দুই
আজকাল এমন মানুষ পাওয়া বেশ কঠিন , যে কিনা বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের নাম শুনেনি ।
অনেকের মতে, পৃথিবীর সেরা দশটা অমীমাংসিত রহস্যের একটা এই বারমুডা ট্রায়াঙ্গল।
সাগরে জাহাজ ডুবে যাবে। এটা স্বাভাবিক একটা হিসেবে। দুঃখজনক দুর্ঘটনা হলেও সবাই জানে, কিছু জাহাজ ফিরে আসবে না দূর সমুদ্র থেকে। অনেকটা যেন একমুঠো মার্বেল নিয়ে খেলতে গিয়ে কোন শিশু বিশাল খেলার মাঠে হারিয়ে ফেলবে দুই চারটে প্রিয় মার্বেল।
বিমান দুর্ঘটনাও হয় হরহামেশাই।
নানান কারণে এটাও মেনে নেয় মানুষ। দুর্ঘটনার উপর কারও কোনও হাত থাকে না।
কিন্তু যখন কোন নির্দিষ্ট এলাকাতে একের পর এক জাহাজ - বিমান বা সাবমেরিন হারিয়ে যেতে থাকে তখন ব্যাপারটা স্বাভাবিক থাকে না। মানুষ নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়।
কী হচ্ছে ওখানে ? ঘটনা কি স্বাভাবিক না অন্য কিছু ? দুর্ঘটনা এক জিনিস আর কোনওরকম হদিশ না দেখে হারিয়ে যাওয়া অন্য জিনিস । একদম চিহ্ন না রেখে জাহাজ- বিমান বা সাবমেরিন হারিয়ে যেতে পারে না । কোনো না কোনো চিহ্ন থাকবেই ।
এ কেমন দুর্ঘটনা, যেখানে জাহাজ ডোবার পর। একটু কাঠ ভেসে উঠবে না। একটা লাশ পাওয়া যাবে না । বিমান থেকে তেল ভেসে উঠবে না। তন্ন তন্ন করে খোঁজার পর এক টুকরো লোহা পাওয়া যাবে না সমুদ্রের তলায়।
বেশিরভাগ সময় দুর্ঘটনার আগে কোন রেডিও মেসেজ পর্যন্ত পাঠাতে পারেনি ।
বিপদগ্রস্ত জাহাজ বা বিমান থেকে কখনও কখনও দুই একটা রেডিও মেসেজ এসেছে। মেসেজগুলির মূল বিষয় চারটে।
এক। জাহাজ বা বিমানের কম্পাস ঠিকমতো কাজ করছে না। বনবন করে ঘুরছে বা পাগলের মতো নাচানাচি করছে।
দুই। চারি দিকে অদ্ভুত রকমের উজ্জ্বল সবুজ কুয়াশা দেখা যাচ্ছে।
তিন। জায়গা চেনা যাচ্ছে না ।
চার। হঠাৎ করেই অশান্ত হয়ে উঠেছে সাগর। সাগরের জল হয়ে গেছে কুচকুচে কালো । আচমকাই ভয়াল ঝড় সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও পরে আবহাওয়া দপ্তর থেকে অমন কোন ঝড়ের খবর পাওয়া যায়নি ।
এ রকম অদ্ভুত রহস্যময় মেসেজ দিয়ে একের পর এক হারিয়েছে অসংখ্য জাহাজ, সাবমেরিন আর বিমান। পরে আর কোনও হদিস পাওয়া যায়নি৷
একদম যেন বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিলো। আর এই রহস্যময় ভুতুড়ে ঘটনাগুলো ঘটেছে আটলান্টিক মহাসাগরের নির্দিষ্ট একটা এলাকাতে।
বারমুডা একটা দ্বীপের নাম।
১৫৬৫ সালে স্প্যানিশ নাবিক জুয়ান ডি বারমুডেজ আবিষ্কার করেন এই দ্বীপটা । এই বারমুডা দ্বীপ থেকে বাহামা ছড়িয়ে মায়ামি পর্যন্ত লম্বা টান দিন স্কেল আর পেন্সিল দিয়ে। সেখান থেকে আর একটা টান সোজা পোর্টরিকো পর্যন্ত। এবং আবার ফিরে আসুন বারমুডা দ্বীপ পর্যন্ত। এখন যে ত্রিভূজটা পেলাম সেটি বারমুডা ট্র্যাঙ্গেল।
পুরো বারমুডা ট্র্যাঙ্গেল এলাকাটা মোট ৪,৪০,০০০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে।
অর্থাৎ আমেরিকার টেক্সাস, লুইজিয়ানা, আর অলকাহামা, তিনটি অঙ্গরাজ্য পুরো একসাথে জোড়া দিলে যা হবে, তার চেয়ে বড়।
প্রাচীনকাল থেকে মানুষজন এই এলাকাটা চিনত৷
পুরোনো দিনের নাবিকরা বলত, শয়তানের সাগর। ভুডু সী ও বলত অনেকে। তবে সভ্য মানুষজন বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের প্রথম রেফারেন্স পায় ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নোটবই থেকে।
সান্তামারিয়া -নিনা আর পিনটা এই তিনটি জাহাজ নিয়ে কলম্বাস যাচ্ছিলেন নতুন মহাদেশ আবিষ্কারের জন্য। আটলান্টিক মহাসাগর বিশেষ একটা এলাকায় পৌঁছতেই ভৌতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন তিনি।
দিনে রাতে হঠাৎ হঠাৎ কম্পাস যেন পাগল হয়ে যেত। চর্কির মতো বনবন করে ঘুরতে থাকত৷
কলম্বাসের লগবুক থেকে জানা যায়, ১৪৯২ সালের এগারোই অক্টোবর রাত দশটার সময় সাগরের বুকে নীল ভৌতিক আলো দেখতে পেয়েছিলেন। সমুদ্রের বুকে নেচে বেড়াচ্ছে আলোর শিখাটা। তারপর আকাশ থেকে ধূমকেতুর মতো বিচিত্র আগুনের গোলা এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সমুদ্রের বুকে ।
জাহাজের নাবিক আর মাল্লারা ভয় পেয়েছিল ভীষণ। ওরা ফিরে যেতে চেয়েছিল নিজেদের দেশে।
কে না জানে, এ সব অচেনা সমুদ্রে তলায় কত রকম ভয়ানক দৈত্য দানব থাকে। হঠাৎ করে উঠে এসে গিলে ফেলে পুরো জাহাজ।
বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের কিংবদন্তি ছড়ানোর পিছনে কলম্বাসে নোটবইয়ের ভূমিকা রয়েছে অসম্ভব রকমের।
তার জাহাজগুলো নাকি বারবার চরায় আটকে যাচ্ছিল৷ অথচ কোথাও স্থলভাগের কোন চিহ্নই ছিল না। সময়ে অসময়ে দিগন্তের কাছে ঝুলে থাকত সবুজ রঙের কুয়াশা।
বারমুডা ট্রায়াঙ্গল শব্দটা অবশ্য তখনও চালু হয়নি। শয়তানের সাগর বলতো সবাই।
ভিনসেন্ট এইচ গ্যাডিস নামে এক লেখক ১৯৬৪ সালে প্রথম বারমুডা ট্রায়াঙ্গল শব্দটা ব্যবহার করেন। অদ্ভুত রকমের শখ ছিল ভিনসেন্ট গ্যাডিস সাহেবের। পত্রিকার কাটিং জমাতে ভালোবাসতেন তিনি। বিচিত্র ধরনের সব খবরগুলো কেটে একটা ফোল্ডার সুন্দর করে জমিয়ে রাখতেন।
হঠাৎ করে কী মনে হল , দুর্ঘটনায় হারিয়ে যাওয়া জাহাজ আর বিমানগুলো খবর জমাতে শুরু করলেন। এবং অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন ১৬০৯ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত এক হাজারের বেশি জাহাজ আর বিমান হারিয়ে গেছে। একের পর এক।
এবং সবই আটলান্টিক মহাসাগরে একটা বিশেষ এলাকার মধ্যে। তিনি নিজেই ম্যাপ নিয়ে বসে স্কেল দিয়ে জায়গাটা চিহ্নিত করে নাম দিলেন বারমুডা ট্রায়াঙ্গল।
গ্যাডিস সাহেব খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, পুরনো দিনের নাবিকেরা এই জায়গাটার ব্যাপারে জানত। বন্দরে ফিরে সবাইকে জানাত তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা।
অতল সাগরে হঠাৎ করে দেখা যায় আগুনের গোলা। সবুজ কুয়াশা । আর কম্পাসের মাতাল আচরণ।
ব্যাপারটা বেশ রোমাঞ্চকর মনে হল ভিনসেন্ট গ্যাডিসের ।
এ সব কথা মিলিয়ে ঝিলিয়ে ১৯৬৪ সালে আরগোসি নামে এক পত্রিকায় বারমুডা ট্রায়াঙ্গল শিরোনামে চমৎকার একটা ফিচার লিখে ফেললেন তিনি।
ব্যাপারটা সব মানুষের নজরে এলো। লেখাটা পাঠকসমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করল বেশ। লোকজনও কেমন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো।
হায় হায়।
কী হচ্ছে এ সব?
পাঠকমহলে সাড়া পেয়ে বেশ উৎসাহ বোধ করলেন তিনি । কাজে নেমে পড়লেন নতুন করে।
অনেক খেটেখুটে নানান জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, পুরনো জাহাজে ক্যাটালগ- রেকর্ড ঘেঁটে লিখে ফেললেন চমৎকার একটা বই- ইনভিজিবল হরাইজন। সেটা পরের বছর। ১৯৬৫ সাল।
নড়েচড়ে বসল সারা দুনিয়ার মানুষ।
চমকে উঠলো সবাই। তাই তো ! জাহাজ আর বিমানগুলো যাচ্ছে কোথায়? কী ঘটছে ওঁদের ভাগ্যে?
মাঠে নামল আরও অনেকেই। বের হল আরও কিছু কলজে কাঁপানো বই ।
যেমন - এন ডাব্লু পেন্সারের- লিম্বো অফ দ্য লস্ট, ১৯৬৯ সালে।
ভিনসেন্ট এইচ গ্যাডিসের - ট্রু মিস্ট্রি অব দ্যা সি, ১৯৬৫ সালে।
চার্লস বাটলিয়ের - দ্যা বারমুডা ট্র্যায়াঙ্গল, ১৯৭৪ সালে।
সমস্যা হল, বেশির ভাগ বই ফালতু গালগল্পে ভর্তি । তথ্যের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় গালগল্প দিয়ে ঠাসা। শুধু খোশগল্প।
তারপরও মানুষজন উপলব্ধি করতে পারল। সত্যিই কিছু একটা হচ্ছে বারমুডার ভেতর।
জাহাজ বিমান হারায়। ভাল কথা। কিন্তু কোনও হদিস থাকবে না কেন? কোথায় যায় ওরা ? কি হয় আসলে ঘটনা শুরুর আগে বা পরে ?
দেখা গেল পৃথিবী প্রায় সব কটা দেশের । জাহাজ কোম্পানি আর বিমান বাহিনীর দপ্তরে অনেকগুলি অমীমাংসিত হারানো রহস্য রয়ে গেছে।
ধারাবাহিক ভাবে একে একে আরও প্রচুর বই বের হয়েছে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নিয়ে। সবগুলিই বেস্ট সেলার । এর লেখকরা প্রচুর অর্থ কড়ি কামিয়েছেন , এই বইগুলো লিখে । বানানো হয়েছে অসংখ্য ফিচার ফিল্ম ।
হয়েছে প্রচুর তর্কবিতর্ক।
বারমুডা ট্রায়াঙ্গল পৃথিবীর অমীমাংসিত রহস্যের প্রথমটা হয়ে রয়েছে বহুদিন ধরে।
অনেক বিজ্ঞানী মাঠে নেমেছেন। তবে আমার মতে সবচেয়ে ভালো কাজ দেখিয়েছে - ডিসকভারি আর ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের বিজ্ঞানীদের দলগুলো। এদের মধ্যে এমন অনেক বিজ্ঞানী আছেন যাঁরা দীর্ঘ ৩২ বছর বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের রহস্য নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন।
তর্কটা উঠলো আচমকা যখন ১৯৭৪ সালের পর থেকে জাহাজ আর বিমান হারানো বন্ধ হয়ে গেল। এদিকে যাঁরাই বারমুডা নিয়ে বইপত্র লিখেছেন তারাই আর্থিকভাবে বেশ সফল হয়েছেন।
তো?
তখনই একদল দাবি করে বসল, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের সব ঘটনা আসলে বানানো গল্প। তিলকে তাল করে লেখকেরা পরিবেশন করেছেন পাঠকের সামনে । কৃত্রিম রহস্য তৈরি করে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নামে একটা ব্র্যান্ড নেইম বানিয়ে ব্যবসা করেছে সবাই মিলে। ।
শুরু হল নতুন বিতর্ক।
একদল বিজ্ঞানী গম্ভীর মুখে বলছেন, সত্যিই রহস্যজনক কিছু রয়েছে ওই এলাকাতে। আরেক দল বিজ্ঞানী বুক ঠুকে বলছেন, সব ধাপ্পা সব গুল । পয়সা কামানোর ধান্দা ।
কাঁদা ছোড়াছুড়ি হচ্ছে দুই পক্ষের মধ্যে। নতুন নতুন আরও বই হচ্ছে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের রহস্য সমাধান শিরোনামে। লিখছেন যার যা খুশি ।ব্যাখ্যা করছেন যে যার মতো।
এমনকী ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে মতো প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত মাঠে নেমে গেছে।
আমেরিকার নেভি পর্যন্ত বলছে, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ঘটনাগুলো গুজব ছাড়া আর কিছুই না। অথচ তাদের কাছে রয়েছে বেশ কিছু অমীমাংসিত ফাইল। যে ফাইলে বিস্তারিত রয়েছে, বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এলাকাতে হারিয়ে যাওয়া বিমান জাহাজ আর সাবমেরিনের তালিকা।
লেখক, লরেন্স ডেভিস কুসচে - র মতে, বারমুডা ট্রায়াঙ্গল আসলে একটা পাজল ছাড়া কিছুই না। এলোমেলো পাজলগুলো একটু গুছিয়ে নিলে সাধারণ আর সাদামাটা জিনিসটা আমাদের চোখে পড়ে। সব কিছু সহজ মনে হয়।
এই বইটা বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নামের রহস্যময় পাজল সমাধান এর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বই।
আসুন। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয়, বিতর্কিত আর ও আলোচিত এই রহস্যে ভেতরে ঢুকে পড়ি।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন