথা বললে ভাল লাগে । আর কারও টা না ।
রোমাঞ্চ উপন্যাস ইটের মত পেল্লাই হতে পারে। কিন্তু কবিতার বই কেন হবে ?
কবিতার বই আশি পাতার মধ্যে শেষ হতে হবে। প্রচ্ছদ হতে হবে হাতে আঁকা । মূর্ত বিমূর্ত যাই হোক - হাতে আঁকা । বাধাই হতে হবে ভাল । আরও লাগবে ভাল কাগজ । ভেতরে বানান ভুল থাকলে কবি প্রকাশক প্রুফ রিডার সবাইকে পাইকারি ভাবে খুনও করতে পারি আমি ।
এই পাতলা বইটা আমি অনেক বার পড়ব । কার্ত্তিকের ফসল বিলাসী হাওয়ার ঘ্রান নিয়ে পড়ব। মাঘের শিশিরের শব্দের সাথে পড়ব । বইটা রেখে দেব ঝিনুকের কারুকাজ করা কালো বার্মিজ টেবিলের উপর । বুকমার্কার হিসাবে থাকবে বুয়েনোস আইরেসের ব্যবহার করা ট্রেনের টিকিট।
সেই কবি কবেরকার কোন আবেগ লিখে তুলে দিয়েছে আমার হাতে । সেটা আমি ওক কাঠের পিপেতে রাখা মদিরার মত অল্প অল্প করে স্বাদ নেব। কে জানে, কবির বাসার ঘুলঘুলিতে আজও বাসা বানায় কি না পাটকিলে রঙের চড়ুই। তার বারান্দায় ঘুমঘুম চোখে বসে থাকে কি না হলুদ বিড়াল ! আজও কি কবির জানালার খড়খড়ি দিয়ে কিশোরীর প্রেমের মত ঢুকে পরে শহরের যাবতীয় কোলাহল ?
আমি চাই সব প্রেমিক তার মায়াবিনীর সাথে দেখা করার সময় ফুলের বদলে একটা কবিতার বই সাথে নিয়ে যাবে। খুব পেল্লাই বা ভারি হবে না। কবিতার বই পাতলা হলেই মানায়। তন্বী নারীর মত। তবে প্রচ্ছদ হতে হবে সুন্দর। হাতে আকা। রঙ্গিন । ভেতরে কিছু অলঙ্করণ ।
পাকা আমলকী রঙের শাড়ি পরে তুমি যদি সামনের সপ্তাহে দেখা কর, তবে আমিও কবিতার বই নিয়ে মুখোমুখি বসব।
আমাদের দেখা হওয়াটা ও একটা কবিতার মত।
আমাদের দেখা হয় না কেন, আরমিন ?
সতের
------------
কিছু কিছু মানুষের কলমে ঈশ্বরের জাদু থাকে। ওরা লিখতে পারে স্বপ্নের মত সব কবিতা। কে জানে হয়তো চন্দনের কলম ব্যবহার করে । জাদুর লতা ম্যানড্রেক বা গুপ্ত কোন উপাদান দিয়ে বানায় কালি।
অদ্ভুত সব গুন নিয়ে মানুষ আসে ধুলামাটির পৃথিবীতে । এলুমিনিয়ামের কলসি বাজিয়ে গান গায় অন্ধ ভিখিরি। ফেলে দেয়া ছাপাখানার কালি ব্যবহার করে বাদামি ঠোঙ্গায় ছবি আঁকে কোন উদাসী শিল্পী ।
সব মানুষই বিচিত্র। আলাদা।
কোন বিজ্ঞানী নাকি অণুবীক্ষণের তলায় বালির কণা তিনশোগুন বড় করে দেখেছেন, ওরা সবাই আলাদা। সবার মধ্যে রয়েছে দম বন্ধ করা বিচিত্র নকশা । যেমন দামি অতসী কাচের নিচে তুষার কণা নিলে দেখা যায় ওরা সবাই আলাদা। সবার রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আলপনা ।
একই রকম প্রিন্টের দুই প্রজাপতি পাওয়া মুস্কিল। হয়তো অসম্ভব ।
প্রিয় মানুষকে হারিয়ে ফেললে আরেকটা ও রকম পাওয়া ভীষণ রকম অসম্ভব।
কে না জানে !
আঠার
-----------
জ্বর হলে মাথার ভেতরটা কেমন ঘোরের মধ্যে থাকে। বেশির ভাগ অনুভূতি লাগে অচেনা। মনে হয় প্যারালাল জগতে আছি। বাস্তব আর অবাস্তবের সীমানায় দাড়িয়ে আছি বিচ্ছিরি ভাবে ।
অমন এক জ্বরের ঘোরে চলে গিয়েছিলাম লক্ষ্মী- নারায়ণ মন্দিরের সামনে । তখনও মন্দির মেরামতের কাজ ধরেনি। পুরানো মন্দিরের রঙ ছিল নীলচিতা ফুলের মত। সাথেই পিচ্চি শনি মন্দির।
ওখানেই দেখলাম মেয়েটাকে। লম্বা, এক হারা, মুখটা লম্বাটে, হাতে পেতলের থালা। সেটা ভর্তি হরেক রকম মৌসুমি ফলের ফালি। বাতাসা আর চিনি।
জ্বরের ঘোরে ভেবেছিলাম কোন দেবী। ভুল করে নেমে এসেছে ।
মনে পড়লো- আজ শনিবার।
একগাদা গরীব বাচ্চাদের মধ্যে প্রসাদ বিলিয়ে দিচ্ছে সে। অকাতরে। সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বেহায়ার মত দেখছি তাকে। সব প্রসাদ বিলিয়ে দেয়ার পর চোখাচোখি হল আমার সাথে।
‘ ওমা, সে কি আপনাকে তো প্রসাদ দিলাম না।’ মুখটা কেমন করে বলল সে। খেয়াল করলাম একটা দাঁত কেমন ব্যাকা। গজদন্ত। ঠোঁটের কোনে মিষ্টি একটা তিল। মাথা ভর্তি চুল। বিয়ের পর জামাই বেচারা নারকেল তেল কিনতে কিনতে ফতুর হয়ে যাবে।
একটা মাত্র বাতাসা ছিল পেতলের থালায়। সোনালী রঙের ডাবলুনের মত। জ্যামাইকার সৈকতে অমন মোহর পাওয়া যায় ঝড়ের শেষে। সেটাই তুলে দিল আমার হাতে।
‘ আপনি কোন প্রসাদ রাখলেন না ?’ হাত বাড়িয়ে গুঁড়ের মোহরটা নিতে নিতে বললাম।
‘শনি পূজার প্রাসাদ আমরা বাড়িতে নিই না।’ থালা থেকে চিনির মিহি একটা দানা তর্জনী দিয়ে তুলে জিভে ঠেকাতে ঠেকাতে বলল সে।
বেহায়ার মত চেয়ে আছি।
বাইরে, মন্দিরের সিঁড়িতে এক ভিক্ষুক বসে গান গাইছে-
‘ সে কেমন শিকারি হায়।
দম রাখে দেহে আমার
পরাণ লইয়া যায়।’
অদ্ভুত রকমের আকর্ষণীয় ক্ষমতা নিয়ে কিছু মেয়ে দুনিয়ায় আসে। পূরুষদের ঘায়েল করার জন্য কোন চেষ্টা করতে হয় না ওদের। সমগ্র পুরুষ জাতিটা পাগল হয়ে যায় ওদের প্রেমে পরার জন্য।
আমাদের মহল্লায় তিন মেয়ে নিয়ে অবনী বাবু বাস করতেন। এই তিন কন্যার জন্য সারা এলাকার ছেলেরা মরতো। সুন্দর বাহারি জামা আর সানগ্লাস চোখে ঠুসে হরেক পদের যুবক হেঁটে যেত অবনী বাবুর বাড়ির সামনে দিয়ে। বাড়ির সামনে আসলে ওদের হাঁটা চলা মন্থর হয়ে যেত, শামুকের মত। হলুদ রঙের রোদে ভিজে মোড়ের দোকানের সামনে দাড়িয়ে থাকতো নার্ভাস ছেলে ছোকরা।
পরের শনিবার আবার গিয়েছিলাম, লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দিরে। সে আসেনি।
পরপর তিন শনিবার পাইনি । তারপর পেলাম। হাতে নারকেলের ফালির মত শাঁখা। কপালে সিঁদুর। কেউ নিয়ে গেছে তাকে। পৃথিবীর সব রাঙা রাজকন্যারা তাদের ডালিম ফুলের মত রূপ নিয়ে চলে যায় বহু বহু দূরে।
আজ কত কত বছর পরেও আচমকা কারণ ছাড়াই মনে পরে। কানে আসে সেই কণ্ঠ- শনি পূজার প্রসাদ আমরা বাড়িতে নিই না। বিলিয়ে দেই।
কানে আসে সেই গান-
‘ সে কেমন শিকারি হায়।
দম রাখে দেহে আমার
পরাণ লইয়া যায়।’
---------------------------------
নোট- সারাক্ষণ দানবের মত চললেও আরমিনের সাথে কথা বলার সময় নার্ভাস হয়ে যেতাম।
ওর চোখের মনি ছিল কালো । আর উজ্জ্বল। কেমন ঝিকিমিকি করতো।
চোখে চোখ পড়লেই মনে হত বুকের ভেতরে ধিসুম ধিসুম করে কেউ পিস্তল দাগছে।
বেহায়ার মত বলে ফেললাম একদিন - আপনার চোখ দুটো অনেক সুন্দর।
সে দুই হাতে মুখ ঢেকে বলল- আপনি একটা খুনি। এক লাইনের ডায়ালগ দিয়ে খুন করে ফেলেছেন আমাকে। এই মিথ্যা বলা ছাড়া আর কি করতে পারেন আপনি?
দিশেহারা নাবিকের মত ম্লান হেসে বললাম, ঈর্ষা করতে পারি। যে সব ছেলেদের সাথে আপনি হেসে কথা বলেন তাদের সবাইকে ঈর্ষা করি আমি।
আহা, কি সব দিন গেছে !
কার নজর পড়েছিল আমাদের উপর ?
শেষ

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন