শহরটা যেখানে শেষ সেখানেই ঘন সবুজ জঙ্গল।
লম্বা গাছের ঠাস বুনট। জঙ্গলের খুব কাছে একতলা কাঠের ছিমছাম একটা বাড়ি। ঐ বাড়িতে ছোট্ট একটা মেয়ে থাকে। ওর নাম রিমি।
ওদের কিচেনটা সুন্দর। ওখানেই বসে রিমি চা খাচ্ছিল আম্মুর সাথে।
বাইরে ঘন কমলা রঙের বিকেল।
জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে হলুদ রঙের কাঠ বাদাম গাছের পাতাগুলো টুপ টাপ করে খসে পড়ছে। বেশ শীত পড়েছে। এমন সময় দরজার কলিং বেল বেজে উঠলো।
‘ এই বিকেল বেলা কে এলো ?’ অবাক হয়ে বলল রিমির আম্মু। ‘ দুধওয়ালা তো সেই সকালে আসে। মুদি দোকানের ছেলেটা দুপুরে এসে চাল আর লবণ দিয়ে গেছে। আর তোমার আব্বুর কাছে তো চাবি আছেই । দরজার বেল বাজাবে কেন ? তুমি গিয়ে দেখ তো কে এলো ।’
দরজা খুলতেই রিমি অবাক হয়ে দেখল বাইরে হলুদ ডোরা কাটা একটা বাঘ দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা শুকনো। রিমিকে দেখেই দুই হাত জোড় করে বলল, ‘ মাফ করবেন। এই রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিলাম। চা খাওয়াবেন নাকি এক পেয়ালা। যা শীত পড়েছে ।’
পিছন পিছন রিমার আম্মু এসেছিল । বাঘটাকে দেখে বলল, ‘ হ্যাঁ, চলে আসুন। সমস্যা নেই।’
বাঘটা বেশ ভদ্রভাবেই রান্নাঘরে চলে এলো। সবচেয়ে বড় টুলটায় আরাম করে বসলো।
‘ শুধু চা দেব ? নাকি স্যান্ডউইচ ও দেব একটা। মাত্র বানিয়েছি। টোস্ট করা রুটি , সবুজ লেটুস, লাল টম্যাটো আর ডিম ভাঁজা দিয়ে বানানো । খাবেন নাকি ?’ আম্মু জানতে চাইল।
সামনেই মস্ত সিরামিকের এক প্লেট ভর্তি স্যান্ডউইচ ছিল এক ডজন। প্লেটটা সামনে নিয়ে সবগুলো স্যান্ডউইচ এক থাবা দিয়ে খেয়ে ফেলল বাঘটা।
বেচারার সাংঘাতিক খিদে পেয়েছিল।
‘ দারুচিনির কেক আছে খাবেন ?’ জানতে চাইল রিমি।
সামনে অ্যালুমিনিয়ামের ঝকঝকে একটা ট্রে ভর্তি মিষ্টি সুগন্ধি দারুচিনির কেক ছিল। সামনে বাড়িয়ে দিল রিমি। থাবা মেরে সব কেক খেয়ে ফেলল বাঘটা।
এতেই থামল না। কাচের জার ভর্তি বিস্কিট ছিল। আরও ছিল ঝুড়িভর্তি মেরুন রঙের এক ডজন আপেল। সব খেয়ে ফেলল বাঘটা।
‘ চা দেই ?’ জানতে চাইল রিমি।
বাঘটা টেবিলের উপর রাখা জগ ভর্তি দুধ, কেটলি ভর্তি চা সব খেয়ে ফেলল। কিচেনের চারিদিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগল খাবার মত আর কিছু আছে নাকি।
এক হাঁড়ি ভাত ছিল। ইলিশ মাছ, ডাল , কচুর লতি ভাঁজা আর বাসি মাংস ছিল সব খেয়ে ফেলল বাঘটা। দুই লিটারের একটা কোকের বোতল ছিল।জেলি আর জ্যামের বয়াম খুলে খেয়ে ফেলল।
আব্বুর কাশির সিরাপটা পর্যন্ত খেয়ে ফেলল।
শেষে বাথরুমে গিয়ে কলে মুখ লাগিয়ে চো চোঁ করে পানি খেয়ে লাজুক মুখে কিচেনে ফিরে এলো ।
‘ আসলে জঙ্গলে খাবার দাবার পাওয়া যায় না। গত সপ্তাহটা শুধু ঘাসফড়িং খেয়ে কাটিয়েছি। ’ লজ্জিত ভাবে বলল বাঘটা । ’ মানুষজন বন জঙ্গল কেটে শেষ করে ফেলছে। ওখানে আবাসিক এলাকা বানাচ্ছে। এই দেশে আর থাকা যাবে না। রিফিউজি হিসাবে অন্য কোন দেশে চলে যাব। যেখানে বন জঙ্গল আছে। দেখি আসামের দিকে যেতে পারি। তরাইয়ের জঙ্গলেও যেতে পারি। জলপাইগুড়ি বা নইনিতাল ও খারাপ না। যে কোন জঙ্গল হলেই চলবে। ’
‘ এমনিতে আপনার বাসা কোথায় ?’ জানতে চাইল রিমি।
‘ আগে সুন্দরবনে থাকতাম। জন্মসুত্রে। এখন খুব রিক্সি জায়গা। ওখানে নাকি কি সব বানাবে। আর গাছ কেটে সুন্দরবন একদম ফাঁকা করে ফেলেছে। যাই অনেক কথা বললাম। চায়ের জন্য ধন্যবাদ। আজ যাই । আরেকদিন আসব। ’
বাঘটা হন হন করে চলে গেল।
‘ হায় হায় এখন কি করব ?’ বললেন আম্মু।’ বাঘটা তো সব খাবার শেষ করে ফেলেছে। তোমার আব্বু এলে কি দেব ? নতুন করে রান্না বসিয়ে দেই ?’
রিমি বাথরুমে গোসল করতে গিয়ে দেখে এক ফোঁটাও পানি নেই। ট্যাঁঙ্কির সব পানি খেয়ে শেষ করে ফেলেছে বাঘটা।
ঠিক তক্ষুনি রিমির আব্বু অফিস থেকে ফিরে এলো। এসেই বলল , ‘ এক কাপ চা দাও তো দেখি।’
‘ চা নেই।’ বলল আম্মু।
‘ বানাও ।’
‘ বানাতে পারব না। পানি নেই ।’
‘অ্যাঁ । বাড়িওয়ালা হারামজাদা আজও পানি দেয়নি ? ’
আম্মু আর রিমি মিলে খুলে বলল আজ কি হয়েছে।
ঘটনা শুনে আব্বু বলল , ‘ কি আর করা বেচারার খিদে পেয়েছে। মেহমান একটু বেশি খেতেই পারে। তাতে রাগ করা একদম ঠিক না। তোমরা রেডি হয়ে নাও। আমরা আজ রাতে বাইরে কোথাও খেয়ে আসি।’
ওরা যখন রেডি হয়ে বাইরে গেল তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। রাস্তার পাশের স্ট্রীট লাইটগুলোর মাখন রঙ্গা আলো মিটমিট করে জ্বলে উঠেছে। রাস্তার ওপাশেই বড় একটা ক্যাফে।
চনমন করা খাবারের ঘ্রান আসছিল। কুমড়ার স্যুপ, সসেজ ভাঁজা, আলু ভাঁজা আর আইসক্রিম দিয়ে রাতের খাবার শেষ করলো ওরা।
পরদিন রিমি আর আম্মু বাজারে গিয়ে প্রচুর জিনিস কিনে আনল।
ময়দা, মাংস, তেল , পাউরুটি, বিস্কুট সব দশগুন বেশি করে কিনল। দোকানদার বুদ্ধি দিল বড় বড় বালতি ভর্তি টাইগার ফুড নিয়ে যেতে। এক বালতি টাইগার ফুড একদিন চলে যাবে একটা বাঘের। জিনিসটা বেশ পুষ্টিকর আর মজার।
সব কিনল ওরা।
আবার যদি বাঘটা চা খেতে চলে আসে !
কিন্তু বাঘটা আর কখনই আসেনি।
( Judith Kerr এর The tiger who came to tea এর ছায়া অবলম্বনে)

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন